১।
" পইপই করে তোকে বলেছি, রোদের মধ্যে বেরোস যখন, সানগ্লাসটা পড়ে নিবি। এবার বোঝ! মাথা ব্যথা কী করে কমবে, আমি জানিনা। গ্লোনইন খেয়ে দেখ। " (মা জননীর পরম প্রতাপান্বিত চিৎকার)
" হ্যাঁ, পড়েছি তো। " ( মিনমিনে রিনরিনে গলায় অধমের উত্তর)
" সে তো এখন, আগে পড়লে এই মাথা ব্যথাটা হত না। এত বছর বয়স হয়ে গেলো, তবু নিজের ভালো নিজে বুঝতে শিখলো না। " ( অত্যন্ত বিরক্তি, "এর আর কিছু হল না" ভাব সহ মা জননী)
২।
" মা আসছি। ক্যাব এসে গিয়েছে। " ছলছল চোখ, মায়ের ও মেয়ের, দুজনেরই। ক্যাবে ওঠার মুখে কিন্তু মেয়ের কক্ষনো ভুল হয় না সানগ্লাসটা পড়ে নিতে, সে রোদ হোক কি না হোক। সেটা যে তখন এক বিরাট পর্দা।
৩।
পণ্ডিচেরি প্ল্যান চেকলিস্টঃ
ফ্লোরাল প্রিন্টের ড্রেস : ✓
বিচ স্যান্ডাল : ✓
সানস্ক্রিন লোশন : ✓
সানগ্লাস ( লেটেস্ট স্টাইলের) : ✓
৪।
তেল মাখা মাথা, কোন হেয়ারস্টাইলই যখন ভালো লাগছে না, মাথার পিছনে সব চুলগুলোকে টেনে এনে একটা দলা পাকিয়ে খোঁপা। চোখে বড় সানগ্লাস, ঠোঁটে হাল্কা লিপগ্লস। পারফেক্ট! এক্কেবারে নাল্লা ইড়কা!!!
Wednesday, November 22, 2017
Tuesday, November 21, 2017
গানের ওপারে
হেমন্তের বিকেল। পড়ন্ত সূর্যের ম্লান আলো এসে পড়েছে হিমানীর ফ্যাকাশে গালে। কাঠের জানলার পাল্লা ধরে বসে থাকে ও এই সময়ে, সারাদিনের মতোই। সামনের লেকের ওপর সূর্যাস্ত ওর খুব প্রিয়, আর একটু পরেই শুরু হয়ে যাবে আশেপাশের বাড়িগুলি থেকে পরিণত অপরিণত কণ্ঠে সরগমের রেওয়াজ। বড় ভালো লাগে হিমানীর। মনে পড়ে যায় ছেলেবেলার দিনগুলি। সন্ধ্যেবেলা খেলার মাঠ থেকে ফিরেই হারমোনিয়াম নিয়ে বসাতো মা, শিবানী আর ও, ওরা দুই বোন গলা খুলে গাইত গান। দুই বোনেরই অসামান্য গানের গলা। পাড়ার ক্লাবে, স্কুলে সমস্ত অনুষ্ঠানে ওরা দুজনে মাটিয়ে রাখতো ওদের কোকিলের কলতানে।
" বৌদি এসো। তোমায় রেডি করে দিই। দাদা আবার নইলে আমায় বকবে দেরি হলে।"
হিমানী কিছু বলে না, ঠায় তাকিয়ে থাকে জানলার বাইরে। পশ্চিমের আকাশ এখন হাল্কা বেগুনী, সার দিয়ে একে একে সব পাখিরা ফিরে যাচ্ছে নিজেদের বাসায়। আজকের মতো সমস্ত সংগ্রাম শেষ, আবার কাল ঊষার নতুন আলোয় শুরু হবে দিনযাপনের যুদ্ধ।
" কী গো? এসো? কোন শাড়িটা পড়বে, বলো।"
রমার কথায় সম্বিৎ ফেরে হিমানীর। আস্তে আস্তে বিছানায় বসে আলমারিতে রাখা শাড়িগুলোর দিকে তাকায়। কত দামী দামী পোশাক, এক কালে রজতের সাথে পার্টিগুলোতে যেত যখন সেজেগুজে, এক্কেবারে রাজরানী লাগত। কত বছর পর আবার আজ একটা পার্টি হতে চলেছে বাড়িতে। চায়নি ও একদম, কিন্তু রজতকে বলতে পারল কই? বিয়ের পঁচিশ বছর উদযাপন করবে বলে নাছোড়বান্দা সে।
বাঁ হাত দিয়ে পছন্দের হলুদ বেনারসিটা দেখায় রমাকে।
" ওই হলদে শাড়িটা? ঠিক তো? "
মাথা নাড়ে হিমানী।
রমা ওকে সাজাতে সাজাতে করে চলে রাজ্যের গল্প, টিভি সিরিয়াল থেকে শুরু করে হাউজিং কমপ্লেক্সের খুঁটিনাটি। গত দশ বছর ধরে ও আছে হিমানীর দেখাশোনা করার জন্য। একেবারে ছায়ার মত থেকে আগলে আগলে রাখে ওকে। যখন প্রথম আসে এ বাড়িতে নার্সের কাজ নিয়ে, তখন দেখত সারাদিন পুরনো ফটো এলবাম হাতে নিয়ে হিমানী পড়ে পড়ে কাঁদত, দুই চোখ ছাপিয়ে গাল বেয়ে নেমে আসত অঝোর অশ্রুধারা। কিন্তু একটা শব্দ বের হত না। অমন লক্ষ্মীপ্রতিমার ন্যায় চেহারার মানুষটাকে কান্নাকাটি করতে দেখতে কোমলহৃদয়ের রমা ভেঙ্গে পড়ত।
এখন আর বৃষ্টি পড়েনা, চারিদিক শান্ত, স্তব্ধ। গাড়ির ভয়াবহ এক্সিডেন্ট আর তাতে ছেলের অকালমৃত্যু নির্বাক করে দেয় হিমানীকে। বহু চেষ্টা করেও আর বাণী ফেরাতে পারেনি ওর কণ্ঠে কেউ। রজত নিজের অফিস, ব্যবসা সব মিলিয়ে অনেকটাই সামলে নিয়েছে নিজেকে। বহির্বিশ্বের সাথে নিত্য কেজো সম্পর্কের ফলে আর সূক্ষ্ম অনুভূতি, দুঃখ কষ্টরা বুঝি কবেই বিদায় নিয়েছে, বুকের মাঝে একটা বিশাল ফাঁক সেও অনুভব করে, তবে হিমানীর মত না।
" কী সুন্দর লাগছে তোমায় দেখতে গো বৌদি। আহা, ঠিক যেন মা লক্ষ্মী। " রমার কথায় ম্লান হাসে ও।
" কই গো, এসো। লোকজন যে আসা শুরু করে দিয়েছে। সবাই অপেক্ষা করছে তোমার। চলো। "
রজতের এগিয়ে দেওয়া হাতে হাত রেখে হিমানী বেরোয় নিজের ঘর থেকে। আজ এতগুলো বছর পরে ও বাড়ির ছাদে এলো। সেই ছাদ, যেখান থেকে দেখা যায় দিগন্ত বিস্তৃত ওর প্রিয় শহরটিকে। ধোঁয়ায় ঢাকা রাতের আকাশে তারারা গরহাজির। কিন্তু ফেয়ারি লাইটস দিয়েছে কৃত্রিম সৌন্দর্য। ম্যুজিক সিস্টেমে লো ভল্যুমে চলছে কিশোর রফি লতার রেট্রো। রঙিন পানীয় আর হরেকরকম সুখাদ্যের গন্ধে সন্ধ্যে জমজমাট।
আত্মীয়স্বজন বন্ধুবান্ধবদের সাথে সৌজন্যের হাসি হেসে কেটে গেল সারা সন্ধ্যেটা। রাত্রে রমার ছুটি করে দিয়ে রজত হিমানীকে নিয়ে গেলো নিজেদের বেডরুমে। ঘর অন্ধকার।
" দাঁড়াও, এক মিনিট। " এই বলে রজত চট করে একটা কাপড়ের ফালি এনে হিমানীর চোখ বেঁধে আস্তে আস্তে ঘে ঢুকল ওর হাত ধরে। হিমানী টের পেল ঘরের আলো জ্বলে উঠেছে। রজত ওর চোখ থেকে ফিতে খুলতেই,
" সারপ্রাইজ! দেখো তো? পছন্দ হল তো? "
ওর সামনে একটা গ্র্যান্ড পিয়ানো, ঠিক যেমনটা পঁচিশ বছর আগে হানিমুনে ইংরেজ আমলের চা বাগানের ম্যানেজারের বাংলোতে দেখে দুই চোখ চিকচিক করে উঠেছিল হিমানীর।
আজ আবার হিমানীর দুই চোখ ছলছল করছে। এত বছরে, এত ঝড়ঝাপটাতেও রজত ভোলেনি ওর এই ইচ্ছাটিকে। খুব সন্তর্পণে ও এসে বসল পিয়ানোতে। বাংলোতে বাজানো গানটাই আবার বাজিয়ে গাইল ও আজ, নাই বা শুনতে পাক ওর গলার স্বর আজ কেউ। হিমানীর আঙুলের ছোঁয়ায় তখন পিয়ানো থেকে যে সুরঝঙ্কার সৃষ্টি হচ্ছে, রজত যেন তাতেই ডুবে যাচ্ছে, আরো প্রেমে, আরো প্রেমে।
" বৌদি এসো। তোমায় রেডি করে দিই। দাদা আবার নইলে আমায় বকবে দেরি হলে।"
হিমানী কিছু বলে না, ঠায় তাকিয়ে থাকে জানলার বাইরে। পশ্চিমের আকাশ এখন হাল্কা বেগুনী, সার দিয়ে একে একে সব পাখিরা ফিরে যাচ্ছে নিজেদের বাসায়। আজকের মতো সমস্ত সংগ্রাম শেষ, আবার কাল ঊষার নতুন আলোয় শুরু হবে দিনযাপনের যুদ্ধ।
" কী গো? এসো? কোন শাড়িটা পড়বে, বলো।"
রমার কথায় সম্বিৎ ফেরে হিমানীর। আস্তে আস্তে বিছানায় বসে আলমারিতে রাখা শাড়িগুলোর দিকে তাকায়। কত দামী দামী পোশাক, এক কালে রজতের সাথে পার্টিগুলোতে যেত যখন সেজেগুজে, এক্কেবারে রাজরানী লাগত। কত বছর পর আবার আজ একটা পার্টি হতে চলেছে বাড়িতে। চায়নি ও একদম, কিন্তু রজতকে বলতে পারল কই? বিয়ের পঁচিশ বছর উদযাপন করবে বলে নাছোড়বান্দা সে।
বাঁ হাত দিয়ে পছন্দের হলুদ বেনারসিটা দেখায় রমাকে।
" ওই হলদে শাড়িটা? ঠিক তো? "
মাথা নাড়ে হিমানী।
রমা ওকে সাজাতে সাজাতে করে চলে রাজ্যের গল্প, টিভি সিরিয়াল থেকে শুরু করে হাউজিং কমপ্লেক্সের খুঁটিনাটি। গত দশ বছর ধরে ও আছে হিমানীর দেখাশোনা করার জন্য। একেবারে ছায়ার মত থেকে আগলে আগলে রাখে ওকে। যখন প্রথম আসে এ বাড়িতে নার্সের কাজ নিয়ে, তখন দেখত সারাদিন পুরনো ফটো এলবাম হাতে নিয়ে হিমানী পড়ে পড়ে কাঁদত, দুই চোখ ছাপিয়ে গাল বেয়ে নেমে আসত অঝোর অশ্রুধারা। কিন্তু একটা শব্দ বের হত না। অমন লক্ষ্মীপ্রতিমার ন্যায় চেহারার মানুষটাকে কান্নাকাটি করতে দেখতে কোমলহৃদয়ের রমা ভেঙ্গে পড়ত।
