Sunday, March 8, 2020

"থাপ্পড়" সিনেমাটি দেখেছেন? আমার দেখা হয়নি। তবে ট্রেলার দেখেছি। পারলে দেখবেন। খুব প্রয়োজন। আপাতত তিনটি ঘটনা বলি যখন এই থাপ্পড়টা খুব জরুরি।

থাপ্পড়
সুচেতনা

(১)
বিতান, অভ্র, রঞ্জিত, সুকোমল সেই কোন ছোট্টবেলা থেকে বন্ধু, যাকে একেবারে বলে "চাড্ডি বাডিজ"। একই স্কুলে লেখাপড়া করেছে। তবে বর্তমানে কলেজ আলাদা। বিতান ফোর্থ ইয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ছে ব্যাঙ্গালোরের কলেজে, অভ্র কোনো এক আই আই টিতে এম এস সি ফার্স্ট ইয়ার, রঞ্জিত হলদিয়াতে মেডিকেল থার্ড ইয়ার আর সুকোমল মাস কম পড়ছে কলকাতাতেই। আপাতত হোলির ছুটিতে চার বন্ধু একসাথে। অনেকদিন পর। আড্ডা জমেছে শহরের এক বিখ্যাত শপিং মলের ফুড কোর্টে। এদিক সেদিক নানান গল্পই চলছে। তবে মাঝে মধ্যেই এক কমন টপিক বারবার উঠে আসছে। তাদের চারজনের জীবনেই কোনো বিশেষ বান্ধবীর অভাব।
বি: ধুর, ফোর্থ ইয়ার হয়ে গেল। গিটার গাঁজা কিছুই বাদ দিলাম না। প্লেসমেন্টেও চাকরি জুটে গেল। কিন্তু গার্ল ফ্রেন্ড? ধুর ধুর। আমার কপালে ওই আনন্দবাজার নাচছে।
র: শোন ভাই, ওসব মেয়ে ফেয়ে নেই লাইফে, অনেক শান্তিতে আছিস। বুঝেছিস?
সু: কেন বে? নিজে ব্যাটা সারাদিন এনাটমি ক্লাসে জমিয়ে অঙ্গ প্রত্যঙ্গ দেখছো সব, তোমার ভাই লাগে না। কিন্তু আমাদের তো লাগে। নাকি? কীরে অভ্র, চুপ করে কেন, বল? কাহাতক আর পোস্টার দেখে কাজ সারতে ভাল্লাগে বল তো?
অভ্র কোনো উত্তর দেয়না। চুপচাপ বসে শোনে ওদের কথা।
বি: সুকোমল ভাই একদম রাইট কথা বলেছিস। রঞ্জিত তো সারাদিন ওই ক্যাডাভার ঘাঁটে। ওর আর কী বল। রাত্রে ওতেই চলে যায়। আমাদের বাপু জীবনে ওই জন্যই শপিং মল লাগে। ওই দেখ, দেখ, দেখ। ওই যে। ওই যে ওই পিঙ্ক হট প্যান্ট পরা চিংকিটাকে দেখ। দেখেছিস? পুরো মাখন ভাই, মাখন।
সু: হ্যাঁ। উফ ঠিক যেন ভিটের ক্যাটরিনা। কী ঠ্যাংখান ভাই। আঃ।
র: তোরা চুপ করবি? তখন থেকে বাজে কথা বলেই যাচ্ছিস। লিমিট ক্রস করছিস কিন্তু।
বি: ওই যে বললাম, আমাদের কষ্টটা তুই আর কী বুঝবি বল। তুই রোজ ঘাঁটিস হিউম্যান ঠ্যাং। আর আমাদের কপালে জোটে ম্যাক্সিমাম ওই কে এফ সির ঠ্যাং। আর সাইডে একটু আধটু ওই চিংকি মামনিগুলো। তুই আর কী বুঝবি ভাই, প্রিভিলেজড মানুষ। কীরে অভ্র, বল?
অভ্র আর চুপ থাকতে পারে না। রাগে ওর কান লাল হয়ে গিয়েছে। ও উঠে দাঁড়িয়ে সুকোমল আর বিতানের গালে দুটো থাপ্পড় মারে, জোরে। "যেদিন তোরা ভালো মানুষ হবি, সেদিন আসবি কথা বলতে", এই বলে উঠে চলে যায় টেবিল ছেড়ে। বাকি তিন বন্ধু সাময়িক ভাবে বিহ্বল হয়ে গেলেও তারপর একে অপরের মুখ চাওয়াচাউই করতে থাকে। ওরা জানে না, অভ্র, যে কিছু মাস আগে অবধিও ওদেরই মতন ছিল, কয়েক সপ্তাহ হল বদলে গিয়েছে। বদলটা অবশ্য বাধ্য হয়েই। নিজের বোনের মলেস্টেশনের পর মানসিক রুগীতে পরিণত হওয়াটা স্বচক্ষে দেখে।

(২)
নয়নিকা আর দীপাঞ্জনের বিয়েটা দুই বছর পূর্ণ করেছে সদ্য। কাগজ দেখে সম্বন্ধ করেই বিয়ে। পাল্টি ঘর। সবাই জানে, বেশ আনন্দেই আছে ওরা। হ্যাঁ, এমনি সবই ঠিকঠাক। শুধু ওই মাঝে মাঝে দীপ অফিস থেকে ফেরে মদ খেয়ে। নেশায় চুর। আর তখন কাণ্ডজ্ঞান থাকে না কোনো। নয়নিকা কিছু বলতে গেলেই তখন জোটে অকথ্য ভাষায় গালাগালি। আর মার। এ ছাড়া অবশ্য মাঝে মাঝে নয়নিকার ইচ্ছের বিরুদ্ধে গিয়ে শারীরিক মিলনও ঘটে। নয়নিকার হাজার বারণ, কাকুতি মিনতি তখন হয়ে যায় "বাহানা"। সমস্ত "পৌরুষ" ঢেলে নিজের "অধিকার" ফলায় দীপ। নয়নিকা একেই নিজের ভাগ্য বলে মেনেই নিচ্ছিল। ঠিক যেমন ছোট থেকে শিখে এসেছে, মেয়েরা মানিয়ে নেয়। স্বামীই দেবতা। পুরুষ মানুষ। একটু আধটু ওরকম করতেই পারে। প্রায় যখন অভ্যেস করেই ফেলছিল ও, হঠাৎই স্কুলের বন্ধুদের গ্রুপ থেকে পুনরায় যোগাযোগ হয় পারমিতার সাথে। পারো উকিল। ডোমেস্টিক ভায়োলেন্স বিষয়ে একদিন একটা পোস্ট শেয়ার করার সূত্রেই ওর সাথে নয়নিকার আলাদা করে কথা হয়। নয়নিকা আস্তে আস্তে বুঝতে শেখে যে এগুলি ওর প্রাপ্য নয়। রুখে দাঁড়াতেই হবে ওকে। অর্থনৈতিক স্বাধীনতা থাকুক কি না। আর তাই সেকেন্ড এনিভার্সারির দিন রাতেও যখন দীপাঞ্জন নেশা করে এসে মারতে যায় নয়নিকাকে, নয়নিকা উল্টে একটা পাল্টা থাপ্পড় মারে দীপের গালে।
ঘটনার আকস্মিকতায় দীপ থমকে যায়। নেশা তখন কেটে গেছে। অবাক সে। ওর এই নরম বউ ওকে মারতে পারলো? আঁতে ঘা লাগে ওর। পার্স আর একটা ছোট ব্যাগ গোছানোই ছিল। হাতে নিয়ে গটগট করে বেরিয়ে যায় নয়নিকা বাড়ি থেকে। মুক্তির সন্ধানে।

(৩)
শর্মী আর ওর  পাঁচ বছরের মেয়ে পুপাই এই কিছু মাস হলো এসে থাকছে নেস্ট হাউজিংয়ের তিনতলার এই ফ্ল্যাটে। ওদের ঘিরে পাড়া প্রতিবেশীর অপার কৌতূহল। কেন বাড়িতে কোনো পুরুষ মানুষ স্থায়ীভাবে নেই, বাড়িতে কখন কে এলো গেল, সব ব্যাপারেই সকলের বড়ই জিজ্ঞাসা। অনেকে তো আবার কেন মিত্তিররা ওদের ফ্ল্যাট ভাড়া দিলো, এই নিয়েও নানান মতামত রেখেছেন।
শর্মীদের এই ফ্ল্যাটে আসার পর আজ প্রথম জেনারেল বডি মিটিং। এমনিতেই ওর ইচ্ছে ছিল এই সুবাদে বিল্ডিংয়ের সকলের সাথে আলাপ পরিচয় করবে, তা ছাড়া সিকিউরিটি, জলের ব্যবস্থা এসব নিয়েও জিজ্ঞাস্য ছিল কিছু। তাই শর্মী এসেছে মিটিংয়ে। কিন্তু এসে যে এমন কিছু ঘটবে, সেটা এই একবিংশ শতাব্দীর কলকাতাতে বসে ও আশা করেনি। কী হলো? শুনুন তাহলে।
মিস্টার দত্ত, হাউজিংয়ের সেক্রেটারি, প্রথমেই শর্মীর সাথে সকলের পরিচয় করালেন। তারপর পরবর্তী এজেন্ডাতে যেতে যাবেন, এমন সময় বাধ সাধলেন শর্মীর উল্টোদিকের ফ্ল্যাটের সিনিয়র মিসেস সিনহা। "আচ্ছা, শর্মী, তুমি একা থাকো কেন?" শর্মী একটু তাকালো, এইসব প্রশ্নে ও অভ্যস্ত। তাই হেসেই উত্তর দিলো, "না তো মাসিমা। আমি আমার মেয়ে পুপাইকে নিয়ে থাকি।" মিসেস সিনহাও দমবার পাত্রী নন। উনি বললেন, "না মানে তোমার হাজব্যান্ড? উনি কোথায়?" শর্মী মাথা ঠান্ডা রেখেই বললো, "নেই।" মিসেস সিনহা অবাক। বললেন, "নেই মানে? উনি কি মারা..." শর্মী ওকে থামিয়ে বললো, " না না। বহাল তবিয়তে বেঁচে আছেন। আমরা ডিভোর্স নিয়েছি, তিন বছর হলো।" ব্যস। এইবার যেন মিসেস সিনহা লোপা বল পেয়েছেন, ঠুকে ওভার বাউন্ডারি। বললেন, "ও মা। সে কী, ডিভোর্স কেন, কী সমস্যা?" শর্মী ঠান্ডা গলায় উত্তর দিলো, "ওটা পার্সোনাল।" মিসেস সিনহা ছাড়বার পাত্রী নন। বললেন, "নিশ্চয়ই তোমার কোনো এফেয়ার টেফেয়ার..." ওর কথা শেষ করতে না দিয়েই হঠাৎ কোণ থেকে এতক্ষণ বিরক্ত হয়ে চুপচাপ শুনে যাওয়া, ওরই পুত্রবধূ, স্বাগতা সিনহা বলে উঠলো, "মা, অন্তত ওর সেই সাহসটা আছে, একসাথে থাকা যাচ্ছিল না বলে বেরিয়ে এসেছে। অন্তত আমার চেয়ে ভালো আছে। প্রতিদিন আপনার ছেলের ওই লুচ্চামি, নোংরামি সহ্য করে আছি শুধুমাত্র সাহসের অভাবে। ও অন্তত নিজের মতো করে বাঁচছে। কে কী বলবে, তা পাত্তা দেয়নি। আর এফেয়ারের কথা বলছেন, আপনার ছেলেকে একবার ফিরে গিয়ে জিজ্ঞেস করবেন তো, আজকাল উনি কার সাথে এফেয়ার করছেন? মিস রুহি না মিসেস মিত্র?"
উপস্থিত সকলে চুপ। কারুর মুখে একটা কথা নেই। শব্দের থাপ্পড়টা ভালোই খেয়েছেন সিনিয়র মিসেস সিনহা।

