উদয়পুর পৌঁছোতে পৌঁছোতে আমাদের প্রায় সন্ধ্যে পেরিয়ে গেল। রাজস্থান ট্রিপ যখনই কোন ট্রাভেল এজেন্সির সাথে হয়,যেহেতু একেকটা জায়গা একে ওপরের থেকে এতটাই দূরে, তাই কোন স্পটে দুই রাত্তির রাখা মানে আসলে তার মধ্যে একটা দিন ধরে সেখানে পৌঁছনোর জন্য। আরেকটা দিন হয় সেইখানের সাইটসিয়িং করার জন্য। এই কদিনে এই ব্যাপারটা উপলব্ধি করেই নিয়েছিলাম। আর তাই যত দেরিতেই কোন জায়গায় পৌঁছই না কেন, আর প্যানিক করতাম না। উদয়পুরে আমাদের যে হোটেলে রেখেছিল, সেটা একটা চৌরাস্তার মুখে, আমাদের অত বড় বাস ওখানে পার্ক করা যাবেনা। তাই মালপত্র ট্রাভেলের ছেলেদের জিম্মায় রেখে আমরা মিনিট পাঁচ সাত হেঁটে হোটেলে পৌঁছলাম। মোতি মহল। একদম মুক্তোর মতোই ধবধবে সাদা। এই প্রসঙ্গে বলি, উদয়পুরের বিভিন্ন নামের মধ্যে, "white city" প্রসিদ্ধ (ঠিক যেমন জয়পুর পিঙ্ক সিটি আর জয়সালমের golden city, ইত্যাদি)। হোটেলটি বেশ সুন্দর সাজানো, ঘর দোর স্ট্যান্ডার্ড। সেদিন রাত্রে আমাদের আর কিছু করার ছিল না। মাংস ভাত খেয়ে টিভি দেখে ঘুম। পরের দিন সকাল সকাল সাইট সিয়িং করতে বেরোনোর কথা।
ব্রেকফাস্ট সেরে আমরা বেরলাম শহর ঘুরতে। বাসে যেতে যেতে প্রথমেই আমাদের বেদান্তর হেড কোয়ার্টার দেখাল। আরো জানলাম, জিঙ্কের জন্য প্রসিদ্ধ উদয়পুর। এরপর আমরা পৌঁছলাম ফতেহ সাগর লেকে। City of lakes বলে বিখ্যাত উদয়পুরকে অনেকেই Venice of the east আখ্যাও দেন। মূলত পাঁচটি বড় লেকের মধ্যে অন্যতম ফতেহ সাগর। বিশাল জায়গা জুড়ে এই লেক। এখানে এমনি মোটর বোট ছাড়াও স্পীড বোটিং ও করা যায়। আমরা মোটর বোটে উঠে গোটা লেকের এক চক্কর কাটলাম। পাহাড় ঘেরা এই লেকটির আঁকার দূর থেকে দেখলে অনেকটা ভারতে ম্যাপের মত লাগে। এই লেকের মধ্যে কয়েকটি দ্বীপ আছে। সেই দ্বীপগুলিতে রয়েছে নেহরু পার্ক, সোলার অবজারভেটরি। প্রতিটিই আলাদা করে টুরিস্ট ডেসটিনেশন। আমরা একটাতেও নামিনি, কিন্তু লেক ঘুরে দেখার সময় দেখলাম আর ছবি তুললাম। মিনিট কুড়ি ধরে চলল জলবিহার।
এরপরে আমরা গেলাম লেকের প্রায় উল্টোদিকেই অবস্থিত রাণা প্রতাপ স্মারকে। পায়ে হেঁটে সিঁড়ি বেয়ে যাওয়া যায়। কিন্তু সময়সাপেক্ষ। আমাদের হাতে তেমন সময় ছিল না। তাই আমরা আমাদের বাসেই গেলাম। মোতি পাহাড়ের ওপর অবস্থিত এই স্মারকটি। মহারাণা প্রতাপ ও তার সাধের চেতকের একটি lifesize ব্রোঞ্জের মূর্তি রয়েছে। মূর্তির ফলকে হলদিঘাটির যুদ্ধ আর চেতকের শেষ নিঃশ্বাসের দৃশ্য দুইদিকে খোদাই করা। এই স্মারকস্থলটি থেকে উদয়পুর শহরের কিছুটা দেখা যায়। আশেপাশে সুন্দর ফুলের বাগান। পাশে ফতেহ সাগর লেক। রোদ ঝলমলে। শীতের সকাল। সব মিলিয়ে জমজমাট। সামনেই একটি ছোট্ট স্যুভেনির শপও রয়েছে। আমি চেতক চাবির রিং কিনলাম সেখান থেকে।
পরবর্তী গন্তব্য ভারতীয় লোককলা কেন্দ্র। এটি রাজস্থানি আর্ট এন্ড ক্রাফট সম্বন্ধে জানার জন্য একেবারে যোগ্য স্থান। বিভিন্ন রাজস্থানি শিল্পকলা, তাদের ইতিহাসের রঙিন সমাবেশ এই কেন্দ্রে। সত্যি কথা বলতে, তখন মনে দিয়ে পড়ে এলেও এখন হয়তো জিজ্ঞেস করলে কিছুই বলতে পারব না। কিন্তু ওই সময়ে যে এক অদ্ভুত ভালো লাগা কাজ করেছিলও মনে, সেটা অনস্বীকার্য। আগেও বলেছি, রঙ আমার খুব প্রিয়। আর তাই এই জায়গাটা আমার বেশিরকমের পছন্দ হয়েছিল। ছবিতে কয়েকটা উদাহরণ দেখালেও সামনা সামনি দেখার আলাদা "চার্ম"। ওই একই জায়গায় এরপর আমরা দেখতে পেলাম ট্র্যাডিশনাল রাজস্থানি পুতুল নাচ। রাজসভায় রাজা ও মন্ত্রীদের সামনে বসে রাজ নর্তক ও নর্তকীর নাচ, ফোক ম্যুজিকের তালে তালে। কতটা দক্ষতা লাগে এই ধরণের উপস্থাপনা করতে, না দেখলে বোঝা কঠিন। ভীষণভাবে উপভোগ্য।
লোক কলা কেন্দ্রের পর আম্রা গেলাম "সহেলীয়ও কি বাড়ি"। রাজপরিবারের মেয়েদের তাদের সহেলীদের সাথে খেলে বেরানোর জায়গা এটি। কিছুই না তেমন, শুধু একটু ফোয়ারা দিয়ে ঘেরা সাজানো গোছানো সুন্দর ফুলে ভর্তি বাগান। ছবি তোলার জন্য মনের মত জায়গা। মিনিট কুড়ির মধ্যে ঘুরে নেওয়াই যায়। বাইরে রাজস্থানি পোশাক পরে ছবি তোলানোরও ব্যবস্থা আছে।
সকালের মত ঘুরে এবার হোটেল ফিরে লাঞ্চ সারা হল। দ্বিতীয়ার্ধে ঘোরার কথা ছিল সিটি প্যালেস। ততক্ষণে কেন জানিনা ওই প্যালেস আর ম্যুজিয়াম দেখতে দেখতে একটু হলেও একঘেয়ে লাগছিল। তার ওপর জনপ্রতি সারে তিনশো টাকা শুনে একটু হলেও বিরত হলাম। আমরা চারজনে সেই জায়গায় অটো ভাড়া করে চলে গেলাম লেক পিচোলা। উদয়পুর বলতেই লোকের মনে যেই নাম আসে, সেটি এই লেক পিচোলা। ভিড় জমজমাট লেকের ধার। পাশেই উদয়পুরের সিটি প্যালেস। লেকের মধ্যে দ্বীপগুলিতে রয়েছে লেক প্যালেস (বর্তমানে বিলাসবহুল হোটেল। সিনেমার শুটিং, প্রচুর টাকাওয়ালা লোকেদের বিয়েবাড়ি এইসব পারপাসেই ব্যবহার হয়) , জগমন্দির ( এর রূপ দেখেই নাকি সম্রাট শাহ জাহান তাজ মহল বানানোর অনুপ্রেরণা পান)। আমরা যেটা করলাম, লেকের কাছেই একটু উঁচুতে অবস্থিত রোপওয়ে রয়েছে, সেটার টিকিট কাটলাম। জনপ্রতি একশোর একটু বেশী খরচ। অপেক্ষা করতে হল খানিকক্ষণ। তারপর মিনিট পাঁচেকে পৌঁছে দিল উল্টোদিকের পাহাড়ে। একসাথে তিনটে গাড়ি চলে, লাল হলুদ ও সবুজ রঙের। ভারি সুন্দর লাগে দূর থেকে দেখতে। ভিতরটা কাছের বড় জানলা দিয়ে তৈরি। পাহাড় পেরোনোর সময় ধারে সিটি প্যালেস, লেক পিচোলা, যোগ মন্দির সব চোখে পড়ে। উলটোদিকে নেমে জানা গেল কর্নি মাতার মন্দির আছে। মা আর কাকা মন্দির থেকে ঘুরে এলো। আমি আর বাবা ওখানে এমনি ঘোরাঘুরি করলাম। ওপর থেকে উদয়পুর শহরটাকে খুব সুন্দর লাগছিল। একটু ঘিঞ্জি, কিন্তু ধবধবে সাদা বাড়ির দেওয়াল। লেকের ওপর সূর্যাস্তের নয়নাভিরাম দৃশ্যও চোখে পড়ল। ছবি তোলার জন্য আইডিয়াল সানসেট স্পট।
এবার ফেরার পালা। মনে আছে তো সেই যে পেন্ডিং শপিঙের কথা বার বার বলছিলাম? অটো ধরে আমরা এলাম বাপু বাজার। অনেক অনেক দোকান। একদম আমাদের বড় বাজার চত্বরের মতোই। কিছু খুচখাচ জামাকাপড় কেনা হল বটে। কিন্তু সেই রাজস্থানি ঝুমকোর আর দেখা পাই না। হাঁটতে হাঁটতে এদিক ওদিক করে চষে ফেললাম গোটা অঞ্চল, কিন্তু কোথায় কি? শেষে বাসন গ্যাস এসবের দোকানের পাড়ায় পৌঁছে এক ভদ্রলোককে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি দেখিয়ে দিলেন একটি রাস্তা। ততক্ষণে সন্ধ্যে নেমে গিয়েছে। রাস্তা প্রায় শুনশান। ওইসব দিকে সন্ধ্যে সারে সাতটার মধ্যেই সব দোকান বন্ধ হয়ে যায়। দেখানো রাস্তা দিয়ে গিয়েও কিছুই খুঁজে পাই না। ফিরে আসব আসব করছি, এমন সময় রাস্তার একজনকে জিজ্ঞেস করায় উনি একটি বাড়ি থেকে কাউকে ডেকে দিলেন। মা আর আমি একটু বাঁধো বাঁধো হয়ে ভিতরে ঢুকে গেলাম বটে। বাবা আর কাকা বাইরে দাঁড়িয়ে রইল পাহারা দিয়ে।
জানলাম এটি যার বাড়ি, তিনি গয়নার হোলসেলার। রীতিমতো আদর আপ্যায়ন করে "বেটি তুঝে যো পসন্দ আয়ে, নিকালকে লে লে" বলে ছাড়পত্র দিলেন। ঘরের টাক ভর্তি গয়নার বাক্স। নামিয়ে নামিয়ে ডিজাইন পছন্দ করে অনেক অনেক কিনলাম। প্রায় আশ মিটিয়ে যাকে বলে। কী সস্তা সব। এখন মনে হয় আরো কিনলে হতো। অনেক গল্প হল ওনার সাথে। পরের বার উদয়পুর এলে ওনার বাড়ি ডাল বাটি চুরমা খাওয়ার নিমন্ত্রণ করলেন ওনার ছেলের বৌ। সাথে করে ওনার কার্ড নিয়ে এসেছি। কারুর যদি উদয়পুর যাওয়ার প্ল্যান থাকে, বলবেন। ঠিকানা দিয়ে দেবো।
আবার আরেকটা জায়গা ঘোরা হয়ে গেল। কতটা ঘুরলাম কি, জানিনা। তবে এইটুকু বলতে পারি, জেনে গেলাম আরো কত কিছু দেখার আছে। হাতে সময় নিয়ে এসে আরো কত কিছু দেখতে হবে, অনুভব করতে হবে। বেরানো শেষের দিকে। মাউন্ট আবু, জয়সালমের আর যোধপুর বাকি। আগামীকাল সকাল সকাল হলদিঘাটি হয়ে যাওয়ার কথা মাউন্ট আবু। সেখান থেকে শুরু হবে মাড়ওয়ার। রুক্ষ্ম প্রকৃতি। বালিয়াড়ি।
Tuesday, January 23, 2018
Sunday, January 21, 2018
সরস্বতী পুজো
বছর আঠাশের শুভ্রা। বিয়ে হয়ে মান্ডি এসছে সবে ছয় মাস হল। কলকাতায় থাকতে এপারট্মেন্টের সবার একেবারে মধ্যমণি ছিল। সমস্ত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের দায়িত্বে থাকত ও। সুষ্ঠু ভাবে তা সম্পন্ন হতো বলে সকলের আদরের ছিল শুভ্রা। সরস্বতী পুজো থেকে শুরু করে দোল, নববর্ষের অনুষ্ঠান থেকে শুরু করে রবি-নজ্রুল সন্ধ্যা, রথযাত্রা থেকে বিজয়া সম্মিলনী, ক্রিসমাস থেকে ন্যু ইয়ার। কোনটাই বাদ পড়ত না। ওর বর অরুণাভ আই আই টি মান্ডিতে কম্প্যুটার সায়েন্স বিভাগে সদ্য জয়েন করেছে এসিস্টেন্ট প্রোফেসর হিসেবে। সেই সুবাদে শুভ্রাও কলকাতার চাকরি ছেড়ে তল্পিতল্পা গুটিয়ে পিছু পিছু এসেছে মান্ডি।
পাহাড়ের কোলে, নদীর ধারে ওদের ক্যাম্পাসটি ভীষণ সুন্দর, পিকচার পোস্টকার্ডের মতোই নয়নাভিরাম। প্রথম কয়েক মাস কোয়ার্টার গুছিয়ে, ঘুরে বেরিয়ে আনন্দ করে কাটালেও আজকাল শুভ্রার জীবনে অখন্ড অবসর। সব সময় কাজের মধ্যে থাকতে যে মেয়ে ভালোবাসে, তাকে এখন সারাদিন খালি বাড়িতে বসে সময় কাটাতে হয়। কত আর বই পড়ে গান শুনে সময় কাটবে। রান্নাবান্না করতে মোটেই ভালোবাসেনা। আশেপাশের কোয়ার্টারেও তেমন কারুর সাথে খুব একটা হৃদ্যতা জমাতে পারেনি এখনো অবধি। মোট কথা, নিতান্তই একাকীত্বে কাটছে শুভ্রার দিনগুলি।
এর মধ্যে হই হই করে এসে গেলো সরস্বতী পুজো। পুজোর মাস খানেক আগে থেকে ওদের কলকাতার এপারট্মেন্টের মেসেজ গ্রুপে চলতে লাগল হাজার একটা প্ল্যানিং। ও প্রথম প্রথম খুব উৎসাহ নিয়ে সেই সব আলোচনায় ভিড় করত বটে। কিন্তু তারপর হঠাৎ করেই একদিন কী মনে হতে সব ছেড়েছুড়ে দিল শুভ্রা। সেখানে না থাকতে পারায় বড্ড কষ্ট হচ্ছিল কি না। বউয়ের এই মন খারাপটা অরুণাভর হঠাৎএকদিন চোখে পড়ল। ভাগ্যিস! নইলে অমন স্কলার ছেলে, মোটামুটি আর বাকি সময়ে জগত সংসার সম্বন্ধে এক্কেবারে ভ্রুক্ষেপহীন। "কী হয়েছে, কেন এমন মন খারাপ, মুখ গোমড়া করে আছে কেন", এসব প্রশ্ন করতে লাগল। শুভ্রাও খুব একটা চাপা মেয়ে না। সে গড়্গড় করে বলল তার বর কে।
"ও এই ব্যাপার? দাঁড়াও, কিছু একটা করতে হবে। আমায় দুদিন সময় দাও।" এই বলে অরুণাভ সেদিন ক্লাস নিতে চলে গেলো। সন্ধ্যে নাগাদ ফিরল সঙ্গে ওর কিছু কলিগদের নিয়ে। মান্ডি ক্যাম্পাসে জনা সাতেক বাঙালি ফ্যাকাল্টি পরিবার। সেই সব বাঙালি ফ্যাকাল্টিদের সাথে শুভ্রার অল্প বিস্তর আলাপ ছিল। তাদেরকে নিজের কোয়ার্টারে দেখে একটু অবাক হল বটে। হঠাৎ কী দরকারে, কেন সবাই হাজির ভাবতে ভাবতে অরুণাভই ওর সব প্রশ্নের উত্তর দিয়ে দিল, " এই নাও। এবার সবাই মিলে প্ল্যান করে একটা সরস্বতী পুজো নামাও তো" এই বলে।
" আরে এটা তো দারুণ বলেছো অরুণাভ।" শুভ্রার মন আনন্দে নেচে উঠল। অন্তত কিছুদিনের জন্য হলেও, কোন একটা ব্যাপারে নিজেকে ব্যস্ত রাখতে পারবে, এই আনন্দে প্রায় সব দায়িত্বই ও নিতে রাজী হয়ে গেল।
কিন্তু পুজো যে হবে, কোথায় হবে? ঠাকুর কোথায় পাবে? কে করবে? এইসব নানান প্রশ্নের উত্তর পেতে শুভ্রা পরেরদিনই একটা ছোট মিটিং ডাকল নিজের বাড়িতে। ক্যাম্পাসের সব বাঙ্গালিরা এলো। চা সামোসা সহযোগে চলল আলোচনা। ঠিক হল, অম্লান দা, অর্থাৎ কেমিস্ট্রির অম্লান ব্যানারজীদা পুজো করবেন। কলেজে থাকাকালীন করার অভিজ্ঞতা আছে। এইবারে আর মূর্তি আনানোর বা বানানোর সময় নেই, তাই ছবি প্রিন্ট করে ফ্রেমে বাঁধিয়ে ঘটে পুজো হবে। শুভ্রাদের বাড়িতেই হবে। কী কী জিনিস লাগবে, কোথা থেকে তা জোগাড় করা যাবে, এইসবের ফর্দ করতে হবে। শুভ্রার বেশ মজা লাগছে। এতদিনে মনে হচ্ছে যেন আবার নিজের এপারট্মেন্টের দিনগুলিতে ফিরে গিয়েছে। মায়ের থেকে ওর পুরনো ফাইল ঘেঁটে পুজোর ফর্দর ছবি ওয়াটসআপে নিয়েছে। এক এক করে কোথায় পাওয়া যেতে আপ্রে, তার হদিস চলছে।
ওর খুব ইচ্ছে একটা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হোক সন্ধ্যেবেলা। লোকবল তেমন নেই। তাই চাইলেও নাটক বা গীতিনাট্য করা যাবেনা। কোন চিন্তা নেই। রমেনদার স্ত্রী, মালবিকা বৌদি খুব ভালো নাচ করেন। ঠিক হল, উনিই বাকি আর তিনজনকে ঘষে মেজে নাচ তুলিয়ে দেবেন। সাথে গান গাইবে শুভ্রা। শুভ্রাকে গানে সঙ্গত করবে তবলায় অরুণাভ। পি এইচ ডি করার সময়ে শেষ তবলা বাজিয়েছিল ও, আজ কিছু বছর পর আবার সেই সুযোগ আসছে দেখে ও সমান ভাবে উত্তেজিত। আজকাল শুভ্রার মধ্যে একটা বেশ খুশি খুশি ভাব দেখে অরুণাভ। দেখেও ভালো লাগে। সত্যি তো, চাকুরিরতা মেয়েকে এমন ঘরবন্দী করে রাখলে কাহাতক আর ওর ভালো লাগে? এই ইনিশিয়েটিভটাকে জিইয়ে রাখতে পারলে ভালো হয়।
দেখতে দেখতে বসন্ত পঞ্চমী এসে গেল। ভোর থেকে, আলো ফোটার আগে থেকেই অরুণাভ টের পেল শুভ্রা উঠে পড়েছে। স্নান সেরে ঠাকুর রাখার জায়গাটা ধুয়ে মুছে তৈরি করছে। ছটা বাজতে না বাজতে একে একে কলিং বেল বাজতে লাগল। হৈমন্তী দি, মালবিকা বৌদি, রিনি, মহুয়াদি, সব এসে পড়তে লাগল। এরপর একে একে দল বেঁধে শুরু হল পুজোর তোড়জোড়। কেউ আল্পনা দিচ্ছে, কেউ ফল কাটছে। তো অন্যদিকে আবার কেউ ঠাকুর সাজাচ্ছে। পুরুষেরাও মেতে উঠেছে পুজোর কাজে। প্ররবাসে হলেও উৎসাহ বা চেষ্টার কোনরকম ত্রুটি রাখেনি ওরা। রমেনদা আবার পটাপট লেন্সবন্দী করে চলেছেন এই মুহূর্তগুলি।
এই খানিক্ষনের মধ্যেই ঘর ভরে যাবে ধূপকাঠির সৌরভে, কর্পূরের গন্ধে তৈরি হবে একটা পুজো পুজো আবহাওয়া। আর সাথে থাকবে দৃপ্ত কণ্ঠস্বরে
"জয় জয় দেবী চরাচর সারে
কুচযুগশোভিত মুক্তাহারে।
বীণারঞ্জিত পুস্তক হস্তে
ভগবতী ভারতী দেবী নমহস্তুতে।" যা পৌঁছে দেবে এক লহমায় অনেকগুলো বছর আগের এমনই কোন বসন্ত পঞ্চমীর দিনে। ফিরে আসবে কত মিষ্টি মধুর স্মৃতি।
Friday, January 19, 2018
তুমি হঠাৎ হাওয়ায় ভেসে আসা ধন
তুমি হঠাৎ হাওয়ায় ভেসে আসা ধন
১।
টিফিন ব্রেকের সময় ভয়ে ভয়ে ক্লাসরুমে ঢুকেছে আজ শ্রেয়ান। এত বছর বয়েজ স্কুলে পড়ার পর এই প্রথম কোএডে। তার ওপর আবার কলেজের প্রথম দিন। মেধাবী ছেলে শ্রেয়ান উচ্চ মাধ্যমিকে চমকপ্রদ রেজাল্ট করে বর্ধমান জেলার এক প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে কলকাতার অন্যতম নামী কলেজে ফিজিক্স নিয়ে পড়তে এসেছে। হোস্টেলে থাকতে হবে। আজ সকালেই বাবা কলেজ গেটে পৌঁছে বাড়ি চলে গিয়েছেন। এত বড় কলকাতা শহরে ও সম্পূর্ণ একা। কাউকে চেনেনা। শুনেছে কলেজে, হোস্টেলে ভালো মতই র্যাগিং হয়। বুক ঢিপ ঢিপ করছে ওর।
শতাব্দীপ্রাচীন কলেজের বড় ক্লাসরুমটাতে বাইরের আলো তেমন নেই, দিনেরবেলাও টিউবলাইট জ্বলছে। ঢুকে দেখল ওদের ক্লাসের বাকি ছেলেমেয়েরা দুটো বেঞ্চ জুড়ে জটলা পাকিয়ে বসে আছে। ওর আর জায়গা হবেনা ওখানে বলে পিছনের বেঞ্চিতে গিয়ে বসল শ্রেয়ান। টিচার্স প্ল্যাটফর্মের ওখানে জনা দশেক সিনিয়র দাদা দিদিরা দাঁড়িয়ে আছে, কয়েকজন টেবিলে চেয়ারে বসে।
" এই শোন, কলেজের প্রথম দিন এসছিস, সিনিয়রদের সম্মান জানাতে হয়, জানিস না? এলি আর বসে পড়লি? গুড আফটারনুন উইশ কে করবে?"
