- কী রে এখনো রেডি হতে পারলি না? কখন বেরবো?
- আরে দাঁড়া না। সবে তো ছটা বাজে। এত তাড়া কিসের?
- ও মা, তাড়া দেবো না? রেডিয়োতে শুনলি না? কত জ্যাম গড়িয়াহাট ফ্লাইওভারে?
- অফিস টাইম। মঙ্গলবার। জ্যাম হবে না তো কী হবে?
- হ্যাঁ সেই জন্যই তো তাড়াতাড়ি বেরোনো উচিত।
- চিল তাতান! তাড়াহুড়ো করে এখন বেরিয়েও সেই সাড়ে আটটার আগে পৌঁছবি না। তার চেয়ে একটু রয়ে সয়ে সাড়ে সাতটার পর বেরোই। ঠিক নটায় পৌঁছে যাব।খামোখা রাস্তায় আটকে থেকে কী হবে বল তো?
- তুই বুঝছিস না দীপু। আধ ঘণ্টা। আধ ঘণ্টায় কতগুলো পকোড়া আর কত বোল স্যুপ খেতে পারতাম। নটায় সময় গেলে আবার দশটার মধ্যে বেরোনোর তাড়া থাকবে, আয়েস করে খেতে পারবো না। স্টারটার মিস হবে।
- আরে ওই পকোডা তুই মেন কোর্সের জায়গায় পেয়ে যাবি। জাস্ট অন্য নামে।
- বললেই হল?
- অফ কোর্স! কাবাবের নামে ওই ওগুলোকেই হাল্কা মডিফাই করে ছাড়ে।
- আর স্যুপ?
- ওই পানসে জলীয় পদার্থটা না খেলেই নয়?
- তো তোর মতে বিয়েবাড়িতে গিয়ে খাবো কী? স্যুপ পানসে, পকোড়া আর মেইন কোর্সের কাবাব সমগোত্রীয়, এরপর বলবি বিরিয়ানি না ভাত ভাজা।
- কেন? গরম গরম রসগোল্লা খাবি। শোন, শীতের বিয়ে। আই এম শিয়োর নলেন গুঁড়ের আইটেম থাকবেই।
- তাও তো একটার বেশী দুটো মুখে দিতে দিবি না!
- অবশ্যই! আয়নায় একবার নিজের ভুঁড়িখানা দেখেছিস তাতান?
- আয়নার সামনে দাঁড়ানোর ফুরসৎ আছে নাকি? আদৌ আয়নাটা ফাঁকা থাকে কখনো? সারাক্ষণ তো তুই একটার পর একটা ড্রেস বের করে পোজ দিয়ে নিজেই নিজেকে চেক আউট করিস।
- আহ, বিয়েবাড়িতে গিয়ে ভালো ভালো ছবি উঠবে। গ্রুপফি, সেলফি, গ্রুপ ফটো। ফেসবুকে ডিপি পালটাবো। একটু প্র্যাকটিস করবো না? Shouldn't I look my very best?
- সে তো তুই গামছা প্রিন্টের স্কারট পরলেও দারুণ লাগিস!
- গামছা??
- কেন ওই যে লাস্ট উইক তুই মন্দিরাদিদের গৃহপ্রবেশে পরলি?
- ও মাই গড, ওটা গামছা প্রিন্ট??? That was a freaking designer saree.. a one of a kind exclusive product..
- Whatever...তাহলেই বোঝ দীপু। সেদিনও এত সময় লাগালি, আমি মোচার চপটা মিস করলাম। এত সেজে কী হল? আমিই বুঝলাম না তোর সাজ।
- হুহ! তুই বুঝবি বলে যেন সাজি?
- তা না?
- অবশ্যই না! শোনো মিস্টার, মেয়েরা সাজে অন্য মেয়েদের দেখাতে। বুঝলে হে?
- হে ভগবান। যাক গে শোন, এই বকবক করতে করতে অনেকক্ষণ গেল। আধ ঘণ্টা ধরে তুই আলমারির সামনে দাঁড়িয়ে আছিস, এখনো ড্রেস ঠিক করতে পারলি না?
- যেটাই ভাবছি পরি আজ, মনে পড়ছে অন্য কোন পার্টিতে পরেছি। সো চেনাজানা লোকেরা দেখে নিয়েছে, রিপিট হবে।
- তুই না। উফ। ওই হলুদ সিল্কটা পর।
- কোনটা?
- ওই যে। ওই ওপরের তাকে যেটা দেখা যাচ্ছে। ওই যে রে, নীলের নীচে।
- উফ তাতান, ওটা দুপাট্টা।
- আমি কি করে বুঝব? ওই অত লম্বা জিনিস।
- তাহলে যা বুঝিস না তা নিয়ে কেন তখন থেকে হেজিয়ে যাচ্ছিস? আমায় একটু শান্তিতে ডিসাইড করতে দে না রে বাবা। ধুর।
- কারণ আমি চাই তুই তাড়াতাড়ি কর। যাতে আমরা ঝটপট বেরোতে পারি। আমি গিয়ে অন্তত তিন রাউন্ড স্টারটার আর দু বাটি স্যুপ খাবোই খাবো।
- সুস্থ মানুষে ওই স্যুপ খায় নাকি রে? তুই এত স্যুপ স্যুপ করিস না তো।
- আবার শুরুতে ফিরে গেলি তো?
- তুইই তো ড্র্যাগ করছিস।
- ঘাঁট হয়েছে আমার। উফ। তুই যতক্ষণ ধরে ইচ্ছে রেডি হও। আমি মন্টুর দোকান থেকে চিকেন চপ খেয়ে আসি। নটার আগে পৌঁছব না বুঝে গিয়েছি। আর বৃথা আশা রেখে লাভ নেই।
- সেই ভালো। আর হ্যাঁ শোন। আমার জন্য এগ রোল আনবি যখন, আগেরবারের মতো ঝাল দিতে বারণ করবি। জাস্ট লেবুর রস। নো সস। ওকে?
- যো আজ্ঞা মেরে আকা!