Friday, March 6, 2020

হোম মিনিস্টার

শনি আর রবি, এই দুদিন বাড়ির সবার আলাদাই আনন্দ। সারা সপ্তাহ অফিসের ঘানি টানার পর পরপর দুদিন শুধুই আরাম আর আলস্য। এই দুটোদিন বাকি পাঁচদিনের মত সকাল ছটার অ্যালার্মে ঘুম না ভাঙলেও চলে। নাকে মুখে কিছু একটা গুঁজে শেয়ার ক্যাবে চেপে অফিস পৌঁছাও, তারপর সারাদিন কীবোর্ডের দিকে তাকিয়ে লাইনের পর লাইন হয় কোড লেখো, নয় ভুল সংশোধন করো। তারপর আবার সন্ধ্যে হলে সেই অ্যাপ ক্যাবের সার্‌জ। সব মিলিয়ে সোম থেকে শুক্র, একটুও শান্তি নেই, নেই অবসর। তবে হ্যাঁ, স্নিগ্ধার অবশ্য যাহাই শনি তাহাই সোম। বরং শনি রবি বাড়তি কাজই বটে। এই যেমন, দুধওয়ালা ঠিক সেই ছটাতেই দুধ দিয়ে যাবে, সাড়ে সাতটাতে ময়লা নেওয়ার গাড়ি এসে উইস্‌ল বাজিয়ে যাবে। তারপর আটটার মধ্যে নিরুদি আসবে বাসন মাজতে। না এলে তো আরোই চিত্তির। শুক্রবার, উইকেন্ড শুরু, একটু বেশীমাত্রাতেই রান্না খাওয়া হয়েছে। সিঙ্ক্‌ ভর্তি এঁটো বাসন। সব মাজতে হবে। স্বামী ইন্দ্রজিৎ আর কন্যা পুপ্লুর ঘুম ভাঙতে ভাঙতে সাড়ে নটা, এর মধ্যেই তাই মুখরোচক নাস্তাও তৈরি করতে হবে। নইলে তো আবার পুপ্লুর বাক্যবাণ ধাঁ করে এসে বিঁধবে। "সারাদিনই তো বাড়ি বসে থাকো। এত কুকারি শোজ্‌ দেখতে থাকো। এদিকে রান্নার সময় সেই একঘেয়ে রান্না। দুটোদিন একটু আয়েস করে খাবো দাব, তাতেও যদি সেই ব্রেকফাস্ট টেবিলে বসে বাটার টোস্ট নয় একঘেয়ে লুচি আলুর চচ্চড়ি পাই, ভালো লাগে বলো? উঁহু। জাস্ট ভাল্লাগেনা। একটু ইউনিক্‌ কিছু তো করতে পারো।" পাশ থেকে ইন্দ্রও সায় দেবে, "হ্যাঁ স্নিগ্ধা, রোজ তো অফিসে টিফিনে পাউরুটি আটা রুটি নয় রবারের সোলের মত ঠাণ্ডা লুচি চিবোই। একটু অন্যরকম কিছু করো প্লিজ?" অগত্যা, সব্জি চিকেন ডিম ময়দা সব নিয়ে তোড়জোড়, রাজকীয় ব্রেকফাস্ট বানাও। পুপ্লু আর ইন্দ্রর সারা সপ্তাহের ছাড়া জামাকাপড় মেশিনে দাও, এরই মধ্যে দুপুরের খাওয়ার আয়োজন। বলাই বাহুল্য, সেখানেও চাই "ভেরিয়েশন'। নইলে একগাদা টাকার শ্রাদ্ধ করে জোম্যাটো। মাগ্যিগণ্ডার বাজার। হিসেব করে চলতে হয়। সবদিক সামলাও। কাজের লোকের মাইনে, সংসারের খরচ, দেওয়া থোওয়া। সব হিসেব তো ম্যাডাম স্নিগ্ধাকেই করতে হয়। বাড়ির লোক তো মাসের শুরুতে থোক টাকা ধরিয়েই খালাস।  জামাকাপড় কাচা চলাকালীনই দুপুর আর রাতের রান্নার ব্যবস্থাটাও করে ফেলতে হয়। শনি রোব্বার মানেই হয় বাড়িতে গেস্ট, নয় নিজেরা কারুর বাড়ি যাওয়া। বা শপিং মলে ঘুরে বেরানো। নইলে সিনেমা থিয়েটার। বয়স যে হচ্ছে, তা স্নিগ্ধা আজকাল ভালোই টের পায়। আগে এত কাজ দিব্যি সামলে নিত, আজকাল অল্পেই হাঁপ ধরছে। হাঁটুর ব্যথাও জানান দিচ্ছে মাঝে মধ্যেই। পঁয়তাল্লিশেই শরীর ভাঙতে শুরু করে দিয়েছে। নিয়মিত আজকাল বাড়িতে ব্যায়াম করছে বটে, পুষ্টিকর খাওয়া দাওয়াও করছে। কেউ দেখবে না, খোঁজ নেবে না। নিজেরটা নিজেকেই বুঝে নিতে হবে। নিজের যত্ন নিজেকেই করতে হবে। যানে স্নিগ্ধা। বোধহয় এবার পরিশ্রমটা একটু একটু করে কমাতে হবে। চাকরিরত হলে চিন্তা ছিল না।  ষাটের পরই রিটায়ারমেন্ট। কিন্তু এই চাকরিতেতো আবার সেই বালাইও নেই। কায়দা করে "ডেজিগ্‌নেশন" দেওয়া আছে বটে, "হোম মিনিস্টার" নাকি "হোম ম্যানেজার"। হাসি পায় স্নিগ্ধার মাঝে মাঝে। এইসব যত গাল ভরা নাম। সবই "গিমিক"। কিছু প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক লাভের জন্য আর কিছু ওই সমাজের জন্য। বেশ এরকম নাম ধাম দিয়ে বিনে পয়সায় কাজ করইয়ে নেওয়া যায়। ওই বছরে কিছু বিশেষ বিশেষ দিনে, যেমন উইমেন্‌স্‌ ডে, মাদার্‌স্‌ ডে, এইসব দিনে যা একটু আধটু উদযাপন হবে। ব্যস। তারপর সারা বছর সেই যে কে সেই। নাহ, উইকেন্ড মোটেই ভালো লাগেনা স্নিগ্ধার।

চাই না বাপু এই দুদিনের উদযাপন, চাই না এই "গিমিক"। তার চেয়ে শুধু আর বাকি সদস্যদের মত প্রাপ্য সম্মান, কাজের স্বীকৃতি ও প্রাপ্য অবসর দাও, এতেই হবে। এইটুকুই তো চায় স্নিগ্ধা, স্নিগ্ধারা। পাবে না ওরা? 

Saturday, February 22, 2020

দ্য লাস্ট লিফ

গ্রিনিচ ভিলেজ। শহরের এই অঞ্চলটা ওয়াশিংটন স্কোয়ারের খানিক পশ্চিমে অবস্থিত। পথঘাট বেশ আঁকা বাঁকা। এই স্থানটি চিত্রশিল্পীদের খুবই প্রিয়। এখানকার পরিবেশ, আলো বাতাস, সবই বেশ প্রশস্ত। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, এখানে ঘরভাড়া নিতান্তই কম। তাই সবদিক দিয়েই, এই গ্রিনিচ ভিলেজ যেন চিত্রশিল্পীদের স্বর্গ।

সু আর জন্সি, দুই বান্ধবী, দুজনেই শিল্পী। গ্রিনিচে এমনই এক তিনতলা বাড়ির সবচেয়ে ওপরতলায় ওরা থাকে। ওদের বন্ধুত্ব অবশ্য এই গ্রিনিচে এসেই। এমনিতে একজনের বাড়ি মেইনে, অন্যজন ক্যালিফোর্নিয়া নিবাসী। বসন্তের এক মনোরম দিনে এইট্থ স্ট্রিটের একটি রেস্তোরাঁয় ওদের দুজনের পরিচয়। আর অল্পক্ষণেই দুজনেই দেখলো দুজনের পছন্দ অপছন্দ অনেকাংশেই মিলে যাচ্ছে। আর তাই ওরা বিশেষ দেরি না করে একসাথে এই বাড়িটিতে থাকা স্থির করলো।

গ্রিনিচ ভিলেজে দিন কেটে যায় আপনমনে। গ্রীষ্ম বর্ষা চলে গিয়ে আসে শীত। সাথে আনে এক নতুন অতিথিকে, নাম তার "নিউমোনিয়া"। এই অতিথি সারা শহরে তার হিমশীতল আঙুলের স্পর্শে একে একে বহু মানুষকে করছে কুপোকাত। শহরের ডাক্তাররা মোটেই খুশি নন একে নিয়ে। যদিও শহরের পূর্বদিকে এর অবাধ গতি, তবু পশ্চিমে, গ্রিনিচের দিকে এই নব্য অতিথি একটু ধীর লয়েই ঘুরছে বটে। অবশ্য তা হলেও, এই অতিথিকে মোটেই সাধুপুরুষ বলা চলে না। বলবোই বা কী করে? কোন ভদ্র ভালো মানুষ কখনও কোন যুবতীকে ব্যতিব্যস্ত করে? এই যে, এই আমাদের অতিথি, তার জ্বালাতনে আমাদের ক্যালিফোর্নিয়া নিবাসী জন্সি ব্যতিব্যস্ত। সে ঠিক নিজের দুষ্ট ঠাণ্ডা আঙ্গুল দিয়ে ছুঁয়েই দিলো মেয়েটিকে। বেচারি জন্সি। বিছানা ছেড়ে আর উঠতে পারে না। পারে না চলতে। সারাদিন শুয়ে থাকে খাটে, জানলার ধারে। আর চেয়ে দেখতে থাকে জানলার বাইরে। এক মনে।

