আজকে বলব আমার এক বন্ধুর কথা। ওর নাম শতায়ু। আমরা একসাথে শিবপুর বেসুতে MSc
পড়তাম। মানে আমি ওখানে মোটে সাতদিন ক্লাস করেছিলাম, তারপরে যাদবপুরে চান্স
পেয়ে চলে যাই। ও ওখানেই কন্টিনিউ করে। এক ক্লাসে পড়লেও সাতদিনে তেমন আলাপ
বন্ধুত্ব্ব হয়নি। শেষদিন যখন আমি ক্লাসের সকলকে goodbye জানিয়ে বেরোচ্ছি,
তখন নিজে যেচে আমার ফোন নম্বর নিয়েছিল আর নিজেরটা দিয়েছিল। সেই থেকে শুরু
আমাদের SMS এ গল্প, আড্ডা মারা।
যাদবপুরে কোর্সে কি পড়লাম নতুন, কারা বন্ধু হল, সিনিয়ররা কে কেমন, কার ওপর ক্রাশ
হল সমস্ত আলোচনা হত। ওর দিক থেকেও খবর পেতাম। তখন ছিল বোধহয় অরকুটের যুগ,
ফেসবুক ততটাও দাপানো শুরু করেনি। মনে আছে ওর অ্যালবামগুলিতে আনতাব্রি
কমেন্ট করতাম, খ্যাপাতাম। মোটামুটি ও ছিল আমার যাকে বলে ভীষণ কাছের বন্ধু।
জীবনের সুখ দুঃখ সমস্ত সময়ে ওকে পাশে পেয়েছি।
২০১২ সালের পুজোতে মনে
আছে দশমীর দিন আসানসোলে কোন কারণে বন্ধ ছিল। আমার পিসি কাকা সবাই ওইদিকে
থাকত। ওদের থেকেই খবর পাওয়া। দর্পণে বিসর্জনের পরে SMS করলাম "শুভ বিজয়া"।
প্রায় ওই দুপুরবেলা নাগাদ, বারোটার আশেপাশে। কোন উত্তর পাইনি। মনে পড়ল, ওর
ঠাকুমার শ্রাদ্ধের কাজ ছিল, বুঝলাম সেই নিয়ে ব্যাস্ত।
মাঝ রাত্রে আমার
বান্ধবী, ও-ও বেসুতেই পড়ত, আমায় মেসেজ করেছিল, শতায়ু আর নেই। ঘুমের মধ্যে
অভ্যেসবশত আমি মেসেজটি ডিলিট করে দিই। সকালবেলা উঠে পরেরদিন কোন আর কারুর
থেকে খবর নেই। ভাবলাম মনের ভুল। আর ব্যাপারটা এমনই অদ্ভুত, ওরকম ডাইরেক্টলি
কাউকে জিজ্ঞেসও করা যায়না। বান্ধবীকে আবার মেসেজ করলাম বিজয়ার শুভেচ্ছা
জানাতে। তখন ও আমায় বলল। আগেরদিন দুপুরে ওর ঠাকুমার কাজের পরে ফুলপাতা
ইত্যাদি ফেলতে দামোদর নদে গিয়েছিল। তখন হঠাৎ বাঁধের জল ছেড়ে দেওয়ায় ওদের
নৌকোটি টাল সামলাতে পারেনি, ও নৌকো থেকে পড়ে ভেসে যায়। অনেক রাত্রে ওর নিথর
মৃতদেহ বহু দূরে পেয়েছিল। ডাক্তার লেখেন "ম্যাসিভ হার্ট এটাক"।
যেইটুকু জেনেছিলাম, যখন ঘটনাটি ঘটে, সময় ওই বারোটার আশেপাশে। যখন কিনা ওকে
আমি SMS করছিলাম। সেইদিন কিন্তু ওই সময়ে আমি আর কাউকে SMS করিনি। আজও
বুঝিনি, কোন টানের বশে ঘটেছিল। লোকে বলে যে প্রিয়জন যখন বিদায় নেয়, দোসরের
সাথে দেখা করে যায়। হয়তো...
https://www.youtube.com/watch?v=AoFgEqjO2kg
Monday, July 3, 2017
Saturday, July 1, 2017
গল্প হলেও সত্যি
****গল্প হলেও সত্যি****
আজ ভেবেছিলাম একটু লেখা থেকে ব্রেক নেব, কিন্তু এমন একখানা কাণ্ড ঘটে গেল, লিখতে বাধ্য হচ্ছি। ঘটনাটি এই রসেবশে গ্রুপ নিয়েই।
মেঘে মেঘে তো বয়সটা নেহাত কম হয়নি, বিয়ে-থা করার চেষ্টা চলছে। সেই সূত্রে আজ এক "প্রস্পেক্টিভ পাত্রের" সাথে ডেটে গিয়েছিলাম। মেনল্যাণ্ড চায়না। চাইনীজ আমার খুবই প্রিয়। মেনু কার্ড দেখে আমি প্রায় হামলে পড়লাম (আসলে হোস্টেলে থাকি, প্রায় অভুক্তই থাকে বলতে পারেন)। স্যুপ, স্টারটার, মেন কোর্স, সাইড ডিশ সব অর্ডার দিয়ে ততক্ষণে উল্টো দিকে যেই ভদ্রলোক বসেছেন, তার সাথে কথা বলতে শুরু করেছি। সেই কথোপকথনের মোটামুটি একটা খসড়া এই রকমঃ
আমিঃ আমি না আপনাকে প্রায় জিজ্ঞেস না করেই সব অর্ডার দিলাম, আশা করি আপনি মাইন্ড করেননি।
সেঃ না না, আপনি দেখলাম বেশ খাদ্যরসিক, খুব সুন্দর সব রকম আইটেম দিব্যি অর্ডার করে দিলেন। আমি না মেনু কার্ড দেখে কিরকম একটা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যাই।
আমিঃ না মানে আমি জোম্যাটো থেকে অল্প বিস্তর দেখে আসি কোথায় কোন খাবার ভাল, সেই অনুযায়ী অর্ডার করি।
সেঃ আপনি যে ভালই খান, আপনার লেখা দেখে বোঝা যায়।
আমিঃ আমার লেখা? আমার লেখা আপনি কোথায় পেলেন? কোন লেখা?
সেঃ ওই যে, এসো বসো আহারে।
আমিঃ ও আপনি বুঝি রসেবশেতে আছেন? ( আসলে এই ভদ্রলোকটি কে তো তখনো ফেসবুকে যোগ করিনি, অন্য কোন সুত্রে লেখাটা পাওয়ার কথা না।)
সেঃ হ্যাঁ, আমি আপনার লেখার বেশ নিয়মিত পাঠক।
আমিঃ ও আচ্ছা। আসলে ওখানে এত মেম্বার, সবার সাথে ঠিক আলাপ পরিচয় নেই, যারা আমার লেখায় লাইক কমেন্ট করেন বা রেগুলারলি লেখেন, তাদের নামে চিনতে পারি। আপনি বোধহয় খুব একটা এক্টিভ না, তাই না?
ইতিমধ্যে লেমন কোরিয়েন্ডার প্রন স্যুপ ও ক্র্যাব কেক এসে গিয়েছে। খাওয়াও শুরু হয়ে গিয়েছে।
সেঃ উমম, বেশ সুন্দর তো টেস্ট, বেশ একটা টক টক খেতে। আপনি অর্ডার ভাল করেছেন।
আমিঃ থ্যাঙ্ক ইউ। হ্যাঁ, খুব ট্যাঙ্গি একটা ফ্লেভার। তা যা বলছিলাম, আপনি বেশী এক্টিভ না গ্রুপে, না?
সেঃ না। মানে আমি মোটামুটি সকলের লেখা পড়ি। তবে ওই লাইক কমেন্ট করিনা। সামহাউ ইচ্ছে করেনা।
আমিঃ ও আচ্ছা। আসলে লাইক কমেন্ট বা যে কোন ফিডব্যাক না পেলে আমরা যারা লিখি, তারা বুঝিনা পাঠক কি চাইছেন। তাই পারলে এরপর থেকে মন্তব্য, নিদেনপক্ষে ভাল লাগলে একটা লাইক করবেন।
সেঃ আচ্ছা বেশ। আমার না একটা প্রশ্ন আছে।
আমিঃ হ্যাঁ বলুন, তবে নুডলসটা খান। জব্বর বানিয়েছে। প্যান ফ্রায়েড, বেশ মুচমুচে।
সেঃ ফিশটাও টেস্টি।
আমিঃ হ্যাঁ। কি প্রশ্ন আছে করে ফেলুন।
সেঃ বলছি আপনার জীবনে অর্ক কে?
আমিঃ অর্ক? কোন অর্ক?
সেঃ না মানে ওই এসো বসো আহারেতে সেদিন লিখলেন পায়েল আর অর্কর গল্প। তারপরে সেদিন ওই মোমোর গল্প লিখলেন। ওগুলো তো আপনারই নিজের ঘটনা নিশ্চয়ই?
আমিঃ পাগল? না না। নিছকই গল্প।
সেঃ আর ওই গানে গল্পের ব্রেকাপটা? ইলেক্ট্রনিক সিটিতে কে থাকে?