শ্রেয়ানের দিকে তাকিয়ে বলল সিনিয়র "দিদি", পরনে সাদার ওপর হলুদ ফুল ছাপ কুর্তি আর নীল জিন্স, গোড়ালি অবধি গিয়ে শেষ হয়েছে। মাথায় এক ঢাল কালো চুল, কয়েকটা আবার বার বার কপালের উপর পড়ছিল বলে মাঝে মাঝেই হাত চলে যাচ্ছিল চুল ঠিক করতে। কানে একজোড়া বড় ঝুমকো দুল। ঠোঁটের ওপর ছোট্ট তিল মুখশ্রীতে আলাদা মাধুর্য এনেছে, শ্রেয়ানের শিল্পী মনে ভাবনা এলো।
" গুড আফটারনুন দিদি।" উঠে দাঁড়িয়ে বলল ও।
" দিদি আবার কী? বলবি মধুরা। নাম কী তোর? "
" শ্রেয়ান। ঠিক আছে দিদি। এই সরি, মধুরা।"
" আতাক্যালানে। যা বোস।"
২।
মাস দুই হয়ে গিয়েছে কলেজের। এখনো শ্রেয়ানের ক্লাসে তেমন বেশী বন্ধু হয়নি। মুখচোরা ছেলে ও। রুমমেটের সাথে ছাড়া আর দু তিনজন ছেলের সাথে যা একটু কথাবার্তা হয় ওর। ক্লাস আর লেখাপড়া নিয়ে ব্যস্ত থাকে। সময় পেলে চলতে থাকে আঁকাঝোঁকা। আজ লাঞ্চের পরে ক্লাসটা ক্যান্সেল হয়ে যাওয়ায় লাইব্রেরির দিকে হাঁটা লাগিয়েছিল ও। কেমিস্ট্রি বিল্ডিঙের সামনে দিয়ে যাচ্ছে যখন, দেখল, উল্টোদিক থেকে আসছে মধুরা। আজ ওর পরনে লাল নীল জংলাছাপ গোড়ালি ঝুলের ড্রেস। ওকে দেখেই, " কী রে কেমন আছিস?" বলে হাল্কা হাসল মধুরা।
" ভালো আছি দি।"
"আবার দি? কোথায় যাচ্ছিস এখন? ক্লাস নেই?"
" না দি। আজ এম বি স্যার ক্লাস নেবেন না বলেছেন। তাই ভাবলাম একটু লাইব্রেরিতে বসি গিয়ে।"
" ওরে হাঁদারাম, এটা স্কুল না যে সারাক্ষণ পড়াশোনা নিয়ে থাকতে হবে। ক্লাস নেই তো মজা করে ঘুরে বেরা!"
" আসলে আমি তেমন কিছুই চিনিনা। কোথায় যাবো? "
" ওরে নিজেকে চিনে নিতে হয়। "
" হুম। ঠিক আছে দি।"
" শোন কাল আমাদের এনভাইরনমেন্টালের ক্লাসটা আমি বাঙ্ক করছি। বারোটায়। তোদের তো ওই সময় বাংলা থাকে। কাউকে বলিস প্রক্সি দিতে। আমার সাথে দেখা করবি মেন গেটে। তোকে নিয়ে যাবো এক জায়গায়। "
" কোথায় দি?"
" কাল দেখতে পাবি। "
ভ্যাবলা হয়ে মধুরার চলে যাওয়া হাঁ করে দেখতে লাগল শ্রেয়ান।
৩।
বারোটা বেজে পনেরো। মধুরার দেখা নেই। শ্রেয়ান কিন্তু কিছুটা কৌতূহলবশত আর কিছুটা ভয়ে ভয়ে (এখনো সিনিয়রদের প্রতি ভীতিটা কাটেনি ওর) অপেক্ষা করে আছে গেটে। চলে গেলে পাছে পরে দেখা হয়ে বকা খায়, এই ভেবে যেতেও পারছেনা। কাউকে প্রক্সি দিতে বলতেই পারেনি ও। মিছিমিছি একটা এটেন্ডেন্স নষ্ট হল। এইসব ভাবতে ভাবতে ফোনে খুঁটখুঁট করছিল শ্রেয়ান।
" সরি, একটু দেরি হয়ে গেল। অনেক্ষণ দাঁড়িয়ে আছিস কি?"
মুখ তুলে মধুরাকে দেখতে পেল।
" ওই আর কী। আগের ক্লাসটা তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে গেল। তখন থেকেই আছি।"
" আসলে আমার আগের ক্লাসটা এস এমের ছিল। বুড়িটা এক্সট্রা টাইম নিলো। তাই দেরি হল। এদিকে তোর নম্বরটাও জানিনা যে এস এম এস করে দেবো। ঝটপট তোর নম্বরটা দে তো।"
" ৯৪৩৩......"
" মিসড কল দিয়ে দিচ্ছি।"
বলতে বলতেই শ্রেয়ানের ফোনে রিং হল, অচেনা নম্বর থেকে। দুটো রিং হতেই কেটে দিল মধুরা।
" নে সেভ করে রাখ।"
" হ্যাঁ, করছি।" "মধুরা দি" লিখে সেভ করল নম্বরটা শ্রেয়ান।
" আজ ওয়েদার ভালো নেই। যে কোন সময় বৃষ্টি নামতে পারে। তাই যেখানে প্ল্যান করেছিলাম, যাওয়া যাবেনা। তার চেয়ে বরং চল কোথাও খেতে যাই।"
" কোথায় যাবে?"
" পার্ক স্ট্রিট চল।"
" কী হল? অমন ভ্যাবলাকান্তর মতো মুখ করে আছিস কেন রে? পার্ক স্ট্রিট গেছিস কখনো?"
" না, মানে শুনেছি দামী জায়গা খুব..."
" ধুর ধুর। আজকে আমার ট্রিট। তোদের ইন্ট্রো নেওয়ার দিন হেবি চেটেছিলাম তোকে। তারপরে ফ্রেশারসে আসিনি আমি। ট্রিটটা পেন্ডিং আছে। বন্ধুত্ত্ব অটুট করতে হবেনা?"
মধুরার মিষ্টি হাসি দেখে আর কথা বাড়ালো না শ্রেয়ান।
৪।
"শুভ মহালয়া দিদি।" শ্রেয়ানের এস এম এস ঢুকল মধুরার ফোনে। খেয়াল পড়ল, তাই তো। আজ থেকে টানা দেড় মাস কলেজ ছুটি। দেড় মাস শ্রেয়ানকে দেখতে পাবেনা। ও ফিরে যাচ্ছে জল্পাইগুড়ি নিজের বাড়ি পুজোয়, শ্রেয়ানও বর্ধমান। একটু যেন তেতো লাগল কফিটা। উফ, এই পিজির রান্নার মাসিটা না। এক্কেবারে যাচ্ছেতাই।
প্রায় প্রতিদিন কলেজের পরে শ্রেয়ান আর ও হাঁটতে হাঁটতে চলে যেত অনেকটা দূর। একেকদিন একেক দিকে। সারাদিনের লেখাপড়ার কথা, বাড়ির কথা, শ্রেয়ানের রবীন্দ্রনাথ চর্চা আর ওর গ্রিন ডের চর্চা। মাঝে কোথাও দাঁড়িয়ে ভাঁড়ের চা। অসমবয়সী হলেও কোথাও যেন একটা অদ্ভুত টান অনুভব করত শ্রেয়ানের জন্য মধুরা। সহজ সরল ছেলেটার সাথে কথা বললে আরাম লাগে, মন ভালো থাকে। আবার একটা রুটিন ব্রেক হবে। একদম ভালো লাগেনা মধুরার।
" হুম, ভালো করে পুজো এঞ্জয় করে ফের।" ছোট্ট জবাব দিয়ে বিছানা ছাড়ল মধুরা। বিস্বাদ কফিটা ছুড়ে ফেলল বেসিনে। ওকে তো আবার ব্যাগ গোছাতে হবে। রাত্রের ট্রেন।
৫।
হাওড়া স্টেশনে ট্রেনের অপেক্ষায় বসে আছে শ্রেয়ান। তিন মাস পর বাড়ি যাচ্ছে। মাঝে অবশ্য কয়েকবার বাবা এসে দেখা করে গিয়েছেন। তবে মা আর ঠাকুমার সাথে দেখা হয়নি এতদিন। ভিডিয়ো কলে দেখেছে বটে, কিন্তু স্পর্শ অনুভব করতে পারেনি। যেদিন প্রথম কলকাতা আসে, সেদিন থেকে দিন গুনতে থেকেছে শ্রেয়ান, কবে বাড়ি যাবে পুজোর ছুটিতে। ভেবেছিল বুঝি খুব আনন্দ হবে। কিন্তু আজ কেমন একটা মন খারাপ গ্রাস করে আসছে ওকে। একেই বাইরে মেঘলা, অন্ধকার হয়ে আছে। বৃষ্টি একদম ভালোবাসেনা শ্রেয়ান। তার ওপর কলেজ, হোস্টেল, মধুরাদিকে ছেড়ে দেড় মাস থাকার কষ্ট, কিচ্ছু ভালো লাগছেনা ওর। এই কয়েক মাসে যেন ভালোবেসে ফেলেছে ও কলকাতা শহরটাকে, আর তার সিংহভাগ কৃতিত্ব মধুরার। ওকে সাথে নিয়ে গোটা শহরটা ঘুরে বেরিয়েছে। ষ্টেশনে ট্রেন ঢুকতেই কামরায় উঠে জানলার ধারে সীট নিয়ে কানে হেডফোন গুঁজে বসল শ্রেয়ান।
"I walk the empty streets
On the boulevard of broken dreams" গ্রীন ডে চলতে লাগল একের পর এক।
৬।
দেড় মাস বাদে জগদ্ধাত্রী পুজোর পরে আজ কলেজ খুলেছে ওদের। দুটোয় ল্যাব আর ক্লাস শেষ করে দুজনের আজ গঙ্গার ঘাট যাওয়ার কথা। কথামতো কলেজ গেটে দেখা করল ওরা। ফেলে যাওয়া শরতের মিঠে রোদে আজ বড় মন জুড়ানো আরামদায়ক। কদিনের প্যাচপ্যাচে বৃষ্টির পর আকাশ আজ রৌদ্রজ্জ্বল। মধুরার পরনে একটা হাল্কা বেগুনি রঙের চিকন কাজ করা শাড়ি। লম্বা চুলটাকে অযত্নে হাতখোঁপায় আটকে রেখেছে, কানে ছোট্ট দুল। দুই চোখে কাজলের ঔজ্জ্বল্য। শ্রেয়ানকেও বড় ঝকঝকে লাগছে আজ লাল পাঞ্জাবিতে।
" চল, গঙ্গার ঘাটে যাই। নৌকোতে চড়ে ঘুরব।"
" চলো!"
গঙ্গার বুকে নৌকোবিহার চলল ওদের অনেকক্ষণ। আজ শ্রেয়ান ওর ক্যামেরাটা নিয়ে এসছিল। পুজোয় বাড়ি গিয়ে বাবার থেকে পাওয়া গিফট। সবে শেখা শুরু করেছে। গোটা সময়টা জুড়েই লেন্স তাক করে রেখেছিল মধুরার দিকেই।
" এই, কী তখন থেকে শুধু ছবিই তুলে যাচ্ছিস?"
" তোমায় আজ খুব সুন্দর লাগছে মধুরাদি।"
" বলছিস?"
" হুম।"
" আমি ওই ন্যাকা মেয়েদের মতো বলব না যে কই কিছুই তো সাজিনি। না, আজ সত্যিই আমি সেজেছি। ভালো লাগছে বললি সেটাও এঞ্জয় করলাম। থ্যাঙ্ক ইয়ু!"
" একটা কথা বলব?"
" কী বল?"
" অনেকদিন ধরে ভাবছিলাম বলব..."
"ভালোবাসিস আমায়?"
"কী হল, ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলি?"
" না মানে..."
" ও, ভালোবাসিস না?"
" না না। তা না। অবশ্যই বাসি।"
" তাহলে?"
" না মানে তুমিও?"
" কী মনে হয়?"
" কে জানে। জানলে তো এমন ভ্যাবাচ্যাকা খেতাম না।"
" পাগল কোথাকার!" হেসে শ্রেয়ানের মাথার চুলগুলো হাত দিয়ে ঘেঁটে দিল মধুরা।
"চল, ফেরা যাক। তোর তো পড়ার টাইম নষ্ট হচ্ছে।"
" হ্যাঁ, তা বটে। কাল ল্যাব নোটবুক জমা দিতে হবে। আজ স্পেক্ট্রোর এক্সপেরিমেন্টটা শেষ করেছি।"
" উফ। চল।"
" পৌঁছে একটা ফোন করো।"
" হুম।"
ঘন্টাখানেক পরে শ্রেয়ান ওর হোস্টেলের ঘরে বসে পড়ছে। বা বলা চলে, পড়ার চেষ্টা করছে। সারাদিনের ঘটনার আকস্মিকতার ঘোর এখনো কাটেনি। এমন সময়ে ফোনে বেজে উঠল, " তুমি সন্ধ্যার মেঘমালা। তুমি আমার সাধের সাধনা।" স্ক্রিনে তাকিয়ে দেখল সদ্য এডিট করা নাম।
"Madhura calling"।
১।
টিফিন ব্রেকের সময় ভয়ে ভয়ে ক্লাসরুমে ঢুকেছে আজ শ্রেয়ান। এত বছর বয়েজ স্কুলে পড়ার পর এই প্রথম কোএডে। তার ওপর আবার কলেজের প্রথম দিন। মেধাবী ছেলে শ্রেয়ান উচ্চ মাধ্যমিকে চমকপ্রদ রেজাল্ট করে বর্ধমান জেলার এক প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে কলকাতার অন্যতম নামী কলেজে ফিজিক্স নিয়ে পড়তে এসেছে। হোস্টেলে থাকতে হবে। আজ সকালেই বাবা কলেজ গেটে পৌঁছে বাড়ি চলে গিয়েছেন। এত বড় কলকাতা শহরে ও সম্পূর্ণ একা। কাউকে চেনেনা। শুনেছে কলেজে, হোস্টেলে ভালো মতই র্যাগিং হয়। বুক ঢিপ ঢিপ করছে ওর।
শতাব্দীপ্রাচীন কলেজের বড় ক্লাসরুমটাতে বাইরের আলো তেমন নেই, দিনেরবেলাও টিউবলাইট জ্বলছে। ঢুকে দেখল ওদের ক্লাসের বাকি ছেলেমেয়েরা দুটো বেঞ্চ জুড়ে জটলা পাকিয়ে বসে আছে। ওর আর জায়গা হবেনা ওখানে বলে পিছনের বেঞ্চিতে গিয়ে বসল শ্রেয়ান। টিচার্স প্ল্যাটফর্মের ওখানে জনা দশেক সিনিয়র দাদা দিদিরা দাঁড়িয়ে আছে, কয়েকজন টেবিলে চেয়ারে বসে।
" এই শোন, কলেজের প্রথম দিন এসছিস, সিনিয়রদের সম্মান জানাতে হয়, জানিস না? এলি আর বসে পড়লি? গুড আফটারনুন উইশ কে করবে?"
