Friday, March 30, 2018

উপহার

মামার অভাবের সংসারে বড় হওয়া মেয়ে শ্যামলী। বাবার মৃত্যুর পর মা মেয়ের ঠাই হয়েছিল এই সংসারে কেবলমাত্র দিদিমার কৃপায়। খুব একটা সুখে তো বড় হয়ইনি শ্যামলী, সাচ্ছ্বল্য কাকে বলে, তা বুঝতেই পারেনি। মা দিন রাত দাদার সংসারে কায়িক পরিশ্রম করে নিজেদের খরচা দিত। শ্যামলীও একদম চুপচাপ থাকত, কোনদিনও কোন সখ আহ্লাদের কথা মুখেও আনেনি। সরকারী স্কুলে কোনোমতে টুয়েলভ পাস করতে না করতেই মামীর তাড়াহুড়োয় বিয়ে হয়ে গেল ওর কৃষ্ণকান্তর সাথে। মা বা মেয়ে কেউই বারণ করতে সাহস পায়নি। কৃষ্ণকান্তও বাপ মা মরা ছেলে। কাকার সংসারে মানুষ। তবে কপাল জোরে লেখাপড়ায় মাথা ছিল ভালো, তাই স্কলারশিপ পেয়ে বি এ পাস করে এখন গ্রামের সরকারী স্কুলের এসিস্টেন্ট টিচার। বয়সে দশ বারো বছরের ছোট মেয়েটিকে যখন বিয়ে করে নিজের ছোট্ট বাড়িতে আনেন, বড় মায়া পড়ে যায় ওর ওপর। নিজের তেমনভাবে সখ আহ্লাদ কোনদিনও মেটেনি বলে শ্যামলীর অবস্থাটাও ভালোই আন্দাজ করতে পারতেন। আর তাই, ফুলসজ্জার দিনেই কথা দেন স্ত্রীকে। সমস্ত সখ আহ্লাদ পূরণ করবেন।
শ্যামলী মুখচোরা মেয়ে। একেই ছোট থেকে চুপচাপ যেটুকু লোকের দয়ায় পায়, তাই দিয়ে কাজ চালিয়ে মানুষ। তার ওপর বয়সের পার্থক্য। স্বামী বহুবার জিজ্ঞেস করলেও কিছুতেই মুখ খোলেনি নিজের চাহিদা বা আবদারের কথা বলতে। রান্নাঘরে বসে তরকারি যখন কড়াইতে ফুটতে থাকে, তখন যে গুনগুন করে গান গায়, ইচ্ছে তো করতোই মামাতো বোন চিনুর মত হারমোনিয়াম বাজিয়ে গাইবে। গলাও ভালো। স্কুলে তো প্রতিবার প্রাইজ পেত শ্যামলী। কিন্তু বাড়ির চার দেওয়ালের মধ্যে সেই সব রুদ্ধ। তাই সারাদিন একলা বাড়িতে রেডিয়োতে নতুন পুরনো গান শুনে নিজের মনে গুনগুন করে কাটিয়েই বেশ চলছিল। কোন কোন দিন অবশ্য কৃষ্ণকান্ত বাড়ি এসে চা চাইতে গিয়েছে, সাড়া পায়নি। কী হল, কোথায় গেলো, দেখতে গিয়ে দেখেন রান্নাঘরের দাওয়ায় বসে রেডিয়োর সাথে তাল মিলিয়ে মনের আনন্দে গান গাইছে শ্যামলী। দুই চোখ বন্ধ। কী নিষ্ঠা। ওই তন্ময়ী রূপ দেখে ওকে তখন থামাতে ইচ্ছেই করেনি। গান থামতে "বাহ, ভারী সুন্দর গলা তো তোমার। গান গাও না কেন আরো?" শুনে লজ্জা পেয়ে বাড়ির মধ্যে ঢুকে যায় শ্যামলী।
আজ দোসরা ফাল্গুন। বিয়ের সময়ে কুষ্ঠি দেখে কৃষ্ণকান্ত জানতে পারে ওইদিন শ্যামলীর জন্মদিন। রোজের মতোই স্কুলে বেরিয়ে যান কৃষ্ণকান্ত। সবে দুপুরের খাবারের থালা বাসন ধুয়ে রান্নাঘর গুছিয়ে শ্যামলী একটু শুতে যাবে, এমন সময় শুনতে পেল স্বামীর হাঁকডাক। "কই গো, কোথায় গেলে? একবার এসো বাইরে।" শ্যামলী হন্তদন্ত হয়ে বেরিয়ে এসে দেখে রিকশা থেকে একটা মাঝারি মাপের কাঠের বাক্স নামাচ্ছেন তার স্বামী। "এই নাও, জন্মদিনের উপহার। এই হারমোনিয়াম। আজ থেকে তুমি গলা ছেড়ে গান গাইবে। আর বিধু মাস্টারকে বলে এসছি। এবার থেকে রবিবারগুলো সকালে তুমি ওনার ক্লাসে যাবে। গান শিখবে।"
আনন্দে আপ্লুত অভিভূত শ্যামলী ঢিপ করে স্বামীর পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করল আর বলল, "আমার আরেকটা আবদার আছে। যদি পূরণ হয়। আমায় কলেজে ভর্তি করে দেবে? আমার লেখাপড়া করারও খুব ইচ্ছা।"
" অবশ্যই। এ ভারি ভালো কথা। আমি কালকেই যাব, খোঁজখবর নিতে। শিক্ষার চেয়ে ভালো উপহার আর কিছু হয় না কি?"

