Monday, November 20, 2017

ব্যাকস্পেসঃ একটি কাল্পনিক কথোপকথন

ইভেন্টের সাথে সামঞ্জস্য আছে কি না, বুঝছিনা। থিম, যেটা নিয়ে লিখছি আর কি, সেটাও কিছুই নতুন না। এই ব্যাকস্পেসের আড়ালে জমে থাকে অনেক অনেক অজানা গল্প। অনেক কিছুই আমরা ভাবি, এমনটা হলে বা এমনটা বলতে পারলে, কী ভালোই না হতো। কোন ঘটনা ঘটে যাওয়ার পরে মনে হয় রিওয়াইন্ড বাটনটা প্রেস করতে পারলে, অনেক কিছু অন্যরকম ভাবে করা যেত। তেমনই এক কাল্পনিক কথোপকথন তুলে ধরলাম। আপনি আমি সক্কলে কোন না কোন দিন এমন অবস্থায় পড়েছি বা পড়ব যেখানে " কেমন আছিস" এর উত্তরে লম্বা করে নিজের দুঃখের কথা লেখার চেয়ে এক বুক অভিমান নিয়ে "হ্যাঁ, ভালো" বলাটা অনেক বেশী সহজ। নীচের লেখাটিও কিছুটা ওই ধাঁচেরই।


ডিসক্লেমারঃ ইভেন্টের নামের সাথেই ম্যাচ করিয়ে, "সব চরিত্র কাল্পনিক। Any resemblance to any person living or dead is purely coincidental."


এক "ভালো" মেয়ের কথা



- ওই, আমার ওপর রাগ হয়েছে নাকি? কদিন এক্কেবারে কথা বলছিস না যে?

- না না, তোর ওপর রাগ হবে কেন? আমি কে? কী রাইট আছে আমার বল তোর ওপর রাগ করার? তুই কি না এখন সেলিব্রিটি, তোর নামে গোটা মিডল স্কুল ফ্ল্যাট, ফ্যান ক্লাব হয়ে গেলো তোর। সেখানে আমি কে না কে কোন হরিদাস পাল যে তোর ওপর রাগ করব? স্বরলিপিতে যখন তোর এগেন্সটে বিলুরা এত নোংরামি করল, তখন না হয় আমি একটু তোকে সাপোর্ট দিয়েছি। তা দেবো না কেন, তুই কি না আমার এত্ত ভালো বন্ধু। তার মানে তো এই না যে তোর ওপর আমার রাগ করার অধিকার হবে, তাই না? স্বরলিপি ছেড়ে বৈতালিকে এলি, শুরুতে তোকে ব্যান্ডে চান্সই দিলো না। তাতে কী? আমরা একসাথে তারপরে গান গাইলাম, সেই সুবাদে তুই আবার সোলো গাইলি। তখন এত্ত লোকে তোর ওই গান শুনে ফ্ল্যাট হয়ে গেলো। তারপর স্কুল ফেস্টে তোর ওই পারফরমেন্সটা রে, যার জন্য আমি এত গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে পাবলিসিটি করলাম, ওটায় যে অসামান্য সাড়া পেলি, ওই চিয়ারিং করা তো আমার নৈতিক দায়িত্ব ছিল, তাই না? আমি কি না তোর সেই কবেকার বন্ধু, বন্ধুর জন্য এইটুকু করতে পারিনা? করবোই তো, আমি না ভালো মেয়ে? বাবা, এখন তুই কত বড় মাপের সিঙ্গার সংরাইটার বল,কীসব আবার শুকনো খেজুরগুড় হাম্বা গাম্বা লেভেলের গান লিখিস, আমার এইটুকু মাথায় ঢোকেই না। মাঝে মাঝে তো দেখি আবার অনু মলিকের মত ওইসব আরবি পার্সি সব গানের সুর থেকেও অনুপ্রেরণা পাস। সেদিনের তোর ওই গানটারে, ওই যে রে, ল্যাভেন্ডার নিয়ে যে গানটা সেদিন রিলিজ করলি, তার সুরটা তো ভীষণভাবে আমার এক চাইনিজ পিয়ানিস্টের একটা পিসের কথা মনে করাল। তারপরে দেখলাম তোর ভিডিওতে ভর্তি ভর্তি লাইক আর লাভ, কমেন্ট আর শেয়ার। কে জানে, এতজন যখন প্রশংসা করল, এত স্তাবক, সকলে কত বুদ্ধিমান, নিশ্চয়ই খুব মৌলিক হয়েছিল। আমার নেহাত কাঁচা মাথা। এসব বুঝিনি তাই, এপ্রিশিয়েট করতেই পারিনি উল্টে ভাবলাম কিনা তুই টুকলি করেছিস। যাই হোক, সরি রে। না না। এরকম ভাবা আমার ভুল হয়েছে। তোর ওপর রাগ করাটাও ভুল হয়ে গিয়েছিল। এক্সট্রিমলি সরি রে। প্লীজ তোর ফ্যানক্লাবে আমায় স্থান দে, অন্তত পুরনো বন্ধুত্বের খাতিরে? ইয়ে দোস্তি হাম কভি না তোড়েঙ্গে। প্লীজ প্লীজ? জানি খুব ট্যালামার্কা শোনাচ্ছি, কিন্তু কি করব, আমি যে এরকমই, প্যালা হাঁদা গঙ্গারাম। তোর মত চৌকশ থোড়িই। আর রাগ করব না। এবার থেকে সারাক্ষণ তোর স্তুতি গাইবো, তোর ভালোটুকুই দেখবো। পদে পদে আমায় যখন অবহেলা করিস, সেগুলো দেখেও না দেখার ভান করব। আমি কি না ভালো ভদ্র মেয়ে। আমার কি আর ঝগড়া আসে বল?



(অনেকগুলো ব্যাকস্পেস টেপার শব্দ)

- ধুর, না রে। একটু ব্যস্ত ছিলাম রে। অনেকগুলো পেন্ডিং এসাইনমেন্ট ছিল, ওই নিয়ে...

- তাই বল। ইয়ুটিউবে একটা নতুন গান পোস্ট করেছি এবার। শুনে বলিস কেমন লাগল। আর একটু প্রোমোট করে দিস, পিপলস চয়েসের প্রাইজটা টার্গেট করেছি।

- হ্যাঁ নিশ্চয়ই। ভালো তো হবেই, তুই করেছিস কি না!

- হুম। প্রোমোট করতে ভুলিস না।
- চল বাই।
- বাই।







Tuesday, November 14, 2017

স্নেহ

- হ্যালো?
- মিতু কী করছিস বাবু?
- সকাল সকাল কী করব বলো? এই তো ক্যাম্পে বসে আছি।
- এখনো কোন পেশেন্ট আসেনি?
- এসছে তো, ওই তিন চার জন।
- কতক্ষণ চলবে?
- বিকেল পাঁচটা অবধি।
- সবে এগারোটা বাজে। বলছি ব্রেকফাস্ট করেছিস?
- না, সময় হয়নি।
- সে কী? কতবার বলব ব্রেকফাস্ট স্কিপ করবি না?
- উফ মা, সময় পাইনি বলছি তো।
- সময় পাইনিটা কোন কথা হল? শরীর খারাপ হয় জানিস?
- মা পাঁচ বছর ধরে কষ্ট করে ডাক্তারিটা না আমি পাস করেছি মা, তুমি না। তাই প্লীজ আমার ব্যাপারটা আমায় বুঝতে দাও।
- ধুর বাবা, ভালো লাগেনা। তোকে কিছু বলতে গেলেই এমনভাবে রিএক্ট করিস আমার ভীষণ খারাপ লাগে।
- বলতে আসোই বা কেনো বলো তো? কাজের সময় ফোন করে জ্ঞান দিতে এলে আমি কিভাবে উত্তর দেবো?
- ছাড়। আমি রাখছি।
- হ্যাঁ রাখো।


মনটা তেতো হয়ে গেলো মিতু, অর্থাৎ ডঃ মিতালি দাসশর্মার। একেই কাল রাত্তির থেকে  হবু বর সুপ্রিয়র সাথে এক প্রস্থ ঝগড়া চলছে। মিতু ওর ফাইনাল ইয়ার থেকে একটি এন জি ওর সাথে যুক্ত। দুই মাস অন্তর অন্তর ও তাদের সাথে আসে সাঁওতাল পরগণার এই ছোট গ্রামে। স্থানীয় মানুষজনের চিকিৎসার জন্য।  বিয়ে ঠিক হওয়ার সময় থেকেই সুপ্রিয় জানে এই ব্যাপারটা, শুরুতে এই নিয়ে কোনরকম মনোমালিন্য হয়নি। কিন্তু ইদানীং মিতু দেখছে, বিয়ে যত এগিয় আসছে, সুপ্রিয়র যেন দুই চোখের বিষ হয়ে উঠছে মিতুর এই ক্যাম্প। কাল রাত্রে অনেকক্ষণ কথা কাটাকাটির পর দুজনেই পরেরদিন কাজ আছে এই অজুহাতে ঝগড়া স্থগিত রেখেছে, তাই মুড অফ। এর মধ্যে মায়ের ফোন আসায় বেচারির উপর চোটপাট করে দিল। কিই বা করে মিতু, এই নিয়ে সকাল থেকে দুবার ফোন, পাঁচবার মেসেজ হয়ে গিয়েছে মায়ের সাথে, তারপরেও বার বার ফোন এলে বিরক্ত হবে না? এক কথা শুনতে ভালো লাগে? ও নিজেও জানে, ব্রেকফাস্ট মিস করা খারাপ। কিন্তু মুড ভালো নেই। ইচ্ছে করছেনা। জোর করে খাবে নাকি? মা যেন কিচ্ছু বুঝতে চায় না। ধুর, পেশেন্টও আসছেনা কোন।
নিজের মেকশিফট চেম্বার থেকে বেরিয়ে বাইরেটা দেখল মিতু। আশেপাশে তেমন লোকজন নেই ক্যাম্পের ওরা কয়েকজন ছাড়া। রাঙ্গারও দেখা নেই।