আমিঃ শুনুন মশাই, ইলেক্ট্রনিক সিটি ফেজ ১ ও ২ মিলিয়ে প্রচুর প্রচুর লোক থাকেন। কিন্তু আমি গোট্টিগেড়েতে থাকিনা। ওটাও নিছকই গল্প। পাতি ব্যাঙ্গালোর টাইমস খুলে পরপর দুটো ক্লাসিফায়েড বিজ্ঞাপনে এই নামগুলো পেলাম।
সেঃ এ বাবা।
আমিঃ এত ডিসাপয়েন্টেড হলেন যে?
সেঃ না আসলে আপনার লেখা গুলো দেখে খুব কৌতূহল হত, তাই যখন ম্যাট্রি প্রোফাইলে আপনার নাম দেখলাম, ভাবলাম দেখি চেষ্টা করে, যদি সামনাসামনি কথা বলে গল্পগুলির পিছনের সত্যিটা জানা যায়। সেই জন্যই আরো আসা আজ।
আমিঃ ও না না, ওগুলো সবই আমার মজা করে লেখা। ইন ফ্যাক্ট রোহিণীর গল্পটাও বানানোই।
সেঃ বুঝলাম।
স্বাভাবিকই এরপরে বেশী আর কথা এগোয়নি। উনি এতটাই মর্মাহত হলেন (ভেবেছিলেন কি নতুন কোনো স্কুপ পাবেন? রসেবশেতে গল্প লিখবেন? মিউচ্যুয়াল ট্রান্সফারের ব্যাকগ্রাউণ্ডের মত এসো বসো আহারের ব্যাকগ্রাউণ্ড? কে জানে!) যে এরপরে আর আইস্ক্রীমও খাওয়া হলনা, যদিও লিচু আইস্ক্রীম ছিল মেনুতে। দেখে রেখেছিলাম!
********************************************************************************
পুনশ্চঃ রসেবশেতে লেখা এ যাবত সমস্ত গল্পই আমার কল্পনা! বাস্তবের সাথে মিল খুঁজতে যাওয়া সময় নষ্ট।
আজ ভেবেছিলাম একটু লেখা থেকে ব্রেক নেব, কিন্তু এমন একখানা কাণ্ড ঘটে গেল, লিখতে বাধ্য হচ্ছি। ঘটনাটি এই রসেবশে গ্রুপ নিয়েই।
মেঘে মেঘে তো বয়সটা নেহাত কম হয়নি, বিয়ে-থা করার চেষ্টা চলছে। সেই সূত্রে আজ এক "প্রস্পেক্টিভ পাত্রের" সাথে ডেটে গিয়েছিলাম। মেনল্যাণ্ড চায়না। চাইনীজ আমার খুবই প্রিয়। মেনু কার্ড দেখে আমি প্রায় হামলে পড়লাম (আসলে হোস্টেলে থাকি, প্রায় অভুক্তই থাকে বলতে পারেন)। স্যুপ, স্টারটার, মেন কোর্স, সাইড ডিশ সব অর্ডার দিয়ে ততক্ষণে উল্টো দিকে যেই ভদ্রলোক বসেছেন, তার সাথে কথা বলতে শুরু করেছি। সেই কথোপকথনের মোটামুটি একটা খসড়া এই রকমঃ
আমিঃ আমি না আপনাকে প্রায় জিজ্ঞেস না করেই সব অর্ডার দিলাম, আশা করি আপনি মাইন্ড করেননি।
সেঃ না না, আপনি দেখলাম বেশ খাদ্যরসিক, খুব সুন্দর সব রকম আইটেম দিব্যি অর্ডার করে দিলেন। আমি না মেনু কার্ড দেখে কিরকম একটা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যাই।
আমিঃ না মানে আমি জোম্যাটো থেকে অল্প বিস্তর দেখে আসি কোথায় কোন খাবার ভাল, সেই অনুযায়ী অর্ডার করি।
সেঃ আপনি যে ভালই খান, আপনার লেখা দেখে বোঝা যায়।
আমিঃ আমার লেখা? আমার লেখা আপনি কোথায় পেলেন? কোন লেখা?
সেঃ ওই যে, এসো বসো আহারে।
আমিঃ ও আপনি বুঝি রসেবশেতে আছেন? ( আসলে এই ভদ্রলোকটি কে তো তখনো ফেসবুকে যোগ করিনি, অন্য কোন সুত্রে লেখাটা পাওয়ার কথা না।)
সেঃ হ্যাঁ, আমি আপনার লেখার বেশ নিয়মিত পাঠক।
আমিঃ ও আচ্ছা। আসলে ওখানে এত মেম্বার, সবার সাথে ঠিক আলাপ পরিচয় নেই, যারা আমার লেখায় লাইক কমেন্ট করেন বা রেগুলারলি লেখেন, তাদের নামে চিনতে পারি। আপনি বোধহয় খুব একটা এক্টিভ না, তাই না?
ইতিমধ্যে লেমন কোরিয়েন্ডার প্রন স্যুপ ও ক্র্যাব কেক এসে গিয়েছে। খাওয়াও শুরু হয়ে গিয়েছে।
সেঃ উমম, বেশ সুন্দর তো টেস্ট, বেশ একটা টক টক খেতে। আপনি অর্ডার ভাল করেছেন।
আমিঃ থ্যাঙ্ক ইউ। হ্যাঁ, খুব ট্যাঙ্গি একটা ফ্লেভার। তা যা বলছিলাম, আপনি বেশী এক্টিভ না গ্রুপে, না?
সেঃ না। মানে আমি মোটামুটি সকলের লেখা পড়ি। তবে ওই লাইক কমেন্ট করিনা। সামহাউ ইচ্ছে করেনা।
আমিঃ ও আচ্ছা। আসলে লাইক কমেন্ট বা যে কোন ফিডব্যাক না পেলে আমরা যারা লিখি, তারা বুঝিনা পাঠক কি চাইছেন। তাই পারলে এরপর থেকে মন্তব্য, নিদেনপক্ষে ভাল লাগলে একটা লাইক করবেন।
সেঃ আচ্ছা বেশ। আমার না একটা প্রশ্ন আছে।
আমিঃ হ্যাঁ বলুন, তবে নুডলসটা খান। জব্বর বানিয়েছে। প্যান ফ্রায়েড, বেশ মুচমুচে।
সেঃ ফিশটাও টেস্টি।
আমিঃ হ্যাঁ। কি প্রশ্ন আছে করে ফেলুন।
সেঃ বলছি আপনার জীবনে অর্ক কে?
আমিঃ অর্ক? কোন অর্ক?
সেঃ না মানে ওই এসো বসো আহারেতে সেদিন লিখলেন পায়েল আর অর্কর গল্প। তারপরে সেদিন ওই মোমোর গল্প লিখলেন। ওগুলো তো আপনারই নিজের ঘটনা নিশ্চয়ই?
আমিঃ পাগল? না না। নিছকই গল্প।
সেঃ আর ওই গানে গল্পের ব্রেকাপটা? ইলেক্ট্রনিক সিটিতে কে থাকে?
আমিঃ শুনুন মশাই, ইলেক্ট্রনিক সিটি ফেজ ১ ও ২ মিলিয়ে প্রচুর প্রচুর লোক থাকেন। কিন্তু আমি গোট্টিগেড়েতে থাকিনা। ওটাও নিছকই গল্প। পাতি ব্যাঙ্গালোর টাইমস খুলে পরপর দুটো ক্লাসিফায়েড বিজ্ঞাপনে এই নামগুলো পেলাম।
সেঃ এ বাবা।
আমিঃ এত ডিসাপয়েন্টেড হলেন যে?
সেঃ না আসলে আপনার লেখা গুলো দেখে খুব কৌতূহল হত, তাই যখন ম্যাট্রি প্রোফাইলে আপনার নাম দেখলাম, ভাবলাম দেখি চেষ্টা করে, যদি সামনাসামনি কথা বলে গল্পগুলির পিছনের সত্যিটা জানা যায়। সেই জন্যই আরো আসা আজ।
আমিঃ ও না না, ওগুলো সবই আমার মজা করে লেখা। ইন ফ্যাক্ট রোহিণীর গল্পটাও বানানোই।
সেঃ বুঝলাম।
স্বাভাবিকই এরপরে বেশী আর কথা এগোয়নি। উনি এতটাই মর্মাহত হলেন (ভেবেছিলেন কি নতুন কোনো স্কুপ পাবেন? রসেবশেতে গল্প লিখবেন? মিউচ্যুয়াল ট্রান্সফারের ব্যাকগ্রাউণ্ডের মত এসো বসো আহারের ব্যাকগ্রাউণ্ড? কে জানে!) যে এরপরে আর আইস্ক্রীমও খাওয়া হলনা, যদিও লিচু আইস্ক্রীম ছিল মেনুতে। দেখে রেখেছিলাম!
********************************************************************************
পুনশ্চঃ রসেবশেতে লেখা এ যাবত সমস্ত গল্পই আমার কল্পনা! বাস্তবের সাথে মিল খুঁজতে যাওয়া সময় নষ্ট।
Thursday, June 29, 2017
তুঝসে নারাজ নহি জিন্দগি
- কি গো, রিপোর্টটা পেয়েছ?
- একটা ফোন করবে না পেয়ে?
- জানানোর মত কিছু হলে নিশ্চয়ই জানাতাম।
(খানিকের নীরবতা)
- এবারও নেগেটিভ তাহলে? ডঃ মিত্রর সাথে কবে দেখা করব তাহলে, পারলে কথা বলে এসো।
- বাড়ী গিয়ে কথা বলব। এখন রাখছি।
- ঠিক আছে। কখন ফিরবে?
