তন্ময়, শুভ্র, আকাশ, দেবারুণ এক্কেবারে যাকে বলে সেই হাফ প্যান্টের বয়স থেকে বন্ধু। এক স্কুল এক পাড়া। সৌভাগ্যবশত কাজের সূত্রেও চারজনই এখনও কলকাতায় আর তাই নিয়মিত আড্ডা বসে ওদের পাড়ার মোড়ের পান সিগারেটের দোকানে। সেরকমই এক আসর আজও বসেছে। কালীপূজো দেওয়ালি শেষ। পরশু থেকে আবার সব অফিস। সকলেই প্রায় মনমরা। ব্যতিক্রম দেবারুণ। বাকিরা দেখছে দেবা সেই আসা ইস্তক ফুরফুরে মেজাজে আছে। মন মেজাজ দিব্যি ভালো। এতটাই ভালো যে কিপ্টে বলে বদনাম যার, সেই দেবাই আজ বাকিদের লেমন সোডাও খাওয়াল। শুভ্র তন্ময় আর আকাশ একে অপরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করছে। বলি হল টা কী ওদের বন্ধুর?
শেষমেশ শুভ্র আর থাকতে না পেরে জিজ্ঞেস করেই ফেলল, "দেবা ব্যাপার কী রে? আজ এত উড়ছিস? কী কেস? ঝুম্পা গ্রিন সিগনাল দিল নাকি?" ঝুম্পা দেবারুণের কলিগ। এই সুন্দরী মেয়েটিকে বেশ কিছু মাস ধরেই পটানোর চেষ্টা করছে দেবা। বন্ধুরা নিয়মিত আপডেট পায় অবশ্য। এখনও অবধি তেমন আশার কিছু দেখেনি।
দেবা একটু লাজুক মুখ করে হেসে বলল, " হ্যাঁ মানে মনে তো হচ্ছে তাই।"
"আরেএএএএ ভাই ভাই ভাই..." বাকি তিনজন পিঠ চাপড়ে "কী ব্যাপার, কী হল, কী করে হল" ইত্যাদি প্রশ্নবাণ হানল দেবারুণের দিকে।
দেবা সেই একইরকম লাজুক লাজুক মুখ করে বলল, "সেদিন আমি ওর টিফিনের মাংস টেস্ট করে এত প্রশংসা করেছিলাম, ও বলেছিল একদিন বাড়িতে নেমন্তন্ন করে খাওয়াবে। তা একটু আগে মেসেজ করলো, বলল কাল ও নাকি অনেক রান্নাবান্না করবে। আমায় যেতে বলল ওর বাড়ি। খাওয়াবে।"
শুভ্র আকাশের দিকে, আকাশ তন্ময়ের দিকে আর তন্ময় শুভ্রর দিকে তাকাল। বেশ সিরিয়াস মুখ করেই। তারপর রীতিমত একই সাথে তিনজনে বলল, "ভাই তুই তো গেলি।"
দেবারুণ অবাক হয়ে বলল, "মানে? কী কেস?"
"ভাই, বুঝছিস না। কাল ভাইফোঁটা রে।"
"তো?"
"আরে এত রেঁধে বেড়ে তোকে ভাইফোঁটার দিনে বাড়িতে ডাকছে। বুঝছিস না? ভাই, তুই তো গেলি..."বলতে বলতে প্রবল অট্টহাসিতে ভেঙ্গে পড়ল ওরা তিনজন। আর দেবারুণ? ওর মুখটা যেন ঠিক চুপসানো ফানুস একটা।
Thursday, November 8, 2018
Monday, November 5, 2018
দীপ্তি
রাত্তির প্রায় আটটা। প্লেনটা গত দশ মিনিট ধরে কলকাতা এয়ারপোর্টের ওপর চক্কর কাটছিল। এয়ার ইন্ডিয়ার ফ্লাইটের উইন্ডো সিট থেকে তিলোত্তমা শহরটিকে দেখে গুঞ্জার মনে হচ্ছিল যেন একটা দামী নেকলেস। ঠিক যেরকম দেখেছিল ও মা, আশাবরীর কর্মস্থলে। কালীপুজোর আগে কয়েকদিন দোকানে খুব ভিড় থাকত, মায়ের ফিরতে অনেক দেরি হত। দিদিমার কাছে বসে স্কুলের পড়া শেষ করে বারান্দায় বসে গল্প শুনত, যতক্ষণ না মা ফিরছে। রূপকথার গল্প শুনতে শুনতে ছোট্ট গুঞ্জা পৌঁছে যেত সব পেয়েছির দেশে। ওর বাস্তবের সাথে দেখানে অনেক অমিল।
আশাবরীর সাথে আবীরের প্রেমজ বিয়ে হয়। মধ্যবিত্ত ঘরের সুশ্রী তন্বী আশার সাথে আবীরের পরিচয় একটি জন্মদিনের পার্টিতে। আবীরের ভাগ্নির জন্মদিন। আশাবরী ছিল ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানির লোক। আবীরের পরিবার মধ্যবিত্ত ঘরের শ্যামলা মেয়েকে প্রথমে মানতে নারাজ হলেও পরে ছেলের জোরাজুরিতে বাধ্য হয় বিয়েতে মত দিতে। বছর খানেকের পর যখন আশার কোল জুড়ে গুঞ্জা আসে, শ্বশুরবাড়ির লোকজন রীতিমতো ছি ছি করেছিল। একেই মেয়ে, তার ওপর মায়ের মতোই শ্যামলা। এক বস্ত্রে সদ্যোজাত মেয়েকে নিয়ে আশা বেরিয়ে আসে সেদিন। আশ্রয় পায় নিজের মায়ের কাছে।
একা হাতে চাকরি করে সংসার চালাত আশাবরী। কোনদিনও মেয়ের লেখাপড়ায় কোন কমতি করেনি। যথাসাধ্য শখ আহ্লাদ পূর্ণ করেছে। তবে গুঞ্জা বুঝত মায়ের দুঃখ। মায়ের সংগ্রাম। আর তাই ছোট্টবেলা থেকেই গুঞ্জার তেমন আবদার ফরমায়েশ ছিল না। বছরের পর বছর ধন্তেরসের দিন মা গল্প করত সেদিন দোকানের বিক্রির কথা। সামর্থ্যের মধ্যে হয়তো কোন বছর জুটত রূপোর দুল। কখনও হয়তো এক কুচি সোনার ফুল।
গুঞ্জা এখন সুপারমডেল। একের পর এক মঞ্চ কাঁপিয়ে বেড়ায়। দেশে বিদেশে। বর্তমানে দেশের এক জনপ্রিয় গয়নার দোকানের ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসাডর। শহরের আনাচে কানাচে ওর ছবি দিয়ে বিজ্ঞাপন। বিভিন্ন গয়না পরে, বিভিন্ন পোশাকে, বিভিন্ন ভঙ্গিতে।
আজ ধন্তেরস। গুঞ্জা আজ মায়ের জন্য ওর বিজ্ঞাপনে পরা সবচেয়ে পছন্দের সেটটি কিনে এনেছে। মায়ের গলায় পরিয়ে তবে শুরু হবে ওর আলোর উৎসব। মায়ের চোখে মুখে যে দীপ্তি দেখবে ও, সেটাই ওর পরম প্রাপ্তি।
আশাবরীর সাথে আবীরের প্রেমজ বিয়ে হয়। মধ্যবিত্ত ঘরের সুশ্রী তন্বী আশার সাথে আবীরের পরিচয় একটি জন্মদিনের পার্টিতে। আবীরের ভাগ্নির জন্মদিন। আশাবরী ছিল ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানির লোক। আবীরের পরিবার মধ্যবিত্ত ঘরের শ্যামলা মেয়েকে প্রথমে মানতে নারাজ হলেও পরে ছেলের জোরাজুরিতে বাধ্য হয় বিয়েতে মত দিতে। বছর খানেকের পর যখন আশার কোল জুড়ে গুঞ্জা আসে, শ্বশুরবাড়ির লোকজন রীতিমতো ছি ছি করেছিল। একেই মেয়ে, তার ওপর মায়ের মতোই শ্যামলা। এক বস্ত্রে সদ্যোজাত মেয়েকে নিয়ে আশা বেরিয়ে আসে সেদিন। আশ্রয় পায় নিজের মায়ের কাছে।
একা হাতে চাকরি করে সংসার চালাত আশাবরী। কোনদিনও মেয়ের লেখাপড়ায় কোন কমতি করেনি। যথাসাধ্য শখ আহ্লাদ পূর্ণ করেছে। তবে গুঞ্জা বুঝত মায়ের দুঃখ। মায়ের সংগ্রাম। আর তাই ছোট্টবেলা থেকেই গুঞ্জার তেমন আবদার ফরমায়েশ ছিল না। বছরের পর বছর ধন্তেরসের দিন মা গল্প করত সেদিন দোকানের বিক্রির কথা। সামর্থ্যের মধ্যে হয়তো কোন বছর জুটত রূপোর দুল। কখনও হয়তো এক কুচি সোনার ফুল।
গুঞ্জা এখন সুপারমডেল। একের পর এক মঞ্চ কাঁপিয়ে বেড়ায়। দেশে বিদেশে। বর্তমানে দেশের এক জনপ্রিয় গয়নার দোকানের ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসাডর। শহরের আনাচে কানাচে ওর ছবি দিয়ে বিজ্ঞাপন। বিভিন্ন গয়না পরে, বিভিন্ন পোশাকে, বিভিন্ন ভঙ্গিতে।
আজ ধন্তেরস। গুঞ্জা আজ মায়ের জন্য ওর বিজ্ঞাপনে পরা সবচেয়ে পছন্দের সেটটি কিনে এনেছে। মায়ের গলায় পরিয়ে তবে শুরু হবে ওর আলোর উৎসব। মায়ের চোখে মুখে যে দীপ্তি দেখবে ও, সেটাই ওর পরম প্রাপ্তি।
Friday, November 2, 2018
SRK and me
একদম ছোটবেলায় যখন প্রথম "জাদু তেরি নজর" শুনি/দেখি, তখন থেকেই লাভ (মানে ওইটুকু বয়সে আদৌ লাভ কী, বোঝা যায় না কি?) অ্যাট ফার্স্ট সাইট। নিজেকে তখন ওঁর হিরোয়িন ভাবতাম। সবাইকে বলতাম, আমার নাম জুহি চাওলা গুপ্ত!!