প্রতিবার ও যখন ক্যাম্পে আসে, রাঙ্গা আর ওর ছেলে বিশু এসে ওর সাথে দেখা করে যায়। পুলের পাশেই ওদের ঘর। গত বর্ষায় কোন বিষাক্ত পোকার কামড় খেয়ে বিশুর অবস্থা যায় যায় প্রায়। রাঙ্গা কাঁদতে কাঁদতে প্রায় হাতে পায়ে ধরে ক্যাম্প থেকে মিতুকে নিয়ে যায় ওদের ঘরে। প্রাথমিক চিকিৎসা করে তারপর এম্ব্যুলেন্স করে সদর হাসপাতালে গিয়ে বিশুর চিকিৎসা চলে দুদিন। পুরোপুরি যতক্ষণ ও সুস্থ না হয়, মিতু ওখানেই ছিল। তারপর হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়ে বিশুকে আর রাঙ্গাকে ওদের ঘরে পৌঁছে ওর ছুটি হয়েছিল। সেই থেকে রাঙ্গা আর বিশু প্রতিবার এসে ওদের ডাক্তার দিদির সাথে দেখা করে যায় ক্যাম্প বসলেই। বড় ভালো লাগে এই গ্রামের মানুষগুলোকে মিতুর, কী সরল, কী ভালো। শহুরে আধুনিকতা যতদিন না ওদের ছুঁতে পারে, ততদিনই ওদের মঙ্গল। নইলে তো সেই সব একেকটা স্বার্থপর জীব হবে।
এসব ভাবতে ভাবতেই মিতু দেখল দূরে হলুদ শাড়ী পরে রাঙ্গা। সাথে হাত ধরে দৌড়তে দৌড়তে আসছে বিশু।
- ও দিদি, কেমন আছো?
- ভালো রাঙ্গা। তুমি?  এই বিশু কেমন আছিস?
- ভালো পিসি।
- তোমাদের আজ দেরি হল? আমি ভাবছিলাম এখনো আসলে না কেন?
- আজ বিশুর ইস্কুলে ডেকেছিল। ওখান হতে এলাম।
- কেন রে বিশু? লেখাপড়া করছিস না নাকি?
- না পিসি। আমি ফার্স্ট হয়েছি ক্লাসে। তাই মা কে ডেকে বলল।
- বাহ! খুব ভালো। দাঁড়া, তোকে কী দিই?
- কিচ্ছু দিয়োনি দিদি। ছেলেটা খুব বদমাশ হচ্ছে।
- কেন রাঙ্গা?
- কোন কথা শোনেনা। সকাল থেকে জানো খায়নি কিচ্ছু। না খেয়ে ইস্কুলে পালায়, খেলবে বলে। তুমি ওকে একটু বকে দাও না দিদি।

মনে পড়ে গেল মায়ের কথা। মায়েদের চিন্তা বোধহয় স্থান কাল পাত্র নির্বিশেষে এক থাকে। সাঁওতাল পল্লীর অশিক্ষিত রাঙ্গা হোক কী দক্ষিণ কলকাতার নামী কলেজের প্রিন্সিপাল মলয়া, নিজের সন্তানের সুস্বাস্থ্য ছাড়া মায়েদের জীবনে বোধহয় আর কিচ্ছু বড় না। হঠাৎই তাই সকাল বেলা মায়ের ওপর চোটপাট করার জন্য একটা অপরাধবোধ কাজ করতে লাগল মিতুর। চেম্বার থেকে নিজের হাতব্যাগটা এনে, সেখান থেকে একটা বিস্কুটের প্যাকেট বের করে বিশুকে দিতে দিতে বলল, " এই বিশু পাগল, আমি যেন পরেরবার এসে মায়ের কাছে তোর নামে কোন নালিশ না শুনি। ঠিক সময়ে খাওয়া দাওয়া করবি। মা কে জ্বালাতন করলেই শহরে নিয়ে যাব। বুঝবি ঠ্যালা তখন! "

শহরের নামেই বিশুর গায়ে জ্বর আসে, আর তাই এইবারে যে মোক্ষম ডোজটা পড়েছে, বুঝল মিতু। " যা বাড়ি গিয়ে স্নান করে শিগগিরি খা কিছু। রাঙ্গা নিয়ে যাও ওকে। ভালো থেকো। "
" দিদি তুমিও ভালো থেকো। আবার এসো।"

মিতুর চোখের সামনে দিয়ে মায়ের হাতে বিস্কুটের প্যাকেটটা দিয়ে, মুখে একটা পুরে, তিড়িং বিড়িং করে লাফাতে লাফাতে চলল আট বছরের বিশু, এক হাতে মায়ের হাত শক্ত করে জাপ্টে ধরে; এর চেয়ে নিরাপদ আশ্রয় আর তো দুটো হয় না। এই বোধও হয়তো দেশ কাল সবকিছুর বাধা ছাড়িয়ে যায় এসে যায় মানব মনে। চোখের কোণের জল রুমালে মুছে মিতু চলল ফোন বের করতে। মা কে একটা সরি বলতেই হবে, এখুনি।

Thursday, November 9, 2017

সোনার ছেলে

মাদ্রাস নিয়ে লিখছি, সেখানে বলব যাদের কথা, তাদেরই একজনের কথা আজ বলি আলাদা করে। ওর জীবনটা হয়তো অনেকের সাথেই মিলে যাবে, আবার নাও মিলতে পারে, কিন্তু আমি যতজনকে চিনেছি আজ অবধি, এইরকম অধ্যাবসায় বোধহয় কারুর দেখিনি।
সকাল থেকে রাত অবধি সাঙ্ঘাতিকভাবে লেখাপড়ার মধ্যে নিজেকে ডুবিয়ে রাখে। অনেক সময় রাতের পর রাত জেগেও কাজ করে। শরীর খারাপ হয়ে যাবে, একটু বিরতি নে বললেও কথা শোনেনা; কারুর সাথে নিজের রিসার্চের কাজের ব্যাপারে কথা বলতে গেলে দুই চোখ চকচক করে ওঠে।  কোন কিছু করবে ভাবলে এক অদম্য জেদের সাথে শেষ দেখেই ছাড়ে। আমরা যখন ওকে বলি যে এত অমানুষিক পরিশ্রম করছিস কেন, তার উত্তর পাই, আমাকে অনেকটা বড় হতে হবে। জীবনে দাঁড়াতে হবে নিজের পায়ে। তোমরা বুঝবে না।
সত্যিই তাই। ওর জীবনের স্ট্রাগলের কথা যতদিন জানিনি, ততদিন ভাবতে পারতাম না, ওর এত খাটুনির পিছনের আসল উদ্দেশ্যটা কী। আসলে যখন ছোট থেকে বড় হয়েছে ও, দুই চোখে ছিল এক স্বপ্ন, সে স্বপ্ন একদিন অনেক বড় হবে, দূর হবে জীবনের বাধা।
মেদিনীপুর শহরের এক বেসরকারি প্রাইমারি স্কুল শিক্ষকের ছেলে ও। বড় হয়েছে দারিদ্র্য ও অভাবের মধ্যে। তবে কখনোই তা মুছে ফেলতে পারেনি ওর দুই চোখের এই স্বপ্নকে। বরং প্রতি মুহূর্তে ওকে এই অভাব অনটনের সংসার মনে করিয়ে দিতো যে আর পাঁচটা ছেলে মেয়ের থেকে ওকে যে অনেক বেশী খাটতে হবে। স্কুলে পড়াকালীন আই আই টি জয়েন্টের কথা জানত না, তাই স্টেট জয়েন্ট ছাড়া অন্য কোন পরীক্ষায় বসেনি। এবং সেখানেও অসম্ভব ভালো র‍্যাঙ্ক করে যাদবপুরে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিঙে চান্স পায়। অর্থনৈতিক সচ্ছ্বলতা না থাকায় ট্যুশন করে নিজের খরচ চালাত। বছর দেড়েক চাকরি করে টাকা জমিয়ে এখন ও আই আই টিতে এরোস্পেস ইঞ্জিনিয়ারিঙে রিসার্চ করছে। ও আমাদের সকলের গর্ব।  যেখানেই যায় নিজের কাজ প্রেসেন্ট করতে, প্রথম স্থান পেয়ে আসে। ও আমাদের সোনার ছেলে। সমস্ত ফ্যাকাল্টিদের, সিনিয়রদের আর জুনিয়রদের ও প্রিয়পাত্র।
আমার খুব গর্ব হয় ওকে চিনি বলে। ওর থেকে প্রতি মুহূর্তে শিখি যে অদম্য ইচ্ছা আর সাহস থাকলে, কঠিন অধ্যাবসায়ের মারফত কীভাবে মানুষ তার স্বপ্ন সফল করতে পারে। যেভাবে ওর কেরিয়ার এখনও অবধি চলছে, আমি হলফ করে বলতে পারি, অদূর ভবিষ্যতে ও একাডেমিক ফিল্ডে খুব নাম করবে।

শুধু লেখাপড়াতেই ওর গুণ সীমিত না। ভীষণ ভাবে ভালো মনের একটা মানুষ, কোনরকম বিপদে আপদে এগিয়ে যায়। যথাসাধ্য সাহায্যও করে। এছাড়া বড় ভালো ছবি আঁকে, গান গায়, লেখালিখি করে। গিটার বাজায়। এই প্রসঙ্গে বলি, ওকে গত সাড়ে তিন বছর ধরে চিনি। গিটার বাজাতো আমি গান গাইলে, তখন ওকে গানের কর্ড দিয়ে দিতে হতো। কিন্তু এই কবছরে নিজের চেষ্টায় গিটারটাকে ভালোমতোই রপ্ত করে ফেলেছে, নিজে নিজে সুর বানায়, বাজায়।

