Thursday, October 26, 2017

আত্মপ্রকাশের জন্য

#নিজস্বীতে_আত্মপ্রকাশ

গুরুদেবের একটি লেখার দ্বিতীয় পর্ব আমি লিখেছিলাম, সেইটা যাতে আপনারা সকলে পড়তে পারেন, সেই জন্যই মূলত আত্মপ্রকাশে আমার আসা। আর ব্যস, তারপরে তো... এই একটা এত্ত বড় পরিবার পেলাম, সে যে কী আনন্দ আমার! নিজে ছোট যৌথ পরিবারে বড় হয়েছি, আত্মীয়স্বজন বন্ধুবান্ধব নিয়ে গল্প করে গল্প শুনে সময় কাটাতে খুব ভালো লাগে। বলা যায়, শুধু কিছু সমমনস্ক মানুষ পেয়ে গেলেই আমি যে সেই বকবক শুরু করব, যে কোন রেডিয়ো ষ্টেশনের আর জে হার মেনে যাবে! আর তাই আত্মপ্রকাশে দিনের মধ্যে অন্তত সাত আটবার ঢুঁ মারাটা আমার নৈতিক দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। সকলের লেখা পড়ি, অনেক সময় কমেন্ট করা হয়ে ওঠেনা (আমি আদপে খুবই অলস কি না, এই আলস্যের জন্যই আমি এখনো চেন্নাইতে পড়ে রইলাম। নইলে তো এতদিনে মঙ্গল গ্রহে পৌঁছে যেতাম, সলমা মাসীর মত অত এলেম নই, তাই প্লুটো অনেকটা বেশী দূর।), কিন্তু অবশ্যই পড়ি। কবিতা তেমন বুঝিনা, তবে গল্প (যে কোন সাইজেরই হোক, গোগ্রাসে গিলি। হ্যাঁ খেতে যে বড্ড ভালোবাসি, আমার সাইজ দেখেই বুঝবেন। ও সরি, কী করেই বা বুঝবেন, ছবি তুলি যখন নিঃশ্বাস চেপে ভুঁড়ি কমানোর মোটামুটি successful attempt নিয়েই ছবি তোলাই যে)
নাম মনে রাখতে পারিনা সহজে, যদি না খুব বেশিভাবে interact করি, বা সামনাসামনি আলাপ হয়, তাই হয়তো সকলের নাম নিয়ে বলতে পারছিনা। এই ইভেন্টটা খুব মনে ধরেছে, অন্তত ডিপির আড়াল থেকে বেড়িয়ে অনেকজনকে দেখবো, চিনব।
এই রে, দেখলেন তো, already বকবকের সুযোগ পেয়ে কিরকম bore করা শুরু করে দিলাম? আর তেমনি কিরকম অসংলগ্ন কথাবার্তা বলা শুরু করলাম? আসলে মাধ্যমিক থেকেই এই অবস্থা। পঃবঃমঃশিঃপঃ (আরে ধুর, ওই যে, State Board) এ পড়লে সুস্থ মানুষেরও হাল এইরকম হয়। তার ওপরে আবার শহুরে কনভেন্ট ইশকুলে পড়লে এমনিই এটা বেড়ে যায়। কুড়িয়ে বাড়িয়ে পরীক্ষায় নম্বর তুলতে গেলে এই হ্যাজানোটা পুরো রক্তে মজ্জায় ঢুকে যায়, আমিও তার কোন ব্যতিক্রম নই। সারাংশ আর ভাব সম্প্রসারণের প্রশ্নে ১০ নম্বর থাকত, কয়েকবার পাথফাইন্ডারের পরীক্ষায় সারাংশ লিখবার চেষ্টা করলাম, নিয়ম মত তো ১/৩ হওয়া উচিত লেখার মাপ, আমার হল গিয়ে ১৩ গুণ। তারপর থেকে আর কোনদিনও চেষ্টা করার দুঃসাহস দেখাইনি। এক্কেবারে পাতার পর পাতা লিখে যেতাম। এখনো সেই অভ্যেস যায়নি। প্রথম প্রথম বাংলা টাইপ করতে কষ্ট হত, অনলাইন একটি সাইট থেকে লিখতাম, তারপর লিনাক্সে অভ্র লাগালাম। আর কি! মাঝে মাঝেই আপনাদের বিরক্ত করে মারি।
এত কিছু বলার পরেও এখনো বললাম না প্রশ্নপত্রের সব উত্তর। ধুর ধুর, প্লীজ adminরা আমার নম্বর কাটবেন না। এত বছরের অভ্যেস কি না।
১। আমি আসলে দক্ষিণ কলকাতার মেয়ে। কিন্তু উত্তর খুব টানে। (জানি না কেন, জাতিস্মর নই, তাই confirm করতে পারছিনা আগে থাকতুম কি না ওই ঠনঠনিয়া চত্বরে)
২। আপাতত থাকি চেন্নাইতে। একটি জঘন্য বিষয়ে (না না বিষয়টা ভালো, আমার আজকাল একঘেয়ে লাগে) রিসার্চ করি। বছরখানেকের মধ্যে ডিগ্রী লাভ করতে চাই।
৩। বই পড়তে, গান শুনতে, খেতে, লোকজনকে ধরে জ্ঞান দিতে আমি ওস্তাদ।
৪। বেড়াতে ভালোবাসি।
৫। ছবি তুলতে ভালবাসি। প্রচুর চেষ্টা করে টাকা পয়সা জমিয়ে জন্মদিনে একটি DSLR কিনলাম, কিন্তু এখনো ৬ মাস পরেও Auto modeএ ছবি ওঠাই।
৬। অল্প বিস্তর লিখি আর রোজ গান গাই।
৭। বন্ধু পাতাতে পারি মোটামুটি।
৮। কুকুর বিড়াল দেখলেই আদেখলাপনা চাগাড় দিয়ে ওঠে।
৯। আমি খুব খুব ভীতু, রাত বিরেতে হোস্টেলের অন্ধকার করিডোরে একা বেরোতে খুব কষ্ট হয়।
থাক, দশ নম্বরটা না হয় বললাম না আর। সব বলে দিলে একেবারে তাহলে আর কি হবে??

আচ্ছা থাক, ১০ নম্বরটা বলেই দিই, অত ভাও খাবও না, সবে কেক আর মাইসোর পাক খেয়ে গুরুভোজন করলাম। খিদে নেই আপাতত।
১০। সিনেমা কেবলমাত্র শাহরুখ খানের হলে, তবেই আস্ত দেখি, তাও হলে। নইলে সব সিনেমা হয় ডাউনলোড করে (অপরাধ, আজকাল কমিয়ে ফেলেছি), Amazon Primeএ বা Youtubeএ দেখলেও গান স্কিপ করে যাই। অত ধৈর্য নেই যে, কি করব!

ব্যস, প্লীজ, অনেক লিখে ফেলেছি। আর পারছিনা। এবার বাকিদের গুলো পড়ি। আর হ্যাঁ, প্লীজ, আমায় ক্ষমা করবেন এত লম্বা essay লিখলাম বলে। মানে লেখাটা ঠিকঠাক হলে কিছু না, এটায় কোনরকম সারমর্ম নেই কি না, তাই।

আচ্ছা, টাটা।

পুনশ্চঃ ছবিটি গত শনিবার দুপুরে আমার ডিপার্টমেন্টের নীচে বাগানে pose দিয়ে তোলা। হলুদ আমার প্রিয় রঙ (হলুদ রঙের চশমার ফ্রেম অর্ডার দিলাম গতকাল), তাই সেই ছবিটিই দিলাম।

ডবল পুনশ্চঃ আত্মপ্রকাশকে জন্মদিনের অনেক অনেক শুভেচ্ছা (এত বাজে বকতে গিয়ে আসল কথাই লিখতে ভুলে গিয়েছিলাম)

ট্রিপল পুনশ্চঃ গুরুদেব মানে আপনাদের সকলের প্রিয়পাত্র, আপনাদের হিরো, শ্রীযুক্ত অর্ণব ভৌমিক (যার পপ্যুলারিটি অর্ণব গোস্বামীর চেয়ে কোন অংশে কম না। পুনশ্চ ৩ক।দুজনেই খুব প্রিয় আমার :)  )

Wednesday, October 18, 2017

ছকভাঙা

#ইভেন্ট
#ছকভাঙা

ইভেন্টের নামই যখন ছকভাঙা, তখন তো নিজের দিক থেকেও কিছু নিয়ম ভাঙ্গতেই হয়। তাই রবিবারের আগে লেখা দেব না ভেবেও উৎসবের মরসুম (আর তার চেয়েও বেশী গুরুত্বপূর্ণ কারণ, চেন্নাইতে আজ দীপাবলির ছুটি হওয়ায় একটু সময় পেলাম লেখার) বলে আজকের এই ছোট্ট নিবেদন। ছক ভাঙল কি না, জানিনা। চেষ্টা করলাম বাঁধা ধরা নিয়ম মাফিক গড়পড়তা জীবন থেকে একটু বেরিয়ে আসতে। মতামত জানাবেন।

১।

" মা মা, আমার জন্য কী কী বাজি কিনে আনবে?" সাত বছরের ছোট্ট মেয়ের প্রশ্নে এক লহমায় তনুশ্রী পৌঁছে যায় নিজের ছোটবেলায়। তখন কালী পুজো মানেই চতুর্দশীর দিন থেকেই শুরু হয়ে যেত জমিয়ে ফুলঝুরি, রঙ মশাল, সাপবাজি, ছুঁচোবাজি, চকোলেট বোমা, কালিপটকা, চরকি, দোদোমা, হাউয়ের তাণ্ডব। আশেপাশের বাড়ির বন্ধুদের মধ্যে চলত প্রতিযোগিতা, কার বাজি কতক্ষণ ফাটে, কত জোরে আওয়াজ হয়। তারপর একটা বছর, ঠাকুরদা বাজির শব্দে আর ধোঁওয়ায় প্রচণ্ড অসুস্থ হলেন, প্রায় যমে মানুষে টানাটানি। কী সাংঘাতিক দিন গিয়েছে তখন, আদরের নাতনি তনুশ্রীর এখনো ভাবলেই ভয়ে শিউরে ওঠে।

" সোনা আমরা কোন বাজি ফাটাবো না। দীপাবলি তো আলোর উৎসব, আমরা খুব করে আলো দিয়ে সাজাবো বাড়ি। ঠিক আছে? আমি কিছু প্রদীপ কিনে আনব, তারপরে তুই আর আমি মিলে সুন্দর করে রঙ করে ডেকোরেট করব। ওকে? "

" মা, রঙ্গোলী করব না? মীনাক্ষীদের বাড়িতে তো হয়, সুমথি আনটি কী সুন্দর করে আঁকে দিওয়ালীর আগে। "

" বেশ, তাও করব। হ্যাপি? "

" ভেরি! "

২।

" কবে থেকে তোকে বলছি যে ঘর পরিষ্কার করবি। এখনো করিসনি কেন? "

" উফ মা। করলাম তো। কাল সারাদিন ধরে করেছি। এর চেয়ে বেশী আর পারব না। দিব্যি পরিষ্কার আছে। "

" মোটেই না। ড্রেসিং টেবিলের অবস্থাটা দেখ। গুচ্ছের শিশি বোতল। "

" মা ওইগুলো সব দরকারি। ফেলা যাবে না। "

" ওই ফেয়ারনেস ক্রিমের টিউবগুলো ফেলে দে। কালীপুজোর সাফ সাফাই তবেই তো কমপ্লিট হবে। "

নিজের চেয়েও বেশী আধুনিকা মায়ের দিকে অপলকে এক রাশ মুগ্ধতা নিয়ে তাকিয়ে থাকে রিনি।

৩।

সকাল থেকে একের পর এক লাড্ডু বানিয়েই চলেছে শুক্লা, যদিও আজ ওর সুইট স্টোর বন্ধ।

ওর বর, অভিজিৎ তো অবাক, " কী ব্যাপার, আজও তুমি মিষ্টি বানিয়ে চলেছ? আজ না তোমার স্টোর বন্ধ? "

"  হ্যাঁ স্টোর বন্ধ। কিন্তু এগুলো কিছু ডেলিভারি করার রয়েছে। অনেক পুরনো অর্ডার। "

"  কোথায়? কার অর্ডার? "

"  সারা বছর আমাদের ডেলিভারি করে যারা, তাদের বাড়ি বাড়ি আজ আমি আর তুমি গিয়ে ডেলিভারি করব এইগুলি। সারা বছর এত খাটে, উৎসবের দিনে ওদেরও তো কিছু প্রাপ্য, বলো? "

