Friday, March 13, 2020

রঙ রুট
সুচেতনা

(৩)
"কী হল মা? কিছু বলছ না কেন?" জাহ্নবীর প্রশ্নে সম্বিৎ ফেরে সুভদ্রার। দার্জিলিং। নামটার সাথে যেন কত অজস্র স্মৃতি জড়িয়ে। সেই কুয়াশা মাখা সকালগুলো, উঁচু নিচু রাস্তা, জলাপাহাড়ের দিকে উঠে যাচ্ছে, সেই সোনালী আলো মাখা ম্যাল, আর সেই খয়েরি কালো চেক চেক মাফ্লার। সব মনে পড়ে যাচ্ছিল সুভদ্রার। জাহ্নবীর ডাকে অন্যমনস্কতা কাটিয়ে জবাব দিলো, "এত জায়গা থাকতে সেই দার্জিলিং?" জাহ্নবী উত্তর দিল, "কেন? দার্জিলিঙে কী সমস্যা? তাছাড়া, আমি অবশ্য ঠিক দার্জিলিং যাচ্ছি না। আমি যাচ্ছি লেপচাজগত। তবে তুমি যে বলো দার্জিলিং খুবই সুন্দর? তাহলে?"
সুভদ্রা কী বলবে বুঝে ওঠেন না। সময় নিয়ে কফির কাপে চুমুক দেন। জাহ্নবী ছাড়ার পাত্রী নয়। ছাড়েও না। আবার মাকে জিজ্ঞেস করে, "কী গো? বলো?"
সুভদ্রা আর কোন উপায় খুঁজে পান না। অনেক বছর পর আবার ফিরতে হয় জীবনের সেই ফেলে আসা অধ্যায়ে। সেই অতীত, যেখানে ফিরতে একটা সময় ভীষণ কষ্ট হতো, চাননি ফিরতে। কফির কাপটা নামিয়ে রেখে মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে বলেন, "দার্জিলিং। এবং সেই ফাল্গুন মাস। সেইবার কলেজের পরীক্ষার পর গিয়েছিলাম দাদা বৌদির সাথে। দার্জিলিং বেড়াতে। সেখানে গিয়েই তোর বাবার সাথে দেখা হলো। আর তারপর..." কথায় ক্ষণিকের বিরতি দিয়ে আবার বলতে থাকেন সুভদ্রা, "আর তারপর তো তুই জানিসই। আমার সর্বনাশ। তাই চাই না তুই যাস। তুই গেলে তোরও যদি... "
মাকে থামিয়ে দিয়ে জাহ্নবী বলে, " প্রথমত, ওটা সর্বনাশ না। অই ভদ্রলোকের সাথে দেখা না হলে, আজ আমি থাকতাম না। আমায় ছাড়া এই নাকি তোমার আর কেউ নেই, তাহলে? সেই ঘটনাকেই বলছ সর্বনাশ? আর সেকেন্ডলি, মিস্টার অর্জুন রাঠোড়ের মত অমন চারমিং ভদ্রলোক আর দ্বিতীয় কাউকে খুঁজে পাওয়া বেশ বেশ কঠিন মা। কাজেই, স্টে রেস্ট অ্যাশিয়রড, আমি তোমার হিস্ট্রি রিপিট করব না। আর যদি করেও ফেলি, আমার সাপোর্ট সিস্টেম তোমার সিস্টেমের চেয়ে ঢের বেশি স্ট্রং। কাজেই, আমি সামলে নেব। আমরা সামলে নেব। বুঝেছ? আর থার্ড পয়েন্ট, মোস্ট ইম্পরট্যান্ট, আমি লেপচাজগত যাচ্ছি। দার্জিলিং না। রডোডেন্ড্রনের সন্ধানে। রঙের সন্ধানে। বাংলা রঙ। ইংরেজির কোন রঙ রুটে ভুলেও যাবো না। বুঝলে?"
সুভদ্রা আধুনিকা। জানেন মেয়ে বড় হয়েছে। ওর ইচ্ছেকে স্বাধীনতাকে মর্যাদা দেওয়াটা কর্তব্য। তাই আর দেরি না করে বললেন, "বেশ। যাবে। তবে হ্যাঁ, সব ডিটেলসে জানিয়ে যাবে আমায়। কবে কোথায় যাচ্ছ, থাকছ কোথায়, সব। আর শুনে রাখো, লেপচাজগত যাও যতই, মনে রেখো তোমার জগত কিন্তু এই আমি। দিল্লীতে বসে হাঁ করে অপেক্ষায় থাকবো। কেমন?"

"লাভ ইউ মা" এই বলে খুশীতে ডগমগো জাহ্নবী মায়ের গলা জড়িয়ে ফেলে আদরে, আহ্লাদে।


(ক্রমশ)