Monday, January 29, 2018
Thursday, January 25, 2018
আমার চোখে রাজস্থান পর্ব দশ যোধপুর ও ঘরে ফেরা।
৩রা জানুয়ারি সকাল সকাল জয়সালমের থেকে রওনা দিলাম যোধপুরের উদ্দেশ্যে। ঘণ্টা পাঁচেকের রাস্তা। তার মধ্যে আবার মাঝে চা আর দুপুরের খাবারের ব্রেক। রাস্তাঘাট খুব সুন্দর। কিন্তু গনগনে রোদ। আর এতদিনের ঘোরাঘুরির ধকল। সকলেরই অবস্থা কাহিল। বাসে আসতে আসতে পরেরদিনের ট্রেনের টিকিট ক্যান্সেল করলাম। বাবার শরীরটা হাল্কা খারাপ হবো হবো করছে। বুঝলাম সবই ক্লান্তি থেকে। এই কটাদিন প্রায় রোজ রাত্রে শুতে যাওয়া হয়েছে বারোটার দিকে, উঠতে হয়েছে সক্কাল সক্কাল। সাড়ে পাঁচটা ছটায়। লঙ জার্নি। শরীরের তো সহ্যের সীমানা থাকে, না কি?
যোধপুর পৌঁছলাম বিকেল তিনটের দিকে। আসার পথে রাস্তায় বড্ড বালি। কিন্তু শহরটা যতটুকু দেখলাম, ভারি ছিমছাম। খুব সুন্দর। গোছানো। শহরের মধ্যে দিয়ে আমাদের বাস চলতে চলতে প্রথমেই নিয়ে এলো মেহেরানগড় কেল্লায়। অনেকেই বলেন, রাজস্থান ভ্রমণের সময় তেমন বেশী না থাকলে, অন্তত যে একটি কেল্লা দেখা উচিত, সেটি মেহেরানগড়। আমি জানি না কতটা একমত হতে পারব বলে, তবে অবশ্য করেই অন্যতম সেরা ও প্রিয় এইটি। পাহাড়ের ওপর এক বিরাটাকায় কেল্লা। পনেরোশো শতাব্দীতে রাও যোধার বানানো। ভীষণ সুন্দর কারুকার্য, স্থাপত্য এবং সর্বোপরি বিরাট আঙিনা। এই এত কেল্লা ঘুরে ঘুরে উচি উঁচু সিঁড়ি ভেঙ্গে যখন হাঁটুর অবস্থা যায় যায় আর কি, তখন মেহেরানগড়ের লিফট ফেসিলিটি আছে জানতে পাড়া একটা বিশাল আশীর্বাদ। টিকিট কাউন্টার থেকে কেল্লার প্রবেশপত্র কিনতে গিয়ে লিফটের জন্য আলাদা টিকিট কিনে নেওয়া যায়। তারপর লম্বা লাইনে অপেক্ষা। অন্তত মিনিট কুড়ি পরে সুযোগ এলো। লিফটে করে এক্কেবারে সাঁটত ওলায় পৌঁছলাম। বেরিয়ে দেখি আবারও এক বিশাল উঠোন মত ছাদ। ছাদের থেকে যোধপুড় শহরের অপরূপ দৃশ্য। সারি সারি নীল রঙের দেওয়ালের বাড়ি। শুনেছি নাকি কেবলমাত্র ব্রাহ্মণরা তাদের বাড়ির দেওয়াল নীল রঙ করতে পারতেন। সে যাই হোক, ছাদ থেকে ভালো লাগছিল, বোঝা গেল কেন শহরটিকে "Blue city" বলা হয়। রোদের তেজে সাংঘাতিক, আর সেই কারণেই যোধপুরের আরেক নাম "Sun city"। একটা কামান দেখলাম। ছাদ থেকে তাক করা। শত্রুপক্ষ আক্রমণ করলেই যাতে দাগা যায়। আজকাল অবশ্য সে শত্রুও নেই। তা বলে মশা মারতেও ব্যবহার করে কিনা, জানা নেই।
কেল্লার ভিতরে সেই ম্যুজিয়াম। রাজা মহারাজাদের ব্যবহৃত জামা কাপড় থেকে শুরু করে অস্ত্র শস্ত্র। দেখলাম। ঘুরলাম। ভালো লাগল। কিন্তু সবচেয়ে ভালো লাগল রাঙিদের মহলগুলি। কী সুন্দর পেইন্টিং দিয়ে সাজানো। রঙের খেলা। আহা, খাসা। হাতিদের হাওদাগুলো খাসা। তেমনি ভালো লেগেছিল প্রচুর পালকি। খুব নিখুঁত কারুকার্য করা। ফুল মহল প্যালেসটি এক কোথায় অসামান্য সুন্দর। কাঁচের ওপর নানান রঙের আঁকিবুঁকি করা। ফুলের মতোই সুন্দর এটি, তাই নাম ফুলমহল। ঘুরে ঘুরে দেখতে দেখতে অসামান্য স্থাপত্য দেখে মুগ্ধ হতে হতে সাত তলা পার করলাম। কেল্লার ভিতরে কিছু মন্দির রয়েছে। আর রয়েছে ক্রাফট বাজার। অবশ্য করেই বাইরের চেয়ে অনেক বেশী দাম, কিন্তু দেখতে ভারি সুন্দর। হ্যান্ডিক্রাফটস, জামাকাপড় সব মিলিয়ে রঙিন পসরা। কেল্লায় প্রবেশের জন্য বেশ কয়েকটি ফটক আছে। লোহাপোলের ধারেই অনেক হাতের ছাপ। সেগুলি নাকি সতী পালন করতে যাওয়ার আগে রাণীদের হাতের ছাপ। আজকের যুগে দাঁড়িয়ে এগুলো ভাবলে সত্যি খুব খারাপ লাগে বটে। কিন্তু তখন যেমন যা নিয়ম, সমাজনীতি ছিল।
প্রায় ঘণ্টা দুই পর ভালো করে কেল্লা ঘুরে আমরা এলাম মূল শহরে। আমাদের হোটেলটি একদম ব্যস্ত মেন রোডের ওপর। ঘরে এসে একটু ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে পড়লাম পরেরদিন জয়পুর কিভাবে যাওয়া যায়, তার খোঁজ নিতে। ট্রেনে গিয়ে তেমন লাভ নেই। আবার গাড়িতেও অনেকটাই বেশী খরচা। হাঁটতে হাঁটতে কাছাকাছির মধ্যেই একটি ট্রাভেল এজেন্সির কাউন্টার থেকে বাসের টিকিট কাটলাম। আড়াইশো টাকার মত পড়ল জনপ্রতি। পরেরদিন দুপুর আড়াইতে নাগাদ বাস। দুটোর মধ্যে কাউন্টারে পৌঁছে যেতে বলল। কাছেই একটা সাইবার ক্যাফে থেকে প্লেনের টিকিট আর বোর্ডিং পাসের প্রিন্ট নিয়ে ফিরলাম হোটেলে। ইতিমধ্যে দলের সকলেরই পরেরদিন ট্রেন কত লেট করবে, কী হবে, সেই চিন্তায় নাজেহাল অবস্থা। এখনো যে একটা স্পট ঘোরা বাকি, সেই নিয়ে তেমনভাবে কারুরুই হেলদোল নেই। রাত্রের খাওয়ার পর শুয়ে পড়লাম।
পরদিন সকালে ব্রেকফাস্ট করে খোঁজ নিয়ে জানলাম সাইটসিয়িং দুপুরে হবে। লাঞ্চের পর। যেহেতু আমাদের হাতে সময় নেই, তাই আমরা ঠিক করলাম নিজেরাই ঘুরে নেব। বাবার রাত্রে জ্বর আসায় ঘুম ভালো হয়নি, রেস্ট নেবে বলল। মা আমি আর কাকা বেরলাম। ওলা বুক করলাম, এলো না। অটো তে অনেক অনেক দরাদরি করে শেষমেশ একটাকে ঠিক করলাম। গন্তব্য উমেদ ভবন।প্রথমে যদিও ভেবেছিলাম রেস্ট নিয়ে সকালটা কাটিয়ে দেবো, আর কতই বা ওই প্যালেস দেখবো।ভাগ্যিস তা করিনি! ভাগ্যিস ইন্টারনেট ঘেঁটে সত্যি ভালো ভালো রিভিউ পেয়েছিলাম। নইলে যে কী জিনিস মিস হতে চলেছিল, ভাবা যায়না!