- জানিনা। দেরী হবে।
রাত এগারোটার পরে আধা মদ্যপ অবস্থায় মুকুলের প্রবেশ বাড়ীতে।
- হাত মুখ ধুয়ে এসো, আমি খাবার বাড়ছি।
- খেয়ে এসেছি। তুমি ঘরে এসো। কথা আছে।
- আমি খাইনি এখনো, চট করে খেয়ে আসছি।
- হুম।
- শোনো সুমি, অনেক তো হল। আর কেন ফালতু লোক হাসাতে বারবার আমায় প্যাথোলজি সেনটারে পাঠাবে বলোতো?
- কি বলছ মুকুল? লোক হাসানো কেন বলছ একে?
- নয়তো কি? তুমি কেন একসেপ্ট করছ না সত্যিটা?
- দেখো এত সহজেই হাল ছাড়লে চলবে নাকি? ডঃ মিত্র তো বলেছেন, সময় লাগবে।
- সেটা উনি তিন বছর আগে বলেছিলেন।
- আশা তো ছাড়েননি।
- বাজে কথা বলো না। ফালতু ফালতু ডাক্তারের পিছনে টাকার শ্রাদ্ধ করে যাচ্ছি। যা হবার না, তা নিয়ে কেন পড়ে আছ?
- তাহলে চল দত্তক নিই? প্লীজ মুকুল, না করো না।
- আবার শুরু হল ওই। মা আর আমি অনেকবার বলেছি তো। কোথাকার কোন পাপীর রক্ত, বেজন্মা আমাদের বংশে আসবে না।
- মুকুল আমারও তো মা হতে ইচ্ছে হয়।
- আমারও বাবা হতে ইচ্ছে হয়, কিন্তু নিজের সন্তানের। এরকম আস্তাকুড়ের ভাগাড়ের থেকে তুলে আনা না।
- তুমি আমার সাথে একদিন চল অরফানেজে, দেখবে...
- আর একটা কথা হবেনা এই নিয়ে। মা ঠিকই বলে। অনেক আগেই তোমার মত বাঁজা মেয়েকে ডিভোর্স করে আরেকটা বিয়ে করা উচিত ছিল। Good for nothing, তাও যদি অন্যভাবেও সুখে রাখতে আমায়। জীবনটা হেল করে ছাড়লে।
(কিছু মাস পরে, কলকাতা থেকে প্রায় আশি কিলোমিটার দূরে, কুসুম কানন অনাথ আশ্রম।)
- মামণি আমি তোমায় ছেড়ে যাবনা। তুমি সিস্টারকে বলে দাও।
- আরে সোনা, তুই নতুন মাম্মাম পাপা পাবি।
- না আমি তোমাদের, তোমাকে ছেড়ে যাব না কোথাও।
- মামাই জেদ করেনা। ওই নতুন মাম্মাম তোকে কত ভালবাসবে, কতো বড় বাড়িতে থাকবি। টিভিতে ডোরার যেমন বাড়ি দেখিস, সেই রকম সাজানো বাড়ি হবে তোর। কি আনন্দ বল তো।
- না সেখানে তুমি থাকবে না মামনি।
- লক্ষ্মী মা আমার, আমি যাব তো মাঝে মাঝে দেখা করতে। আমরা সবাই যাব। দিয়া দিদির বাড়ি সবাই যাই না বল?
- প্রমিস?
- গড প্রমিস। নে চল, ব্যাগ গুছিয়ে দিই। মাম্মাম পাপা এসে গিয়েছেন।
পাঁচ বছরের রিনিকে তার নতুন বাবা মায়ের কাছে সঁপে দিতে গিয়ে মনে হল যেন নিজের হৃদয়ের একটা টুকরো খসে গেল। তবে এটা ভেবে একটা অদ্ভুত ভালোলাগা হয় যে অন্তত আরেকটা পরিবার সন্তান পেল, বেঁচে থাকার মানেটা পেল। এই কয়েক মাসেই অনাথ আশ্রমের বাচ্চাগুলো কতটা আপন হয়ে গিয়েছে সুমির। এখন ওর একটা নয়, দুটো নয়, চল্লিশ জন সন্তান। প্রতিদিন ভোরবেলা ওদের ঘুমন্ত চেহারায় নরম সূর্যের আলোর রশ্মি দেখতে দেখতে সুমি বোঝে, একেই বুঝি বলে স্বর্গ সুখ।
- একটা ফোন করবে না পেয়ে?
- জানানোর মত কিছু হলে নিশ্চয়ই জানাতাম।
(খানিকের নীরবতা)
- এবারও নেগেটিভ তাহলে? ডঃ মিত্রর সাথে কবে দেখা করব তাহলে, পারলে কথা বলে এসো।
- বাড়ী গিয়ে কথা বলব। এখন রাখছি।
- ঠিক আছে। কখন ফিরবে?
- জানিনা। দেরী হবে।
রাত এগারোটার পরে আধা মদ্যপ অবস্থায় মুকুলের প্রবেশ বাড়ীতে।
- হাত মুখ ধুয়ে এসো, আমি খাবার বাড়ছি।
- খেয়ে এসেছি। তুমি ঘরে এসো। কথা আছে।
- আমি খাইনি এখনো, চট করে খেয়ে আসছি।
- হুম।
- শোনো সুমি, অনেক তো হল। আর কেন ফালতু লোক হাসাতে বারবার আমায় প্যাথোলজি সেনটারে পাঠাবে বলোতো?
- কি বলছ মুকুল? লোক হাসানো কেন বলছ একে?
- নয়তো কি? তুমি কেন একসেপ্ট করছ না সত্যিটা?
- দেখো এত সহজেই হাল ছাড়লে চলবে নাকি? ডঃ মিত্র তো বলেছেন, সময় লাগবে।
- সেটা উনি তিন বছর আগে বলেছিলেন।
- আশা তো ছাড়েননি।
- বাজে কথা বলো না। ফালতু ফালতু ডাক্তারের পিছনে টাকার শ্রাদ্ধ করে যাচ্ছি। যা হবার না, তা নিয়ে কেন পড়ে আছ?
- তাহলে চল দত্তক নিই? প্লীজ মুকুল, না করো না।
- আবার শুরু হল ওই। মা আর আমি অনেকবার বলেছি তো। কোথাকার কোন পাপীর রক্ত, বেজন্মা আমাদের বংশে আসবে না।
- মুকুল আমারও তো মা হতে ইচ্ছে হয়।
- আমারও বাবা হতে ইচ্ছে হয়, কিন্তু নিজের সন্তানের। এরকম আস্তাকুড়ের ভাগাড়ের থেকে তুলে আনা না।
- তুমি আমার সাথে একদিন চল অরফানেজে, দেখবে...
- আর একটা কথা হবেনা এই নিয়ে। মা ঠিকই বলে। অনেক আগেই তোমার মত বাঁজা মেয়েকে ডিভোর্স করে আরেকটা বিয়ে করা উচিত ছিল। Good for nothing, তাও যদি অন্যভাবেও সুখে রাখতে আমায়। জীবনটা হেল করে ছাড়লে।
(কিছু মাস পরে, কলকাতা থেকে প্রায় আশি কিলোমিটার দূরে, কুসুম কানন অনাথ আশ্রম।)
- মামণি আমি তোমায় ছেড়ে যাবনা। তুমি সিস্টারকে বলে দাও।
- আরে সোনা, তুই নতুন মাম্মাম পাপা পাবি।
- না আমি তোমাদের, তোমাকে ছেড়ে যাব না কোথাও।
- মামাই জেদ করেনা। ওই নতুন মাম্মাম তোকে কত ভালবাসবে, কতো বড় বাড়িতে থাকবি। টিভিতে ডোরার যেমন বাড়ি দেখিস, সেই রকম সাজানো বাড়ি হবে তোর। কি আনন্দ বল তো।
- না সেখানে তুমি থাকবে না মামনি।
- লক্ষ্মী মা আমার, আমি যাব তো মাঝে মাঝে দেখা করতে। আমরা সবাই যাব। দিয়া দিদির বাড়ি সবাই যাই না বল?
- প্রমিস?
- গড প্রমিস। নে চল, ব্যাগ গুছিয়ে দিই। মাম্মাম পাপা এসে গিয়েছেন।
পাঁচ বছরের রিনিকে তার নতুন বাবা মায়ের কাছে সঁপে দিতে গিয়ে মনে হল যেন নিজের হৃদয়ের একটা টুকরো খসে গেল। তবে এটা ভেবে একটা অদ্ভুত ভালোলাগা হয় যে অন্তত আরেকটা পরিবার সন্তান পেল, বেঁচে থাকার মানেটা পেল। এই কয়েক মাসেই অনাথ আশ্রমের বাচ্চাগুলো কতটা আপন হয়ে গিয়েছে সুমির। এখন ওর একটা নয়, দুটো নয়, চল্লিশ জন সন্তান। প্রতিদিন ভোরবেলা ওদের ঘুমন্ত চেহারায় নরম সূর্যের আলোর রশ্মি দেখতে দেখতে সুমি বোঝে, একেই বুঝি বলে স্বর্গ সুখ।
Wednesday, June 28, 2017
তুমি রবে নীরবে, হৃদয়ে momo
|||তুমি রবে নীরবে, হৃদয়ে momo|||
- হেলো।
- হেলেছি।
- আমি আজ উল্টে পড়ে গেছি একটু আগে।
- ও, তাই বল। আমি ভাবলাম আবার ভূমিকম্প হল না কি।
- হ্যালো?
