Thursday, January 18, 2018

আমার চোখে রাজস্থান পর্ব ৫ (পুষ্কর ও আজমের)

আলো ফোটেনি, এমন অবস্থাতেই আমরা জয়পুর থেকে রওনা দিলাম পুষ্করের উদ্দেশ্যে। ঘুম ঘুম চোখে জানলার ধারে চাদর দিয়ে মাথা ঢেকেঢুকে, যা ঠাণ্ডা। কানে চলছে গান, চোখে রাত্রের কোটার বাকি ঘুম। বাস চলছে মেওয়ারের রাস্তা বেয়ে। এগারোটার দিকে জানলার বাইরে দিয়ে উট চোখে পড়তে লাগল। কিছু এমনিই বুনো উট, কিছু পোশ্য, সাজিয়ে গুছিয়ে রাখা। বুঝলাম, পুষ্কর পৌঁছলাম। আসলে পুষ্কর মানেই জানি ক্যামেল ফেয়ার। কার্ত্তিক মাসের পূর্ণিমা অবধি চলে, প্রতি বছর। তখন সাড়া দেশ থেকে, এমন কি বিদেশ থেকেও লোকজন ভিড় করে এই পুষ্করে। ছবি তোলার জন্য এক্কেবারে পারফেক্ট। বিভিন্ন ম্যাগাজিনে ছবি দেখেই পুষ্করের সাথে আমার পরিচয়। তবে এছাড়াও পুষ্করে যে দেখার মধ্যে হ্রদ আর মন্দির আছে, সেই বিষয়ে আমার তেমন ধারণা ছিলনা। ট্রাভেল এজেন্সির আইটিনারি দেখে তবে জেনেছি।
প্রত্যেকবার কোথাও বেড়াতে গেলে আগে সেই জায়গার ওপর বেশ অনেক পড়াশোনা করে যাওয়ার চেষ্টা করি। দুর্ভাগ্যবশত এই ট্রিপে তা করতে পারিনি। এক তো সময়ের অভাব ছিল। দুই, ভেবেছিলাম আশা করে থাকব, এই দেখবো, সেই দেখবো, অথচ তারপরে ট্রাভেল এজেন্সি বলে আদ্ধেক জিনিসই বাদের তালিকায় চলে যাবে, তখন মন খারাপ হবে। তাই প্রতিদিন রাত্রে পরেরদিনের জায়গাটি সম্বন্ধে নেটে অল্প করে পড়ে রাখতাম। সেইরকমই জেনেছিলাম, পুষ্করের হ্রদ নাকি বিখ্যাত পুণ্যস্থান। ওই হ্রদের জলের বুঝি ঔষধি গুণ আছে। সেই জল স্পর্শ করলে মানুষের চর্মরোগ সেরে যায়। দেশের বিভিন্ন প্রান্তও থেকে তাই লোকেরা এই হ্রদে আসে, পুণ্যস্নান করতে। কাছেই ব্রহ্মার মন্দির। সারা পৃথিবীতে নাকি আর কোথাও ব্রহ্মার মন্দির নেই।
পারকিং লটে বাস থেকে নেমে বেশ কিছুটা হেঁটে যেতে হল। শুরুতে বালি বালি রাস্তাঘাট। উটেরা সারি দিয়ে বসে আছে। কোন কোন গুলোর দিকে তাকিয়ে মায়া হল। কিছু উটমালিক আমাদের ধরাধরি করতে লাগলেন, ক্যামেল সাফারির জন্য। প্রত্যেককেই মানা করে দিলাম। জয়সালমেরে এমনিই আমাদের প্রোগ্রামে ঠিক করা আছে ক্যামেল সাফারি। হেঁটে যখন মন্দিরের কাছাকাছি পৌঁছে যাচ্ছি, তখন শুনলাম যে আর জুতো পরে যাওয়া যাবেনা। মন্দিরে জুতো চল্বেনা, সেটা যেমন স্বাভাবিক, ঠিক তেমনি অদ্ভুত লাগল যে তা বলে এত আগে থেকে কেন জুতো ছাড়তে হবে। জুতো রাখার জন্য দোকানগুলো জোরাজুরি করছিল। জুতো রাখতে দেওয়া যাবে যদি পুজোর ডালা ওদের থেকে কেনা হয়। আমি খুব বেশী মন্দির দর্শনে উৎসাহী থাকিনা সচরাচর। তা ছাড়া সেখানে যদি শুনি এরকম খুব ভিড়, তাহলে তো কথাই নেই। বাইরে থেকে, দূর থেকে নমস্কার করে চলে আসব। আমার বাবা আর কাকাও ওরকম। আমরা তিনজন মন্দির গেলাম না। মা গেলো বাকিদের সাথে। ইতিমধ্যে আমরা তিনজন হাঁটা লাগালাম হ্রদের দিকে। রাস্তা জুড়ে দুইদিকে দোকানীরা পসরা সাজিয়ে বসেছে। কত রঙ, কত হস্তশিল্প। দাঁড়িয়ে দেখে মুগ্ধ হতে হয়। কোথাও উটের প্রতিকৃতি তো কোথাও হাতি। কাঁচের কাজ করা ব্যাগ। মাটির ওপর নানান রঙের কাজের ওয়াল হ্যানগিং। কাপড়ের পুতুল। শাড়ি। জামা। সব মিলিয়ে জমজমাট।  একটু দরদাম করলাম পছন্দের জিনিসের। কিন্তু মা সাথে না থাকায় সাহস করে কিনলাম না। হ্রদে পৌঁছে দেখি মোটামুটি ভিড়। লোকজন ঘাটে বসে পুজো করছেন, স্নান করছেন। কিন্তু জলের যা অবস্থা দেখলাম, মনে হল যে এই জলে স্নান করলে চর্মরোগ তো সারবেই না, উল্টে নতুন করে হয়ে যাবে। পুষ্করিণীর জলের সংস্করণ চলছে শুনলাম, কী জানি, কিছু তো বুঝলাম না। এমনি বেশ সুন্দর, অনেকটা বড়, হ্রদ। চারপাশে পাহাড় ঘেরা। দেখতে ভালো। কিন্তু ঘাট বড্ড পিছল। খানিকক্ষণ ঘাটে দাঁড়িয়ে চারিদিক দেখতে দেখতে মায়েরা এলো। পুজোর প্রসাদ মুখে দিয়ে তারপরে ফেরত চললাম বাসের দিকে। পথে দোকানগুলোতে ঢুঁ মেরে চলল অল্পবিস্তর কেনাকাটি। সাবিত্রী মাতার মন্দির অনেক উঁচুতে থাকায় কেউই যায়নি।
পুষ্কর হয়ে তারপরে বাস চলল আজমেরের পথে। আজমের শহরটি তো আজমের শরিফ দরগার জন্য বিশ্ববিখ্যাত। পৃথিবীর নানা জায়গা থেকে মানুষ আসেন, বিভিন্ন ধর্মাবলম্বীরা মাথা ঠেকায়, চাদর চড়ায় এখানে। পথে চোখে পড়ল বিশাল আনা সাগর লেকের। হোটেলে পৌঁছে স্নান সেরে খেয়ে একটু বিশ্রাম নিয়ে বেরোনোর কথা দরগায়। দুপুরের খাবার রেডি হতে দেরি হছহিল বলে পাশেই থাকা একটু মিষ্টির দোকান থেকে গরম গরম গোলাপ জাম মিষ্টি খেলাম। আহ, কী অপূর্ব সে স্বাদ। ঘিয়ে ভাজা মিষ্টি। রাজস্থান জুড়ে নানান জায়গায় বেশ সুন্দর সুন্দর সুস্বাদু অনেক মিষ্টি খেয়েছি। কিন্তু ক্যালোরি কনশাস হলেই শেষ!
দরগা অঞ্চলে খুব ভিড় হয়, আর তার সাথে সাথে নাকি পকেটমারির খুব প্রকোপ। তাই ম্যানেজার কাকু বললেন ক্যামেরা বা ফোন সাথে না নিয়ে যাওয়াই ভালো। (যদিও ওইদিন একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ফোন আসার কথা ছিল আমার, তাই আমি ফোন নিয়ে বেরিয়েছিলাম। আর তাই অল্প হলেও কয়েকটা ছবি তুলেছি।)  আর টাকাও খুব কম রাখতে। এই একটা আফসোস আমার রয়ে গেল। দরগার সামনের রাস্তা জুড়ে যে বাজার বসে, সেখানে এত অভাবনীয় কম দামে এত বিচিত্র পসরা, ভাবা যায় না। কি সস্তা কি সস্তা! সাথে পর্যাপ্ত টাকা ছিল না বলে বড় মিস করলাম এই শপিঙের চান্স।
দরগায় আমরা চাদর চড়াইনি। শুধু ফুল দিয়ে শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করেছিলাম। দরগাটি বেশ একটা বড় কম্পাউন্ডের মধ্যে। অনেকগুলি সাদা মার্বেলের বিল্ডিং। একটি মসজিদ রয়েছে। গেটে উর্দুতে ঈশ্বরচেতনার (ঈশ্বর কি বলা চলবে? জানিনা) বাণী লিপিবদ্ধ। খাদিম যিনি ছিলেন ভিতরে, এত দরদ দিয়ে আন্তরিকভাবে দুয়া পড়লেন আমাদের জন্য, মনের মধ্যে একটা অদ্ভুত প্রশান্তি এসে গেল। সেই সম্রাট আকবরের আমল থেকে শুরু করে আজও লোকের ঢল নামে এখানে। এতটাই জাগ্রত এই দরগা। এখানে মাথা ঠেকাতে পেরে ভালো লেগেছিল খুব।
দরগার পর আমরা যাই আনা সাগর লেকে। পৃথ্বীরাজ চৌহানের ঠাকুরদার তৈরি করা এই লেক। তেরো কিলোমিটার লম্বা এই লেক। শহরের জলের কষ্ট নিবারণ করতেই বানানো এটি। বিশাল জায়গা জুড়ে, পাশে সুন্দর পার্ক বানিয়ে সাজিয়ে গুছিয়ে রাখা। মোঘল সম্রাট শাহ জাহান ও জাহাঙ্গীরের তৈরি এই ধারের বারাদারি আর ঘট। যতক্ষণে আমরা আনা সাগরে পৌঁছই, সূর্যাস্তের সময় এসে গিয়েছে। দিগন্তবিস্তৃত আকাশ তখন লালের ছটায় রঙিন। তার ব্যাকড্রপে দেখছি দিনের শেষে সমস্ত পাখিরা ঘরে ফিরছে। সে এক মায়াবী দৃশ্য।
আমাদেরও এদিনের মত এবার ঘরে ফেরার পালা। আগামীকাল উদয়পুর যাবো। চিতোরগড় হয়ে। রাণী পদ্মিনীর গল্প শুনে বড় হওয়া। পদ্মাবতী সিনেমার ট্রেলার গান শুনে সেই উৎসাহ আরো বেড়ে যাওয়া। সব মিলিয়ে, মন উসখুস। কতক্ষণে পৌছব চিতোর।

