Friday, July 21, 2017

পিতা পুত্রী উবাচ ৩

বেশ কিছু বছর আগের কথা। সেই বছর ভারত পাকিস্তান বিশ্বকাপে কোয়ার্টার ফাইনাল খেলেছিল। ছোট্ট মেয়েটা খুব দাঁতের যন্ত্রণায় ভুগছে। অথচ ডেন্টিস্টের কাছে দ্বিতীয় দিন আর কিছুতেই যেতে চাইছেনা, যদি দাঁত তুলে দেয়।


- পুচু বাবা ওরকম করে না। ডাক্তারের কাছে যেতে হবে তো।
- না। দাঁত তুলে দেবে। আমি যাব না। ব্যাথা লাগবে।
- আরে না না। কে বলেছে দাঁত তুলবে?
- আমি জানি।
- না রে বাবা। দাঁত তুলবে না। একটু জাস্ট নাড়াচাড়া করবে।
- ব্যাথা লাগবে।
- উহু। আগে একটু ক্রিম লাগাবে মাড়িতে। অবশ করে দেবে জায়গাটা।
- উ।
- তারপরে কুট কুট করে একটু ফোটাবে, একটুও লাগবেই না।
- পিঁপড়ে কামড়ানোর মতও না?
- একটুও লাগবে না। বুঝবিই না।
- উ।
- তারপর একটু নাড়িয়ে চাড়িয়ে দেখবে। ব্যাস।
- শেষ?
- একদম। ব্যাথা ভ্যানিশ!


সত্যি সত্যিই ডাক্তার এই জিনিসগুলিই করেছিল। শুধু শেষের নাড়াচাড়াতে affected দাঁতটি তুলে দেয়। ছোট্ট মেয়েটার দাঁত তলার ভয় উপেক্ষা করে ব্যাথা কমে যায়।

অনেক বছর পরে রুট ক্যানাল ট্রিটমেন্ট করতে গিয়ে খুব মিস করছিল বাবার এই গল্প!

পিতা পুত্রী উবাচ ২

#পিতা_পুত্রী_উবাচ

২।

- ফোন কোনটা কিনবি, ঠিক করলি?
- হুম। স্যামসাং।
- ব্যাটারি ট্যাটারি দেখে কিনিস। আবার সেই স্যামসাং?
- এটা ভালো। এই দামে আর অল্টারনেটিভ বলতে ওই চাইনিজ গুলো।
- না না ওসব নিতে হবেনা। তাহলে স্যামসাং ভালো। নিয়ে নে।

(পরের দিন)
- অর্ডার করে দিই?
- হ্যাঁ দাও।

(তারপরের দিন)
- ধুর ভাল্লাগছেনা।
- কেন আবার কি হল?
- পুরনো ফোনটা আর ব্যাবহার হবে না...
- কেন? ওটাও থাকবে। ওতে টম খেলিস।
- রজনীও তাই বলছিল।
- দেখ। কি সুন্দর চিন্তা করে।

(যেদিন ফোন এলো)

- নতুন ফোন থেকে টাইপ করলাম মেসেজ।
- ও ওই জন্যই এত পরিষ্কার এলো লেখাটা :P

(সেদিন সন্ধ্যেবেলা, কাঁদো কাঁদো গলায়)

- কিরকম একটা লাগছে। মনে হচ্ছে যেন পুরনো ফোনটাকে ডাম্প করলাম।
- কেন, ও তো থাকলই।
- না use তো করছি না আর। কিরকম মনে হচ্ছে ওর সাথে treachery করলাম। রস নিংড়ে ফেলে দিলাম ছিবড়েটা।
- সব সময় মাথায় রাখো যে ওটা মায়ের জন্য জমিয়ে রাখছ*। ব্যাস! সেই ভেবে যত্নে রেখো।
- এটা ভালো বললে।