গর্ব হয় প্রতি মুহূর্তে আমার ওর জন্য। ও আমার সবচেয়ে প্রিয় ভাই, চন্দন বোস। 


Thursday, November 2, 2017

নাম তো সুনা হোগা

পুজোর ছুটির পর স্কুল খুলেছে আজ প্রায় এক মাস পরে। এইট বির ক্লাসরুমে আজ এক নতুন মুখ। লাস্ট বেঞ্চের একটা কোণে চুপ করে বসে আছে ছেলেটা। মিষ্টি দেখতে, চোখে চশমা না থাকলে অনেকটা রাহুলের মতো দেখতে। আরে রাহুল, কুচ কুচ হোতা হ্যায়? সেই রাহুল।  ফার্স্ট পিরিয়ডে ক্লাস টিচার মহুয়া মিস রোল কলের সময় ছেলেটির সাথে সারা ক্লাসের পরিচয় করিয়েছিলেন বটে, কিন্তু রূপসা তখন চকপিস আনতে অফিসে গিয়েছিল, তাই নামটা জানা হয়নি। রূপসার তো কী বিশাল ক্রাশ এস আর কের উপর। প্রথম তিন পিরিয়ড ধরে ক্লাস চলাকালীন তাই বারবার চোখ গেছে ছেলেটির দিকে। বেশ একটা অগোছালো ভাব চেহারার মধ্যে, শার্টের কলারটা একদিকে উঠে আছে, টাইটাও ল্যুজ। নেহাত হেডস্যার এখনো এইদিকে আসেননি, নইলে ঠিক প্রথমদিনেই ছেলেটা পানিশমেন্ট পেত। রূপসা ঠিক করল, টিফিন ব্রেকের সময় একবার গিয়ে আলাপ করবে আর তখন ওকে স্কুলের আদবকায়দা নিয়ে বলবে। এই সবে সরখেল স্যার ম্যাথস ক্লাস নিয়ে বেরিয়ে গেলেন। টাইম এন্ড ডিস্টেন্সের কিছু বাঁশ বাঁশ অঙ্ক করতে করতে আজ সারা ক্লাস বিদ্ধ্বস্ত, সবাই প্রায় যে যার মত চুপচাপ টিফিন বক্স বের করছে। নতুন ছেলেটি ছাড়া আর কেউই তেমন সপ্রতিভ নেই আর। ছেলেটিই বরং প্রত্যেকটা অঙ্ক স্যারের সাথে সাথে তাল মিলিয়ে করে যাচ্ছিল। রূপসা ভাবল, এই সুযোগ। অঙ্ক বোঝাও হবে, সাথে সাথে আলাপটাও ঝালিয়ে আসবে। নইলে ওর মতো গুডি গুডি মেয়ে হঠাৎ যেচে যেচে নতুন ছেলের সাথে আলাপ করতে যাচ্ছে, ইমেজের সাথে যায়না। বন্ধুরাও আওয়াজ দেবে।
"হাই, আমি রূপসা। লাস্ট যে অঙ্কটা স্যার আদ্ধেক হিন্টস দিয়ে চলে গেলেন না, ডু ইয়ু মাইন্ড এক্সপ্লেইনিং ইট টু মি?"
" শিয়োর! এই দেখো, এইখানে রিলেটিভ ভেলোসিটি ধর এক্স, প্ল্যাটফর্মের লেন্থ তো বলেই দিয়েছে ... "

মিনিট দশেক ধরে অঙ্কটা ভালো করে বুঝেটুঝে বহুবার থ্যাঙ্ক ইউ বলে রূপসা এবার নিজের ডেস্কের দিকে যেতে গেলো। হঠাৎ মনে পড়ল, আরে এত কাণ্ডের মধ্যে, ওর নামটাই তো জানা হয়নি।
" হ্যাঁরে। তোর নাম কী রে? সেটাই তো জানলাম না। "
উত্তর এলো, " রাহুল, নাম তো সুনা হোগা! "
ঠোঁটের কোণের এক কুচি হাসিটা...