Tuesday, January 16, 2018

আমার চোখে রাজস্থান পর্ব ৪ (জয়পুর)

খাম্মা ঘানি! কাল অনেক রাত্রে জয়পুরে পৌঁছলাম তো, তখন আর মাথা কাজ করছিল না। তাই এই রাজস্থানি সম্ভাষণটা করা হয়ে ওঠেনি। এখন করলাম। আজ অর্থাৎ ২৬শে ডিসেম্বর আমাদের সারাদিন জয়পুর সিটি সাইটসিইং করার কথা। হিসেব মত পঁচিশ তারিখটা আমাদের সন্ধ্যেবেলা ফ্রি থাকার কথা ছিল। মোটামুটি যত রিসোর্স আছে, সব কাজে লাগিয়ে ভালো শপিঙের জায়গার হদিস নিয়ে এসছিলাম। প্ল্যান ছিল ওইদিন ফাঁকা সময়টা শপিঙে কাজে লাগানো যাবে। তবে বাসের অনুপস্থিতি সব ভেস্তে দিল। কিন্তু নো চিন্তা! মৃত্যুঞ্জয় কাকুর থেকে গোটা দিনের একটা রাফ শিডিউল জেনে নিয়ে ঠিক করলাম, লাস্ট স্পট থেকে একটা ওলা বা উবার নিয়ে বাপু বাজার চলে যাব (এই প্রসঙ্গে বলে রাখি, জয়পুর ছাড়াও বাপু বাজার আছে উদয়পুরে। দুটোই খুব বিখ্যাত।)। পারলে বিকেল বিকেল। কারণ সাতটা সাড়ে সাতটার মধ্যে দোকান বাজার বন্ধ হয়ে যায়।
ব্রেকফাস্ট করার আগে চলল আমাদের হোটেলে একপ্রস্থ ফটোশুট। হোটেলটি রাজপুত ডাক্তার পরিবারের পৈত্রিক বাড়ি। কিছু অংশে পরিবারের লোকজন এখনো থাকেন, আর বাকিটা হেরিটেজ হোটেল হিসেবে চলে। রাজকীয় ব্যবস্থাপনা। প্রতিটিঘরের অন্দরসজ্জা যেমন খুবই রুচিসম্পন্ন, তেমনি প্রতিটি ফ্লোরের লিভিং স্পেস, রিডিং রুম, সমানভাবে সাজানো। একতলায় ড্রয়িং রুমে গতকাল রাত্রেই চোখে পড়েছিল সেনটার টেবিলটি, ওটির পায়া আসলে একটি বাঘিনী। আরেকটি ছিল, সেটি আবার উটের ওপর ভর করা। বিভিন্ন কাঠের মূর্তি, অমূল্য পেইন্টিং, সিলিঙে অনন্য কারুকার্য, হাল্কা লাইটিং, সব মিলিয়ে ছবি তোলার জন্য যাকে বলে পারফেক্ট। বেরোনোর মুখে আরেক প্রস্থ বাস সমস্যা শুরু হল। যে নতুন বাসটি আসার কথা ছিল, সেটি তখনো রেডি না বলে আবার নানান মনোমালিন্য ইত্যাদি ইত্যাদির পর রওনা দেওয়া হল। আমরা চারজন বাসের পিছনের সিট নিয়েছিলাম। বেশ খেলে ছড়িয়ে বসা যায়। ক্যামেরা হাতে আমার জায়গা ছিল জানলার ধারে। পুরনো জয়পুরের রাস্তা দিয়ে আমাদের প্রথম গন্তব্য যন্তর মন্তর। অবশ্য পথে যেতে যেতে প্রথমেই আমাদের ডানদিকে দেখিয়ে দেওয়া হল রাজমন্দির সিনেমা হল। এই সিনেমা হলটির বৈশিষ্ট্য বলতে খুব সুন্দর করে সাজিয়ে রাখা নাকি ভিতরে। বাইরে থেকেও বেশ একধরণের ফরাসী মিষ্টির মত দেখতে। সময়ের অভাবে আর ভিতরে যাওয়া হয়নি। অনেক ট্যুরিস্ট এখানে সিনেমা দেখেন। আমার বাবা ১৯৯৭ সালে যখন জয়পুর এসেছিল, তখন সদ্য মুক্তিপ্রাপ্ত জুড়ওয়া সিনেমাটি দেখেছিল এখানে।
এরপরই আমাদের পথে পড়ল জয়পুরের বিখ্যাত হাওয়া মহল। আমাদের বাঁ দিকে। পরে ভিতরে এক্সপ্লোর করা হবে। তখন শুধুমাত্র বাইরে থেকে দেখে নেওয়া হল। জয়পুর বললে ছোট থেকে যা বুঝি, তা কিন্তু হাওয়া মহল। বিরাট একটা গোলাপী স্থাপত্য, অনেকটা মৌমাছিদের বাসার মত। বাসটা ওই জায়গায় ট্রাফিকের জন্য এমনিই আস্তে চলছিল, তাই ওই বিরাট ফ্যাকেডের ছবি তুলতে অসুবিধে হয়নি। "পিঙ্ক সিটি"র রাস্তায় এরপর দেখলাম লাইন দিয়ে গোলাপী রঙের বাড়ি, বিভিন্ন দোকান। অনেকটা আমাদের ধর্মতলা নিউ মার্কেট চত্বরের মত। সারি দিয়ে শুধুই দোকান। ওই সকালে তখনো দোকানগুলি খোলেনি। গোলাপী রঙটা ঠিক আমাদের পরিচিত গোলাপী বলা যায় না। খানিকটা যেন কমলা মিশিয়ে দেওয়া। তবে প্রতিটি দেওয়ালে ওই গোলাপীর ওপর খুব নিখুঁত ভাবে সাদা দিয়ে বর্ডার এঁকে আলপনা দেওয়া। দেখতে বেশ ভালো লাগছিল।
যন্তর মন্তরে পৌঁছলাম। পারকিং থেকে স্পটে যাওয়ার পথে দেখলাম অনেক দানা বিক্রি হচ্ছে। লোকে কিনে কিনে পায়রাদের খাওয়াচ্ছে। রাজস্থানিরা মনে করেন যে এতে পুণ্য হয়। গোটা রাজস্থান জুড়েই খুব দেখেছি এই ব্যাপারটা। আরেকটা জিনিস যেটা লক্ষ্য করলাম, সমস্ত ট্যুরিস্ট স্পটের ধারেকাছেই ভর্তি হকার, রঙ বেরঙের পসরা সাজিয়ে। মাথার পাগড়ি থেকে শুরু করে চাবির রিং, জামা, ঘর সাজানোর জন্য ছোট ছোট মূর্তি, ওয়াল হ্যানগিং, ইত্যাদি। ওই রঙ দেখলেই মন ভালো হয়ে যায়। অনেকে বলেন যে রাজস্থান রুক্ষ, মরুভূমির দেশ। তাই মানুষজন পোশাকে রঙের খুব ব্যবহার করেন মন মেজাজ ভালো রাখতে। এই প্রসঙ্গে বলি, রাজস্থান মূলত দুই ভাগে বিভক্তঃ মেওয়ার ও মাড়োওয়ার। মেওয়ার দিব্যি সবুজ, চাষ হয়, অনেক গাছপালা আছে। জয়পুর উদয়পুর চিতোর সব মেওয়ারে। মাড়োওয়ার বালির জায়গা। যোধপুর জয়সালমের। যাই হোক, যা বলতে গিয়ে এতগুলো কথা বলে ফেললাম। সেই দোকানিদের থেকে দরদাম করে বেশ একটা হলুদ লাল সবুজ মেশানো পাগড়ি কিনে ফেললাম।
যন্তর মন্তরে ঢুকে দেখলাম দেখলাম এবং আশ্চর্য হলাম (যারা দিল্লীতে যন্তর মন্তর ঘুরেছেন, শুনেছি সেটা নাকি আরো মনোগ্রাহী)। নিজে ইঞ্জিনিয়ারিং সায়েন্সের স্টুডেন্ট বলেই যেন ওই প্রাচীন যুগে ভারতীয়দের টেকনলজিকাল এডভান্সমেন্টের এই দারুণ নিদর্শন দেখে বেশ একটা গর্ববোধ করছিলাম। আজকের যুগে দাঁড়িয়ে হয়তো ওই যন্ত্রগুলির কোনটারই তেমনভাবে কোন প্রয়োজনীয়তা নেই, কিন্তু সেই আমলে এস্ট্রোনমি চর্চার জন্য যে এমন সব যন্ত্র বানানো হয়েছিল সাওাই জয় সিং দ্বিতীয়র আমলে, তা সত্যিই কুর্নিশ যোগ্য। যন্তর মন্তরটি ইয়ুনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট হিসেবে স্বীকৃত, পৃথিবীর সর্ব বৃহৎ সানডায়ালটি এখানেই রয়েছে। যন্তর মন্তরের মূল কমপ্লেক্স থেকে সিটি প্যালেস আর দূরে নাহারগড় কেল্লা দেখা যায়। এরপরের গন্তব্য সিটি প্যালেস। তবে নাহারগড় আমাদের শিডিউলে ছিলনা। নাহারগড়ের নাম সম্ভবত সব বাঙালিরা আমরা প্রথম শুনি সোনার কেল্লা পড়তে গিয়ে (আমার তো মনে হয় বাঙালির রাজস্থান প্রীতির একটা অন্যতম কারণ সত্যজিৎ রায়, ফেলুদা।)। এইখান থেকেই ডঃ হাজরাকে ঠেলে ফেলে দেয় মন্দার বোস এন্ড কোং।
সিটি প্যালেসটিো তৈরি হয় মহারাজা জয় সিং দ্বিতীয়র আমলে। জনসংখ্যা বাড়ার কারণে আমের থেকে রাজধানী সরিয়ে যখন জয়পুরে আনা হয়, এক বাঙালি স্থপতি ছিলেন অন্যতম। জালেব চৌকের কাছে উদয়পোল দিয়ে সিটি প্যালেসে আমরা এলাম টিকিট কেটে। প্রথমেই এলাম মুবারক মহলে। এই মহলটিতে রয়েছে মিউজিয়াম। মিউজিয়ামের ভিতরে রাজা মহারাজাদের ব্যবহার করা পোশাক অস্ত্রের বিচিত্র সম্ভার। নজর কেড়েছিল সাওয়াই মাধো সিংজীর বিরাট পোশাক। মুবারাক মহলের পরে সিটি প্যালেস কমপ্লেক্সেই আমাদের পরবর্তী গন্তব্য ছিল চন্দ্র মহল। ভিতরে মিউজিয়াম ছিল, তবে যাইনি। সেই জায়গায় বাইরেটা ঘুরে ঘুরে দেখছিলাম। গোলাপী রঙের ওপর খুব সূক্ষ্ম কারুকার্য অন্য মাত্রা এনে দিয়েছিল। সিটি প্যালেসেই চোখে পড়ল দুইটি বিরাট কলসীর, স্টারলিং রুপোর তৈরি। গাইড বললেন যে ওইটি নাকি গিনেস রেকর্ড হোল্ডার। চার হাজার লিটার জল ধরবে ওতে। ভাবতেই চোখ গোল হয়ে গেল! সিটি প্যালেসে ঘুরতে ঘুরতে আমাদের দলের এক বয়স্ক মানুষ হঠাৎ বেপাত্তা হয়ে গেলেন। এদিকে তার সাথে ফোন নেই, খোঁজ খোঁজ করতে করতে অনেক পরে ওনাকে পাওয়া গেল। উনি নাকি ভিতরে অত হাঁটাহাঁটি করতে পারবেন না বলে বাইরেই ছিলেন। বোঝো কাণ্ড!