#এলোমেলো

পুনশ্চঃ সেই ফোনটি মনে হচ্ছে কোমাচ্ছন্ন।

* আমার মাতৃদেবী স্মার্টফোন ব্যবহার করতেই চান না এক্কেবারে। নিতান্তই একটু অয়াটসআপ আর টকিং টম খেলেন। তাই আমার বাতিল ফোনগুলি মায়ের কপালেই জোটে। (না না, মা কে বেটার ফোনও দিই।)



পিতা_পুত্রী_উবাচ




১।

- বাবা ভীষণ depressed লাগছে।
- কেন?
- জানি না।
- weather কেমন?
- মেঘলা।
- কি খেয়েছ দুপুরে?
- ভাত ডাল আর ঘ্যাঁট মার্কা কিছু।
- ওই জন্যই। এরকম weatherএ মাংস খেতে হয়।
- ধুর।
- আরে হ্যাঁ। রাত্রে চিকেন খেয়ে নিয়ো। সব মুড ভালো হয়ে যাবে।


পুনশ্চঃ সত্যিই তাই হয়েছে।



Wednesday, July 19, 2017

অন্তর জ্বলে রে জ্বলে ২

- মিঠি তুমি ড্রাইভ করবে তো?
- আর নইলে কে করবে? বসে বসে তো একের পর এক গ্লাস whiskey সাঁটালে।
- হুম, অনেকদিন পরে। বেশ ভালো মুড এসছিল।
- আমিও খুব এঞ্জয় করেছি।
- yeah, it was a good party.
- চল চল, অনেক বেজে গিয়েছে। মালতী দি তো আবার সেই ঠিক ছটার সময় এসে বেল বাজাবে। By the way, কাল কিন্তু তোমার turn দরজা খোলার।
- হুম।


***************************************************************************

মিঠি আর রাহুল বাড়ি পৌঁছেছে খানিকক্ষণ হল। রাহুল বিছানায় বালিশে হেলান দিয়ে বসে ফোন নিয়ে কিছু একটা করে চলেছে অনেকক্ষণ ধরে। মিঠি ড্রেসিং টেবিলের সামনে বসে করছে তো রূপচর্চা। তবে চোখ কিন্তু আয়নাতেই, তখন থেকে রাহুলের ওপর নজর।

- এই তখন থেকে কি করে চলেছ বলো তো?
- এমনি একটু ফেসবুক করছি।
- কার সাথে চ্যাট করছ?
- ও অনেকের সাথেই। কেন?
- কে কে বল তো?
- উফ মিঠি, খুব বোকা বোকা হচ্ছে কিন্তু। এরকম করে জেরা করে নাকি কেউ? তাও আবার এত পুরনো বর কে?
- শোনো ওই পুরনো বরের হাবভাব যদি সন্দেহজনক ঠেকে, অবশ্যই জেরা করব। এটা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।
- ও হরি। এই একই কাজ যদি আমি করতাম, তাহলে তো তোমরা একেবারে সোশাল মিডিয়ায় ঝড় তুলতে। মেয়েদের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ ব্লা ব্লা ব্লা।
- সে করতামই তো। আমাদের রাইট আছে।
- কি অদ্ভুত! আর আমাদের কেন রাইট থাকবে না?
- উফ রাহুল। তর্ক বন্ধ কর তো। আগে বল কার সাথে চ্যাট করছ?
- ওই তো আশিস, পুলক আর রাজর্ষি।
- আর?
- আর কেউ না।
- আবার মিথ্যে?
- আহা মিথ্যে বলছি না ডার্লিং।
- সুলগ্নার সাথে কথা বলছ না?