বাড়িতে কেবিল টিভি ছিল না। তাই রবিবারগুলো হাওড়ায় মাসির বাড়ি যাওয়ার হলেই মুখিয়ে থাকতাম। দুপুর দুটোয় লোকাল কেবিলে তখন সদ্য রিলিজ হওয়া সিনেমাগুলো দিত। মনে আছে একবার পরদেশ সিনেমাটি দেখি। যদিও ওই মারামারি রক্তারক্তি একদম দেখতে পারি না, তবুও ওই "দো দিল মিল রহে হ্যায়" শুনলে বা দেখলেই কেমন ভেবলে যেতাম।
স্কুলে বন্ধুদের দৌলতে তার পরে পরেই কুছ কুছ হোতা হ্যায়, কভি খুশি কভি ঘম এই সিনেমাগুলির কথা শুনলাম। তখন রেডিওতে ওই সিনেমার গান আর নিউজপেপার ম্যাগাজিনে হাঁ করে ছবি গিলে গিয়েছি। আনন্দলোকের পূজাবার্ষিকীগুলোতে গল্প উপন্যাসের চেয়ে গ্লসি কাগজে এস আর কের ছবিগুলো মন্ত্রমুগ্ধের মতো দেখতে থাকতাম।
ক্লাস ইলেভেন পড়াকালীন স্কুল এক্সকারশানে ভাইজাগ গিয়েছিলাম। সেদিন রাত্রে আমাদের ক্যাম্প ফায়ার গোছের কিছু হওয়ার কথা ডিনারের পর। কেউ একজন হোটেলের ঘরে টিভি চালিয়ে দেখেছে ম্যায় হু না হচ্ছে। ব্যস। ঘরে ঘরে খবর পৌঁছে গেল। আমি যত তাড়াতাড়ি পেরেছি ঘরে এসে সিনেমা দেখেছি। একেই শাহরুখ, বাড়তি পাওনা দার্জিলিং।
প্রথম ডেস্কটপ কম্পিউটার আসে হায়ার সেকন্ডারির পর। হ্যাপি কোইন্সিডেন্স, যিনি অ্যাসেম্বল করেছিলেন, মিউজিক ফোল্ডারে চলতে চলতে সিনেমার সব গান দিয়েছিলেন। তখন সদ্য ইন্টারনেটে অভ্যস্ত হচ্ছি। ওয়েবসাইট থেকে গান ডাউনলোড করছি আর ফোনে ট্রান্সফার করছি। তখনও স্মার্টফোন আসেনি, সিম্বিয়ানে চলে। বলা বাহুল্য, সবই ভদ্রলোকের সিনেমার।
কী বা করি আর? ওই যে স্বদেশের মোহন ভারগব হোক বা চক দে ইন্ডিয়ার কবীর খান, কুছ কুছ হোতা হ্যায় হোক বা চেন্নাই এক্সপ্রেস... হাল্কা হেসে গালে টোল পড়া আর ওই ultimate romantic চাউনি... loveriaর শিকার না হয়ে থাকা যায়?
অন্তত একবার আমার দিকে ওরকম ভাবে তাকাক... জিন্দেগি আপনে আপ হসীন হয়ে যাবে...
SRK
১।
ক্লাস এইটের টিনার আজ বেশ মন খারাপ। আবার স্কুল খুলেছে পুজোর পর। এই এক মাস বাড়ি বসে দিব্যি শাহরুখ খানের সিনেমা দেখত। এখন আবার ওই টাইম অ্যান্ড ডিস্টেন্স আর কারেন্টস অফ দি প্যাসিফিক ওশেনের বোরিং ক্লাস। প্লেলিস্টে এস আর কের গান চালিয়ে ইয়ারফোন কানে ক্লাসরুমে নিজের পছন্দের ফ্রন্ট রো সিটে ব্যাগটা রাখতে গিয়ে দেখল একটি ছেলে বসে রয়েছে। নতুন স্টুডেন্ট নাকি? একে তো কখনও দেখে নি?
টিনা কিছু বলল না। ইয়ারফোনটা খুলে ব্যাগটা নিয়ে অন্য বেঞ্চের দিকে যাচ্ছিলই, ঠিক তখন ওর হাতটা ধরে আটকাল ছেলেটি। টিনা পিছন ফিরে তাকালো। হাসি মুখে ওর দিকে তাকিয়ে আছে এটা কে? সেই একইরকম টোল গালে, চুলটা হাল্কা উসকো খুস্কো।
বন্ধুত্বের হাতটা এগিয়ে বলল, "I'm Rahul...নাম তো সুনা হোগা!"
মুহূর্তেই টিনা শুনতে পেল সেই বিখ্যাত ম্যান্ডোলিনের টুং টাং।
২।
বছর তেইশের রাজীব থাপা আর পাঁচটা নেপালী ছেলের মতোই। স্কুলের গণ্ডী পেড়িয়ে এখন মা আর মাসীর সাথে ক্ষেতি করেই দিন চলে। গান পাগল ছেলেটি রাত্রে খাওয়ার পর খোলা আকাশের নিচে প্রিয় গিটার হাতে বলিউডের গান গায় গলা ছেড়ে। ওদের পাশের বাড়ির কাকীমারা নিজেদের বাড়িটাকে ইদানীং হোমস্টে হিসেবে ভাড়া দিচ্ছে। সেখানেরই কিছু বাবুরা রাজীবের গান শুনে এক্কেবারে মুগ্ধ। ওদের নাকি কলকাতায় হোটেল আছে। বলেছে ওকে হোটেলে গান গাইবার সুযোগ দেবে। নিয়মিত টাকা আসবে।
দার্জিলিং মেল থেকে হাওড়া স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে পা রাখল রাজীব। সাদা ফুল শার্ট, কালো কোট আর কালো প্যান্ট পরে। মধ্যে মধ্যে ওর মা ওর দিকে মুগ্ধ দৃষ্টিতে দেখছে। সাধের "রাজু বন গয়া gentleman!"