এরই মধ্যে একদিন, জন্সির চিকিৎসক, বেশ চিন্তান্বিত হয়েই সু'কে ডেকে জিজ্ঞেস করলেন, "আচ্ছা, তোমার বন্ধুর ব্যাপারটা কী বলো তো? ওর কি বাঁচবার এতটুকুও ইচ্ছে নেই?" সু কী উত্তর দেবে, ভেবে পায় না। অনেক কষ্টে বলে, "কেন ডাক্তারবাবু? কী হয়েছে? জন্সির কতদিনের শখ, ইতালি যাবে। সেখানে গিয়ে বে অফ নেপলসের ছবি আঁকবে।" ডাক্তার মাথা নেড়ে বলেন, "উঁহু। দেখো, যে রুগী নিজেই বাঁচতে চায় না, আমি হাজার চেষ্টা করলেও তাকে বাঁচাতে পারবো না। বাঁচবার জন্য ইচ্ছেশক্তি রোগীর নিজের ভিতর থেকে আসতে হবে। বুঝলে? আর সেইটা কিন্তু আমি তোমার বন্ধুর মধ্যে এতটুকুও পাচ্ছি না। খুবই চিন্তার বিষয়।" সু অবাক হয়। কী হলো জন্সির, এরকম আচরণ কেন? কীসের কষ্ট ওর? তবে কি এটা কোন হৃদয়ঘটিত ব্যাপার? কই, ও তো কিছু জানে না। না না, এ হতেই পারে না। ডাক্তার বলেন, "দেখো, জন্সির শরীর অত্যন্ত দুর্বল। আমি আমার দিক থেকে সব রকম চেষ্টা তো করছিই। করবোও। কিন্তু রুগী যদি নিজেই তার বাঁচবার ইচ্ছে হারিয়ে ফেলে, তাহলে ডাক্তার হিসেবে আমার বিশেষ কিছু আর করার ক্ষমতা থাকে না। দেখো, ওর সাথে গল্প করো। কথা বলে দেখো, ওর কী সমস্যা। আগামীদিনের কথা বলো, নানান পরিকল্পনা করো। শোনো ও কী বলছে। ভবিষ্যতের কথা বললে যদি ও প্রাণশক্তি ফেরত পায়। দেখো।"

ডাক্তারের মুখে বান্ধবীর শরীরের এই অবস্থার কথা শুনে সু মনের দুঃখে ভেঙ্গে পড়ে। পাশের ঘরে বসে নিভৃতে খানিক চোখের জল ফেলে। তারপর মনে পড়ে যায় নিজের দায়িত্ব। নাহ, বন্ধুকে বাঁচাতেই হবে। ওকে ভালো রাখতেই হবে। তাই চোখ মুছে হাসিমুখে, প্রিয় গান গুনগুন করতে করতে রঙ তুলি ক্যানভাস নিয়ে পৌঁছে যায় জন্সির ঘরে। গিয়ে দেখে সেই একই পরিচিত দৃশ্য। জানলার দিকে পাশ ফিরে চুপ করে শুয়ে আছে জন্সি। রোগে জীর্ণ ক্লান্ত জন্সি। ও ঘুমোচ্ছে, পাছে ওর গানের শব্দে ওর ঘুমের ব্যাঘাত হয়, এই ভেবে সু গান থামিয়ে দেয়। তারপর আঁকা নিয়ে বসে।

কাজ করতে করতে সু'র কানে একটি মৃদু শব্দ আসতে থাকে। মিনমিনে রিনরিনে স্বরে যেন কোন কথা বলছে। ও আঁকা ফেলে উঠে যায় জন্সির খাটের পাশে। গিয়ে দেখে, বন্ধুটি জেগে শুয়ে আছে। আর আপন মনে বাইরে তাকিয়ে কী যেন গুনে চলেছে। এবং যে সংখ্যাগুলো বিরবির করছে, তার গুনতি উল্টো। বারো। খানিক থেমে আবারএগারো, দশ। মুহূর্তেই এরপর নয়, আট, সাত...  শেষের সংখ্যাগুলো যেন হুড়মুড়িয়ে একের পর এক এসে গেলো।

সু অবাক হয়। জন্সি কী গুনছে? কীই বা আছে গোনার? কৌতূহলী সু জানলার বাইরে তাকায়। চোখে পড়ে পাশের বাড়ির ন্যাড়া দেওয়াল। সেই দেওয়ালের গা বেয়ে দাঁড়িয়ে থাকা লতানে গাছটিতেও শীতের স্পর্শ দৃশ্যমান। ইতিমধ্যেই শীতল হাওয়ায় পাতাঝরা শুরু হয়ে গিয়েছে। দেওয়ালের সাথে তাল মিলিয়ে সেও যেন ন্যাড়া হওয়ার জন্যই পথ চেয়ে আছে, অপেক্ষায়।

"কী হলো জন্সি?" সু অবাক হয়ে প্রশ্ন করে।
জন্সি দুর্বল কন্ঠে উত্তর দেয়, "ছয়... ওই দেখো সু, তিনদিন আগেও ওখানে শয়ে শয়ে ছিলো। তখন গুনতে গুনতে আমার মাথা ব্যথা করতো সু। আর এখন দেখো, সব শেষ। প্রায় সব শেষ। ওই, ওই। ওই যে। আরো একটা। পাঁচ। ওই দেখো। আরো তাড়াতাড়ি যেন কমে যাচ্ছে এখন।"
বন্ধুর এই হাহাকার কিছুই বোধগম্য হয়না সু'র। অবাক হয়েই প্রশ্ন করে, "কী গুনছ জন্সি? কী? পাঁচটা কী?"
কাঁপা কাঁপা স্বরে জন্সি বলে, "পাতা। ওই যে, সামনের গাছটা দেখছো, ওই যে। ওই গাছের পাতাগুলো ঝরতে ঝরতে এখন মোটে পাঁচে এসে ঠেকেছে। যেদিন শেষ পাতাটি ঝরে যাবে সু, সেদিনই, সেদিনই জেনো, আমিও মরে যাবো। ডাক্তার বলেনি তোমায়?"

সু'র ভিতরটা দুঃখে কেঁপে ওঠে। অনেক কষ্টে নিজেকে সামলে পরম মমতাভরে জন্সির মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলে, "ওসব যত বাজে কথা। ওরকম হয় নাকি জন্সি? তুমি ভুল জানো। তাছাড়া তুমি ওই গাছটাকে কত ভালোবাসো বলো তো? ওর সাথে তোমার আয়ু মোটেই জড়িত না। হতেই পারে না। তাছাড়া, সবচেয়ে বড় কথা। এই তো, একটু আগেই আমার ডাক্তারের সাথে কথা হলো। উনি বলেছেন। তোমার শরীর এখন আগের চেয়ে অনেক ভালো আছে। উন্নতি হচ্ছে স্বাস্থ্যের। দেখো, দুর্বলতা তো এখনো রয়েছে। সেটা কাটালেই ব্যস, তুমি পুরো সুস্থ হয়ে উঠবে। নাও, এখন কিছু খাও দেখি। চাঙ্গা হতে হবে তো? তুমি খেয়ে নাও। তুমি খেয়ে নিলে আমি কাজ নিয়ে বসবো। আঁকা বাকি বেশ কিছু। দেখি, আঁকাগুলো বিক্রি করে তোমার জন্য কী কিনতে পারি।"

জন্সি অবুঝ বালিকার মতো উত্তর দেয়, "না সু। আমি কিচ্ছু খাবো না। আমার জন্য তোমায় কিছু কিনতেও হবে না। দেখো, ওই যে। আরো একটা পাতা ঝরে গেলো। আমি জানি। পরপর সব পাতা ঝরে যাবে। আজ রাতের মধ্যেই সব পাতা ঝরে গাছটা একদম ন্যাড়া হয়ে যাবে। আর কী, সব শেষ। আমিও চলে যাবো। আমারও আয়ু ফুরাবে।"

বন্ধুর এমন ব্যবহারে সু বিহ্বল হয়। কী বলবে ও? কীভাবে শান্ত করবে জন্সিকে? শেষ চেষ্টা করে। কাতরস্বরে বলে, "জন্সি, তুমি এখন একটু শুয়ে থাকো। চোখ বন্ধ করে থাকো। আর বাইরে তাকিয়ো না। দেখো, আমায় আজ রাতের মধ্যে এই কাজটা শেষ করতেই হবে। আলো লাগবে। তাই আর জানলাটা বন্ধ করতে পারছি না। কিন্তু তুমি বাইরে তাকিয়ো না। জন্সি, দোহাই তোমার, একটু ঘুমাও।"
জন্সি জিজ্ঞেস করে, "পাশের ঘরে গিয়ে কাজ করা যায় না?"
সু মাথা নাড়ে। বলে, "না জন্সি। আমি তোমার পাশে থাকতে চাই। আমি চাই না তুমি ওই পাতাগুলোর দিকে তাকাও।"
রোগে ক্লিষ্ট জন্সি অবোধ শিশুর মতোই অবুঝ।  বলে, "ঠিক আছে। আমি চোখ বন্ধ করে থাকছি। কিন্তু তুমি কথা দাও। কাজ শেষ করেই আমায় বলবে। আমি বাইরে তাকিয়ে থাকতে চাই। দেখতে চাই পাতাগুলো কীভাবে ঝরে পড়ে। আমার প্রাণও যে ওর সাথে জড়িয়ে আছে। ওই যে, ওই শেষ পাতাটার সাথেই দুলে দুলে পরম আনন্দে আমিও চলে যেতে চাই।"
"জন্সি, তুমি কথা বলো না। দোহাই। আমি আমার আঁকাটা শেষ করি। আজকের মধ্যে এটা করতেই হবে। আঁকায় একটি পুরুষ চরিত্র থাকবে। দেখি, তাকে মিস্টার বারম্যানের মতোই দেখতে আঁকবো। ওঁকে ডেকে আনি। আমি এই যাবো আর এই আসবো। তুমি কথা দাও, জন্সি, নড়াচড়া করবে না এর মধ্যে। কথা দাও ঘুমোবে?" 