সিটি প্যালেসের পর আমাদের পরের গন্তব্য আমের ফোরট। পথে জলমহল পড়ল। দেখলাম মান সাগর হ্রদের জলের মধ্যে একটা প্রাসাদ। কথা রইলো ফেরার পথে নেমে ফটো তোলা যাবে। একটা পারকিং লটে বাস থামিয়ে ওখানেই প্যাকড লাঞ্চ খেয়ে নেওয়া হল। সামনেই ছিল সরকারী হ্যান্ডলুম হ্যান্ডিক্রাফটসের আউটলেট। আমি যত মাকে বলি যে না, আমি বাপু বাজার থেকেই কেনাকাটি করবো, মায়ের তত এক কথা। "না না, দর দাম হবেনা আমার দ্বারা, তোর দ্বারাও হয় না। বরং গভমেন্টের জিনিস, ফিক্সড প্রাইস, এখান থেকেই কিনব।" ঘুরে ফিরে কিছু কিনব না কিনব না করেও কেনাকাটি হল। দাম বেশী কি কম, বলতে পারব না। এইটুকু সান্ত্বনা যে আমি ঠকলে আর পাঁচটা লোক যারা কিনল, তারাও ঠকেছে, আমি একা না!
আমের ফোরট পৌঁছোতে প্রায় চারটে বেজে গেল। রোদ পড়ে আসছে। মাওতা লেকের ধারে বিশাল ফোরটটির গায়ে পড়ন্ত সূর্যের সোনালী আলো। ফোরটের ভিতরে যেতে গেলে বেশ খানিকটা চড়াই চড়তে হবে। ব্যাটারই চালিত গাড়ি পাওয়া যায়, বেশ মিষ্টি দেখতে। বিভিন্ন রঙের। একটা গাড়িতে পাঁচ ছয় জন অনায়াসে এঁটে যায়। তবে আমরা যতক্ষণে গেলাম স্ট্যান্ডে, স্ট্যান্ড খালি। লাইনে দাঁড়ালে ঘন্টাখানেকের আগে চান্স পাওয়া যাবেনা। কোই বাত নেহি, এগারো নম্বর গাড়ি আছে না? তার ভরসায় মিনিট পনেরো কুড়ি উঁচুতে চড়ে অবশেষে পৌঁছলাম আমের ফোরটে।রাজস্থানের বেশীরভাগ ফোরতেই মোটামুটি একই ধরণের স্ট্রাকচার। একটা বিশাল কপমাউন্ড। চারিদিকে উঁচু বাড়ি। এখানেও তাই। সিঁড়ি ভেঙ্গে উঠে আসতে আসতে গোটা কেল্লাটা ঘুরলাম। রাজার মহল, রানির মহল (সুহাগ মন্দির, যেখান থেকে রাজ পরিবারের নারীরা পর্দার আড়ালে থেকে ণিচে দিওয়ান ই আমের কর্মযজ্ঞ দেখতে পেতেন), দিওয়ান ই আম, দিওয়ান ই খাস, সব। শীষমহলে কাঁচের ওপর কারুকার্য সত্যি দেখার মতো। ট্যুরিস্ট এসে এসে নষ্ট হয়ে যাচ্ছিল বলে মূল ঘরটিতে এখন আর ঢুকতে দেওয়া হয়না। বাইরে থেকেই দেখতে হয়। আগে নাকি গাইডরা মোমবাতি জ্বালিয়ে দেখাতেন ওই মহলের সৌন্দর্য, কাঁচের ওপর আলোর রিফ্লেকশনের ছটা।
যতক্ষণে আমরা আমের ফোরট ঘুরে নীচে এলাম, ততক্ষণে সূর্যাস্ত শুরু হয়ে গিয়েছে। পশ্চিমের আকাশ এক অদ্ভুত মায়াবী লাল রঙে রঙিন। তার ব্যাকড্রপে আমের ফোরটকে কি সুন্দর যে লাগছিল, কী বলি? আমাদের বাস যতক্ষণে এসে পৌঁছল, ততক্ষণে ফোরটে আলো জ্বলে গিয়েছে। অসাধারণ দৃশ্য। এবার ফেরার পালা।
বাসে উঠতে গিয়ে আরেক বিপত্তি। আবার একজন সদস্য মিসিং। তাকে খুঁজতে খুঁজতে আরো ঘন্টাখানেক প্রায় কেটে গেলো। যা বুঝলাম, জলমহল আর দেখা যাবেনা। পরের গন্তব্য বিড়লা মন্দির। ততক্ষণে আমার শরীরের সমস্ত এনার্জি শেষ। বাপু বাজারে গিয়ে যে শপিং করব, তারও আর ইচ্ছা নেই। মা ইতিমধ্যে আমের ফোরটের গেটের উল্টোদিকের একটা দোকানে গিয়ে বেশ কিছু টুকটাক কেনাকাটি করেছিলও। আমাদের দলের অনেকেই দেখলাম মার্কেটিং করেছে। মা বলল, "থাক। আবার অন্য জায়গায় কিনব।" আমিও কিছু বললাম না। একটু মন খারাপ হল বটে। সঙ্গে সঙ্গে গুগুল খুলে দেখতে লাগলাম পরের শহরগুলিতে কোথায় ভালো কেনাকাটি করা যায়। আসলে রাজস্থান বেড়ানোর কারণগুলির অন্যতম আমার কাছে ছবি তোলা আর কেনাকাটি করা। কাজেই একটু এফোরট দিতেই হবে। বিড়লা মন্দিরে আর নামিনি। বাসে বসেই তখন নেটে উদয়পুর যোধপুরের বাজারের হাল হকিকত দেখছিলাম।
রাত্রে হোটেলে ফিরে খেয়ে দেয়ে নরম বিছানায় শুয়ে টানা ঘুম দিলাম। আহ, কী আরাম। আবার পরেরদিন সক্কাল সক্কাল বেরোনো। পুষ্কর হয়ে আজমের। সকাল সাড়ে ছটার মধ্যে লাগেজ দিয়ে দিতে হতো। সাতটায় বাস ছাড়ত। তখনও ভোরের আলো ফোটেনি। 
 

Monday, January 15, 2018

আমার চোখে রাজস্থান পর্ব ৩ (তাজ মহল)

