Friday, December 20, 2019
3
মায়ের শাড়ি শাল ধার করে বিয়েবাড়ির সাজগোজ সম্পূর্ণ করলো রুমুন। আজ ছোটবেলার প্রিয় বান্ধবী, কস্তুরীর রিসেপশন। মা বাবারও নেমন্তন্ন রয়েছে, তবে ওঁরা যাচ্ছেন না। মাকে সাজটা দেখাতে গেলো রুমুন। অবশ্য মায়ের যে কী রিঅ্যাকশন হবে, সেটা মোটামুটি ও জানতো। মায়ের মুখ গম্ভীর। বক্তব্য এই যে, সব্বাই দিব্যি বিয়ে করে থিতু হয়ে যাচ্ছে। ও কবে করবে। মা বাবাকে এখনও পুরো ব্যাপারটা ভালো করে বলেইনি রুমুন। তাই ওঁরাও দ্বিধায়, দ্বন্দ্বে। অবশ্য, বলবেই বা কী? ও কি নিজেই আদৌ জানে? অগ্নির সাথে সম্পর্কটা এখন কোথায় গিয়ে যে দাঁড়িয়েছে...
বিয়েবাড়িতে ভারী মজা হলো। বরপক্ষের বেশ কিছু নিমন্ত্রিতদের সাথে বিয়ের দিনেই আলাপ হয়েছিল রুমুনের। বিশেষ করে বাসর রাত জাগার সময় সবাই মিলে দারুণ আনন্দ করেছিল। আজ বৌভাতের অনুষ্ঠানেও সেই আলাপ ঝালিয়ে নিয়েছিল রুমুন আর ওর বাকি বান্ধবীরা। তাই সন্ধ্যের অনুষ্ঠানেও খাতির যত্ন আলাপ আড্ডা কোনটারই অভাব হলো না। বরের বন্ধুদের মধ্যে সঙ্কল্প বলে ছেলেটি, ডাক্তার, বেশ মিশুকে। তার সাথে রুমুনের ভালোই বন্ধুত্বপূর্ণ খুনসুটি চলেছে। বাসরের রাতে গান বাজনাও ভালোই হয়েছে। রিসেপশনে দেখা হতেই এক গাল হাসি। "বাঃ, তোমাকে তো বেশ লাগছে দেখতে!" রুমুন একটু ব্লাশ করেই ধন্যবাদ জানায়। বান্ধবীরা কিন্তু কেউ মিস করেনি এই কথা। সারা সন্ধ্যে তারা লক্ষ্য করে গেলো, সঙ্কল্প যেন রুমুনের চারিদিকেই থাকার সঙ্কল্প নিয়েছে। কিছুতেই পিছু ছাড়ে না। সারাক্ষণ ওদের সাথেই রইলো। একসাথে ছবি টবিও উঠলো। হোয়াটসঅ্যাপে শেয়ারও হলো, স্টেটাসও হলো।
ফিরতি পথে রুমুন আর ঋত্বিকা একটা ওলা ধরলো। ঋত্বিকা জমিয়ে রুমুনের পিছনে লাগতে থাকল। "কী রে, তাহলে সঙ্কল্প?"
রুমুন একবার তাকায় বান্ধবীর দিকে, কিছু বলেনা। কিন্তু বান্ধবী, সেই কোন ছোট্টবেলার। মুখ চোখ দেখেই বুঝে যায় সব। বলে, "এখনও মিটলো না তোদের?" রুমুন মাথা নাড়ে উত্তরে। ঋত্বিকা প্রশ্ন করে, "তোদের হলো টা কী?" রুমুন বলে, "জানি না রে। আই অ্যাম স্টিল সারচিং ফর অ্যান আনসার।" ঋত্বিকা কথা বাড়ায় না। শুধু বন্ধুর হাতটা স্নেহের পরশে চেপে ভরসা জোগায়। ওর বাড়ি এসে গেলে, ও নেমে পড়ে। রুমুন চলতে থাকে ক্যাবে।
ক্যাবে তখন বাজছে
"Kaisi Teri Khudgarzi
Na Dhoop Chune Na Chhaaon
Kaisi Teri Khudgarzi
Kisi Thor Tike Na Paaon...
Ban Liya Apna Paigambar
Tar Liya Tu Saat Samandar
Phir Bhi Sookha Mann Ke Andar
Kyun Reh Gaya
Re Kabira Maan Jaa
Re Faqeera Maan Jaa
Aaja Tujhko Pukaare Teri Parchhaaiyan
Re Kabira Maan Ja..."
একবার ফোনটা হাতে বের করে। হোয়াটসঅ্যাপে খোলে অগ্নির চ্যাটটা। মেসেজ করবে? কী লিখবে?
বোঝে না। আবার ফোন বন্ধ করে ব্যাগে রেখে দেয়।
****************
অগ্নি প্রতিদিনের মতো চ্যাট উইন্ডো দেখে। রুমুন অনলাইন। অপেক্ষায় থাকে মেসেজের। আসে না...
#রুমুন_অগ্নি
#সীজন২
Thursday, December 19, 2019
(২)
"কীরে, চুপ করে বসে কেন? ফোনের অপেক্ষা নাকি?" বন্ধু অমৃতর ডাকে অগ্নি পিছন ফিরে তাকালো। মাথা নেড়ে না বললো ও। ফোন? কেই বা করবে? বাবা মা জানে ওরা এখন পার্টি করছে। আজকের মত কথা হয়ে গিয়েছে। আর করবে না। অফিসের কলও নেই। উইকেন্ড মোডে সকলে। কেই বা আর করবে ওকে ফোন?
কোরমঙ্গলায় অমৃতর ব্যাচেলর্স প্যাডে আজ ওদের পাঁচ বন্ধুর গেট টুগেদার। অমৃত, অগ্নি, শুভঙ্কর, পল্লব আর সম্রাট। সেই স্কুলবেলার বন্ধু। আজ কর্মসূত্রে একেক শহরে একেকজন। অনেকদিন পর ওরা পঞ্চ পাণ্ডব এক হয়েছে। উদ্দেশ্য তাই আজ সারা রাত জেগে চুটিয়ে গল্প, আড্ডা। অমৃতই সমস্ত আয়োজন করেছে। সকাল থেকে ফ্ল্যাটটা সাজিয়েছে আলো দিয়ে। খাবার দাবার আনানো হয়েছে। পানীয়ও রয়েছে। গল্পের ফোয়ারা বইছে। স্পিকারে বেজে চলেছে পরপর কিছু রেট্রো গান। কিশোর আশা লতা রফি মান্না।
বারান্দায় দাঁড়িয়ে উইস্কির গ্লাস হাতে অন্যমনস্ক হয়ে বাইরে তাকিয়েছিল অগ্নি। দূরে ব্যাঙ্গালোর শহরের ঝাঁ চকচকে রাস্তা, স্ট্রিট লাইট, ঝড়ের বেগে ছুটে চলা গাড়ি। এমন সময়ে কানে এলো, আশা ভোঁসলে গাইছেন,
"তু রুঠা তো ম্যায় রো দুঙ্গি সনম
আজা মেরে, বাহো মে আ।।"
মুহূর্তে একটা পরিচিত কণ্ঠের কাতর অনুনয় মাখা হোয়াটসআপ ভয়েস নোট মনে পড়ে গেলো। ফোনে ঢুকেছিলো গত সপ্তাহে। হ্যাঁ। ঠিক গত বৃহস্পতিবার, রাত দশটা পঁচিশে। যেই মেসেজটি রোজ কম করে অন্তত দশবার শোনে ও। অথচ, মেসেজের রিপ্লাই দেয়নি।
"কীরে অগ্নি, ভিতরে আসবি না? বাইরে কেন? আয়।"
এইবারে আর সম্রাটের ডাককে অগ্রাহ্য করেনা অগ্নি। হাতের মুঠো থেকে ফোনটা পকেটে ভরে রেখে ঘরে ঢোকে। হোয়াটসআপটা খোলাই থেকে যায়।
কয়েক হাজার কিলোমিটার দূরে বসে রুমুন হাঁ করে তাকিয়ে থাকে চ্যাট উইন্ডোতে। 'অনলাইন'। কিন্তু 'টাইপিং' আসে না।
#রুমুন_অগ্নি
#সিজন২
1
ট্যাক্সিতে উঠে সশব্দে দরজা বন্ধ করে রুমুন বললো, "চলুন দাদা।" গাড়িতে এফ এম চলছে। রেট্রো গান। কিন্তু রুমুনের এখন সেইসব দিকে কান যাচ্ছে না। টানা আটচল্লিশ ঘন্টা অফিসে কাজ করে ও বিধ্বস্ত। কাল ক্লায়েন্ট মিটিং, এদিকে এখনো টীম প্রেজেন্টেশন নিয়ে তৈরি না। রুমুন ওদের ফোনে সাপোর্ট দেবে এই আশ্বাস দিয়ে বাড়ি ফিরছে। ওর ক্লান্ত শরীরে আর দিচ্ছেনা। এরই মধ্যে অবিনাশের ফোন এলো। রুমুন যথাসাধ্য নির্দেশ দিলো ওকে। এরপর ফোনটা ছেড়ে জানলার কাঁচে মাথাটা এলিয়ে দিলো ও। আড়চোখে দেখতে পেলো শহরের রাস্তা। গভীর রাত। শুনশান রাজপথ। একটা দুটো গাড়ি সোঁ সোঁ করে পাশ দিয়ে ছুটে চলেছে। হলুদ নিয়নের আলোর আলাদা মাদকতা। রুমুন ট্যাক্সির সীটে শরীরটাকে এলিয়ে দিয়ে চোখ বোজে।
