শুভাদিত্য সান্যাল। বয়স পঁয়ত্রিশ। নামী দামী কলেজের ডিগ্রীর দৌলতে ইতিমধ্যেই একটি বহুজাতিক সংস্থার ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে বম্বেতে কর্মরত। সোম থেকে শুক্র অফিসে বারো ঘণ্টা কাটালেও, শনি এবং রবি, পারতপক্ষে কাজেকর্মে থাকতে নারাজ। এই দু'দিন ওর যাকে বলে "মি-টাইম"। সারা সপ্তাহের রসদ জোগায় এই দুদিন।
সক্কাল সক্কাল কমপ্লেক্সের অনতিদূরে অবস্থিত পার্কে খানিক জগিং, তারপর কমপ্লেক্সেরই জিমে খানিক ঘাম ঝরানো। উদ্দেশ্য, এন্ডরফিন সৃষ্টি। এরপর বাড়ি ফিরে খবরের কাগজ। ইতিমধ্যে স্ত্রী ঘুম থেকে উঠে পড়ে। সেও কর্মরত, সারা সপ্তাহে একসাথে বেশিরভাগ দিনই সময় হয় না খাওয়ার। উইকেন্ডে তাই বাড়ির নিয়ম, একই শহরে থাকলে অন্তত দুটো খাওয়া একসাথে বসে খেতেই হবে। শনিবার ব্রেকফাস্ট স্ত্রী মনস্বী বানালে রবিবার বানায় শুভাদিত্য। আজ অবশ্য মনস্বী শহরে নেই। কলেজ রি-ইউনিয়নে ব্যাঙ্গালোরে। তাই নিজের হাতেই ব্রেড টোস্ট আর স্ক্র্যাম্বল্ড এগস, সাথে কড়া করে এক কাপ কফি বানিয়ে খেতে হল।
এরপর সারাদিন টুকটাক নিজের স্টাডি রুমটা গুছিয়ে রাখা, বইয়ের আলমারিতে বইগুলো নিয়ে এদিক ওদিক করা। কখনও কখনও আবার এক আধটা বই বের করে উল্টে পাল্টে দেখা। এই আলমারির সংগ্রহ ওদের দুজনের মিলিত প্রয়াস। দুজনেই বই-পোকা। ম্যাট্রিমোনি ওয়েবসাইটে যখন দুজনের প্রথম আলাপ হয়, গান ও সিনেমা ছাড়া আরো যে একটা কমন পছন্দ দুজনের রয়েছে, এটা জেনে শুভাদিত্য যারপরনাই খুশি হয়েছিল। অবশ্য কাজের চাপে ইদানীং পড়া কম হয়ে গিয়েছে আগের তুলনায়, তবুও মাঝে মধ্যেই বইগুলো নেড়েঘেঁটে রাখা হয়।
আজ একা একা লাঞ্চ করতে হবে বলে শুভাদিত্য ক্লাব থেকেই খেয়ে এলো। ওখানে কিছু পরিচিত বন্ধুবান্ধব ছিল। খেতে বসে বেশ একটু আড্ডাও হয়ে গেলো। বাড়ি ফেরার পালা।
এই এত বড় বিলাসবহুল ফ্ল্যাটটা যেন আজ বড্ড খালি খালি লাগছে। কেউ শুনলে হয়তো বলবে শুভাদিত্য মনস্বীকে চোখে হারায়, কিন্তু ঠিক তা না। তবে মনস্বীর উপস্থিতিটাই এমন স্বাভাবিক হয়ে গিয়েছে যে ও না থাকলেই কেমন জানি কী নেই কী নেই মনে হয়।
আজ দুপুরে বারান্দায় ইজিচেয়ারটা নিয়ে বইয়ের আলমারি থেকে কে জানে কী মনে হতে সুচিত্রা ভট্টাচার্যের উপন্যাস সমগ্র নিয়ে বসেছিল। প্রথম বিবাহবার্ষিকীতে মনস্বীকে দেওয়া ওর উপহার। পড়তে পড়তে কখন কে জানে দু চোখের পাতা এক হয়ে গিয়েছে। ঘুম ভাঙল ঠাণ্ডা হাওয়ার ঝোঁকে। ধুলো উড়ছে। এই রে, হাওয়ার ধাক্কায় ড্রয়িং রুমে মনস্বীর যত্ন করে গুছিয়ে রাখা পোর্সিলিনের শো-পিসগুলি উল্টে গিয়েছে। ভাগ্যিস ভাঙেনি, কেলেঙ্কারি হয়ে যেতো নইলে। দৌড়ে ঘরে ঢুকে, দরজা বন্ধ করে সেগুলিকে এক এক করে ঠিক করে সযত্নে আগের মতো করেই রাখল শুভাদিত্য। আগের মতো? মনে মনে হাসল শুভাদিত্য। সব কি আগের মতো আদৌ হয়?
ঝড় বৃষ্টি যেন আজকাল শুভাদিত্যর বড্ড ভালো লাগে। কেন জানি না মনে হয়, প্রকৃতি বুঝি ভীষণভাবে ওর জীবনের সাথে মিলে মিশে একাকার। মুহূর্তের একটা থমথমে ভাব। তারপরএই তোলপাড়, আলোড়ন। তারপর সব কিছু ঠাণ্ডা করে দিয়ে নামে বৃষ্টি। মুষলধারায়। মাস দেড়েক আগে যেমন হয়েছিল। অদ্ভুতভাবেই অপ্রত্যাশিত সেই ঘটনা। অত্যন্ত অনভিপ্রেতও বটে। মনস্বীর অনুপস্থিতিতে শুভাদিত্য জানতে পারে ওর জীবনে কৃষ্ণনের কথা। প্রথমে হতবাক হয়। খানিক যেন বিশ্বাসই করতে পারেনা ও। মনস্বী? এমন করলো?
শুভাদিত্য ঠাণ্ডা মাথায় ভাবে। কোথাও হয়তো কোন ভুল হচ্ছে কিছু। সন্দেহের জালে না ফেঁসে সোজাসুজি মনস্বীর সাথে কথা বলার সিদ্ধান্ত নেয়। সেদিন যখন ও মনস্বীকে নিয়ে ডিনারের পর গাড়ি পার্ক করে মেরিন ড্রাইভ ধরে হাঁটতে বেরোয়, মনস্বী কিন্তু অবাক হয়নি। হয়তো এইসব বিষয়ে আগাম আঁচ সকলেই পেয়ে যায়। তাই শুভাদিত্য যখন কৃষ্ণনের কথা ওকে জিজ্ঞেস করে, মনস্বী একটুও না চমকে দৃপ্ত কণ্ঠে জানায় যে হ্যাঁ, ও কৃষ্ণনকে ভালোবাসে। যেমন বাসত সেই কলেজের দিনগুলি থেকে। তবে কৃষ্ণন ভালোবাসে ওর স্ত্রী সিন্ধুজাকে। তাই মনস্বীরটা এক তরফাই থেকে যায়।
"তাহলে তুমি আমায় ঠকিয়েছিলে বিয়ে করে?" শুভাদিত্য প্রশ্ন করেছিল।
"দেখো, যখন তোমায় বিয়ে করি, আমি তখন অনেকটাই সরে এসেছিলাম ব্যাপারটা থেকে। ভেবেছিলাম তোমায় বিয়ে করে হয়তো পুরোপুরি ভুলে যাবো ওকে। হয়েছিলও তাই। আমিও নিশ্চিন্ত ছিলাম। তুমিই বলো, কোনদিনও তোমার নিজেকে আন-লাভড মনে হয়েছে?" মনস্বী জিজ্ঞেস করেছিল।
শুভাদিত্য চুপ। সত্যিই, এর তো কোন উত্তর নেই ওর কাছে। আজ যদি ও জানতে না পারতো, তাহলে কি কোনভাবে মনস্বীর কোন আচরণে ও বুঝতে পেরেছিল? মনস্বী কি স্ত্রী হওয়ার সমস্ত ধর্ম পালন করেনি? অদ্ভুত এক দোলাচলে ভোগে শুভাদিত্য।
"শোনো, আমি নিজেও খুবই কনফিউজড। আমার মনে হয় আবার কৃষ্ণনের সাথে যোগাযোগটা হওয়ায় আমার মন এমন ঘেঁটে গিয়েছে। আমি নিশ্চিত। তোমার প্রতি আমার ভালোবাসা এতটুকুও কমেনি। এবং সেটা নিখাদ। কিন্তু এই মুহূর্তে আমার মনে হচ্ছে, হয়তো কৃষ্ণনকেও আমি সমানভাবে ভালোবাসি। বা হয়তো বাসি না। যা বোধ করছি এই মুহূর্তে, তা হয়তো গোটাটাই সাময়িক মোহ? মায়া? দেখো, সিন্ধুজার ক্যান্সারের খবর পেয়ে কৃষ্ণনের সাথে আমার যোগাযোগটা আবার শুরু হয়। সিম্প্যাথি থেকেই বন্ধুত্বটা গভীর হয়। আগে যেটা হয়তো ইনফ্যাচুয়েশন ছিল, বা ধরে নিলাম ভালোবাসা, আমি ঠিক শিয়োর নই, হয়তো এখনও সেই একই অনুভূতি। শুধুমাত্র বয়স এবং পরিস্থিতি বদলের জন্য অন্যরকম লাগছে।"
মনস্বীর কথা শুনে শুভাদিত্য হাঁ করে ওর দিকে তাকিয়ে থাকে। কী বলবে ও? এরপর আর কীই বা বলার আছে?