বারম্যান ওদেরই বিল্ডিঙে থাকেন, ষাটোর্দ্ধ চিত্রশিল্পী। দীর্ঘ চল্লিশ বছরের ওপর উনি ছবি আঁকছেন। মনে সাধ, একদিন কোন দুর্দান্ত ছবি এঁকে বিশ্ববিখ্যাত হবেন। অবশ্য তাঁর আঁকার বিশেষ কদর শিল্পমহলে নেই। টাকার জন্য তাই মাঝেমাঝেই অন্য শিল্পীদের হয়ে মডেলের কাজও করে দেন। যা রোজগার, বেশিরভাগই উড়িয়ে দেন মদের নেশায়। তবুও এত কিছুর মধ্যেও সু আর জন্সির খোঁজখবর নেওয়া, ওদের সাহায্য করাটাকে নিজের পরম কর্তব্য বলেই মনে করেন বারম্যান।

বারম্যানের ঘরে পৌঁছে সু দেখলো, ঘর অন্ধকার। উনি চুপ করে বসে আছেন। ঘরভর্তি মদের গন্ধ। নির্ঘাত নেশা করে আছেন। সু এরই মধ্যে মনের দুঃখে জন্সির অসুখ, দেওয়ালের ধারের শুকনো গাছটার ঝরাপাতা, তার সাথে জন্সির নিজের আয়ুকে জুড়ে নেওয়ার কথা সব বলে ভেঙে পড়ে, "আমি আর পারছি না। কোনদিক যে সামলাই? আঁকাটাও শেষ করতে হবে। আপনি আসবেন মিস্টার বারম্যান? আমার মডেল হয়ে যান দয়া করে।" সব শুনে মিস্টার বারম্যান রাগে ফেটে পড়লেন। চেঁচিয়ে বললেন, "এমন অলুক্ষুণে কথা কে বলে? কে ঢোকাচ্ছে এইসব আবোল তাবোল কথা জন্সির মাথায়? মেয়েটা মরতে বসেছে আর তুমি আমায় বলছো বসে বসে এখন মডেল সেজে বসে থাকতে? যাবো না আমি। এ হয় না।" সু কাঁদো কাঁদো স্বরে বলে, "দোহাই মিস্টার বারম্যান। এরকম বলবেন না। জন্সি দুর্বল। এই দুর্বল চিত্তে ওর মাথায় যত উদ্ভত খেয়াল হচ্ছে। এরই মধ্যে আপনিও সাহায্য না করলে আমি তবে কোথায় যাই?"

মিস্টার বারম্যান এবার শান্ত হয়ে বললেন, "দেখো সু। আমি আসছি। আমি কোথায় বললাম আমি যাবো না। শুধু জন্সি বেচারির জন্য মন কেমন করছে। ওইটুকু একটা মেয়ে, এমন অসুখে ভুগবে কেন? এখানে থাকাই উচিত না তোমাদের। আমাদের। দেখো, আমি একদিন একটা সাঙ্ঘাতিক কিছু ছবি আঁকবোই। বিখ্যাত হবোই। অনেক খ্যাতি হবে। হবে যশ। আর সেদিন তোমাদের নিয়ে আমি এই বাজে জায়গা থেকে চলে যাবো। অনেক দূরে। দেখো। নাও চলো দেখি, আঁকার জোগাড় করো। আমি আসছি।"

এরপর আর কোন কথা হয় না। দুজনে চুপচাপ নেমে আসে নীচে। জন্সির ঘরে। জন্সি তখন রোগক্লিষ্ট ঘুমে আচ্ছন্ন। পর্দা সরিয়ে জানলা ভেজিয়ে পাশের ঘরে আসে সু আর মিস্টার বারম্যান। সেই ঘরের জানলা দিয়ে দুজনে একবার বাইরে তাকায়। প্রবল ঝড় বইছে, সাথে বৃষ্টি। বৃষ্টির সাথে মাঝে মাঝে নরম বরফকুচি ঝরে পড়ছে। পাতাঝরা লতানে গাছটার দিকে তাকিয়ে দেখে দুজনে, একদৃষ্টে। কোন কথা বেরোয়না ওদের মুখ দিয়ে। তারপর চুপচাপ জায়গায় ফিরে আঁকা শুরু করে সু। প্রায় সারা রাত জেগে কাজটা শেষ করেছে ও। ভোরের দিকে ঘন্টাখানেকের জন্য একটু ঘুমিয়েও পড়েছিল সু। এইবার উঠে পাশের ঘরে যায়, ধীরপায়ে। দেখে, জন্সি জেগে শুয়ে আছে। ব্যাকুল দৃষ্টিতে জানলার পর্দার দিকে চেয়ে। সু'কে দেখে বলে, "পর্দাটা সরিয়ে দাও। আমি দেখতে চাই। আমি দেখতে চাই আমার গাছটাকে। দেখি, পাতাগুলো কেমন আছে।"

সু আস্তে আস্তে জানলা থেকে পর্দাটা সরিয়ে দেয়। চোখ যায় ন্যাড়া দেওয়ালের গায়ে লতানে গাছটার দিকে। সারা রাত ঝড় বৃষ্টি চলেছে।  তবুও, শেষ একটা পাতা এখনও টিকে আছে। শুকনো খয়েরি ডালের ভিতর থেকে। একটা সবুজ পাতা। ধারগুলো অবশ্য ইতিমধ্যেই হলুদ হতে শুরু করেছে। তবুও, একা লড়ে যাচ্ছে, প্রবলভাবে। একটা শেষ সবুজ পাতা। জন্সি দেখে অবাক হয়, বলে, "সারা রাত যা বৃষ্টি হলো, হাওয়া দিলো, আমি ভেবেছিলাম বুঝি... না। আজ আর পারবে না ও। আজ ও ঝরে পড়বেই। আর সাথে আমিও। দেখো সু।" সু ভেবে পায় না কী বলবে এর উত্তরে। যে কিনা নিজেই বাঁচবার শেষ ইচ্ছেটুকু বিসর্জন দিয়েছে, চলে যাওয়ার জন্য মনে মনে প্রস্তুত হয়ে আছে, তাকে কীই বা বলে আটকানো যায়? সু অপারগ দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখে বন্ধুকে। অপলকে। ইচ্ছে করে বন্ধুত্বের দোহাই দেবে। কিন্তু জানে, তাতেও কাজ হবে না। যে জীবন থেকে সব মোহ ক্রমশ সরিয়ে ফেলছে, সেখানে বন্ধুত্বের দোহাই বা টিকবে কেন?

দিন কেটে যায়। রাত্রে আবার ঝড় ওঠে। বৃষ্টি। ঘুটঘুট্টে অন্ধকার। তারই মধ্যে ওরা দেখতে পায়, সেই শেষ সবুজ পাতাটা এখনও টিকে আছে। লড়ছে, প্রবল বিক্রমে, সমস্ত প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে। একা। বীরদর্পে।

পরদিন সকালে আবার জন্সির আব্দারে জানলার পর্দা সরে যায় ঘরের। দুই বন্ধু দেখে অবাক হয়ে, সেই গতকালের শেষ সবুজ পাতাটা এখনও টিকে গেছে। খানিকক্ষণ সেদিকে দেখে এরপর সু চলে যায় রান্না করতে। জন্সির জন্য পথ্য রান্না করবে ও। জন্সি খানিক তাকিয়ে থাকে বাইরে, তারপর বন্ধুকে বলে, "সু, আমি অনেক ভাবলাম। এই যে পাতাটা টিকে গেলো, কেন জানো? কারণ ও কিছু বলতে চায় আমায়। আমায় বোঝাতে চায় যে এত সহজে হার মানলে চলবে না। আমায় লড়াই করতে হবে। আমি এ কদিন বড় ভুল করেছি, আর এমন করবো না। আমায় বাঁচতে হবে। নতুন উদ্যম নিয়ে। আগে দেখি, একটু আমায় আয়নাটা এনে দাও দেখি। একবার দেখি এ কদিনে কী অবস্থা হয়ে আছে আমার চেহারার।"
সু ওকে খাইয়ে নিজের কাজ করতে থাকে। জন্সি বসে থাকে বিছানার ধারে। কিছুক্ষণ পরে সুর দিকে তাকিয়ে বলে, "জানো সু, আমি একদিন ঠিক ইতালি যাবো। দেখো। বে অফ নেপলসের ছবি আমি আঁকবোই।" বন্ধুর কথা শুনে সু খুশী হয়। এই তো, এই তো ও আগামীর কথা ভাবছে। এই তো, ফিরছে। ওর জীবনীশক্তি ফিরছে। তাহলে হয়তো এ যাত্রায় বাঁচাতে পারলো বন্ধুকে।

বিকেলের দিকে ডাক্তার আসেন রুগীকে পরীক্ষা করতে। জন্সিকে দেখে পরীক্ষা নিরিক্ষা করে উনি আজ বেশ সন্তুষ্ট। সুকে বলেন, "তোমার বন্ধুর শারীরিক উন্নতি হয়েছে দেখছি। যত্ন ভালোই করেছো। চালিয়ে যাও। খাওয়া দাওয়া, বিশ্রাম আর যত্ন। এই তিনটিই মূল ওষুধ ওর। ভালো হয়ে যাবে ও। খুব শিগগিরই সুস্থ হয়ে উঠবে। আমি এখন যাই, ওদিকে ডাক পড়েছে। নতুন রুগী। বারম্যান নাম। মাইকের বয়স হয়েছে। মনে তো হচ্ছে নিউমোনিয়া। ওঁকে সারানো কঠিন। দেখি হাসপাতালে নিয়ে যাই যাতে যতটা কম কষ্ট পায় আর কী।"

পরের দিন আবার ডাক্তার ফিরে আসেন। জন্সির স্বাস্থ্য পরীক্ষা করে দেখেন। তারপর খুশি হয়ে সু'কে বলেন, "তুমি বড় ভালো সেবা করেছো রুগীর। ও এখন অনেক ভালো আছে। চিন্তার আর কোন কারণ নেই। ঠিক করে খাওয়া দাওয়া করিয়ো। ব্যস। তাহলেই সব ঠিক। "

বেলার দিকে জন্সির কাছে এসে বসে সু। ওকে সস্নেহে জড়িয়ে ধরে বলে, "জন্সি, একটা খবর দেওয়ার ছিল।" জন্সি সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে তাকায় বন্ধুর দিকে। সু বলতে থাকে, "মিস্টার বারম্যান। মিস্টার বারম্যান আর নেই। আজকেই মৃত্যু হয়েছে ওঁর। হাসপাতালে। তবে একটাই ভালো কথা। উনি বেশি ভোগেননি। বেশি কষ্ট পাননি। দুদিনের কষ্ট। প্রথম দিন কেউ একজন ওঁকে নিজের ঘরে শুয়ে যন্ত্রণায় কাতরাতে দেখে ডাক্তার ডেকে দেন। ওঁর জামাকাপড় জুতো সব ভিজে। হিমশীতল। কে জানে কী করে? তারপর একটু এদিক ওদিক খুঁজতে গিয়ে অবশ্য নজরে আসে একটা আলো। বাইরে নিয়ে যাওয়ার আলো। হয়তো কোথাও বেরিয়েছিলেন। আর পাওয়া যায় কিছু আঁকার সরঞ্জাম। একটু হলুদ রঙ, একটু সবুজ রঙ তখনও লেগে আছে প্যালেটে।"