Wednesday, March 28, 2018

আমার পাওয়া উপহার


উপহার বুঝি এমন একটা জিনিস যেটা পেতে এবং দিতে, দুইই ভালো লাগে। কাউকে কোন উপলক্ষ্যে বা এমন কী, কারণ ছাড়াই উপহার দিতে ইচ্ছে হলে, অনেক ভেবেচিন্তে দিই, তাঁর কী ভালো লাগতে পারে, কাজে লাগতে পারে, ইত্যাদি ভাবনাচিন্তা করেই। নিজেও তাই যখন পাই, একটা আশা থাকে যে অনেক ভাবনা চিন্তা করেই কেউ আমায়ও দেবে। অনেকেই দেন, আবার অনেকেই সেই একঘেয়ে স্টোনডাস্টের মূর্তি বা পার্কার পেন দিয়ে কাজ সাড়েন। যদিও কেউ হয়তো ওই মূর্তির শিল্পকলা খুবই ভালোবাসেন, আমি অবশ্য চারুকলা বিষয়ে এক্কেবারে আকাট মূর্খ। তাই হাজার চেষ্টা করেও উপহারের মর্যাদা দিতে পারিনা যথাযথ। এই মুহূর্তে বসে আমার সবচেয়ে পছন্দের উপহার বলতে গেলে বলব বই। গোগ্রাসে গিলে ফেলতে পারি। যত পাবো, তত ভালো। আশ মিটবেনা। আমার পাওয়া কিছু উপহারের কথা বলি এই প্রসঙ্গে।

প্রথম মুখ দেখা, অন্নপ্রাশন, জন্মদিন ইত্যাদি অনুষ্ঠানে ঠাকুমা দিদিমা মাসির কাছ থেকে পেয়েছি কিছু সোনার গয়না। তখন সেগুলোর তেমন কিছু বুঝতাম না। এখনো বুঝিনা বিশেষ। শুধু পুরনো দিনের সোনা আর কিছু সাবেকি ডিজাইন বলে দেখতে ভালো লাগে। থাকে তো সেই লকারেই।

যখন ক্লাস ফাইভে পড়ি, তখন জন্মদিনে মাসি আমায় একটা টাইমেক্সের ঘড়ি দিয়েছিল। ওই প্রথম রিষ্ট ওয়াচ। সেই থেকে,হাতঘড়ির ওপর দুর্বলতা শুরু। ঘড়ি পরে রোজ স্কুলে যেতাম। ওই ঘড়িটা পরে মাধ্যমিক পরীক্ষাও দিই। একটা কালো সিন্থেটিক ব্যান্ডের ওপর কালো গোল ডায়ালের ঘড়ি। ইলেভেনে উঠতে জন্মদিনে বাবা মায়ের থেকে পেলাম তখনকার স্টাইল আইকন, একটি ফাস্ট ট্র্যাক ঘড়ি। সেই ঘড়ি আমি বোধহয় গত বছর অবধি ব্যবহার করেছি। দারুণ টেকসই ছিল।