এখন আর বৃষ্টি পড়েনা, চারিদিক শান্ত, স্তব্ধ। গাড়ির ভয়াবহ এক্সিডেন্ট আর তাতে ছেলের অকালমৃত্যু নির্বাক করে দেয় হিমানীকে। বহু চেষ্টা করেও আর বাণী ফেরাতে পারেনি ওর কণ্ঠে কেউ। রজত নিজের অফিস, ব্যবসা সব মিলিয়ে অনেকটাই সামলে নিয়েছে নিজেকে। বহির্বিশ্বের সাথে নিত্য কেজো সম্পর্কের ফলে আর সূক্ষ্ম অনুভূতি, দুঃখ কষ্টরা বুঝি কবেই বিদায় নিয়েছে, বুকের মাঝে একটা বিশাল ফাঁক সেও অনুভব করে, তবে হিমানীর মত না।
" কী সুন্দর লাগছে তোমায় দেখতে গো বৌদি। আহা, ঠিক যেন মা লক্ষ্মী। " রমার কথায় ম্লান হাসে ও।
" কই গো, এসো। লোকজন যে আসা শুরু করে দিয়েছে। সবাই অপেক্ষা করছে তোমার। চলো। "
রজতের এগিয়ে দেওয়া হাতে হাত রেখে হিমানী বেরোয় নিজের ঘর থেকে। আজ এতগুলো বছর পরে ও বাড়ির ছাদে এলো। সেই ছাদ, যেখান থেকে দেখা যায় দিগন্ত বিস্তৃত ওর প্রিয় শহরটিকে। ধোঁয়ায় ঢাকা রাতের আকাশে তারারা গরহাজির। কিন্তু ফেয়ারি লাইটস দিয়েছে কৃত্রিম সৌন্দর্য। ম্যুজিক সিস্টেমে লো ভল্যুমে চলছে কিশোর রফি লতার রেট্রো। রঙিন পানীয় আর হরেকরকম সুখাদ্যের গন্ধে সন্ধ্যে জমজমাট।
আত্মীয়স্বজন বন্ধুবান্ধবদের সাথে সৌজন্যের হাসি হেসে কেটে গেল সারা সন্ধ্যেটা। রাত্রে রমার ছুটি করে দিয়ে রজত হিমানীকে নিয়ে গেলো নিজেদের বেডরুমে। ঘর অন্ধকার।
" দাঁড়াও, এক মিনিট। " এই বলে রজত চট করে একটা কাপড়ের ফালি এনে হিমানীর চোখ বেঁধে আস্তে আস্তে ঘে ঢুকল ওর হাত ধরে। হিমানী টের পেল ঘরের আলো জ্বলে উঠেছে। রজত ওর চোখ থেকে ফিতে খুলতেই,
" সারপ্রাইজ! দেখো তো? পছন্দ হল তো? "
ওর সামনে একটা গ্র্যান্ড পিয়ানো, ঠিক যেমনটা পঁচিশ বছর আগে হানিমুনে ইংরেজ আমলের চা বাগানের ম্যানেজারের বাংলোতে দেখে দুই চোখ চিকচিক করে উঠেছিল হিমানীর।
আজ আবার হিমানীর দুই চোখ ছলছল করছে। এত বছরে, এত ঝড়ঝাপটাতেও রজত ভোলেনি ওর এই ইচ্ছাটিকে। খুব সন্তর্পণে ও এসে বসল পিয়ানোতে। বাংলোতে বাজানো গানটাই আবার বাজিয়ে গাইল ও আজ, নাই বা শুনতে পাক ওর গলার স্বর আজ কেউ। হিমানীর আঙুলের ছোঁয়ায় তখন পিয়ানো থেকে যে সুরঝঙ্কার সৃষ্টি হচ্ছে, রজত যেন তাতেই ডুবে যাচ্ছে, আরো প্রেমে, আরো প্রেমে।
Monday, November 20, 2017
ব্যাকস্পেসঃ একটি কাল্পনিক কথোপকথন
ইভেন্টের সাথে সামঞ্জস্য আছে কি না, বুঝছিনা। থিম, যেটা নিয়ে লিখছি আর কি, সেটাও কিছুই নতুন না। এই ব্যাকস্পেসের আড়ালে জমে থাকে অনেক অনেক অজানা গল্প। অনেক কিছুই আমরা ভাবি, এমনটা হলে বা এমনটা বলতে পারলে, কী ভালোই না হতো। কোন ঘটনা ঘটে যাওয়ার পরে মনে হয় রিওয়াইন্ড বাটনটা প্রেস করতে পারলে, অনেক কিছু অন্যরকম ভাবে করা যেত। তেমনই এক কাল্পনিক কথোপকথন তুলে ধরলাম। আপনি আমি সক্কলে কোন না কোন দিন এমন অবস্থায় পড়েছি বা পড়ব যেখানে " কেমন আছিস" এর উত্তরে লম্বা করে নিজের দুঃখের কথা লেখার চেয়ে এক বুক অভিমান নিয়ে "হ্যাঁ, ভালো" বলাটা অনেক বেশী সহজ। নীচের লেখাটিও কিছুটা ওই ধাঁচেরই।
ডিসক্লেমারঃ ইভেন্টের নামের সাথেই ম্যাচ করিয়ে, "সব চরিত্র কাল্পনিক। Any resemblance to any person living or dead is purely coincidental."
এক "ভালো" মেয়ের কথা
- ওই, আমার ওপর রাগ হয়েছে নাকি? কদিন এক্কেবারে কথা বলছিস না যে?
- না না, তোর ওপর রাগ হবে কেন? আমি কে? কী রাইট আছে আমার বল তোর ওপর রাগ করার? তুই কি না এখন সেলিব্রিটি, তোর নামে গোটা মিডল স্কুল ফ্ল্যাট, ফ্যান ক্লাব হয়ে গেলো তোর। সেখানে আমি কে না কে কোন হরিদাস পাল যে তোর ওপর রাগ করব? স্বরলিপিতে যখন তোর এগেন্সটে বিলুরা এত নোংরামি করল, তখন না হয় আমি একটু তোকে সাপোর্ট দিয়েছি। তা দেবো না কেন, তুই কি না আমার এত্ত ভালো বন্ধু। তার মানে তো এই না যে তোর ওপর আমার রাগ করার অধিকার হবে, তাই না? স্বরলিপি ছেড়ে বৈতালিকে এলি, শুরুতে তোকে ব্যান্ডে চান্সই দিলো না। তাতে কী? আমরা একসাথে তারপরে গান গাইলাম, সেই সুবাদে তুই আবার সোলো গাইলি। তখন এত্ত লোকে তোর ওই গান শুনে ফ্ল্যাট হয়ে গেলো। তারপর স্কুল ফেস্টে তোর ওই পারফরমেন্সটা রে, যার জন্য আমি এত গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে পাবলিসিটি করলাম, ওটায় যে অসামান্য সাড়া পেলি, ওই চিয়ারিং করা তো আমার নৈতিক দায়িত্ব ছিল, তাই না? আমি কি না তোর সেই কবেকার বন্ধু, বন্ধুর জন্য এইটুকু করতে পারিনা? করবোই তো, আমি না ভালো মেয়ে? বাবা, এখন তুই কত বড় মাপের সিঙ্গার সংরাইটার বল,কীসব আবার শুকনো খেজুরগুড় হাম্বা গাম্বা লেভেলের গান লিখিস, আমার এইটুকু মাথায় ঢোকেই না। মাঝে মাঝে তো দেখি আবার অনু মলিকের মত ওইসব আরবি পার্সি সব গানের সুর থেকেও অনুপ্রেরণা পাস। সেদিনের তোর ওই গানটারে, ওই যে রে, ল্যাভেন্ডার নিয়ে যে গানটা সেদিন রিলিজ করলি, তার সুরটা তো ভীষণভাবে আমার এক চাইনিজ পিয়ানিস্টের একটা পিসের কথা মনে করাল। তারপরে দেখলাম তোর ভিডিওতে ভর্তি ভর্তি লাইক আর লাভ, কমেন্ট আর শেয়ার। কে জানে, এতজন যখন প্রশংসা করল, এত স্তাবক, সকলে কত বুদ্ধিমান, নিশ্চয়ই খুব মৌলিক হয়েছিল। আমার নেহাত কাঁচা মাথা। এসব বুঝিনি তাই, এপ্রিশিয়েট করতেই পারিনি উল্টে ভাবলাম কিনা তুই টুকলি করেছিস। যাই হোক, সরি রে। না না। এরকম ভাবা আমার ভুল হয়েছে। তোর ওপর রাগ করাটাও ভুল হয়ে গিয়েছিল। এক্সট্রিমলি সরি রে। প্লীজ তোর ফ্যানক্লাবে আমায় স্থান দে, অন্তত পুরনো বন্ধুত্বের খাতিরে? ইয়ে দোস্তি হাম কভি না তোড়েঙ্গে। প্লীজ প্লীজ? জানি খুব ট্যালামার্কা শোনাচ্ছি, কিন্তু কি করব, আমি যে এরকমই, প্যালা হাঁদা গঙ্গারাম। তোর মত চৌকশ থোড়িই। আর রাগ করব না। এবার থেকে সারাক্ষণ তোর স্তুতি গাইবো, তোর ভালোটুকুই দেখবো। পদে পদে আমায় যখন অবহেলা করিস, সেগুলো দেখেও না দেখার ভান করব। আমি কি না ভালো ভদ্র মেয়ে। আমার কি আর ঝগড়া আসে বল?
(অনেকগুলো ব্যাকস্পেস টেপার শব্দ)
- ধুর, না রে। একটু ব্যস্ত ছিলাম রে। অনেকগুলো পেন্ডিং এসাইনমেন্ট ছিল, ওই নিয়ে...
- তাই বল। ইয়ুটিউবে একটা নতুন গান পোস্ট করেছি এবার। শুনে বলিস কেমন লাগল। আর একটু প্রোমোট করে দিস, পিপলস চয়েসের প্রাইজটা টার্গেট করেছি।
- হ্যাঁ নিশ্চয়ই। ভালো তো হবেই, তুই করেছিস কি না!
- হুম। প্রোমোট করতে ভুলিস না।
- চল বাই।
- বাই।
Tuesday, November 14, 2017
স্নেহ
- হ্যালো?
- মিতু কী করছিস বাবু?
- সকাল সকাল কী করব বলো? এই তো ক্যাম্পে বসে আছি।
- এখনো কোন পেশেন্ট আসেনি?
- এসছে তো, ওই তিন চার জন।
- কতক্ষণ চলবে?
- বিকেল পাঁচটা অবধি।
- সবে এগারোটা বাজে। বলছি ব্রেকফাস্ট করেছিস?
- না, সময় হয়নি।
- সে কী? কতবার বলব ব্রেকফাস্ট স্কিপ করবি না?
- উফ মা, সময় পাইনি বলছি তো।
- সময় পাইনিটা কোন কথা হল? শরীর খারাপ হয় জানিস?
- মা পাঁচ বছর ধরে কষ্ট করে ডাক্তারিটা না আমি পাস করেছি মা, তুমি না। তাই প্লীজ আমার ব্যাপারটা আমায় বুঝতে দাও।
- ধুর বাবা, ভালো লাগেনা। তোকে কিছু বলতে গেলেই এমনভাবে রিএক্ট করিস আমার ভীষণ খারাপ লাগে।
- বলতে আসোই বা কেনো বলো তো? কাজের সময় ফোন করে জ্ঞান দিতে এলে আমি কিভাবে উত্তর দেবো?