- কি হল? বল?
- আরে না বাবা। এসে দেখে যাও বিশ্বাস না হলে।
- আমি ওরকম লেভেলে নামিনি এখনো রাহুল।
- তাহলে এতক্ষণ জেরা করে গেলে যে?
- শোনো এই বয়সটা ঠিক ভালো না। চোখে চোখে রাখতে হয় বরদের।
- উফ। You and your silly সানন্দা।
- কিচ্ছু ভুল লেখেনা। দেখলামই তো আজ পার্টিতে।
- কি দেখলে? ল্যা!
- সারাক্ষণ একেবারে সুলগ্নার পাশে চিপটে চিপটে ছিলে না?
- ওমা, সুলগ্না একা ছিল নাকি। ওর বরও তো ছিল।
- তারপরে ডিনারের সময়ে সেজলের সাথে ওই ন্যাকা ন্যাকা কেম ছো!
- সেজল CRYতে আছে। আমাদের CSRএর ব্যাপারে কথা এগোচ্ছিলাম। অফিসে গিয়ে শান্তনুকে বলে দেবো কন্ট্যাক্ট মেন্টেন করতে।
- আর কৌশাণি?
- well...you know না...
- কি well?
- আহা তার মানে গোটা পার্টিটা তুমি শুধু আমার ওপর spy করেই কাটালে মিঠি?
- spy কেন করতে যাব। just নজরে আসছিল।
- এ বাবা, রজত, স্যামুয়েল... এদের পাত্তাই দিলে না। আমি ভাবলাম...
- idiot!!!
- এবার পেলে তো?
- কি?
- Dose of your own medicine?
- আর কৌশাণি?


Tuesday, July 18, 2017

কলকল

স্নান করে সবে বেরিয়েছি, মাথা থেকে এখনো টুপটুপ করে জল ঝরছে। দেখি আমার ছোট্ট বোনঝি আরিয়া, বছর তিনেক বয়স, ওর ঘর থেকে ওর প্লাস্টিকের চেয়ারটা টেনে টেনে আনছে আমার ঘরে।
- আরিয়া কি করছ সোনা? চেয়ারটা আনছ কেন?
- মানি আমি খেলব তোমার সাথে।
- আচ্ছা ঠিক আছে। চেয়ারটা রাখো। আমি এখুনি আসছি।

 চুলটা আঁচড়াতে যাব,ওমনি ভ্যা ভ্যা করে আরিয়ার কান্না।

- কি হল মাম্মা?
- দেখো না মানি, আমার চেয়ারের পায়ে ধাক্কা খেয়ে একটা ant চোট পেয়েছে। ও হাঁটতে পারছেনা।
- কই দেখি?
- এই তো।

এগিয়ে গিয়ে দেখি, সত্যি একটা পিঁপড়ে আধমরা হয়ে রয়েছে। আরিয়া অনেক যত্নে ওটাকে নিজের হাতে তুলে নিয়ে আমার হাত ধরে টানতে টানতে বলল
- মানি চল ওকে ডক্টর আন্টির কাছে নিয়ে যাই।

আমাদের ফ্ল্যাটের ঠিক উল্টো দিকেই থাকেন এক ডাক্তার। ওদের বাড়িতে আরিয়ার অবাধ যাতায়াত। ছুট্টে গিয়ে ওর ডাক্তার আন্টির কাছে আরিয়া বলল এই পেশেন্টের কথা। ইতিমধ্যে চোখে চোখে "আন্টি" আর মানির কথা হয়ে গিয়েছে।

- ঠিক আছে আরিয়া, আমি ওকে ওষুধ দিচ্ছি। ও ভালো হয়ে যাবে।
- আন্টি তুমি কিন্তু ওকে ইনজেকশন দিয়োনা, ওর লাগবে।
- ঠিক আছে। আমি এমনি ওষুধ দেবো। তুমি এখন যাও। আমি ওকে ওষুধ দিই।


বিকেলবেলা আবার আরিয়া আমায় টেনে নিয়ে গেল উল্টো দিকের ফ্ল্যাটে।
- আন্টি আমার ফ্রেন্ড কোথায়?
- আরিয়া ও তো ভালো হয়ে গিয়েছে। ওর মা এসে ওকে বাড়ি নিয়ে গিয়েছিল। আর তোমায় খুব করে থ্যাঙ্ক ইউ বলেছে। আর এইটা তোমার জন্য রেখে গেছে।
 হাতে একটা এক্লেয়ারস নিয়ে আরিয়ার আবার প্রশ্ন।
- ও তো ছোট, ও এত হেভি জিনিস কি করে নিলো?
- আরিয়া পিঁপড়েরা নিজেদের চেয়েও দশগুণ ওজন ক্যারি করতে পারে।
-ও wow!