ক্লাস এইট। ফাইনাল পরীক্ষায় রেজাল্ট আনতে গিয়েছি। বাবা বাইরে অপেক্ষা করছে পেট্রোল পাম্পে। গেট থেকে বেরোলাম হাসিমুখে। বাবা জিজ্ঞেস করল, কেমন হয়েছে। আমি শুধু হাসিমুখে তর্জনী দেখালাম। অর্থাৎ কিনা, প্রথম হয়েছি ক্লাসে। বাবা তখন সদ্য এটিএম কার্ড ব্যবহার শুরু করেছে। পাশেই একটা আইসিয়াইসিয়াই বা এইচডিএফসি কিছুর এটিএম থেকে একশো টাকা তুলে আমায় উপহার দিলো। সে কী আনন্দ আমার!

মনে পড়ে গেল, কলেজে সেকেন্ড ইয়ারে থাকাকালীন বোস ইন্সটিটিউতে ক্যুইজ কম্পিটিশন হয়েছিল। আমরা সেকেন্ড হয়েছিলাম। আমাদের তখন ডিপারট্মেন্টাল হেড, উডিতা দি, ভীষণ খুশী হয়ে খামে ভরে একশো টাকা দিয়েছিলেন। বলেছিলেন "যা ইচ্ছে কিনে নিয়ো। আমার পক্ষে তো সম্ভব হয়নি।" দিদি উইলচেয়ারেই যাতায়াত করতেন, চলাফেরায় ছিল অনেক অসুবিধে। তবুও সেই প্রতিবন্ধকতাকে বাঁধা হতে না দিয়ে ঠিক আমাদের জন্য উপহার এনেছিলেন মনে করে, বিরাট প্রাপ্তি। ওই টাকাটি আজও খরচা করিনি। সযত্নে তুলে রেখেছি।


এরপর বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন মেটিরিয়ালিস্টিক উপহার পেয়েছি। কখনো জন্মদিনে, কখনো রেজাল্ট ভালো করলে, ইত্যাদি। ইলেভেনে উঠলে ক্যালকুলেটর লাগবে বলে সেই বছর জন্মদিনে মা সাইন্টিফিক ক্যালকুলেটর দিয়েছিল। সযত্নে রয়েছে। বড় হওয়ার সাথে সাথে যেন উপহারগুলো অনেকটা দরকার, তাই কিনতে হবে, জন্মদিন আসছে, তাহলে জন্মদিনের উপহার হোক, এই ভাবে কেনা। রিসার্চ শুরু করার পর এক্সটারনাল হার্ড ডিস্ক কেনার খুব দরকার থাকায়, জন্মদিনে মা বাবা এক টিবির হার্ড ডিস্ক দিল। সে বছর আমি কিনলাম একটি কিন্ডল। হস্টেলে বই রাখার জায়গা নেই। তাই এই অল্টারনেটিভ ব্যবস্থা।


টাকা উপার্জন করতে শুরু করার পর আমি নিজেও নিজেকে বেশ কিছু পছন্দসই উপহার দিয়েছি। কন্টেন্ট রাইটিং করে টাকা জমিয়ে প্রথম স্মার্ট ফোন কিনি। সেই সাথে কিনি একটি নিকন কুলপিক্স ক্যামেরা। দুটোই পি এইচ ডি এডমিশন পাওয়ার আনন্দে কেনা। সেই বছরই জন্মদিনে আবার নিজেকে একটি টাইটান রাগা উপহার দিই। তখন সায়েন্স কলেজের স্কলারশিপের সামান্য টাকা বাঁচিয়ে ওইটা কিনতে পারার মধ্যে সে কী আনন্দ।

পি এইচ ডির স্টাইপেন্ড পাওয়ার পর থেকে উপহার দেওয়ার বহর বেড়েছে। এখন দরকার অদরকারে মাঝে মাঝেই নিজেকে বিভিন্ন বই উপহার দিই। ব্যাগ কিনি। সুগন্ধী কিনি। গত বছর নিজেকে একটা ডি এস এল আর আর আরেকটা ঘড়ি (আমার প্রিয় রোজ গোল্ড) উপহার দিয়েছি। উপলক্ষয় বানিয়ে নিই ঠিকই।

আচ্ছা, এবারে একটু নন-মেটিরিয়ালিস্টিক কিছু উপহারের কথা বলি?