- ছাড়। আমি রাখছি।
- হ্যাঁ রাখো।
মনটা তেতো হয়ে গেলো মিতু, অর্থাৎ ডঃ মিতালি দাসশর্মার। একেই কাল রাত্তির থেকে হবু বর সুপ্রিয়র সাথে এক প্রস্থ ঝগড়া চলছে। মিতু ওর ফাইনাল ইয়ার থেকে একটি এন জি ওর সাথে যুক্ত। দুই মাস অন্তর অন্তর ও তাদের সাথে আসে সাঁওতাল পরগণার এই ছোট গ্রামে। স্থানীয় মানুষজনের চিকিৎসার জন্য। বিয়ে ঠিক হওয়ার সময় থেকেই সুপ্রিয় জানে এই ব্যাপারটা, শুরুতে এই নিয়ে কোনরকম মনোমালিন্য হয়নি। কিন্তু ইদানীং মিতু দেখছে, বিয়ে যত এগিয় আসছে, সুপ্রিয়র যেন দুই চোখের বিষ হয়ে উঠছে মিতুর এই ক্যাম্প। কাল রাত্রে অনেকক্ষণ কথা কাটাকাটির পর দুজনেই পরেরদিন কাজ আছে এই অজুহাতে ঝগড়া স্থগিত রেখেছে, তাই মুড অফ। এর মধ্যে মায়ের ফোন আসায় বেচারির উপর চোটপাট করে দিল। কিই বা করে মিতু, এই নিয়ে সকাল থেকে দুবার ফোন, পাঁচবার মেসেজ হয়ে গিয়েছে মায়ের সাথে, তারপরেও বার বার ফোন এলে বিরক্ত হবে না? এক কথা শুনতে ভালো লাগে? ও নিজেও জানে, ব্রেকফাস্ট মিস করা খারাপ। কিন্তু মুড ভালো নেই। ইচ্ছে করছেনা। জোর করে খাবে নাকি? মা যেন কিচ্ছু বুঝতে চায় না। ধুর, পেশেন্টও আসছেনা কোন।
নিজের মেকশিফট চেম্বার থেকে বেরিয়ে বাইরেটা দেখল মিতু। আশেপাশে তেমন লোকজন নেই ক্যাম্পের ওরা কয়েকজন ছাড়া। রাঙ্গারও দেখা নেই।
প্রতিবার ও যখন ক্যাম্পে আসে, রাঙ্গা আর ওর ছেলে বিশু এসে ওর সাথে দেখা করে যায়। পুলের পাশেই ওদের ঘর। গত বর্ষায় কোন বিষাক্ত পোকার কামড় খেয়ে বিশুর অবস্থা যায় যায় প্রায়। রাঙ্গা কাঁদতে কাঁদতে প্রায় হাতে পায়ে ধরে ক্যাম্প থেকে মিতুকে নিয়ে যায় ওদের ঘরে। প্রাথমিক চিকিৎসা করে তারপর এম্ব্যুলেন্স করে সদর হাসপাতালে গিয়ে বিশুর চিকিৎসা চলে দুদিন। পুরোপুরি যতক্ষণ ও সুস্থ না হয়, মিতু ওখানেই ছিল। তারপর হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়ে বিশুকে আর রাঙ্গাকে ওদের ঘরে পৌঁছে ওর ছুটি হয়েছিল। সেই থেকে রাঙ্গা আর বিশু প্রতিবার এসে ওদের ডাক্তার দিদির সাথে দেখা করে যায় ক্যাম্প বসলেই। বড় ভালো লাগে এই গ্রামের মানুষগুলোকে মিতুর, কী সরল, কী ভালো। শহুরে আধুনিকতা যতদিন না ওদের ছুঁতে পারে, ততদিনই ওদের মঙ্গল। নইলে তো সেই সব একেকটা স্বার্থপর জীব হবে।
এসব ভাবতে ভাবতেই মিতু দেখল দূরে হলুদ শাড়ী পরে রাঙ্গা। সাথে হাত ধরে দৌড়তে দৌড়তে আসছে বিশু।
- ও দিদি, কেমন আছো?
- ভালো রাঙ্গা। তুমি? এই বিশু কেমন আছিস?
- ভালো পিসি।
- তোমাদের আজ দেরি হল? আমি ভাবছিলাম এখনো আসলে না কেন?
- আজ বিশুর ইস্কুলে ডেকেছিল। ওখান হতে এলাম।
- কেন রে বিশু? লেখাপড়া করছিস না নাকি?
- না পিসি। আমি ফার্স্ট হয়েছি ক্লাসে। তাই মা কে ডেকে বলল।
- বাহ! খুব ভালো। দাঁড়া, তোকে কী দিই?
- কিচ্ছু দিয়োনি দিদি। ছেলেটা খুব বদমাশ হচ্ছে।
- কেন রাঙ্গা?
- কোন কথা শোনেনা। সকাল থেকে জানো খায়নি কিচ্ছু। না খেয়ে ইস্কুলে পালায়, খেলবে বলে। তুমি ওকে একটু বকে দাও না দিদি।
মনে পড়ে গেল মায়ের কথা। মায়েদের চিন্তা বোধহয় স্থান কাল পাত্র নির্বিশেষে এক থাকে। সাঁওতাল পল্লীর অশিক্ষিত রাঙ্গা হোক কী দক্ষিণ কলকাতার নামী কলেজের প্রিন্সিপাল মলয়া, নিজের সন্তানের সুস্বাস্থ্য ছাড়া মায়েদের জীবনে বোধহয় আর কিচ্ছু বড় না। হঠাৎই তাই সকাল বেলা মায়ের ওপর চোটপাট করার জন্য একটা অপরাধবোধ কাজ করতে লাগল মিতুর। চেম্বার থেকে নিজের হাতব্যাগটা এনে, সেখান থেকে একটা বিস্কুটের প্যাকেট বের করে বিশুকে দিতে দিতে বলল, " এই বিশু পাগল, আমি যেন পরেরবার এসে মায়ের কাছে তোর নামে কোন নালিশ না শুনি। ঠিক সময়ে খাওয়া দাওয়া করবি। মা কে জ্বালাতন করলেই শহরে নিয়ে যাব। বুঝবি ঠ্যালা তখন! "
শহরের নামেই বিশুর গায়ে জ্বর আসে, আর তাই এইবারে যে মোক্ষম ডোজটা পড়েছে, বুঝল মিতু। " যা বাড়ি গিয়ে স্নান করে শিগগিরি খা কিছু। রাঙ্গা নিয়ে যাও ওকে। ভালো থেকো। "
" দিদি তুমিও ভালো থেকো। আবার এসো।"
মিতুর চোখের সামনে দিয়ে মায়ের হাতে বিস্কুটের প্যাকেটটা দিয়ে, মুখে একটা পুরে, তিড়িং বিড়িং করে লাফাতে লাফাতে চলল আট বছরের বিশু, এক হাতে মায়ের হাত শক্ত করে জাপ্টে ধরে; এর চেয়ে নিরাপদ আশ্রয় আর তো দুটো হয় না। এই বোধও হয়তো দেশ কাল সবকিছুর বাধা ছাড়িয়ে যায় এসে যায় মানব মনে। চোখের কোণের জল রুমালে মুছে মিতু চলল ফোন বের করতে। মা কে একটা সরি বলতেই হবে, এখুনি।
- মিতু কী করছিস বাবু?
- সকাল সকাল কী করব বলো? এই তো ক্যাম্পে বসে আছি।
- এখনো কোন পেশেন্ট আসেনি?
- এসছে তো, ওই তিন চার জন।
- কতক্ষণ চলবে?
- বিকেল পাঁচটা অবধি।
- সবে এগারোটা বাজে। বলছি ব্রেকফাস্ট করেছিস?
- না, সময় হয়নি।
- সে কী? কতবার বলব ব্রেকফাস্ট স্কিপ করবি না?
- উফ মা, সময় পাইনি বলছি তো।
- সময় পাইনিটা কোন কথা হল? শরীর খারাপ হয় জানিস?
- মা পাঁচ বছর ধরে কষ্ট করে ডাক্তারিটা না আমি পাস করেছি মা, তুমি না। তাই প্লীজ আমার ব্যাপারটা আমায় বুঝতে দাও।
- ধুর বাবা, ভালো লাগেনা। তোকে কিছু বলতে গেলেই এমনভাবে রিএক্ট করিস আমার ভীষণ খারাপ লাগে।
- বলতে আসোই বা কেনো বলো তো? কাজের সময় ফোন করে জ্ঞান দিতে এলে আমি কিভাবে উত্তর দেবো?
- ছাড়। আমি রাখছি।
- হ্যাঁ রাখো।
মনটা তেতো হয়ে গেলো মিতু, অর্থাৎ ডঃ মিতালি দাসশর্মার। একেই কাল রাত্তির থেকে হবু বর সুপ্রিয়র সাথে এক প্রস্থ ঝগড়া চলছে। মিতু ওর ফাইনাল ইয়ার থেকে একটি এন জি ওর সাথে যুক্ত। দুই মাস অন্তর অন্তর ও তাদের সাথে আসে সাঁওতাল পরগণার এই ছোট গ্রামে। স্থানীয় মানুষজনের চিকিৎসার জন্য। বিয়ে ঠিক হওয়ার সময় থেকেই সুপ্রিয় জানে এই ব্যাপারটা, শুরুতে এই নিয়ে কোনরকম মনোমালিন্য হয়নি। কিন্তু ইদানীং মিতু দেখছে, বিয়ে যত এগিয় আসছে, সুপ্রিয়র যেন দুই চোখের বিষ হয়ে উঠছে মিতুর এই ক্যাম্প। কাল রাত্রে অনেকক্ষণ কথা কাটাকাটির পর দুজনেই পরেরদিন কাজ আছে এই অজুহাতে ঝগড়া স্থগিত রেখেছে, তাই মুড অফ। এর মধ্যে মায়ের ফোন আসায় বেচারির উপর চোটপাট করে দিল। কিই বা করে মিতু, এই নিয়ে সকাল থেকে দুবার ফোন, পাঁচবার মেসেজ হয়ে গিয়েছে মায়ের সাথে, তারপরেও বার বার ফোন এলে বিরক্ত হবে না? এক কথা শুনতে ভালো লাগে? ও নিজেও জানে, ব্রেকফাস্ট মিস করা খারাপ। কিন্তু মুড ভালো নেই। ইচ্ছে করছেনা। জোর করে খাবে নাকি? মা যেন কিচ্ছু বুঝতে চায় না। ধুর, পেশেন্টও আসছেনা কোন।
নিজের মেকশিফট চেম্বার থেকে বেরিয়ে বাইরেটা দেখল মিতু। আশেপাশে তেমন লোকজন নেই ক্যাম্পের ওরা কয়েকজন ছাড়া। রাঙ্গারও দেখা নেই।
প্রতিবার ও যখন ক্যাম্পে আসে, রাঙ্গা আর ওর ছেলে বিশু এসে ওর সাথে দেখা করে যায়। পুলের পাশেই ওদের ঘর। গত বর্ষায় কোন বিষাক্ত পোকার কামড় খেয়ে বিশুর অবস্থা যায় যায় প্রায়। রাঙ্গা কাঁদতে কাঁদতে প্রায় হাতে পায়ে ধরে ক্যাম্প থেকে মিতুকে নিয়ে যায় ওদের ঘরে। প্রাথমিক চিকিৎসা করে তারপর এম্ব্যুলেন্স করে সদর হাসপাতালে গিয়ে বিশুর চিকিৎসা চলে দুদিন। পুরোপুরি যতক্ষণ ও সুস্থ না হয়, মিতু ওখানেই ছিল। তারপর হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়ে বিশুকে আর রাঙ্গাকে ওদের ঘরে পৌঁছে ওর ছুটি হয়েছিল। সেই থেকে রাঙ্গা আর বিশু প্রতিবার এসে ওদের ডাক্তার দিদির সাথে দেখা করে যায় ক্যাম্প বসলেই। বড় ভালো লাগে এই গ্রামের মানুষগুলোকে মিতুর, কী সরল, কী ভালো। শহুরে আধুনিকতা যতদিন না ওদের ছুঁতে পারে, ততদিনই ওদের মঙ্গল। নইলে তো সেই সব একেকটা স্বার্থপর জীব হবে।
এসব ভাবতে ভাবতেই মিতু দেখল দূরে হলুদ শাড়ী পরে রাঙ্গা। সাথে হাত ধরে দৌড়তে দৌড়তে আসছে বিশু।
- ও দিদি, কেমন আছো?