উমেদ ভবন প্যালেসটি মহারাজা উমেদ সিংহের তৈরি। এটিতে তিনটি ভাগ। ১। যেখানে রাজপরিবার থাকে। ২। তাজ গ্রুপের লাক্সারি হোটেল। ৩। মিউজিয়াম। প্রথম দুটিতে আমাদের এক্সেস নেই। তাই অমন অপূর্ব স্থাপত্য (ইয়ুরোপীয় ও ভারতীয় স্থাপত্যের সংমিশ্রণ) দেখার জন্য একমাত্র ভরসা মিউজিয়াম। প্রবল খরায় যোধপুরবাসীর অবস্থা যখন নাজেহাল হয়ে যায়, তাদের কর্মসংস্থান করার জন্যই নাকি এই বিলাসবহুল প্রাসাদটি বানানো হয়। উমেদ ভবন শহর থেকে একটু দূরে একটি পাহাড়ের ওপর অবস্থিত। পাশেই মিলিটারই এরিয়া, খুব সুন্দর ফুলের গাছে সাজানো রাস্তা জুড়ে। সোনালি আর খয়েরি রঙের মিশ্রণে যে রঙ হয়, সেই রঙের স্যান্ডস্টোন দিয়ে তৈরি এই প্রাসাদ। টিকিট কেটে ভিতরে ঢুকলাম। প্রথমেই সারি সারি ছবি। বর্তমান রাজপরিবারের সদস্য সদস্যাদের। কিছু পুরনো ছবি, যোধপুরের, রাজপরিবারের। গ্যালারিটির সিলিঙেও দেখার মত কারুকার্য। আধুনিকতা ও প্রাচীনত্বের এক অসামান্য সমাবেশ। বিভিন্ন পোশাক অস্ত্র শস্ত্র তো অনেক দেখেছি। কিন্তু উমেদ ভবনে যেটা আমার সবচেয়ে ভালো লেগেছিল, তা হল রাজা মহারাজাদের ব্যবহৃত দৈনন্দিন প্রয়োজনের নিত্য সামগ্রী। কলম, চিঠির খাম, দোয়াত থেকে শুরু করে চায়ের পিরিচ, সুরাপানের গ্লাস, কাতলারি, আয়না, ঘড়ি, আসবাবপত্র। এক সে বড়কর এক। কত কত বিভিন্ন ডিজাইনের ঘড়ি, আমি তো দেখে পাগল হয়ে যাওয়ার জোগাড়। আর ওই রাজকীয় বাসনপত্র দেখে না মনে হচ্ছিল যে ইশ, সামনের জন্মে যেন এমন রাজপরিবারে জন্মাতে পারি। আহা কি বিলাসিতা। অবশ্য ততদিনে রাজপরিবারগুলির এই বৈভব থাকবে কি না, জানা নেই। স্টাফ করা চিতাবাঘ দেখে চক্ষু চড়ক গাছ! দরবার হলের পেইন্টিংগুলি আমার মত অনভিজ্ঞর কাছেও অসম্ভব মুগ্ধতার উদ্রেক করে। পোল খেলা যোধপুরের মহারাজাদের একচেটিয়া ছিল এক কালে, সেইসব আমলের ট্রফিগুলিও বেশ সাজিয়ে গুছিয়ে রাখা। মূল প্যালেসের সামনে কাঁচের ঘরে কত কত ভিন্টেজ গাড়ির প্রদর্শনী। মানে যাকে বলে, total aristocracy। উমেদ ভবনে ঘণ্টা দেড়েকের ওপর কাটিয়ে আবার অটো করে ফিরলাম হোটেলে।
দুপুরের খাওয়াদাওয়া সেরে বেরলাম বাস স্ট্যান্ডের উদ্দেশ্যে। বাইপাস রাস্তার ওপর দিয়ে বাস যায়, মূল শহরে তাকে আসতে দেয়না। বাস এলো প্রায় তিনটে নাগাদ। স্লিপার বাস। কী চওড়া সীট। একদম প্লেনের বিজনেস ক্লাসের মতো! দারুণ লেগস্পেস। ঘণ্টা ছয়েকের রাস্তা, আজমের হয়ে জয়পুর। একটুও কষ্ট হয়নি। জয়পুরে আমাদের হোটেলটা ভীষণ ভালো ছিল। অ্যাপ দিয়ে বুক করা। একদম সিন্ধ্রি গেট টারমিনাসের কাছেই। পরদিন সকালে আবার মা কাকা আর আমি পায়ে হেঁটে ঘুরতে বেরলাম। বাবা ব্রেকফাস্ট করে ঘরে রইলো। আমরা তিনজন কাছেই মেট্রো স্টেশন দেখে ঢুকে গেলাম। শেষ ষ্টেশন অবধি গেলাম এলাম। কী ফাঁকা কোচ। আর কী পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। ঝকঝকে তকতকে। বেশ লাগল। বিকেলের দিকে ক্যাব ডেকে চললাম এয়ারপোর্টের দিকে। আমার এই নিয়ে তেরো নম্বর ফ্লাইট হলেও বাবা মা এবং কাকার জন্য প্রথম প্লেনে চড়া। তাদের জন্য এক্কেবারে অনন্য এক্সপিরিয়েন্স। আমার জন্যও। যাঁদের হাত ধরে হাঁটা শিখলাম, তাদেরকে হাত ধরে প্লেনে চাপা শেখাতে পারা, বিরাট প্রাপ্তি। দু ঘণ্টার প্লেন জার্নি আর তারপর এক ঘণ্টা ক্যাবে চেপে অবশেষে দুই সপ্তাহ পর বাড়ি ফিরলাম পাঁচ তারিখ।
অসম্ভব ভালো ঘুরেছি বললেও কম বলা হয়। ভ্রমণের অভিজ্ঞতা লিখতে লিখতে খেয়াল করেছি যে অনেক অনেক কিছু দেখা বাকি রয়ে গেল। অনেক কিছু আরো বেশী সময় ব্যয় করে দেখতে হত। তবে কোন আক্ষেপ নেই। বারবার ফিরে যাবো আমি রাজস্থানে, এইটুকু আমি জানি। আর তাই কোন না কোন দিন ঠিক পুরো ঘুরব। কুম্ভলগড়, রান্থামবোর, নাহারগড়, বিকানের, ভানগড়...কত কিছু বাকি। ধীরেসুস্থে নিশ্চয়ই যাবো। এমন রঙিন রাজ্য, এত আন্তরিকতা, এত আপন...