বাবা মায়ের কথা আসবেই আসবে এই প্রসঙ্গে। সারা জীবন তাদের ভালোবাসা পেয়েছি, সহযোগিতা পেয়েছি প্রতিমুহূর্তে। এর চেয়ে বড় উপহার কী হতে পারে? যে বছর বি এস সি পরীক্ষায় জঘন্য রেজাল্ট করলাম, সাঙ্ঘাতিকভাবে মুষড়ে পড়েছি। বাবা মায়ের আমার ওপর ভরসা ছিল ওই সময়ের শ্রেষ্ঠ উপহার। জানতাম যে কেউ থাকুক না থাকুক, তারা আছেই। আর তাদের জন্যই আমায় ঘুরে দাঁড়াতে হবে। মনোবল পেতাম তাদের ভরসায়। বাবা বেশী করে আত্মবিশ্বাস জুগিয়ে দিত। সব সময় প্রেরণা পেয়েছি।


যখনই মন খারাপ করে, সেই খারাপ লাগা গুলো শেয়ার করে মন হাল্কা করাটা তো খুব দরকার। সেটা করার জন্য কিছু খুব কাছের মানুষেরা আছে আমার জীবনে। তাদেরই একজনের সাথে গতকাল কথা হচ্ছিল। কিছুদিন আগে হঠাৎ করে বিশ্রী একটা ডিপ্রেশন গ্রাস করেছিল আমায়। তখন রাত জেগে কথা বলে অনেকটা আরাম পাই। আর কাল তার সাথে কথা প্রসঙ্গে একটা ভারি দামী কথা শুনলাম। " এই যে, তোমায় সক্কলে এত ভালোবাসে। আর এদিকে রাত বিরেতে তোমার মন খারাপ হয়। উল্টোপাল্টা চিন্তা করো। এরকম করবে না। জেনে রেখো, আর কেউ কী ভাবল না ভাবল, পৃথিবীর যে প্রান্তেই আমরা থাকি না কেন, সব সময় এই একজন আছেই যে তোমায় সব সময় ভালবাসবে আর তোমার কথা ভাববে।" (একটু প্যারাফ্রেজ করলাম, কিন্তু বক্তব্যটা এটাই।) এর চেয়ে ভালো কিছু কী হয়?

Monday, March 26, 2018

রিম ঝিম ঘন ঘন রে বরষে


হঠাৎ করেই মনে পড়ে যায় কত কথা। শেষ হয়েও যা হয়নি শেষ। হয়তো দরকার ছিল একটা closure।
গভীর রাতে নিদ্রাবিহীন চোখ। দু গাল বেয়ে নেমে আসে নোনতা জলের ধারা। অবিরাম। অনিবার।
তারপর স্বাভাবিকভাবেই এক সময় রাতের আকাশ ফর্সা হয়।
সব ঝেড়ে ফেলে নামতে হয় জীবন সংগ্রামে। একেই বুঝি বড় হওয়া কয়।