শ্রেয়ানের দিকে তাকিয়ে বলল সিনিয়র "দিদি", পরনে সাদার ওপর হলুদ ফুল ছাপ কুর্তি আর নীল জিন্স, গোড়ালি অবধি গিয়ে শেষ হয়েছে। মাথায় এক ঢাল কালো চুল, কয়েকটা আবার বার বার কপালের উপর পড়ছিল বলে মাঝে মাঝেই হাত চলে যাচ্ছিল চুল ঠিক করতে। কানে একজোড়া বড় ঝুমকো দুল। ঠোঁটের ওপর ছোট্ট তিল মুখশ্রীতে আলাদা মাধুর্য এনেছে, শ্রেয়ানের শিল্পী মনে ভাবনা এলো।
" গুড আফটারনুন দিদি।" উঠে দাঁড়িয়ে বলল ও।
" দিদি আবার কী? বলবি মধুরা। নাম কী তোর? "
" শ্রেয়ান। ঠিক আছে দিদি। এই সরি, মধুরা।"
" আতাক্যালানে। যা বোস।"
২।
মাস দুই হয়ে গিয়েছে কলেজের। এখনো শ্রেয়ানের ক্লাসে তেমন বেশী বন্ধু হয়নি। মুখচোরা ছেলে ও। রুমমেটের সাথে ছাড়া আর দু তিনজন ছেলের সাথে যা একটু কথাবার্তা হয় ওর। ক্লাস আর লেখাপড়া নিয়ে ব্যস্ত থাকে। সময় পেলে চলতে থাকে আঁকাঝোঁকা। আজ লাঞ্চের পরে ক্লাসটা ক্যান্সেল হয়ে যাওয়ায় লাইব্রেরির দিকে হাঁটা লাগিয়েছিল ও। কেমিস্ট্রি বিল্ডিঙের সামনে দিয়ে যাচ্ছে যখন, দেখল, উল্টোদিক থেকে আসছে মধুরা। আজ ওর পরনে লাল নীল জংলাছাপ গোড়ালি ঝুলের ড্রেস। ওকে দেখেই, " কী রে কেমন আছিস?" বলে হাল্কা হাসল মধুরা।
" ভালো আছি দি।"
"আবার দি? কোথায় যাচ্ছিস এখন? ক্লাস নেই?"
" না দি। আজ এম বি স্যার ক্লাস নেবেন না বলেছেন। তাই ভাবলাম একটু লাইব্রেরিতে বসি গিয়ে।"
" ওরে হাঁদারাম, এটা স্কুল না যে সারাক্ষণ পড়াশোনা নিয়ে থাকতে হবে। ক্লাস নেই তো মজা করে ঘুরে বেরা!"
" আসলে আমি তেমন কিছুই চিনিনা। কোথায় যাবো? "
" ওরে নিজেকে চিনে নিতে হয়। "
" হুম। ঠিক আছে দি।"
" শোন কাল আমাদের এনভাইরনমেন্টালের ক্লাসটা আমি বাঙ্ক করছি। বারোটায়। তোদের তো ওই সময় বাংলা থাকে। কাউকে বলিস প্রক্সি দিতে। আমার সাথে দেখা করবি মেন গেটে। তোকে নিয়ে যাবো এক জায়গায়। "
" কোথায় দি?"
" কাল দেখতে পাবি। "
ভ্যাবলা হয়ে মধুরার চলে যাওয়া হাঁ করে দেখতে লাগল শ্রেয়ান।
৩।
বারোটা বেজে পনেরো। মধুরার দেখা নেই। শ্রেয়ান কিন্তু কিছুটা কৌতূহলবশত আর কিছুটা ভয়ে ভয়ে (এখনো সিনিয়রদের প্রতি ভীতিটা কাটেনি ওর) অপেক্ষা করে আছে গেটে। চলে গেলে পাছে পরে দেখা হয়ে বকা খায়, এই ভেবে যেতেও পারছেনা। কাউকে প্রক্সি দিতে বলতেই পারেনি ও। মিছিমিছি একটা এটেন্ডেন্স নষ্ট হল। এইসব ভাবতে ভাবতে ফোনে খুঁটখুঁট করছিল শ্রেয়ান।
" সরি, একটু দেরি হয়ে গেল। অনেক্ষণ দাঁড়িয়ে আছিস কি?"
মুখ তুলে মধুরাকে দেখতে পেল।
" ওই আর কী। আগের ক্লাসটা তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে গেল। তখন থেকেই আছি।"
" আসলে আমার আগের ক্লাসটা এস এমের ছিল। বুড়িটা এক্সট্রা টাইম নিলো। তাই দেরি হল। এদিকে তোর নম্বরটাও জানিনা যে এস এম এস করে দেবো। ঝটপট তোর নম্বরটা দে তো।"
" ৯৪৩৩......"
" মিসড কল দিয়ে দিচ্ছি।"
বলতে বলতেই শ্রেয়ানের ফোনে রিং হল, অচেনা নম্বর থেকে। দুটো রিং হতেই কেটে দিল মধুরা।
" নে সেভ করে রাখ।"
" হ্যাঁ, করছি।" "মধুরা দি" লিখে সেভ করল নম্বরটা শ্রেয়ান।
" আজ ওয়েদার ভালো নেই। যে কোন সময় বৃষ্টি নামতে পারে। তাই যেখানে প্ল্যান করেছিলাম, যাওয়া যাবেনা। তার চেয়ে বরং চল কোথাও খেতে যাই।"
" কোথায় যাবে?"
" পার্ক স্ট্রিট চল।"
" কী হল? অমন ভ্যাবলাকান্তর মতো মুখ করে আছিস কেন রে? পার্ক স্ট্রিট গেছিস কখনো?"
" না, মানে শুনেছি দামী জায়গা খুব..."
" ধুর ধুর। আজকে আমার ট্রিট। তোদের ইন্ট্রো নেওয়ার দিন হেবি চেটেছিলাম তোকে। তারপরে ফ্রেশারসে আসিনি আমি। ট্রিটটা পেন্ডিং আছে। বন্ধুত্ত্ব অটুট করতে হবেনা?"
মধুরার মিষ্টি হাসি দেখে আর কথা বাড়ালো না শ্রেয়ান।
৪।
"শুভ মহালয়া দিদি।" শ্রেয়ানের এস এম এস ঢুকল মধুরার ফোনে। খেয়াল পড়ল, তাই তো। আজ থেকে টানা দেড় মাস কলেজ ছুটি। দেড় মাস শ্রেয়ানকে দেখতে পাবেনা। ও ফিরে যাচ্ছে জল্পাইগুড়ি নিজের বাড়ি পুজোয়, শ্রেয়ানও বর্ধমান। একটু যেন তেতো লাগল কফিটা। উফ, এই পিজির রান্নার মাসিটা না। এক্কেবারে যাচ্ছেতাই।
প্রায় প্রতিদিন কলেজের পরে শ্রেয়ান আর ও হাঁটতে হাঁটতে চলে যেত অনেকটা দূর। একেকদিন একেক দিকে। সারাদিনের লেখাপড়ার কথা, বাড়ির কথা, শ্রেয়ানের রবীন্দ্রনাথ চর্চা আর ওর গ্রিন ডের চর্চা। মাঝে কোথাও দাঁড়িয়ে ভাঁড়ের চা। অসমবয়সী হলেও কোথাও যেন একটা অদ্ভুত টান অনুভব করত শ্রেয়ানের জন্য মধুরা। সহজ সরল ছেলেটার সাথে কথা বললে আরাম লাগে, মন ভালো থাকে। আবার একটা রুটিন ব্রেক হবে। একদম ভালো লাগেনা মধুরার।
" হুম, ভালো করে পুজো এঞ্জয় করে ফের।" ছোট্ট জবাব দিয়ে বিছানা ছাড়ল মধুরা। বিস্বাদ কফিটা ছুড়ে ফেলল বেসিনে। ওকে তো আবার ব্যাগ গোছাতে হবে। রাত্রের ট্রেন।
৫।
হাওড়া স্টেশনে ট্রেনের অপেক্ষায় বসে আছে শ্রেয়ান। তিন মাস পর বাড়ি যাচ্ছে। মাঝে অবশ্য কয়েকবার বাবা এসে দেখা করে গিয়েছেন। তবে মা আর ঠাকুমার সাথে দেখা হয়নি এতদিন। ভিডিয়ো কলে দেখেছে বটে, কিন্তু স্পর্শ অনুভব করতে পারেনি। যেদিন প্রথম কলকাতা আসে, সেদিন থেকে দিন গুনতে থেকেছে শ্রেয়ান, কবে বাড়ি যাবে পুজোর ছুটিতে। ভেবেছিল বুঝি খুব আনন্দ হবে। কিন্তু আজ কেমন একটা মন খারাপ গ্রাস করে আসছে ওকে। একেই বাইরে মেঘলা, অন্ধকার হয়ে আছে। বৃষ্টি একদম ভালোবাসেনা শ্রেয়ান। তার ওপর কলেজ, হোস্টেল, মধুরাদিকে ছেড়ে দেড় মাস থাকার কষ্ট, কিচ্ছু ভালো লাগছেনা ওর। এই কয়েক মাসে যেন ভালোবেসে ফেলেছে ও কলকাতা শহরটাকে, আর তার সিংহভাগ কৃতিত্ব মধুরার। ওকে সাথে নিয়ে গোটা শহরটা ঘুরে বেরিয়েছে। ষ্টেশনে ট্রেন ঢুকতেই কামরায় উঠে জানলার ধারে সীট নিয়ে কানে হেডফোন গুঁজে বসল শ্রেয়ান।
"I walk the empty streets
On the boulevard of broken dreams" গ্রীন ডে চলতে লাগল একের পর এক।
৬।
দেড় মাস বাদে জগদ্ধাত্রী পুজোর পরে আজ কলেজ খুলেছে ওদের। দুটোয় ল্যাব আর ক্লাস শেষ করে দুজনের আজ গঙ্গার ঘাট যাওয়ার কথা। কথামতো কলেজ গেটে দেখা করল ওরা। ফেলে যাওয়া শরতের মিঠে রোদে আজ বড় মন জুড়ানো আরামদায়ক। কদিনের প্যাচপ্যাচে বৃষ্টির পর আকাশ আজ রৌদ্রজ্জ্বল। মধুরার পরনে একটা হাল্কা বেগুনি রঙের চিকন কাজ করা শাড়ি। লম্বা চুলটাকে অযত্নে হাতখোঁপায় আটকে রেখেছে, কানে ছোট্ট দুল। দুই চোখে কাজলের ঔজ্জ্বল্য। শ্রেয়ানকেও বড় ঝকঝকে লাগছে আজ লাল পাঞ্জাবিতে।
" চল, গঙ্গার ঘাটে যাই। নৌকোতে চড়ে ঘুরব।"
" চলো!"
গঙ্গার বুকে নৌকোবিহার চলল ওদের অনেকক্ষণ। আজ শ্রেয়ান ওর ক্যামেরাটা নিয়ে এসছিল। পুজোয় বাড়ি গিয়ে বাবার থেকে পাওয়া গিফট। সবে শেখা শুরু করেছে। গোটা সময়টা জুড়েই লেন্স তাক করে রেখেছিল মধুরার দিকেই।
" এই, কী তখন থেকে শুধু ছবিই তুলে যাচ্ছিস?"
" তোমায় আজ খুব সুন্দর লাগছে মধুরাদি।"
" বলছিস?"
" হুম।"
" আমি ওই ন্যাকা মেয়েদের মতো বলব না যে কই কিছুই তো সাজিনি। না, আজ সত্যিই আমি সেজেছি। ভালো লাগছে বললি সেটাও এঞ্জয় করলাম। থ্যাঙ্ক ইয়ু!"
" একটা কথা বলব?"
" কী বল?"
" অনেকদিন ধরে ভাবছিলাম বলব..."
"ভালোবাসিস আমায়?"
"কী হল, ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলি?"
" না মানে..."
" ও, ভালোবাসিস না?"
" না না। তা না। অবশ্যই বাসি।"
" তাহলে?"
" না মানে তুমিও?"
" কী মনে হয়?"
" কে জানে। জানলে তো এমন ভ্যাবাচ্যাকা খেতাম না।"
" পাগল কোথাকার!" হেসে শ্রেয়ানের মাথার চুলগুলো হাত দিয়ে ঘেঁটে দিল মধুরা।
"চল, ফেরা যাক। তোর তো পড়ার টাইম নষ্ট হচ্ছে।"
" হ্যাঁ, তা বটে। কাল ল্যাব নোটবুক জমা দিতে হবে। আজ স্পেক্ট্রোর এক্সপেরিমেন্টটা শেষ করেছি।"
" উফ। চল।"
" পৌঁছে একটা ফোন করো।"
" হুম।"
ঘন্টাখানেক পরে শ্রেয়ান ওর হোস্টেলের ঘরে বসে পড়ছে। বা বলা চলে, পড়ার চেষ্টা করছে। সারাদিনের ঘটনার আকস্মিকতার ঘোর এখনো কাটেনি। এমন সময়ে ফোনে বেজে উঠল, " তুমি সন্ধ্যার মেঘমালা। তুমি আমার সাধের সাধনা।" স্ক্রিনে তাকিয়ে দেখল সদ্য এডিট করা নাম।
"Madhura calling"।
আমার চোখে রাজস্থান পর্ব ৬ ( চিতোরগড়)
আমি যখন কলকাতায় একদিন থেকে জামাকাপড় প্যাক করছিলাম, আলমারি ঘাটতে গিয়ে অনেক এমন জামা পাই যেগুলি একদা অত্যন্ত প্রিয় হলেও চেন্নাইতে থাকার সুবাদে পড়া হয়ে ওঠেনি। তেমনি একটি প্রিয় সালওয়ার কামিজ, বেগুনীর ওপর সোনালি সুতোর কাজ করা, ওটা মনে হল রাজস্থান ট্যুরের জন্য নিয়েই নিই। বেশী রংচঙে মনে হলে চিন্তা নেই, কারডিগানের নীচে ঢাকা পড়ে যাবে। সেই মত নিলাম, আর তখন ঠিক করলাম যে চিতোর বেড়াতে যাব যেদিন, সেইদিন পড়তে পারব। তেমন সুযোগ পেলে একটু ঘুমর ঘুমর বলে নেচেও নেব।
মানুষ ভাবে এক, হয় আরেক। আমার ক্ষেত্রেও তার কোন ব্যতিক্রম হলনা। এই কদিন ঘুরে বেরিয়ে বুঝে গিয়েছিলাম যে আর যাই হোক, দিনেরবেলা ওইসব রংচঙে ঝলমলে সিন্থেটিক পড়া যাবেনা। অগত্যা, আজমের থেকে চিতোর যাওয়ার সময় আমায় এমনি সাধারণ পোশাকই পড়তে হল। "আমার আর পদ্মিনী সাজা হল না!"