৩।
চায়ের দোকানের পল্টু ভারি হাসি খুশি ছেলে। বয়স ওই বারো তেরো। সকালবেলা মিউনিসিপ্যালিটির স্কুলে পড়াশোনা করে। দুপুর থেকে বাবার দোকানে হাতে হাতে কাজ এগিয়ে দেয়। একটা আদ্যিকালের কালো রেডিয়োতে সারাক্ষণ বেজে চলেছে হিন্দি বাংলা গান। শুনে শুনে পল্টুর সব মুখস্থ। শারুখ খানের গানগুলো ওর হেব্বি লাগে। রেডিওর অফিসটা আবার ওদের দোকানের পিছনেই। কতবার ওই দাদা দিদিগুলোকে ও চা পৌঁছে দিয়ে এসেছে। কী রংচঙে আপিস। সবাই কী হাসিখুশি। পল্টু এক দুবার কাঁচের দরজার এপার থেকে দেখেছে কেমনভাবে মাইকের সামনে দাদা দিদিগুলো কথা বলে।ও যদি এমন সুযোগ পেতো...
শিশু দিবস উপলক্ষ্যে এই রেডিওর দিদি দাদাগুলো নাকি পল্টুর মতো ছেলে মেয়েদের সেই সুযোগ দেবে। ওরা মানে যারা লেখাপড়ার সাথে সাথে কাজকর্মওকরে, তাদের নিয়ে নাকি অনুষ্ঠান হবে। পল্টু বেজায় খুশি। ওকেও শোনা যাবে রেডিওতে।
বেশ ফিটফাট হয়ে পল্টু রেডিওর আপিসে গিয়েছে আজ। নিচে ওর বাবা রেডিওর একদম সামনে বসে আছে। অধীর অপেক্ষা। যে কোন মুহূর্তে ওর গলা শোনা যাবে। শুনতে পেল এক দিদির গলা, "তোমার নামটা বলো?"
আর তারপরেই বহু প্রতীক্ষিত সেই কণ্ঠ।
"আমায় সবাই পল্টু বলেই চেনে। কিন্তু আমার একটা ভালো নাম আছে। রাহুল। নাম তো সুনা হোগা?"
৪।
ইশ, কী কুক্ষণে যে ফোনটা চার্জ করতে ভুলে গিয়েছিল, চারজারটাও কাজ করছে না। ট্রেনের ভিতরে বসে টেনশন করতে লাগল সিমি। ইউরেল চেপে জুরিখ যাচ্ছে। অ্যানা থাকে। তবে হঠাৎ প্ল্যান বদল করে একদিন আগেই সিমি পৌঁছে যাচ্ছে। অ্যানাকে জানানো হয়নি। তাড়াহুড়োয় ভেবেছিল ট্রেনে উঠে জানিয়ে দেবে। এখন এই বিপত্তি। কী করে কী করবে ও জুরিখে? বড্ড চিন্তা হচ্ছে। ওর কামরাটাও একদম ফাঁকা। কারুর থেকে যে ফোন বা চারজার চাইবে, সেই উপায়ও নেই। এক্কেবারে কাঁদো কাঁদো অবস্থা ওর।
ট্রেন ছুটছে সুইজারল্যান্ডের ভিতর দিয়ে। অপূর্ব প্রাকৃতিক শোভা। এদিকে সিমির সেদিকে চোখ নেই। সানেন স্টেশনে এক যুবক উঠল ওর কামরায়। দেখে তো ভারতীয়ই মনে হল। চোখে কালো চশমা, সাদা শার্টের ওপর গাঢ় নীল জ্যাকেট, স্কাউ ব্লু জিন্স, পিঠে ব্যাকপ্যাক।
ওর উল্টোদিকের সিটে জানলার ধারে বসল। সিমির দিকে তাকিয়ে একবার হাসল।
"এক্সকিউজ মি, ডু ইউ হ্যাভ আ মোবাইল চারজার? মাইন ইস নট ওয়ার্কিং। অ্যান্ড আই নিড টু মেক আ ভেরি ইম্পরট্যান্ট কল টু মাই ফ্রেন্ড ইন জুরিখ। মাই ফোন ইস ডেড", বলল সিমি।
"koi baat nahin senorita.. bade bade desho mein aisi chhoto chhoti baatein hoti rehti hain..."
৫।
প্রাইমারি স্কুলের খেলার মাঠ। টিফিন পিরিয়ডে ছেলেরা দৌড়ঝাঁপ করছে। আজও গাবলু ছোঁওয়াছুঁই খেলায় অক্রমের নাগাল পেল না। উফ, কী জোরে ছুটতে পারে ছেলেটা। কী দম।
"ঠিক আছে। থাম অক্রম। আমি আর ছুটতে পারবো না।"
"দেখলি তো, আজও ধরতে পারলি না আমায়?"
গাবলু একটু হেসে বলল, "জানি তো। ডন কো পকড়না মুশকিল হই নহি, না মুমকিন হ্যায়!"
ক্লাস এইটের টিনার আজ বেশ মন খারাপ। আবার স্কুল খুলেছে পুজোর পর। এই এক মাস বাড়ি বসে দিব্যি শাহরুখ খানের সিনেমা দেখত। এখন আবার ওই টাইম অ্যান্ড ডিস্টেন্স আর কারেন্টস অফ দি প্যাসিফিক ওশেনের বোরিং ক্লাস। প্লেলিস্টে এস আর কের গান চালিয়ে ইয়ারফোন কানে ক্লাসরুমে নিজের পছন্দের ফ্রন্ট রো সিটে ব্যাগটা রাখতে গিয়ে দেখল একটি ছেলে বসে রয়েছে। নতুন স্টুডেন্ট নাকি? একে তো কখনও দেখে নি?
টিনা কিছু বলল না। ইয়ারফোনটা খুলে ব্যাগটা নিয়ে অন্য বেঞ্চের দিকে যাচ্ছিলই, ঠিক তখন ওর হাতটা ধরে আটকাল ছেলেটি। টিনা পিছন ফিরে তাকালো। হাসি মুখে ওর দিকে তাকিয়ে আছে এটা কে? সেই একইরকম টোল গালে, চুলটা হাল্কা উসকো খুস্কো।
বন্ধুত্বের হাতটা এগিয়ে বলল, "I'm Rahul...নাম তো সুনা হোগা!"
মুহূর্তেই টিনা শুনতে পেল সেই বিখ্যাত ম্যান্ডোলিনের টুং টাং।
২।
বছর তেইশের রাজীব থাপা আর পাঁচটা নেপালী ছেলের মতোই। স্কুলের গণ্ডী পেড়িয়ে এখন মা আর মাসীর সাথে ক্ষেতি করেই দিন চলে। গান পাগল ছেলেটি রাত্রে খাওয়ার পর খোলা আকাশের নিচে প্রিয় গিটার হাতে বলিউডের গান গায় গলা ছেড়ে। ওদের পাশের বাড়ির কাকীমারা নিজেদের বাড়িটাকে ইদানীং হোমস্টে হিসেবে ভাড়া দিচ্ছে। সেখানেরই কিছু বাবুরা রাজীবের গান শুনে এক্কেবারে মুগ্ধ। ওদের নাকি কলকাতায় হোটেল আছে। বলেছে ওকে হোটেলে গান গাইবার সুযোগ দেবে। নিয়মিত টাকা আসবে।
দার্জিলিং মেল থেকে হাওড়া স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে পা রাখল রাজীব। সাদা ফুল শার্ট, কালো কোট আর কালো প্যান্ট পরে। মধ্যে মধ্যে ওর মা ওর দিকে মুগ্ধ দৃষ্টিতে দেখছে। সাধের "রাজু বন গয়া gentleman!"
৩।
চায়ের দোকানের পল্টু ভারি হাসি খুশি ছেলে। বয়স ওই বারো তেরো। সকালবেলা মিউনিসিপ্যালিটির স্কুলে পড়াশোনা করে। দুপুর থেকে বাবার দোকানে হাতে হাতে কাজ এগিয়ে দেয়। একটা আদ্যিকালের কালো রেডিয়োতে সারাক্ষণ বেজে চলেছে হিন্দি বাংলা গান। শুনে শুনে পল্টুর সব মুখস্থ। শারুখ খানের গানগুলো ওর হেব্বি লাগে। রেডিওর অফিসটা আবার ওদের দোকানের পিছনেই। কতবার ওই দাদা দিদিগুলোকে ও চা পৌঁছে দিয়ে এসেছে। কী রংচঙে আপিস। সবাই কী হাসিখুশি। পল্টু এক দুবার কাঁচের দরজার এপার থেকে দেখেছে কেমনভাবে মাইকের সামনে দাদা দিদিগুলো কথা বলে।ও যদি এমন সুযোগ পেতো...
