Tuesday, May 14, 2019

কলকাতার করচা
ব্যস্ত শহর দিনের শেষ,
দামাল হাওয়া, বৃষ্টি রেশ।
হাড় কাঁপানি বজ্রপাত,
স্নিগ্ধ শহর, রাত্রিবাস।।

Monday, May 13, 2019

গুমটি থেকে স্টার্টারের বারংবার চোখ রাঙানি আর উপেক্ষা করতে না পেরে শেষমেশ ২৩৪ বাসটা ঢিকঢিক করতে করতে এগিয়ে গেলো।
১০০ দিনের কাজ প্রকল্পে কাজ পাওয়া মঙ্গলা আর প্রমোদা ধুলো উড়িয়ে পিচ রাস্তা ঝাঁট দিয়ে এখন আঁচলের কোণায় ঘাম মুছছে।
দুটো শালিখ ছাদের অলস রেলিংয়ে বসে অপেক্ষা করছে সূর্য ডোবার, বাসায় ফেরার।
কৃষ্ণচূড়ার পাপড়িগুলো আপনমনে হাওয়ায় ভাসতে ভাসতে মাটির সাথে ঠোঁটে ঠোঁট মেলাচ্ছে।
বারান্দার কোণে দিদিমণির শুকোতে দেওয়া আমের দিকে লোলুপ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে একটা একলা কাক।
পশ্চিমের ঘরটা রোদে ভেসে যাচ্ছে। কো অপটেক্স থেকে পয়লা বৈশাখে কেনা সবুজ পর্দাগুলো ফ্যানের হাওয়ায় মধ্যে মধ্যে দাদরায় দুলছে।
আনন্দবাজারে শব্দছকটা শেষ করে জেঠুমণি এবার টিভি খুলবে। বাবার সুডোকু এখনও চলছে। মায়ের হাতের কাজ আর শেষ হয় না।

সারা দুপুর এসির জল টুপটুপ টুপটুপ করে পড়ে এখন ক্লান্ত। একটা ছোট্ট চড়াই সেই জমা জলে "কাকস্নান" করছে।

গ্রীষ্মের দুপুরগুলো সেই একইরকম আছে। বছরের পর বছর। শুধু দাদাইয়ের পাঠানো আমের জেলি রাখা হরলিক্সের মোটা কাঁচের বয়ামে ধুলো জমছে। ক্রমশ।