পুনশ্চঃ শনি রবি ছুটি। লেখা না আসারই চান্স বেশি। পুরো প্যাকড শিডিউল উইকেন্ডে।

Thursday, March 12, 2020



রঙ রুট
সুচেতনা

(২)
সুভদ্রা সিঙ্গেল মাদার। একা হাতেই মেয়েকে মানুষ করেছেন। মেয়ে রীতিমত তাই মায়ের বন্ধুরই মতন। ইদানীং মেয়ের কিছু সমস্যা হয়েছে, মানসিকভাবে একটু বিপর্যস্ত। তাই মাঝে মধ্যে থেরাপিস্টের কাছে যায়। থেরাপিস্টটি মোটামুটি ভালোই। সুভদ্রার অন্তত তাই মনে হয়। জাহ্নবীর মুড সুইংস আজকাল আগের চেয়ে অনেকটাই কম। একেকদিন সেশন থেকে এসে একেকরকম টোটকা শোনায় মাকে। আজও বুঝই সেরকমই ব্যাপার।
সুভদ্রা মেয়ের কথায় বিশেষ উত্তর দিচ্ছে না দেখে জাহ্নবী ব্যস্ত হয়ে বলল, "কী গো মাতৃদেবী, কন্যার কথা শুনছ না যে? বড়ই অবহেলা করছ? কী ব্যাপার?" সুভদ্রা মেয়ের জন্য হট চকলেট আর একটু চিকেন পপকর্ন ভেজে এনে সামনে গুছিয়ে বসে জিজ্ঞেস করলেন, "বল। শুনছি তো। কিন্তু এমন কথা তো দুদিন অন্তরই শুনে থাকি। তা এইবারে বাড়তি কী আছে যে খুব পাত্তা দেবো?" মায়ের কথায় জাহ্নবী স্পষ্টই বিরক্ত। কাঁচুমাচু মুখ করে বল্য, "দেখলে তো? আমার কথার কোন ইম্পরটেন্সই নেই।" মায়ের সটান উত্তর, "ও মা, গুরুত্ব নেই কে বলেছে? এই তো শুনছি, বাবু, সবই শুনি। শুধু তোদের মত সবেতে রিঅ্যাক্ট করে বসিনা। বল, যা বলছিলি। শুনছি আমি।"
খানিক শান্ত হয়ে জাহ্নবী বলল, "শোনো না মা, আজ ডক্টর শালিনী বলছিল যে আমার নাকি একটা ব্রেক দরকার। আই নিড আ চেঞ্জ ফ্রম দ্য রুটিন। তাই একটু বেড়াতে বেরনো খুব প্রয়োজন আমার।" সুভদ্রা উত্তর দিলেন, "তা ভালোই বলেছে। তোকে তো কত বলি। একটু ছুটি নে। কাছে পিঠে কোথাও থেকে ঘুরে আসি। চল না, আগ্রা যাবি উইকেন্ডে?" জাহ্নবী মাকে থামিয়ে দিয়ে বলে, "উফ মা। আমার পুরো কথাটাই তো শুনলে না। আই হ্যাভ টু ট্র্যাভেল অ্যালোন। টু ডিস্কাভার মাইসেল্‌ফ। বুঝলে?" সুভদ্রা শুনে হতবাক। কী বলে কী এরা? একলা একলা না ঘুরলে নিজেকে জানবে না? কেন ওরা নিজেদের চেনেনি? মানুষ হয়নি? যতসব অদ্ভুত সব চিকিৎসা পদ্ধতি। অবাক লাগে ভাবতেই। তবুও, ডাক্তার বলেছেন যখন, একেবারে ফেলনা করা যায় না। মেয়েকে জিজ্ঞেস করলেন, "তা কোথায় যাবি ঠিক করলি?"
মেয়ে দুমিনিট চুপ থাকে। ফোনের ভিতর কীসব খুটখুট করতে থাকে। এই হয়েছে এই প্রজন্মর এক নেশা। সারাক্ষণ মোবাইল। অ্যাপেই এদের জীবন।
জাহ্নবী মোবাইলের স্ক্রিনটা ধরে মায়ের সামনে। একটা হোটেল বুকিং অ্যাপ। সেখানে জ্বলজ্বল করছে লেখা "হিল হ্যাপি হোমস্টে"। দার্জিলিঙের কাছেই। ঝকঝকে এক গাল হাসি হেসে জাহ্নবী বলে, "মা, তুমি তো বলেছ দার্জিলিং অসাধারণ সুন্দর? তোমার তো থাকা দার্জিলিঙে, বলো? আমি ভাবলাম, আমিও সোলো ট্রিপ ওখানেই করি।"
সুভদ্রা চুপ। কী উত্তর দেবেন, বুঝতে পারেন না।


(ক্রমশ)

Wednesday, March 11, 2020



রঙ রুট

সুচেতনা




(১)