এতক্ষণে কানে ঢোকে এফ এম স্টেশনের গান।
"hum Ko Mili Hai Aaj
ye Ghadiya Naseeb Se
jee Bhar Ke Dekh Leejiye
humko Kareeb Se
phir Apke Naseeb Mein
ye Baat Ho Na Ho
shayad phir Is Janaam Mein
mulakaat Ho Na Ho"
বন্ধ চোখে ভেসে ওঠে একটা মুখ। বহু পরিচিত, বড় আপন, বড্ড কাছের সেই জন। কতদিন দেখেনি সেই মানুষটাকে, মনে পড়ে যায় রুমুনের। দু চোখ ভরে আসে জলে।
#রুমুন_অগ্নি
#সীজন২
ট্যাক্সিতে উঠে সশব্দে দরজা বন্ধ করে রুমুন বললো, "চলুন দাদা।" গাড়িতে এফ এম চলছে। রেট্রো গান। কিন্তু রুমুনের এখন সেইসব দিকে কান যাচ্ছে না। টানা আটচল্লিশ ঘন্টা অফিসে কাজ করে ও বিধ্বস্ত। কাল ক্লায়েন্ট মিটিং, এদিকে এখনো টীম প্রেজেন্টেশন নিয়ে তৈরি না। রুমুন ওদের ফোনে সাপোর্ট দেবে এই আশ্বাস দিয়ে বাড়ি ফিরছে। ওর ক্লান্ত শরীরে আর দিচ্ছেনা। এরই মধ্যে অবিনাশের ফোন এলো। রুমুন যথাসাধ্য নির্দেশ দিলো ওকে। এরপর ফোনটা ছেড়ে জানলার কাঁচে মাথাটা এলিয়ে দিলো ও। আড়চোখে দেখতে পেলো শহরের রাস্তা। গভীর রাত। শুনশান রাজপথ। একটা দুটো গাড়ি সোঁ সোঁ করে পাশ দিয়ে ছুটে চলেছে। হলুদ নিয়নের আলোর আলাদা মাদকতা। রুমুন ট্যাক্সির সীটে শরীরটাকে এলিয়ে দিয়ে চোখ বোজে।
এতক্ষণে কানে ঢোকে এফ এম স্টেশনের গান।
"hum Ko Mili Hai Aaj
ye Ghadiya Naseeb Se
jee Bhar Ke Dekh Leejiye
humko Kareeb Se
phir Apke Naseeb Mein
ye Baat Ho Na Ho
shayad phir Is Janaam Mein
mulakaat Ho Na Ho"
বন্ধ চোখে ভেসে ওঠে একটা মুখ। বহু পরিচিত, বড় আপন, বড্ড কাছের সেই জন। কতদিন দেখেনি সেই মানুষটাকে, মনে পড়ে যায় রুমুনের। দু চোখ ভরে আসে জলে।
#রুমুন_অগ্নি
#সীজন২
Monday, December 16, 2019
চুরমুর
বেশ একটা ফুরফুরে মন নিয়েই রুমুন বেরিয়েছিল বিকেলে। উদ্দেশ্য একটাই, একটু সেন্ট্রাল পার্কে কয়েক চক্কর কেটে তারপর ফুচকাওয়ালার সামনে ভিড় ঠেলে কুড়ি টাকার চুরমুর কিনে বাড়ি ফেরা। বাড়িতে সদ্য লাইব্রেরি থেকে আনা শঙ্কু সমগ্র পড়তে পড়তে জমিয়ে চা সহযোগে সান্ধ্য আহার হয়ে যাবে। ভাবতেই জিভে জল এসে যায় রুমুনের।
গেট থেকে বেরোতেই এক প্রৌঢ় ব্যক্তি ও সাথে খুব সম্ভবত তাঁর স্ত্রীর মুখোমুখি। ভদ্রলোকের পরনে অতি সাধারণ ফতুয়া পাজামা, গায়ে ওই মলিন খয়েরিই বোধহয়, চাদর। চুল একটু কোঁকড়া, উস্কোখুস্কো না হলেও, যত্নের ছাপ স্পষ্ট। সাথে ভদ্রমহিলার পরনে ডুরে শাড়ি, গায়ে তেমনই এক জীর্ণ চাদর। ক্ষণিকের ইতস্ততা কাতিয়ে মলিন হাসিমুখে রুমুনের দিকে এগিয়ে এসে বললেন, "মা, আপনি কি এই এখানেই থাকেন?" রুমুন ভাবল, হয়তো কোন বাড়ির নির্দেশিকা খুঁজছেন। ও ঘাড় নেড়ে হ্যাঁ বলল। ভদ্রমহিলা এবার একটু সাহস করেই এগিয়ে এসে বললেন, "একটু ওষুধ দিয়ে সাহায্য করবেন মা?" রুমুন এবারে অবাক হয়েই ওঁকে জরিপ করে। কোনো চোট আঘাত নাকি? হয়তো ব্যান্ড এড ডেটল জাতীয় কিছু চাইবেন। ও বলে, "বলুন।" ভদ্রলোক এবার এগিয়ে এসে বললেন, "আসলে গত ছয় মাস ধরে আমার চাকরি নেই। আমার স্ত্রী, সাইকিয়াট্রিক পেশেন্ট। তাই..." ভদ্রমহিলা বললেন কাতর কন্ঠে, "একশোটা টাকা দিলেও হবে। একটু সাহায্য করলে... আমার ওষুধ... আপনি কাছেই থাকেন কি? তাহলে যদি এনে দেন।"
রুমুন অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে। না বলতে পারে না। আবার যা দিনকাল, কাকে কতটা কী বিশ্বাস করবে, বুঝে ওঠে না। ওয়ালেটে কড়কড়ে তিনটে পাঁচশো আর বেশ কয়েকটা একশোর নোট থাকলেও বের করতে দ্বিধা হয়। মাথা নিচু করে এগিয়ে যায়। ওঁরা পিছন থেকে কিছু বলতে থাকেন, আশায়... রুমুন হয়তো মত বদলাবে। রুমুন এগিয়ে যায়। ও জানে, এইসব পরিস্থিতে পিছনে ফিরে তাকাতে নেই। ক্ষণিকের জন্য হলেও হাতের টিফিন বাক্সটা একটু ভারী লাগে। তবুও এগিয়ে যায় ও।
ফুচকাওয়ালার সামনে আলু সিদ্ধ, পিঁয়াজ লঙ্কা কুঁচি, তেঁতুল জলের আলাদা সুগন্ধ। সব দ্বিধা দ্বন্দ্ব কেটে যায় ও। "দিন তো, কুড়িটা টাকার চুরমুর" বলে এগিয়ে দেয় টিফিন বাক্স। চুরমুর তৈরি হয়। রুমুন বাড়ি ফেরে। প্রফেসর শঙ্কুর অ্যাডভেঞ্চার অপেক্ষা করে আছে। ভালোই কাটবে সন্ধ্যেটা। একটাই আফশোস, পার্কে কয়েক রাউন্ড হাঁটা হলো না।
রুমুন আজ যথার্থই নাগরিক।
গেট থেকে বেরোতেই এক প্রৌঢ় ব্যক্তি ও সাথে খুব সম্ভবত তাঁর স্ত্রীর মুখোমুখি। ভদ্রলোকের পরনে অতি সাধারণ ফতুয়া পাজামা, গায়ে ওই মলিন খয়েরিই বোধহয়, চাদর। চুল একটু কোঁকড়া, উস্কোখুস্কো না হলেও, যত্নের ছাপ স্পষ্ট। সাথে ভদ্রমহিলার পরনে ডুরে শাড়ি, গায়ে তেমনই এক জীর্ণ চাদর। ক্ষণিকের ইতস্ততা কাতিয়ে মলিন হাসিমুখে রুমুনের দিকে এগিয়ে এসে বললেন, "মা, আপনি কি এই এখানেই থাকেন?" রুমুন ভাবল, হয়তো কোন বাড়ির নির্দেশিকা খুঁজছেন। ও ঘাড় নেড়ে হ্যাঁ বলল। ভদ্রমহিলা এবার একটু সাহস করেই এগিয়ে এসে বললেন, "একটু ওষুধ দিয়ে সাহায্য করবেন মা?" রুমুন এবারে অবাক হয়েই ওঁকে জরিপ করে। কোনো চোট আঘাত নাকি? হয়তো ব্যান্ড এড ডেটল জাতীয় কিছু চাইবেন। ও বলে, "বলুন।" ভদ্রলোক এবার এগিয়ে এসে বললেন, "আসলে গত ছয় মাস ধরে আমার চাকরি নেই। আমার স্ত্রী, সাইকিয়াট্রিক পেশেন্ট। তাই..." ভদ্রমহিলা বললেন কাতর কন্ঠে, "একশোটা টাকা দিলেও হবে। একটু সাহায্য করলে... আমার ওষুধ... আপনি কাছেই থাকেন কি? তাহলে যদি এনে দেন।"