জন্সি থামিয়ে দেয় বন্ধুকে। বলে, "দেখো সু। জানলার বাইরে তাকিয়ে দেখো। ওই গাছের শেষ পাতাটি দেখছো? দেখেছো কেমন এত ঝড় বৃষ্টিতেও ওটা অটুট আছে। এতটুকু নড়ে পর্যন্ত নি। এবার বুঝছি কেনো। ওই তো, ওই যে, ওইটাই সেদিন রাত্রে মিস্টার বারম্যান এঁকে গিয়েছেন। এতদিনে ওঁর মনস্কামনা পূর্ণ হয়েছে। দেখেছো কেমন অদ্ভুত সুন্দর ওই সৃষ্টিটি? এটাই মিস্টার বারম্যানের এঁকে যাওয়া শ্রেষ্ঠ শিল্প। ওঁর গুণের শ্রেষ্ঠ নিদর্শন। ওই শেষ সবুজ পাতাটা। শিল্পী মহলে দেখো, অমর হয়ে থাকবে। ওঁর শেষ শিল্প।"






Monday, February 17, 2020

দ্য গিফট অফ দ্য মাজাই



মোটে এক ডলার সাতাশি সেন্ট? মোটে? ডেলা এই নিয়ে তিনবার গুণে দেখলো। এইটুকু ওর সম্বল। মোটে এইটুকু। রোজের বাজারহাটের খরচ থেকে তিল তিল করে বাঁচানো মোটে এইটুকু। অথচ কালকেই বড়দিন। বেচারি ডেলা আর কীই বা করে, বিছানায় শুয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদা ছাড়া আর অন্য কোন উপায় নেই। অগত্যা, ডেলা তাইই করছে।


যতক্ষণ ডেলা একটু শান্ত হচ্ছে, আসুন, ততক্ষণে বরং আমরা বাড়িটা ঘুরে দেখি। অবশ্য বাড়ি বলতে যা বোঝায়, এই আট ডলার প্রতি সপ্তাহের ভাড়ায় আদৌ তা আশা করা যে অনুচিত, তা জানা কথা। কাজেই এই বাড়ি নিয়ে বিশেষ কিছু যে বলার নেই, তা বোধহয় আর বলে দিতে হয় না। বাড়ির সামনে হলে একটা অতি ছোট ডাকবাক্স, যাতে যে কোন চিঠিই আঁটবে না। একটা বৈদ্যুতিক ঘণ্টিও আছে। অবশ্য সেই ঘণ্টি বাজে না। এছাড়া দরজার পাশে একটা ফলকে বড় করে লেখা বাড়ির মালিকের নাম, " মিস্টার জেমস ডিলিংহ্যাম ইয়ং"।


যখন ফলকটি ওখানে বসানো হয়েছিল, তখন মিস্টার জেমস ডিলিংহ্যাম ইয়ং সপ্তাহান্তে তিরিশ ডলার করে মাইনে পেতেন। এখন যখন সেটি কমে কুড়ি ডলারে নেমেছে, তখন বোধকরি ওই এত বড় নামটি নেহাতই বড় ও অপ্রয়োজনীয় বলে মনে হয়। তবে মিস্টার জেমস ডিলিংহ্যাম ইয়ং যখন এই সজ্জিত ঘরে ঢোকেন, ওঁর নাম হয়ে যায় আরো ছোট। মিসেস জেমস ডিলিংহ্যাম ইয়ং সপ্রেম ওঁর গলা জড়িয়ে ওঁকে "জিম" বলে ডাকেন। মিসেস ইয়ংএর সাথে পরিচয় ইতিমধ্যেই হয়ে গিয়েছে - ডেলা।


ডেলা খানিকক্ষণ পরে কান্না থামিয়ে মুখ চোখ মুছল। জানলার ধারে দাঁড়িয়ে বাইরে তাকিয়ে রইলো বটে, তবে সেদিকে কোথাও কোন মন নেই ওর। আগামীকাল বড়দিন, এদিকে জিমের জন্য উপহার কেনার জন্য হাতে রয়েছে মোটে এক ডলার ও সাতাশি সেন্ট। বহু মাস ধরে অল্প সল্প এদিক ওদিকের খরচ থেকে বাঁচিয়েও এতদিনে সর্বসাকুল্যে রয়েছে মোটে এইটুকু টাকা। সপ্তাহে কুড়ি ডলার দিয়ে সংসার চালানো চারটিখানি কথা না। সবকিছুরই খরচ অনেক বেশি হয়েছে, ভাবনার বাইরে বেরিয়ে গিয়েছে হিসেব।


এত কিছুর পর দিনের শেষে হাতে রয়েছে কেবলমাত্র এই এক ডলার সাতাশি সেন্ট। এই দিয়ে ওকে জিমের জন্য উপহার কিনতে হবে ভেবেই মন খারাপ হয়ে যাচ্ছে ডেলার। অথচ জিমের যোগ্য উপহারের চিন্তায় কত খেয়াল বেখেয়ালি মুহূর্ত ও কাটিয়েছে। এমন কিছু কিনতে হবে যা জিমের জন্য হবে এক্কেবারে যথাযথ, যা জিম ভীষণভাবে ভালোবাসবে, ঠিক সেরকম কিছুর সন্ধানে ডেলা কত সময় ব্যয় করেছে।


দুটি জানলার মধ্যিখানে রয়েছে একটি আয়না। সেইরকম আয়না হয়তো আপনি আগেও দেখেছেন কোন সস্তার বাড়িতে। অত্যন্ত সরু এক ফালি কাঁচ। যদি মানুষটি খুব রোগা হন এবং দ্রুত পদচালনা করতে পারতে পারেন, তবে হয়তো পূর্ণ অবয়ব দেখতে পেতে পারেন এমন আয়নায়। ডেলা নিতান্তই ছিমছাম, বলা চলে রোগা। কাজেই ও সহজেই এই আয়নায় নিজেকে দেখতে পেয়ে যায় সহজেই।


কী মনে হতে, হঠাৎ ডেলা জানলা থেকে সরে এসে আয়নার সামনে দাঁড়ালো। কিছু একটা বুদ্ধি এসেছে মাথায়, আর সেই উত্তেজনায় ডেলার দুই চোখ উজ্জ্বল। তবে মুখখানি বিবর্ণ। তাড়াতাড়ি চুলের খোঁপা খুলে ওর এক ঢাল লম্বা ঘন চুল এলিয়ে দিলো কাঁধ পিঠ বরাবর।


ডিলিংহ্যাম ইয়ং পরিবার তাদের দুই মূল্যবান ঐশ্বর্য নিয়ে অত্যন্ত গর্ব করতেন। প্রথমটা, জিমের সোনার ঘড়ি। এই ঘড়িটি একদা জিমের বাবার সম্পত্তি ছিলো। তারও আগে এটি ছিল ওঁর বাবার সম্পত্তি। বংশানুক্রমে এখন জিমের। দ্বিতীয়ত, ডেলার অপরূপ সুন্দর চুল।


যদি ওদের বাড়ির সামনে কোন সাতমহলা প্রাসাদে কোন রানী বাস করতেন, তবে ডেলা নিয়মিত রানীকে দেখিয়ে দেখিয়ে চুল ধুতো, তারপর সযত্নে কেশবিন্যাস করতো। ডেলা নিশ্চিত, ওর চুল যে কোন সময়ী যে কোন রাজরানীর ঐশ্বর্য ও ধনের চেয়ে বেশি দামী, বেশি গর্বের।


আর যদি কোন মহারাজ থাকতেন, তবে জিম অবশ্যই প্রতিবার দেখা হলেই বারবার নিজের ঘড়িখানি বের করে সময় দেখতো। এমনই ঐশ্বর্য সেই ঘড়িতে। জিম জানে, অমন মূল্যবান সম্পদ কোন রাজার কাছেও নেই।


এখন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ডেলার লম্বা খয়েরি রেশমি চুল এক ঢাল ঝর্নার জলের মতো পিঠ বরাবর ঢেউ খেলছে। চুল লম্বায় ওর হাঁটু ছাড়িয়ে যায়, ঠিক যেন ওর কোন পোশাক।


ডেলা ক্ষণিকের ইতস্ততা কাটিয়ে ঝটপট নিজের চুল সাজিয়ে ফেললো খোঁপায়। মুহূর্তের জন্য থমকে দাঁড়ালো, গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়লো কয়েক ফোঁটা চোখের জল।


এরপর নিজের খয়েরি কোট গায়ে জড়িয়ে, মাথায় জীর্ণ খয়েরি টুপিটা মাথায় পরে বেরিয়ে পড়লো। দু চোখে এখনও লেগে আছে সেই ঔজ্জ্বল্য। ডেলা দ্রুত পায়ে চলতে চলতে এসে পৌঁছল একটি দোকানের সামনে।


দোকানের সামনে রয়েছে একটি ফলক, লেখা, "মিসেস সফ্রোনি। এখানে সব রকম চুলের সরঞ্জামের কারবার হয়।" ডেলা এরপর হড়বড় করে দোতলায় এসে পৌঁছল। হাঁপাচ্ছে। একটু থেমে শ্বাস ঠিক করে দেখলো সামনে দাঁড়িয়ে মিসেস সফ্রোনি। এক বিশালাকার ফ্যাকাশে মুখো মহিলা। ডেলা ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করলো, "আমার চুল কিনবেন?"