- ভালো রাঙ্গা। তুমি? এই বিশু কেমন আছিস?
- ভালো পিসি।
- তোমাদের আজ দেরি হল? আমি ভাবছিলাম এখনো আসলে না কেন?
- আজ বিশুর ইস্কুলে ডেকেছিল। ওখান হতে এলাম।
- কেন রে বিশু? লেখাপড়া করছিস না নাকি?
- না পিসি। আমি ফার্স্ট হয়েছি ক্লাসে। তাই মা কে ডেকে বলল।
- বাহ! খুব ভালো। দাঁড়া, তোকে কী দিই?
- কিচ্ছু দিয়োনি দিদি। ছেলেটা খুব বদমাশ হচ্ছে।
- কেন রাঙ্গা?
- কোন কথা শোনেনা। সকাল থেকে জানো খায়নি কিচ্ছু। না খেয়ে ইস্কুলে পালায়, খেলবে বলে। তুমি ওকে একটু বকে দাও না দিদি।
মনে পড়ে গেল মায়ের কথা। মায়েদের চিন্তা বোধহয় স্থান কাল পাত্র নির্বিশেষে এক থাকে। সাঁওতাল পল্লীর অশিক্ষিত রাঙ্গা হোক কী দক্ষিণ কলকাতার নামী কলেজের প্রিন্সিপাল মলয়া, নিজের সন্তানের সুস্বাস্থ্য ছাড়া মায়েদের জীবনে বোধহয় আর কিচ্ছু বড় না। হঠাৎই তাই সকাল বেলা মায়ের ওপর চোটপাট করার জন্য একটা অপরাধবোধ কাজ করতে লাগল মিতুর। চেম্বার থেকে নিজের হাতব্যাগটা এনে, সেখান থেকে একটা বিস্কুটের প্যাকেট বের করে বিশুকে দিতে দিতে বলল, " এই বিশু পাগল, আমি যেন পরেরবার এসে মায়ের কাছে তোর নামে কোন নালিশ না শুনি। ঠিক সময়ে খাওয়া দাওয়া করবি। মা কে জ্বালাতন করলেই শহরে নিয়ে যাব। বুঝবি ঠ্যালা তখন! "
শহরের নামেই বিশুর গায়ে জ্বর আসে, আর তাই এইবারে যে মোক্ষম ডোজটা পড়েছে, বুঝল মিতু। " যা বাড়ি গিয়ে স্নান করে শিগগিরি খা কিছু। রাঙ্গা নিয়ে যাও ওকে। ভালো থেকো। "
" দিদি তুমিও ভালো থেকো। আবার এসো।"
মিতুর চোখের সামনে দিয়ে মায়ের হাতে বিস্কুটের প্যাকেটটা দিয়ে, মুখে একটা পুরে, তিড়িং বিড়িং করে লাফাতে লাফাতে চলল আট বছরের বিশু, এক হাতে মায়ের হাত শক্ত করে জাপ্টে ধরে; এর চেয়ে নিরাপদ আশ্রয় আর তো দুটো হয় না। এই বোধও হয়তো দেশ কাল সবকিছুর বাধা ছাড়িয়ে যায় এসে যায় মানব মনে। চোখের কোণের জল রুমালে মুছে মিতু চলল ফোন বের করতে। মা কে একটা সরি বলতেই হবে, এখুনি।
Thursday, November 9, 2017
সোনার ছেলে
মাদ্রাস নিয়ে লিখছি, সেখানে বলব যাদের কথা, তাদেরই একজনের কথা আজ বলি আলাদা করে। ওর জীবনটা হয়তো অনেকের সাথেই মিলে যাবে, আবার নাও মিলতে পারে, কিন্তু আমি যতজনকে চিনেছি আজ অবধি, এইরকম অধ্যাবসায় বোধহয় কারুর দেখিনি।
সকাল থেকে রাত অবধি সাঙ্ঘাতিকভাবে লেখাপড়ার মধ্যে নিজেকে ডুবিয়ে রাখে। অনেক সময় রাতের পর রাত জেগেও কাজ করে। শরীর খারাপ হয়ে যাবে, একটু বিরতি নে বললেও কথা শোনেনা; কারুর সাথে নিজের রিসার্চের কাজের ব্যাপারে কথা বলতে গেলে দুই চোখ চকচক করে ওঠে। কোন কিছু করবে ভাবলে এক অদম্য জেদের সাথে শেষ দেখেই ছাড়ে। আমরা যখন ওকে বলি যে এত অমানুষিক পরিশ্রম করছিস কেন, তার উত্তর পাই, আমাকে অনেকটা বড় হতে হবে। জীবনে দাঁড়াতে হবে নিজের পায়ে। তোমরা বুঝবে না।
সত্যিই তাই। ওর জীবনের স্ট্রাগলের কথা যতদিন জানিনি, ততদিন ভাবতে পারতাম না, ওর এত খাটুনির পিছনের আসল উদ্দেশ্যটা কী। আসলে যখন ছোট থেকে বড় হয়েছে ও, দুই চোখে ছিল এক স্বপ্ন, সে স্বপ্ন একদিন অনেক বড় হবে, দূর হবে জীবনের বাধা।
মেদিনীপুর শহরের এক বেসরকারি প্রাইমারি স্কুল শিক্ষকের ছেলে ও। বড় হয়েছে দারিদ্র্য ও অভাবের মধ্যে। তবে কখনোই তা মুছে ফেলতে পারেনি ওর দুই চোখের এই স্বপ্নকে। বরং প্রতি মুহূর্তে ওকে এই অভাব অনটনের সংসার মনে করিয়ে দিতো যে আর পাঁচটা ছেলে মেয়ের থেকে ওকে যে অনেক বেশী খাটতে হবে। স্কুলে পড়াকালীন আই আই টি জয়েন্টের কথা জানত না, তাই স্টেট জয়েন্ট ছাড়া অন্য কোন পরীক্ষায় বসেনি। এবং সেখানেও অসম্ভব ভালো র্যাঙ্ক করে যাদবপুরে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিঙে চান্স পায়। অর্থনৈতিক সচ্ছ্বলতা না থাকায় ট্যুশন করে নিজের খরচ চালাত। বছর দেড়েক চাকরি করে টাকা জমিয়ে এখন ও আই আই টিতে এরোস্পেস ইঞ্জিনিয়ারিঙে রিসার্চ করছে। ও আমাদের সকলের গর্ব। যেখানেই যায় নিজের কাজ প্রেসেন্ট করতে, প্রথম স্থান পেয়ে আসে। ও আমাদের সোনার ছেলে। সমস্ত ফ্যাকাল্টিদের, সিনিয়রদের আর জুনিয়রদের ও প্রিয়পাত্র।
আমার খুব গর্ব হয় ওকে চিনি বলে। ওর থেকে প্রতি মুহূর্তে শিখি যে অদম্য ইচ্ছা আর সাহস থাকলে, কঠিন অধ্যাবসায়ের মারফত কীভাবে মানুষ তার স্বপ্ন সফল করতে পারে। যেভাবে ওর কেরিয়ার এখনও অবধি চলছে, আমি হলফ করে বলতে পারি, অদূর ভবিষ্যতে ও একাডেমিক ফিল্ডে খুব নাম করবে।
শুধু লেখাপড়াতেই ওর গুণ সীমিত না। ভীষণ ভাবে ভালো মনের একটা মানুষ, কোনরকম বিপদে আপদে এগিয়ে যায়। যথাসাধ্য সাহায্যও করে। এছাড়া বড় ভালো ছবি আঁকে, গান গায়, লেখালিখি করে। গিটার বাজায়। এই প্রসঙ্গে বলি, ওকে গত সাড়ে তিন বছর ধরে চিনি। গিটার বাজাতো আমি গান গাইলে, তখন ওকে গানের কর্ড দিয়ে দিতে হতো। কিন্তু এই কবছরে নিজের চেষ্টায় গিটারটাকে ভালোমতোই রপ্ত করে ফেলেছে, নিজে নিজে সুর বানায়, বাজায়।
গর্ব হয় প্রতি মুহূর্তে আমার ওর জন্য। ও আমার সবচেয়ে প্রিয় ভাই, চন্দন বোস।
সকাল থেকে রাত অবধি সাঙ্ঘাতিকভাবে লেখাপড়ার মধ্যে নিজেকে ডুবিয়ে রাখে। অনেক সময় রাতের পর রাত জেগেও কাজ করে। শরীর খারাপ হয়ে যাবে, একটু বিরতি নে বললেও কথা শোনেনা; কারুর সাথে নিজের রিসার্চের কাজের ব্যাপারে কথা বলতে গেলে দুই চোখ চকচক করে ওঠে। কোন কিছু করবে ভাবলে এক অদম্য জেদের সাথে শেষ দেখেই ছাড়ে। আমরা যখন ওকে বলি যে এত অমানুষিক পরিশ্রম করছিস কেন, তার উত্তর পাই, আমাকে অনেকটা বড় হতে হবে। জীবনে দাঁড়াতে হবে নিজের পায়ে। তোমরা বুঝবে না।
সত্যিই তাই। ওর জীবনের স্ট্রাগলের কথা যতদিন জানিনি, ততদিন ভাবতে পারতাম না, ওর এত খাটুনির পিছনের আসল উদ্দেশ্যটা কী। আসলে যখন ছোট থেকে বড় হয়েছে ও, দুই চোখে ছিল এক স্বপ্ন, সে স্বপ্ন একদিন অনেক বড় হবে, দূর হবে জীবনের বাধা।
মেদিনীপুর শহরের এক বেসরকারি প্রাইমারি স্কুল শিক্ষকের ছেলে ও। বড় হয়েছে দারিদ্র্য ও অভাবের মধ্যে। তবে কখনোই তা মুছে ফেলতে পারেনি ওর দুই চোখের এই স্বপ্নকে। বরং প্রতি মুহূর্তে ওকে এই অভাব অনটনের সংসার মনে করিয়ে দিতো যে আর পাঁচটা ছেলে মেয়ের থেকে ওকে যে অনেক বেশী খাটতে হবে। স্কুলে পড়াকালীন আই আই টি জয়েন্টের কথা জানত না, তাই স্টেট জয়েন্ট ছাড়া অন্য কোন পরীক্ষায় বসেনি। এবং সেখানেও অসম্ভব ভালো র্যাঙ্ক করে যাদবপুরে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিঙে চান্স পায়। অর্থনৈতিক সচ্ছ্বলতা না থাকায় ট্যুশন করে নিজের খরচ চালাত। বছর দেড়েক চাকরি করে টাকা জমিয়ে এখন ও আই আই টিতে এরোস্পেস ইঞ্জিনিয়ারিঙে রিসার্চ করছে। ও আমাদের সকলের গর্ব। যেখানেই যায় নিজের কাজ প্রেসেন্ট করতে, প্রথম স্থান পেয়ে আসে। ও আমাদের সোনার ছেলে। সমস্ত ফ্যাকাল্টিদের, সিনিয়রদের আর জুনিয়রদের ও প্রিয়পাত্র।
আমার খুব গর্ব হয় ওকে চিনি বলে। ওর থেকে প্রতি মুহূর্তে শিখি যে অদম্য ইচ্ছা আর সাহস থাকলে, কঠিন অধ্যাবসায়ের মারফত কীভাবে মানুষ তার স্বপ্ন সফল করতে পারে। যেভাবে ওর কেরিয়ার এখনও অবধি চলছে, আমি হলফ করে বলতে পারি, অদূর ভবিষ্যতে ও একাডেমিক ফিল্ডে খুব নাম করবে।
