Monday, November 12, 2018

হঠাৎ দেখা

১।

দেরাদুনের জলি গ্রান্ট এয়ারপোর্টে প্লেনটা যখন নামল, ঘড়িতে সকাল সাড়ে এগারোটা। হ্যান্ড লাগেজ ছাড়া আর অন্য কোন কিছু নেওয়ার ছিল না, তাই প্লেন থেকে নেমেই একেবারে বাইরে চলে এলাম। আমি, সম্রাজ্ঞী দাশগুপ্ত, বর্তমানে দিল্লীতে এক মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে চাকরি করি। দেরাদুন এসেছি, বা বলা চলে, মুসোউরি যাচ্ছি আমার খুব কাছের এক বান্ধবীর বিয়ে উপলক্ষে। মেঘা, আমার ক্লাসমেট কাম রুমমেট। একসাথে এম বি এ পড়েছি আমেদাবাদে। ওই দুই বছরের কঠিন দিনগুলো অনেকাংশেই কম কষ্টের কাটত শুধুমাত্র এই সদা হাসি খুশি পাহাড়ি মেয়েটির জন্য। মেঘা আমার কাছে বন্ধুর চেয়েও অনেক বেশি কিছু। আর তাই ও যখন আমায় ওর বিয়ের তারিখ ঠিক হওয়ার কথা জানালো দশ মাস আগে, আমি তক্ষুনি ছুটির আবেদন করে ফেলেছিলাম। মেঘার বিয়ে উপলক্ষ্যে আমাদের ব্যাচের অনেকেই আসবে। রুশা, সিম্মি, প্রিয়াঙ্কা, গৌরব, নেহাল, চঞ্চল, পারুল, বিবেক, আকাশ, সুমিত। সবার সাথে দেখা হবে, ভেবে এমনিতেই মন ভালো। তার ওপর এয়ারপোর্টের বাইরে বেরিয়েই পাহাড় দেখে আর একটা ঠাণ্ডা হাওয়ার আমেজ আমায় মুহূর্তেই খুশি করে দিল। দিল্লীতেও ঠাণ্ডা পড়তে শুরু করেছে। তবে এই শুদ্ধ পরিবেশের বড্ড অভাব। মাঝে মাঝে দম বন্ধ হয়ে আসে। মেঘার মেসেজ পেয়েছি, এয়ারপোর্টের সামনেই ওর পাঠানো গাড়ি আছে। গাড়ির নম্বর জানিয়ে রেখেছে। আমি ড্রাইভার সাহেবকে ফোন করে এগোতে লাগলাম।

একটা কালো রঙের ইনোভা গাড়ি। দরজার বাইরেই এক বছর পঁচিশ তিরিশের যুবক দাঁড়িয়ে। বুঝলাম ইনিই চালক। আমার হাত থেকে ট্রলি ব্যাগটা নিয়ে বললেন, "মেমসাব, একটু অপেক্ষা করতে হবে। এর পরের ফ্লাইটে আর এক সাবজী আসছেন। মেঘা ম্যাডাম বলেছেন আপনাদের দুজনকে একসাথে নিয়ে আসতে। এই তো বারোটা পনেরোর দিকেই ল্যান্ড করবে। আপনি গাড়ির ভিতরে বসুন।"
আমি অবাক হয়ে গেলাম একটু। কই, মেঘা তো আমায় কিছু বলেনি। কে আসছে? আমাদের ব্যাচের কেউ? ওয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে কেউ কিছু তো লিখল না। আমার ধারণা ছিল বাকিরা বম্বে হয়ে আসছে। বিকেলে পৌঁছবে। কে জানে। থাক, একটু রোদ পোহাই, আর বাড়িতেও ফোন করে দিই। মা বাবা চিন্তা করছে নিশ্চয়ই। হ্যান্ডব্যাগটা গাড়িতে রেখে আমি বাইরেই দাঁড়ালাম। বাড়িতে কথাবার্তা সারলাম। ঘড়িতে বাজে বারোটা পঁয়ত্রিশ। ইতিমধ্যেই ভৈঁরো সিং, মানে আমাদের ইনোভার চালকের ফোনে আমার সহযাত্রীর কল এসে গিয়েছে। উনি কনভেয়ার বেল্ট থেকে লাগেজ নিয়েই আসছেন। আমি ভৈঁরোর সাথে খানিক খেজুরে গল্প করলাম। মুসৌরির আবহাওয়া, বিয়ের তোরজোড় ইত্যাদি নিয়ে।

"ওই তো, সাব এসে গিয়েছেন।"  ভৈঁরোর কোথায় সম্বিত ফিরল। ফোন থেকে মুখ তুলে তাকিয়ে দেখলাম যাকে, মুহূর্তে আমার হৃৎপিণ্ড দু তিনটে বিট মিস করলোই করল। ঠিক আগের মতোই। নীল জিন্স, লাল কালো  চেক শার্ট আর চোখে কেতাদুরস্ত সানগ্লাস পরে আমাদের দিকে এগিয়ে আসছে সম্রাট। সম্রাট চট্টোপাধ্যায়। একদা আমাদের এম বি এ ক্লাসের ক্লাসমেট। তার চেয়েও বড় কথা, আমার প্রাক্তন প্রেমিক।


২।

সালটা ২০১১। তখন সবে যাদবপুর থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করে এম বি এ পড়তে ঢুকেছি। প্রথম বাড়ির বাইরে থাকা। হোস্টেল জীবন। পড়ার চাপ। র‍্যাগিং। সব মিলিয়ে মন খারাপ করেই অবসর কাটত। অবশ্য লেখাপড়ার এত চাপ থাকত, রোজ রোজ একেকটা অ্যাসাইনমেন্ট শেষ করা, ক্লাসের পড়া রেডি করা, হঠাৎ হঠাৎ সারপ্রাইজ কুইজ, সব মিলিয়ে নাজেহাল। বরাবর স্কুল আর কলেজ টপার আমি। তাতেও হিমশিম খেতাম এম বি এর কারিকুলামে। ব্যাচের সকলের সাথেও আলাপ হয়নি সেরকমভাবে, কিছু বন্ধু বান্ধব হয়েছিল সেকশনে, ওইটুকুই। এরই মধ্যে একদিন আমাদের ব্যাচের থেকে কিছু লোকজন ঠিক করল, সব সেকশন মিলে মিড সেমেস্টারে একটা উইকেন্ডে বেড়াতে যাওয়া হবে। উদয়পুর। এই উপায়ে সকলের সাথে সকলের বেশ পরিচিতি হবে। বেড়াতে আমি ভালোইবাসি। আর রাজস্থান বেড়াতে যাওয়ার শখ অনেকদিন ধরেই। তাই না করিনি। কে জানত, এই ট্রিপই আমূল বদলে দেবে আমার জীবন। এনে দেবে এই নিস্তরঙ্গ জীবনে ঝঞ্ঝা।