"শোনো, আমি বেড়াতে যাব। আমার একটা চেঞ্জ দরকার। খুব।" বাড়ি ঢুকেই প্রথম কথা জাহ্নবীর। জাহ্নবীর মা, সুভদ্রা, উনি অবশ্য এই ধরণের কথায় তেমন আর বিচলিত হন না আজকাল। মেয়ের এই যখন তখন হঠাৎ করেই এইসব বক্তব্য, এসবে তিনি অভ্যস্ত। নির্ঘাত জাহ্নবী ফেসবুকে কোনো বন্ধুর পোস্ট দেখেছে, কোথাও ঘুরতে টুরতে গিয়ে ছবি দিয়েছে। আর ব্যস, সঙ্গে সঙ্গে মেয়ের উঠলো বাই তো কটক যাই। তবে এই কটক যাওয়াটা অবশ্য আজ অবধি শুধুমাত্র বলা অবধিই সীমাবদ্ধ থেকেছে। নইলে যে হারে জাহ্নবী একেকদিন অফিস থেকে ফিরে ওই "বেনারস যাবো। আজ ত্রিপর্ণার প্রোফাইলে অসাধারণ আরতির ছবি দেখলাম। ওর চেয়ে ঢের ভালো ছবি আমি তুলতে পারবো" বা "মা, চলো লাদাখ যাই। কী অসাধারণ সিনারি গো মা" বা "মা মা, লাস্ট টাইম তো দেখো কানহা গিয়েও বাঘের দেখা মিলল না। চলো না, সরিস্কা যাই। শিয়র শট বাঘের দেখা মিলবেই" করে, এতদিনে সব যদি সত্যিই ও যেত, অফিসের পাওনা ছুটি আর ব্যাংক ব্যালেন্স, দুইই ফাঁকা গড়ের মাঠ হয়ে যেত। জাহ্নবী কাজপাগল মেয়ে। সারাক্ষণ কিছু না কিছু নিয়ে মেতে থাকতে এতই ভালোবাসে, আর অফিসে ওর সুপারভাইজার এই ব্যাপারটা এতটাই ভালো বুঝে গিয়েছেন যে, সারা অফিসের সব দায়িত্বই প্রায় জাহ্নবীর ঘাড়েই পড়েছে। অমুক মিটিং, জাহ্নবী প্রেজেন্ট করবে, তমুকের সেলস কল, জাহ্নবী হ্যান্ডেল করবে। অমুক ডেটা চাই, ওই তো, জাহ্নবী আছে তো। এই করে করে বেশিরভাগ শনি রবিও জাহ্নবীর অফিসে গিয়ে বা ওয়ার্ক ফ্রম হোম দিয়েই কেটে যায়। কিন্তু তবুও, মেয়ের এদিক ওদিক ঘুরতে যাওয়ার ইচ্ছে, ষোলো আনা। আর তাই রোজের এই এখানে যাবো আর ওখানে যাব, এই ফিরিস্তি শুনতে হয় সুভদ্রাকে। সুভদ্রা আজকাল পাত্তা দেন না। শুনেই যান। আজকের এই ডিক্লারেশনকেও সেরকমই ভেবে উড়িয়ে দিয়ে রান্নাঘরে চললেন, মেয়ের জন্য চা করতে। কিন্তু এইবারে যে ব্যাপারটা একটু অন্যরকম, এইটা বুঝলেন মেয়ের পরের কথায়।




(ক্রমশ)




পুনশ্চ: চেষ্টা করবো রোজ লেখার। তবে এইটুকুই। চাইলে একসাথে পুরোটা পড়তে পারেন।

Sunday, March 8, 2020

এশিয়ান ক্যুইজিন বড়ই প্রিয়। বিশেষ করে ভালোবাসি থাই রান্না। থাই রান্না বলতেই সবচেয়ে প্রথমে মাথায় যা আসে, এটি সেই। থাই রেড কারী। চিকেন দিয়ে করলাম। স্পেনসার্স থেকে রেড কারী পেস্ট কিনে এনেছিলাম। খুবই সহজ প্রণালী। চটজলদি রান্না হয়ে যায়। মিনিমাম পরিশ্রম। স্বাদে ভালো।

রেসিপি দিয়েই দিলাম। যদিও অনেকেই জানেন।
চিকেনটাকে (৫০০গ্রাম) অল্প নুন জলে সিদ্ধ করে রেখেছিলাম। বোনলেস দিয়ে করলে বেশি ভালো।

গরম জলে ম্যাগির নারকোলের দুধ পাউডার (৩ চামচ দিয়েছিলাম। আরো একটু দেওয়াই যায়) গুলে রেখেছিলাম।

কড়াইতে দুই টেবিল চামচ সাদা তেল গরম করে তাতে একে একে গাজর, পেঁয়াজ, ক্যাপসিকাম (ইচ্ছে অনুযায়ী। চাইলে নাও দিতে পারেন) একে একে দিয়ে সাঁতলে নিলাম। এরপর ওই তেলেই একটু রসুন বাটা আদা বাটা দিলাম (দুটোই কুচি দিলে ভালো হতো। ছিল না।)। খানিক নাড়াচাড়া করলাম। এবার এতে দিলাম দুই চামচ (উঁচু করে) রেড কারী পেস্ট। আবার খানিক নাড়াচাড়া করলাম। এবার এতে চিকেনের টুকরোগুলো দিয়ে আবার নাড়লাম। ভালো করে মশলা মাখামাখি করে নারকেলের দুধটা ঢেলে দিলাম। চিকেন সিদ্ধর জলও দিলাম। এরপর আন্দাজ মতো নুন আর চিনি দিলাম। খেয়াল রাখতে হবে, রেড কারী পেস্টটাতে নুন, গুড় দুইই আছে। কাজেই বুঝেশুনে। আর রান্নাটা মিষ্টি মিষ্টি ঝাল ঝাল হয়। তাই মিষ্টত্ব আনতে নারকোলের দুধ বেশি দিলেও হয়। এরপর খানিক ফোটালাম। গোটা চার পাঁচেক লেবু পাতা (কাফির লেবুর পাতা দেওয়ার কথা। আমি গন্ধরাজ দিলাম।) দিয়ে ফোটালাম। এরপর গ্যাস বন্ধ করে দিলাম।