শুধু লেখাপড়াতেই ওর গুণ সীমিত না। ভীষণ ভাবে ভালো মনের একটা মানুষ, কোনরকম বিপদে আপদে এগিয়ে যায়। যথাসাধ্য সাহায্যও করে। এছাড়া বড় ভালো ছবি আঁকে, গান গায়, লেখালিখি করে। গিটার বাজায়। এই প্রসঙ্গে বলি, ওকে গত সাড়ে তিন বছর ধরে চিনি। গিটার বাজাতো আমি গান গাইলে, তখন ওকে গানের কর্ড দিয়ে দিতে হতো। কিন্তু এই কবছরে নিজের চেষ্টায় গিটারটাকে ভালোমতোই রপ্ত করে ফেলেছে, নিজে নিজে সুর বানায়, বাজায়।
গর্ব হয় প্রতি মুহূর্তে আমার ওর জন্য। ও আমার সবচেয়ে প্রিয় ভাই, চন্দন বোস।
Thursday, November 2, 2017
নাম তো সুনা হোগা
পুজোর ছুটির পর স্কুল খুলেছে আজ প্রায় এক মাস পরে। এইট বির ক্লাসরুমে আজ এক নতুন মুখ। লাস্ট বেঞ্চের একটা কোণে চুপ করে বসে আছে ছেলেটা। মিষ্টি দেখতে, চোখে চশমা না থাকলে অনেকটা রাহুলের মতো দেখতে। আরে রাহুল, কুচ কুচ হোতা হ্যায়? সেই রাহুল। ফার্স্ট পিরিয়ডে ক্লাস টিচার মহুয়া মিস রোল কলের সময় ছেলেটির সাথে সারা ক্লাসের পরিচয় করিয়েছিলেন বটে, কিন্তু রূপসা তখন চকপিস আনতে অফিসে গিয়েছিল, তাই নামটা জানা হয়নি। রূপসার তো কী বিশাল ক্রাশ এস আর কের উপর। প্রথম তিন পিরিয়ড ধরে ক্লাস চলাকালীন তাই বারবার চোখ গেছে ছেলেটির দিকে। বেশ একটা অগোছালো ভাব চেহারার মধ্যে, শার্টের কলারটা একদিকে উঠে আছে, টাইটাও ল্যুজ। নেহাত হেডস্যার এখনো এইদিকে আসেননি, নইলে ঠিক প্রথমদিনেই ছেলেটা পানিশমেন্ট পেত। রূপসা ঠিক করল, টিফিন ব্রেকের সময় একবার গিয়ে আলাপ করবে আর তখন ওকে স্কুলের আদবকায়দা নিয়ে বলবে। এই সবে সরখেল স্যার ম্যাথস ক্লাস নিয়ে বেরিয়ে গেলেন। টাইম এন্ড ডিস্টেন্সের কিছু বাঁশ বাঁশ অঙ্ক করতে করতে আজ সারা ক্লাস বিদ্ধ্বস্ত, সবাই প্রায় যে যার মত চুপচাপ টিফিন বক্স বের করছে। নতুন ছেলেটি ছাড়া আর কেউই তেমন সপ্রতিভ নেই আর। ছেলেটিই বরং প্রত্যেকটা অঙ্ক স্যারের সাথে সাথে তাল মিলিয়ে করে যাচ্ছিল। রূপসা ভাবল, এই সুযোগ। অঙ্ক বোঝাও হবে, সাথে সাথে আলাপটাও ঝালিয়ে আসবে। নইলে ওর মতো গুডি গুডি মেয়ে হঠাৎ যেচে যেচে নতুন ছেলের সাথে আলাপ করতে যাচ্ছে, ইমেজের সাথে যায়না। বন্ধুরাও আওয়াজ দেবে।
"হাই, আমি রূপসা। লাস্ট যে অঙ্কটা স্যার আদ্ধেক হিন্টস দিয়ে চলে গেলেন না, ডু ইয়ু মাইন্ড এক্সপ্লেইনিং ইট টু মি?"
" শিয়োর! এই দেখো, এইখানে রিলেটিভ ভেলোসিটি ধর এক্স, প্ল্যাটফর্মের লেন্থ তো বলেই দিয়েছে ... "
মিনিট দশেক ধরে অঙ্কটা ভালো করে বুঝেটুঝে বহুবার থ্যাঙ্ক ইউ বলে রূপসা এবার নিজের ডেস্কের দিকে যেতে গেলো। হঠাৎ মনে পড়ল, আরে এত কাণ্ডের মধ্যে, ওর নামটাই তো জানা হয়নি।
" হ্যাঁরে। তোর নাম কী রে? সেটাই তো জানলাম না। "
উত্তর এলো, " রাহুল, নাম তো সুনা হোগা! "
ঠোঁটের কোণের এক কুচি হাসিটা...
"হাই, আমি রূপসা। লাস্ট যে অঙ্কটা স্যার আদ্ধেক হিন্টস দিয়ে চলে গেলেন না, ডু ইয়ু মাইন্ড এক্সপ্লেইনিং ইট টু মি?"
" শিয়োর! এই দেখো, এইখানে রিলেটিভ ভেলোসিটি ধর এক্স, প্ল্যাটফর্মের লেন্থ তো বলেই দিয়েছে ... "
মিনিট দশেক ধরে অঙ্কটা ভালো করে বুঝেটুঝে বহুবার থ্যাঙ্ক ইউ বলে রূপসা এবার নিজের ডেস্কের দিকে যেতে গেলো। হঠাৎ মনে পড়ল, আরে এত কাণ্ডের মধ্যে, ওর নামটাই তো জানা হয়নি।
" হ্যাঁরে। তোর নাম কী রে? সেটাই তো জানলাম না। "
উত্তর এলো, " রাহুল, নাম তো সুনা হোগা! "
ঠোঁটের কোণের এক কুচি হাসিটা...
Monday, October 30, 2017
আজি দখিন দুয়ার খোলা ৪ঃ জীবন যেমন চলছে চলুক
আমি আমার বাবা মায়ের একমাত্র সন্তান, ছোট থেকেই বন্ধুবান্ধবদের মুখে তাদের ভাই বোন দাদা দিদিদের কথা শুনে মাঝে মাঝে মনে হত,আমার নিজের একখানা দাদা/দিদি/ভাই/বোন থাকলে তো বেশ হয়। তারপরে আই আই টিতে এসে যখন দেখলাম এই সিব্লিং পাতানোর স্যাম্পল সাইজটা বেশ বেশ ভালো এবং বড়, আমি আর বেশী দেরি করিনি। বোনের সংখ্যা একটু কম (সবচেয়ে বেশী যাদের নাম বলব, ভাস্বতী আর অনিন্দিতা। অমৃতার কথা আগের পর্বেই বলেছি। এছাড়া সায়ন্তীর কথা না বললেই না। মেয়েটা আমায় এত ভালোবাসে, এত যত্ন করে আমার, খুব খেয়াল রাখে। গত শীতে আমি সাইকেল থেকে উল্টে চিতপটাং যখন, ও ছিল সাক্ষাৎ আমার সান্টা ক্লজ।), দাদা দিদি প্রায় নেইই বলা চলে (এর কারণ হল আমি নিজেই তো প্রায় প্রাগৈতিহাসিক যুগের মানুষ, এখানে আমার চেয়ে বয়সে বড় খুব বেশী লোকজন নেই, থাকলেও চেনা না।) । তবে ভাইয়ের সংখ্যা এত বেশীমাত্রায় অধিক যে আমার চারপাশে মাঝেমধ্যেই "দিদি দিদি" বলে হাঁকপাঁক শোনা যায়। এবং সেই ডাক এতটাই জোরে হয় যে দুই হাজার কিমি দূরে বসেও মানুষ কাজ করতে করতে একবার ভেবে ফেলেন, নিশি ডাকল নাকি।
ক্যাম্পাসে আমাদের একটি বাঙালি এসোসিয়েশন আছে, নাম দিগন্ত। দিগন্ততে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করতে গিয়েই মূলত এদের সাথে আলাপ। অয়ন, চন্দন, ঋতেন্দু, শরণ্য এরা হচ্ছে যাকে বলে একদম প্রাণাধিক প্রিয়। এদের সাথে উঠতে বসতে যেমন ঝগড়া হয়, তেমনি এরা না থাকলে মনে হয় কিছু একটা মিসিং। আমার যত দাবী ওদেরই কাছে আর ওদেরও যত আবদার আমার কাছে। যেমন তেড়ে ঝগড়া করি, তেমনি আবার চোখ বন্ধ করে ভরসা করে মন খারাপ হলেই দুঃখর ঝাঁপি ওদের কাছেই পেশ করি। এছাড়া আরো আছে কয়েকজন, যেমন সৌরভ, নীলাঞ্জন, দেবজ্যোতি। একসাথে এদের অনেকের সাথেই খুচখাচ বেড়াতে টেরাতে (ইয়েলাগিরি, কোল্লি হিলস, পন্ডিচেরি, মহাবলিপুরম) গিয়েওছি। ওদের সাথে এই হৃদ্যতা বাড়ে আরো বেশী করে বন্যার সময়ে।
২০১৫ সালে ডিসেম্বর মাস নাগাদ আমাদের এখানে ভয়ঙ্কর বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল। বেশ কিছুদিন ধরে ভারী বৃষ্টি হয়ে রাস্তাঘাট জলমগ্ন, সাবস্টেশন জলে ডুবে বলে কম্পালসরি পাওয়ার কাট। বাহাত্তর ঘণ্টা আমরা বিনা বিদ্যুতে ছিলাম। আই আই টিতে হোস্টেলগুলির নাম সব নদীর নামে। যেমন কৃষ্ণা, কাবেরি, ব্রহ্মপুত্র, সিন্ধু, তুঙ্গ-ভদ্রা, সরযূ, সবরমতি, অলকানন্দা, যমুনা, গঙ্গা (কখনো কোন দরকারে গঙ্গা জল লাগবে শুনলে প্রথম যে পিজেটা মাথায় আসে, গঙ্গা হোস্টেলের কলের জল আনলেই হয়!!) ইত্যাদি। আমার হোস্টেল সবরমতি। পরিচিতা থাকত অন্য হোস্টেলে, সরযূতে। যেহেতু আমরা বাকি মেয়েরা থাকতাম সবরমতিতে, ও তাই আমাদের এখানে চলে এসেছিল। বাইরে যখন হোস্টেলগুলি নিজেদের নামের মহিমা অক্ষুণ্ণ রাখতে ব্যস্ত (ভালোমতো স্রোতস্বিনী নদী বইত) , তখন আমরা হস্টেলের ভিতরে ব্যস্ত রাজ্যের গল্প নিয়ে। পি এন পি সি থেকে শুরু করে গভীর জীবনদর্শন কিচ্ছুটি বাদ যায়নি। কারেন্ট নেই, রাস্তাঘাটে জল থইথই, ওই অবস্থায় তো আর ল্যাবে যাওয়া যায়না। কাজেই হঠাৎ পাওয়া ছুটি। সকাল হতে হতেই আমরা কোনোমতে মেসে ব্রেকফাস্ট করে বেরোতাম এডমিন বিল্ডিং। সারা ক্যাম্পাসে তখন শুধুই ওখানে এমারজেন্সি পাওয়ার থাকত, উদ্দেশ্য ফোনটা একটু চার্জ দেওয়া। এবং কষ্টেসৃষ্টে যদি একটু ফোনের টাওয়ার পাওয়া যায়, তাহলে বাড়িতে কথা বলা। মোবাইলে সিগন্যাল পাওয়া ভারী দুষ্কর ছিল, ল্যান্ডফোন ওই কটাদিন দারুণ সার্ভিস দিয়েছিল। সারা বছর হোস্টেলের ল্যান্ডলাইনে কোন রিং শোনা যায়না, আর ওই কদিন একের পর এক শুধু ফোন এসে যাচ্ছে। কখনো ৪৩২, কখনো ৪৪০। যেই ধরছে, যার জন্য ফোন তাকে ডেকে দিচ্ছে। ভাগ্যক্রমে আমার বি এস এন এল কানেকশন থেকে এস এম এস যাচ্ছিল, বাড়িতে ওইভাবেই যোগাযোগ রেখেছিলাম। অন্যান্যদিনে মেসে যেই উপমা দেখলে নাক সিটকে চলে যাই, বন্যার সময় ওই কটাদিন সেই খাবারই সোনামুখ করে খেতাম। প্রতিটা মিল খেতে যাওয়ার সময় ভাবতাম, কে জানে এরপরেরটা পাবো কি না। একেই তো বৃষ্টি থামার কোন সিন নেই, তার উপর দোকান বাজার বন্ধ, মেসেই বা কোথা থেকে খাবার আসবে। ওই ডাল ভাত আর আঁচার পেলেই তখন কী খুশী। পাওয়ার নেই, পাম্পে জল উঠবে না, তাই স্নান করা নিয়েও প্রায় রেস্ট্রিকশন, এর মধ্যেও দেখতাম কিছু লোকজন কোমরছাপানো লম্বা চুল শ্যাম্পু করছে, বালতি বালতি জামাকাপড় কাচছে, সত্যি বাবা, কত বিভিন্ন ধরণের মানুষ যে হতে পারে, হোস্টেল লাইফ না হলে বোঝা যায় না।