Saturday, May 11, 2019

Mother's day

সম্ভবী মিত্রর বয়স ওই পঁচিশ। বাবা মায়ের একমাত্র সন্তান হওয়ায় খুবই আদর যত্নে মানুষ। নামী ল স্কুল থেকে আইন পাশ করে এখন হায়দ্রাবাদে একটি বেসরকারি ল ফার্মে বেশ মোটা মাইনের চাকরি করে। অফিসের কাছাকাছি একটা ওয়ান বি এইচ কে ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে একাই থাকে।
প্রতিদিনের মতোই সকাল সকাল ব্রেকফাস্ট সেরে রওনা দিয়েছে অফিসের পথে। আজ তৈরি হতে দেরি হওয়ায় মেনুতে ছিল চিকেন স্যান্ডউইচ। এই টোটকা কাম রান্নাটা শেখা মায়ের কাছে। ছোটবেলায় টিফিন বানাতে সময় কম থাকলে মা সব সময় এই চিকেন স্যান্ডউইচ দিতো। ফ্রিজে চিকেন সিদ্ধ সব সময় রেডি থাকে। শুধু একটু ব্রেড টোস্ট করে মাখন লাগিয়ে পুরে দাও। ব্যস। সুস্বাদু খাবার তৈরি।
ক্যাবে রেডিও চলছে। এখনো স্থানীয় ভাষাটা রপ্ত হয়নি বটে। তবে বিজ্ঞাপন শুনে বুঝলো। আসন্ন মাদার্স ডে উপলক্ষে অনুভূতিকে সুড়সুড়ি দিয়ে ব্যবসার প্রচেষ্টা। হ্যাঁ, সুড়সুড়িই বটে। নইলে বছরে কি মোটে একটা দিন লাগে মাকে ভালোবাসতে?
এক রাশ বিরক্তি মুখে সম্ভবী অফিসে পৌঁছয়। অফিসের ইমেলে লগ ইন করতেই দেখে এইচ আর থেকে ইমেল। আগামীকাল মাদার্স ডে সেলিব্রেশন। প্রত্যেকের মা ও মহিলা কর্মীদের সন্তান কাল অফিসে আমন্ত্রিত। অফিস থেকে লাঞ্চ অর্গানাইজ করা হবে। আয়োজনের সুবিধার্থে সকলে যেন গেস্ট লিস্ট আপডেট করে দেয় এ এস এ পি। যত ঢং। ছুটি চাইলে ছুটি নেই। ওয়ার্ক ফ্রম হোম চাইলে তাতে না। শুধু ফালতু ফালতু যত উদ্ভট সেলিব্রেশন। বিরক্ত মুড আরো খিঁচড়ে যায় সম্ভবীর। কাজ নিয়ে বসে। কয়েকটা কেসের রিপোর্ট লেখা বাকি। ইন্টারনেট খুলতেই শুধুই মাদার্স ডের বিজ্ঞাপন। চারিদিকে শুধুই অফার আর অফার। কেক পাঠালে ফুল ফ্রি। হীরে কিনলে সোনা ফ্রি। ঘড়িতে ৫০% ছাড়। পারফিউমে এই। শাড়িতে সেই। বিরক্তিকর। তার সাথে এস এম এসের বন্যা। পাশের কিউবিকলে রঞ্জন আর মেহুল অনেকক্ষণ ধরে ফুসুর ফুসুর করছে। আবছা যা কানে আসছে, বুঝলো ওরাও মাদার্স ডে নিয়েই কথা বলছে। মাথাটা ছিঁড়ে যাচ্ছে সম্ভবীর। এক কাপ কফি না খেলেই নয়। সারাদিনের অনেক কাজ। সামলাতে হবে তো? নইলে ওই রাগী মহিলা...মিসেস কুমুদিনী..লাইফ হেল করে দেবে। যা চ্যাটাং চ্যাটাং কথা শোনায়। বাপ রে। মা মাসীদের বয়সী মানুষ। অথচ কথায় কোনো রাখ ঢাক নেই। মুখে আগল নেই।
ভেন্ডিং মেশিনের দিকে এগিয়ে গেলো সম্ভবী। পেপার কাপে কড়া কফির লিকার ঢেলেছে কি ঢালেনি, চোখ পড়ল, কাঁচের কেবিন থেকে মিসেস কুমুদিনী ওর দিকে তাকিয়ে আছে। ও দেখছে দেখে হাত নেড়ে ওকে ডাকলো কেবিনে। এই রে। নির্ঘাত এসেই কফি ব্রেক কেন নিয়েছে, সেই নিয়ে কথা শোনাবে ওকে, ভাবলো সম্ভবী। ধুর ধুর। দিনটাই খারাপ। দুরুদুরু বুকে ও কুমুদিনীর কেবিনে প্রবেশ করলো। ওকে সামনের চেয়ারে বসতে বলে বলল, " সকাল সকাল এসেই কফি? শরীর খারাপ? "
সম্ভবী প্রমাদ গুনলো। এই শুরু হলো। হয় বকুনি। নয় লেকচার। ও মনে মনে নিজেকে প্রস্তুত করে বললো, "হ্যাঁ মানে মাথাটা একটু ধরেছে।"
"কেন?"
"ঘুম হয়নি ঠিক করে।"
"কখন শুয়েছো?"
সম্ভবী বিরক্ত হয়। এ আবার কী। এত ব্যক্তিগত প্রশ্ন। ব্যাজার মুখে উত্তর দেয়, "ওই একটার দিকে।"
"আর উঠেছ?"
"সাতটা।"
"এরকম করলে মাথা কাজ করবে না তো। বার্ন আউট হবে। আর কত বলবো তোমাদের? দিস জেনেরশন হ্যাজ গন টু দ্য ডগস।" বিরক্তিভরে মাথা নাড়ে কুমুদিনী।
সম্ভবী চুপ করে থাকে। কোনো কথা বলা মানেই আরো লম্বা আলোচনা। যা এই মুহূর্তে ও কিছুতেই চায় না। কুমুদিনী আবার বলে, " যে জন্য তোমায় ডাকা। কাল কী করছো?"
সম্ভবী মুখ তোলে। "কোথায়? কখন?" জিজ্ঞেস করে।
"অফিস পার্টিতে।"
"কিছুই না। আপনি তো জানেন। আমার মা..."
"হ্যাঁ। ওই জন্যই তো ডেকেছি।"
"মানে?" অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে সম্ভবী।
"তুমি নিশ্চয়ই জানো, আমার কোনো ছেলে মেয়ে নেই।"
"আই সি।"
"আমি চাই কাল তুমি আমার সাথে আমার মেয়ে হয়ে অফিস পার্টিতে এসো।"
সম্ভবী অবাক হয়ে তাকায় কুমুদিনীর দিকে। কুমুদিনী বোঝে। বলে, "অবাক হচ্ছ? ভাবছো কেন তুমি অফ অল পিপল?"
সম্ভবী মাথা নাড়ে।
কুমুদিনী বলে, "আই লস্ট মাই মা ওয়েন আই ওয়াস অনলি সেভেন। মা কে ছাড়া থাকার কষ্টটা আমি তাই বুঝি। তুমি রিসেন্টলি মাকে হারিয়েছ। আমি জানি। ভাবলাম ইউ উড বি আপসেট উইথ এভরিথিং টুমরো। তাই এই প্রস্তাব। ভেবে দেখো। কোনো কম্পলশান নেই।"
সম্ভবী কী বলবে, বুঝে পায় না। হাঁ করে তাকিয়ে থাকে কুমুদিনীর দিকে। ওই রাগী বসের ভিতরেও যে এমন মাতৃসত্ত্বা আছে, অনুভব করে ও বিস্মিত। অবাক। কুমুদিনীর চোখের নীচের কুঁচকে যাওয়া চামড়ার দিকে তাকিয়ে থাকে সম্ভবী। ঠিক ওর মায়ের মতো। মায়েরও তো ছিল এমন। তাকিয়ে থাকতে থাকতে কখন কে জানে দুই গাল বেয়ে নামতে থাকে জল। কুমুদিনী অপ্রস্তুত হয়ে ওঠে। নিজের চেয়ার ছেড়ে এসে সম্ভবীকে জড়িয়ে ধরে মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলে, "ধরে নিলাম প্রস্তাবে সম্মতি আছে। ব্যস। মা পেলে আমায়। মায়ের আদরও যেমন দেব, তেমনি শাসনও করবো। দুইই মেনে নিতে হবে। পারবি তো?"
সম্ভবী ওর নতুন মায়ের বুকে মুখ গুঁজে অস্পষ্ট স্বরে বলে, "হ্যাঁ।"
কুমুদিনী বলে, "যা তাহলে কাজে ফের। ফাঁকি মারলেই বকুনি। লাঞ্চে আসিস ক্যান্টিনে। কালকের প্ল্যান করবো। আমি এইচ আরে মেলটা করে দিই। তোর অপেক্ষায় ছিলাম।"
সম্ভবী আস্তে আস্তে উঠে ফেরে নিজের কিউবিকলে। আবিষ্কার করে এত কিছুর মধ্যে কফির কাপটা সেই খালিই পড়ে আছে। তবে অদ্ভুতভাবে, মাথা ব্যাথাটা কোথায় যেন গায়েব। মুহূর্তেই।
মায়ের পরশ?