মিসেস সফ্রোনি একটু তাকালেন ডেলার দিকে। তারপর মেপে মেপে উত্তর দিলেন, "আমি চুল কিনি। দেখি, টুপিটা খোলো, দেখি তোমার চুল কেমন।"


ডেলা খোঁপা খুলে দেখালো। লম্বা খয়েরি রেশমের ন্যায় ওর চুল দেখে মিসেস সফ্রোনি বললেন, "কুড়ি ডলার। হুম, কুড়ি ডলার দিতে পারি।"


ডেলা ব্যস্ত হয়ে বললো, "নিন। আমার চুল নিন। পরিবর্তে আমায় এখুনি কুড়ি ডলার দিন। দয়া করে।"


এরপরের দুঘণ্টা যেন কোথায় উড়ে গেলো। এ দোকান সে দোকান করতে থাকল ডেলা। কিছুতেই যেন কোথাও আর জিমের জন্য পছন্দের কোন উপহার চোখেই পড়ে না ওর।


শহরের সমস্ত দোকান প্রায় চষে বেরানোর পর অবশেষে মিলল সেই বহু কাঙ্খিত উপহারটি। যথার্থই এটি জিমের জন্যই বুঝি বানানো। একেবারে সেরার সেরা।


সোনার এই ঘড়ির বন্ধনীটি অমূল্য। নকশায় বিশেষ কারুকাজ না থাকলেও, ধাতুর বিশুদ্ধতার জন্য এই ঘড়ির বন্ধনীটি এত মহার্ঘ্য। এত দামী। এতই সাধারণ দেখতে, অথচ অসাধারণ সুন্দর। দেখলেই বোঝা যায় এর দাম, এমনই সে সৌন্দর্য।


যাক, এতদিনে জিমের সেই ঘড়িটার জন্য এক্কেবারে যথাযথ বন্ধনী তবে পাওয়া গেলো।


বন্ধনীটি দেখেই ডেলার মনে হলো, জিমের ঘড়ির সাথে এমন মানানসই বন্ধনীরই বুঝি অপেক্ষা ছিল এতদিন। জিমের সাথে দিব্যি মানাবে এটিকে। একদম ওরই মতোন, শান্ত, স্নিগ্ধ। জিমের মতোই মূল্যবান এটি। ও একুশ ডলার দাম দিয়ে কিনে ফেললো। ঘড়ির বন্ধনী ও সাতাশি সেন্ট হাতে নিয়ে ডেলা ফিরে এলো নিজের আট ডলারের সংসারে।


এতদিন বন্ধনীর অভাবে জিম ঘড়িটি লোকসমাজে ব্যবহার করতেই পারতো না। যদিও ঘড়ি হিসেবে ওটি অত্যন্ত সুন্দর, তবুও বন্ধনীর অভাবে লুকিয়ে জামার খোপ থেকে বের করে সময় দেখতে হতো এতদিন। এইবার জিম নিশ্চিন্তে সকলের সামনে যখন ইচ্ছে ঘড়িতে সময় দেখতে পাবে। এইবার ডেলা খুশি, খুব খুশি।


বাড়ি ফিরে ডেলা এইবারে শান্ত হয়ে বসলো। এখন অনেক ভাবনা চিন্তার সময়। এই যে কীর্তিটি ও করলো, এটাকে তো লুকোতে হবে। এই দুঃখী ক্ষতচিহ্নকে যে মুছতে হবে, ঢাকতে হবে। ভালোবাসা ও উদার হৃদয়, দুইয়ে মিলে যে অনেক ক্ষতস্থান সৃষ্টি করে বন্ধু। অবশ্য সেই ক্ষত সহজে জুরোবার নয়।


চল্লিশ মিনিট ধরে ডেলা নিজের অবশিষ্ট চুল নিয়ে নানান কারুকাজ করতে লাগলো, একেক সময় একেক কেশবিন্যাস। কখন কোনটায় ওকে মানিয়ে যায়। এইরকম চেষ্টা করতে করতে অবশেষে যখন ওর মনে হলো নিজেকে একটু ভদ্রস্থ দেখাচ্ছে, আদপে তখন ডেলাকে লাগছিল ঠিক এক দুষ্টু ইশকুল ছাত্রের মতো। বেশ অনেকটা সময় আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে পর্যবেক্ষণ করতে লাগলো ডেলা। ও নিশ্চিত, জিম বাড়ি ফিরে ওকে এরকম সাজে দেখলে নির্ঘাত মেরেই ফেলবে। আর যদি নাও বা মারে, দ্বিতীয়বার চেয়ে দেখার আগে অবশ্যই বলবে যে ওকে দেখতে লাগছে ঠিক সেইসব মেয়েগুলোর মতো, যারা নেচে আর গান গেয়ে টাকা উপার্জন করে। কিন্তু ডেলা কীই বা করবে নইলে? ওর যে হাতে ছিল মোটে ওই এক ডলার সাতাশি সেন্ট। এই দিয়ে কি আর জিমের জন্য পছন্দসই উপহার কেনা যায়?


সন্ধ্যে সাতটায় জিমের নৈশভোজ তৈরি করে ডেলা অপেক্ষা করতে লাগলো। জিম কোনদিনও এতটুকুও বিলম্ব করে না বাড়ি ফেরায়। সদ্য কেনা ঘড়ির বন্ধনীটা হাতে নিয়ে ডেলা বসে অপেক্ষা করতে লাগলো


দরজার ধারে। সদর দরজা। যেখান দিয়ে জিম রোজ ওদের বাড়ি ঢোকে। মুহূর্তেই ডেলা বাইরে হলে জিমের পায়ের শব্দ পেলো। ভয়ে, চিন্তায় ওর সুন্দর মুখখানি ফ্যাকাশে হয়ে গিয়েছে। ডেলার একটা স্বভাব আছে, ছোট বড় সবকিছু নিয়েই যখন তখন ও ইশ্বরের কাছে প্রার্থনা করে। এখনও তার ব্যতিক্রম ঘটলো না। ও চুপিচুপি ইশ্বরকে ডেকে বলল, "হে ইশ্বর, দয়া করো, দয়া করে যেন জিম আমায় এখনও সুন্দরী ভাবে।"


যথাসময়ে দরজা খুলে জিম বাড়ির ভিতরে প্রবেশ করলো। ক্লান্ত, বিধ্বস্ত, রোগা চেহারা। বেচারা, এই বাইশ বছর বয়সে সংসারের বোঝা টানা, চারটিখানি কথা না। একটা কোট আর এক জোড়া গ্লাভসের খুব প্রয়োজন। দেখেই মায়া হয়।


শিকারি যেমন শিকারের সামনে এসে স্থির হয়ে খানিক থমকে দাঁড়ায়, জিমের অবস্থাও এখন সেরকম। বাড়ি ঢুকে হাঁ করে ডেলার দিকে চেয়ে রইলো। কোন কথা নেই মুখে। এক অদ্ভুত দৃষ্টিতে ডেলাকে দেখেছে ও। সেই অভিব্যক্তি এতটাই অচেনা ডেলার কাছে, ডেলা বুঝছে না। ও কি ভয় পাবে? জিম কি রেগে গেলো? নাকি চমকে গেলো? বুঝতে পারে না ও।


ডেলা এগিয়ে যায় জিমের দিকে, বলে, "জিম, পায়ে পড়ি, ওরকম ভাবে আমার দিকে তাকিয়ো না। আমি চুল কেটে তা বিক্রি করেছি। দেখো, কাল বড়দিন। তোমার জন্য উপহার না কিনে কী করে থাকতাম আমি বলো? সেই জন্যই এই কাজ করতে হলো। শোনো, আমার চুল খুব তাড়াতাড়ি লম্বা হয়। তুমি চিন্তা করো না। লক্ষ্মীটি জিম, কাল বড়দিন। এসো, আমরা আনন্দ করি। জানো, তোমার জন্য কী দারুণ সুন্দর একটা উপহার আমি কিনেছি।"


জিম এবার বেশ কষ্ট করে, ধীরে জিজ্ঞেস করে, "চুল কেটে ফেলেছ?" যেন ঘটনাটি বুঝেও বিশ্বাস করতে মন চাইছে না। মুখে সেই কষ্ট স্পষ্ট।


ডেলা ব্যস্ত হয়ে উত্তর দিলো, "হ্যাঁ জিম। চুল কেটে তারপর বিক্রি করে ফেলেছি। দেখো জিম, আমি কিন্তু মানুষটা সেই একই আছি। তোমার ডেলা। দেখো জিম। আমায় ভালো লাগছে না? বলো?"


জিম অবিশ্বাসের সাথে চারিদিকে তাকিয়ে আবারও বলে, "চুল কেটে ফেলেছ?"


ডেলা আস্তে আস্তে উত্তর দেয়, "হ্যাঁ জিম। তুমি এদিক ওদিক খুঁজো না। পাবে না। আমি চুল কেটে বিক্রি করে দিয়েছি। দেখো জিম, এটা ছাড়া আমার কাছে আর দ্বিতীয় উপায় ছিল না। কাল বড়দিন। তোমার জন্য উপহার কিনতেই হতো। নাও, এবার মন খারাপ করা বন্ধ করো জিম। দেখো, তোমার জন্য পছন্দসই উপহার কিনেছি। শোনো জিম, আমার চুলের আয়ু সীমিত, ও চুল আবার গজাবে, বাড়বে। কিন্তু তোমার প্রতি আমার ভালোবাসা, সে তো নিখাদ। এসো, আমরা খেয়ে নিই এবার।"


জিম উত্তরে ডেলাকে জড়িয়ে ধরলো। আসুন, এই অল্পক্ষণ, আমরা একটু অন্যদিকে তাকাই। আচ্ছা, সপ্তাহে আট ডলার আর বছরে লক্ষাধিক ডলার। কত পার্থক্য? বুদ্ধিমানেরা এর এক উত্তর দেবেন। তবে, তা মোটেই সঠিক না। ম্যাজাই যারা ছিলেন, তারা বহু দামী উপহার এনেছিলেন। তবে এদের উপহার আলাদা। কীভাবে? শিগগিরই বোঝাবো আমি।


জিম কোটের পকেট থেকে একটি রঙিন কাগজে মোড়া কোন বস্তু বের করে হেলায় খাটে রেখে দিলো। তারপর ডেলাকে বলল, "দেখো ডেলা, তুমি যেমনই দেখতে হও না কেন, যেভাবেই চুল কাটো কি বড় করো, যা ইচ্ছে করো, জেনে রেখো, আমি তোমায় চিরকাল ভালোবাসবো। একই ভাবে ভালোবাসবো। তবে ওই যে, ওই মোড়কটি খুলে দেখলেই বুঝবে আমি এমন হতভম্বের মতো কেন তাকিয়েছিলাম তোমার দিকে।"


ডেলা ওর ভয়ে দুঃখে ফ্যাকাশে হয়ে আসা আঙ্গুল দিয়ে সযত্নে মোড়াটি খুলল। এবং খুলেই আনন্দের উচ্ছ্বাস। মুহূর্তেই অবশ্য তা বদলে গেলো চোখের জলে। কেন? কারণ ওর সামনে রয়েছে সেই চিরুনি। সেইইই চিরুনি, যা একদিন দোকানে দেখে খুব পছন্দ হলেও, মূল্য দেখে আর কেনা হয়নি। সাধ্যের বাইরেই ছিল ওর শখ। অপূর্ব সুন্দর এই চিরুনি, মণিমুক্তো খচিত। একদম ডেলার মনোরম চুলের সাথে মানানসই। একদা যা শখের ছিল, আজও আছে, আজ সাধ্যেও রয়েছে, এদিকে সেই চুল আর নেই।


বুকে আগলে রেখে খানিকক্ষণ চোখ বন্ধ করে রইলো ডেলা। তারপর বলল," জিম, আমার চুল খুব শিগগিরই লম্বা হয়। তুমি চিন্তা করো না।"


মুহূর্তেই যেন কী মনে পড়ে গেলো ওর। জিমের জন্য আনা উপহারটি বের করে আনলো ও জিমের সামনে। সোনার বন্ধনীটি যেন সোহাগের আদরে আরো নরম, আরো সুন্দর দেখাচ্ছে। জিমকে ওটা দেখাতে দেখাতে ডেলা উচ্ছ্বসিত হয়ে জিজ্ঞেস করলো, "এটা কী দারুণ না জিম? একদম মানানসই হয়েছে তোমার ঘড়ির সাথে জানো, আমি সারা শহর ঘুরে তবে এটা পেয়েছি। দেখি দেখি তোমার ঘড়িখানি দাও দেখি। দেখো তো কেমন দারুণ মানিয়েছে দুটিকে। কই? দাও?'