Monday, October 30, 2017

আজি দখিন দুয়ার খোলা ৪ঃ জীবন যেমন চলছে চলুক

আমি আমার বাবা মায়ের একমাত্র সন্তান, ছোট থেকেই বন্ধুবান্ধবদের মুখে তাদের ভাই বোন দাদা দিদিদের কথা শুনে মাঝে মাঝে মনে হত,আমার নিজের একখানা দাদা/দিদি/ভাই/বোন থাকলে তো বেশ হয়। তারপরে আই আই টিতে এসে যখন দেখলাম এই সিব্লিং পাতানোর স্যাম্পল সাইজটা বেশ বেশ ভালো এবং বড়, আমি আর বেশী দেরি করিনি। বোনের সংখ্যা একটু কম (সবচেয়ে বেশী যাদের নাম বলব, ভাস্বতী আর অনিন্দিতা। অমৃতার কথা আগের পর্বেই বলেছি।  এছাড়া সায়ন্তীর কথা না বললেই না। মেয়েটা আমায় এত ভালোবাসে, এত যত্ন করে আমার, খুব খেয়াল রাখে। গত শীতে আমি সাইকেল থেকে উল্টে চিতপটাং যখন, ও ছিল সাক্ষাৎ আমার সান্টা ক্লজ।), দাদা দিদি প্রায় নেইই বলা চলে (এর কারণ হল আমি নিজেই তো প্রায় প্রাগৈতিহাসিক যুগের মানুষ, এখানে আমার চেয়ে বয়সে বড় খুব বেশী লোকজন নেই, থাকলেও চেনা না।) । তবে ভাইয়ের সংখ্যা এত বেশীমাত্রায় অধিক যে আমার চারপাশে মাঝেমধ্যেই "দিদি দিদি" বলে হাঁকপাঁক শোনা যায়। এবং সেই ডাক এতটাই জোরে হয় যে দুই হাজার কিমি দূরে বসেও মানুষ কাজ করতে করতে একবার ভেবে ফেলেন, নিশি ডাকল নাকি।
ক্যাম্পাসে আমাদের একটি বাঙালি এসোসিয়েশন আছে, নাম দিগন্ত। দিগন্ততে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করতে গিয়েই মূলত এদের সাথে আলাপ। অয়ন, চন্দন, ঋতেন্দু, শরণ্য এরা হচ্ছে যাকে বলে একদম প্রাণাধিক প্রিয়। এদের সাথে উঠতে বসতে যেমন ঝগড়া হয়, তেমনি এরা না থাকলে মনে হয় কিছু একটা মিসিং। আমার যত দাবী ওদেরই কাছে আর ওদেরও যত আবদার আমার কাছে। যেমন তেড়ে ঝগড়া করি, তেমনি আবার চোখ বন্ধ করে ভরসা করে মন খারাপ হলেই দুঃখর ঝাঁপি ওদের কাছেই পেশ করি। এছাড়া আরো আছে কয়েকজন, যেমন সৌরভ, নীলাঞ্জন, দেবজ্যোতি। একসাথে এদের অনেকের সাথেই  খুচখাচ বেড়াতে টেরাতে (ইয়েলাগিরি, কোল্লি হিলস, পন্ডিচেরি, মহাবলিপুরম) গিয়েওছি। ওদের সাথে এই হৃদ্যতা বাড়ে আরো বেশী করে বন্যার সময়ে।
২০১৫ সালে ডিসেম্বর মাস নাগাদ আমাদের এখানে ভয়ঙ্কর বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল। বেশ কিছুদিন ধরে  ভারী বৃষ্টি হয়ে রাস্তাঘাট জলমগ্ন, সাবস্টেশন জলে ডুবে বলে কম্পালসরি পাওয়ার কাট। বাহাত্তর ঘণ্টা আমরা বিনা বিদ্যুতে ছিলাম। আই আই টিতে হোস্টেলগুলির নাম সব নদীর নামে। যেমন কৃষ্ণা, কাবেরি, ব্রহ্মপুত্র, সিন্ধু, তুঙ্গ-ভদ্রা, সরযূ, সবরমতি, অলকানন্দা, যমুনা, গঙ্গা (কখনো কোন দরকারে গঙ্গা জল লাগবে শুনলে প্রথম যে পিজেটা মাথায় আসে, গঙ্গা হোস্টেলের কলের জল আনলেই হয়!!) ইত্যাদি।  আমার হোস্টেল সবরমতি। পরিচিতা থাকত অন্য হোস্টেলে, সরযূতে। যেহেতু আমরা বাকি মেয়েরা থাকতাম সবরমতিতে, ও তাই আমাদের এখানে চলে এসেছিল। বাইরে যখন হোস্টেলগুলি নিজেদের নামের মহিমা অক্ষুণ্ণ রাখতে ব্যস্ত  (ভালোমতো স্রোতস্বিনী নদী বইত) , তখন আমরা হস্টেলের ভিতরে ব্যস্ত রাজ্যের গল্প নিয়ে। পি এন পি সি থেকে শুরু করে গভীর জীবনদর্শন কিচ্ছুটি বাদ যায়নি। কারেন্ট নেই, রাস্তাঘাটে জল থইথই, ওই অবস্থায় তো আর ল্যাবে যাওয়া যায়না। কাজেই হঠাৎ পাওয়া ছুটি। সকাল হতে হতেই আমরা কোনোমতে মেসে ব্রেকফাস্ট করে বেরোতাম এডমিন বিল্ডিং। সারা ক্যাম্পাসে তখন শুধুই ওখানে এমারজেন্সি পাওয়ার থাকত, উদ্দেশ্য ফোনটা একটু চার্জ দেওয়া। এবং কষ্টেসৃষ্টে যদি একটু ফোনের টাওয়ার পাওয়া যায়, তাহলে বাড়িতে কথা বলা। মোবাইলে সিগন্যাল পাওয়া ভারী দুষ্কর ছিল, ল্যান্ডফোন ওই কটাদিন দারুণ সার্ভিস দিয়েছিল। সারা বছর হোস্টেলের ল্যান্ডলাইনে কোন রিং শোনা যায়না, আর ওই কদিন একের পর এক শুধু ফোন এসে যাচ্ছে। কখনো ৪৩২, কখনো ৪৪০। যেই ধরছে, যার জন্য ফোন তাকে ডেকে দিচ্ছে। ভাগ্যক্রমে আমার বি এস এন এল কানেকশন থেকে এস এম এস যাচ্ছিল, বাড়িতে ওইভাবেই যোগাযোগ রেখেছিলাম। অন্যান্যদিনে মেসে যেই উপমা দেখলে নাক সিটকে চলে যাই, বন্যার সময় ওই কটাদিন সেই খাবারই সোনামুখ করে খেতাম। প্রতিটা মিল খেতে যাওয়ার সময় ভাবতাম, কে জানে এরপরেরটা পাবো কি না। একেই তো বৃষ্টি থামার কোন সিন নেই, তার উপর দোকান বাজার বন্ধ, মেসেই বা কোথা থেকে খাবার আসবে। ওই ডাল ভাত আর আঁচার পেলেই তখন কী খুশী। পাওয়ার নেই, পাম্পে জল উঠবে না, তাই স্নান করা নিয়েও প্রায় রেস্ট্রিকশন, এর মধ্যেও দেখতাম কিছু লোকজন কোমরছাপানো লম্বা চুল শ্যাম্পু করছে, বালতি বালতি জামাকাপড় কাচছে, সত্যি বাবা, কত বিভিন্ন ধরণের মানুষ যে হতে পারে, হোস্টেল লাইফ না হলে বোঝা যায় না।
তো যাই হোক, যা বলছিলাম, আমি এত এক কথা বলতে অন্য কথায় চলে যাই, কি বলি। ক্ষমা করে দেবেন মাঝে মাঝে। হ্যাঁ, এই ঝড়বৃষ্টির মধ্যে একদিন হয়েছে কি, আমার ভারী চিন্তা শুরু হয়েছে, আমার ভাইগুলো সব ঠিক আছে তো? কোন খবর পাচ্ছিনা, ফোনে কথা হচ্ছেনা, হোস্টেলের নাম জানি, কিন্তু রুম নম্বর জানিনা, অগত্যা ওই চত্বরে ঘুরে ফিরে এলাম, বাই চান্স যদি দেখা পাই আর খবর পাই। কপাল খারাপ, কারুর সাথেই দেখা হলো না। পরেরদিন কিভাবে, এখন আর মনে নেই, যোগাযোগ হল। তারপর ঠিক হল, অমুক জায়গায় অমুক সময়ে সকলের জমায়েত হবে। আর হলও তাই। তারপর গান গল্প এই করেই কাটত সন্ধ্যেগুলো। অন্ধকার হয়ে এলে টর্চ হাতে করে ওরা আমাদের হোস্টেল অবধি পৌঁছে যেত, আমার ভাইগুলো খুব শিভাল্রাস কিন্তু! ইতিমধ্যে একদিন খুব হিড়িক পড়ল লোকের, দল বেঁধে সব ভাইজাগ ব্যাঙ্গালোর চলে যাবে, বড় বড় বাসে ক্যাম্পাস ভরে গেল, নাকি দুদিনের ওপর কারেন্ট নেই, আর রিস্ক নেওয়া যায়না। বাইরে অবস্থা খুব খারাপ। সকলের বাড়ি থেকে খবর আসছে, টিভিতে ভয়াবহ সব চিত্র দেখাচ্ছে, আমরা তো ক্যাম্পাসে অনেকটাই নিরাপদে ছিলাম। ওই কারেন্ট ছিল না আর জল ভেঙ্গে এদিক ওদিক করছিলাম আর মেসের (অমৃত) খাবার খাচ্ছিলাম। আমরা তাই ঘটনার ভয়াবহতা অতটা আন্দাজ করতে পারিনি, কিন্তু যখন একটা মাস এক্সোডাস শুরু হল, আমরা তখন যেন একটু হলেও চিন্তা করতে শুরু করলাম, উৎকণ্ঠা হতে লাগল। যে যার বন্ধুবান্ধবরা আছে ব্যাঙ্গালরে, খবর নেওয়া শুরু করলাম, একটু আশ্রয় পাওয়া যাবে কি না গেলে। বাড়ির থেকে অবশ্যই