তো যাই হোক, যা বলছিলাম, আমি এত এক কথা বলতে অন্য কথায় চলে যাই, কি বলি। ক্ষমা করে দেবেন মাঝে মাঝে। হ্যাঁ, এই ঝড়বৃষ্টির মধ্যে একদিন হয়েছে কি, আমার ভারী চিন্তা শুরু হয়েছে, আমার ভাইগুলো সব ঠিক আছে তো? কোন খবর পাচ্ছিনা, ফোনে কথা হচ্ছেনা, হোস্টেলের নাম জানি, কিন্তু রুম নম্বর জানিনা, অগত্যা ওই চত্বরে ঘুরে ফিরে এলাম, বাই চান্স যদি দেখা পাই আর খবর পাই। কপাল খারাপ, কারুর সাথেই দেখা হলো না। পরেরদিন কিভাবে, এখন আর মনে নেই, যোগাযোগ হল। তারপর ঠিক হল, অমুক জায়গায় অমুক সময়ে সকলের জমায়েত হবে। আর হলও তাই। তারপর গান গল্প এই করেই কাটত সন্ধ্যেগুলো। অন্ধকার হয়ে এলে টর্চ হাতে করে ওরা আমাদের হোস্টেল অবধি পৌঁছে যেত, আমার ভাইগুলো খুব শিভাল্রাস কিন্তু! ইতিমধ্যে একদিন খুব হিড়িক পড়ল লোকের, দল বেঁধে সব ভাইজাগ ব্যাঙ্গালোর চলে যাবে, বড় বড় বাসে ক্যাম্পাস ভরে গেল, নাকি দুদিনের ওপর কারেন্ট নেই, আর রিস্ক নেওয়া যায়না। বাইরে অবস্থা খুব খারাপ। সকলের বাড়ি থেকে খবর আসছে, টিভিতে ভয়াবহ সব চিত্র দেখাচ্ছে, আমরা তো ক্যাম্পাসে অনেকটাই নিরাপদে ছিলাম। ওই কারেন্ট ছিল না আর জল ভেঙ্গে এদিক ওদিক করছিলাম আর মেসের (অমৃত) খাবার খাচ্ছিলাম। আমরা তাই ঘটনার ভয়াবহতা অতটা আন্দাজ করতে পারিনি, কিন্তু যখন একটা মাস এক্সোডাস শুরু হল, আমরা তখন যেন একটু হলেও চিন্তা করতে শুরু করলাম, উৎকণ্ঠা হতে লাগল। যে যার বন্ধুবান্ধবরা আছে ব্যাঙ্গালরে, খবর নেওয়া শুরু করলাম, একটু আশ্রয় পাওয়া যাবে কি না গেলে। বাড়ির থেকে অবশ্যই বারবার বলছিল যে ক্যাম্পাসের মত সেফ আর কোত্থাও না, যেয়ো না হ্যানাত্যানা। এদিকে আমাদের তখন হঠাৎ করেই যেন ভয় বেড়ে গিয়েছে, ক্যাম্পাস খালি হয়ে যাচ্ছে, ঘুটঘুট্টি অন্ধকার, এক বন্ধুর তখন জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছে, সব মিলিয়ে সকলেই টেন্সড। এমনিতেই আমাদের ক্যাম্পাস যেহেতু জঙ্গলের মধ্যে, হাজার একটা পোকামাকড় আছে, বৃষ্টির জমা জলে যে কত সাপখোপ, বিছে ইত্যাদি থাকছে, ভাবলেইগা শিরশির করে উঠছে। এমন অবস্থায় এমারজেন্সি পাওয়ার দিয়ে হঠাৎ পুরো "Let there be light" বলে যেন আলো এলো, সেই আলো দেখে প্রচণ্ড কলরব শুরু হল। যে যার নিজের নিজের ঘরে তখন ছোটো, ফোনে চার্জ দাও, অথচ চার্জ দিয়ে বা কি হবে, টাওয়ার বাবাজীর দেখা আসতে আরো দিন দুইএক লেগেছিল। ক্রমে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হল,তারপরে ইন্টারনেট আসতে খবরের মাধ্যমে দেখলাম, সত্যি, এমন সব ভিস্যুয়ালস, বাড়ির লোক ভয় পাবে না কেন!
এই বন্যার সময়েই চেন্নাই বেঙ্গলী ফেসবুক গ্রুপের অন্যতম মেম্বার, পুন্ডরিকদা একটা whatsapp গ্রুপ বানিয়েছিল, উদ্দেশ্য ছিল ম্যাক্সিমাম লোককে একসাথে রাখা, সকলের খবর যাতে পাওয়া যায়। প্রত্যেকে তখন একে অপরকে যতটা পেরেছে সাহায্যও করেছে, কোথায় জল নেমেছে, কার বাড়িতে খুব জল, তাই অন্যের বাড়ি এসে থাকার আমন্ত্রণ, এটিএমে টাকা কোথায় আছে, আরও কত কিছু।
২০১৬ ডিসেম্বরে এলো সাইক্লোন Vardah, জনজীবনের সেইভাবে ক্ষতি করতে পারেনি খুব বেশী, আসলে বন্যার পর সকলেই মোটামুটি প্রস্তুত ছিল। কিন্তু আমার সাধের ক্যাম্পাসের সৌন্দর্য অনেকটাই ম্লান হয়ে গিয়েছে। ঝড়ে এত গাছ পড়েছিল, জায়গায় জায়গায় ন্যাড়া দেখলে এখনো মন খারাপ হয়। নভেম্বর ডিসেম্বর আসলে North East Monsoon বা Retreating Monsoonএর সময়, তাই এই কটা মাস চেন্নাইবাসী বেশ তটস্থ থাকি আমরা। এই যেমন গত কয়েকদিন তুমুল বৃষ্টি হল, সঙ্গে সঙ্গে আমাদের চেন্নাই বেঙ্গলী ফেসবুক পেজ সক্রিয় হয়ে গেল। যে যেখান থেকে পারছে (মোটামুটি) জেনুইন তথ্য সরবরাহ করতে থাকে, মুহূর্তে মুহূর্তে। আমরা আসলে ঘরপোড়া গরু, সিঁদুরে মেঘ দেখলেই ভয় পাই, আকাশ একটু কালো হতেই শুকনো খাবার স্টক করি, এখনো ফোন প্রায় সর্বক্ষণ চার্জে বসিয়ে রাখি।
এই চেন্নাই বেঙ্গলী (সিবি বলেই বেশী পরিচিত) গ্রুপ হল একটা অন্যতম ব্যাপার যার জন্য আমার চেন্নাইতে থাকাটা খুবই সুখকর হয়েছে এ যাবৎ। ২০১৩ সালে তেমনভাবে কাউকেই চিনতাম না, তাই আমি সেইবারে পুজোয় খুব মনমরা ছিলাম। রিম্পা অর্ক (ওদের কথা একেবারে শুরুতে বলেছিলাম, মনে আছে? বাবা রে, ওদের বিয়েটা হয়েছিল একদম বন্যার পরেপরে। ওরা কত এডভেঞ্চার করে চেন্নাই থেকে ব্যাঙ্গালোর হয়ে তারপরে হায়দ্রাবাদ থেকে ফ্লাইট পেয়ে কলকাতা গিয়েছিল বিয়ে করতে!!) সুজাতা অরিজিতা কস্তূরী এদের সাথে এঞ্জয় করলেও সেই কলকাতার ফিলটা আসেনি। তাই সেইবারে পণ করেছিলাম, দাঁতে দাঁত চিপে সারা বছর ছুটি না নিয়ে পুজোয় বাড়ি যাবো। তবে এবার ছুটি নিইনি পুজোয়, কিন্তু এই বছর এই চেন্নাই বেঙ্গলীর সূত্রে এত বন্ধু পেলাম, সকলে মিলে প্রচণ্ড আনন্দ করে পুজো কাটিয়েছি, মানে আমি নিজে ভাবতেই পারিনি যে পুজোটা চেন্নাইতে বসেও এত ভালো করে উপভোগ করা যায়। প্রায় ১৪-১৫টা পুজো হয়, অবশ্যই সব কটা বিশাল কিছু না। বড় বড়গুলোর মধ্যে ওই হাতে গোনা কয়েকটা, বেসন্ত নগরে একটা, টি নগর বেঙ্গল এসোসিয়েশনের একটা। এছাড়া নাভালুরেও হয়, তবে সেটা এত বেশী দূর বলে সুজয় দার (সুজয় দার সাথেও পরিচয় এই চেন্নাই বেঙ্গলী গ্রুপেরই সূত্রে, সজ্জন মানুষ, দাদাসুলভ ) বহু নিমন্ত্রণ সত্ত্বেও যাওয়া হয়ে ওঠেনি। মনে আছে পুজোয় বাড়ি যাচ্ছিনা বলে যখন খুব মন খারাপ, তখন তৃণাদি আশ্বাস দিয়েছিল, সবাই মিলে দারুণ কাটবে,আর সত্যিই হলোও তাই! সুজয় দা, রূপম দা, তৃণা দি, বিভেন্দু দা, ধ্রুব দা, রজত, ঈপ্সিতা, কাকীমা (মানে তৃনাদির মা), প্রিয়াঙ্কা সকলে মিলে খুব খুব আনন্দ করেছি। চারটে গাড়ি করে পুজো পরিক্রমা, প্যান্ডেলে আড্ডা, খাওয়া।
পুজোর কিছুদিন আগে হয়েছিল সিবি গ্রুপের এন্যুয়াল ফাংশান, সাগরিকা। গত বছর দর্শক হলেও এবারে মূলত তৃণাদির উদ্যোগেই আমিও একটু আধটু অংশ নিলাম। রিহার্সালের দিনগুলো ভারী আনন্দে কাটত, সত্যি বলছি, সারাদিন সারা সপ্তাহ এই রিসার্চের চক্করে পড়ে এইসবই একটু নিঃশ্বাস ফেলার রসদ যোগায়। নতুন করে কত বন্ধু পেলাম, তৈরি হল স্মৃতি।
এই তো, এই করেই চার চারটে বছর কাটিয়ে দিলাম এখানে। প্রথম এসেছিলাম যখন, শহরটা ছিল দুই চোখের বিষ। খালি কলকাতা ভালো, ব্যাঙ্গালোর ভালো এই করে যেতাম। এখন যেন মনে হয়, এ শহর আমার দ্বিতীয় বাড়ি, আমার ঠিকানা। বন্ধু বান্ধব হই হুল্লোড় ঘুরে বেড়ানো (প্রচুর জায়গা আছে এখান থেকে বেড়ানোর, অন্যতম হল শহরের মধ্যে কয়েকটা বিচ, যেমন বিশ্ববিখ্যাত মেরিনা বিচ; এছাড়া তো ইউনেস্কো হেরিটেজ সাইট মহাবলিপুরম, কাঞ্চীপুরম, পন্ডিচেরি, টাডা ফলস, তিরুপতি, হরস্লে হিলস, ইয়ারকাড, ইয়েলাগিরি, কোল্লি হিলস; একটু দূরে গেলে ওইয়ানাড, মুন্নার, ব্যাঙ্গালোর, মাইসোর, উটি, কোদাইকানাল) সিনেমা দেখা (বাংলা সিনেমা পর্যন্ত চারটে এখানে স্ক্রিন হয়েছে, যার মধ্যে একটি, প্রাক্তন , আনানোর দলে অত্যন্ত সক্রিয় ছিলাম এই আমি আর ইয়েতি অভিযান দেখেছিলাম গোটা হলে শুধুমাত্র দুইজন দর্শক আমরা, বিচিত্র অভিজ্ঞতা বটে।), দুর্গা পুজো, ইলিশ (হ্যাঁ সিজনে সেটাও ভালো মতই পাওয়া যায়, দাম অবশ্যই বেশী, কিন্তু পাওয়া যায়) সব মিলিয়ে চেন্নাই সত্যি সত্যি হয়ে উঠেছে "নাম্মা চেন্নাই", অর্থাৎ, আমার চেন্নাই। এই শহরকে বন্যা সাইক্লোনের সময়ে দেখেছি কীভাবে একজোট হয়ে রুখে দাঁড়িয়েছে বিপর্যয়ের মুখে, তেমনি প্রিয় আম্মার মৃত্যুতে কেঁদেও ভাসিয়েছে এই শহর, এই শহরের মধ্যে যেমন আছে বহু প্রাচীন মন্দিরের ঐতিহ্য, তেমনি রয়েছে ফিনিক্স মলের মতো আধুনিকতা, মার্সিডিজ বি এম ডাব্লিউয়ের সাথে তাল মিলিয়ে চলে ঠ্যালাগাড়ি নিয়ে "তাতা" (দাদু) ফুল বিক্রি করতে করতে, সন্ধ্যে হলে মন্দির থেকে ভেসে আসে পবিত্র ধূপের গন্ধ, আবার অন্যদিকে সমুদ্রের মিষ্টি হাওয়া জুড়িয়ে দেয় প্রাণকে।
এই শহর দিয়েছে অনেক কিছু, নিয়েছেও কিছু, তবে পাওয়ার ঝুলিটাই কানায় কানায় ভরে আছে। আর তাই, গর্ব করে বলতে পারি, আমি এই শহরে থেকেছি, আমি চেন্নাইবাসী।
ক্যাম্পাসে আমাদের একটি বাঙালি এসোসিয়েশন আছে, নাম দিগন্ত। দিগন্ততে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করতে গিয়েই মূলত এদের সাথে আলাপ। অয়ন, চন্দন, ঋতেন্দু, শরণ্য এরা হচ্ছে যাকে বলে একদম প্রাণাধিক প্রিয়। এদের সাথে উঠতে বসতে যেমন ঝগড়া হয়, তেমনি এরা না থাকলে মনে হয় কিছু একটা মিসিং। আমার যত দাবী ওদেরই কাছে আর ওদেরও যত আবদার আমার কাছে। যেমন তেড়ে ঝগড়া করি, তেমনি আবার চোখ বন্ধ করে ভরসা করে মন খারাপ হলেই দুঃখর ঝাঁপি ওদের কাছেই পেশ করি। এছাড়া আরো আছে কয়েকজন, যেমন সৌরভ, নীলাঞ্জন, দেবজ্যোতি। একসাথে এদের অনেকের সাথেই খুচখাচ বেড়াতে টেরাতে (ইয়েলাগিরি, কোল্লি হিলস, পন্ডিচেরি, মহাবলিপুরম) গিয়েওছি। ওদের সাথে এই হৃদ্যতা বাড়ে আরো বেশী করে বন্যার সময়ে।
২০১৫ সালে ডিসেম্বর মাস নাগাদ আমাদের এখানে ভয়ঙ্কর বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল। বেশ কিছুদিন ধরে ভারী বৃষ্টি হয়ে রাস্তাঘাট জলমগ্ন, সাবস্টেশন জলে ডুবে বলে কম্পালসরি পাওয়ার কাট। বাহাত্তর ঘণ্টা আমরা বিনা বিদ্যুতে ছিলাম। আই আই টিতে হোস্টেলগুলির নাম সব নদীর নামে। যেমন কৃষ্ণা, কাবেরি, ব্রহ্মপুত্র, সিন্ধু, তুঙ্গ-ভদ্রা, সরযূ, সবরমতি, অলকানন্দা, যমুনা, গঙ্গা (কখনো কোন দরকারে গঙ্গা জল লাগবে শুনলে প্রথম যে পিজেটা মাথায় আসে, গঙ্গা হোস্টেলের কলের জল আনলেই হয়!!) ইত্যাদি। আমার হোস্টেল সবরমতি। পরিচিতা থাকত অন্য হোস্টেলে, সরযূতে। যেহেতু আমরা বাকি মেয়েরা থাকতাম সবরমতিতে, ও তাই আমাদের এখানে চলে এসেছিল। বাইরে যখন হোস্টেলগুলি নিজেদের নামের মহিমা অক্ষুণ্ণ রাখতে ব্যস্ত (ভালোমতো স্রোতস্বিনী নদী বইত) , তখন আমরা হস্টেলের ভিতরে ব্যস্ত রাজ্যের গল্প নিয়ে। পি এন পি সি থেকে শুরু করে গভীর জীবনদর্শন কিচ্ছুটি বাদ যায়নি। কারেন্ট নেই, রাস্তাঘাটে জল থইথই, ওই অবস্থায় তো আর ল্যাবে যাওয়া যায়না। কাজেই হঠাৎ পাওয়া ছুটি। সকাল হতে হতেই আমরা কোনোমতে মেসে ব্রেকফাস্ট করে বেরোতাম এডমিন বিল্ডিং। সারা ক্যাম্পাসে তখন শুধুই ওখানে এমারজেন্সি পাওয়ার থাকত, উদ্দেশ্য ফোনটা একটু চার্জ দেওয়া। এবং কষ্টেসৃষ্টে যদি একটু ফোনের টাওয়ার পাওয়া যায়, তাহলে বাড়িতে কথা বলা। মোবাইলে সিগন্যাল পাওয়া ভারী দুষ্কর ছিল, ল্যান্ডফোন ওই কটাদিন দারুণ সার্ভিস দিয়েছিল। সারা বছর হোস্টেলের ল্যান্ডলাইনে কোন রিং শোনা যায়না, আর ওই কদিন একের পর এক শুধু ফোন এসে যাচ্ছে। কখনো ৪৩২, কখনো ৪৪০। যেই ধরছে, যার জন্য ফোন তাকে ডেকে দিচ্ছে। ভাগ্যক্রমে আমার বি এস এন এল কানেকশন থেকে এস এম এস যাচ্ছিল, বাড়িতে ওইভাবেই যোগাযোগ রেখেছিলাম। অন্যান্যদিনে মেসে যেই উপমা দেখলে নাক সিটকে চলে যাই, বন্যার সময় ওই কটাদিন সেই খাবারই সোনামুখ করে খেতাম। প্রতিটা মিল খেতে যাওয়ার সময় ভাবতাম, কে জানে এরপরেরটা পাবো কি না। একেই তো বৃষ্টি থামার কোন সিন নেই, তার উপর দোকান বাজার বন্ধ, মেসেই বা কোথা থেকে খাবার আসবে। ওই ডাল ভাত আর আঁচার পেলেই তখন কী খুশী। পাওয়ার নেই, পাম্পে জল উঠবে না, তাই স্নান করা নিয়েও প্রায় রেস্ট্রিকশন, এর মধ্যেও দেখতাম কিছু লোকজন কোমরছাপানো লম্বা চুল শ্যাম্পু করছে, বালতি বালতি জামাকাপড় কাচছে, সত্যি বাবা, কত বিভিন্ন ধরণের মানুষ যে হতে পারে, হোস্টেল লাইফ না হলে বোঝা যায় না।
তো যাই হোক, যা বলছিলাম, আমি এত এক কথা বলতে অন্য কথায় চলে যাই, কি বলি। ক্ষমা করে দেবেন মাঝে মাঝে। হ্যাঁ, এই ঝড়বৃষ্টির মধ্যে একদিন হয়েছে কি, আমার ভারী চিন্তা শুরু হয়েছে, আমার ভাইগুলো সব ঠিক আছে তো? কোন খবর পাচ্ছিনা, ফোনে কথা হচ্ছেনা, হোস্টেলের নাম জানি, কিন্তু রুম নম্বর জানিনা, অগত্যা ওই চত্বরে ঘুরে ফিরে এলাম, বাই চান্স যদি দেখা পাই আর খবর পাই। কপাল খারাপ, কারুর সাথেই দেখা হলো না। পরেরদিন কিভাবে, এখন আর মনে নেই, যোগাযোগ হল। তারপর ঠিক হল, অমুক জায়গায় অমুক সময়ে সকলের জমায়েত হবে। আর হলও তাই। তারপর গান গল্প এই করেই কাটত সন্ধ্যেগুলো। অন্ধকার হয়ে এলে টর্চ হাতে করে ওরা আমাদের হোস্টেল অবধি পৌঁছে যেত, আমার ভাইগুলো খুব শিভাল্রাস কিন্তু! ইতিমধ্যে একদিন খুব হিড়িক পড়ল লোকের, দল বেঁধে সব ভাইজাগ ব্যাঙ্গালোর চলে যাবে, বড় বড় বাসে ক্যাম্পাস ভরে গেল, নাকি দুদিনের ওপর কারেন্ট নেই, আর রিস্ক নেওয়া যায়না। বাইরে অবস্থা খুব খারাপ। সকলের বাড়ি থেকে খবর আসছে, টিভিতে ভয়াবহ সব চিত্র দেখাচ্ছে, আমরা তো ক্যাম্পাসে অনেকটাই নিরাপদে ছিলাম। ওই কারেন্ট ছিল না আর জল ভেঙ্গে এদিক ওদিক করছিলাম আর মেসের (অমৃত) খাবার খাচ্ছিলাম। আমরা তাই ঘটনার ভয়াবহতা অতটা আন্দাজ করতে পারিনি, কিন্তু যখন একটা মাস এক্সোডাস শুরু হল, আমরা তখন যেন একটু হলেও চিন্তা করতে শুরু করলাম, উৎকণ্ঠা হতে লাগল। যে যার বন্ধুবান্ধবরা আছে ব্যাঙ্গালরে, খবর নেওয়া শুরু করলাম, একটু আশ্রয় পাওয়া যাবে কি না গেলে। বাড়ির থেকে অবশ্যই বারবার বলছিল যে ক্যাম্পাসের মত সেফ আর কোত্থাও না, যেয়ো না হ্যানাত্যানা। এদিকে আমাদের তখন হঠাৎ করেই যেন ভয় বেড়ে গিয়েছে, ক্যাম্পাস খালি হয়ে যাচ্ছে, ঘুটঘুট্টি অন্ধকার, এক বন্ধুর তখন জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছে, সব মিলিয়ে সকলেই টেন্সড। এমনিতেই আমাদের ক্যাম্পাস যেহেতু জঙ্গলের মধ্যে, হাজার একটা পোকামাকড় আছে, বৃষ্টির জমা জলে যে কত সাপখোপ, বিছে ইত্যাদি থাকছে, ভাবলেইগা শিরশির করে উঠছে। এমন অবস্থায় এমারজেন্সি পাওয়ার দিয়ে হঠাৎ পুরো "Let there be light" বলে যেন আলো এলো, সেই আলো দেখে প্রচণ্ড কলরব শুরু হল। যে যার নিজের নিজের ঘরে তখন ছোটো, ফোনে চার্জ দাও, অথচ চার্জ দিয়ে বা কি হবে, টাওয়ার বাবাজীর দেখা আসতে আরো দিন দুইএক লেগেছিল। ক্রমে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হল,তারপরে ইন্টারনেট আসতে খবরের মাধ্যমে দেখলাম, সত্যি, এমন সব ভিস্যুয়ালস, বাড়ির লোক ভয় পাবে না কেন!