সকাল সকালই বেরিয়ে পড়েছিলাম।। বাসে ব্রেকফাস্ট সেরে চিতোর পৌঁছোতে পৌঁছোতে প্রায় সাড়ে দশটা এগারোটা বেজে গিয়েছিল। পারকিং লটে গাড়ি দাঁড় করানো হল বটে। কিন্তু নামতে গিয়ে বিপত্তি। একটা বিরাট পোষা হাতি রাস্তা আটকে ছিল। হেলতে দুলতে সে বেশ খানিক পরে রাস্তা ছাড়ল। ছাড়পত্র পেতে তাকে বাসের জানলা দিয়ে কমলা লেবু, বান রুটি এইসব ঘুষ দিতে হয়েছিল। অটো চেপে আমাদের চিতোর দর্শন হবে ঠিক হল। হাতির পিঠে চেপেও করা যায়। তবে তা অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং সময়ও পেরিয়ে গিয়েছিল। বোধহয় সকাল এগারোটা অবধিই চলে এই হস্তিবিহার। ২৯জনের দলকে মোটামুটি ছটা অটোতে চাপিয়ে রওনা দেওয়া হল। একটি অটোর ড্রাইভার আমাদের গাইডের কাজ করবেন। লক্ষ্য করলাম প্রতিটি অটোর সামনে কাঁচের ওপর সত্যিকার সাটানো। "আমরা পদ্মাবতী সিনেমার ঘোরতর বিরোধ করি।" হিন্দিতে লেখা। বুঝলাম, হাওয়া বেশ গরম। আলটপকা মন্তব্যও করলেই মুশকিল।
চিতোরগড় ভারতের অন্যতম বড় গড়ের মধ্যে অন্যতম। শুধুমাত্র বিশাল আকৃতির জন্যই না, বরং চিতোর আমাদের সকলের মনে দাগ কাটে তার বীরত্বের জন্য, প্রেমের জন্য। সাম্প্রতিক কালে নানান বিতর্কের জন্য সারা দেশ পদ্মিনীর কথা জানলেও আমরা কিন্তু বহু আগে থেকেই পদ্মিনি-রতন সিনহ-আলাউদ্দিন খিলজির গল্প শুনেছি। চিতোরগড় দেখবো বলে তাই আলাদা উৎসাহ ছিল। অটোতে এসে আমাদের প্রথম স্টপ হয় কুম্ভ শ্যাম মন্দিরে। রাণা কুম্ভ এই মন্দিরটি বানান। স্থাপত্যে পুরীর অগন্নাথ মন্দিরের সাথে ভালোই মিল রয়েছে এই মন্দিরটির। কথিত আছে, ভোজরাজের স্ত্রী মীরাবাঈ এই মন্দিরেই শ্রী কৃষ্ণের উপাসনা করতেন। রাজপ্রাসাদের বাহুল্য তার কাছে অপ্রয়োজনীয় ছিল। তিনি স্বামীর অনুমতি নিয়ে এই মন্দিরেই সময় কাটাতেন। সূর্যবংশী হওয়া সত্ত্বেও ভোজরাজ তার স্ত্রীর ইচ্ছাকে সম্মান জানিয়ে কৃষ্ণের উপাসনা চলতে দিলেও ওনার মৃত্যুর পর পরিবারের বাকিরা মীরাকে এখান থেকে সরানোর জন্য উঠে পড়ে লাগেন। সেই চিরাচরিত পারিবারিক সাতকাহন। মীরাকে নানান পরীক্ষার সম্মুখীন হতে হয়। প্রতিবারই ভক্তির জোরে রক্ষাও পান। অবশেষে বীতশ্রদ্ধ হয়ে মীরা চিতোর ছেড়ে চলে যান। কুম্ভ শ্যাম মন্দিরের পাশেই রয়েছে একটি ছোট মীরা মন্দির।
মন্দির দেখে আমাদের পরবর্তী গন্তব্য পদ্মিনীর প্যালেস। চিতোরগড় এতটাই বড় যে পায়ে হেঁটে ঘুরে দেখা অসম্ভব। কেল্লায় ঢুকতেই আমাদের বেশ অনেকগুলো ফটক পার হতে হয়েছিল। আমাদের গাইডের কোথায়, "Garh ho toh Chittor ka, baki sab garhaiya", অর্থাৎ কেল্লা হতে হয় চিতোরের মত হবে। বাকিরা ধারেকাছেও লাগেনা। এমন নাকি কথিত আছে।
পদ্মিনীর প্যালেসের কাছে এসে গাইড বললেন ইতিহাসের কথা। রতন সিং ও পদ্মিনীর কথা। পদ্মিনী নাকি এতটাই সুন্দরী ছিলেন, এমন তার গায়ের রঙ ছিল যে উনি নাকি যখন জল খেতেন, বাইরে থেকে দেখা যেত জল নামছে গলা দিয়ে। আলাউদ্দিন খিলজি জনশ্রুতিতে জেনেছিলেন এই সৌন্দর্যের কথা। তার বহু পীড়াপীড়িতে রাজপুতরা অবশেষে রাজি হন পদ্মিনীর সৌন্দর্যের সাথে আলাউদ্দিনের পরিচয় ঘটাতে। তবে অবশ্যই ছলের মাধ্যমে। বৈজ্ঞানিক উপায়ে (রিফ্লেকশন রিফ্র্যাকশনের নানান কম্বিনেশনে) আলাউদ্দিন দেখলেন তার স্বপ্নসুন্দরীকে। আর যথারীতি মাথা ঘুরে গেল তার। পদ্মিনীকে জয় করার উদ্দেশ্যে আক্রমণ করলেন চিতোর। বীরপুরুষ রাজপুতরা প্রাণ দিয়ে বাপ্পা রাওালের প্রতিষ্ঠিত মেওয়ার রাজ্যের রাজধানী চিতোরকে বাঁচানোর চেষ্টা করেন। সেই জুদ্ধে পরাজিত হন পরম শৌর্যের নিদর্শন দেখিয়েও। আর তারপরে পদ্মিনী তার ১৩০০ সঙ্গিনীকে নিয়ে "জোউহর" করেন, অর্থাৎ শত্রুর হাতে নিজেদের তুলে দেওয়ার চেয়ে প্রাণ দিয়ে দেন বিরাট চন্দন কাঠের আগুনে। রাজপুতমেয়েরাও যে সমান বীরাঙ্গনা, তার নিদর্শন পদে পদে রাজস্থানের বিভিন্ন গড়ে পাওয়া গেছে। চিতোরগড়েই তিনবার জোউহর হয়েছে বিভিন্ন শতাব্দীতে।
পদ্মিনীর প্যালেসের ধারের পদ্ম পুকুরটির আজ শোচনীয় অবস্থা। ঠিকমতো রক্ষণাবেক্ষণ হয়না। যে আয়না ঘরে বসে আলাউদ্দিন রিফ্লেকশন দেখেছিলেন, সেইটিও সাম্প্রতিক বিতর্কের জেরে ""vandalised" হওয়ায় এখন তালাবন্দী হয়ে আছে। সে আয়না ভাংচুর করে ফেলেছে কিছু উত্তেজিত জনতা। এক টুকরো ইতিহাস চিরতরে হারিয়ে গেল। জানিনা কি করে এডমিনিস্ট্রেশন এগুলো হতে দিল। শাস্তিও কেউ পেয়েছে বলে তো শুনিনি। প্যালেসের বাগানে ফুলে ভর্তি। সুন্দর দৃশ্য। কিন্তু গড়ের ক্ষতির উদাহরণ দেখে ততক্ষণে আমার মন খারাপ হয়ে গিয়েছিল।
এরপর আমরা গেলাম চিতোরগড়ের অন্যতম বিখ্যাত বিজয় স্তম্ভে। মালওয়া আর গুজরাটে জয় লাভ করে রাণা কুম্ভ এই বিরাট স্তম্ভটি বানান। মোট নয় তলা। প্রতিটি তলায় হিন্দু ধর্মের বিভিন্ন ঘটনা খোদাই করা। অসম্ভব সুন্দর স্থাপত্য। সময়ের অভাবে সিঁড়ি বেয়ে উঠে ওপর থেকে চিতোরগড় শহরের দৃশ্য দেখার সুযোগ হয়নি। কাছেই জউহরের জায়গাটিও দেখলাম। সেখানে পাশে সতী মায়ের মন্দির রয়েছে। জউহরের কুয়োতে অনেক গরু ছাগল ও অনেক সময় শিশুরাও পড়ে যেত বলে সেটি এখন মাটি চেপে দিয়েছে।
এছাড়া চিতোরগড় অঞ্চলে দেখার মত রয়েছে কিছু জৈন মন্দির, কীর্তি স্তম্ভ। আর রয়েছে গোমুখ। একটি জলাশয় যেখানে জল আসে প্রাকৃতিক কারণে। গরুর মুখের মতো দেখতে সেই জলের সোর্সটি। এই জলকে স্থানীয়রা উপাসনা করেন।
ফেরার পথে কালীমাতার মন্দির চোখে পড়ল। সেখানে তখন প্যান্ডেল করে বড় কোন পুজো যজ্ঞ চলছিল। ঘণ্টা আড়াই কাটিয়ে আমরা ফিরলাম পারকিং লটে। দুপুরের খাওয়া সেরে এবারের গন্তব্য উদয়পুর।
মানুষ ভাবে এক, হয় আরেক। আমার ক্ষেত্রেও তার কোন ব্যতিক্রম হলনা। এই কদিন ঘুরে বেরিয়ে বুঝে গিয়েছিলাম যে আর যাই হোক, দিনেরবেলা ওইসব রংচঙে ঝলমলে সিন্থেটিক পড়া যাবেনা। অগত্যা, আজমের থেকে চিতোর যাওয়ার সময় আমায় এমনি সাধারণ পোশাকই পড়তে হল। "আমার আর পদ্মিনী সাজা হল না!"
সকাল সকালই বেরিয়ে পড়েছিলাম।। বাসে ব্রেকফাস্ট সেরে চিতোর পৌঁছোতে পৌঁছোতে প্রায় সাড়ে দশটা এগারোটা বেজে গিয়েছিল। পারকিং লটে গাড়ি দাঁড় করানো হল বটে। কিন্তু নামতে গিয়ে বিপত্তি। একটা বিরাট পোষা হাতি রাস্তা আটকে ছিল। হেলতে দুলতে সে বেশ খানিক পরে রাস্তা ছাড়ল। ছাড়পত্র পেতে তাকে বাসের জানলা দিয়ে কমলা লেবু, বান রুটি এইসব ঘুষ দিতে হয়েছিল। অটো চেপে আমাদের চিতোর দর্শন হবে ঠিক হল। হাতির পিঠে চেপেও করা যায়। তবে তা অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং সময়ও পেরিয়ে গিয়েছিল। বোধহয় সকাল এগারোটা অবধিই চলে এই হস্তিবিহার। ২৯জনের দলকে মোটামুটি ছটা অটোতে চাপিয়ে রওনা দেওয়া হল। একটি অটোর ড্রাইভার আমাদের গাইডের কাজ করবেন। লক্ষ্য করলাম প্রতিটি অটোর সামনে কাঁচের ওপর সত্যিকার সাটানো। "আমরা পদ্মাবতী সিনেমার ঘোরতর বিরোধ করি।" হিন্দিতে লেখা। বুঝলাম, হাওয়া বেশ গরম। আলটপকা মন্তব্যও করলেই মুশকিল।
চিতোরগড় ভারতের অন্যতম বড় গড়ের মধ্যে অন্যতম। শুধুমাত্র বিশাল আকৃতির জন্যই না, বরং চিতোর আমাদের সকলের মনে দাগ কাটে তার বীরত্বের জন্য, প্রেমের জন্য। সাম্প্রতিক কালে নানান বিতর্কের জন্য সারা দেশ পদ্মিনীর কথা জানলেও আমরা কিন্তু বহু আগে থেকেই পদ্মিনি-রতন সিনহ-আলাউদ্দিন খিলজির গল্প শুনেছি। চিতোরগড় দেখবো বলে তাই আলাদা উৎসাহ ছিল। অটোতে এসে আমাদের প্রথম স্টপ হয় কুম্ভ শ্যাম মন্দিরে। রাণা কুম্ভ এই মন্দিরটি বানান। স্থাপত্যে পুরীর অগন্নাথ মন্দিরের সাথে ভালোই মিল রয়েছে এই মন্দিরটির। কথিত আছে, ভোজরাজের স্ত্রী মীরাবাঈ এই মন্দিরেই শ্রী কৃষ্ণের উপাসনা করতেন। রাজপ্রাসাদের বাহুল্য তার কাছে অপ্রয়োজনীয় ছিল। তিনি স্বামীর অনুমতি নিয়ে এই মন্দিরেই সময় কাটাতেন। সূর্যবংশী হওয়া সত্ত্বেও ভোজরাজ তার স্ত্রীর ইচ্ছাকে সম্মান জানিয়ে কৃষ্ণের উপাসনা চলতে দিলেও ওনার মৃত্যুর পর পরিবারের বাকিরা মীরাকে এখান থেকে সরানোর জন্য উঠে পড়ে লাগেন। সেই চিরাচরিত পারিবারিক সাতকাহন। মীরাকে নানান পরীক্ষার সম্মুখীন হতে হয়। প্রতিবারই ভক্তির জোরে রক্ষাও পান। অবশেষে বীতশ্রদ্ধ হয়ে মীরা চিতোর ছেড়ে চলে যান। কুম্ভ শ্যাম মন্দিরের পাশেই রয়েছে একটি ছোট মীরা মন্দির।
মন্দির দেখে আমাদের পরবর্তী গন্তব্য পদ্মিনীর প্যালেস। চিতোরগড় এতটাই বড় যে পায়ে হেঁটে ঘুরে দেখা অসম্ভব। কেল্লায় ঢুকতেই আমাদের বেশ অনেকগুলো ফটক পার হতে হয়েছিল। আমাদের গাইডের কোথায়, "Garh ho toh Chittor ka, baki sab garhaiya", অর্থাৎ কেল্লা হতে হয় চিতোরের মত হবে। বাকিরা ধারেকাছেও লাগেনা। এমন নাকি কথিত আছে।
পদ্মিনীর প্যালেসের কাছে এসে গাইড বললেন ইতিহাসের কথা। রতন সিং ও পদ্মিনীর কথা। পদ্মিনী নাকি এতটাই সুন্দরী ছিলেন, এমন তার গায়ের রঙ ছিল যে উনি নাকি যখন জল খেতেন, বাইরে থেকে দেখা যেত জল নামছে গলা দিয়ে। আলাউদ্দিন খিলজি জনশ্রুতিতে জেনেছিলেন এই সৌন্দর্যের কথা। তার বহু পীড়াপীড়িতে রাজপুতরা অবশেষে রাজি হন পদ্মিনীর সৌন্দর্যের সাথে আলাউদ্দিনের পরিচয় ঘটাতে। তবে অবশ্যই ছলের মাধ্যমে। বৈজ্ঞানিক উপায়ে (রিফ্লেকশন রিফ্র্যাকশনের নানান কম্বিনেশনে) আলাউদ্দিন দেখলেন তার স্বপ্নসুন্দরীকে। আর যথারীতি মাথা ঘুরে গেল তার। পদ্মিনীকে জয় করার উদ্দেশ্যে আক্রমণ করলেন চিতোর। বীরপুরুষ রাজপুতরা প্রাণ দিয়ে বাপ্পা রাওালের প্রতিষ্ঠিত মেওয়ার রাজ্যের রাজধানী চিতোরকে বাঁচানোর চেষ্টা করেন। সেই জুদ্ধে পরাজিত হন পরম শৌর্যের নিদর্শন দেখিয়েও। আর তারপরে পদ্মিনী তার ১৩০০ সঙ্গিনীকে নিয়ে "জোউহর" করেন, অর্থাৎ শত্রুর হাতে নিজেদের তুলে দেওয়ার চেয়ে প্রাণ দিয়ে দেন বিরাট চন্দন কাঠের আগুনে। রাজপুতমেয়েরাও যে সমান বীরাঙ্গনা, তার নিদর্শন পদে পদে রাজস্থানের বিভিন্ন গড়ে পাওয়া গেছে। চিতোরগড়েই তিনবার জোউহর হয়েছে বিভিন্ন শতাব্দীতে।
পদ্মিনীর প্যালেসের ধারের পদ্ম পুকুরটির আজ শোচনীয় অবস্থা। ঠিকমতো রক্ষণাবেক্ষণ হয়না। যে আয়না ঘরে বসে আলাউদ্দিন রিফ্লেকশন দেখেছিলেন, সেইটিও সাম্প্রতিক বিতর্কের জেরে ""vandalised" হওয়ায় এখন তালাবন্দী হয়ে আছে। সে আয়না ভাংচুর করে ফেলেছে কিছু উত্তেজিত জনতা। এক টুকরো ইতিহাস চিরতরে হারিয়ে গেল। জানিনা কি করে এডমিনিস্ট্রেশন এগুলো হতে দিল। শাস্তিও কেউ পেয়েছে বলে তো শুনিনি। প্যালেসের বাগানে ফুলে ভর্তি। সুন্দর দৃশ্য। কিন্তু গড়ের ক্ষতির উদাহরণ দেখে ততক্ষণে আমার মন খারাপ হয়ে গিয়েছিল।
এরপর আমরা গেলাম চিতোরগড়ের অন্যতম বিখ্যাত বিজয় স্তম্ভে। মালওয়া আর গুজরাটে জয় লাভ করে রাণা কুম্ভ এই বিরাট স্তম্ভটি বানান। মোট নয় তলা। প্রতিটি তলায় হিন্দু ধর্মের বিভিন্ন ঘটনা খোদাই করা। অসম্ভব সুন্দর স্থাপত্য। সময়ের অভাবে সিঁড়ি বেয়ে উঠে ওপর থেকে চিতোরগড় শহরের দৃশ্য দেখার সুযোগ হয়নি। কাছেই জউহরের জায়গাটিও দেখলাম। সেখানে পাশে সতী মায়ের মন্দির রয়েছে। জউহরের কুয়োতে অনেক গরু ছাগল ও অনেক সময় শিশুরাও পড়ে যেত বলে সেটি এখন মাটি চেপে দিয়েছে।
এছাড়া চিতোরগড় অঞ্চলে দেখার মত রয়েছে কিছু জৈন মন্দির, কীর্তি স্তম্ভ। আর রয়েছে গোমুখ। একটি জলাশয় যেখানে জল আসে প্রাকৃতিক কারণে। গরুর মুখের মতো দেখতে সেই জলের সোর্সটি। এই জলকে স্থানীয়রা উপাসনা করেন।
ফেরার পথে কালীমাতার মন্দির চোখে পড়ল। সেখানে তখন প্যান্ডেল করে বড় কোন পুজো যজ্ঞ চলছিল। ঘণ্টা আড়াই কাটিয়ে আমরা ফিরলাম পারকিং লটে। দুপুরের খাওয়া সেরে এবারের গন্তব্য উদয়পুর।
Thursday, January 18, 2018
আমার চোখে রাজস্থান পর্ব ৫ (পুষ্কর ও আজমের)
আলো ফোটেনি, এমন অবস্থাতেই আমরা জয়পুর থেকে রওনা দিলাম পুষ্করের উদ্দেশ্যে। ঘুম ঘুম চোখে জানলার ধারে চাদর দিয়ে মাথা ঢেকেঢুকে, যা ঠাণ্ডা। কানে চলছে গান, চোখে রাত্রের কোটার বাকি ঘুম। বাস চলছে মেওয়ারের রাস্তা বেয়ে। এগারোটার দিকে জানলার বাইরে দিয়ে উট চোখে পড়তে লাগল। কিছু এমনিই বুনো উট, কিছু পোশ্য, সাজিয়ে গুছিয়ে রাখা। বুঝলাম, পুষ্কর পৌঁছলাম। আসলে পুষ্কর মানেই জানি ক্যামেল ফেয়ার। কার্ত্তিক মাসের পূর্ণিমা অবধি চলে, প্রতি বছর। তখন সাড়া দেশ থেকে, এমন কি বিদেশ থেকেও লোকজন ভিড় করে এই পুষ্করে। ছবি তোলার জন্য এক্কেবারে পারফেক্ট। বিভিন্ন ম্যাগাজিনে ছবি দেখেই পুষ্করের সাথে আমার পরিচয়। তবে এছাড়াও পুষ্করে যে দেখার মধ্যে হ্রদ আর মন্দির আছে, সেই বিষয়ে আমার তেমন ধারণা ছিলনা। ট্রাভেল এজেন্সির আইটিনারি দেখে তবে জেনেছি।
প্রত্যেকবার কোথাও বেড়াতে গেলে আগে সেই জায়গার ওপর বেশ অনেক পড়াশোনা করে যাওয়ার চেষ্টা করি। দুর্ভাগ্যবশত এই ট্রিপে তা করতে পারিনি। এক তো সময়ের অভাব ছিল। দুই, ভেবেছিলাম আশা করে থাকব, এই দেখবো, সেই দেখবো, অথচ তারপরে ট্রাভেল এজেন্সি বলে আদ্ধেক জিনিসই বাদের তালিকায় চলে যাবে, তখন মন খারাপ হবে। তাই প্রতিদিন রাত্রে পরেরদিনের জায়গাটি সম্বন্ধে নেটে অল্প করে পড়ে রাখতাম। সেইরকমই জেনেছিলাম, পুষ্করের হ্রদ নাকি বিখ্যাত পুণ্যস্থান। ওই হ্রদের জলের বুঝি ঔষধি গুণ আছে। সেই জল স্পর্শ করলে মানুষের চর্মরোগ সেরে যায়। দেশের বিভিন্ন প্রান্তও থেকে তাই লোকেরা এই হ্রদে আসে, পুণ্যস্নান করতে। কাছেই ব্রহ্মার মন্দির। সারা পৃথিবীতে নাকি আর কোথাও ব্রহ্মার মন্দির নেই।
পারকিং লটে বাস থেকে নেমে বেশ কিছুটা হেঁটে যেতে হল। শুরুতে বালি বালি রাস্তাঘাট। উটেরা সারি দিয়ে বসে আছে। কোন কোন গুলোর দিকে তাকিয়ে মায়া হল। কিছু উটমালিক আমাদের ধরাধরি করতে লাগলেন, ক্যামেল সাফারির জন্য। প্রত্যেককেই মানা করে দিলাম। জয়সালমেরে এমনিই আমাদের প্রোগ্রামে ঠিক করা আছে ক্যামেল সাফারি। হেঁটে যখন মন্দিরের কাছাকাছি পৌঁছে যাচ্ছি, তখন শুনলাম যে আর জুতো পরে যাওয়া যাবেনা। মন্দিরে জুতো চল্বেনা, সেটা যেমন স্বাভাবিক, ঠিক তেমনি অদ্ভুত লাগল যে তা বলে এত আগে থেকে কেন জুতো ছাড়তে হবে। জুতো রাখার জন্য দোকানগুলো জোরাজুরি করছিল। জুতো রাখতে দেওয়া যাবে যদি পুজোর ডালা ওদের থেকে কেনা হয়। আমি খুব বেশী মন্দির দর্শনে উৎসাহী থাকিনা সচরাচর। তা ছাড়া সেখানে যদি শুনি এরকম খুব ভিড়, তাহলে তো কথাই নেই। বাইরে থেকে, দূর থেকে নমস্কার করে চলে আসব। আমার বাবা আর কাকাও ওরকম। আমরা তিনজন মন্দির গেলাম না। মা গেলো বাকিদের সাথে। ইতিমধ্যে আমরা তিনজন হাঁটা লাগালাম হ্রদের দিকে। রাস্তা জুড়ে দুইদিকে দোকানীরা পসরা সাজিয়ে বসেছে। কত রঙ, কত হস্তশিল্প। দাঁড়িয়ে দেখে মুগ্ধ হতে হয়। কোথাও উটের প্রতিকৃতি তো কোথাও হাতি। কাঁচের কাজ করা ব্যাগ। মাটির ওপর নানান রঙের কাজের ওয়াল হ্যানগিং। কাপড়ের পুতুল। শাড়ি। জামা। সব মিলিয়ে জমজমাট। একটু দরদাম করলাম পছন্দের জিনিসের। কিন্তু মা সাথে না থাকায় সাহস করে কিনলাম না। হ্রদে পৌঁছে দেখি মোটামুটি ভিড়। লোকজন ঘাটে বসে পুজো করছেন, স্নান করছেন। কিন্তু জলের যা অবস্থা দেখলাম, মনে হল যে এই জলে স্নান করলে চর্মরোগ তো সারবেই না, উল্টে নতুন করে হয়ে যাবে। পুষ্করিণীর জলের সংস্করণ চলছে শুনলাম, কী জানি, কিছু তো বুঝলাম না। এমনি বেশ সুন্দর, অনেকটা বড়, হ্রদ। চারপাশে পাহাড় ঘেরা। দেখতে ভালো। কিন্তু ঘাট বড্ড পিছল। খানিকক্ষণ ঘাটে দাঁড়িয়ে চারিদিক দেখতে দেখতে মায়েরা এলো। পুজোর প্রসাদ মুখে দিয়ে তারপরে ফেরত চললাম বাসের দিকে। পথে দোকানগুলোতে ঢুঁ মেরে চলল অল্পবিস্তর কেনাকাটি। সাবিত্রী মাতার মন্দির অনেক উঁচুতে থাকায় কেউই যায়নি।
পুষ্কর হয়ে তারপরে বাস চলল আজমেরের পথে। আজমের শহরটি তো আজমের শরিফ দরগার জন্য বিশ্ববিখ্যাত। পৃথিবীর নানা জায়গা থেকে মানুষ আসেন, বিভিন্ন ধর্মাবলম্বীরা মাথা ঠেকায়, চাদর চড়ায় এখানে। পথে চোখে পড়ল বিশাল আনা সাগর লেকের। হোটেলে পৌঁছে স্নান সেরে খেয়ে একটু বিশ্রাম নিয়ে বেরোনোর কথা দরগায়। দুপুরের খাবার রেডি হতে দেরি হছহিল বলে পাশেই থাকা একটু মিষ্টির দোকান থেকে গরম গরম গোলাপ জাম মিষ্টি খেলাম। আহ, কী অপূর্ব সে স্বাদ। ঘিয়ে ভাজা মিষ্টি। রাজস্থান জুড়ে নানান জায়গায় বেশ সুন্দর সুন্দর সুস্বাদু অনেক মিষ্টি খেয়েছি। কিন্তু ক্যালোরি কনশাস হলেই শেষ!