বৃহস্পতিবার বিকেলে আমাদের ১০০ জনের দল চারটে বড় বাস নিয়ে রওনা দিলাম। যেহেতু এই ট্রিপের মূল কারণ বা লক্ষ্যই ছিল একে অপরের সাথে মেলামেশা হওয়া, পরিচিতি বাড়া, তাই সিটিং এরেঞ্জমেন্টও ছিল বেশ অভিনব। লটারিতে ঠিক হবে এই পাঁচ ঘণ্টার রাস্তা কে কার সাথে বসবে। উদয়পুর পৌঁছনর আগে আবার বাসে লটারি হয়েছিল কে কার রুমমেট হবে। আমি যে চিরকুট দুটি তুলেছিলাম, তাতে আমার বাস সঙ্গী ছিল সম্রাট। আর রুমমেট পারুল। সম্রাটের পাশে বসবে সম্রাজ্ঞী, ব্যাচের যে কজন বাঙালি ছিল, তারা দায়িত্ব নিয়ে এই জোড়ির গল্প গোটা ব্যাচকে বুঝিয়ে দিল। আর কী, সারা রাস্তা আমাদের দুজনকে নিয়ে হাসি ঠাট্টা হইহই হল। সুমন থেকে থেকেই রব নে বনা দি জোড়ির টাইটেল ট্র্যাক গাইতে লাগল। সম্রাটের সাথে আমার আলাপ ছিল না আগে। ও ছিল সেকশন এ তে। আর আমি, সেকশন বি। বরাবরের প্রগল্ভ আমি, লোকজনের উৎপাত থেকে কোনক্রমে নিজেকে বাঁচিয়ে নিজেই যেচে আলাপ করলাম। শুনলাম, ও প্রবাসী বাঙালি। জন্ম থেকেই নাগপুরে থাকে। ওর বাবা ওখানের এক কলেজের প্রফেসর। হিন্দি ফিল্ম আর কান্ট্রি ফোকের পোকা। আমারও মোটামুটি পছন্দের বিষয় এগুলিই। পাঁচ ঘণ্টার রাস্তা এই নিয়ে আলোচনা করতে করতে কখন যে কেটে গেল, খেয়ালই নেই। মনে আছে, ওর বাংলা ফোক সং নিয়ে তেমন ধারণা নেই শুনে আমি বেশ কয়েকটা গান গেয়ে শুনিয়েছিলাম। আমার গানের গলার প্রশংসা পেলাম উপহারে। তবে সবচেয়ে বড় উপহার, বা বলা যায়, স্মরণীয় উপহার পেলাম, তা ছিল সম্রাটের বন্ধুত্ব। আগামী তিনদিন এত ভালো কেটেছিল, ঠিক যেন স্বপ্ন। উদয়পুর লেকে সূর্যাস্ত দেখা, নৌকাভ্রমণ, সিটি প্যালেসের ঐশ্বর্য্য জৌলুসে চোখ ধাঁধিয়ে যাওয়া...প্রতি মুহূর্ত বন্ধুদের সাথে, বিশেষ করে সম্রাটের সাথে ঘুরে ভীষণ উপভোগ করেছিলাম। ফেরার পথে আর আমাদের সিটিং নিয়ে কিছু আলাদা ব্যবস্থা ছিল না। যে যার পাশে বসা যাবে। অদ্ভুতভাবে আমার পাশের জায়গায় ঠিক সম্রাট এসে বসেছিল।

দেখতে দেখতে দিন গেল। সম্রাটের সাথে আমার বন্ধুত্ব আরো নিবিড় হতে থাকল। সময় সুযোগ থাকলেই লাইব্রেরি গিয়ে পড়াশোনা করা, এক সাথে এসাইনমেন্ট সল্ভ করা, পড়তে পড়তে মাথা জ্যাম হয়ে গেলে রাস্তার ওপারে চায়ের দোকানে গিয়ে একটু বিরাম নেওয়া... একদিন হঠাৎ বুঝলাম, কবে যেন আমরা শুধুই ভালো বন্ধুর গণ্ডি পেরিয়ে অনেকটাই এগিয়ে গিয়েছি পরের ধাপে। হাসি মজার মধ্যে দিয়েই লেখাপড়া,  ঘুরে বেড়ানো, দেখতে দেখতে কোর্স শেষ হলো। প্লেসমেন্টে দুজনে দুই জায়গায় চাকরি পেলাম। আমি দিল্লি। সম্রাট চেন্নাই। অবশ্যই মাঝে মাঝেই একে অপরের কাছে চলে আসব, দেখা করব, এই সমস্ত কথা দেয়া নেওয়া চলল।

প্রথম এক বছর মোটামুটি তেমনভাবে চললও। লং উইকেন্ড পেলেই হয় আমি চেন্নাই নয় সম্রাট দিল্লি এসে যেত। ছুতোয় নাতায় কাজ নিয়ে চলে যেতাম চেন্নাই। বা ও আসত বোম্বে। আমি ছুটি ম্যানেজ করে সেখানে চলে যেতাম। দুই পক্ষের বাড়িতেই আমাদের কথা জানত। এক আধ বার আমরা কবে বিয়ে করেছি, এই মর্মে কথাবার্তা উঠেছে। দুজনেই কেরিয়ারে আরো উন্নতি করব, তারপর গাঁটছড়া বাঁধব, এই বলে সাময়িকভাবে কথা এড়াতাম। তবে মনে মনে বিয়ে নিয়ে যে অল্প বিস্তর স্বপ্ন দেখতাম, স্বীকার করতে লজ্জা নেই। সম্রাটকে বলেওছিলাম। তবে ও পাত্তা দিত না। ক্রমে কাজকর্মের দোহাই দিয়ে আমাদের মধ্যে আসতে শুরু করল দূরত্ব। দিনে দুই তিনবার ফোন কলের বদলে সপ্তাহে দুদিন ভিডিও কল, তারপর তাও কমতে কমতে মাসে এক দুই দিন। এক সাথে কোথাও যাওয়া নেই। গোদের ওপর বিষফোঁড়ার মতো আমার ট্রান্সফার হয়ে গেল স্কটল্যান্ডের অপরূপ সুন্দর শহর, গ্লাসগো। দেশ ছেড়ে যাওয়ার আগে চেষ্টা করেছিলাম দেখা করার সম্রাটের সাথে। কিন্তু ও সময় দিতে পারেনি। মন খারাপ নিয়েই গেলাম গ্লাসগো।