"তাহলে আমাদের কী হবে মনস্বী? তুমি আমি আর আমাদের এই ছোট্ট পৃথিবী?" শুধুমাত্র এইটুকু জিজ্ঞেস করতে পেরেছিল ও।
"যেমন ছিল, তেমন থাক না শুভ?" মনস্বী বলেছিল।
ঝড় থেমে তখন গোটা গোটা ফোঁটা বৃষ্টি শুরু হয়েছে। বেশ খানিকক্ষণ চুপচাপ ওরা গাড়িতে ফিরে বসে রইলো। তারপর মনস্বী বলল, "আমায় একটু সময় দেবে শুভ? আমি একটু নিজেকে যাচাই করি? নিজের অনুভূতিগুলি? আগামী মাসে একটা উইকেন্ডে আমাদের কলেজ রি-ইউনিয়ন আছে। আমি ওখানে যাই। কৃষ্ণনও আসবে ওখানে। শুনেছি। আমার মনে হয় ওখানে গেলেই আমার কাছে গোটা ব্যাপারটা পরিষ্কার হয়ে যাবে। আমি তোমায় কথা দিচ্ছি শুভ, ঠকাবো না।" এরপর আর শুভাদিত্য কিচ্ছুটি বলতে পারেনি। তবে ভিতরের তোলপাড় শান্ত হয়েছে।
ঝড় বৃষ্টি চলল অনেক রাত অবধি। শুভাদিত্য চুপচাপ জানালর ধারে বসে বাইরেটা দেখতে লাগল। ব্যস্ত শহর। অগুন্তি লোক। কোলাহল। তাণ্ডব। প্রতিনিয়ত সৃষ্টি হচ্ছে মুহূর্ত।
দশটার দিকে ফোন এলো মনস্বীর।
"শুভ, কাল কিন্তু প্লীজ এয়ারপোর্টে এসো। বলেছিলাম না এখানে এলে আমার মাথাটা পরিষ্কার হবে? হয়েওছে ঠিক তাই। এখন আমি একদম শিয়োর। আমি কী চাই। কাকে চাই। লক্ষ্মীটি, কাল আমায় পিক-আপ করতে এসো। যতক্ষণ না মুখোমুখি কথা হচ্ছে, আমি তর সইতে পারছি না।" কলকল করে বলে গেলো ও।
"বেশ, আসবো। ফ্লাইট ডিটেলস মেসেজ করে দিয়ো।" শুভ মৃদু হেসে বলল।
রাত প্রায় বারোটা। বৃষ্টিটা ধরেছে খানিকক্ষণ হল। চারিদিক ঠাণ্ডা। শান্ত। স্নিগ্ধ। বারান্দার সামনের কৃষ্ণচূড়া গাছের ফুলগুলো বৃষ্টির জলে স্নান করে ঝকঝক করছে স্ট্রিটলাইটের আলোয়।
আবারও শুভাদিত্য নিজের জীবনের সাথে প্রকৃতিকে বড্ড একাত্ম বোধ করলো।
Monday, April 8, 2019
Sunday, April 7, 2019
আজি ঝড়ের রাতে
শহরের নামকরা একটি ফাইভ স্টার হোটেলের ব্যাংকুয়েট হলে আজ একটা জমাটি গেট টুগেদার চলছে। উপলক্ষ্য সেন্ট জেমস কলেজ অফ ইঞ্জিনিয়ারিং এর ব্যাচ অফ ২০০৯ এর টেন্থ রি-ইউনিয়ন। এই রি-ইউনিয়নের জন্য দেশ ও দেশের বাইরে থেকে প্রায় ষাটজন প্রাক্তন ছাত্র ছাত্রীরা এসেছে ব্যাঙ্গালোর শহরে। ওদের কলেজে। শুক্রবার রাত্রের মধ্যে সবাই এসে পড়েছে। শনিবার সারাদিন হইহই করে আড্ডা, ঘুরে বেড়ানো, খাওয়া দাওয়া। আর রাত্রে এই বিলাসবহুল ডিনার পার্টি। কাল আবার সবাই যে যার ডেরায় ফিরে যাওয়া।
এত বছর পর ব্যাচের সবার সাথে সবার দেখা হয়ে প্রত্যেকেই খুব খুশি। এক কালে যে দুই বন্ধুকে সর্বক্ষণ একসাথে দেখা যেত, রুমমেট ছিল হোস্টেলে, তারাই এখন দুজনে দুই মহাদেশে। কলেজ ছাড়ার পর হয়তো দশ বছরে তিন থেকে চারবার দেখা হয়েছে মেরেকেটে। সেদিনের সেই মানিক জোড়ের আজ এতটা সময় একসাথে কাটিয়ে, আবার আগের মতো করে আনন্দ করে যেন রিভাইটাল টনিকের চেয়েও বেশি কাজ দিয়েছে। একেই আনন্দ, উল্লাস। তারপর কয়েক পেগ উইস্কি। ক্যারাওকেতে যখন পরপর ওদের প্রিয় সমস্ত গান চলতে শুরু হলো, দুজনকে আর দেখতে হয় না। মাইক হাতে হেড়ে গলায় প্রাণ খুলে ওরা একটার পর একটা গান গেয়েই যেতে লাগলো। ঠিক যেমন হতো হোস্টেল নাইটে। ফেস্টে।
মনস্বী কলেজ জীবনেও চুপচাপ থাকত। এখনও একটুও বদলায়নি। ওয়াইন গ্লাস হাতে সুইমিং পুলের ধারে একটা কোণায় বসে অনেকক্ষণ ধরে এদের সকলের নাচ গান আড্ডা শুনছিলো, দেখছিল। ওর এতেই আনন্দ। মাঝে মাঝে এ সে এসে দুটো কথা বলে যাচ্ছিল। ছোট্ট করে হেসে দুটো কথা বলে, ফোন নম্বর ইমেল এড্রেস এক্সচেঞ্জ করে আবার নিজের ছোট্ট জগতে ফেরত। রাধিকা কয়েকবার রিকুয়েস্ট করলো ওকে, ক্যারাওকেতে এসে গাইতে। হেসে বারণ করলো। রাধিকা চলে গেল। মনস্বীর মনে পড়ে যাচ্ছিল বারবার। হোস্টেল নাইটে সেবার বন্ধুদের জোরাজুরিতে গানের কম্পিটিশনে নাম দিয়েছিল। তারপর স্টেজে উঠে একেই তো ওই চোখ ধাঁধানো আলো। তারপর প্রথম সারিতে বসা বাঘা বাঘা বিচারক। পিছনে এত ভিড়। এবং সেই ভিড়ের মধ্যে সেই এক জোড়া চোখ। কৃষ্ণনের। যে চোখের দিকে লুকিয়ে লুকিয়ে তাকিয়ে থাকত ক্লাসে বেশিরভাগ সময়। সেই চোখদুটিও ওর দিকে তাকিয়ে। অধীর আগ্রহে। সব কেমন ঘেঁটে গেল ওর। নার্ভাস হয়ে গলা দিয়ে সুরই বেরোলো না। বেতালা, বেসুরো গান। পুরোটা শেষ করবার সুযোগও পায়নি ও। তার আগেই দর্শকাসন থেকে চিৎকার, হট্টগোল শুরু হয়ে গেল। কোনোমতে কার্টেন ড্রপ। আর ওর পালিয়ে নেমে আসা। কী বিভীষিকা। আর কোনোদিনও এরপর মনস্বী স্টেজে গান করেনি। কারুর সামনেও গায় না।
' হাই! এখানে একা একা বসে? ভিড় ভালো লাগছে না বুঝি?' মনস্বী তাকিয়ে দেখল। ওর পাশে এসে বসেছে কৃষ্ণন। গাঢ় নীল স্যুট। কব্জিতে দামি ঘড়ি দেখা যাচ্ছে। চোখে সরু চশমা। কিন্তু সেই দশ বারো বছর আগের স্পার্কটা এখনো একইভাবে বর্তমান। বিলাসবহুল ফ্রেঞ্চ পারফিউমের সুগন্ধ। সব মিলিয়ে কৃষ্ণন এখনো একইভাবে আকর্ষণীয়। স্বল্প হেসে মনস্বী বললো, 'হ্যাঁ। এখানে বসে দিব্যি লাগছে। লোকজন কী সুন্দর গাইছে। আমিও দূরে বসে গুনগুন করছি। এই ভালো।'
কৃষ্ণন মাথা নাড়লো।
'তুই এদিকে এলি যে?' মনস্বী ওকে প্রশ্ন করলো।
'একচ্যুয়ালি আমিও খানিকটা হাঁপিয়ে উঠেছি এই ভিড়ে। ওভারডোজ হয়ে গিয়েছে আমার।' কৃষ্ণন হাসলো।
'বাবা, এ যে একেবারে উলটপুরাণ। দ্য হ্যাপেনিং কৃষ্ণন। দ্য কৃষ্ণন হু ইজ দ্য লাইফলাইন অফ অল পার্টিজ, সে টায়ার্ড?' এইবারে একটু জোরেই হেসে কথাগুলি বললো মনস্বী।
'আরে তুইও এরকম বলিস না! তুইও পিছনে লাগলে কী করে হবে?' কৃষ্ণনের এই কাতর কণ্ঠে মনস্বীর হাসি আরো বেড়ে গেলো। ও বললো, 'তাহলে কী করতে ইচ্ছে করছে এখন? চুপচাপ এখানে বসে ওয়াইন খাওয়া?'
কৃষ্ণন ছোট্ট করে হাসলো। তারপর বলল, 'ইচ্ছে তো করছে এখন এখানে আমার বউয়ের পাশে বসে চুপচাপ আকাশের দিকে তাকাই। আর তারা গুনি। বউ পাশ থেকে গুনগুন করে গান গাক। বউয়ের ফেভারিট। আজি যত তারা তবে আকাশে। কিন্তু...'
'কিন্তু কী কৃষ্ণন?' মনস্বী জিজ্ঞেস করে।
'আকাশে ঘন মেঘ। একটাও তারা দেখা যাচ্ছে না। ঠান্ডা হাওয়া দিচ্ছে। মনে হয় ঝড়টা এলো বলে। বউকে যে এবারে অন্য গান গাইতে হবে?'
মনস্বী তাকায় ওর দিকে।
তারপর খোলা গলায় গান ধরে।
'আজি ঝড়ের রাতে, তোমার অভিসার।
পরাণসখা, বন্ধু হে আমার।'
যতক্ষণে ও পৌঁছয় 'সুদূর কোন নদীর পারে, গহন কোন বনের ধারে
গভীর কোন অন্ধকারে হতেছ তুমি পার'এ, আইফোনের ওয়েদার app কে সঠিক প্রমাণ করে তখন ব্যাঙ্গালোরে উঠেছে প্রবল ঝড়। কংক্রিটের বনে, সুইমিং পুলের ধার কীভাবে যেন হয়ে গিয়েছে শিলাইদহ।
বৃষ্টির বড় বড় ফোঁটা শুরু হলো। চারিদিকে হলের ভিতরে ঘরে ঢোকার জন্য ছোটাছুটি।
ওরা দুজনে ভিজছে। আজ অনেকদিন পর।
' হাই! এখানে একা একা বসে? ভিড় ভালো লাগছে না বুঝি?' মনস্বী তাকিয়ে দেখল। ওর পাশে এসে বসেছে কৃষ্ণন। গাঢ় নীল স্যুট। কব্জিতে দামি ঘড়ি দেখা যাচ্ছে। চোখে সরু চশমা। কিন্তু সেই দশ বারো বছর আগের স্পার্কটা এখনো একইভাবে বর্তমান। বিলাসবহুল ফ্রেঞ্চ পারফিউমের সুগন্ধ। সব মিলিয়ে কৃষ্ণন এখনো একইভাবে আকর্ষণীয়। স্বল্প হেসে মনস্বী বললো, 'হ্যাঁ। এখানে বসে দিব্যি লাগছে। লোকজন কী সুন্দর গাইছে। আমিও দূরে বসে গুনগুন করছি। এই ভালো।'
কৃষ্ণন মাথা নাড়লো।
'তুই এদিকে এলি যে?' মনস্বী ওকে প্রশ্ন করলো।
'একচ্যুয়ালি আমিও খানিকটা হাঁপিয়ে উঠেছি এই ভিড়ে। ওভারডোজ হয়ে গিয়েছে আমার।' কৃষ্ণন হাসলো।
'বাবা, এ যে একেবারে উলটপুরাণ। দ্য হ্যাপেনিং কৃষ্ণন। দ্য কৃষ্ণন হু ইজ দ্য লাইফলাইন অফ অল পার্টিজ, সে টায়ার্ড?' এইবারে একটু জোরেই হেসে কথাগুলি বললো মনস্বী।
'আরে তুইও এরকম বলিস না! তুইও পিছনে লাগলে কী করে হবে?' কৃষ্ণনের এই কাতর কণ্ঠে মনস্বীর হাসি আরো বেড়ে গেলো। ও বললো, 'তাহলে কী করতে ইচ্ছে করছে এখন? চুপচাপ এখানে বসে ওয়াইন খাওয়া?'
কৃষ্ণন ছোট্ট করে হাসলো। তারপর বলল, 'ইচ্ছে তো করছে এখন এখানে আমার বউয়ের পাশে বসে চুপচাপ আকাশের দিকে তাকাই। আর তারা গুনি। বউ পাশ থেকে গুনগুন করে গান গাক। বউয়ের ফেভারিট। আজি যত তারা তবে আকাশে। কিন্তু...'