জ্যাসমিন রাইস দিয়ে সার্ভ করার কথা। আমি প্লেন ভাতের সাথেই খাবো। তবে ভাত রাঁধার সময় ওই দু তিনটে লেবুপাতা দিয়ে ফুটিয়েছি।
সকলের রাতের খাওয়া কমপ্লিট? তাহলে এই ফাঁকে একটু গপ্পো করি। আজকে সকালেই লিখলাম ওই উইকেন্ড নিয়ে। পড়েছেন? সেখানে বাহারি রান্নার কথাও বলেছি। তা হয়েছে কী, লিখতে লিখতে আমার নিজেরও মনে হলো যে না। ওই উইকেন্ডে নিজেই কিছু অন্যরকম রান্না করি। প্রত্যেকবার তো মায়ের ওপরই হম্বি তম্বি করি। লেখালিখিতে যতই ভালো ভালো জ্ঞান দিই না কেন, আমি আসলে জ্ঞানপাপীই বটে। তা যাই হোক। যেমন ভাবা, তেমনি কাজ। ছটার সময় ইনস্টিটিউট থেকে বেরিয়ে সোজা চলে এলাম শপিং মল। বড় ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে এসে টুকটাক কিছু কিনলাম বটে। তবে বাড়ি ফিরতে ফিরতেও ঠিক করে উঠতে পারলাম না, কী রান্না করা যায়। তারপর আর কী, ওই অগতির গতি। সকালে শুনে গিয়েছিলাম ফ্রিজে চিকেন আছে। আর সবচেয়ে সহজ রান্না চিকেন। কাজেই...

কিন্তু তাও তো হলো। তবে রাঁধবো টা কী? এই চিকেন ওই চিকেন সেই চিকেন নাকি সেই ওই যে ওইটা? ভেবে ভেবে একসা।

এবার সত্যি কথা বলি একটা। আমি না জীবনেও পড়া মুখস্থ করতে পারিনি। চিরকাল ওই পড়তাম ঠিকই। কিন্তু তারপর পরীক্ষার হলে গিয়ে নিজের মতো করে বানিয়ে বানিয়ে লিখে আসতাম। দু তিনটে রেফারেন্স বই থেকে পড়তাম। তাই এ বই সে বই মিলিয়ে মালমশলা মন্দ থাকত না। কাজেই নম্বর, বলতে নেই, ভালোই পেতাম।

একই গল্প হলো তাই আজও। সারাদিন সময় পেলেই রান্নাবান্নার ভিডিও আর পোস্ট দেখি। তবে কী রান্না করবো, ভেবেই পাইনি। অগত্যা, মস্তিষ্কপ্রসূত ও বাড়িতে যা যা সরঞ্জাম ছিল, সেসবের সাহায্যে এই রান্নাটি করলাম। খেতেও উপাদেয় হয়েছিল। নামকরণ করেছি "বাদাম চিকেন"। করে দেখবেন নাকি? খুব সোজা। আমার মতো অপদার্থ মানুষ রাঁধতে পেরেছে মানে দুনিয়ায় যে কেউ (অবশ্যই বেসিক হাতে খড়িটা হয়ে থাকতে হবে রান্নাঘরে) এটা সহজেই রেঁধে ফেলবেন। দেখুন দেখি, এই লম্বা ছুটি আসছে সামনে। এর মধ্যে করেন কি না। বিশেষ করে বলবো, আপনাদের, যাঁরা অন্যদিন অন্যের রান্না খান। একবার এইটা রেঁধেই খাওয়ান না তাঁকে। রান্নার স্বাদ যেমন খুশি হোক না কেন, জেশ্চারটা কিন্তু খুবই ভালো লাগবে। প্রশংসা পেলে আমায় একটা ক্যাডবেরি খাইয়ে দেবেন। ঠিকানা বলে দেব। ঠিক আছে?

নিন, এবার রেসিপি লিখেই দিচ্ছি।
(গতকাল বেনুদির রান্নাঘর বইটা পড়ছিলাম। তাই ওই স্টাইলে লিখতে চেষ্টা করেছি। অবশ্যই হয়নি। না রান্না, না লেখা।)

"আদা রসুন বাটা (দুই থেকে আড়াই চামচ, উঁচু উঁচু), টমেটো বাটা (একটা মাঝারি মাপের আস্ত টমেটো ঘষে দিয়েছি গ্রেটারে), টক দই (দুই টেবিল চামচ), নুন (স্বাদ অনুসারে), লঙ্কা গুঁড়ো (স্বাদ অনুসারে) দিয়ে চিকেনের টুকরোগুলো ম্যারিনেট করলাম। পাঁচশো চিকেন ছিল। ততক্ষণে পরপর বাকি কাজ সারলাম। বাড়িতে যাবতীয় যা যা বাদাম ছিল, সেই কাজু, আমন্ড, চিনেবাদম, আখরোট নিলাম। সব মিলিয়ে হাফ কাপ হবে। (ছোট কাপের হাফ কাপ) জলে ভিজিয়ে রাখলাম মিনিট পাঁচেক। সেই জলসহ ভিজে বাদাম, পেঁয়াজ (দেড়খানা, মাঝারি মাপ), একটা শুকনো লঙ্কা, অল্প নুন দিয়ে মিক্সিতে ভালো করে বেটে নিলাম। এবার কড়াইতে সাদা তেল (আমি একটু কমই দিই। তাও ধরুন, দুই টেবিল চামচ। দই দেওয়া আছে মাংসে, তাই তেল ছাড়বে) গরম করে পেঁয়াজ কুচি (আধখানা মাঝারি মাপের), অল্প নুন আর চিনি (চিনি দেওয়া ক্যারামেলাইজ করতে) দিয়ে কড়া খয়েরি করে ভাজলাম। তুলে রাখলাম। এর পরের স্টেপ, অপশনাল। আমাদের বাড়িতে চাইনিজ ছাড়া মাংসের সব প্রিপারেশনেই আলু পড়ে। তাই তেলে আলু ভাজলাম অল্প। একই কড়াইতে (প্রয়োজন হলে একটু তেল আরো দেওয়া যায়। তবে আমি কম তেল প্রেফার করি। এক কেজি ওজন আজই দেখলাম কমেছে কি না!) এবার শুকনো লঙ্কা (২টা), তেজ পাতা (২টা) আর আস্ত গোল মরিচ (গোটা পাঁচ ছয়েক)
এবং ইঞ্চি দেড়েক দারুচিনি ফোড়ন দিলাম। এরপর ওই বাদাম বাটার মিশ্রণ প্রায় ৩/৪ ঢেলে দিলাম। কষাতে লাগলাম খানিক। আলুর সাথে মাখামাখি হলো খানিক। এরপর চিকেনের টুকরো দিয়ে দিলাম। নাড়াচাড়া চলতে লাগল। বাকি বাদাম বাটা দিলাম। প্রয়োজন মতো এরপর নুন চিনি আর জল দিয়ে দিলাম। কড়াই ঢেকে মাংস সিদ্ধ হতে রাখলাম খানিকক্ষণ। হয়ে গেলে একটু (এক চামচ) ঘি ছড়ালাম। এবার ঢাকনা খুলে আরো একটু নাড়াচাড়া। তারপর নামানোর ঠিক আগে বেরেস্তা ছড়িয়ে নেড়ে ঘেঁটে গ্যাস বন্ধ।

স্পেনসার্স গিয়েছিলাম আজ গ্রসারি (পড়ুন খ্যাটনের সরঞ্জাম জোগাড় করতে) শপিং করতে। রেডিমেড কুলচা কিনেছিলাম। মাইক্রোতে গরম করে মাংসটা দিয়ে খেলাম। তবে এই প্রিপারেশন পরোটা বা গরম ভাত দিয়েও খাওয়া যায় মনে হয়। আর ভালো হবে যদি তেলের সাথে ঘি মিশিয়ে রাধলে ফোড়ন দেওয়ার সময়। তবে ওই যে, আমি হেলদি ইটিংয়ে বিশ্বাসী!😊😊

কেউ এটা ট্রাই করলে জানাবেন কিন্তু!

(তা বলে ভাববেন না এবার থেকে এখানে আমি লেখা আসছে না বলে ফাঁকি মেরে গান যেমন দিই, তোমন রান্না দেব। উঁহু। নেহাৎ এই বিশেষ রান্নাটি সম্পূর্ণ আমার ঊর্বর মস্তিষ্কপ্রসূত, অগত্যা "ক্রিয়েটিভ ও অরিজিনাল কন্টেন্ট"। তাই সাম্পানের পাতায় স্থান দিলাম। হজম হলে হয়।)

- সুচেতনা
"থাপ্পড়" সিনেমাটি দেখেছেন? আমার দেখা হয়নি। তবে ট্রেলার দেখেছি। পারলে দেখবেন। খুব প্রয়োজন। আপাতত তিনটি ঘটনা বলি যখন এই থাপ্পড়টা খুব জরুরি।

থাপ্পড়
সুচেতনা

(১)
বিতান, অভ্র, রঞ্জিত, সুকোমল সেই কোন ছোট্টবেলা থেকে বন্ধু, যাকে একেবারে বলে "চাড্ডি বাডিজ"। একই স্কুলে লেখাপড়া করেছে। তবে বর্তমানে কলেজ আলাদা। বিতান ফোর্থ ইয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ছে ব্যাঙ্গালোরের কলেজে, অভ্র কোনো এক আই আই টিতে এম এস সি ফার্স্ট ইয়ার, রঞ্জিত হলদিয়াতে মেডিকেল থার্ড ইয়ার আর সুকোমল মাস কম পড়ছে কলকাতাতেই। আপাতত হোলির ছুটিতে চার বন্ধু একসাথে। অনেকদিন পর। আড্ডা জমেছে শহরের এক বিখ্যাত শপিং মলের ফুড কোর্টে। এদিক সেদিক নানান গল্পই চলছে। তবে মাঝে মধ্যেই এক কমন টপিক বারবার উঠে আসছে। তাদের চারজনের জীবনেই কোনো বিশেষ বান্ধবীর অভাব।
বি: ধুর, ফোর্থ ইয়ার হয়ে গেল। গিটার গাঁজা কিছুই বাদ দিলাম না। প্লেসমেন্টেও চাকরি জুটে গেল। কিন্তু গার্ল ফ্রেন্ড? ধুর ধুর। আমার কপালে ওই আনন্দবাজার নাচছে।
র: শোন ভাই, ওসব মেয়ে ফেয়ে নেই লাইফে, অনেক শান্তিতে আছিস। বুঝেছিস?
সু: কেন বে? নিজে ব্যাটা সারাদিন এনাটমি ক্লাসে জমিয়ে অঙ্গ প্রত্যঙ্গ দেখছো সব, তোমার ভাই লাগে না। কিন্তু আমাদের তো লাগে। নাকি? কীরে অভ্র, চুপ করে কেন, বল? কাহাতক আর পোস্টার দেখে কাজ সারতে ভাল্লাগে বল তো?
অভ্র কোনো উত্তর দেয়না। চুপচাপ বসে শোনে ওদের কথা।
বি: সুকোমল ভাই একদম রাইট কথা বলেছিস। রঞ্জিত তো সারাদিন ওই ক্যাডাভার ঘাঁটে। ওর আর কী বল। রাত্রে ওতেই চলে যায়। আমাদের বাপু জীবনে ওই জন্যই শপিং মল লাগে। ওই দেখ, দেখ, দেখ। ওই যে। ওই যে ওই পিঙ্ক হট প্যান্ট পরা চিংকিটাকে দেখ। দেখেছিস? পুরো মাখন ভাই, মাখন।
সু: হ্যাঁ। উফ ঠিক যেন ভিটের ক্যাটরিনা। কী ঠ্যাংখান ভাই। আঃ।
র: তোরা চুপ করবি? তখন থেকে বাজে কথা বলেই যাচ্ছিস। লিমিট ক্রস করছিস কিন্তু।
বি: ওই যে বললাম, আমাদের কষ্টটা তুই আর কী বুঝবি বল। তুই রোজ ঘাঁটিস হিউম্যান ঠ্যাং। আর আমাদের কপালে জোটে ম্যাক্সিমাম ওই কে এফ সির ঠ্যাং। আর সাইডে একটু আধটু ওই চিংকি মামনিগুলো। তুই আর কী বুঝবি ভাই, প্রিভিলেজড মানুষ। কীরে অভ্র, বল?
অভ্র আর চুপ থাকতে পারে না। রাগে ওর কান লাল হয়ে গিয়েছে। ও উঠে দাঁড়িয়ে সুকোমল আর বিতানের গালে দুটো থাপ্পড় মারে, জোরে। "যেদিন তোরা ভালো মানুষ হবি, সেদিন আসবি কথা বলতে", এই বলে উঠে চলে যায় টেবিল ছেড়ে। বাকি তিন বন্ধু সাময়িক ভাবে বিহ্বল হয়ে গেলেও তারপর একে অপরের মুখ চাওয়াচাউই করতে থাকে। ওরা জানে না, অভ্র, যে কিছু মাস আগে অবধিও ওদেরই মতন ছিল, কয়েক সপ্তাহ হল বদলে গিয়েছে। বদলটা অবশ্য বাধ্য হয়েই। নিজের বোনের মলেস্টেশনের পর মানসিক রুগীতে পরিণত হওয়াটা স্বচক্ষে দেখে।

(২)
নয়নিকা আর দীপাঞ্জনের বিয়েটা দুই বছর পূর্ণ করেছে সদ্য। কাগজ দেখে সম্বন্ধ করেই বিয়ে। পাল্টি ঘর। সবাই জানে, বেশ আনন্দেই আছে ওরা। হ্যাঁ, এমনি সবই ঠিকঠাক। শুধু ওই মাঝে মাঝে দীপ অফিস থেকে ফেরে মদ খেয়ে। নেশায় চুর। আর তখন কাণ্ডজ্ঞান থাকে না কোনো। নয়নিকা কিছু বলতে গেলেই তখন জোটে অকথ্য ভাষায় গালাগালি। আর মার। এ ছাড়া অবশ্য মাঝে মাঝে নয়নিকার ইচ্ছের বিরুদ্ধে গিয়ে শারীরিক মিলনও ঘটে। নয়নিকার হাজার বারণ, কাকুতি মিনতি তখন হয়ে যায় "বাহানা"। সমস্ত "পৌরুষ" ঢেলে নিজের "অধিকার" ফলায় দীপ। নয়নিকা একেই নিজের ভাগ্য বলে মেনেই নিচ্ছিল। ঠিক যেমন ছোট থেকে শিখে এসেছে, মেয়েরা মানিয়ে নেয়। স্বামীই দেবতা। পুরুষ মানুষ। একটু আধটু ওরকম করতেই পারে। প্রায় যখন অভ্যেস করেই ফেলছিল ও, হঠাৎই স্কুলের বন্ধুদের গ্রুপ থেকে পুনরায় যোগাযোগ হয় পারমিতার সাথে। পারো উকিল। ডোমেস্টিক ভায়োলেন্স বিষয়ে একদিন একটা পোস্ট শেয়ার করার সূত্রেই ওর সাথে নয়নিকার আলাদা করে কথা হয়। নয়নিকা আস্তে আস্তে বুঝতে শেখে যে এগুলি ওর প্রাপ্য নয়। রুখে দাঁড়াতেই হবে ওকে। অর্থনৈতিক স্বাধীনতা থাকুক কি না। আর তাই সেকেন্ড এনিভার্সারির দিন রাতেও যখন দীপাঞ্জন নেশা করে এসে মারতে যায় নয়নিকাকে, নয়নিকা উল্টে একটা পাল্টা থাপ্পড় মারে দীপের গালে।
ঘটনার আকস্মিকতায় দীপ থমকে যায়। নেশা তখন কেটে গেছে। অবাক সে। ওর এই নরম বউ ওকে মারতে পারলো? আঁতে ঘা লাগে ওর। পার্স আর একটা ছোট ব্যাগ গোছানোই ছিল। হাতে নিয়ে গটগট করে বেরিয়ে যায় নয়নিকা বাড়ি থেকে। মুক্তির সন্ধানে।

(৩)
শর্মী আর ওর  পাঁচ বছরের মেয়ে পুপাই এই কিছু মাস হলো এসে থাকছে নেস্ট হাউজিংয়ের তিনতলার এই ফ্ল্যাটে। ওদের ঘিরে পাড়া প্রতিবেশীর অপার কৌতূহল। কেন বাড়িতে কোনো পুরুষ মানুষ স্থায়ীভাবে নেই, বাড়িতে কখন কে এলো গেল, সব ব্যাপারেই সকলের বড়ই জিজ্ঞাসা। অনেকে তো আবার কেন মিত্তিররা ওদের ফ্ল্যাট ভাড়া দিলো, এই নিয়েও নানান মতামত রেখেছেন।
শর্মীদের এই ফ্ল্যাটে আসার পর আজ প্রথম জেনারেল বডি মিটিং। এমনিতেই ওর ইচ্ছে ছিল এই সুবাদে বিল্ডিংয়ের সকলের সাথে আলাপ পরিচয় করবে, তা ছাড়া সিকিউরিটি, জলের ব্যবস্থা এসব নিয়েও জিজ্ঞাস্য ছিল কিছু। তাই শর্মী এসেছে মিটিংয়ে। কিন্তু এসে যে এমন কিছু ঘটবে, সেটা এই একবিংশ শতাব্দীর কলকাতাতে বসে ও আশা করেনি। কী হলো? শুনুন তাহলে।
মিস্টার দত্ত, হাউজিংয়ের সেক্রেটারি, প্রথমেই শর্মীর সাথে সকলের পরিচয় করালেন। তারপর পরবর্তী এজেন্ডাতে যেতে যাবেন, এমন সময় বাধ সাধলেন শর্মীর উল্টোদিকের ফ্ল্যাটের সিনিয়র মিসেস সিনহা। "আচ্ছা, শর্মী, তুমি একা থাকো কেন?" শর্মী একটু তাকালো, এইসব প্রশ্নে ও অভ্যস্ত। তাই হেসেই উত্তর দিলো, "না তো মাসিমা। আমি আমার মেয়ে পুপাইকে নিয়ে থাকি।" মিসেস সিনহাও দমবার পাত্রী নন। উনি বললেন, "না মানে তোমার হাজব্যান্ড? উনি কোথায়?" শর্মী মাথা ঠান্ডা রেখেই বললো, "নেই।" মিসেস সিনহা অবাক। বললেন, "নেই মানে? উনি কি মারা..." শর্মী ওকে থামিয়ে বললো, " না না। বহাল তবিয়তে বেঁচে আছেন। আমরা ডিভোর্স নিয়েছি, তিন বছর হলো।" ব্যস। এইবার যেন মিসেস সিনহা লোপা বল পেয়েছেন, ঠুকে ওভার বাউন্ডারি। বললেন, "ও মা। সে কী, ডিভোর্স কেন, কী সমস্যা?" শর্মী ঠান্ডা গলায় উত্তর দিলো, "ওটা পার্সোনাল।" মিসেস সিনহা ছাড়বার পাত্রী নন। বললেন, "নিশ্চয়ই তোমার কোনো এফেয়ার টেফেয়ার..." ওর কথা শেষ করতে না দিয়েই হঠাৎ কোণ থেকে এতক্ষণ বিরক্ত হয়ে চুপচাপ শুনে যাওয়া, ওরই পুত্রবধূ, স্বাগতা সিনহা বলে উঠলো, "মা, অন্তত ওর সেই সাহসটা আছে, একসাথে থাকা যাচ্ছিল না বলে বেরিয়ে এসেছে। অন্তত আমার চেয়ে ভালো আছে। প্রতিদিন আপনার ছেলের ওই লুচ্চামি, নোংরামি সহ্য করে আছি শুধুমাত্র সাহসের অভাবে। ও অন্তত নিজের মতো করে বাঁচছে। কে কী বলবে, তা পাত্তা দেয়নি। আর এফেয়ারের কথা বলছেন, আপনার ছেলেকে একবার ফিরে গিয়ে জিজ্ঞেস করবেন তো, আজকাল উনি কার সাথে এফেয়ার করছেন? মিস রুহি না মিসেস মিত্র?"
উপস্থিত সকলে চুপ। কারুর মুখে একটা কথা নেই। শব্দের থাপ্পড়টা ভালোই খেয়েছেন সিনিয়র মিসেস সিনহা।

Friday, March 6, 2020

হোম মিনিস্টার

শনি আর রবি, এই দুদিন বাড়ির সবার আলাদাই আনন্দ। সারা সপ্তাহ অফিসের ঘানি টানার পর পরপর দুদিন শুধুই আরাম আর আলস্য। এই দুটোদিন বাকি পাঁচদিনের মত সকাল ছটার অ্যালার্মে ঘুম না ভাঙলেও চলে। নাকে মুখে কিছু একটা গুঁজে শেয়ার ক্যাবে চেপে অফিস পৌঁছাও, তারপর সারাদিন কীবোর্ডের দিকে তাকিয়ে লাইনের পর লাইন হয় কোড লেখো, নয় ভুল সংশোধন করো। তারপর আবার সন্ধ্যে হলে সেই অ্যাপ ক্যাবের সার্‌জ। সব মিলিয়ে সোম থেকে শুক্র, একটুও শান্তি নেই, নেই অবসর। তবে হ্যাঁ, স্নিগ্ধার অবশ্য যাহাই শনি তাহাই সোম। বরং শনি রবি বাড়তি কাজই বটে। এই যেমন, দুধওয়ালা ঠিক সেই ছটাতেই দুধ দিয়ে যাবে, সাড়ে সাতটাতে ময়লা নেওয়ার গাড়ি এসে উইস্‌ল বাজিয়ে যাবে। তারপর আটটার মধ্যে নিরুদি আসবে বাসন মাজতে। না এলে তো আরোই চিত্তির। শুক্রবার, উইকেন্ড শুরু, একটু বেশীমাত্রাতেই রান্না খাওয়া হয়েছে। সিঙ্ক্‌ ভর্তি এঁটো বাসন। সব মাজতে হবে। স্বামী ইন্দ্রজিৎ আর কন্যা পুপ্লুর ঘুম ভাঙতে ভাঙতে সাড়ে নটা, এর মধ্যেই তাই মুখরোচক নাস্তাও তৈরি করতে হবে। নইলে তো আবার পুপ্লুর বাক্যবাণ ধাঁ করে এসে বিঁধবে। "সারাদিনই তো বাড়ি বসে থাকো। এত কুকারি শোজ্‌ দেখতে থাকো। এদিকে রান্নার সময় সেই একঘেয়ে রান্না। দুটোদিন একটু আয়েস করে খাবো দাব, তাতেও যদি সেই ব্রেকফাস্ট টেবিলে বসে বাটার টোস্ট নয় একঘেয়ে লুচি আলুর চচ্চড়ি পাই, ভালো লাগে বলো? উঁহু। জাস্ট ভাল্লাগেনা। একটু ইউনিক্‌ কিছু তো করতে পারো।" পাশ থেকে ইন্দ্রও সায় দেবে, "হ্যাঁ স্নিগ্ধা, রোজ তো অফিসে টিফিনে পাউরুটি আটা রুটি নয় রবারের সোলের মত ঠাণ্ডা লুচি চিবোই। একটু অন্যরকম কিছু করো প্লিজ?" অগত্যা, সব্জি চিকেন ডিম ময়দা সব নিয়ে তোড়জোড়, রাজকীয় ব্রেকফাস্ট বানাও। পুপ্লু আর ইন্দ্রর সারা সপ্তাহের ছাড়া জামাকাপড় মেশিনে দাও, এরই মধ্যে দুপুরের খাওয়ার আয়োজন। বলাই বাহুল্য, সেখানেও চাই "ভেরিয়েশন'। নইলে একগাদা টাকার শ্রাদ্ধ করে জোম্যাটো। মাগ্যিগণ্ডার বাজার। হিসেব করে চলতে হয়। সবদিক সামলাও। কাজের লোকের মাইনে, সংসারের খরচ, দেওয়া থোওয়া। সব হিসেব তো ম্যাডাম স্নিগ্ধাকেই করতে হয়। বাড়ির লোক তো মাসের শুরুতে থোক টাকা ধরিয়েই খালাস।  জামাকাপড় কাচা চলাকালীনই দুপুর আর রাতের রান্নার ব্যবস্থাটাও করে ফেলতে হয়। শনি রোব্বার মানেই হয় বাড়িতে গেস্ট, নয় নিজেরা কারুর বাড়ি যাওয়া। বা শপিং মলে ঘুরে বেরানো। নইলে সিনেমা থিয়েটার। বয়স যে হচ্ছে, তা স্নিগ্ধা আজকাল ভালোই টের পায়। আগে এত কাজ দিব্যি সামলে নিত, আজকাল অল্পেই হাঁপ ধরছে। হাঁটুর ব্যথাও জানান দিচ্ছে মাঝে মধ্যেই। পঁয়তাল্লিশেই শরীর ভাঙতে শুরু করে দিয়েছে। নিয়মিত আজকাল বাড়িতে ব্যায়াম করছে বটে, পুষ্টিকর খাওয়া দাওয়াও করছে। কেউ দেখবে না, খোঁজ নেবে না। নিজেরটা নিজেকেই বুঝে নিতে হবে। নিজের যত্ন নিজেকেই করতে হবে। যানে স্নিগ্ধা। বোধহয় এবার পরিশ্রমটা একটু একটু করে কমাতে হবে। চাকরিরত হলে চিন্তা ছিল না।  ষাটের পরই রিটায়ারমেন্ট। কিন্তু এই চাকরিতেতো আবার সেই বালাইও নেই। কায়দা করে "ডেজিগ্‌নেশন" দেওয়া আছে বটে, "হোম মিনিস্টার" নাকি "হোম ম্যানেজার"। হাসি পায় স্নিগ্ধার মাঝে মাঝে। এইসব যত গাল ভরা নাম। সবই "গিমিক"। কিছু প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক লাভের জন্য আর কিছু ওই সমাজের জন্য। বেশ এরকম নাম ধাম দিয়ে বিনে পয়সায় কাজ করইয়ে নেওয়া যায়। ওই বছরে কিছু বিশেষ বিশেষ দিনে, যেমন উইমেন্‌স্‌ ডে, মাদার্‌স্‌ ডে, এইসব দিনে যা একটু আধটু উদযাপন হবে। ব্যস। তারপর সারা বছর সেই যে কে সেই। নাহ, উইকেন্ড মোটেই ভালো লাগেনা স্নিগ্ধার।

চাই না বাপু এই দুদিনের উদযাপন, চাই না এই "গিমিক"। তার চেয়ে শুধু আর বাকি সদস্যদের মত প্রাপ্য সম্মান, কাজের স্বীকৃতি ও প্রাপ্য অবসর দাও, এতেই হবে। এইটুকুই তো চায় স্নিগ্ধা, স্নিগ্ধারা। পাবে না ওরা?