শিশু দিবস উপলক্ষ্যে এই রেডিওর দিদি দাদাগুলো নাকি পল্টুর মতো ছেলে মেয়েদের সেই সুযোগ দেবে। ওরা মানে যারা লেখাপড়ার সাথে সাথে কাজকর্মওকরে, তাদের নিয়ে নাকি অনুষ্ঠান হবে। পল্টু বেজায় খুশি। ওকেও শোনা যাবে রেডিওতে।
বেশ ফিটফাট হয়ে পল্টু রেডিওর আপিসে গিয়েছে আজ। নিচে ওর বাবা রেডিওর একদম সামনে বসে আছে। অধীর অপেক্ষা। যে কোন মুহূর্তে ওর গলা শোনা যাবে। শুনতে পেল এক দিদির গলা, "তোমার নামটা বলো?"
আর তারপরেই বহু প্রতীক্ষিত সেই কণ্ঠ।
"আমায় সবাই পল্টু বলেই চেনে। কিন্তু আমার একটা ভালো নাম আছে। রাহুল। নাম তো সুনা হোগা?"
৪।
ইশ, কী কুক্ষণে যে ফোনটা চার্জ করতে ভুলে গিয়েছিল, চারজারটাও কাজ করছে না। ট্রেনের ভিতরে বসে টেনশন করতে লাগল সিমি। ইউরেল চেপে জুরিখ যাচ্ছে। অ্যানা থাকে। তবে হঠাৎ প্ল্যান বদল করে একদিন আগেই সিমি পৌঁছে যাচ্ছে। অ্যানাকে জানানো হয়নি। তাড়াহুড়োয় ভেবেছিল ট্রেনে উঠে জানিয়ে দেবে। এখন এই বিপত্তি। কী করে কী করবে ও জুরিখে? বড্ড চিন্তা হচ্ছে। ওর কামরাটাও একদম ফাঁকা। কারুর থেকে যে ফোন বা চারজার চাইবে, সেই উপায়ও নেই। এক্কেবারে কাঁদো কাঁদো অবস্থা ওর।
ট্রেন ছুটছে সুইজারল্যান্ডের ভিতর দিয়ে। অপূর্ব প্রাকৃতিক শোভা। এদিকে সিমির সেদিকে চোখ নেই। সানেন স্টেশনে এক যুবক উঠল ওর কামরায়। দেখে তো ভারতীয়ই মনে হল। চোখে কালো চশমা, সাদা শার্টের ওপর গাঢ় নীল জ্যাকেট, স্কাউ ব্লু জিন্স, পিঠে ব্যাকপ্যাক।
ওর উল্টোদিকের সিটে জানলার ধারে বসল। সিমির দিকে তাকিয়ে একবার হাসল।
"এক্সকিউজ মি, ডু ইউ হ্যাভ আ মোবাইল চারজার? মাইন ইস নট ওয়ার্কিং। অ্যান্ড আই নিড টু মেক আ ভেরি ইম্পরট্যান্ট কল টু মাই ফ্রেন্ড ইন জুরিখ। মাই ফোন ইস ডেড", বলল সিমি।
"koi baat nahin senorita.. bade bade desho mein aisi chhoto chhoti baatein hoti rehti hain..."
৫।
প্রাইমারি স্কুলের খেলার মাঠ। টিফিন পিরিয়ডে ছেলেরা দৌড়ঝাঁপ করছে। আজও গাবলু ছোঁওয়াছুঁই খেলায় অক্রমের নাগাল পেল না। উফ, কী জোরে ছুটতে পারে ছেলেটা। কী দম।
"ঠিক আছে। থাম অক্রম। আমি আর ছুটতে পারবো না।"
"দেখলি তো, আজও ধরতে পারলি না আমায়?"
গাবলু একটু হেসে বলল, "জানি তো। ডন কো পকড়না মুশকিল হই নহি, না মুমকিন হ্যায়!"
Tuesday, October 30, 2018
pujo
এইবারের পুজোটাও চেন্নাইতেই কাটালাম। গত বছর এখানে দুর্গাপুজো কাটানোয় জানতাম যে বাড়ির থেকে দূরে থাকলেও, আনন্দ কম হবে না। আসলে এই গত পাঁচ বছরের ওপর এখানে রয়েছি, এত মানুষজনের সাথে আলাপ পরিচয় হয়েছে, চেন্নাই শহরটা এখন দিব্যি লাগে!
পুজো বলতে আমি পূজাবার্ষিকী বুঝি। সাম্পানের পূজাবার্ষিকী নিয়ে বেশ কিছুদিন টানা খাটাখাটুনির পর পুজো পুজো ভাব আনতে কিনে ফেললাম শারদীয়া দেশ আর বিচিত্রপত্র। এক দিদির থেকে আনন্দমেলাও পেয়ে গেলাম। আমার পুজো দিব্যি শুরু হয়ে গেল। ইতিমধ্যে অবশ্য ওয়াটসঅ্যাপে গ্রুপ তৈরি হয়ে গিয়েছে। পুজোর সময় কে কবে কোন প্যান্ডেলে যাবে, কোথায় কোথায় যাওয়া হবে, সেই সব আলোচনা করতে। সেখান থেকেই একে একে ছবি পাচ্ছি, ঠাকুর আসছে বিভিন্ন প্যান্ডেলে। আলপনা দেওয়া চলছে। পুজো প্রাঙ্গণ সাজছে। তৈরি হচ্ছে আগামী কদিনের কর্মযজ্ঞের জন্য।
ষষ্ঠীর দিন থেকেই নতুন জামা পরতে লাগলাম। এমনই অভ্যেস, বরাবরের। বেশ সাজুগুজু করে ছবিটবি তুলব, ওয়াটসঅ্যাপ, ফেসবুকে দেবো। এতেই আনন্দ। সারাদিন নতুন জামা পরে ল্যাবে কাজকর্ম করে সন্ধ্যেবেলা ঠাকুর দেখতে বেরোলাম। আমাদের চেন্নাইয়ে বেশ কয়েকটা পুজো হয়। প্রায় ১০-১২টা তো বটেই। তবে বড় ও জনপ্রিয় ওই হাতে গোনা কয়েকটিই। তার মধ্যে সবচেয়ে কাছে পড়ে ক্যাম্পাস থেকে, বেসন্ত নগরের সাউথ মাদ্রাস কালচারাল অ্যাসোসিয়েশনের পুজো। ষষ্ঠীতে তাই ওখানেই গেলাম। ঠাকুর প্রতিমা একদম সাবেকি। রঙিন ঝলমলে শাড়ি গয়নায় মাকে সাজানো।
ঠাকুর নমস্কার করে এসে মূল কাজে মন দিলাম। পেট পুজো। পুজো মানেই চুটিয়ে খাওয়া দাওয়া করা আর আড্ডা মারা। সত্যি বলতে কী, প্যান্ডেলে গিয়ে কতবার ঠাকুর নমস্কার করি, মাঝে মাঝে খেয়ালই পড়ে না! বেসন্ত নগরের পুজো চত্বরে দারুণ দারুণ খাবারের স্টল থাকে। রোল বিরিয়ানি চপ ফ্রাই চাউমিন সিঙ্গারা লুচি পরোটা সব। এ ছাড়া মিষ্টি তো আছেই। ঘুরে ঘুরে সব দেখে শুনে প্রথম দিনের পেট পুজোটা সারলাম বিরিয়ানি আর এগ রোল সাঁটিয়ে। চেনা পরিচিত লোকজনের সাথে দেখা হয়েই যায় এখানে, হলও তাই। ফিরলাম হোস্টেল।