"রঙ যেন মোর মর্মে লাগে
আমার সকল কর্মে লাগে।" এই আশাতেই শেষ করলাম এবারের মতো আমার চোখে রাজস্থান ভ্রমণের লেখা। সাধারণ ভ্রমণকাহিনী অনেক পড়েছেন। সেখানে এর চেয়ে অনেক বেশী ভালো করে জায়গাগুলির ইতিহাস সম্বন্ধে, ঘুরে বেরানো সম্বন্ধে অনেক তথ্য থাকবে। আমার এই গোটা সিরিজটি লেখার মূল উদ্দেশ্য ছিল একজন সাধারণ ট্যুরিস্ট হিসেবেকী দেখলাম, কী বুঝলাম আর সর্বোপরি কী উপভোগ করলাম, সেইটুকুই নিজের মত করে জানানো। গোটা যাত্রাপথে সাথে থাকার জন্য অনেক ধন্যবাদ।
যোধপুর পৌঁছলাম বিকেল তিনটের দিকে। আসার পথে রাস্তায় বড্ড বালি। কিন্তু শহরটা যতটুকু দেখলাম, ভারি ছিমছাম। খুব সুন্দর। গোছানো। শহরের মধ্যে দিয়ে আমাদের বাস চলতে চলতে প্রথমেই নিয়ে এলো মেহেরানগড় কেল্লায়। অনেকেই বলেন, রাজস্থান ভ্রমণের সময় তেমন বেশী না থাকলে, অন্তত যে একটি কেল্লা দেখা উচিত, সেটি মেহেরানগড়। আমি জানি না কতটা একমত হতে পারব বলে, তবে অবশ্য করেই অন্যতম সেরা ও প্রিয় এইটি। পাহাড়ের ওপর এক বিরাটাকায় কেল্লা। পনেরোশো শতাব্দীতে রাও যোধার বানানো। ভীষণ সুন্দর কারুকার্য, স্থাপত্য এবং সর্বোপরি বিরাট আঙিনা। এই এত কেল্লা ঘুরে ঘুরে উচি উঁচু সিঁড়ি ভেঙ্গে যখন হাঁটুর অবস্থা যায় যায় আর কি, তখন মেহেরানগড়ের লিফট ফেসিলিটি আছে জানতে পাড়া একটা বিশাল আশীর্বাদ। টিকিট কাউন্টার থেকে কেল্লার প্রবেশপত্র কিনতে গিয়ে লিফটের জন্য আলাদা টিকিট কিনে নেওয়া যায়। তারপর লম্বা লাইনে অপেক্ষা। অন্তত মিনিট কুড়ি পরে সুযোগ এলো। লিফটে করে এক্কেবারে সাঁটত ওলায় পৌঁছলাম। বেরিয়ে দেখি আবারও এক বিশাল উঠোন মত ছাদ। ছাদের থেকে যোধপুড় শহরের অপরূপ দৃশ্য। সারি সারি নীল রঙের দেওয়ালের বাড়ি। শুনেছি নাকি কেবলমাত্র ব্রাহ্মণরা তাদের বাড়ির দেওয়াল নীল রঙ করতে পারতেন। সে যাই হোক, ছাদ থেকে ভালো লাগছিল, বোঝা গেল কেন শহরটিকে "Blue city" বলা হয়। রোদের তেজে সাংঘাতিক, আর সেই কারণেই যোধপুরের আরেক নাম "Sun city"। একটা কামান দেখলাম। ছাদ থেকে তাক করা। শত্রুপক্ষ আক্রমণ করলেই যাতে দাগা যায়। আজকাল অবশ্য সে শত্রুও নেই। তা বলে মশা মারতেও ব্যবহার করে কিনা, জানা নেই।
কেল্লার ভিতরে সেই ম্যুজিয়াম। রাজা মহারাজাদের ব্যবহৃত জামা কাপড় থেকে শুরু করে অস্ত্র শস্ত্র। দেখলাম। ঘুরলাম। ভালো লাগল। কিন্তু সবচেয়ে ভালো লাগল রাঙিদের মহলগুলি। কী সুন্দর পেইন্টিং দিয়ে সাজানো। রঙের খেলা। আহা, খাসা। হাতিদের হাওদাগুলো খাসা। তেমনি ভালো লেগেছিল প্রচুর পালকি। খুব নিখুঁত কারুকার্য করা। ফুল মহল প্যালেসটি এক কোথায় অসামান্য সুন্দর। কাঁচের ওপর নানান রঙের আঁকিবুঁকি করা। ফুলের মতোই সুন্দর এটি, তাই নাম ফুলমহল। ঘুরে ঘুরে দেখতে দেখতে অসামান্য স্থাপত্য দেখে মুগ্ধ হতে হতে সাত তলা পার করলাম। কেল্লার ভিতরে কিছু মন্দির রয়েছে। আর রয়েছে ক্রাফট বাজার। অবশ্য করেই বাইরের চেয়ে অনেক বেশী দাম, কিন্তু দেখতে ভারি সুন্দর। হ্যান্ডিক্রাফটস, জামাকাপড় সব মিলিয়ে রঙিন পসরা। কেল্লায় প্রবেশের জন্য বেশ কয়েকটি ফটক আছে। লোহাপোলের ধারেই অনেক হাতের ছাপ। সেগুলি নাকি সতী পালন করতে যাওয়ার আগে রাণীদের হাতের ছাপ। আজকের যুগে দাঁড়িয়ে এগুলো ভাবলে সত্যি খুব খারাপ লাগে বটে। কিন্তু তখন যেমন যা নিয়ম, সমাজনীতি ছিল।
