নমস্কার। সাগরিকার এই অনুষ্ঠানে আপনাদের সকলকে স্বাগত জানাই। গত বছরের মহালয়ার অনুষ্ঠানের পরে এই বছর দাক্ষায়ণী টিমের সকলে আপনাদের সামনে এক ভিন্ন আঙ্গিকের নৃত্য পরিবেশনে প্রয়াসী।
মেঘ রঙে রঙে বোনা, আজ রবির রঙে সোনা।
আজ আলোর রঙ যে বাজল পাখির রবে।
আজ রঙ সাগরে তুফান ওঠে মেতে।
মানবজীবন বর্ণময়। সেই মানবজীবনে আবেগের আতিশয্যই আমাদের আজকের নৃত্যানুষ্ঠানের প্রেরণা। ইতিবাচক ও নেতিবাচক দুইরকম আবেগেই পরিপূর্ণ এই জীবন। এই বিভিন্ন আবেগ ও অনুভূতির নানান বর্ণচ্ছটায় মানবজীবন হয়ে ওঠে রঞ্জিত। এর প্রকাশ ঘটে বিভিন্ন অভিব্যক্তির মাধ্যমে। কখনো সে খুশীতে উদ্বেলিত, কখনো ঈর্ষান্বিত, কখনো বা
উচ্ছ্বসিত তো কখনো সে ক্রোধানলে
জর্জরিত। কখনো সে জীবনের শূন্যতায় বিমর্ষ তো কখনো ধ্বংসলীলায় মত্ত।
১। ক। যুগ যুগ ধরে সুন্দরী বসুন্ধরার পানে চেয়ে কত মানুষের প্রাণ গেয়ে উঠেছে প্রকাণ্ড উল্লাসভারে। যৌবন দিয়েছে এই সৌন্দর্যকে এক অনন্ত ব্যাপী অনন্যতা, যা দিকে দিকে অরণ্যে ভূধরে নবপল্লবে হিল্লোল তুলেছে। এই প্রাণোচ্ছ্বল যৌবনেরই রঙ সবুজ। অসীম ক্ষমতা তার।
ওরে নবীন, ওরে আমার কাঁচা
ওরে সবুজ ওরে অবুঝ
আধ মরাদের ঘা মেরে তুই বাঁচা।
যৌবন তার প্রাণবন্ত আবেগে সারাবেলা যে আনন্দদোলায় মনকে স্পর্শ করে, সেই নৃত্যই আমাদের প্রথম পরিবেশন।
১/ খ যৌবন ক্ষণস্থায়ী। আর তাই যৌবনের সৌন্দর্যও স্বল্পায়ু। নবপল্লবের কাঁচা রঙ যে কখন মানে পাল্টে কাঁচা পাকা চুলের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হতে থাকে, তা উপলব্ধি করা কঠিন, মানব মন মানতে পারেনা।
আমাদের পাকবে না চুল গো - মোদের পাকবে না চুল।
আমাদের ঝরবে না ফুল গো - মোদের ঝরবে না ফুল।
অবশিষ্ট যৌবনকে বৃথা আঁকড়ে ধরার বিফল চেষ্টা ও আশেপাশের সদ্য যৌবনপ্রাপ্ত প্রাণকে দেখে, মানব মন হয়ে ওঠে ঈর্ষান্বিত। না পাওয়ার তৃষ্ণা দগ্ধে দগ্ধে মারে তাকে, ছুটি পায় প্রাণের আরাম। নব যৌবনের সবুজ তখন প্রতীক হয়ে ওঠে ঈর্ষার। আমাদের দ্বিতীয় পরিবেশনা - " ঈর্ষার সবুজ চোখ"।
২/ক। যা পায়নি, তাকে পাওয়ার জন্য মনের মধ্যে প্রতিনিয়ত চলতে থাকে একটা যুদ্ধ। তারপর আপাত যুদ্ধশেষে কাঙ্খিত বস্তু মিললে মন কিছুটা হলেও পায় সাময়িক স্বস্তি, ।
তোমারি ওই অমৃত পরশে আমার হিয়াখানি
হারাল সীমা বিপুল হরষে, উথলি উঠে বাণী।
এই ঝলমলে আনন্দেরই রঙ কমলা। এই আনন্দ বিশ্বভুবনকে ছন্দে নাচায়, নাড়িয়ে দেয় চিত্তবীণা। এই প্রবল সন্তুষ্টিই ফুটে উঠবে আমাদের পরবর্তী নিবেদনে।
২। খ। যাহা পাস তাই ভালো
হাসিটুকু, কথাটুকু
নয়নের দৃষ্টিটুকু, প্রেমের আভাস।
সমগ্র মানব তুই পেতে চাস,
এ কী দুঃসাহস!
কী আছে বা তোর!
কাঙ্খিত বস্তুর প্রাপ্তিসুখ ক্ষণস্থায়ী। একটা যুদ্ধ জয় মনকে করে তোলে ক্ষুধার্ত। তার আরো চাই, আরো চাইয়ের মত আগ্রাসী মনোভাব জন দেয় লিপ্সাকে। চিত্তমাঝে এক অজ্ঞাৎ ব্যাথা ভরে ওঠে অচেনা প্রত্যাশায়। তৃপ্তিহীন এক মহা আশা মনের মধ্যে সঞ্চারণ করে লোভ ও লিপ্সাকে। হলুদ রঙ এই লোভ ও লিপ্সার প্রতীক। এই দীপ্তোজ্জ্বল লিপ্সার অনল পরিবেশিত হতে চলেছে আমাদের পরবর্তী নিবেদনে।
৩/
একটা সময় পর মন এই দ্বন্দ্বেও হয় জয়ী। হিংসা লোভ লিপ্সাকে জয় করার হর্ষ জাগে পৃথিবীতে। জীবনে লাগে এক প্রাপ্তির পরশ, আসে স্থিতিশীলতা। এই
প্রাপ্তি এনে দেয় এক রাজকীয় , যে আভিজাত্য মনের ব্যাপ্তি ঘটায়; নীল সমুদ্রের ম্পতই যা অনন্ত, গভীর ও বিশাল। অসীম এই অভিজাত্যের আপন সুর তাল ছন্দ ও বর্ণের প্রকাশই আমাদের পরবর্তী নিবেদনে।
৪। আভিজাত্যের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকে ব্যক্তিত্ব। আর এই ব্যক্তিত্বময় সত্ত্বার থেকেই সৃষ্টি হয় তীব্র আবেগ ও অনুভূতির। রাগে অনুরাগে আকর্ষণে আকুল আর্তস্বর ওঠে, যা জাগিয়ে তোলে মানব মনের সুপ্ত অনুভূতিগুলোকে। সে অনুভূতি একদিকে যেমন প্রেমময়, কোমল, তেমনি আবার তার তীব্রতা নটরাজের ক্রোধের সাথে তুলনীয়। তীব্র আবেগের রঙ গোলাপী, ক্রোধের রঙ লাল। রাগ ও অনুরাগের মধ্যে চলতে থাকে এক চিরদ্বন্দ্ব। জগত চরাচর কাঁপিয়ে এই দুই সত্ত্বার স্বতঃস্ফূর্ত প্রাণোচ্ছ্বাস সৃষ্টি করে এক প্রচণ্ড কল্লোল। তীব্রতা ও কোমলতার এই নিরন্তর দ্বন্দ্ব ও একে অপরকে অতিক্রম করে প্রাধান্য প্রতিষ্ঠার প্রয়াসই ধরা দেবে আমাদের পরবর্তী পরিবেশনায়।
৫। নাই সুর, নাই ছন্দ, অর্থহীন নিরানন্দ
জড়ের নরটন।
সহস্র জীবনে বেঁচে ওই কি এছে নেচে
প্রকাণ্ড মরণ।
যখন প্রতিনিয়ত বিভিন্ন অনুভূতির সাথে যুদ্ধ করতে করতে মানব মন হয়ে পড়ে রণক্লান্ত, যখন যুদ্ধ জয়ের আনন্দ ফোটাতে পারেনা হাসি, মানবমন এক উদাসমূর্তি বিষাদশান্ত শোভায় আচ্ছন্ন থাকে, তখন চারিদিকে শুধুই কালিমা, শুধুই হাহাকার, শুধুই শূন্যতা। রজনী গভীর হয়, দীপ নিভে আসে। চারিদিকে কেবলই কালো। মনের শূন্যতা, তাকে করে তোলে অশান্ত ও ধ্বংসাত্মক। বাদ প্রতিবাদের নিনাদ ঘোষণা করে সে লিপ্ত হয় ধ্বংসলীলায়। আমাদের আগামী উপস্থাপনায় মনের সেই অশান্তিই ব্যক্ত হয়ে উঠবে।
৬। আবেগ অনুভূতি চাওয়া পাওয়ার অন্ধকারের শেষে ঊষার পুণ্য লগ্নে গগনে ওঠে নবীন সূর্য। এই নবীন সূর্য আনে নব আশা ও নবজাগরণের বার্তা। পুরাতনকে ভুলে, অতৃপ্ত গোপনমর্মদাহিনী বাসনাকে ট্যাগ করে এগিয়ে নিয়ে চলে চিরপরিচয়মাঝে এক নব পরিচয়ে। এই নবীন সূর্যের শুভ্র রশ্মিতেই ধুয়ে মুছে যায় সমস্ত কালিমা, ঘুচে যায় দুঃখ। সমস্ত অনুভূতির সংমিশ্রণে এক মায়াময় প্রশান্তি সৃষ্টি হয়। সব রঙ মিলে যেমন তৈরী হয় সাদা, তেমনি জীবনের নানাবিধ আবেগ ও অনুভূতির মিলনেই বহমান জীবনের সার্থকতা। এদের মিলনঘাতের বিচিত্র বেদনা নিত্য রচনা চলেছে নব বর্ণ গন্ধ গীতি।
আমি বিপুল কিরণে ভুবন করি যে আলো,
তবু শিশিরটুকুরে ধরা দিতে পারি, বাসিতে পারি যে ভালো।
এই মায়াবী শুভ্র আলোর হাসির রেশটুকু থেকে যাক আমাদের প্রত্যেকের জীবনে, প্রতি মুহূর্তে। জীবন পরিপূর্ণ হোক, এই আশা নিয়েই আমাদের সর্বশেষ উপস্থাপনা - "মায়াবী জীবন।"
Friday, October 27, 2017
আজি দখিন দুয়ার খোলা: যেখান থেকে সব শুরু
সালটা ২০১৩, ওই জানুয়ারির মাঝামাঝি (নাকি শেষের দিকে) একদিন নেহাতই অনিচ্ছে সহ গেট পরীক্ষা দিতে গেলাম সোনারপুরে। সেই নিয়ে ছিল ওটা আমার তৃতীয় এটেম্পট এই জঘন্য পরীক্ষার। গত দুইবারে একটুর জন্য কান ঘেঁষে বেরিয়ে যাই, তাই এইবারে একদমই মন ছিল না পরীক্ষাটা দেওয়ার। ইতিমধ্যে তখন ব্যাঙ্গালোরে একটি স্টার্ট আপ কোম্পানিতে চাকরির অফারও পেয়েছিলাম, আর MSc শেষ করার পরে দুই বছর ধরে চেষ্টা করে করেও যখন PhD করার সুযোগ পাচ্ছিলাম না, তখন প্রায় বীতশ্রদ্ধ হয়েই গিয়েছিলাম। তবুও, নেহাত ওই বছর মেয়েদের জন্য পরীক্ষার ফর্ম বিনামূল্যে দিয়েছিল এবং অন্যান্য বন্ধুদের পরীক্ষাকেন্দ্র প্রায় এক রাত্তির ট্রেনে করে গিয়ে পৌঁছনোর মত জায়গা আর আমারটা লোকাল ট্রেনে কয়েকটা স্টেশন গেলেই যাওয়া যাবে বলে, যাব না যাব না করেও অবশেষে গেলাম। পরীক্ষা সেই বছর প্রথম পুরোপুরি কম্পিউটারাইজড ছিল, প্রথম সব কিছু নিয়ে মানুষজন যতই ভালোলাগা ভালবাসাবাসি করুক না কেন, এই ক্ষেত্রে প্রায় কুরুক্ষেত্র লাগার জোগাড়। যে পরীক্ষা দুপুর দুটোয় শুরু হওয়ার কথা, তা শুরু হলে গিয়ে প্রায় সাড়ে তিনটেতে। বিঘ্ন দিয়ে শুরু হল, তাই এর থেকে তেমন প্রত্যাশা ছিল না। ভুলে মেরে দিলাম।
এই ফেব্রুয়ারি মার্চ মাস নাগাদ, রাজাবাজারের স্যারেরা বললেন মাদ্রাজ পাঠাবেন, প্রোজেক্টে। ওরে বাবা, শোনা ইস্তক সে যে আমার কী আনন্দ কী আনন্দ, বলে বোঝাতে পারব না। আই আই টি নামক প্রতিষ্ঠানের ও সেখানে পড়াশোনা করে যারা, তাদের ওপর সে কী অসীম শ্রদ্ধা তখন আমার। আমি তো প্রায় নাচতে নাচতে সব বন্ধুদের বলতে লাগলাম, এই জানিস আমি IIT Madras যাচ্ছি, আড়াই মাস থাকব। প্রচুর বাহবা টাহবা পেলামও (যদিও স্যারেরা পাঠাচ্ছেন, এতে যে আমার কি এলিজিবিলিটি প্রশংসা পাওয়ার, তা জানিনা! ) ওমা, আমার এমন সুন্দর স্বপ্নের দিনগুলিতে হঠাৎ পিন মেরে ফুস করে সব হাওয়া বের করে আমার স্যার বললেন, " শোনো, তোমায় অমুকের সাথে কথা বলতে হবে। আন্না ইউনিভার্সিটিতে, ও প্রজেক্ট করাবে। এই নাও ইমেল আই ডি। যোগাযোগ করে নিয়ো।" হায় আমার পোড়া কপাল রে, এবারেও বিড়ালের ভাগ্যে শিক ছিঁড়ল না! এই প্রসঙ্গে বলি, আমি যখন কোনকিছু নিয়ে বেশ ভাবনা চিন্তা করে ফেলি, তখন কিন্তু জান প্রাণ লড়িয়ে দিতে পারি সেটা হাসিল করতে, অন্তত নিজের দিক সমস্ত চেষ্টা করি, ফলের আশা করেই। সেই শুরু হল আমার প্রজেক্ট আই আই টি। তড়িঘড়ি ডিপার্টমেন্টের ওয়েবসাইট খুলে দুমদাম গোটা দশ পনেরো জনকে মেল করে দিলাম। চার পাঁচজন উত্তর দিল না, কয়েকজন লিখে দিল, না, জায়গা নেই। কেবলমাত্র একজন বাঙালি ভদ্রলোক, অত্যন্ত সদয় হয়ে বললেন, আরে এসো এসো। অবশ্যই এসো, সুস্বাগতম, ইত্যাদি ইত্যাদি। আহা সেদিন সে আমার প্রচণ্ড মন ভালো, বেশ একটা প্রজেক্ট/মিশন সফল হল বলে কথা। আহা, কি না কি বিশ্বজয় করে ফেলেছি, ইত্যাদি ইত্যাদি। রাজাবাজারে গিয়ে স্যারদের বলে দিলাম, ওইসব আন্না বান্না ছাড়ুন, আমি যাব আই আই টি। ওনারাও দেখলাম হাসিমুখেই পারমিশন দিলেন। সেই শুরু হল আমার দিন গোনা।
তখন একেবারে ফেসবুক খুলে ফ্রেন্ডলিস্ট স্ক্যান করতে শুরু করলাম, কে কে আছে চেনা পরিচিতদের মধ্যে, যারা চেন্নাইতে থাকে বা থাকত। আমার এক বন্ধু, রোহিত, ও বেশ কিছু মাস (নাকি বছর?) চেন্নাইতে থেকেছে, চাকরিসূত্রে। সেই সময়ে ওই হয়ে দাঁড়ালো আমার মুশকিল আসান। ওর সূত্রেই আলাপ হল অর্কদীপ আর রিম্পার সাথে। ওরা দুজনেই তখন আই আই টিতেই MS পড়ছে। ব্যস, সেই থেকে যে ওদেরকে জ্বালাতন করা শুরু করলাম, এখনো ছাড়িনি (ওরা দুজনে আমার চেন্নাইয়ের লোকাল গার্জেন)। তখন প্রথম চিন্তা, কোথায় থাকব। ক্যাম্পাসে হোস্টেল পাবো কি না, পেলেও কিভাবে কোথায় কার কাছে এপ্লাই করব। কিছুদিন খোঁজাখুঁজির পরে জানা গেল যে ক্যাম্পাসে আপাতত হোস্টেলের আকাল চলছে, অগত্যা আমায় নিজের ব্যবস্থা অন্যত্রই করতে হবে। অন্তত শুরুতে বাইরেই থাকতে হবে, তারপরে না হয় ওখানে পৌঁছে কাকুতি মিনতি করে যদি কিছু ব্যবস্থা হয়। শুরু হল ইন্টারনেটের মাধ্যমে বাসস্থান খোঁজার পর্ব। কিছু জায়গা সিলেক্ট করি তো খরচে পোষায় না, কিছু খরচে আসে তো দূরত্বে বাদ পড়ে যায়। অনেক অনেক চেষ্টা চরিত্র করে তারপরে একদিন একটি অনলাইন বিজ্ঞাপনের সাইট থেকে খবর পেলাম একটি পিজির। প্রথমে মেল চালাচালি করলাম। জানলাম এক বয়স্কা ভদ্রমহিলার বাড়িতে থাকার ব্যবস্থা, পাশেই ওনার মেয়ে তার ফ্যামিলি নিয়ে থাকেন। মেয়েই মেলে যোগাযোগ করছিলেন। কথাবার্তা বলে টলে প্রায় ফাইনাল করে রাখলাম।