- (silence)
- আরে হ্যালো।
- কথা বলব না তোর সাথে।
- কেন??
- আমি পড়ে গিয়েছই শুনে এই তোর রিএকশন?
- তা কি করব?
- অন্তত জিজ্ঞেস করবি তো কি হল, চোট পেলাম কিনা। বেঁচে আছি কি মরে গেছি তাতে তো তোর কোন যায় আসেনা।
- এক নম্বরঃ বেঁচে না থাকলে তোর ফোন পেতাম না। অবশ্য তুই ভূত, থুড়ি শাঁকচুন্নি হয়েও আমায় যে জ্বালাবি না, তার কোন গ্যারান্টি নেই। দুই নম্বরঃ পড়ে গেলে কম বেশী চোট তো পাবিই। তা অত বড় শরীর বানিয়েছিস, ধপাধপ করে পড়বিই। কতবার বলি একটু এক্সারসাইজ কর, তা না। উনি খালি খেয়েই যাবেন।
- তোকে ফোন করাটাই আমার ভুল হল। আর কক্ষনও করবও না। আড়ি।
- কি fickle minded রে তুই? এই বললি আর কথা বলবি না, আর ওমনি ফোন within an hour? একটু ভাও খা, তা না। কিছুই শিখলি না।
- ন্যাকা। By the way, thank you for the momos. কি করে জানলি আমার এখন মোমো খেতে ইচ্ছে করছে?
- Dil ka connection madam
- আর তাও আবার pan fried.. I love you পুচু।
- হ্যাঁ হ্যাঁ, me too। যা এবার খা। তোর তো pan fried momo ঠাণ্ডা একদমই রোচে না। আর হ্যাঁ, পেনকিলারটা খেতে ভুলিসনা। Fitness level বাড়া! আমি ফেরত আসি সামনের মাসে, দেখ কী দৌড় করাব।
- কচু পোড়া। দৌড়ে দৌড়ে ওই ফুচকাওয়ালা অবধি ঠিক আছে। হুহ।
- হেলো।
- হেলেছি।
- আমি আজ উল্টে পড়ে গেছি একটু আগে।
- ও, তাই বল। আমি ভাবলাম আবার ভূমিকম্প হল না কি।
- হ্যালো?
- (silence)
- আরে হ্যালো।
- কথা বলব না তোর সাথে।
- কেন??
- আমি পড়ে গিয়েছই শুনে এই তোর রিএকশন?
- তা কি করব?
- অন্তত জিজ্ঞেস করবি তো কি হল, চোট পেলাম কিনা। বেঁচে আছি কি মরে গেছি তাতে তো তোর কোন যায় আসেনা।
- এক নম্বরঃ বেঁচে না থাকলে তোর ফোন পেতাম না। অবশ্য তুই ভূত, থুড়ি শাঁকচুন্নি হয়েও আমায় যে জ্বালাবি না, তার কোন গ্যারান্টি নেই। দুই নম্বরঃ পড়ে গেলে কম বেশী চোট তো পাবিই। তা অত বড় শরীর বানিয়েছিস, ধপাধপ করে পড়বিই। কতবার বলি একটু এক্সারসাইজ কর, তা না। উনি খালি খেয়েই যাবেন।
- তোকে ফোন করাটাই আমার ভুল হল। আর কক্ষনও করবও না। আড়ি।
- কি fickle minded রে তুই? এই বললি আর কথা বলবি না, আর ওমনি ফোন within an hour? একটু ভাও খা, তা না। কিছুই শিখলি না।
- ন্যাকা। By the way, thank you for the momos. কি করে জানলি আমার এখন মোমো খেতে ইচ্ছে করছে?
- Dil ka connection madam
- আর তাও আবার pan fried.. I love you পুচু।
- হ্যাঁ হ্যাঁ, me too। যা এবার খা। তোর তো pan fried momo ঠাণ্ডা একদমই রোচে না। আর হ্যাঁ, পেনকিলারটা খেতে ভুলিসনা। Fitness level বাড়া! আমি ফেরত আসি সামনের মাসে, দেখ কী দৌড় করাব।
- কচু পোড়া। দৌড়ে দৌড়ে ওই ফুচকাওয়ালা অবধি ঠিক আছে। হুহ।
Tuesday, June 27, 2017
এসো বসো আহারে
।।এসো বসো আহারে।।
স্থানঃ কোন এক বাঙালি রেস্টুরেন্ট
সময়ঃ রবিবার দুপুর
অর্কঃ নে কি খাবি বলে দে, শিগগিরি অর্ডার দিয়ে দে। ভিড় শুরু হলে পাবিনা।
পায়েলঃ আমি কিন্তু বিরিয়ানি খাবই। তার সাথে দেখি কি খাই। এখানে এসছি আর মাছ খাব না, হওয়াটা মুশকিল।
অর্কঃ মাছ কি বিরিয়ানি দিয়ে খাবি নাকি?
পায়েলঃ কেন? ভাত দিয়ে খাব!
অর্কঃ ওই তো ওইটুকু পাখির আহার করিস, সে আবার নাকি বিরিয়ানি-ভাত দুইই নেবে! যতসব।
পায়েলঃ বাজে বকিসনা তো। আমি কি বিরিয়ানি ভাত সব একা খাব নাকি? শেয়ার করবি আমার সাথে।
অর্কঃ উহু! ওই জিনিসটি হচ্ছেনি হে। এই শর্মা খাবার শেয়ার করেনা!!!
পায়েলঃ মর গে যা। যা ইচ্ছে অর্ডার কর নিজের। আমার একটা মাটন বিরিয়ানি আর হাফ ভাত, সাথে লাউ চিংড়ি।
অর্কঃ বেশ। দাদা তাহলে অর্ডার নিয়ে নিন। দেড়টা ভাত, একটা মাটন বিরিয়ানি, একটা লাউ চিংড়ি, একটা শুক্তো, একটা ধোকার ডালনা, একটা ভাপা চিংড়ি আর একটা দই মাছ। ও হ্যাঁ, শেষে চাটনি দেবেন দুটো।
প্লেটে সাজিয়ে সব খাবার এসে পড়ল কিছুক্ষণেই। খাওয়া শুরু করল।
অর্কঃ আহা, কি অপূর্ব! খাঁটি বাঙালি মেনু। আমার বিয়েতে এরকম মেনু রাখব।
পায়েলঃ রাত্তিরে শুক্তো???
অর্কঃ আরে হাঁদা, সকালে। মানে বিয়েবাড়ির দুপুরে এই খাবার হবে। সোনামুগ ডালের সাথে তার দোসর ঝিরিঝিরি আলু ভাজা, শুক্তো, এঁচোড় হবে চিংড়ি দিয়ে, সাথে পাবদার পাতলা বড়ি দেওয়া ঝোল আর পাকা কাতলা মাছের পেটি দিয়ে দই মাছ। শেষ পাতে লাল দই আর আমের চাটনি।
পায়েলঃ বিয়ের দুপুরে খাওয়া তো তোর বারণ! নিজের পছন্দের মেনু দিয়ে তোর কি লাভ?
অর্কঃ সবসময় নিজের লাভ দেখতে নেই মা! তাছাড়া আমি মোটেই বিয়েতে উপোস করব না। দেখিসনা বলির পাঁঠাকে কিরকম খাইয়ে দাইয়ে তাগড়াই করে? আমিও তো বলিই হব!
পায়েলঃ হ্যাঁ সেই। বটে।
অর্কঃ আর তোর কি পছন্দের মেনু হবে বিয়েতে?
পায়েলঃ দুপুরটা নিয়ে লীস্ট বদারড। রাত্রে অবশ্যই মিষ্টি পোলাউ, চিকেন কোর্মা, তন্দুরী ভেটকি থাকতেই হবে। মিষ্টিতে গরম মালপোয়া আর বেকড রসগোল্লা থাকতেই হবে। আর যা ইচ্ছে হোক, না হলেও হবে।
অর্কঃ আহ, শুনেই কিরকম জিভে জল এসে গেল। নাহ, মানতেই হচ্ছে, তোর টেস্ট আছে।
পায়েলঃ হে হে, সে আর বলতে। আর তোর কি মেনু হবে?
অর্কঃ তুই কোন দেশী পাগল রে? এক্ষুণি তো এত্ত লম্বা মেনু বললি। একই বিয়েতে কত মেনু হবে?? আমার পছন্দেরটা বউভাতের দিন হবে।
খানিকক্ষণ একটু অর্কর দিকে তাকিয়ে রইল পায়েল। ব্যাপারটা বুঝে শুনে
পায়েলঃ ছাগল শেষমেশ এইভাবে প্রপোজ করলি??? ওয়েল, ইন দ্যাট কেস, আমিও কিন্তু উপোস করছিনা তাহলে সারাদিন! হোপ ইউ ডোন্ট মাইন্ড। তবে এঁচোড়, আম...মানে সেই গরম কালে বিয়ে। উফফ।
*****************************************************************************
আজ খুব জমিয়ে মাটন বিরিয়ানি কাবাব দিয়ে রাতের খাওয়াটা সেরেছি, তাই ফুর্তির প্রাণ গড়ের মাঠ।
Monday, June 26, 2017
তুমি অন্য কারুর সঙ্গে বেঁধো ঘর
- ডাক্তারবাবু কি বললেন দিদি?