Saturday, March 24, 2018

কিছু মানুষের গল্প

কিছু মানুষের গল্প

১।

চাকরিটা আজ আমি ছেড়েই দিলাম। প্রথমে একটু দোনামনা করছিলাম বটে। অনেক কষ্ট করে লোন নিয়ে লেখাপড়া কমপ্লিট করে তবে গিয়ে এই এত মাইনের চাকরি পেয়েছিলাম। কিন্তু দিন রাত অফিসের টেনশনটা আর নিতে পারছিলামনা। আমার কঠোর পরিশ্রমে করা কাজগুলোর কৃতিত্ব সব অন্য লোকে নিচ্ছিল। এপ্রেইজালের সময় ভুলভাল রেটিং পাচ্ছিলাম, কেন? না বসের সাথে ট্যুরে গিয়ে আলাদা রুমে থেকেছিলাম বলে। দিন নেই রাত নেই, শনি রবির বালাই নেই, যখন তখন বসের ফোন, "এই কাজটা এক্ষুনি চাই।" "অমুক ফাইলটা এক্ষুনি পাঠাও।" " তমুক ক্লায়েন্টের সাথে এক্ষুনি মিট করো।" হঠাৎ হঠাৎ করে ছুটি ক্যান্সেল্ড। আরে বাবা, ওয়ার্ক লাইফ ব্যালেন্স নেই না কি? অবশ্য আমার তেমন অসুবিধে হবেনা, মাস গেলে মাইনে না আসলেও, আমার বউ তো আছে রে বাবা। বিরাট উঁচু পোস্টে চাকরি করে। আমি না হয় কিছুদিন ব্রেক নিই, একটু লেখালিখি গানবাজনা করি। তারপর পরের চিন্তা পরে হবেখন।




২।

"হ্যাপি বার্থডে লাভ।" একটা বিশাল লাল গোলাপের তোড়া এক হাতে, আরেক হাতে অজস্র গোলাপী হার্ট শেপের বেলুন নিয়ে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে রোহণ। ওকে যা সুন্দর দেখাচ্ছে না ক্রিম রঙের টিশার্ট আর ব্লু জিন্সে। সদ্য স্নান করেছে, গা দিয়ে শাওয়ার জেলের মাদক সুগন্ধ এখনো ভুরভুর করছে। ফর্সা গালে হাল্কা সবুজ খোঁচা দাড়ি অল্প। নিজেকে থামাতে পারলাম না। বিজ্ঞাপনের মেয়েগুলোর মতো ওকে ঘরে টেনে ঝাঁপিয়ে পড়লাম ওর ওপর।

কোনমতে জিনিসগুলো পাশে রেখে ঘন হওয়ার ঠিক আগের মুহূর্তে হাসতে হাসতে রোহণ বলে উঠল, "সোহম, তোর কীসের এত তাড়া?"

৩।

সাত্বিক আর কিঙ্কিণীর বিয়ের যখন ঠিক আর ছয় মাস বাকি, তখন কেমিক্যাল প্লান্টে একটা ছোট্ট আক্সিডেন্টের ফলে সাত্বিক গুরুতর আহত হয়। এর ফলে হারিয়ে ফেলে নিজের দৃষ্টি। ছাড়া পাওয়ার মাস খানেক পর বাবা মায়ের সাথে একদিন সাত্বিক এলো কিঙ্কিণীর বাড়ি। হবু শ্বশুর শাশুড়ির কাছে হাত জোড় করে বলল, " কাকু কাকিমা, আমায় ক্ষমা করবেন। আমি কিঙ্কিণীকে বিয়ে করে ওর জীবনের বোঝা হয়ে থাকতে চাইনা। এই বিয়ে বন্ধ হোক।" উপস্থিত বাকি সকলেই স্তব্ধ, নির্বাক।

খানিক নিস্তব্ধতার পর ভেসে এলো জানলার ধারে দাঁড়িয়ে থাকা কিঙ্কিণীর কণ্ঠস্বর। " বাবা, ওকে জিজ্ঞেস করো দৃশ্যপট যদি ঠিক উল্টে যেত, ও কী আমায় বিয়ে করতো না?"

আগামী পরশু ওদের পঞ্চম বিবাহবার্ষিকী। নিমন্ত্রনপত্র পেয়ে মনে পড়ে গেল ঘটনাটা।

****************************************************

এঁরাও কিন্তু প্রত্যেকেই আমার আপনার সকলের মতোই manউষই।

Wednesday, March 21, 2018

নতুনের আহ্বান

kajer loker meyer school jawa

mayeder internet e asha

biyer pore harmonium



যবে থেকে বকুলকে নিয়ে কাজের বাড়ি নিয়ে গিয়েছে মীনা, সেইদিন থেকে শুরু হয়েছে ওর জ্বালা। কেন যে মরতে সেদিন মেয়েকে নিতে গেলো, নেহাত শাশুড়ি ছিলনা, একা একা সারাদিন ওই কচি মেয়েটা থাকবে, না জানি কি করে ফেলবে, কোথায় বেরিয়ে হারিয়ে যাবে, সেই ভয়ে ভোরের আলো ফুটতে না ফুটতেই বকুলকে সাথে নিয়ে বেরিয়েছিল। আর ব্যস। শুরু হল বিকেল থেকেই মেয়ের ঘ্যান ঘ্যান। গোটা রাস্তা জুড়ে "মা, আমিও ইস্কুল যাবো, মা আমিও নতুন জামা পরবো। আমি ল্যাখাপড়া শিখব।" ইত্যাদি। মেয়েকে তেমন ভাবে দোষও দেওয়া যায় না। এইটুকু বাচ্চা, যা দেখবে, তাইই সখ হবে। সক্কাল সক্কালই তো চারিদিকে লাল নীল সাদা শার্ট প্যান্ট স্কারট ব্লাউজ পরে বড় বড় বাসে করে স্কুলে যায় ছোট্ট ছোট্ট বাচ্চাগুলো। মায়েরা বাবারা ঘুম ঘুম চোখে ওদের হাত নেড়ে স্কুলে পাঠায় এক নিশ্চিত ভবিষ্যতের জন্য। মীনা তখনই দেখেছিল বকুলের চোখে মুখে বিস্ময়।


মীনারও ইচ্ছে কি তা বলে হয় না? নিজে লোকের বাড়ি বাড়ি ঠিকা কাজ করে বলে কি মেয়েকেও সেই একই হতে হবে? কিন্তু টাকা? ইস্কুলে ভর্তির ব্যবস্থা? নতুন জামা বই? সি ব্লকের পাঁচতলার বৌদি ইংরেজি ইস্কুলে পড়ায়, সাহস করে বলে দেখিইনা, এই ভেবে সে আজ সকাল সকাল কথাটা পেড়েই দিল। " বৌদি, বলছি যে বকুল খুব ইস্কুলে যেতে চায়। কিছু ব্যবস্থা করতে পারো?"
" তা ভালো তো। ওকে স্কুলে দে। পাড়ায় পাড়ায় তো এত সরকারি স্কুল, তোদের বাড়ির দিকেও নিশ্চয়ই আছে। খোঁজ নে। শুরুতে যা টাকাপত্তর লাগবে, আমি না হয় দিয়ে দেবো। মাসে মাসে শোধ করে দিস সুবিধে মতো।"



বকুলের আনন্দ আর ধরে না। মা বিকেলে বাড়ি এসে ওর হাতে যখন একটা প্যাকেট ধরালো, ও প্রথমে "কী আছে এতে মা?" বলায় মা শুধু মুচকি হাসল। প্যাকেট থেকে যখন বেরোল চারটে বই আর দুটো খাতা,  দুটো লাল কালো পেন্সিল আর একটা সাদা রবার, বকুলের মুখে বিস্ময় ফুটে উঠেছিল।
"কাল থেকে ইস্কুল যাবি। আমি সব কথা বলে এসছি। এবার খুশি তো?"
সারা সন্ধ্যে বকুল নতুন বই খাতা শুঁকতে শুঁকতেই কাটিয়ে দিল। নেহাত খাবার পড়ে বই নষ্ট হতে পারে, এই বলে বই থেকে আলাদা করা গেল বকুলকে। রাত্রে হাতের কাজ সেরে মীনা ঘরে ঢুকে দেখে মেয়ে বই আঁকড়ে ঘুমোচ্ছে, অচেতনে। পরম শান্তি চোখে মুখে। চুলে বিলি কাটতে কাটতে দেওয়ালে টাঙ্গানো মা কালীর ছবিটার দিকে তাকিয়ে বলে, "মা, মেয়েটাকে দেখো।"



Tuesday, March 20, 2018

Thirty Days to Thirty

Thirty Days to Thirty


I have this calendar at my desk that gives inspirational quotes each day of the year. Today's one liner says "It's not how long life is but the quality of our life that is important." Funny that it had to come on a day when I am in the retrospective mode. It's exactly thirty more days till I hit the thirties.


Too many setbacks, plans A to Z gone haywire (currently surviving on Plan AZ of PlanLostCountOfTheNumber.xls), countless heartbreaks. Innumerable failures. Wrong decisions worth repenting. Endless tossing and turning in the bed. Dark circles. Weight gain. Stress. Relationships damaged. The last few years have been nothing less than a roller coaster ride.