জিম উত্তর দেয় না। হাসে। তারপর থপ করে বসে পড়ে খাটে। তারপর ডেলাকে ধীরে ধীরে বলে, "ডেলা, এসো, আমরা খেয়ে নিই। আমাদের একে ওপরের জন্য আনা উপহারগুলি বরং এখন তোলা থাক। এখন ব্যবহার করা যাবে না। ওগুলি বড্ড বেশিই সুন্দর। আমি আমার ঘড়িটা বিক্রি করে দিয়েছি তোমার চুলের চিরুনির জন্য। এসো, আমরা খেয়ে নিই।"


ম্যাজাইরা ছিলেন বুদ্ধিমান লোক। শিশু যীশুর জন্মের পর তাঁরা দূর দূরান্ত থেকে এসে উপহার দিয়েছিলেন যীশুকে। সম্ভবত ওইগুলিই প্রথম বড়দিনের উপহার। তাঁরা ছিলেন বুদ্ধিমান, অগত্যা, ওঁদের আনা উপহারও ছিলো দামী, মূল্যবান ও কার্যকরী। আর আজ যাদের কথা বললাম, তারা বোকা। তাদের উপহারেরও কোন আর মানেই রইলো না। তবে তারা, প্রেমে পাগল হয়ে বোকা। একে অপরকে নিজের চেয়েও বেশি ভালোবেসে বোকা। নিজেদের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পত্তি বিক্রি করে অন্যের জন্য উপহার কেনার মতো বোকা। কিন্তু না, আমি বলি কী, যতজন আজ অবধি উপহার দিয়েছে, এই দুজনের মতো বুদ্ধি কারুর নেই। এরাই যথার্থ ম্যাজাই। এরাই আসল বুদ্ধিমান। ভালোবাসামাখা উপহার এরাই দিয়েছে।

Saturday, February 15, 2020

- "যদি বলো হ্যাঁ, বি সি এসে বসে যাবো আমি।" হ্যাঁ, এইটা গুনগুন করতি না তুই কলেজ ক্যান্টিনে?
(চুপ)
- কী রে, কথা নেই কেন মুখে?
- হ্যাঁ মানে..
- মানে মানে করছিস কেন বল তো?
- ইয়ে মানে
- ওই ইয়ে মানে এই করেই যা তুই। যখন প্রেম করতাম, পটানোর দরকার ছিল, তখন কত ডায়লগ, হ্যাঁ? খালি গান আর গান? আর এখন? একটু বললাম আজকে তাড়াতাড়ি আসতে। স্পেশাল ওকেশন। সেলিব্রেট করবো। তা না। আজকের দিনেও তুই লেট। সো নট ডান।
- শোন না। প্লিজ, রাগ করিস না। লক্ষ্মীটি?
- তুই থাম। নেহাৎ পাবলিক প্লেস। তাই আমি চুপ করে আছি। বাড়ি চল। দেখাচ্ছি মজা।
- (নীচু স্বরে) এখনই যা চ্যাঁচাচ্ছিস, এর চেয়েও বেশি? ওরে বাবা রে।
- কী, কী বললি?
- না কিছু না।
- তাই বল। তখন থেকে জিজ্ঞেস করছি, কেন দেরী হলো, তার উত্তর কই?
- আরে সেটাই তো বলার চেষ্টা করছি। বলতে দে।
- বল না। কখন থামালাম?
- সেই তো।
- আবার টন্ট?
- ওই দেখ। কথাই বলতে দিচ্ছিস না।
- তুইই বাজে বকে চলেছিস।
- আমি বাজে বকি?
- না। তবে বেশি বকিস।
- সেই তো। এখন তো আমি বাজে বকি। বেশি বকি।
- ওই দেখ। ও মা, রাগ করেনা সোনা।
- হুহ।
- শোন না। একটা গুড নিউজ আছে। ঐটার জন্যই দেরি হলো।
- কী নিউজ?
- আজ বি সি এসের রেজাল্ট বেরিয়েছে। তোকে না বলে আমি পরীক্ষা দিয়েছিলাম। প্রিলি ক্লিয়ার করেছি!
- সত্যিই?
- তিন সত্যি! তোকে বলতাম গান গেয়ে? তুই তখন একবার হ্যাঁ বলেছিলি। তাই...
- মাই গড, এটা দারুণ খবর!
- ওই রেজাল্ট দেখতে গিয়েই দেরি হলো।
- সব মাফ। চল, লেট আস সেলিব্রেট। এর চেয়ে ভালো ভ্যালেন্টাইনস ডে উপহার আর কিছুই হয় না। ইউ কেপ্ট ইয়োর ওয়ার্ডস! থ্যাংক ইউ সো মাচ!
- লাভ ইউ! তুই না থাকলে, ইন্সপায়ার না করলে হতই না!
- লাভ ইউ টু!

Friday, February 14, 2020

রেডিও
সুচেতনা

(১)
ধুর ধুর, স্কুলের সব বন্ধুরা কী সুন্দর পুজোর ছুটি, গরমের ছুটি পড়লেই বেড়াতে বেরোয়। আর এদিকে পুপুর সেই সুযোগই নেই। বাবা মায়ের যে কী এমন অদ্ভুত চাকরি। বছরে ওই একবারই যা ওরা কোথাও যায়, শীতকালে। বাকি ছুটিগুলো বড্ড মন খারাপের মধ্যেই কাটে। শনি রবিবারগুলোও তো কখনো সখনো ওদের অফিস থাকে। এবার ছুটিতে ঠাম্মা এসেছে ওদের বাড়ি। বেচারি ঠাম্মা, টিভি সিরিয়াল ছাড়া চলেই না। এদিকে বাবা মায়ের কড়া আদেশ। পুপু যতদিন না আরেকটু বড় হচ্ছে, বাড়িতে কেবিল টিভি আসবেই না। অগত্যা, ঠাম্মার জন্য তড়িঘড়ি লফ্ট থেকে নেমে এলো এই কালো বাক্সটা। ব্যাটারি পাল্টিয়ে খুট করে সুইচ অন করতেই ম্যাজিক। পুপু অবাক। মুগ্ধ। দারুণ ব্যাপার তো। কী দারুণ অনুষ্ঠান সারাদিন ধরে। কত চ্যানেল। নানান প্রোগ্রাম। একটায় আবার বেলায় ইংলিশ ক্লাসিক্স, দুপুরে নাটক, বিকেলে হিন্দি গান। কোনো চ্যানেলে আবার সারাদিনই হিন্দি বাংলা বকবক আর গান। মজার মজার সে বকরবকর। দিব্যি ভালো তো! যাক, ছুটিগুলো বোধহয় আর বোরিং কাটবে না পুপুর।

(২)
চাকরির এপয়েন্টমেন্ট লেটারটা হাতে পেয়ে অর্ক মোটেই খুশি হয়নি। যদিও অফিস পোস্টিং দিয়েছে কলকাতাতেই, তবুও, সেটা বড্ড দূর বাড়ি থেকে। রোজ রোজ যাতায়াত করতে হবে ভাবলেই গায়ে জ্বর এসে যাচ্ছে। এমনিতেই ট্র্যাফিকের যা অবস্থা শহরে, তার ওপর আবার টালা ব্রিজ বন্ধ। তারপর রোজই কোনো না কোনো মিছিল মিটিং। মা বাবাকে একবার বলেই দেখলো প্রস্তাবটা, অফিসের কাছাকাছি কোথাও একটা বাড়ি ভাড়া নিয়ে থাকবে। সুবিধে।
ছেলের মুখে এই প্রস্তাব শুনে মায়ের তো প্রায় মূর্ছা যাওয়ার জোগাড়। চার বছর বাড়ির বাইরে, হোস্টেলে থেকে ছেলে সবে কলকাতা ফিরেছে। আবার এই কদিনেই যদি আবার বাড়ির বাইরে চলে যেতে হয়, তা হলে তো মুশকিল। চার বছরে ছেলেটা ঠিকঠাক যত্ন পায়নি। উঁহু। আর একে হাতের বাইরে মোটেই ছাড়া যাবে না। অর্কর প্ল্যান মা একাই ভেস্তে দিলো। অবশ্য সমাধান দিয়েছে বটে। ছেলে একটু সকাল সকাল উঠে পড়বে। বাস জার্নি করেই যাবে। জার্নিটা লম্বা ঠিকই। কিন্তু কানে গোঁজা থাকবে এফ এম রেডিও।
আজকাল অর্ক বাসেই যাতায়াত করছে। আর জে ও হিন্দি বাংলা গানের কল্যাণে দেড় ঘন্টা যে কীভাবে পেরিয়ে যায়, খেয়ালই পড়ে না আর!