প্রায় ঘণ্টা দুই পর ভালো করে কেল্লা ঘুরে আমরা এলাম মূল শহরে। আমাদের হোটেলটি একদম ব্যস্ত মেন রোডের ওপর। ঘরে এসে একটু ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে পড়লাম পরেরদিন জয়পুর কিভাবে যাওয়া যায়, তার খোঁজ নিতে। ট্রেনে গিয়ে তেমন লাভ নেই। আবার গাড়িতেও অনেকটাই বেশী খরচা। হাঁটতে হাঁটতে কাছাকাছির মধ্যেই একটি ট্রাভেল এজেন্সির কাউন্টার থেকে বাসের টিকিট কাটলাম। আড়াইশো টাকার মত পড়ল জনপ্রতি। পরেরদিন দুপুর আড়াইতে নাগাদ বাস। দুটোর মধ্যে কাউন্টারে পৌঁছে যেতে বলল। কাছেই একটা সাইবার ক্যাফে থেকে প্লেনের টিকিট আর বোর্ডিং পাসের প্রিন্ট নিয়ে ফিরলাম হোটেলে। ইতিমধ্যে দলের সকলেরই পরেরদিন ট্রেন কত লেট করবে, কী হবে, সেই চিন্তায় নাজেহাল অবস্থা। এখনো যে একটা স্পট ঘোরা বাকি, সেই নিয়ে তেমনভাবে কারুরুই হেলদোল নেই। রাত্রের খাওয়ার পর শুয়ে পড়লাম।
পরদিন সকালে ব্রেকফাস্ট করে খোঁজ নিয়ে জানলাম সাইটসিয়িং দুপুরে হবে। লাঞ্চের পর। যেহেতু আমাদের হাতে সময় নেই, তাই আমরা ঠিক করলাম নিজেরাই ঘুরে নেব। বাবার রাত্রে জ্বর আসায় ঘুম ভালো হয়নি, রেস্ট নেবে বলল। মা আমি আর কাকা বেরলাম। ওলা বুক করলাম, এলো না। অটো তে অনেক অনেক দরাদরি করে শেষমেশ একটাকে ঠিক করলাম। গন্তব্য উমেদ ভবন।প্রথমে যদিও ভেবেছিলাম রেস্ট নিয়ে সকালটা কাটিয়ে দেবো, আর কতই বা ওই প্যালেস দেখবো।ভাগ্যিস তা করিনি! ভাগ্যিস ইন্টারনেট ঘেঁটে সত্যি ভালো ভালো রিভিউ পেয়েছিলাম। নইলে যে কী জিনিস মিস হতে চলেছিল, ভাবা যায়না!
উমেদ ভবন প্যালেসটি মহারাজা উমেদ সিংহের তৈরি। এটিতে তিনটি ভাগ। ১। যেখানে রাজপরিবার থাকে। ২। তাজ গ্রুপের লাক্সারি হোটেল। ৩। মিউজিয়াম। প্রথম দুটিতে আমাদের এক্সেস নেই। তাই অমন অপূর্ব স্থাপত্য (ইয়ুরোপীয় ও ভারতীয় স্থাপত্যের সংমিশ্রণ) দেখার জন্য একমাত্র ভরসা মিউজিয়াম। প্রবল খরায় যোধপুরবাসীর অবস্থা যখন নাজেহাল হয়ে যায়, তাদের কর্মসংস্থান করার জন্যই নাকি এই বিলাসবহুল প্রাসাদটি বানানো হয়। উমেদ ভবন শহর থেকে একটু দূরে একটি পাহাড়ের ওপর অবস্থিত। পাশেই মিলিটারই এরিয়া, খুব সুন্দর ফুলের গাছে সাজানো রাস্তা জুড়ে। সোনালি আর খয়েরি রঙের মিশ্রণে যে রঙ হয়, সেই রঙের স্যান্ডস্টোন দিয়ে তৈরি এই প্রাসাদ। টিকিট কেটে ভিতরে ঢুকলাম। প্রথমেই সারি সারি ছবি। বর্তমান রাজপরিবারের সদস্য সদস্যাদের। কিছু পুরনো ছবি, যোধপুরের, রাজপরিবারের। গ্যালারিটির সিলিঙেও দেখার মত কারুকার্য। আধুনিকতা ও প্রাচীনত্বের এক অসামান্য সমাবেশ। বিভিন্ন পোশাক অস্ত্র শস্ত্র তো অনেক দেখেছি। কিন্তু উমেদ ভবনে যেটা আমার সবচেয়ে ভালো লেগেছিল, তা হল রাজা মহারাজাদের ব্যবহৃত দৈনন্দিন প্রয়োজনের নিত্য সামগ্রী। কলম, চিঠির খাম, দোয়াত থেকে শুরু করে চায়ের পিরিচ, সুরাপানের গ্লাস, কাতলারি, আয়না, ঘড়ি, আসবাবপত্র। এক সে বড়কর এক। কত কত বিভিন্ন ডিজাইনের ঘড়ি, আমি তো দেখে পাগল হয়ে যাওয়ার জোগাড়। আর ওই রাজকীয় বাসনপত্র দেখে না মনে হচ্ছিল যে ইশ, সামনের জন্মে যেন এমন রাজপরিবারে জন্মাতে পারি। আহা কি বিলাসিতা। অবশ্য ততদিনে রাজপরিবারগুলির এই বৈভব থাকবে কি না, জানা নেই। স্টাফ করা চিতাবাঘ দেখে চক্ষু চড়ক গাছ! দরবার হলের পেইন্টিংগুলি আমার মত অনভিজ্ঞর কাছেও অসম্ভব মুগ্ধতার উদ্রেক করে। পোল খেলা যোধপুরের মহারাজাদের একচেটিয়া ছিল এক কালে, সেইসব আমলের ট্রফিগুলিও বেশ সাজিয়ে গুছিয়ে রাখা। মূল প্যালেসের সামনে কাঁচের ঘরে কত কত ভিন্টেজ গাড়ির প্রদর্শনী। মানে যাকে বলে, total aristocracy। উমেদ ভবনে ঘণ্টা দেড়েকের ওপর কাটিয়ে আবার অটো করে ফিরলাম হোটেলে।