রুমুন অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে। না বলতে পারে না। আবার যা দিনকাল, কাকে কতটা কী বিশ্বাস করবে, বুঝে ওঠে না। ওয়ালেটে কড়কড়ে তিনটে পাঁচশো আর বেশ কয়েকটা একশোর নোট থাকলেও বের করতে দ্বিধা হয়। মাথা নিচু করে এগিয়ে যায়। ওঁরা পিছন থেকে কিছু বলতে থাকেন, আশায়... রুমুন হয়তো মত বদলাবে। রুমুন এগিয়ে যায়। ও জানে, এইসব পরিস্থিতে পিছনে ফিরে তাকাতে নেই। ক্ষণিকের জন্য হলেও হাতের টিফিন বাক্সটা একটু ভারী লাগে। তবুও এগিয়ে যায় ও।
ফুচকাওয়ালার সামনে আলু সিদ্ধ, পিঁয়াজ লঙ্কা কুঁচি, তেঁতুল জলের আলাদা সুগন্ধ। সব দ্বিধা দ্বন্দ্ব কেটে যায় ও। "দিন তো, কুড়িটা টাকার চুরমুর" বলে এগিয়ে দেয় টিফিন বাক্স। চুরমুর তৈরি হয়। রুমুন বাড়ি ফেরে। প্রফেসর শঙ্কুর অ্যাডভেঞ্চার অপেক্ষা করে আছে। ভালোই কাটবে সন্ধ্যেটা। একটাই আফশোস, পার্কে কয়েক রাউন্ড হাঁটা হলো না।
রুমুন আজ যথার্থই নাগরিক।
Saturday, December 14, 2019
পার্ক
হাঁপানির কষ্টটা শীতকালে ভীষণ জ্বালায়। তাই মর্নিং ওয়াকে প্রতিমা বেরোন একটু বেলা করেই। তা প্রায় আটটা বেজেই যায়। ততক্ষণে অবশ্য সেন্ট্রাল পার্কের বাকি মর্নিং ওয়াকারের দল প্রায় সবাই ফিরে যান, বা ফেরার পথে। প্রতিমা রিটায়ার্ড। পার্ক লাগোয়া ফ্ল্যাটে একা থাকেন। ছেলে মেয়ে নাতি নাতনি বৌমা জামাই প্রত্যেকেই দেশে বিদেশে যে যার মতো আছে, প্রতিমার এক্কেবারে ঝাড়া হাত পা। মর্নিং ওয়াকে এসে কিছু বন্ধু বান্ধবী জুটিয়ে ফেলেছেন। তাঁরাও প্রায় ওঁরই মতোই। ঝাড়া হাত পা। হোয়াটসআপ গ্রুপ রয়েছে। সেখানেই রোজ লেখালিখি চলে। সময় মিলিয়ে বেরিয়ে পড়েন প্রত্যেকেই। একইসাথে হাঁটাহাঁটি, যোগব্যায়াম চলে। তারপর খানিকক্ষণ বসে গল্প। এরপর আস্তে আস্তে টুকটুক করে যে যার নিজের নিজের ডেরায় ফেরা।
আজ অবশ্য প্রতিমা আর শ্যমলবাবু ছাড়া আর কেউ নেই। বাকিদের মধ্যে কেউ কেউ বেড়াতে গিয়েছে, কেউ বিদেশে পাড়ি দিয়েছে, ছেলে মেয়েদের কাছে। আবার কয়েকজন অসুস্থ। শীতকালের সিজন চেঞ্জে কাবু। শ্যমলবাবু ইউনিভার্সিটিতে ইকোনমিক্সের অধ্যাপক ছিলেন। প্রতিমাও ব্যাংকে উচ্চপদে চাকরি করেছেন। কাজেই দুজনের কথার বিষয়ের অভাব কখনোই হয় না। এমন কি, দুজনেরই বেশ ভালোই লাগে একে অপরের উপস্থিতি। বাকিদের চেয়ে একটু বেশিই যেন একে অপরের সাথে কথা বলতে মনের খোরাক পায়। সাম্প্রতিক বাজারের পিঁয়াজের মহার্ঘ্য অবস্থার কথাই আলোচনা করছিলেন দুজনে, হাতে মাটির ভাঁড়ে গরম চা। পার্কের চার পাক হেঁটে এই চা যেন বড়ই আরামের। আয়েশ করে চায়ের ভাঁড়ে এক চুমুক দিয়ে সবে শ্যমলবাবু কিছু একটা বলতে যাচ্ছেন, এমন সময় প্রতিমা হাত তুলে ইশারায় ওঁকে থামতে বললেন। শ্যমলবাবু একটু অবাক। কী হলো, জানতে চাইলেন। প্রতিমা ওঁকে চুপ করে বসে একটু কান পাততে বললেন। শ্যামলবাবু এবার কান খাড়া করলেন। এবং তারপরেই শুনতে পেলেন। ওঁদের বসার জায়গা থেকে একটু দূরেই বসে আছে এক যুবক যুবতী। দেখে মনে হয় সবে স্কুলের গন্ডি পেরিয়েছে। পরনে ওই জিন্স টিশার্ট আর জ্যাকেট। পিঠে ব্যাকপ্যাক। একটু উত্তেজিত দুজনেই, তাই কথাবার্তা চলছে উচ্চস্বরেই।
- শোন, এই লাস্ট মোমেন্টে এসে এরকম কিন্তু কিন্তু করলে কী করে হবে?
- না মানে...
- না মানে কী?
- ভয় করছে।
- ভয়? কীসের ভয়?
- বাড়ির থেকে যদি জানতে পারে..
- জানলে জানবে।
- জানলে জানবে আবার কী?
- মানেটা খুব সিম্পল। আমরা প্রাপ্তবয়স্ক। আমরা দুইজনেই যথেষ্ট ওয়াকিবহাল আমাদের ভালো মন্দ নিয়ে। কাজেই আমরা যদি মনে করি আমরা একসাথে কোথাও বেড়াতে যাবো, এতে কীসের যে এত ভয় পাচ্ছ তুমি, আমি জাস্ট বুঝছি না।
- আরে, বাড়িতে নাইটস্টের কথা বলবো কী করে?
- কী আবার, বলবি ক্লাসের পিকনিক। তাজপুর। আমি বলবো কিছু বন্ধুদের কথা। সিম্পল। ওরা জানবে আমরা তাজপুর যাচ্ছি। সেটা সত্যিই। কিন্তু কার সাথে, সেটা জাস্ট চেপে যাবো। তাহলেই হলো। ওরা তো কেউ গোয়েন্দা লাগাতে যাবে না রে বাবা
- তুমি জানো না। আমার বাবা খুব স্ট্রিক্ট।
- ডি ডি এল জের অমৃশ পুরীর মতো?
- কয়েক ধাপ বেশি।
- তাহলে তো আরো ভালো। বেশি চ্যালেঞ্জিং হবে। (সুর করে) লে জায়েঙ্গে লে জায়েঙ্গে দিলওয়ালে দুলহানিয়া লে জায়েঙ্গে।
- তুমি সবেতেই বড্ড ইয়ার্কি করো।
- আর তুই সবেতেই এক্সট্রা টেনশন নিয়ে নিস।
- কী করবো। ছোট থেকে বাড়িতে যেরকম ভাবে বড় হয়েছি...
- ওই হলো, গেল আমাদের যাওয়া। এত কষ্ট করে সব প্ল্যান করলাম। তুই ভেস্তে দিলি।
- সরি। কিন্তু সত্যি বলছি। আমিই তাল তুলেছিলাম বটে। কিন্তু, দেখো, বাড়িতে পারমিশন পাবো না। উল্টে এর পরে বেরোতে গেলে হয়তো সন্দেহ করে নজরদারি শুরু হবে। তার চেয়ে যেমন চলছে চলুক...
- মানে এই কলেজের নামে এই পার্ক ওই মল?
- হুম। আপাতত। তারপর তুমি আর আমি দুজনে নিজের পায়ে দাঁড়াই। ব্যস। একদম নির্ভয়ে বাড়িতে বলে বুক ফুলিয়ে বেরোতে পারবো।
- বেশ। তাহলে নিউ সী হক ক্যানসেল। চলো, অন্তত সাগরদ্বীপে যকের ধন দেখি। দেখি, কটার শো।
- চলো, যাওয়া যাক।
প্রতিমা আর শ্যামল লক্ষ্য করে, এই দুই যুবক যুবতী কিঞ্চিৎ বিমর্ষচিত্তে এগিয়ে যায়। শ্যামল প্রতিমার দিকে তাকিয়ে বলেন, "কী বুঝলেন?"
প্রতিমা হেসে উত্তর দেয়, "কড়া বাপ মা যুগে যুগে প্রেমে ভিলেন হয়েই রইলো। আর কী!"