ওখান থেকে কয়েকবার কথা হয়েছে, অন্য টাইমজোন হয়ে দাঁড়িয়েছে পথের কাঁটা। তারপর আর তাও না। বুঝতাম সম্রাট আমায় এড়িয়ে যাচ্ছে। মেসেজের উত্তর নেই। আমার জন্মদিনে পর্যন্ত যোগাযোগ নেই। আমি বোকা মেয়ে। ভেবেছিলাম হয়তো আমায় সারপ্রাইজ দিতে গ্লাসগো আসবে। সারাদিন অফিস করতে করতে এই চিন্তাই মাথার মধ্যে খেলছিল আমার। দুদিন পরে ফেসবুকে দেখলাম আমার জন্মদিনের দিন সম্রাট ছিল অফিস পার্টিতে। ঝকঝকে পার্টি। হাসি খুশি মানুষজন। খাদ্য আর পানীয়ের অফুরান ব্যবস্থা। নতুন পরিবেশ। নতুন লোক। সম্রাটকে দেখে মনেই হলো না আমায় মিস করে বলে।

ফেসবুকের থেকেই তারপর একদিন জানতে পারলাম সম্রাট সিডনি ট্রান্সফার হচ্ছে। একবার ভেবেওছিলাম শুভেচ্ছা জানাই। কে জানে কী হলো, জানালাম না। "গাট ফিলিং" হয়তো একেই বলে। ভাগ্যিস জানাইনি। কারণ তিন সপ্তাহ পর দেখলাম সম্রাটের নতুন আপডেট। "ইন এ রিলেশনশিপ উইথ স্বপ্না মেরহোত্রা"। স্টক করে দেখলাম স্বপ্না ওর কলিগ। ব্যাঙ্গালোর অফিস থেকে সিডনি গিয়েছে। কলেজের গ্রুপের বন্ধুদের সাথে তেমন আর বিশেষ যোগাযোগ ছিল না। শুধু মেঘার সাথে নিয়মিত কথা হতো। ও জানতো আমার আর সম্রাটের সম্পর্কের কথা। মেঘার তৎকালীন বয়ফ্রেন্ড, বর্তমানে হবু বর স্বাধীনের বেস্ট ফ্রেন্ড ছিল সম্রাট। মেঘা আর স্বাধীন খুব আঘাত পেয়েছিল এই ঘটনাটির পর। একদিন স্কাইপ কলে আমি আর মেঘা দুইজনে অনেক অনেক কান্নাকাটি করলাম। তারপর "এগিয়ে চলতে হবে, যে আমার সাথে এমন করতে পারল, তার মতো খারাপ কেউ হতেই পারেনা। তার জন্য কান্নাকাটি করতে যাওয়া মানে নিজেকে অপমান করা।" এই সব ভেবে আমি এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করি। হ্যাঁ, চেষ্টা। আজও যখন তিন বছর কোনোরকম যোগাযোগ না রেখেও ওকে দেখে এরকম বুকের মধ্যে আনচান করে ওঠা... সত্যি কি আমি "মুভ অন" করতে পেরেছি? এতই কি সহজ?