ইচ্ছে ছিল পরেরদিন, অর্থাৎ সপ্তমী থেকে দশমী ল্যাবে যাবো না। কিন্তু মানুষ ভাবে এক, হয় আর এক। কিছু পেন্ডিং কাজ পড়ে যায়, সপ্তমী দুপুরটায় ল্যাবে থাকতেই হল। অবশ্য তার আগে সকাল সকাল মাইলাপুরে রামকৃষ্ণ মিশনের মন্দিরে সপ্তমীর পুষ্পাঞ্জলি দিয়ে নিয়েছি। দুপুরে ভোগ প্রসাদের ছবি আসছে ওয়াটসঅ্যাপে। এদিকে আমি কম্পিটারের সামনে বসে চরম মাথা ব্যাথা নিয়েও গ্রাফের পর গ্রাফ প্লট করে চলেছি। আজ কাজটা শেষ করতেই হবে। নইলে কাল আবার বসতে হবে এই নিয়ে। পেটে ছুঁচো ডন বৈঠক দিচ্ছে। উহু। এরকম করে তো চলবে না। অনলাইন খাবার অর্ডার করে ফেললাম। সরু চালের ভাত, ডাল আর গারলিক ফিশ। এনার্জি পেয়ে কাজ শেষ করে হোস্টেলে এসে হাল্কা বিউটি ন্যাপ দিয়ে আবার সন্ধ্যেয় বেরোলাম বেসন্ত নগর। এবার সদলবলে। সঙ্গে ক্যামেরা। প্রচুর ছবি তুললাম। খেলামও অনেক। পুজোর ভোগের খিচুরি তরকারি তো ছিলই, এ ছাড়া মাছ ভাজা থেকে শুরু করে বিরিয়ানি, শেষ পাতে ইয়া বড় বড় কমলাভোগ। আড্ডা টাড্ডাও মারলাম। তারপর আর কী, ব্যাক টু প্যাভিলিয়ন। পরেরদিন অষ্টমী। অঞ্জলি দিতে হবে। রেস্ট দরকার।
অষ্টমীর অঞ্জলি দিলাম টি নগর বেঙ্গলি এসোসিয়েশনের পুজোয়। এবারে বোধহয় ওদের ৮০ না ৮৫তম পুজো ছিল। এসোসিয়েশনের নিজস্ব বিল্ডিঙে হয়। পুজোর জায়গাটা একটু ছোট। আর খুব ভিড়। তার মধ্যেও জায়গা করে নিলাম। ঠাকুরের প্রতিমা সাবেকি। আসলে চেন্নাইয়ে এখনও থিম পুজোর উপদ্রব শুরু হয়নি তো, তাই সব জায়গায় ঠাকুরের রূপ অসামান্য লাগে। কেমন একটা মোহময়ী স্নিগ্ধ মাতৃরূপ। অঞ্জলি দিলাম। সন্ধিপুজো দেখলাম। তারপর পেট পুজো। অতি লোভনীয় লুচি ছোলার ডাল আর রসগোল্লা। বাইরে বৃষ্টি শুরু হয়ে গিয়েছে ততক্ষণে। কাছাকাছির মধ্যে কালীবাড়ি, সেখানে যাওয়া গেল না তাই। আবারও আড্ডা মেরে ভোগ খেতে বসলাম। সাবেকি ভোগ। খিচুরি লাবড়া বেগুনি চাটনি পায়েস। কী অপূর্ব স্বাদ। আহা। সন্ধ্যেয় আবার বেসন্ত নগর। আবারও প্রচুর চেনা লোক। আড্ডা। গল্প। আমার স্কুলের এক বান্ধবীর সাথে দীর্ঘ ষোল বছর পর দেখা হল। আরাত্রিকা। বেশ ভালোই লাগল। ছবি টবি তুললাম। খেলাম দেলাম। পুজোও মাঝামাঝি পর্যায়ে। ক্লান্তি আসছে অল্প করে। একেই পুজো কাটিয়েছি অসহ্য মাথা ব্যথায়। তবুও আনন্দ করব বলে দাঁতে দাঁত চিপে ওষুধ খেয়ে খেয়ে ঘুরেছি এই কটাদিন। বই পড়াও হচ্ছেনা। সব মিলিয়ে বিধ্বস্ত।
তাই নবমীর অঞ্জলি দেওয়া হল না। লাঞ্চের আগে আগে বেসন্ত নগর পৌঁছে গেলাম। আজও সদলবলে। তবে অন্য দল। বলে রাখা ভালো। আমার প্রচুর সার্কেল এখানে। সকলের সাথে মিলে মিশে প্ল্যান করে দেখা সাক্ষাত করতে হয়েছে পুজোয়। আজও ভালো মতনই খ্যাঁটন হল। পোলাও মাংস মাছ ভাজা মিষ্টি তো ছিলই, (ভোগ বাই ডিফল্ট ছিল) সাথে যোগ হল ফুচকা। হ্যাঁ জানি ভাবছেন বাবা, এ মেয়ে কত খায়। হ্যাঁ। ওজন বেড়ে যে কোথায় পৌঁছেছে, লজ্জার মাথা খেয়ে আর মাপিনি!
যাই হোক, নবমীর দুপুরে সব একে তাকে একসাথে নিয়ে আমাদের পরিক্রমায় বেরোনোর কথা ছিল। দেখা গেল লেট হচ্ছে। আমি ধ্রুব দা অপর্ণা দি আর ওদের ছেলে ময়ূখ বেরিয়ে পড়লাম ওলা নিয়ে। রামকৃষ্ণ মিশন পৌঁছতে পৌঁছতে দেখি সুজয়দারা বিরাট টেম্পো ত্র্যাভেলার নিয়ে চলে এসেছে। আর সৈকতদারাও গাড়ি নিয়ে এসে গিয়েছে। ব্যস। আর কী, পুরো গ্রুপ রেডি। এরপর শুধুই ঘোরা। এ গাড়ি থেকে ওই গাড়িতে ফোন করে ডিরেকশন নেওয়া। ছবি তোলা। সিঙ্গল। কাপল। গ্রুপ। সেলফি। মানে যত রকমের কম্বিনেশন হয়। মাঝে চায়ের ব্রেক নেওয়া হল আন্না নগর দক্ষিনী সোসাইটির পুজোয়। বৃষ্টি হয়ে রাস্তায় কাদা। ভিড়। সব মিলিয়ে কালীবাড়ি হয়ে টি নগরে এলাম যখন, ভেবেছিলাম ডিনার প্যাক করে হোস্টেলে ফিরব। ওরে বাবা, ওখানে এত ভিড়, তিলধারণের জায়গা নেই বলা যায়। শুনলাম এগারোটার আগে ডিনার পাওয়াই যাবে না। অগত্যা আবার বেসন্ত নগর। ওলা ছেড়ে দিয়েছি। গাড়ি আর পাওয়া যায় না। এত লোকের ঢল রাস্তায়। সত্যি বলছি, মনে হচ্ছিল, এ কলকাতা নাকি? শেষ মেশ অটো করে বেসন্ত নগর এলাম। মোগলাই পরোটা আর ফিস ফ্রাই প্যাক করে ফিরলাম হোস্টেল।
আর এনার্জি নেই। পরেরদিন তাই আর প্যান্ডেলে যাইনি। পি এইচ ডি স্কলার মানুষ। ফিরলাম ল্যাবে। কাগজে কলমে পুজো শেষ হল। তবে আমার পুজো এখনও চলছে। পরপর বন্ধুরা বাড়ি থেকে ফিরছে। মিষ্টির পর মিষ্টি খাচ্ছি। শারদীয়াগুলো পড়ছি। এছাড়াও আরো অনেক বই কেনা রয়েছে (দুটো তো সপ্তমীর দিন পেলাম)। সেগুলি পড়ছি এক এক করে। পুজোর এই রেশ থাকবে কিছুদিন! অন্তত কালীপূজো অবধি।