গরমের ছুটিতে

স্কুলে গরমের ছুটি পড়েছে। প্রতিবারই আমাদের এই ছুটিতে দলবল বেঁধে বেড়াতে যাওয়া হয়। আমরা মানে আমি, মা, বাবা, ওদিকে মাসী, মেসো, ফুল, রেণু, বড় মামা, মামী, তুবড়ি দাদা, চরকি দিদি। কখনও পুরী, কখনও গ্যাংটক তো কখনও ভোপাল, জব্বলপুর। গরমের ছুটি মানে টানা দেড় মাস। আর একদম স্কুল খুলেই পরীক্ষার চোখ রাঙানি নেই। তাই এই ছুটিতে খুব আনন্দ করে আমরা বেড়াই। এই বছর অবশ্য ব্যাপারটা বেশ স্পেশাল। আগামী ২০শে মে আমাদের ছোটমামার বিয়ে। ছোটমামার গল্প তো আগেই বলেছি। ভাগলপুরে থাকে চাকরিসূত্রে। বিয়েটা অবশ্য হবে বর্ধমান জেলার কোন এক গ্রামে। আমরা তিনজন, মাসীরা চারজন আগেভাগেই পৌঁছে গিয়েছি জলপাইগুড়ি। ওখান থেকে সবাই মিলে ট্রেনে একসাথে বর্ধমান আসা হবে। বাবার আর মেসোর বেশ আপত্তি ছিল বটে। ট্রেনে করে কলকাতা থেকে বর্ধমান অনেক কাছে। সেইরকম গেলেই হয়। কিন্তু না। এইসব বিষয়ে মা আর মাসির কথাই ফাইনাল। তাই বাবা আর মেসোকে দুদিন বাড়তি ছুটি নিয়ে জলপাইগুড়ি পৌঁছতে হলো। নেহাত মা অফিসের ছুটি কম পেয়েছে, তাই এক সপ্তাহাগে থেকে যেতে পারেনি। আমার আর বাবার সাথেই গেলো জলপাইগুড়ি।
মামাবাড়িতে গিয়ে দেখি হইহই কাণ্ড। লোকজন আত্মীয়স্বজনে ভর্তি। ভিড়। অমুক মামা, তমুক মাসি, তাঁদের এই এত এত ছেলে মেয়ে। সেই ছেলেমেয়েদেরও আবার কতজনের ছেলেপুলে হয়ে গিয়েছে। এত লোকের নাম ধাম মনে রাখার চেয়ে বাবা হিস্ট্রির ডেট মনে করা সোজা। আমি তাই কেউ এসে আলাপ করলেই শুধু হেসে পালাচ্ছি। চরকি দিদি আর তুবড়ি দাদার অবস্থা অবশ্য সঙ্গীন। যেহেতু নিমন্ত্রিতরা সব ওদের বাড়ি এসেছে, তাই ওদের পালানোর উপায় নেই। আমি, ফুল-রেণু বেশিরভাগ সময়েই ছাদের কোণে গিয়ে বসছি। ওখানে প্যান্ডেল বাঁধার কাজ চলছে। সেইসব দেখছি লুকিয়ে লুকিয়ে। বড়দের চোখ বাঁচিয়ে চলা আর কী। কারণ কেউ দেখলেই ওমনি শুরু হবে, "আরে, তুমি ঝুমকুর মেয়ে না? কত বড় হয়ে গিয়েছ। কোন ক্লাস হলো? অঙ্কে কত মার্কস পেয়েছ? জানো তো, তোমার মা অঙ্কে খুব ভালো ছিল। কোনদিনও ১০০র নীচে নম্বর পায়নি। তোমার কি ষাট পেলে চলে বলো? ভালো করে অঙ্ক করো। নাও দেখি  তো, অমুক তমুক আর তমুকের ল সা গু গ সা গু বলো দেখি?" ব্যস। বুকের ভিতর ধুকপুকানিটা বেড়ে গিয়ে একশা। চোখে মুখে ঘাম। একেই এই প্রচণ্ড গরম। তার মধ্যে এইসব বাঘা বাঘা অঙ্ক। ইতিমধ্যেই আবার দেখবো মা কথা থেকে এসে হাজির। "দেখো না মামা, কেয়াটা একটা ভোঁদড় তৈরি হয়েছে। মাথা ভর্তি গোবর। কিচ্ছু পারে না। এমন সোজা সোজা অঙ্ক পরীক্ষায় ভুল করে কী বলবো। কান্না পেয়ে যায় আমার ওর খাতা দেখলে।" তার মধ্যে আবার কখন মাসিও হাজির হয়ে যাবে। সেও জোট বাঁধবে মায়ের সাথে। ফুল-রেণু নাকি কতটা গাধা, এখনও নাকি ৭ এর নামটা মুখস্থ বলতে পারে না, সেই নিয়ে চলবে তুমুল হা-পিত্যেশ। আর এসবের মধ্যে মামী এসে গেলে তো ষোল কলা পূর্ণ। চরকি দিদি লাস্ট একজ্যামে অঙ্কে ১০০য় ১০০ আর তুবড়ি দাদা ১০০এ ৫৫। "দুই ভাই বোনে যে কী করে এত আলাদা হয় জানিনে বাবা। মনে হয় হাসপাতালে বদল হয়ে গিয়েছিল ছেলেটা আমার। কোথাকার কোন বুদ্ধুরামকে দিয়ে দিয়েছে দেখো।" এই বলে ঘ্যান ঘ্যান শুরু হবে মামীর। ভাগ্যিস পাশের বাড়ির নন্দা মাসি এসে "এদিকে এসো বৌদি, তত্ত্ব দেখে যাও। ঠিক সাজানো হলো কি না, বলো" বলবে। তাই শুনে মাসি মা আর মামী নীচে যাবে। আমরাও হাঁফ ছেড়ে বাঁচবো। কাল দুপুরে খুব হয়রানি হয়েছে। আগামীকাল রাত্রে ট্রেন। আশা করছি সবাই খুব ব্যস্ত থাকবে গোছগাছ করতে। তাই কালকের দিনটা মুক্তি। আজকেরদিনটা পার করে দিতে পারলেই কেল্লা ফতে।