দুপুরের খাওয়াদাওয়া সেরে বেরলাম বাস স্ট্যান্ডের উদ্দেশ্যে। বাইপাস রাস্তার ওপর দিয়ে বাস যায়, মূল শহরে তাকে আসতে দেয়না। বাস এলো প্রায় তিনটে নাগাদ। স্লিপার বাস। কী চওড়া সীট। একদম প্লেনের বিজনেস ক্লাসের মতো! দারুণ লেগস্পেস। ঘণ্টা ছয়েকের রাস্তা, আজমের হয়ে জয়পুর। একটুও কষ্ট হয়নি। জয়পুরে আমাদের হোটেলটা ভীষণ ভালো ছিল। অ্যাপ দিয়ে বুক করা। একদম সিন্ধ্রি গেট টারমিনাসের কাছেই। পরদিন সকালে আবার মা কাকা আর আমি পায়ে হেঁটে ঘুরতে বেরলাম। বাবা ব্রেকফাস্ট করে ঘরে রইলো। আমরা তিনজন কাছেই মেট্রো স্টেশন দেখে ঢুকে গেলাম। শেষ ষ্টেশন অবধি গেলাম এলাম। কী ফাঁকা কোচ। আর কী পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। ঝকঝকে তকতকে। বেশ লাগল। বিকেলের দিকে ক্যাব ডেকে চললাম এয়ারপোর্টের দিকে। আমার এই নিয়ে তেরো নম্বর ফ্লাইট হলেও বাবা মা এবং কাকার জন্য প্রথম প্লেনে চড়া। তাদের জন্য এক্কেবারে অনন্য এক্সপিরিয়েন্স। আমার জন্যও। যাঁদের হাত ধরে হাঁটা শিখলাম, তাদেরকে হাত ধরে প্লেনে চাপা শেখাতে পারা, বিরাট প্রাপ্তি। দু ঘণ্টার প্লেন জার্নি আর তারপর এক ঘণ্টা ক্যাবে চেপে অবশেষে দুই সপ্তাহ পর বাড়ি ফিরলাম পাঁচ তারিখ।
অসম্ভব ভালো ঘুরেছি বললেও কম বলা হয়। ভ্রমণের অভিজ্ঞতা লিখতে লিখতে খেয়াল করেছি যে অনেক অনেক কিছু দেখা বাকি রয়ে গেল। অনেক কিছু আরো বেশী সময় ব্যয় করে দেখতে হত। তবে কোন আক্ষেপ নেই। বারবার ফিরে যাবো আমি রাজস্থানে, এইটুকু আমি জানি। আর তাই কোন না কোন দিন ঠিক পুরো ঘুরব। কুম্ভলগড়, রান্থামবোর, নাহারগড়, বিকানের, ভানগড়...কত কিছু বাকি। ধীরেসুস্থে নিশ্চয়ই যাবো। এমন রঙিন রাজ্য, এত আন্তরিকতা, এত আপন...
"রঙ যেন মোর মর্মে লাগে
আমার সকল কর্মে লাগে।" এই আশাতেই শেষ করলাম এবারের মতো আমার চোখে রাজস্থান ভ্রমণের লেখা। সাধারণ ভ্রমণকাহিনী অনেক পড়েছেন। সেখানে এর চেয়ে অনেক বেশী ভালো করে জায়গাগুলির ইতিহাস সম্বন্ধে, ঘুরে বেরানো সম্বন্ধে অনেক তথ্য থাকবে। আমার এই গোটা সিরিজটি লেখার মূল উদ্দেশ্য ছিল একজন সাধারণ ট্যুরিস্ট হিসেবেকী দেখলাম, কী বুঝলাম আর সর্বোপরি কী উপভোগ করলাম, সেইটুকুই নিজের মত করে জানানো। গোটা যাত্রাপথে সাথে থাকার জন্য অনেক ধন্যবাদ।
আমার চোখে রাজস্থান পর্ব ৯ জয়সালমের
সোনার কেল্লার সাথে বোধহয় আমাদের সব বাঙ্গালীর আলাদা একটা সেন্টিমেন্ট কাজ করে, তাই না? নইলে বলুন, জয়সালমের যাচ্ছি ভাব্লেই কেন একটা আলাদা রকমের ভালো লাগা আসবে মনে? সবাই কেন বলবে, "ইশ, কী মজা রে!"? ফেলুদস গুলে বড় হয়েছি, সোনার কেল্লা সিনেমাটা কতবার যে দেখেছি, তার আর ইয়ত্তা নেই। এবারে চাক্ষুষ দেখব, ভাবতেই উত্তেজনা শুরু হয়ে গেল। মাউন্ট আবু থেকে জয়সালমেরের ওই দীর্ঘ পথ, নিমেষেই সব ক্লান্তি দূর করে দিতে শুরু করলাম কিন্ডল রিডারে আবার করে সোনার কেল্লা পড়া। বই পড়া শেষ হলে চলল ইয়ুট্যুবে সিনেমাটি দেখা। জয় বাবা জিয়োর জয়, ওই ধু ধু প্রান্তরেই অমন ভালো টাওয়ার, আহা! রাস্তায় ব্রেক নিয়ে নিয়ে, খাওয়া দাওয়া সেরে জয়সালমের পৌঁছলাম সন্ধ্যেবেলা। শহরে ঢুকতে ঢুকতেই চোখে পড়ল সুবিশাল কেল্লা। রাতের আলোয় সাজানো "সোনার কেল্লা"। অদ্ভুত ভালো লাগা, বিচিত্র অনুভূতি। চোখের সামনে ছোটবেলা।
আমাদের হোটেলে বাস পৌঁছে দিল। সেখানে রিসেপশনে দেখলাম ক্যামেল সাফারি, সোনার কেল্লার ছবি। এত বাঙালি ট্যুরিস্ট আসে ওখানে বলে, দেওয়ালে বাংলাতে নোটিস লিখে রাখা। ওই হোটেলে তখন আমাদের দল ছাড়াও আরো দুটি দল আসায় ঘরের কমতি হয়েছিল। তাই আমাদের কিছুজনকে পাশের আরেকটা হোটেলে ঘর দিল। সাপে বর হল বটে কারণ এই নতুন হোটেলটি ভারী সুন্দর। সোনালী রঙের প্রাসাদের মতোই দেখতে। ঘরগুলি বড়। বিছানা পরিপাটি। বিছানার ওপর দেওয়ালে সোনার কেল্লার একটা প্যানোরামা ছবি বাঁধিয়ে রাখা। প্রথম হোটেলটির ছাদে রাত্রের খাওয়ার ব্যবস্থা ছিল। ছাদ থেকে কাছেই সোনার কেল্লা দেখা যায়। দিব্যি সেই দেখতে দেখতে মাংস ভাত দিয়ে ডিনার সারলাম।