রাত্রে ডিনার টেবিলে বসে সবাই মিলে আলোচনা করে ঠিক করা হল যে পরেরদিন সকাল সকাল তাজ মহল দেখতে যাওয়া হবে। তাজ দর্শন করে তবেই জয়পুরের উদ্দেশ্যে বেরোনো হবে। প্রথমে ঠিক ছিল ফতেহপুর সিক্রিও যাওয়া হবে, কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই পরিকল্পনা মুলতুবি রাখতে হল।
পঁচিশে ডিসেম্বর, সাংঘাতিক ভিড় হবে। এমনি দিনেই গড়ে এক দেড় ঘণ্টার লাইন পড়ে তাজ মহলে ঢুকতে, তাই সক্কাল সক্কাল ব্রেকফাস্ট সেরে আমরা চারজন একটা অটো ধরে পৌঁছে গেলাম নির্দিষ্ট গন্তব্যস্থলে। তখন সবে টিকিট কাউন্টারে লাইন পড়ব পড়ব করছে। পাঁচ মিনিটে টিকিট হাতে নিয়ে মূল গেটে চলে এলাম। এসে দেখি ছেলেদের আর মেয়েদের আলাদা লাইন। এবং সেই লাইন বিশাল লম্বা। তাজ মহল খুলে যায় ভোর ছটা নাগাদ। আমরা প্রায় সাড়ে আটটা নটা নাগাদ লাইনে ঢুকলাম। মেয়েদের লাইনে ঘণ্টা দেড়েক লেগেছিল মায়ের আর আমার। সিকিউরিটি চেকিং বেশ কড়া (মানে অনেকটা ওই এয়ারপোর্টের মতোই)। কিছু নিষিদ্ধ জিনিস আছে যেমন ছুরি কাঁচি ইত্যাদি। জল নিয়ে যাওয়া যায়। তবে কোনরকম কস্মেটিক, খাবার কিছু এলাউড না।  তাজের খয়েরি রঙের মূল এন্ট্রান্স দিয়ে ঢুকে একটা বিরাট কম্পাউন্ডে এসে পড়লাম। শুরু হয়ে গেল আমার ক্যামেরায় ক্লিক ক্লিক। বাবাকে ফোন করে জানা গেল ওদের লাইনটা অনেক লম্বা হওয়ায় ওদের ভিতরে আসতে অন্তত আরো ঘন্টাখানেক লাগবেই। মা কে বললাম, "সময় নষ্ট করে লাভ নেই। চলো আমরা ঘুরতে থাকি। ছবি তোলার সময় পেয়ে যাবো। চলো।"
এই বলে তাজ মহলের দিকে এগোলাম। একটা গেটের সামনে দেখি খুব ভিড়। কারণটা খুব শিগগিরি বুঝে গেলাম। ওখান থেকেই যে প্রথম দর্শন পাওয়া যাচ্ছে দুনিয়ার সাত আশ্চর্যের আশ্চর্যটির। কেদারনাথ যাওয়ার পথে একটা জায়গা আছে, দেওদিখানি। সেখান থেকে প্রথম মন্দিরের চূড়া দেখা যায়। তেমনি এই জায়গাটা যেন তাজদিখানি। তাজের সাথে শুভদৃষ্টিটা মানুষ এখান থেকেই সারছেন। আর তাই আরো বেশী ভিড়। ফটক টপকে যখন বইয়ের পাতায় দেখা আমাদের চিরপরিচিত তাজ মহল প্রথম দেখলাম, একেবারে পূর্ণ অবয়বে, ওই শ্বেত মার্বেলের বিশালাকৃতি দেখে অল্পক্ষণের জন্য হলেও থমকে গিয়েছিলাম। আর তার পরেই যেন ঘটনা ও পরিস্থিতির বাস্তবতা আমায় ধাক্কা দিয়ে ঘোরের মধ্যে থেকে বের করল। আরে, ছবি তুলতে হবে তো। খচ খচ করে একটার পর একটা ছবি তুলতে শুরু করে দিলাম। জুম লেন্সের ব্যাগটা বাবার হাতে, তাই কেরামতি মেরে দূর থেকে ভিড় টপকে একটাও ছবি এলোনা। আদ্ধেকের বেশী ছবিতেই পিলপিল করছে লোক। জন অরণ্য যাকে বলে। মোটামুটি জায়গায় জায়গায় দাঁড়িয়ে পোজ দিতে দিতে ও দেওয়াতে দেওয়াতে ছবি তুলে ও তুলিয়ে অবশেষে এসে পৌঁছলাম মূল মউসোলিয়ামে। দু চোখ ভরে অবাক চোখে দেখে যেতে লাগলাম মার্বেলের ওপর নয়নাভিরাম কারুকার্য। এত শত বছর আগের তৈরি, কী সাঙ্ঘাতিক প্রতিভাবান শিল্পীরা বানিয়েছিলেন এটিকে, আজ এতগুলো বছর পরেও সমানভাবে আমাদের আকর্ষণ করছে তাজ মহল। বাহ তাজ বলি আমরা সব সময়, আমার তো মনে হয়, প্রতিটি শিল্পীর নাম নিয়ে নিয়ে বাহ বললে হয়ত তাদের কাজের প্রতি সঠিক শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করা হবে। ঐতিহাসিক কারণের চেয়েও বেশী, তাজ মহল আমার ভালো লেগেছে শৈল্পিক কারণে।
পরিবেশ দূষণের কারণে, তাজ মহলের আগের জৌলুস নাকি আর নেই। কী জানি বাবা, আমি তো এই প্রথম দেখলাম, ওই দুধ সাদা মনুমেন্টটি দেখে আমি হাঁ! আর এই দূষণের থেকে তাজ মহলকে বাঁচাতে এখন ভিতরে জুতো পরে যেতে দেয়না। জুতো পড়লেও তার ওপর পলিথিনের এক ধরণের আস্তরন লাগিয়ে ঢুকতে হয়। দশটাকা দিয়ে আমরা প্রত্যেকের জন্য এক এক জোড়া কিনে রেখেছিলাম আগেরদিনই। তাজ মহলের ভিতরে প্রবেশ করার জন্য দেখলাম আরেকপ্রস্থ বিশাল লাইন। আমাদের হাতে সময় কম। তাড়াতাড়ি হোটেলে ফিরে বেরোতে হবে জয়পুরের উদ্দেশ্যে। জীবনে একবারে সব কিছু পাওয়া হয় না, এরকম একটা দার্শনিক মনোভাব নিয়েই মা আর আমি ঠিক করলাম যে থাক, আর ভিতরে ঢুকে কাজ নেই। এমনিও শাহ জাহান মুমতাজের আসল সমাধি মোটেই দেখাবেনা, আর কারুকার্য, সে তো বাইরে থেকেই ভালোই দেখতে পাচ্ছি। মোটেই বিরাট আর্ট ক্রিটিক নই আমরা যে একদম ডিটেলে না দেখলে জীবন ব্যর্থ হয়ে যাবে। তার চেয়ে বরং তাজের চার পাশটা প্রায় প্রদক্ষিণ করার মতো করেই হাঁটলাম। পিছন দিয়ে বয়ে চলেছে যমুনা নদী, জল কম। কুয়াশাচ্ছন্ন। একটু ফাঁকা দেখে তাজের দেওয়ালে হাত দিলাম, স্পর্শ করে অনুভব করার চেষ্টা করলাম এই বিশাল কীর্তিটিকে, বিশ্বজুড়ে যা এত বিখ্যাত করেছে আমার দেশকে। সাধারণ ভাবে ভাবলে হয়তো অন্য কোন শ্বেত পাথরের স্তম্ভ ছুঁয়ে দেখলেও একই অনুভূতি হত, কিন্তু ব্যাপারটা যেখানে তাজ মহল, যা চাক্ষুস দেখব বলে এই কদিন ধরে তিল তিল করে উত্তেজনার পাহাড় জমিয়েছি মনে, তাই সেই হিমশীতল স্পর্শও দিব্যি লাগল।
ইতিমধ্যে বাবা আর কাকাও চলে এসেছে। বাবার আগে জয়পুর আগ্রা ঘোরা, দিল্লি থেকে এসে। বাবা তো এই এত ভিড় দেখে অবাক। বলল যে লাস্ট যখন এসেছিল, তখন নাকি কোন লাইনই পায়নি। এমনি এমনি টুকটাক এসো, সিঁড়ি বেয়ে উঠে ঘুরে বেড়াও। সঙ্গে সঙ্গে উইশ লিস্টে যোগ করে নিলাম। তাজ মহল, ফাঁকাতে এসে ডিটেলে ঘুরতে হবে। আরো এক প্রস্থ ছবি তুলে দলের বাকি লোকজন (সবাই না, এই দলে এমন অনেকেই ছিল যারা সময় বেঁধে দেওয়া হলেও তা মানত না। সেইসব কীর্তি বিভিন্ন পর্বে আরো আসবে।) মিলে আমরা হোটেলে ফিরলাম। এসে শুনি আরেক বিপত্তি। যে বাসে করে আমাদের জয়পুর যাওয়ার কথা, তথা, গোটা ট্রিপটা হওয়ার কথা, সেটা উদয়পুর থেকে আসছিল। পথে তার উইন্ডস্ক্রিন ভেঙ্গে চুরচুর। সে বাস গিয়েছে গ্যারেজে সারাতে। সকাল থেকে তো এমন কথা শুঞ্ছিলাম। এসে দেখি তখনও সে বাস আসেনি। কাঁচও কেনা হয়নি। এবার কতক্ষনে বাস রেডি হয়ে আসবে, কতক্ষণে আমরা বেরবো...জয়পুর পৌঁছব কতক্ষনে। দুপুরের খাবার খেয়ে হোটেলের ঘর চেক আউট করে সবাই লবিতে এসে বসেছি। বারবার ম্যানেজার কাকুকে সবাই জিজ্ঞেস করছি, কোন আপডেট আছে কি না। হোটেলের পাশে একটা স্যুভেনির শপ ছিল, সবাই প্রায় পালা করে করে ওখানে ঢুঁ মেরে এসেছি। আমার মা আর বাবা এর মধ্যে একবার বেরিয়ে আগ্রার বিখ্যাত পেঠা কিনেও এনেছে। এদিকে তো আসের কোন পাত্তা নেই। তখন খালি ভাবছি, ওলা ডেকে ফতেপুর সিক্রিটা দিব্যি ঘুরে আসা যেত এমন জানলে। কপালে না থাকলে যা হয়, আর কী। যাই হোক, সব জল্পনা কল্পনার অবসান ঘটিয়ে আমাদের বাস এলো প্রায় সাড়ে তিনটে নাগাদ। হইহই করে লোকজন ছুটল সীট দখল করতে। মায়ের কাছে শোনা, এই কোম্পানির নিয়ম হল ট্যুরের মোট সময়টাকে দুই ভাগে ভাগ করে সীট এলট করা, যাতে কি না সকলেই মোটামুটি সামনে পিছনে মিলিয়ে বসতে পারে। বেশ ভালো নিয়ম। তা এই বাসে উঠেও দেখলাম সেরকম লিস্ট করে দেওয়া আছে। এদিকে সিটের গায়ে কোন নম্বর লেখা নেই। সেই নিয়ে শুরু হল গোলমাল। ডান্দিক থেকে এক নম্বর না বাঁ দিক থেকে এক নম্বর ধরা হবে... আরে বাবা, সিটিং প্ল্যান তো ছবির মতো আঁকা আছে, সিনেমার টিকিট কাটতে গেলে যেমন দেখি। তেমন করে বসলেই হল। তা না। যাদের পিছনের দিকে সীট পড়েছে, তারা শুরু করল আপত্তি। পাঁচ সাড়ে পাঁচ ঘন্টার জার্নি কি করে টানা কেউ পিছনে বসবে, এই একদিনেই ওলট পালট করতে হবে, সামনে বসতে দিতে হবে, হাঁটু ট্রান্সপ্লান্ট করা, তাই সামনে বসব (অথচ গোটা ট্রিপে একবারও অন্য সময় কিন্তু দেখলাম না আর কিছুতে কোন অসুবিধে),  কোমরে ব্যথা তাই ঝাঁকুনি সহ্য হবেনা, সিনিয়ার সিটিজেন তাই সামনে বসব। লেগ স্পেস কম, বসব না। বাস পাল্টাও। এখুনি মালিককে কল করো, ট্রিপ ক্যান্সেল করে দিচ্ছি। ইত্যাদি ইত্যাদি। কান ঝালাপালা করে শেষমেশ জয়পুর থেকে বাস বদল হবে এই আশ্বাসে আমাদের বাসটা ছাড়ল প্রায় চারটের পর, সকাল নটায় যেটা রওনা হওয়ার কথা ছিল। ফতেহপুর, ভরতপুর সব জায়গার ওপর দিয়ে যেতে যেতে মাঝে চায়ের হল্ট দিয়ে শেষমেশ বাস জয়পুরে ঢুকল রাত প্রায় দশটা নাগাদ। চারিদিক তখন প্রায় শুনশান। বাসের ড্রাইভার হোটেলের রাস্তা চেনেনা। কেন যে এরা গুগুল ম্যাপ ব্যবহার করেনা, কে জানে। অটোওয়ালা জোগাড় হল, একশো না দেড়শো টাকার বিনিময়ে রফা হল, সে আগে আগে গিয়ে আমাদের হোটেল অবধি বাসটাকে পৌঁছে দেবে। জয়পুরের হোটেলটা ছিল একটি হেরিটেজ হোটেল। রাডোলি হাউজ। ইন্টারনেটে দেখে এসছিলাম, দারুণ ইন্টারেস্টিং লেগেছিল, উৎসুক হয়েছিলাম তাই ওখানে পৌঁছতে। শেষমেশ রাত এগারোটার পর হোটেলের গেটে এসে পৌঁছলাম। ঘুমে দুই চোখ বুজে আসছে। এক ঝলক দেখে যা বুঝলাম, অতি রাজকীয় থাকার ব্যবস্থা। সকালে উঠে ভালো করে দেখেশুনে ছবি তুলতে হবে।
এজেন্সির লোকজন তাড়াহুড়ো করে ওই রাতে রান্না চাপাতে গেল। পরেরদিন আমার কাকার জন্মদিন ছিল। কেকের ব্যবস্থা নেই। তাই রাত বারোটা বাজতে না বাজতে, কাকাকে দিয়ে "পেঠা কাটিয়ে" জন্মদিন পালন হল। আমি নিজে বছর দুই আগে মুন্নারে পিতজা কেটে জন্মদিন পালন করেছি। তবে পেঠাটা সত্যিই বিচিত্র! ওই অত রাত্তিরেও ভাত ডাল ভাজা মাছ (নাকি মাংস? ঠিক খেয়াল নেই) পেয়ে ক্লান্ত শরীর একটু আরাম পেল। মশমশে গরম জলে স্নান করে খেয়ে নরম বিছানায় গা এলালাম যখন, রাস্তায় বাইরে তখন শুধু কুকুরের চিৎকার শোনা যাচ্ছে। ঘুটঘুট্টি অন্ধকার। রাত প্রায় দেড়টা। এদিকে নির্দেশ এসে গিয়েছে, পরেরদিন সকাল আটটার মধ্যে ব্রেকফাস্ট দিয়ে দেওয়া হবে। নটায় বেরনো। সিটি সাইট সিইং।