আজ কলকাতা থেকে আরো অনেক আত্মীয় এসেছে। বাড়িতে বলা যায় তিলধারণের জায়গা নেই। আমাদের পাঁচ বাচ্চাকে (অবশ্য আমার এই বাচ্চা উপাধি শুনতে মোটেই ভালো লাগে না। আমার অলরেডি ক্লাস থ্রি। তুবড়ি দাদা ক্লাস সিক্স, চরকি দিদি ক্লাস ফাইভ। ফুল-রেণু না হয় আপার কেজি, ওরা তাও বাচ্চা বলে চলতে পারে।) প্রতিবেশী বাড়ি মায়া মাইমার কাছে পৌঁছে দিলো। একটু যাতে শান্তিতে আমরা শুতে পারি। মায়া মাইমা যেন সার্থকনামা। যদিও মা মাসির কড়া আদেশ ছিল যাতে আমরা ঘুমোই, কিন্তু এরকম বললে হয় নাকি? ঘুম তো যখন তখন পায় না। জোর করে ঘুম পাড়ানো মানে এক প্রকার শাসন বটে। মায়া মাইমার দুই ছেলে মেয়ে। বকুল দিদি আর মুকুল। মাইমা ওদেরকেও কক্ষনো জোর করে না ঘুমোতে। আমাদের সাতজনের ঠাই হলো বকুল মুকুলের ঠাম্মার ঘরে। এই এত্ত বড়ও ঘর। এই উঁচু তার সিলিঙ। কী সুন্দর নক্সা কাটা কাঠের খাট। সেটাও উঁচু। লম্বা ডাণ্ডা পাখা ঝুলছে। সমস্ত কাঠের জানলা বন্ধ। ঘরে অন্ধকার। লাল সিমেন্টের মেঝে। কী ঠাণ্ডা, কী আরাম। ঠাম্মার বয়স বোধহয় ওই সত্তরের দিকে। এক মাথা কাঁচা পাকা চুল, গায়ে সুতির সাদা ধবধবে শাড়ি। হাতে সরু সোনার চুরি।
ঠাম্মা আমাদের সাতজনকে নিজের চারপাশে বসিয়ে আলমারি থেকে একটা মোটা লাল রঙের বই বের করে বললেন, "আয় সোনারা, তোদের ঘুমোতে হবে না। আমি বরং তোদের আজ গল্প পড়ে শোনাই। শুনবি?" এবার গল্পের কথা বললে কেউ কি না করে? আমরা সদলবলে "হ্যাঁ হ্যাঁ বলো, শুনবো।" বললাম। ফুল-রেণুর আবদার রাজা রাণীর গল্প চাই। তুবড়ি দাদার চাই যুদ্ধ। চরকি দিদি আর আমার তেমন দাবী দাওয়া নেই। আমাদের গল্প হলেই হলো। বকুল মুকুল শান্ত। ওরা ওদের ঠাম্মার কাছে গল্প শুনতে অভ্যস্ত। সব রকম শোনে।  ঠাম্মা বললেন, "হ্যাঁ রে দাদাভাই, দিদিভাই, তোদের সবার কথাই রাখবো। আজ তোদের যে এমন একটা গল্প শোনাবো, দেখিস। সেখানে আছে রাজা, রাণী, যুদ্ধ, লড়াই, ন্যায় অন্যায়। স-অ-অ-ব। তোদের আজ মহাভারতের গল্প বলবো।" ঠাম্মার হাতের বইটা "ছেলেদের মহাভারত", উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর। সেই যে ঠাম্মা শুরু করলো গল্প পড়া, আমরা মুগ্ধ হয়ে শুনতে লাগলাম। উফ, সে কী গল্প। কত লোক, কত লড়াই, কত ধনরত্ন, কত বুদ্ধি...বিকেলে মাইমার কাছেই দুধ মুড়ি খেলাম। মায়েরা ডাকতে এলো আমাদের, নিয়ে যাবে। আমরা তো যাবোই না। যতক্ষণ না গল্প শেষ হচ্ছে। ঠাম্মা বলল, "তোরা যা। কাল আবার বলবো না হয়।" আমরা ততক্ষণে গল্পের নেশায় ডুবে গেছি। বললাম, "কালকে আরেকটা গল্প শুনবো। আজ এটা শেষ করবোই।" সন্ধ্যেবেলা একটা বড় কাঁসার থালায় করে মাইমা দিস্তে দিস্তে লুচি আর জামবাটিতে উঁচু উঁচু করে ভর্তি ডাল, আলু পটলের তরকারি আর আরেকটা থালায় ছানা মাখা দিয়ে গেলো। ঠাম্মা নিজেও খেলো, আমাদের সাত নাতি নাতনিকেও খাইয়ে দিলো। খেয়ে উঠে আবার চলল গল্প। যতক্ষণে পাণ্ডবেরা মহাপ্রস্থানের পথে, রাত প্রায় নটা। আমাদের চোখ ঘুমে ঢুলছে। তবুও উঠবার নাম নেই। শেষ মেশ ঠাম্মার ওপর প্রচুর অত্যাচার করে দশটার দিকে গল্প শেষ করে ঠাম্মাকে জড়িয়ে ধরে আদর করে আমরা পাঁচ ভাই বোন বাড়ি ফিরলাম। বকুল মুকুলের বাবা, অর্ধেন্দু মামা আমাদের বাড়ি পৌঁছে দিলো। বাড়ি ঢুকতেই মাসির গলা, "এতক্ষণে বাড়ি ফেরার নাম হলো?"
মায়ের গলা, "থাক এখন ঘুমক সব। কাল আবার রাত্রে ট্রেন। ঘুমের প্রব্লেম হবে। যাক গে। ছিল না সারাদিন, আমরাও নিশ্চিন্ত ছিলাম।" মা আমায় নিয়ে ঘরে শুইয়ে দিলো। বললাম, "জানো তো মা, আজ না ঠাম্মা আমাদের মহাভারতের গল্প বলেছে। খুব ভালো লেগেছে মা। আমায় আবার পড়ে শুনিয়ো।" মা হাসল। চুলগুলো একটু হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলল, "বাড়িতে আছে। নিজে নিজে পড়বি। নামিয়ে দেবো। যখন বই পড়তে বলি, শুনিস না!"
আমি মনে মনে জিভ কাটলাম। এমন ট্রেজার বাড়িতে আছে আর আমি পড়িনি? মায়ের কথা শুনে চলতে হবে দেখছি এবার থেকে। বিয়েবাড়িটা মিটুক। বাড়ি ফিরেই ঝাঁপিয়ে পড়বো। ঠাম্মা বলেছে, এই লেখকের আরো অনেক দুর্দান্ত লেখা আছে। সবপড়ে ফেলবো।