বারবার বলছিল যে ক্যাম্পাসের মত সেফ আর কোত্থাও না, যেয়ো না হ্যানাত্যানা। এদিকে আমাদের তখন হঠাৎ করেই যেন ভয় বেড়ে গিয়েছে, ক্যাম্পাস খালি হয়ে যাচ্ছে, ঘুটঘুট্টি অন্ধকার, এক বন্ধুর তখন জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছে, সব মিলিয়ে সকলেই টেন্সড। এমনিতেই আমাদের ক্যাম্পাস যেহেতু জঙ্গলের মধ্যে, হাজার একটা পোকামাকড় আছে, বৃষ্টির জমা জলে যে কত সাপখোপ, বিছে ইত্যাদি থাকছে, ভাবলেইগা শিরশির করে উঠছে। এমন অবস্থায় এমারজেন্সি পাওয়ার দিয়ে হঠাৎ পুরো "Let there be light" বলে যেন আলো এলো, সেই আলো দেখে প্রচণ্ড কলরব শুরু হল। যে যার নিজের নিজের ঘরে তখন ছোটো, ফোনে চার্জ দাও, অথচ চার্জ দিয়ে বা কি হবে, টাওয়ার বাবাজীর দেখা আসতে আরো দিন দুইএক লেগেছিল। ক্রমে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হল,তারপরে ইন্টারনেট আসতে খবরের মাধ্যমে দেখলাম, সত্যি, এমন সব ভিস্যুয়ালস, বাড়ির লোক ভয় পাবে না কেন!
এই বন্যার সময়েই চেন্নাই বেঙ্গলী ফেসবুক গ্রুপের অন্যতম মেম্বার, পুন্ডরিকদা একটা whatsapp গ্রুপ বানিয়েছিল, উদ্দেশ্য ছিল ম্যাক্সিমাম লোককে একসাথে রাখা, সকলের খবর যাতে পাওয়া যায়। প্রত্যেকে তখন একে অপরকে যতটা পেরেছে সাহায্যও করেছে, কোথায় জল নেমেছে, কার বাড়িতে খুব জল, তাই অন্যের বাড়ি এসে থাকার আমন্ত্রণ, এটিএমে টাকা কোথায় আছে, আরও কত কিছু।
২০১৬ ডিসেম্বরে এলো সাইক্লোন Vardah, জনজীবনের সেইভাবে ক্ষতি করতে পারেনি খুব বেশী, আসলে বন্যার পর সকলেই মোটামুটি প্রস্তুত ছিল। কিন্তু আমার সাধের ক্যাম্পাসের সৌন্দর্য অনেকটাই ম্লান হয়ে গিয়েছে। ঝড়ে এত গাছ পড়েছিল, জায়গায় জায়গায় ন্যাড়া দেখলে এখনো মন খারাপ হয়। নভেম্বর ডিসেম্বর আসলে North East Monsoon বা Retreating Monsoonএর সময়, তাই এই কটা মাস চেন্নাইবাসী বেশ তটস্থ থাকি আমরা। এই যেমন গত কয়েকদিন তুমুল বৃষ্টি হল, সঙ্গে সঙ্গে আমাদের চেন্নাই বেঙ্গলী ফেসবুক পেজ সক্রিয় হয়ে গেল। যে যেখান থেকে পারছে (মোটামুটি) জেনুইন তথ্য সরবরাহ করতে থাকে, মুহূর্তে মুহূর্তে। আমরা আসলে ঘরপোড়া গরু, সিঁদুরে মেঘ দেখলেই ভয় পাই, আকাশ একটু কালো হতেই শুকনো খাবার স্টক করি, এখনো ফোন প্রায় সর্বক্ষণ চার্জে বসিয়ে রাখি।
এই চেন্নাই বেঙ্গলী (সিবি বলেই বেশী পরিচিত) গ্রুপ হল একটা অন্যতম ব্যাপার যার জন্য আমার চেন্নাইতে থাকাটা খুবই সুখকর হয়েছে এ যাবৎ। ২০১৩ সালে তেমনভাবে কাউকেই চিনতাম না, তাই আমি সেইবারে পুজোয় খুব মনমরা ছিলাম। রিম্পা অর্ক (ওদের কথা একেবারে শুরুতে বলেছিলাম, মনে আছে? বাবা রে, ওদের বিয়েটা হয়েছিল একদম বন্যার পরেপরে। ওরা কত এডভেঞ্চার করে চেন্নাই থেকে ব্যাঙ্গালোর হয়ে তারপরে হায়দ্রাবাদ থেকে ফ্লাইট পেয়ে কলকাতা গিয়েছিল বিয়ে করতে!!) সুজাতা অরিজিতা কস্তূরী এদের সাথে এঞ্জয় করলেও সেই কলকাতার ফিলটা আসেনি। তাই সেইবারে পণ করেছিলাম, দাঁতে দাঁত চিপে সারা বছর ছুটি না নিয়ে পুজোয় বাড়ি যাবো। তবে এবার ছুটি নিইনি পুজোয়, কিন্তু এই বছর এই চেন্নাই বেঙ্গলীর সূত্রে এত বন্ধু পেলাম, সকলে মিলে প্রচণ্ড আনন্দ করে পুজো কাটিয়েছি, মানে আমি নিজে ভাবতেই পারিনি যে পুজোটা চেন্নাইতে বসেও এত ভালো করে উপভোগ করা যায়। প্রায় ১৪-১৫টা পুজো হয়, অবশ্যই সব কটা বিশাল কিছু না। বড় বড়গুলোর মধ্যে ওই হাতে গোনা কয়েকটা, বেসন্ত নগরে একটা, টি নগর বেঙ্গল এসোসিয়েশনের একটা। এছাড়া নাভালুরেও হয়, তবে সেটা এত বেশী দূর বলে সুজয় দার (সুজয় দার সাথেও পরিচয় এই চেন্নাই বেঙ্গলী গ্রুপেরই সূত্রে, সজ্জন মানুষ, দাদাসুলভ ) বহু নিমন্ত্রণ সত্ত্বেও যাওয়া হয়ে ওঠেনি। মনে আছে পুজোয় বাড়ি যাচ্ছিনা বলে যখন খুব মন খারাপ, তখন তৃণাদি আশ্বাস দিয়েছিল, সবাই মিলে দারুণ কাটবে,আর সত্যিই হলোও তাই! সুজয় দা, রূপম দা, তৃণা দি, বিভেন্দু দা, ধ্রুব দা, রজত, ঈপ্সিতা, কাকীমা (মানে তৃনাদির মা), প্রিয়াঙ্কা  সকলে মিলে খুব খুব আনন্দ করেছি। চারটে গাড়ি করে পুজো পরিক্রমা, প্যান্ডেলে আড্ডা, খাওয়া।
 পুজোর কিছুদিন আগে হয়েছিল সিবি গ্রুপের এন্যুয়াল ফাংশান, সাগরিকা। গত বছর দর্শক হলেও এবারে মূলত তৃণাদির উদ্যোগেই আমিও একটু আধটু অংশ নিলাম। রিহার্সালের দিনগুলো ভারী আনন্দে কাটত, সত্যি বলছি, সারাদিন সারা সপ্তাহ এই রিসার্চের চক্করে পড়ে এইসবই একটু নিঃশ্বাস ফেলার রসদ যোগায়। নতুন করে কত বন্ধু পেলাম, তৈরি হল স্মৃতি।
 এই তো, এই করেই চার চারটে বছর কাটিয়ে দিলাম এখানে। প্রথম এসেছিলাম যখন, শহরটা ছিল দুই চোখের বিষ। খালি কলকাতা ভালো, ব্যাঙ্গালোর ভালো এই করে যেতাম। এখন যেন মনে হয়, এ শহর আমার দ্বিতীয় বাড়ি, আমার ঠিকানা। বন্ধু বান্ধব হই হুল্লোড় ঘুরে বেড়ানো (প্রচুর জায়গা আছে এখান থেকে বেড়ানোর, অন্যতম হল শহরের মধ্যে কয়েকটা বিচ, যেমন বিশ্ববিখ্যাত মেরিনা বিচ; এছাড়া তো ইউনেস্কো হেরিটেজ সাইট মহাবলিপুরম, কাঞ্চীপুরম, পন্ডিচেরি,  টাডা ফলস, তিরুপতি, হরস্লে হিলস, ইয়ারকাড, ইয়েলাগিরি, কোল্লি হিলস; একটু দূরে গেলে ওইয়ানাড, মুন্নার, ব্যাঙ্গালোর, মাইসোর, উটি, কোদাইকানাল) সিনেমা দেখা (বাংলা সিনেমা পর্যন্ত চারটে এখানে স্ক্রিন হয়েছে, যার মধ্যে একটি, প্রাক্তন , আনানোর দলে অত্যন্ত সক্রিয় ছিলাম এই আমি আর ইয়েতি অভিযান দেখেছিলাম গোটা হলে শুধুমাত্র দুইজন দর্শক আমরা, বিচিত্র অভিজ্ঞতা বটে।), দুর্গা পুজো, ইলিশ (হ্যাঁ সিজনে সেটাও ভালো মতই পাওয়া যায়, দাম অবশ্যই বেশী, কিন্তু পাওয়া যায়) সব মিলিয়ে চেন্নাই সত্যি সত্যি হয়ে উঠেছে "নাম্মা চেন্নাই", অর্থাৎ, আমার চেন্নাই। এই শহরকে বন্যা সাইক্লোনের সময়ে দেখেছি কীভাবে একজোট হয়ে রুখে দাঁড়িয়েছে বিপর্যয়ের মুখে, তেমনি প্রিয় আম্মার মৃত্যুতে কেঁদেও ভাসিয়েছে এই শহর, এই শহরের মধ্যে যেমন আছে বহু প্রাচীন মন্দিরের ঐতিহ্য, তেমনি রয়েছে ফিনিক্স মলের মতো আধুনিকতা, মার্সিডিজ বি এম ডাব্লিউয়ের সাথে তাল মিলিয়ে চলে ঠ্যালাগাড়ি নিয়ে "তাতা" (দাদু) ফুল বিক্রি করতে করতে, সন্ধ্যে হলে মন্দির থেকে ভেসে আসে পবিত্র ধূপের গন্ধ, আবার অন্যদিকে সমুদ্রের মিষ্টি হাওয়া জুড়িয়ে দেয় প্রাণকে।