এত কিছু হয়ে গেল, কিন্তু মাস তখনো মধ্য মার্চ। আমার আসলে সবেতেই একটু বেশী হুড়োহুড়ি তাড়াতাড়ি। একদিন (১৩ই মার্চ সম্ভবত) রাত্রে দিব্যি শুয়ে পড়েছি, এমন সময়ে ফোনে মেসেজ এলো বান্ধবীর, "গেটের রেজাল্ট লিক হয়েছে। খড়গপুরের পেজে দেখা যাচ্ছে, তোমার কত র্যাঙ্ক এলো, দেখো। আমার অমুক।" আগেই বলেছি, গেট পরীক্ষা নিয়ে আর উৎসাহ ছিল না। কিন্তু ওই যে,রেজাল্ট, কিরকম পেটের মধ্যে গুঁড়িগুঁড়ি শুরু হল। জানি যাই হোক না কেন, ওই রেজাল্টে কিচ্ছু যায় আসবে না আমার, তবুও, নিজেকে সামলাতে পারলাম না। আধ ঘণ্টা ধরে কাল সকালে দেখবো, এখন দেখে কি করব ভেবে ভেবেও সেই উঠে ডেস্কটপটা অন করলাম। মেল থেকে আই ডি পাসওয়ার্ড বের করে লগ ইন করলাম সাইটে। ওই মিনিট খানেক যা সময় লাগল রেজাল্ট বেরোনোর, মনে হচ্ছিল যেন, এখনো সময় আছে, পালিয়ে যাই, দেখবো না। ডিসিশন নিতে আমি খুবই অপারগ, তাই যতক্ষণে ঠিক করলাম সিস্টেম ষাট ডাউন করব, ততক্ষণে স্ক্রিনে জ্বলজ্বল করে ভেসে উঠল আমার রোল নম্বর এবং একটি র্যাঙ্ক, এমন র্যাঙ্ক, যা আমি স্বপ্নেও ভাবিনি পেতে পারি। প্রথম রিএকশন কি ছিল জানেন? এক ছুট্টে এসে মায়ের ঘুম ভাঙিয়ে সেটা জানানো, আর তারপরে যেই কথাটা বলেছিলাম আমি, আজও মনে পড়লে কেমন একটা মনে হয় যে Man proposes, God disposes বাগধারাটি সত্য! মা কে সেদিন বেলছিলাম, " মা শোনো, ভালো র্যাঙ্ক এসছে। কিন্তু প্লীজ, আমি PhD করব না। আমায় দয়া করে বলবে না কোথাও এপ্লাই করতে। " এই কথাকটি বলার পিছনে একটা বিরাট চিন্তাভাবনা ছিল। তখন ভাবতাম যে কলকাতায় থেকে PhD করতে গেলে বাবা মা আত্মীয় স্বজনরা ধরে বেঁধে কিছু বছরের মধ্যেই বিয়ে দিয়ে দেবে, বরং ব্যাঙ্গালোর গেলে তখন হাতের নাগালের মধ্যে থাকব না, আরামে থাকব। পরেরদিন সকালে রফা হল বাবা মায়ের সাথে। যেহেতু মাদ্রাজে যাচ্ছিই সামার প্রোজেক্টে, অন্তত IIT Madrasএ এপ্লাইটা করি। আমার তো নিজের ওপর ও নিজের কর্মক্ষমতার ওপর ফুলপ্রুফ ভরসা, জানি এপ্লাই করলেও চান্স পাবোই না। তাই কোন বাড়তি কথা খরচা না করে দিলাম এপ্লিকেশন ফর্ম ভরে। ২০শে মে পরীক্ষা (যেটা শিয়োর ছিলাম ক্লিয়ার করব না), আমার ট্রেনের টিকিট কাটা ছিল ১৩ই মে, মাদ্রাজ মেলের। এক ঢিলে দুই পাখি মারা হয়ে যাবে ভেবে মনে মনে নিশ্চিন্তও হলাম।
এরপর ব্যস্ত হয়ে গেলাম কোর্সের পরীক্ষা নিয়ে। কখন যে মে মাস এসে গেল, খেয়ালই করিনি প্রায়। আই আই টি আসব, তার তোড়জোড় শুরু হল জোর কদমে এপ্রিল শেষ হতেই। প্রথম কাজ যেটা করলাম, একটা ল্যাপটপ কিনলাম। তারপরে বন্ধুদের সাথে আত্মীয়স্বজনদের সাথে আহা, আগামী আড়াই মাস দেখা হবে না, ভালো থাকিস/থেকো এই করতে করতে অবশেষে ১৩ই মে রাত্রের ট্রেন ধরতে রওনা দিলাম বাবা আর আমি।
এই ফেব্রুয়ারি মার্চ মাস নাগাদ, রাজাবাজারের স্যারেরা বললেন মাদ্রাজ পাঠাবেন, প্রোজেক্টে। ওরে বাবা, শোনা ইস্তক সে যে আমার কী আনন্দ কী আনন্দ, বলে বোঝাতে পারব না। আই আই টি নামক প্রতিষ্ঠানের ও সেখানে পড়াশোনা করে যারা, তাদের ওপর সে কী অসীম শ্রদ্ধা তখন আমার। আমি তো প্রায় নাচতে নাচতে সব বন্ধুদের বলতে লাগলাম, এই জানিস আমি IIT Madras যাচ্ছি, আড়াই মাস থাকব। প্রচুর বাহবা টাহবা পেলামও (যদিও স্যারেরা পাঠাচ্ছেন, এতে যে আমার কি এলিজিবিলিটি প্রশংসা পাওয়ার, তা জানিনা! ) ওমা, আমার এমন সুন্দর স্বপ্নের দিনগুলিতে হঠাৎ পিন মেরে ফুস করে সব হাওয়া বের করে আমার স্যার বললেন, " শোনো, তোমায় অমুকের সাথে কথা বলতে হবে। আন্না ইউনিভার্সিটিতে, ও প্রজেক্ট করাবে। এই নাও ইমেল আই ডি। যোগাযোগ করে নিয়ো।" হায় আমার পোড়া কপাল রে, এবারেও বিড়ালের ভাগ্যে শিক ছিঁড়ল না! এই প্রসঙ্গে বলি, আমি যখন কোনকিছু নিয়ে বেশ ভাবনা চিন্তা করে ফেলি, তখন কিন্তু জান প্রাণ লড়িয়ে দিতে পারি সেটা হাসিল করতে, অন্তত নিজের দিক সমস্ত চেষ্টা করি, ফলের আশা করেই। সেই শুরু হল আমার প্রজেক্ট আই আই টি। তড়িঘড়ি ডিপার্টমেন্টের ওয়েবসাইট খুলে দুমদাম গোটা দশ পনেরো জনকে মেল করে দিলাম। চার পাঁচজন উত্তর দিল না, কয়েকজন লিখে দিল, না, জায়গা নেই। কেবলমাত্র একজন বাঙালি ভদ্রলোক, অত্যন্ত সদয় হয়ে বললেন, আরে এসো এসো। অবশ্যই এসো, সুস্বাগতম, ইত্যাদি ইত্যাদি। আহা সেদিন সে আমার প্রচণ্ড মন ভালো, বেশ একটা প্রজেক্ট/মিশন সফল হল বলে কথা। আহা, কি না কি বিশ্বজয় করে ফেলেছি, ইত্যাদি ইত্যাদি। রাজাবাজারে গিয়ে স্যারদের বলে দিলাম, ওইসব আন্না বান্না ছাড়ুন, আমি যাব আই আই টি। ওনারাও দেখলাম হাসিমুখেই পারমিশন দিলেন। সেই শুরু হল আমার দিন গোনা।
তখন একেবারে ফেসবুক খুলে ফ্রেন্ডলিস্ট স্ক্যান করতে শুরু করলাম, কে কে আছে চেনা পরিচিতদের মধ্যে, যারা চেন্নাইতে থাকে বা থাকত। আমার এক বন্ধু, রোহিত, ও বেশ কিছু মাস (নাকি বছর?) চেন্নাইতে থেকেছে, চাকরিসূত্রে। সেই সময়ে ওই হয়ে দাঁড়ালো আমার মুশকিল আসান। ওর সূত্রেই আলাপ হল অর্কদীপ আর রিম্পার সাথে। ওরা দুজনেই তখন আই আই টিতেই MS পড়ছে। ব্যস, সেই থেকে যে ওদেরকে জ্বালাতন করা শুরু করলাম, এখনো ছাড়িনি (ওরা দুজনে আমার চেন্নাইয়ের লোকাল গার্জেন)। তখন প্রথম চিন্তা, কোথায় থাকব। ক্যাম্পাসে হোস্টেল পাবো কি না, পেলেও কিভাবে কোথায় কার কাছে এপ্লাই করব। কিছুদিন খোঁজাখুঁজির পরে জানা গেল যে ক্যাম্পাসে আপাতত হোস্টেলের আকাল চলছে, অগত্যা আমায় নিজের ব্যবস্থা অন্যত্রই করতে হবে। অন্তত শুরুতে বাইরেই থাকতে হবে, তারপরে না হয় ওখানে পৌঁছে কাকুতি মিনতি করে যদি কিছু ব্যবস্থা হয়। শুরু হল ইন্টারনেটের মাধ্যমে বাসস্থান খোঁজার পর্ব। কিছু জায়গা সিলেক্ট করি তো খরচে পোষায় না, কিছু খরচে আসে তো দূরত্বে বাদ পড়ে যায়। অনেক অনেক চেষ্টা চরিত্র করে তারপরে একদিন একটি অনলাইন বিজ্ঞাপনের সাইট থেকে খবর পেলাম একটি পিজির। প্রথমে মেল চালাচালি করলাম। জানলাম এক বয়স্কা ভদ্রমহিলার বাড়িতে থাকার ব্যবস্থা, পাশেই ওনার মেয়ে তার ফ্যামিলি নিয়ে থাকেন। মেয়েই মেলে যোগাযোগ করছিলেন। কথাবার্তা বলে টলে প্রায় ফাইনাল করে রাখলাম।
এত কিছু হয়ে গেল, কিন্তু মাস তখনো মধ্য মার্চ। আমার আসলে সবেতেই একটু বেশী হুড়োহুড়ি তাড়াতাড়ি। একদিন (১৩ই মার্চ সম্ভবত) রাত্রে দিব্যি শুয়ে পড়েছি, এমন সময়ে ফোনে মেসেজ এলো বান্ধবীর, "গেটের রেজাল্ট লিক হয়েছে। খড়গপুরের পেজে দেখা যাচ্ছে, তোমার কত র্যাঙ্ক এলো, দেখো। আমার অমুক।" আগেই বলেছি, গেট পরীক্ষা নিয়ে আর উৎসাহ ছিল না। কিন্তু ওই যে,রেজাল্ট, কিরকম পেটের মধ্যে গুঁড়িগুঁড়ি শুরু হল। জানি যাই হোক না কেন, ওই রেজাল্টে কিচ্ছু যায় আসবে না আমার, তবুও, নিজেকে সামলাতে পারলাম না। আধ ঘণ্টা ধরে কাল সকালে দেখবো, এখন দেখে কি করব ভেবে ভেবেও সেই উঠে ডেস্কটপটা অন করলাম। মেল থেকে আই ডি পাসওয়ার্ড বের করে লগ ইন করলাম সাইটে। ওই মিনিট খানেক যা সময় লাগল রেজাল্ট বেরোনোর, মনে হচ্ছিল যেন, এখনো সময় আছে, পালিয়ে যাই, দেখবো না। ডিসিশন নিতে আমি খুবই অপারগ, তাই যতক্ষণে ঠিক করলাম সিস্টেম ষাট ডাউন করব, ততক্ষণে স্ক্রিনে জ্বলজ্বল করে ভেসে উঠল আমার রোল নম্বর এবং একটি র্যাঙ্ক, এমন র্যাঙ্ক, যা আমি স্বপ্নেও ভাবিনি পেতে পারি। প্রথম রিএকশন কি ছিল জানেন? এক ছুট্টে এসে মায়ের ঘুম ভাঙিয়ে সেটা জানানো, আর তারপরে যেই কথাটা বলেছিলাম আমি, আজও মনে পড়লে কেমন একটা মনে হয় যে Man proposes, God disposes বাগধারাটি সত্য! মা কে সেদিন বেলছিলাম, " মা শোনো, ভালো র্যাঙ্ক এসছে। কিন্তু প্লীজ, আমি PhD করব না। আমায় দয়া করে বলবে না কোথাও এপ্লাই করতে। " এই কথাকটি বলার পিছনে একটা বিরাট চিন্তাভাবনা ছিল। তখন ভাবতাম যে কলকাতায় থেকে PhD করতে গেলে বাবা মা আত্মীয় স্বজনরা ধরে বেঁধে কিছু বছরের মধ্যেই বিয়ে দিয়ে দেবে, বরং ব্যাঙ্গালোর গেলে তখন হাতের নাগালের মধ্যে থাকব না, আরামে থাকব। পরেরদিন সকালে রফা হল বাবা মায়ের সাথে। যেহেতু মাদ্রাজে যাচ্ছিই সামার প্রোজেক্টে, অন্তত IIT Madrasএ এপ্লাইটা করি। আমার তো নিজের ওপর ও নিজের কর্মক্ষমতার ওপর ফুলপ্রুফ ভরসা, জানি এপ্লাই করলেও চান্স পাবোই না। তাই কোন বাড়তি কথা খরচা না করে দিলাম এপ্লিকেশন ফর্ম ভরে। ২০শে মে পরীক্ষা (যেটা শিয়োর ছিলাম ক্লিয়ার করব না), আমার ট্রেনের টিকিট কাটা ছিল ১৩ই মে, মাদ্রাজ মেলের। এক ঢিলে দুই পাখি মারা হয়ে যাবে ভেবে মনে মনে নিশ্চিন্তও হলাম।
এরপর ব্যস্ত হয়ে গেলাম কোর্সের পরীক্ষা নিয়ে। কখন যে মে মাস এসে গেল, খেয়ালই করিনি প্রায়। আই আই টি আসব, তার তোড়জোড় শুরু হল জোর কদমে এপ্রিল শেষ হতেই। প্রথম কাজ যেটা করলাম, একটা ল্যাপটপ কিনলাম। তারপরে বন্ধুদের সাথে আত্মীয়স্বজনদের সাথে আহা, আগামী আড়াই মাস দেখা হবে না, ভালো থাকিস/থেকো এই করতে করতে অবশেষে ১৩ই মে রাত্রের ট্রেন ধরতে রওনা দিলাম বাবা আর আমি।
Thursday, October 26, 2017
আত্মপ্রকাশের জন্য
#নিজস্বীতে_আত্মপ্রকাশ
গুরুদেবের একটি লেখার দ্বিতীয় পর্ব আমি লিখেছিলাম, সেইটা যাতে আপনারা সকলে পড়তে পারেন, সেই জন্যই মূলত আত্মপ্রকাশে আমার আসা। আর ব্যস, তারপরে তো... এই একটা এত্ত বড় পরিবার পেলাম, সে যে কী আনন্দ আমার! নিজে ছোট যৌথ পরিবারে বড় হয়েছি, আত্মীয়স্বজন বন্ধুবান্ধব নিয়ে গল্প করে গল্প শুনে সময় কাটাতে খুব ভালো লাগে। বলা যায়, শুধু কিছু সমমনস্ক মানুষ পেয়ে গেলেই আমি যে সেই বকবক শুরু করব, যে কোন রেডিয়ো ষ্টেশনের আর জে হার মেনে যাবে! আর তাই আত্মপ্রকাশে দিনের মধ্যে অন্তত সাত আটবার ঢুঁ মারাটা আমার নৈতিক দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। সকলের লেখা পড়ি, অনেক সময় কমেন্ট করা হয়ে ওঠেনা (আমি আদপে খুবই অলস কি না, এই আলস্যের জন্যই আমি এখনো চেন্নাইতে পড়ে রইলাম। নইলে তো এতদিনে মঙ্গল গ্রহে পৌঁছে যেতাম, সলমা মাসীর মত অত এলেম নই, তাই প্লুটো অনেকটা বেশী দূর।), কিন্তু অবশ্যই পড়ি। কবিতা তেমন বুঝিনা, তবে গল্প (যে কোন সাইজেরই হোক, গোগ্রাসে গিলি। হ্যাঁ খেতে যে বড্ড ভালোবাসি, আমার সাইজ দেখেই বুঝবেন। ও সরি, কী করেই বা বুঝবেন, ছবি তুলি যখন নিঃশ্বাস চেপে ভুঁড়ি কমানোর মোটামুটি successful attempt নিয়েই ছবি তোলাই যে)
নাম মনে রাখতে পারিনা সহজে, যদি না খুব বেশিভাবে interact করি, বা সামনাসামনি আলাপ হয়, তাই হয়তো সকলের নাম নিয়ে বলতে পারছিনা। এই ইভেন্টটা খুব মনে ধরেছে, অন্তত ডিপির আড়াল থেকে বেড়িয়ে অনেকজনকে দেখবো, চিনব।
এই রে, দেখলেন তো, already বকবকের সুযোগ পেয়ে কিরকম bore করা শুরু করে দিলাম? আর তেমনি কিরকম অসংলগ্ন কথাবার্তা বলা শুরু করলাম? আসলে মাধ্যমিক থেকেই এই অবস্থা। পঃবঃমঃশিঃপঃ (আরে ধুর, ওই যে, State Board) এ পড়লে সুস্থ মানুষেরও হাল এইরকম হয়। তার ওপরে আবার শহুরে কনভেন্ট ইশকুলে পড়লে এমনিই এটা বেড়ে যায়। কুড়িয়ে বাড়িয়ে পরীক্ষায় নম্বর তুলতে গেলে এই হ্যাজানোটা পুরো রক্তে মজ্জায় ঢুকে যায়, আমিও তার কোন ব্যতিক্রম নই। সারাংশ আর ভাব সম্প্রসারণের প্রশ্নে ১০ নম্বর থাকত, কয়েকবার পাথফাইন্ডারের পরীক্ষায় সারাংশ লিখবার চেষ্টা করলাম, নিয়ম মত তো ১/৩ হওয়া উচিত লেখার মাপ, আমার হল গিয়ে ১৩ গুণ। তারপর থেকে আর কোনদিনও চেষ্টা করার দুঃসাহস দেখাইনি। এক্কেবারে পাতার পর পাতা লিখে যেতাম। এখনো সেই অভ্যেস যায়নি। প্রথম প্রথম বাংলা টাইপ করতে কষ্ট হত, অনলাইন একটি সাইট থেকে লিখতাম, তারপর লিনাক্সে অভ্র লাগালাম। আর কি! মাঝে মাঝেই আপনাদের বিরক্ত করে মারি।
এত কিছু বলার পরেও এখনো বললাম না প্রশ্নপত্রের সব উত্তর। ধুর ধুর, প্লীজ adminরা আমার নম্বর কাটবেন না। এত বছরের অভ্যেস কি না।
১। আমি আসলে দক্ষিণ কলকাতার মেয়ে। কিন্তু উত্তর খুব টানে। (জানি না কেন, জাতিস্মর নই, তাই confirm করতে পারছিনা আগে থাকতুম কি না ওই ঠনঠনিয়া চত্বরে)
২। আপাতত থাকি চেন্নাইতে। একটি জঘন্য বিষয়ে (না না বিষয়টা ভালো, আমার আজকাল একঘেয়ে লাগে) রিসার্চ করি। বছরখানেকের মধ্যে ডিগ্রী লাভ করতে চাই।
৩। বই পড়তে, গান শুনতে, খেতে, লোকজনকে ধরে জ্ঞান দিতে আমি ওস্তাদ।
৪। বেড়াতে ভালোবাসি।
৫। ছবি তুলতে ভালবাসি। প্রচুর চেষ্টা করে টাকা পয়সা জমিয়ে জন্মদিনে একটি DSLR কিনলাম, কিন্তু এখনো ৬ মাস পরেও Auto modeএ ছবি ওঠাই।
৬। অল্প বিস্তর লিখি আর রোজ গান গাই।
৭। বন্ধু পাতাতে পারি মোটামুটি।
৮। কুকুর বিড়াল দেখলেই আদেখলাপনা চাগাড় দিয়ে ওঠে।
৯। আমি খুব খুব ভীতু, রাত বিরেতে হোস্টেলের অন্ধকার করিডোরে একা বেরোতে খুব কষ্ট হয়।
থাক, দশ নম্বরটা না হয় বললাম না আর। সব বলে দিলে একেবারে তাহলে আর কি হবে??
আচ্ছা থাক, ১০ নম্বরটা বলেই দিই, অত ভাও খাবও না, সবে কেক আর মাইসোর পাক খেয়ে গুরুভোজন করলাম। খিদে নেই আপাতত।
১০। সিনেমা কেবলমাত্র শাহরুখ খানের হলে, তবেই আস্ত দেখি, তাও হলে। নইলে সব সিনেমা হয় ডাউনলোড করে (অপরাধ, আজকাল কমিয়ে ফেলেছি), Amazon Primeএ বা Youtubeএ দেখলেও গান স্কিপ করে যাই। অত ধৈর্য নেই যে, কি করব!
ব্যস, প্লীজ, অনেক লিখে ফেলেছি। আর পারছিনা। এবার বাকিদের গুলো পড়ি। আর হ্যাঁ, প্লীজ, আমায় ক্ষমা করবেন এত লম্বা essay লিখলাম বলে। মানে লেখাটা ঠিকঠাক হলে কিছু না, এটায় কোনরকম সারমর্ম নেই কি না, তাই।
আচ্ছা, টাটা।
পুনশ্চঃ ছবিটি গত শনিবার দুপুরে আমার ডিপার্টমেন্টের নীচে বাগানে pose দিয়ে তোলা। হলুদ আমার প্রিয় রঙ (হলুদ রঙের চশমার ফ্রেম অর্ডার দিলাম গতকাল), তাই সেই ছবিটিই দিলাম।
ডবল পুনশ্চঃ আত্মপ্রকাশকে জন্মদিনের অনেক অনেক শুভেচ্ছা (এত বাজে বকতে গিয়ে আসল কথাই লিখতে ভুলে গিয়েছিলাম)
ট্রিপল পুনশ্চঃ গুরুদেব মানে আপনাদের সকলের প্রিয়পাত্র, আপনাদের হিরো, শ্রীযুক্ত অর্ণব ভৌমিক (যার পপ্যুলারিটি অর্ণব গোস্বামীর চেয়ে কোন অংশে কম না। পুনশ্চ ৩ক।দুজনেই খুব প্রিয় আমার :) )
গুরুদেবের একটি লেখার দ্বিতীয় পর্ব আমি লিখেছিলাম, সেইটা যাতে আপনারা সকলে পড়তে পারেন, সেই জন্যই মূলত আত্মপ্রকাশে আমার আসা। আর ব্যস, তারপরে তো... এই একটা এত্ত বড় পরিবার পেলাম, সে যে কী আনন্দ আমার! নিজে ছোট যৌথ পরিবারে বড় হয়েছি, আত্মীয়স্বজন বন্ধুবান্ধব নিয়ে গল্প করে গল্প শুনে সময় কাটাতে খুব ভালো লাগে। বলা যায়, শুধু কিছু সমমনস্ক মানুষ পেয়ে গেলেই আমি যে সেই বকবক শুরু করব, যে কোন রেডিয়ো ষ্টেশনের আর জে হার মেনে যাবে! আর তাই আত্মপ্রকাশে দিনের মধ্যে অন্তত সাত আটবার ঢুঁ মারাটা আমার নৈতিক দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। সকলের লেখা পড়ি, অনেক সময় কমেন্ট করা হয়ে ওঠেনা (আমি আদপে খুবই অলস কি না, এই আলস্যের জন্যই আমি এখনো চেন্নাইতে পড়ে রইলাম। নইলে তো এতদিনে মঙ্গল গ্রহে পৌঁছে যেতাম, সলমা মাসীর মত অত এলেম নই, তাই প্লুটো অনেকটা বেশী দূর।), কিন্তু অবশ্যই পড়ি। কবিতা তেমন বুঝিনা, তবে গল্প (যে কোন সাইজেরই হোক, গোগ্রাসে গিলি। হ্যাঁ খেতে যে বড্ড ভালোবাসি, আমার সাইজ দেখেই বুঝবেন। ও সরি, কী করেই বা বুঝবেন, ছবি তুলি যখন নিঃশ্বাস চেপে ভুঁড়ি কমানোর মোটামুটি successful attempt নিয়েই ছবি তোলাই যে)
নাম মনে রাখতে পারিনা সহজে, যদি না খুব বেশিভাবে interact করি, বা সামনাসামনি আলাপ হয়, তাই হয়তো সকলের নাম নিয়ে বলতে পারছিনা। এই ইভেন্টটা খুব মনে ধরেছে, অন্তত ডিপির আড়াল থেকে বেড়িয়ে অনেকজনকে দেখবো, চিনব।
এই রে, দেখলেন তো, already বকবকের সুযোগ পেয়ে কিরকম bore করা শুরু করে দিলাম? আর তেমনি কিরকম অসংলগ্ন কথাবার্তা বলা শুরু করলাম? আসলে মাধ্যমিক থেকেই এই অবস্থা। পঃবঃমঃশিঃপঃ (আরে ধুর, ওই যে, State Board) এ পড়লে সুস্থ মানুষেরও হাল এইরকম হয়। তার ওপরে আবার শহুরে কনভেন্ট ইশকুলে পড়লে এমনিই এটা বেড়ে যায়। কুড়িয়ে বাড়িয়ে পরীক্ষায় নম্বর তুলতে গেলে এই হ্যাজানোটা পুরো রক্তে মজ্জায় ঢুকে যায়, আমিও তার কোন ব্যতিক্রম নই। সারাংশ আর ভাব সম্প্রসারণের প্রশ্নে ১০ নম্বর থাকত, কয়েকবার পাথফাইন্ডারের পরীক্ষায় সারাংশ লিখবার চেষ্টা করলাম, নিয়ম মত তো ১/৩ হওয়া উচিত লেখার মাপ, আমার হল গিয়ে ১৩ গুণ। তারপর থেকে আর কোনদিনও চেষ্টা করার দুঃসাহস দেখাইনি। এক্কেবারে পাতার পর পাতা লিখে যেতাম। এখনো সেই অভ্যেস যায়নি। প্রথম প্রথম বাংলা টাইপ করতে কষ্ট হত, অনলাইন একটি সাইট থেকে লিখতাম, তারপর লিনাক্সে অভ্র লাগালাম। আর কি! মাঝে মাঝেই আপনাদের বিরক্ত করে মারি।
এত কিছু বলার পরেও এখনো বললাম না প্রশ্নপত্রের সব উত্তর। ধুর ধুর, প্লীজ adminরা আমার নম্বর কাটবেন না। এত বছরের অভ্যেস কি না।
১। আমি আসলে দক্ষিণ কলকাতার মেয়ে। কিন্তু উত্তর খুব টানে। (জানি না কেন, জাতিস্মর নই, তাই confirm করতে পারছিনা আগে থাকতুম কি না ওই ঠনঠনিয়া চত্বরে)
২। আপাতত থাকি চেন্নাইতে। একটি জঘন্য বিষয়ে (না না বিষয়টা ভালো, আমার আজকাল একঘেয়ে লাগে) রিসার্চ করি। বছরখানেকের মধ্যে ডিগ্রী লাভ করতে চাই।
৩। বই পড়তে, গান শুনতে, খেতে, লোকজনকে ধরে জ্ঞান দিতে আমি ওস্তাদ।
৪। বেড়াতে ভালোবাসি।
৫। ছবি তুলতে ভালবাসি। প্রচুর চেষ্টা করে টাকা পয়সা জমিয়ে জন্মদিনে একটি DSLR কিনলাম, কিন্তু এখনো ৬ মাস পরেও Auto modeএ ছবি ওঠাই।
৬। অল্প বিস্তর লিখি আর রোজ গান গাই।
৭। বন্ধু পাতাতে পারি মোটামুটি।
৮। কুকুর বিড়াল দেখলেই আদেখলাপনা চাগাড় দিয়ে ওঠে।
৯। আমি খুব খুব ভীতু, রাত বিরেতে হোস্টেলের অন্ধকার করিডোরে একা বেরোতে খুব কষ্ট হয়।
থাক, দশ নম্বরটা না হয় বললাম না আর। সব বলে দিলে একেবারে তাহলে আর কি হবে??
আচ্ছা থাক, ১০ নম্বরটা বলেই দিই, অত ভাও খাবও না, সবে কেক আর মাইসোর পাক খেয়ে গুরুভোজন করলাম। খিদে নেই আপাতত।
১০। সিনেমা কেবলমাত্র শাহরুখ খানের হলে, তবেই আস্ত দেখি, তাও হলে। নইলে সব সিনেমা হয় ডাউনলোড করে (অপরাধ, আজকাল কমিয়ে ফেলেছি), Amazon Primeএ বা Youtubeএ দেখলেও গান স্কিপ করে যাই। অত ধৈর্য নেই যে, কি করব!
ব্যস, প্লীজ, অনেক লিখে ফেলেছি। আর পারছিনা। এবার বাকিদের গুলো পড়ি। আর হ্যাঁ, প্লীজ, আমায় ক্ষমা করবেন এত লম্বা essay লিখলাম বলে। মানে লেখাটা ঠিকঠাক হলে কিছু না, এটায় কোনরকম সারমর্ম নেই কি না, তাই।
আচ্ছা, টাটা।
পুনশ্চঃ ছবিটি গত শনিবার দুপুরে আমার ডিপার্টমেন্টের নীচে বাগানে pose দিয়ে তোলা। হলুদ আমার প্রিয় রঙ (হলুদ রঙের চশমার ফ্রেম অর্ডার দিলাম গতকাল), তাই সেই ছবিটিই দিলাম।
ডবল পুনশ্চঃ আত্মপ্রকাশকে জন্মদিনের অনেক অনেক শুভেচ্ছা (এত বাজে বকতে গিয়ে আসল কথাই লিখতে ভুলে গিয়েছিলাম)
ট্রিপল পুনশ্চঃ গুরুদেব মানে আপনাদের সকলের প্রিয়পাত্র, আপনাদের হিরো, শ্রীযুক্ত অর্ণব ভৌমিক (যার পপ্যুলারিটি অর্ণব গোস্বামীর চেয়ে কোন অংশে কম না। পুনশ্চ ৩ক।দুজনেই খুব প্রিয় আমার :) )
Wednesday, October 18, 2017
ছকভাঙা
#ইভেন্ট
#ছকভাঙা
ইভেন্টের নামই যখন ছকভাঙা, তখন তো নিজের দিক থেকেও কিছু নিয়ম ভাঙ্গতেই হয়। তাই রবিবারের আগে লেখা দেব না ভেবেও উৎসবের মরসুম (আর তার চেয়েও বেশী গুরুত্বপূর্ণ কারণ, চেন্নাইতে আজ দীপাবলির ছুটি হওয়ায় একটু সময় পেলাম লেখার) বলে আজকের এই ছোট্ট নিবেদন। ছক ভাঙল কি না, জানিনা। চেষ্টা করলাম বাঁধা ধরা নিয়ম মাফিক গড়পড়তা জীবন থেকে একটু বেরিয়ে আসতে। মতামত জানাবেন।
১।
" মা মা, আমার জন্য কী কী বাজি কিনে আনবে?" সাত বছরের ছোট্ট মেয়ের প্রশ্নে এক লহমায় তনুশ্রী পৌঁছে যায় নিজের ছোটবেলায়। তখন কালী পুজো মানেই চতুর্দশীর দিন থেকেই শুরু হয়ে যেত জমিয়ে ফুলঝুরি, রঙ মশাল, সাপবাজি, ছুঁচোবাজি, চকোলেট বোমা, কালিপটকা, চরকি, দোদোমা, হাউয়ের তাণ্ডব। আশেপাশের বাড়ির বন্ধুদের মধ্যে চলত প্রতিযোগিতা, কার বাজি কতক্ষণ ফাটে, কত জোরে আওয়াজ হয়। তারপর একটা বছর, ঠাকুরদা বাজির শব্দে আর ধোঁওয়ায় প্রচণ্ড অসুস্থ হলেন, প্রায় যমে মানুষে টানাটানি। কী সাংঘাতিক দিন গিয়েছে তখন, আদরের নাতনি তনুশ্রীর এখনো ভাবলেই ভয়ে শিউরে ওঠে।
" সোনা আমরা কোন বাজি ফাটাবো না। দীপাবলি তো আলোর উৎসব, আমরা খুব করে আলো দিয়ে সাজাবো বাড়ি। ঠিক আছে? আমি কিছু প্রদীপ কিনে আনব, তারপরে তুই আর আমি মিলে সুন্দর করে রঙ করে ডেকোরেট করব। ওকে? "
" মা, রঙ্গোলী করব না? মীনাক্ষীদের বাড়িতে তো হয়, সুমথি আনটি কী সুন্দর করে আঁকে দিওয়ালীর আগে। "
" বেশ, তাও করব। হ্যাপি? "
" ভেরি! "
২।
" কবে থেকে তোকে বলছি যে ঘর পরিষ্কার করবি। এখনো করিসনি কেন? "
" উফ মা। করলাম তো। কাল সারাদিন ধরে করেছি। এর চেয়ে বেশী আর পারব না। দিব্যি পরিষ্কার আছে। "
" মোটেই না। ড্রেসিং টেবিলের অবস্থাটা দেখ। গুচ্ছের শিশি বোতল। "
" মা ওইগুলো সব দরকারি। ফেলা যাবে না। "
" ওই ফেয়ারনেস ক্রিমের টিউবগুলো ফেলে দে। কালীপুজোর সাফ সাফাই তবেই তো কমপ্লিট হবে। "
নিজের চেয়েও বেশী আধুনিকা মায়ের দিকে অপলকে এক রাশ মুগ্ধতা নিয়ে তাকিয়ে থাকে রিনি।
৩।
সকাল থেকে একের পর এক লাড্ডু বানিয়েই চলেছে শুক্লা, যদিও আজ ওর সুইট স্টোর বন্ধ।
ওর বর, অভিজিৎ তো অবাক, " কী ব্যাপার, আজও তুমি মিষ্টি বানিয়ে চলেছ? আজ না তোমার স্টোর বন্ধ? "
" হ্যাঁ স্টোর বন্ধ। কিন্তু এগুলো কিছু ডেলিভারি করার রয়েছে। অনেক পুরনো অর্ডার। "
" কোথায়? কার অর্ডার? "
" সারা বছর আমাদের ডেলিভারি করে যারা, তাদের বাড়ি বাড়ি আজ আমি আর তুমি গিয়ে ডেলিভারি করব এইগুলি। সারা বছর এত খাটে, উৎসবের দিনে ওদেরও তো কিছু প্রাপ্য, বলো? "
ঠিক সেই মুহূর্তে নিজের স্ত্রীর প্রতি অভিজিতের জন্মায় এক নতুন শ্রদ্ধা।
সকলকে জানাই শুভ দীপাবলি।
#ছকভাঙা
ইভেন্টের নামই যখন ছকভাঙা, তখন তো নিজের দিক থেকেও কিছু নিয়ম ভাঙ্গতেই হয়। তাই রবিবারের আগে লেখা দেব না ভেবেও উৎসবের মরসুম (আর তার চেয়েও বেশী গুরুত্বপূর্ণ কারণ, চেন্নাইতে আজ দীপাবলির ছুটি হওয়ায় একটু সময় পেলাম লেখার) বলে আজকের এই ছোট্ট নিবেদন। ছক ভাঙল কি না, জানিনা। চেষ্টা করলাম বাঁধা ধরা নিয়ম মাফিক গড়পড়তা জীবন থেকে একটু বেরিয়ে আসতে। মতামত জানাবেন।
১।
" মা মা, আমার জন্য কী কী বাজি কিনে আনবে?" সাত বছরের ছোট্ট মেয়ের প্রশ্নে এক লহমায় তনুশ্রী পৌঁছে যায় নিজের ছোটবেলায়। তখন কালী পুজো মানেই চতুর্দশীর দিন থেকেই শুরু হয়ে যেত জমিয়ে ফুলঝুরি, রঙ মশাল, সাপবাজি, ছুঁচোবাজি, চকোলেট বোমা, কালিপটকা, চরকি, দোদোমা, হাউয়ের তাণ্ডব। আশেপাশের বাড়ির বন্ধুদের মধ্যে চলত প্রতিযোগিতা, কার বাজি কতক্ষণ ফাটে, কত জোরে আওয়াজ হয়। তারপর একটা বছর, ঠাকুরদা বাজির শব্দে আর ধোঁওয়ায় প্রচণ্ড অসুস্থ হলেন, প্রায় যমে মানুষে টানাটানি। কী সাংঘাতিক দিন গিয়েছে তখন, আদরের নাতনি তনুশ্রীর এখনো ভাবলেই ভয়ে শিউরে ওঠে।
" সোনা আমরা কোন বাজি ফাটাবো না। দীপাবলি তো আলোর উৎসব, আমরা খুব করে আলো দিয়ে সাজাবো বাড়ি। ঠিক আছে? আমি কিছু প্রদীপ কিনে আনব, তারপরে তুই আর আমি মিলে সুন্দর করে রঙ করে ডেকোরেট করব। ওকে? "
" মা, রঙ্গোলী করব না? মীনাক্ষীদের বাড়িতে তো হয়, সুমথি আনটি কী সুন্দর করে আঁকে দিওয়ালীর আগে। "
" বেশ, তাও করব। হ্যাপি? "
" ভেরি! "
২।
" কবে থেকে তোকে বলছি যে ঘর পরিষ্কার করবি। এখনো করিসনি কেন? "
" উফ মা। করলাম তো। কাল সারাদিন ধরে করেছি। এর চেয়ে বেশী আর পারব না। দিব্যি পরিষ্কার আছে। "
" মোটেই না। ড্রেসিং টেবিলের অবস্থাটা দেখ। গুচ্ছের শিশি বোতল। "
" মা ওইগুলো সব দরকারি। ফেলা যাবে না। "
" ওই ফেয়ারনেস ক্রিমের টিউবগুলো ফেলে দে। কালীপুজোর সাফ সাফাই তবেই তো কমপ্লিট হবে। "
নিজের চেয়েও বেশী আধুনিকা মায়ের দিকে অপলকে এক রাশ মুগ্ধতা নিয়ে তাকিয়ে থাকে রিনি।
৩।
সকাল থেকে একের পর এক লাড্ডু বানিয়েই চলেছে শুক্লা, যদিও আজ ওর সুইট স্টোর বন্ধ।
ওর বর, অভিজিৎ তো অবাক, " কী ব্যাপার, আজও তুমি মিষ্টি বানিয়ে চলেছ? আজ না তোমার স্টোর বন্ধ? "
" হ্যাঁ স্টোর বন্ধ। কিন্তু এগুলো কিছু ডেলিভারি করার রয়েছে। অনেক পুরনো অর্ডার। "
" কোথায়? কার অর্ডার? "
" সারা বছর আমাদের ডেলিভারি করে যারা, তাদের বাড়ি বাড়ি আজ আমি আর তুমি গিয়ে ডেলিভারি করব এইগুলি। সারা বছর এত খাটে, উৎসবের দিনে ওদেরও তো কিছু প্রাপ্য, বলো? "
ঠিক সেই মুহূর্তে নিজের স্ত্রীর প্রতি অভিজিতের জন্মায় এক নতুন শ্রদ্ধা।
সকলকে জানাই শুভ দীপাবলি।
Monday, October 16, 2017
একটি সাংসারিক গপ্পো (কহানী ঘর ঘর কি )
সকাল ছটার এলারমে ঠিক রোজের মতই আজও ঘুম ভেঙ্গে গেল বিদিশার। টের পেল, বাইরে তখনো বৃষ্টি পড়ছে। সারা রাত ধরে গ্যারেজের টিনের চালে সমানে টিপটিপ টাপটুপ করে পড়েই চলেছে। ছোটবেলায় এরকম সারাদিন বৃষ্টি পড়লেই সে কী আনন্দ বিদিশার, "মা আজ কিন্তু রেইনি ডে, আজ স্কুল যাব না।" সারাদিন তারপরে মা মেয়েতে কত গান, কত গল্প কত বইয়ের রাজ্যে নিজেদের হারিয়ে ফেলত। এখনো সখ হয় তো আগের মতোই, শুধু পূর্ণ হয়না। পাঁচটা মিনিট বাড়তি শোয়ার অবকাশ নেই, ঘড়ির কাঁটা মিলিয়ে কাজ করে যেতে হয়। পাশে শোয়া অর্ঘ্যর যাতে এতটুকু ব্যাঘাত না ঘটে ঘুমের, আস্তে আস্তে পা টিপে টিপে উঠল বিদিশা। হাত মুখ ধুয়ে সঙ্গে সঙ্গে রান্নাঘরের দিকে গেল, শুরু হবে আবার একটা নতুন দিনের যুদ্ধ। সারা রাত যা বৃষ্টি হয়েছে, কাজের লোকেরা কেউ আসবে বলে মনে হচ্ছেনা, বাড়তি কাজ হল। গ্যাসে চায়ের জলটা বসিয়ে বিদিশা ফ্রিজ থেকে সারাদিনের রান্নার জন্য সব্জি বের করতে লাগল। শ্বশুরমশাই আর অর্ঘ্যর লাঞ্চ, টুকাইয়ের টিফিন, ননদ মিন্তির ব্রাঞ্চ, টুকাইকে স্কুলের জন্য তৈরি করা...সব করতে করতে কখন যে সারাটা সকাল কেটে যায়, খেয়ালই পড়েনা। আগে বাপের বাড়ি থাকতে দুটো খবরের কাগজ না পড়ে দিন শুরু হত না যে মেয়ের, সে এখন খবরের কাগজ দেখে বোধহয় সংবাদ বাসি হয়ে যাওয়ার পর।
ট্রে করে চায়ের কাপ নিয়ে শ্বশুর শাশুড়ির ঘরে এলো বিদিশা। বউমার হাতের চা না খেলে ওনাদের দিন শুরু হয় না। টুকাই তার দাদু ঠাকুমার কাছে রাত্রে থাকে, এইবারে মায়ের ডাকে রোজের মতই ঘুম থেকে ওঠা নিয়ে শুরু হল এক প্রস্থ লড়াই।
" থাক না বিদিশা, একটা দিন একটু ঘুমোক না ও।"
" না মা, আর ঘুমোলে স্কুল বাস মিস করবে। কে আবার পৌঁছোতে যাবে ওকে তখন বলুন? একেই যা বিচ্ছিরি ওয়েদার।"
" ওই জন্যই তো বলছি, ওকে আজ রেইনি ডে করে দাও না। একদিন স্কুল না গেলে কিচ্ছু হবে না।"
" হ্যাঁ বউমা, কি সুন্দর শুয়ে আছে আরাম করে। একটা তো দিন। আমরা ছোটবেলায় কত এরকম স্কুল কামাই করতাম বৃষ্টি হলেই।"
" সে তো আমিও করতাম বাপি। তবে আপনার ছেলেকে বলুন। ও রাগারাগি করবে শুনলে।"
" চিন্তা করো না বউমা, তোমার শাশুড়ি বলবে বাবুকে। কি, বলবে তো? "
" হ্যাঁ, বাবু উঠেছে? ওকে পাঠিয়ো এই ঘরে। ইন ফ্যাক্ট, আমার একটা প্রস্তাব আছে।"
" কী প্রস্তাব মা?"
" আজকে সবাই রেইনি ডে পালন করবে। কেউ কাজে বেরোবে না। স্কুল কলেজ অফিস সব ছুটি।"
" ওরে বাবা, এ তো বেশ যুগান্তকারী আদেশ মা। "
" তুমি পাগল হলে নাকি ঝুমুর? টুকাইয়ের ওপর না হয় এই ফরমান চলতে পারে, আর কেউ মানবে নাকি?"
" অবশ্যই মানবে। বাবুরটা আলাদা ব্যাপার। কোন ইম্পরট্যান্ট কেস থাকলে ওকে ছেড়ে দেব। নইলে আর কেউ না। তুমি কাল বাদে পরশু রিটায়ার করতে বসেছ, এখনো এত কী? আজ একটা সি এল নেবে। মিন্তি রোজ এত কত ক্লাস করে, আমার সব জানা আছে। আজ তাই ডুব দেবে। এই বলে দিলাম। "
" আপনার আর আজ অফিস যাওয়া হল না বাপি। দাঁড়ান। আমি আপনাদের ছেলেকে পাঠাচ্ছি এই ঘরে। আপনারা বলুন। আমি রান্নাঘরে যাই। প্রচুর কাজ। টুকু ঘুমো তুই আরো। "
নিজেদের বেডরুমে এসে অর্ঘ্যকে ঘুম থেকে তোলাটা আরেক পর্ব যেন যুদ্ধের। যেমন বাবা, তেমন ছেলে, দুজনের কেউই সকালবেলা উঠতে চায় না। প্রায় দশ মিনিট চেষ্টা করার পর যখন অর্ঘ্য চোখ খুলল, বিদিশা বলল, " শোনো, মা আজ রেইনি ডের ফরমান জানিয়েছেন। সবার ছুটি। "
" মানে? টুকাই কে রেডি করেছো?"
" আরে সেটাই তো বলছি। মা বলে দিয়েছেন আজ সবাই বাঙ্ক করবে স্কুল কলেজ অফিস। তোমায় ও ঘরে ডেকেছেন। যাও। টুকাই এখনো ঘুমোচ্ছে। "
" সে যা ইচ্ছে বলুক মা। আমার ওসব সুযোগ নেই। টুকাইয়ের স্কুলটা মিছিমিছি কামাই করালে। "
" আমায় বলছ কেন? মা বাপিকে বল! "
" হুম, যাচ্ছি। তুমি তাহলে আমার চা আর টেলিগ্রাফটা ওই ঘরে এনে দাও। "
" হ্যাঁ। আসছি। "
" কী ব্যাপার মা? আজ নাকি তুমি সবার ছুটি ডিক্লেয়ার করেছো? "
" হ্যাঁ, করেছিই তো। এরকম ভালো ওয়েদার, একটু বাড়ি বসে আরাম করতে কী হয়? "
" ওইসব আরাম ইত্যাদি তোমাদেরই হয়। আমার হবে না। আমি হসপিটালে না গেলে হবে না। "
" বেশ, তুই যাস। নেহাত পেশেন্টরা তোদের মুখ চেয়ে বসে থাকে, নইলে ছাড়তাম না তোকেও। যত তাড়াতাড়ি পারিস ফেরত আসিস। আমরা বাকিরা আজ এঞ্জয় করব। "
ইতিমধ্যে মিন্তির ঘুম ভেঙ্গেছে, বৌদির কাছে শুনেছে মায়ের এই অদ্ভুত বিধান। আজ কি না সুজিতের সাথে সিনেমা দেখতে যাবে ভেবেছিল, এমনিও ক্লাস কম আজ। মা যদি কলেজ যেতে না দেয়, তাহলে সেই প্ল্যান ক্যান্সেল। সুজিত বেশ রেগে যাবে, জানে। দেখা যাক, মা কে রাজি করানো যায় কি না। ব্রাশ করে মা বাবার ঘরে এলো মিন্তি। সেখানে ইতিমধ্যে ভাইপো টুকাই ঘুম থেকে উঠে পড়েছে। স্কুল যেতে হবে না শুনে ভারী আনন্দ তার। ঘরময় ছোটাছুটি করছে। ওরই সব চেয়ে যেন মন ভালো। বাবার মিশ্র অভিব্যক্তি, বোধহয় অফিসের শেষ কটা মাস জমিয়ে কাজ করে গল্প করে কাটাতে চান সহকর্মীদের সাথে। বৌদির অবশ্য মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে, সপ্তাহের মাঝে একটা হঠাৎ করে আসা ছুটির দিনের আগমনে খুব খুশী না, আসলে হবেই বা কী করে। সকলে বাড়ি থাকলেই তো বেচারির ওপর একটার পর একটা অর্ডার আসতে থাকে। দাদার লুচি আলুর দম চাই তো বাবার দিনের মধ্যে পনেরো বার চা। মায়ের পুজোর ঘরে হাজারটা দরকার, মিন্তির নিজেরই বা কম আবদার থাকে না কি? নেল পেন্ট লাগানো থেকে মাথায় হেনা করা, বৌদি ছাড়া কে বা করবে। এর ওপর আবার টুকাইয়ের পিছনে পিছনে সারাদিন দৌড়াদৌড়ি। আহা রে, মা যে কী করে না!
" মা, তুমি না কি কীসব মাস বাঙ্কের নিয়ম করেছো আজকের জন্য? বৌদির কাছে শুনলাম।"
" হ্যাঁ, আজ রেইনি ডে পালন হবে। তোমার বাবা ভাইপো সবাই ছুটি নিলো। তুমিও কলেজ যাবে না আজ। দাদা নেহাত রুগী দেখবে, তাই আটকাতে পারলাম না। "
" কিন্তু মা, আমার যে ক্লাস আছে কয়েকটা আজ। খুব ইম্পরট্যান্ট টপিকস চলছে। "
" কী যেমন? জুড়য়া ২ নাকি গোলমাল? "
" ধ্যাত, যত বাজে কথা। "
" আহা, আমি কি ঘাসে মুখ দিয়ে চলি না কি?"
" আরে না, আজ স্ট্যাট মেকের কয়েকটা ইম্পরট্যান্ট লেকচার আছে। মিস করা যাবে না। প্লীজ বোঝো। "
" শোন, বই খুলে পড়ে নিবি নিজে। না বুঝলে ক্লাসমেটদের থেকে কাল বুঝে নিস। আজ ছুটি, বলে দিয়েছি, ব্যস। এর আর অন্যথা শুনব না। "
" মা তুমি না! আরে আমরা বাড়িতে থাকলে বৌদির ওপর এক্সট্রা কাজের হ্যাপা হয়। কেন বেচারীকে প্রেশার দিচ্ছ? "
" এই না না ননদিনী, আমার কোন অসুবিধেই হবে না। থাকো না বাড়ি। বাপি আর টুকাই আছে। তুমিও থাকো। ভালো হবে কিন্তু। তোমার দাদাকেও বলো যত তাড়াতাড়ি পারে, ম্যানেজ করে চলে আসতে। সবাই মিলে বেশএকটা ছুটি কাটানো যাবে। "
" এই মিন্তি, তখন থেকে পটর পটর করে চলেছিস। চুপ কর। আমার একটা প্ল্যান আছে। বলছি শোন। আগে বোস এখানে। বাবু তুই যাবি না এক্ষুনি, আগে আমার কথা শুনে যা। বিদিশা তুমিও বসো। "
" মা অনেক কাজ বাকি। ওর টিফিন বানাতে হবে। "
" তুমি আগে বসো। শাশুড়ির মুখে মুখে আবার কথা, ভারী পাজি বৌ তো! "
মিন্তির ফিচকে হাসি দেখে শাশুড়ি একবার কড়া নজর দিলেন, তারপরে আবার শুরু করলেন বলা। " প্রতিদিন আমাদের বিদিশা তো খেটে খেটে একসা হয়ে যায়। মেয়েটার তো কোন ছুটিই হয় না। আজ আমরা সব্বাই মিলে ওকে ছুটি দেব। "
" হয়েছে! দেখেছো বৌমা? তোমায় ছুটি করে দেবে তোমার শাশুড়ি। কাল সিরিয়ালের সময়ে বিরক্ত করেছো, এই তার পানিশমেন্ট। "
" থামবে? আমায় কথা শেষ করতে দাও।" এই বাড়িতে ঝুমুর মুখোপাধ্যায়ের কথার ওপর এখনো অবধি কেউ কথা বলতে পারে না, সে তার স্বামী, এত বড় পোস্টের বি সি এস অফিসারই হোক, কি ছেলে যে কিনা মস্ত বড় ডাক্তার। তাই ঝুমুর দেবী নিজের মত করে আবার বলা শুরু করলেন।
" আজ আমি আর মিন্তি মিলে রান্নাবান্না করব। বাবু তুই কখন আসতে পারবি বল? "
" আমার যদি হঠাৎ করে এমারজেন্সি কোন কেস না আসে, তাহলে দুটোর মধ্যে ম্যানেজ হবে মনে হয়। '
" বেশ, তাই আসবি। আসার পথে কিছু জিনিস বলে দেবো, নিয়ে আসবি।"
"কী?"
" কিছু পছন্দের খাবার আমাদের বিদিশা রাণীর জন্য। "
" আচ্ছা। তা আজ কি বৌমা ষষ্ঠী না কি?"
" একটা মার খাবি। ৩৬৫ দিন যখন ও সবার জন্য এত করে, তখন কেউ জিজ্ঞেস করিস যে আজ কী উপলক্ষ্য? "
ডঃ অর্ঘ্য মুখোপাধ্যায়ের মাথা হেঁট হয়ে যায় মুহূর্তের মধ্যে। বিদিশা বেশ অপ্রস্তুত হয়ে বলে ওঠে, " আহা মা, ও তো আমি করি সংসারকে ভালোবেসে। এসব কথা উঠছে কেন। থাক না। "
" না থাকবে না বিদিশা। সবার চেতনা হওয়াটা দরকার। তুমি না থাকলে দেখতাম সবাই কে কী করে নিজেদের বাইরের জগতটা সামাল দিত। "
" ঠিকই বলেছ গিন্নি। চলো আজ আমরা মেয়েটাকে সেলিব্রেট করি। "
খেলতে খেলতে কানে হঠাৎ টুকাইয়ের কানে ঢুকল " সেলিব্রেট" শব্দটি, সঙ্গে সঙ্গে ও জিজ্ঞেস করে উঠল, " আজ কি মাম্মামের জন্মদিন ঠামি? আজ কিসের সেলিব্রেশন? "
" আজ আমরা তোমার মাম্মাম কে ভালোবাসি বলে সারাদিন মাম্মামকে সেলিব্রেট করব। ওকে? "
" ওকে!"
" শোন, তুমি বসে থেকো না তো ঠায়। যাও ছাতা মাথায় দিয়ে বাজারে যাও। আমি কিছু ফর্দ করে দিচ্ছি। নিয়ে এসো। "
" এই বৃষ্টিতে দোকান বাজার বসবে না মা। আজকের দিনটা থাক না। যা যেমন আছে, সেই দিয়ে করে ম্যানেজ করে নিই। এসব সেলিব্রেশনের দরকার নেই কিন্তু কোন।"
" খুব আছে। তুমি চুপ করে বসো তো। তোমায় যদি আজ কাজ করতে দেখি একটুও তো দেখো কী করি আমি। "
" হ্যাঁ বাবা, মা কে রাগিয়ো না। " ফুট কাটল মিন্তি।
" স্পেন্সারস, মোর সব খোলা। আমি যেমন লিস্ট করে দিচ্ছি, তেমন আনো জিনিসপত্র। আমি আজ রান্না করব। আর হ্যাঁ, বিশুর দোকান থেকে জিলিপি আর কচুরি এনো, ওটাই ব্রেকফাস্ট। তাড়াতাড়ি এস, বাবুকে বেরোতে হবে খেয়ে।"
" এই দাদা, জলদি আসবি। একসাথে খাবো। তারপরে সিনেমা দেখবো। নেটফ্লিক্সে ভালো কিছু সিনেমা এসছে রে। "
" ঠিক আছে রে, চেষ্টা করছি যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আসার। "
সেদিন সকালের ওই হেভি ব্রেকফাস্টের পর অর্ঘ্য হাসপাতালে চলে যাওয়ার পর বাকি সবাই মিলে শুরু করল কত গল্প আর গান। অনেক দিন বাদে গলা ছেড়ে গান গাইলও বিদিশা, সংসারের ঠেলায় তো গানের পাট এতদিন উঠেই গিয়েছিল। মিন্তি আবার ফেসবুক লাইভও করল ওদের গানের আসর। সেখানে কত লাইক আর কমেন্ট। বিদিশার বোন অস্ট্রেলিয়া থেকে দেখে সঙ্গে সঙ্গে ফোন করেও ফেলল, " দিদি তোকে আজ কী খুশী দেখাচ্ছে রে। দারুণ। চালিয়ে যা। আমি মা বাবা কে রাত্রে বাড়ি ফিরে দেখাবও ভিডিয়ো।"
" রাত্রে কেন রে মলি? আমি এক্ষুনি বেয়াই কে স্কাইপে ডাকছি। ওনারাও শুনুন নিজেদের মেয়েকে। "
দুপুরবেলা অর্ঘ্য এলো আরসালান থেকে বিরিয়ানি আর মঞ্জিনিস থেকে বিদিশার পছন্দের ব্ল্যাক ফরেস্ট কেক নিয়ে। ইতিমধ্যে শাশুড়ি মা বানিয়ে ফেলেছিলেন মটন চাপ ফিস ফ্রাই আর পেঁপের চাটনি। আহা, কতদিন পরে এমন সুন্দর খাওয়াদাওয়া করল বিদিশা, এমন আরামে। রেঁধে বেড়ে তো ওই খাওয়ায় সকলকে, আজ এতদিন পর কেউ ওকেও এত যত্ন করে খাওয়াল। তারপরে সবাই মিলে একসাথে ওদের প্রিয় সিনেমা দেখল। বিকেলের দিকে বৃষ্টিটা একটু ধরতে হই হই করে ওরা বেরোল কাছের শপিং মলে। চলল জমিয়ে কেনাকাটা, প্রত্যেকের জন্য। তারপরে রেস্টুরেন্টে খেয়ে রাত্রে যখন ওরা ছয়জন ফিরল, প্রত্যেকেই ক্লান্ত। তবে এ ক্লান্তি মধুর, এ আনন্দের, সারাদিন একে ওপরের সাথে কাটানোর মজাই আলাদা। কাজের ফাঁকে কেউই তো আজকাল একে অপরকে তেমন সময়ে দিয়ে উঠতে পারে না। নিয়মের মধ্যে চলতে চলতে সবাই হাঁপিয়ে ওঠে। আজ হঠাৎ সেই বাঁধাধরা নিয়ম ভেঙ্গে কেমন আনন্দে দিন কাটল ওদের। এর জন্য ঝুমুর মুখোপাধ্যায় আর বরুণদেবের সব কৃতজ্ঞতা প্রাপ্য। রেইনি ডের মজা যে এখনো নেওয়া যায়, তারই জ্বলজ্যান্ত প্রমাণ পেল আজ মুখোপাধ্যায় বাড়ির সদস্যরা। আজ বিদিশার মুখের থেকে হাসির রেশ যেন যেতেই চাইছেনা। লেগে থাকুক এই অমলিন হাসি, চিরকাল। মাঝে মাঝেই এমন ছকে বাঁধা জীবন থেকে বেরিয়ে আনন্দের স্বাদ পাক ওরা সবাই।
ট্রে করে চায়ের কাপ নিয়ে শ্বশুর শাশুড়ির ঘরে এলো বিদিশা। বউমার হাতের চা না খেলে ওনাদের দিন শুরু হয় না। টুকাই তার দাদু ঠাকুমার কাছে রাত্রে থাকে, এইবারে মায়ের ডাকে রোজের মতই ঘুম থেকে ওঠা নিয়ে শুরু হল এক প্রস্থ লড়াই।
" থাক না বিদিশা, একটা দিন একটু ঘুমোক না ও।"
" না মা, আর ঘুমোলে স্কুল বাস মিস করবে। কে আবার পৌঁছোতে যাবে ওকে তখন বলুন? একেই যা বিচ্ছিরি ওয়েদার।"
" ওই জন্যই তো বলছি, ওকে আজ রেইনি ডে করে দাও না। একদিন স্কুল না গেলে কিচ্ছু হবে না।"
" হ্যাঁ বউমা, কি সুন্দর শুয়ে আছে আরাম করে। একটা তো দিন। আমরা ছোটবেলায় কত এরকম স্কুল কামাই করতাম বৃষ্টি হলেই।"
" সে তো আমিও করতাম বাপি। তবে আপনার ছেলেকে বলুন। ও রাগারাগি করবে শুনলে।"
" চিন্তা করো না বউমা, তোমার শাশুড়ি বলবে বাবুকে। কি, বলবে তো? "
" হ্যাঁ, বাবু উঠেছে? ওকে পাঠিয়ো এই ঘরে। ইন ফ্যাক্ট, আমার একটা প্রস্তাব আছে।"
" কী প্রস্তাব মা?"
" আজকে সবাই রেইনি ডে পালন করবে। কেউ কাজে বেরোবে না। স্কুল কলেজ অফিস সব ছুটি।"
" ওরে বাবা, এ তো বেশ যুগান্তকারী আদেশ মা। "
" তুমি পাগল হলে নাকি ঝুমুর? টুকাইয়ের ওপর না হয় এই ফরমান চলতে পারে, আর কেউ মানবে নাকি?"
" অবশ্যই মানবে। বাবুরটা আলাদা ব্যাপার। কোন ইম্পরট্যান্ট কেস থাকলে ওকে ছেড়ে দেব। নইলে আর কেউ না। তুমি কাল বাদে পরশু রিটায়ার করতে বসেছ, এখনো এত কী? আজ একটা সি এল নেবে। মিন্তি রোজ এত কত ক্লাস করে, আমার সব জানা আছে। আজ তাই ডুব দেবে। এই বলে দিলাম। "
" আপনার আর আজ অফিস যাওয়া হল না বাপি। দাঁড়ান। আমি আপনাদের ছেলেকে পাঠাচ্ছি এই ঘরে। আপনারা বলুন। আমি রান্নাঘরে যাই। প্রচুর কাজ। টুকু ঘুমো তুই আরো। "
নিজেদের বেডরুমে এসে অর্ঘ্যকে ঘুম থেকে তোলাটা আরেক পর্ব যেন যুদ্ধের। যেমন বাবা, তেমন ছেলে, দুজনের কেউই সকালবেলা উঠতে চায় না। প্রায় দশ মিনিট চেষ্টা করার পর যখন অর্ঘ্য চোখ খুলল, বিদিশা বলল, " শোনো, মা আজ রেইনি ডের ফরমান জানিয়েছেন। সবার ছুটি। "
" মানে? টুকাই কে রেডি করেছো?"
" আরে সেটাই তো বলছি। মা বলে দিয়েছেন আজ সবাই বাঙ্ক করবে স্কুল কলেজ অফিস। তোমায় ও ঘরে ডেকেছেন। যাও। টুকাই এখনো ঘুমোচ্ছে। "
" সে যা ইচ্ছে বলুক মা। আমার ওসব সুযোগ নেই। টুকাইয়ের স্কুলটা মিছিমিছি কামাই করালে। "
" আমায় বলছ কেন? মা বাপিকে বল! "
" হুম, যাচ্ছি। তুমি তাহলে আমার চা আর টেলিগ্রাফটা ওই ঘরে এনে দাও। "
" হ্যাঁ। আসছি। "
" কী ব্যাপার মা? আজ নাকি তুমি সবার ছুটি ডিক্লেয়ার করেছো? "
" হ্যাঁ, করেছিই তো। এরকম ভালো ওয়েদার, একটু বাড়ি বসে আরাম করতে কী হয়? "
" ওইসব আরাম ইত্যাদি তোমাদেরই হয়। আমার হবে না। আমি হসপিটালে না গেলে হবে না। "
" বেশ, তুই যাস। নেহাত পেশেন্টরা তোদের মুখ চেয়ে বসে থাকে, নইলে ছাড়তাম না তোকেও। যত তাড়াতাড়ি পারিস ফেরত আসিস। আমরা বাকিরা আজ এঞ্জয় করব। "
ইতিমধ্যে মিন্তির ঘুম ভেঙ্গেছে, বৌদির কাছে শুনেছে মায়ের এই অদ্ভুত বিধান। আজ কি না সুজিতের সাথে সিনেমা দেখতে যাবে ভেবেছিল, এমনিও ক্লাস কম আজ। মা যদি কলেজ যেতে না দেয়, তাহলে সেই প্ল্যান ক্যান্সেল। সুজিত বেশ রেগে যাবে, জানে। দেখা যাক, মা কে রাজি করানো যায় কি না। ব্রাশ করে মা বাবার ঘরে এলো মিন্তি। সেখানে ইতিমধ্যে ভাইপো টুকাই ঘুম থেকে উঠে পড়েছে। স্কুল যেতে হবে না শুনে ভারী আনন্দ তার। ঘরময় ছোটাছুটি করছে। ওরই সব চেয়ে যেন মন ভালো। বাবার মিশ্র অভিব্যক্তি, বোধহয় অফিসের শেষ কটা মাস জমিয়ে কাজ করে গল্প করে কাটাতে চান সহকর্মীদের সাথে। বৌদির অবশ্য মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে, সপ্তাহের মাঝে একটা হঠাৎ করে আসা ছুটির দিনের আগমনে খুব খুশী না, আসলে হবেই বা কী করে। সকলে বাড়ি থাকলেই তো বেচারির ওপর একটার পর একটা অর্ডার আসতে থাকে। দাদার লুচি আলুর দম চাই তো বাবার দিনের মধ্যে পনেরো বার চা। মায়ের পুজোর ঘরে হাজারটা দরকার, মিন্তির নিজেরই বা কম আবদার থাকে না কি? নেল পেন্ট লাগানো থেকে মাথায় হেনা করা, বৌদি ছাড়া কে বা করবে। এর ওপর আবার টুকাইয়ের পিছনে পিছনে সারাদিন দৌড়াদৌড়ি। আহা রে, মা যে কী করে না!
" মা, তুমি না কি কীসব মাস বাঙ্কের নিয়ম করেছো আজকের জন্য? বৌদির কাছে শুনলাম।"
" হ্যাঁ, আজ রেইনি ডে পালন হবে। তোমার বাবা ভাইপো সবাই ছুটি নিলো। তুমিও কলেজ যাবে না আজ। দাদা নেহাত রুগী দেখবে, তাই আটকাতে পারলাম না। "
" কিন্তু মা, আমার যে ক্লাস আছে কয়েকটা আজ। খুব ইম্পরট্যান্ট টপিকস চলছে। "
" কী যেমন? জুড়য়া ২ নাকি গোলমাল? "
" ধ্যাত, যত বাজে কথা। "
" আহা, আমি কি ঘাসে মুখ দিয়ে চলি না কি?"
" আরে না, আজ স্ট্যাট মেকের কয়েকটা ইম্পরট্যান্ট লেকচার আছে। মিস করা যাবে না। প্লীজ বোঝো। "
" শোন, বই খুলে পড়ে নিবি নিজে। না বুঝলে ক্লাসমেটদের থেকে কাল বুঝে নিস। আজ ছুটি, বলে দিয়েছি, ব্যস। এর আর অন্যথা শুনব না। "
" মা তুমি না! আরে আমরা বাড়িতে থাকলে বৌদির ওপর এক্সট্রা কাজের হ্যাপা হয়। কেন বেচারীকে প্রেশার দিচ্ছ? "
" এই না না ননদিনী, আমার কোন অসুবিধেই হবে না। থাকো না বাড়ি। বাপি আর টুকাই আছে। তুমিও থাকো। ভালো হবে কিন্তু। তোমার দাদাকেও বলো যত তাড়াতাড়ি পারে, ম্যানেজ করে চলে আসতে। সবাই মিলে বেশএকটা ছুটি কাটানো যাবে। "
" এই মিন্তি, তখন থেকে পটর পটর করে চলেছিস। চুপ কর। আমার একটা প্ল্যান আছে। বলছি শোন। আগে বোস এখানে। বাবু তুই যাবি না এক্ষুনি, আগে আমার কথা শুনে যা। বিদিশা তুমিও বসো। "
" মা অনেক কাজ বাকি। ওর টিফিন বানাতে হবে। "
" তুমি আগে বসো। শাশুড়ির মুখে মুখে আবার কথা, ভারী পাজি বৌ তো! "
মিন্তির ফিচকে হাসি দেখে শাশুড়ি একবার কড়া নজর দিলেন, তারপরে আবার শুরু করলেন বলা। " প্রতিদিন আমাদের বিদিশা তো খেটে খেটে একসা হয়ে যায়। মেয়েটার তো কোন ছুটিই হয় না। আজ আমরা সব্বাই মিলে ওকে ছুটি দেব। "
" হয়েছে! দেখেছো বৌমা? তোমায় ছুটি করে দেবে তোমার শাশুড়ি। কাল সিরিয়ালের সময়ে বিরক্ত করেছো, এই তার পানিশমেন্ট। "
" থামবে? আমায় কথা শেষ করতে দাও।" এই বাড়িতে ঝুমুর মুখোপাধ্যায়ের কথার ওপর এখনো অবধি কেউ কথা বলতে পারে না, সে তার স্বামী, এত বড় পোস্টের বি সি এস অফিসারই হোক, কি ছেলে যে কিনা মস্ত বড় ডাক্তার। তাই ঝুমুর দেবী নিজের মত করে আবার বলা শুরু করলেন।
" আজ আমি আর মিন্তি মিলে রান্নাবান্না করব। বাবু তুই কখন আসতে পারবি বল? "
" আমার যদি হঠাৎ করে এমারজেন্সি কোন কেস না আসে, তাহলে দুটোর মধ্যে ম্যানেজ হবে মনে হয়। '
" বেশ, তাই আসবি। আসার পথে কিছু জিনিস বলে দেবো, নিয়ে আসবি।"
"কী?"
" কিছু পছন্দের খাবার আমাদের বিদিশা রাণীর জন্য। "
" আচ্ছা। তা আজ কি বৌমা ষষ্ঠী না কি?"
" একটা মার খাবি। ৩৬৫ দিন যখন ও সবার জন্য এত করে, তখন কেউ জিজ্ঞেস করিস যে আজ কী উপলক্ষ্য? "
ডঃ অর্ঘ্য মুখোপাধ্যায়ের মাথা হেঁট হয়ে যায় মুহূর্তের মধ্যে। বিদিশা বেশ অপ্রস্তুত হয়ে বলে ওঠে, " আহা মা, ও তো আমি করি সংসারকে ভালোবেসে। এসব কথা উঠছে কেন। থাক না। "
" না থাকবে না বিদিশা। সবার চেতনা হওয়াটা দরকার। তুমি না থাকলে দেখতাম সবাই কে কী করে নিজেদের বাইরের জগতটা সামাল দিত। "
" ঠিকই বলেছ গিন্নি। চলো আজ আমরা মেয়েটাকে সেলিব্রেট করি। "
খেলতে খেলতে কানে হঠাৎ টুকাইয়ের কানে ঢুকল " সেলিব্রেট" শব্দটি, সঙ্গে সঙ্গে ও জিজ্ঞেস করে উঠল, " আজ কি মাম্মামের জন্মদিন ঠামি? আজ কিসের সেলিব্রেশন? "
" আজ আমরা তোমার মাম্মাম কে ভালোবাসি বলে সারাদিন মাম্মামকে সেলিব্রেট করব। ওকে? "
" ওকে!"
" শোন, তুমি বসে থেকো না তো ঠায়। যাও ছাতা মাথায় দিয়ে বাজারে যাও। আমি কিছু ফর্দ করে দিচ্ছি। নিয়ে এসো। "
" এই বৃষ্টিতে দোকান বাজার বসবে না মা। আজকের দিনটা থাক না। যা যেমন আছে, সেই দিয়ে করে ম্যানেজ করে নিই। এসব সেলিব্রেশনের দরকার নেই কিন্তু কোন।"
" খুব আছে। তুমি চুপ করে বসো তো। তোমায় যদি আজ কাজ করতে দেখি একটুও তো দেখো কী করি আমি। "
" হ্যাঁ বাবা, মা কে রাগিয়ো না। " ফুট কাটল মিন্তি।
" স্পেন্সারস, মোর সব খোলা। আমি যেমন লিস্ট করে দিচ্ছি, তেমন আনো জিনিসপত্র। আমি আজ রান্না করব। আর হ্যাঁ, বিশুর দোকান থেকে জিলিপি আর কচুরি এনো, ওটাই ব্রেকফাস্ট। তাড়াতাড়ি এস, বাবুকে বেরোতে হবে খেয়ে।"
" এই দাদা, জলদি আসবি। একসাথে খাবো। তারপরে সিনেমা দেখবো। নেটফ্লিক্সে ভালো কিছু সিনেমা এসছে রে। "
" ঠিক আছে রে, চেষ্টা করছি যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আসার। "
সেদিন সকালের ওই হেভি ব্রেকফাস্টের পর অর্ঘ্য হাসপাতালে চলে যাওয়ার পর বাকি সবাই মিলে শুরু করল কত গল্প আর গান। অনেক দিন বাদে গলা ছেড়ে গান গাইলও বিদিশা, সংসারের ঠেলায় তো গানের পাট এতদিন উঠেই গিয়েছিল। মিন্তি আবার ফেসবুক লাইভও করল ওদের গানের আসর। সেখানে কত লাইক আর কমেন্ট। বিদিশার বোন অস্ট্রেলিয়া থেকে দেখে সঙ্গে সঙ্গে ফোন করেও ফেলল, " দিদি তোকে আজ কী খুশী দেখাচ্ছে রে। দারুণ। চালিয়ে যা। আমি মা বাবা কে রাত্রে বাড়ি ফিরে দেখাবও ভিডিয়ো।"
" রাত্রে কেন রে মলি? আমি এক্ষুনি বেয়াই কে স্কাইপে ডাকছি। ওনারাও শুনুন নিজেদের মেয়েকে। "
দুপুরবেলা অর্ঘ্য এলো আরসালান থেকে বিরিয়ানি আর মঞ্জিনিস থেকে বিদিশার পছন্দের ব্ল্যাক ফরেস্ট কেক নিয়ে। ইতিমধ্যে শাশুড়ি মা বানিয়ে ফেলেছিলেন মটন চাপ ফিস ফ্রাই আর পেঁপের চাটনি। আহা, কতদিন পরে এমন সুন্দর খাওয়াদাওয়া করল বিদিশা, এমন আরামে। রেঁধে বেড়ে তো ওই খাওয়ায় সকলকে, আজ এতদিন পর কেউ ওকেও এত যত্ন করে খাওয়াল। তারপরে সবাই মিলে একসাথে ওদের প্রিয় সিনেমা দেখল। বিকেলের দিকে বৃষ্টিটা একটু ধরতে হই হই করে ওরা বেরোল কাছের শপিং মলে। চলল জমিয়ে কেনাকাটা, প্রত্যেকের জন্য। তারপরে রেস্টুরেন্টে খেয়ে রাত্রে যখন ওরা ছয়জন ফিরল, প্রত্যেকেই ক্লান্ত। তবে এ ক্লান্তি মধুর, এ আনন্দের, সারাদিন একে ওপরের সাথে কাটানোর মজাই আলাদা। কাজের ফাঁকে কেউই তো আজকাল একে অপরকে তেমন সময়ে দিয়ে উঠতে পারে না। নিয়মের মধ্যে চলতে চলতে সবাই হাঁপিয়ে ওঠে। আজ হঠাৎ সেই বাঁধাধরা নিয়ম ভেঙ্গে কেমন আনন্দে দিন কাটল ওদের। এর জন্য ঝুমুর মুখোপাধ্যায় আর বরুণদেবের সব কৃতজ্ঞতা প্রাপ্য। রেইনি ডের মজা যে এখনো নেওয়া যায়, তারই জ্বলজ্যান্ত প্রমাণ পেল আজ মুখোপাধ্যায় বাড়ির সদস্যরা। আজ বিদিশার মুখের থেকে হাসির রেশ যেন যেতেই চাইছেনা। লেগে থাকুক এই অমলিন হাসি, চিরকাল। মাঝে মাঝেই এমন ছকে বাঁধা জীবন থেকে বেরিয়ে আনন্দের স্বাদ পাক ওরা সবাই।
Saturday, October 14, 2017
আয় তবে সহচরী
"ধুর, জীবনটা বড্ড একঘেয়ে হয়ে গেল রে শৌভিক। কিছু একটা করতে হবে, সামথিং ইন্টারেস্টিং!" প্রতি রবিবারের মতই গত রবিবারের সকালটাও আমার শুরু হয়েছিল ঠিক একই ভাবে। আমি শৌভিক চট্টোপাধ্যায়, বয়স ৩০, চাকরি করি একটি মাল্টিনেশন্যাল কোম্পানিতে, বিজনেস এনালিস্ট পদে। থাকি চেন্নাইতে। সোম থেকে শুক্র নয় ঘন্টা অফিস করে কোনোমতে দিন কাটাই, তাই শনিবারটা শুধুই ঘুমিয়ে শুয়ে টিভি দেখে বই পড়ে শেষ হয়ে যায়। এই একই অবস্থা মুকুলেরও। মুকুল বসু, আমার ফ্ল্যাটমেট, আমারই বয়সী। চাকরি করে একটি মোটর কোম্পানিতে, আমারই মত দশটা সাতটা রুটিনে বিপর্যস্ত। শনিবারের দিনটা ওরও এমনভাবেই কাটে। আর তারপর রবিবার ভোর (হ্যাঁ মানে ওই ধরুন সাতটা নাগাদ সকালে) হতে ঘুম ভেঙ্গে আমার জন্য কফি আর নিজের জন্য গ্রিন টি বানিয়ে আসে আমার ঘরে। কাপটা দিতে দিতেই ঠিক এই একই হতাশাময় বাক্য বলে। সত্যি বলছি, আইডেন্টিকাল, word to word same, বিশ্বাস না হয়, আমি পরপর কিছু সপ্তাহ না হয় রেকর্ড করে শোনাবো আপনাকে। তখন বুঝবেন। একটা মানুষের যে কী করে এত কন্সিসটেন্সি থাকে জীবনে, ভাবতেই অবাক লাগে।
তা প্রতি সপ্তাহে শুনি আর ভাবি, যে হ্যাঁ, সত্যিই তো। আমার বয়সীরা এখন কেউ অনসাইটে কাজের দৌলতে কোম্পানির টাকায় ইউ এস ইউ কে ভ্রমণ করছে, কেউ বা রাজারহাটে ফ্ল্যাট কিনে এখন হয় বৌয়ের সাথে যৌথ ডিনার পার্টি হোস্ট করছে প্রতি উইকেন্ডে। সেখানে আমি রবিবার হলে কাজের কাজ বলতে আডিয়ারে গিয়ে একটু মাছের বাজার করছি আর কে সি দাসে কচুরি জিলিপি খেয়ে ব্রেকফাস্ট সারছি। সারাদিনে তারপর দুটো সিনেমা ইউটিউবে আর দু চার লাইন কাব্য লিখছি। মাঝে রান্নার মাসীর রেঁধে যাওয়া অখাদ্য কুখাদ্য ভাত ডাল সব্জি খাচ্ছি। রাত্তির হলেই সুইগি দিয়ে কিছু ভালো মন্দ হয় অর্ডার করছি, নয়তো দুজনে বাইক হাঁকিয়ে ফিনিক্স মলে গিয়ে খেয়ে আসছি। এই কী কোন জীবন হল? না, এবারে কিছু তো করতেই হবে। কতটা এক্সাইটিং হবে, জানি না। কিন্তু অন্তত স্বাদবদল তো হবেই।
" চল মুকুল, আজ কিছু অন্যরকম করব।"
" কী করবি?"
" করবি না, বল করব।"
" ফালতু হ্যাজাস না তো। ওই একই হল। তা কী করব সেটা বল।"
" বাইক বের কর। একটা জায়গায় যাব। "
" কোথায়?"
" আগে বের কর, রাস্তায় বেরিয়ে বলছি।"
কিছুদিন আগে ফেসবুকের একটি গ্রুপে একটা প্রতিষ্ঠানের খবর পেয়েছিলাম, তারা কাজ করে এইডস আক্রান্ত শিশুদের নিয়ে। মহাবালিপুরম যাওয়ার পথে মাঝে একটু বাঁক নিলে রয়েছে স্নেহাম নামের একটি আশ্রম। গুগুল ম্যাপ্সে সেই লোকেশন সেট করে আমরা দুই বন্ধু সেই রবিবার চললাম স্নেহামে। পথে একটা ডিপারট্মেন্টাল স্টোর থেকে বাচ্চাদের জন্য নিলাম অনেক চকোলেট, রঙ পেন্সিল, খাতা, পেন্সিল আর কিছু টুকটাক ছোটখাটো মুখরোচক খাবারদাবার। স্নেহামে পৌঁছলাম যখন, ঘড়ির কাঁটা তখন দশটা ছুঁই ছুঁই। বাইক পার্ক করে আমরা অফিসের ইন চার্জ, শ্রী ভেঙ্কটেসানের সাথে কথা বললাম। জানালাম যে বাচ্চাগুলোর সাথে আজকের সারাদিন কাটাতে চাই। ওদের জন্য কিছু জিনিস এনেছি, সেইগুলি দিয়ে দিলাম। ভেঙ্কটেসানের মুখের হাসি দেখে কে বলবে যে একটু আগেই তার চকচকে কৃষ্ণবর্ণ চেহারায় বিশাল মোটা একখানা গোঁফ দেখে আমরা তামিল সিনেমার ভিলেন ভেবে ভয় পাচ্ছিলাম! ভানাক্কাম ভানাক্কাম (নমস্কার) , নান্দ্রী (ধন্যবাদ) , রোম্বা নাল্লা (খুব ভালো) ইত্যাদি ইত্যাদি শুনেটুনে আমরা যখন একেবারে গদগদ, ছাতি প্রায় দশ ইঞ্চি বেড়েছে, বাচ্চাদের প্লেরুমে ঢুকতে যাবো, এমন সময় কানে ভেসে এলো, " উফ, কী প্যাথেটিক, বাইকটাকে পার্ক করেছে দেখ, যেন পার্সোনাল গ্যারেজ। এক্সকিউজ মি, ইস দা বাইক ইয়োরস? কুড ইউ প্লিজ মুভ ইট এ লিটল, আই এম আনেবল টু পার্ক মাই স্কুটি।" দক্ষিণদেশে বঙ্গতনয়ার সুমিষ্ট কন্ঠস্বর শুনে তো ততক্ষণে আমি আর মুকুল থ। তাকিয়ে দেখি হাল্কা বাদামী রঙের কুর্তি আর নীল জিন্স পরিহিতা এক অপূর্ব সুন্দরীর কন্ঠ, পাশে রয়েছে একইরকম সুন্দরী, বুদ্ধিদীপ্ত চেহারার আরেক তনয়া, পরনে লাল টপ আর হলুদ সালোয়ার। দুজনেরি হাতে হেলমেট। ঘোর ভাঙল, বলা চলে ওদের দিকে হাঁ করে তাকিয়ে থাকা থেকে বিঘ্ন ঘটাল ভেঙ্কটেসানের কথা, " সার, প্লীজ পার্ক ইয়োর বাইক কেয়ারফুলি, দিস ম্যাডাম ক্যানট পার্ক হার স্কুটি।"
" ও হ্যাঁ, করছি, আই মিন, ইয়েস, ডুইং ডুইং।" বলতে বলতে মুকুল এগিয়ে গেল।
" আপনারা বাঙ্গালী দেখছি! (কোনো বোনাস পয়েন্ট দেব না, মুকুলের উচ্চারণে পরিষ্কার বাংলা টান আছে, যে কোন বাঙালি ওই ইংরেজি শুনে বুঝে যাবে যে বক্তা বঙ্গতনয়।)
" হ্যাঁ, নমস্কার। আমি শৌভিক চট্টোপাধ্যায়, আর ও আমার বন্ধু মুকুল বসু। আমরা চেন্নাইতে চাকরি করি, থাকি।"
" তুলিকা মুখোপাধ্যায়। আন্না ইউনিভার্সিটিতে ইলেকট্রিকাল ডিপারট্মেন্টে লেকচারার। আমার বান্ধবী, সহচরী সান্যাল, ও সি এম আই তে রিসার্চ করে, ফিসিক্স ডিপার্টমেন্টে।" গড়্গড় করে বলে চলল লাল হলুদ, প্রিয় দল ইস্টবেঙ্গলের রঙ্গে রঙ্গীন মেয়েটি।
" আলাপ করে ভালো লাগল।"
" দাঁড়ান, আপনার বন্ধু দেখছি বাইকটা সরিয়েছে, আমি স্কুটিটা পার্ক করে আসছি। তুলি তুই ভেঙ্কটেসানকে জিনিসগুলো দে, আমি আসছি।" এই বলে বাদামী জামা পরিহিতা শ্রীমতী সহচরী বেরিয়ে গেলেন। শ্রীমতি বললাম কারণ হঠাৎ করেই ওকে দেখে আর ওর রাগ রাগ কথা প্রথমে শোনা ইস্তক আমার শতাব্দী রায়ের শ্রীমতি ভয়ঙ্করী সিনেমার কথা মনে পড়ে গেল! তা বলে নিজেকে চিরঞ্জিতের প্রলয়শঙ্কর মনে হয়নি অবশ্যই! সে যাই হোক। ইতিমধ্যে ভেঙ্কটেসানের পিছু পিছু আমি আর তুলিকা প্লে রুমে গেলাম। জানতে পারলাম যে এই দুই বন্ধু মাঝে মাঝেই এখানে আসে, বাচ্চাগুলো তাই ওদের খুব ভালো করে চেনে, ওদের দেখলেই খুশি হয়ে যায়। খানিকবাদে সহচরী আর মুকুল ঢুকল বেশ হাসি গল্প করতে করতে।
স্নেহামে মোট ২৯টি বাচ্চা থাকে, বয়স পাঁচ থেকে পনেরো। প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে ওদের স্কুলে পাঠানো হয়, নিয়মিত ডাক্তার এসে চেক-আপ করে যান। মাঝে মাঝে এরকম আমাদের মত কেউ কেউ আসে, সারা দিন ওদের সাথে কাটায়। ওদেরও ভালো লাগে।
সেইদিনটা আমরা ভীষণ ভালো কাটালাম, উপভোগ করলাম এই বাচ্চাগুলোর সাহচর্য। ভেঙ্কটেসান সহ আরো যারা এই মহৎ কাজে লিপ্ত, তাদের সকলের সাথে পরিচয় হল। বাচ্চাগুলোর নির্মল হাসি, সহস্র দুঃখ কষ্টের মধ্যেও হার না মানার অদম্য প্রচেষ্টা, মন জয় করা ব্যবহার, সব আমাদের মুগ্ধ করল। প্রতিজ্ঞা করলাম যে এইখানে আবারও ফিরে আসব। সেইদিন অবশ্য এদের সাথে সাথে মদ্রদেশে দুই বঙ্গতনয়ার সাথে আলাপ হয়েও আমাদের দুই বন্ধুর নিস্তরঙ্গ জীবনে কিছুটা হলেও হিল্লোল উঠেছিল। গত ছয়দিন আমরা দুই বন্ধুই রাত জেগে শ্রীমতী ভয়ঙ্করী ও তুলির সাথে দেদার আড্ডা দিয়েছি। এখনো অবধি আড্ডাতে চারজনেরই অবাধ প্রবেশাধিকার ছিল। তবে মনে হচ্ছে খুব শিগগিরই সহচরী আর মুকুল বোধহয় একটু রাইট টু প্রাইভেসি আওড়াবে, সেদিন মুকুলকে দেখছিলাম কি না ইন্টারনেটে এসব সার্চ করছিল। আর আমি? দেখা যাক, কপালে কী আছে! আর কিছু হোক না হোক, মুকুলের সাথে সাথে সবাই যে সহচর সহচরী পেলাম অনেকগুলো, এতেই আপাতত খুশি।
তা প্রতি সপ্তাহে শুনি আর ভাবি, যে হ্যাঁ, সত্যিই তো। আমার বয়সীরা এখন কেউ অনসাইটে কাজের দৌলতে কোম্পানির টাকায় ইউ এস ইউ কে ভ্রমণ করছে, কেউ বা রাজারহাটে ফ্ল্যাট কিনে এখন হয় বৌয়ের সাথে যৌথ ডিনার পার্টি হোস্ট করছে প্রতি উইকেন্ডে। সেখানে আমি রবিবার হলে কাজের কাজ বলতে আডিয়ারে গিয়ে একটু মাছের বাজার করছি আর কে সি দাসে কচুরি জিলিপি খেয়ে ব্রেকফাস্ট সারছি। সারাদিনে তারপর দুটো সিনেমা ইউটিউবে আর দু চার লাইন কাব্য লিখছি। মাঝে রান্নার মাসীর রেঁধে যাওয়া অখাদ্য কুখাদ্য ভাত ডাল সব্জি খাচ্ছি। রাত্তির হলেই সুইগি দিয়ে কিছু ভালো মন্দ হয় অর্ডার করছি, নয়তো দুজনে বাইক হাঁকিয়ে ফিনিক্স মলে গিয়ে খেয়ে আসছি। এই কী কোন জীবন হল? না, এবারে কিছু তো করতেই হবে। কতটা এক্সাইটিং হবে, জানি না। কিন্তু অন্তত স্বাদবদল তো হবেই।
" চল মুকুল, আজ কিছু অন্যরকম করব।"
" কী করবি?"
" করবি না, বল করব।"
" ফালতু হ্যাজাস না তো। ওই একই হল। তা কী করব সেটা বল।"
" বাইক বের কর। একটা জায়গায় যাব। "
" কোথায়?"
" আগে বের কর, রাস্তায় বেরিয়ে বলছি।"
কিছুদিন আগে ফেসবুকের একটি গ্রুপে একটা প্রতিষ্ঠানের খবর পেয়েছিলাম, তারা কাজ করে এইডস আক্রান্ত শিশুদের নিয়ে। মহাবালিপুরম যাওয়ার পথে মাঝে একটু বাঁক নিলে রয়েছে স্নেহাম নামের একটি আশ্রম। গুগুল ম্যাপ্সে সেই লোকেশন সেট করে আমরা দুই বন্ধু সেই রবিবার চললাম স্নেহামে। পথে একটা ডিপারট্মেন্টাল স্টোর থেকে বাচ্চাদের জন্য নিলাম অনেক চকোলেট, রঙ পেন্সিল, খাতা, পেন্সিল আর কিছু টুকটাক ছোটখাটো মুখরোচক খাবারদাবার। স্নেহামে পৌঁছলাম যখন, ঘড়ির কাঁটা তখন দশটা ছুঁই ছুঁই। বাইক পার্ক করে আমরা অফিসের ইন চার্জ, শ্রী ভেঙ্কটেসানের সাথে কথা বললাম। জানালাম যে বাচ্চাগুলোর সাথে আজকের সারাদিন কাটাতে চাই। ওদের জন্য কিছু জিনিস এনেছি, সেইগুলি দিয়ে দিলাম। ভেঙ্কটেসানের মুখের হাসি দেখে কে বলবে যে একটু আগেই তার চকচকে কৃষ্ণবর্ণ চেহারায় বিশাল মোটা একখানা গোঁফ দেখে আমরা তামিল সিনেমার ভিলেন ভেবে ভয় পাচ্ছিলাম! ভানাক্কাম ভানাক্কাম (নমস্কার) , নান্দ্রী (ধন্যবাদ) , রোম্বা নাল্লা (খুব ভালো) ইত্যাদি ইত্যাদি শুনেটুনে আমরা যখন একেবারে গদগদ, ছাতি প্রায় দশ ইঞ্চি বেড়েছে, বাচ্চাদের প্লেরুমে ঢুকতে যাবো, এমন সময় কানে ভেসে এলো, " উফ, কী প্যাথেটিক, বাইকটাকে পার্ক করেছে দেখ, যেন পার্সোনাল গ্যারেজ। এক্সকিউজ মি, ইস দা বাইক ইয়োরস? কুড ইউ প্লিজ মুভ ইট এ লিটল, আই এম আনেবল টু পার্ক মাই স্কুটি।" দক্ষিণদেশে বঙ্গতনয়ার সুমিষ্ট কন্ঠস্বর শুনে তো ততক্ষণে আমি আর মুকুল থ। তাকিয়ে দেখি হাল্কা বাদামী রঙের কুর্তি আর নীল জিন্স পরিহিতা এক অপূর্ব সুন্দরীর কন্ঠ, পাশে রয়েছে একইরকম সুন্দরী, বুদ্ধিদীপ্ত চেহারার আরেক তনয়া, পরনে লাল টপ আর হলুদ সালোয়ার। দুজনেরি হাতে হেলমেট। ঘোর ভাঙল, বলা চলে ওদের দিকে হাঁ করে তাকিয়ে থাকা থেকে বিঘ্ন ঘটাল ভেঙ্কটেসানের কথা, " সার, প্লীজ পার্ক ইয়োর বাইক কেয়ারফুলি, দিস ম্যাডাম ক্যানট পার্ক হার স্কুটি।"
" ও হ্যাঁ, করছি, আই মিন, ইয়েস, ডুইং ডুইং।" বলতে বলতে মুকুল এগিয়ে গেল।
" আপনারা বাঙ্গালী দেখছি! (কোনো বোনাস পয়েন্ট দেব না, মুকুলের উচ্চারণে পরিষ্কার বাংলা টান আছে, যে কোন বাঙালি ওই ইংরেজি শুনে বুঝে যাবে যে বক্তা বঙ্গতনয়।)
" হ্যাঁ, নমস্কার। আমি শৌভিক চট্টোপাধ্যায়, আর ও আমার বন্ধু মুকুল বসু। আমরা চেন্নাইতে চাকরি করি, থাকি।"
" তুলিকা মুখোপাধ্যায়। আন্না ইউনিভার্সিটিতে ইলেকট্রিকাল ডিপারট্মেন্টে লেকচারার। আমার বান্ধবী, সহচরী সান্যাল, ও সি এম আই তে রিসার্চ করে, ফিসিক্স ডিপার্টমেন্টে।" গড়্গড় করে বলে চলল লাল হলুদ, প্রিয় দল ইস্টবেঙ্গলের রঙ্গে রঙ্গীন মেয়েটি।
" আলাপ করে ভালো লাগল।"
" দাঁড়ান, আপনার বন্ধু দেখছি বাইকটা সরিয়েছে, আমি স্কুটিটা পার্ক করে আসছি। তুলি তুই ভেঙ্কটেসানকে জিনিসগুলো দে, আমি আসছি।" এই বলে বাদামী জামা পরিহিতা শ্রীমতী সহচরী বেরিয়ে গেলেন। শ্রীমতি বললাম কারণ হঠাৎ করেই ওকে দেখে আর ওর রাগ রাগ কথা প্রথমে শোনা ইস্তক আমার শতাব্দী রায়ের শ্রীমতি ভয়ঙ্করী সিনেমার কথা মনে পড়ে গেল! তা বলে নিজেকে চিরঞ্জিতের প্রলয়শঙ্কর মনে হয়নি অবশ্যই! সে যাই হোক। ইতিমধ্যে ভেঙ্কটেসানের পিছু পিছু আমি আর তুলিকা প্লে রুমে গেলাম। জানতে পারলাম যে এই দুই বন্ধু মাঝে মাঝেই এখানে আসে, বাচ্চাগুলো তাই ওদের খুব ভালো করে চেনে, ওদের দেখলেই খুশি হয়ে যায়। খানিকবাদে সহচরী আর মুকুল ঢুকল বেশ হাসি গল্প করতে করতে।
স্নেহামে মোট ২৯টি বাচ্চা থাকে, বয়স পাঁচ থেকে পনেরো। প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে ওদের স্কুলে পাঠানো হয়, নিয়মিত ডাক্তার এসে চেক-আপ করে যান। মাঝে মাঝে এরকম আমাদের মত কেউ কেউ আসে, সারা দিন ওদের সাথে কাটায়। ওদেরও ভালো লাগে।
সেইদিনটা আমরা ভীষণ ভালো কাটালাম, উপভোগ করলাম এই বাচ্চাগুলোর সাহচর্য। ভেঙ্কটেসান সহ আরো যারা এই মহৎ কাজে লিপ্ত, তাদের সকলের সাথে পরিচয় হল। বাচ্চাগুলোর নির্মল হাসি, সহস্র দুঃখ কষ্টের মধ্যেও হার না মানার অদম্য প্রচেষ্টা, মন জয় করা ব্যবহার, সব আমাদের মুগ্ধ করল। প্রতিজ্ঞা করলাম যে এইখানে আবারও ফিরে আসব। সেইদিন অবশ্য এদের সাথে সাথে মদ্রদেশে দুই বঙ্গতনয়ার সাথে আলাপ হয়েও আমাদের দুই বন্ধুর নিস্তরঙ্গ জীবনে কিছুটা হলেও হিল্লোল উঠেছিল। গত ছয়দিন আমরা দুই বন্ধুই রাত জেগে শ্রীমতী ভয়ঙ্করী ও তুলির সাথে দেদার আড্ডা দিয়েছি। এখনো অবধি আড্ডাতে চারজনেরই অবাধ প্রবেশাধিকার ছিল। তবে মনে হচ্ছে খুব শিগগিরই সহচরী আর মুকুল বোধহয় একটু রাইট টু প্রাইভেসি আওড়াবে, সেদিন মুকুলকে দেখছিলাম কি না ইন্টারনেটে এসব সার্চ করছিল। আর আমি? দেখা যাক, কপালে কী আছে! আর কিছু হোক না হোক, মুকুলের সাথে সাথে সবাই যে সহচর সহচরী পেলাম অনেকগুলো, এতেই আপাতত খুশি।
ধন্তেরস
" বাপ রে, আজকের কাগজটা দেখেছিস তুয়া? পুরো আশি পাতা!"
" হ্যাঁ, দেখেছি। শুধুই বিজ্ঞাপন আর বিজ্ঞাপন। প্রত্যেকটা ফেস্টিভালকে এরা এত কমারশিয়ালাইজ করে, ভাবা যায় না।"
" বাট দ্যাট ইস বিজনেস, তাই না? লোকের এখন হাতে বোনাস, মনে ফুর্তি। এটাকে এনক্যাশ করতেই হবে!"
" হুম, ঠিকই। এনিওয়ে, আমি বেরোচ্ছি দীপ, তোর খাবার টেবিলে গুছিয়ে রেখে গেলাম। খেয়ে নিস। আর আজ কখন বেরোবি?"
" থ্যাংকস! লাঞ্চের পর একটা মিটিং আছে। কাজারিয়ার সাথে। দেখি যদি ডিলটা ক্র্যাক করতে পারি।"
" অল দা বেস্ট। দেখ কাজারিয়ার মুড নিশ্চয়ই এই ফেস্টিভ সিজনে ভালো, যদি তুইও সেটা এনক্যাশ করতে পারিস দীপ।"
" হ্যাঁ। ক্র্যাক করতে পারলে একটা প্লে স্টেশন কিনব। প্রচুর অফার দিচ্ছে।"
" তুই ওই কর দীপ। তিরিশ বছর বয়স হয়েছে, কোন ম্যাচিউরিটি নেই। এখন না কি প্লে স্টেশন কিনবি। সিরিয়াসলি!!!"
" বাট ওয়াই নট? রোজগার করছি, ভোগ করব না কেন?"
" হ্যাঁ সেই তো। দিনের পর দিন আমি খেটে মরছি, আমাদের সব বিলস পে করছি, তোর খামখেয়ালিপনা সাপোর্ট করছি, আর উনি নাকি দু পয়সা এলে সঙ্গে সঙ্গে প্লে স্টেশন কিনবেন। সত্যি!"
" তুই এমন করছিস তুয়া যেন সবটা তোর কাছে সারপ্রাইজ? আমি যখন স্টার্ট আপটা শুরু করব বললাম, তুইই তো তখন বলেছিলি যে আমায় সাপোর্ট করবি। আর এখন এক বছর হতে না হতেই এই?"'
" দীপ, আমি কি একবারও বলেছি যে তোকে সাপোর্ট করব না? কিন্তু তুই বল, এক বছরে একটুও কি কিছু উন্নতি হয়েছে? আই এম টায়ার্ড দীপ, তুই প্লীজ রেগ্যুলার চাকরি খোঁজ। এনিওয়ে, আই এম গেটিং রিয়েলি ভেরি লেট। রাত্রে কথা বলব।"
মন মেজাজ তিক্ত করে তুয়া বেরোল অফিসের জন্য। একটা সরকারি ব্যাঙ্কে ক্লারিক্যাল পদে চাকরি করে। বাড়ি থেকে অফিস প্রায় ঘন্টাখানেকের রাস্তা। মিনিবাসে অফিসটাইমে ভিড়ে গাদাগাদি করতে করতে রোজ অফিস যাওয়া, একটা বিভীষিকাই বটে। একটা সময় ছিল যখন ও ভাবত চাকরিটা ছেড়ে দিয়ে নিজের মত করে পছন্দসই কিছু করবে, ক্রিয়েটিভ কিছু। ছোটবেলা থেকে শেখা নাচ বা গানকে পেশা করবে। কিন্তু দীপের আই টি ফার্মের চাকরিটা দু বছর আগে চলে যাওয়ার পর থেকে আর হাজার ইচ্ছে থাকলেও পারেনি ব্যাঙ্কের চাকরি ছাড়তে। দিনের পর দিন, শত বিরক্তি, ক্লান্তি নিয়েও করে গিয়েছে একই একঘেয়ে টাকাপত্তরের হিসেব।
ক'দিন ধরেই অফিস কলিগ শিপ্রাদি, মাধুদি আর পুণ্যিরা লাঞ্চ টাইমে শুধুই ধন্তেরসে কে কী কিনবে, কোন গয়নার দোকানে কী অফার চলছে, সেই নিয়েই আলোচনা করে চলেছে। এইসব ডিস্কাশানের সময়ে এত মন খারাপ হয়ে যায় তুয়ার। উঠে যে চলে যাবে, সে উপায়ও নেই। কেন যে ওরা একটু সেনসিটিভ হয় না, ওরাও তো জানে তুয়ার বর্তমান পরিস্থিতি। তুয়া আর দীপ দুজনেই ঠিক করেছিল, দুই পক্ষের বাবা মা কে কোনভাবেই বিরক্ত করবে না অর্থনৈতিক সাহায্য চেয়ে, যা করার, নিজেরাই করবে। এই কদিন দিব্যি মানিয়েও নিয়েছে, চলেও যাচ্ছে। আসলে মানিয়ে নেওয়াই হচ্ছে, সাধ আহ্লাদ দুজনেই তো বিসর্জন দিয়েছে কতদিন হল। উঠতে বসতে ট্যাক্সি ছাড়া চলত না যার, সেই দীপ এখন মেট্রো, বাসে করে ক্লায়েন্ট ইনভেস্টর মিটিং করছে, বাজার করে সন্ধ্যেবেলা কুড়িটা টাকা বাঁচানোর জন্য রিক্সা না নিয়ে তুয়া হেঁটে বাড়ি ফিরছে। এডজাস্ট করেও তো চলছে, ধৈর্য ধরে চলছে বটে, কিন্তু আজকাল মাঝে মাঝেই বাঁধ ভাঙ্গছে। এই যেমন, একটা প্লে স্টেশন কেনা নিয়ে দীপকে সকাল সকাল কথা শুনিয়ে দিল ও, সত্যি তো, মানুষটা কতদিন তো নিজের জন্য কিচ্ছু কেনেনি।
আজ সকালে গয়নার দোকানের এড দেখে একটা নেকলেস ভীষণ পছন্দ হয়েছিল তুয়ার, ভেবেছিল ওই ডিজাইন দেখিয়ে পাড়ার দোকান থেকে মাসিক কিস্তিতে টাকা দিয়ে বানাবে, বড় বড় দোকানের মজুরি, ট্যাক্সের চক্করে যা আকাশছোঁয়া দাম হবে, ওর পক্ষে এফরড করা সম্ভব না এখন। আর ঠিক তখনই দীপ বলল প্লে স্টেশন কেনার কথা, হঠাৎ করেই তাই মাথাটা গরম হয়ে গিয়েছিল। এখন ভীষণ খারাপ লাগছে। না, এর একটা বিহিত করতেই হবে। যেমন ভাবা, তেমনি কাজ। সঙ্গে সঙ্গে অফিস কলিগ শুভ্রকে একটা মেসেজ পাঠালো, " এই শুভ্র, প্লে ষ্টেশনের মোটামুটি ভালোর মধ্যে কোন মডেলটা কেনা যায় বলবি? তোর জামাইবাবুর জন্য সারপ্রাইজ গিফট হিসেবে কিনব। এমাজনের লিঙ্ক সমেত বল।" শুভ্র ওর খুব ন্যাওটা, বছর পাঁচেকের ছোট ওর থেকে, সবে কিছু মাস হয়েছে ওদের ব্রাঞ্চে যোগ দিয়েছে। সারাক্ষণ দিদি দিদি করে যায়। খুব টেক স্যাভি, তাই ওর থেকেই যথাযথ ইনফরমেশন পাবে জেনেই ওকে মেসেজটি করেছিল তুয়া। এবং যথারীতি দশ মিনিটের মধ্যেই বাস গড়িয়াহাটের মোড়ে জ্যামে যখন দাঁড়িয়ে আছে, তখনই ওর ফোনে ঢুকল শুভ্রর মেসেজ।
অফিসে পৌঁছে সঙ্গে সঙ্গে ডেস্কটপ খুলে অর্ডার করে দিল। ভাগ্য ভালো ছিল, ই এম আই তে টাকা দেওয়া সত্ত্বেও ফেস্টিভ অফারে সেম ডে ডেলিভারি হবে। দীপের নম্বরটা আর বাড়ির ঠিকানাটা দিয়ে অর্ডার প্লেস করে তবে শান্তি পেল তুয়া। এইবারেও তাহলে নেকলেসটা হল না, যাক গে, বিয়েতে কিছু গয়না পেয়েছিল, সেইগুলোও তো ভল্টে রয়েছে, নতুন কিনেই বা কী করত, না হয় পরে কোন একটা গয়না এক্সচেঞ্জ করে এই নতুন বানিয়ে নেবে। এইসব ভাবতে ভাবতে দিনের কাজ শেষ করল। ফেরার পথে রাস্তায় খুব জ্যাম পেল। আজ ধন্তেরস, পথেঘাটে খুব ভিড়, স্পেশালি গয়নার দোকানগুলির কাছে। বৌবাজার পেরোতেই বাসটার আধ ঘণ্টা লেগে গেল। ছোট বড় দোকানগুলিতে ভর সন্ধ্যেয় ক্রেতা ভর্তি, পা ফেলার জায়গা নেই। আরো একবার হতাশার নিশ্বাসটা পড়ল তুয়ার। তখনই মোবাইলে ঢুকল এমাজনের মেসেজ, পার্সেল ডেলিভারির। বাড়ি পৌঁছোতে পৌঁছোতে আটটা বেজে গেল ওর। বেল বাজানোর পর মিনিট দুই কেটে যাওয়ার পর এক মুখ চওড়া হাসি সহ দরজা খুলল দীপ। যাক, প্লে স্টেশনটা পেয়ে তাহলে সত্যিই খুব আনন্দ পেয়েছে ও।
কিন্তু এ কী, প্যাকেজটা তো টেবিলের ওপর পড়ে আছে, খোলাও হয়নি। তাহলে?
" তুয়া, আমি ডিলটা ক্র্যাক করেছি।"
" অসাম!!! Congrats দীপ। আই এম সো হ্যাপি ফর ইউ। "
" আই নো! আমার এতদিনের উদ্যম, চেষ্টা আজ স্বীকৃতি পেল। ভীষণ ভালো লাগছে।"
" কিন্তু তুই আমায় ফোন করে জানালি না কেন?"
" বিকজ আই ওয়ান্টেড ট সি দিস প্রেশাস স্মাইল অন ইয়োর ফেস ওয়েন আই break দিস নিউজ টু ইউ!"
" সত্যি রে দীপ। আমি খুব খুশী। আচ্ছা শোন, তাহলে তো ওই এমাজনের প্যাকেজটা একদম ডবল আনন্দ দেবে তোকে। জাস্ট খুলে দেখ! "
" দেখছি। কী আছে এতে? তুই এলে খুলব বলে আর এতক্ষণ অপেক্ষা করে আছি।"
" এবার দেখ। মনে হয় পছন্দ হবে।"
" দাঁড়া এক মিনিট। আমিও তোর জন্য একটা গিফট এনেছি। চল একসাথেই দুজনে খুলব নিজেদের গিফটস।"
" বেশ তো।"
দীপ বেডরুম থেকে ফিরল হাতে একটা গয়নার দোকানের প্যাকেট নিয়ে।
" এই নে, তোর জন্য।"
তুয়া খুলে দেখে ভিতরে ওর কদিন ধরে পছন্দ করা নেকলেসটি। আনন্দে দুই চোখের কোণ চিকচিক করে ওঠে জলে।
" তুই কী করে জানলি...?"
" শোন, ব্যবসা করতে নেমেছি, চারিদিকে চোখ কান খোলা রাখাটা প্র্যাকটিস করতে হবে তো, নাকি? তুই মুখ ফুটে কিছু বলিসনা বলে কি আমি কিছুই বুঝিনা? ডিলটা ক্র্যাক করেছি, তাই আডভান্সের টাকাটা দিয়ে এটা তোর জন্য।"
" থ্যাঙ্ক ইউ সো মাচ দীপ। আই লাভ ইউ।"
" আই লাভ ইউ টু! আর হ্যাঁ, প্লে স্টেশনটার জন্যও মেনি থ্যাংকস।"
" কী করে জানলি?"
" হাম সব সমঝতে হ্যায় ম্যাডাম!"
" যতসব।"
" প্যাকেটের ওপর লেখা থাকে রে হাঁদা! ওটাই দেখেছি।"
" হুম। ব্যস, ওমনি দেখলি, আর তাই ছুটলি আমার জন্য রিটার্ন গিফট কিনতে।"
" তুয়া!!!!! তুই আর শুধরোবি না!!!"
দুজনের খুনসুটি ভরা হাসির ফোয়ারায় তখন উৎসবের আলো আরো ঝলমল করে উঠেছে।
" হ্যাঁ, দেখেছি। শুধুই বিজ্ঞাপন আর বিজ্ঞাপন। প্রত্যেকটা ফেস্টিভালকে এরা এত কমারশিয়ালাইজ করে, ভাবা যায় না।"
" বাট দ্যাট ইস বিজনেস, তাই না? লোকের এখন হাতে বোনাস, মনে ফুর্তি। এটাকে এনক্যাশ করতেই হবে!"
" হুম, ঠিকই। এনিওয়ে, আমি বেরোচ্ছি দীপ, তোর খাবার টেবিলে গুছিয়ে রেখে গেলাম। খেয়ে নিস। আর আজ কখন বেরোবি?"
" থ্যাংকস! লাঞ্চের পর একটা মিটিং আছে। কাজারিয়ার সাথে। দেখি যদি ডিলটা ক্র্যাক করতে পারি।"
" অল দা বেস্ট। দেখ কাজারিয়ার মুড নিশ্চয়ই এই ফেস্টিভ সিজনে ভালো, যদি তুইও সেটা এনক্যাশ করতে পারিস দীপ।"
" হ্যাঁ। ক্র্যাক করতে পারলে একটা প্লে স্টেশন কিনব। প্রচুর অফার দিচ্ছে।"
" তুই ওই কর দীপ। তিরিশ বছর বয়স হয়েছে, কোন ম্যাচিউরিটি নেই। এখন না কি প্লে স্টেশন কিনবি। সিরিয়াসলি!!!"
" বাট ওয়াই নট? রোজগার করছি, ভোগ করব না কেন?"
" হ্যাঁ সেই তো। দিনের পর দিন আমি খেটে মরছি, আমাদের সব বিলস পে করছি, তোর খামখেয়ালিপনা সাপোর্ট করছি, আর উনি নাকি দু পয়সা এলে সঙ্গে সঙ্গে প্লে স্টেশন কিনবেন। সত্যি!"
" তুই এমন করছিস তুয়া যেন সবটা তোর কাছে সারপ্রাইজ? আমি যখন স্টার্ট আপটা শুরু করব বললাম, তুইই তো তখন বলেছিলি যে আমায় সাপোর্ট করবি। আর এখন এক বছর হতে না হতেই এই?"'
" দীপ, আমি কি একবারও বলেছি যে তোকে সাপোর্ট করব না? কিন্তু তুই বল, এক বছরে একটুও কি কিছু উন্নতি হয়েছে? আই এম টায়ার্ড দীপ, তুই প্লীজ রেগ্যুলার চাকরি খোঁজ। এনিওয়ে, আই এম গেটিং রিয়েলি ভেরি লেট। রাত্রে কথা বলব।"
মন মেজাজ তিক্ত করে তুয়া বেরোল অফিসের জন্য। একটা সরকারি ব্যাঙ্কে ক্লারিক্যাল পদে চাকরি করে। বাড়ি থেকে অফিস প্রায় ঘন্টাখানেকের রাস্তা। মিনিবাসে অফিসটাইমে ভিড়ে গাদাগাদি করতে করতে রোজ অফিস যাওয়া, একটা বিভীষিকাই বটে। একটা সময় ছিল যখন ও ভাবত চাকরিটা ছেড়ে দিয়ে নিজের মত করে পছন্দসই কিছু করবে, ক্রিয়েটিভ কিছু। ছোটবেলা থেকে শেখা নাচ বা গানকে পেশা করবে। কিন্তু দীপের আই টি ফার্মের চাকরিটা দু বছর আগে চলে যাওয়ার পর থেকে আর হাজার ইচ্ছে থাকলেও পারেনি ব্যাঙ্কের চাকরি ছাড়তে। দিনের পর দিন, শত বিরক্তি, ক্লান্তি নিয়েও করে গিয়েছে একই একঘেয়ে টাকাপত্তরের হিসেব।
ক'দিন ধরেই অফিস কলিগ শিপ্রাদি, মাধুদি আর পুণ্যিরা লাঞ্চ টাইমে শুধুই ধন্তেরসে কে কী কিনবে, কোন গয়নার দোকানে কী অফার চলছে, সেই নিয়েই আলোচনা করে চলেছে। এইসব ডিস্কাশানের সময়ে এত মন খারাপ হয়ে যায় তুয়ার। উঠে যে চলে যাবে, সে উপায়ও নেই। কেন যে ওরা একটু সেনসিটিভ হয় না, ওরাও তো জানে তুয়ার বর্তমান পরিস্থিতি। তুয়া আর দীপ দুজনেই ঠিক করেছিল, দুই পক্ষের বাবা মা কে কোনভাবেই বিরক্ত করবে না অর্থনৈতিক সাহায্য চেয়ে, যা করার, নিজেরাই করবে। এই কদিন দিব্যি মানিয়েও নিয়েছে, চলেও যাচ্ছে। আসলে মানিয়ে নেওয়াই হচ্ছে, সাধ আহ্লাদ দুজনেই তো বিসর্জন দিয়েছে কতদিন হল। উঠতে বসতে ট্যাক্সি ছাড়া চলত না যার, সেই দীপ এখন মেট্রো, বাসে করে ক্লায়েন্ট ইনভেস্টর মিটিং করছে, বাজার করে সন্ধ্যেবেলা কুড়িটা টাকা বাঁচানোর জন্য রিক্সা না নিয়ে তুয়া হেঁটে বাড়ি ফিরছে। এডজাস্ট করেও তো চলছে, ধৈর্য ধরে চলছে বটে, কিন্তু আজকাল মাঝে মাঝেই বাঁধ ভাঙ্গছে। এই যেমন, একটা প্লে স্টেশন কেনা নিয়ে দীপকে সকাল সকাল কথা শুনিয়ে দিল ও, সত্যি তো, মানুষটা কতদিন তো নিজের জন্য কিচ্ছু কেনেনি।
আজ সকালে গয়নার দোকানের এড দেখে একটা নেকলেস ভীষণ পছন্দ হয়েছিল তুয়ার, ভেবেছিল ওই ডিজাইন দেখিয়ে পাড়ার দোকান থেকে মাসিক কিস্তিতে টাকা দিয়ে বানাবে, বড় বড় দোকানের মজুরি, ট্যাক্সের চক্করে যা আকাশছোঁয়া দাম হবে, ওর পক্ষে এফরড করা সম্ভব না এখন। আর ঠিক তখনই দীপ বলল প্লে স্টেশন কেনার কথা, হঠাৎ করেই তাই মাথাটা গরম হয়ে গিয়েছিল। এখন ভীষণ খারাপ লাগছে। না, এর একটা বিহিত করতেই হবে। যেমন ভাবা, তেমনি কাজ। সঙ্গে সঙ্গে অফিস কলিগ শুভ্রকে একটা মেসেজ পাঠালো, " এই শুভ্র, প্লে ষ্টেশনের মোটামুটি ভালোর মধ্যে কোন মডেলটা কেনা যায় বলবি? তোর জামাইবাবুর জন্য সারপ্রাইজ গিফট হিসেবে কিনব। এমাজনের লিঙ্ক সমেত বল।" শুভ্র ওর খুব ন্যাওটা, বছর পাঁচেকের ছোট ওর থেকে, সবে কিছু মাস হয়েছে ওদের ব্রাঞ্চে যোগ দিয়েছে। সারাক্ষণ দিদি দিদি করে যায়। খুব টেক স্যাভি, তাই ওর থেকেই যথাযথ ইনফরমেশন পাবে জেনেই ওকে মেসেজটি করেছিল তুয়া। এবং যথারীতি দশ মিনিটের মধ্যেই বাস গড়িয়াহাটের মোড়ে জ্যামে যখন দাঁড়িয়ে আছে, তখনই ওর ফোনে ঢুকল শুভ্রর মেসেজ।
অফিসে পৌঁছে সঙ্গে সঙ্গে ডেস্কটপ খুলে অর্ডার করে দিল। ভাগ্য ভালো ছিল, ই এম আই তে টাকা দেওয়া সত্ত্বেও ফেস্টিভ অফারে সেম ডে ডেলিভারি হবে। দীপের নম্বরটা আর বাড়ির ঠিকানাটা দিয়ে অর্ডার প্লেস করে তবে শান্তি পেল তুয়া। এইবারেও তাহলে নেকলেসটা হল না, যাক গে, বিয়েতে কিছু গয়না পেয়েছিল, সেইগুলোও তো ভল্টে রয়েছে, নতুন কিনেই বা কী করত, না হয় পরে কোন একটা গয়না এক্সচেঞ্জ করে এই নতুন বানিয়ে নেবে। এইসব ভাবতে ভাবতে দিনের কাজ শেষ করল। ফেরার পথে রাস্তায় খুব জ্যাম পেল। আজ ধন্তেরস, পথেঘাটে খুব ভিড়, স্পেশালি গয়নার দোকানগুলির কাছে। বৌবাজার পেরোতেই বাসটার আধ ঘণ্টা লেগে গেল। ছোট বড় দোকানগুলিতে ভর সন্ধ্যেয় ক্রেতা ভর্তি, পা ফেলার জায়গা নেই। আরো একবার হতাশার নিশ্বাসটা পড়ল তুয়ার। তখনই মোবাইলে ঢুকল এমাজনের মেসেজ, পার্সেল ডেলিভারির। বাড়ি পৌঁছোতে পৌঁছোতে আটটা বেজে গেল ওর। বেল বাজানোর পর মিনিট দুই কেটে যাওয়ার পর এক মুখ চওড়া হাসি সহ দরজা খুলল দীপ। যাক, প্লে স্টেশনটা পেয়ে তাহলে সত্যিই খুব আনন্দ পেয়েছে ও।
কিন্তু এ কী, প্যাকেজটা তো টেবিলের ওপর পড়ে আছে, খোলাও হয়নি। তাহলে?
" তুয়া, আমি ডিলটা ক্র্যাক করেছি।"
" অসাম!!! Congrats দীপ। আই এম সো হ্যাপি ফর ইউ। "
" আই নো! আমার এতদিনের উদ্যম, চেষ্টা আজ স্বীকৃতি পেল। ভীষণ ভালো লাগছে।"
" কিন্তু তুই আমায় ফোন করে জানালি না কেন?"
" বিকজ আই ওয়ান্টেড ট সি দিস প্রেশাস স্মাইল অন ইয়োর ফেস ওয়েন আই break দিস নিউজ টু ইউ!"
" সত্যি রে দীপ। আমি খুব খুশী। আচ্ছা শোন, তাহলে তো ওই এমাজনের প্যাকেজটা একদম ডবল আনন্দ দেবে তোকে। জাস্ট খুলে দেখ! "
" দেখছি। কী আছে এতে? তুই এলে খুলব বলে আর এতক্ষণ অপেক্ষা করে আছি।"
" এবার দেখ। মনে হয় পছন্দ হবে।"
" দাঁড়া এক মিনিট। আমিও তোর জন্য একটা গিফট এনেছি। চল একসাথেই দুজনে খুলব নিজেদের গিফটস।"
" বেশ তো।"
দীপ বেডরুম থেকে ফিরল হাতে একটা গয়নার দোকানের প্যাকেট নিয়ে।
" এই নে, তোর জন্য।"
তুয়া খুলে দেখে ভিতরে ওর কদিন ধরে পছন্দ করা নেকলেসটি। আনন্দে দুই চোখের কোণ চিকচিক করে ওঠে জলে।
" তুই কী করে জানলি...?"
" শোন, ব্যবসা করতে নেমেছি, চারিদিকে চোখ কান খোলা রাখাটা প্র্যাকটিস করতে হবে তো, নাকি? তুই মুখ ফুটে কিছু বলিসনা বলে কি আমি কিছুই বুঝিনা? ডিলটা ক্র্যাক করেছি, তাই আডভান্সের টাকাটা দিয়ে এটা তোর জন্য।"
" থ্যাঙ্ক ইউ সো মাচ দীপ। আই লাভ ইউ।"
" আই লাভ ইউ টু! আর হ্যাঁ, প্লে স্টেশনটার জন্যও মেনি থ্যাংকস।"
" কী করে জানলি?"
" হাম সব সমঝতে হ্যায় ম্যাডাম!"
" যতসব।"
" প্যাকেটের ওপর লেখা থাকে রে হাঁদা! ওটাই দেখেছি।"
" হুম। ব্যস, ওমনি দেখলি, আর তাই ছুটলি আমার জন্য রিটার্ন গিফট কিনতে।"
" তুয়া!!!!! তুই আর শুধরোবি না!!!"
দুজনের খুনসুটি ভরা হাসির ফোয়ারায় তখন উৎসবের আলো আরো ঝলমল করে উঠেছে।
Subscribe to:
Posts (Atom)