৩।

প্রাথমিক ভ্যাবাচ্যাকা কাটিয়ে দুজনেই দুজনকে দেখে হাসলাম।
"কেমন আছিস, আই মিন, কেমন আছেন?" থমকে গিয়ে বললাম আমি।
"ভালো আছি। চলছে এক রকম। তুই? আর হ্যাঁ, প্লিজ আপনি আজ্ঞে করিস না। অদ্ভুত লাগে।" করমর্দন করতে করতে সম্রাট বললো। প্রয়োজনের চেয়ে কি একটু বেশিই সময় আমরা একে অপরের হাত ধরেছিলাম? কে জানে।
ভৈঁরো সিং এর ডাকে আমরা গাড়ির ভিতর ঢুকলাম। দুজনের লাগেজ পিছনে চালান হয়ে গিয়েছে। মাঝের সিটে দুই জানলার ধারে আমরা দুজন। আমার হ্যান্ডব্যাগটা দুজনের মধ্যের  যেন এক প্রাচীর সৃষ্টি করেছে। গাড়ি চলছে মুসৌরির দিকে। জানলার কাঁচ নামানো ছিল আমার দিকে অল্প। ঠান্ডা হাওয়া মুখের ওপর পড়ায় খুব আরাম লাগছিলো। একবার বাঁ দিকে তাকিয়ে দেখলাম, সম্রাট মাফলার বের করেছে নিজের ব্যাকপ্যাক থেকে। আঁটোসাঁটো করে গলায় জড়িয়ে নিচ্ছে।
"জানলার কাঁচ তুলে দেব?" জিজ্ঞেস করলাম।
ও বললো, "না থাক।"
"খবর কী তোর, বল। অফিস কোথায় এখন?"
"এই তো। আপাতত কোম্পানি ইস্টার্ন জোনে এক্সপ্যান্ড করছে। তাই কলকাতায় হেডকোয়ার্টার সামলাচ্ছি।" হাসল সম্রাট।
"ফাইনালি তাহলে কলকাতা গেলি। কেমন লাগছে শহরটা?"
"উম, মন্দ না। এক সময় এত গল্প শুনেছি।"
সেই। কত গল্পই না করেছি আমি। শহরটাকে আমি বড্ড ভালোবাসি। আর তাই তার প্রতিটি আনাচে কানাচে ঘুরিয়েছিলাম সম্রাটকে আমার কথার মাধ্যমে। ভিক্টরিয়া হোক কি ময়দান, কলেজ স্ট্রিট বা গড়িয়াহাট, সল্ট লেক হোক কি বেহালা, পুরো কলকাতা আমার নখদর্পনে। কলকাতার গল্প করতে এত ভালোবাসতাম। কেন কে জানে?
বুঝলাম সম্রাটও সেই একই কথাই ভাবছে। আর তাই অপ্রস্তুতও বোধ করছে। কথায় কথা বাড়ে। আমি কিছু বললাম না। আবার জানলার বাইরে তাকিয়ে রইলাম। দুইবপাশে ঘন সবুজ রাশি। আকাশ পরিষ্কার। এমন নীল আকাশ কতদিন দেখিনা... নৈসর্গিক শোভা বড়ই অপূর্ব। মেঘার কাছে ছবি দেখেছি। আজ চাক্ষুস দেখে যেন আরো মোহাচ্ছন্ন লাগছিলো আমার।
মাঝে একটা জায়গায় আমরা গাড়ি থামালাম। দাঁড়িয়ে গরম গরম চা খেলাম। দেখলাম সম্রাট এখনও বেশি গরম কাপ ধরতে পারে না। কলেজ জীবনে আমার দুপাট্টা জড়িয়ে চায়ের গ্লাস ধরত। আজ দেখলাম স্বাবলম্বী হয়েছে। পকেট থেকে রুমাল বের করে ধরল। পটাপট কিছু ছবি তুলে ওয়াটসঅ্যাপে দিলাম। মেঘার বিয়ে উপলক্ষ্যে বানানো গ্রুপে। কেউ কেউ রিপ্লাই দিল। ওরা আসছে সন্ধ্যেয়। সবার সাথে দেখা হবে পাঁচ বছর পর। কত গল্প বাকি।  আমরা গাড়িতে উঠলাম। ভৈঁরো নিজের পছন্দের নেপালি লোকসংগীত চালিয়ে রেখেছে। কথা যেটুকু বুঝলাম, মনে হলো ভালোবাসার গান। ও নিজেও বেশ ফুরফুরে মেজাজে গুনগুন করছিল। মুখে স্মিত হাসি। দেখে ভালো লাগছিলো আমার।
দু ঘন্টার একটু পর আমরা প্রায় যখন মুসৌরি শহরে ঢুকছি, মেঘার ফোন এলো আমার মোবাইলে। কতদূর এসেছি জানতে চাইলো। বললাম।
"শোন না, তুই কিন্তু প্লিজ আমার ওপর রাগ করিস না সম্রাজ্ঞী। সম্রাটকে কিন্তু আমি ইচ্ছে করে তোর গাড়িতে আনাইনি। ওকে আনতে যে গাড়ির যাওয়ার ছিল, আজ সকালে ওর ড্রাইভার ক্যানসেল করল। আমার আর কোনো উপায় ছিল না। বিশ্বাস কর। সো সরি।" মেঘার কথা শুনে আমি অল্প হাসলাম। "আরে না না। কোনো ব্যাপার না। অসুবিধে হয়নি। তুই চিন্তা করিস না। এই এখনই পৌঁছবো। গিয়ে দেখা হচ্ছে। কান্ট ওয়েট টু সি ইউ উড বি ব্রাইড!"

"আর কতক্ষণ ভৈঁরো?" আমি জিজ্ঞেস করলাম।
"মেমসব, আর পনেরো বিশ মিনিট। জ্যাম নেই ভাগ্যিস আজ।"
বাইরে হাওয়াটা ভালোই বইছে। সবে বেলা আড়াইটা পেরিয়েছে, এরই মধ্যে রোদের তেজ কমতে শুরু করেছে। একটু একটু কুয়াশার চাদর সবে জড়াতে শুরু করেছে পথঘাটকে। আমি হ্যান্ডব্যাগ থেকে স্টোলটা বের করে গায়ে জড়িয়ে নিলাম। দেখলাম সম্রাট আমার দিকে তাকিয়ে। কিছু কি বলবে? আমি কোনো কথা বললাম না। মুখ ঘুরিয়ে নিলাম।
আমাদের গাড়িটা একটা বাড়ির সামনে এসে থামল। বিরাট বাড়ি। গেটে ফুল দিয়ে সাজানো হচ্ছে। লম্বা করে টুনি বাল্ব লাগানো। বুঝলাম এটাই মেঘার বাড়ি। সাজগোজ দেখেই বোঝা যায় যে এটি একটি উৎসবের বাড়ি।
এইবার নামতে হবে। ভৈঁরো সিং নেমে লাগেজ নামাতে গেল। আমিও নামতে যাচ্ছিলামই, এমন সময় সম্রাট আমার হাতটা চেপে আটকালো। আমি অবাক হয়েই তাকালাম ওর দিকে।
"সম্রাজ্ঞী, আই এম ভেরি সরি ফর এভরিথিং। তুই প্লিজ আমায় ক্ষমা করে দিস পারলে। আই নো আই হ্যাভ রংড ইউ।"
আমি তাকিয়েই রইলাম ওর দিকে। তারপর কিচ্ছু না বলে হাতটা ছাড়িয়ে গাড়ি থেকে নেমে এলাম। মুখে চওড়া হাসি। মেঘাও এর মধ্যে এসে গিয়েছে গেটে। এতদিন পর প্রাণের বন্ধুকে পেয়ে ওর গলা জড়িয়ে ধরলাম। পুরোনো কথা নিয়ে ভাবার এখন সময় নেই। আগামী কটাদিন হোক সুন্দর। সেই আশাতেই থাকবো আমি। আর সবচেয়ে বড় কথা। টের পেলাম, সম্রাটের কথায় বা আচরণে আমি আর একটুও বিচলিত হলাম না। হয়তো এই দু ঘন্টার যাত্রাপথটা খুব প্রয়োজন ছিল, আমাদের ক্লোজারের জন্য। কে জানে... ভালো থাকে ভালোবাসা।