সকাল সকাল ব্রেকফাস্ট করে বেরনো হল লোকাল সাইটসিয়িং করতে। সাথে গাইড ছিলেন। প্রথমেই গেলাম পাট্টা কি হাভেলিতে। ওই একই জায়গায় দুটো হাভেলি আছে। আমরা একটিই দেখা স্থির করলাম। পঞ্চাশ টাকা টিকিট কাটতে হল। হাভেলির বাইরে থেকে দেখলাম সোনালী পাথরে তৈরি একটি বিশাল বড় বাড়ি। অত্যন্ত সূক্ষ্ম কারুকার্য করা দেওয়ালে, পাথরের ওপর। বারান্দাগুলি দেখার মতো। তেমনি দেখার মতো হল জাফরি কাজগুলি। ব্যবসায়ী পরিবারের অঢেল টাকা, তাই এমন ব্য্যবহুল বাড়ি বানানো। বিলাসবহুলও বটে। হাভেলির ভিতরে বিশাল উঁচু উঁচু সিঁড়ি। এবং সরু। আমার আবার একটু ক্লস্ট্রোফোবিয়া আছে, তাই হাল্কা অস্বস্তি হচ্ছিল সিঁড়ি ভাঙতে। কিন্তু এই কষ্টটা সত্যিই করা উচিৎ। কারণ ভিতরটাও দেখার মতোই সুন্দর। সিলিঙে নানান রঙের পেইন্টিং থেকে শুরু করে কাঁচের কাজ, স্কাল্পচার, অসামান্য। একেক তলায় একেক খনির সম্ভার যেন। সবচেয়ে ওপরতলা আর ছাদ, দুই জায়গা থেকেই বিশাল সোনার কেল্লা দেখা যায়। আমাদের গাইড তো বেশ উৎসাহ পেয়ে আমায় দাঁড় করিয়ে পোজ দিইয়ে অনেক ছবি তুলে দিলেন সোনার কেল্লার ব্যাকড্রপে। হাভেলির বাইরে আবার অনেক ছোটখাটো দোকান। সস্তায় বেশ রংবেরঙের জামা ব্যাগ শোপিস ইত্যাদি ইত্যাদি বিক্রি হচ্ছিল। আমি কি কিনলাম কিছু? হ্যাঁ অবশ্যই! যোধপুর ছাড়া সব জায়গা থেকেই আমি কিছু না কিছু কিনেছি, এইটা পরে খেয়াল হল!
হাভেলি ঘোরা এবং তারপরে কেনাকাটির পর গাইড আমাদের ভিতরের গলির রাস্তা দিয়ে দিয়ে নিয়ে চললেন সোনার কেল্লার দিকে। একটা অদ্ভুত জিনিস খেয়াল করলাম। রাস্তা জুড়ে দেওয়ালগুলিতে বিয়ের বিজ্ঞপ্তি। অমুকের সাথে তমুকের বিয়ে। অমুক দিন। তমুক জায়গায়। বাড়িগুলোর দেওয়ালে লেখা। রঙিন। মা অবাক হয়ে জানতে চাইল এখানে কার্ডের প্রচলন নেই নাকি? গাইড বললেন যে হ্যাঁ, টা আছে। তবুও এই বিজ্ঞপ্তি দেওয়াটা চলে আসছে বছরের পর বছর। ভারী মজার কিন্তু!
সোনার কেল্লাতে ঢুকলাম একটা বাজার অঞ্চলের মধ্যে দিয়ে। সোনার কেল্লা নাকি অন্যতম "living fort", অর্থাৎ, এখনো জয়সালমের শহরের বহু বাসিন্দা কেল্লার মধ্যেই বসবাস করেন। অনেকটা জায়গা জুড়ে এই কেল্লা। কিছুটা এলাকা শুধুমাত্র টুরিস্টদের জন্য। কিছুটা ব্রাহ্মণদের থাকার জায়গা আর কিছুটা রাজপুতদের। গাইড বললেন, কেল্লার ভিতরে অনেকটা হাঁটাহাঁটি আর কিছু সিঁড়ি ভাঙ্গা রয়েছে। সেই শুনে দলের তিন চারজন এলেন না। তারা নীচেই বসে চারিদিক দেখতে লাগলেন। দোকানপাট, লোকজন। আমরা গাইডের পিছন পিছন চললাম। প্রথমেই আমাদের নিয়ে এলেন লক্ষ্মী নারায়ণ মন্দিরে। দেব দেবী নিয়ে কিছু বলার নেই, তবে মন্দিরের বাইরের কারুকার্য খুব সুন্দর। সেই জাফরি কাজের। এরপরের স্থান হল "মুকুল বাড়ি"। সোনার কেল্লা সিনেমায় যে বাড়িটা দেখে মুকুল নিজের বাড়ি বলে পরিচয় দেয়, সেই ভগ্নাবশেষটি এখন আরেকটা "স্পট"। অন্যান্য প্রদেশের টুরিস্টদের সেটি দেখানো হয় কিনা সেই বিষয়ে আমার খুব কৌতূহল। চারিদিকেই মুকুল আর মুকুল। একটি দোকান দেখলাম পাথর বাটির, সেটির নামেও মুকুল। শুনেছি ওখানে নাকি প্রত্যেক দোকানেই (অন্তত পুরনো গুলো) সত্যজিত রায়ের ছবিতে পুজো করে। নেহাত কোন দোকানে ঢুকিনি, তাই যাচাই করতে পারিনি। এমনি রাস্তার ধারে কেল্লার মধ্যে ঢেলে বিক্রি হচ্ছে সোনার পাথরবাটি। দর দাম করতে হবে অবশ্যই। কিনলাম কয়েকটা।