Sunday, July 16, 2017

বাজে করুণ সুরে

- রাহুল আমার মনে হয় আমাদের ব্রেকাপ করে নেওয়াই ভাল। এইভাবে আর চলছেনা।
- ওরকম বললে কি করে হয় অপা?
- দেখো লাস্ট পাঁচ মাস ধরে আমরা প্রতিদিন ঝগড়া করেছি। আমাদের মধ্যে আর সেই আগের বোঝাপড়াটাই নেই।
- দেখো সব কাপলের মধ্যেই এরকম একটু আধটু লেগেই থাকে, তা বলে কি আমরা হাল ছাড়লে হবে?
- আমরা চেষ্টা করেছি তো বল, করিনি?
- দশ বছরের সম্পর্ক এরকম পাঁচ মাসের ঝগড়ায় কাটেনা। আমার মনে হয় আমরা যদি আরেকটু এফোরট দিই, তাহলে ঠিক সমস্ত প্রব্লেম সরটেড হবে।
- লং ডিস্টেন্সে হয় না। সারাক্ষণ আমরা খিটিমিটি করে চলেছি।
- অপা আমার মনে হচ্ছে অন্য কিছু ব্যাপার। ঠিক করে বল তো, ব্যাপারটা কি?
- কিছু না, রাহুল।
- অপা...
- বলছি তো কিছু না।
- শোনো এতদিন ধরে চিনি, গলার স্বরেই বুঝে যাই কখন কি চলছে তোমার মনে। প্লীজ আমায় বলো।
- There's someone else in my life now
- কে? অভীক তো?
- কি করে জানলে?
- বললাম তো, আমি সব টের পেয়ে যাই।
- হুম। শোনো, আমার মনে, দুজনের ভালোর জন্যই আমাদের আর যোগাযোগটা বন্ধ করতে হবে। নইলে none of us can move on in life।
- দেখো অপা আমি কোনোদিনও তোমার ইচ্ছের বিরুদ্ধে কিছু বলিনি। আজও তার ব্যাতিক্রম হবেনা। কাজেই তুমি যা বলবে। শুধু আরেকবার বলব। ভেবে দেখো।
- আমি ঠিক করে ফেলেছি রাহুল। ভালো থেকো।
- বেশ, তুমিও।

*****************************************************************************


- এবারে বল, কি হল যে এরকম হুঠ করে আমায় ডেকে আনলি?
- জানিস আজ অপা ফোন করেছিল।
- এই না তোরা ব্রেকাপ করে নিয়েছিলি আর কোন যোগাযোগ রাখার কথা ছিল না?
- তাইই আছে। ও বিয়ে করছে। ওর কলিগ অভীককে। বিয়ের নেমন্তন্ন করতে কল করেছিল।
- তুই কি বললি?
- বারবার করে বলল যেতে।
- তুই নিশ্চয়ই গলে জল হয়ে গেলি?
- বলেছি চেষ্টা করব।
- রাহুল আমি তোকে খুন করব যদি তুই যাস।
- কেন? প্রাক্তন প্রাক্তনের জায়গায়, মটন বিরিয়ানি বিরিয়ানির জায়গায়। জানিস আমার পছন্দের মেনু করেছে।
- তুই বাজে কথা বলা বন্ধ করবি গাধা কোথাকার?
- আরে সাথে চিকেন রেজালা, ভেটকির তন্দুরী, রাবড়ি আর মালাই চমচমও আছে।
- শালা, নাটক হচ্ছে? তুই গেলে না দেখ তোর ঠ্যাঙ খোঁড়া না করি তো আমার নাম পাল্টে ফেলব।
- কি নাম রাখবি, ঠিক করে ফেল। কারণ আমি যাবই!
- রাহুল!
- হরিদাস পাল কেমন হবে?
- তুই শুধরোবি না। নে দু পেগ গলায় ঢাল।