Friday, November 9, 2018

ভাইফোঁটা

ছোটবেলা থেকে আজকের দিনটা নিয়ে প্রচণ্ড উৎসাহ থাকত। সপ্তাহখানেক আগে থেকে মা আর আমি বসতাম মেনু ঠিক করতে। ভাত হবে না পি-পোলাউ, নিরামিষে ভাজা মুগ ডাল নাকি মাছের মাথা দিয়ে হবে, এই নিয়ে বিস্তর আলোচনা পর্ব চলত। তবে কিছু আইটেম একেবারে বাঁধাধরা ছিল। ভেটকি মাছের ফিলে দিয়ে ফিস ফ্রাই, মাটন আর জলপাইয়ের চাটনি। দাদাভাই আর মামার আবার মাছের পছন্দ আলাদা। তাই দুই তিন রকমের মাছের ব্যবস্থাও করতে হবে। প্রচুর আলাপ আলোচনার পর মা ফর্দ ধরিয়ে দিত বাবার হাতে। বাবা দুদিন আগে অফিস ফেরতা লেক মার্কেট থেকে মাছ কিনে আনত। আর মা যাদবপুরের একটা নির্দিষ্ট দোকান থেকে পাঁঠার মাংস কিনে আনত।
তখন কত ছোট। মাসে একশো টাকা করে পকেট মানি পাই। সারা বছর ওই জমানো টাকা দিয়ে একে তাকে গিফট কিনে দিই। সেই টাকা দিয়েই দাদাভাইয়ের জন্যও ভাইফোঁটার উপহার নিতে হবে। কী দেওয়া যায়, কী দেওয়া যায়। সেই আবার মা আর আমার ব্রেনস্টরমিং সেশন চলত। তারপর কোন বছর সুতোর কাজ করা পাঞ্জাবি তো কোন বছর অরিফ্লেমের পারফ্যুম। বা কখনও মানি ব্যাগ। যে বছর যেমন সাধয়ে কুলতো। আমার আবার প্রচণ্ড আত্মাভিমান এইসব বিষয়ে। এমনকি ভাইফোঁটার মিষ্টি যেটা দাদাভাইয়ের জন্য কিনব, সেটাও নিজের ট্যাঁক থেকে।
প্রতিপদের দিন বিকেল বিকেল মা আর আমি হাঁটতে হাঁটতে চলে যেতাম লর্ডসের মোড়ে কল্পনায়। কী উপচে পড়া ভিড়। তার মধ্যে থেকে বাছাই করে দাদাভাই আর আমআমর জন্য সাত রকমের মিষ্টি আর নোন্তা কিনতাম। তার মধ্যে ভাইফোঁটা লেখা সন্দেশ আর খাজা মাস্ট! এছাড়াও দুপুরের খাবারের পর লাল দই আর রসগোল্লা সকলের জন্য নেওয়া হত।
ভাইফোঁটার দিন সকাল সকাল উঠে স্নান সেরে নতুন জামা পরে ঠাকুরঘর থেকে চন্দন কাঠ এনে বেটে রেডি রাখতাম। আসন বের করে গুছিয়ে রাখা। বাগান থেকে দুব্বো তোলাটা মা করত, আমার দ্বারা ওইটি হয় না। না খেয়ে ফোঁটা দেবো। এদিকে দাদাভাই এ বাড়ি ও বাড়ি থেকে সবার কাছ থেকে ফোঁটা নিয়ে শেষমেশ আমাদের বাড়িতে আসবে। আমি বারবার ঘর বারান্দা করছি। মোবাইলের যুগে ফোন করে বারবার তাড়া দিচ্ছি। খিদেয় পেট চুঁইচুঁই। প্রতিজ্ঞা করছি, এত কষ্ট পোষায় না। সামনের বছর থেকে প্রতিপদে ফোঁটা দেবো (বরিশালের বাঙ্গাল, আমাদের আসলে প্রতিপদেই ফোঁটা)।
তারপর প্রায় বারোটা নাগাদ মামা মামী ঢুকল, মাসী এসে গিয়েছে আগেই। দাদাভাইও আসছে। শঙ্খধ্বনি, উলু দিয়ে গিফট এক্সচেঞ্জ করে  ঝটপট ফোঁটা পর্ব মিটত। ইতিমধ্যে জেঠু আর বাবা পিসির বাড়ি থেকে ফোঁটা নিয়ে গিফট নিয়ে ফিরে এসেছে। বসত একটা জমাটি আড্ডা। দেড়টা দুটোর মধ্যে খেতে বসা। ব্যাচ করে। হাতে হাতে মাকে সাহায্য করা। খাবার শেষে মামা ঠিক বেরিয়ে স্পেশাল মিঠে পান নিয়ে আসত। পান চিবোতে চিবোতে চলত আরেক প্রস্থ গল্প।  যাদের যাদের ঘুম পেতো, একেকটা ঘরে বিছানা দখল করে ঘুম। চারটের দিকে স্প্রাইট বা থাম্বস আপ। সাড়ে পাঁচটার দিকে চা আর রসগোল্লা।
শীত আসবো আসবো তখন। সাড়ে পাঁচটায়ই ঝুপ করে অন্ধকার নেমে আসত। একে একে মামা মামী, মামণি (মাসী) আর দাদা সবার ফেরার পালা। কোন কোন বছর মামা বাজি নিয়ে আসত। সেই বছরগুলো দাদা আর আমি ওই ফুলঝুরি, তুবড়ি চর্কি জ্বালাতাম। বাড়তি আনন্দ। উপরি পাওনা।
পরেরদিন থেকে স্কুল অফিস সকলের। উৎসব শেষ। মন খারাপের রেশ।

এই বছরেরটা নিয়ে ছয় বছর হল এই ভাইফোঁটায় দাদাভাইকে ফোঁটা দিতে পারলাম না। ওই ওয়াটসআপে শুধু শুকনো মেসেজ করেছি বটে, কিন্তু এই অনুভূতিগুলো আসেই না। সকাল থেকেই তাই ভীষণ মন খারাপ।

Thursday, November 8, 2018

sad ভাইফোঁটা

ভাইফোঁটার দিনে ভাই বোনের ঝগড়া করাটা যেন একটা ট্র্যাডিশন হয়ে গিয়েছে। পাঁচ থ্বেকে পনেরো ছিল সকালে ভাইফোঁটা সন্দেশ আর খাজা নিয়ে কাড়াকাড়ি আর তারপর দুপুরে খেতে বসে মাটনের পিস আর ফিস ফ্রাই খাওয়া নিয়ে কম্পিটিশন।
দিন বদলায়। বছরের পর বছর কেটে যায়। ঝগড়া থামে না। শুধু পাল্টে যায় কারণ।
মধ্যবয়স্ক দুই ভাই বোন আজও ঝগড়া করে। মায়ের মান্তাসা চন্দ্রহার কে ভাগে পাবে, এই নিয়ে...

ভাই-জোনড

তন্ময়, শুভ্র, আকাশ, দেবারুণ এক্কেবারে যাকে বলে সেই হাফ প্যান্টের বয়স থেকে বন্ধু। এক স্কুল এক পাড়া। সৌভাগ্যবশত কাজের সূত্রেও চারজনই এখনও কলকাতায় আর তাই নিয়মিত আড্ডা বসে ওদের পাড়ার মোড়ের পান সিগারেটের দোকানে। সেরকমই এক আসর আজও বসেছে। কালীপূজো দেওয়ালি শেষ। পরশু থেকে আবার সব অফিস। সকলেই প্রায় মনমরা। ব্যতিক্রম দেবারুণ। বাকিরা দেখছে দেবা সেই আসা ইস্তক ফুরফুরে মেজাজে আছে। মন মেজাজ দিব্যি ভালো। এতটাই ভালো যে কিপ্টে বলে বদনাম যার, সেই দেবাই আজ বাকিদের লেমন সোডাও খাওয়াল। শুভ্র তন্ময় আর আকাশ একে অপরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করছে। বলি হল টা কী ওদের বন্ধুর?
শেষমেশ শুভ্র আর থাকতে না পেরে জিজ্ঞেস করেই ফেলল, "দেবা ব্যাপার কী রে? আজ এত উড়ছিস? কী কেস? ঝুম্পা গ্রিন সিগনাল দিল নাকি?" ঝুম্পা দেবারুণের কলিগ। এই সুন্দরী মেয়েটিকে বেশ কিছু মাস ধরেই পটানোর চেষ্টা করছে দেবা। বন্ধুরা নিয়মিত আপডেট পায় অবশ্য। এখনও অবধি তেমন আশার কিছু দেখেনি।
দেবা একটু লাজুক মুখ করে হেসে বলল, " হ্যাঁ মানে মনে তো হচ্ছে তাই।"
"আরেএএএএ ভাই ভাই ভাই..." বাকি তিনজন পিঠ চাপড়ে "কী ব্যাপার, কী হল, কী করে হল"  ইত্যাদি প্রশ্নবাণ হানল দেবারুণের দিকে।
দেবা সেই একইরকম লাজুক লাজুক মুখ করে বলল, "সেদিন আমি ওর টিফিনের মাংস টেস্ট করে এত প্রশংসা করেছিলাম, ও বলেছিল একদিন বাড়িতে নেমন্তন্ন করে খাওয়াবে। তা একটু আগে মেসেজ করলো, বলল কাল ও নাকি অনেক রান্নাবান্না করবে। আমায় যেতে বলল ওর বাড়ি। খাওয়াবে।"
শুভ্র আকাশের দিকে, আকাশ তন্ময়ের দিকে আর তন্ময় শুভ্রর দিকে তাকাল। বেশ সিরিয়াস মুখ করেই। তারপর রীতিমত একই সাথে তিনজনে বলল, "ভাই তুই তো গেলি।"
দেবারুণ অবাক হয়ে বলল, "মানে? কী কেস?"
"ভাই, বুঝছিস না। কাল ভাইফোঁটা রে।"
"তো?"
"আরে এত রেঁধে বেড়ে তোকে ভাইফোঁটার দিনে বাড়িতে ডাকছে। বুঝছিস না? ভাই, তুই তো গেলি..."বলতে বলতে প্রবল অট্টহাসিতে ভেঙ্গে পড়ল ওরা তিনজন। আর দেবারুণ? ওর মুখটা যেন ঠিক চুপসানো ফানুস একটা। 

Monday, November 5, 2018

দীপ্তি

রাত্তির প্রায় আটটা। প্লেনটা গত দশ মিনিট ধরে কলকাতা এয়ারপোর্টের ওপর চক্কর কাটছিল। এয়ার ইন্ডিয়ার ফ্লাইটের উইন্ডো সিট থেকে তিলোত্তমা শহরটিকে দেখে গুঞ্জার মনে হচ্ছিল যেন একটা দামী নেকলেস। ঠিক যেরকম দেখেছিল ও মা, আশাবরীর কর্মস্থলে। কালীপুজোর আগে কয়েকদিন দোকানে খুব ভিড় থাকত, মায়ের ফিরতে অনেক দেরি হত। দিদিমার কাছে বসে স্কুলের পড়া শেষ করে বারান্দায় বসে গল্প শুনত, যতক্ষণ না মা ফিরছে। রূপকথার গল্প শুনতে শুনতে ছোট্ট গুঞ্জা পৌঁছে যেত সব পেয়েছির দেশে। ওর বাস্তবের সাথে দেখানে অনেক অমিল।
আশাবরীর সাথে আবীরের প্রেমজ বিয়ে হয়। মধ্যবিত্ত ঘরের সুশ্রী তন্বী আশার সাথে আবীরের পরিচয় একটি জন্মদিনের পার্টিতে। আবীরের ভাগ্নির জন্মদিন। আশাবরী ছিল ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানির লোক। আবীরের পরিবার মধ্যবিত্ত ঘরের শ্যামলা মেয়েকে প্রথমে মানতে নারাজ হলেও পরে ছেলের জোরাজুরিতে বাধ্য হয় বিয়েতে মত দিতে। বছর খানেকের পর যখন আশার কোল জুড়ে গুঞ্জা আসে, শ্বশুরবাড়ির লোকজন রীতিমতো ছি ছি করেছিল। একেই মেয়ে, তার ওপর মায়ের মতোই শ্যামলা। এক বস্ত্রে সদ্যোজাত মেয়েকে নিয়ে আশা বেরিয়ে আসে সেদিন। আশ্রয় পায় নিজের মায়ের কাছে।
একা হাতে চাকরি করে সংসার চালাত আশাবরী। কোনদিনও মেয়ের লেখাপড়ায় কোন কমতি করেনি। যথাসাধ্য শখ আহ্লাদ পূর্ণ করেছে। তবে গুঞ্জা বুঝত মায়ের দুঃখ। মায়ের সংগ্রাম। আর তাই ছোট্টবেলা থেকেই গুঞ্জার তেমন আবদার ফরমায়েশ ছিল না।  বছরের পর বছর ধন্তেরসের দিন মা গল্প করত সেদিন দোকানের বিক্রির কথা। সামর্থ্যের মধ্যে হয়তো কোন বছর জুটত রূপোর দুল। কখনও হয়তো এক কুচি সোনার ফুল।
গুঞ্জা এখন সুপারমডেল। একের পর এক মঞ্চ কাঁপিয়ে বেড়ায়। দেশে বিদেশে। বর্তমানে দেশের এক জনপ্রিয় গয়নার দোকানের ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসাডর। শহরের আনাচে কানাচে ওর ছবি দিয়ে বিজ্ঞাপন। বিভিন্ন গয়না পরে, বিভিন্ন পোশাকে, বিভিন্ন ভঙ্গিতে।
আজ ধন্তেরস।  গুঞ্জা আজ মায়ের জন্য ওর বিজ্ঞাপনে পরা সবচেয়ে পছন্দের সেটটি কিনে এনেছে। মায়ের গলায় পরিয়ে তবে শুরু হবে ওর আলোর উৎসব। মায়ের চোখে মুখে যে দীপ্তি দেখবে ও, সেটাই ওর পরম প্রাপ্তি।