এই শহর দিয়েছে অনেক কিছু, নিয়েছেও কিছু, তবে পাওয়ার ঝুলিটাই কানায় কানায় ভরে আছে। আর তাই, গর্ব করে বলতে পারি, আমি এই শহরে থেকেছি, আমি চেন্নাইবাসী।

আজি দখিন দুয়ার খোলাঃ গুটি গুটি পায়ে পথ চলা শুরু

১৫ই অগস্ট ভারতবর্ষ স্বাধীনতা লাভ করেছিল, আমি ওইদিনে বাড়ি থেকে তল্পিতল্পা গুটিয়ে রওনা দিলাম মাদ্রাসের উদ্দেশ্যে, শুরু করতে চেন্নাইতে আমার দ্বিতীয় ইনিংস। জানিনা সেটা আমারও স্বাধীনতা নাকি পরাধীনতার নতুন শৃঙ্খলাবদ্ধ হলাম। তখনো পি এইচ ডি এডমিশন হয়নি, তাই আবারও পাট্টির বাড়িতেই উঠলাম। মাস দেড়েক থাকলাম। ৩রা সেপ্টেম্বর, আমার মায়ের জন্মদিনের দিনে জয়েন করলাম বায়োটেকনোলজি ডিপার্টমেন্ট, জুনিয়র রিসার্চ ফেলো হিসেবে। দুই চোখে তখন অনেক স্বপ্ন, বিশাল কেউকেটা হব। হোস্টেল পেয়ে গেলেও কেন জানিনা ওই পিজি ছেড়ে আসতে একদম ইচ্ছে করছিল না। তার মূল কারণ বোধহয় খাবার। মেসে দুপুরবেলাগুলো খেতে যেতাম, ওরে বাবা রে, ওই কুমড়োর ঘ্যাঁট, বেগুনের কিছু একটা, মূলো দেওয়া সাম্বার। সেখানে পিজিতে বেশ ইচ্ছেমতো মাছ মাংস সবজি ডিম যা প্রাণ চায়, রাঁধো, খাও। কিন্তু দুই জায়গার খরচা চালানোটা খুব বোকামি হয়ে যাচ্ছিল, তাই ঠিক করলাম অক্টোবরের শুরুতেই হোস্টেলে শিফট করব। ঘর দেখতে এসে তখন প্রথম আলাপ হল পরিচিতার সাথে। ওর কেমিস্ট্রি ডিপার্টমেন্ট ওই একই সেমিস্টারে ভর্তি হয়েছে পি এইচ ডি তে। ইতিমধ্যে ল্যাবে সুজাতার সাথে গাঢ় বন্ধুত্ব হয়ে গিয়েছিল (সে বন্ধুত্ত্ব এখনো বহাল আছে, ও সুদূর ইউ এস এতে পি এইচ ডি করছে। প্রতি রবিবার সকালে নিয়ম করে আমরা স্কাইপে কথা বলি, সারা সপ্তাহ মেসেজ। মানে সারাক্ষণ আপডেটেড থাকতেই হয় নিজেদের। সুজাতা আর আমি একবার তিরুপতি দর্শনে গিয়েছিলাম, সাত আট ঘন্টা লাইনে দাঁড়িয়ে কী মারাত্মক অবস্থা। ওই ভিড়ের মধ্যেই কিছু মানুষজনের আজব ব্যবহার, প্রায় পারলে ওই লাইনে দাঁড়িয়েই যত পারে সোহাগ করে ফেলে। বাবা রে। গরমে ঘামতে ঘামতে ভিড়ে চিড়েচ্যাপটা হয়েও প্রেমের কমতি নেই। উফ!!! সেইবারে অবশেষে যখন দেবদর্শন হয়, ভগবানকে বলেছিলাম, ক্ষমা করবেন, খুব শিগগিরি আর আসছি না। এমনি মনে মনেই ভক্তি প্রার্থনা চলবে। তবে ওই যে মানুষ ভাবে এক, হয় এক। তারপরে আবারও একবার গিয়েছিলাম দর্শনে। আমার এক তামিল বান্ধবী, অমৃতা আর ওর মা বাবা বোনের সাথে। সেইবারে সুষ্ঠুভাবেই মিটেছিল। প্রসঙ্গত বলি, অমৃতা আমার খুব কাছের বান্ধবী। ও এখন হিউস্টনে পি এইচ ডি করছে। মেসের জঘন্য খাবার, ডিপারট্মেন্টের কিছু লোকজনের পি এন পি সি এই ছিল আমাদের হৃদ্যতার বেসিস, যা এখন বেশ বেশ পাকাপোক্ত। ও আমায় তামিল গান শেখায়, আমি ওকে বাংলা। আমরা একসাথে হোস্টেলের প্রোগ্রামে গেয়েওছিলাম। আমাদের ক্যাম্পাসের সরস্বতী পুজোতে ও একবার আমার সাথেই ভোরবেলা উঠে আমায় শাড়ি পড়িয়ে, নিজেও তৈরি হয়ে পুজোর যাবতীয় কাজকর্ম করেছিল। খুব লক্ষ্মী মেয়ে ও) , সুজাতা কেমিস্ট্রি ডিপার্টমেন্ট থেকে মাস্টারস করে আমাদের ল্যাবে প্রোজেক্টে ছিল, তাই ওর সুত্রে (আর কিছুটা নিজে গ্র্যাজুএশনে ওই একই সাব্জেক্ট পড়ার সুবাদে) পরিচিতার সাথে বেশ একটা একাত্মভাব অনুভব করেছিলাম। তবে আমার অত্যন্ত স্বভাববিরুদ্ধভাবে শুরুতে শিফটিঙ্গের আগেই পরিচিতার সাথে ছোট করে একটা ভুল বোঝাবুঝি হয়ে গিয়েছিল। ভাগ্যিস মায়ের কথামতো তারপরে ওর কাছে সরি টরি বলে সেসব মিটিয়ে নিয়েছিলাম। নইলে যে কী করে থাকতাম হোস্টেলে!
কেন, বলি। আমাদের তখন হোস্টেলের কমতি পড়েছিল ক্যাম্পাসে। বিভিন্ন আইনি প্যাঁচে পড়ে নতুন হোস্টেল আদ্ধেক তৈরি হয়ে ফেলে রেখেছিল, আমাদের মেয়েদের থাকতে দিচ্ছিল কোয়ার্টারে। 1BHK ফ্ল্যাটের মতো, হলে দুটো বেড আর বেড্রুমে দুখানা। আমার আর পরিচিতার ছিল হলে, বাকি যেই দুইজন ছিল ভিতরে, তারা অন্ধ্র প্রদেশের। তাদের মধ্যে একজন, সুস্মিতা তার নাম, সে যে কী প্রচন্ড জ্বালাতন করে মেরেছে আমাদের, কী বলব! মানে ওকে নিয়ে লিখতে গেলে একটা গোটা পর্ব হয়ে যাবে, আর ও মোটেই সেটা পাওয়ার যোগ্য না। তাই এক দুই শব্দেই বলি, ওর মতো অসহযোগী, নিয়মকানুনের ধার না ধরা, ইচ্ছে করে পায়ে পা লাগিয়ে ঝগড়া করা মেয়ে আর দুটো দেখিনি। পরিচিতা যতদিন ছিল আমার রুমমেট, কোন কারণে সুস্মিতা ওকে একটু সমঝে চলত। ও চলে যেতেই সুস্মিতার দৌরাত্ম্য শুরু হত। তখন একেই লেখাপড়ার সাঙ্ঘাতিক প্রেশার, অন্যদিকে প্রতিদিন হোস্টেলে ফিরে এই মানসিক অত্যাচার। সত্যি, কীসব দিনই না গিয়েছে।
যাই হোক, ২০১৩'র ডিসেম্বরে আমি বাড়ি ফিরি, ভাই (মানে দিব্যেন্দু) আর আমি, একসাথেই টিকিট কেটেছিলাম। গোটা জার্নি গল্প করে মজা করেই কাটিয়েছিলাম। সেইবারে তো বাড়ি ফিরে একেবারে প্রায় যাকে বলে গ্র্যান্ড ওয়েলকাম পাই আর কি! ইউনিভারসিটির বন্ধুরা, স্কুলের বন্ধুরা সকলের সাথে এতদিন বাদে দেখা করে কী আনন্দ আমার। মনে আছে, ওই প্রথমদিন মা আর বাবাকে খালি ডেকে ডেকে দেখিয়েছিলাম আই আই টির সবুজ রঙের আই ডি কার্ডটি, সেটি যে তখন আমার একটু "সেলিব্রিটি স্ট্যাটাসের" চাবিকাঠি!
যাই হোক, তা কাজে কর্মে, কোর্সের চাপে দিন কাটছিল বেশ। ইতিমধ্যে একবার ভাই আর সুজাতার সাথে তদানীন্তন চেন্নাইয়ের একমাত্র অথেন্টিক বাঙালি খাবারের ঠেক, শ্রী অন্নপূর্ণাতে গিয়ে খেয়ে এসেছিলাম। কলকাতা ছাড়ার আগেই জায়গাটির মাহাত্ম্য সম্বন্ধে জেনে গিয়েছিলাম (ওই যে বললাম, হোমওয়ার্ক)। যেহেতু এগমোরে দোকানটি অবস্থিত ছিল, আর আমরা ছিলাম আডিয়ারে, অনেকটাই দূর ছিল। গিয়ে খাবার পাবো কি পাবো না, জানার জন্য দুই তিনবার ফোন করে এমন ধ্যাতানি খেয়েছিলাম, বাপ রে। তবে দোকানে বসে ভাত ডাল তরকারি মাছ খেয়ে সেই বকাঝকা কখন বেমালুম ভুলে গিয়েছি, তার খেয়াল নেই।
এপ্রিল মাস আমার জন্মমাস। ২০১৪'র জন্মদিন ছিল প্রথমবার যেবার আমি বাড়ির বাইরে, কলকাতায় বসে বাবা মায়ের যেমন মন খারাপ, তেমনই মন খারাপ আমারও। কিন্তু ওই যে, আমার বন্ধুরা কিছুতেই জন্মদিনে আমার মন ভালো না করে থাকবেনা, সেইদিন আমরা কিছুজন মিলে গিয়েছিলাম সকালে সিনেমা দেখতে। যতদূর মনে পড়ছে, টু স্টেটস, মন্দ লাগেনি (আমার আবার রমকম বেশ উপভোগ্য লাগে)। আর বিকেলবেলা দিব্যেন্দু আর সুজাতাকে নিয়ে ঠিক করলাম একটি নতুন বাঙালি রেস্টুরেন্টে খেতে যাব। আগেরদিন থেকেই প্ল্যান করে রেখেছিলাম, পায়েস খাওয়াটা আমার খুব দরকার ছিল জন্মদিনে, ইতিমধ্যে অন্যান্য বাঙালি স্টুডেন্ট যারা ক্যাম্পাসে ছিল, তাদের থেকে হদিস পেয়েছিলাম পেটুকের। খানিক দূরে, জৈন কলেজের স্টপে এইট সিটার রেস্টুরেন্ট। এক বাঙালি দম্পতির যৌথ প্রয়াস, আমাদের মতো ঘরের থেকে এত দূরে পরে থাকা পাব্লিকদের জন্য। সেই সময়েই আলাপ অনির্বাণদা ও মৈত্রীদির সাথে। পরেরদিন যেন অবশ্য করে আমার জন্য পায়েস রাখা থাকে, দুই তিন রকমের মাছ, মাংস, বিরিয়ানি, সব যেন থাকে, জন্মদিন বলে কথা, এইভাবে ইমোশনাল ব্ল্যাকমেল করে প্রায় খাবার রেডি রাখিয়েছিলাম।  দে দম্পতির সাথে এখনো সাঙ্ঘাতিকভাবে যোগাযোগ আছে, ওনারা তো আবার আমার ভারচ্যুয়াল পালিত বাবা-মা। সেইবারে আমরা তিনজনের জন্য এত খাবার অর্ডার করেছিলাম, অনেকেই বোধহয় ওইদিনে আর পেটুকে খাবার পায়নি। ওই জন্যই আজও পেটুক গেলে আমি আগেভাগেই যাওয়ার চেষ্টা করি, যাতে খাবারের শর্টেজ না পড়ে! পেটুক এখন মস্ত বড় হয়েছে, দুটো ব্রাঞ্চ আর একটি স্ন্যাক্সের দোকান হয়েছে। চেন্নাইয়ের আইকনিক বাঙালি খাবারের জায়গা বলতে পেটুক অন্যতম। চেন্নাইতে বাঙালি বেড়াতে এলেও পেটুক খোঁজে।  পেটুকের খাবার আমার খুব প্রিয়, পেটুক আছে বলেই আজও চেন্নাইতে দিব্যি হেসেখেলে, গায়েগতরে ভালোই পাইল আপ করে আছি।
দিন দিন চেন্নাইতে বাঙালি খাবারদাবারের দোকান অনেক নতুন নতুন হয়েছে, এপোলো হাসপাতালের ওইদিকে প্রচুর পাইস হোটেল। আসলে চেন্নাইতে বাঙালি জনসংখ্যা দিনদিন বাড়ছে বই কমছেনা।
বাঙালি ওড়িয়া বিহারি রাঁধুনের অভাব নেই, অবশ্যই খরচ বেশী অনেকটাই, তাও। পোস্তো থেকে শুরু করে ইলিশ মাছ, কচু শাক থেকে শুরু করে কাঁকরোল, এঁচোড় থেকে শুরু করে কই মাছ, সমস্ত কিছু পাওয়া যায় আজকাল এখানে। এমনকি গোবিন্দভোগ চাল যা কিছু বছর আগে অবধি তেমন চল ছিল, জিরাসাম্বা রাইস দিয়ে কাজ চালাতে হত, সেটাও এখন পাওয়া যায়। কুলের আচার থেকে শুরু করে শুক্তো মিক্স, খিচুরি মিক্সস সব। বিভিন্ন অনলাইন পোর্টালের মাধ্যমে ডালের বড়ি, মুড়ি, নতুন গুড়, নাহুমের কেক, গাঙ্গুরামের সন্দেশ সব হাতের মুঠোয়।  ওহ ক্যালকাটা বা ভজহরি মান্না নেই বটে, কিন্তু এখানে আছে বে লিফ, যেখানে খেয়ে ও খাইয়ে আলাদা রকমের ভালোলাগা আসে। দেশি বিদেশি বিভিন্ন ক্যুজিনের রেস্টুরেন্ট রয়েছে চেন্নাইতে। মহারাষ্ট্র, পাঞ্জাব, বিহার, গুজরাট, রাজস্থান, কর্ণাটক, অন্ধ্র যেমন আছে, তেমনই বিদেশির মধ্যে ইথিয়োপিয়ান, পার্সি, আরবি, চাইনিজ, নেপালি, থাই সব পাওয়া যায়। আর এইসব খাবার যে শুধুমাত্রই ভিন রাজ্যের মানুষগুলোই খায়, তা না। স্থানীয় লোকেদেরও আমি চেটেপুটে এইসব খেতে দেখেছি। কে এফ সি, পিতজা হাট, ডমিনোজ, ওয়াও মোমো চুটিয়ে ব্যবসা করছে এখানে। ব্যাঙ্গালোর হায়দ্রাবাদ দিল্লি বম্বের মতো এখনো না হলেও, দিনদিন চেন্নাইতে বাঙালির সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এত কিছু বললাম, একটাই উদ্দেশ্য, গত চার বছরে শহরটার ভোল পালটাতে দেখলাম। সব ভালো, এমনকি খুঁজলে পরে বিকেলে তেলেভাজা মুড়ি আর চপ কাটলেট এগ রোলও যেমন পাওয়া যায়, তেমনই সকাল সকাল কচুরি জিলিপি দিয়েও ব্রেকফাস্ট সারা যায়। হে হে, এমনি এমনি কী আর শহরটার এত গুণগান গাই নাকি? সময় পেলেই, সপ্তাহের মাঝে, সপ্তাহান্তে আমার কিছু ভাই বোনদের সাথে বেরিয়ে পড়ি খেতে আর ঘুরতে। চেন্নাইতে এসে আমার ভাই বোন ভাগ্যটা বেশ খুলেছে ভালোই। আগামী পর্বে ওদের কথা বলব আপনাদের।

