Tuesday, June 20, 2017

মধু




অবশেষে সেই দিন চলে এলো। ১৩ই জানুয়ারি। আজ দুপুরের ট্রেনে উঠছি, গন্তব্য পুণা। যাচ্ছি একটি কনফারেন্স ও ওয়ার্কশপে। এই প্রথম পশ্চিম ভারতে যাওয়া, তার ওপর অনেকদিন বাদে ট্রেনে যাব, একা; অল্প হলেও উত্তেজনা হচ্ছিল। সাম্প্রতিক কালে সাইকেল থেক উল্টে গিয়ে ডান হাতে বেদম চোট পাওয়ার ফলে খুবই সামান্য লাগেজ নিয়ে বেরোলাম। চেন্নাই সেন্ট্রালে পৌছতে পৌছতে একটু দেরী হয়ে গেল বটে, দেখলাম প্ল্যাটফর্মে মুম্বাই মেল দাঁড়িয়ে আছে। ধীরে সুস্থে এ-১ এর সামনে গেলাম, মোটামুটি ফাঁকা। অভ্যেসবশতই এরপরে চার্টে নিজের নাম দেখলাম। হাতে কনফার্মড টিকিট থাকলেও চার্ট দেখাটা কখনো বাদ যায়না। আসলে আশেপাশের যাত্রীরা কে বা কারা, অন্তত নাম বয়েস এসব দেখে একটু কল্পনা করে নিতে ভালো লাগে। দেখলাম আমি যে চারজনের ব্লকটিতে লোয়ার বার্থে আছি, সেখানে আর কেউ নেই। এমনকি সাইড লোয়ার আপারেও কেউ নেই। ভালোই হল, ট্রেন কমবেশী ফাঁকাই যাচ্ছে। নিশ্চিন্তে যাওয়া যাবে, হুঠহাঠ মাঝরাত্রে ছোট বাচ্চার কান্নায় ঘুম ভাঙবার সম্ভবনা কম, বা অনেক রাত্তির অবধি এক দঙ্গল স্কুল পড়ুয়াদের গানের লড়াই বা তাস লুডোর উল্লাসে ঘুম না আসার সমস্যাও হবেনা। অতি প্রসন্ন হয়ে নিজের বার্থে বসলাম। সুটকেসটিকে সীটের নীচে এবং পোস্টারটিকে আপাতত সীটের ওপরে রেখে বেশ পা ছড়িয়ে আরাম করে বসলাম। যথারীতি ট্রেন ঠিক সময়ে ছাড়েনি। প্রায় মিনিট দশেক পরে যখন গুটিগুটি পায়ে সেন্ট্রাল ছাড়ল মুম্বাই মেল, বাড়িতে মা বাবাকে ফোন করে জানিয়ে দিলাম। আধ ঘণ্টার মধ্যেই টিকিট চেকার এসে আমার টিকিট দেখে গেল। আমারও একটু ঝিমুনি আসছিল, ইয়ারফোন কানে গুঁজে জানলার কাঁচে মাথা ঠেকিয়ে বসলাম। কতক্ষণ যে এরকমভাবে ঘুমিয়ে পড়েছি, খেয়াল নেই। এক সময়ে খুব ঠাণ্ডা লাগছিল বলে ঘুম ভাঙল। ঘড়িতে দেখলাম দুটো বাজে। রেনিগুন্টা আসতে আরো আধ ঘণ্টা চল্লিশ মিনিট। খিদে পাচ্ছে, তখন কিছু কিনে খাওয়া যাবে ভাবতে ভাবতে হ্যান্ড ব্যাগ থেকে শরদিন্দু অমনিবাসটা বের করলাম। পুণা যাচ্ছি বলে যেন আরো ইচ্ছে করে ওনার বই নিয়ে যাচ্ছিলাম। পেজ মার্ক দেওয়া পাতাটা খুলে আরম্ভ করলাম পড়া। মধু-মালতী। সেই পুণার রাস্তায় সাইকেল চালাত জীবদ্দশায় এবং পরে অলৌকিক সত্ত্বা নিয়েও তাদের বামন রাওয়ের দোকান থেকে প্রতি রাতে সাইকেল নিয়ে ঘুরে বেরানোর গল্প।


রেনিগুন্টায় ট্রেন থামল মিনিট পাঁচেক। ইতিমধ্যে হকারের থেকে ইডলি-বড়া আর কফি কিনলাম। ট্রেন সবে ছাড়ব ছাড়ব করছে, তখন দেখি এক ভদ্রলোক (নাকি ছোকরা, কী বলব, বয়েস আনুমানিক ২৮-২৯ বেশ হন্তদন্ত হয়ে এসে আমার উল্টোদিকের সীটে ব্যাকপ্যাক রেখে বসল। অল্পক্ষণ জিরিয়ে নিয়ে একটা প্রিন্ট-আউট (সম্ভবত টিকিটের) হাতে করে দেখলাম দরজার দিকে গেল। বোধহয় টিটির কাছে। কিছুক্ষণ বাদে ফিরল বেডরোল নিয়ে। বুঝলাম ইনি তার মানে আমার সহযাত্রী। অর্থাৎ, গোটা জার্নিটা তাহলে একা একা ভূতের মতো কাটাতে হবেনা। বকবক করতে আমার খুব ভালো লাগে, আর সহ যাত্রী প্রায় সমবয়সী হওয়ায় মনে হল যে যাক, তাহলে হয়ত গল্প করে কিছুটা সময় কাটানো যাবে। অবশ্য উনি আদৌ কথাবার্তা ভালোবাসেন কিনা, জানিনা। মনে মনে ভাবলাম একটু খানিকক্ষণ দেখি, তারপরে নাহয় নিজে যেচে আলাপ করব মনে হলে। আর উনি যদি পুণার বাসিন্দা হন, একটু রাস্তাঘাট সম্বন্ধে জেনেও নেওয়া যাবে।


ট্রেন ছুটে চলেছে অন্ধ্র প্রদেশের মধ্যে দিয়ে। ধীরে ধীরে দেখলাম কখন দিনের আলো ফুরিয়ে গেল। প্যান্ট্রি কারের থেকে চা কফি ওয়ালা এক চক্কর দিয়ে গেল। বাইরের দৃশ্য আর দেখা যাচ্ছেনা, বইয়ে আবার মনোযোগ দেবো বলে সেটি হাতে নিতেই ওদিক থেকে কথা শুরু হল।


-আপনি বাঙালি দেখছি। শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় পড়ছেন। নমস্কার। আমার নাম মধুসূদন দেশপাণ্ডে।

-দেশপাণ্ডে? মারাঠি?