শ্যামল আর প্রতিমা দুজনেই হো হো করে হাসে খানিকক্ষণ। তারপর হাসির দমক একটু কম হতে শ্যমলবাবু প্রতিমার দিকে ফিরে বেশ একটা দুঃখী দুঃখী মুখ করে বললেন, "তা, আমাদের দুজনেরই জীবনে ভিলেন বলতে কেউ নেই। আমাদেরও ভিলেনের পার্ট প্লে করা হয়ে গিয়েছে। আমরা দুজন তা হলে সী হকে যাবো নাকি? মালিকের একটা বুকিং ক্যানসেল হয়ে গেল। ভাবলেও খারাপ লাগে।" মিথ্যে কাঁচুমাচু মুখ করে আর কতক্ষণই বা থাকা যায়? ফিক করে হেসে ফেললেন। প্রতিমাও কপট রাগ পুষে না রেখে হেসে উত্তর দিলেন, "ও, পেটে পেটে এতদূর? তা চলুন। ঘুরেই আসি।"
হাঁপানির কষ্টটা শীতকালে ভীষণ জ্বালায়। তাই মর্নিং ওয়াকে প্রতিমা বেরোন একটু বেলা করেই। তা প্রায় আটটা বেজেই যায়। ততক্ষণে অবশ্য সেন্ট্রাল পার্কের বাকি মর্নিং ওয়াকারের দল প্রায় সবাই ফিরে যান, বা ফেরার পথে। প্রতিমা রিটায়ার্ড। পার্ক লাগোয়া ফ্ল্যাটে একা থাকেন। ছেলে মেয়ে নাতি নাতনি বৌমা জামাই প্রত্যেকেই দেশে বিদেশে যে যার মতো আছে, প্রতিমার এক্কেবারে ঝাড়া হাত পা। মর্নিং ওয়াকে এসে কিছু বন্ধু বান্ধবী জুটিয়ে ফেলেছেন। তাঁরাও প্রায় ওঁরই মতোই। ঝাড়া হাত পা। হোয়াটসআপ গ্রুপ রয়েছে। সেখানেই রোজ লেখালিখি চলে। সময় মিলিয়ে বেরিয়ে পড়েন প্রত্যেকেই। একইসাথে হাঁটাহাঁটি, যোগব্যায়াম চলে। তারপর খানিকক্ষণ বসে গল্প। এরপর আস্তে আস্তে টুকটুক করে যে যার নিজের নিজের ডেরায় ফেরা।
আজ অবশ্য প্রতিমা আর শ্যমলবাবু ছাড়া আর কেউ নেই। বাকিদের মধ্যে কেউ কেউ বেড়াতে গিয়েছে, কেউ বিদেশে পাড়ি দিয়েছে, ছেলে মেয়েদের কাছে। আবার কয়েকজন অসুস্থ। শীতকালের সিজন চেঞ্জে কাবু। শ্যমলবাবু ইউনিভার্সিটিতে ইকোনমিক্সের অধ্যাপক ছিলেন। প্রতিমাও ব্যাংকে উচ্চপদে চাকরি করেছেন। কাজেই দুজনের কথার বিষয়ের অভাব কখনোই হয় না। এমন কি, দুজনেরই বেশ ভালোই লাগে একে অপরের উপস্থিতি। বাকিদের চেয়ে একটু বেশিই যেন একে অপরের সাথে কথা বলতে মনের খোরাক পায়। সাম্প্রতিক বাজারের পিঁয়াজের মহার্ঘ্য অবস্থার কথাই আলোচনা করছিলেন দুজনে, হাতে মাটির ভাঁড়ে গরম চা। পার্কের চার পাক হেঁটে এই চা যেন বড়ই আরামের। আয়েশ করে চায়ের ভাঁড়ে এক চুমুক দিয়ে সবে শ্যমলবাবু কিছু একটা বলতে যাচ্ছেন, এমন সময় প্রতিমা হাত তুলে ইশারায় ওঁকে থামতে বললেন। শ্যমলবাবু একটু অবাক। কী হলো, জানতে চাইলেন। প্রতিমা ওঁকে চুপ করে বসে একটু কান পাততে বললেন। শ্যামলবাবু এবার কান খাড়া করলেন। এবং তারপরেই শুনতে পেলেন। ওঁদের বসার জায়গা থেকে একটু দূরেই বসে আছে এক যুবক যুবতী। দেখে মনে হয় সবে স্কুলের গন্ডি পেরিয়েছে। পরনে ওই জিন্স টিশার্ট আর জ্যাকেট। পিঠে ব্যাকপ্যাক। একটু উত্তেজিত দুজনেই, তাই কথাবার্তা চলছে উচ্চস্বরেই।
- শোন, এই লাস্ট মোমেন্টে এসে এরকম কিন্তু কিন্তু করলে কী করে হবে?
- না মানে...
- না মানে কী?
- ভয় করছে।
- ভয়? কীসের ভয়?
- বাড়ির থেকে যদি জানতে পারে..
- জানলে জানবে।
- জানলে জানবে আবার কী?
- মানেটা খুব সিম্পল। আমরা প্রাপ্তবয়স্ক। আমরা দুইজনেই যথেষ্ট ওয়াকিবহাল আমাদের ভালো মন্দ নিয়ে। কাজেই আমরা যদি মনে করি আমরা একসাথে কোথাও বেড়াতে যাবো, এতে কীসের যে এত ভয় পাচ্ছ তুমি, আমি জাস্ট বুঝছি না।
- আরে, বাড়িতে নাইটস্টের কথা বলবো কী করে?
- কী আবার, বলবি ক্লাসের পিকনিক। তাজপুর। আমি বলবো কিছু বন্ধুদের কথা। সিম্পল। ওরা জানবে আমরা তাজপুর যাচ্ছি। সেটা সত্যিই। কিন্তু কার সাথে, সেটা জাস্ট চেপে যাবো। তাহলেই হলো। ওরা তো কেউ গোয়েন্দা লাগাতে যাবে না রে বাবা
- তুমি জানো না। আমার বাবা খুব স্ট্রিক্ট।
- ডি ডি এল জের অমৃশ পুরীর মতো?
- কয়েক ধাপ বেশি।
- তাহলে তো আরো ভালো। বেশি চ্যালেঞ্জিং হবে। (সুর করে) লে জায়েঙ্গে লে জায়েঙ্গে দিলওয়ালে দুলহানিয়া লে জায়েঙ্গে।
- তুমি সবেতেই বড্ড ইয়ার্কি করো।
- আর তুই সবেতেই এক্সট্রা টেনশন নিয়ে নিস।
- কী করবো। ছোট থেকে বাড়িতে যেরকম ভাবে বড় হয়েছি...
- ওই হলো, গেল আমাদের যাওয়া। এত কষ্ট করে সব প্ল্যান করলাম। তুই ভেস্তে দিলি।
- সরি। কিন্তু সত্যি বলছি। আমিই তাল তুলেছিলাম বটে। কিন্তু, দেখো, বাড়িতে পারমিশন পাবো না। উল্টে এর পরে বেরোতে গেলে হয়তো সন্দেহ করে নজরদারি শুরু হবে। তার চেয়ে যেমন চলছে চলুক...
- মানে এই কলেজের নামে এই পার্ক ওই মল?
- হুম। আপাতত। তারপর তুমি আর আমি দুজনে নিজের পায়ে দাঁড়াই। ব্যস। একদম নির্ভয়ে বাড়িতে বলে বুক ফুলিয়ে বেরোতে পারবো।
- বেশ। তাহলে নিউ সী হক ক্যানসেল। চলো, অন্তত সাগরদ্বীপে যকের ধন দেখি। দেখি, কটার শো।
- চলো, যাওয়া যাক।
প্রতিমা আর শ্যামল লক্ষ্য করে, এই দুই যুবক যুবতী কিঞ্চিৎ বিমর্ষচিত্তে এগিয়ে যায়। শ্যামল প্রতিমার দিকে তাকিয়ে বলেন, "কী বুঝলেন?"
প্রতিমা হেসে উত্তর দেয়, "কড়া বাপ মা যুগে যুগে প্রেমে ভিলেন হয়েই রইলো। আর কী!"
শ্যামল আর প্রতিমা দুজনেই হো হো করে হাসে খানিকক্ষণ। তারপর হাসির দমক একটু কম হতে শ্যমলবাবু প্রতিমার দিকে ফিরে বেশ একটা দুঃখী দুঃখী মুখ করে বললেন, "তা, আমাদের দুজনেরই জীবনে ভিলেন বলতে কেউ নেই। আমাদেরও ভিলেনের পার্ট প্লে করা হয়ে গিয়েছে। আমরা দুজন তা হলে সী হকে যাবো নাকি? মালিকের একটা বুকিং ক্যানসেল হয়ে গেল। ভাবলেও খারাপ লাগে।" মিথ্যে কাঁচুমাচু মুখ করে আর কতক্ষণই বা থাকা যায়? ফিক করে হেসে ফেললেন। প্রতিমাও কপট রাগ পুষে না রেখে হেসে উত্তর দিলেন, "ও, পেটে পেটে এতদূর? তা চলুন। ঘুরেই আসি।"
Wednesday, December 11, 2019
মডার্ন পেরেন্টিং (৩)
সুচেতনা
কে জানে কী মনে হতে স্কুলের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপটা খুলল রিমঝিম। স্কুল বলতে, মেয়ে রুনির স্কুলের। রুনির সবে ক্লাস ওয়ান। বাড়ির কাছেই নামকরা ইংরেজি মিডিয়াম স্কুলে পড়ে। বম্বেতে এটাই নিয়ম। স্কুল হতে হবে বাড়ির কাছাকাছি। এই জিনিসটা রিমঝিমের ভারী পছন্দ। কলকাতায় থাকতে নিজের বন্ধুদের তো কত দেখেছে, সেই দমদম, সল্ট লেক থেকে যাদবপুর আসতো নামী স্কুলে পড়বে বলে, বা সেই বেহালা থেকে আসতে হতো বালিগঞ্জ। কম কষ্ট নাকি বাচ্চাদের? এখন দিনকাল কত পালটে গিয়েছে। আগে যেমন ওই স্কুলের বাইরে ভিড় করে থাকা বাবা মায়েরা, বিশেষ করে মায়েরা জটলা পাকিয়ে স্কুলের শেষে হোমওয়ার্ক, পরীক্ষার সিলেবাস, টিউশন ক্লাসের হদিস পেতো, এখন সেইসব হয় ভার্চ্যুয়ালি। whatsapp গ্রুপে চ্যাটে। রিমঝিম দেখলো, আজ নাকি অনেকের ডায়েরিতে নোটিস পড়েছে। পেরেন্টস কল। কে জানে, রুনিরও হলো কি না। বাড়ি ফিরে দেখতে হবে। যা দস্যি মেয়ে।
দস্যি বটে, তবে একদিক দিয়ে রিমঝিম মনে মনে মেয়েকে নিয়ে খুব খুশি। স্কুলে ইতিমধ্যেই গুড টাচ ব্যাড টাচ নিয়ে শিখিয়ে তো দিয়েছে। মা হিসেবেও রিমঝিম ওর দায়িত্ব পালন করেছে। নিজে একটা ছুটির দিনে বসে ভালো করে যত্ন সহকারে মেয়েকে ভালো মন্দ বলেছে। আর সাথে এটাও বলেছে, কেউ কখনো "হার্ট" করতে গেলেই তাইকন্ডো ক্লাসে শেখা কয়েকটা ডেমো দিয়ে দিতে। তাহলে আর সহজে ঘাঁটতে পারবে না। রুনি কিন্তু মায়ের বাধ্য মেয়ে। স্কুলে এরপর বার দুইয়েক স্পোর্টস চলাকালীন ক্লাসের কিছু দুষ্টু ছেলে ওর পিছনে লাগছিলো, দিয়েছে দুই ঘা। রিমঝিম মনে মনে বেশ প্রাউড ফিল করে। যেমন দিন পড়েছে, তেমন করেই মানুষ করতে হবে।
বাড়ি ফিরে রিমঝিম অবাক। মানতুদির কাছে শুনলো, রুনি নীচে খেলতে যায়নি। স্কুল থেকে ফিরেছে বেশ চুপচাপ। খাওয়া নিয়ে রোজের মতো একটুও ঝামেলা পাকায়নি। খুঁটে খুঁটে অল্প একটু খেয়ে উঠে গিয়েছে। টিভিও চালায়নি। ঘর অন্ধকার করে শুয়ে আছে। রিমঝিম শুনে বেশ চিন্তিত হলো। কী ব্যাপার, মেয়ের এরকম আমূল পরিবর্তন কেন? জানতে ওকে হবেই। ও হাতমুখ ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে ঝটপট রুনির ঘরে গেল। মেয়ে পাশ ফিরে শুয়ে আছে। বোধহয় ঘুমিয়ে পড়েছে। কোলবালিশ আঁকড়ে শুয়ে। গাল বেয়ে চোখের জল, শুকিয়ে দাগ হয়ে গিয়েছে। আহা রে, মেয়েটা কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে পড়েছে। কী হলো? রিমঝিম একটু ভয় পায়। দিনকাল এত খারাপ। শিউরে ওঠে। রুনির কোনো ক্ষতি হলো না তো? সর্বক্ষণ কাঁটা হয়ে থাকতে হয়।
রিমঝিম স্নেহের বশে মেয়েকে জাপ্টে ওর পাশে শুয়ে পড়ে। মাথায় হাত বোলাতে থাকে। মেয়ের ভয় কাটিয়ে ওর কথা শুনতে হবে। দেখতে হবে কী সমস্যা হয়েছে ওর। মায়ের স্পর্শে রুনির ঘুম ভেঙে যায়। চোখ খুলর ড্যাবড্যাব করে মায়ের দিকে তাকিয়ে থাকে। তারপর ক্ষণিকের ভেবলে যাওয়াটা কাটিয়ে মায়ের বুকে মুখ গুঁজে ডুকরে কেঁদে ওঠে। রিমঝিম মেয়ের মাথায় হাত বোলাতে থাকে। শান্ত করার চেষ্টা করে। স্নেহের সাথে বলে, "কাঁদে না সোনা। বলো আমায়, কী হয়েছে?" রুনি কান্না বন্ধ করার কোনো চেষ্টাই করেনা। কাঁদতে কাঁদতে হেঁচকি তুলতে তুলতে যা বলে, তার সারমর্ম এই। ওর ক্লাসের এক বন্ধু, অঙ্কিত নাকি ওকে আজ টিফিন ব্রেকে ওর হাত ধরে পাশে বসিয়ে ওকে বলেছে, "আমি তোকে খুব ভালোবাসি। আজ থেকে তুই আমার গার্লফ্রেন্ড আর আমি তোর বয়ফ্রেন্ড। অন্য কোনো ছেলের সাথে আর কথা বলবি না।" এই বলে নাকি আবার রুনির গালে চুমু খেয়েছে। রুনি নিজেকে বাঁচাতে অবশ্য অঙ্কিতকে ধরে দিয়েছে পেটে একটা ঘুঁষি। কিন্তু ভীষণভাবে বিড়ম্বিত। ও কিছুতেই আর অঙ্কিতের সাথে কথা বলতে চায় না।
রিমঝিম হতভম্ব। এইটুকু বাচ্চা। এরা আবার প্রেম ভালোবাসা গার্লফ্রেন্ড বয়ফ্রেন্ড এসবের কী বোঝে? যত আজেবাজে সিরিয়াল সিনেমার প্রকোপ। কেন যে বাবা মায়ের যা খুশি টিভিতে দেখতে দেয় এদের। রুনিকে শান্ত করে। বলে, " আমি অঙ্কিতের মাকে বলবো। এরকম আর রিপিট হবে না। গ্লোরিয়া মিসকেও বলবো কালকেই। তুমি চিন্তা করো না মাম্মাম। আর রিপিট হবে না। কিন্তু বাই চান্স যদি হয়, ডু ওয়াট ইউ ডিড টুডে। কেউ তোমায় অস্বস্তিতে ফেললেই সেলফ ডিফেন্স যা শিখেছো, এপ্লাই করবে। আর হ্যাঁ, কান্নাকাটি তুমি করবে না মা একদম। দোষ যে করেছে, সে অঙ্কিত। নট ইউ। হি শুড বি এশেমড অফ হিমসেলফ। হি শুড বি পিনালাইজড। বুঝেছো?"
রুনি মাথা নাড়ে। রিমঝিম মেয়ের মাথায় হাত বুলাতে থাকে। সাময়িক মিটমাট। কিন্তু কাল অবশ্যই ক্লাস টিচারকে জানাতে হবে। আর খানিকক্ষণ পর, অঙ্কিতের মাকে। ক্লাস ওয়ানের বাচ্চারাও নাকি প্রপোজ করছে। ভাবা যায়? আর এদিকে ওকে পুরো কলেজ লাইফ অবধি হা পিত্যেস করে থাকতে হলো, কবে সুমিত ওকে প্রপোজ করবে। হা ঈশ্বর।
দস্যি বটে, তবে একদিক দিয়ে রিমঝিম মনে মনে মেয়েকে নিয়ে খুব খুশি। স্কুলে ইতিমধ্যেই গুড টাচ ব্যাড টাচ নিয়ে শিখিয়ে তো দিয়েছে। মা হিসেবেও রিমঝিম ওর দায়িত্ব পালন করেছে। নিজে একটা ছুটির দিনে বসে ভালো করে যত্ন সহকারে মেয়েকে ভালো মন্দ বলেছে। আর সাথে এটাও বলেছে, কেউ কখনো "হার্ট" করতে গেলেই তাইকন্ডো ক্লাসে শেখা কয়েকটা ডেমো দিয়ে দিতে। তাহলে আর সহজে ঘাঁটতে পারবে না। রুনি কিন্তু মায়ের বাধ্য মেয়ে। স্কুলে এরপর বার দুইয়েক স্পোর্টস চলাকালীন ক্লাসের কিছু দুষ্টু ছেলে ওর পিছনে লাগছিলো, দিয়েছে দুই ঘা। রিমঝিম মনে মনে বেশ প্রাউড ফিল করে। যেমন দিন পড়েছে, তেমন করেই মানুষ করতে হবে।
বাড়ি ফিরে রিমঝিম অবাক। মানতুদির কাছে শুনলো, রুনি নীচে খেলতে যায়নি। স্কুল থেকে ফিরেছে বেশ চুপচাপ। খাওয়া নিয়ে রোজের মতো একটুও ঝামেলা পাকায়নি। খুঁটে খুঁটে অল্প একটু খেয়ে উঠে গিয়েছে। টিভিও চালায়নি। ঘর অন্ধকার করে শুয়ে আছে। রিমঝিম শুনে বেশ চিন্তিত হলো। কী ব্যাপার, মেয়ের এরকম আমূল পরিবর্তন কেন? জানতে ওকে হবেই। ও হাতমুখ ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে ঝটপট রুনির ঘরে গেল। মেয়ে পাশ ফিরে শুয়ে আছে। বোধহয় ঘুমিয়ে পড়েছে। কোলবালিশ আঁকড়ে শুয়ে। গাল বেয়ে চোখের জল, শুকিয়ে দাগ হয়ে গিয়েছে। আহা রে, মেয়েটা কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে পড়েছে। কী হলো? রিমঝিম একটু ভয় পায়। দিনকাল এত খারাপ। শিউরে ওঠে। রুনির কোনো ক্ষতি হলো না তো? সর্বক্ষণ কাঁটা হয়ে থাকতে হয়।
রিমঝিম স্নেহের বশে মেয়েকে জাপ্টে ওর পাশে শুয়ে পড়ে। মাথায় হাত বোলাতে থাকে। মেয়ের ভয় কাটিয়ে ওর কথা শুনতে হবে। দেখতে হবে কী সমস্যা হয়েছে ওর। মায়ের স্পর্শে রুনির ঘুম ভেঙে যায়। চোখ খুলর ড্যাবড্যাব করে মায়ের দিকে তাকিয়ে থাকে। তারপর ক্ষণিকের ভেবলে যাওয়াটা কাটিয়ে মায়ের বুকে মুখ গুঁজে ডুকরে কেঁদে ওঠে। রিমঝিম মেয়ের মাথায় হাত বোলাতে থাকে। শান্ত করার চেষ্টা করে। স্নেহের সাথে বলে, "কাঁদে না সোনা। বলো আমায়, কী হয়েছে?" রুনি কান্না বন্ধ করার কোনো চেষ্টাই করেনা। কাঁদতে কাঁদতে হেঁচকি তুলতে তুলতে যা বলে, তার সারমর্ম এই। ওর ক্লাসের এক বন্ধু, অঙ্কিত নাকি ওকে আজ টিফিন ব্রেকে ওর হাত ধরে পাশে বসিয়ে ওকে বলেছে, "আমি তোকে খুব ভালোবাসি। আজ থেকে তুই আমার গার্লফ্রেন্ড আর আমি তোর বয়ফ্রেন্ড। অন্য কোনো ছেলের সাথে আর কথা বলবি না।" এই বলে নাকি আবার রুনির গালে চুমু খেয়েছে। রুনি নিজেকে বাঁচাতে অবশ্য অঙ্কিতকে ধরে দিয়েছে পেটে একটা ঘুঁষি। কিন্তু ভীষণভাবে বিড়ম্বিত। ও কিছুতেই আর অঙ্কিতের সাথে কথা বলতে চায় না।
রিমঝিম হতভম্ব। এইটুকু বাচ্চা। এরা আবার প্রেম ভালোবাসা গার্লফ্রেন্ড বয়ফ্রেন্ড এসবের কী বোঝে? যত আজেবাজে সিরিয়াল সিনেমার প্রকোপ। কেন যে বাবা মায়ের যা খুশি টিভিতে দেখতে দেয় এদের। রুনিকে শান্ত করে। বলে, " আমি অঙ্কিতের মাকে বলবো। এরকম আর রিপিট হবে না। গ্লোরিয়া মিসকেও বলবো কালকেই। তুমি চিন্তা করো না মাম্মাম। আর রিপিট হবে না। কিন্তু বাই চান্স যদি হয়, ডু ওয়াট ইউ ডিড টুডে। কেউ তোমায় অস্বস্তিতে ফেললেই সেলফ ডিফেন্স যা শিখেছো, এপ্লাই করবে। আর হ্যাঁ, কান্নাকাটি তুমি করবে না মা একদম। দোষ যে করেছে, সে অঙ্কিত। নট ইউ। হি শুড বি এশেমড অফ হিমসেলফ। হি শুড বি পিনালাইজড। বুঝেছো?"
রুনি মাথা নাড়ে। রিমঝিম মেয়ের মাথায় হাত বুলাতে থাকে। সাময়িক মিটমাট। কিন্তু কাল অবশ্যই ক্লাস টিচারকে জানাতে হবে। আর খানিকক্ষণ পর, অঙ্কিতের মাকে। ক্লাস ওয়ানের বাচ্চারাও নাকি প্রপোজ করছে। ভাবা যায়? আর এদিকে ওকে পুরো কলেজ লাইফ অবধি হা পিত্যেস করে থাকতে হলো, কবে সুমিত ওকে প্রপোজ করবে। হা ঈশ্বর।
Monday, December 9, 2019
মডার্ন পেরেন্টিং (২)
"নিজের বই কোথায় ফেলে আসো, খেয়াল থাকে না কেন?" এই বলে রুকুর গালে ঠাস করে একটা থাপ্পড় মারলো পিউ। রুকু কাঁদলো না। তবে মুখটা কাঁচুমাচু করে চলে গেল নিজের ঘরে।
অফিস টাইমে এই ভিড় মেট্রো চেপে ফিরতে ফিরতে একেই মাথা গরম হয়ে থাকে। তার ওপর এই যদি ফিরে এসেই শুনতে হয় আগামী সপ্তাহে যে সাবজেক্টের পরীক্ষা, তার বই হারিয়েছে ছেলে, মেজাজ সামলে রাখা ভীষণ কঠিন হয়ে পড়ে বটে। পিউয়ের খারাপ লাগে। আজকাল বড্ড মেজাজ হারাচ্ছে। কারণে অকারণে বকুনি দিচ্ছে রুকুকে। অনেক চেষ্টা করে নিজেকে সামলাতে, পারে না।
হিন্দি সাবজেক্টটা নিয়ে এমনিই হিমশিম খায় ওরা মা ছেলেতে। অনেক কষ্টে বন্ধু বান্ধবদের ধরে ইন্টারনেট ঘেঁটে নানান কাঠখড় পুড়িয়ে তবে কিনা সমস্ত সিলেবাস শেষ করিয়েছিল। যত ওয়ার্ক শিট, সব সলভ করিয়েছিল। আর এখন, পরীক্ষার এক সপ্তাহ আগে যদি রুকু এসে বলে যে বইটা খুঁজে পাচ্ছে না, কী করে চলে? হ্যাঁ, বাধ্য হয়ে, নিরুপায় হয়ে নতুন আরেকটা বই কিনে আনতে হবে ঠিকই। কিন্তু ওই সলিউশনগুলো? পিউ নিজে বরাবর হিন্দিতে কাঁচা। কখন ওই করেগা আর কখন করেগি, এই নিয়ে চিরকাল জেরবার। আবার ওই অফিসের সৌরভকে ধরতে হবে। এমনিতেই ওকে তেমন পছন্দ নয় পিউয়ের। কিন্তু কী আর করা, হিন্দি মাদার টাং। ও ছাড়া এই লাস্ট মোমেন্টে কেই বা হেল্প করবে। ভাবছে সামনের বছর থেকে একটা টিউটর রাখবে হিন্দির জন্য। ওর পক্ষে এই জোড়াতাপ্পি দিয়ে চালানো বেশ কঠিন।
রুকুর মুখটা ভেবে মায়া হলো পিউয়ের। ওর ঘরে উঁকি দিয়ে দেখলো, অঙ্ক খাতা নিয়ে বসেছে। যাক অন্তত একটা বকুনি খেয়ে বাকি আর কিছুর জন্য বকতে হয়নি। এমনিই নিজে থেকেই বসে গিয়েছে পড়তে। হাত মুখ ধুয়ে রান্নাঘরে ঢুকলো পিউ। ফ্রিজ থেকে একটু চিকেন সিদ্ধ বের করলো। অল্প পিঁয়াজ ক্যাপসিকাম কেটে ফ্রায়িং প্যানে দিয়ে নাড়াচাড়া করে একটা টস কারি গোছের রেঁধে ফেললো। ব্রেড টোস্ট করে তাতে হালকা চিজ মাখিয়ে মা ও ছেলে, দুজনের জন্য চিকেন এন্ড টোস্ট নিয়ে রুকুর ঘরে এলো। রুকু পিউয়ের পায়ের শব্দে মাথা তুললো, কিছু না বলে আবার অঙ্ক খাতায় মনোনিবেশ করলো। পিউ ওর সামনে টেবিল পেতে তাতে দুজনের প্লেট রেখে রুকুর মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললো, "সরি। তখন পুরো ঘটনা না শুনে তোকে মারা উচিত হয়নি আমার। খেয়ে নে।"
রুকু পেন্সিল নীচে নামিয়ে রাখলো। খাতা খোলা। মায়ের হাত থেকে প্লেটটা নিয়ে বললো, "মা, সত্যি বলছি। আমার মনে নেই আমি কোথায় রেখেছি বইটা।"
পিউ বললো, "সে তো বুঝলাম। কিন্তু মনে না করলে খুঁজে পাবে কী করে বলো? পরীক্ষাতে কী করবে?"
রুকু উত্তর বলে, "মা, অবিনাশকে ফোন করবো? ওর বইটা যদি ও লেন্ড করে। তুমি জেরক্স করে নেবে।"
পিউ খেতে খেতে মাথা নাড়লো। তারপর বলল, "আচ্ছা, অবিনাশকে একবার জিজ্ঞেস করে দেখ না। ওর বইয়ের সাথে চলে যায় নি তো? পাশাপাশি বসিস।" রুকু শুনে একটু মাথা নাড়লো। হুম। হতেই পারে। একসাথেই তো ওরা বসে। বইপত্র সব এক টেবিলে থাকে। ও বলে, "মা, তুমি আন্টির নম্বরে কল করো একবার। আমি বলি।"
পিউ মোবাইল বের করে। অবিনাশের মায়ের ফোনে কল করে। অবিনাশ কোচিং ক্লাসে গিয়েছে। তাই পিউই ওর মাকে বলে, "মিসেস বসু, আমার ছেলের হিন্দি বইটা খুঁজে পাচ্ছি না। একবার প্লিজ দেখবেন অবিনাশের ব্যাগে ওর বইয়ের সাথে চলে গিয়েছে কি না?" উল্টোদিক থেকে ঝাঁঝালো উত্তর আসে, "অবি কেন স্বস্তিকের বই নিয়ে আসবে?"
পিউ একটু নরম স্বরেই বলে, "না না, সেটা না। আসলে ওরা পাশাপাশি বসে। তাই ভাব্লাম। বাই মিস্টেক... যাই হোক, আপনি প্লিজ দেখবেন। আই এম শিয়োর, থাকলে আপনি ফেরত পাঠিয়ে দেবেন। খুবই উপকার হয়।" অবিনাশের মা একটু ঠান্ডা গলায় বলে, "হুম। ঠিক আছে। ও ক্লাস থেকে ফিরুক। আমি দেখবো।" এই বলে ফোন ছেড়ে দেয়। পিউ আর বই জেরক্সের কথা বলতে পারে না। রুকুকে বলে, "শোন, একজ্যামের এখন ওয়ান উইক বাকি। একটু দেখ কাল অবিনাশ আনে কি না। আর পরশু তো স্কুলে লস্ট প্রপার্টি আছে। দেখ অপেক্ষা করে। যদি পাস। নইলে আমি ব্যবস্থা করছি। হয় নতুন বই, নয় কারুর থেকে জেরক্স। মিসেস বসুকে তো মনে হল না কথা শুনে যে বই ধার দেবে। আমাকেই কিছু ব্যবস্থা করতে হবে।"
রুকু প্লেট রেখে হাত মুখ ধুয়ে এসে অঙ্ক খাতা নিয়ে বসলো। পিউ সাংসারিক কাজে মন দিলো।
পরের দিন স্বাভাবিকভাবেই রুকু স্কুলে গেলো। পিউ ওকে একবার মনে করিয়ে দিলো, অবিনাশকে বইয়ের কথা জিজ্ঞেস করতে। বিকেলে ফিরে রুকু জানালো, অবিনাশ বএলছে, ওর কাছে বই নেই। লস্ট প্রপার্টির জন্য এখন আর একদিন অপেক্ষা।
লস্ট প্রপার্টিতেও বই পাওয়া গেলো না। পিউ এবার একটু চিন্তিত। বই জেরক্স কেউ কি আদৌ করতে দেবে? অবিনাশের মাকেই কি বলবে? দ্বিধা করতে থাকে। স্কুলে আর তো কেউ নেই। এই বছর সেকশন চেঞ্জ হয়ে যাওয়ায় কারুর ফোন নম্বর নেই পিউয়ের কাছে। একবার কি তাহলে কাল স্কুলের পর হিন্দি মিসের সাথে দেখা করবে? নতুন বই নিয়ে গেলে যদি একটু হেল্প করে দেন? সেই আশা অবশ্য কম। এইসব টিচাররা যে যার প্রাইভেট টিউশানি করতে এতই ব্যস্ত। প্রাইভেট স্কুলের হাইফাই ব্যাপার। পিউ কিছুতেই মেলাতে পারে না এইসব, নিজের শৈশবের সাথে। ওরাও তো ভালো স্কুলে পড়েছে, মাঝেসাঝে কামাইও হয়েছে। সব সময় তো বন্ধুরা সাহায্য করেছে। পিউয়ের মনে পড়ে, ওর যখন ক্লাস সেভেন, সেবার সেকেন্ড টার্মের ঠিক আগে ওর সে কী টায়ফয়েড। স্কুলের মিস, ক্লাসের বন্ধুরা সব্বাই মিলে ওকে নোটস বানিয়ে দিত। আর এখন কে জানে এত কম্পিটিশন কেন।
রুকুর স্কুল গেটে দাঁড়িয়ে পিউ। রুকুর ডায়েরিতে ও লিখে দিয়েছিল, হিন্দি মিসের সাথে দেখা করার কথা। যদি উনি হ্যাঁ বলেন, তাহলে দেখা করবে। রুকু বেরিয়েই এক গাল হাসি হেসে মাকে বলল, "মা, আর মিসের সাথে দেখা করতে হবে না। হিন্দি বইটা আমি পেয়ে গিয়েছি।"
পিউ খানিক অবাক হয়েই বলল, "তাই? বাহ। ভালো তো। তা পেলি কোথায়?"
রুকু হেসে বলল, "অবিনাশের কাছেই ছিল। ওর ব্যাগের ভিতর। ও বলল, এই কদিন নাকি ও খেয়াল করেনি। আমি বলেছিলাম না মা? ওর ব্যাগেই নিশ্চয়ই চলে গিয়েছে। আমি হারাইনি?"
পিউ আর কিছু বলেনা। রুকুর হাত ধরে রাস্তা পার হয়। উল্টো দিকে অটোর লম্বা লাইন। তাড়াতাড়ি না গেলে সেখানেও ভিড় হবে। সর্বত্র কম্পিটিশন, র্যাট রেস। ভাল্লাগেনা।
বাড়ি ফিরে রুকুকে পড়তে বসিয়ে কী জানি কী মনে হতে পিউ হিন্দি বইটা খোলে। উলটে পালটে দেখতে গিয়ে একটা ছোট্ট চিরকুট বেরিয়ে পড়ে। অচেনা হাতের লেখায় কিছু পেজ নম্বর লেখা। আর সাথে লেখা, 'এক কপি'। কৌতূহলবশত ওই পাতাগুলোতে যায় পিউ। গত টার্মের সিলেবাসের কঠিনতম চ্যাপ্টারগুলি। কত কাঠখড় পুড়িয়ে যা সল্ভ করেছিল পিউ। সেইগুলিই জেরক্স হয়েছে। হঠাৎ করেই পুরো ঘটনাটা বুঝতে পারে পিউ। শিউরে ওঠে। এই র্যাট রেসে এমনভাবে ছেলে মেয়েগুলোও নেমে পড়লো? কী দিনকাল। কীসব পেরেন্টিং...