দরগা অঞ্চলে খুব ভিড় হয়, আর তার সাথে সাথে নাকি পকেটমারির খুব প্রকোপ। তাই ম্যানেজার কাকু বললেন ক্যামেরা বা ফোন সাথে না নিয়ে যাওয়াই ভালো। (যদিও ওইদিন একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ফোন আসার কথা ছিল আমার, তাই আমি ফোন নিয়ে বেরিয়েছিলাম। আর তাই অল্প হলেও কয়েকটা ছবি তুলেছি।) আর টাকাও খুব কম রাখতে। এই একটা আফসোস আমার রয়ে গেল। দরগার সামনের রাস্তা জুড়ে যে বাজার বসে, সেখানে এত অভাবনীয় কম দামে এত বিচিত্র পসরা, ভাবা যায় না। কি সস্তা কি সস্তা! সাথে পর্যাপ্ত টাকা ছিল না বলে বড় মিস করলাম এই শপিঙের চান্স।
দরগায় আমরা চাদর চড়াইনি। শুধু ফুল দিয়ে শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করেছিলাম। দরগাটি বেশ একটা বড় কম্পাউন্ডের মধ্যে। অনেকগুলি সাদা মার্বেলের বিল্ডিং। একটি মসজিদ রয়েছে। গেটে উর্দুতে ঈশ্বরচেতনার (ঈশ্বর কি বলা চলবে? জানিনা) বাণী লিপিবদ্ধ। খাদিম যিনি ছিলেন ভিতরে, এত দরদ দিয়ে আন্তরিকভাবে দুয়া পড়লেন আমাদের জন্য, মনের মধ্যে একটা অদ্ভুত প্রশান্তি এসে গেল। সেই সম্রাট আকবরের আমল থেকে শুরু করে আজও লোকের ঢল নামে এখানে। এতটাই জাগ্রত এই দরগা। এখানে মাথা ঠেকাতে পেরে ভালো লেগেছিল খুব।
দরগার পর আমরা যাই আনা সাগর লেকে। পৃথ্বীরাজ চৌহানের ঠাকুরদার তৈরি করা এই লেক। তেরো কিলোমিটার লম্বা এই লেক। শহরের জলের কষ্ট নিবারণ করতেই বানানো এটি। বিশাল জায়গা জুড়ে, পাশে সুন্দর পার্ক বানিয়ে সাজিয়ে গুছিয়ে রাখা। মোঘল সম্রাট শাহ জাহান ও জাহাঙ্গীরের তৈরি এই ধারের বারাদারি আর ঘট। যতক্ষণে আমরা আনা সাগরে পৌঁছই, সূর্যাস্তের সময় এসে গিয়েছে। দিগন্তবিস্তৃত আকাশ তখন লালের ছটায় রঙিন। তার ব্যাকড্রপে দেখছি দিনের শেষে সমস্ত পাখিরা ঘরে ফিরছে। সে এক মায়াবী দৃশ্য।
আমাদেরও এদিনের মত এবার ঘরে ফেরার পালা। আগামীকাল উদয়পুর যাবো। চিতোরগড় হয়ে। রাণী পদ্মিনীর গল্প শুনে বড় হওয়া। পদ্মাবতী সিনেমার ট্রেলার গান শুনে সেই উৎসাহ আরো বেড়ে যাওয়া। সব মিলিয়ে, মন উসখুস। কতক্ষণে পৌছব চিতোর।
প্রত্যেকবার কোথাও বেড়াতে গেলে আগে সেই জায়গার ওপর বেশ অনেক পড়াশোনা করে যাওয়ার চেষ্টা করি। দুর্ভাগ্যবশত এই ট্রিপে তা করতে পারিনি। এক তো সময়ের অভাব ছিল। দুই, ভেবেছিলাম আশা করে থাকব, এই দেখবো, সেই দেখবো, অথচ তারপরে ট্রাভেল এজেন্সি বলে আদ্ধেক জিনিসই বাদের তালিকায় চলে যাবে, তখন মন খারাপ হবে। তাই প্রতিদিন রাত্রে পরেরদিনের জায়গাটি সম্বন্ধে নেটে অল্প করে পড়ে রাখতাম। সেইরকমই জেনেছিলাম, পুষ্করের হ্রদ নাকি বিখ্যাত পুণ্যস্থান। ওই হ্রদের জলের বুঝি ঔষধি গুণ আছে। সেই জল স্পর্শ করলে মানুষের চর্মরোগ সেরে যায়। দেশের বিভিন্ন প্রান্তও থেকে তাই লোকেরা এই হ্রদে আসে, পুণ্যস্নান করতে। কাছেই ব্রহ্মার মন্দির। সারা পৃথিবীতে নাকি আর কোথাও ব্রহ্মার মন্দির নেই।
পারকিং লটে বাস থেকে নেমে বেশ কিছুটা হেঁটে যেতে হল। শুরুতে বালি বালি রাস্তাঘাট। উটেরা সারি দিয়ে বসে আছে। কোন কোন গুলোর দিকে তাকিয়ে মায়া হল। কিছু উটমালিক আমাদের ধরাধরি করতে লাগলেন, ক্যামেল সাফারির জন্য। প্রত্যেককেই মানা করে দিলাম। জয়সালমেরে এমনিই আমাদের প্রোগ্রামে ঠিক করা আছে ক্যামেল সাফারি। হেঁটে যখন মন্দিরের কাছাকাছি পৌঁছে যাচ্ছি, তখন শুনলাম যে আর জুতো পরে যাওয়া যাবেনা। মন্দিরে জুতো চল্বেনা, সেটা যেমন স্বাভাবিক, ঠিক তেমনি অদ্ভুত লাগল যে তা বলে এত আগে থেকে কেন জুতো ছাড়তে হবে। জুতো রাখার জন্য দোকানগুলো জোরাজুরি করছিল। জুতো রাখতে দেওয়া যাবে যদি পুজোর ডালা ওদের থেকে কেনা হয়। আমি খুব বেশী মন্দির দর্শনে উৎসাহী থাকিনা সচরাচর। তা ছাড়া সেখানে যদি শুনি এরকম খুব ভিড়, তাহলে তো কথাই নেই। বাইরে থেকে, দূর থেকে নমস্কার করে চলে আসব। আমার বাবা আর কাকাও ওরকম। আমরা তিনজন মন্দির গেলাম না। মা গেলো বাকিদের সাথে। ইতিমধ্যে আমরা তিনজন হাঁটা লাগালাম হ্রদের দিকে। রাস্তা জুড়ে দুইদিকে দোকানীরা পসরা সাজিয়ে বসেছে। কত রঙ, কত হস্তশিল্প। দাঁড়িয়ে দেখে মুগ্ধ হতে হয়। কোথাও উটের প্রতিকৃতি তো কোথাও হাতি। কাঁচের কাজ করা ব্যাগ। মাটির ওপর নানান রঙের কাজের ওয়াল হ্যানগিং। কাপড়ের পুতুল। শাড়ি। জামা। সব মিলিয়ে জমজমাট। একটু দরদাম করলাম পছন্দের জিনিসের। কিন্তু মা সাথে না থাকায় সাহস করে কিনলাম না। হ্রদে পৌঁছে দেখি মোটামুটি ভিড়। লোকজন ঘাটে বসে পুজো করছেন, স্নান করছেন। কিন্তু জলের যা অবস্থা দেখলাম, মনে হল যে এই জলে স্নান করলে চর্মরোগ তো সারবেই না, উল্টে নতুন করে হয়ে যাবে। পুষ্করিণীর জলের সংস্করণ চলছে শুনলাম, কী জানি, কিছু তো বুঝলাম না। এমনি বেশ সুন্দর, অনেকটা বড়, হ্রদ। চারপাশে পাহাড় ঘেরা। দেখতে ভালো। কিন্তু ঘাট বড্ড পিছল। খানিকক্ষণ ঘাটে দাঁড়িয়ে চারিদিক দেখতে দেখতে মায়েরা এলো। পুজোর প্রসাদ মুখে দিয়ে তারপরে ফেরত চললাম বাসের দিকে। পথে দোকানগুলোতে ঢুঁ মেরে চলল অল্পবিস্তর কেনাকাটি। সাবিত্রী মাতার মন্দির অনেক উঁচুতে থাকায় কেউই যায়নি।
পুষ্কর হয়ে তারপরে বাস চলল আজমেরের পথে। আজমের শহরটি তো আজমের শরিফ দরগার জন্য বিশ্ববিখ্যাত। পৃথিবীর নানা জায়গা থেকে মানুষ আসেন, বিভিন্ন ধর্মাবলম্বীরা মাথা ঠেকায়, চাদর চড়ায় এখানে। পথে চোখে পড়ল বিশাল আনা সাগর লেকের। হোটেলে পৌঁছে স্নান সেরে খেয়ে একটু বিশ্রাম নিয়ে বেরোনোর কথা দরগায়। দুপুরের খাবার রেডি হতে দেরি হছহিল বলে পাশেই থাকা একটু মিষ্টির দোকান থেকে গরম গরম গোলাপ জাম মিষ্টি খেলাম। আহ, কী অপূর্ব সে স্বাদ। ঘিয়ে ভাজা মিষ্টি। রাজস্থান জুড়ে নানান জায়গায় বেশ সুন্দর সুন্দর সুস্বাদু অনেক মিষ্টি খেয়েছি। কিন্তু ক্যালোরি কনশাস হলেই শেষ!
দরগা অঞ্চলে খুব ভিড় হয়, আর তার সাথে সাথে নাকি পকেটমারির খুব প্রকোপ। তাই ম্যানেজার কাকু বললেন ক্যামেরা বা ফোন সাথে না নিয়ে যাওয়াই ভালো। (যদিও ওইদিন একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ফোন আসার কথা ছিল আমার, তাই আমি ফোন নিয়ে বেরিয়েছিলাম। আর তাই অল্প হলেও কয়েকটা ছবি তুলেছি।) আর টাকাও খুব কম রাখতে। এই একটা আফসোস আমার রয়ে গেল। দরগার সামনের রাস্তা জুড়ে যে বাজার বসে, সেখানে এত অভাবনীয় কম দামে এত বিচিত্র পসরা, ভাবা যায় না। কি সস্তা কি সস্তা! সাথে পর্যাপ্ত টাকা ছিল না বলে বড় মিস করলাম এই শপিঙের চান্স।
দরগায় আমরা চাদর চড়াইনি। শুধু ফুল দিয়ে শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করেছিলাম। দরগাটি বেশ একটা বড় কম্পাউন্ডের মধ্যে। অনেকগুলি সাদা মার্বেলের বিল্ডিং। একটি মসজিদ রয়েছে। গেটে উর্দুতে ঈশ্বরচেতনার (ঈশ্বর কি বলা চলবে? জানিনা) বাণী লিপিবদ্ধ। খাদিম যিনি ছিলেন ভিতরে, এত দরদ দিয়ে আন্তরিকভাবে দুয়া পড়লেন আমাদের জন্য, মনের মধ্যে একটা অদ্ভুত প্রশান্তি এসে গেল। সেই সম্রাট আকবরের আমল থেকে শুরু করে আজও লোকের ঢল নামে এখানে। এতটাই জাগ্রত এই দরগা। এখানে মাথা ঠেকাতে পেরে ভালো লেগেছিল খুব।
দরগার পর আমরা যাই আনা সাগর লেকে। পৃথ্বীরাজ চৌহানের ঠাকুরদার তৈরি করা এই লেক। তেরো কিলোমিটার লম্বা এই লেক। শহরের জলের কষ্ট নিবারণ করতেই বানানো এটি। বিশাল জায়গা জুড়ে, পাশে সুন্দর পার্ক বানিয়ে সাজিয়ে গুছিয়ে রাখা। মোঘল সম্রাট শাহ জাহান ও জাহাঙ্গীরের তৈরি এই ধারের বারাদারি আর ঘট। যতক্ষণে আমরা আনা সাগরে পৌঁছই, সূর্যাস্তের সময় এসে গিয়েছে। দিগন্তবিস্তৃত আকাশ তখন লালের ছটায় রঙিন। তার ব্যাকড্রপে দেখছি দিনের শেষে সমস্ত পাখিরা ঘরে ফিরছে। সে এক মায়াবী দৃশ্য।
আমাদেরও এদিনের মত এবার ঘরে ফেরার পালা। আগামীকাল উদয়পুর যাবো। চিতোরগড় হয়ে। রাণী পদ্মিনীর গল্প শুনে বড় হওয়া। পদ্মাবতী সিনেমার ট্রেলার গান শুনে সেই উৎসাহ আরো বেড়ে যাওয়া। সব মিলিয়ে, মন উসখুস। কতক্ষণে পৌছব চিতোর।
Tuesday, January 16, 2018
আমার চোখে রাজস্থান পর্ব ৪ (জয়পুর)
খাম্মা ঘানি! কাল অনেক রাত্রে জয়পুরে পৌঁছলাম তো, তখন আর মাথা কাজ করছিল না। তাই এই রাজস্থানি সম্ভাষণটা করা হয়ে ওঠেনি। এখন করলাম। আজ অর্থাৎ ২৬শে ডিসেম্বর আমাদের সারাদিন জয়পুর সিটি সাইটসিইং করার কথা। হিসেব মত পঁচিশ তারিখটা আমাদের সন্ধ্যেবেলা ফ্রি থাকার কথা ছিল। মোটামুটি যত রিসোর্স আছে, সব কাজে লাগিয়ে ভালো শপিঙের জায়গার হদিস নিয়ে এসছিলাম। প্ল্যান ছিল ওইদিন ফাঁকা সময়টা শপিঙে কাজে লাগানো যাবে। তবে বাসের অনুপস্থিতি সব ভেস্তে দিল। কিন্তু নো চিন্তা! মৃত্যুঞ্জয় কাকুর থেকে গোটা দিনের একটা রাফ শিডিউল জেনে নিয়ে ঠিক করলাম, লাস্ট স্পট থেকে একটা ওলা বা উবার নিয়ে বাপু বাজার চলে যাব (এই প্রসঙ্গে বলে রাখি, জয়পুর ছাড়াও বাপু বাজার আছে উদয়পুরে। দুটোই খুব বিখ্যাত।)। পারলে বিকেল বিকেল। কারণ সাতটা সাড়ে সাতটার মধ্যে দোকান বাজার বন্ধ হয়ে যায়।
ব্রেকফাস্ট করার আগে চলল আমাদের হোটেলে একপ্রস্থ ফটোশুট। হোটেলটি রাজপুত ডাক্তার পরিবারের পৈত্রিক বাড়ি। কিছু অংশে পরিবারের লোকজন এখনো থাকেন, আর বাকিটা হেরিটেজ হোটেল হিসেবে চলে। রাজকীয় ব্যবস্থাপনা। প্রতিটিঘরের অন্দরসজ্জা যেমন খুবই রুচিসম্পন্ন, তেমনি প্রতিটি ফ্লোরের লিভিং স্পেস, রিডিং রুম, সমানভাবে সাজানো। একতলায় ড্রয়িং রুমে গতকাল রাত্রেই চোখে পড়েছিল সেনটার টেবিলটি, ওটির পায়া আসলে একটি বাঘিনী। আরেকটি ছিল, সেটি আবার উটের ওপর ভর করা। বিভিন্ন কাঠের মূর্তি, অমূল্য পেইন্টিং, সিলিঙে অনন্য কারুকার্য, হাল্কা লাইটিং, সব মিলিয়ে ছবি তোলার জন্য যাকে বলে পারফেক্ট। বেরোনোর মুখে আরেক প্রস্থ বাস সমস্যা শুরু হল। যে নতুন বাসটি আসার কথা ছিল, সেটি তখনো রেডি না বলে আবার নানান মনোমালিন্য ইত্যাদি ইত্যাদির পর রওনা দেওয়া হল। আমরা চারজন বাসের পিছনের সিট নিয়েছিলাম। বেশ খেলে ছড়িয়ে বসা যায়। ক্যামেরা হাতে আমার জায়গা ছিল জানলার ধারে। পুরনো জয়পুরের রাস্তা দিয়ে আমাদের প্রথম গন্তব্য যন্তর মন্তর। অবশ্য পথে যেতে যেতে প্রথমেই আমাদের ডানদিকে দেখিয়ে দেওয়া হল রাজমন্দির সিনেমা হল। এই সিনেমা হলটির বৈশিষ্ট্য বলতে খুব সুন্দর করে সাজিয়ে রাখা নাকি ভিতরে। বাইরে থেকেও বেশ একধরণের ফরাসী মিষ্টির মত দেখতে। সময়ের অভাবে আর ভিতরে যাওয়া হয়নি। অনেক ট্যুরিস্ট এখানে সিনেমা দেখেন। আমার বাবা ১৯৯৭ সালে যখন জয়পুর এসেছিল, তখন সদ্য মুক্তিপ্রাপ্ত জুড়ওয়া সিনেমাটি দেখেছিল এখানে।
এরপরই আমাদের পথে পড়ল জয়পুরের বিখ্যাত হাওয়া মহল। আমাদের বাঁ দিকে। পরে ভিতরে এক্সপ্লোর করা হবে। তখন শুধুমাত্র বাইরে থেকে দেখে নেওয়া হল। জয়পুর বললে ছোট থেকে যা বুঝি, তা কিন্তু হাওয়া মহল। বিরাট একটা গোলাপী স্থাপত্য, অনেকটা মৌমাছিদের বাসার মত। বাসটা ওই জায়গায় ট্রাফিকের জন্য এমনিই আস্তে চলছিল, তাই ওই বিরাট ফ্যাকেডের ছবি তুলতে অসুবিধে হয়নি। "পিঙ্ক সিটি"র রাস্তায় এরপর দেখলাম লাইন দিয়ে গোলাপী রঙের বাড়ি, বিভিন্ন দোকান। অনেকটা আমাদের ধর্মতলা নিউ মার্কেট চত্বরের মত। সারি দিয়ে শুধুই দোকান। ওই সকালে তখনো দোকানগুলি খোলেনি। গোলাপী রঙটা ঠিক আমাদের পরিচিত গোলাপী বলা যায় না। খানিকটা যেন কমলা মিশিয়ে দেওয়া। তবে প্রতিটি দেওয়ালে ওই গোলাপীর ওপর খুব নিখুঁত ভাবে সাদা দিয়ে বর্ডার এঁকে আলপনা দেওয়া। দেখতে বেশ ভালো লাগছিল।
যন্তর মন্তরে পৌঁছলাম। পারকিং থেকে স্পটে যাওয়ার পথে দেখলাম অনেক দানা বিক্রি হচ্ছে। লোকে কিনে কিনে পায়রাদের খাওয়াচ্ছে। রাজস্থানিরা মনে করেন যে এতে পুণ্য হয়। গোটা রাজস্থান জুড়েই খুব দেখেছি এই ব্যাপারটা। আরেকটা জিনিস যেটা লক্ষ্য করলাম, সমস্ত ট্যুরিস্ট স্পটের ধারেকাছেই ভর্তি হকার, রঙ বেরঙের পসরা সাজিয়ে। মাথার পাগড়ি থেকে শুরু করে চাবির রিং, জামা, ঘর সাজানোর জন্য ছোট ছোট মূর্তি, ওয়াল হ্যানগিং, ইত্যাদি। ওই রঙ দেখলেই মন ভালো হয়ে যায়। অনেকে বলেন যে রাজস্থান রুক্ষ, মরুভূমির দেশ। তাই মানুষজন পোশাকে রঙের খুব ব্যবহার করেন মন মেজাজ ভালো রাখতে। এই প্রসঙ্গে বলি, রাজস্থান মূলত দুই ভাগে বিভক্তঃ মেওয়ার ও মাড়োওয়ার। মেওয়ার দিব্যি সবুজ, চাষ হয়, অনেক গাছপালা আছে। জয়পুর উদয়পুর চিতোর সব মেওয়ারে। মাড়োওয়ার বালির জায়গা। যোধপুর জয়সালমের। যাই হোক, যা বলতে গিয়ে এতগুলো কথা বলে ফেললাম। সেই দোকানিদের থেকে দরদাম করে বেশ একটা হলুদ লাল সবুজ মেশানো পাগড়ি কিনে ফেললাম।
যন্তর মন্তরে ঢুকে দেখলাম দেখলাম এবং আশ্চর্য হলাম (যারা দিল্লীতে যন্তর মন্তর ঘুরেছেন, শুনেছি সেটা নাকি আরো মনোগ্রাহী)। নিজে ইঞ্জিনিয়ারিং সায়েন্সের স্টুডেন্ট বলেই যেন ওই প্রাচীন যুগে ভারতীয়দের টেকনলজিকাল এডভান্সমেন্টের এই দারুণ নিদর্শন দেখে বেশ একটা গর্ববোধ করছিলাম। আজকের যুগে দাঁড়িয়ে হয়তো ওই যন্ত্রগুলির কোনটারই তেমনভাবে কোন প্রয়োজনীয়তা নেই, কিন্তু সেই আমলে এস্ট্রোনমি চর্চার জন্য যে এমন সব যন্ত্র বানানো হয়েছিল সাওাই জয় সিং দ্বিতীয়র আমলে, তা সত্যিই কুর্নিশ যোগ্য। যন্তর মন্তরটি ইয়ুনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট হিসেবে স্বীকৃত, পৃথিবীর সর্ব বৃহৎ সানডায়ালটি এখানেই রয়েছে। যন্তর মন্তরের মূল কমপ্লেক্স থেকে সিটি প্যালেস আর দূরে নাহারগড় কেল্লা দেখা যায়। এরপরের গন্তব্য সিটি প্যালেস। তবে নাহারগড় আমাদের শিডিউলে ছিলনা। নাহারগড়ের নাম সম্ভবত সব বাঙালিরা আমরা প্রথম শুনি সোনার কেল্লা পড়তে গিয়ে (আমার তো মনে হয় বাঙালির রাজস্থান প্রীতির একটা অন্যতম কারণ সত্যজিৎ রায়, ফেলুদা।)। এইখান থেকেই ডঃ হাজরাকে ঠেলে ফেলে দেয় মন্দার বোস এন্ড কোং।
সিটি প্যালেসটিো তৈরি হয় মহারাজা জয় সিং দ্বিতীয়র আমলে। জনসংখ্যা বাড়ার কারণে আমের থেকে রাজধানী সরিয়ে যখন জয়পুরে আনা হয়, এক বাঙালি স্থপতি ছিলেন অন্যতম। জালেব চৌকের কাছে উদয়পোল দিয়ে সিটি প্যালেসে আমরা এলাম টিকিট কেটে। প্রথমেই এলাম মুবারক মহলে। এই মহলটিতে রয়েছে মিউজিয়াম। মিউজিয়ামের ভিতরে রাজা মহারাজাদের ব্যবহার করা পোশাক অস্ত্রের বিচিত্র সম্ভার। নজর কেড়েছিল সাওয়াই মাধো সিংজীর বিরাট পোশাক। মুবারাক মহলের পরে সিটি প্যালেস কমপ্লেক্সেই আমাদের পরবর্তী গন্তব্য ছিল চন্দ্র মহল। ভিতরে মিউজিয়াম ছিল, তবে যাইনি। সেই জায়গায় বাইরেটা ঘুরে ঘুরে দেখছিলাম। গোলাপী রঙের ওপর খুব সূক্ষ্ম কারুকার্য অন্য মাত্রা এনে দিয়েছিল। সিটি প্যালেসেই চোখে পড়ল দুইটি বিরাট কলসীর, স্টারলিং রুপোর তৈরি। গাইড বললেন যে ওইটি নাকি গিনেস রেকর্ড হোল্ডার। চার হাজার লিটার জল ধরবে ওতে। ভাবতেই চোখ গোল হয়ে গেল! সিটি প্যালেসে ঘুরতে ঘুরতে আমাদের দলের এক বয়স্ক মানুষ হঠাৎ বেপাত্তা হয়ে গেলেন। এদিকে তার সাথে ফোন নেই, খোঁজ খোঁজ করতে করতে অনেক পরে ওনাকে পাওয়া গেল। উনি নাকি ভিতরে অত হাঁটাহাঁটি করতে পারবেন না বলে বাইরেই ছিলেন। বোঝো কাণ্ড!
সিটি প্যালেসের পর আমাদের পরের গন্তব্য আমের ফোরট। পথে জলমহল পড়ল। দেখলাম মান সাগর হ্রদের জলের মধ্যে একটা প্রাসাদ। কথা রইলো ফেরার পথে নেমে ফটো তোলা যাবে। একটা পারকিং লটে বাস থামিয়ে ওখানেই প্যাকড লাঞ্চ খেয়ে নেওয়া হল। সামনেই ছিল সরকারী হ্যান্ডলুম হ্যান্ডিক্রাফটসের আউটলেট। আমি যত মাকে বলি যে না, আমি বাপু বাজার থেকেই কেনাকাটি করবো, মায়ের তত এক কথা। "না না, দর দাম হবেনা আমার দ্বারা, তোর দ্বারাও হয় না। বরং গভমেন্টের জিনিস, ফিক্সড প্রাইস, এখান থেকেই কিনব।" ঘুরে ফিরে কিছু কিনব না কিনব না করেও কেনাকাটি হল। দাম বেশী কি কম, বলতে পারব না। এইটুকু সান্ত্বনা যে আমি ঠকলে আর পাঁচটা লোক যারা কিনল, তারাও ঠকেছে, আমি একা না!
আমের ফোরট পৌঁছোতে প্রায় চারটে বেজে গেল। রোদ পড়ে আসছে। মাওতা লেকের ধারে বিশাল ফোরটটির গায়ে পড়ন্ত সূর্যের সোনালী আলো। ফোরটের ভিতরে যেতে গেলে বেশ খানিকটা চড়াই চড়তে হবে। ব্যাটারই চালিত গাড়ি পাওয়া যায়, বেশ মিষ্টি দেখতে। বিভিন্ন রঙের। একটা গাড়িতে পাঁচ ছয় জন অনায়াসে এঁটে যায়। তবে আমরা যতক্ষণে গেলাম স্ট্যান্ডে, স্ট্যান্ড খালি। লাইনে দাঁড়ালে ঘন্টাখানেকের আগে চান্স পাওয়া যাবেনা। কোই বাত নেহি, এগারো নম্বর গাড়ি আছে না? তার ভরসায় মিনিট পনেরো কুড়ি উঁচুতে চড়ে অবশেষে পৌঁছলাম আমের ফোরটে।রাজস্থানের বেশীরভাগ ফোরতেই মোটামুটি একই ধরণের স্ট্রাকচার। একটা বিশাল কপমাউন্ড। চারিদিকে উঁচু বাড়ি। এখানেও তাই। সিঁড়ি ভেঙ্গে উঠে আসতে আসতে গোটা কেল্লাটা ঘুরলাম। রাজার মহল, রানির মহল (সুহাগ মন্দির, যেখান থেকে রাজ পরিবারের নারীরা পর্দার আড়ালে থেকে ণিচে দিওয়ান ই আমের কর্মযজ্ঞ দেখতে পেতেন), দিওয়ান ই আম, দিওয়ান ই খাস, সব। শীষমহলে কাঁচের ওপর কারুকার্য সত্যি দেখার মতো। ট্যুরিস্ট এসে এসে নষ্ট হয়ে যাচ্ছিল বলে মূল ঘরটিতে এখন আর ঢুকতে দেওয়া হয়না। বাইরে থেকেই দেখতে হয়। আগে নাকি গাইডরা মোমবাতি জ্বালিয়ে দেখাতেন ওই মহলের সৌন্দর্য, কাঁচের ওপর আলোর রিফ্লেকশনের ছটা।
যতক্ষণে আমরা আমের ফোরট ঘুরে নীচে এলাম, ততক্ষণে সূর্যাস্ত শুরু হয়ে গিয়েছে। পশ্চিমের আকাশ এক অদ্ভুত মায়াবী লাল রঙে রঙিন। তার ব্যাকড্রপে আমের ফোরটকে কি সুন্দর যে লাগছিল, কী বলি? আমাদের বাস যতক্ষণে এসে পৌঁছল, ততক্ষণে ফোরটে আলো জ্বলে গিয়েছে। অসাধারণ দৃশ্য। এবার ফেরার পালা।
বাসে উঠতে গিয়ে আরেক বিপত্তি। আবার একজন সদস্য মিসিং। তাকে খুঁজতে খুঁজতে আরো ঘন্টাখানেক প্রায় কেটে গেলো। যা বুঝলাম, জলমহল আর দেখা যাবেনা। পরের গন্তব্য বিড়লা মন্দির। ততক্ষণে আমার শরীরের সমস্ত এনার্জি শেষ। বাপু বাজারে গিয়ে যে শপিং করব, তারও আর ইচ্ছা নেই। মা ইতিমধ্যে আমের ফোরটের গেটের উল্টোদিকের একটা দোকানে গিয়ে বেশ কিছু টুকটাক কেনাকাটি করেছিলও। আমাদের দলের অনেকেই দেখলাম মার্কেটিং করেছে। মা বলল, "থাক। আবার অন্য জায়গায় কিনব।" আমিও কিছু বললাম না। একটু মন খারাপ হল বটে। সঙ্গে সঙ্গে গুগুল খুলে দেখতে লাগলাম পরের শহরগুলিতে কোথায় ভালো কেনাকাটি করা যায়। আসলে রাজস্থান বেড়ানোর কারণগুলির অন্যতম আমার কাছে ছবি তোলা আর কেনাকাটি করা। কাজেই একটু এফোরট দিতেই হবে। বিড়লা মন্দিরে আর নামিনি। বাসে বসেই তখন নেটে উদয়পুর যোধপুরের বাজারের হাল হকিকত দেখছিলাম।
রাত্রে হোটেলে ফিরে খেয়ে দেয়ে নরম বিছানায় শুয়ে টানা ঘুম দিলাম। আহ, কী আরাম। আবার পরেরদিন সক্কাল সক্কাল বেরোনো। পুষ্কর হয়ে আজমের। সকাল সাড়ে ছটার মধ্যে লাগেজ দিয়ে দিতে হতো। সাতটায় বাস ছাড়ত। তখনও ভোরের আলো ফোটেনি।
ব্রেকফাস্ট করার আগে চলল আমাদের হোটেলে একপ্রস্থ ফটোশুট। হোটেলটি রাজপুত ডাক্তার পরিবারের পৈত্রিক বাড়ি। কিছু অংশে পরিবারের লোকজন এখনো থাকেন, আর বাকিটা হেরিটেজ হোটেল হিসেবে চলে। রাজকীয় ব্যবস্থাপনা। প্রতিটিঘরের অন্দরসজ্জা যেমন খুবই রুচিসম্পন্ন, তেমনি প্রতিটি ফ্লোরের লিভিং স্পেস, রিডিং রুম, সমানভাবে সাজানো। একতলায় ড্রয়িং রুমে গতকাল রাত্রেই চোখে পড়েছিল সেনটার টেবিলটি, ওটির পায়া আসলে একটি বাঘিনী। আরেকটি ছিল, সেটি আবার উটের ওপর ভর করা। বিভিন্ন কাঠের মূর্তি, অমূল্য পেইন্টিং, সিলিঙে অনন্য কারুকার্য, হাল্কা লাইটিং, সব মিলিয়ে ছবি তোলার জন্য যাকে বলে পারফেক্ট। বেরোনোর মুখে আরেক প্রস্থ বাস সমস্যা শুরু হল। যে নতুন বাসটি আসার কথা ছিল, সেটি তখনো রেডি না বলে আবার নানান মনোমালিন্য ইত্যাদি ইত্যাদির পর রওনা দেওয়া হল। আমরা চারজন বাসের পিছনের সিট নিয়েছিলাম। বেশ খেলে ছড়িয়ে বসা যায়। ক্যামেরা হাতে আমার জায়গা ছিল জানলার ধারে। পুরনো জয়পুরের রাস্তা দিয়ে আমাদের প্রথম গন্তব্য যন্তর মন্তর। অবশ্য পথে যেতে যেতে প্রথমেই আমাদের ডানদিকে দেখিয়ে দেওয়া হল রাজমন্দির সিনেমা হল। এই সিনেমা হলটির বৈশিষ্ট্য বলতে খুব সুন্দর করে সাজিয়ে রাখা নাকি ভিতরে। বাইরে থেকেও বেশ একধরণের ফরাসী মিষ্টির মত দেখতে। সময়ের অভাবে আর ভিতরে যাওয়া হয়নি। অনেক ট্যুরিস্ট এখানে সিনেমা দেখেন। আমার বাবা ১৯৯৭ সালে যখন জয়পুর এসেছিল, তখন সদ্য মুক্তিপ্রাপ্ত জুড়ওয়া সিনেমাটি দেখেছিল এখানে।
এরপরই আমাদের পথে পড়ল জয়পুরের বিখ্যাত হাওয়া মহল। আমাদের বাঁ দিকে। পরে ভিতরে এক্সপ্লোর করা হবে। তখন শুধুমাত্র বাইরে থেকে দেখে নেওয়া হল। জয়পুর বললে ছোট থেকে যা বুঝি, তা কিন্তু হাওয়া মহল। বিরাট একটা গোলাপী স্থাপত্য, অনেকটা মৌমাছিদের বাসার মত। বাসটা ওই জায়গায় ট্রাফিকের জন্য এমনিই আস্তে চলছিল, তাই ওই বিরাট ফ্যাকেডের ছবি তুলতে অসুবিধে হয়নি। "পিঙ্ক সিটি"র রাস্তায় এরপর দেখলাম লাইন দিয়ে গোলাপী রঙের বাড়ি, বিভিন্ন দোকান। অনেকটা আমাদের ধর্মতলা নিউ মার্কেট চত্বরের মত। সারি দিয়ে শুধুই দোকান। ওই সকালে তখনো দোকানগুলি খোলেনি। গোলাপী রঙটা ঠিক আমাদের পরিচিত গোলাপী বলা যায় না। খানিকটা যেন কমলা মিশিয়ে দেওয়া। তবে প্রতিটি দেওয়ালে ওই গোলাপীর ওপর খুব নিখুঁত ভাবে সাদা দিয়ে বর্ডার এঁকে আলপনা দেওয়া। দেখতে বেশ ভালো লাগছিল।
যন্তর মন্তরে পৌঁছলাম। পারকিং থেকে স্পটে যাওয়ার পথে দেখলাম অনেক দানা বিক্রি হচ্ছে। লোকে কিনে কিনে পায়রাদের খাওয়াচ্ছে। রাজস্থানিরা মনে করেন যে এতে পুণ্য হয়। গোটা রাজস্থান জুড়েই খুব দেখেছি এই ব্যাপারটা। আরেকটা জিনিস যেটা লক্ষ্য করলাম, সমস্ত ট্যুরিস্ট স্পটের ধারেকাছেই ভর্তি হকার, রঙ বেরঙের পসরা সাজিয়ে। মাথার পাগড়ি থেকে শুরু করে চাবির রিং, জামা, ঘর সাজানোর জন্য ছোট ছোট মূর্তি, ওয়াল হ্যানগিং, ইত্যাদি। ওই রঙ দেখলেই মন ভালো হয়ে যায়। অনেকে বলেন যে রাজস্থান রুক্ষ, মরুভূমির দেশ। তাই মানুষজন পোশাকে রঙের খুব ব্যবহার করেন মন মেজাজ ভালো রাখতে। এই প্রসঙ্গে বলি, রাজস্থান মূলত দুই ভাগে বিভক্তঃ মেওয়ার ও মাড়োওয়ার। মেওয়ার দিব্যি সবুজ, চাষ হয়, অনেক গাছপালা আছে। জয়পুর উদয়পুর চিতোর সব মেওয়ারে। মাড়োওয়ার বালির জায়গা। যোধপুর জয়সালমের। যাই হোক, যা বলতে গিয়ে এতগুলো কথা বলে ফেললাম। সেই দোকানিদের থেকে দরদাম করে বেশ একটা হলুদ লাল সবুজ মেশানো পাগড়ি কিনে ফেললাম।
যন্তর মন্তরে ঢুকে দেখলাম দেখলাম এবং আশ্চর্য হলাম (যারা দিল্লীতে যন্তর মন্তর ঘুরেছেন, শুনেছি সেটা নাকি আরো মনোগ্রাহী)। নিজে ইঞ্জিনিয়ারিং সায়েন্সের স্টুডেন্ট বলেই যেন ওই প্রাচীন যুগে ভারতীয়দের টেকনলজিকাল এডভান্সমেন্টের এই দারুণ নিদর্শন দেখে বেশ একটা গর্ববোধ করছিলাম। আজকের যুগে দাঁড়িয়ে হয়তো ওই যন্ত্রগুলির কোনটারই তেমনভাবে কোন প্রয়োজনীয়তা নেই, কিন্তু সেই আমলে এস্ট্রোনমি চর্চার জন্য যে এমন সব যন্ত্র বানানো হয়েছিল সাওাই জয় সিং দ্বিতীয়র আমলে, তা সত্যিই কুর্নিশ যোগ্য। যন্তর মন্তরটি ইয়ুনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট হিসেবে স্বীকৃত, পৃথিবীর সর্ব বৃহৎ সানডায়ালটি এখানেই রয়েছে। যন্তর মন্তরের মূল কমপ্লেক্স থেকে সিটি প্যালেস আর দূরে নাহারগড় কেল্লা দেখা যায়। এরপরের গন্তব্য সিটি প্যালেস। তবে নাহারগড় আমাদের শিডিউলে ছিলনা। নাহারগড়ের নাম সম্ভবত সব বাঙালিরা আমরা প্রথম শুনি সোনার কেল্লা পড়তে গিয়ে (আমার তো মনে হয় বাঙালির রাজস্থান প্রীতির একটা অন্যতম কারণ সত্যজিৎ রায়, ফেলুদা।)। এইখান থেকেই ডঃ হাজরাকে ঠেলে ফেলে দেয় মন্দার বোস এন্ড কোং।
সিটি প্যালেসটিো তৈরি হয় মহারাজা জয় সিং দ্বিতীয়র আমলে। জনসংখ্যা বাড়ার কারণে আমের থেকে রাজধানী সরিয়ে যখন জয়পুরে আনা হয়, এক বাঙালি স্থপতি ছিলেন অন্যতম। জালেব চৌকের কাছে উদয়পোল দিয়ে সিটি প্যালেসে আমরা এলাম টিকিট কেটে। প্রথমেই এলাম মুবারক মহলে। এই মহলটিতে রয়েছে মিউজিয়াম। মিউজিয়ামের ভিতরে রাজা মহারাজাদের ব্যবহার করা পোশাক অস্ত্রের বিচিত্র সম্ভার। নজর কেড়েছিল সাওয়াই মাধো সিংজীর বিরাট পোশাক। মুবারাক মহলের পরে সিটি প্যালেস কমপ্লেক্সেই আমাদের পরবর্তী গন্তব্য ছিল চন্দ্র মহল। ভিতরে মিউজিয়াম ছিল, তবে যাইনি। সেই জায়গায় বাইরেটা ঘুরে ঘুরে দেখছিলাম। গোলাপী রঙের ওপর খুব সূক্ষ্ম কারুকার্য অন্য মাত্রা এনে দিয়েছিল। সিটি প্যালেসেই চোখে পড়ল দুইটি বিরাট কলসীর, স্টারলিং রুপোর তৈরি। গাইড বললেন যে ওইটি নাকি গিনেস রেকর্ড হোল্ডার। চার হাজার লিটার জল ধরবে ওতে। ভাবতেই চোখ গোল হয়ে গেল! সিটি প্যালেসে ঘুরতে ঘুরতে আমাদের দলের এক বয়স্ক মানুষ হঠাৎ বেপাত্তা হয়ে গেলেন। এদিকে তার সাথে ফোন নেই, খোঁজ খোঁজ করতে করতে অনেক পরে ওনাকে পাওয়া গেল। উনি নাকি ভিতরে অত হাঁটাহাঁটি করতে পারবেন না বলে বাইরেই ছিলেন। বোঝো কাণ্ড!
সিটি প্যালেসের পর আমাদের পরের গন্তব্য আমের ফোরট। পথে জলমহল পড়ল। দেখলাম মান সাগর হ্রদের জলের মধ্যে একটা প্রাসাদ। কথা রইলো ফেরার পথে নেমে ফটো তোলা যাবে। একটা পারকিং লটে বাস থামিয়ে ওখানেই প্যাকড লাঞ্চ খেয়ে নেওয়া হল। সামনেই ছিল সরকারী হ্যান্ডলুম হ্যান্ডিক্রাফটসের আউটলেট। আমি যত মাকে বলি যে না, আমি বাপু বাজার থেকেই কেনাকাটি করবো, মায়ের তত এক কথা। "না না, দর দাম হবেনা আমার দ্বারা, তোর দ্বারাও হয় না। বরং গভমেন্টের জিনিস, ফিক্সড প্রাইস, এখান থেকেই কিনব।" ঘুরে ফিরে কিছু কিনব না কিনব না করেও কেনাকাটি হল। দাম বেশী কি কম, বলতে পারব না। এইটুকু সান্ত্বনা যে আমি ঠকলে আর পাঁচটা লোক যারা কিনল, তারাও ঠকেছে, আমি একা না!
আমের ফোরট পৌঁছোতে প্রায় চারটে বেজে গেল। রোদ পড়ে আসছে। মাওতা লেকের ধারে বিশাল ফোরটটির গায়ে পড়ন্ত সূর্যের সোনালী আলো। ফোরটের ভিতরে যেতে গেলে বেশ খানিকটা চড়াই চড়তে হবে। ব্যাটারই চালিত গাড়ি পাওয়া যায়, বেশ মিষ্টি দেখতে। বিভিন্ন রঙের। একটা গাড়িতে পাঁচ ছয় জন অনায়াসে এঁটে যায়। তবে আমরা যতক্ষণে গেলাম স্ট্যান্ডে, স্ট্যান্ড খালি। লাইনে দাঁড়ালে ঘন্টাখানেকের আগে চান্স পাওয়া যাবেনা। কোই বাত নেহি, এগারো নম্বর গাড়ি আছে না? তার ভরসায় মিনিট পনেরো কুড়ি উঁচুতে চড়ে অবশেষে পৌঁছলাম আমের ফোরটে।রাজস্থানের বেশীরভাগ ফোরতেই মোটামুটি একই ধরণের স্ট্রাকচার। একটা বিশাল কপমাউন্ড। চারিদিকে উঁচু বাড়ি। এখানেও তাই। সিঁড়ি ভেঙ্গে উঠে আসতে আসতে গোটা কেল্লাটা ঘুরলাম। রাজার মহল, রানির মহল (সুহাগ মন্দির, যেখান থেকে রাজ পরিবারের নারীরা পর্দার আড়ালে থেকে ণিচে দিওয়ান ই আমের কর্মযজ্ঞ দেখতে পেতেন), দিওয়ান ই আম, দিওয়ান ই খাস, সব। শীষমহলে কাঁচের ওপর কারুকার্য সত্যি দেখার মতো। ট্যুরিস্ট এসে এসে নষ্ট হয়ে যাচ্ছিল বলে মূল ঘরটিতে এখন আর ঢুকতে দেওয়া হয়না। বাইরে থেকেই দেখতে হয়। আগে নাকি গাইডরা মোমবাতি জ্বালিয়ে দেখাতেন ওই মহলের সৌন্দর্য, কাঁচের ওপর আলোর রিফ্লেকশনের ছটা।
যতক্ষণে আমরা আমের ফোরট ঘুরে নীচে এলাম, ততক্ষণে সূর্যাস্ত শুরু হয়ে গিয়েছে। পশ্চিমের আকাশ এক অদ্ভুত মায়াবী লাল রঙে রঙিন। তার ব্যাকড্রপে আমের ফোরটকে কি সুন্দর যে লাগছিল, কী বলি? আমাদের বাস যতক্ষণে এসে পৌঁছল, ততক্ষণে ফোরটে আলো জ্বলে গিয়েছে। অসাধারণ দৃশ্য। এবার ফেরার পালা।
বাসে উঠতে গিয়ে আরেক বিপত্তি। আবার একজন সদস্য মিসিং। তাকে খুঁজতে খুঁজতে আরো ঘন্টাখানেক প্রায় কেটে গেলো। যা বুঝলাম, জলমহল আর দেখা যাবেনা। পরের গন্তব্য বিড়লা মন্দির। ততক্ষণে আমার শরীরের সমস্ত এনার্জি শেষ। বাপু বাজারে গিয়ে যে শপিং করব, তারও আর ইচ্ছা নেই। মা ইতিমধ্যে আমের ফোরটের গেটের উল্টোদিকের একটা দোকানে গিয়ে বেশ কিছু টুকটাক কেনাকাটি করেছিলও। আমাদের দলের অনেকেই দেখলাম মার্কেটিং করেছে। মা বলল, "থাক। আবার অন্য জায়গায় কিনব।" আমিও কিছু বললাম না। একটু মন খারাপ হল বটে। সঙ্গে সঙ্গে গুগুল খুলে দেখতে লাগলাম পরের শহরগুলিতে কোথায় ভালো কেনাকাটি করা যায়। আসলে রাজস্থান বেড়ানোর কারণগুলির অন্যতম আমার কাছে ছবি তোলা আর কেনাকাটি করা। কাজেই একটু এফোরট দিতেই হবে। বিড়লা মন্দিরে আর নামিনি। বাসে বসেই তখন নেটে উদয়পুর যোধপুরের বাজারের হাল হকিকত দেখছিলাম।
রাত্রে হোটেলে ফিরে খেয়ে দেয়ে নরম বিছানায় শুয়ে টানা ঘুম দিলাম। আহ, কী আরাম। আবার পরেরদিন সক্কাল সক্কাল বেরোনো। পুষ্কর হয়ে আজমের। সকাল সাড়ে ছটার মধ্যে লাগেজ দিয়ে দিতে হতো। সাতটায় বাস ছাড়ত। তখনও ভোরের আলো ফোটেনি।
Monday, January 15, 2018
আমার চোখে রাজস্থান পর্ব ৩ (তাজ মহল)
রাত্রে ডিনার টেবিলে বসে সবাই মিলে আলোচনা করে ঠিক করা হল যে পরেরদিন সকাল সকাল তাজ মহল দেখতে যাওয়া হবে। তাজ দর্শন করে তবেই জয়পুরের উদ্দেশ্যে বেরোনো হবে। প্রথমে ঠিক ছিল ফতেহপুর সিক্রিও যাওয়া হবে, কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই পরিকল্পনা মুলতুবি রাখতে হল।
পঁচিশে ডিসেম্বর, সাংঘাতিক ভিড় হবে। এমনি দিনেই গড়ে এক দেড় ঘণ্টার লাইন পড়ে তাজ মহলে ঢুকতে, তাই সক্কাল সক্কাল ব্রেকফাস্ট সেরে আমরা চারজন একটা অটো ধরে পৌঁছে গেলাম নির্দিষ্ট গন্তব্যস্থলে। তখন সবে টিকিট কাউন্টারে লাইন পড়ব পড়ব করছে। পাঁচ মিনিটে টিকিট হাতে নিয়ে মূল গেটে চলে এলাম। এসে দেখি ছেলেদের আর মেয়েদের আলাদা লাইন। এবং সেই লাইন বিশাল লম্বা। তাজ মহল খুলে যায় ভোর ছটা নাগাদ। আমরা প্রায় সাড়ে আটটা নটা নাগাদ লাইনে ঢুকলাম। মেয়েদের লাইনে ঘণ্টা দেড়েক লেগেছিল মায়ের আর আমার। সিকিউরিটি চেকিং বেশ কড়া (মানে অনেকটা ওই এয়ারপোর্টের মতোই)। কিছু নিষিদ্ধ জিনিস আছে যেমন ছুরি কাঁচি ইত্যাদি। জল নিয়ে যাওয়া যায়। তবে কোনরকম কস্মেটিক, খাবার কিছু এলাউড না। তাজের খয়েরি রঙের মূল এন্ট্রান্স দিয়ে ঢুকে একটা বিরাট কম্পাউন্ডে এসে পড়লাম। শুরু হয়ে গেল আমার ক্যামেরায় ক্লিক ক্লিক। বাবাকে ফোন করে জানা গেল ওদের লাইনটা অনেক লম্বা হওয়ায় ওদের ভিতরে আসতে অন্তত আরো ঘন্টাখানেক লাগবেই। মা কে বললাম, "সময় নষ্ট করে লাভ নেই। চলো আমরা ঘুরতে থাকি। ছবি তোলার সময় পেয়ে যাবো। চলো।"
এই বলে তাজ মহলের দিকে এগোলাম। একটা গেটের সামনে দেখি খুব ভিড়। কারণটা খুব শিগগিরি বুঝে গেলাম। ওখান থেকেই যে প্রথম দর্শন পাওয়া যাচ্ছে দুনিয়ার সাত আশ্চর্যের আশ্চর্যটির। কেদারনাথ যাওয়ার পথে একটা জায়গা আছে, দেওদিখানি। সেখান থেকে প্রথম মন্দিরের চূড়া দেখা যায়। তেমনি এই জায়গাটা যেন তাজদিখানি। তাজের সাথে শুভদৃষ্টিটা মানুষ এখান থেকেই সারছেন। আর তাই আরো বেশী ভিড়। ফটক টপকে যখন বইয়ের পাতায় দেখা আমাদের চিরপরিচিত তাজ মহল প্রথম দেখলাম, একেবারে পূর্ণ অবয়বে, ওই শ্বেত মার্বেলের বিশালাকৃতি দেখে অল্পক্ষণের জন্য হলেও থমকে গিয়েছিলাম। আর তার পরেই যেন ঘটনা ও পরিস্থিতির বাস্তবতা আমায় ধাক্কা দিয়ে ঘোরের মধ্যে থেকে বের করল। আরে, ছবি তুলতে হবে তো। খচ খচ করে একটার পর একটা ছবি তুলতে শুরু করে দিলাম। জুম লেন্সের ব্যাগটা বাবার হাতে, তাই কেরামতি মেরে দূর থেকে ভিড় টপকে একটাও ছবি এলোনা। আদ্ধেকের বেশী ছবিতেই পিলপিল করছে লোক। জন অরণ্য যাকে বলে। মোটামুটি জায়গায় জায়গায় দাঁড়িয়ে পোজ দিতে দিতে ও দেওয়াতে দেওয়াতে ছবি তুলে ও তুলিয়ে অবশেষে এসে পৌঁছলাম মূল মউসোলিয়ামে। দু চোখ ভরে অবাক চোখে দেখে যেতে লাগলাম মার্বেলের ওপর নয়নাভিরাম কারুকার্য। এত শত বছর আগের তৈরি, কী সাঙ্ঘাতিক প্রতিভাবান শিল্পীরা বানিয়েছিলেন এটিকে, আজ এতগুলো বছর পরেও সমানভাবে আমাদের আকর্ষণ করছে তাজ মহল। বাহ তাজ বলি আমরা সব সময়, আমার তো মনে হয়, প্রতিটি শিল্পীর নাম নিয়ে নিয়ে বাহ বললে হয়ত তাদের কাজের প্রতি সঠিক শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করা হবে। ঐতিহাসিক কারণের চেয়েও বেশী, তাজ মহল আমার ভালো লেগেছে শৈল্পিক কারণে।
পরিবেশ দূষণের কারণে, তাজ মহলের আগের জৌলুস নাকি আর নেই। কী জানি বাবা, আমি তো এই প্রথম দেখলাম, ওই দুধ সাদা মনুমেন্টটি দেখে আমি হাঁ! আর এই দূষণের থেকে তাজ মহলকে বাঁচাতে এখন ভিতরে জুতো পরে যেতে দেয়না। জুতো পড়লেও তার ওপর পলিথিনের এক ধরণের আস্তরন লাগিয়ে ঢুকতে হয়। দশটাকা দিয়ে আমরা প্রত্যেকের জন্য এক এক জোড়া কিনে রেখেছিলাম আগেরদিনই। তাজ মহলের ভিতরে প্রবেশ করার জন্য দেখলাম আরেকপ্রস্থ বিশাল লাইন। আমাদের হাতে সময় কম। তাড়াতাড়ি হোটেলে ফিরে বেরোতে হবে জয়পুরের উদ্দেশ্যে। জীবনে একবারে সব কিছু পাওয়া হয় না, এরকম একটা দার্শনিক মনোভাব নিয়েই মা আর আমি ঠিক করলাম যে থাক, আর ভিতরে ঢুকে কাজ নেই। এমনিও শাহ জাহান মুমতাজের আসল সমাধি মোটেই দেখাবেনা, আর কারুকার্য, সে তো বাইরে থেকেই ভালোই দেখতে পাচ্ছি। মোটেই বিরাট আর্ট ক্রিটিক নই আমরা যে একদম ডিটেলে না দেখলে জীবন ব্যর্থ হয়ে যাবে। তার চেয়ে বরং তাজের চার পাশটা প্রায় প্রদক্ষিণ করার মতো করেই হাঁটলাম। পিছন দিয়ে বয়ে চলেছে যমুনা নদী, জল কম। কুয়াশাচ্ছন্ন। একটু ফাঁকা দেখে তাজের দেওয়ালে হাত দিলাম, স্পর্শ করে অনুভব করার চেষ্টা করলাম এই বিশাল কীর্তিটিকে, বিশ্বজুড়ে যা এত বিখ্যাত করেছে আমার দেশকে। সাধারণ ভাবে ভাবলে হয়তো অন্য কোন শ্বেত পাথরের স্তম্ভ ছুঁয়ে দেখলেও একই অনুভূতি হত, কিন্তু ব্যাপারটা যেখানে তাজ মহল, যা চাক্ষুস দেখব বলে এই কদিন ধরে তিল তিল করে উত্তেজনার পাহাড় জমিয়েছি মনে, তাই সেই হিমশীতল স্পর্শও দিব্যি লাগল।
ইতিমধ্যে বাবা আর কাকাও চলে এসেছে। বাবার আগে জয়পুর আগ্রা ঘোরা, দিল্লি থেকে এসে। বাবা তো এই এত ভিড় দেখে অবাক। বলল যে লাস্ট যখন এসেছিল, তখন নাকি কোন লাইনই পায়নি। এমনি এমনি টুকটাক এসো, সিঁড়ি বেয়ে উঠে ঘুরে বেড়াও। সঙ্গে সঙ্গে উইশ লিস্টে যোগ করে নিলাম। তাজ মহল, ফাঁকাতে এসে ডিটেলে ঘুরতে হবে। আরো এক প্রস্থ ছবি তুলে দলের বাকি লোকজন (সবাই না, এই দলে এমন অনেকেই ছিল যারা সময় বেঁধে দেওয়া হলেও তা মানত না। সেইসব কীর্তি বিভিন্ন পর্বে আরো আসবে।) মিলে আমরা হোটেলে ফিরলাম। এসে শুনি আরেক বিপত্তি। যে বাসে করে আমাদের জয়পুর যাওয়ার কথা, তথা, গোটা ট্রিপটা হওয়ার কথা, সেটা উদয়পুর থেকে আসছিল। পথে তার উইন্ডস্ক্রিন ভেঙ্গে চুরচুর। সে বাস গিয়েছে গ্যারেজে সারাতে। সকাল থেকে তো এমন কথা শুঞ্ছিলাম। এসে দেখি তখনও সে বাস আসেনি। কাঁচও কেনা হয়নি। এবার কতক্ষনে বাস রেডি হয়ে আসবে, কতক্ষণে আমরা বেরবো...জয়পুর পৌঁছব কতক্ষনে। দুপুরের খাবার খেয়ে হোটেলের ঘর চেক আউট করে সবাই লবিতে এসে বসেছি। বারবার ম্যানেজার কাকুকে সবাই জিজ্ঞেস করছি, কোন আপডেট আছে কি না। হোটেলের পাশে একটা স্যুভেনির শপ ছিল, সবাই প্রায় পালা করে করে ওখানে ঢুঁ মেরে এসেছি। আমার মা আর বাবা এর মধ্যে একবার বেরিয়ে আগ্রার বিখ্যাত পেঠা কিনেও এনেছে। এদিকে তো আসের কোন পাত্তা নেই। তখন খালি ভাবছি, ওলা ডেকে ফতেপুর সিক্রিটা দিব্যি ঘুরে আসা যেত এমন জানলে। কপালে না থাকলে যা হয়, আর কী। যাই হোক, সব জল্পনা কল্পনার অবসান ঘটিয়ে আমাদের বাস এলো প্রায় সাড়ে তিনটে নাগাদ। হইহই করে লোকজন ছুটল সীট দখল করতে। মায়ের কাছে শোনা, এই কোম্পানির নিয়ম হল ট্যুরের মোট সময়টাকে দুই ভাগে ভাগ করে সীট এলট করা, যাতে কি না সকলেই মোটামুটি সামনে পিছনে মিলিয়ে বসতে পারে। বেশ ভালো নিয়ম। তা এই বাসে উঠেও দেখলাম সেরকম লিস্ট করে দেওয়া আছে। এদিকে সিটের গায়ে কোন নম্বর লেখা নেই। সেই নিয়ে শুরু হল গোলমাল। ডান্দিক থেকে এক নম্বর না বাঁ দিক থেকে এক নম্বর ধরা হবে... আরে বাবা, সিটিং প্ল্যান তো ছবির মতো আঁকা আছে, সিনেমার টিকিট কাটতে গেলে যেমন দেখি। তেমন করে বসলেই হল। তা না। যাদের পিছনের দিকে সীট পড়েছে, তারা শুরু করল আপত্তি। পাঁচ সাড়ে পাঁচ ঘন্টার জার্নি কি করে টানা কেউ পিছনে বসবে, এই একদিনেই ওলট পালট করতে হবে, সামনে বসতে দিতে হবে, হাঁটু ট্রান্সপ্লান্ট করা, তাই সামনে বসব (অথচ গোটা ট্রিপে একবারও অন্য সময় কিন্তু দেখলাম না আর কিছুতে কোন অসুবিধে), কোমরে ব্যথা তাই ঝাঁকুনি সহ্য হবেনা, সিনিয়ার সিটিজেন তাই সামনে বসব। লেগ স্পেস কম, বসব না। বাস পাল্টাও। এখুনি মালিককে কল করো, ট্রিপ ক্যান্সেল করে দিচ্ছি। ইত্যাদি ইত্যাদি। কান ঝালাপালা করে শেষমেশ জয়পুর থেকে বাস বদল হবে এই আশ্বাসে আমাদের বাসটা ছাড়ল প্রায় চারটের পর, সকাল নটায় যেটা রওনা হওয়ার কথা ছিল। ফতেহপুর, ভরতপুর সব জায়গার ওপর দিয়ে যেতে যেতে মাঝে চায়ের হল্ট দিয়ে শেষমেশ বাস জয়পুরে ঢুকল রাত প্রায় দশটা নাগাদ। চারিদিক তখন প্রায় শুনশান। বাসের ড্রাইভার হোটেলের রাস্তা চেনেনা। কেন যে এরা গুগুল ম্যাপ ব্যবহার করেনা, কে জানে। অটোওয়ালা জোগাড় হল, একশো না দেড়শো টাকার বিনিময়ে রফা হল, সে আগে আগে গিয়ে আমাদের হোটেল অবধি বাসটাকে পৌঁছে দেবে। জয়পুরের হোটেলটা ছিল একটি হেরিটেজ হোটেল। রাডোলি হাউজ। ইন্টারনেটে দেখে এসছিলাম, দারুণ ইন্টারেস্টিং লেগেছিল, উৎসুক হয়েছিলাম তাই ওখানে পৌঁছতে। শেষমেশ রাত এগারোটার পর হোটেলের গেটে এসে পৌঁছলাম। ঘুমে দুই চোখ বুজে আসছে। এক ঝলক দেখে যা বুঝলাম, অতি রাজকীয় থাকার ব্যবস্থা। সকালে উঠে ভালো করে দেখেশুনে ছবি তুলতে হবে।