Wednesday, May 8, 2019

পঁচিশে প্রজ্ঞা

"আগামী বুধবার, ঠিক সন্ধ্যে ছটায় কিন্তু আমার অ্যাপার্টমেন্টে চলে আসবি।" তুলি মাসির মেসেজ ঢুকলো হোয়াটসআপে। ডেস্কটপে কালো স্ক্রিনে একগাদা কোড চলছে বা বলা ভালো, চলানোর চেষ্টা করে চলেছে সেই সকাল থেকে। কিছুতেই চলছে না। ডিবাগিং সমস্যায় জেরবার প্রজ্ঞা টেবিলে রাখা ক্যালেন্ডারে চোখ বোলালো। সুদূর অ্যাটলান্টাতে বসেও ওর টেবিলে বাংলা ক্যালেন্ডার। বুধবার জ্বলজ্বল করছে লাল কালিতে। রবীন্দ্রজয়ন্তী। এক লহমায় মুহূর্তের সব বিরক্তি কোথায় যেন ম্যাজিকের মতো গায়েব হয়ে যায়। স্ক্রিনে লাইনের পর লাইন কোড চলতে থাকে। প্রজ্ঞার মন ছুটে যায় ফেলে আসা স্কুলবেলায়।

প্রজ্ঞা পড়তো দক্ষিণ কলকাতার এক নামী ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে। সেখানে লেখাপড়ার সাথে সাথে সাংস্কৃতিক পঠনপাঠনও বেশ গুরুত্বপূর্ণ ছিল। রবীন্দ্র নজরুল জয়ন্তীতে ক্লাসের হয়ে পারফর্ম করতে পারা ছিল আলাদা গর্বের ব্যাপার। প্রজ্ঞা সেই যে ক্লাস ওয়ান থেকে শুরু করেছিলো নাচ ও গান, একেবারে হায়ার সেকেন্ডারি অবধি মঞ্চ কাঁপিয়ে অনুষ্ঠান করেছে। এ ছাড়া পাড়ার অনুষ্ঠানেও দিব্যি সাবলীল। সব মিলিয়ে পঁচিশে বৈশাখের স্মৃতি ওর কাছে বড়ই মধুর। তুলি মাসির মেসেজে যেন সেই সব খনি ওর সামনে আবার উপচে পড়েছে বারবার।

তখন বোধহয় ক্লাস থ্রি। এই প্রথম একক গান গাইবে। নন্দিনী মিস নিজে বসিয়ে ওকে শিখিয়েছেন। " আলো আমার আলো ওগো"। এর আগে দৌড় ছিল সমবেত সঙ্গীতে "আমরা সবাই রাজা" বা "হারে রে রে রে"। মা বাবা দাদুন ঠামুন সব্বাই কি এক্সাইটেড! প্রজ্ঞা এই প্রথম স্টেজে সোলো গাইবে। মা নিউ মার্কেট থেকে ওর জন্য লাল পার গরদের শাড়ি কিনে এনেছে। অনুষ্ঠানের দিন সযত্নে ওকে সাজিয়ে একদম পরীর মতো লেগেছিল। প্রজ্ঞার অবশ্য মনে নেই। কিছু হলদে হয়ে আসা ফটোগ্রাফ সম্বল। স্টেজে উঠে সেদিন অপূর্ব গেয়েছিল ও। নন্দিনী মিস তো স্টেজ থেকে বেরোনোর পর ওর দুই গালে চুমু এঁকে দেন।

মনে পড়ে যায় ক্লাস টেনের কথা। প্রিটেস্টের জন্য পড়ার চাপ। অথচ নাচ করতেই হবে। তাও আবার শ্যামা নৃত্যনাট্যে নাম ভূমিকায়। বাড়িতে বকাঝকা কম হয়নি এই নিয়ে। কিন্তু প্রজ্ঞা গুণী মেয়ে। এবং চালাক। নাচ গানের সাথে সাথে লেখাপড়াটা এত সুন্দরভাবে ম্যানেজ করেছে...কোনোদিনও বাবা মা বকার সুযোগ পাননি। ওই জন্যই উচ্চ মাধ্যমিকের বছরেও জয়েন্ট এনট্র্যান্স ইত্যাদি সবকিছুর প্রিপারেশন নিতে নিতেও চলেছে সমান তালে নাচ ও গানের মহড়া। সেবার তো আবার তাসের দেশ। অনেক অনেক গান। নাচ।