- বড় ডাক্তার এখনো আসেননি। এখন জুনিয়ার ডাক্তার আপাতত প্রাথমিক চিকিৎসা শুরু করেছেন। আপনার মায়ের মাথার চোট তো বেশ গভীর।
- বড় ডাক্তার মানে ডাক্তার সান্যাল তো?
- হ্যাঁ, উনি রাউন্ডে বেরিয়েছেন, পরপর দেখে আপনার মায়ের কাছেও আসবেন। রাউন্ড শেষ হলে চেম্বারে ডেকে নেবেন। অপেক্ষা করুন।
ডাক্তার শুভঙ্কর সান্যাল। বয়স আনুমানিক ৬৫। এক মাথা শুভ্রকেশ, সৌম্য চেহারা। দেখলেই একরকম ভক্তি ভাব জাগে মনে। লন্ডন থেকে নিউরোসার্জারিতে ডিগ্রী নিয়ে দেশে ফিরেছেন প্রায় তিরিশ বছর আগে। সেই থেকে সপ্তাহে চারদিন বিকেলে কলকাতায় ও বাকি সমস্ত সময় এই বেলাপুর টাউন হাসপাতালে কাটান। বিপত্নীক, নিঃসন্তান। কোনরকম পিছুটান নেই। এই হাসপাতাল, রুগী, হাসপাতালের কর্মী- এসব নিয়েই ওনার জীবন। বা বলা চলে এঁরাই ওনার জীবন। এঁরা আছে বলেই তিনি ২৮ বছর আগের ঘটনাটিকে কিছুটা হলেও মাঝে মাঝে ভুলে থাকতে পারেন। সেই দুর্ঘটনা ওনাকে সাংঘাতিক ভাবে নাড়িয়ে দিয়েছিল। এখনো এত বছর পরেও রাত্রে শুতে গেলে চোখের সামনে ভেসে আসে সেই ভয়াবহ দৃশ্য। এক জোড়া হেডলাইট উল্টো দিক থেকে আসছে, একদম শেষ মুহূর্তে স্টিয়ারিং উইলটা বাঁদিকে কাটাতে সোজা ধাক্কা ল্যাম্প পোস্টে। পাশে বসে থাকা রাকা ও দীপের সেই চীৎকার এখনো কানে বাজে। নিজেও আহত হন, তাও ওই অবস্থাতেই হাইওয়েতে গাড়ী থামিয়ে যতক্ষণে হাসপাতালে নিয়ে যেতে পেরেছিলেন, ততক্ষণে স্ত্রী পুত্র দুজনকেই চিরতরে হারিয়ে ফেলেছিলেন। সেদিনের মত অসহায়তা আজ অবধি আর কখনো বোধ করেননি শুভঙ্কর। তবে ওনার একটি বিরাট গুণ, কর্মক্ষেত্রে কোনদিনও এর প্রভাব পড়েনি। আজ অবধি যত সার্জারি করেছেন, একটাও বিফলে যায়নি। অপারেশন টেবিল থেকে প্রতিটি রুগী সুস্থ হয়ে ফিরেছে। আর তাই পেশেন্টরা ডঃ সান্যালকে অনেক সময়েই দেবতার আসনে উন্নীত করতে দ্বিধা করেননা।
রেসিডেন্ট ডাক্তার বলে রেখেছিল আজকের নতুন কেসের কথা। পেশেন্ট একজন ভদ্রমহিলা। বয়স আনুমানিক ৬০-৬২। বাড়িতে গতকাল হঠাৎ ব্ল্যাকাউট হয়। পড়েও যান, সেই সময়ে খাটের কোণায় কপাল ঠুকে গিয়ে রক্তারক্তি কাণ্ড। বাড়ির লোকজন তড়িঘড়ি নিয়ে আসেন হাসপাতালে। প্রাথমিক চিকিৎসা চলছে, কিন্তু পেশেন্টের সমানে জ্ঞান আসছে যাচ্ছে, তাই ওনাকে দেখতে যাওয়ার তলব পড়েছে। ওয়ার্ডের বাকি পেশেন্টদের দেখে অবশেষে এলেন বেড নং ৪৮এ।
হঠাৎ দেখলে মনে হবে যেন সুলতা মাসি। সেই অবিকল পানপাতার মত মুখ, নাকের ডগায় ছোট্ট খয়েরী তিল, সাদাকালো কোঁকড়া চুল, টিকলো নাক - এক লহমায় ৫০-৫৫ বছর আগে চলে গেলেন। তখন তিনি শুভঙ্কর, সক্কলের প্রিয় শুভ। সান্যাল বাড়ীর একরত্তি ছেলে, সবার নয়নের মণি। ছোটবেলায় মাকে হারানোর ফলে কাকী-পিসি-মাসি-ঠাকুমার কাছে মানুষ। সবচেয়ে বেশী সময় কাটত পাশের বাড়িতে, সুলতা মাসির কাছে। ওই বাড়িটা হর মামার বাড়ি। মামা মামির সাথে থাকত বিধবা সুলতা মাসী ও তার মেয়ে গৌরী। গৌরী আর শুভঙ্করের বয়সের ফারাক ওই বছর তিন চারেকের। একসাথেই ওদের বেড়ে ওঠা। মামা-মামী নিঃসন্তান ছিলেন, গৌরী ওদের আদরেই বড় হচ্ছিল। ওর লেখাপড়া, সাধারণ জীবনযাপন, সখ আহ্লাদ মেটানো কোন কিছুতেই কোন খামতি ছিলনা। শুভঙ্করদের মত অত ধনী না হলেও গৌরীর মামাও নিতান্ত ফেলনা ছিলেন না। সরকারী দপ্তরে বড় বাবু ছিলেন। দুই বাড়ির মধ্যে যোগাযোগ বরাবরই খুব ভালো ছিল। ওরা দুজনে পড়ত পাশাপাশি দুটো স্কুলে - সরকারী বয়েজ ও গার্লস স্কুলে। স্কুলে যাওয়া আসা একসাথে হত। সক্কাল হতে না হতে কোনমতে দুধ কলা মুড়ি খেয়ে সাইকেল বের করত শুভ। গৌরীদের বাড়ির সামনে সাইকেলটা যতক্ষণে নিয়ে যেত, ইতিমধ্যে হাঁকডাক পেড়ে ওকে বাড়ি থেকে বের করিয়ে আনত। তারপরে দুজনে একসাথে যেতো স্কুল।
গ্রীষ্মের চাঁদিফাটা রোদে, বর্ষায় ক্ষেতের আল বরাবর, শীতের কুয়াশাচ্ছন্ন রাস্তায় গুড়ের গন্ধে যখন চারিদিক মেতে থাকত, ওরা একসাথে সাইকেলে স্কুল যেত। দুপুরে আজ এই বাড়ী কাল ওই বাড়ি করে একসাথে খাওয়া হত। সুলতা মাসী গৌরী আর শুভর পছন্দের রান্না রেঁধে যত্ন করে দুজনকে একসাথে বেড়ে খাওয়াতেন। শুভর ঠাকুমার থালা থেকেও দুজনের সিদ্ধ ভাত ঘি দিয়ে মেখে খাওয়াটা প্রায় নিয়মের মধ্যে পড়ত। দুর্গা পুজো, রথের মেলা, শীতকালের যাত্রাপালা সর্বত্র একসাথে ওরা গিয়ে কত আনন্দও করত। দেখতে দেখতে শুভর স্কুলের পাঠ মিটল। ভীষণ ভালো নম্বর পেয়ে ও কলকাতায় মেডিকেল কলেজে ডাক্তারি পড়ার সুযোগ পেল। গৌরীর তখনও তিন বছর বাকি।
পেশেন্টের বেডের পাশে রাখা কাগজপত্রে চোখ বোলাতে গিয়ে দেখলেন নাম। সেদিনের কুমারী গৌরী বসু আজ শ্রীমতী গৌরী মিত্র। রিপোর্টগুলিকে ভালো করে খুঁটিয়ে দেখলেন। এখন গৌরী ঘুমোচ্ছে, কড়া সেডেটিভের কল্যাণে। চ্যানেল করে বাঁ হাতের শিরা দিয়ে শরীরে যাচ্ছে প্রয়োজনীয় স্যালাইন ও ওষুধ। সস্নেহে, অতি যত্নে ডঃ সান্যাল গৌরীর ডান হাতটি নিজের হাতে তুলে নিলেন পালস মাপতে। সেই স্পর্শ। গত প্রায় পঞ্চাশ বছরেও যে স্পর্শ তিনি ভুলতে পারেননি।
শুভর যেদিন কলকাতায় চলে আসার কথা, তার আগেরদিন বিকেলে ওরা দেখা করতে গেল পুরনো শিবমন্দিরের কাছে। যতক্ষণে গৌরী এসে পৌঁছেছে, শুভর একটা সিগারেট খাওয়া প্রায় শেষ।
- তুমি আবার ওই ছাইপাঁশ খাচ্ছ শুভদা?
- তুই জানিসনা গৌরী, এতে টান দিয়ে কত সুখ।
- চুপ করো। কলকাতায় গেলে না, তার আগেই এইরকম করছ। এরপরে কলকাতায় হোস্টেলে থাকা শুরু করলে তো তুমি গোল্লায় যাবে।
- হ্যাঁ তা অবশ্য ঠিক। ওখানে কে আমায় এমন করে শাসন করবে বল গৌরী?