Sunday, October 29, 2017

আজি দখিন দুয়ার খোলাঃ হানিমুন পিরিয়ড

১৫ই মে ভোর চারটের আগেই মাদ্রাজ মেল পৌঁছল চেন্নাই সেন্ট্রাল স্টেশন। প্রায় তিরিশ ঘন্টা সময় দেওয়া থাকে বলে ট্রেনটা সচরাচর লেট করেনা। ভোরের আলো ফুটলে পর স্টেশন থেকে একটা অটো নিয়ে রওনা দিলাম ভেলাচেরির দিকে, যেখানে আমার পিজিটি অবস্থিত। সেই প্রথম শুরু ভাষার সমস্যা (এই সমস্যা আজ চার বছরেও খুব বেশী কমেনি) । হিন্দি এখানের সাধারণ লোকে খুব বেশী বলেন না, ইংরেজিটাও অদ্ভুত। কারুর কারুর যাকে বলে "ইম্পেকেবেল" তো কারুর আবার সাঙ্ঘাতিক রকমের ভাঙ্গা ইংরেজি। যাই হোক, হাত পা নেড়ে একে তাকে বলে জিজ্ঞেস করে অবশেষে এলাম পিজিতে। যেই আন্টির সাথে মেইলে যোগাযোগ ছিল, ফোন করে দিতে উনি বাড়ির সামনে এসে দাঁড়ালেন। একটি একতলা বাড়ি, লাল রঙের। সামনে অনেকটা উঠোন। ওনার মা, মানে যার বাড়ি, তার সাথে আমার আর বাবার আলাপ করিয়ে দিলেন। ওই পাট্টি (তামিল ভাষায় ঠাকুমা নাকি দিদিমাকে পাট্টি বলে) এক বর্ণও ইংরেজি বা হিন্দি বলতে বা বুঝতে পারেননা। বাবার দিকে দিকে তাকিয়ে প্রথম প্রশ্ন করলেন, "তামিল তেরি মা?" আমি তো শুনেই থ। বলে কী?? এসেই এরকম মা বাপ তুলে গালি? বোধহয় আমার মুখটা খানিক হলেও ভেবলে গিয়েছিল, সেইটা দেখে আন্টি বললেন যে উনি জিজ্ঞেস করছেন আমরা তামিল বলতে/বুঝতে পারি কি না। মাথা নেড়ে আমাদের অপারগতার অবস্থা উল্লেখ করলাম। সেদিন থেকে শুরু হল আমাদের প্রথম তামিল শেখা। এই প্রশ্নের উত্তরে কী বলতে হবে, সেটাও তখনই জানলাম। "তামিল তেরিয়াদা", অর্থাৎ, তামিল জানিনা। যাই হোক, যেই ঘরে আমায় থাকতে দেওয়া হল, সেটা দেখেই তো আমি প্রথম নাক সিটকে একাকার। কীরকম সিঁড়ির তলার ঘরের মত ছোট্ট একটা ঘর, অনেকটা পাট্টির ঘরের এন্টি-রুম গোছের (পরে বুঝেছিলাম কী এডভান্টেজ, রাত্রে গরমে হাঁসফাঁস করতে হতোনা অন্যদের মতো, পাট্টির ঘরের এসির ঠান্ডা বাতাস এসে যেতো আমাদের ঘরেও)। আমার রুম মেট  ছিল স্মৃতি, ও ভুবনেশ্বরের মেয়ে, আই আই টি লাইব্রেরিতে ইন্টার্নশিপ করছিল তখন। ঘর ও থাকার ব্যবস্থা দেখেই আমি প্রায় কাঁদো কাঁদো হয়ে অন্য পিজিতে খোঁজ নিলাম। তবে কোথাও আর থাকার জায়গা না পাওয়ার জন্য এখানেই আগামী আড়াই মাস থাকার জন্য নিজের মনকে বোঝালাম।
বেলার দিকে তারপরে হেঁটে হেঁটে (মিনিট দশেক লাগত) গেলাম আই আই টি। ঢুকেই তো একটা অদ্ভুত রকমের মনের ভাব হল । এই তাহলে সেই বিখ্যাত জায়গা, যেখানে নাকি সব জ্ঞানের ভাণ্ডাররা থাকে, ইত্যাদি ইত্যাদি (এই একই অবস্থা হত যখন ক্যাম্পাস বাসে চেপে ডিপার্টমেন্ট যেতাম। সহযাত্রীদের দেখে ভাবতাম, এরাই তাহলে দেশের ব্রেনিয়েস্ট অফ দা ব্রেনি? সত্যি বলছি, খুব সৌভাগ্যবতী লাগত নিজেকে, এদের সাথে একসাথে কাজ করছি বলে। পরে অবশ্য বুঝলাম এসব কিছুই না।)। লোকজনকে জিজ্ঞেস করে টরে তারপরে ক্যাম্পাস বাসে করে পৌঁছলাম আমার ডিপার্টমেন্টে।  পরিচয় পর্ব করে স্যারের সাথে কথাবার্তা বলে কাজ কর্ম বুঝে নিলাম। বাবা চেন্নাইতে ছিল আমার পরীক্ষার দিন অবধি। তারপরে ফিরে গেল কলকাতা। আমি প্রথম, বাড়ি থেকে এত দূরে, সম্পূর্ণ অচেনা জায়গায় এক্কেবারে একা। সকাল সাড়ে আটটার মধ্যে পিজি থেকে ভাত সাম্বার আর সবজি, টক দই খেয়ে বেরিয়ে পড়তাম। পিজিতে একটা রান্না করার আক্কা (দিদিকে তামিল ভাষায় আক্কা আর দাদাকে আন্না বলে। বোনাস তথ্য দিই, ভাইকে তাম্বি আর বোনকে তাঙ্গাচ্ছি ডাকে। তবে দুই ক্ষেত্রেই ত এর উচ্চারণটা ত আর থ এর মাঝে।) সকাল ছটায় এসে রেঁধে যেত সারাদিনের খাবার। ব্রেকফাস্টের জন্য বেশিরভাগ দিন থাকত ইডলি বা পোঙ্গাল আর চাটনি। আর দুপুরের খাবারের ভাত তরকারি সাম্বার রসম আর দই। পিজির অন্যান্য মেয়েরা টিফিন কেরিয়ারে গুছিয়ে ভাত ডাল নিয়ে গেলেও আমার কখনোই তা করা হয়ে ওঠেনি। গোটা স্কুল কলেজ লাইফ সকালে ভাত খেয়ে দুপুরে হাল্কা টিফিন নেওয়ার অভ্যেস এখানেও কায়েম রইল। চেন্নাইতে দেখেছি, সকলে দুপুরের খাবারটা খুব গুছিয়ে প্যাক করে আনে। তারপরে লাঞ্চ টাইমে সব নিজের নিজের ফ্রেন্ড সারকেলের সাথে বসে এরটা ওরটা শেয়ার করে খায়। অবশ্য সকলেরই লাঞ্চ বক্সে তো ওই এক সাম্বার রসম আর কুরমা। আমার এক সিনিয়র দিদি ডে স্কলার ছিল, ও ও বাড়ি থেকে খাবার আনত, ওর সাথে সাথে আমিও লাঞ্চ রুমে গিয়ে বসতাম প্রথম প্রথম। একসাথে মিলে মিশে খেতাম। আমি ইডলি খেতে খুব ভালোবাসি, কিন্তু সাথের নারকেল চাটনিটা অতক্ষণে নষ্ট হয়ে যেত বলে খেতে পারতাম না। সেই দিনগুলো অন্যদের থেকে সাম্বার নিয়ে খেতাম। এমনি একদিন একজন আক্কা নিয়ে এসছে চাউমিন। বেশ সুন্দর ব্রোকলি দিয়ে বানানো। সবাইকে দিয়ে খাচ্ছে। আমার পাশে বসা একটি মেয়েকে পরিষ্কার দেখলাম সাম্বার ঢেলে সেই চাউমিন খেলো। ব্যস, আর খুব একটা ওই গ্রুপে বসতাম না।   নানান অছিলায় দেরীতে খেতে যেতাম। আমার মা তখনো অফিস যায়, ওই সময়টা তাই মা কে মিসড কল দিতাম। তারপরে মা ফোন করলে একসাথে দুজনে গল্প করতে করতে খেতাম। সারাদিনের যাবতীয় গল্প করার তখন সময়। কে কী বলল, কী খেলাম, কোথায় গেলাম সব আলোচনা তখন হত। তখন বিকেল হলে ক্যাম্পাসেই গুরুনাথ বলে একটি চত্ত্বর আছে, সেখানে নানান জ্যুস, চাট, ইত্যাদি পাওয়া যায়, ওখানে চলে যেতাম জ্যুস খেতে। ওইখানে প্রচুর হরিণের ঘোরাঘুরি তখন। আসলে আই আই টি মাদ্রাস ক্যাম্পাসটি গিন্ডি ন্যাশনাল পার্কের একটা অংশ কেটে বানানো। তাই প্রচুর হরিণ, বাঁদর, শিয়াল, নানান প্রজাতির পাখি, সাপ বেজি পোকামাকড়ের আড্ডা। আমার হাত থেকে নিয়ে ওই হরিণগুলো কেমন করে আমার হাত থেকে তরমুজ খেতো, সেইসব গল্প মা কে বলার জন্য মুখিয়ে থাকতাম!
যে আমি কোনদিনও বাবা মা কে ছেড়ে এক রাতও কাটাইনি, দিব্যি কিরকম চেন্নাইতে এডজাস্ট করে ফেলেছিলাম, আসলে তার পিছনে কিছু কারণ ছিল। প্রথমত, জানতাম যে মোটে দশ সপ্তাহের ব্যাপার, এরপরে তো ঠিক ফেরত আসব বাড়ি। দ্বিতীয়ত, শাসনের বাইরে। আনলিমিটেড ফ্রী হাই স্পীড ইন্টারনেট (তখনও মোবাইল ইন্টারনেটের এই এখনকার মতো রেভোলিউশন আসেনি, ডেটার অনেক খরচা), প্রচুর সিনেমা ডাউনলোড করে নিতাম। মনে আছে ওই আড়াই মাসে প্রায় একশো জিবি ব্লু রে কোয়ালিটির প্রিন্টের সিনেমা নামিয়েছিলাম। ক্যাম্পাসের স্টুডেন্টরাই একটা রিপোসিটরি মতো মেইন্টেইন করে। যা চাই, তাই পাই আর কী। তাই মনের সুখে রাত জেগে সিনেমা দেখা, বই পড়া, ফেসবুকে গল্প করা, গেম খেলা, সব চলত চুটিয়ে। ল্যাবেও খুব উপভোগ করতাম সকলের সাথে। কাজের ফাঁকে ফাঁকে একসাথে হইহই করে মাঝে মাঝে বিকেলে মাঠে খেলাধুলো করা, চা খেতে যাওয়া, স্যারের বাড়ি গিয়ে ওনার স্ত্রী আর মেয়ের সাথে গল্প করা...দারুন অভিজ্ঞতা।