Friday, November 2, 2018

SRK and me


একদম ছোটবেলায় যখন প্রথম "জাদু তেরি নজর" শুনি/দেখি, তখন থেকেই লাভ (মানে ওইটুকু বয়সে আদৌ লাভ কী, বোঝা যায় না কি?) অ্যাট ফার্স্ট সাইট। নিজেকে তখন ওঁর হিরোয়িন ভাবতাম। সবাইকে বলতাম, আমার নাম জুহি চাওলা গুপ্ত!!

বাড়িতে কেবিল টিভি ছিল না। তাই রবিবারগুলো হাওড়ায় মাসির বাড়ি যাওয়ার হলেই মুখিয়ে থাকতাম। দুপুর দুটোয় লোকাল কেবিলে তখন সদ্য রিলিজ হওয়া সিনেমাগুলো দিত। মনে আছে একবার পরদেশ সিনেমাটি দেখি। যদিও ওই মারামারি রক্তারক্তি একদম দেখতে পারি না, তবুও ওই "দো দিল মিল রহে হ্যায়" শুনলে বা দেখলেই কেমন ভেবলে যেতাম।

স্কুলে বন্ধুদের দৌলতে তার পরে পরেই কুছ কুছ হোতা হ্যায়, কভি খুশি কভি ঘম এই সিনেমাগুলির কথা শুনলাম। তখন রেডিওতে ওই সিনেমার গান আর নিউজপেপার ম্যাগাজিনে হাঁ করে ছবি গিলে গিয়েছি। আনন্দলোকের পূজাবার্ষিকীগুলোতে গল্প উপন্যাসের চেয়ে গ্লসি কাগজে এস আর কের ছবিগুলো মন্ত্রমুগ্ধের মতো দেখতে থাকতাম।

ক্লাস ইলেভেন পড়াকালীন স্কুল এক্সকারশানে ভাইজাগ গিয়েছিলাম। সেদিন রাত্রে আমাদের ক্যাম্প ফায়ার গোছের কিছু হওয়ার কথা ডিনারের পর। কেউ একজন হোটেলের ঘরে টিভি চালিয়ে দেখেছে ম্যায় হু না হচ্ছে। ব্যস। ঘরে ঘরে খবর পৌঁছে গেল। আমি যত তাড়াতাড়ি পেরেছি ঘরে এসে সিনেমা দেখেছি। একেই শাহরুখ, বাড়তি পাওনা দার্জিলিং।

প্রথম ডেস্কটপ কম্পিউটার আসে হায়ার সেকন্ডারির পর। হ্যাপি কোইন্সিডেন্স, যিনি অ্যাসেম্বল করেছিলেন, মিউজিক ফোল্ডারে চলতে চলতে সিনেমার সব গান দিয়েছিলেন। তখন সদ্য ইন্টারনেটে অভ্যস্ত হচ্ছি। ওয়েবসাইট থেকে গান ডাউনলোড করছি আর ফোনে ট্রান্সফার করছি। তখনও স্মার্টফোন আসেনি, সিম্বিয়ানে চলে। বলা বাহুল্য, সবই ভদ্রলোকের সিনেমার।

কী বা করি আর? ওই যে স্বদেশের মোহন ভারগব হোক বা চক দে ইন্ডিয়ার কবীর খান, কুছ কুছ হোতা হ্যায় হোক বা চেন্নাই এক্সপ্রেস... হাল্কা হেসে গালে টোল পড়া আর ওই ultimate romantic চাউনি... loveriaর শিকার না হয়ে থাকা যায়?

অন্তত একবার আমার দিকে ওরকম ভাবে তাকাক... জিন্দেগি আপনে আপ হসীন হয়ে যাবে...

SRK

১।

ক্লাস এইটের টিনার আজ বেশ মন খারাপ। আবার স্কুল খুলেছে পুজোর পর। এই এক মাস বাড়ি বসে দিব্যি শাহরুখ খানের সিনেমা দেখত। এখন আবার ওই টাইম অ্যান্ড ডিস্টেন্স আর কারেন্টস অফ দি প্যাসিফিক ওশেনের বোরিং ক্লাস। প্লেলিস্টে এস আর কের গান চালিয়ে ইয়ারফোন কানে ক্লাসরুমে নিজের পছন্দের ফ্রন্ট রো সিটে ব্যাগটা রাখতে গিয়ে দেখল একটি ছেলে বসে রয়েছে। নতুন স্টুডেন্ট নাকি? একে তো কখনও দেখে নি?
টিনা কিছু বলল না। ইয়ারফোনটা খুলে ব্যাগটা নিয়ে অন্য বেঞ্চের দিকে যাচ্ছিলই, ঠিক তখন ওর হাতটা ধরে আটকাল ছেলেটি। টিনা পিছন ফিরে তাকালো। হাসি মুখে ওর দিকে তাকিয়ে আছে এটা কে? সেই একইরকম টোল গালে, চুলটা হাল্কা উসকো খুস্কো।
বন্ধুত্বের হাতটা এগিয়ে বলল, "I'm Rahul...নাম তো সুনা হোগা!"
মুহূর্তেই টিনা শুনতে পেল সেই বিখ্যাত ম্যান্ডোলিনের টুং টাং। 



২।

বছর তেইশের রাজীব থাপা আর পাঁচটা নেপালী ছেলের মতোই। স্কুলের গণ্ডী পেড়িয়ে এখন মা আর মাসীর সাথে ক্ষেতি করেই দিন চলে। গান পাগল ছেলেটি  রাত্রে খাওয়ার পর খোলা আকাশের নিচে প্রিয় গিটার হাতে বলিউডের গান গায় গলা ছেড়ে। ওদের পাশের বাড়ির কাকীমারা নিজেদের বাড়িটাকে ইদানীং হোমস্টে হিসেবে ভাড়া দিচ্ছে। সেখানেরই কিছু বাবুরা রাজীবের গান শুনে এক্কেবারে মুগ্ধ। ওদের নাকি কলকাতায় হোটেল আছে। বলেছে ওকে হোটেলে গান গাইবার সুযোগ দেবে। নিয়মিত টাকা আসবে।
দার্জিলিং মেল থেকে হাওড়া স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে পা রাখল রাজীব। সাদা ফুল শার্ট, কালো কোট আর কালো প্যান্ট পরে। মধ্যে মধ্যে ওর মা ওর দিকে মুগ্ধ দৃষ্টিতে দেখছে। সাধের "রাজু বন গয়া gentleman!"


৩।

চায়ের দোকানের পল্টু ভারি হাসি খুশি ছেলে। বয়স ওই বারো তেরো। সকালবেলা মিউনিসিপ্যালিটির স্কুলে পড়াশোনা করে। দুপুর থেকে বাবার দোকানে হাতে হাতে কাজ এগিয়ে দেয়। একটা আদ্যিকালের কালো রেডিয়োতে সারাক্ষণ বেজে চলেছে হিন্দি বাংলা গান। শুনে শুনে পল্টুর সব মুখস্থ। শারুখ খানের গানগুলো ওর হেব্বি লাগে।  রেডিওর অফিসটা আবার ওদের দোকানের পিছনেই। কতবার ওই দাদা দিদিগুলোকে ও চা পৌঁছে দিয়ে এসেছে। কী রংচঙে আপিস। সবাই কী হাসিখুশি। পল্টু এক দুবার কাঁচের দরজার এপার থেকে দেখেছে কেমনভাবে মাইকের সামনে দাদা দিদিগুলো কথা বলে।ও যদি এমন সুযোগ পেতো...

শিশু দিবস উপলক্ষ্যে এই রেডিওর দিদি দাদাগুলো নাকি পল্টুর মতো ছেলে মেয়েদের সেই সুযোগ দেবে। ওরা মানে যারা লেখাপড়ার সাথে সাথে কাজকর্মওকরে, তাদের নিয়ে নাকি অনুষ্ঠান হবে। পল্টু বেজায় খুশি। ওকেও শোনা যাবে রেডিওতে।

বেশ ফিটফাট হয়ে পল্টু রেডিওর আপিসে গিয়েছে আজ। নিচে ওর বাবা রেডিওর একদম সামনে বসে আছে। অধীর অপেক্ষা। যে কোন মুহূর্তে ওর গলা শোনা যাবে। শুনতে পেল এক দিদির গলা, "তোমার নামটা বলো?"
আর তারপরেই বহু প্রতীক্ষিত সেই কণ্ঠ।
"আমায় সবাই পল্টু বলেই চেনে। কিন্তু আমার একটা ভালো নাম আছে। রাহুল। নাম তো সুনা হোগা?"


৪।

ইশ, কী কুক্ষণে যে ফোনটা চার্জ করতে ভুলে গিয়েছিল, চারজারটাও কাজ করছে না। ট্রেনের ভিতরে বসে টেনশন করতে লাগল সিমি।  ইউরেল চেপে জুরিখ যাচ্ছে। অ্যানা থাকে। তবে হঠাৎ প্ল্যান বদল করে একদিন আগেই সিমি পৌঁছে যাচ্ছে। অ্যানাকে জানানো হয়নি। তাড়াহুড়োয় ভেবেছিল ট্রেনে উঠে জানিয়ে দেবে। এখন এই বিপত্তি। কী করে কী করবে ও জুরিখে? বড্ড চিন্তা হচ্ছে। ওর কামরাটাও একদম ফাঁকা। কারুর থেকে যে ফোন বা চারজার চাইবে, সেই উপায়ও নেই। এক্কেবারে কাঁদো কাঁদো অবস্থা ওর।

ট্রেন ছুটছে সুইজারল্যান্ডের ভিতর দিয়ে। অপূর্ব প্রাকৃতিক শোভা। এদিকে সিমির সেদিকে চোখ নেই। সানেন স্টেশনে এক যুবক উঠল ওর কামরায়। দেখে তো ভারতীয়ই মনে হল। চোখে কালো চশমা, সাদা শার্টের ওপর গাঢ় নীল জ্যাকেট, স্কাউ ব্লু জিন্স, পিঠে ব্যাকপ্যাক।
ওর উল্টোদিকের সিটে জানলার ধারে বসল। সিমির দিকে তাকিয়ে একবার হাসল।
"এক্সকিউজ মি, ডু ইউ হ্যাভ আ মোবাইল চারজার? মাইন ইস নট ওয়ার্কিং। অ্যান্ড আই নিড টু মেক আ ভেরি ইম্পরট্যান্ট কল টু মাই ফ্রেন্ড ইন জুরিখ। মাই ফোন ইস ডেড", বলল সিমি।
"koi baat nahin senorita.. bade bade desho mein aisi chhoto chhoti baatein hoti rehti hain..."


৫।

প্রাইমারি স্কুলের খেলার মাঠ। টিফিন পিরিয়ডে ছেলেরা দৌড়ঝাঁপ করছে। আজও গাবলু ছোঁওয়াছুঁই খেলায় অক্রমের নাগাল পেল না। উফ, কী জোরে ছুটতে পারে ছেলেটা। কী দম।
"ঠিক আছে। থাম অক্রম। আমি আর ছুটতে পারবো না।"
"দেখলি তো, আজও ধরতে পারলি না আমায়?"
গাবলু একটু হেসে বলল, "জানি তো। ডন কো পকড়না মুশকিল হই নহি, না মুমকিন হ্যায়!"