এজেন্সির লোকজন তাড়াহুড়ো করে ওই রাতে রান্না চাপাতে গেল। পরেরদিন আমার কাকার জন্মদিন ছিল। কেকের ব্যবস্থা নেই। তাই রাত বারোটা বাজতে না বাজতে, কাকাকে দিয়ে "পেঠা কাটিয়ে" জন্মদিন পালন হল। আমি নিজে বছর দুই আগে মুন্নারে পিতজা কেটে জন্মদিন পালন করেছি। তবে পেঠাটা সত্যিই বিচিত্র! ওই অত রাত্তিরেও ভাত ডাল ভাজা মাছ (নাকি মাংস? ঠিক খেয়াল নেই) পেয়ে ক্লান্ত শরীর একটু আরাম পেল। মশমশে গরম জলে স্নান করে খেয়ে নরম বিছানায় গা এলালাম যখন, রাস্তায় বাইরে তখন শুধু কুকুরের চিৎকার শোনা যাচ্ছে। ঘুটঘুট্টি অন্ধকার। রাত প্রায় দেড়টা। এদিকে নির্দেশ এসে গিয়েছে, পরেরদিন সকাল আটটার মধ্যে ব্রেকফাস্ট দিয়ে দেওয়া হবে। নটায় বেরনো। সিটি সাইট সিইং।
পঁচিশে ডিসেম্বর, সাংঘাতিক ভিড় হবে। এমনি দিনেই গড়ে এক দেড় ঘণ্টার লাইন পড়ে তাজ মহলে ঢুকতে, তাই সক্কাল সক্কাল ব্রেকফাস্ট সেরে আমরা চারজন একটা অটো ধরে পৌঁছে গেলাম নির্দিষ্ট গন্তব্যস্থলে। তখন সবে টিকিট কাউন্টারে লাইন পড়ব পড়ব করছে। পাঁচ মিনিটে টিকিট হাতে নিয়ে মূল গেটে চলে এলাম। এসে দেখি ছেলেদের আর মেয়েদের আলাদা লাইন। এবং সেই লাইন বিশাল লম্বা। তাজ মহল খুলে যায় ভোর ছটা নাগাদ। আমরা প্রায় সাড়ে আটটা নটা নাগাদ লাইনে ঢুকলাম। মেয়েদের লাইনে ঘণ্টা দেড়েক লেগেছিল মায়ের আর আমার। সিকিউরিটি চেকিং বেশ কড়া (মানে অনেকটা ওই এয়ারপোর্টের মতোই)। কিছু নিষিদ্ধ জিনিস আছে যেমন ছুরি কাঁচি ইত্যাদি। জল নিয়ে যাওয়া যায়। তবে কোনরকম কস্মেটিক, খাবার কিছু এলাউড না। তাজের খয়েরি রঙের মূল এন্ট্রান্স দিয়ে ঢুকে একটা বিরাট কম্পাউন্ডে এসে পড়লাম। শুরু হয়ে গেল আমার ক্যামেরায় ক্লিক ক্লিক। বাবাকে ফোন করে জানা গেল ওদের লাইনটা অনেক লম্বা হওয়ায় ওদের ভিতরে আসতে অন্তত আরো ঘন্টাখানেক লাগবেই। মা কে বললাম, "সময় নষ্ট করে লাভ নেই। চলো আমরা ঘুরতে থাকি। ছবি তোলার সময় পেয়ে যাবো। চলো।"
এই বলে তাজ মহলের দিকে এগোলাম। একটা গেটের সামনে দেখি খুব ভিড়। কারণটা খুব শিগগিরি বুঝে গেলাম। ওখান থেকেই যে প্রথম দর্শন পাওয়া যাচ্ছে দুনিয়ার সাত আশ্চর্যের আশ্চর্যটির। কেদারনাথ যাওয়ার পথে একটা জায়গা আছে, দেওদিখানি। সেখান থেকে প্রথম মন্দিরের চূড়া দেখা যায়। তেমনি এই জায়গাটা যেন তাজদিখানি। তাজের সাথে শুভদৃষ্টিটা মানুষ এখান থেকেই সারছেন। আর তাই আরো বেশী ভিড়। ফটক টপকে যখন বইয়ের পাতায় দেখা আমাদের চিরপরিচিত তাজ মহল প্রথম দেখলাম, একেবারে পূর্ণ অবয়বে, ওই শ্বেত মার্বেলের বিশালাকৃতি দেখে অল্পক্ষণের জন্য হলেও থমকে গিয়েছিলাম। আর তার পরেই যেন ঘটনা ও পরিস্থিতির বাস্তবতা আমায় ধাক্কা দিয়ে ঘোরের মধ্যে থেকে বের করল। আরে, ছবি তুলতে হবে তো। খচ খচ করে একটার পর একটা ছবি তুলতে শুরু করে দিলাম। জুম লেন্সের ব্যাগটা বাবার হাতে, তাই কেরামতি মেরে দূর থেকে ভিড় টপকে একটাও ছবি এলোনা। আদ্ধেকের বেশী ছবিতেই পিলপিল করছে লোক। জন অরণ্য যাকে বলে। মোটামুটি জায়গায় জায়গায় দাঁড়িয়ে পোজ দিতে দিতে ও দেওয়াতে দেওয়াতে ছবি তুলে ও তুলিয়ে অবশেষে এসে পৌঁছলাম মূল মউসোলিয়ামে। দু চোখ ভরে অবাক চোখে দেখে যেতে লাগলাম মার্বেলের ওপর নয়নাভিরাম কারুকার্য। এত শত বছর আগের তৈরি, কী সাঙ্ঘাতিক প্রতিভাবান শিল্পীরা বানিয়েছিলেন এটিকে, আজ এতগুলো বছর পরেও সমানভাবে আমাদের আকর্ষণ করছে তাজ মহল। বাহ তাজ বলি আমরা সব সময়, আমার তো মনে হয়, প্রতিটি শিল্পীর নাম নিয়ে নিয়ে বাহ বললে হয়ত তাদের কাজের প্রতি সঠিক শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করা হবে। ঐতিহাসিক কারণের চেয়েও বেশী, তাজ মহল আমার ভালো লেগেছে শৈল্পিক কারণে।
পরিবেশ দূষণের কারণে, তাজ মহলের আগের জৌলুস নাকি আর নেই। কী জানি বাবা, আমি তো এই প্রথম দেখলাম, ওই দুধ সাদা মনুমেন্টটি দেখে আমি হাঁ! আর এই দূষণের থেকে তাজ মহলকে বাঁচাতে এখন ভিতরে জুতো পরে যেতে দেয়না। জুতো পড়লেও তার ওপর পলিথিনের এক ধরণের আস্তরন লাগিয়ে ঢুকতে হয়। দশটাকা দিয়ে আমরা প্রত্যেকের জন্য এক এক জোড়া কিনে রেখেছিলাম আগেরদিনই। তাজ মহলের ভিতরে প্রবেশ করার জন্য দেখলাম আরেকপ্রস্থ বিশাল লাইন। আমাদের হাতে সময় কম। তাড়াতাড়ি হোটেলে ফিরে বেরোতে হবে জয়পুরের উদ্দেশ্যে। জীবনে একবারে সব কিছু পাওয়া হয় না, এরকম একটা দার্শনিক মনোভাব নিয়েই মা আর আমি ঠিক করলাম যে থাক, আর ভিতরে ঢুকে কাজ নেই। এমনিও শাহ জাহান মুমতাজের আসল সমাধি মোটেই দেখাবেনা, আর কারুকার্য, সে তো বাইরে থেকেই ভালোই দেখতে পাচ্ছি। মোটেই বিরাট আর্ট ক্রিটিক নই আমরা যে একদম ডিটেলে না দেখলে জীবন ব্যর্থ হয়ে যাবে। তার চেয়ে বরং তাজের চার পাশটা প্রায় প্রদক্ষিণ করার মতো করেই হাঁটলাম। পিছন দিয়ে বয়ে চলেছে যমুনা নদী, জল কম। কুয়াশাচ্ছন্ন। একটু ফাঁকা দেখে তাজের দেওয়ালে হাত দিলাম, স্পর্শ করে অনুভব করার চেষ্টা করলাম এই বিশাল কীর্তিটিকে, বিশ্বজুড়ে যা এত বিখ্যাত করেছে আমার দেশকে। সাধারণ ভাবে ভাবলে হয়তো অন্য কোন শ্বেত পাথরের স্তম্ভ ছুঁয়ে দেখলেও একই অনুভূতি হত, কিন্তু ব্যাপারটা যেখানে তাজ মহল, যা চাক্ষুস দেখব বলে এই কদিন ধরে তিল তিল করে উত্তেজনার পাহাড় জমিয়েছি মনে, তাই সেই হিমশীতল স্পর্শও দিব্যি লাগল।
ইতিমধ্যে বাবা আর কাকাও চলে এসেছে। বাবার আগে জয়পুর আগ্রা ঘোরা, দিল্লি থেকে এসে। বাবা তো এই এত ভিড় দেখে অবাক। বলল যে লাস্ট যখন এসেছিল, তখন নাকি কোন লাইনই পায়নি। এমনি এমনি টুকটাক এসো, সিঁড়ি বেয়ে উঠে ঘুরে বেড়াও। সঙ্গে সঙ্গে উইশ লিস্টে যোগ করে নিলাম। তাজ মহল, ফাঁকাতে এসে ডিটেলে ঘুরতে হবে। আরো এক প্রস্থ ছবি তুলে দলের বাকি লোকজন (সবাই না, এই দলে এমন অনেকেই ছিল যারা সময় বেঁধে দেওয়া হলেও তা মানত না। সেইসব কীর্তি বিভিন্ন পর্বে আরো আসবে।) মিলে আমরা হোটেলে ফিরলাম। এসে শুনি আরেক বিপত্তি। যে বাসে করে আমাদের জয়পুর যাওয়ার কথা, তথা, গোটা ট্রিপটা হওয়ার কথা, সেটা উদয়পুর থেকে আসছিল। পথে তার উইন্ডস্ক্রিন ভেঙ্গে চুরচুর। সে বাস গিয়েছে গ্যারেজে সারাতে। সকাল থেকে তো এমন কথা শুঞ্ছিলাম। এসে দেখি তখনও সে বাস আসেনি। কাঁচও কেনা হয়নি। এবার কতক্ষনে বাস রেডি হয়ে আসবে, কতক্ষণে আমরা বেরবো...জয়পুর পৌঁছব কতক্ষনে। দুপুরের খাবার খেয়ে হোটেলের ঘর চেক আউট করে সবাই লবিতে এসে বসেছি। বারবার ম্যানেজার কাকুকে সবাই জিজ্ঞেস করছি, কোন আপডেট আছে কি না। হোটেলের পাশে একটা স্যুভেনির শপ ছিল, সবাই প্রায় পালা করে করে ওখানে ঢুঁ মেরে এসেছি। আমার মা আর বাবা এর মধ্যে একবার বেরিয়ে আগ্রার বিখ্যাত পেঠা কিনেও এনেছে। এদিকে তো আসের কোন পাত্তা নেই। তখন খালি ভাবছি, ওলা ডেকে ফতেপুর সিক্রিটা দিব্যি ঘুরে আসা যেত এমন জানলে। কপালে না থাকলে যা হয়, আর কী। যাই হোক, সব জল্পনা কল্পনার অবসান ঘটিয়ে আমাদের বাস এলো প্রায় সাড়ে তিনটে নাগাদ। হইহই করে লোকজন ছুটল সীট দখল করতে। মায়ের কাছে শোনা, এই কোম্পানির নিয়ম হল ট্যুরের মোট সময়টাকে দুই ভাগে ভাগ করে সীট এলট করা, যাতে কি না সকলেই মোটামুটি সামনে পিছনে মিলিয়ে বসতে পারে। বেশ ভালো নিয়ম। তা এই বাসে উঠেও দেখলাম সেরকম লিস্ট করে দেওয়া আছে। এদিকে সিটের গায়ে কোন নম্বর লেখা নেই। সেই নিয়ে শুরু হল গোলমাল। ডান্দিক থেকে এক নম্বর না বাঁ দিক থেকে এক নম্বর ধরা হবে... আরে বাবা, সিটিং প্ল্যান তো ছবির মতো আঁকা আছে, সিনেমার টিকিট কাটতে গেলে যেমন দেখি। তেমন করে বসলেই হল। তা না। যাদের পিছনের দিকে সীট পড়েছে, তারা শুরু করল আপত্তি। পাঁচ সাড়ে পাঁচ ঘন্টার জার্নি কি করে টানা কেউ পিছনে বসবে, এই একদিনেই ওলট পালট করতে হবে, সামনে বসতে দিতে হবে, হাঁটু ট্রান্সপ্লান্ট করা, তাই সামনে বসব (অথচ গোটা ট্রিপে একবারও অন্য সময় কিন্তু দেখলাম না আর কিছুতে কোন অসুবিধে), কোমরে ব্যথা তাই ঝাঁকুনি সহ্য হবেনা, সিনিয়ার সিটিজেন তাই সামনে বসব। লেগ স্পেস কম, বসব না। বাস পাল্টাও। এখুনি মালিককে কল করো, ট্রিপ ক্যান্সেল করে দিচ্ছি। ইত্যাদি ইত্যাদি। কান ঝালাপালা করে শেষমেশ জয়পুর থেকে বাস বদল হবে এই আশ্বাসে আমাদের বাসটা ছাড়ল প্রায় চারটের পর, সকাল নটায় যেটা রওনা হওয়ার কথা ছিল। ফতেহপুর, ভরতপুর সব জায়গার ওপর দিয়ে যেতে যেতে মাঝে চায়ের হল্ট দিয়ে শেষমেশ বাস জয়পুরে ঢুকল রাত প্রায় দশটা নাগাদ। চারিদিক তখন প্রায় শুনশান। বাসের ড্রাইভার হোটেলের রাস্তা চেনেনা। কেন যে এরা গুগুল ম্যাপ ব্যবহার করেনা, কে জানে। অটোওয়ালা জোগাড় হল, একশো না দেড়শো টাকার বিনিময়ে রফা হল, সে আগে আগে গিয়ে আমাদের হোটেল অবধি বাসটাকে পৌঁছে দেবে। জয়পুরের হোটেলটা ছিল একটি হেরিটেজ হোটেল। রাডোলি হাউজ। ইন্টারনেটে দেখে এসছিলাম, দারুণ ইন্টারেস্টিং লেগেছিল, উৎসুক হয়েছিলাম তাই ওখানে পৌঁছতে। শেষমেশ রাত এগারোটার পর হোটেলের গেটে এসে পৌঁছলাম। ঘুমে দুই চোখ বুজে আসছে। এক ঝলক দেখে যা বুঝলাম, অতি রাজকীয় থাকার ব্যবস্থা। সকালে উঠে ভালো করে দেখেশুনে ছবি তুলতে হবে।
এজেন্সির লোকজন তাড়াহুড়ো করে ওই রাতে রান্না চাপাতে গেল। পরেরদিন আমার কাকার জন্মদিন ছিল। কেকের ব্যবস্থা নেই। তাই রাত বারোটা বাজতে না বাজতে, কাকাকে দিয়ে "পেঠা কাটিয়ে" জন্মদিন পালন হল। আমি নিজে বছর দুই আগে মুন্নারে পিতজা কেটে জন্মদিন পালন করেছি। তবে পেঠাটা সত্যিই বিচিত্র! ওই অত রাত্তিরেও ভাত ডাল ভাজা মাছ (নাকি মাংস? ঠিক খেয়াল নেই) পেয়ে ক্লান্ত শরীর একটু আরাম পেল। মশমশে গরম জলে স্নান করে খেয়ে নরম বিছানায় গা এলালাম যখন, রাস্তায় বাইরে তখন শুধু কুকুরের চিৎকার শোনা যাচ্ছে। ঘুটঘুট্টি অন্ধকার। রাত প্রায় দেড়টা। এদিকে নির্দেশ এসে গিয়েছে, পরেরদিন সকাল আটটার মধ্যে ব্রেকফাস্ট দিয়ে দেওয়া হবে। নটায় বেরনো। সিটি সাইট সিইং।
Subscribe to:
Posts (Atom)