ঠিক সেই মুহূর্তে নিজের স্ত্রীর প্রতি অভিজিতের জন্মায় এক নতুন শ্রদ্ধা। 



সকলকে জানাই শুভ দীপাবলি।

Monday, October 16, 2017

একটি সাংসারিক গপ্পো (কহানী ঘর ঘর কি )

সকাল ছটার এলারমে ঠিক রোজের মতই আজও ঘুম ভেঙ্গে গেল বিদিশার। টের পেল, বাইরে তখনো বৃষ্টি পড়ছে। সারা রাত ধরে গ্যারেজের টিনের চালে সমানে টিপটিপ টাপটুপ করে পড়েই চলেছে। ছোটবেলায় এরকম সারাদিন বৃষ্টি পড়লেই সে কী আনন্দ বিদিশার, "মা আজ কিন্তু রেইনি ডে, আজ স্কুল যাব না।" সারাদিন তারপরে মা মেয়েতে কত গান, কত গল্প কত বইয়ের রাজ্যে নিজেদের হারিয়ে ফেলত। এখনো সখ হয় তো আগের মতোই, শুধু পূর্ণ হয়না। পাঁচটা মিনিট বাড়তি শোয়ার অবকাশ নেই, ঘড়ির কাঁটা মিলিয়ে কাজ করে যেতে হয়। পাশে শোয়া অর্ঘ্যর যাতে এতটুকু ব্যাঘাত না ঘটে ঘুমের, আস্তে আস্তে পা টিপে টিপে উঠল বিদিশা। হাত মুখ ধুয়ে সঙ্গে সঙ্গে রান্নাঘরের দিকে গেল, শুরু হবে আবার একটা নতুন দিনের যুদ্ধ। সারা রাত যা বৃষ্টি হয়েছে, কাজের লোকেরা কেউ আসবে বলে মনে হচ্ছেনা, বাড়তি কাজ হল। গ্যাসে চায়ের জলটা বসিয়ে বিদিশা ফ্রিজ থেকে সারাদিনের রান্নার জন্য সব্জি বের করতে লাগল। শ্বশুরমশাই আর অর্ঘ্যর লাঞ্চ, টুকাইয়ের টিফিন, ননদ মিন্তির ব্রাঞ্চ, টুকাইকে স্কুলের জন্য তৈরি করা...সব করতে করতে কখন যে সারাটা সকাল কেটে যায়, খেয়ালই পড়েনা। আগে বাপের বাড়ি থাকতে দুটো খবরের কাগজ না পড়ে দিন শুরু হত না যে মেয়ের, সে এখন খবরের কাগজ দেখে বোধহয় সংবাদ বাসি হয়ে যাওয়ার পর।
ট্রে করে চায়ের কাপ নিয়ে শ্বশুর শাশুড়ির ঘরে এলো বিদিশা। বউমার হাতের চা না খেলে ওনাদের দিন শুরু হয় না। টুকাই তার দাদু ঠাকুমার কাছে রাত্রে থাকে, এইবারে মায়ের ডাকে রোজের মতই ঘুম থেকে ওঠা নিয়ে শুরু হল এক প্রস্থ লড়াই।
" থাক না বিদিশা, একটা দিন একটু ঘুমোক না ও।"
" না মা, আর ঘুমোলে স্কুল বাস মিস করবে। কে আবার পৌঁছোতে যাবে ওকে তখন বলুন? একেই যা বিচ্ছিরি ওয়েদার।"
" ওই জন্যই তো বলছি, ওকে আজ রেইনি ডে করে দাও না। একদিন স্কুল না গেলে কিচ্ছু হবে না।"
" হ্যাঁ বউমা, কি সুন্দর শুয়ে আছে আরাম করে। একটা তো দিন। আমরা ছোটবেলায় কত এরকম স্কুল কামাই করতাম বৃষ্টি হলেই।"
" সে তো আমিও করতাম বাপি। তবে আপনার ছেলেকে বলুন। ও রাগারাগি করবে শুনলে।"
" চিন্তা করো না বউমা, তোমার শাশুড়ি বলবে বাবুকে। কি, বলবে তো? "
" হ্যাঁ, বাবু উঠেছে? ওকে পাঠিয়ো এই ঘরে। ইন ফ্যাক্ট, আমার একটা প্রস্তাব আছে।"
" কী প্রস্তাব মা?"
" আজকে সবাই রেইনি ডে পালন করবে। কেউ কাজে বেরোবে না। স্কুল কলেজ অফিস সব ছুটি।"
" ওরে বাবা, এ তো বেশ যুগান্তকারী আদেশ মা। "
" তুমি পাগল হলে নাকি ঝুমুর? টুকাইয়ের ওপর না হয় এই ফরমান চলতে পারে, আর কেউ মানবে নাকি?"
" অবশ্যই মানবে। বাবুরটা আলাদা ব্যাপার। কোন ইম্পরট্যান্ট কেস থাকলে ওকে ছেড়ে দেব। নইলে আর কেউ না। তুমি কাল বাদে পরশু রিটায়ার করতে বসেছ, এখনো এত কী? আজ একটা সি এল নেবে। মিন্তি রোজ এত কত ক্লাস করে, আমার সব জানা আছে। আজ তাই ডুব দেবে। এই বলে দিলাম। "
" আপনার আর আজ অফিস যাওয়া হল না বাপি। দাঁড়ান। আমি আপনাদের ছেলেকে পাঠাচ্ছি এই ঘরে। আপনারা বলুন। আমি রান্নাঘরে যাই। প্রচুর কাজ। টুকু ঘুমো তুই আরো। "


নিজেদের বেডরুমে এসে অর্ঘ্যকে ঘুম থেকে তোলাটা আরেক পর্ব যেন যুদ্ধের। যেমন বাবা, তেমন ছেলে, দুজনের কেউই সকালবেলা উঠতে চায় না। প্রায় দশ মিনিট চেষ্টা করার পর যখন অর্ঘ্য চোখ খুলল, বিদিশা বলল, " শোনো, মা আজ রেইনি ডের ফরমান জানিয়েছেন। সবার ছুটি। "
" মানে? টুকাই কে রেডি করেছো?"
" আরে সেটাই তো বলছি। মা বলে দিয়েছেন আজ সবাই বাঙ্ক করবে স্কুল কলেজ অফিস। তোমায় ও ঘরে ডেকেছেন। যাও। টুকাই এখনো ঘুমোচ্ছে। "
" সে যা ইচ্ছে বলুক মা। আমার ওসব সুযোগ নেই। টুকাইয়ের স্কুলটা মিছিমিছি কামাই করালে। "
" আমায় বলছ কেন? মা বাপিকে বল! "
"  হুম, যাচ্ছি। তুমি তাহলে আমার চা আর টেলিগ্রাফটা ওই ঘরে এনে দাও। "
" হ্যাঁ। আসছি। "


" কী ব্যাপার মা? আজ নাকি তুমি সবার ছুটি ডিক্লেয়ার করেছো? "
" হ্যাঁ, করেছিই তো। এরকম ভালো ওয়েদার, একটু বাড়ি বসে আরাম করতে কী হয়? "
" ওইসব আরাম ইত্যাদি তোমাদেরই হয়। আমার হবে না। আমি হসপিটালে না গেলে হবে না। "
" বেশ, তুই যাস। নেহাত পেশেন্টরা তোদের মুখ চেয়ে বসে থাকে, নইলে ছাড়তাম না তোকেও।  যত তাড়াতাড়ি পারিস ফেরত আসিস। আমরা বাকিরা আজ এঞ্জয় করব। "

ইতিমধ্যে মিন্তির ঘুম ভেঙ্গেছে, বৌদির কাছে শুনেছে মায়ের এই অদ্ভুত বিধান। আজ কি না সুজিতের সাথে সিনেমা দেখতে যাবে ভেবেছিল, এমনিও ক্লাস কম আজ। মা যদি কলেজ যেতে না দেয়, তাহলে সেই প্ল্যান ক্যান্সেল। সুজিত বেশ রেগে যাবে, জানে। দেখা যাক, মা কে রাজি করানো যায় কি না। ব্রাশ করে মা বাবার ঘরে এলো মিন্তি। সেখানে ইতিমধ্যে ভাইপো টুকাই ঘুম থেকে উঠে পড়েছে। স্কুল যেতে হবে না শুনে ভারী আনন্দ তার। ঘরময় ছোটাছুটি করছে। ওরই সব চেয়ে যেন মন ভালো। বাবার মিশ্র অভিব্যক্তি, বোধহয় অফিসের শেষ কটা মাস জমিয়ে কাজ করে গল্প করে কাটাতে চান সহকর্মীদের সাথে। বৌদির অবশ্য মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে, সপ্তাহের মাঝে একটা হঠাৎ করে আসা ছুটির দিনের আগমনে খুব খুশী না, আসলে হবেই বা কী করে। সকলে বাড়ি থাকলেই তো বেচারির ওপর একটার পর একটা অর্ডার আসতে থাকে। দাদার লুচি আলুর দম চাই তো বাবার দিনের মধ্যে পনেরো বার চা। মায়ের পুজোর ঘরে হাজারটা দরকার, মিন্তির নিজেরই বা কম আবদার থাকে না কি? নেল পেন্ট লাগানো থেকে মাথায় হেনা করা, বৌদি ছাড়া কে বা করবে। এর ওপর আবার টুকাইয়ের পিছনে পিছনে সারাদিন দৌড়াদৌড়ি। আহা রে, মা যে কী করে না!

" মা, তুমি না কি কীসব মাস বাঙ্কের নিয়ম করেছো আজকের জন্য? বৌদির কাছে শুনলাম।"
" হ্যাঁ, আজ রেইনি ডে পালন হবে। তোমার বাবা ভাইপো সবাই ছুটি নিলো। তুমিও কলেজ যাবে না আজ। দাদা নেহাত রুগী দেখবে, তাই আটকাতে পারলাম না। "
" কিন্তু মা, আমার যে ক্লাস আছে কয়েকটা আজ। খুব ইম্পরট্যান্ট টপিকস চলছে। "
"  কী যেমন?  জুড়য়া ২ নাকি গোলমাল? "
" ধ্যাত, যত বাজে কথা। "
" আহা, আমি কি ঘাসে মুখ দিয়ে চলি না কি?"
" আরে না, আজ স্ট্যাট মেকের কয়েকটা ইম্পরট্যান্ট লেকচার আছে। মিস করা যাবে না। প্লীজ বোঝো। "
" শোন, বই খুলে পড়ে নিবি নিজে। না বুঝলে ক্লাসমেটদের থেকে কাল বুঝে নিস। আজ ছুটি, বলে দিয়েছি, ব্যস। এর আর অন্যথা শুনব না। "
" মা তুমি না! আরে আমরা বাড়িতে থাকলে বৌদির ওপর এক্সট্রা কাজের হ্যাপা হয়। কেন বেচারীকে প্রেশার দিচ্ছ? "
" এই না না ননদিনী, আমার কোন অসুবিধেই হবে না। থাকো না বাড়ি। বাপি আর টুকাই আছে। তুমিও থাকো। ভালো হবে কিন্তু। তোমার দাদাকেও বলো যত তাড়াতাড়ি পারে, ম্যানেজ করে চলে আসতে। সবাই মিলে বেশএকটা ছুটি কাটানো যাবে। "

" এই মিন্তি, তখন থেকে পটর পটর করে চলেছিস। চুপ কর। আমার একটা প্ল্যান আছে। বলছি শোন। আগে বোস এখানে। বাবু তুই যাবি না এক্ষুনি, আগে আমার কথা শুনে যা। বিদিশা তুমিও বসো। "
" মা অনেক কাজ বাকি। ওর টিফিন বানাতে হবে। "
" তুমি আগে বসো। শাশুড়ির মুখে মুখে আবার কথা, ভারী পাজি বৌ তো! "

মিন্তির ফিচকে হাসি দেখে শাশুড়ি একবার কড়া নজর দিলেন, তারপরে আবার শুরু করলেন বলা। " প্রতিদিন আমাদের বিদিশা তো খেটে খেটে একসা হয়ে যায়। মেয়েটার তো কোন ছুটিই হয় না। আজ আমরা সব্বাই মিলে ওকে ছুটি দেব। "
" হয়েছে! দেখেছো বৌমা? তোমায় ছুটি করে দেবে তোমার শাশুড়ি। কাল সিরিয়ালের সময়ে বিরক্ত করেছো, এই তার পানিশমেন্ট। "
" থামবে? আমায় কথা শেষ করতে দাও।" এই বাড়িতে ঝুমুর মুখোপাধ্যায়ের কথার ওপর এখনো অবধি কেউ কথা বলতে পারে না, সে তার স্বামী, এত বড় পোস্টের বি সি এস অফিসারই হোক, কি ছেলে যে কিনা মস্ত বড় ডাক্তার। তাই ঝুমুর দেবী নিজের মত করে আবার বলা শুরু করলেন।
" আজ আমি আর মিন্তি মিলে রান্নাবান্না করব। বাবু তুই কখন আসতে পারবি বল? "
" আমার যদি হঠাৎ করে এমারজেন্সি কোন কেস না আসে, তাহলে দুটোর মধ্যে ম্যানেজ হবে মনে হয়। '
" বেশ, তাই আসবি। আসার পথে কিছু জিনিস বলে দেবো, নিয়ে আসবি।"
"কী?"
" কিছু পছন্দের খাবার আমাদের বিদিশা রাণীর জন্য। "
" আচ্ছা। তা আজ কি বৌমা ষষ্ঠী না কি?"
" একটা মার খাবি। ৩৬৫ দিন যখন ও সবার জন্য এত করে, তখন কেউ জিজ্ঞেস করিস যে আজ কী উপলক্ষ্য? "
 ডঃ অর্ঘ্য মুখোপাধ্যায়ের মাথা হেঁট হয়ে যায় মুহূর্তের মধ্যে। বিদিশা বেশ অপ্রস্তুত হয়ে বলে ওঠে, " আহা মা, ও তো আমি করি সংসারকে ভালোবেসে। এসব কথা উঠছে কেন। থাক না। "
" না থাকবে না বিদিশা। সবার চেতনা হওয়াটা দরকার। তুমি না থাকলে দেখতাম সবাই কে কী করে নিজেদের বাইরের জগতটা সামাল দিত। "
" ঠিকই বলেছ গিন্নি। চলো আজ আমরা মেয়েটাকে সেলিব্রেট করি। "

খেলতে খেলতে কানে হঠাৎ টুকাইয়ের কানে ঢুকল " সেলিব্রেট" শব্দটি, সঙ্গে সঙ্গে ও জিজ্ঞেস করে উঠল, " আজ কি মাম্মামের জন্মদিন ঠামি? আজ কিসের সেলিব্রেশন? "
" আজ আমরা তোমার মাম্মাম কে ভালোবাসি বলে সারাদিন মাম্মামকে সেলিব্রেট করব। ওকে? "
" ওকে!"
" শোন, তুমি বসে থেকো না তো ঠায়। যাও ছাতা মাথায় দিয়ে বাজারে যাও। আমি কিছু ফর্দ করে দিচ্ছি। নিয়ে এসো। "
" এই বৃষ্টিতে দোকান বাজার বসবে না মা। আজকের দিনটা থাক না। যা যেমন আছে, সেই দিয়ে করে ম্যানেজ করে নিই। এসব সেলিব্রেশনের দরকার নেই কিন্তু কোন।"
" খুব আছে। তুমি চুপ করে বসো তো। তোমায় যদি আজ কাজ করতে দেখি একটুও তো দেখো কী করি আমি। "

" হ্যাঁ বাবা, মা কে রাগিয়ো না। " ফুট কাটল মিন্তি।
" স্পেন্সারস, মোর সব খোলা। আমি যেমন লিস্ট করে দিচ্ছি, তেমন আনো জিনিসপত্র। আমি আজ রান্না করব। আর হ্যাঁ, বিশুর দোকান থেকে জিলিপি আর কচুরি এনো, ওটাই ব্রেকফাস্ট। তাড়াতাড়ি এস, বাবুকে বেরোতে হবে খেয়ে।"

" এই দাদা, জলদি আসবি। একসাথে খাবো। তারপরে সিনেমা দেখবো। নেটফ্লিক্সে ভালো কিছু সিনেমা এসছে রে। "
" ঠিক আছে রে, চেষ্টা  করছি যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আসার। "


সেদিন সকালের ওই হেভি ব্রেকফাস্টের পর অর্ঘ্য হাসপাতালে চলে যাওয়ার পর বাকি সবাই মিলে শুরু করল কত গল্প আর গান। অনেক দিন বাদে গলা ছেড়ে গান গাইলও বিদিশা, সংসারের ঠেলায় তো গানের পাট এতদিন উঠেই গিয়েছিল। মিন্তি আবার ফেসবুক লাইভও করল ওদের গানের আসর। সেখানে কত লাইক আর কমেন্ট। বিদিশার বোন অস্ট্রেলিয়া থেকে দেখে সঙ্গে সঙ্গে ফোন করেও ফেলল, " দিদি তোকে আজ কী খুশী দেখাচ্ছে রে। দারুণ। চালিয়ে যা। আমি মা বাবা কে রাত্রে বাড়ি ফিরে দেখাবও ভিডিয়ো।"
" রাত্রে কেন রে মলি? আমি এক্ষুনি বেয়াই কে স্কাইপে ডাকছি। ওনারাও শুনুন নিজেদের মেয়েকে। "
দুপুরবেলা অর্ঘ্য এলো আরসালান থেকে বিরিয়ানি আর মঞ্জিনিস থেকে বিদিশার পছন্দের ব্ল্যাক ফরেস্ট কেক নিয়ে। ইতিমধ্যে শাশুড়ি মা বানিয়ে ফেলেছিলেন মটন চাপ ফিস ফ্রাই আর পেঁপের চাটনি। আহা, কতদিন পরে এমন সুন্দর খাওয়াদাওয়া করল বিদিশা, এমন আরামে। রেঁধে বেড়ে তো ওই খাওয়ায় সকলকে, আজ এতদিন পর কেউ ওকেও এত যত্ন করে খাওয়াল। তারপরে সবাই মিলে একসাথে ওদের প্রিয় সিনেমা দেখল। বিকেলের দিকে বৃষ্টিটা একটু ধরতে হই হই করে ওরা বেরোল কাছের শপিং মলে। চলল জমিয়ে কেনাকাটা, প্রত্যেকের জন্য। তারপরে রেস্টুরেন্টে খেয়ে রাত্রে যখন ওরা ছয়জন ফিরল, প্রত্যেকেই ক্লান্ত। তবে এ ক্লান্তি মধুর, এ আনন্দের, সারাদিন একে ওপরের সাথে কাটানোর মজাই আলাদা। কাজের ফাঁকে কেউই তো আজকাল একে অপরকে তেমন সময়ে দিয়ে উঠতে পারে না। নিয়মের মধ্যে চলতে চলতে সবাই হাঁপিয়ে ওঠে।  আজ হঠাৎ সেই বাঁধাধরা নিয়ম ভেঙ্গে কেমন আনন্দে দিন কাটল ওদের। এর জন্য ঝুমুর মুখোপাধ্যায় আর বরুণদেবের সব কৃতজ্ঞতা প্রাপ্য। রেইনি ডের মজা যে এখনো নেওয়া যায়, তারই জ্বলজ্যান্ত প্রমাণ পেল আজ মুখোপাধ্যায় বাড়ির সদস্যরা। আজ বিদিশার মুখের থেকে হাসির রেশ যেন যেতেই চাইছেনা। লেগে থাকুক এই অমলিন হাসি, চিরকাল। মাঝে মাঝেই এমন ছকে বাঁধা জীবন থেকে বেরিয়ে আনন্দের স্বাদ পাক ওরা সবাই। 

Saturday, October 14, 2017

আয় তবে সহচরী

"ধুর, জীবনটা বড্ড একঘেয়ে হয়ে গেল রে শৌভিক। কিছু একটা করতে হবে, সামথিং ইন্টারেস্টিং!" প্রতি রবিবারের মতই গত রবিবারের সকালটাও আমার শুরু হয়েছিল ঠিক একই ভাবে। আমি শৌভিক চট্টোপাধ্যায়, বয়স ৩০, চাকরি করি একটি মাল্টিনেশন্যাল কোম্পানিতে, বিজনেস এনালিস্ট পদে। থাকি চেন্নাইতে। সোম থেকে শুক্র নয় ঘন্টা অফিস করে কোনোমতে দিন কাটাই, তাই শনিবারটা শুধুই ঘুমিয়ে শুয়ে টিভি দেখে বই পড়ে শেষ হয়ে যায়। এই একই অবস্থা মুকুলেরও। মুকুল বসু, আমার ফ্ল্যাটমেট, আমারই বয়সী। চাকরি করে একটি মোটর কোম্পানিতে, আমারই মত দশটা সাতটা রুটিনে বিপর্যস্ত। শনিবারের দিনটা ওরও এমনভাবেই কাটে। আর তারপর রবিবার ভোর (হ্যাঁ মানে ওই ধরুন সাতটা নাগাদ সকালে) হতে ঘুম ভেঙ্গে আমার জন্য কফি আর নিজের জন্য গ্রিন টি বানিয়ে আসে আমার ঘরে। কাপটা দিতে দিতেই ঠিক এই একই হতাশাময় বাক্য বলে। সত্যি বলছি, আইডেন্টিকাল, word to word same, বিশ্বাস না হয়, আমি পরপর কিছু সপ্তাহ না হয় রেকর্ড করে শোনাবো আপনাকে। তখন বুঝবেন। একটা মানুষের যে কী করে এত কন্সিসটেন্সি থাকে জীবনে, ভাবতেই অবাক লাগে।
তা প্রতি সপ্তাহে শুনি আর ভাবি, যে হ্যাঁ, সত্যিই তো। আমার বয়সীরা এখন কেউ অনসাইটে কাজের দৌলতে কোম্পানির টাকায় ইউ এস ইউ কে ভ্রমণ করছে, কেউ বা রাজারহাটে ফ্ল্যাট কিনে এখন হয় বৌয়ের সাথে যৌথ ডিনার পার্টি হোস্ট করছে প্রতি উইকেন্ডে। সেখানে আমি রবিবার হলে কাজের কাজ বলতে আডিয়ারে গিয়ে একটু মাছের বাজার করছি আর কে সি দাসে কচুরি জিলিপি খেয়ে ব্রেকফাস্ট সারছি। সারাদিনে তারপর দুটো সিনেমা ইউটিউবে আর দু চার লাইন কাব্য লিখছি। মাঝে রান্নার মাসীর রেঁধে যাওয়া অখাদ্য কুখাদ্য ভাত ডাল সব্জি খাচ্ছি। রাত্তির হলেই সুইগি দিয়ে কিছু ভালো মন্দ হয় অর্ডার করছি, নয়তো দুজনে বাইক হাঁকিয়ে ফিনিক্স মলে গিয়ে খেয়ে আসছি। এই কী কোন জীবন হল? না, এবারে কিছু তো করতেই হবে। কতটা এক্সাইটিং হবে, জানি না। কিন্তু অন্তত স্বাদবদল তো হবেই।
" চল মুকুল, আজ কিছু অন্যরকম করব।"
" কী করবি?"
" করবি না, বল করব।"
" ফালতু হ্যাজাস না তো। ওই একই হল। তা কী করব সেটা বল।"
" বাইক বের কর। একটা জায়গায় যাব। "
" কোথায়?"
" আগে বের কর, রাস্তায় বেরিয়ে বলছি।"

কিছুদিন আগে ফেসবুকের একটি গ্রুপে একটা প্রতিষ্ঠানের খবর পেয়েছিলাম, তারা কাজ করে এইডস আক্রান্ত শিশুদের নিয়ে। মহাবালিপুরম যাওয়ার পথে মাঝে একটু বাঁক নিলে রয়েছে স্নেহাম নামের একটি আশ্রম। গুগুল ম্যাপ্সে সেই লোকেশন সেট করে আমরা দুই বন্ধু সেই রবিবার চললাম স্নেহামে। পথে একটা ডিপারট্মেন্টাল স্টোর থেকে বাচ্চাদের জন্য নিলাম অনেক চকোলেট, রঙ পেন্সিল, খাতা, পেন্সিল আর কিছু টুকটাক ছোটখাটো মুখরোচক খাবারদাবার। স্নেহামে পৌঁছলাম যখন, ঘড়ির কাঁটা তখন দশটা ছুঁই ছুঁই। বাইক পার্ক করে আমরা অফিসের ইন চার্জ, শ্রী ভেঙ্কটেসানের সাথে কথা বললাম। জানালাম যে বাচ্চাগুলোর সাথে আজকের সারাদিন কাটাতে চাই। ওদের জন্য কিছু জিনিস এনেছি, সেইগুলি দিয়ে দিলাম। ভেঙ্কটেসানের মুখের হাসি দেখে কে বলবে যে একটু আগেই তার চকচকে কৃষ্ণবর্ণ চেহারায় বিশাল মোটা একখানা গোঁফ দেখে আমরা তামিল সিনেমার ভিলেন ভেবে ভয় পাচ্ছিলাম! ভানাক্কাম ভানাক্কাম (নমস্কার) , নান্দ্রী (ধন্যবাদ) , রোম্বা নাল্লা (খুব ভালো)  ইত্যাদি ইত্যাদি শুনেটুনে আমরা যখন একেবারে গদগদ, ছাতি প্রায় দশ ইঞ্চি বেড়েছে, বাচ্চাদের প্লেরুমে ঢুকতে যাবো, এমন সময় কানে ভেসে এলো, " উফ, কী প্যাথেটিক, বাইকটাকে পার্ক করেছে দেখ, যেন পার্সোনাল গ্যারেজ। এক্সকিউজ মি, ইস  দা বাইক ইয়োরস? কুড ইউ প্লিজ মুভ ইট এ লিটল, আই এম আনেবল টু পার্ক মাই স্কুটি।" দক্ষিণদেশে বঙ্গতনয়ার সুমিষ্ট কন্ঠস্বর শুনে তো ততক্ষণে আমি আর মুকুল থ। তাকিয়ে দেখি হাল্কা বাদামী রঙের কুর্তি আর নীল জিন্স পরিহিতা এক অপূর্ব সুন্দরীর কন্ঠ, পাশে রয়েছে একইরকম সুন্দরী, বুদ্ধিদীপ্ত চেহারার আরেক তনয়া, পরনে লাল টপ আর হলুদ সালোয়ার। দুজনেরি হাতে হেলমেট।  ঘোর ভাঙল, বলা চলে ওদের দিকে হাঁ করে তাকিয়ে থাকা থেকে বিঘ্ন ঘটাল ভেঙ্কটেসানের কথা, " সার, প্লীজ পার্ক ইয়োর বাইক কেয়ারফুলি, দিস ম্যাডাম ক্যানট পার্ক হার স্কুটি।"
" ও হ্যাঁ, করছি, আই মিন, ইয়েস, ডুইং ডুইং।" বলতে বলতে মুকুল এগিয়ে গেল।
" আপনারা বাঙ্গালী দেখছি! (কোনো বোনাস পয়েন্ট দেব না, মুকুলের উচ্চারণে পরিষ্কার বাংলা টান আছে, যে কোন বাঙালি ওই ইংরেজি শুনে বুঝে যাবে যে বক্তা বঙ্গতনয়।)
" হ্যাঁ, নমস্কার। আমি শৌভিক চট্টোপাধ্যায়, আর ও আমার বন্ধু মুকুল বসু। আমরা চেন্নাইতে চাকরি করি, থাকি।"
" তুলিকা মুখোপাধ্যায়। আন্না ইউনিভার্সিটিতে ইলেকট্রিকাল ডিপারট্মেন্টে লেকচারার। আমার বান্ধবী, সহচরী সান্যাল, ও সি এম আই  তে রিসার্চ করে, ফিসিক্স ডিপার্টমেন্টে।" গড়্গড় করে বলে চলল লাল হলুদ, প্রিয় দল ইস্টবেঙ্গলের রঙ্গে রঙ্গীন মেয়েটি।
" আলাপ করে ভালো লাগল।"
" দাঁড়ান, আপনার বন্ধু দেখছি বাইকটা সরিয়েছে, আমি স্কুটিটা পার্ক করে আসছি। তুলি তুই ভেঙ্কটেসানকে জিনিসগুলো দে, আমি আসছি।" এই বলে বাদামী জামা পরিহিতা শ্রীমতী সহচরী বেরিয়ে গেলেন। শ্রীমতি বললাম কারণ হঠাৎ করেই ওকে দেখে আর ওর রাগ রাগ কথা প্রথমে শোনা ইস্তক আমার শতাব্দী রায়ের শ্রীমতি ভয়ঙ্করী সিনেমার কথা মনে পড়ে গেল! তা বলে নিজেকে চিরঞ্জিতের প্রলয়শঙ্কর মনে হয়নি অবশ্যই! সে যাই হোক। ইতিমধ্যে ভেঙ্কটেসানের পিছু পিছু আমি আর তুলিকা প্লে রুমে গেলাম। জানতে পারলাম যে এই দুই বন্ধু মাঝে মাঝেই এখানে আসে, বাচ্চাগুলো তাই ওদের খুব ভালো করে চেনে, ওদের দেখলেই খুশি হয়ে যায়। খানিকবাদে সহচরী আর মুকুল ঢুকল বেশ হাসি গল্প করতে করতে।
স্নেহামে মোট ২৯টি বাচ্চা থাকে, বয়স পাঁচ থেকে পনেরো। প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে ওদের স্কুলে পাঠানো হয়, নিয়মিত ডাক্তার এসে চেক-আপ করে যান। মাঝে মাঝে এরকম আমাদের মত কেউ কেউ আসে, সারা দিন ওদের সাথে কাটায়। ওদেরও ভালো লাগে।
সেইদিনটা আমরা ভীষণ ভালো কাটালাম, উপভোগ করলাম এই বাচ্চাগুলোর সাহচর্য। ভেঙ্কটেসান সহ আরো যারা এই মহৎ কাজে লিপ্ত, তাদের সকলের সাথে পরিচয় হল। বাচ্চাগুলোর নির্মল হাসি, সহস্র দুঃখ কষ্টের মধ্যেও হার না মানার অদম্য প্রচেষ্টা, মন জয় করা ব্যবহার, সব আমাদের মুগ্ধ করল। প্রতিজ্ঞা করলাম যে এইখানে আবারও ফিরে আসব। সেইদিন অবশ্য এদের সাথে সাথে মদ্রদেশে দুই বঙ্গতনয়ার সাথে আলাপ হয়েও আমাদের দুই বন্ধুর নিস্তরঙ্গ জীবনে কিছুটা হলেও হিল্লোল উঠেছিল। গত ছয়দিন আমরা দুই বন্ধুই রাত জেগে শ্রীমতী ভয়ঙ্করী ও তুলির সাথে দেদার আড্ডা দিয়েছি। এখনো অবধি আড্ডাতে চারজনেরই অবাধ প্রবেশাধিকার ছিল। তবে মনে হচ্ছে খুব শিগগিরই সহচরী আর মুকুল বোধহয় একটু রাইট টু প্রাইভেসি আওড়াবে, সেদিন মুকুলকে দেখছিলাম কি না ইন্টারনেটে এসব সার্চ করছিল।  আর আমি? দেখা যাক, কপালে কী আছে! আর কিছু হোক না হোক, মুকুলের সাথে সাথে সবাই যে সহচর সহচরী পেলাম অনেকগুলো, এতেই আপাতত খুশি।

ধন্তেরস

" বাপ রে, আজকের কাগজটা দেখেছিস তুয়া? পুরো আশি পাতা!"
" হ্যাঁ, দেখেছি। শুধুই বিজ্ঞাপন আর বিজ্ঞাপন। প্রত্যেকটা ফেস্টিভালকে এরা এত কমারশিয়ালাইজ করে, ভাবা যায় না।"
" বাট দ্যাট ইস বিজনেস, তাই না? লোকের এখন হাতে বোনাস, মনে ফুর্তি। এটাকে এনক্যাশ করতেই হবে!"
" হুম, ঠিকই। এনিওয়ে, আমি বেরোচ্ছি দীপ, তোর খাবার টেবিলে গুছিয়ে রেখে গেলাম। খেয়ে নিস। আর আজ কখন বেরোবি?"
" থ্যাংকস! লাঞ্চের পর একটা মিটিং আছে। কাজারিয়ার সাথে। দেখি যদি ডিলটা ক্র্যাক করতে পারি।"
" অল দা বেস্ট। দেখ কাজারিয়ার মুড নিশ্চয়ই এই ফেস্টিভ সিজনে ভালো, যদি তুইও সেটা এনক্যাশ করতে পারিস দীপ।"
" হ্যাঁ। ক্র্যাক করতে পারলে একটা প্লে স্টেশন কিনব। প্রচুর অফার দিচ্ছে।"
" তুই ওই কর দীপ। তিরিশ বছর বয়স হয়েছে, কোন ম্যাচিউরিটি নেই। এখন না কি প্লে স্টেশন কিনবি। সিরিয়াসলি!!!"
" বাট ওয়াই নট? রোজগার করছি, ভোগ করব না কেন?"
" হ্যাঁ সেই তো। দিনের পর দিন আমি খেটে মরছি, আমাদের সব বিলস পে করছি, তোর খামখেয়ালিপনা সাপোর্ট করছি, আর উনি নাকি দু পয়সা এলে সঙ্গে সঙ্গে প্লে স্টেশন কিনবেন। সত্যি!"
" তুই এমন করছিস তুয়া যেন সবটা তোর কাছে সারপ্রাইজ? আমি যখন স্টার্ট আপটা শুরু করব বললাম, তুইই তো তখন বলেছিলি যে আমায় সাপোর্ট করবি। আর এখন এক বছর হতে না হতেই এই?"'
" দীপ, আমি কি একবারও বলেছি যে তোকে সাপোর্ট করব না? কিন্তু তুই বল, এক বছরে একটুও কি কিছু উন্নতি হয়েছে? আই এম টায়ার্ড দীপ, তুই প্লীজ রেগ্যুলার চাকরি খোঁজ। এনিওয়ে, আই এম গেটিং রিয়েলি ভেরি লেট। রাত্রে কথা বলব।"

মন মেজাজ তিক্ত করে তুয়া বেরোল অফিসের জন্য। একটা সরকারি ব্যাঙ্কে ক্লারিক্যাল পদে চাকরি করে। বাড়ি থেকে অফিস প্রায় ঘন্টাখানেকের রাস্তা। মিনিবাসে অফিসটাইমে ভিড়ে গাদাগাদি করতে করতে রোজ অফিস যাওয়া, একটা বিভীষিকাই বটে। একটা সময় ছিল যখন ও ভাবত চাকরিটা ছেড়ে দিয়ে নিজের মত করে পছন্দসই কিছু করবে, ক্রিয়েটিভ কিছু। ছোটবেলা থেকে শেখা নাচ বা গানকে পেশা করবে। কিন্তু দীপের আই টি ফার্মের চাকরিটা দু বছর আগে চলে যাওয়ার পর থেকে আর হাজার ইচ্ছে থাকলেও পারেনি ব্যাঙ্কের চাকরি ছাড়তে। দিনের পর দিন, শত বিরক্তি, ক্লান্তি নিয়েও করে গিয়েছে একই একঘেয়ে টাকাপত্তরের হিসেব। 

ক'দিন ধরেই অফিস কলিগ শিপ্রাদি, মাধুদি আর পুণ্যিরা লাঞ্চ টাইমে শুধুই ধন্তেরসে কে কী কিনবে, কোন গয়নার দোকানে কী অফার চলছে, সেই নিয়েই আলোচনা করে চলেছে। এইসব ডিস্কাশানের সময়ে এত মন খারাপ হয়ে যায় তুয়ার। উঠে যে চলে যাবে, সে উপায়ও নেই। কেন যে ওরা একটু সেনসিটিভ হয় না, ওরাও তো জানে তুয়ার বর্তমান পরিস্থিতি। তুয়া আর দীপ দুজনেই ঠিক করেছিল, দুই পক্ষের বাবা মা কে কোনভাবেই বিরক্ত করবে না অর্থনৈতিক সাহায্য চেয়ে, যা করার, নিজেরাই করবে। এই কদিন দিব্যি মানিয়েও নিয়েছে, চলেও যাচ্ছে। আসলে মানিয়ে নেওয়াই হচ্ছে, সাধ আহ্লাদ দুজনেই তো বিসর্জন দিয়েছে কতদিন হল। উঠতে বসতে ট্যাক্সি ছাড়া চলত না যার, সেই দীপ এখন মেট্রো, বাসে করে ক্লায়েন্ট ইনভেস্টর মিটিং করছে, বাজার করে সন্ধ্যেবেলা কুড়িটা টাকা বাঁচানোর জন্য রিক্সা না নিয়ে তুয়া হেঁটে বাড়ি ফিরছে। এডজাস্ট করেও তো চলছে, ধৈর্য ধরে চলছে বটে, কিন্তু আজকাল মাঝে মাঝেই বাঁধ ভাঙ্গছে।  এই যেমন, একটা প্লে স্টেশন কেনা নিয়ে দীপকে সকাল সকাল কথা শুনিয়ে দিল ও, সত্যি তো, মানুষটা কতদিন তো নিজের জন্য কিচ্ছু কেনেনি।

আজ সকালে গয়নার দোকানের এড দেখে একটা নেকলেস ভীষণ পছন্দ হয়েছিল তুয়ার, ভেবেছিল ওই ডিজাইন দেখিয়ে পাড়ার দোকান থেকে মাসিক কিস্তিতে টাকা দিয়ে বানাবে, বড় বড় দোকানের মজুরি, ট্যাক্সের চক্করে যা আকাশছোঁয়া দাম হবে, ওর পক্ষে এফরড করা সম্ভব না এখন।  আর ঠিক তখনই দীপ বলল প্লে স্টেশন কেনার কথা, হঠাৎ করেই তাই মাথাটা গরম হয়ে গিয়েছিল। এখন ভীষণ খারাপ লাগছে। না, এর একটা বিহিত করতেই হবে। যেমন ভাবা, তেমনি কাজ। সঙ্গে সঙ্গে অফিস কলিগ শুভ্রকে একটা মেসেজ পাঠালো, " এই শুভ্র, প্লে ষ্টেশনের মোটামুটি ভালোর মধ্যে কোন মডেলটা কেনা যায় বলবি? তোর জামাইবাবুর জন্য সারপ্রাইজ গিফট হিসেবে কিনব। এমাজনের লিঙ্ক সমেত বল।" শুভ্র ওর খুব ন্যাওটা, বছর পাঁচেকের ছোট ওর থেকে, সবে কিছু মাস হয়েছে ওদের ব্রাঞ্চে যোগ দিয়েছে। সারাক্ষণ দিদি দিদি করে যায়। খুব টেক স্যাভি, তাই ওর থেকেই যথাযথ ইনফরমেশন পাবে জেনেই ওকে মেসেজটি করেছিল তুয়া। এবং যথারীতি দশ মিনিটের মধ্যেই বাস গড়িয়াহাটের মোড়ে জ্যামে যখন দাঁড়িয়ে আছে, তখনই ওর ফোনে ঢুকল শুভ্রর মেসেজ।

অফিসে পৌঁছে সঙ্গে সঙ্গে ডেস্কটপ খুলে অর্ডার করে দিল। ভাগ্য ভালো ছিল, ই এম আই তে টাকা দেওয়া সত্ত্বেও ফেস্টিভ অফারে সেম ডে ডেলিভারি হবে। দীপের নম্বরটা আর বাড়ির ঠিকানাটা দিয়ে অর্ডার প্লেস করে তবে শান্তি পেল তুয়া। এইবারেও তাহলে নেকলেসটা হল না, যাক গে, বিয়েতে কিছু গয়না পেয়েছিল, সেইগুলোও তো ভল্টে রয়েছে, নতুন কিনেই বা কী করত, না হয় পরে কোন একটা গয়না এক্সচেঞ্জ করে এই নতুন বানিয়ে নেবে। এইসব ভাবতে ভাবতে দিনের কাজ শেষ করল। ফেরার পথে রাস্তায় খুব জ্যাম পেল। আজ ধন্তেরস, পথেঘাটে খুব ভিড়, স্পেশালি গয়নার দোকানগুলির কাছে। বৌবাজার পেরোতেই বাসটার আধ ঘণ্টা লেগে গেল। ছোট বড় দোকানগুলিতে ভর সন্ধ্যেয় ক্রেতা ভর্তি, পা ফেলার জায়গা নেই। আরো একবার হতাশার নিশ্বাসটা পড়ল তুয়ার। তখনই মোবাইলে ঢুকল এমাজনের মেসেজ, পার্সেল ডেলিভারির। বাড়ি পৌঁছোতে পৌঁছোতে আটটা বেজে গেল ওর। বেল বাজানোর পর মিনিট দুই কেটে যাওয়ার পর এক মুখ চওড়া হাসি সহ দরজা খুলল দীপ। যাক, প্লে স্টেশনটা পেয়ে তাহলে সত্যিই খুব আনন্দ পেয়েছে ও।
কিন্তু এ কী, প্যাকেজটা তো টেবিলের ওপর পড়ে আছে, খোলাও হয়নি। তাহলে?
" তুয়া, আমি ডিলটা ক্র্যাক করেছি।"
" অসাম!!! Congrats  দীপ। আই এম সো হ্যাপি ফর ইউ। "
" আই নো! আমার এতদিনের উদ্যম, চেষ্টা আজ স্বীকৃতি পেল। ভীষণ ভালো লাগছে।"
" কিন্তু তুই আমায় ফোন করে জানালি না কেন?"
" বিকজ আই ওয়ান্টেড ট সি দিস প্রেশাস স্মাইল অন ইয়োর ফেস ওয়েন আই break দিস নিউজ টু ইউ!"
" সত্যি রে দীপ। আমি খুব খুশী। আচ্ছা শোন, তাহলে তো ওই এমাজনের প্যাকেজটা একদম ডবল আনন্দ দেবে তোকে। জাস্ট খুলে দেখ! "
" দেখছি। কী আছে এতে? তুই এলে খুলব বলে আর এতক্ষণ অপেক্ষা করে আছি।"
" এবার দেখ। মনে হয় পছন্দ হবে।"
" দাঁড়া এক মিনিট। আমিও তোর জন্য একটা গিফট এনেছি। চল একসাথেই দুজনে খুলব নিজেদের গিফটস।"
" বেশ তো।"
দীপ বেডরুম থেকে ফিরল হাতে একটা গয়নার দোকানের প্যাকেট নিয়ে।
" এই নে, তোর জন্য।"
তুয়া খুলে দেখে ভিতরে ওর কদিন ধরে পছন্দ করা নেকলেসটি। আনন্দে দুই চোখের কোণ চিকচিক করে ওঠে জলে।
" তুই কী করে জানলি...?"
" শোন, ব্যবসা করতে নেমেছি, চারিদিকে চোখ কান খোলা রাখাটা প্র্যাকটিস করতে হবে তো, নাকি? তুই মুখ ফুটে কিছু বলিসনা বলে কি আমি কিছুই বুঝিনা? ডিলটা ক্র্যাক করেছি, তাই আডভান্সের টাকাটা দিয়ে এটা তোর জন্য।"
" থ্যাঙ্ক ইউ সো মাচ দীপ। আই লাভ ইউ।"
" আই লাভ ইউ টু! আর হ্যাঁ, প্লে স্টেশনটার জন্যও মেনি থ্যাংকস।"
" কী করে জানলি?"
" হাম সব সমঝতে হ্যায় ম্যাডাম!"
" যতসব।"
" প্যাকেটের ওপর লেখা থাকে রে হাঁদা! ওটাই দেখেছি।"
" হুম। ব্যস, ওমনি দেখলি, আর তাই ছুটলি আমার জন্য রিটার্ন গিফট কিনতে।"
" তুয়া!!!!! তুই আর শুধরোবি না!!!"
দুজনের খুনসুটি ভরা হাসির ফোয়ারায় তখন উৎসবের আলো আরো ঝলমল করে উঠেছে।

Tuesday, September 26, 2017

বোধন

রথযাত্রার দিন থেকেই মজুমদার বাড়িতে একটা খুশীর হাওয়া বইতে থাকে। কাঠামো তৈরি হয় যে ওদিন থেকেই। শতাব্দী প্রাচীন এই মজুমদার বাড়ীর পুজো। এক কালে প্রায় একশো সদস্যর পরিবারের এখন বেশীরভাগই চাকরি, লেখাপড়া সূত্রে দেশে বিদেশে বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে আছে। কিন্তু আশ্বিন মাস পড়লেই সবাই যে যার জায়গা থেকে ফিরে আসে এই বাড়ীতে, একসাথে পুজো করবে বলে। প্রাচীন এই পুজোয় নিয়ম কানুন মেনে চলা হয় প্রায় একদম প্রথম বছরের পুজোর মত করেই। বাড়ির বয়োজ্যেষ্ঠ সদস্য সদস্যারা খেয়াল রাখেন যাতে ঐতিহ্যবাহী পুজোর নিয়মাবলী থেকে এক চুলও এদিক ওদিক না নড়ে। এই বছর এই দায়িত্বে রয়েছেন অশীতিপর সুরমা দেবী। বয়সেও যেমন প্রাচীন, তেমনি চিন্তাধারাতেও।  কাঠামো তৈরির দিন পুজোয় যেমন বাড়ির কাজের মেয়ে মলয়াকে ছুটি দিলেন, প্রথমে শুনে কেউ ভাবতেই পারেন যে হয়তো পূজা পার্বণ বলে ছুটি দিলেন, তা তো খুবই ভালো কথা। আসলে মলয়া সন্তানহীনা, আর তাই সুরমা দেবীর মতে, "অপয়া"। পুজোর কাজে কর্মে তাই তার আসা একদম বারণ। মিঠি, সুরমা দেবীর ছোট নাতনী, একবার বলার চেষ্টা করেছিল ঠাকুমাকে। ও ক্লাস এইটে পড়ে, ছোটবেলা থেকেই ঠাকুমার ন্যাওটা। পুজোর সমস্ত কাজে মা জেঠিমা ঠাকুমা পিসিদের সাথে হাতে হাত মিলিয়ে কাজ করতে ভালোবাসে। তাই রথের দিন স্কুলে যায়নি, পুজোর কাজে সাহায্য করবে ভেবে। মলয়া মাসি ওর খুব প্রিয়, কিন্তু সেইদিন ওকে ছুটি দেওয়ায় ঠাকুমার কাছে কারণ জানতে পেয়ে খুব দুঃখ পেয়েছিল। " আচ্ছা ঠাম্মি, মলয়া মাসীর সন্তান হয়নি, তাহলে তো দেখো ওর কত দুঃখ। তার ওপর তুমি ওকে পুজোয় আসতে দিলে না কেন? আরো কষ্ট পেল তো মাসি।"
" শোন মিঠি, এই বাড়ির কিছু নিয়ম কানুন আছে। যা বুঝিস না, তা নিয়ে মাথা ঘামাস না। আমাকে নিয়ম মানতে দে। "
" কিন্তু ঠাম্মি..."
" যা গিয়ে চন্দন কাঠটা ওপর থেকে নিয়ে আয়। তোর মাকে কখন থেকে বলেছি। স্কুলে গিয়ে যত ছাই পাঁশ শিখে আসে আর তারপর পটর পটর করা। আর হ্যাঁ, হাত পা ধুয়ে আমার পুজোর ঘরে ঢুকবি। যত অনাসৃষ্টি। "
মিঠি একদম একা, ওর দাদা দিদিরা কেউ আসেনি এখনো। সব্বাই বাইরে, হয় কলেজে নয় চাকরি করছে। ওর কথায় সায় দেওয়ার জন্য কেউ নেই। বাবা কে বললে বাবা বলবে, " নিয়ম যা, তা তো মানতেই হবে মা?" আর মা কে বললে সেই একই উত্তর, " মিঠি, গুরুজনদের কথা সব সময় মেনে চলতে হয়।" আচ্ছা, নিয়ম মানা, গুরুজনদের কথা শুনে চলা তো ভালো। কিন্তু নিয়মের তো কোন কারণ থাকা দরকার, তাই না? কে বোঝাবে।

মিঠি স্কুল থেকে ফেরার পথে রোজ ঠাকুর দালান হয়ে আসে। পরাণ দাদু ঠাকুর বানায় আর ও বিভোর হয়ে তাকিয়ে থাকে। ছোটবেলা থেকে পরাণ দাদুকেই দেখে চলেছে, কি নিখুঁত করে প্রতিমা গড়ে। প্রথমে খড়ের ওপর কাদামাটি লেপে, তারপরে আসতে আসতে সেই মাটি শুকিয়ে গেলে রঙ। কাঠামো সঠিক না হলে রঙও ভালো বসবে না। ঠিক যেন মানুষের মন, সঠিক ভাবে তাকে লালন পালন করলে তবেই তো বিকশিত হবে। এখন তো ছোট বলে কেউ ওর কথা শোনেনা, কিন্তু ওকে বোঝাতেই হবে সকলকে।
দিন যায়, এসে পড়ে মহালয়া। পুজোর তোড়জোড় ভালো করেই চলছে মজুমদার বাড়িতে। ফুল কাকারা কাল আসবে দিল্লী থেকে। বনি পিসিরা আসছে পরশু, লন্ডন থেকে। সুমি দিদি এবারে একা আসছে, জামাইবাবু ছুটি পায়নি। লাল্টুদা, ঊর্মিদিরা আজ বিকেলেই। ভাবতেই কী আনন্দ হচ্ছে মিঠির। পঞ্চমী অবধি স্কুল আছে বটে ওর, কিন্তু এই কটাদিন স্কুলে তেমনভাবে কারুরই মন বসে না। কবে কোন জামা পরবে, কোথায় কোথায় ঘুরবে, কী খাবে, এই নিয়ে চলছে প্ল্যানিং। কিন্তু এইসবের মধ্যেই আরেকটা টেনশন এবারে মিঠিকে কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে। গত মাসের মত চললে, এবারে ঠিক ষষ্ঠীর দিনে ওর পিরিয়ডের ডেট। সারাটা বছর এত মুখিয়ে থাকে পুজোর এই পাঁচদিনের জন্য, পুজোর কাজ করতে এত ভালো লাগে। কিন্তু এইবার ডেটে ডেটে ওর পিরিয়ডটা এলে ঠাম্মি কিছুতেই ওকে ঠাকুর দালানেই আসতে দেবেনা। মা কে বলেও লাভ হবে না। মা তো সেই ঠাম্মির ভয়েই কাটিয়ে দিল জীবনটা।

বলে না, যেখানে বাঘের ভয়, সেখানে সন্ধ্যে হয়। হলও ঠিক তাই। পঞ্চমীর দিন বিকেলবেলা স্কুল থেকে ফিরেই টের পেল, শরীর ওকে জানিয়ে দিল আরো একবার, মেয়ে হওয়ার "জ্বালা"। মায়েরা সবাই মিলে বসে আনন্দনাড়ু গড়ছিল, কানে কানে মায়ের কাছে জানালো। আর ঠিক যেমন ভেবেছিল, মাও ওকে তক্ষুনি "কী সর্বনাশ, কেন এই অবস্থায় এই ঘরে ঢুকলি, এক্ষুণি এখান থেকে চলে যা। এই ঘরে আর আসবি না"  বলে ঘর থেকে তাড়িয়ে দিল। মুখ চুন করে মিঠি দোতলায় ওর নিজের ঘরে চলে গেল। জানলার ধারে বসে হাঁ করে নীচে ঠাকুর দালানে চোখ গেল ওর। দেখল, মা এক কড়াই নাড়ুর কাঁথ ফেলতে গেল রান্নাঘরের দিকে। দশমী অবধি ও থাকবে "অশুদ্ধ", আর পুজোর কোন কাজে তো থাকতে পারবেই না, তার ওপর আবার অষ্টমীর অঞ্জলিও দিতে পারবে না। ঠাম্মির এই বিধান। পুজোটা গেল ভেস্তে এইবারের মত।  মিঠি বুঝতে পারে না, এই যুগে এসেও কী করে পিরিয়ডের মতো অতি সাধারণ শারীরিক অবস্থাকে এমন বিচ্ছিরি নজরে দেখা হয়।

"কী মিঠি রানী? মুখ চুন করে বসে কেন? চল নীচে যাবি না? নাড়ু বানাচ্ছে তো সবাই।"
" সুমি দিদি? কখন এলে?"
" এই একটু আগে, একবার ভবানীপুরে গিয়েছিলাম। আমার এক বান্ধবীর সাথে দেখা করতে। ও কাল ইউ কে চলে যাবে,আর দেখা হত না পুজোয়, তাই। কিন্তু তুই নাড়ুর ওখানে না গিয়ে এখানে কেন?"
" আমার পুজোটা পুরো গেল সুমি দিদি। পিরিয়ড স্টার্ট হয়েছে আজকেই। "
" উফ, নিশ্চয়ই দিদান তার প্রাগৈতিহাসিক বিধান দিয়েছে?"
" হুম। কি করব বল।"
" আমি বুঝিনা, বাড়ির বাকি সকলে কেন এখনো এগুলো এলাউ করে। প্রত্যেকে শিক্ষিত, ঘরে বাইরে সমানভাবে পারদর্শী। তা সত্ত্বেও এই বস্তাপচা মনোভাব, শতাব্দী প্রাচীন নিয়ম মানে কেন?"
" গুরুজনদের অসম্মান হবে না মানলে দিদি। মা সারাক্ষণ এই বলে আমায়।"
" মামা মামীদের দিয়ে কিচ্ছু হবে না। আমার মাও কিছুই বলবে না। সব ওই সুরমা মজুমদারের চোখ রাঙানিতে কাত।"
" হ্যাঁ। নইলে ঠাম্মি এমন শুরু করবে। কে জানে হয়তো নির্জলা উপোস শুরু করে দিতে পারে। কিছুই বলা যায় না তাকে।"
"  তুই চিন্তা করিস না বাবু। আমি দেখছি কী করা যায়।"

খানিক বাদে ওদের সিংহবাহিনী দলের গভীর আলোচনা বসল মিঠির ঘরে। সিংহবাহিনী মানে ওরা সব খুড়তুতো পিসতুতো ভাই বোনেরা। মিঠির প্রতি এই অন্যায়ের কিছু একটা বিহিত করতেই হবে। এবং ঠিক হল, ঠাম্মির পন্থাই অবলম্বন করা হবে। দল বেঁধে ওরা গেল ঠাকুরদালানে। সেখানে তখন সুরমা দেবীর নির্দেশে পুজোর ফাইনাল জোগাড়যন্ত্র করতে ব্যস্ত বাড়ির ছেলে বৌরা।

" কী হয়েছে দিদিভাই? সবাই হঠাৎ দল বেঁধে এখানে? আর এই মিঠি, তোকে বললাম না এইদিকে আসবি না। যা যা সরে দাঁড়া। সিঁড়িতে উঠিসনা। এক্ষুণি মোছা হয়েছে। চোদ্দবার মুছবার সময় নেই কারুর। "
" দিদান, আমরা একটা কথা জানাতে এসেছি তোমাদের। তোমার কথা অনুযায়ী, মিঠি যখন এইবারে পুজোর কোন কাজে থাকতে পারবেনা, পুজোয় কোনভাবেই অংশ নিতে পারবেনা, ওর বড় বড় দাদা দিদিরা হয়ে, আমরাও ওর সাথে থাকব। আমরাও কেউ কোনভাবেই পুজোয় থাকব না এইবারে। আমাদের ক্ষমা করে দিয়ো।"
" এই এসব কী বলছিস সুমি?"
" মা, তুমি থামো। আমি দিদানের সাথে কথা বলছি। তুমি মাঝখান থেকে এসো না প্লীজ।"
" দেখলি বিনু? তোর মেয়ের কথার ছিরি? হ্যাঁ রে সুমি, তুই কি জানিস না কেন মিঠিকে আমি বারণ করেছি?"
" জানি, কিন্তু তোমার কারণ কোন কারণই না। তাই জন্যই ও যদি বিনা কারণে বাদ পড়ে পুজো থেকে, তাহলে আমরাও বাদ।"
" বিনা কারণে মানে? ও তো এখন অশুচি।"
" অশুচি আবার কি দিদান? পিরিয়ড হওয়া অশুচি?"
" অবশ্যই।"
" মোটেই না। পিরিয়ড একটি অতি সাধারণ শারীরিক অবস্থা। যেমন হাঁচি কাশি হয়, তেমনি। না, ভুল বললাম। হাঁচি কাশি তো অসুখ। যেমন হার্ট বিট করে প্রতি মুহূর্তে, যেমন শ্বাস প্রশ্বাস নিই মারা, ঠিক তেমনি মাসে একবার করে আমাদের মেয়েদের পিরিয়ড হয়। এতে অশুচির কি দেখলে?"
" না। শাস্ত্রে লেখা আছে। "
" কোথায় দেখাও? আর থাকলেও, সেই শাস্ত্রও গুলি মারো। আর হ্যাঁ শোন, অম্বুবাচীর সময়ে যে তোমার ঠাকুরেরও পিরিয়ড হয়? সেই বেলা? ঠাকুর তখন অশুচি? বলো?"

সুরমা দেবী কিচ্ছু বলেন না। চুপচাপ তাকিয়ে থাকেন নিজের নাটি নাতনিগুলোর দিকে। সেদিন রাত্রে কোনোমতে সবাই খেয়ে ঘুমোল। পরের দিন সকাল সকাল সবাই উঠে স্নান সেরে ফেলল। বাড়ির বড়রা পুজোর দালানে বসে। কিন্তু সুরমা দেবীর তখনো দেখা নেই। ঠাকুরমশাই চণ্ডীপাঠ শুরুর জন্য তৈরি, সুরমা দেবী আসলেই হয়।

" কী রে দাদা? মা তো এখনো এলো না? কোথায় গেল?"
" হ্যাঁ রে বনি। আমিও তো তাই ভাবছি। মা তো লেট করেনা কখনো। হল কি?"
" বৌদি মা কে দেখেছো সকাল থেকে? "
" হ্যাঁ বনি। মা কে তো সকাল সকাল দেখলাম বাগানের দিকে যাচ্ছিল, ফুলের সাজি হাতে নিয়ে। হয়তো ঠাকুর ঘরে দেরী হয়ে গিয়েছে। দাঁড়াও, আমি দেখে আসছি। "
" হ্যাঁ। বাচ্চাগুলোও কিরকম মিছিমিছি গোঁয়ারপনা করছে দেখো তো। আদ্যিকালের নিয়ম, যেমন চলে আছে, মেনে নে না বাবা। কি ফালতু ফালতু পুজো আচ্চার মধ্যে ব্যতিক্রমী হওয়ার চেষ্টা।"

" কিচ্ছু গোঁয়ারপনা না। আমার নাটি নাতনিরা যা করেছে, একদম ঠিক।"
ঠাকুর দালানে উপস্থিত সক্কলে তাকিয়ে দেখল, সুরমা দেবী, সাথে তার সিংহবাহিনী। সুরমা দেবী ডান হাত দিয়ে মিঠির হাত ধরে উঠলেন ঠাকুর দালানে।
" শোন, যে নিয়ম, আচার চলে আসছে যুগ যুগ ধরে, তা যে এখনো মানতে হবে, তা মোটেই না। এইসব নিয়মের না কোন মানেই নেই। কাল আমার নাতি নাতনিগুলোর কথা অনেকক্ষণ ধরে শুয়ে শুয়ে ভাবলাম। আর তখনই বুঝলাম, যে যা করছি, একদম ভুল। সব্বাই মিলে সব রকম ভেদাভেদ ভুলে আমরা এই কতাদিন আনন্দ করব, মায়ের পুজো করব। দুর্গা তো আমাদের মেয়ে, এক মেয়ের আদরে আরেক মেয়ে সুযোগ পাবে না কেন? আমাদের কি বুকে এতটুকু ভালোবাসা নেই? আর হ্যাঁ, মলয়ার প্রতিও আমি অন্যায় করেছি। আমি নিজে ওর কাছে ক্ষমা চাইব। ওকে ডেকে পাঠিয়েছি। ও আসুক। তারপর সবাই মিলে একসাথে পুজো শুরু করা হবে। "

ঠাকুর দালানে তখন দেবী দুর্গার সাথে সাথে মর্ত্যবাসীদেরও শুভ বুদ্ধির বোধন হল।







Saturday, September 23, 2017

গন্ধ


" হ্যাঁ দিদি, আমি এই মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই বেরিয়ে পড়ছি। চিন্তা করো না। সব রেডি। আজকের ইন্টার্ভিউটা দারুণ হবে। " ফোন নামিয়ে রেখে একবার আয়নায় নিজেকে জরিপ করল কস্তুরী, কস্তুরী সেন , ট্রেনী জার্নালিস্ট, তিতলি পত্রিকার। তিতলি একটি মহিলা কেন্দ্রিক পাক্ষিক পত্রিকা, মোটামুটি এই সেগমেন্টের প্রথম পাঁচের মধ্যে পড়ে। স্বাস্থ্য, সৌন্দর্য, ভ্রমণ, রন্ধনশিল্প, সাহিত্যকলা ইত্যাদি বিভিন্ন বিভাগ নিয়ে তিতলি হাজির হয় পাঠকদের কাছে। কস্তুরী এতদিন সিনিয়র দিদিদের সাথে ইন্টার্ভিউগুলিতে যেত, শুনত, শিখত। আজও তাই যাওয়ার কথা ছিল। বিখ্যাত অন্ট্রেপ্রেনিউর, শ্রী সৌরভ বণিক অনেক টালবাহানা করে অবশেষে আজ দুপুর বারোটার সময় ওদের ম্যাগাজিন থেকে আসতে বলেছিলেন। শ্রুতিদির কথা ছিল এটা কাভার করার, সাথে থাকত কস্তুরী, কিন্তু গত সপ্তাহে একটা কেলেঙ্কারি কাণ্ড ঘটিয়ে শ্রুতিদি আপাতত শয্যাশায়ী। আর তার ফলে ইন্টার্ভিউয়ের দায়িত্ব এই প্রথম বার, পুরোটাই পড়েছে কস্তুরীর ঘাড়ে।

অনেকদিন ধরেই কস্তুরীর মনের কোণে একটা আশা ছিল, একদিন ও একা গিয়ে কোন বড় মাপের মানুষের ইন্টার্ভিউ নেবে, সেই ইন্টার্ভিউ ছাপার পর দিকে দিকে ওর নাম সবাই জেনে যাবে। তাই সৌরভ বণিকের ইন্টার্ভিউটা ওকে আজ যেমন করেই হোক, ভালো করতেই হবে। নিজের প্রিয় সুগন্ধী হাল্কা করে গায়ে লাগিয়ে আত্মবিশ্বাসে ভরপুর কস্তুরী অফিসের পাঠানো ক্যাবে গিয়ে বসল। ভদ্রলোকের বাড়ি মালঞ্চগ্রাম নামে এক জায়গায়, কলকাতা থেকে প্রায় ঘন্টাখানেকের পথ। গাড়িতে বসে অসে তাই কস্তুরী ওনার বিষয়ে জোগাড় করা সমস্ত তথ্যে আরেকবার চোখ বোলাতে লাগল। শ্রুতিদি যখন কোন কাজ করে, এত নিখুঁত ভাবে করে, এই ফাইলটা দেখে নতুন করে শ্রুতিদির প্রতি কস্তুরীর শ্রদ্ধা বেড়ে গেল।

সৌরভ বণিকের পরিবারের ব্যবসা কেমিক্যালসের ও রঙের, প্রায় পঞ্চাশ বছরের কাছাকাছি। অবশ্য সেই ব্যবসার হাল তেমন আহামরি কিছু নয়। সৌরভ  নিজে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃতি ছাত্র, বিদেশের নামকরা ইউনিভার্সিটি থেকে গবেষণা করে দেশে ফিরে পারিবারিক ব্যবসার হাল ধরেন এবং এক লাফে পাঁচ বছরের মধ্যেই বণিক কেমিক্যালসের নাম সারা দেশের কোণায় কোণায় ছড়িয়ে দিতে সক্ষম হন। ব্র্যান্ডের নামী সুগন্ধীগুলোর মতই কোম্পানীর নাম যশ দিকে দিকে। বহু পুরস্কার এসেছে ঝুলিতে। আজকের এই ইন্টারভিউটির মাধ্যমে তিতলি থেকে এই নবীন ব্যবসায়ীর উত্তরণের কাহিনী জনগণের কাছে আসতে চলেছে।

সৌরভ বণিক তেমন বেশী প্রচারে থাকেন না। উনি তেমনই ব্যক্তি যিনি কাজ দিয়েই নিজেকে চেনাতে চান সকলের কাছে। তাই এই সাক্ষাৎকারটি দিতে তিনি সহজে রাজী হন নি। শ্রুতিদির পক্ষ থেকে অনেক চেষ্টা করার পরে আজ বেলা বারোটার সময় দিয়েছেন উনি তিতলিকে। তিতলির হয়ে কস্তুরীকে তাই আজ নিজের সেরাটুকু দিতেই হবে, বারবার করে পাখি পড়ার মত শ্রুতিদি বলেছিল। পৌনে বারোটা নাগাদ ওরা পৌঁছল মালঞ্চগ্রামে, বণিক বাড়ী। বিশাল তিনতলা বাড়ী, প্রায় অট্টালিকা বলা চলে। সামনে সুসজ্জিত বাগান। গাড়িটা উল্টোদিকের রাস্তায় গাছের তলায় রাখতে বলে কস্তুরী ধীর পায়ে এল সদর দরজায়। অদ্ভুত লাগল, এত বড় বাড়ি, অথচ কোন দারোয়ান নেই। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে খানিক অপেক্ষা করে, ঠিক কাঁটায় কাঁটায় বারোটা বাজতে ও কলিং বেল বাজালো। একটা মিষ্টি পাখির ডাক, বেশ খানিকক্ষণ বাজল। দুই তিন মিনিট হয়ে গেল, অথচ কোন সাড়াশব্দ নেই কারুর। আরেকবার বেল বাজালো কস্তুরী। কিন্তু তারপরেও কোন শব্দ নেই প্রায় পাঁচ মিনিট। কি করবে, ফেরত যাবে, নাকি ভদ্রলোককে ফোন করবে, ভাবতে ভাবতে এমন সময় দরজা খুলে গেল। অপর প্রান্তে যিনি দাঁড়িয়ে আছেন, উনিই সৌরভ বণিক। গত তিন চারদিন ধরে ওনার বিষয়ে পড়াশোনা করতে গিয়ে কতবার যে এই চেহারাটাকে দেখেছে, তার ইয়ত্তা নেই। এক মাথা কুচকুচে কালো চুল, ফর্সা গোল মুখ, কুতকুতে দুটো চোখ। আর সবচেয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করে যেটা, ঠোঁটের ওপরে একটা কালো আঁচিল।

"নমস্কার। আমি কস্তুরী সেন, তিতলি পত্রিকা থেকে আসছি।"

"আর শ্রুতি মুখোপাধ্যায়? উনি কই?"

"শ্রুতিদির একটা এক্সিডেন্ট হয়েছে, শয্যাশায়ী। তাই আসতে পারেননি, আপনার সেক্রেটারিকে জানিয়ে দিয়েছিল গত কাল।"

"ও আচ্ছা। দিলীপ গত তিনদিন ধরে আসছেনা। তাই আমি জানতাম না। আসুন। বসুন।"

ঘরে ঢুকে কস্তুরীর দু চোখ ধাঁধিয়ে যাওয়ার জোগাড়। এত সুন্দর আরটিস্টিক ভাবে সাজানো গোছানো ঘর, দেওয়াল জুড়ে দুর্দান্ত কিছু অয়েল পেন্টিং, ক্যাবিনেট জুড়ে দেশ বিদেশের বিভিন্ন প্রান্তের থেকে জড়ো করা স্যুভেনির। বইয়ের তাকে ভর্তি ভর্তি রবীন্দ্রনাথ, বিভূতিভূষণ, কোলরিজ, হেমিংওয়ে।

" বসুন। চা খাবেন তো? দাঁড়ান, নিয়ে আসছি।"

" না না ঠিক আছে, লাগবে না। আপনি আবার কষ্ট করতে যাবেন কেন?"

" আরে কিছু হবে না। আমার কাজের লোকগুলো রবিবার করে ছুটি নেয়, আমার অভ্যেস আছে চা করার। পাঁচ মিনিট সময় দিন, আসছি।"

মিনিট দশেক পরে সৌরভ বণিক ঘরে ঢুকলেন, হাতে চায়ের ট্রে আর কিছু কুকিজ নিয়ে। সুগন্ধীর ব্যবসা বলে বোধহয়, বাড়িতে ঢোকা ইস্তক কস্তুরী একটা মিষ্টি সুবাস পাচ্ছে। চায়র কাপ হাতে নিয়ে সেখান থেকেও পেল জ্যাস্মিনের সুগন্ধ।

" দার্জিলিং থেকে আনানো, স্পেশাল জ্যাসমিন টি। খান। ভালো লাগবে। অপূর্ব গন্ধ। স্বাদও অতুলনীয়।"

" হ্যাঁ নিচ্ছি। ধন্যবাদ।"

"রিলাক্স করে বসুন। এত আড়ষ্ট হয়ে আছেন কেন? আরাম করে বসুন। হাতে অনেক সময় আছে। চা টা খান, তারপরে সাক্ষাৎকার শুরু হবে। "

" হ্যাঁ ঠিক আছে। আমি এমনিও গরমে খুব একটা স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করিনা, বরং আপনার ইন্টার্ভিউ শুরু করি? কিছু যদি মনে না করেন। আসলে সময় তো বেশী নেই, এক ঘণ্টার মোটে শিডিউল।"

" বেশ। তাহলে শুরু করুন প্রশ্ন। তবে একটা কথা। আমি কিন্তু সব প্রশ্নের উত্তর নাও দিতে পারি, আর আগে পরেও দিতে পারি। ঠিক আছে?"

"বেশ, তাই হবে। তাহলে শুরু করি? আমি কিন্তু রেকর্ড করব উত্তর।"

" আপত্তি নেই।"

" আচ্ছা সৌরভ বাবু, প্রথম প্রশ্ন। আপনি ছোট থেকে কি ভেবেছিলেন পারিবারিক ব্যবসায় আসবেন?"

"অবশ্যই। বাবা দাদুকে ব্যবসা নিয়ে আলোচনা করতে দেখে আমিও তখন থেকে ভাবতাম যে একদিন এই ব্যবসায় যোগদান করব। তবে, আমার কিন্তু সেকেলে নিয়ম কানুন, ব্যবসার নীতি ভালো লাগত না। আর তাই বিদেশ থেকে আমি পড়াশোনা করে আসি। এসে ব্যবসার হাল ধরে আজ একটা অনেক diversify করেছি। "

" ঠিকই। আপানদের তো আগে বোধহয় কেমিক্যালস আর রঙের ব্যবসা ছিল শুধু? এখন তো এ ছাড়াও অনেক অন্যান্য প্রোডাক্ট আছে। একটু সেই বিষয়ে বলুন।"

" দেখুন বিদেশে থাকাকালীন যেটা আমি রিয়েলাইজ করি, সেটা হল, দেশে ফিরলে পরে বন্ধু বান্ধব ও আত্মীয়স্বজনরা যেই গিফট পেলে সবচেয়ে খুশী হয়, তা হল সুগন্ধী। তখনই এর কারণ ভাবতে গিয়ে বুঝলাম যে কস্তুরীমৃগের দেশ এখানে হলেও, আমাদের দেশে সুগন্ধীর প্রোডাকশন কোয়ালিটি মন্দ। তাই ডিমান্ড থাকলেও দেশীয় জিনিসের সাপ্লাই নেই, তাই এই সুগন্ধীর মার্কেটটা ট্যাপ করার খুব ইচ্ছে হল আমার। সেই ইচ্ছে থেকেই এরপর শুরু হল আমাদের কোম্পানির নতুন ডিভিশন যেখানে  আমরা মূলত এরোমাথেরাপি ও সুগন্ধী নিয়ে কারবার করি।"

" আচ্ছা। সৌরভ বাবু, এবার একটা ব্যক্তিগত প্রশ্ন। আপনার সবচেয়ে প্রিয় ফ্রেগ্রেন্স কি?"

" বলব, রাদার, শোঁকাব। একটু সময় দিন। জিনিসটা আমার কাছে খুব স্পেশাল, তাই তাড়াহুড়ো করতে চাইনা। সময় লাগবে, কিন্তু আমি আপনাকে ডেমো দেব। অন্য কোন প্রশ্ন থাকলে করুন।"

 এরপর আরো খানিকক্ষণ চলতে লাগল কস্তুরীর প্রশ্নপর্ব। সৌরভ বণিকও হাসি মুখেই উত্তর দিলেন। ইতিমধ্যে চা শেষ হয়ে যাওয়ায় ভদ্রলোক বললেন, " চলুন তাহলে। আপনাকে আমার ল্যাবরেটরিটা দেখিয়ে আনি। ওখানেই আমার প্রিয় কিছু গন্ধ রাখা আছে। আপনি দেখতে পাবেন।"

যে আঁতুড়ঘরে সৃষ্টি হয়েছে কিছু বাজার কাঁপানো গন্ধ, যেখানে জন্ম নিয়েছে কিছু যুগান্তকারী বিউটি প্রোডাক্ট, সেইখানে যে সৌরভ বণিক কস্তুরীকে নিয়ে যাবেন, ও ভাবতেই পারেনি। তাই প্রস্তাবটা শুনে খানিকক্ষণের জন্য হলেও ও স্থির হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

" কি হল? চলুন? দেখবেন না আমার ল্যাব?"

" হ্যাঁ নিশ্চয়ই। আসলে আমি ভাবছিলাম যে এরকম একটা সুযোগ পেলাম। কিন্তু সাথে ক্যামেরাম্যানকে আনিনি। ছবি মিস হয়ে যাবে।"

" না না। ছবি তুলতে এমনিও দিতাম না। আপনাকে আলাদা করে দেখাচ্ছি। জনগণকে আমার ল্যাব, আমার কর্মকাণ্ড দেখাতে চাইছিনা এক্ষুনি। হ্যাঁ, আপনি বরং আপনার মোবাইলটাও এখানেই রেখে যান। ভিতরে গিয়ে সিগন্যাল পাবেন না। ভুল করে যদি ছবি তুলে ফেলেন, তখন মুশকিল হয়ে যাবে।"

" আমি ছবি তুলবনা আপনি বারণ করলে।"

" হ্যাঁ। সে ঠিক আছে। কিন্তু ফোনটা রেখে যান। চিন্তা করবেন না। আমার বাড়িতে এখন আমরা দুজন ছাড়া আর কেউ নেই। মেন গেটও লক করা আছে। ফোন চুরি যাবে না। আপনি আসুন।"

অগত্যা কস্তুরী বাধ্য হয়েই নিজের ফোনটা সেন্টার টেবিলে রেখে সৌরভ বাবুর পিছন পিছন হাঁটা শুরু করল বাড়ির ভিতর। একটা লম্বা করিডর, আর তার দুইদিকে সার দিয়ে কিছু ঘর। প্রত্যেকটা ঘরেই তালা বন্ধ। এক তলা বলে করিডরে তেমন আলো ঢুকছেনা। ঠাণ্ডা মেঝেতে পা ফেলে চলতে চলতে অবাক হয়েই চারিদিক দেখছিল কস্তুরী। ঘরগুলির পাশ দিয়ে যেতে যেতে একটা অদ্ভুত ধরণের ভয় করছিল ওর। সম্বিৎ ফিরল সৌরভের কোথায়, " এই সমস্ত ঘরবাড়ি এক কালে লোকে ভর্তি থাকত। আমাদের যৌথ পরিবার এখন ভেঙ্গে টুকরো টুকরো হয়ে সবাই এদিক সেদিকে ছড়িয়ে আছে। আমার বাবা মা বেনারসে গিয়েছেন। কালি পুজোর পরে ফিরবেন। এটাই ওনাদের প্রতি বছরের নিয়ম। তাই আর কি বাড়ি এত খালি দেখছেন। আমি একা থাকব, কাজের লোকদেরও তাই ছুটি দিয়েছি। একজন মাসি এসে সপ্তাহে তিনদিন ঘরদোর ঝাঁট মোছ করে যায়। আমার রান্নাবান্না আমি নিজেই করে নিই। রান্না আমার আরেকটা প্যাশন।"

" ও! তাই? বেশ, ইন্টারেস্টিং, যে রাঁধে সে গন্ধও বেচে।"

" ওই রকমই। চলুন। আমরা এসে পড়েছি, এই এইটা আমার ল্যাব। আপনি বসুন। আমি আরেকটা চেয়ার নিয়ে আসছি। "

এই বলে সৌরভ ল্যাবের দরজায় ছিটকিনি লাগিয়ে ভিতরের ঘরে চলে গেলেন। সেখান থেকে তারপরে বেরোলেন একটা প্লাস্টিকের চেয়ার আর একটা কাঠের বাক্স নিয়ে। কস্তুরীর সামনে বসে বাক্সটার লোক খুলতে খুলতে বললেন, " এই বাক্সের মধ্যেই রয়েছে আমার কিছু পছন্দের গন্ধ। আপনার চারিদিকে তাকিয়ে দেখুন, দেখছেন তো কত শিশি ভর্তি তাক? সেইরকমই কিছু ভায়াল আমার এই বাক্সে আছে। "

কস্তুরী তাকিয়ে দেখল, ঘরের আলো কম হওয়ায়, এতক্ষণ নজরে আসেনি। ঘরময় বেশ কিছু শেল্ফ, আর প্রতিটি শেল্ফে রাখা সারি দিয়ে কাঁচের শিশি।

" এইটা দেখুন, শুরু করছি এইটা দিয়ে। এতে রয়েছে এক ধরণের জংলা ফুলের এসেন্স। আমি কিছু বছর আগে দার্জিলিং গিয়েছিলাম, তখন হঠাৎ করেই হাঁটতে হাঁটতে এক জায়গায় এই ফুলগুলির সন্ধান পাই। শুকে দেখুন। "

কস্তুরীর নাকের ডগায় কমলা রঙের তরলযুক্ত ভায়ালটা ধরলেন সৌরভ। একটা অদ্ভুত রকমের মাদকতা মিশ্রিত সুগন্ধ ওর শরীরে হিল্লোল তুলল।

" অপূর্ব। এটি আপনার কোন প্রোডাক্টে ব্যবহার করেছেন বলবেন? আমি কিনতে চাই। "

" নিজের সবচেয়ে প্রিয় গন্ধগুলো সম্পূর্ণ আমার কস্তুরী। আমি ওইগুলো বিক্রি করে কারুর সাথে ভাগ করে নিতে চাই না। দাঁড়ান, এর পরেরটা দেখুন। শান্ত হয়ে বসুন। "

একটা হাল্কা বেগুনি রঙের তরল ভর্তি ভায়াল এরপর ওর নাকের সামনে এনে ধরল সৌরভ।

" এটি আমি চায়নাতে পাই। যখন গ্রেট ওয়ালের সিঁড়ি বেয়ে উঠছিলাম, আবারও পথের ধারের কিছু জংলা ফুল কুড়িয়ে পাই। তবে আশ্চর্যভাবে ফুলের চেয়েও পাতার গন্ধ আমায় বেশী টানে। এটি সেই গন্ধ। "

প্রায় মিনিট দুই তিনেক সৌরভ ওর সামনে ওই ভায়ালের ঢাকনা খুলে কস্তুরীকে শুঁকতে দিল ওই গন্ধ।

" কি দুর্দান্ত! আপনি যে কেন এই গন্ধ বিক্রি করেন না। আমার তো মন চাইছে খালি এটাই শুঁকে যাই। মাথাটা কি সুন্দর হাল্কা লাগছে। "

" বেশ তো, খানিকক্ষণ শুঁকুন। আমি তো ধাপে ধাপে আমার প্রিয় গন্ধগুলি আপনাকে দেখাচ্ছি। এরপরের কয়েকটা আমার সবচেয়ে প্রিয়। ওগুলোর লাইভ ডেমো দেব। আগে এইটা শেষ হোক। "

এরপরে হলুদ, খয়েরী, নীল বিভিন্ন রঙের ভায়ালের থেকে গন্ধ শুঁকতে শুঁকতে কস্তুরীর দু চোখের পাতা কখন এক হয়ে গিয়েছিল, ও টেরই পায়নি। চোখ মেলে দেখল ওর সামনে সৌরভ বণিক বসে। নিজেকে একটু ধাতস্থ করতে গিয়ে টের পেল, হাত দুটো বাঁধা।

" এ কি? আমার হাত বাঁধা কেন?"

" আসলে এবারে আমার সবচেয়ে পছন্দের গন্ধ প্রস্তুত করব। তখন সেই গন্ধ তৈরির সময়ে আপনি পাগল হয়ে ছটফট করতে পারেন। আর তাতে আমার কিঞ্চিৎ অসুবিধে হবে। সেই জন্যই এই প্রিকশন। "

" সে আবার কি? ছটফট করব কেন? "

" আমার পূর্বের অভিজ্ঞতা তাই বলছে। সুগন্ধীর সাবজেক্টরা ছটফট করে বইকি। তারপরে মিইয়ে যায়। বারবার বলা সত্ত্বেও শোনেনা। তাই এই পন্থাটি নিতে হল। দুঃখিত।  "

" সাবজেক্ট? তার সাথে আমার কি সম্পর্ক? কিছু বুঝছি না। "

" সব বুঝে যাবেন। একটু ধৈর্য রাখুন। "

" এ কি? আপনি ছুরি নিয়ে আসছেন কেন এদিকে? "

" চুপ। বললাম না। "

" আলো নেভাচ্ছেন কেন? "

" মোমবাতিটা জ্বালাবো, আর আলো লাগবে না। আপনি শান্ত হোন কস্তুরী। আমার সুগন্ধী তৈরির সময়ে এত কথা আমি একদম পছন্দ করিনা। আপনি কথা বললে কিন্তু মুখে কাপড় দিতে বাধ্য হব। প্লীজ আমায় দিয়ে অপ্রিয় কাজ করাবেন না। "

" আপনি ছুরিটা দূরে রাখুন। লেগে যাবে আমার। "

" দূরে রাখলে তো ম্যাডাম আমি সুগন্ধী পাব না। "

" প্লীজ সৌরভ বাবু, পাগলামি করছেন কেন? আমি চাই না আপনার প্রিয় সুগন্ধের হদিশ। আমার বাঁধন খুলুন। "

" তা বললে কি আর হবে ম্যাডাম? সিকুয়েন্স অনুযায়ী চলছি। মাঝপথে বেরোনো যাবে না। এখন আপনি চুপটি করে বসুন, নইলে বেশী ব্যথা লাগবে। ও মা আপনি এত তাড়াতাড়ি ঘামতে শুরু করে দিলেন? বাহ। অন্যান্যবার তো আমায় ফ্যান বন্ধ করতে হয়। আপনি ভারী লক্ষ্মী মেয়ে তো। ঘাম এসে গিয়েছে। এবারে একটু রক্ত আসুক। দুটো মিশুক।"

" সৌরভ বাবু, প্লীজ।"

" তখন থেকে কি প্লীজ প্লীজ করে চলেছেন বলুন তো?  আপনাকে কথা দিচ্ছি, খুব বেশী লাগবে না। ব্যস, একটা মোটে কাটব। পরে আপনাকে পেন কিলারও দিয়ে দেব। আপনি জানেন না, কাঁচা রক্ত আর তার সাথে মেশা ভয়ার্ত মানুষের শরীরের ঘাম...অনবদ্য এক পাগলকরা গন্ধ সৃষ্টি করে। আমি আগে বহুবার এটা অনুভব করেছি। ভারী ভালো লাগবে। একটু স্থির হয়ে বসুন, আপনাকেও শোঁকাব।"

" বাঁচাও। কে আছো? প্লীজ হেল্প!"

" চীৎকার করে লাভ নেই কস্তুরী। বাড়িতে আপনি আর আমি ছাড়া আর কেউ নেই। বললাম না কাজের লোকেদের ছুটি দিয়ে দিয়েছি?"

" প্লীজ, এরকম করবেন না। আমার লাগছে।"

" ছুরিটা ঠিক করে বসল না আর এর মধ্যেই লাগছে?"

" হেল্প! হেল্প! "

" আপনি চীৎকার করুন। নিজেরই ক্ষতি, ঠিক যেই গন্ধটা আমি চাই, সেটা আসতে আরো দেরী হবে। ভালো। আমার কি? দিনের শেষে আমার গন্ধ পেলেই হল!"

" আহা, লাফঝাঁপের চেষ্টা করবেন না প্লীজ। লেগে যাবে। আমি কিন্তু ছোট্ট একটা কাট করছি, আপনি এত নাড়ালে কিন্তু উন্ডটা বড় হয়ে যাবে। ঠিকঠাক গন্ধ পাব না। তখন আমায় আবার আপনার ডান হাতে এটেম্পট নিতে হবে। "

টুপ টাপ টুপ টাপ। কস্তুরীর রক্তের ফোঁটা, ভয়ের ঘাম মিলে মিশে একাকার। নতুন কাঁচের ভায়ালে বন্দী হতে থাকে আদিম সুগন্ধী। প্রিয় গন্ধ সঞ্চয় হতে দেখে সৌরভ বণিকের মুখে ফুটে ওঠে এক পৈশাচিক হাসি, মোমবাতির আলোয় যা মনে করিয়ে দেয় যে কোন হিংস্র পশুকে। চেয়ারে নেতিয়ে পড়ে থাকে সাবজেক্ট, কস্তুরী।

           *********************************************

( গল্পটা পড়ে হয়তো পারফ্যুম সিনেমাটির কথা মনে হতে পারে। আমার অবশ্য সিনেমাটির বিষয়ে কোন ধারণা ছিল না। আদ্ধেক লেখার পরে প্লটটা নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে জেনেছি। )