- কলকাতায় গিয়ে তোমার কত নতুন নতুন বন্ধু হবে। বান্ধবী হবে। তারা দেখবে। তখন গৌরীর কথা মনেও পড়বেনা তোমার।
- ওই শুরু হল মেয়ের। ঠোঁট ফুলিয়ে এবারে কাঁদ। একেই নাকের ডগায় দেখছি টুকটুকে লাল রঙ।
- বলো তুমি কলকাতায় গেলে আমায় ভুলবে না?
- আরে পাগলী। তুই হলি আমার ছোটবেলার গৌরী, তোকে কখনো ভুলতে পারি?
- তবে যে মাধুরী বলছিল, শিশির দা কলকাতায় যাওয়ার পর আর পায়েলদির সাথে কোন যোগাযোগ রাখেনি?
- শিশিরের সাথে তুই আমার তুলনা করলি গৌরী?
- আমার খুব ভয় করে যে শুভদা। যবে থেকে তোমার admissionএর খবর দিয়েছ, আমার মন অস্থির হয়ে গিয়েছে। খালি মনে হচ্ছে আর বোধহয় সবকিছু আগের মত থাকবেনা।
শুভ আস্তে করে নিজের দুই হাতের মধ্যে গৌরীর দুই হাতজোড়া চেপে ধরে ওর চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,
- গৌরী যে কোন ঝড় ঝাপটা আসুক না কেন, আমরা একে ওপরের সাথেই থাকব। আমি নিজের দিব্যি দিয়ে বললাম আজ। আমার ওপর ভরসা রাখ।
অনন্তকাল দুজনে এইভাবে বসেছিল। কোন কথা না বলেও যে কত কথা বলা যায়, তার আরো একটা নিদর্শন যেন রয়ে গেল সেদিনের ওই বিকেলে। কনে দেখা আলোয় লক্ষ্মী প্রতিমার মত গৌরী আর শুভঙ্করের ওই শেষ দেখা।
পালস রেট এখন একটু stable। তিনি মেডিকেল চার্টে প্রয়োজন মত নির্দেশিকা লিখে নার্সকে বলে গেলেন কোনরকম কিছু অবস্থার পরিবর্তন হলেই ওনাকে জানাতে। চেম্বারে এরপর এক এক করে সমস্ত পেশেন্ট পার্টি আসা শুরু হল। অত্যন্ত ধৈর্য ধরে তিনি সকলকে তাদের প্রিয়জনের সংবাদ দিলেন। শেষে এলো বছর ৪০ এর এক ভদ্রলোক। নিজেকে গৌরীর ছেলে অনিমেষ মিত্র বলে পরিচয় দিলেন। ডঃ সান্যালের মনে হল আজ ওনার ছেলে দীপ বেঁচে থাকলে হয়তো এই রকমই হত। কে জানে, হয়তো অনিমেষের বন্ধুও হতে পারত।
- ডাক্তারবাবু মা কে কেমন দেখলেন?
- condition stable আপাতত, কাল সকালে একবার স্ক্যান করাতে হবে কলকাতায় নিয়ে গিয়ে। Internal hemorrhage আছে কিনা দেখে নিতে হবে।
পরের দিন সকালে হাসপাতালের ambulance করে গৌরীকে কলকাতা নিয়ে গিয়ে স্ক্যান করিয়ে আনা হল। স্ক্যান রিপোর্ট দেখে ডঃ সান্যাল অনিমেষকে জানালেন যে খুব শিগগিরি সার্জারি করতে হবে। পারলে কালকেই। বাড়ির লোকজন এক বাক্যে ডাক্তারবাবুর কথা বেদ বাক্য মনে করে সম্মতি জানিয়ে দিলেন। অনেক রাত্রে একবার শুভঙ্কর গৌরীর বেডের কাছে গেলেন। রাতের নার্সকে বেরিয়ে যেতে বলে বসলেন গৌরীর সামনে।
- গৌরী
নিদ্রাচ্ছন্ন গৌরী দুইবার নিজের নাম শুনে তাকালেন চোখ মেলে।
- আমায় চিনতে পারছিস?
- আপনি?
-আমি যে তোর শুভদা।
- শুভ দা? কত বছর পরে, মনে হচ্ছে যেন এক জীবন পরে দেখছি তোমায়।
- কেমন আছিস?
- খুব মাথায় যন্ত্রণা করছে।
- কোন চিন্তা করিসনা, কাল তোর অপারেশন করব, দেখবি তারপরে সব ঠিক হয়ে যাবে।
- সত্যি বলছ?
- আমার ওপর ভরসা রাখ।
শিবমন্দিরের কাছে বসেও তো সেদিন তিনি গৌরীকে ভরসা রাখতে বলেছিলেন। তারপরে কী হল? রাখতে পেরেছিলেন কথা? যখন সেকন্ড ইয়ারে পড়াকালীন গৌরী আকুলি বিকুলি করে জানাল যে মামা ওর বিয়ে ঠিক করে ফেলেছেন, শুভ যেন এসে ওকে বাঁচায়, শুভকে ছাড়া ও থাকতে পারবেনা, শুভঙ্কর তো কিছুই করতে পারেননি। রক্ষণশীল ব্রাহ্মণ পরিবারে কায়স্থ বাড়ির মেয়েকে বৌ হিসেবে আনতে কিছুতেই রাজী হয়নি। শুভর ঠাকুমা তো তখন এক রকম জোর করেই রাকার সাথে আশীর্বাদ করিয়ে দেন। নইলে আশি বছরের ঠাকুমা জল স্পর্শ করবেন না বলেছিলেন। পরিবারের বিরুদ্ধে গিয়ে গৌরীর পাশে দাঁড়াতে না পারার কষ্ট বহুকাল ওঁকে কুঁড়ে কুঁড়ে খেয়েছে। ডাক্তারি পাস করে রাকার সাথে বিয়েটাও হয়ে যায়। এরপর লন্ডন, তারপরে আর বহু বছর বাদে কলকাতায় ফেরা। জীবনে নীল এলো। ইতিমধ্যে গৌরীর সাথে আর দেখাই হয়নি, কিন্তু ওর কথা ভুলতে পারেননি শুভঙ্কর।
- গৌরী তুই আমার সাথে থাকবি? আমি জানি তখন আমার একটা স্ট্যান্ড নেওয়া উচিত ছিল। আমি ভুল করেছিলাম। তুই দয়া করে আমায় ক্ষমা করে দে। চল আমরা আমাদের বাকি জীবনটা একসাথে কাটাই।
- এসব হয় না শুভদা। তোমার এ কথা সিনেমা বইতে চলতে পারে, বাস্তবে এটা কিছুতেই হতে পারেনা। অনেক দেরী হয়ে গিয়েছে।
- তোর যা ইচ্ছে। ভালো থাকিস গৌরী। কাল তোর অপারেশন হয়ে গেলে আমার তবে ছুটি।
সাধারণত পরের দিন সার্জারি থাকলে ডঃ সান্যাল চেষ্টা করেন একটানা আট ঘণ্টা ঘুমনোর। কিন্তু আজ কিছুতেই ঘুম আসছিল না। বারবার চোখের সামনে নানান ছবি ভেসে আসছিল। ছোট্টবেলাকার সমস্ত স্মৃতি, গৌরী, শুভ, সুলতা মাসী, বাবা, ঠাকুমা...মেডিকেল কলেজ। রাকা আর দীপের কথা ভাবতে গিয়ে দুই গাল বেয়ে অঝোরে জল পড়তে লাগল। অনেক রাত্রে হাল্কা ঘুম এলো।
পরেরদিন সকালে হাসপাতালে পৌঁছে যথাসময়ে ও টি তে ঢুকলেন। মনের ভিতরের ঝড় প্রভাব ফেলল ওনার সার্জারিতে। ক্রমাগত ভুল করতে লাগলেন। সহকারী ডাক্তার নার্স একে ওপরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করতে লাগল। ক্রমশ গৌরীর প্রেশার ফল করতে লাগল, পালস কমতে লাগল। গৌরী মৃত্যুর কোলে ঢলে যেতে লাগলেন। এই প্রথম ডঃ সান্যাল কোন কেসে ব্যর্থ হলেন।
বিদ্ধ্বস্ত ডাক্তার নিজের বাড়ি ফিরে এলেন দুপুর দুপুরই। আরামকেদারায় গা এলিয়ে বসলেন, হাতে পুরনো album। বাইরে অঝোরে বৃষ্টি শুরু হয়েছে। সি ডি প্লেয়ারে বাজছে "বনমালী তুমি পরজন্মে হইয়ো রাধা।"
- বড় ডাক্তার এখনো আসেননি। এখন জুনিয়ার ডাক্তার আপাতত প্রাথমিক চিকিৎসা শুরু করেছেন। আপনার মায়ের মাথার চোট তো বেশ গভীর।
- বড় ডাক্তার মানে ডাক্তার সান্যাল তো?