অফিস টাইমে এই ভিড় মেট্রো চেপে ফিরতে ফিরতে একেই মাথা গরম হয়ে থাকে। তার ওপর এই যদি ফিরে এসেই শুনতে হয় আগামী সপ্তাহে যে সাবজেক্টের পরীক্ষা, তার বই হারিয়েছে ছেলে, মেজাজ সামলে রাখা ভীষণ কঠিন হয়ে পড়ে বটে। পিউয়ের খারাপ লাগে। আজকাল বড্ড মেজাজ হারাচ্ছে। কারণে অকারণে বকুনি দিচ্ছে রুকুকে। অনেক চেষ্টা করে নিজেকে সামলাতে, পারে না।
হিন্দি সাবজেক্টটা নিয়ে এমনিই হিমশিম খায় ওরা মা ছেলেতে। অনেক কষ্টে বন্ধু বান্ধবদের ধরে ইন্টারনেট ঘেঁটে নানান কাঠখড় পুড়িয়ে তবে কিনা সমস্ত সিলেবাস শেষ করিয়েছিল। যত ওয়ার্ক শিট, সব সলভ করিয়েছিল। আর এখন, পরীক্ষার এক সপ্তাহ আগে যদি রুকু এসে বলে যে বইটা খুঁজে পাচ্ছে না, কী করে চলে? হ্যাঁ, বাধ্য হয়ে, নিরুপায় হয়ে নতুন আরেকটা বই কিনে আনতে হবে ঠিকই। কিন্তু ওই সলিউশনগুলো? পিউ নিজে বরাবর হিন্দিতে কাঁচা। কখন ওই করেগা আর কখন করেগি, এই নিয়ে চিরকাল জেরবার। আবার ওই অফিসের সৌরভকে ধরতে হবে। এমনিতেই ওকে তেমন পছন্দ নয় পিউয়ের। কিন্তু কী আর করা, হিন্দি মাদার টাং। ও ছাড়া এই লাস্ট মোমেন্টে কেই বা হেল্প করবে। ভাবছে সামনের বছর থেকে একটা টিউটর রাখবে হিন্দির জন্য। ওর পক্ষে এই জোড়াতাপ্পি দিয়ে চালানো বেশ কঠিন।
রুকুর মুখটা ভেবে মায়া হলো পিউয়ের। ওর ঘরে উঁকি দিয়ে দেখলো, অঙ্ক খাতা নিয়ে বসেছে। যাক অন্তত একটা বকুনি খেয়ে বাকি আর কিছুর জন্য বকতে হয়নি। এমনিই নিজে থেকেই বসে গিয়েছে পড়তে। হাত মুখ ধুয়ে রান্নাঘরে ঢুকলো পিউ। ফ্রিজ থেকে একটু চিকেন সিদ্ধ বের করলো। অল্প পিঁয়াজ ক্যাপসিকাম কেটে ফ্রায়িং প্যানে দিয়ে নাড়াচাড়া করে একটা টস কারি গোছের রেঁধে ফেললো। ব্রেড টোস্ট করে তাতে হালকা চিজ মাখিয়ে মা ও ছেলে, দুজনের জন্য চিকেন এন্ড টোস্ট নিয়ে রুকুর ঘরে এলো। রুকু পিউয়ের পায়ের শব্দে মাথা তুললো, কিছু না বলে আবার অঙ্ক খাতায় মনোনিবেশ করলো। পিউ ওর সামনে টেবিল পেতে তাতে দুজনের প্লেট রেখে রুকুর মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললো, "সরি। তখন পুরো ঘটনা না শুনে তোকে মারা উচিত হয়নি আমার। খেয়ে নে।"
রুকু পেন্সিল নীচে নামিয়ে রাখলো। খাতা খোলা। মায়ের হাত থেকে প্লেটটা নিয়ে বললো, "মা, সত্যি বলছি। আমার মনে নেই আমি কোথায় রেখেছি বইটা।"
পিউ বললো, "সে তো বুঝলাম। কিন্তু মনে না করলে খুঁজে পাবে কী করে বলো? পরীক্ষাতে কী করবে?"
রুকু উত্তর বলে, "মা, অবিনাশকে ফোন করবো? ওর বইটা যদি ও লেন্ড করে। তুমি জেরক্স করে নেবে।"
পিউ খেতে খেতে মাথা নাড়লো। তারপর বলল, "আচ্ছা, অবিনাশকে একবার জিজ্ঞেস করে দেখ না। ওর বইয়ের সাথে চলে যায় নি তো? পাশাপাশি বসিস।" রুকু শুনে একটু মাথা নাড়লো। হুম। হতেই পারে। একসাথেই তো ওরা বসে। বইপত্র সব এক টেবিলে থাকে। ও বলে, "মা, তুমি আন্টির নম্বরে কল করো একবার। আমি বলি।"
পিউ মোবাইল বের করে। অবিনাশের মায়ের ফোনে কল করে। অবিনাশ কোচিং ক্লাসে গিয়েছে। তাই পিউই ওর মাকে বলে, "মিসেস বসু, আমার ছেলের হিন্দি বইটা খুঁজে পাচ্ছি না। একবার প্লিজ দেখবেন অবিনাশের ব্যাগে ওর বইয়ের সাথে চলে গিয়েছে কি না?" উল্টোদিক থেকে ঝাঁঝালো উত্তর আসে, "অবি কেন স্বস্তিকের বই নিয়ে আসবে?"
পিউ একটু নরম স্বরেই বলে, "না না, সেটা না। আসলে ওরা পাশাপাশি বসে। তাই ভাব্লাম। বাই মিস্টেক... যাই হোক, আপনি প্লিজ দেখবেন। আই এম শিয়োর, থাকলে আপনি ফেরত পাঠিয়ে দেবেন। খুবই উপকার হয়।" অবিনাশের মা একটু ঠান্ডা গলায় বলে, "হুম। ঠিক আছে। ও ক্লাস থেকে ফিরুক। আমি দেখবো।" এই বলে ফোন ছেড়ে দেয়। পিউ আর বই জেরক্সের কথা বলতে পারে না। রুকুকে বলে, "শোন, একজ্যামের এখন ওয়ান উইক বাকি। একটু দেখ কাল অবিনাশ আনে কি না। আর পরশু তো স্কুলে লস্ট প্রপার্টি আছে। দেখ অপেক্ষা করে। যদি পাস। নইলে আমি ব্যবস্থা করছি। হয় নতুন বই, নয় কারুর থেকে জেরক্স। মিসেস বসুকে তো মনে হল না কথা শুনে যে বই ধার দেবে। আমাকেই কিছু ব্যবস্থা করতে হবে।"
রুকু প্লেট রেখে হাত মুখ ধুয়ে এসে অঙ্ক খাতা নিয়ে বসলো। পিউ সাংসারিক কাজে মন দিলো।
পরের দিন স্বাভাবিকভাবেই রুকু স্কুলে গেলো। পিউ ওকে একবার মনে করিয়ে দিলো, অবিনাশকে বইয়ের কথা জিজ্ঞেস করতে। বিকেলে ফিরে রুকু জানালো, অবিনাশ বএলছে, ওর কাছে বই নেই। লস্ট প্রপার্টির জন্য এখন আর একদিন অপেক্ষা।
লস্ট প্রপার্টিতেও বই পাওয়া গেলো না। পিউ এবার একটু চিন্তিত। বই জেরক্স কেউ কি আদৌ করতে দেবে? অবিনাশের মাকেই কি বলবে? দ্বিধা করতে থাকে। স্কুলে আর তো কেউ নেই। এই বছর সেকশন চেঞ্জ হয়ে যাওয়ায় কারুর ফোন নম্বর নেই পিউয়ের কাছে। একবার কি তাহলে কাল স্কুলের পর হিন্দি মিসের সাথে দেখা করবে? নতুন বই নিয়ে গেলে যদি একটু হেল্প করে দেন? সেই আশা অবশ্য কম। এইসব টিচাররা যে যার প্রাইভেট টিউশানি করতে এতই ব্যস্ত। প্রাইভেট স্কুলের হাইফাই ব্যাপার। পিউ কিছুতেই মেলাতে পারে না এইসব, নিজের শৈশবের সাথে। ওরাও তো ভালো স্কুলে পড়েছে, মাঝেসাঝে কামাইও হয়েছে। সব সময় তো বন্ধুরা সাহায্য করেছে। পিউয়ের মনে পড়ে, ওর যখন ক্লাস সেভেন, সেবার সেকেন্ড টার্মের ঠিক আগে ওর সে কী টায়ফয়েড। স্কুলের মিস, ক্লাসের বন্ধুরা সব্বাই মিলে ওকে নোটস বানিয়ে দিত। আর এখন কে জানে এত কম্পিটিশন কেন।
রুকুর স্কুল গেটে দাঁড়িয়ে পিউ। রুকুর ডায়েরিতে ও লিখে দিয়েছিল, হিন্দি মিসের সাথে দেখা করার কথা। যদি উনি হ্যাঁ বলেন, তাহলে দেখা করবে। রুকু বেরিয়েই এক গাল হাসি হেসে মাকে বলল, "মা, আর মিসের সাথে দেখা করতে হবে না। হিন্দি বইটা আমি পেয়ে গিয়েছি।"
পিউ খানিক অবাক হয়েই বলল, "তাই? বাহ। ভালো তো। তা পেলি কোথায়?"
রুকু হেসে বলল, "অবিনাশের কাছেই ছিল। ওর ব্যাগের ভিতর। ও বলল, এই কদিন নাকি ও খেয়াল করেনি। আমি বলেছিলাম না মা? ওর ব্যাগেই নিশ্চয়ই চলে গিয়েছে। আমি হারাইনি?"
পিউ আর কিছু বলেনা। রুকুর হাত ধরে রাস্তা পার হয়। উল্টো দিকে অটোর লম্বা লাইন। তাড়াতাড়ি না গেলে সেখানেও ভিড় হবে। সর্বত্র কম্পিটিশন, র্যাট রেস। ভাল্লাগেনা।
বাড়ি ফিরে রুকুকে পড়তে বসিয়ে কী জানি কী মনে হতে পিউ হিন্দি বইটা খোলে। উলটে পালটে দেখতে গিয়ে একটা ছোট্ট চিরকুট বেরিয়ে পড়ে। অচেনা হাতের লেখায় কিছু পেজ নম্বর লেখা। আর সাথে লেখা, 'এক কপি'। কৌতূহলবশত ওই পাতাগুলোতে যায় পিউ। গত টার্মের সিলেবাসের কঠিনতম চ্যাপ্টারগুলি। কত কাঠখড় পুড়িয়ে যা সল্ভ করেছিল পিউ। সেইগুলিই জেরক্স হয়েছে। হঠাৎ করেই পুরো ঘটনাটা বুঝতে পারে পিউ। শিউরে ওঠে। এই র্যাট রেসে এমনভাবে ছেলে মেয়েগুলোও নেমে পড়লো? কী দিনকাল। কীসব পেরেন্টিং...
Subscribe to:
Posts (Atom)