এই বন্যার সময়েই চেন্নাই বেঙ্গলী ফেসবুক গ্রুপের অন্যতম মেম্বার, পুন্ডরিকদা একটা whatsapp গ্রুপ বানিয়েছিল, উদ্দেশ্য ছিল ম্যাক্সিমাম লোককে একসাথে রাখা, সকলের খবর যাতে পাওয়া যায়। প্রত্যেকে তখন একে অপরকে যতটা পেরেছে সাহায্যও করেছে, কোথায় জল নেমেছে, কার বাড়িতে খুব জল, তাই অন্যের বাড়ি এসে থাকার আমন্ত্রণ, এটিএমে টাকা কোথায় আছে, আরও কত কিছু।
২০১৬ ডিসেম্বরে এলো সাইক্লোন Vardah, জনজীবনের সেইভাবে ক্ষতি করতে পারেনি খুব বেশী, আসলে বন্যার পর সকলেই মোটামুটি প্রস্তুত ছিল। কিন্তু আমার সাধের ক্যাম্পাসের সৌন্দর্য অনেকটাই ম্লান হয়ে গিয়েছে। ঝড়ে এত গাছ পড়েছিল, জায়গায় জায়গায় ন্যাড়া দেখলে এখনো মন খারাপ হয়। নভেম্বর ডিসেম্বর আসলে North East Monsoon বা Retreating Monsoonএর সময়, তাই এই কটা মাস চেন্নাইবাসী বেশ তটস্থ থাকি আমরা। এই যেমন গত কয়েকদিন তুমুল বৃষ্টি হল, সঙ্গে সঙ্গে আমাদের চেন্নাই বেঙ্গলী ফেসবুক পেজ সক্রিয় হয়ে গেল। যে যেখান থেকে পারছে (মোটামুটি) জেনুইন তথ্য সরবরাহ করতে থাকে, মুহূর্তে মুহূর্তে। আমরা আসলে ঘরপোড়া গরু, সিঁদুরে মেঘ দেখলেই ভয় পাই, আকাশ একটু কালো হতেই শুকনো খাবার স্টক করি, এখনো ফোন প্রায় সর্বক্ষণ চার্জে বসিয়ে রাখি।
এই চেন্নাই বেঙ্গলী (সিবি বলেই বেশী পরিচিত) গ্রুপ হল একটা অন্যতম ব্যাপার যার জন্য আমার চেন্নাইতে থাকাটা খুবই সুখকর হয়েছে এ যাবৎ। ২০১৩ সালে তেমনভাবে কাউকেই চিনতাম না, তাই আমি সেইবারে পুজোয় খুব মনমরা ছিলাম। রিম্পা অর্ক (ওদের কথা একেবারে শুরুতে বলেছিলাম, মনে আছে? বাবা রে, ওদের বিয়েটা হয়েছিল একদম বন্যার পরেপরে। ওরা কত এডভেঞ্চার করে চেন্নাই থেকে ব্যাঙ্গালোর হয়ে তারপরে হায়দ্রাবাদ থেকে ফ্লাইট পেয়ে কলকাতা গিয়েছিল বিয়ে করতে!!) সুজাতা অরিজিতা কস্তূরী এদের সাথে এঞ্জয় করলেও সেই কলকাতার ফিলটা আসেনি। তাই সেইবারে পণ করেছিলাম, দাঁতে দাঁত চিপে সারা বছর ছুটি না নিয়ে পুজোয় বাড়ি যাবো। তবে এবার ছুটি নিইনি পুজোয়, কিন্তু এই বছর এই চেন্নাই বেঙ্গলীর সূত্রে এত বন্ধু পেলাম, সকলে মিলে প্রচণ্ড আনন্দ করে পুজো কাটিয়েছি, মানে আমি নিজে ভাবতেই পারিনি যে পুজোটা চেন্নাইতে বসেও এত ভালো করে উপভোগ করা যায়। প্রায় ১৪-১৫টা পুজো হয়, অবশ্যই সব কটা বিশাল কিছু না। বড় বড়গুলোর মধ্যে ওই হাতে গোনা কয়েকটা, বেসন্ত নগরে একটা, টি নগর বেঙ্গল এসোসিয়েশনের একটা। এছাড়া নাভালুরেও হয়, তবে সেটা এত বেশী দূর বলে সুজয় দার (সুজয় দার সাথেও পরিচয় এই চেন্নাই বেঙ্গলী গ্রুপেরই সূত্রে, সজ্জন মানুষ, দাদাসুলভ ) বহু নিমন্ত্রণ সত্ত্বেও যাওয়া হয়ে ওঠেনি। মনে আছে পুজোয় বাড়ি যাচ্ছিনা বলে যখন খুব মন খারাপ, তখন তৃণাদি আশ্বাস দিয়েছিল, সবাই মিলে দারুণ কাটবে,আর সত্যিই হলোও তাই! সুজয় দা, রূপম দা, তৃণা দি, বিভেন্দু দা, ধ্রুব দা, রজত, ঈপ্সিতা, কাকীমা (মানে তৃনাদির মা), প্রিয়াঙ্কা সকলে মিলে খুব খুব আনন্দ করেছি। চারটে গাড়ি করে পুজো পরিক্রমা, প্যান্ডেলে আড্ডা, খাওয়া।
পুজোর কিছুদিন আগে হয়েছিল সিবি গ্রুপের এন্যুয়াল ফাংশান, সাগরিকা। গত বছর দর্শক হলেও এবারে মূলত তৃণাদির উদ্যোগেই আমিও একটু আধটু অংশ নিলাম। রিহার্সালের দিনগুলো ভারী আনন্দে কাটত, সত্যি বলছি, সারাদিন সারা সপ্তাহ এই রিসার্চের চক্করে পড়ে এইসবই একটু নিঃশ্বাস ফেলার রসদ যোগায়। নতুন করে কত বন্ধু পেলাম, তৈরি হল স্মৃতি।
এই তো, এই করেই চার চারটে বছর কাটিয়ে দিলাম এখানে। প্রথম এসেছিলাম যখন, শহরটা ছিল দুই চোখের বিষ। খালি কলকাতা ভালো, ব্যাঙ্গালোর ভালো এই করে যেতাম। এখন যেন মনে হয়, এ শহর আমার দ্বিতীয় বাড়ি, আমার ঠিকানা। বন্ধু বান্ধব হই হুল্লোড় ঘুরে বেড়ানো (প্রচুর জায়গা আছে এখান থেকে বেড়ানোর, অন্যতম হল শহরের মধ্যে কয়েকটা বিচ, যেমন বিশ্ববিখ্যাত মেরিনা বিচ; এছাড়া তো ইউনেস্কো হেরিটেজ সাইট মহাবলিপুরম, কাঞ্চীপুরম, পন্ডিচেরি, টাডা ফলস, তিরুপতি, হরস্লে হিলস, ইয়ারকাড, ইয়েলাগিরি, কোল্লি হিলস; একটু দূরে গেলে ওইয়ানাড, মুন্নার, ব্যাঙ্গালোর, মাইসোর, উটি, কোদাইকানাল) সিনেমা দেখা (বাংলা সিনেমা পর্যন্ত চারটে এখানে স্ক্রিন হয়েছে, যার মধ্যে একটি, প্রাক্তন , আনানোর দলে অত্যন্ত সক্রিয় ছিলাম এই আমি আর ইয়েতি অভিযান দেখেছিলাম গোটা হলে শুধুমাত্র দুইজন দর্শক আমরা, বিচিত্র অভিজ্ঞতা বটে।), দুর্গা পুজো, ইলিশ (হ্যাঁ সিজনে সেটাও ভালো মতই পাওয়া যায়, দাম অবশ্যই বেশী, কিন্তু পাওয়া যায়) সব মিলিয়ে চেন্নাই সত্যি সত্যি হয়ে উঠেছে "নাম্মা চেন্নাই", অর্থাৎ, আমার চেন্নাই। এই শহরকে বন্যা সাইক্লোনের সময়ে দেখেছি কীভাবে একজোট হয়ে রুখে দাঁড়িয়েছে বিপর্যয়ের মুখে, তেমনি প্রিয় আম্মার মৃত্যুতে কেঁদেও ভাসিয়েছে এই শহর, এই শহরের মধ্যে যেমন আছে বহু প্রাচীন মন্দিরের ঐতিহ্য, তেমনি রয়েছে ফিনিক্স মলের মতো আধুনিকতা, মার্সিডিজ বি এম ডাব্লিউয়ের সাথে তাল মিলিয়ে চলে ঠ্যালাগাড়ি নিয়ে "তাতা" (দাদু) ফুল বিক্রি করতে করতে, সন্ধ্যে হলে মন্দির থেকে ভেসে আসে পবিত্র ধূপের গন্ধ, আবার অন্যদিকে সমুদ্রের মিষ্টি হাওয়া জুড়িয়ে দেয় প্রাণকে।
এই শহর দিয়েছে অনেক কিছু, নিয়েছেও কিছু, তবে পাওয়ার ঝুলিটাই কানায় কানায় ভরে আছে। আর তাই, গর্ব করে বলতে পারি, আমি এই শহরে থেকেছি, আমি চেন্নাইবাসী।
Subscribe to:
Posts (Atom)