'কিন্তু কী কৃষ্ণন?' মনস্বী জিজ্ঞেস করে।
'আকাশে ঘন মেঘ। একটাও তারা দেখা যাচ্ছে না। ঠান্ডা হাওয়া দিচ্ছে। মনে হয় ঝড়টা এলো বলে। বউকে যে এবারে অন্য গান গাইতে হবে?'
মনস্বী তাকায় ওর দিকে।
তারপর খোলা গলায় গান ধরে।
'আজি ঝড়ের রাতে, তোমার অভিসার।
পরাণসখা, বন্ধু হে আমার।'
যতক্ষণে ও পৌঁছয় 'সুদূর কোন নদীর পারে, গহন কোন বনের ধারে
গভীর কোন অন্ধকারে হতেছ তুমি পার'এ, আইফোনের ওয়েদার app কে সঠিক প্রমাণ করে তখন ব্যাঙ্গালোরে উঠেছে প্রবল ঝড়। কংক্রিটের বনে, সুইমিং পুলের ধার কীভাবে যেন হয়ে গিয়েছে শিলাইদহ।
বৃষ্টির বড় বড় ফোঁটা শুরু হলো। চারিদিকে হলের ভিতরে ঘরে ঢোকার জন্য ছোটাছুটি।
ওরা দুজনে ভিজছে। আজ অনেকদিন পর।
Thursday, April 4, 2019
- কখন ফিরলি অফিস থেকে?
-
- এই? কীরে?
- অ্যাঁ? কিছু বলছিস?
- বলছি যে, কখন ফিরলি?
- খেয়াল নেই। তবে ঘন্টাখানেকের ওপর। বৃষ্টিটা শুরু হয়নি তখনও।
- চা খেয়েছিস?
- উহু।
- কেন?
- ইচ্ছে করছিল না। এমন রোম্যান্টিক ওয়েদার। বসে বসে কী সুন্দর বৃষ্টি দেখছিলাম।
- নিকুচি করেছে ওয়েদার। বাড়ি ফিরতে জল কাদায় পাগল হয়ে গেলাম। একটা ট্যাক্সি নেই। কিছু না। বাসগুলো ভিড়। বিরক্তিকর।
- আমি ভাবছিলাম...
- কী? এবারে একটা গাড়ি কিনলে হয়, বল?
- ওসব না। আমি ভাবছিলাম...
- বল।
- ধর বছর দশেক পর, এমনই এক বৃষ্টির সন্ধ্যেয় তোর আর আমার হঠাৎ দেখা হল কোথাও...
- কোথায়?
- ধর কোথাও।
- ধরলাম। তো?
- তাহলে তুই আমায় তখন কী বলবি?
- কী বলবো?
- সে তুই বল। তোকে জিজ্ঞেস করছি তো।
- উমম...ফ্রিজে চারটেই ডিম আছে। রাত্রের জন্য খিচুরি ডিম ভাজা করে ফেলছি। কিন্তু কাল সকালে তাতান আর তিতিরের টিফিন কী দেবো? দেখ যদি বৃষ্টিটা কমে, একবার গিয়ে নিয়ে আয় বা আনিয়ে নে তো।
- এই? এই বলবি তুই?
- বিয়িং প্র্যাক্টিকাল!
- হাউ আনরোম্যান্টিক!!
- সামওয়ান হ্যাস টু বি প্র্যাক্টিকাল টু!
- হা ঈশ্বর।
- বাই দ্য ওয়ে, তাতান অ্যান্ড তিতির?
- হ্যাঁ!
- মানে একে শান্তি নেই।
- যমজ, যমজ...
Tuesday, April 2, 2019
তাতান ও ম্যাজিক সানগ্লাস
১।
ছ'টার জায়গায় পৌনে সাতটায় যখন দার্জিলিং মেলটা শিয়ালদা ঢুকল, তাতান যেন ধড়ে প্রাণ ফিরে পেল। যদিও এক সপ্তাহের জন্য বেড়াতে গিয়ে বেশ ভালোই লেগেছে ওর, তবুও এই আজকে ঠিক সময়ে বাড়িতে না পৌঁছলে কেলেঙ্কারি হয়ে যেত তাতানের। তাতান, অর্থাৎ সেন্ট ডমিনিক পাবলিক স্কুলের ক্লাস সিক্সের সৌরদীপ সেনগুপ্ত। আগামীকাল ওর একটা গুরুত্বপূর্ণ ক্রিকেট ম্যাচ রয়েছে। সেন্ট ডমিনিক ভার্সেস সানশাইন অ্যাকাডেমি। যদিও স্কুলেরই কাবস দল, অর্থাৎ জুনিয়র দলের মধ্যে এই প্রতিযোগিতা, তবুও সিনিয়রদের রেষারেষির ছায়া এদের মধ্যেও পড়েছে। কাবসের ইনটার স্কুলে গত বছর সানশাইনকে ফাইনালে পাঁচ উইকেটে হারিয়ে সেন্ট ডমিনিক জিতলেও এইবারে অবস্থা হাড্ডাহাড্ডি। গ্রুপ ম্যাচে এবারে সেন্ট ডমিনিকের পারফর্মেন্স খুব একটা ভালো যায়নি। ওদের স্টার প্লেয়ার, ফাস্ট বোলার চাঁদু, অর্থাৎ চন্দ্রদীপ দ্বিতীয় ম্যাচের দিনেই পা ভেঙ্গে কাহিল। বদলি বোলার হারুণ নতুন। নার্ভাস। তাই নেটে ভালো খেললেও আসল ম্যাচে বলে বলে ওকে অপনেন্টের ব্যাটসম্যানরা পিটিয়ে ছাতু করে দিচ্ছে, রোজ। নেহাত তাতান, অর্ক আর মানিক - তিনজনেই দুর্দান্ত ফর্মে আছে, তাই কোনরকমে ব্যাটিং দিয়ে ম্যানেজ হয়েছে এ যাবৎ। কিন্তু সানশাইন তো আর যে সে টিম নয়। ওদের বিরুদ্ধে জিততে গেলে একেবারে জান প্রাণ লড়িয়ে দিতে হবে।
প্রচণ্ড গরম এবং বেশ কিছু প্লেয়ারদের চোট আঘাতের জন্য গ্রুপ ম্যাচের পর দশদিনের ছুটি ছিল। আগামীকাল থেকে কোয়ার্টার ফাইনাল শুরু। এবং প্রথম ম্যাচেই সেন্ট ডমিনিক খেলবে সানশাইনের বিরুদ্ধে। তাতান সেন্ট ডমিনিকের ক্যাপ্টেন। ওর ওপর তাই বাড়তি দায়িত্ব, বাড়তি চাপ। আজ দুপুরের প্র্যাকটিস সেশনটা তাই ওদের জন্য খুব জরুরি। তাতান মুখিয়ে আছে। হারুণকে চাঙ্গা করতে দার্জিলিং থেকে দুর্ধর্ষ টোটকা নিয়ে এসেছে। এবার তারই পরীক্ষা।
২।
বাড়ি ফিরে ঠামুর কাছে আদর আহ্লাদ পেয়ে, স্নান সেরে, ডাল-ভাত-পোস্ত-মাছের ঝোল খেয়ে তাতান বসল নিজের কিট ব্যাগটা নিয়ে। দেড়টা বেজে গিয়েছে। আড়াইটের মধ্যে স্কুল গ্রাউন্ডে ওদের সবার পৌঁছে যাওয়ার কথা। তার আগে ব্যাগ গুছিয়ে নিতে হবে। দার্জিলিং ট্রিপে ওর যাবতীয় জামা-প্যান্ট সব ছিল বাবার স্যুটকেসে। বাবা তো এখন ঘুমোচ্ছে। ডেকে তোলাও যাবে না। বকা খাবে। কাজেই বন্ধুদের জন্য কেনা উপহারগুলো আজ আর নিয়ে যাওয়া যাবে না। যাক গে। কীই বা করা যাবে। কিন্তু আসল জিনিসটা তাতান বুদ্ধি করে গতকাল বিকেলেই মায়ের হ্যান্ডব্যাগে রেখে দিয়েছিল। ভাগ্যিস। মা একটু সবে ঘরে ঢুকে বিছানায় গা এলিয়েছে, হাতে মোবাইল নিয়ে, তাতান বলল, "মা, আমার সানগ্লাসটা তোমার হ্যানন্ডব্যাগে দিয়েছিলাম না কাল? ওটা নিয়ে বেরবো এখন। ব্যাগটা কোথায় আছে বলো, আমি বের করে নেবো।" মা চোখ না তুলেই বলল, "দেখ ড্রেসিং টেবিলের পাশে চেয়ারে রাখা আছে। নিয়ে নে সাবধানে।" তাতান গেলো ড্রেসিং টেবিলের কাছে। মায়ের হাল্কা গোলাপী ব্যাগটার চেন খুলে খানিক হাতড়ে খুঁজে পেল সানগ্লাসের কালো পাউচটা। একবার দড়ি খুলে দেখে নিলো, সব ঠিকঠাক আছে তো? এরপর নিজের ঘরে এসে ব্যাগ গুছিয়ে প্র্যাকটিস জার্সি-ট্রাউজারস পরে চোখে সানগ্লাসটা এঁটে কিটব্যাগ নিয়ে সাইকেল চেপে বেরোল স্কুল গ্রাউন্ডের দিকে।
যতক্ষণে তাতান স্কুলে পৌঁছল, ঘড়িতে তখন বাজে সোয়া দুটো। দেখল, ইতিমধ্যেই সেন্ট ডমিনিকের রত্নরা, অর্থাৎ, অর্ক, মানিক, পল্লব, রজত, আনন্দ, কল্যাণ সবাই এসে গিয়েছে। এখনও আসা বাকি ফারুখ, বিদ্যুৎ, প্রদীপ্ত আর ঋভুর। তাতান মাঠে যেতেই সবাই ওকে ঘিরে ধরল। "কীরে কেমন ঘুরলি?" "মোমো খেলি?" "ঠাণ্ডা পেলি?" সব প্রশ্নের উত্তর একে একে দিয়ে তাতান বলল, "শোন, যে কারণে তোদের আগেভাগে ডাকা। কালকের ম্যাচের জন্য ছোট্ট করে স্ট্র্যাটেজি ঠিক করবো। আর একটা ছোটো করে নেট প্র্যাকটিস। এ ক'দিন সবাই খেলেছিস তো নিয়মিত?"
বিদ্যুৎ বলল, "সে তো খেলেছি। স্ট্র্যাটেজি করবি, ভেরি গুড। কিন্তু এখনও হারুণ আসেনি কেন?"
"ও আসবে। ওকে আমিই তিনটে নাগাদ আসতে বলেছি। ও আসার আগে আমাদের কিছু আলোচনা আছে।" গম্ভীরস্বরে তাতান কথাগুলো বলে দলের সকলকে নিয়ে গোল হয়ে দাঁড়িয়ে খানিক জটলা পাকিয়ে খেলার স্ট্র্যাটেজি তৈরির আলোচনা শুরু করলো। খানিক ফিসফাস, আস্তে, জোরে সবরকমই গুঞ্জন শোনা গেলো। এরপর তাতান বিদ্যুৎকে বলল, "ভাই, হারুণ যখন তোকে বল করবে, ফুল টস দিলেই ছয় হাঁকিয়ে দিবি। ইয়রকার দিলে ছেড়ে দিয়ে বোল্ড আউট হবি। আর একটু শর্ট লেন্থ দিলেই খোঁচা লাগাবি" তারপর বাকিদের দিকে তাকিয়ে বলল, "কেউ একটাও ক্যাচ ফেলবি না যেন। আজকের ম্যাচ প্র্যাকটিসটা বুঝতেই পারছিস কতটা ভাইটাল। স্পেশালি আমাদের হারুণের জন্য। চল চল, ও এসে গিয়েছে দেখ। লেটস ওয়ার্ম আপ।"
হারুণ সেন্ট ডমিনিকের ক্লাস ফাইভের ছাত্র। রোগা পাতলা এই ছেলেটি সাধারণত চুপচাপ থাকে, একটু ভীতু প্রকৃতিরই। নেহাৎ গেমসের নিখিলেশ স্যার ওকে গেমস পিরিয়ডে দুর্দান্ত কয়েকটা ইয়রকার দিতে দেখেছিলেন, তাই। এই বছর যখন সেন্ট ডমিনিকের কাবসের দল তৈরি হচ্ছিল, উনি নিজে তাতানের কাছে ওর নাম সুপারিশ করে বলেন, "সৌরদীপ, যদিও হারুণ একটু ছোট, তবুও বলবো। ওকে তোমাদের দলে রেখে দাও। কোন কোন ম্যাচে খেলিয়ো। ওর মধ্যে একটা পোটেনশিয়াল আছে, আমি দেখেছি। দেখো, ভালোই খেলবে।" স্যারের কথা অনুযায়ী তাতান হারুণকে দলে নিলো। চাঁদুর চোটের পর খেলালোও সব ম্যাচ। কিন্তু নেটে যে উইকেটের বাইরে একটাও বল করে না, সে কিনা পরপর তিন ম্যাচে একটাও উইকেট না পেয়ে শুধুই চার আর ছয় খেয়ে গেলো। আগামীকাল সানশাইনের খেলা নিয়ে ও ভীষণ ভয় পেয়ে আছে। তাতানকে তো দার্জিলিঙে থাকাকালীন বেশ কয়েকবার ফোন করে "দাদা আমি কী করে খেলবো? আমায় বের করে দাও দল থেকে। আমায় সবাই খালি ছয় চার মারে" বলে কাকুতি মিনতি করেছে। তাতান ছোটো হলেও ওর মধ্যে ক্যাপ্টেনসুলভ বিচক্ষণতা আছে। বারবার যথাসাধ্য ও হারুণকে সাহস জুগিয়ে চলেছে। কিন্তু কোথায় কী? আসল ম্যাচে ছেলেটা নার্ভাস হয়ে এত বিচ্ছিরি ভাবে খেলেছে। নেহাৎই নিরুপায়। তাই তাতান ওকে টিমে রাখতে বাধ্য হয়েছে। দার্জিলিং বেড়াতে গিয়ে দাদানের সাথে অনেক গল্প চলাকালীন তাতান হারুণের ব্যাপারে কথা বলতেই দাদানই এই চমৎকার আইডিয়াটি দেয়। এইবার এই চমৎকার আইডিয়া কতদূর খাটে এই ক্ষেত্রে, তা পরখের প্রতীক্ষা।
"হারুণ, চলে আয়। রেডি তো?" তাতান হাসিমুখে প্রশ্ন করে।
"হ্যাঁ দাদা। রেডি। তবে..." কাচুমুচু মুখে হারুণ আদ্ধেক কথা বলে থেমে যায়।
"কী হলো রে? কী তবে?" তাতান জিজ্ঞেস করে।
"তবে ভয় করছে।" হারুণ একটু নীচু স্বরে বলে।
"তাহলে এক কাজ করি। এদিকে আয় আমার সাথে। তোকে একটা সিক্রেট বলি।" এই বলে তাতান হারুণের কাঁধে হাত রেখে ওকে নিয়ে এগলো গ্যালারির দিকে। বাকিরা কথা মতো ফিল্ডিং প্র্যাকটিস চালু করে দিয়েছে ইতিমধ্যে।
"এই যে, এই সানগ্লাসটা পরে আছি আমি দেখছিস?" তাতান নিজের নীল সানগ্লাসটার দিকে আঙুল তুলে দেখাল।
"হ্যাঁ, বেশ দেখতে কিন্তু! একদম রিকি পন্টিং এর মতো লাগছে দেখতে তোমাকে।" হারুণ বলল, মুগ্ধ হয়ে।
"শুধু দেখতেই না রে। এই সানগ্লাসটা পরলে আমার মধ্যে রিকি পন্টিং খোদ ভর করে রে।" তাতান বলতে থাকে।
হারুণ অবাক হয়ে বলে, "মানে?"
"মানে এই যে এই চশমাটা চোখে থাকলে আমার ক্রিকেটীয় বুদ্ধি দারুণ বেড়ে যায়। এমন কী আমি ম্যাজিকের মতো ঠিক আগে থেকে দেখে বুঝে যাই। দেখতে পাই, বলতে পারিস। কোন বোলার কীরকম বল করবে। কোন ব্যাটসম্যান কীভাবে খেলবে। সব। এমনকি, ফিল্ডার ক্যাচ মিস করবে কি রান আউট করতে পারবে, সব আমি আগাম বলে দিতে পারি। সবকিছু দেখতে পেয়ে যাই এই চশমাটা পরলেই।" তাতানের কথাগুলো শুনে হারুণ খানিক অবাক হয়ে তাকায়। তারপর বলে, "ধ্যাত, কী যে বলো দাদা? এমন আবার হয় নাকি?" তাতান যেন এমন প্রশ্নের জন্য তৈরিই ছিল। সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল, "চল তাহলে তোকে ডেমো দেখাই একটা। তবে যদি তুই বিশ্বাস করিস। নেটে চল।"
"চলো" বলে হারুণ আর তাতান এগোয় নেটের দিকে।
নেটে তখন কল্যাণ বল করছিল ঋভুকে। অন্যদিকে দাঁড়িয়ে বিদ্যুৎ। কল্যাণের থেকে বলটা নিয়ে হারুণের হাতে দিল তাতান। আর বিদ্যুতের দিকে তাকিয়ে বলল, "দেখি তো বিদ্যুৎ, কেমন খেলিস হারুণকে।" হারুণের দিকে একবার হাসি হাসি মুখ করে তাকিয়ে তাতান বলল, " নে দেখি। উইকেট টিপ করে বল কর। দেখি কেমন ছয় মারে। কল্যাণ ব্যাটাকে তো ছয়ের পর ছয় হাঁকছিল দেখলাম। আমি পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছি। তুই টিপ রেখে বল করছিস। পরপর বেল উড়ছে। নে দেখি, খেল।"
সত্যিই তাই। এরপর পরপর ছয় বল হারুণ এক্কেবারে উইকেট লক্ষ্য করেই করলো। এবং প্রত্যেকটাতেই বিদ্যুতের বিখ্যাত ডিফেন্সকে নড়বড়ে প্রমাণ করে বেল উড়ে গেলো। ছয়ে ছয়।
"সাবাশ হারুণ।" তাতান, মানিক, অর্ক ওর পিঠ চাপড়ে গেলো একে একে। বিদ্যুতের মতো প্লেয়ারের ডিফেন্স পরপর ছ'বার অ্যাটাক করে বেল উড়িয়ে দেওয়া, চারটিখানি কথা না।
আরো ঘণ্টা দেড়েক চলল ওদের প্র্যাকটিস। এই এতক্ষণে তাতানের মনে হল, ওর দল দুর্ধর্ষ ফর্মে রয়েছে। প্রত্যেকে। আত্মবিশ্বাস টগবগ করছে সকলের। কালকে সানশাইনকে দেখিয়ে দেবে ওরা।
৩।
অবশেষে আজ সেই ঐতিহাসিক ম্যাচের দিন। সকাল ন'টা থেকে সেন্ট ডমিনিকের গ্রাউন্ডেই খেলা। হোম গ্রাউন্ড অ্যাডভান্টেজ নিতে ওরা প্রস্তুত। স্কুলের কমলা খয়েরি জার্সি গায়ে দিয়ে ওরা এগারোজন প্লেয়ার মাঠে নামছে। সবার সামনে রয়েছে ওদের ক্যাপ্টেন, সৌরদীপ। মাথায় সাদা রঙের ক্যাপ। এ যাবৎ টুর্নামেন্টে সবচেয়ে বেশি রানের প্রতীক। চোখে নীল সানগ্লাস। টসে জিতে সানশাইন ব্যাটিং নিয়েছে। ব্যাটিং এর উপযুক্ত একদম এই পিচ। এমনটা ইচ্ছে করেই করা। কারণ সেন্ট ডমিনিকের ব্যাটসম্যানেরাই সম্বল।
তাতানের ভিতরে উত্তেজনা তুঙ্গে। এই ম্যাচটা বের করতেই হবে। টসে হেরে একটু দমে গেলেও বাকিদের সামনে দেখানোই যাবেনা। বিশেষ করে হারুণ। কল্যাণকে দিয়ে ওপেন করালো ওভার। এবং প্রথম বলেই চার মারল সানশাইনের কপিল। দ্বিতীয় বল, একটু স্লো করলো। ব্যাটে বলে লাগল না। তৃতীয় বল। আবারও ব্যাটে বলে হল না। ডট বল। চতুর্থ বল। ফুল টস। তবুও দুই রানই হল। পঞ্চম বল। গুড লেন্থ। ঠুকে খেলে এক রান নিলো কপিল। এবারে শেষ বল খেলবে রাজীব। ডট বল। প্রথম ওভারের শেষে সানশাইনের রান ৭/০।
দ্বিতীয় ওভার বল করবে হারুণ। তাতান ওর হাতে বল দিয়ে পিঠ চাপড়ে বলল, "হারুণ, আমি দেখতে পাচ্ছি। তুই কালকের মতো উইকেট টিপ করে বল কর। বোল্ড হবেই।" ফিল্ড সাজানো হল। লম্বা রান-আপ নিয়ে বল করলো হারুণ। এবং এক্কেবারে ফুল-টস। কপিল সুযোগ ছাড়ল না। তুলে ছয়। তাতান দৌড়ে এসে হারুণের কাঁধে হাত রেখে বলল, "ভয় পাস না। বলছি না? তুই উইকেট লক্ষ্য করে বল কর। বোল্ড হবেই। কপিল এই ওভারেই বোল্ড হবে।" দ্বিতীয় বল। ইয়রকার। এবং কপিল বোল্ড। দলের সব ছেলেরা লাফিয়ে এসে হারুণকে জড়িয়ে ধরল। এরপর নামল সূরজ। সানশাইনের এই মুহূর্তের সবচেয়ে ইন-ফরম ব্যাটসম্যান। তাতান জানে, হারুণের সামনে কঠিন চ্যালেঞ্জ। ওকে সামলাতে হবে। সূরজ লেগের বলগুলো দারুণ খেলে। ওইদিকে তাই ওকে কিছুতেই বল দেওয়া যাবে না। কোনমতে সামলে রাখতে হবে। হারুণকে বলল, "আস্তে করে শর্ট দে একটা। খোঁচা লাগাক। স্লিপে ছেলে রাখছি। আউট হবেই।" হারুণ ওর তাতান দাদার কথা অক্ষরে অক্ষরে পালন করলো। এবং অবধারিতভাবে ফলও পেল। স্লিপে পল্লবের হাতে ক্যাচ আউট। পরের তিন বলই ডট। দ্বিতীয় ওভারের শেষে সানশাইন ১৩/২।
এরপর স্পিনার এলো। সানশাইন তুলে তুলে মারল। মারবেই। ব্যাটিং পিচ। দশ ওভারের শেষে ওরা ৮০/২। আর পাঁচ ওভার বাকি। এই স্লগ ওভারগুলো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। হারুণের এখনও দু'ওভার বল বাকি। তাতান এবার তাই ওকেই ডেকে বল দিল। ব্যাট করবে প্রদীপ্ত। কুড়ি বলে পঁয়ত্রিশ করে খেলছে। তাতান হারুণকে তাতানোর জন্য এগিয়ে এলো, "আবার সোজা উইকেট দেখে বল কর। আমি দেখতে পাচ্ছি। তুই ওকে বোল্ড করবি। এই ওভারেই। দেখে বল কর ভাই।"
হারুণ বল হাতে ছোটা শুরু করল। সেন্ট ডমিনিকের গ্যালারি থেকে "গো হারুণ, গো হারুণ" চিৎকার। এবং সোজা উইকেটে বল। প্রদীপ্তর ডিফেন্স কোন কাজেই এলো না। বেল উড়ে গিয়ে মিডল স্টাম্প ছিটকে গেলো। সারা মাঠ হইহই করে উঠল। ৮০/৩। এবারে ক্রিজে এলো সায়ন। বিগ হিটার। সানশাইনের ক্রিস গেল। তাতানের সেই এক বুলি। হারুণ বল করলো। এবারে লেগ স্টাম্প উড়ল। ৮০/৪। এই নিয়ে ম্যাচে দ্বিতীয়বার, "হারুণ অন আ হ্যাট্রিক।" তাতান এসে হারুণকে বলল, "দেখ, হ্যাট্রিক করার সুবর্ণ সুযোগ। আমি দেখতে পাচ্ছি। তুই এই বলেই উইকেট পাবি। শান্ত হয়ে খেল। মাথা ঠাণ্ডা। স্লো বল দে। খোঁচা লাগাক। স্লিপে ঋভু থাকবে।" সানশাইনের ঝড় এখন হঠাৎ করেই থেমে গিয়েছে। নতুন ব্যাটসম্যান দীপু। চূড়ান্ত চাপে আছে। চোখ মুখে দেখেই বোঝা যাচ্ছে, মারাত্মক টেনশনে। এদিকে হারুণ আত্মবিশ্বাসে ভরপুর। স্লো বল করলো একটা। এবং ঠিক তাতানের ভবিষ্যৎবাণী মেনেই বলটা না ছেড়ে দিপু খেলতে গেলো, এবং আবার সেই খোঁচা লাগল। স্লিপে ক্যাচ। ঋভুর হাতে এসে বল সহজেই পড়ল। আউট। হারুণের হ্যাট্রিকে গোটা মাঠ উল্লাসে ফেটে পড়েছে। গ্যালারি থেকে ভেঁপু, বাঁশির আওয়াজ। হইহই। চিৎকার। হারুণ নিজে ছুটে গিয়ে তাতানকে জড়িয়ে ধরল। চোখে জল। "দাদা, আমি পারলাম। তোমার প্রেডিকশন পারফেক্ট।"
সানশাইনের ইনিংস শেষ হল নব্বই রানে। সেন্ট ডমিনিকের ব্যাটসম্যানেরা হেসে হেসে বারো ওভারের আগেই তিন উইকেট হারিয়ে সেই রান তুলেও ফেলল। সানশাইনকে হারিয়ে সেমি ফাইনালে পৌঁছল সেন্ট ডমিনিক। ম্যান অফ দ্য ম্যাচ স্বাভাবিকভাবেই হারুণ।
প্রাইজ সেরিমনির পর নিজেদের মধ্যে বসে ওরা বারোজন এখনও লাফালাফি করছে। এ ওর কাঁধে চাপছে। হারুণকে তো কেউ ছাড়তেই চাইছে না। ওই তো আজকের হিরো। এরই ফাঁকে তাতান মায়ের পৌঁছে দেওয়া ব্যাগটা নিয়ে এসেছে। এতক্ষণে সময় হয়েছে বন্ধুদের জন্য আনা গিফটগুলো দেওয়ার। প্রথমেই ও ডাকল হারুণকে। একটা কালো পাউচ ওর হাতে দিয়ে বলল, "এই নে। তোর জন্য আমারই মতো একটা ম্যাজিক সানগ্লাস। পরে দেখ দেখি। কী দেখতে পাস।"
হারুণ সোল্লাসে নিলো ওটা। চোখে দিল। খানিক এদিক ওইদিক দেখল। কিন্তু এ কী? আর পাঁচটা সাধারণ সানগ্লাসের চেয়ে তো আলাদা কিছু বুঝছে না।
"কী? দেখতে পেলি কিছু স্পেশাল?" তাতান প্রশ্ন করলো।
"কই না তো তাতান দাদা। আমি তো বিশেষ কিছু দেখতে পেলাম না। এমনিই তোমাদের সবাইকে, এদিক ওদিক সব দেখলাম। শুধু নীল কাঁচ বলে একটু অন্য রঙে।" অবাক হয়েই হারুণ বলল কথাগুলি।
"ওহো হো, তাহলে বোধহয় তোকে অর্করটা দিয়েছি। সরি।" অর্ককে ওই সানগ্লাসটা ধরিয়ে তাতান ব্যাগ থেকে আরো একটা ওইরকম পাউচ বের করলো। হারুণ চোখে দিল চশমা। এবং এবারেও সেই এক। এইটা পেল বিদ্যুৎ। দেখতে দেখতে হারুণের হাত ঘুরে সকলেই পেল একই চশমা। হারুণের স্পেশালটা তাহলে কোথায়?
"আচ্ছা, তুই বরং আমারটা পরে দেখ তো একবার।" তাতান নিজের সানগ্লাসটা খুলে দিল হারুণকে। অবাক কাণ্ড। হারুণ এতেও আর পাঁচটার চেয়ে আলাদা কিচ্ছুটি বুঝল না। অবাক হয়ে মাথা ঝাঁকিয়ে বলল, "কই তাতান দাদা, এটাও তো একই দেখছি।" সানগ্লাসটা তাতানকে ফেরত দিয়ে জানালো ও। এইবারে তাতান মুচকি হেসে বলল, "আসলে হারুণ তোর কোন দোষ নেই। সব সানগ্লাসই এক। আমি সবকটাই তোদের জন্য হং কং মার্কেট থেকে কিনেছি। কোনটার আলাদা করে কিচ্ছু ম্যাজিকাল পাওয়ার নেই। এই ম্যাজিকের গোটা গল্পটাই ছিল প্রি-প্ল্যান্ড। যাতে কিনা তোর ভয় কাটে। কনফিডেন্স বাড়ে। আসলে তুই এমনিই সেরা প্লেয়ার। খুব ট্যালেন্টেডও। কিন্তু তোর যেটা প্রব্লেম, নিজের ওপর কোন বিশ্বাস নেই। তোর মধ্যে ম্যাচের আগে এই ভরসাটা ফেরত আনা খুব দরকার ছিল। তাই আমরা দশজন মিলে তোর সাথে এই গল্পটা প্রেজেন্ট করি। তুই সেটায় বিশ্বাসও করলি। আর দেখ, তাই ভয় ভুলে কেমন নিজের সেরাটা দিলি। দিলি তো? ফলও দেখতে পেলি?"
হারুণ অবাক। নির্বাক। কী বলবে? এমনও হয়? ও সত্যিই তাহলে ভালো বল করে?
"যাক গে, আজ সবাই রেস্ট নে। আবার কাল থেকে প্র্যাকটিস। শুক্রবার সেমি আছে।" তাতান সকলকে বিদায় জানিয়ে স্কুল গ্রাউন্ড থেকে বেরোয়। মা বাইরে অপেক্ষা করছে। মায়ের থেকে মোবাইলটা নিয়ে ফোন করে দাদানকে। গোটা প্ল্যানের মাস্টারমাইন্ডকে রেজাল্টটা জানাতে হবে তো? রিং হচ্ছে। অপর প্রান্তে এইবারে দাদানের গলা শুনেই ও বলে উঠল, "হিপ হিপ হুররে দাদান!"
ছ'টার জায়গায় পৌনে সাতটায় যখন দার্জিলিং মেলটা শিয়ালদা ঢুকল, তাতান যেন ধড়ে প্রাণ ফিরে পেল। যদিও এক সপ্তাহের জন্য বেড়াতে গিয়ে বেশ ভালোই লেগেছে ওর, তবুও এই আজকে ঠিক সময়ে বাড়িতে না পৌঁছলে কেলেঙ্কারি হয়ে যেত তাতানের। তাতান, অর্থাৎ সেন্ট ডমিনিক পাবলিক স্কুলের ক্লাস সিক্সের সৌরদীপ সেনগুপ্ত। আগামীকাল ওর একটা গুরুত্বপূর্ণ ক্রিকেট ম্যাচ রয়েছে। সেন্ট ডমিনিক ভার্সেস সানশাইন অ্যাকাডেমি। যদিও স্কুলেরই কাবস দল, অর্থাৎ জুনিয়র দলের মধ্যে এই প্রতিযোগিতা, তবুও সিনিয়রদের রেষারেষির ছায়া এদের মধ্যেও পড়েছে। কাবসের ইনটার স্কুলে গত বছর সানশাইনকে ফাইনালে পাঁচ উইকেটে হারিয়ে সেন্ট ডমিনিক জিতলেও এইবারে অবস্থা হাড্ডাহাড্ডি। গ্রুপ ম্যাচে এবারে সেন্ট ডমিনিকের পারফর্মেন্স খুব একটা ভালো যায়নি। ওদের স্টার প্লেয়ার, ফাস্ট বোলার চাঁদু, অর্থাৎ চন্দ্রদীপ দ্বিতীয় ম্যাচের দিনেই পা ভেঙ্গে কাহিল। বদলি বোলার হারুণ নতুন। নার্ভাস। তাই নেটে ভালো খেললেও আসল ম্যাচে বলে বলে ওকে অপনেন্টের ব্যাটসম্যানরা পিটিয়ে ছাতু করে দিচ্ছে, রোজ। নেহাত তাতান, অর্ক আর মানিক - তিনজনেই দুর্দান্ত ফর্মে আছে, তাই কোনরকমে ব্যাটিং দিয়ে ম্যানেজ হয়েছে এ যাবৎ। কিন্তু সানশাইন তো আর যে সে টিম নয়। ওদের বিরুদ্ধে জিততে গেলে একেবারে জান প্রাণ লড়িয়ে দিতে হবে।
প্রচণ্ড গরম এবং বেশ কিছু প্লেয়ারদের চোট আঘাতের জন্য গ্রুপ ম্যাচের পর দশদিনের ছুটি ছিল। আগামীকাল থেকে কোয়ার্টার ফাইনাল শুরু। এবং প্রথম ম্যাচেই সেন্ট ডমিনিক খেলবে সানশাইনের বিরুদ্ধে। তাতান সেন্ট ডমিনিকের ক্যাপ্টেন। ওর ওপর তাই বাড়তি দায়িত্ব, বাড়তি চাপ। আজ দুপুরের প্র্যাকটিস সেশনটা তাই ওদের জন্য খুব জরুরি। তাতান মুখিয়ে আছে। হারুণকে চাঙ্গা করতে দার্জিলিং থেকে দুর্ধর্ষ টোটকা নিয়ে এসেছে। এবার তারই পরীক্ষা।
২।
বাড়ি ফিরে ঠামুর কাছে আদর আহ্লাদ পেয়ে, স্নান সেরে, ডাল-ভাত-পোস্ত-মাছের ঝোল খেয়ে তাতান বসল নিজের কিট ব্যাগটা নিয়ে। দেড়টা বেজে গিয়েছে। আড়াইটের মধ্যে স্কুল গ্রাউন্ডে ওদের সবার পৌঁছে যাওয়ার কথা। তার আগে ব্যাগ গুছিয়ে নিতে হবে। দার্জিলিং ট্রিপে ওর যাবতীয় জামা-প্যান্ট সব ছিল বাবার স্যুটকেসে। বাবা তো এখন ঘুমোচ্ছে। ডেকে তোলাও যাবে না। বকা খাবে। কাজেই বন্ধুদের জন্য কেনা উপহারগুলো আজ আর নিয়ে যাওয়া যাবে না। যাক গে। কীই বা করা যাবে। কিন্তু আসল জিনিসটা তাতান বুদ্ধি করে গতকাল বিকেলেই মায়ের হ্যান্ডব্যাগে রেখে দিয়েছিল। ভাগ্যিস। মা একটু সবে ঘরে ঢুকে বিছানায় গা এলিয়েছে, হাতে মোবাইল নিয়ে, তাতান বলল, "মা, আমার সানগ্লাসটা তোমার হ্যানন্ডব্যাগে দিয়েছিলাম না কাল? ওটা নিয়ে বেরবো এখন। ব্যাগটা কোথায় আছে বলো, আমি বের করে নেবো।" মা চোখ না তুলেই বলল, "দেখ ড্রেসিং টেবিলের পাশে চেয়ারে রাখা আছে। নিয়ে নে সাবধানে।" তাতান গেলো ড্রেসিং টেবিলের কাছে। মায়ের হাল্কা গোলাপী ব্যাগটার চেন খুলে খানিক হাতড়ে খুঁজে পেল সানগ্লাসের কালো পাউচটা। একবার দড়ি খুলে দেখে নিলো, সব ঠিকঠাক আছে তো? এরপর নিজের ঘরে এসে ব্যাগ গুছিয়ে প্র্যাকটিস জার্সি-ট্রাউজারস পরে চোখে সানগ্লাসটা এঁটে কিটব্যাগ নিয়ে সাইকেল চেপে বেরোল স্কুল গ্রাউন্ডের দিকে।
যতক্ষণে তাতান স্কুলে পৌঁছল, ঘড়িতে তখন বাজে সোয়া দুটো। দেখল, ইতিমধ্যেই সেন্ট ডমিনিকের রত্নরা, অর্থাৎ, অর্ক, মানিক, পল্লব, রজত, আনন্দ, কল্যাণ সবাই এসে গিয়েছে। এখনও আসা বাকি ফারুখ, বিদ্যুৎ, প্রদীপ্ত আর ঋভুর। তাতান মাঠে যেতেই সবাই ওকে ঘিরে ধরল। "কীরে কেমন ঘুরলি?" "মোমো খেলি?" "ঠাণ্ডা পেলি?" সব প্রশ্নের উত্তর একে একে দিয়ে তাতান বলল, "শোন, যে কারণে তোদের আগেভাগে ডাকা। কালকের ম্যাচের জন্য ছোট্ট করে স্ট্র্যাটেজি ঠিক করবো। আর একটা ছোটো করে নেট প্র্যাকটিস। এ ক'দিন সবাই খেলেছিস তো নিয়মিত?"
বিদ্যুৎ বলল, "সে তো খেলেছি। স্ট্র্যাটেজি করবি, ভেরি গুড। কিন্তু এখনও হারুণ আসেনি কেন?"
"ও আসবে। ওকে আমিই তিনটে নাগাদ আসতে বলেছি। ও আসার আগে আমাদের কিছু আলোচনা আছে।" গম্ভীরস্বরে তাতান কথাগুলো বলে দলের সকলকে নিয়ে গোল হয়ে দাঁড়িয়ে খানিক জটলা পাকিয়ে খেলার স্ট্র্যাটেজি তৈরির আলোচনা শুরু করলো। খানিক ফিসফাস, আস্তে, জোরে সবরকমই গুঞ্জন শোনা গেলো। এরপর তাতান বিদ্যুৎকে বলল, "ভাই, হারুণ যখন তোকে বল করবে, ফুল টস দিলেই ছয় হাঁকিয়ে দিবি। ইয়রকার দিলে ছেড়ে দিয়ে বোল্ড আউট হবি। আর একটু শর্ট লেন্থ দিলেই খোঁচা লাগাবি" তারপর বাকিদের দিকে তাকিয়ে বলল, "কেউ একটাও ক্যাচ ফেলবি না যেন। আজকের ম্যাচ প্র্যাকটিসটা বুঝতেই পারছিস কতটা ভাইটাল। স্পেশালি আমাদের হারুণের জন্য। চল চল, ও এসে গিয়েছে দেখ। লেটস ওয়ার্ম আপ।"
হারুণ সেন্ট ডমিনিকের ক্লাস ফাইভের ছাত্র। রোগা পাতলা এই ছেলেটি সাধারণত চুপচাপ থাকে, একটু ভীতু প্রকৃতিরই। নেহাৎ গেমসের নিখিলেশ স্যার ওকে গেমস পিরিয়ডে দুর্দান্ত কয়েকটা ইয়রকার দিতে দেখেছিলেন, তাই। এই বছর যখন সেন্ট ডমিনিকের কাবসের দল তৈরি হচ্ছিল, উনি নিজে তাতানের কাছে ওর নাম সুপারিশ করে বলেন, "সৌরদীপ, যদিও হারুণ একটু ছোট, তবুও বলবো। ওকে তোমাদের দলে রেখে দাও। কোন কোন ম্যাচে খেলিয়ো। ওর মধ্যে একটা পোটেনশিয়াল আছে, আমি দেখেছি। দেখো, ভালোই খেলবে।" স্যারের কথা অনুযায়ী তাতান হারুণকে দলে নিলো। চাঁদুর চোটের পর খেলালোও সব ম্যাচ। কিন্তু নেটে যে উইকেটের বাইরে একটাও বল করে না, সে কিনা পরপর তিন ম্যাচে একটাও উইকেট না পেয়ে শুধুই চার আর ছয় খেয়ে গেলো। আগামীকাল সানশাইনের খেলা নিয়ে ও ভীষণ ভয় পেয়ে আছে। তাতানকে তো দার্জিলিঙে থাকাকালীন বেশ কয়েকবার ফোন করে "দাদা আমি কী করে খেলবো? আমায় বের করে দাও দল থেকে। আমায় সবাই খালি ছয় চার মারে" বলে কাকুতি মিনতি করেছে। তাতান ছোটো হলেও ওর মধ্যে ক্যাপ্টেনসুলভ বিচক্ষণতা আছে। বারবার যথাসাধ্য ও হারুণকে সাহস জুগিয়ে চলেছে। কিন্তু কোথায় কী? আসল ম্যাচে ছেলেটা নার্ভাস হয়ে এত বিচ্ছিরি ভাবে খেলেছে। নেহাৎই নিরুপায়। তাই তাতান ওকে টিমে রাখতে বাধ্য হয়েছে। দার্জিলিং বেড়াতে গিয়ে দাদানের সাথে অনেক গল্প চলাকালীন তাতান হারুণের ব্যাপারে কথা বলতেই দাদানই এই চমৎকার আইডিয়াটি দেয়। এইবার এই চমৎকার আইডিয়া কতদূর খাটে এই ক্ষেত্রে, তা পরখের প্রতীক্ষা।
"হারুণ, চলে আয়। রেডি তো?" তাতান হাসিমুখে প্রশ্ন করে।
"হ্যাঁ দাদা। রেডি। তবে..." কাচুমুচু মুখে হারুণ আদ্ধেক কথা বলে থেমে যায়।
"কী হলো রে? কী তবে?" তাতান জিজ্ঞেস করে।
"তবে ভয় করছে।" হারুণ একটু নীচু স্বরে বলে।
"তাহলে এক কাজ করি। এদিকে আয় আমার সাথে। তোকে একটা সিক্রেট বলি।" এই বলে তাতান হারুণের কাঁধে হাত রেখে ওকে নিয়ে এগলো গ্যালারির দিকে। বাকিরা কথা মতো ফিল্ডিং প্র্যাকটিস চালু করে দিয়েছে ইতিমধ্যে।
"এই যে, এই সানগ্লাসটা পরে আছি আমি দেখছিস?" তাতান নিজের নীল সানগ্লাসটার দিকে আঙুল তুলে দেখাল।
"হ্যাঁ, বেশ দেখতে কিন্তু! একদম রিকি পন্টিং এর মতো লাগছে দেখতে তোমাকে।" হারুণ বলল, মুগ্ধ হয়ে।
"শুধু দেখতেই না রে। এই সানগ্লাসটা পরলে আমার মধ্যে রিকি পন্টিং খোদ ভর করে রে।" তাতান বলতে থাকে।
হারুণ অবাক হয়ে বলে, "মানে?"
"মানে এই যে এই চশমাটা চোখে থাকলে আমার ক্রিকেটীয় বুদ্ধি দারুণ বেড়ে যায়। এমন কী আমি ম্যাজিকের মতো ঠিক আগে থেকে দেখে বুঝে যাই। দেখতে পাই, বলতে পারিস। কোন বোলার কীরকম বল করবে। কোন ব্যাটসম্যান কীভাবে খেলবে। সব। এমনকি, ফিল্ডার ক্যাচ মিস করবে কি রান আউট করতে পারবে, সব আমি আগাম বলে দিতে পারি। সবকিছু দেখতে পেয়ে যাই এই চশমাটা পরলেই।" তাতানের কথাগুলো শুনে হারুণ খানিক অবাক হয়ে তাকায়। তারপর বলে, "ধ্যাত, কী যে বলো দাদা? এমন আবার হয় নাকি?" তাতান যেন এমন প্রশ্নের জন্য তৈরিই ছিল। সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল, "চল তাহলে তোকে ডেমো দেখাই একটা। তবে যদি তুই বিশ্বাস করিস। নেটে চল।"
"চলো" বলে হারুণ আর তাতান এগোয় নেটের দিকে।
নেটে তখন কল্যাণ বল করছিল ঋভুকে। অন্যদিকে দাঁড়িয়ে বিদ্যুৎ। কল্যাণের থেকে বলটা নিয়ে হারুণের হাতে দিল তাতান। আর বিদ্যুতের দিকে তাকিয়ে বলল, "দেখি তো বিদ্যুৎ, কেমন খেলিস হারুণকে।" হারুণের দিকে একবার হাসি হাসি মুখ করে তাকিয়ে তাতান বলল, " নে দেখি। উইকেট টিপ করে বল কর। দেখি কেমন ছয় মারে। কল্যাণ ব্যাটাকে তো ছয়ের পর ছয় হাঁকছিল দেখলাম। আমি পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছি। তুই টিপ রেখে বল করছিস। পরপর বেল উড়ছে। নে দেখি, খেল।"
সত্যিই তাই। এরপর পরপর ছয় বল হারুণ এক্কেবারে উইকেট লক্ষ্য করেই করলো। এবং প্রত্যেকটাতেই বিদ্যুতের বিখ্যাত ডিফেন্সকে নড়বড়ে প্রমাণ করে বেল উড়ে গেলো। ছয়ে ছয়।
"সাবাশ হারুণ।" তাতান, মানিক, অর্ক ওর পিঠ চাপড়ে গেলো একে একে। বিদ্যুতের মতো প্লেয়ারের ডিফেন্স পরপর ছ'বার অ্যাটাক করে বেল উড়িয়ে দেওয়া, চারটিখানি কথা না।
আরো ঘণ্টা দেড়েক চলল ওদের প্র্যাকটিস। এই এতক্ষণে তাতানের মনে হল, ওর দল দুর্ধর্ষ ফর্মে রয়েছে। প্রত্যেকে। আত্মবিশ্বাস টগবগ করছে সকলের। কালকে সানশাইনকে দেখিয়ে দেবে ওরা।
৩।
অবশেষে আজ সেই ঐতিহাসিক ম্যাচের দিন। সকাল ন'টা থেকে সেন্ট ডমিনিকের গ্রাউন্ডেই খেলা। হোম গ্রাউন্ড অ্যাডভান্টেজ নিতে ওরা প্রস্তুত। স্কুলের কমলা খয়েরি জার্সি গায়ে দিয়ে ওরা এগারোজন প্লেয়ার মাঠে নামছে। সবার সামনে রয়েছে ওদের ক্যাপ্টেন, সৌরদীপ। মাথায় সাদা রঙের ক্যাপ। এ যাবৎ টুর্নামেন্টে সবচেয়ে বেশি রানের প্রতীক। চোখে নীল সানগ্লাস। টসে জিতে সানশাইন ব্যাটিং নিয়েছে। ব্যাটিং এর উপযুক্ত একদম এই পিচ। এমনটা ইচ্ছে করেই করা। কারণ সেন্ট ডমিনিকের ব্যাটসম্যানেরাই সম্বল।
তাতানের ভিতরে উত্তেজনা তুঙ্গে। এই ম্যাচটা বের করতেই হবে। টসে হেরে একটু দমে গেলেও বাকিদের সামনে দেখানোই যাবেনা। বিশেষ করে হারুণ। কল্যাণকে দিয়ে ওপেন করালো ওভার। এবং প্রথম বলেই চার মারল সানশাইনের কপিল। দ্বিতীয় বল, একটু স্লো করলো। ব্যাটে বলে লাগল না। তৃতীয় বল। আবারও ব্যাটে বলে হল না। ডট বল। চতুর্থ বল। ফুল টস। তবুও দুই রানই হল। পঞ্চম বল। গুড লেন্থ। ঠুকে খেলে এক রান নিলো কপিল। এবারে শেষ বল খেলবে রাজীব। ডট বল। প্রথম ওভারের শেষে সানশাইনের রান ৭/০।
দ্বিতীয় ওভার বল করবে হারুণ। তাতান ওর হাতে বল দিয়ে পিঠ চাপড়ে বলল, "হারুণ, আমি দেখতে পাচ্ছি। তুই কালকের মতো উইকেট টিপ করে বল কর। বোল্ড হবেই।" ফিল্ড সাজানো হল। লম্বা রান-আপ নিয়ে বল করলো হারুণ। এবং এক্কেবারে ফুল-টস। কপিল সুযোগ ছাড়ল না। তুলে ছয়। তাতান দৌড়ে এসে হারুণের কাঁধে হাত রেখে বলল, "ভয় পাস না। বলছি না? তুই উইকেট লক্ষ্য করে বল কর। বোল্ড হবেই। কপিল এই ওভারেই বোল্ড হবে।" দ্বিতীয় বল। ইয়রকার। এবং কপিল বোল্ড। দলের সব ছেলেরা লাফিয়ে এসে হারুণকে জড়িয়ে ধরল। এরপর নামল সূরজ। সানশাইনের এই মুহূর্তের সবচেয়ে ইন-ফরম ব্যাটসম্যান। তাতান জানে, হারুণের সামনে কঠিন চ্যালেঞ্জ। ওকে সামলাতে হবে। সূরজ লেগের বলগুলো দারুণ খেলে। ওইদিকে তাই ওকে কিছুতেই বল দেওয়া যাবে না। কোনমতে সামলে রাখতে হবে। হারুণকে বলল, "আস্তে করে শর্ট দে একটা। খোঁচা লাগাক। স্লিপে ছেলে রাখছি। আউট হবেই।" হারুণ ওর তাতান দাদার কথা অক্ষরে অক্ষরে পালন করলো। এবং অবধারিতভাবে ফলও পেল। স্লিপে পল্লবের হাতে ক্যাচ আউট। পরের তিন বলই ডট। দ্বিতীয় ওভারের শেষে সানশাইন ১৩/২।
এরপর স্পিনার এলো। সানশাইন তুলে তুলে মারল। মারবেই। ব্যাটিং পিচ। দশ ওভারের শেষে ওরা ৮০/২। আর পাঁচ ওভার বাকি। এই স্লগ ওভারগুলো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। হারুণের এখনও দু'ওভার বল বাকি। তাতান এবার তাই ওকেই ডেকে বল দিল। ব্যাট করবে প্রদীপ্ত। কুড়ি বলে পঁয়ত্রিশ করে খেলছে। তাতান হারুণকে তাতানোর জন্য এগিয়ে এলো, "আবার সোজা উইকেট দেখে বল কর। আমি দেখতে পাচ্ছি। তুই ওকে বোল্ড করবি। এই ওভারেই। দেখে বল কর ভাই।"
হারুণ বল হাতে ছোটা শুরু করল। সেন্ট ডমিনিকের গ্যালারি থেকে "গো হারুণ, গো হারুণ" চিৎকার। এবং সোজা উইকেটে বল। প্রদীপ্তর ডিফেন্স কোন কাজেই এলো না। বেল উড়ে গিয়ে মিডল স্টাম্প ছিটকে গেলো। সারা মাঠ হইহই করে উঠল। ৮০/৩। এবারে ক্রিজে এলো সায়ন। বিগ হিটার। সানশাইনের ক্রিস গেল। তাতানের সেই এক বুলি। হারুণ বল করলো। এবারে লেগ স্টাম্প উড়ল। ৮০/৪। এই নিয়ে ম্যাচে দ্বিতীয়বার, "হারুণ অন আ হ্যাট্রিক।" তাতান এসে হারুণকে বলল, "দেখ, হ্যাট্রিক করার সুবর্ণ সুযোগ। আমি দেখতে পাচ্ছি। তুই এই বলেই উইকেট পাবি। শান্ত হয়ে খেল। মাথা ঠাণ্ডা। স্লো বল দে। খোঁচা লাগাক। স্লিপে ঋভু থাকবে।" সানশাইনের ঝড় এখন হঠাৎ করেই থেমে গিয়েছে। নতুন ব্যাটসম্যান দীপু। চূড়ান্ত চাপে আছে। চোখ মুখে দেখেই বোঝা যাচ্ছে, মারাত্মক টেনশনে। এদিকে হারুণ আত্মবিশ্বাসে ভরপুর। স্লো বল করলো একটা। এবং ঠিক তাতানের ভবিষ্যৎবাণী মেনেই বলটা না ছেড়ে দিপু খেলতে গেলো, এবং আবার সেই খোঁচা লাগল। স্লিপে ক্যাচ। ঋভুর হাতে এসে বল সহজেই পড়ল। আউট। হারুণের হ্যাট্রিকে গোটা মাঠ উল্লাসে ফেটে পড়েছে। গ্যালারি থেকে ভেঁপু, বাঁশির আওয়াজ। হইহই। চিৎকার। হারুণ নিজে ছুটে গিয়ে তাতানকে জড়িয়ে ধরল। চোখে জল। "দাদা, আমি পারলাম। তোমার প্রেডিকশন পারফেক্ট।"
সানশাইনের ইনিংস শেষ হল নব্বই রানে। সেন্ট ডমিনিকের ব্যাটসম্যানেরা হেসে হেসে বারো ওভারের আগেই তিন উইকেট হারিয়ে সেই রান তুলেও ফেলল। সানশাইনকে হারিয়ে সেমি ফাইনালে পৌঁছল সেন্ট ডমিনিক। ম্যান অফ দ্য ম্যাচ স্বাভাবিকভাবেই হারুণ।
প্রাইজ সেরিমনির পর নিজেদের মধ্যে বসে ওরা বারোজন এখনও লাফালাফি করছে। এ ওর কাঁধে চাপছে। হারুণকে তো কেউ ছাড়তেই চাইছে না। ওই তো আজকের হিরো। এরই ফাঁকে তাতান মায়ের পৌঁছে দেওয়া ব্যাগটা নিয়ে এসেছে। এতক্ষণে সময় হয়েছে বন্ধুদের জন্য আনা গিফটগুলো দেওয়ার। প্রথমেই ও ডাকল হারুণকে। একটা কালো পাউচ ওর হাতে দিয়ে বলল, "এই নে। তোর জন্য আমারই মতো একটা ম্যাজিক সানগ্লাস। পরে দেখ দেখি। কী দেখতে পাস।"
হারুণ সোল্লাসে নিলো ওটা। চোখে দিল। খানিক এদিক ওইদিক দেখল। কিন্তু এ কী? আর পাঁচটা সাধারণ সানগ্লাসের চেয়ে তো আলাদা কিছু বুঝছে না।
"কী? দেখতে পেলি কিছু স্পেশাল?" তাতান প্রশ্ন করলো।
"কই না তো তাতান দাদা। আমি তো বিশেষ কিছু দেখতে পেলাম না। এমনিই তোমাদের সবাইকে, এদিক ওদিক সব দেখলাম। শুধু নীল কাঁচ বলে একটু অন্য রঙে।" অবাক হয়েই হারুণ বলল কথাগুলি।
"ওহো হো, তাহলে বোধহয় তোকে অর্করটা দিয়েছি। সরি।" অর্ককে ওই সানগ্লাসটা ধরিয়ে তাতান ব্যাগ থেকে আরো একটা ওইরকম পাউচ বের করলো। হারুণ চোখে দিল চশমা। এবং এবারেও সেই এক। এইটা পেল বিদ্যুৎ। দেখতে দেখতে হারুণের হাত ঘুরে সকলেই পেল একই চশমা। হারুণের স্পেশালটা তাহলে কোথায়?
"আচ্ছা, তুই বরং আমারটা পরে দেখ তো একবার।" তাতান নিজের সানগ্লাসটা খুলে দিল হারুণকে। অবাক কাণ্ড। হারুণ এতেও আর পাঁচটার চেয়ে আলাদা কিচ্ছুটি বুঝল না। অবাক হয়ে মাথা ঝাঁকিয়ে বলল, "কই তাতান দাদা, এটাও তো একই দেখছি।" সানগ্লাসটা তাতানকে ফেরত দিয়ে জানালো ও। এইবারে তাতান মুচকি হেসে বলল, "আসলে হারুণ তোর কোন দোষ নেই। সব সানগ্লাসই এক। আমি সবকটাই তোদের জন্য হং কং মার্কেট থেকে কিনেছি। কোনটার আলাদা করে কিচ্ছু ম্যাজিকাল পাওয়ার নেই। এই ম্যাজিকের গোটা গল্পটাই ছিল প্রি-প্ল্যান্ড। যাতে কিনা তোর ভয় কাটে। কনফিডেন্স বাড়ে। আসলে তুই এমনিই সেরা প্লেয়ার। খুব ট্যালেন্টেডও। কিন্তু তোর যেটা প্রব্লেম, নিজের ওপর কোন বিশ্বাস নেই। তোর মধ্যে ম্যাচের আগে এই ভরসাটা ফেরত আনা খুব দরকার ছিল। তাই আমরা দশজন মিলে তোর সাথে এই গল্পটা প্রেজেন্ট করি। তুই সেটায় বিশ্বাসও করলি। আর দেখ, তাই ভয় ভুলে কেমন নিজের সেরাটা দিলি। দিলি তো? ফলও দেখতে পেলি?"