- হ্যাঁ, উনি রাউন্ডে বেরিয়েছেন, পরপর দেখে আপনার মায়ের কাছেও আসবেন। রাউন্ড শেষ হলে চেম্বারে ডেকে নেবেন। অপেক্ষা করুন।
ডাক্তার শুভঙ্কর সান্যাল। বয়স আনুমানিক ৬৫। এক মাথা শুভ্রকেশ, সৌম্য চেহারা। দেখলেই একরকম ভক্তি ভাব জাগে মনে। লন্ডন থেকে নিউরোসার্জারিতে ডিগ্রী নিয়ে দেশে ফিরেছেন প্রায় তিরিশ বছর আগে। সেই থেকে সপ্তাহে চারদিন বিকেলে কলকাতায় ও বাকি সমস্ত সময় এই বেলাপুর টাউন হাসপাতালে কাটান। বিপত্নীক, নিঃসন্তান। কোনরকম পিছুটান নেই। এই হাসপাতাল, রুগী, হাসপাতালের কর্মী- এসব নিয়েই ওনার জীবন। বা বলা চলে এঁরাই ওনার জীবন। এঁরা আছে বলেই তিনি ২৮ বছর আগের ঘটনাটিকে কিছুটা হলেও মাঝে মাঝে ভুলে থাকতে পারেন। সেই দুর্ঘটনা ওনাকে সাংঘাতিক ভাবে নাড়িয়ে দিয়েছিল। এখনো এত বছর পরেও রাত্রে শুতে গেলে চোখের সামনে ভেসে আসে সেই ভয়াবহ দৃশ্য। এক জোড়া হেডলাইট উল্টো দিক থেকে আসছে, একদম শেষ মুহূর্তে স্টিয়ারিং উইলটা বাঁদিকে কাটাতে সোজা ধাক্কা ল্যাম্প পোস্টে। পাশে বসে থাকা রাকা ও দীপের সেই চীৎকার এখনো কানে বাজে। নিজেও আহত হন, তাও ওই অবস্থাতেই হাইওয়েতে গাড়ী থামিয়ে যতক্ষণে হাসপাতালে নিয়ে যেতে পেরেছিলেন, ততক্ষণে স্ত্রী পুত্র দুজনকেই চিরতরে হারিয়ে ফেলেছিলেন। সেদিনের মত অসহায়তা আজ অবধি আর কখনো বোধ করেননি শুভঙ্কর। তবে ওনার একটি বিরাট গুণ, কর্মক্ষেত্রে কোনদিনও এর প্রভাব পড়েনি। আজ অবধি যত সার্জারি করেছেন, একটাও বিফলে যায়নি। অপারেশন টেবিল থেকে প্রতিটি রুগী সুস্থ হয়ে ফিরেছে। আর তাই পেশেন্টরা ডঃ সান্যালকে অনেক সময়েই দেবতার আসনে উন্নীত করতে দ্বিধা করেননা।
রেসিডেন্ট ডাক্তার বলে রেখেছিল আজকের নতুন কেসের কথা। পেশেন্ট একজন ভদ্রমহিলা। বয়স আনুমানিক ৬০-৬২। বাড়িতে গতকাল হঠাৎ ব্ল্যাকাউট হয়। পড়েও যান, সেই সময়ে খাটের কোণায় কপাল ঠুকে গিয়ে রক্তারক্তি কাণ্ড। বাড়ির লোকজন তড়িঘড়ি নিয়ে আসেন হাসপাতালে। প্রাথমিক চিকিৎসা চলছে, কিন্তু পেশেন্টের সমানে জ্ঞান আসছে যাচ্ছে, তাই ওনাকে দেখতে যাওয়ার তলব পড়েছে। ওয়ার্ডের বাকি পেশেন্টদের দেখে অবশেষে এলেন বেড নং ৪৮এ।
হঠাৎ দেখলে মনে হবে যেন সুলতা মাসি। সেই অবিকল পানপাতার মত মুখ, নাকের ডগায় ছোট্ট খয়েরী তিল, সাদাকালো কোঁকড়া চুল, টিকলো নাক - এক লহমায় ৫০-৫৫ বছর আগে চলে গেলেন। তখন তিনি শুভঙ্কর, সক্কলের প্রিয় শুভ। সান্যাল বাড়ীর একরত্তি ছেলে, সবার নয়নের মণি। ছোটবেলায় মাকে হারানোর ফলে কাকী-পিসি-মাসি-ঠাকুমার কাছে মানুষ। সবচেয়ে বেশী সময় কাটত পাশের বাড়িতে, সুলতা মাসির কাছে। ওই বাড়িটা হর মামার বাড়ি। মামা মামির সাথে থাকত বিধবা সুলতা মাসী ও তার মেয়ে গৌরী। গৌরী আর শুভঙ্করের বয়সের ফারাক ওই বছর তিন চারেকের। একসাথেই ওদের বেড়ে ওঠা। মামা-মামী নিঃসন্তান ছিলেন, গৌরী ওদের আদরেই বড় হচ্ছিল। ওর লেখাপড়া, সাধারণ জীবনযাপন, সখ আহ্লাদ মেটানো কোন কিছুতেই কোন খামতি ছিলনা। শুভঙ্করদের মত অত ধনী না হলেও গৌরীর মামাও নিতান্ত ফেলনা ছিলেন না। সরকারী দপ্তরে বড় বাবু ছিলেন। দুই বাড়ির মধ্যে যোগাযোগ বরাবরই খুব ভালো ছিল। ওরা দুজনে পড়ত পাশাপাশি দুটো স্কুলে - সরকারী বয়েজ ও গার্লস স্কুলে। স্কুলে যাওয়া আসা একসাথে হত। সক্কাল হতে না হতে কোনমতে দুধ কলা মুড়ি খেয়ে সাইকেল বের করত শুভ। গৌরীদের বাড়ির সামনে সাইকেলটা যতক্ষণে নিয়ে যেত, ইতিমধ্যে হাঁকডাক পেড়ে ওকে বাড়ি থেকে বের করিয়ে আনত। তারপরে দুজনে একসাথে যেতো স্কুল।
গ্রীষ্মের চাঁদিফাটা রোদে, বর্ষায় ক্ষেতের আল বরাবর, শীতের কুয়াশাচ্ছন্ন রাস্তায় গুড়ের গন্ধে যখন চারিদিক মেতে থাকত, ওরা একসাথে সাইকেলে স্কুল যেত। দুপুরে আজ এই বাড়ী কাল ওই বাড়ি করে একসাথে খাওয়া হত। সুলতা মাসী গৌরী আর শুভর পছন্দের রান্না রেঁধে যত্ন করে দুজনকে একসাথে বেড়ে খাওয়াতেন। শুভর ঠাকুমার থালা থেকেও দুজনের সিদ্ধ ভাত ঘি দিয়ে মেখে খাওয়াটা প্রায় নিয়মের মধ্যে পড়ত। দুর্গা পুজো, রথের মেলা, শীতকালের যাত্রাপালা সর্বত্র একসাথে ওরা গিয়ে কত আনন্দও করত। দেখতে দেখতে শুভর স্কুলের পাঠ মিটল। ভীষণ ভালো নম্বর পেয়ে ও কলকাতায় মেডিকেল কলেজে ডাক্তারি পড়ার সুযোগ পেল। গৌরীর তখনও তিন বছর বাকি।
পেশেন্টের বেডের পাশে রাখা কাগজপত্রে চোখ বোলাতে গিয়ে দেখলেন নাম। সেদিনের কুমারী গৌরী বসু আজ শ্রীমতী গৌরী মিত্র। রিপোর্টগুলিকে ভালো করে খুঁটিয়ে দেখলেন। এখন গৌরী ঘুমোচ্ছে, কড়া সেডেটিভের কল্যাণে। চ্যানেল করে বাঁ হাতের শিরা দিয়ে শরীরে যাচ্ছে প্রয়োজনীয় স্যালাইন ও ওষুধ। সস্নেহে, অতি যত্নে ডঃ সান্যাল গৌরীর ডান হাতটি নিজের হাতে তুলে নিলেন পালস মাপতে। সেই স্পর্শ। গত প্রায় পঞ্চাশ বছরেও যে স্পর্শ তিনি ভুলতে পারেননি।
শুভর যেদিন কলকাতায় চলে আসার কথা, তার আগেরদিন বিকেলে ওরা দেখা করতে গেল পুরনো শিবমন্দিরের কাছে। যতক্ষণে গৌরী এসে পৌঁছেছে, শুভর একটা সিগারেট খাওয়া প্রায় শেষ।
- তুমি আবার ওই ছাইপাঁশ খাচ্ছ শুভদা?
- তুই জানিসনা গৌরী, এতে টান দিয়ে কত সুখ।
- চুপ করো। কলকাতায় গেলে না, তার আগেই এইরকম করছ। এরপরে কলকাতায় হোস্টেলে থাকা শুরু করলে তো তুমি গোল্লায় যাবে।
- হ্যাঁ তা অবশ্য ঠিক। ওখানে কে আমায় এমন করে শাসন করবে বল গৌরী?
- কলকাতায় গিয়ে তোমার কত নতুন নতুন বন্ধু হবে। বান্ধবী হবে। তারা দেখবে। তখন গৌরীর কথা মনেও পড়বেনা তোমার।
- ওই শুরু হল মেয়ের। ঠোঁট ফুলিয়ে এবারে কাঁদ। একেই নাকের ডগায় দেখছি টুকটুকে লাল রঙ।
- বলো তুমি কলকাতায় গেলে আমায় ভুলবে না?
- আরে পাগলী। তুই হলি আমার ছোটবেলার গৌরী, তোকে কখনো ভুলতে পারি?
- তবে যে মাধুরী বলছিল, শিশির দা কলকাতায় যাওয়ার পর আর পায়েলদির সাথে কোন যোগাযোগ রাখেনি?
- শিশিরের সাথে তুই আমার তুলনা করলি গৌরী?