দুর্দান্ত রেজাল্ট করে যাদবপুর থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়া। ইউনিভার্সিটি জীবনেও মিস যায়নি কোনো অনুষ্ঠান। ওদের গল্ফগ্রীনের প্রোগ্রামে তো ভিড় উপচে পড়তো। ফার্স্ট ইয়ারে পড়াকালীন গানের স্কুলের থেকে চিত্রাঙ্গদা মঞ্চস্থ হয়েছিল। ও ছিল বরাবরের মতোই নাম ভূমিকায়। অর্জুন হয়েছিল ঋজু বলে একটি ছেলে। অর্জুনের গান গেয়েছিল ওদের স্কুলেরই এক ছাত্র, রেবন্ত। কয়েক বছরের বড়। অসাধারণ গানের গলা। তেমনই মিশুকে। তবে এক বছর ওদের সাথে গান শেখার পরে ও জে এন ইউ তে চাকরি পেয়ে চলে যায় দিল্লী। তারপর আর কোন যোগাযোগ নেই। সেই অনুষ্ঠানে বহু প্রথিতযশা শিল্পীদের ভিড়ে প্রজ্ঞাও মন কেড়ে নিয়েছিল সকলেরই। যখন মাস্টার্স করতে ইউ এস এলো, একটু শঙ্কা ছিল। এখানে এসে নাচ গানটা বজায় থাকবে তো? তবে ওর সমস্ত আশঙ্কা দূর করে তুলি মাসিকে পেলো এখানে। তুলি মাসি আর প্রবুদ্ধ মেসো তিরিশ বছর ধরে অ্যাটলান্টায় থাকেন। নিঃসন্তান এই দম্পতি বড় ভালোবাসেন প্রজ্ঞাকে। গান গল্প খাওয়া দাওয়া লেগেই থাকে ওদের বাড়ি। এমনিই ছুটি ছাটার দিনে তো বটেই, আর বিশেষ বিশেষ দিনে থাকে বিশেষ ভাবে উদযাপন। যেমন, দোল, নববর্ষ, রবীন্দ্র জয়ন্তী, নজরুল জয়ন্তী, বিজয়া সম্মেলনী, সরস্বতী পূজা ইত্যাদি। তুলি মাসির বাড়ি যে এবারেও দারুণ আনন্দ হবে, প্রজ্ঞা জানে।

লাঞ্চ আয়ার্সএ প্রজ্ঞা তুলি মাসিকে ফোন করলো।
"হ্যালো মাসি?"
"মেসেজ পেয়েছিস তো?"
"হ্যাঁ গো। ওই জন্যই তো ফোন।"
"চলে আসবি কিন্তু সময়মতো। এবারে কিন্তু একটা সারপ্রাইজ আছে!"
"সারপ্রাইজ? কী গো?"
"ধুর, তাই যদি বলে দিই, তাহলে আর কীসের সারপ্রাইজ হলো বল?"
"তাও বটে। তা, ড্রেসকোড আছে কোনো? আই মিন, কালার কোড?"
"হুম। সাদা ঢাকাই। যে কোনো রঙের পার।"
"এই রে। আমার যে নেই।"
"আমার কয়েকটা আছে। আজ ল্যাব থেকে ফেরার পথে আসিস। পছন্দ করে নিয়ে যাবি।"
"আচ্ছা। ইউ আর অলওয়েজ এ সেভিয়ার মাসি।"
"আর শোন, ডিনারটা আমার কাছেই করিস। তোর ফেভারিট বাটি চচ্চড়ি করবো।"
"ইয়ে!"

বুধবার এলো। সুপারভাইজরকে বলে আজ হাফ ডে নিয়েছে ও। লাঞ্চ সেরে কাজকর্ম গুটিয়ে বাড়ি পৌঁছে একবার গীতবিতান খুলে বসলো। ঠিক করাই আছে কী কী গান গাইবে। তবুও, ওই ঝালিয়ে নেওয়া। শুরু করবে "আনন্দধারা বহিছে ভুবনে" দিয়ে, তারপর একে একে "বহে নিরন্তর অনন্ত আনন্দধারা", "তাই তোমার আনন্দ" আর সব শেষে "আনন্দলোকে মঙ্গলালোকে"। তুলি মাসির নীল পার শাড়িটা পরে খোঁপায় ম্যাচিং নীল অর্কিড লাগিয়ে পাঁচটার দিকেই বেরিয়ে পড়ল প্রজ্ঞা। যদিও মাসির বাড়ি ওই মিনিট কুড়ির ড্রাইভ, তাও, হাতে হাতে মাসিকে সাহায্য করাও যাবে। ও জানে, আজ অনেক লোক সমাগম হবেই। আর মাসির একার পক্ষে সব আয়োজন করা কঠিন। তাই তুলি মাসি না বললেও, ও আগেই পৌঁছল। বেল বাজালো। ভিতর থেকে ভেসে আসছে স্পিকারে গমগমে গলায় দেবব্রত বিশ্বাস। "মেঘের পরে মেঘ জমেছে..."। সত্যিই, অ্যাটলান্টার আকাশেও যেন মেঘের ক্যানভাস। তাতে অস্তমিত সূর্যের রক্তিম আভা। অনন্য এক চিত্র। এইসব ভাবতে ভাবতে দরজা খুলতে সামনে যাকে দেখলও প্রজ্ঞা, ও এক্কেবারে তাজ্জব! এ কী? এ যে রেবন্তদা !!