আমার ল্যাবে দুইজন বাঙালি ছিল, দেবস্তুতি দি আর দিব্যেন্দু। দিদি বেশিরভাগ সময়ে পড়াশোনা কাজেকর্মে ব্যস্ত থাকত, তাই বেশিরভাগ গল্প আড্ডা যা হত, তা ওই ভাই মানে দিব্যেন্দুর সাথে। ক্যাম্পাসে কোথায় গেলে ভালো খাবার পাওয়া যায় যা খেলে ওই রোজের সাম্বার আর রসমের থেকে মুক্তি পাবো, তার হদিস পেতাম ভাইয়ের কাছেই। পি এইচ ডি এন্ট্রান্সের রেজাল্ট বেরোল যেদিন, দেখলাম ওয়েট লিস্টে নাম। যদিও এসেছিলাম একগুঁয়ে মনোভাব নিয়ে যে কিছুতেই রিসার্চে আসবনা, কেন জানিনা, ওই রেজাল্ট দেখে সাঙ্ঘাতিক মন খারাপ করেছিল। সেদিন মন ভালো করতে ভাই নিয়ে যায় সুপ্রিয়া বিরিয়ানি নামক একটি দোকানে। আমাদের ক্যাম্পাসের একটা গেট দিয়ে বেরোলেই উল্টোদিকেই। অন্ধ্র স্টাইলের বিরিয়ানি, বেশ ঝাল ঝাল, সাথে বালতি করে রায়তা আর বেগুন/টমেটোর কারি দেওয়া। সেইদিন থেকে আজ অবধি ওই রায়তা আমার খুবই পছন্দের, এখন তো এমনও হয় যে রায়তা খাব বলে বিরিয়ানি অর্ডার করি, অন্য কাউকে বিরিয়ানিটা খাইয়ে দিই।
যখন এসেছিলাম এখানে, তার মাসখানেক আগে রোহিতের সাথে দেখা করে কিছু বিগিনারস টিপ্স জেনে নিয়েছিলাম, তার মধ্যে ছিল যে যে কোন ইংরেজি শব্দের শেষে আ-কার যোগ করলেই নাকি তামিল ভাষীদের সাথে সহজেই কথা বলতে পারব। উদাহরণ দিই, জেরক্স করতে হবে, দোকানে গিয়ে জেরক্সা বললেই লোকে বুঝবে। আমার স্যার আমায় বলেছিলেন যে ভাঙ্গা ইংরেজি বললে মোটামুটি কাজ চালানো যাবে। আমিও এই দুই রকম পদ্ধতি দিয়ে আর সব জায়গায় কাজ চালাতে পারলেও আসল অসুবিধে হত পিজিতে ফিরে। পাট্টি তামিল ছাড়া বোঝেন না, আমি এক লাইনও তামিল বলতে পারিনা। রীতিমতো হাত নেড়ে নেড়ে আন্দাজে কথা চালাতাম। মূকাভিনয় করা যে কতটা কঠিন, সেটা আমি বুঝেছিলাম ওই দিনগুলিতে। হাজার চেষ্টা করেও পারতাম না যখন, তখন দিব্যি বাংলায় কথা বলতাম। তাতে হত কি, অঙ্গভঙ্গীগুলো বেশ সহজেই হয়ে যেতো। পাট্টির কিচেনেই আমি নিজের ইচ্ছেমতো টুকটাক রান্নাবান্না করতাম। ওখানে কয়েকদিন মাছও খেয়েছি, কিন্তু রান্নার স্টাইল পছন্দ হতনা। তাই একদিন করলাম কী, স্পেন্সারস গিয়ে এক কেজির রুই মাছ কাটিয়ে কিনে আনলাম। এক কেজি ওজন ছিল পুরো মাছটার, আর ওখানে গোটা ছাড়া মাছ বিক্রি হত না, তাই পিজির বাকি মেয়েরা নিরামিষাশী হলেও আমায় গোটাটাই কিনতে হল। দোকানদার আবার আমায় জিজ্ঞেস করছেন, "এটা কে রুই মাছ বলে, জানেন তো?"  আ মলো যা! বাঙ্গালিকে নাকি এসছেন উনি মাছ চেনাতে। যত্তসব। কোনদিনও বাড়িতে থাকাকালীন মাছ রান্না করিনি, কিন্তু মাকে দেখতাম তো রাঁধতে, আর টিভিতেও কুকারি শোগুলি আমার প্রিয়, তাই দিব্যি ম্যানেজ করে দেখলাম মাছের ঝোল রেঁধে ফেললাম। ফ্রিজে রেখে প্রায় দিন চারেক দুইবেলা মাছের ঝোল ভাত খেয়েছি।  ল্যাবের দুই দিদির জন্য একদিন টিফিন বক্সে করে নিয়ে গিয়েছিলাম, ওরাও খুব খুশি হয়েছিল। চেন্নাইতে বসে, দুপুরবেলা, তাও মেসে বসে ভাতের সাথে মাছের ঝোল, এ যেন কল্পনাতীত। অবশ্য আজকাল দিনকাল পালটেছে। বিভিন্ন অপশন এখন বাঙালি মাছভাত খাওয়ার আর নানান অ্যাপ আছে বলে ডেলিভারি সিস্টেমও দারুণ।  সেইসব গল্প অন্য কোন পর্বে বলব।
রোহিতের থেকে শুনেছিলাম যে বেসন্ত নগর বিচটা আমাদের ক্যাম্পাস থেকে সবথেকে কাছে। যদিও তখন হাতে স্মারটফোন আছে, তাও কেন জানিনা সেইসবের তোয়াক্কা না করে একদিন নিজে নিজে বিকেলবেলা বেরোলাম হাঁটা লাগিয়ে। উদ্দেশ্য বিচে যাওয়া। সে তো আমি হেঁটেই চলেছি, হেঁটেই চলেছি। রাস্তায় বড় করে এরো দিয়ে লেখা বেসন্ত নগর, কিন্তু তার আর দেখা পাইনা। রাস্তার ধারে পড়ে থাকা বালির কণা দেখে নিজেকে সান্ত্বনা দিচ্ছি, বালি দেখা গিয়েছে যখন, তখন জলও নিশ্চয়ই দেখতে পাবো এবারে! ভাগ্যিস সন্ধ্যের অন্ধকার ঘনিয়ে আসছিল, তাই সেই যাত্রায় ফেরত আসি পিজিতে। (পরে জেনেছিলাম যে আদৌ বিচ যাওয়ার রাস্তা মোটেই ওটা না।) আসলে আমার রাস্তাঘাটের ডিরেকশন সেন্সটা অত্যন্ত খারাপ, তাই দিকভ্রান্তের মতো হেঁটে বেরানো যে কী ভয়ানক পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে, তা নিশ্চয়ই বুঝছেন। আমার এই কান্ডকারখানার কথা শুনে আমার বান্ধবী পায়েল দায়িত্ব নেয় আমায় সমুদ্র দেখানোর। পায়েল আমার সাথে স্কুল লাইফে ট্যুশানে পড়ত, তখন চেন্নাইতে টি সি এসে চাকরি করছিল। খুব দূরে থাকত না আমার ক্যাম্পাস থেকে, একটা রবিবার দেখে ও এলো আর আমায় নিয়ে বিচে গেলো, তিরুভন্ম্যুর বিচ। কী ঝকঝকে তকতকে পরিষ্কার বালি, চোখের সামনে দিগন্ত বিস্তৃত নীল সমুদ্র দেখে আমি মুগ্ধ। সেদিন আকাশে ঘন মেঘ করে বৃষ্টিও হয়েছিল অল্প। পায়েলের ফোনে দারুণ দারুণ ছবি তোলা হয়েছিল। ওর সাথে তারপরে ডিনার সেরে বাড়ি ফিরি। চেন্নাই যাওয়ার আগে দিদি বলে দিয়েছিল (আজ্ঞে হ্যাঁ, আমি হোমওয়ার্ক করেই যাই সরবত্র, যথাসাধ্য) একটি রেস্টুরেন্টের নাম, সেখানেই আমরা খেলাম। কী অসাধারণ চাইনিজ ক্যুজিন। আহা!
সপ্তাহখানেক পরে আমার রুম মেট আমায় নিয়ে বেসন্ত নগর বিচ ঘুরিয়ে আনে। ওর সাথে তারপরে সেদিন একটি গয়নার দোকানেও গিয়েছিলাম, ওর আংটি কেনার ছিল। দোকানে ঢুকে আমি হতবাক। বলে কী? বিভিন্ন ক্যাটেগোরির কাউন্টার, কোথাও ৫গ্রামের হার তো কোথাও ১০০গ্রামের হার। সেইগুলি দেখে সত্যি বলছি, নারকেল দড়ির কথা মনে হয়েছিল! আমি আর মা এখনো একটু মোটা চেনের কথা উঠলেই নারকেল দড়ির উদাহরণ দিই। এখানে নাকি বিয়েতে মঙ্গলসূত্রের জায়গায় এরকম মোটা সোনার চেইন পরানো হয়, চোরের বাড়িতেও অঢেল সোনা। তাই চুরি ছিন্তাই অনেকটাই কম চেন্নাইতে। ইদানীং ভিন রাজ্য থেকে বেশ কিছু মানুষজনের আগমন ঘটায় অবশ্য ক্রাইম রেট একটু হলেও বেড়ে গিয়েছে।
এইসব করতে করতে কখন যে আড়াই মাস কেটে গেল, বুঝেই উঠিনি। শুধু শেষ দশদিন কাজ নিয়ে প্রচন্ড চাপে ছিলাম, প্রেজেন্টেশন ভালো করে দিয়ে ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ল। বাবা চলে এলো চেন্নাই, আমাদের ফেরার দিন এসে গেল। তখনো ওয়েট লিস্টেই আছি, এদিকে স্যার পুরোপুরি মোটিভেট করে পি এইচ ডি জয়েন করার জন্য রাজী করিয়ে দিয়েছেন (এদিকে হাতে অফার নেই কিন্তু! আবার নেক্সট চান্স সেই ডিসেম্বরের সেমেস্টারের ইন্টার্ভিউ)। স্টেট ব্যাঙ্কের পি ও পরীক্ষার ইন্টারভ্যু স্কিপ করেছি, ইউ বি আইয়ে ক্লারকশিপের অফার লেটার রিজেক্ট করেছি। মন টানছে মাদ্রাসে। জানিনা ফিরব কবে, ফিরলেও কতদিনের জন্য। ফেরত গিয়েই রাজাবাজারে ফাইনাল পরীক্ষা। সব মিলিয়ে বিতিকিচ্ছিরি অবস্থা। যেই পিজিতে প্রথম দিনই ভেবেছিলাম যে থাকব না, অন্যত্র জায়গা খুঁজব, যেই ল্যাব, যেই রিসার্চ জীবন নিয়ে প্রথম থেকে ধোঁয়াশার মধ্যে ছিলাম, হঠাৎ করেই যেন সবাই ভীষণ বেশী করে টানতে লাগল। ফেরার দিন প্রায় কাঁদো কাঁদো অবস্থায় ট্রেনে চাপলাম।
এইভাবেই মিটল আমার চেন্নাইতে হানিমুন পর্ব। আবার ফিরব অগস্টের মাঝামাঝি, প্রোজেক্টে। এই মর্মে ছাড়া পেলাম ল্যাব থেকে। তখন শুরু হবে আরেকপ্রস্থ লড়াই। একটা নতুন জীবন। নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ।