Tuesday, September 25, 2018

অভিমান

বর্ণগুলো সেদিন এদিক সেদিক এক্কা দোক্কা খেলছিল নিশ্চিন্তে।
হঠাৎ কী যে হল,
মাত্রারা সব মাত্রাতিরিক্তভাবে
এসে জড়ালো বর্ণরাজির সাথে।
তারপর...


তারপর কথার পিঠে জমল অনেক কথা। 


শব্দের পরে যোগ হল শত শব্দ।
সৃষ্টি হল ভারি ভারি সব গাঁথা।

কিন্তু হায়, ক্ষণজন্মা হল না যে তারা।
 
 
সেই ঊষাকালে জন্ম নিলো আরো এক নতুন অনুভূতি। 
 
আদর করে নাম দিলাম তারে "অভিমান"। 

Monday, September 24, 2018

বিজয়া


সকাল এগারোটা। সোমবার। ভাদ্রের আকাশে পেঁজা তুলোর মতো সাদা মেঘ। একদম যাকে বলে "পুজোর আকাশ"। দক্ষিণ কলকাতার এক অভিজাত সরকারি হাউজিং কমপ্লেক্সে সুবোধ সান্যাল ও ওঁর স্ত্রী শ্রীময়ী সান্যালের নিস্তরঙ্গ জীবন। তিনতলার রান্নাঘর থেকে টুকটাক রান্নার ছ্যাঁক ছোক আর বাসনকোসনের অল্প আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। সাথে মাঝে মাঝে চুরির টুংটাং। বাড়ির সামনে মাঠে পুজোর প্যান্ডেলের কাজ চলছে। মধ্যে মধ্যে বাঁশ পড়া আর পেরেক ঠোকার শব্দ, মিস্ত্রীদের হাঁকডাক।


"শুনছো, টিকিটগুলো কেটেছ?" বছর ষাটের শ্রীময়ী রান্নাঘরে সকালের দ্বিতীয় দফার চায়ের জল চাপিয়ে প্রশ্ন করলেন। সুবোধবাবু তখন আনন্দবাজারের শব্দজব্দ নিয়ে বসেছেন, গভীর মনোযোগ দিয়ে অভিধান দেখে, কাটাকুটি করে সমাধান করতে এখনও দেরি। প্রতিদিনের অভ্যেস। রিটায়ার্ড মানুষ। এইসব নিয়েই দিন কাটে। পেন্সিল হাতে একবার মুখ তুলে উত্তর দিলেন, "হ্যাঁ। কাল রাত্তিরেই করেছি।"

" কোথায় যাচ্ছি এইবারে আমরা? " শ্রীময়ীর পাল্টা প্রশ্ন এলো।

" এন জে পির টিকিট কেটেছি। তারপর দেখা যাবে। "

" গত বছরও ওইদিকেই গেলাম। এবারে সমুদ্র গেলে হতো না? " দুই হাতে দুটো চায়ের কাপ এনে সামনে বেতের টেবিলে রাখতে রাখতে শ্রীময়ী বললেন।


সুবোধবাবু একবার তাকালেন স্ত্রীর দিকে। হাত বাড়িয়ে কাপটা নিলেন। কিচ্ছু না বলে আবার ফিরলেন শব্দের জগতে।


"কী গো? কথার উত্তর দিলে না?"


"আমরা কি এই সময়ে বেড়াতে যাই শ্রী যে অত বাছবিচার করব? যেখানের টিকিট পাবো, সেখানেই যাবো। মোট কথা, এই চত্বরে পুজোর কটাদিন থাকবো না না না।" একটু কড়া স্বরেই কথাগুলো বললেন সুবোধবাবু। এবং বলেই বুঝলেন, এরকম বলা ঠিক হয়নি। সামনে বসে থাকা শ্রীময়ী হঠাৎ ডুকরে কেঁদে উঠলেন।


সাময়িক বিহ্বলতা কাটিয়ে স্ত্রীর কপালে মাথায় হাত বুলিয়ে সুবোধবাবু বললেন, "সরি। আমার এরকম বলা উচিত হয়নি।"

শ্রীময়ী কিছু বললেন না। আস্তে আস্তে শাড়ির আঁচল দিয়ে চোখের কোণ মুছে চায়ের কাপ হাতে বারান্দায় চলে গেলেন। সুবোধ দেখলেন, শ্রীময়ী অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছেন মাঠের দিকে। জগৎ জননীর আগমনীর অপেক্ষায়।


আট বছর আগে এমনই এক আগমনীর বিদায়বেলায় এই জননীর কোল খালি করে বিজয়া দশমীর দিন চলে গিয়েছিল ওঁদের একমাত্র ছেলে, শুভজিৎ। পাড়ার পুজোর ভাসানে গিয়ে আর ফেরেনি। প্রতিমা বাহক ট্রলারের পিছনের চাকায় পিষ্ট হয়ে চিরতরে চলে গিয়েছিল সে।


সেই থেকে সান্যাল দম্পতি পুজোর চার পাঁচদিন চলে যান দূরে, অনেক দূরে। এই কটাদিন এলে যেন সেই পরম বিভীষিকাময় রাত্রিটা গলা চেপে ধরে ওঁদের। আর তাই এই আনন্দোৎসব থেকে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন ওঁরা। এখনও।

সমাপ্ত

(অত্যন্ত মর্মান্তিক একটি সত্য ঘটনা অবলম্বনে লেখা।)
আমাদের মুস্কিল কী জানেন?
আমরা দুই আর দুই যোগে যে চার হতে পারে, অনেক সময়ে সেটা মানতে পারি না।
সম্পর্কগুলো আদপে খুব সহজ সরল।
অযথা নামের বোঝা চাপিয়ে ফেলি আমরাই। তারপর আর সেই ভার বইতে পারিনা।
যতবার তুমি আঘাত পেয়েছ, গর্জে উঠেছে কলম।
হে কবি,
গহীন গোপনে তোমার সৃজনী ব্যথার প্রলেপ পশম।।

Friday, September 21, 2018

লুচিকে চিঠি

প্রিয় লুচি
এই শোন, তোরা কী ভেবেছিস বল তো? আমায় কি এতটুকুও শান্তিতে থাকতে দিবি না? পুজো আসতে আর কটাদিন বাকি জানিস তো? এক মাসও না। আমায় না হাল ফ্যাশনের জামাকাপড় পরে ভুবনমোহিনী হয়ে ঘুরে বেড়াতে হবে... তার জন্য তো এই ফুটবলের আকৃতিটা ঝরাতে হবে, নাকি? এদিকে তোরা যদি সারাক্ষণ আমার চোখের সামনে ঘুরঘুর করিস, আমি কী করে সামলাই নিজেকে?
তুই নিজেই ভাব না। ধবধবে সাদা, তুলতুলে নরম, গাওয়া ঘিতে ভাজা গরম গরম ফুলকো লুচি যদি চোখের সামনে কড়াই থেকে নামতে দেখি, নিজের দুই হাত দড়ি দিয়ে বাঁধা থাকলেও আমি হ্যারি হুডিনির চেয়ে বেশি ক্ষিপ্র হয়ে বাঁধনমুক্ত করব নিজেকে। আর তারপর, এই একটা ইয়া বড় হাঁ করে সটান মুখে। আর যদি ভিতরে একটু কড়াইশুঁটি বা ডালের পুর থাকে, তাহলে তো কথাই নেই। এই অভাগাকে দেখে কে?
সবচেয়ে খারাপ জিনিস কী জানিস? তোরা তো আবার একা একা থাকিস না। সব সময় কাউকে না কাউকে ঠিক পটিয়ে নিস। সে কিসমিস নারকেল কুচি দেওয়া ঘিয়ের গন্ধে ভরপুর মাখোমাখো ছোলার ডাল হোক, বা বেশ আদা রসুন গরম মসলা হিং দিয়ে রসিয়ে কষিয়ে আলুর দম। মাঝে সাঝে তো আবার আরও এক কাঠি ওপরে যাস। এক্কেবারে অতি সুসিদ্ধ তুলতুলে নরম পাঁঠার মাংসের ঝোলের সাথে দেখা দিস। ইয়ার্কি পেয়েছিস নাকি?
ফের যদি পুজো শেষ হওয়ার আগে তোদের দেখা পাই না, লাল দইয়ের মাথার কসম খাচ্ছি, ঠেঙ্গিয়ে চ্যাপ্টা করে দেবো। চুপসে গিয়ে তখন ওই হতচ্ছাড়া পুরি আলু সব্জি হয়ে সারা জীবন কাটাতে হবে তোকে। মনে থাকে যেন?
আর শোন, আপাতত ছুটিতে যাচ্ছিস যা। যাওয়ার আগে এক হাঁড়ি ডায়েট রসগোল্লা রেখে যাবি। আচ্ছা আচ্ছা ঠিক আছে। জানি। দুনিয়ায় বারমুডা ট্রায়াঙ্গালের রহস্য পর্যন্ত সমাধান হয়ে যেতে পারবে। কিন্তু ডায়েট রসগোল্লা কখনোই আমার মুখে রুচবে না। ঠিক আছে। এমনিটাই আনিস। একদম স্ট্রেট ফ্রম দ্য গামলা। গরম গরম। রসে টইটুম্বুর। মিষ্টি খেলে মন ভালো হয়। তোদের সাথে সাময়িক ব্রেক-আপ করছি, সেই দুঃখটা ভুলতে হবে তো, নাকি?
আর ফিরবি যখন, বিজয়া করতে, তখন কিন্তু সরভাজা আর ছানার জিলিপি মাস্ট। ঠিক?
নে, বিদেয় হ। আমি একটু কোল্ড ড্রিঙ্ক খেয়ে প্রাণের জ্বালা জুড়োই।
ইতি
তোর খাদ্যরসিক টিপিকাল বাঙালি  

Wednesday, September 19, 2018

নিজেকে চিঠি

প্রিয় নীলু
কী রে, সন্ধ্যে হয়ে গিয়েছে, আর তুই এখনও ঘরের আলো জ্বালাসনি। চুপ করে একটা কোণে বসে আছিস। ও মা, এ কী? কাঁদছিস...কেন? ও। বুঝেছি। দীপু তোর চেয়ে অনেক কম নম্বর পেয়েও শিকাগো স্টেটে অ্যাডমিশন পেয়ে গেল আর তুই অ্যারিজোনা স্টেটেও পেলি না, তাই? এইটাতে তুই পাবিই পাবি ভেবে রেখেছিলি, তাই না রে? ভাবছিস মল্লিকা আপসেট হবে। না? তাহলে? ও আচ্ছা। ক্যাটেও রেজাল্ট ভালো হয়নি। চাকরিটা ছাড়তে পারবি না, তাই তো? 
তোকে কয়েকটা কথা বলি নীলু। আমি তো কম করেও বেশ কিছু বছরের বড় তোর থেকে, দুনিয়াটা একটু হলেও বেশি দেখেছি। তাই বলছি, শোন, কিছু বছর পরে দেখবি, এগুলো কিচ্ছু ম্যাটার করবে না। এই যে তুই ভাবছিস, সব বন্ধুরা বম্বে দিল্লি ব্যাঙ্গালোর অ্যামেরিকা ইংল্যান্ড চলে গেল, আর তুই পড়ে রইলি সেই কলকাতায়, দেখিস দশ বছর পর তোর জীবনেই আক্ষেপ অনেক কম হবে।
বিল্টু, দীপু এরা হয়তো বিশাল চাকরি করবে। কিন্তু সকলে দেশের বাইরে। কালেভদ্রে সকলের সাথে যখন তোর আবার কথা হবে, দেখিস, সব্বাই বলবে। "তুইই ভালো আছিস রে নীলু। কলকাতায় রয়ে গেলি। বেশ নিশ্চিন্তে। রাত দুপুরে ফোন বাজলে দেশ থেকে, কী হল, সব ঠিক আছে তো ভেবে হঠাৎ করে হার্টবিট মিস হয় না। সকাল সন্ধ্যে নিজের সংসারের সাথে বুড়ো বুড়ি দুটোর জন্য বাড়তি টেনশন নিতে হয় না।" নীলু তুই হয়তো তখন ওদের বলবি, "নদীর এপার ওপার কেস এটা।" হয়তো তাই। কিন্তু তুইই বল। বাবা মায়ের বয়স হচ্ছে। হাজারটা ডাক্তার বদ্যি চলছে। তবুও সর্বক্ষণ চোখের সামনে দেখতে পাবি ওঁদের। বা ধর, যখন সারাদিন অফিসে প্রচুর খাটুনির পর বাড়ি ফিরে মায়ের কোলে মাথা রেখে শুয়ে শুয়ে রেডিওতে পছন্দের বাংলা গান শুনতে পাবি, সেই বেলা? অ্যামেরিকা বা হিল্লি দিল্লি কোথাও এই সুখটা পাবি?
যতই ভিড় ভাড় হোক, তাও, ট্র্যাফিক জ্যামের মধ্যে দিয়ে নিজের উপার্জনে কেনা চার চাকা চালাতে চালাতে যখন আশে পাশে বিলবোর্ডে বাংলায় বিজ্ঞাপন দেখবি, আশে পাশে সমস্ত মানুষকে দেখবি যাদের সাথে তুই নিজের অনেক মিল দেখবি... দেখিস, খুব ভালো লাগবে। ওঁরাও যেমন জীবনযাপনের জন্য লড়ছেন, তেমনই তুইও। সংগ্রামটা একই রে। অনেক একাত্ম বোধ করবি।
বর্ষার দিনে গড়িয়াহাট মোড়ে গাড়িটা যখন সিগনালে দাঁড়িয়ে, দেখতে পাবি তোর স্কুলের কিছু বাচ্চারা সেই নীল সাদা ইউনিফর্ম পরে জমা জলের ওপর দিয়ে লাফাচ্ছে, হাসছে, খেলছে, এক লহমায় তোর নিজের স্কুল লাইফের কথা মনে পড়ে যাবে। কত আনন্দই না করেছিস। সেদিন তুই ঠিক বাড়ি ফিরে পুপাইকে নিয়ে কাগজের নৌকো বানিয়ে বিল্ডিঙের সামনে জমা জলে ভাসাবিই। কত আনন্দ পাবি, বলে বোঝাতে পারবো না তোকে। তুই মিলিয়ে নিস শুধু।
হয়তো ঠিকই, কলকাতার বাইরে গেলে তুই অনেক বেশি টাকা রোজগার করতি। হয়তো বা তোর জীবনযাত্রা অনেক উন্নতমানের হত। কিন্তু আমি বলছি, এই কলকাতায় শান্তিতে বাঁচতে গেলে যেটুকু দরকার, তুই ঠিক পাবি। এখনের চাকরিটাতে টিকে গেলেও তোর দশ বছর বাদে যথেষ্ট থাকবে। আর চাকরি পালটালে তো কথাই নেই। এখানেও যা ইনক্রিমেন্ট পাবি, দিব্যি চলে যাবে। এত লো কস্ট অফ লিভিং আর একটা শহরে দেখা দেখি?
একটা কথা বলবো? জানিস এই একটু আগে সামনের রোয়ের বাড়িগুলো থেকে পুজোর চাঁদা তুলে এলাম। ওই বাড়িগুলোয় বেশির ভাগই এখন সিনিয়র সিটজেন। ছেলে মেয়েরা সব জীবীকার সন্ধানে দেশের বাইরে, বা অন্য রাজ্যে। বাবা মায়েরা ওপর ওপর "ভালো আছি" বলেন ঠিকই, কিন্তু সকলের মধ্যেই কেমন অবসাদ দেখলাম। একাকীত্ব। জীবনশক্তিটাই কত কমে গিয়েছে। সেই তুলনায় আমার মা বাবা সুগার কোলেস্টেরলে ভুগলেও, দিল খুলে হাসে এখনও, ছেলে মেয়ে বৌমা জামাই নাতি নাতনি নিয়ে মাঝে মাঝেই বেড়াতে বেরোয়। খেতে যায়। দিব্যি আছে। দিব্যি আছি।
অফিসের কাজ আছে। সেসব তো চলতেই থাকবে। তার সাথে এই যে এই সময় তিন চার মাস, জোর কদমে পুজোর কাজ কর্ম, ছোটাছুটি আর তারপর বিসর্জনের পর একটু স্বস্তি। প্রচুর খাটনি যায়। মাঝে মাঝে মনে হয়, ধুর ছেড়ে দেব। তাও, যখন প্যান্ডেলে লোকেদের ভিড় দেখি, অঞ্জলির লাইন, সেলফির হিড়িক, সেই সব যখন ফেসবুক লাইভে দিই, একদা এ পাড়ার দাদা দিদি ভাই বোন বন্ধুরা দেশ বিদেশ থেকে দেখে আর "মিস করছি" বলে, তখন নিজেকে রাজা মনে হয় রে। এই যে পরিতৃপ্তি, এর কোন তুলনা নেই। বলছিনা যে বাইরে থাকলে এগুলো উপভোগ করা যায় না, কিন্তু তাও, বাড়ি বাড়িই, নিজের শহর, নিজেরই। এই শহরও তো আরেকটা মা রে।  এই তো একটু আগে ফেসবুকে দেখলাম রুমঝুমের বোনটা, যে চেন্নাইতে থাকে, ফেসবুকে স্টেটাস দিয়েছে, "বাবার কাছে শুনলাম নীলাঞ্জন দা চাঁদা নিয়ে গেল। এবারও কলকাতার পুজো মিস হল।" আমি যদি কলকাতায় না থাকতাম হয়তো এরকমই কিছু স্ট্যাটাস দিতাম। বি-ব্লক, সি এসের মাঠ, এই সব মিস করছি লিখে।
শোন, তোকে বলি, যা হয়েছে, ঠিক আছে। এটাকে নিয়েই এগিয়ে যাওয়া যায়। স্বচ্ছন্দে। আমি বলছি। অভিজ্ঞতা থেকে। বিদেশে বা অন্য শহরে থাকার যেমন প্রোস অ্যান্ড কন্স আছে, তেমনই কলকাতারও আছে। দেখবি, এই শহরে বসেই জীবনটা ভালোই কাটবে। বছরে দুবার বেড়াতে যাবি। দেশে বিদেশে। সারা বছর শান্তিতে থাকবি । জ্যাম জট মিটিং মিছিলের শহরেও ঠিক একটা জীবন চলে যায়।
এত চিন্তা করিস না। মন খারাপও না।
নে, এবার ঘরের বাইরে চল। দেখ, মলি এসেছে। মা আর ও ফুচকা বানাচ্ছে। খাবি তো?
ইতি
কয়েক গাছা বেশি চুল পাকা নীলু 

Sunday, September 16, 2018

আহা রে মন


কাঠের আলমারিটার সামনে চাবির গোছা হাতে দাঁড়িয়ে এখনও ইতস্তত করছে রঙ্গনা। দোর্দণ্ডপ্রতাপ শাশুড়ি কুমুদিনী মারা গিয়েছেন মাস খানেক হয়ে গিয়েছে। এই ঘর ও আলমারি তাঁরই। উল্টোদিকের দেওয়ালে ওঁর সদ্য বাধানো ছবিটার ছায়া আলমারির দরজায় লাগানো আয়নায় জ্বলজ্বল করছে। তিরিশ বছর ধরে রঙ্গনা এই বাড়িতে আছে, কিন্তু কোনদিনও কুমুদিনী ছাড়া কাউকে এই আলমারি খুলতে দেখেনি। এক আধবার তো স্বামী মানবকে ঠাট্টার ছলে এ কথাও বলেছে, "হ্যাঁ গো, কী এমন গুপ্তধন আছে গো মায়ের আলমারিতে যে আমাদের ধারে কাছে আসতে দেন না?"
"কে জানে? ছোট থেকেই দেখে আসছি। মায়ের আলমারি ঘাঁটা বারণ আমার। আগে ভাবতাম বোধহয় হজমি আচার লুকিয়ে রাখে মা। পাছে বেশি খেয়ে নিই, তাই। তারপর খেয়াল করলাম, বড় হয়ে যাওয়ার পরও ওই আলমারিতে হাত দেওয়া বারণ। একবার জানো, মায়ের ধুম জ্বর। তখন আমি কলেজে পড়ি। মাইনে দিতে হবে। মা বিছানা ছেড়ে উঠতে পারছে না। আমি বললাম, মা, আমায় চাবিটা দাও, আমি নিয়ে নেবো। তোমায় কষ্ট করে উঠতে হবেনা। ও মা, মা কিছুতেই শুনলো না। সেই দুর্বল শরীরে আমায় ঘর থেকে বের করে নিজে আলমারি খুলে আমায় টাকা দিলো।"
এই তো অবস্থা, নেহাত মানব সেদিন বলছিল এইবারে মায়ের জিনিসগুলোর সদ্গতি করতে। তার চেয়েও বড় কথা, ব্যাঙ্ক, এল আই সির জন্য যে কাগজপত্র লাগবে, সবই ওই আলমারিতেই আছে। সেই জন্যই আজ রঙ্গনা তোষকের তলা থেকে চাবির গোছাটা বের করে আলমারির সামনে দাঁড়িয়েছে। নাহ, কাজটা যখন করতেই হবে, তাহলে আর দেরি করে লাভ নেই। কাঁপা কাঁপা হাতে রঙ্গনা চাবিটা দরজার গায়ে ঘোরালো। একটা ক্যাঁচ করে আওয়াজ করে দরজাটা খুলে গেল।
এক ঝাঁক পুরনো স্মৃতির সাথে এক সুমিষ্ট সুঘ্রাণ। রঙ্গনার মনে পড়ে গেল, সত্যিই তো, মা তো কেউ কোথাও গেলেই এই ছোট ছোট সুগন্ধীর পাউচগুলো আনাতেন। কাপড়ের ভাঁজে ভাঁজে রাখবেন বলে। ন্যাপথালিনে অ্যালার্জি ছিল মায়ের। শীতের শুরুতে ওরা উলের পোশাক বের করে বারান্দার রোদে দিলে মা সেই কদিন ওই মুখোই হতেন না।
কী সুন্দর তাকে গুছিয়ে রাখা শাড়িগুলি। তাঁতের শাড়ির সংখ্যায় বেশি। তাই দুটো তাক জুড়ে শুধুই তাই তাঁত। বত্রিশে স্বামীহারা হন কুমুদিনী, ওই বয়স থেকেই সাদা ছাড়া অন্য কোন রঙই কুমুদিনী জীবনে আসতেই দেননি। বয়সের সাথে সাথে পাড়ের দৈর্ঘ্যও কমতে থেকেছে। সিল্কের সারিতে রঙ্গনা দেখল ওর বিয়ের নমস্কারির কাতান সিল্কটা রাখা। ঘি রঙা জমির ওপর ময়ূরকণ্ঠী নীল পাড় আঁচল। এই শাড়িটা কুমুদিনীকে কোনোদিনও পরতেই দেখেনি রঙ্গনা। হয়তো ওঁর জন্য বেশিই রঙিন হয়ে গিয়েছিল। আর তাই বিয়ের পর প্রথম পুজোয় তত্ত্ব কেনার সময় মায়ের সাথে গিয়ে নিজের হাতে শাশুড়ি মায়ের জন্য শাড়ি পছন্দ করেছিল ও। সাদা সিল্কের ওপর সবুজ পাড়, আঁচলেও ন্যুনতম কাজ। ওইটি কুমুদিনীর পছন্দ হয়েছিল। কুমুদিনীকে কোনদিনও গয়না পরে সাজতেও দেখেনি কেউ। মানব যখন পিতৃহারা হয়, তখন নিতান্তই ছোট। মোটে আট। ওরও মনে নেই মাকে সেজেগুজে রঙ্গীন পোশাকে দেখেছে বলে।
শাড়িগুলো এদিক ওদিক ওলট পালট করতে গিয়ে রঙ্গনার নজর গেল নীচের তাকে। অখানে যত্ন করে একটা কোণে রাখা কুমুদিনী আর ওঁর স্বামীর সমস্ত রেজাল্ট। পাতাগুলো হলুদ হয়ে গিয়েছে, অস্পষ্ট সব অক্ষরও। আবছা কিছু নম্বর, স্কুলের নাম ঠিকানা, কিছু তারিখ। শ্বশুরমশাইকে রঙ্গনা দেখেনি, তাই ওঁর কাগজপত্র দেখে আলাদা করে কিছু মনে না হলেও কুমুদিনীর মার্কশিটগুলো দেখতে দেখতে অদ্ভুত একটা অনুভূতি হল। উনিও যে সাদা শাড়ি আর খোঁপার আগে রঙ্গীন শাড়ি, লাল ফিতে বাঁধা দুই বেণী ছিলেন, মনেই হয়নি কখনও। উনিও হয়তো সকালবেলা স্কুল, তারপর বিকেলে বাড়ি ফিরে ব্যাগ ফেলে ছুটতেন পিছনের মাঠে, অনেক সময়ে মায়ের কান মলা খেয়ে তবে ফিরতেন পড়তে বসতে।
কী সুন্দর গুছিয়ে রাখা জিনিসপত্র আলমারিতে। আবার সমস্ত কিছু যথাস্থানে রেখে রঙ্গনা এবার খুঁজতে লাগল ব্যাঙ্ক ইন্সিয়োরেন্সের কাগজ। ওর চোখে পড়ল শালের সম্ভারের পিছনে একটা গোলাপি রঙের ফাইল। দরকারি কোন কাগজ নাকি? ফাইলটা টেনে বের করল রঙ্গনা। স্বচ্ছ্ব প্লাস্টিকের ফাইল কাভার। ভিতরে অনেক পুরনো কাগজ। খয়েরি হয়ে যাওয়া। সযত্নে না ধরলে চুরচুর করে ভেঙ্গে পড়বে, এমনই ভঙ্গুর অবস্থা।
রঙ্গনা সাবধানে কাগজগুলি বের করে একে একে দেখতে লাগল। বাড়ির দলিল একটা। সেখানে অক্ষর অস্পষ্ট। কষ্ট করে পড়ে রঙ্গনা বুঝল, বাংলাদেশের খুলনা শহরের কোন বাড়ির দলিল। সই করেছেন শ্রী নারায়ণদেব গঙ্গোপাধ্যায়। মানে কুমুদিনীর দাদা শ্বশুর। বাবা, কত পুরনো। কত মূল্যবান। যদিও দেশ ভাগের পরে সেই সব আর কিছুই পড়ে নেই, তাও। পরের কাগজটা একটা চিঠি। অমূল্য মুখোপাধ্যায়ের লেখা। শ্রী আদিত্যনারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় কে জানিয়েছেন যে অমূল্য বাবুর কন্যা একটি পুত্রসন্তানের জন্ম দিয়েছেন, ৭ই বৈশাখ, মুঙ্গেরের সদর হাসপাতালে। আদিত্যনারায়ণ কুমুদিনীর শ্বশুরমশাইয়ের নাম। এই চিঠিটি তার মানে রঙ্গনার শ্বশুর মশাইয়ের জন্মের সংবাদ বাহক। সেই চিঠি এত বছর ধরে এমন যত্নে রেখে দিয়েছিলেন কুমুদিনী। আরো কিছু চিঠি দেখতে পেল রঙ্গনা। মূলত শ্বশুর মশাই শশাঙ্কদেবের লেখা। বিভিন্ন সময়ে। বিভিন্ন দরকারে, অদরকারে। তার মধ্যে মানবের জন্মের চিঠিও রয়েছে। আরো কত কিছু। কিছু সাদা কালো ছবি, যা এখন স্মৃতির ভারে খয়েরি হয়ে গিয়েছে। কোন কোন জায়গায় আবার ফ্যাকাসে হয়ে গিয়েছে। কালো কাগজের ওপর সাটিয়ে রাখা, এত বছর পর কোণগুলি উঠে আসছে। ছবিগুলোয় পুরুষেরা সকলে ধুতি পাঞ্জাবি পরিহিত, কারুর মুখে হাসি নেই। মেয়েরাও গম্ভীর মুখে। ছাপা শাড়ি পরে, বড় হাতা ব্লাউজ। সেই আমলের এই ফ্যাশন। কাউকেই চিনতে পারল না রঙ্গনা। কেবলমাত্র একটা ছবি বাদে। কুমুদিনী ও তাঁর স্বামীর ছবি। বিয়ের পরে পরেই তোলা হয়তো। কুমুদিনীর চোখে মুখে নববধূর লাজ। ঘোমটা মাথায়, মুখ নিচু, আড়ষ্ট হয়ে দাঁড়িয়ে। পাশে হাসিমুখে রঙ্গনার শ্বশুর মশাই শশাঙ্কদেব। কুমুদিনীর মতো অমন দাপুটে ভদ্রমহিলা, যাকে বিয়ের তিরিশ বছর পরেও রঙ্গনা ভয় পেত, মুখ তুলে কথার পিঠে কথা বলতে পারত না, সেই ভদ্রমহিলা যে এক কালে এমন লাজুক ও শান্ত ছিলেন, অভাবনীয়। সত্যি, এই আলমারি গোছাতে গিয়ে কত নতুন ভাবেই না রঙ্গনা চিনছে ওর মৃতা শাশুড়িকে।
কাগজগুলো তুলে রাখল রঙ্গনা। আলমারিতে তালা লাগাতে গিয়ে চোখে পড়ল খাটের কোণে মেঝেতে একটা কাগজ পড়ে রয়েছে। কোনো চিঠি হয়তো। নিচু হয়ে তুলল কাগজটি। এটিও একটি চিঠিই। বাকিগুলোর চেয়ে কম পুরনো। একটু কৌতূহল হল রঙ্গনার। কার চিঠি? কী লেখা? তারিখ লেখা ১৬ই সেপ্টেম্বর, ১৯৬৫। মুক্তোর মতো হাতের লেখায় নীল কালিতে লেখাঃ
প্রিয় কুমুদিনী
আজ তোমাদের বাড়ি গিয়েই কথাগুলো তোমায় সামনাসামনি বলব ভেবেছিলাম। কিন্তু শশাঙ্কদার মা বাবা থাকায় সেই সুযোগ পেলাম না। অবশ্য তুমি রাজি থাকলে আমি নিশ্চয়ই ওনাদের এবং তোমার মা বাবার সাথে কথা বলবো এবং অনুমতি নেব। কিন্তু তার আগে সবচেয়ে জরুরি জানা তোমার মতামতটি।
তোমাকে আমি বহুবার বলেছি। ভালোবাসি তোমায়। ভালোবাসি তোমার কথা বলা। তোমার ভঙ্গিমা। তোমার হাসি। তোমার সবটুকু। সাধারণের মধ্যেও অসাধারণ তুমি। রোজের একঘেয়েমিতেও তুমি অনন্যা। বাবুকে যখন বকো বা ধোপাকে যখন যত্ন করে জামাকাপড় বুঝিয়ে দাও, বা ধরো তমাদের বাসায় গেলে আমার পছন্দ অনুযায়ী ঠিক বেশি চিনি দিয়ে চা দাও, তোমার শরীর খারাপ হলে ওষুধ খেতে বললে আমায় পাত্তা দাও না - সব, সব। তোমায় তুমি রূপে ভালোবাসি কুমুদ। লক্ষ্মীটি, আমায় বিয়ে করো।
জানি আমার দেওয়া বিয়ের প্রস্তাব শুনে হয়তো তুমি অনেক দ্বিধা দ্বন্দ্বে পড়বে। কিন্তু আমার সমস্ত ইষ্ট দেবতার শপথ নিয়ে বলছি। আমার অন্তরের যত স্নেহ ও ভালোবাসা আছে, সমস্ত দিয়ে তোমায় আর বাবুকে ভরিয়ে রাখবো। একবারের জন্যও তোমায় বা মানবকে শশাঙ্কদার অভাব বুঝতেই দেব না।
কুমুদ এই যে আমি সময়ে অসময়ে তোমাদের বাসায় আসি, এ কি শুধুই এক প্রাক্তন সহকর্মী ও তাঁর পরিবারের প্রতি কর্তব্যবোধে? তুমি কি একবারও বোঝোনি যে এটা অন্য টান? আর যদি বা বুঝেও তুমি অস্বীকার করে থাকো, বা আমায় গ্রহণ করতে না চাও, তাহলেও আমার কোনো খেদ নেই। আমি চিরকাল মন প্রাণ দিয়ে তোমাকে একইভাবে ভালোবেসে যাবো। সম্মান করে যাবো। এবার তুমি যা ভালো বোঝো। তোমার উত্তরের অপেক্ষায় রইলাম।
ইতি
তোমার প্রিয়তোষ দা
রঙ্গনা স্তব্ধ। প্রিয়তোষ কাকু? ওদের পরিবারের সদস্য বললেও কম বলা হয়। নিকটাত্মীয়ের চেয়ে কোনো অংশে কম যেতেন না। মানবের পিতৃতুল্য। যেই মানুষটা বটবৃক্ষের মতো না আগলে থাকলে নাকি মানব আর কুমুদিনীর জীবন লন্ডভন্ড হয়ে যেত, সেই প্রিয়তোষ কাকু? মাকে এত ভালোবাসতেন? আর মা? উনিও কি? নিশ্চয়ই তাই, নইলে এত বছর ধরে এমন যত্ন করে চিঠিটা থাকতো না...তাহলে কি সমাজ ও লোকলজ্জার ভয়ে সাড়া দিতে পারেননি? এতগুলো বছর কাউকে জানতেই দিলেন না? চিঠিটা পেযে কি মাও বিচলিত হয়েছিলেন? ভয়? হৃদস্পন্দন বেড়ে গিয়েছিল? উত্তর কি মুখে দিয়েছিলেন? না চিঠিতে? কী ছিল তার বয়ান?
প্রিয়তোষ কাকু গত বছর পুজোর ঠিক পরে পরেই দীর্ঘ রোগভোগের পর চলে গিয়েছেন। মানব মা কে সেই সংবাদ যখন দেয়, কুমুদিনী নিরুত্তাপ, নির্বাক। খানিকক্ষণ ওরকম দাঁড়িয়ে থেকে নিজের ঘরে গিয়ে দরজা বন্ধ করেছিলেন। রঙ্গনার সব ছবির মতো স্পষ্ট মনে আছে। কুমুদিনী সেই রাতে খাননি। পরদিন সকালে মানবকে ডেকে বলেন, " বাবু উনি তোর পিতৃতুল্য ছিলেন। তুই ঠাকুরমশাইকে ডেকে বিধান না। আমি চাই তুই ওনার কাজ করিস। আর রঙ্গনা, আগামী কয়েকদিন আমাদের বাড়িতে অশৌচ পালন হবে। খেয়াল রেখো।"
রঙ্গনা সেদিন কিচ্ছু না বুঝে অবাক হলেও আজ সব জলের মতো পরিষ্কার। পঞ্চাশ বছরের ওপর চলতে থাকা এই নীরব প্রেমের গল্প, এ যে এক অন্য কুমুদিনীর কাহিনী। এই কুমুদিনী শাসন ছাড়াও ছিলেন এক রক্ত মাংসের মানুষ। এই কুমুদিনীরও একটা হৃদয় ছিল। ছিল সযত্নে সভয়ে চেপে রাখা আবেগ। ভালোবাসা। এতগুলো বছর পর আজ কুমুদিনী ও তার প্রিয়তোষদা সমস্ত লোকলজ্জার ভয় কাটিয়ে হয়তো অবশেষে এক হয়েছেন, চির অসীমের ওপারে।
পড়ন্ত সূর্যের রশ্মির ছটায় পশ্চিমের ঘরটা আলোকিত। কুমুদিনীর ছবিটাও সেই দ্যুতিতে বড্ড জীবন্ত। আজ প্রথমবার সেইদিকে তাকিয়ে রঙ্গনার দুই চোখ চাপিয়ে জল এলো।