"ও মা, তুমি? রেবন্তদা?" প্রজ্ঞার চোখে মুখে বিস্ময়। রেবন্ত ঠিক একই আছে। সেই কোঁকড়া চুল, রোগা লম্বা চেহারা। গালে হাল্কা গোঁফ দাঁড়ি। দুষ্টু দুষ্টু চোখ। সরু রিমের ছোট্ট চশমা। সেই জিন্স আর খাদির হলুদ পাঞ্জাবি। দেখে বোঝার উপায় নেই যে এখন কলেজে অধ্যাপনা করে এবং রীতিমতো সিরিয়াস প্রফেসর।
পিছন থেকে তুলি মাসির গলা পেলো প্রজ্ঞা। "কী? বলেছিলাম না সারপ্রাইজ আছে?"
"কিন্তু তুমি রেবন্তদাকে চিনলে কী করে মাসি?"
"ভিতরে আয়। সব কথা কি বাইরেই হবে নাকি?"
ড্রইং রুমটা ভীষণ এস্থেটিক ভাবে সাজিয়েছে আজ। এত বড় ছবি কবিগুরুর। তার সামনে বড় বড় ফুলের তোড়া। নরম সোফায় গা এলিয়ে আরাম করে বসেছে প্রজ্ঞা। তুলি মাসি বলতে থাকে, "রেবন্ত আমার এক মাসতুতো দিদির মেয়ের দেওর। ও এখানে এসেছে একটা এক্সচেঞ্জ প্রোগ্র্যামের জন্য। আমায় দিদি বলল, ওকে একটু দেখতে। আমি তো ফোন করে গল্প জুড়ে দিলাম। তারপর কথায় কথায় জানলাম, ও ভীষণ ভালো গান করে। অবশ্য সেটা সীমাদি বলেছে। রেবন্ত নিজের মুখে বলেনি।"
"হ্যাঁ, রেবন্তদা বরাবরই ওরকম। বড্ড বিনয়ী।"
"তা রেবন্তকে বললাম আমদের অনুষ্ঠানের কথা। কে কে আসে, নিয়মিত গায়, সব বললাম। তোর নাম শুনেই বলল, ওই যে চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা, গোলগাল ছোট্ট মেয়েটা? ব্যস, তোর ছবি দেখালাম। বলল, হ্যাঁ, এই সে। এই তো আমার চিত্রাঙ্গদা। তারপর দুজনে মিলে এই প্ল্যান। আজ দুজনে চিত্রাঙ্গদার সব গান গাইবি। কোরাস আমরা ম্যানেজ দেবো। বুঝেছিস?"
" বাবা রে মাসি, তলে তলে এত কিছু?"
"আবার কী?"
"কিন্তু আমি যে এত গান বেছে এলাম?"
"সে গাস। কিন্তু আগে এটা। রেবন্তকে তো রোজ পাবি না। তাই চিত্রাঙ্গদা ফার্স্ট প্রায়োরিটি। এমনিও দেখ, অনেকদিনের ইচ্ছে ছিল এটা করার। অর্জুন পাইনি এতদিন। আজ যখন আমার অর্জুন এসে হাজির নিজেই, এই সুযোগ আমি ছাড়ছি না!"
"বলছো যখন..."
"হ্যাঁ, তোরা চাইলে একটু রিহার্সাল করে নে। অন্যরা আসবে ওই সাড়ে ছটার দিকে। নে, গান ধর...তোর মেসো পাঠ করে দিচ্ছেখন..."

("মণিপুর রাজের ভক্তিতে তুষ্ট হয়ে শিব বর দিয়েছিলেন যে তার বংশে কেবল পুত্রই জন্মাবে। তৎসত্ত্বেও যখন রাজককূলে চিত্রাঙ্গদার জন্ম হল, তখন রাজা তাকে পুত্র রূপেই পালন করলেন...")
- কীরে, ফোন করলি না কেন সারাদিন?
- মুড অফ।
- কেনো?
- নানান কারণ।
- আমি মনে হয় সেই নানানের একটা নই, রাইট?
- হুম।
- যাক। নিশ্চিন্ত।
- Actually, now that I think about it, তোর ওপরও রাগ করা উচিত আমার।
- এই রে, কেন?
- সারাদিনে খোঁজ নিলি না।
- আচ্ছা, তার জাস্টিফিকেশন পরে দিচ্ছি। আগে আগেরগুলো বল।
- বাবা মা।
- কী হলো?
- এত ন্যাগিং।
- আবার বিয়ে বিয়ে করছে?
- থ্যাংকফুলি না।
- তবে?
- কাজ নিয়ে। অফিস নিয়ে।
- তা সে ওঁরা out of concern বলছেন।
- আরে কিছু জিনিস আমার হাতে থাকে না। বোঝে না কেন? বুঝবে না। এদিকে random মন্তব্য করে মেজাজ খারাপ করে দেবে।
- বুঝলাম।
- সকাল সকাল ঝগড়া। ফোন কেটে দিলাম। তারপর সারাদিন কল করিনি। এদিকে দুপুর থেকে চোদ্দবার মেসেজ। কী করছিস? খেলি? উত্তর প্রায় দিইনি। বা দিলেও হুম হ্যাঁ। তাতে লিখছে, রাগ করে আছিস? লাইক, বোঝেনা নাকি? রাগ করার মতো কাজ করবে আর আমি ধেই ধেই করে নাচ করবো?
- হুম।
- হুম হুম করিস না।
- উফ। মাথা ঠান্ডা কর। ভাব।
- ছাই।
- দেখ, পৃথিবীতে বাবা মা হলো একমাত্র আপন। আমিও নই। ওঁরা তোকে যত ভালোবাসেন, তুই বিশ্বাস কর, আর কেউ তোর ভালো অতটা চায় না। ওঁরা সবটা বোঝেন না। ওঁদের সময় আলাদা ছিল। ওঁরা সেই এক্সপিরিয়েন্স থেকে বলেন। এত গায়ে মাখিস না।
- শোন, এটা আজ না। দিনের পর দিন হয়।
- আরোই তো তোর অভ্যেস হয়ে যাওয়া উচিত। নয় কি?
- হ্যাঁ, সব দোষ আমার।
- আবার রাগ অভিমান।
- হু।
- মন দিয়ে শোন। ভাব। বুঝবি।
- কী?
- এই যে এতগুলো কথা বললাম। ঠান্ডা মাথায় ভাব। আর ওঁদের ফোন করে নে। একদিনের জন্য অনেক রাগ হয়ে গেছে। বেশি মাথা গরম করলে মাথায় পিম্পল হবে।
- ধ্যাৎ। বাজে কথা।
- বাগান করিস তো খুব। ওইখান থেকেই একটা এক্সাম্পল দিই। গোলাপ ফোটাতে কত কসরৎ করিস বল তো?
- হুম।
- এদিকে বাগানের এক কোণে যে নয়নতারাগুলো ফুটে থাকে... দিব্যি রোজ ফুল ফোটে। যত্ন করতে হয় না। তবুও কনস্ট্যান্ট থাকে। বাগানের শোভা বাড়ায়... বাবা মা ঠিক তেমন। হয়তো ছাপোষা, কিন্তু দিনের শেষে ওঁরাই আশ্রয়। বুঝলি?
- বেশ দারুণ উপমা দিলি তো।
- ফেসবুক থেকে ঝাঁপা। আমার অত সাহিত্য আসে না।
- সব হলো। কিন্তু তুই সারাদিন আজ কেন ফোন করিসনি বল।
- প্লিজ, আজকের জন্য অনেক রাগ অভিমান হয়ে আছে। প্রমিস। এটা ডিউ থাকলো। যেদিন খুব প্রেম পাবে, ঝগড়ার টপিক পাবো না, সেদিন এটা নিয়ে আলোচনা হোক?
- ছাগল একটা!
Remove