(৩)
মন দিয়ে টেস্ট পেপার থেকে ভেক্টরের অঙ্ক সমাধান করছিল মিথি। আর কদিন বাদেই হায়ার সেকেন্ডারি পরীক্ষা। ভেক্টর নিয়ে বেশ জেরবার। গোটা ফিজিক্স নিয়েই জেরবার। টিউশন ক্লাসও শেষ। তবে ওর রিভিশন এখনো চলছে। কয়েকটা অঙ্ক আটকেওছে। টেনশন হচ্ছে। কী যে করে। কে জানে, অংশু এগুলো সলভ করেছে কি না। ও কে জিজ্ঞেস করে লাভ আছে? অন্তত ও না পারলে, ওর দাদাকে ও জিজ্ঞেস করে জানাবে না হয়। দাদাভাই তো ফিজিক্সেরই ছাত্র।
মোবাইল হাতে নিয়ে মিথি মেসেজ করে অংশুকে। "এবারের টেস্ট পেপারের পেজ ২৪১ এর কোয়েশ্চেন ২এ টা মাথায় ঢুকছে না। একটু সলভ করে হোয়াটসআপ করে দে তো।" মুহূর্তেই ব্লু টিক। মেসেজ পড়েই অংশুর উত্তর, ওকে। তুই ততক্ষণ রেডিও শোন। ১০৯.৩ মেগাহার্টজ এ। ভালো গান দিচ্ছে পরপর। আমি ততক্ষণ কোয়েশ্চেনটা দেখছি।"
মিথি রেডিও চালায়। সত্যি তো, বেশ ভালো গান। পরপর দুটো হলো। দুটোই ওর ফেভারিট। অনুরোধের আসর গোছের হচ্ছে। লোকজন মেসেজ করে জানাচ্ছে প্রিয় মানুষদের প্রতি ডেডিকেশন। একেকজন বেশ মজার মজার কথা লিখে পাঠাচ্ছে। মন দিয়েই শুনছিলো মিথি। আর ঠিক তখনই আর জে বললো, "আচ্ছা, আজ কিন্তু কিস ডে। জানেন তো? আর সেই উপলক্ষেই পরের মেসেজ। বেশ ইন্টারেস্টিং। লিখেছে অংশু। মেসেজটা পাঠিয়েছে মিথির জন্য। বলছে, সামনেই আমাদের এইচ এস। আজ দেখাসাক্ষাৎ তো হচ্ছে না। তাই পরের গানটা বিশেষ করে ওর জন্য।
"আজ, ঠোঁটের কোলাজ থামালো কাজ
মন তোমাকে ছুঁয়ে দিলাম..." বাঃ, দারুণ তো। তাহলে এই রইলো বিশেষ দিনে, বিশেষ গান। শুনতে থাকো। এনজয়।"
মিথির মুখ সলজ্জ হাসিতে রাঙা হয়।

(আজ বিশ্ব রেডিও দিবস। সেই উপলক্ষে এই পুঁচকি নিবেদন। রেডিও আমাদের জীবনের সাথে ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে আছে। সাথে নিয়ে অনেক মিষ্টি মধুর স্মৃতি। সে মহালয়ার ভোর হোক, বা অনুরোধের আসর। রেডিও আর আমাদের সম্পর্ক আজকের কথা নয়!)




Wednesday, February 12, 2020

আলিঙ্গন



(১)
ফেব্রুয়ারির কলকাতা। ঠান্ডাটা এখনো যাবো যাবো করেও যায়নি। জলসা পার্টির জন্য সবচেয়ে যথাযথ সময়। রুমিদের ছাদের গানের আসর তাই জমে গিয়েছে। রুমির দাদা ও তার বন্ধুরা, রুমি ও তার বন্ধুরা, সব্বাই হাজির। গান গল্প আর কাবাব সহকারে শীতের রাত জমে যায়, প্রতি বছর। এতক্ষণ রুমিদের "ব্যান্ড"এর গান হলো। বেশিরভাগই হালফিলের বলিউড আর হলিউড। এখন টুকরো বিরতি। বিরতির অবসরেই পিকলু রুমিকে চোখের ইশারায় ডেকে নিয়ে গেল ছাদের একটা নিরিবিলি কোণে। পিকলু, রুমির দাদা সুবুর বেস্ট ফ্রেন্ড। আবার কলেজ হোস্টেলের একদা রুমমেটও। এখন একই অফিসে চাকরিও করে। রুমি সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে তাকায় পিকলুর দিকে। পিকলু  বলে, "গানের গলা তোর এত ভালো। এত স্পষ্ট বাংলা ইংরেজি হিন্দি উচ্চারণ। এদিকে গেয়ে বেড়াস যত হাবিজাবি গান। কেন রে?" রুমি পাল্টা প্রশ্ন করে, "কেন, ভালো হয়নি?" পিকলু জবাব দেয়, "তা না। কিন্তু নিজের গুণকে মর্যাদা দিতে পারিস না এইভাবে।" রুমি কিছু বলে না। হাতের কফি কাপটা নামিয়ে রেখে দাঁড়িয়ে থাকে দেয়ালে হেলান দিয়ে। রাতের কলকাতার ঝিকমিক আলো। মায়াবী। টের পায়, পাশে পিকলুও দাঁড়িয়ে আছে। তবে পিকলুর দৃষ্টি ওরই দিকে স্থির। ওর দিকে না ফিরেই রুমি বলে, "কিছু বলবে?" পিকলু চুপ থাকে। তারপর প্রায় মিনিট দুই পর রুমিকে বুকে জড়িয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। এই বন্ধনে রয়েছে অনেকটা আশ্বাস। ভরসা। ভালোবাসা। গাঢ় কণ্ঠে বলে, "পাগলী, ভয় পাচ্ছিস কেন? আমি তো যাচ্ছি এই মোটে দু বছরের জন্য। ফিরে তো আসবই। ফিরতে তো আমাকে হবেই। আমার এই পাগলীটা রয়ে গেলো যে এখানে।"
নাঃ। রুমি উত্তরে কিচ্ছু বলতে পারে না। শুধু আরো খানিকক্ষণ পিকলুর শরীরের ওমটুকু শুষে নেয়। তারপর কোনোমতে নিজেকে ছাড়িয়ে এগিয়ে যায় স্টেজের দিকে। গিটার হাতে উঠে গাইতে থাকে, মঞ্চে প্রথমবার, রেট্রো গান। রুমির এ যাবৎ সেরা উপস্থাপনা।

"Paas aiye ki ham nahin
Ayenge baar baar
Bahen gale mein daal ke
Ham ro le zaar-zaar
Ankhoon se phir ye
Pyaar ki barsaat ho na ho
Shayad phir is janam mein
Mulakat ho na ho"



(২)

সারা রাত বীভৎস কেটেছে ওদের। ওদের, মানে, রুমি আর পিকলুর। সাত মাসের মেয়ে পুপুলের সারা রাত জ্বর আর তার জেরে বেচারি একটুও ঘুমোতেই পারেনি। কান্নাকাটি করেই চলেছে। নতুন বাবা মাও তাই দু চোখের পাতা এক করতে পারেনি এক মুহূর্তও। ভোরের দিকে তাও পুপুল শান্ত হয়ে একটু ঘুমোলে, রুমি ল্যাপটপ খুলে নিজের কাজ নিয়ে বসতে পেরেছে। ইন্টারন্যাশনাল অফিসে আজ ওর খুবই গুরুত্বপূর্ণ প্রেজেন্টেশন, বড়সড় ক্লায়েন্টের জন্য। এটায় ভালো করে ওকে আজ কাজ দেখাতেই হবে। কেরিয়ারের উন্নতি অনেকটাই নির্ভর করে আছে আজকের প্রেজেন্টেশনের ওপর। তার ওপর আবার ছয় মাস ম্যাটারনিটি লীভের পর এটাই বড় মঞ্চ, নিজেকে আবার লাইমলাইটে অ্যানার জন্য। সব মিলিয়ে রুমির জন্য আজকের এই দিন একেবারে "ডু অর ডাই"। এমনই দিনে মেয়ের জন্য সারা রাত জেগে থাকতে হলো। মাঝে মধ্যে যে ও কাজের চেষ্টা করছিল না, তা নয়। পিকলু বরং ওকে বারবার বলছিলও, ওই সামলে নেবে। রুমি যেন কাজে মন দেয়। কিন্তু পুপুল যে এতদিন মায়ের সান্নিধ্যেই অভ্যস্ত। পিকলু সবে দশদিন হলো অফিসের কাজ থেকে বাড়ি ফিরেছে। তাই এখনও মেয়ের সাথে তেমন করে সখ্যতা গজিয়ে ওঠেনি। 

আটটার দিকে রুমি ল্যাপটপ বন্ধ করে উঠে পড়লো অফিসের জন্য  তৈরি হতে। পিকলুও অন্য ঘরে নিজের অফিসের জন্য তৈরি হতে গিয়েছে। দুজনে একসাথে ব্রেকফাস্ট সেরে বেরিয়ে পড়বে কাজে। দুজনের অফিস দুই প্রান্তে। দুটো গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে যাবে দুজন। পুপুল থাকবে ন্যানির কাছে। আজ এর মধ্যেই মেয়ের ন্যানি এসে গিয়েছে। ওকে ওষুধপত্র ঠিকমতো বুঝিয়ে দিয়েছে রুমি। কিছুটা নিশ্চিন্ত। তবুও, মায়ের মন, মেয়েকে ফেলে যেতে মন কেমন করছিল। বেরোতে গিয়ে বারবার ব্যাগ ফেলে এলাম, চাবি ফেলে এলাম, এরকম নানান ছুতো করে পুপুলের কাছে ফিরে যাচ্ছিল রুমি। পিকলু খেয়াল করেছে সেটা। চতুর্থবার যখন রুমি "এই যাহ্‌, জল খেয়ে এলাম না" বলে আবার ফ্ল্যাটের ভিতর ঢুকতে এগোচ্ছে, পিকলু ওকে দু হাত দিয়ে থামিয়ে দৃপ্ত কন্ঠে বলল, " শোন, এত প্যানিক করিস না তো। শি উইল বি ফাইন। অ্যাবসোলিউটলি ফাইন। তুই প্রেজেন্টেশনে কন্সেন্ট্রেট কর। পুপুলের কাছে তো সীতা রইলোই।" রুমি ধরা গলায় উত্তর দেয়, "মেয়েটাকে জ্বরের মধ্যে ফেলে রেখে যেতে খুব গিলটি ফিলিং হচ্ছে রে।" পিকলু শক্ত করে ওকে নিজের বুকে জড়িয়ে বলে, "সে তো বুঝছি। কিন্তু শোন, তোকে আজ যে অফিস জেতেই হবে। নইলে কিন্তু বড় হয়ে তোর মেয়ে যদি শোনে যে অর কথা ভেবে তুই এমন চান্স মিস করছিস, শি উইল নেভার ফরগিভ ইউ। কাজেই বলি কী? আমি না হয় আজ ওয়ার্ক ফ্রম হোম নিয়ে নিই। তুই নিশ্চিন্তে  অফিস যা। ওকে?" রুমি শান্ত হয়ে আকড়ে থাকে পিকলুকে। মুহূর্ত থমকে যায়। এইগুলোই তো প্রাপ্তি, এইটুকুই তো চাওয়া-পাওয়া।

পরিস্থিতিগুলো পাল্টে যায়। কিন্তু পাত্র পাত্রী আর আলিঙ্গন, আর তার সাথে লেগে থাকা ভরসাগুলো এক রয়ে যায়।  ফোর এভার।   

"Hum ko mili hai aaj
Ye ghadiya naseeb se
Je bhar ke dekh leejiye
Hamako kareeb se"