Yet on the other hand...

Very very very supporting parents, almost always a supportive family (at least not the typical nagging/bugging one), loving friends who are more like family, good grades (it does really matter at times, no matter how much we deny it), some (however negligible it may be) contribution to the scientific community, rewards and recognition, opportunity to cultivate my hobbies.

In the end, I have come out stronger and happier than before.


I may have pictured a very different (and a rosy one) entry into the thirties..so many "Things to do/Places to visit before you turn 30" (including the much wanted Ladakh trip) still unchecked... but this isn't bad either!


Hello thirties.. on my way... (almost there)

Tuesday, March 13, 2018

ট্রুকলার



" হেলো, ইজ ইট মি ইউ আর লুকিং ফর?"

উফ, প্রতিদিন। প্রত্যেকদিন। ঠিক বিকেল তিনটে বাজবে। সবেমাত্র সুপ্রিয় ক্যাফেটেরিয়াতে চা খেতে আসবে, আর তক্ষুনি পকেটে রাখা ফোনটা বেজে উঠবে, অ্যালার্মের মতো। সেই একই নম্বর থেকে ফোন। ট্রুকলারে উঠবে, "স্প্যাম সুস্মিতা"। নেট না থাকলে নাম না উঠলেও এখন প্রতিদিন ওই এক নম্বর দেখে দেখে মুখস্থ হয়ে গিয়েছে ওর।

" নমস্কার স্যার, আমি হেলো বি জে এইচ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি থেকে সুস্মিতা কথা বলছি। আপনি কি এই মুহূর্তে কোন ইন্স্যুরেন্স পলিসির কথা ভাবছেন?"

খেয়ে দেয়ে কাজ নেই, মান্থ এন্ড। এক পাহাড় কাজ, কোনমতে একটু মাথা ছাড়াতে এসেছে, তখন নাকি ইন্স্যুরেন্সের কথা ভাববে। যতসব।

" গুড আফটারনুন স্যার। আমি সুস্মিতা বলছি। আমাদের একটা নতুন হেলথ পলিসি শুরু হয়েছে। সেখানে এগারো মাসের টাকা আপনি দিলে বারো মাসেরটা কোম্পানি দেবে। "

" ও ম্যাডাম, আপনি বোঝেন না কেন? আমি সত্যিই ইন্টারেস্টেড নই। রোজ রোজ কেন ফোন করেন রে বাবা?"

" স্যার আসলে এরকম ভালো একটা স্কিম বেশিদিন থাকবেনা। স্পেশাল অফার চলছে। আপনি কাইন্ডলি শুনুন।"

" ধুত্তেরি, এটা গয়নার দোকান নাকি যে এগারো মাস দিলে বারো মাসেরটা ফ্রি? আপনি রাখুন।"

এরপর হয়তো দুদিন গ্যাপ। শনি আর রবি। তারপর আবার সোমবার। ঘড়ি ধরে ঠিক তিনটে বাজতেই, " স্যার, আমাদের একটা নতুন ক্যান্সার হেলথ পলিসি শুরু হয়েছে। আপনি শুধু একবার টারমসগুলো শুনুন।"

" আপনি ফোন রাখুন। আমি ইন্টারেস্টেড নই। আমার ক্যান্সার হয়নি। চৌদ্দ গুষ্টিতে কারুর ক্যান্সার হয়নি।"

"স্যার, হতে কতক্ষন। তখন কিন্তু এটা কাজে লাগবে। শুনুন, ক্যান্সারের অনেক খরচা।"

" এই যে শুনুন। অনেক হল। সমানে প্রত্যেকদিন আপনাকে বলে চলেছি, আমি এসবে ইন্টারেস্টেড না। ভদ্রভাবে বললে হয় না? আর একবার ফোন করে দেখুন, মজা দেখাচ্ছি।"

এপ্রেইজালের দিন। ম্যানেজারের মুখ থমথমে। কে জানে কী রেটিং দিলো, সেই নিয়ে টেনশন চলছে। তার মধ্যে এই ভ্যান্তারা, বিরক্তিকর। সুপ্রিয় বোঝে, এটা হয়তো ওই মেয়েটা বাধ্য হয়েই করে, কাজ। এমনি এমনি কেই বা যেচে রোজ কারুর মুখঝামটা খেতে যাবে। কিন্তু আজকেরটা বাড়াবাড়ি।

পরপর তিনদিন আর কোন ফোন আসেনি। চা খেতে গিয়ে বন্ধুদের থেকে, "কী রে, তোর মোহনবাঁশি বাজল না যে আজ?" শুনে সুপ্রিয় একটু হাসে। যাক, সেদিনের ডোজটা একটু কড়া হয়েছে ঠিকই, কিন্তু কাজে দিয়েছে।

শুক্রবার, উইকেন্ড মুড চারিদিকে। সুপ্রিয়র আজ একটু উড়ুউড়ু মন। মায়ের বান্ধবীর নিকটাত্মীয়ার সাথে কফি খেতে যাওয়ার কথা। সন্ধ্যেবেলা। কোথায় আর ঠিক কখন মিট করবে, সেটা মেয়েটি জানাবে। সারাদিন ধরে চাতক পাখির মতো ফোনের দিকে তাকিয়ে আছে সুপ্রিয়। কাজের ফাঁকে ফাঁকে চেক করছে কোন মেসেজ ঢুকল কি না। পিতজা হাট, কে এফ সি, লাইফস্টাইল আর এইচ ডি এফ সি ক্রেডিট কার্ড ছাড়া আর কিছুই এলোনা। নিয়ম মতোই তিনটে নাগাদ ক্যাফেটেরিয়া যেতেই, অবাক কাণ্ড, ঠিক অ্যালার্মের মতোই আবার বেজে উঠল ফোন। স্ক্রিনে জ্বলজ্বল করছে ট্রুকলারে "স্প্যাম সুস্মিতা"। মরণ। আজ আর ঝগড়া করে মেজাজ খারাপ করতে ইচ্ছে করল না ওর। একটা রিং হতেই কেটে দিলো। আবার ফোন। আবার কেটে দিল। এরকম তিন চারবার হওয়ার পরও যখন পঞ্চম বার ফোন এলো, নম্বরটা ব্লক লিস্টে ফেলবে কি ফেলবে না ভাবতে ভাবতে ধরেই ফেলল। ধরেই, "কেটে দিচ্ছি মানে কথা বলতে আগ্রহী না, বুঝতে পারেন না? অদ্ভুত তো?" চিৎকার করে উঠল। কাটতে যাবে ফোন, এমন সময় ওদিক থেকে শুনতে পেল,

" এক মিনিট। একটা কথা শুনুন। তারপর ডিসাইড করবেন রাখবেন না ধরবেন। আমি সুস্মিতা। প্রীতি পিসি আমাকে আপনার নম্বর দিয়েছেন। আপনার মা জানেন। আমাদের আজ কফিশপে দেখা করার কথা, সেই নিয়ে কথা বলতেই ফোন করছি। আর আপনি অদ্ভুত মানুষ, সমানে কেটে দিচ্ছেন।"

" ইয়ে, মানে, সরি। আসলে বুঝতে পারিনি। ভেরি সরি। "

" রাখুন আপনার সরি। নেহাত পিসি দুঃখ পাবে, তাই। নইলে আপনার মতো অভদ্র একজনের সাথে কফি খেতে যাওয়ার আমার কোনমতেই ইচ্ছে নেই। "

" আমি আসলে বুঝিনি। বলছি তো, সরি। ভেরি সরি। কী করলে আপনি ক্ষমা করবেন বলুন?"

" লেক রোডের সি সি ডি তে চলে আসবেন ঠিক সাড়ে ছটা নাগাদ। আমাদের কোম্পানির অন্তত তিনটি পলিসি পেপারে আপনি সাইন করবেন। আর আজকের কফি বিলটা আপনি মেটাবেন। তবে ক্ষমা টমার কথা চিন্তা করব।"

" তাই সই।"


পুনশ্চঃ ছয় মাস পর সুপ্রিয়র জীবন এখন বেশ ভালোরকমই সুরক্ষিত। সব দিক দিয়েই।