পুজো বলতে আমি পূজাবার্ষিকী বুঝি। সাম্পানের পূজাবার্ষিকী নিয়ে বেশ কিছুদিন টানা খাটাখাটুনির পর পুজো পুজো ভাব আনতে কিনে ফেললাম শারদীয়া দেশ আর বিচিত্রপত্র। এক দিদির থেকে আনন্দমেলাও পেয়ে গেলাম। আমার পুজো দিব্যি শুরু হয়ে গেল। ইতিমধ্যে অবশ্য ওয়াটসঅ্যাপে গ্রুপ তৈরি হয়ে গিয়েছে। পুজোর সময় কে কবে কোন প্যান্ডেলে যাবে, কোথায় কোথায় যাওয়া হবে, সেই সব আলোচনা করতে। সেখান থেকেই একে একে ছবি পাচ্ছি, ঠাকুর আসছে বিভিন্ন প্যান্ডেলে। আলপনা দেওয়া চলছে। পুজো প্রাঙ্গণ সাজছে। তৈরি হচ্ছে আগামী কদিনের কর্মযজ্ঞের জন্য।
ষষ্ঠীর দিন থেকেই নতুন জামা পরতে লাগলাম। এমনই অভ্যেস, বরাবরের। বেশ সাজুগুজু করে ছবিটবি তুলব, ওয়াটসঅ্যাপ, ফেসবুকে দেবো। এতেই আনন্দ। সারাদিন নতুন জামা পরে ল্যাবে কাজকর্ম করে সন্ধ্যেবেলা ঠাকুর দেখতে বেরোলাম। আমাদের চেন্নাইয়ে বেশ কয়েকটা পুজো হয়। প্রায় ১০-১২টা তো বটেই। তবে বড় ও জনপ্রিয় ওই হাতে গোনা কয়েকটিই। তার মধ্যে সবচেয়ে কাছে পড়ে ক্যাম্পাস থেকে, বেসন্ত নগরের সাউথ মাদ্রাস কালচারাল অ্যাসোসিয়েশনের পুজো। ষষ্ঠীতে তাই ওখানেই গেলাম। ঠাকুর প্রতিমা একদম সাবেকি। রঙিন ঝলমলে শাড়ি গয়নায় মাকে সাজানো।
ঠাকুর নমস্কার করে এসে মূল কাজে মন দিলাম। পেট পুজো। পুজো মানেই চুটিয়ে খাওয়া দাওয়া করা আর আড্ডা মারা। সত্যি বলতে কী, প্যান্ডেলে গিয়ে কতবার ঠাকুর নমস্কার করি, মাঝে মাঝে খেয়ালই পড়ে না! বেসন্ত নগরের পুজো চত্বরে দারুণ দারুণ খাবারের স্টল থাকে। রোল বিরিয়ানি চপ ফ্রাই চাউমিন সিঙ্গারা লুচি পরোটা সব। এ ছাড়া মিষ্টি তো আছেই। ঘুরে ঘুরে সব দেখে শুনে প্রথম দিনের পেট পুজোটা সারলাম বিরিয়ানি আর এগ রোল সাঁটিয়ে। চেনা পরিচিত লোকজনের সাথে দেখা হয়েই যায় এখানে, হলও তাই। ফিরলাম হোস্টেল।
ইচ্ছে ছিল পরেরদিন, অর্থাৎ সপ্তমী থেকে দশমী ল্যাবে যাবো না। কিন্তু মানুষ ভাবে এক, হয় আর এক। কিছু পেন্ডিং কাজ পড়ে যায়, সপ্তমী দুপুরটায় ল্যাবে থাকতেই হল। অবশ্য তার আগে সকাল সকাল মাইলাপুরে রামকৃষ্ণ মিশনের মন্দিরে সপ্তমীর পুষ্পাঞ্জলি দিয়ে নিয়েছি। দুপুরে ভোগ প্রসাদের ছবি আসছে ওয়াটসঅ্যাপে। এদিকে আমি কম্পিটারের সামনে বসে চরম মাথা ব্যাথা নিয়েও গ্রাফের পর গ্রাফ প্লট করে চলেছি। আজ কাজটা শেষ করতেই হবে। নইলে কাল আবার বসতে হবে এই নিয়ে। পেটে ছুঁচো ডন বৈঠক দিচ্ছে। উহু। এরকম করে তো চলবে না। অনলাইন খাবার অর্ডার করে ফেললাম। সরু চালের ভাত, ডাল আর গারলিক ফিশ। এনার্জি পেয়ে কাজ শেষ করে হোস্টেলে এসে হাল্কা বিউটি ন্যাপ দিয়ে আবার সন্ধ্যেয় বেরোলাম বেসন্ত নগর। এবার সদলবলে। সঙ্গে ক্যামেরা। প্রচুর ছবি তুললাম। খেলামও অনেক। পুজোর ভোগের খিচুরি তরকারি তো ছিলই, এ ছাড়া মাছ ভাজা থেকে শুরু করে বিরিয়ানি, শেষ পাতে ইয়া বড় বড় কমলাভোগ। আড্ডা টাড্ডাও মারলাম। তারপর আর কী, ব্যাক টু প্যাভিলিয়ন। পরেরদিন অষ্টমী। অঞ্জলি দিতে হবে। রেস্ট দরকার।
অষ্টমীর অঞ্জলি দিলাম টি নগর বেঙ্গলি এসোসিয়েশনের পুজোয়। এবারে বোধহয় ওদের ৮০ না ৮৫তম পুজো ছিল। এসোসিয়েশনের নিজস্ব বিল্ডিঙে হয়। পুজোর জায়গাটা একটু ছোট। আর খুব ভিড়। তার মধ্যেও জায়গা করে নিলাম। ঠাকুরের প্রতিমা সাবেকি। আসলে চেন্নাইয়ে এখনও থিম পুজোর উপদ্রব শুরু হয়নি তো, তাই সব জায়গায় ঠাকুরের রূপ অসামান্য লাগে। কেমন একটা মোহময়ী স্নিগ্ধ মাতৃরূপ। অঞ্জলি দিলাম। সন্ধিপুজো দেখলাম। তারপর পেট পুজো। অতি লোভনীয় লুচি ছোলার ডাল আর রসগোল্লা। বাইরে বৃষ্টি শুরু হয়ে গিয়েছে ততক্ষণে। কাছাকাছির মধ্যে কালীবাড়ি, সেখানে যাওয়া গেল না তাই। আবারও আড্ডা মেরে ভোগ খেতে বসলাম। সাবেকি ভোগ। খিচুরি লাবড়া বেগুনি চাটনি পায়েস। কী অপূর্ব স্বাদ। আহা। সন্ধ্যেয় আবার বেসন্ত নগর। আবারও প্রচুর চেনা লোক। আড্ডা। গল্প। আমার স্কুলের এক বান্ধবীর সাথে দীর্ঘ ষোল বছর পর দেখা হল। আরাত্রিকা। বেশ ভালোই লাগল। ছবি টবি তুললাম। খেলাম দেলাম। পুজোও মাঝামাঝি পর্যায়ে। ক্লান্তি আসছে অল্প করে। একেই পুজো কাটিয়েছি অসহ্য মাথা ব্যথায়। তবুও আনন্দ করব বলে দাঁতে দাঁত চিপে ওষুধ খেয়ে খেয়ে ঘুরেছি এই কটাদিন। বই পড়াও হচ্ছেনা। সব মিলিয়ে বিধ্বস্ত।
তাই নবমীর অঞ্জলি দেওয়া হল না। লাঞ্চের আগে আগে বেসন্ত নগর পৌঁছে গেলাম। আজও সদলবলে। তবে অন্য দল। বলে রাখা ভালো। আমার প্রচুর সার্কেল এখানে। সকলের সাথে মিলে মিশে প্ল্যান করে দেখা সাক্ষাত করতে হয়েছে পুজোয়। আজও ভালো মতনই খ্যাঁটন হল। পোলাও মাংস মাছ ভাজা মিষ্টি তো ছিলই, (ভোগ বাই ডিফল্ট ছিল) সাথে যোগ হল ফুচকা। হ্যাঁ জানি ভাবছেন বাবা, এ মেয়ে কত খায়। হ্যাঁ। ওজন বেড়ে যে কোথায় পৌঁছেছে, লজ্জার মাথা খেয়ে আর মাপিনি!
যাই হোক, নবমীর দুপুরে সব একে তাকে একসাথে নিয়ে আমাদের পরিক্রমায় বেরোনোর কথা ছিল। দেখা গেল লেট হচ্ছে। আমি ধ্রুব দা অপর্ণা দি আর ওদের ছেলে ময়ূখ বেরিয়ে পড়লাম ওলা নিয়ে। রামকৃষ্ণ মিশন পৌঁছতে পৌঁছতে দেখি সুজয়দারা বিরাট টেম্পো ত্র্যাভেলার নিয়ে চলে এসেছে। আর সৈকতদারাও গাড়ি নিয়ে এসে গিয়েছে। ব্যস। আর কী, পুরো গ্রুপ রেডি। এরপর শুধুই ঘোরা। এ গাড়ি থেকে ওই গাড়িতে ফোন করে ডিরেকশন নেওয়া। ছবি তোলা। সিঙ্গল। কাপল। গ্রুপ। সেলফি। মানে যত রকমের কম্বিনেশন হয়। মাঝে চায়ের ব্রেক নেওয়া হল আন্না নগর দক্ষিনী সোসাইটির পুজোয়। বৃষ্টি হয়ে রাস্তায় কাদা। ভিড়। সব মিলিয়ে কালীবাড়ি হয়ে টি নগরে এলাম যখন, ভেবেছিলাম ডিনার প্যাক করে হোস্টেলে ফিরব। ওরে বাবা, ওখানে এত ভিড়, তিলধারণের জায়গা নেই বলা যায়। শুনলাম এগারোটার আগে ডিনার পাওয়াই যাবে না। অগত্যা আবার বেসন্ত নগর। ওলা ছেড়ে দিয়েছি। গাড়ি আর পাওয়া যায় না। এত লোকের ঢল রাস্তায়। সত্যি বলছি, মনে হচ্ছিল, এ কলকাতা নাকি? শেষ মেশ অটো করে বেসন্ত নগর এলাম। মোগলাই পরোটা আর ফিস ফ্রাই প্যাক করে ফিরলাম হোস্টেল।
আর এনার্জি নেই। পরেরদিন তাই আর প্যান্ডেলে যাইনি। পি এইচ ডি স্কলার মানুষ। ফিরলাম ল্যাবে। কাগজে কলমে পুজো শেষ হল। তবে আমার পুজো এখনও চলছে। পরপর বন্ধুরা বাড়ি থেকে ফিরছে। মিষ্টির পর মিষ্টি খাচ্ছি। শারদীয়াগুলো পড়ছি। এছাড়াও আরো অনেক বই কেনা রয়েছে (দুটো তো সপ্তমীর দিন পেলাম)। সেগুলি পড়ছি এক এক করে। পুজোর এই রেশ থাকবে কিছুদিন! অন্তত কালীপূজো অবধি।
Monday, October 29, 2018
অগ্নির জন্য
বেলা দেড়টা। নিউ জার্সির লিবার্টি ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টের লাউঞ্জে বসে আছি, বোর্ডিঙের অপেক্ষায়। প্লেন ছাড়তে এখনও প্রায় পঁয়তাল্লিশ মিনিট বাকি। এক্ষুনি আমার প্লেনেরই সহযাত্রী সম্ভবত, বছর উনিশ কুড়ির দুই বঙ্গ তনয়া এসে আমার সাথে সেলফি তুলে গেল। ইন্সটাগ্রামে দেবে। অটোগ্রাফও দিতে হল।
সপ্তাহ খানেকের জন্য এসেছিলাম ইস্ট কোস্টে। এই প্রথম এই দিকে এলাম। উদ্দেশ্য ছিল বিশ্বখ্যাত নিউ ইয়র্ক ফেস্টিভালে রেডিও অ্যাওয়ার্ড অনুষ্ঠানে আবারও এই বছর সানডে সাসপেন্সের জন্য পাওয়া গোল্ডেন প্রাইজটি গ্রহণ করা। এই নিয়ে টানা দশ বছর আমরা এই পুরস্কার পাচ্ছি। এই বারে যেহেতু আমার নির্দেশনায় "কৈলাসে কেলেঙ্কারি"র জন্য অ্যাওয়ার্ড, তাই স্বাভাবিকভাবেই আমি এসেছিলাম পুরস্কার নিতে। কাছাকাছি সময়েই নর্থ অ্যামেরিকা বেঙ্গলি কনভেনশনও ছিল। জার্সি সিটিতে হল। গত দুই বছর ধরে আমন্ত্রণ পেয়েও যাওয়া হয়ে ওঠেনি। এইবারে সেই কাজটিও সেরে এলাম। প্রবাসেও যে আমাদের এত ভালোবাসে লোকে, অনুভব করে খুব ভালো লাগল।
নয় নয় করে প্রায় বারো বছর হয়ে গেল মিরচিতে আছি। ক্যাপ্টেন নানান কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ায় আজকাল ওঁর শোটা এখন আমিই করি। প্রথম যখন এই সুযোগটা আসে আমার কাছে, খুব চ্যালেঞ্জিং লেগেছিল। ক্যাপ্টেন শোটাকে যেই উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছেন, সেখানে পৌঁছনো যে কী কঠিন কাজ হবে, আমি হাড়ে হাড়ে জানতাম। আর আজ তাই যখন সেই শোয়ের জন্যই জায়গায় জায়গায় পুরস্কার পাই, শ্রোতাদের ভালোবাসা পাই, অসম্ভব আনন্দ হয়। এই যেমন গত মাসে রেডিও কনেক্স অ্যাওয়ার্ডে ইস্টার্ন জোনের বেস্ট আর জে হলাম। বা গত বছর পেলাম জনপ্রিয় চ্যানেলের সেরা বাঙালি পুরস্কার। যখন মিরচির অডিশন দিতে গিয়েছিলাম, কখনও ভেবেছিলাম একদিন এই জায়গায় পৌঁছতে পারবো?
এত খ্যাতি, তার জন্য এত এদিক ওদিক যাওয়া আসা, লেগেই রয়েছে। তবুও, যতই হিল্লি দিল্লী ঘুরে বেড়াই না কেন, দিনের শেষে কলকাতায় ফেরার তৃপ্তিটাই আলাদা। এই যে সাতদিন পর আবার কাল বাড়ি ফিরছি, ভেবেই রোমাঞ্চ জাগছে। আবার ঠিক সকাল সাতটা বাজলেই মাইক্রোফোনের সামনে বসব। মিস করেছি এই কদিন, খুব। এতগুলো মানুষের সাথে আবার কানেক্ট করব নিজেকে। দারুণ।
জীবনে তেমনভাবে প্ল্যান করে কখনোই চলিনি। তবু হলফ করে বলতে পারি, যেমনভাবে যে পথে যে গতিতে এগিয়ে চলেছি, এই তো, দিব্যি আছি। প্রায় কোন আক্ষেপ নেই বলা চলে। হুম, "প্রায়"। কেন বললাম? আসলে নিজের জন্য কখনও কারুর কাছে তেমনভাবে দাবী করে উঠতে পারিনি। আবার সময়মতো সঠিক লোককে সঠিক কথাটা বলতে পারিনি। আর তাই, এই যে আমি, এখনও মূর্তিমান "সদা সিঙ্গল" হয়েই রয়ে গেলাম! এটাও অভাবনীয় কিন্তু, শোয়ের ট্যাগলাইন যে এইভাবে ফলে যাবে আমার ব্যক্তিগত জীবনে... যাই হোক, লাইন পড়ছে। উঠি। ষোল ঘণ্টার লম্বা জার্নি। হ্যান্ডব্যাগেই "সেরা সন্দেশ" রাখা আছে। আমার সময় ঠিক কেটে যাবে। জয় গুরু!
সপ্তাহ খানেকের জন্য এসেছিলাম ইস্ট কোস্টে। এই প্রথম এই দিকে এলাম। উদ্দেশ্য ছিল বিশ্বখ্যাত নিউ ইয়র্ক ফেস্টিভালে রেডিও অ্যাওয়ার্ড অনুষ্ঠানে আবারও এই বছর সানডে সাসপেন্সের জন্য পাওয়া গোল্ডেন প্রাইজটি গ্রহণ করা। এই নিয়ে টানা দশ বছর আমরা এই পুরস্কার পাচ্ছি। এই বারে যেহেতু আমার নির্দেশনায় "কৈলাসে কেলেঙ্কারি"র জন্য অ্যাওয়ার্ড, তাই স্বাভাবিকভাবেই আমি এসেছিলাম পুরস্কার নিতে। কাছাকাছি সময়েই নর্থ অ্যামেরিকা বেঙ্গলি কনভেনশনও ছিল। জার্সি সিটিতে হল। গত দুই বছর ধরে আমন্ত্রণ পেয়েও যাওয়া হয়ে ওঠেনি। এইবারে সেই কাজটিও সেরে এলাম। প্রবাসেও যে আমাদের এত ভালোবাসে লোকে, অনুভব করে খুব ভালো লাগল।
নয় নয় করে প্রায় বারো বছর হয়ে গেল মিরচিতে আছি। ক্যাপ্টেন নানান কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ায় আজকাল ওঁর শোটা এখন আমিই করি। প্রথম যখন এই সুযোগটা আসে আমার কাছে, খুব চ্যালেঞ্জিং লেগেছিল। ক্যাপ্টেন শোটাকে যেই উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছেন, সেখানে পৌঁছনো যে কী কঠিন কাজ হবে, আমি হাড়ে হাড়ে জানতাম। আর আজ তাই যখন সেই শোয়ের জন্যই জায়গায় জায়গায় পুরস্কার পাই, শ্রোতাদের ভালোবাসা পাই, অসম্ভব আনন্দ হয়। এই যেমন গত মাসে রেডিও কনেক্স অ্যাওয়ার্ডে ইস্টার্ন জোনের বেস্ট আর জে হলাম। বা গত বছর পেলাম জনপ্রিয় চ্যানেলের সেরা বাঙালি পুরস্কার। যখন মিরচির অডিশন দিতে গিয়েছিলাম, কখনও ভেবেছিলাম একদিন এই জায়গায় পৌঁছতে পারবো?
এত খ্যাতি, তার জন্য এত এদিক ওদিক যাওয়া আসা, লেগেই রয়েছে। তবুও, যতই হিল্লি দিল্লী ঘুরে বেড়াই না কেন, দিনের শেষে কলকাতায় ফেরার তৃপ্তিটাই আলাদা। এই যে সাতদিন পর আবার কাল বাড়ি ফিরছি, ভেবেই রোমাঞ্চ জাগছে। আবার ঠিক সকাল সাতটা বাজলেই মাইক্রোফোনের সামনে বসব। মিস করেছি এই কদিন, খুব। এতগুলো মানুষের সাথে আবার কানেক্ট করব নিজেকে। দারুণ।
জীবনে তেমনভাবে প্ল্যান করে কখনোই চলিনি। তবু হলফ করে বলতে পারি, যেমনভাবে যে পথে যে গতিতে এগিয়ে চলেছি, এই তো, দিব্যি আছি। প্রায় কোন আক্ষেপ নেই বলা চলে। হুম, "প্রায়"। কেন বললাম? আসলে নিজের জন্য কখনও কারুর কাছে তেমনভাবে দাবী করে উঠতে পারিনি। আবার সময়মতো সঠিক লোককে সঠিক কথাটা বলতে পারিনি। আর তাই, এই যে আমি, এখনও মূর্তিমান "সদা সিঙ্গল" হয়েই রয়ে গেলাম! এটাও অভাবনীয় কিন্তু, শোয়ের ট্যাগলাইন যে এইভাবে ফলে যাবে আমার ব্যক্তিগত জীবনে... যাই হোক, লাইন পড়ছে। উঠি। ষোল ঘণ্টার লম্বা জার্নি। হ্যান্ডব্যাগেই "সেরা সন্দেশ" রাখা আছে। আমার সময় ঠিক কেটে যাবে। জয় গুরু!
Monday, October 22, 2018
Post Pujo হ্যাঙ্গাম
পুজো শেষ। কদিনের হইহুল্লোড়ের পর বাচ্চাগুলো মামাবাড়ি থেকে ফিরেছে। একটুও ফাঁকি মারার জো নেই। এতগুলো বই নিয়ে এসেছে মামাবাড়ি থেকে, পড়ার এখন স্কোপই নেই। স্কুল খুললেই পরীক্ষা। আর তাই সারাক্ষণ মায়ের চোখ রাঙানি।
মায়ের কড়া অনুশাসনে ছেলেমেয়েগুলো এতদিন পর সবে আবার বই নিয়ে বসেছে। একগাদা পড়া বাকি। হোমওয়ার্ক রয়েছে। সিলেবাসও এগিয়ে রাখতে হবে। মায়ের হাতে শারদীয়া পত্রিকা। মাঝে মাঝে চায়ের কাপ থেকে এক এক চুমুক দিচ্ছেন আর বইয়ের পাতা থেকে মুখ তুলে বাচ্চাগুলোকে দেখে নিচ্ছেন। "পড়ছিস তো? পরীক্ষায় যেন একটাও যেন সিলি মিস্টেক না হয়। মন দিয়ে পড় বাবা।"
এদিকে পাশে রাখা ফোনটা সমানে টুং টাং করে বেজেই চলেছে। বিরক্ত লেগে যায়। ওয়াটসঅ্যাপ আর ফেসবুকের গুচ্ছের নোটিফিকেশন। লোকগুলো যত বলিহারি। আরে বাবা, এতদিন আনন্দ করলি। বেশ। এবার তো কাজে ফের। তা না। এই গুচ্ছের গুচ্ছের ছবি সব সোশ্যাল মিডিয়ায় আপলোড করতে হবে। আর করবি কর। আবার এত ট্যাগ কেন বাবা? একটুও শান্তিতে থাকতে দিবি না? নিজেদের না হয় এখনও ছুটি। কাজ কর্ম নেই। কিন্তু এই বাচ্চাগুলো তো ডিস্টার্ব ফিল করছে, বোঝে না কেন এরা?
ধুস। রাগের চোটে মা এবার ফোন থেকে নেটই অফ করে দিলেন।
বিঃ দ্রঃ বুঝলেন তো, এক্কেবারে আঁখো দেখা হাল বলছি। স্ট্রেট ফ্রম কৈলাস। মা দুর্গা অ্যান্ড কোংকে এবার একটু নিজেদের মতো থাকতে দিন প্লিজ। নেট অফ আপাতত। সোশ্যাল মিডিয়া থেকে পুরোপুরি বেরিয়ে গেলে সারা বছর আমার আপনার প্রার্থনাগুলো শুনবেন কী করে বলুন তো?
বিঃ বিঃ দ্রঃ জনৈক অনুপম রায়ের একটি বিখ্যাত গান এখন মায়ের কলার ট্যুন।
মায়ের কড়া অনুশাসনে ছেলেমেয়েগুলো এতদিন পর সবে আবার বই নিয়ে বসেছে। একগাদা পড়া বাকি। হোমওয়ার্ক রয়েছে। সিলেবাসও এগিয়ে রাখতে হবে। মায়ের হাতে শারদীয়া পত্রিকা। মাঝে মাঝে চায়ের কাপ থেকে এক এক চুমুক দিচ্ছেন আর বইয়ের পাতা থেকে মুখ তুলে বাচ্চাগুলোকে দেখে নিচ্ছেন। "পড়ছিস তো? পরীক্ষায় যেন একটাও যেন সিলি মিস্টেক না হয়। মন দিয়ে পড় বাবা।"
এদিকে পাশে রাখা ফোনটা সমানে টুং টাং করে বেজেই চলেছে। বিরক্ত লেগে যায়। ওয়াটসঅ্যাপ আর ফেসবুকের গুচ্ছের নোটিফিকেশন। লোকগুলো যত বলিহারি। আরে বাবা, এতদিন আনন্দ করলি। বেশ। এবার তো কাজে ফের। তা না। এই গুচ্ছের গুচ্ছের ছবি সব সোশ্যাল মিডিয়ায় আপলোড করতে হবে। আর করবি কর। আবার এত ট্যাগ কেন বাবা? একটুও শান্তিতে থাকতে দিবি না? নিজেদের না হয় এখনও ছুটি। কাজ কর্ম নেই। কিন্তু এই বাচ্চাগুলো তো ডিস্টার্ব ফিল করছে, বোঝে না কেন এরা?
ধুস। রাগের চোটে মা এবার ফোন থেকে নেটই অফ করে দিলেন।
বিঃ দ্রঃ বুঝলেন তো, এক্কেবারে আঁখো দেখা হাল বলছি। স্ট্রেট ফ্রম কৈলাস। মা দুর্গা অ্যান্ড কোংকে এবার একটু নিজেদের মতো থাকতে দিন প্লিজ। নেট অফ আপাতত। সোশ্যাল মিডিয়া থেকে পুরোপুরি বেরিয়ে গেলে সারা বছর আমার আপনার প্রার্থনাগুলো শুনবেন কী করে বলুন তো?
বিঃ বিঃ দ্রঃ জনৈক অনুপম রায়ের একটি বিখ্যাত গান এখন মায়ের কলার ট্যুন।
Subscribe to:
Posts (Atom)