Sunday, January 14, 2018

আমার চোখে রাজস্থান পর্ব ২ (আগ্রা ফোরট)

হোটেলে ঢুকে তো আরেকপ্রস্থ ঝুটঝামেলা। গিয়ে জানা গেলো, আমাদের সকলের জন্য বরাদ্দ ১৩টা ঘরের মধ্যে নাকি সব ঘর এখনো খালি নেই চেক ইন টাইম দুপুর বারোটা। তাই ঘর রেডি নেই। ম্যানেজার কাকু, হোটেলের ম্যানেজার, দলের লোকজন মিলে বাকবিতন্ডা (মিথ্যে বলব না, আমিও কম কথা শোনাইনি, আর শোনাব নাই বা কেন? ওমা, ভোর চারটেতে রাইট টাইমে পৌঁছলে কী হত? তখনও বারোটা অবধি লবিতে রাখত নাকি?) করে শেষমেশ বারোটার আগেই ঘর পাওয়া গেল। বেশ সুন্দর পরিষ্কার ছিমছাম ঘর, ব্যাল্কনি দেওয়া। সবাইকে ফ্রেশ হয়ে একটার মধ্যে লাঞ্চ করতে বলা হল। এই শুরু হল, প্রতিদিন খাওয়ার সময় এমন এনাউন্সমেন্ট। সারাদিনের টাইমটেবিল জানানো। ওইদিনের প্রোগ্রাম আগ্রা ফোরট আর তাজ মহল। গরম জলে ভালো করে স্নান করে শরীরের গ্লানি কাটিয়ে খেতে বসেই মন ভালো হয়ে গেলো। চেন্নাইয়ে দিনের পর দিন মাছ না পাওয়া আমি, পাতে দেখি মাছের মাথা দিয়ে ডাল, পাবদা মাছের ঝাল আর ইয়া বড় সাইজের গলদা (নাকি বাগদা? আমার এখনো গুলিয়ে যায় কোনটা কী) চিংড়ির কারি। মন ভরে পেট ভরে খেয়ে এবার সবাই মিলে বাসে ওঠা হল। প্রথম দিন, অল্পক্ষণের জার্নি, তাই বাসের সীট এলট্মেন্ট কিছু হয়নি। মৃত্যুঞ্জয় কাকু বলেই দিলেন। পরের দিন থেকে সীট নাম্বার লিস্ট সব দিয়ে দেওয়া হবে। আমরা তো তখনও বুঝিনি যে এই সীট নিয়েও কেমন দক্ষযজ্ঞ লেগে যেতে পারে। যাই হোক, আমাদের হোটেল থেকে আগ্রা ফোরট এবং তাজ মহল, দুটোই খুব কাছে। ট্যুর প্রোগ্রাম অনুযায়ী ঠিক হল যে আগে ফোরট যাওয়া হবে। তারপরে তাজ মহল। আমি অবশ্য একটু গাঁইগুই করছিলাম বটে যে ফোরটের লাইট এন্ড সাউন্ড দেখা যায় সন্ধ্যে ছটার পর থেকে। তার আগে বরং তাজ মহল দেখে নিই। কিন্তু যেহেতু সেট শিডিউল, তাই কিছু করার নেই। এই প্রথম বললাম মা বাবাকে, "ওই জন্যই নিজেরা নিজেরা গাড়ি নিয়ে ঘুরে বেরানো উচিৎ। নিজেরদের মতো প্রোগ্রাম করে। কী যে দরকার এই ট্যুর পার্টিগুলোর, ইত্যাদি ইত্যাদি।"
ফোরট পৌঁছলাম মিনিট কুড়ি পঁচিশেই। রাস্তায় সামান্য জ্যাম ছিল। বাস কোথায় পার্ক হবে, কোথায় আমাদের নামতে হবে, এইসব চর্চা যখন চলছে, ইতিমধ্যে আমি জানলার পর্দা সরিয়ে পটাপট ছবি তোলা শুরু করে দিয়েছি। দুপুরের রোদে খয়েরি রঙের ফোরটের একটা সোনালি ব্রাউন রঙ, অপূর্ব লাগছিল।
ঘুরতে আসার আগে আগেই আমি ইন্দু সুন্দরেসনের একটি বই পড়ি, "দি টুএনটিএথ ওয়াইফ" নামের। এই বইটিতে মূলত মেহর-উন-নিসা অর্থাৎ নূর জাহানের কথাই লেখা। নূর জাহানের চোখ দিয়ে তৎকালীন মোগল সাম্রাজ্য, রাজ পরিবারের নানান কাহিনী। আর সেই বইতে প্রায় সিংহভাগ জুড়েই আগ্রা। আগ্রা ফোরট আর তাজ মহল। ফোরটে টিকিট কেটে (এই প্রসঙ্গে বলে রাখি, রাজস্থান বেড়াতে এলে এমনি থাকা খাওয়া যাতায়াতের জন্য তো খরচ আছেই, আমাদের যেমন ট্রেন/প্লেন ভাড়া ছাড়া টুইন শেয়ারিং বেসিসে প্রতি জনের কুড়ি হাজার টাকা লেগেছিল, তার সাথে সাথে অন্তত দুই থেকে আড়াই হাজার টাকা লাগে বিভিন্ন জায়গায় এন্ট্রি ফি আর গাইড ফি দিতে গিয়ে।) অমর সিং গেট দিয়ে ঢুকেই মনে হল, ঠিক যেন গল্পের পাতায় পৌঁছে গেলাম। চোখের সামনে যেন দেখতে পাচ্ছি, ছোট্ট মেহর-উন-নিসা মা বাবার হাত ধরে জেনানা মহলে ঢুকছে, বেগামের সাথে দেখা করতে। সেই বাগান যেখানে একদিন মেহরের সাথে চোখাচুখি হয় সেলিমের (যিনি তখনও জাহাঙ্গীর উপাধি নেন নি।)। আগ্রা ফোরট কিন্তু বাবরের আমল থেকেই মোগল সম্রাটদের দখলে, মাঝে কয়েকবার বিভিন্ন যুদ্ধে কেল্লার মালিকানা হারালেও পরবর্তী কালে মোগলদের হাতেই থেকে যায়। ইতিহাস বলে যে শুরুতে ইটের তৈরি কেল্লা হলেও সম্রাট আকবর স্থানীয় লাল স্যান্ডস্টোন দিয়ে এই কেল্লার বর্তমান রূপটি আনেন।
ফোরটের ভিতরে তিনটি স্বতন্ত্র স্থান দেখতে পাওয়া যায়। একটি আকবরের আমলের, অন্যটি জাহাঙ্গীর এবং তৃতীয়টি শাহ জাহানের। মূল কেল্লার স্থাপত্য দেখার মতো। সুক্ষ্ম কারুকার্য , সাদা মার্বেলের ওপর অতুলনীয়। দিওয়ান -ই-আম, দিওান-ই-খাসের নাম যেমন ইতিহাসের বইতে পড়েছি, তেমনি পরেছিলাম ওই গল্পের বইটিতে। চাক্ষুস দেখতে দেখতে সত্যি বলছি, গায়ে কাঁটা দিচ্ছিল। যে জানলা দিয়ে শাহ জাহান শেষ বয়সে তাজ মহল দেখতেন, সেইখানে দাঁড়িয়ে যখন তাজ মহল দেখছিলাম, নিজেকে ইতিহাসের একটা অংশ মনে হচ্ছিল। শব্দ দিয়ে বলে বোঝাতে পারব না এই অনুভুতির কথা। গল্পের বইয়ে পড়েছিলাম মীনা বাজারের কথা, যেখানে মহিলা মহলের জন্য আলাদা করে বাজার বস্ত, দোকানীরা পসরা সাজাতো, সেলিম আর মেহর-উন-নিসার কথোপকথন হত যেখানে, সেই মীনা বাজারের কথা যখন গাইড বলছিলেন, চোখের সামনে সিনেমার মতো দেখতে পাচ্ছিলাম প্রতিটি দৃশ্য। কেল্লাটি বিশাল, পুরোটা ভালো করে ঘুরে, ছবি তুলে বেরোতে বেরোতে আর উনত্রিশ জন একসঙ্গে বাসে আসতে আসতে প্রায় সাড়ে চারটে বেজে গেল। তাজ মহলে এন্ট্রি পাঁচটা নাগাদ বন্ধ হয়ে যায়। তাজের দিকের রাস্তায় ভীষণ ভিড়। রবিবার বিকেল। ছুটির মরসুম চলছে। আমাদের বুক ধুকপুক করছে, তাজ মহল কী দেখতে পাবো? প্ল্যান অনুযায়ী আগামীকাল সকাল সকাল জয়পুর বেরিয়ে যাওয়ার কথা। তীরে এসে তরী ডুবলে ভারী মন খারাপ হবে। ঠিক পাঁচটা বাজতে পাঁচে তাজ মহলের পারকিং লটে বাস থেকে নেমে টিকিট কাউন্টারের দিকে এগোচ্ছি সকলে, আশে পাশের দোকানীরা বললেন যে এখন আর গিয়ে কোন লাভ নেই। টিকিট পাওয়া যাবেনা। বিষণ্ণ হয়ে হোটেলে ফিরলাম। সন্ধ্যের চা আর ফিশ ফ্রাইও মনে আনন্দ আনতে পারল না এতটুকুও। দ্বিতীয়বার মা কে বললাম, "এই জন্যই ট্রাভেল এজেন্সির সাথে আসতে নেই। আগে ফোরটে না গেলেই হতো! মিছিমিছি তাজ মহল মিস করলাম।"

Saturday, January 13, 2018

আমার চোখে রাজস্থান পর্ব ১

প্রস্তুতি ও ট্রেন পর্ব

বেড়াতে যেতে আমি খুব ভালোবাসি। আগে বছরে দুবার ঘুরতে যেতাম, একটা ছোট ট্রিপ হত (মানে ওই দিন সাতেকের), মার্চ এপ্রিলে স্কুলের নতুন সেশান শুরু হওয়ার আগে। আরেকটা হত একটু বড়। দিন পনেরোর। মূলত ডিসেম্বরে শীতের ছুটিতে। আর কলেজে পড়াকালীন দেড় মাস পুজোর ছুটি পেতাম বলে লক্ষ্মী পুজোর পর বেরোতাম। যবে থেকে মাদ্রাজে এসেছি লেখাপড়ার জন্য, বছরে যে কটাদিন ছুটি পাই, মন আনচান করে কখন বাড়ি যাবো, সেই ভেবে। তাই বাবা মায়ের সাথে তেমন করে ঘুরে বেড়ানো হয়না। আশেপাশে এখানে উইকেন্ড বা ডে ট্রিপ খুচখাচ লেগেই থাকে। ওদিকে বাবা মা ও নিজেরা অল্প বিস্তর এদিক সেদিক ঘুরে বেড়ায়। দুই পক্ষই নিজের মতো ঘুরে বেড়ালেও একসাথে ঘোরার আনন্দ বড্ড মিস করছিলাম, আর তাই সুযোগ খোঁজা হচ্ছিল একসাথে কোথাও যাওয়ার। যেতেই হবে এমন জায়গার লিস্টে ছিল রাজস্থান, লাদাখ, আন্দামান। শীত ছাড়া ছুটি পাওয়া যাবেনা বলে লাদাখ বাদ পড়ে গেলো। আন্দামান আর রাজস্থানের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের পর অবশেষে পরম বিক্রমের সাথে রাণাদের দেশ, রাজপুতানাই জিতে গেলো। বেশ কিছু বছর আগে শাহরুখ খানকে পহেলী সিনেমায় দেখে রাজস্থান জায়গাটির প্রতি ভীষণভাবে আকৃষ্ট হয়ে যাই। এই আকর্ষণ কখনো কমতে পারেনি, তার আরেকটা কারণ হল, রাজস্থান সাঙ্ঘাতিক রকমের ফোটোজেনিক। আর যেই জায়গার  আর যেখানে ছবি তুলে আনন্দ পাওয়া যায়, আমি এক পায়ে খাড়া সেখানে যেতে। কাছাকাছি পাড়ার এক ট্রাভেল এজেন্সির (এদের সাথে বাবা মা দুটো ট্রিপ করে বেশ সন্তুষ্ট। কারণগুলি ক্রমশ প্রকাশ্য) লিস্ট দেখে ডিসেম্বরের ২৩ তারিখ ঠিক হল দুই সপ্তাহব্যাপী রাজস্থান ভ্রমণের। বাঙালি ফাউ পেলে আর কিছু চায় না, আমরাও রাজস্থানের সাথে ফাউ পেলাম আগ্রা। আহ! সেই কবে থেকে ইতিহাসের পাতায় " টিয়ারড্রপ ইন দি চিক অফ টাইম"এর কথা পড়েছি, ছবি দেখে মুগ্ধ হয়েছি। বাড়িতে ছোট রেপ্লিকা দেখেছি। এইবারে চাক্ষুস দেখব। নতুন কেনা ডি এস এল আর টার সদ্ব্যবহার হবে, এই আশায় আমি সমানে লাফাচ্ছি চেন্নাইতে বসে।
একুশ তারিখ বাড়ি এলাম। সন্ধ্যে থেকে নিজের লাগেজ প্যাক করতে বসলাম। ইতিমধ্যে মা নিজের আর বাবারটা গুছিয়ে রেখেছিল। আমি চেন্নাই থেকে এমনি সাধারণ পোশাক নিয়ে আসলেও গরমজামা কলকাতা থেকেই নিতে হল (কী করব, ২০১৩'র পর গরম জামা পড়েছি কেবলমাত্র গত জানুয়ারিতে পুণা গিয়ে)। অসম্ভব টায়ারড হয়েই (প্যাকিং আর বাইশে একটু দুই একজন আত্মীয়ের সাথে দেখা সাক্ষাত করেই কাহিল) ট্রেনে উঠলাম তেইশ তারিখ। সকাল আটটার পূর্বাতে টিকিট ছিল। বাড়ি থেকে ভোর ভোর (মানে আমার কাছে অন্তত ভোর। তার ওপর আবার ডিসেম্বরের শেষের ঠান্ডা, কম্বলের আরাম ছাড়া বড্ড কড়া শাস্তি যে!) বেরিয়ে ট্রেনে তো উঠলাম। এসি থ্রি টিয়ারে আমাদের রিজার্ভেশন ছিল। আমি পেয়েছিলাম পছন্দসই লোয়ার বার্থ (তবে আমার সবচেয়ে প্রিয় ছিল সাইড লোয়ার। বেশ পর্দা টেনে নিজস্ব একটা জগত তৈরি করা যেত। কিন্তু আজকাল তো ভারতীয় রেল অনেক বেশী প্রগতিশীল হয়েছে, পর্দা সিস্টেম কবেই উঠে গিয়েছে! ভালো ভালো। দেশের উন্নতি।) মা বাবা আর আমি এক জায়গায়, আমার কাকা আসানসোল থেকে উঠবে, শেষ মুহূর্তে জয়েন করেছে প্ল্যানে, তাই এসিতে টিকিট হয়নি, তৎকালেও। বেচারা স্লিপারেই পুরোটা এলো। আমাদের সহযাত্রীরা ছিল এক গুজরাটি পরিবার। প্রায় ৩০-৪০জনের দল ওদের, পুরো পরিবার মিলে মথুরা যাবে। কলকাতার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ওরা সবাই মিলে চলেছে। ওদেরও গন্তব্য টুন্ডলা ষ্টেশন, আমাদেরই মতো। ট্রেন রাইট টাইমে পৌঁছলে ভোর তিনটে নাগাদ টুন্ডলা নামার কথা, তবে শীতকাল। জানা কথাই যে লেট হবে। আমরা শুধু এইটুকুই প্রার্থনা করছি, যেন অন্তত চারটে পাঁচটার আগে ষ্টেশন না আসে (প্রার্থনার যে ভালোই জোর আছে, এবং কিছুটা হলেও দরকারের চেয়ে বেশী, তা আমরা খুব শিগগিরি বুঝে গিয়েছিলাম!)। ওই বিশাল দলটা সারাক্ষণ নিজেদের মধ্যে বকবক করেই চলছিল, শুরুর দিকে মন্দ না লাগলেও আসতে আসতে বেশ একটা বিরক্তি ধরছিল বটে। আমি সচরাচর ট্রেনে বা প্লেনে উঠলে বই পড়ি বা গান শুনি। শুয়ে শুয়ে কিন্ডল রিডারে বই পড়তে খুব অসুবিধে হচ্ছিল এই ক্ষেত্রে। জানলার ধারে এমনি বসে থাকলে আমার খুব ঘুম পায়। তাই কিছুটা ঘুমোতে ঘুমোতে আর খানিক বই পড়তে পড়তে চলল আমাদের ট্রেন জার্নি। ট্রাভেল এজেন্সির ম্যানেজার বাবু, মৃত্যুঞ্জয় কাকু মাঝে এসে দেখা করে গেলেন। চুক্তি অনুযায়ী ট্রেনে সেদিন ব্রেকফাস্ট থেকেই ওদের খাবার দেওয়া শুরু।
মা বাবা এই এজেন্সির সাথে প্রথম যায় মধ্য প্রদেশ। জার্নি, থাকা ইত্যাদি নিয়ে আমরা তিনজনেই খুব ফ্লেক্সিবল, শুধু যেটা সমস্যা দাঁড়ায়, খাওয়া নিয়ে। না, মানে বাঙালি খাবার ছাড়া মুখে কিছু রোচে না এমনটা না, যদিও কেদারনাথে হেঁটে হেঁটে পৌঁছে যখন দেখলাম ভারত সেবাশ্রমে রান্না হচ্ছে খিচুরি আর আলুভাজা, আমরা যেমন আনন্দিত হই, ঠিক তেমনি অমৃতসরের পথে ধাবায় বসে সরসো কা সাগ আর মকাই কি রুটি তেমনি উপভোগ করি। তবে আজকাল বয়সের সাথে সাথে আমার মায়ের বেশী করে (গলব্লাডারের স্টোন অপারেশনের পর এটা বেড়েছে) আর কিছুটা হলেও আমার বাবার টানা বেশিদিন তেল মসলা দেওয়া খাবার খেলে শরীর খারাপ করে। তাই ওরা আজকাল প্রেফার করেন এরকম এজেন্সির সাথে ঘোরা যাতে ঘরোয়া খাবারটা পাওয়া যায় (যদিও চিরকাল আমরা নিজেরাই ঘুরে বেরিয়েছি। রাজস্থান ট্রিপ্টাই আমার জন্য প্রথম এজেন্সির সাথে বেরানো)। ব্রেকফাস্টে বান রুটি, ডিম সিদ্ধ, আপেল, মিষ্টি ছিল। সাথে চা। দুপুরে প্যাকড লাঞ্চ। ফ্রায়েড রাইস কাতলা মাছের কালিয়া আর আবার মিষ্টি (এই ট্রিপে প্রত্যেকদিন ব্রেকফাস্টে একটা করে মিষ্টি খেয়েছি। কাজেই কত কিলো যে ওজন বাড়িয়েছি, সেই প্রসঙ্গে না গেলেও চলে)। দিনেরবেলা ট্রেন বিহার দিয়ে যায়, কাজেই একদম প্রত্যাশিতভাবেই প্রচুর এক্সট্রা লোকজন উঠলেন রিজারভড কামরাতে। অবশ্য করেই অসুবিধে হয়, ওদের ওপর রাগ হয়। কিন্তু পরমুহূর্তেই কষ্ট লাগে ওদের জন্য, এই বিরাট ভারতবর্ষে যেমন আমরা থাকি মেট্রো সিটিতে, যেখানে রয়েছে সব রকম সুবিধে, ঠিক তেমনি প্রত্যন্ত গ্রামে থাকেন এরা। যাদের কাছে এই দূরপাল্লার ট্রেন ছাড়া কোন গতি নেই। আর তাই নিরুপায় হয়ে রিজারভড কম্পারট্মেন্টেও উঠতে হয়, লোকের কটুক্তি শুনতে হয়। প্রতিনিয়ত।
কখন টুন্ডলা আসবে, নামতে হবে, এই ভাবতে ভাবতে প্রতি ঘন্টায় একবার করে জেগে বাইরেটা জানলা দিয়ে দেখার চেষ্টা করতে করতে অবশেষে পরেরদিন ছয় ঘন্টা লেট করে আমাদের ট্রেন সকাল নটায় ঢুকল টুন্ডলা। দুই মিনিটের হল্ট, অনেক লোক নাম্বে একই কামরা থেকে, তাই একটু টেনশন ছিল। মোটামুটি ধাক্কাধাক্কি করতে করতে মাল নিয়ে নেমে পড়লাম টুন্ডলা। ট্রাভেল এজেন্সির সাথে ঘোরার পরবর্তী উপকারিতা এইবারে টের পেলাম। সমস্ত লাগেজের দায়িত্ব ওদের। এক্টুও মাল টানাটানি করতে হয়নি। সাথে প্রৌঢ় বা বয়স্ক মানুষ থাকলেও লাগেজ নিয়ে ঘুরতে একটুও অসুবিধে হয়না। ষ্টেশনের বাইরে বেরিয়ে আমাদের একটি বাসে তুলে দেওয়া হল। ওই তখনই পরিচয় হল মোটামুটি গ্রুপের বাকিদের সাথে। আমরা চারজন (মা বাবা কাকা আর আমি) ছাড়া আরো পঁচিশজন। এছাড়া এজেন্সির পাঁচ কর্মচারী আর ম্যানেজার মশাই। মোট দলে পয়ত্রিশজন। বাসে ঘন্টাখানেকের জার্নি করে আমরা শেষমেশ এসে পৌঁছলাম আগ্রাতে, আমাদের হোটেল ডিলাক্স প্লাজাতে। 

আমার চোখে রাজস্থান: পর্ব ০



- কী ব্যাপার তোমার, অমন প্যাঁচার মত মুখ করে বসে আছো কেন?
- সা, মন মেজাজ ভালো নেই।
- কেন গো? কী হল?
- ধুর ধুর। এই নটা বাজতে গেল। এইবারে ভিড় শুরু হবে। আবার ওই হাসি মুখ করে পোজ দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা। আর ভালো লাগছেনা।
- তা এ তো তোমার আজকের নতুন রুটিন না। বছরের পর বছর ধরে চলে আসছে। হঠাৎ আজ কী হল?
- হচ্ছে ঠিকই। কিন্তু আমার আজকাল আর ভালো লাগছেনা। এই যে এত্তগুলো বাইরের অজানা অচেনা লোকজন আসছে, আমাদের সব জিনিসপত্রের ছবি তুলে নিয়ে যাচ্ছে। ক্যামেরার ফ্ল্যাশে হাভেলির অমন দুর্লভ পেইন্টিংগুলোর রঙ ফ্যাকাশে হয়ে যাচ্ছে। বাড়ির এত সুন্দর সুন্দর ডিজাইন লোকে বেমালুম কপি করে যাচ্ছে। এক্সলুসিভ বলে আর কিছু থাকছেনা যে।
- বুঝি সবই বুঝি। কিন্তু কিছু তো করার নেই সা। বংশধরেরা যে এখনো অবধি হাভেলিটাকে পাঁচতারা হোটেল বানাতে দিয়ে দেয়নি, এই ঢের। নইলে তোমার আমার স্থান যে কোথায় হত আমি ভাবতেও পারছিনা। ওদের রোজগারপাতির ঠিকঠিকানা নেই, এদিকে লাইফস্টাইল দেখো এখনো খানদানি। ওদের কথা ভেবে নাহয় আমাদের আরো দিনের পর দিন এমনভাবে নিজেদের ডিসপ্লে আইটেম করতে হবে!
- কপাল, কপাল!
- হু। ছাড়ো। নাস্তা দাও। কী বানিয়েছ?
- কী আবার? ডাল বাটি চুরমা। একটু ভারি খাবার না খেলে বিকেল অবধি ঠায় দাঁড়ানোর স্ট্রেন্থ পাবেনা সা।
- তাও বটে। তাও বটে।।

Wednesday, December 20, 2017

বছর শেষের হিসেব নিকেশ

ওরে বাবা, ভাবতেই পারছিনা, এই সেই টুংটাং করে ফোনে মেসেজ ঢুকছিল এত হ্যাপি ন্যু ইয়ার বলে, তারপরে ৩৫৪ দিন শেষ? কী কাণ্ড, এত তাড়াতাড়ি শেষ হল কি করে এই একটা আস্ত বছর, কে জানে বাবা। কত কিছু করব বলে গত বছর এমন সময়ে লম্বা লিস্ট করলাম, তার তো বোধহয় সিকিভাগও পুরণ হয়নি। এখনো রোগা হওয়াটা বাকি। ওজন কমা তো দূর অস্ত, উল্টে কিলো পাঁচেক অন্তত বেড়েছে। (এবার সেটা বুদ্ধি না ফ্যাট, টু বি ভেরি স্পেসিফিক, বার বার কিলো কিলো চকোলেট, সেটা নিয়ে আমার এখনো সন্দেহ আছে যথেষ্ট পরিমাণে।) এখনো একটা পাব্লিকেশন হলো না ফার্স্ট অথরে। (শুনুন, পি এইচ ডি স্টুডেন্ট, তায় ফিফথ ইয়ার চলছে, এই সময়ে এইসব ভাবনা আপনা আপনি না চাইতেই মাথায় আসে।) ম্যানুয়াল মোডে ডি এস এল আর চালানো শিখলাম না (এদিকে যতক্ষণ না কিনছিলাম, ততক্ষণ নিজেকে রঘু রাইয়ের মাস্টার ভাবছিলাম। কিছু কিছু লোককে কচুপোড়া দেখিয়ে একটা পৈশাচিক হাসি হাসতে পারলাম না (ওটা আমার হেব্বি সখ, কী করব)। ব্যাঙ্ক ব্যালেন্স যেমন ছিল, বাড়ে তো নি, বরং আরো কমেছে (গরীব রিসার্চ স্কলার। আমাদের ওইসব পে কমিশন হ্যান কমিশন কিচ্ছু হয় না)। বছর শেষ হচ্ছে ভাবতে বসেই যদি এতগুলো হা পিত্যেশ মাথায়া সে প্রথমে, না জানি ব্যালেন্স শিট বানাতে বসলে কি দাঁড়াবে। না মানে জানি, না পাওয়াগুলো অনেক অনেক বেশী হবে সংখ্যায়। চেষ্টা করি মাস ধরে ধরে একটু হিসেব নিকেশ করার (আমি আদপে একটুও হিসেবী না হলেও...)।

গত বছর শেষ করেছিলাম হাতে ভালো মতো চোট পেয়ে। তাই নতুন বছরকে স্বাগত করি হাতে ক্রেপ ব্যান্ডেজ বেঁধে! বেশ বিরক্ত লাগত, হুটহাট লেগে যেত হাতে, ব্যথা পেতাম। তারই মধ্যে পুণা গেলাম কনফারেন্সে পেপার প্রেজেন্ট করতে। আই আই টি তে আসার পর আমার স্বভাবের বেশ পরিবর্তন হয়েছে। যে আমি কি না এক সপ্তাহ বাকি থাকতে সব পেন্ডিং কাজ সেরে ফেলতাম এক কালে, সেই আমিই কি না আজকাল সব ইলেভেন্থ আওয়ার অবধি মিনিমাম ফেলে রাখি। তা হয়েছে কি, পোস্টার প্রিন্ট করতে গিয়ে যারপরনাই বিচ্ছিরি অবস্থায় পড়েছিলাম। একদম হিসেবের বাইরে ছিল যে তামিল নাড়ুতে পোঙ্গাল রীতিমতো বিরাট উৎসব যখন দোকান পাট সব বন্ধ থাকে।  লাস্ট মোমেন্টে কোনমতে সুপারভাইসারের সাথে কম কারেকশনের রফা করে যা হোক করে দোকান বন্ধ হয়ে যাবে, আর ছাপানোর সময় পাবো না, ইত্যাদি ইত্যাদি করে কোনমতে তো পোস্টার সহ গেলাম পুণাতে। তা কনফারেন্সে আগেই বলে রেখেছিল যে ওরাল টকের জন্যও প্রস্তুত হয়ে আসতে, বিড়ালের ভাগ্যে শিকে ছিঁড়তেও পারে। আমি কে আমি, এত কনফিডেন্স নিজের ওপর, ধরেই নিলাম। এই তো ভারী কাজ করেছি, নেহাত সরকারি টাকায় দেশভ্রমণ হবে, তাই যাচ্ছি। আমি তো জেতার ধারেকাছেও থাকবনা। তার উপর আবার এরকম জঘন্য ভাবে শেষ মুহূর্তে বানানো পোস্টার। তাই কোনরকম  প্রস্তুতি না নিয়েই এমনিই গিয়েছিলাম। কেলোটা করল কনফারেন্সের তৃতীয় দিন। দুইদিন পোস্টারের পর তারা রেজাল্টে হঠাৎ করেই আমার নাম ঘোষণা করে দিলেন, নাকি টক দিতে হবে। খুব নার্ভাস হয়ে গিয়ে সেই টক তো দিলামও। আবার ভগবান জানেন কি করে, সেখানে আবার প্রথম পুরস্কারও পেয়ে গেলাম। আমার সুপারভাইজার তো শুনে হতবাক, ফোনে জানাতে উনি প্রথম যে কথাটি বলেন, " সে কী? কেউ আদৌ এসছিল তোমার কাজ নিয়ে শুনতে? কি করে জিতলে? যাই হোক, কংগ্র্যাটস।" বছরের শুরুতেই একটা মোক্ষম শিক্ষা পেলাম। বা বলা চলে, নিজের সম্বন্ধে জানলাম। টেনশন না করে কাজ করলে, বেশী এক্সপেক্টেশন না রাখলে অনেক কিছু প্রাপ্তি হয়। এখন পদে পদে তা মানার চেষ্টা করলেও ম্যাক্সিমাম সময়েই মানতে পারিনা। সামান্য কিছুতেই হাত পা ঘেমে নেয়ে একাকার হয়ে যায়। তাও যাই হোক, বছর শুরু হল বেশ কাজের স্বীকৃতি পেয়ে। দিব্যি মন খুশি। এক্সট্রা খুশি হলাম তারপর যখন একটা মোটামুটি ভালো জারনালে সেকেন্ড অথরে পেপার বেরোলো মার্চ মাসে। যারা রিসারচের সাথে যুক্ত নন, তাদের বলি। এই পেপার পাব্লিশ করাটা অনেকটা সাধারণের সরকারি চাকরি পাওয়ার মতো বলা চলে। ফার্স্ট অথর মানে ওই আই এ এস, আই এফ এস। আর সেকেন্ড অথর মানে হয়তো স্টেট ব্যাঙ্কের পি ও। নিজে রিসারচার বলে লেখায় মাঝে মাঝে এই প্রসঙ্গ আসতে পারে। আগাম ক্ষমা চেয়ে নিলাম।
এপ্রিল মাস, আমার জন্ম মাস। আমার ক্যাম্পাসের ভাই বোনদের কথা তো আগে ম্যাড্রাস প্রসঙ্গে লেখায় বলেছি। তা এবার হলো কি, ভাইরা মিলে সব আমার জন্মদিন পালন করল। মাঝরাতে, ক্যাম্পাসের বেশ একদম মধ্যমা জায়গায় আমায় মধ্যমণি করে চলল সেলিব্রেশন। বয়স হচ্ছে, জীবনে কাজের কাজ কিছু হচ্ছেনা। এইসব ভাবতে ভাবতে আমার কেন জানিনা নিজের জন্মদিনটা বড্ড মন খারাপ মন কেমন করা লাগে। জন্মদিনের আগেরদিন থেকেই কেমন অকারণে ডিপ্রেশন হয়। গতবারে বাবা মায়ের সাথে মুন্নারে পালিয়েছিলাম। এইবারে মন খারাপ নিয়ে ছিলাম যে জন্মদিনে মা বাবার থেকে দূরে থাকতে হবে। তবে ভাইগুলো এক্কেবারে ভাইয়ের দায়িত্ব পালন করে দারুন সুন্দর করে আমার জন্মদিন পালন করল। সারাদিন বেশ খাওয়াদাওয়া, ছবি তোলা, কেক কাটা, উপহার পাওয়া, সব মিলিয়ে খুব ভালো কেটেছিল। মানে অভাবনীয় ভালোই বলা চলে। প্রবাসে আত্মীয়তা পেলে যা হয় আর কী।
মে মাসটা আমার খুব খারাপ কেটেছে। ব্যক্তিগত পর্যায়ে কিছু মানুষের সাথে চরম মতানৈক্য হওয়ার ফলে নিজের অত্যন্ত একটা প্রিয় কর্মকাণ্ড থেকে নিজেকে চিরতরে সরিয়ে নিই। খুব খুব কষ্ট হয়েছিল, বেশ অনেক রাত কেঁদেকেটে না ঘুমিয়ে কাটিয়েছি। কিন্তু ওই যে বলে না, অন্ধকারের পরে আলোর উৎস আছেই। সব কিছু ভালোর জন্য হয়। তা আমার ক্ষেত্রেও তাই হয়েছিল। এই অভিশপ্ত দিনগুলির মন খারাপ করা কাটাতে আমি লেখালিখিতে অনেক অনেক বেশী মনোযোগ দিতে লাগলাম। আগে যেটা সপ্তাহে একটা কি আরো কম লিখতাম, সেই আমি হঠাৎ শুরু করলাম প্রায় রোজ নতুন নতুন লেখার। রসেবশে বলে একটা গ্রুপে লিখতাম। অনেকের ভালোবাসা পেয়েছি। প্রচুর গুণীজনের সান্নিধ্যও পেয়েছিলাম। কিন্তু বাঙ্গালী একসাথে দুইজন থাকলেই অন্তত তিনটে দুর্গাপুজো হয়, বেশিদিন রসেবশেতে থাকতে পারিনি। অর্ণবের হাত ধরে এসছিলাম বছরের মাঝামাঝি আত্মপ্রকাশে। খুচখাচ লিখতে লিখতে তারপরে কখন যে এত আত্মীয় পেয়ে গেলাম, এই বছরের একটা বিরাট প্রাপ্তি নির্দ্বিধায় বলতে পারি। সেই একই সাথে সাথে এলো আমার নিজস্ব একটি পেজ, সাম্পান। সাম্পান নামে আমার বাবা তাঁর কলেজ জীবনে লিটল ম্যাগাজিন চালাতেন। কয়েকটা সংখ্যাই বেরিয়েছিল। যখন নিজের পেজ বানাই, তাই নাম নিয়ে ভাবতে দুইবারের বেশী চিন্তা করতে হয়নি। বাবার ম্যাগাজিনের লিগ্যাসি চালানোর চেষ্টা করে চলেছি প্রতিনিয়ত। সাম্পান সন্তানসম প্রিয়।

এই করতে করতে এসে গেলো পুজোর কটাদিন। আগের লেখাতেই বলেছি। চেন্নাইতে এই নিয়ে দ্বিতীয় বার পুজো কাটালাম। একটাবারের জন্যও মনে হয়নি পরিবারের থেকে দূরে আছি। আসলে রক্তের সম্পর্ক দিয়েই তো সব সময় আত্মীয়তা হয় না। মনের টান, প্রাণের টান লাগেই। এটা আমি খুব বিশ্বাস করি। এবং আমার জীবনে এর বহু বহু উদাহরণ। পুজো দারুণ কাটিয়েছি। বিশাল প্রাপ্তিস্বরুপ নতুন করে বানানো এখানে অনেকের সাথে আত্মীয়তা।

"কান্না হাসির দোল দোলানো
পৌষ ফাগুনের পালা।"
এত আনন্দের মধ্যে তারপর হঠাৎ একদিন আমার অতি নিকটাত্মীয়ার অকাল মৃত্যু সংবাদ সাঙ্ঘাতিকভাবে নাড়িয়ে দিলো আমায়। শোকের থেকে নিজেকে ধাতস্থ করতে বেশী সময় নিতে পারিনি। কারণ সাথে যোগ হয়েছিল বাড়তি কিছু দায়িত্ব, দায়বদ্ধ্বতা, পরিবারের প্রতি।

এই করতে করতে এসে গেলো শীত। মানে মোটামুটি আপনাদের সকলের শীতকাল। আমাদের এখানে অল্প গরম। আগামীকাল বাড়ি যাচ্ছি বেশ কিছু মাস পরে। তারপরে শনিবারে বেড়াতে যাবো রাজস্থান, বাবা মায়ের সাথে। বছর দুই পরে আবার সপরিবারে আমাদের বেরানো। একটা সময়ে বছরে অন্তত দুইবার বেরানো হতোই হত। চেন্নাই আসার পর থেকে সেটা বন্ধ হতেই বসেছিল। তাই এই বেরানো নিয়ে খুব উদ্গ্রীব হয়ে আছি।

এই যে, লিখতে লিখতে বেশ একটা আত্মসমীক্ষণও হয়ে গেল। বছরের শুরুতে যেমন করে কাটাব ভেবেছিলাম, অবশ্যই তা মেলেনি। তাই মিললে বোধহয় জীবন থেকে সারপ্রাইজ এলিমেন্ট চলে যেত। একটা গতে বাঁধা জীবন কাটাতে হত। নিজেকে রোবট মনে হত। বরং এই বেশ ভালো। জীবন প্রতি মুহূর্তে চ্যালেঞ্জ ছুড়েছে। নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করেছি। যতটা পেরেছি মোকাবিলা করেছি। অনেক অনেক কিছু শেখা বাকি। অনেক কিছু একমপ্লিশ করা বাকি। সামনের বছরের রেজোল্যুশনে সেসব থাকবে। শুধু এইটুকুই বলতে পারি, সামনের বছর যেন এরকম সময়ে বসে এই বছরের মতই বলতে পারি, ভালো মন্দ মিশিয়ে কাটলেও, মূলত ভালোর ওপর দিয়েই সব গিয়েছে। এইটুকুই আশা। আপনাদের সকলের জন্যও এইটুকুই প্রার্থনা রইলো। আগামী বছর খুব ভালো কাটুক।