********************************************************************************




- রাহুল কি করছিস?
- কি আবার করব? কি হয়েছে বল তো? উইকডেতে ভর সন্ধ্যেবেলা কল? সব ঠিকঠাক?
- না, আসলে আজ অপার বিয়ের তারিখ কিনা, তাই।
- ও তাই খোঁজ নিচ্ছিলি যে আমি কলকাতা গেছি না এখানে পড়ে আছি?
- উফ। তোর মন মেজাজ কেমন আছে, সেটা জানতে কল করলাম।
- আমি হেব্বি আছি বস। একটা ডেট আছে, সেখানে যাওয়ার জন্য রেডি হচ্ছিলাম ভাই।
- সত্যি?
- হ্যাঁ রে।
- কার সাথে?
- অফিস কলিগ, রিচা।
- বাওয়া! যাও যাও! এনজয় গুরু! এক্স এখনো মিসেস হল না আর মিস্টার চলল ডেটে! হেব্বি ব্যাপার। প্রাউড অফ ইউ ভাই।
- হ্যাঁরে কেউ ফেসবুকে কোন ছবি দিল টিল?
- ডেটে যাচ্ছ, যাও না। আবার ছবি দিয়ে কি হবে গুরু?
- আসলে অপাকে কনে সাজে দেখার খুব ইচ্ছে ছিল কিনা। মনে মনে কতবার যে কল্পনা করেছিলাম ওকে, লাল বেনারসী, গোল্ডেন ভেল...
- ব্যাটা তুই সত্যি ডেটে যাচ্ছিস তো?
- হ্যাঁ, যাচ্ছি।
- তো যা। আর হ্যাঁ, ফেসবুকে কোন আপডেট নেই।
- ঠিক আছে। পরে কথা হবে। রাখলাম।


অন্ধকার ঘরে হাতে  whiskeyর গ্লাস্টা নিয়ে বসল রাহুল। সি ডি প্লেয়ারে এই নিয়ে বোধহয় ১৫ নম্বর বার বাজা শুরু হল " তুঝে ইয়াদ না মেরি আয়ি"।




              *************************************************************

অন্তর জ্বলে রে জ্বলে



অফিস থেকে ফেরার পথে লেটার বক্সটা চেক করাটা অনেকদিনের অভ্যেস মিঠির। বছর পাঁচেক আগে অবধি অল্প বিস্তর চিঠি আসত, নিয়মিত না হলেও, অন্তত নিউ ইয়ার, ক্রিসমাসে, বিজয়ায় আত্মীয় স্বজনদের থেকে আসত। তার কারণ তখন অবশ্যই ওর শ্বশুর শাশুড়ি; এখন আর তাঁরা এখানে থাকেন না, তাই চিঠিপত্রের হিড়িক অনেক কম। আজকাল আবার চিঠি বলতে শুধুই ওই ব্যাঙ্কের স্টেটমেন্ট, ইলেক্ট্রিসিটির বিল আর কিছু বিজ্ঞাপনের কাগজ। বিল ও স্টেটমেন্ট অনলাইনে দেখে নেওয়া হয় বলে লেটার বক্সের কোন দরকারই নেই, তবুও মিঠি নিজের অভ্যেস থেকে সরতে পারে না। আর এই নিয়ে রোজ ওর পিছনে লাগে রাহুল। আজ লেটার বক্স হাতড়ে যখন একটা ঝলমলে নীল রঙের খাম পেল, আনন্দে আত্মহারা হয়ে যায় আর কি! ওর এতদিনের অভ্যেসের ফল মিলল তাহলে।

কোনমতে ঘরে ঢুকেই ঝটপট খামটা খুলে ফেলল মিঠি। কোনোদিনও ওর খুব একটা সূক্ষ্ম কারুকার্যে মনোযোগ ছিল না, ক্রাফটে তো একবার ফেল গ্রেড পেয়েছিল! তাই বেশ বিচ্ছিরি ভাবেই খামখানি ছিঁড়ে ভিতর থেকে চিঠিখানা বের করল। খামের কন্টেন্ট দেখে আনন্দে আত্মহারা হওয়ার জোগাড়। মাধ্যমিক ২০০৪ ব্যাচের প্রথম রিউনিয়নের নিমন্ত্রণ। ফেসবুকে ওদের একটা গ্রুপ আছে, সেখানে কিছুদিন ধরে এই নিয়ে নানান প্ল্যান চলছিল, খুব বেশী তাতে না থাকলেও খবর ঠিক রাখত মিঠি। রাহুল ফিরলে বলতেই হবে। এত আনন্দ হচ্ছে ভাবতে, কি করবে বুঝেই উঠছেনা। কতদিন পরে সব বন্ধু বান্ধবীদের সাথে দেখা হবে। আহা, সেই ছোট্টবেলাকার বন্ধুত্ব, কাজের চাপে একেক জন একেক জায়গায় থাকে বলে অনেকের সাথেই বহু বছর দেখা নেই। কিন্তু এই রিউনিয়নে অন্তত যদি ৫০ জন ও আসে, তাদের সাথে তো আবার সাক্ষাতটা ঝালাই হয়ে যাবে। টুক করে ওইয়াটসাপে ওদের এক বন্ধু বান্ধবীর গ্রুপে মেসেজ ছেড়ে দিল।

রাত্রে খাবার টেবিলে বসে রাহুল তো অবাক যখন পাতে দেখে রোজের কেনা রুটি আর চিকেন কারীর জায়গায় একেবারে গরম গরম ধোঁয়া ওঠা ভাত, ঘি, মুগের ডাল, আলু ভাজা আর চিংড়ি মাছের মালাইকারি।
- কি ব্যাপার? আজ এত এলাহি খাবার?
- এমনিই, ইচ্ছে হল। রেঁধে নিলাম।
- বাব্বা! সপ্তাহের মাঝখানে এরকম ইচ্ছে। লটারী টটারী জিতলে নাকি গো?
- বলতে পারো!
- রিয়েলি?
- হুম, তুমিও শুনলে বিশাল খুশী হবে।
- সাস্পেন্স থামাও প্লীজ মিঠি। কি হয়েছে সেটা বল।
- আজ লেটার বক্স থেকে একটা দারুন জিনিস পেয়েছি! তুমি চ্যালেঞ্জ হেরেছ, আমায় একটা সিল্ক এনে দেবে কাল। হ্যাঁ, যেটা বলার, চিঠি এসছে স্কুলের থেকে। আমাদের ব্যাচ রিউনিয়ন। আগামী শনিবার।
- তুমি যাবে নাকি?
- অফ কোর্স! তুমিও যাবে!!! স্পাউস নিয়ে যেতে বলেছে। ককটেল পার্টি।
- প্লীজ, তোমার ব্যাচের রিউনিয়নে গিয়ে আমি কি করব? তুমি যাও!
- প্লীজ রাহুল, চলো না!
- আহা আমি তো ওখানে কাউকেই প্রায় চিনব না, গিয়ে সাঙ্ঘাতিক বোরড হব।
- শোনো আমিও তোমার অফিস পার্টিগুলোতে কিন্তু যাই, কাউকে তেমন না চিনলেও দাঁত ঠিক কেলিয়ে দিই। তুমিও সেরকম করো।
- মিঠি প্লীজ, নেক্সট উইকেন্ডে আমার অন্য প্ল্যান। স্পোর্টস বারে গিয়ে ম্যাচ দেখার প্ল্যান আছে আশিসদের সাথে। বিসাইডস সেই পারুর বিয়েতে গিয়ে কি বোরিং কেটেছিল। বাপ রে। তুমি নিজের বন্ধুদের নিয়ে ছিলে আর আমায় ভিড়িয়ে দিয়েছিলে ওই কার একটা বরের সাথে। কি বোর পাব্লিক ছিল মাই গড!
- সত্যিই রাহুল। তোমায় আর কি বলব বল। একবার যখন ঠিক করে ফেলেছ, আর কি বলি বল? আমি এত করে বললাম, তাও আসবে না। সবাই বর বৌ নিয়ে আসবে।
- প্লীজ।
- কিন্তু আমি যাব, এই বলে দিলাম।
- হ্যাঁ যাও। আনন্দ করো। আমি বারণ করছি না তো!
- আর এমন কিছু দুরেও না, গাড়িটা আমি নিয়ে বেরবো।
- হুম ঠিক আছে।
- উফ, ভাবতেই কি আনন্দ হচ্ছে। ফাইনালি ফেসবুক গ্রুপ্টা একটা কাজের কাজ করল!
- হুম।
- কি তখন থেকে হুম হুম করে যাচ্ছ?
- হুম।
- ধ্যাত! কোন কথাই কানে যাচ্ছেনা। দেখো বসে অর্ণব গোস্বামীর চেঁচামিচি। হুহ। আমি পারুকে কল করি। প্ল্যান বানাই।
- হুম।

- হ্যালো পারু?
-
- হ্যাঁ রে, আমি আজই চিঠিটা পেলাম।
-
- সত্যি রে, কি এক্সাইটেড লাগছে। কে কে আসছে জানিস?
-
- শেলী আর মণীষা? ওরা কোথায়?
-
- ও। শেলীর খবর নিশ্চয়ই অনিরুদ্ধ জানবে? হিহি!
-
- সেই সেই, অনির বিয়ে হয়ে গেল তো। ও কি আর খোঁজ রাখবে!
-
- ছেলেরা কে কে আসছে?
-
- নির্মাল্য মানে যে ওই ক্লাস এইটে তোকে প্রেমপত্র দিয়েছিল?
-
- এখনো তোর সাথে যোগাযোগ আছে নাকি? রণদা জানে?
-
-রাহুল যদি জানত যে আমার সব এডমায়রাররা আসছে, নির্ঘাত অস্থির হয়ে যাবে!!!!
-
- না রে, ও আসবে না। ওর বন্ধুদের সাথে নাকি প্ল্যান করা আছে।
-
- আরে একদিক দিয়ে ভালোই হল। ও থাকলে মন খুলে ফ্লারট করতে পারতাম না! হি হি!
-
- ওমা। রজত বেচারাটা নেহাত সাহস জুটিয়ে আমায় লাভ লেটারটা দিতে পারল না। হেমার কাছে পরে শুনে মনে আছে হেসে কুটিপাটি আমরা! ও যদি সেদিন আমায় প্রোপোজ করত, আমি ভেবে দেখতাম ঠিক।
-
- তা বলে কি হবে। না হয় আমার বিয়ে হয়ে গিয়েছে। ওর তো আর হয়নি। আর হলেই বা। জানিস এখনো ওর প্রোফাইল স্টক করি ফেসবুকে, হেবি স্মার্ট দেখতে হয়েছে। হিল্লি দিল্লি করে বেড়ায়। এক দুটো ডান্স না হয় করব ওর সাথে।
-
- ধুর, রাহুল পাশেই আছে। কিন্তু এত জোরে টিভি দেখছে, কিচ্ছু শুনতেই পাচ্ছেনা!!
-
- ওরা যখন কলিগদের সুন্দরী বৌদের সাথে ঢং করে বেড়াবে? সে বেলা? আমরা একটু পুরনো ক্লাসমেটদের সাথে না হয় হাল্কা মস্করা হাসি ঠাট্টা করব। তাতেই ওমনি দোষ?
-
- এই স্যামুয়েল আসবে রে?
-
- আরে স্যামুয়েল রে। ওই যে সি সেকশনের টিমে ক্রিকেট খেলত। ব্রাউন চুল, নীল চোখ।
-
- হ্যাঁ হ্যাঁ। সেই ছেলেটা। ক্লাস সেভেনে আমার পাশে বসেছিল পিকনিক বাসে বলে টেনের দিদিগুলোর কি হিংসা!
-
- মজা হবে কিন্তু। ওই বয়সে যাদের থেকে চোখ ফেরাতে পারতাম না, তাদের আবার দেখব।
-
-যাক গে, সেসব ছাড়। বলছি কাল একবার সন্ধ্যেবেলা কোয়েস্টে যাবি? ড্রেস আর ম্যাচিং জুতো কিনতাম।
-
- অবশ্যই! যোগা করে শরীরটা কে মেন্টেন করেছি এত সুন্দর, একটু ফ্ল্যাটারিং ড্রেস না পড়লে হয় নাকি? হেব্বি সেজেগুজে যাব দেখিস।
-
- মনে আছে স্কুলে কিরকম কালার ড্রেস হলে আমরা সব প্ল্যান করে কালার ম্যাচ করে সাজতাম? ঠিক সেই রকম করব। দাঁড়া, আমি কাজরীকে মেসেজ করি। নিয়ে কাল বা পরশু চল একসাথে শপিঙে যাই।
-
- চল, তাহলে দেখা হচ্ছে শিগগিরি। বাই।

- বাব্বাহ, হল তোমার ফোন পর্ব!
- হুম।
- কত বকে যেতে পারো।
- তুমি বুঝি কান পেতে শুনছিলে?
- আমি শুনতে যাব কেন? জাস্ট অনেকক্ষণ ধরে কানে শব্দ আসছিল তো। তাই।
- বুঝলাম।

***********************************************************************

সারা সপ্তাহ মিঠি আর ওর বান্ধবীর প্রচুর দোকান বাজার করল। পছন্দসই ড্রেস, ম্যাচিং জুতো, ব্যাগ আর গয়না সবই হল। শনিবার সকাল থেকেই একটা উত্তেজনা। অবশেষে ডি ডে এসেছে। পার্লারের মেয়েটা এসে চুল সেট করে দিয়ে বেরিয়ে যেতে মিঠি নিজের ঘরে ঢুকতে যাচ্ছে ড্রেস চেঞ্জ করতে, এমন সময় রাহুলের হাঁকডাক।

- মিঠি আমার সুটটা কোথায়?
- কোন সুট?
- আরে যেটা জন্মদিনে তুমি গিফট করলে।
- ওটা তোমার আলমারিতেই আছে। একটু ভালো করে তাকিয়ে দেখো।
- পাচ্ছি না। প্লীজ একটু খুঁজে দিয়ে যাও।
- উফ আমার দেরী হয়ে যাবে। এখন ওটা দিয়ে কি করবে?
- ওটাই পরব তো।
- বল কি? স্পোর্টস বারে সুটেড বুটেড হয়ে যাবে??
- ওখানে যাচ্ছিনা তো।
- তাহলে কোথায় যাবে?
- তোমার সাথে, রিউনিয়নে।
- এ?? আর তোমার প্ল্যান?
- ক্যান্সেল করে দিয়েছি।
- কেন? কি কান্ড!
- ভেবে দেখলাম। এই বয়েসে বন্ধুরা গেলেও নতুন বন্ধু জুটে যাবে। কিন্তু যা চেহারা হয়েছে, বৌ গেলে আর নতুন করে মেয়ে পটানো মুস্কিল হয়ে যাবে। যে পার্টিতে বউয়ের এত এডমায়রার ঘুর ঘুর করবে, সেখানে না যাওয়াটা ভারী বোকামো!
- যাক! পারুর সাথে ফোন কলটা তাহলে কাজে দিল!!!

********************************************************