-হ্যাঁ, ভাবছেন তো কি করে এত পরিষ্কার বাংলা বলছি?

-হ্যাঁ মানে...

-আসলে আমার জন্ম থেকে বারো বছর বয়স অবধি আমি খড়গপুরে থেকেছি। আমার বাবা রেলে চাকরী করেন। সেই সূত্রে ওখানে স্কুলে বাংলা শিখেছি।

-ও আচ্ছা। কোথায় চললেন, পুণা নাকি বম্বে?

-আমি পুণার আগের ষ্টেশন, দউন্ড জংশনে নামব।

-আমি পুণা যাচ্ছি।

-কাজে না ভ্রমণে?

-বাবা! ভ্রমণ! কী সাধু ভাষা ব্যবহার করেন আপনি!!

-আসলে বাংলার চর্চা এখনো ওই একটু আধটু বই পড়ে, তাই ওই ভাষাটাই যা রপ্ত হয়ে আছে।

-আমি যাচ্ছি একটা কনফারেন্সে। পুণে ইউনিভার্সিটিতে।

-ও। আমি একটা সময়ে ওইসব জায়গায় খুব ঘুরে বেড়াতাম। ফারগুসন কলেজের ছাত্র ছিলাম। এস পি, মানে আপনার সাবিত্রীবাই ফুলে পুণে ইউনিভার্সিটিতে অনেক বন্ধুবান্ধব ছিল। সবাই সাইকেলে চড়ে অনেক দূরে দূরে চলে যেতাম।

-পুণায় আমার এই প্রথমবার যাওয়া। জিওগ্রাফি বইতে, হিস্ট্রি বইতে অনেক পড়েছি এই শহরটাকে নিয়ে। তবে সবচেয়ে বেশী করে যেন চিনেছি শরদিন্দু বাবুর লেখা থেকে। আমার খুব কৌতূহল তাই শহরটার বিষয়ে।

-থাকছেন কোথায়?

-আমি আইসারের হোস্টেলে থাকছি।

-আচ্ছা, মানে বানের অঞ্চল। খুবই সুন্দর ওই জায়গাটা।

-ওখানে বেড়ানোর মত কিছু আছে আশেপাশে?

- ওই অঞ্চলে ঠিক তেমন কিছু নেই। পাষাণ লেকে যেতে পারেন, একদম ভোরবেলা বা সন্ধ্যের মুখে মুখে। অনেক পাখী দেখতে পাবেন। এমনিতে পুণার রাস্তাঘাটে হেঁটে চলে দেখবেন, ভালো লাগবে। হাতে সময় থাকলে গাড়ী ভাড়া করে শনিবারয়াডা, পার্বতী, সিঙ্ঘগঢ় এসবে যেতে পারেন। তবে চেষ্টা করবেন একা না যাওয়ার, লোকজন নিয়ে যাবেন, বড্ড নিরিবিলি।

-থ্যাঙ্ক ইউ। নিশ্চয়ই চেষ্টা করব এগুলোয় যাওয়ার।

-কোন গল্প চলছে এখন?

-আপাতত মধু-মালতী। পড়েছেন?

-আলবত। আমায় বন্ধুরা মধু বলে ডাকে, তাই আমি ছোটবেলায় ভাবতাম যে এ গল্প বুঝি আমায় নিয়ে লেখা। তারপর যখন কলেজে উঠে আমার এক বান্ধবী হল, কাকতালীয় ভাবে তারও নাম মালতী, ভাবতে পারবেন না কতটা আনন্দ হয়েছিল। শুনতে খুব বোকাবোকা লাগলেও, ওই ১৮-১৯ বছর বয়েসেও আমার দৃঢ় বিশ্বাস ছিল যে আমাদেরও একদিন একটা প্রেম কাহিনী হবে, মধু-মালতীর মত।

-সেকি? জেনেশুনে কেউ ওরকম পরিণতি চায় নাকি?

-দেখুন, মধু-মালতী কেন ইম্মরটাল হয়ে আছে শরদিন্দু বাবুর লেখায়? ওরা বেঁচে থাকলে কী ভদ্রলোক লিখতেন ওদের নিয়ে? ভাবুন!

-সেটা ঠিক, কিন্তু তা বলে কেউ জেনেশুনে এরকম কামনা করে নাকি নিজের জীবনের?

-আমরা করতাম। তা কিছুটা পূরণ হয়েছিল।

-মানে?

-এসে বলছি।



গল্প করতে করতে কখন আটটা বেজে গিয়েছিল, স্বাভাবিক ভাবেই খেয়াল করিনি। গুন্টাকাল জংশনে ট্রেন থেমেছে তখন। পঁচিশ মিনিট থামার কথা এখানে। ডিনার এখানেই কিনে নেব ঠিক ছিল। মধুসূদন প্ল্যাটফর্মে নামল চা-নাস্তার আশায়। আমি রেলের ক্যাটারারের থেকে একটা নন ভেজ মীল নিলাম। বাড়িতে কথাও বলে নিলাম ফোনে সিগনাল আছে দেখে। ট্রেন যদি এরকমভাবে চালাতে পারে, তাহলে কাল রাইট টাইমেই পুণা ঢুকে যাব বুঝলাম। নিশ্চিন্তও হলাম। অজানা অচেনা শহরে যত সকাল সকাল যাওয়া যায়, ততই ভালো। কালকের দিনটা পুরো হাত খালি। পরশু থেকে কনফারেন্স শুরু হয়ে গেলে তো আর তেমনভাবে ঘুরে বেড়ানোর অবকাশ পাবোনা। যদি কোথাও যাওয়া যায়, অন্তত পায়ে হেঁটে এদিক ওদিক যাওয়াটা কালকেই সেরে ফেললে হয়। মধুর থেকে জেনে নিতে হবে অটো ট্যাক্সির ভাড়ার কথা।


হঠাৎ খেয়াল হল। একি, ছেলেটা গেল কোথায়। ট্রেনের গ্রীন সিগনাল দিয়ে দিয়েছে, ট্রেন মৃদু গতিতে চলা শুরু করেও দিল। কিন্তু মধু কই? তাহলে হয়ত অন্যও কোন কামরায় উঠে পড়েছে। পরের ষ্টেশনের আগে তো এখানে আসতেও পারবেনা। প্যান্ট্রিটা আমাদের ঠিক পাশেই বলে ভেস্টিবিউল একদিকে বন্ধ। আমি ডিনার সেরে হাত মুখ ধুয়ে নিজের জায়গায় ফেরত চলে এলাম। আশেপাশের কম্পারটমেন্টে লোকে একে একে বিছানা পেতে শোওয়ার আয়োজন করছে। ট্রেন জার্নিতে বেশীরভাগ লোকই রাত্রে তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়ে, আসলে তেমন কিছু করার থাকেনা বলে বোধহয়। আমিও বিছানা পেতে বই হাতে করে শুলাম। আডোনি, মন্ত্রালায়াম রোড, কৃষ্ণা সমস্ত ষ্টেশন গেল। এক মিনিট করে থামল। কিন্তু কই, মধুর তো দেখা নেই। ও কি তাহলে ট্রেনে উঠতে পারেনি? নাকি অল্প সময় থামছে বলে নামতে সাহস পাচ্ছেনা ট্রেন থেকে? হয়ত মাঝ্রাত্রে বড় স্টপে থামলে আসবে। ওর সীটে বিছানার চাদর কম্বল পরিপাটি করে ভাজ করে রাখা, ও আসলে হাতই দেয়নি ওতে। পিঠের ব্যাগটাও নিয়ে নীচে নেমেছিল, যাক অন্তত কিছু দরকার পড়লে সাথে থাকবে সব। এইসব ভাবতে ভাবতে কখন দু চোখের পাতা এক হয়ে গিয়েছিল, টেরই পাইনি। ঘুম ভাঙল যখন, দেখি সাতটা বাজে। ভাগ্যিস রোজের অ্যালার্মটা কাটিনি। এত আরামের ঘুম অনেকদিন পরে ঘুমিয়েছি। উল্টোদিকে তাকিয়ে দেখলাম, তখনো মধু নেই। আহা রে, তাহলে হয়ত ট্রেন মিস করেছে। ফ্রেশ হয়ে এসে ব্যাগ গুছিয়ে বসলাম। আটটায় দউন্ড ষ্টেশন এলো। আমি উৎসুক হয়ে প্ল্যাটফর্মের দিকে তাকিয়ে রইলাম মধু কে দেখতে পাই কিনা ভেবে। ট্রেন যখন প্ল্যাটফর্ম ছেড়ে বেরোচ্ছে, দেখলাম অনেক দূরে, বেঞ্চিতে বসে মধু। আমায় হাত নেড়ে যাচ্ছে। বুঝলাম সারা রাত তার মানে অন্যও কোন কামরায় খালি সীটে কাটিয়েছে। একটাই আক্ষেপ রয়ে গেল, ওর গল্পের পুরোটা শোনা হলনা।


সাড়ে আটটায় কোচ আটেন্ডেন্ট এলো বেড রোল ফেরত নিতে। আমার গুলো নিয়ে চলে যাচ্ছিল, আমি ডেকে বললাম,

- ভাইয়া উস সীটকা ভি লেলো। প্যাসেঞ্জার উতার গয়া।

-ক্যা ম্যাডাম? ক্যা লু উস সীট সে?

-ও বেড রোল।

-কহা হে? কুছ নহি হে ওয়াহা।

-ক্যা কুছ নহি? হে না ও।

-আরে ম্যাডাম ও পুরানা আখবার হে। প্যাসেঞ্জার নেহি হে তো বেড রোল কৈসে?


আমি উঠে গিয়ে দেখলাম যে সত্যি, ওখানে তো ১২ তারিখের টাইমস অফ ইন্ডিয়া রাখা। বম্বে এডিশন। বুঝলাম কোথাও একটা খুব বড় গণ্ডগোল হয়েছে। পুণায় নেমে চার্টে চোখ বোলালাম দরজায়। দেখলাম এ-১ এ আমার আশেপাশে কোথাও কারুর নাম নেই। মাথাটা কিরকম একটা ঘুরে গেল। কোনমতে অটো স্ট্যান্ডে গিয়ে বানের রোড বলে লাগেজ উঠিয়ে বসলাম। তিনদিন ছিলাম পুণাতে। রাস্তায় রাস্তায় অনেক হেঁটেছি, ফারগুসন কলেজ, এস পি ইউনিভারসিটি চত্বরে প্রচুর ঘুরলাম। ১৮ তারিখ ভোরবেলা বম্বের ট্রেনটা যখন ষ্টেশন ছাড়ছে, দূরে চায়ের স্টলে দেখলাম মধু দাঁড়িয়ে, হাতে চায়ের কাপ। হাসিমুখে আমায় হাত নাড়ছে।




Saturday, June 17, 2017

একটি অতি প্রিয় রবীন্দ্রসঙ্গীতের parody মাথায় এলো সাইকেল চালাতে চালাতে।


তবু মনে রেখো যদি পড়ি মহা ঋণে,
তবু মনে রেখো।
যদি দুহাজারি নোট বদলাতে না পারি ছোট নোট দিয়ে,
যদি থাকি কাছাকাছি, খুচরো দিয়ো বঁধুর মতো মাঝে মাঝে-
তবু মনে রেখো।

যদি টাকা ফুরায় পেটিএমে,
একদিন যদি ওলা মানি দাও মধুরাতে,
তবু মনে রেখো।
একদিন যদি পাসওয়ার্ড যাই ভুলে ক্রেডিট কার্ডের,
তবু মনে রেখো।

যদি পড়িয়া মনে
আগের পাওনা টাকা নাই দেখা দেয়
তোমার একাউন্টে,
তবু মনে রেখো।

Monday, June 12, 2017

সিকিউরিটি চেক-ইন এর পরে গেটের সামনেই চলে এলাম। হাতে এখনো ঘণ্টা খানেকের ওপর বাকি বোর্ডিঙের। জানলার ধারে খালি জায়গাটা দেখে তো লাফিয়ে লাফিয়ে এসে বসা গেল, কিন্তু এতক্ষণ কি করণীয়? সঙ্গে পাওয়ার ব্যাঙ্কটিও নেই যে একটু মোবাইলে গান শুনবে; এত ঝটপট আজকাল চার্জ শেষ হয়ে যায়। অগত্যা, লোক দেখা যাক! লোকজন দেখতে মন্দ লাগেনা আমার। বেশ একটা চেহারা দেখে বা আশে পাশের লোকেদের কথাবার্তার টুকরো যেইটুকু কানে ভেসে আসে, তার থেকে তাদের বিষয়ে নিজের মত করে গল্প বানিয়ে ফেলতে খুব মজা লাগে।

এই করতে করতে দিব্যি কাটছিল সময়। মাঝে মাঝে ডিসপ্লেবোর্ডটির দিকে চোখ বুলিয়ে নিচ্ছিলাম। বোর্ডিং আরম্ভ হল কিনা দেখতে। এই ফাঁকে কখন দেখি আমার পাশের সীটটি তে এক অতি সুপুরুষ ব্যাক্তি এসে বসেছেন। সামনে তার ল্যাপটপে টার্মিনাল খোলা। নিজে লিনাক্স ব্যাবহার করি বলে উবুন্টুর চেনা ইন্টারফেস দেখে কীরকম একটা এক্সট্রা ভালোলাগা তৈরী হয়ে গেল। পরনে হাল্কা নীলের ওপর ভীষণ সরু সাদা স্ট্রাইপ ফুল হাটা শার্ট, চোখে রিমলেস চশমা। ফর্সা গালে একদিনের হাল্কা একটু সব্জেটে দাড়ির আভা। আমি তো পুরো ফ্ল্যাট! সমানে চান্স খুঁজছি দেখার যে উনি কোন ফ্লাইটে। আসলে ওই একই টাইমে (মিনিট কুড়ির ব্যাবধানে) পাশাপাশি গেট থেকে একটা চেন্নাই আর একটা বেঙ্গালুরুর প্লেন ছিল। আমার হাতে ছিল এয়ার ইন্ডিয়ার চেন্নাই যাওয়ার বিমানের বোর্ডিং পাস। কপাল খুলল মিনিট দশেক পরে। দেখলাম ভাগ্যদেবী প্রসন্ন তখনো আমার ওপরে। ভদ্রলোকেরও একই বিমান, এমনকি কপাল ভাবুন আমার, আমার পাশেরই সীট।
যাক! দুই ঘণ্টার জার্নি আর যাই হোক, অন্তত ঝারি মেরে কাটানো যাবে। বাড়ি ছেড়ে আসার দুঃখও মুহূর্তের মধ্যে উড়ে গেল। বেশ একটা ফুরফুরে মন নিয়ে প্লেনে তো গিয়ে উঠলাম। "তিনি" আসতেই আমার আইল সীট থেকে বেরিয়ে তাঁকে ভিতরে বসতে দিলাম। সৌজন্যমূলক একটু হাসিও হাসলাম দুজনেই। ততক্ষণে তো বোধহয় মনে মনে প্রায় হানিমুনে কোথায় যাব দূরে থাক, fifth anniversaryটা সুইজারল্যান্ড না কাশ্মীর (আমার আসলে পাহাড় খুব প্রিয় কিনা!) কোথায় কাটাবো (ডিপেন্ড করছে ততদিনে আমি PhDটা সেরে কি করছি, তার ওপর) ভাবছি, এদিকে ওনার সামনে এক্কেবারে নির্লিপ্ত থাকার ভেক ধরে বসে আছি। পূর্ব experience থেকে বলতে পারি, ছেলেদের chase করে আজ অবধি successful হইনি, কাজেই একদম চুপচাপ থাকাটাই শ্রেয় মনে করলাম। তা টেক-অফ ও বেশ ঘটনাবিহীন ভাবেই হল। খাবারের ট্রের থেকে দই বড়াতে চামচ বসাতে যাব কি পাশ থেকে তার গলার আওয়াজ।
- কী যে ছাইপাঁশ খেতে দেয় এরা, সরকারী বিমান বলেই এরকম যা ইচ্ছে তাই।
ব্যাস! গেল আমার মাথাটি গরম হয়ে। দই বড়াকে খারাপ বলা আর তার ওপর সরকারী বিমান বলে খোঁটা দেওয়া... এ তো মেনে নেওয়া যায় না। সরকারী চাকুরে মা বাবার মেয়ে হয়ে এ হেন বদনাম নেব না। দিলাম চারটি কথা শুনিয়ে।
- কেন? এটা খারাপ কী? অন্তত পেট ভরার মত খাবার দেয়। কয়েক মাস আগে বম্বে গেলাম, এমনি অল্প ব্রেকফাস্ট দিল জেটে, পেটই ভরেনি আমার! আর সরকারী কিছু হলেই খারাপ? জানেন এয়ার ইন্ডিয়া আছে বলেই দেশের কত remote locations এখন connected by air?
তিনিও দমবার পাত্র নন।
- সে তো BSNLও claim করে নাকি কীসব "Connecting India" , তা চাইলেও ফোনর সিগনাল পান সবসময়, বলুন? নাকি আপনি ভরসা করে ওটির কানেকশন রাখেন?
ব্যাস। হল final nail in the coffin।
- শুনুন মশাই, এই BSNLএর connectionটি ছিল বলেই আমি ঘরে বসে web check-in করেছি। আপনার তো দেখছি kiosk checkin। প্রাইভেট কোম্পানির internet বুঝি service দেয়নি? আপনার জন্য খুব খারাপ লাগছে। বেচারা। কত কষ্ট করে টাকা খরচা করে আপনি আপনার অপছন্দের airlines এর টিকিট কেটে চললেন। যাই হোক।

বাকি সময়টুকু Kindleএ মন দিয়েই কাটালাম।

ঠিক এইভাবেই আমি আরেকটিও হতেও পারত প্রেমকাহিনীকে কেঁচিয়ে দিলাম।  

Monday, May 8, 2017

২৪শে বৈশাখ

মা তোমার আলমারির চাবিটা দাও তো।
নে। তবে বেশী ওলট পালট করবিনা কিন্তু।
না না, জাস্ট একটা লাল পাড় সাদা শাড়ী পেলেই চলবে।
হুম। অনেকগুলো আছে, কোনটা নিবি দেখ।
দিদুনের গরদটা দেবে?
না না, এই ভ্যাপসা গরমে নো গরদ অর সিল্ক। তুই বরং আমার ঢাকাইটা দেখ।
ওই যেটা লাস্ট পুজোয় কিনলে?
হ্যাঁ। লাল পাড় সাদা ঢাকাই, খোঁপায় জুঁই ফুলের মালা আর একটা বড় লাল টিপ। সাজ কমপ্লিট।
থ্যাঙ্ক ইউ মা।
তা কোন গানটা গাইছিস কাল?
আমি ভেবেছিলাম আমি তোমার সঙ্গে বেঁধেছি আমার প্রাণ গাইব, কিন্তু মৌসুমি দি বলল আহা তোমার সঙ্গে প্রাণের খেলা গাইতে।
বাহ! আমার প্রিয় গান।
দেখি, আমি একটু ফাইনাল রেওয়াজটা সেরে নিই। তুমি একটু প্লীজ বাজার থেকে ফুলের মালা আনিয়ে রেখো। সক্কাল সক্কাল বেরোতে হবে।





বাবাই? দিদি হারমোনিয়াম নিয়ে রেওয়াজে বসেছে, একটু তোদের চিল চীৎকারটা একবেলার জন্য বন্ধ রাখ আজ, দয়া করে। ও রেগে গেলে কিন্তু কেলেঙ্কারি হয়ে যাবে।
না না, হবে না। দিদি রেওয়াজ করতে পারে, আর আমাদের জ্যামিং থাকলেই যত তোমার বাঁধা দেওয়া! চলবে না।
আরে কাল ওর ফাংশান আছে সকালে, গানের স্কুলে।
তাতে কি? সারা বছর তো প্যান প্যান করে গেয়ে চলে। একদিন না গাইলে কি আসে যাবে? আমরা পারব না। বিল্টু, রনি আর টাবলু আসছে। কাল আমাদের একটা ইউটিউব লাইভ এর প্ল্যান আছে, তার রিহার্সাল।
তা আমিও যদি একই লজিক দিই তোকে? সারা বছর তো তোরাও ড্রাম পিটিয়ে আমার কান ঝালাপালা করে দিচ্ছিস, একদিন না জ্যাম করলে কি হবে?
আরে বাবা, সারা বছর তো মেটালিকা আর গ্রীন ডে গেয়ে বাজিয়ে বেড়াই, কাল স্পেশাল দিন। আমাদের জনারের বাইরে বেরিয়ে গান গাইছি।
সে কী রে? কি গান?
আমরা কাল রবীন্দ্রনাথের গান কে নিজেদের মত করে গাইব চ্যানেলে। তবে গান সিলেকশন এখনো হয়নি। একটু সাজেস্ট করো না মা।
হাউ আবাউট বাঁধ ভেঙ্গে দাও?
কুল! শুনেছি। চলবে। আরো গোটা তিনেক বল।
মম... জাগরণে যায় বিভাবরী, যেমনটা ওই সিনেমায় করেছিল...
ওকে। আর?
একটা হাল্কা গান বলি? ট্রাই কর না? রনির গলায় মনে হয় মানাবে। মাঝে মাঝে তব দেখা পাই।
শুনিনি। বেশ। ইউ আর এ রকস্টার মা। থ্যাংকস। এবার সামহাউ দিদিকে ম্যানেজ করে দাও। প্লীজ!
দেখছি।
আর হ্যাঁ শোন, আমাদের লাইভ প্রোগ্রামের ইন্ট্রোটা তুমি দেবে। কিছু একটা ভেবে চিন্তে রেখো।
ওরে বাবা। যাই তাহলে সঞ্চয়িতা বের করি।







Friday, May 5, 2017

হোস্টেলের রোজনামচা

আমি যেই হোস্টেলে থাকি, সেটির একটি গুগুল মেলিং লিস্ট আছে। তা সেই মেলিং লিস্টের উদ্দেশ্য হল হোস্টেল সঙ্ক্রান্ত যাবতীয় যা যা খবরাখবর সরবরাহ করা যায়, সমস্ত কিছু সম্পর্কে হোস্টেল বাসিন্দাদের জানানো। সে মেসের ফীজ দেওয়ার শেষ দিন থেকে শুরু করে বাঁদরের উৎপাত থেকে বাঁচতে সর্বক্ষণ ঘরের দরজা আটকে রাখা,  ইত্যাদি আরো নানান রকমের তথ্য। তা কিছু লোকজন আছে, সেই ফোরামটাকে পুরো এক খানা নালিশ বাক্স বানিয়ে দিয়েছে। আরে বাবা হ্যাঁ ঠিক আছে, হোস্টেলে কি সমস্যা হচ্ছে, সেটা লেখা ভালো যাতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানতে পারে এবং প্রয়োজন মত তার ব্যাবস্থা নিতে পারে, কিন্তু তা বলে এই রকম??? উদাহরণ দিই।

কেন লোকে কাচা জামার থেকে  জল পুরোপুরি নিংড়ে মেলবে না, এটা একটা দাবী হল? ওরে বাবা রে, মানুষগুলো তো তোর আমার মতই তেইশ জোড়া ক্রোমোজোমেরই মানুষ! তারা হুঠ করে রাতারাতি তো আর সুপারম্যান হয়ে যাবে না! ওই নরম নরম হাতে যতটা পারে, জল নিংড়োয় , তাতে বাপু তোমার শুকনো  জামা ভিজে যাক, তা কি আসে যায়! তোমায় কে বলেছিল হে শুকনো জামাকাপড় দড়িতে মেলে রেখে দিতে? কি এমন বিরাট কাজ করছ যে সময় করে দড়ি থেকে কাপড় সরাওনি? নিজের কাজ টাইমে করবে না, আর যত দোষ ওপরতলার মেয়েদের। ক্লাসিস্ট কোথাকার।

আরেক খানা বলি। বাঁদর এসে সকাল সকাল করিডর জুড়ে নোংরা করে রাখবে, বাথরুম থেকে ডাস্টবিন ঘেঁটে কলার খোসা থেকে শুরু করে বিরিয়ানির কৌটো নিয়ে ফেলে ছড়িয়ে লাট করবে; সেই থেকে মুক্তি পেতে অ্যাডমিন থেকে দরজায় এক ধরণের বিশেষ তালা লাগিয়ে দিল। বাঁদরের হাতের নাগালের বাইরে। দিব্যি চলছিল। উৎপাত কমে গেল। হঠাত একদিন কয়েকজনের মেল এলো। কিছু মেয়ে নাকি দরজায় আংটা লাগাচ্ছেনা, যার ফলে আবার আমাদের পূর্বপুরুষেরা আক্রমণ করছে। কেন মেয়েরা এরকম দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণ করবে, এতে হোস্টেলের শান্তি শৃঙ্খলার ব্যাঘাত ঘটছে, ইত্যাদি ইত্যাদি। ওরে বাবা, তোরা বুঝিসনা বলে এমন কড়া কড়া চিঠি লিখিস গ্রুপে। ওদের কথাটাও তো ভাবতে হবে নাকি? ওদের যদি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দাঁত মাজার সময় পাশে পূর্বপুরুষের লম্বা লেজের দরশন না হয়, কি করে নিজের ক্রমশ কম হতে থাকা চুলের কথা মনে পড়বে? বাঁদরের ওই লম্বা লেজ দেখে বলুন, আপনার রাপুঞ্জেলের বিনুনির কথা মনে হয়না? আজকালকার যুগরে বাবা। এত কাজে কম্মে এসব কি আর মনে থাকে? তাই জন্যই তো এইসব রিমাইন্ডার দেখে মনে হয় যে নাহ, আজ চুলে ভালো করে তেল মাখতে হবে। তারপর শ্যাম্পু করতে হবে। বাথরুমের ড্রেনে এক গাদা চুলের দলা পড়ে থাকতে দেখে এত মনে কষ্ট হবে যে টাক পড়ে যাছে অথচ টাকার আমদানি হচ্ছেনা। সেই দুঃখে বাথরুমটা পরিষ্কারের কথা মনে পড়ে বলুন? আপনার পড়ত? পরে যে স্নান করতে আসে আসুক, জল দাঁড়িয়ে গেলে বাথরুমে, তার হেডেক, আমার আপনার কি! বরং ওদের এত চুল ঝরছে, সেই জন্য মিনিমাম সহানুভূতি না জানিয়ে কিনা মেয়েরা লম্বা মেল করবে কেন এরা বাথরুম নোংরা করে। আরে বাপু, তোদের এত দাবী দাওয়া কিসের? এটা তো হোস্টেল নাকি? নিজের বাড়ি পাওনি যে সর্বক্ষণ দাসীবাঁদী পাবে মা কে যে তুমি বেরিয়ে গেলে তোমার পরে দুনিয়া ঠিক করে দেবে।

এইটুকু শুনেই ভাবতে বসবেননা যে এ আর এমন কি, পৃথিবীতে এর চেয়ে ঢের বেশী সমস্যা আছে। হ্যাঁ তা আছে বইকি, এর চেয়ে অনেক বেশী ঘোরপ্যাঁচের লোকের সাথে সর্বক্ষণ আপনাকে ডিল করতে হয়, মানলাম। কিন্তু আপনি ভাবুন। আমার দিদি কিনা স্বাবলম্বী হতে চেয়ে গয়নার ব্যাবসা শুরু করেছে, না হয় দিনে দশটা করে মেল পাঠাচ্ছিলাম ওই ব্যাপারে, পোড়ারমুখীগুলোর সইলনা। এক প্রস্থ লম্বা মেল থ্রেড শুরু করল যে নাকি এসব করে তাদের মেলবক্স স্প্যাম হচ্ছে। আর নিজেরা যে এই বিষয়টা নিয়ে এত মেল করছিস, সেই বেলা? বাবা ঘরে এসে সামনাসামনি মুখে বলে গেলেই পারতি। টেকনোলজি ইন্সটিটিউটে পড়লেই যে উঠতে বসতে শুতে খেতে ইমেল করতে হবে... রক্ষে করো বাপু! আমি আর নিতে পারলুম না। তোমাদের মেল লিস্ট থেকে আমার নামটি বের করে দাও শুধু। তবে হ্যাঁ, যাওয়ার আগে শেষ অভিযোগটা করে দিই? তোমরা বাপু আমিষ নিরামিষ ডাইনিং ফেসিলিটি নিয়ে এত তর্কাতর্কি করছ, তা এমন এক খানা মেস দাও না যাতে একটু আলু ভাতে আর বিউলির ডাল পাই? সাথে একটু আলু পোস্ত দিলে কিন্তু কাঁচা লঙ্কাটি দিতে ভুলোনা হে। ভগবান মঙ্গল করুন। রাধা মাধব, রাধা মাধব।

Wednesday, May 3, 2017

নিবারণ কাকা

আমাদের আশে পাশে এমন অনেক মানুষ আছেন যারা অন্যের ব্যাপারে মতামত, উপদেশ দিতে খুব ভালোবাসেন। তারা হয়ত সব সময় যে নাক গলাতে আসেন, তা না। অনেক ক্ষেত্রেই তারা ভালো করতে চেয়ে এগিয়ে আসেন তাদের অভিজ্ঞতার ঝুলির ওপর নির্ভর করে কিছু মন্তব্য করতে। সকলে একইভাবে ব্যাপারটা নেন না। সেরকমই একজনের কথা লিখছি।

********************************************************************************

নিবারণ কাকা

আমাদের পাড়ার নিবারণ কাকা। সবার সব ব্যাপারে তার মন্তব্য করা চাইই চাই। নতুন ফ্ল্যাট কিনে কে সত্যনারায়ণ পুজোয় শ্যামল জেঠুদের ডাকল আর তার ভাই বিমল জেঠুদের ডাকল না, অনিমেষ কর্নেলে যাবে না কারনিগি (কি? কি বললেন? কোন নিধি?)  মেলন (সেটার যে আদৌ তরমুজের সাথে কোনভাবেই মিল নেই, অবশ্য করেই সেই বিষয়ে না জেনে), রাখী কেন করন অর্জুনের মায়ের পার্ট করবে, মিনতির মা কেন পাঁচতলার ঘোষেদের বাড়ি জামাকাপড় কাচতে পাঁচশ আর বি ব্লকের সান্যালদের থেকে সাড়ে পাঁচশ নেবে, পুজোর চাঁদা কেন প্রতি বছর বাড়বে সমস্ত বিষয়ে ওনার মহামূল্যবান মতামতের ছড়াছড়ি, কিন্তু দুঃখের বিষয় এই যে বেশীরভাগ সময়েই নিবারণ কাকার বাড়ির লোকেরা পর্যন্ত ওনার কথার কোন পাত্তা দেন না। রমা কাকীমা তো উঠতে বসতে কাকাকে খোঁটা দিয়েই চলেন।

নিজের বাড়ির লোকের তো মাথা খাচ্ছই, আবার পাড়া প্রতিবেশীর জীবন অতিষ্ঠ না করলেই নয়?

কেন কেন? আমি কার কোন পাকা ধানে মই দিলাম শুনি?

পাকা ধানে মই দাওনি তো কি করেছ?  ছবিদির নাতনির স্কুলের ভর্তি নিয়ে তোমাকে কে মন্তব্য করতে বলেছিল হ্যাঁ?

ওমা ওইটুকু মেয়েকে এখন থেকেই কিসের জন্য বইয়ের বস্তা পিঠে করে স্কুলে পাঠাবে, সেটা গুরুজন হিসেবে আমার বলার কি কোন দায়িত্ব নেই?

তা ওরা তোমার কথা শুনল তো?

সে ওরা আমার উপদেশ কানে দেয়নি, এতে ওদের মেয়েরই দুদিন বাদে ঘাড়ে পিঠে ব্যাথা হবে যখন, বুঝবে।

কেন কেন করতে যাও? নতুন বৌ এসে মিষ্টি করে দুপুরবেলা চারটি কথা শুনিয়ে গেল।

কি বলেছে সে?

কি না বলেছে? আমায় ঠারেঠোরে জিজ্ঞেস করল তুমি কোন ক্লাস পাস, আমাদের ছেলে মেয়েরা কে কতদূর পড়বে।

কি? এত বড় স্পর্ধা? ওর শ্বশুর আমায় ছোট ভাইয়ের চোখে দেখে বলে না আমি নাতনির ভালো মন্দ নিয়ে কথা বলতে গেছিলাম! আমার বিদ্যে নিয়ে প্রশ্ন তোলে? জানিয়ে দেবে ওকে সামনের বারে যে আমি কালীকৃষ্ণ স্কুলের ফার্স্ট বয় ছিলাম মাধ্যমিকে, হুহ। ও মেয়ে কিনা শহরের ইংরেজি স্কুলের ভারী আমার কি না কি লেখাপড়ায়, সে আবার চ্যাটাং চ্যাটাং কথা শুনিয়ে যাচ্ছে! দাঁড়াও, আমি আজই দাদাকে বলব। সনৎ কত ভদ্র ছেলে। এই নতুন বৌ এসে মাথা খেয়েছে ছেলেটার। দাদাকে বলব, সুনীতি মায়ের জন্য যেন দেখে শুনে বিয়ে দায়ে; এরকম শহুরে ধিঙ্গি ছেলেপিলে জোটালে মুশকিল।

তুমি আর কোনদিনও শুধরোবে না, নাকি! এত কিছু হল, তাও তুমি ওদের বাড়ি গিয়ে আবার বিয়ের কথা তুলবে?

কাকিমা, ও কাকিমা।

কে রে? ও নিতু? আয় আয়। এক্ষুনি তোর কাকা আর আমি তোকে নিয়ে কথা বলছিলাম।

অ। তা কি কথা কইছিলে শুনি?

ওই তোর বিয়ে নিয়ে।

ওমা, মা তোমাদের বলে দিয়েছে? আমি যে বললুম আমিই এসে নিজের মুখে তোমাদের জানাব। মায়ের পেটে না কোন কথাই থাকেনা দেখছি। ধুর।

কি? ছবি দি তো কিছু বলেনি? কি বলবে?

তাও ভালো। দাঁড়াও আগে এক খান পেন্নাম ঠুকে নিই।

দেখো দেখো রমা, নিতুর মত মেয়ে হয় না।

আসলে নতুন জীবনে পা দিতে চলেছি, তাই তোমাদের আশীর্বাদ নিতে এলাম।

কোথায় চললি? ব্যাঙ্কের চাকরিটা পেলি? যেটার ফর্মের খবর তোকে এনে দিয়েছিলাম...

না না নিবারণ কাকা। আমার মাথায় অত বুদ্ধি নেই। তোমায় তো তখনি বলেছিলাম, ওসব আমার দ্বারা হবেনা। আমি বিয়ে করেছি। আজ রেজিস্ট্রি করে এলাম। আসলে সুবলকে বাবা মা মেনে নিচ্ছিল না, তাই বাধ্য হলাম। বারবার বলা সত্ত্বেও বাবা একের পর এক সম্বন্ধ আনছিল। আমি আর নিতে না পেরে আজ রেজিস্ট্রিটা সেরেই ফেললাম। বাবার মেজাজ তিরিক্ষি হয়ে আছে। মা মিনমিন করছে। কাকা তুমিই পারবে বাবাকে বোঝাতে, প্লীজ বল।

হে ভগবান, আর আমি কিনা দাদার কাছে তোর জন্য ভালো পাত্রের সন্ধান দিতে যাচ্ছিলাম, আর তুই কিনা বিয়ে করে ফেললি। উফ। দুনিয়ায় কেউ যদি আমার কথার ওপর ভরসা রাখত। রাধা মাধব রাধা মাধব।

ও রমা। মিঠু বাড়ি আসবে কখন? ওকে আজ একটু বোঝাতে হবে। ও যেন আমার মান সম্মান না ডোবায়।

হম, দিনকাল ভালো না। কত নানানলোকের সাথে মেলামেশা করে, কার থেকে কি শিখছে জানছে কে জানে। আমার বড় ভয় করে।

হ্যাঁ। ওকে বলব। রাইসে ভর্তি করে দেবো, মন দিয়ে সরকারী চাকরির পরীক্ষা দিক। ওসব ফ্যাশন ডিজাইনিং না কি ছাই পাঁশ পড়তে চায়, সেসব চলবে না।

উফ। তুমি কি ঠেকেও শেখোনা? মেয়ে বড় হয়েছে। নিজের ভালো মন্দ নিজেই বুঝবে। ওর কেরিয়ার নিয়ে মতামত দিতে যেও না। বাবা হিসেবে যেটুকু কর্তব্য, সেই টুকু করো। আর হ্যাঁ, পাড়াপড়শি কেউ আজকাল অন্যের কথা শোনেনা; মেয়ে নিজের বাপ মার কথা শুনছে না, নাকি দুনিয়ার লোক তোমার কথা শুনবে। একটু বোঝার চেষ্টা করো।

সেই রাত্রে নিবারণ কাকাকে বাস স্ট্যান্ডের কাছে অনেক রাত অবধি চুপচাপ দুখী মুখে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছিলাম, এই প্রথম কারুর সাথে একটি কথাও না বলে বাড়ী ফিরেছিলেন।

******************************************************************************

Tuesday, March 7, 2017

The nostalgia of smell



কাচা জামাকাপড় দড়ি থেকে তুলে ঘরে আনতে আনতে একটা অদ্ভুত মিষ্টি গন্ধ নাকে এল। Fabric conditioner এর floral smell। কেন জানিনা হঠাৎ করে গন্ধে আমার মইমার কথা মনে পড়ে গেল। মইমার থেকে কোনোদিনও এই গন্ধ পাইনি, তবুও কেন কে জানে। দুপুরে ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে Howrah'র বাড়ির স্বপ্নও দেখে ফেললাম। আহ্! কি আরাম ফেলে আসা দিনগুলিতে।

এই জামাকাপড়ের গন্ধের প্রসঙ্গে মনে পড়ে গেল।প্রত্যেকবার বাড়ী থেকে IIT চলে আসার আগে ভাবি।মায়ের একটা না-কাচা, preferably ঘরে পরার শাড়ী নিয়ে আসলে কেমন হয়। বেশ কিছুদিন একটা মা-মা গন্ধ পাব।
Sarayu Extension-এর hostel এ থাকতে থাকতে মাঝেসাঝে উল্টোদিকের বাঙালী একটা বাড়ী থেকে ডিমের ঝোলের গন্ধ আসত। রোজ রোজ সাম্বার রসম দিয়ে কোনক্রমে ভাত খেয়ে সেই ডিমের কারির সুগন্ধ- উফ্!
আসলে গন্ধগুলি যত না ভাল লাগে, তার থেকে বেশী ভাল লাগে ওগুলির সাথে জড়িয়ে থাকা কিছু স্মৃতি। এই যেমন সেদিন একটা scent এর বোতলে হাত চলে গেল- খুব rarely use করি। কিছুদিন আগে Yelagiri গিয়ে ওটা ব্যবহার করেছিলাম। সেদিন খুব ইচ্ছে করল trip টা কে আরেকবার অনুভব করতে, তাই অবার কুর্তিতে একটু spray করে নিলাম।