Sunday, May 5, 2019

ভাঙা রেডিওটা থেকে ক্ষীণ স্বরে ভেসে আসছে সঞ্চালকের কথা। আগামী চব্বিশ ঘন্টায় ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা। জেলেদের সমুদ্রে যাওয়ায় নিষেধাজ্ঞা। হাতের কাজ সারতে সারতে কথাগুলো কানে যায় ময়নার। ময়নামতী। বছর পঁয়ত্রিশ বয়স। শ্যামলা গায়ের রং। টানা টানা কাজল কালো চোখ। ঠিক যেন কবির কৃষ্ণকলি। এক মাথা কোঁকড়া চুল। টেনে খোঁপা বাঁধা। জেলেপাড়াতেই থাকে মেয়ে সুখীকে নিয়ে। স্বামী এমনই এক ঝড় ঝঞ্ঝায় সেই যে সমুদ্রে গিয়েছিল, আজও ফেরেনি। ময়না জানে, সমুদ্র কখনো কিছু নেয় না। সব ঠিক ফিরিয়ে দেয়। একদিন ওর স্বামীকেও ঠিক পৌঁছে দেবে ওর কাছে। গভীর রাতে যখন ঝুপড়ির সামনে বসে থাকে, বঙ্গোপসাগরের থেকে ভেসে আসা নোনা বাতাসে স্বামীর সোহাগ অনুভব করে সে।

নিউ দিঘায় বীচের ধারে একটা মামুলি ভাতের হোটেল চালায় ময়না। টুরিস্ট মরসুমে বলতে নেই, বেশ ভালোই চলে। যায় ফলে এইসব খারাপ আবহাওয়ার সময়ে দোকানে খরিদ্দার না এলেও কোনোমতে মা মেয়ের চলে যায়। ছোটবেলায় মায়ের হাত ধরে কলকাতায় সাহেব বাবুদের বাড়ি কাজ করতে গিয়ে কত নামী দামী রান্নার গল্প শুনতো। ময়না স্বপ্ন দেখতো, একদিন ওরও এমন কায়দার দোকান হবে। ছোট্ট বাঁশের দোকান। সমুদ্রের ধারে। ঝিনুক দিয়ে সাজাবে। হাওয়াতে উইন্ডচাইমগুলো টুংটাং শব্দে অতিথিদের মাতিয়ে রাখবে। আশে পাশের ভাতের হোটেলের সাথে কোনোরকম সংঘাতে না গিয়ে ওর দোকানে একদম অন্য ধরণের দেশী বিদেশী খাবার হবে। নিজস্ব আইডেন্টিটি হবে। মেনুতে থাকবে বোটি কাবাব, আল ফাহাম কত কিছু। দামও খুব বেশি রাখবে না। ভাইকে দিয়ে দেশের বাড়ি থেকে ফল আনবে। টাটকা। রান্নার হাত ওর বরাবরই ভালো। তাই ওর খাবারের দোকানে পয়লা বৈশাখে কাঁচা আম আর ময়নামতীর নববর্ষের রান্না খেতে ভিড় উপচে পড়বে। কত স্বপ্ন।

বাবা মারা গেলো এক্সিডেন্টে। তড়িঘড়ি কলকাতার পাট চুকিয়ে ময়না, ভাই আর ওর মা ফিরে এলো খড়গপুর। তারপর আর কী, অভাবের সংসার। তাড়াহুড়োয় ভুবনের সাথে বিয়েটা হয়ে গেল। ভুবন মাঝি। গেলো বছর পাড়ার ক্লাবে বায়োস্কোপে এই নামের সিনেমা দেখে এই কাকতলীয় ব্যাপারটা জেনে বেশ অবাক হয়েছিল ময়না। ভুবন যখন নিখোঁজ হয়, সুখী খুবই ছোট। বছর ছয়েক বয়স। ওইটুকু মেয়েকে নিয়ে ভদ্রভাবে বেঁচে থাকার তাগিদে প্রাণপণ লড়াই করে নিতান্তই মনের জোরে সেদিনের সেই কালো মেয়েটা আজ নেমেছে স্বপ্নপূরণের লড়াইয়ে। নিজের রান্নার হাতকে মূলধন করে। হয়তো সেই ছোট্ট ময়নার সেদিনের স্বপ্ন কোনোদিনও পূরণ হবে না। কিন্তু অস্তিত্ব রয়ে যাবে। ময়না আজও স্বপ্ন দেখে। সুখীকে একদিন মানুষের মতো মানুষ করবে। অনেক বড় হবে ও।

বাইরে ইতিমধ্যেই শনশন করে হাওয়া বইছে। ঘরের কাজ শেষ করে সুখীকে নিয়ে বেরোয় ও। এই সময়টা একদম মা মেয়ের, একান্ত। দিগন্ত বিস্তৃত সমুদ্রের পানে চেয়ে থাকে দুজনে। কোনো কথা নেই কারুর মুখে। দূরে কয়েকটা জাহাজে টিমটিম করছে আলো। জেলে নৌকাগুলো ফিরছে একে একে। বিষ্টুর চায়ের ঠেক থেকে গান ভেসে আসছে। বনমালী, পরজনমে হইও রাধা। এমন সময় চোখ যায় পূবদিকে। একটা ছোট জটলা। প্রতিবেশী পরাণ ওদিক থেকে আসছিল। ওদের দেখে বললো, "বৌদি, ওখানে একটা লোক ভেসে এসেছে। বেহুঁশ। পুলিশ আসবে এখনই। তোমরা বাইরে থেকোনা। ঘরে যাও গে।" ময়নার বুকটা ধক করে ওঠে। তাকায় সুখীর দিকে। ও ও বুঝি তাই ভাবছে। তবে কি...

বালির ওপর দিয়ে এগিয়ে যায় ওরা। এক বুক আশা নিয়ে...