- আমার খুব ভয় করে যে শুভদা। যবে থেকে তোমার admissionএর খবর দিয়েছ, আমার মন অস্থির হয়ে গিয়েছে। খালি মনে হচ্ছে আর বোধহয় সবকিছু আগের মত থাকবেনা।
শুভ আস্তে করে নিজের দুই হাতের মধ্যে গৌরীর দুই হাতজোড়া চেপে ধরে ওর চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,
- গৌরী যে কোন ঝড় ঝাপটা আসুক না কেন, আমরা একে ওপরের সাথেই থাকব। আমি নিজের দিব্যি দিয়ে বললাম আজ। আমার ওপর ভরসা রাখ।
অনন্তকাল দুজনে এইভাবে বসেছিল। কোন কথা না বলেও যে কত কথা বলা যায়, তার আরো একটা নিদর্শন যেন রয়ে গেল সেদিনের ওই বিকেলে। কনে দেখা আলোয় লক্ষ্মী প্রতিমার মত গৌরী আর শুভঙ্করের ওই শেষ দেখা।
পালস রেট এখন একটু stable। তিনি মেডিকেল চার্টে প্রয়োজন মত নির্দেশিকা লিখে নার্সকে বলে গেলেন কোনরকম কিছু অবস্থার পরিবর্তন হলেই ওনাকে জানাতে। চেম্বারে এরপর এক এক করে সমস্ত পেশেন্ট পার্টি আসা শুরু হল। অত্যন্ত ধৈর্য ধরে তিনি সকলকে তাদের প্রিয়জনের সংবাদ দিলেন। শেষে এলো বছর ৪০ এর এক ভদ্রলোক। নিজেকে গৌরীর ছেলে অনিমেষ মিত্র বলে পরিচয় দিলেন। ডঃ সান্যালের মনে হল আজ ওনার ছেলে দীপ বেঁচে থাকলে হয়তো এই রকমই হত। কে জানে, হয়তো অনিমেষের বন্ধুও হতে পারত।
- ডাক্তারবাবু মা কে কেমন দেখলেন?
- condition stable আপাতত, কাল সকালে একবার স্ক্যান করাতে হবে কলকাতায় নিয়ে গিয়ে। Internal hemorrhage আছে কিনা দেখে নিতে হবে।
পরের দিন সকালে হাসপাতালের ambulance করে গৌরীকে কলকাতা নিয়ে গিয়ে স্ক্যান করিয়ে আনা হল। স্ক্যান রিপোর্ট দেখে ডঃ সান্যাল অনিমেষকে জানালেন যে খুব শিগগিরি সার্জারি করতে হবে। পারলে কালকেই। বাড়ির লোকজন এক বাক্যে ডাক্তারবাবুর কথা বেদ বাক্য মনে করে সম্মতি জানিয়ে দিলেন। অনেক রাত্রে একবার শুভঙ্কর গৌরীর বেডের কাছে গেলেন। রাতের নার্সকে বেরিয়ে যেতে বলে বসলেন গৌরীর সামনে।
- গৌরী
নিদ্রাচ্ছন্ন গৌরী দুইবার নিজের নাম শুনে তাকালেন চোখ মেলে।
- আমায় চিনতে পারছিস?
- আপনি?
-আমি যে তোর শুভদা।
- শুভ দা? কত বছর পরে, মনে হচ্ছে যেন এক জীবন পরে দেখছি তোমায়।
- কেমন আছিস?
- খুব মাথায় যন্ত্রণা করছে।
- কোন চিন্তা করিসনা, কাল তোর অপারেশন করব, দেখবি তারপরে সব ঠিক হয়ে যাবে।
- সত্যি বলছ?
- আমার ওপর ভরসা রাখ।
শিবমন্দিরের কাছে বসেও তো সেদিন তিনি গৌরীকে ভরসা রাখতে বলেছিলেন। তারপরে কী হল? রাখতে পেরেছিলেন কথা? যখন সেকন্ড ইয়ারে পড়াকালীন গৌরী আকুলি বিকুলি করে জানাল যে মামা ওর বিয়ে ঠিক করে ফেলেছেন, শুভ যেন এসে ওকে বাঁচায়, শুভকে ছাড়া ও থাকতে পারবেনা, শুভঙ্কর তো কিছুই করতে পারেননি। রক্ষণশীল ব্রাহ্মণ পরিবারে কায়স্থ বাড়ির মেয়েকে বৌ হিসেবে আনতে কিছুতেই রাজী হয়নি। শুভর ঠাকুমা তো তখন এক রকম জোর করেই রাকার সাথে আশীর্বাদ করিয়ে দেন। নইলে আশি বছরের ঠাকুমা জল স্পর্শ করবেন না বলেছিলেন। পরিবারের বিরুদ্ধে গিয়ে গৌরীর পাশে দাঁড়াতে না পারার কষ্ট বহুকাল ওঁকে কুঁড়ে কুঁড়ে খেয়েছে। ডাক্তারি পাস করে রাকার সাথে বিয়েটাও হয়ে যায়। এরপর লন্ডন, তারপরে আর বহু বছর বাদে কলকাতায় ফেরা। জীবনে নীল এলো। ইতিমধ্যে গৌরীর সাথে আর দেখাই হয়নি, কিন্তু ওর কথা ভুলতে পারেননি শুভঙ্কর।
- গৌরী তুই আমার সাথে থাকবি? আমি জানি তখন আমার একটা স্ট্যান্ড নেওয়া উচিত ছিল। আমি ভুল করেছিলাম। তুই দয়া করে আমায় ক্ষমা করে দে। চল আমরা আমাদের বাকি জীবনটা একসাথে কাটাই।
- এসব হয় না শুভদা। তোমার এ কথা সিনেমা বইতে চলতে পারে, বাস্তবে এটা কিছুতেই হতে পারেনা। অনেক দেরী হয়ে গিয়েছে।
- তোর যা ইচ্ছে। ভালো থাকিস গৌরী। কাল তোর অপারেশন হয়ে গেলে আমার তবে ছুটি।
সাধারণত পরের দিন সার্জারি থাকলে ডঃ সান্যাল চেষ্টা করেন একটানা আট ঘণ্টা ঘুমনোর। কিন্তু আজ কিছুতেই ঘুম আসছিল না। বারবার চোখের সামনে নানান ছবি ভেসে আসছিল। ছোট্টবেলাকার সমস্ত স্মৃতি, গৌরী, শুভ, সুলতা মাসী, বাবা, ঠাকুমা...মেডিকেল কলেজ। রাকা আর দীপের কথা ভাবতে গিয়ে দুই গাল বেয়ে অঝোরে জল পড়তে লাগল। অনেক রাত্রে হাল্কা ঘুম এলো।
পরেরদিন সকালে হাসপাতালে পৌঁছে যথাসময়ে ও টি তে ঢুকলেন। মনের ভিতরের ঝড় প্রভাব ফেলল ওনার সার্জারিতে। ক্রমাগত ভুল করতে লাগলেন। সহকারী ডাক্তার নার্স একে ওপরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করতে লাগল। ক্রমশ গৌরীর প্রেশার ফল করতে লাগল, পালস কমতে লাগল। গৌরী মৃত্যুর কোলে ঢলে যেতে লাগলেন। এই প্রথম ডঃ সান্যাল কোন কেসে ব্যর্থ হলেন।
বিদ্ধ্বস্ত ডাক্তার নিজের বাড়ি ফিরে এলেন দুপুর দুপুরই। আরামকেদারায় গা এলিয়ে বসলেন, হাতে পুরনো album। বাইরে অঝোরে বৃষ্টি শুরু হয়েছে। সি ডি প্লেয়ারে বাজছে "বনমালী তুমি পরজন্মে হইয়ো রাধা।"
Sunday, June 25, 2017
শুভ রথযাত্রা
অনুরোধ করব লেখাটা পড়ার সময় সাথে দেওয়া লিঙ্কটি ইয়ারফোন বা স্পিকারে চালিয়ে শুনতে। মনে হয় ভালো লাগবে।
https://www.youtube.com/watch?v=EmkMEB-exl4
উফ, বাবা যে কেন আসছে না এখনো, এই করতে করতে মা কে ব্যাতিব্যস্ত করে তুলতে লাগল বুবাই। মা ততক্ষণে মিনতি মাসীর সাথে মিলে জিলিপি ভাজা শুরু করে দিয়েছে। রথ টানার পরেই যে মনটা ঘুগনি জিলিপি জিলিপি করে!
ঠিক সাড়ে চারটে বাজতেই গেটে আওয়াজ পেল বুবাই।
মা! বাবা এসে গেছে!!!
হ্যাঁ, দাঁড়া, লোকটা ক্লান্ত হয়ে এসছে বাস ট্রামে। একটু দুটো মিনিট জিরোতে দে।
বাবা বাবা বাবা। রথ!!!!
বুবাই, কি সুন্দর সাজিয়েছিস তুই?
মা আর আমি করেছি। ছবি তুলে দাও। দিদুনকে পাঠাব।
আচ্ছা আচ্ছা দেবো। এবার চল দেখি রথ টানি!
বাবা রথের দড়ি ধরে টানা শুরু করল। পিছন পিছন মা ছেলের wheelchairটা ঠেলতে ঠেলতে উঠোনে আনল। হাতে রথের রসি ধরে ছোট্ট বুবাই আনন্দে দুই হাতে তালি দিতে লাগল।
হাল্কা ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টি শুরু হল আকাশ ভেঙ্গে।
Subscribe to:
Posts (Atom)