হারুণ অবাক। নির্বাক। কী বলবে? এমনও হয়? ও সত্যিই তাহলে ভালো বল করে?
"যাক গে, আজ সবাই রেস্ট নে। আবার কাল থেকে প্র্যাকটিস। শুক্রবার সেমি আছে।" তাতান সকলকে বিদায় জানিয়ে স্কুল গ্রাউন্ড থেকে বেরোয়। মা বাইরে অপেক্ষা করছে। মায়ের থেকে মোবাইলটা নিয়ে ফোন করে দাদানকে। গোটা প্ল্যানের মাস্টারমাইন্ডকে রেজাল্টটা জানাতে হবে তো? রিং হচ্ছে। অপর প্রান্তে এইবারে দাদানের গলা শুনেই ও বলে উঠল, "হিপ হিপ হুররে দাদান!"
চৈত্র বিকেলে বৃষ্টি পড়লে যেই ছেলেটা এখনও ছাদে দৌড়াদৌড়ি করে,
অফিস ডেস্কে কাজের ভিড়ে সন্দেশ শুকতারা যার এখনও উঁকি মারে,
সেই ছেলেটার যত্ন নিয়ো,
ভালোবাসায় মুড়িয়ে দিয়ো।
দায়িত্ব পেয়ে সে আজ মস্ত লোক,
আদরে আবদারে ওর খুউব ভালো হোক।।
অফিস ডেস্কে কাজের ভিড়ে সন্দেশ শুকতারা যার এখনও উঁকি মারে,
সেই ছেলেটার যত্ন নিয়ো,
ভালোবাসায় মুড়িয়ে দিয়ো।
দায়িত্ব পেয়ে সে আজ মস্ত লোক,
আদরে আবদারে ওর খুউব ভালো হোক।।
Monday, April 1, 2019
আরশোলা
ব্যাপারটা বেশ কিছুদিন পরে আবার ঘটল। এর আগে সপ্তাহখানেক আগে হয়েছিল বটে। তবে আমি বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে ধরে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করেই এড়িয়ে গিয়েছি। আসলে ব্যাপারটা এমন কিছু প্রসন্নদায়ক তো নয়। তাই মাথা না ঘামানোই শ্রেয় মনে করেছিলাম। কিন্তু গতকাল আর আজ সকালে আবারও একই ঘটনার পুনরাবৃত্তির পর আমি কিঞ্চিৎ চিন্তিত। খুলে বলি।
গতকাল ভোরবেলা আমার যখন ঘুম ভাঙল, খাট থেকে নেমে মাটির দিকে চোখ পড়তে, দেখতে পেলাম একটা মরা আরশোলা। হাত পা তুলে উল্টে শুয়ে আছে। কোত্থেকে এলো, কে জানে, এইসব ভাবতে ভাবতে আমি ওটিকে ঝাঁটা দিয়ে চৌকাঠ পার করে দিলাম।
আজ সকালে উঠে দেখি, সেই একই জায়গায় একই ভাবে আরেকটি আরশোলা মরে পড়ে আছে। আজ ঝাঁটা দিয়ে ওটাকে বের করতে গিয়ে দরজার কোণে আটকে গেলো। অন্য শক্তপোক্ত ঝাঁটা এনে ওটা বের করতে গিয়ে দেখি ওটি নেই। আরশোলা নেই। কী কাণ্ড! এই এক্ষুণি একটা মরা আরশোলা এখানে ফেলে রেখে গেলাম। আর এই এক্ষুণি দেখছি নেই? কী করে হলো? মরা পোকা গেলো কোথায়? তাও এত অল্প সময়ে?
তাহলে কি... তাহলে কি ওটা আদৌ মরা ছিল না? অশরীরী? নইলে পরপর দুদিন ও আগের সপ্তাহে একদিন ঠিক একই জায়গায়, একই ভাবে কী করে পড়ে থাকলো আরশোলাটা?
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, মরল কী করে? আমি তো স্প্রে করিনি গত কয়েকদিনে?
হঠাৎ শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের "টিকটিকির ডিম" গল্পটার কথা মনে পড়ে গেলো। কোন একদিন আরশোলা মেরেছিলাম বলে কি এইভাবে বদলা নিতে আসছে? এরপরে কি চারিদিকে মরা আরশোলা দেখবো?
গতকাল ভোরবেলা আমার যখন ঘুম ভাঙল, খাট থেকে নেমে মাটির দিকে চোখ পড়তে, দেখতে পেলাম একটা মরা আরশোলা। হাত পা তুলে উল্টে শুয়ে আছে। কোত্থেকে এলো, কে জানে, এইসব ভাবতে ভাবতে আমি ওটিকে ঝাঁটা দিয়ে চৌকাঠ পার করে দিলাম।
আজ সকালে উঠে দেখি, সেই একই জায়গায় একই ভাবে আরেকটি আরশোলা মরে পড়ে আছে। আজ ঝাঁটা দিয়ে ওটাকে বের করতে গিয়ে দরজার কোণে আটকে গেলো। অন্য শক্তপোক্ত ঝাঁটা এনে ওটা বের করতে গিয়ে দেখি ওটি নেই। আরশোলা নেই। কী কাণ্ড! এই এক্ষুণি একটা মরা আরশোলা এখানে ফেলে রেখে গেলাম। আর এই এক্ষুণি দেখছি নেই? কী করে হলো? মরা পোকা গেলো কোথায়? তাও এত অল্প সময়ে?
তাহলে কি... তাহলে কি ওটা আদৌ মরা ছিল না? অশরীরী? নইলে পরপর দুদিন ও আগের সপ্তাহে একদিন ঠিক একই জায়গায়, একই ভাবে কী করে পড়ে থাকলো আরশোলাটা?
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, মরল কী করে? আমি তো স্প্রে করিনি গত কয়েকদিনে?
হঠাৎ শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের "টিকটিকির ডিম" গল্পটার কথা মনে পড়ে গেলো। কোন একদিন আরশোলা মেরেছিলাম বলে কি এইভাবে বদলা নিতে আসছে? এরপরে কি চারিদিকে মরা আরশোলা দেখবো?
প্যাঁচা প্যাঁচানি সংলাপ
- সকাল সকাল এলবাম খুলে বসে কী করছিস?
- আমাদের ছবি খুঁজছি।
- কেন? দিব্যি তো ওয়ালপেপার ঠিক আছে।
- আরে এটা অন্য কারণে।
- কী?
- ধ্যাত। এত কৌতূহল কেন?
- সকাল থেকে দেখে যাচ্ছি এই এত এলবাম খুলে বসে আছিস। ফেসবুক ইন্সটা হার্ড ডিস্ক। সব ঘেঁটে চলেছিস। প্রশ্ন করতে পারব না?
- উহু। কোনো প্রশ্ন নয়। পরে সঠিক সময় সব জানতে পারবি।
- আমাদের ছবি খুঁজছি।
- কেন? দিব্যি তো ওয়ালপেপার ঠিক আছে।
- আরে এটা অন্য কারণে।
- কী?
- ধ্যাত। এত কৌতূহল কেন?
- সকাল থেকে দেখে যাচ্ছি এই এত এলবাম খুলে বসে আছিস। ফেসবুক ইন্সটা হার্ড ডিস্ক। সব ঘেঁটে চলেছিস। প্রশ্ন করতে পারব না?
- উহু। কোনো প্রশ্ন নয়। পরে সঠিক সময় সব জানতে পারবি।
- ওরকম বিটকেল মুখ না করে একটা কাপল ফোটো সিলেক্ট করে দে না।
- কারণ না জানলে কী ভাবে চ্যুজ করবো?
- মানে?
- না মানে ধর তুই কোনো ফাইট টাইটের বিজ্ঞাপন বানাতে চাইলে এক ধরণের ছবি দেব। লাভি ডাভি কিছু চাইলে আরেক ধরণ।
- লাভি ডাভি চাই। এই দেখ, এইটা দিই? আমায় কী ভালো লাগছে দেখতে।
- না। এটা না। আই লুক টেরিবল হিয়ার। ওই দেখ, ওইটা। জ্যু এর সামনেরটা।
- ইশ। না। আমায় কেমন প্যাঁচার মতো লাগছে।
- তা মন্দ কী? জ্যুয়ের সামনে ঠিকই আছে। বাই দি ওয়ে, তুই প্যাঁচা না। প্যাঁচানি।
- তুই আমায় প্যাঁচা বললি?
- আবার ভুল বলে? বললাম না? প্যাঁচানি। ফিমেল প্যাঁচা। এইসব কনভেন্টে পড়লে এই হয়। প্যাঁচা প্যাঁচানিতে পার্থক্য জানে না।
- তুই চুপ কর। তুই আমায় আউল বললি? উল্লু?
- উফ। তো কী হয়েছে? প্যাঁচা তো কত সুইট।
- সুইট মাই ফুট।
- আহা, এটা শুনিসনি? "তোর গানে পেঁচি রে, সব ভুলে গেছি রে-
চাঁদমুখে মিঠে গান, শুনে ঝরে দু'নয়ান"?
- আবোল তাবোল।
- তাহলে?
- তা বলে তুই আমায় প্যাঁচা বললি?
- উফ। প্যাঁচানি।
-....
-...
- কারণ না জানলে কী ভাবে চ্যুজ করবো?
- মানে?
- না মানে ধর তুই কোনো ফাইট টাইটের বিজ্ঞাপন বানাতে চাইলে এক ধরণের ছবি দেব। লাভি ডাভি কিছু চাইলে আরেক ধরণ।
- লাভি ডাভি চাই। এই দেখ, এইটা দিই? আমায় কী ভালো লাগছে দেখতে।
- না। এটা না। আই লুক টেরিবল হিয়ার। ওই দেখ, ওইটা। জ্যু এর সামনেরটা।
- ইশ। না। আমায় কেমন প্যাঁচার মতো লাগছে।
- তা মন্দ কী? জ্যুয়ের সামনে ঠিকই আছে। বাই দি ওয়ে, তুই প্যাঁচা না। প্যাঁচানি।
- তুই আমায় প্যাঁচা বললি?
- আবার ভুল বলে? বললাম না? প্যাঁচানি। ফিমেল প্যাঁচা। এইসব কনভেন্টে পড়লে এই হয়। প্যাঁচা প্যাঁচানিতে পার্থক্য জানে না।
- তুই চুপ কর। তুই আমায় আউল বললি? উল্লু?
- উফ। তো কী হয়েছে? প্যাঁচা তো কত সুইট।
- সুইট মাই ফুট।
- আহা, এটা শুনিসনি? "তোর গানে পেঁচি রে, সব ভুলে গেছি রে-
চাঁদমুখে মিঠে গান, শুনে ঝরে দু'নয়ান"?
- আবোল তাবোল।
- তাহলে?
- তা বলে তুই আমায় প্যাঁচা বললি?
- উফ। প্যাঁচানি।
-....
-...
Subscribe to:
Posts (Atom)