এরপর মূল মহলে যাওয়া কেল্লার। টিকিট কাটতে হল। ক্যামেরার আলাদা টিকিট। প্রাসাদে রাজাদের বংশতালিকা, তাদের ছবি তো দেখলামই, সাথে তাদের ব্যবহৃত পোশাক, অস্ত্র সবই চোখে পড়ল। এগুলি দেখে দেখে এখন চোখ পচে যাওয়ার জোগাড়। কিন্তু যা বার বার দেখছিলাম আর মুগ্ধ হচ্ছিলাম, তা হল স্থাপত্য। কী অসম্ভব সুন্দর করে পাথরের ওপর খোদাই করে কাজ করা। ততক্ষণে সূর্যের তেজ বেড়েছে। সূর্যের আলোয় হলুদ স্যান্ডস্টোনের কেল্লাকে দেখে সত্যি মনে হচ্ছিল যেন সোনা দিয়ে তৈরি। সোনালি আভা ঠিকরে পড়ছিল যেন। প্রাসাদের ছাদ থেকে দেখতে পেলাম অনতিদূরে জৈন মন্দিরের চুড়ো। পাশে লোকজনের বাড়ি। প্রাচীন কেল্লায় এখন টাটা স্কাইয়ের এন্টেনাও দেখলাম, পুরনো ও নতুনের কী অদ্ভুত সুন্দর মিলন। ছাদ থেকে পাট্টা হাভেলিটিও দেখলাম। জায়গায় জায়গায় এখন হোটেল, দোকান। ঘিঞ্জি হয়ে গিয়েছে কেল্লার ভিতর। যার ফলে নাকি এখন কেল্লার সামগ্রিক অবস্থা বিশেষ সুবিধের না, সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা দেখা গিয়েছে। ড্রেনেজ সিস্টেমের অবস্থা নিতান্তই শোচনীয়। মাঝে মাঝে থেমে থেমে আমরা ছবি তুলে বেরিয়ে এলাম কেল্লা থেকে। পারকিং লট অবধি পৌছতে পৌছতে কেল্লার বিশাল প্রাচীর আমাদের সাথে সাথেই ছিল। সোনার কেল্লা সোনার কেল্লা বলে এত উত্তেজনা, তাও দেখা শেষ!
ইতিমধ্যে ওই ভীষণ রোদে ঘুরে ঘুরে আমার সাইনাসের ব্যথাটা চাগাড় দিয়ে উঠল। তাই এরপরে কাছেই একটি মন্দিরে নিয়ে গিয়েছিল, সেখানে আর আমি নামিনি। বিকেলে উট চাপতে হবে যে। এনারজি বাঁচানো আর কী!
দুপুরের খাওয়া দাওয়ার পাট মিটিয়ে চারটে নাগাদ বেরনো হল আবার বাসে করে, ক্যামেল সাফারির উদ্দেশ্যে। ইতিমধ্যে তো যাবতীয় সব রকম পড়াশোনা করে রেখেছি, কী ভাবে উটে উঠবো। খুব লাফাচ্ছি, আহা, উট, শিপ অফ দি ডেজারট, ইত্যাদি ইত্যাদি বলে। তারপরে যখন আসল সময় এলো, ভয়ে হাত পা ঠান্ডা হওয়ার জোগাড়। আমি বেঁটে মানুষ, পা দুটো ছোট। বাইকে একদিকে দুই পা রেখে বসি, সে হেন মানুষকে উটের পিঠে বসাতে গিয়ে একেবারে নাজেহাল অবস্থা। দলের আরেকটি মেয়ে ছিল, কোনমতে উটে চেপে তার কোমর জড়িয়ে বসেছি। উট সামনে ঝুঁকবে না আমি পিছনে ঝুঁকব, এই ভাবতে ভাবতে ঠিক করতে করতে দেখি হ্যাঁচকা দিয়ে উট চার পায়ে খাঁড়া। উটের পিঠে চেপে তারপরে শুরু হল আমাদের সাফারি। উট ব্যাটা সোজা রাস্তা দিয়ে যাবেনা, তাকে যত উঁচু নীচু জায়গা দিয়েই যেতে হবে। খালি মনে হচ্ছে, এই রে, এই বুঝি উল্টে পড়ব। উটের সাথে যে ছেলেটি যাচ্ছিল, সে যত আমায় বলে যে কিচ্ছু হবেনা, পড়ব না। রিলাক্স করি যেন। আমার তো ভয়ে অবস্থা খারাপ। পারলে ওখানেই নেমে যাই, এমন অবস্থা। এই হাল্কা দুলুনি, এই বুঝি গেলাম, এই রে, এই শেষ, সাইকেল থেকে পড়ে হাত ভাঙতে ভাঙতে বেঁচেছি, ফাঁড়াটা কাটেনি, এই এবার উট থেকে পড়ব, এইসব ভাবতে ভাবতে যতক্ষণে দেখি এডজাস্ট হবো হবো, ততক্ষণে গন্তব্যে পৌঁছে গেলাম। মিনিট পনেরো, মোটামুটি মরুভূমির ওপর দিয়ে গেলাম। তবে সেখানে গিয়ে উট চালক বলে কি এটা কী আর আসল রেগিস্তান, আরো ছয়শো টাকা দিলে আধ ঘন্টা ধরে মূল মরুভূমিতে ঘুরিয়ে আনবে। কোথায় রুদালি, কোথায় বর্ডার ইত্যাদি সিনেমার শুটিং হয়েছে, সব দেখাবে। ততক্ষণে আমার অবস্থা এমন যে ফ্রিতে নিয়ে গেলেও যাবো না। বাবা রে বাবা, সখ মিটে গিয়েছে। হেঁটে চলে বেরাব, তাও ভালো। কিন্তু উটের পিঠে আর না। দাঁড়িয়ে ঘুরে বেরিয়ে তারপরে সূর্যাস্ত দেখলাম মরুভুমিতে। বিরাট লাল সূর্য আস্তে আস্তে ঢলে পড়ল পশ্চিম আকাশে। দিগন্ত বিস্তৃত লালচে আভার আকাশ। ক্রমে অন্ধকার নামল। আমাদের এরপরের গন্তব্য ফোক ডান্স শো। ক্যাম্পে যেতে গিয়ে দেখলাম পূর্ণিমার এত্ত বড় চাঁদ উঠছে। সূর্যাস্ত সূর্যোদয় অনেক দেখছি, চন্দ্রোদয় এই প্রথম দেখলাম। অসম্ভব সুন্দর লাগল। খোলা আকাশের নীচে এরপর গ্যালারিতে বসলাম। খুব কনকনে ঠান্ডা ছিল। ভালো করে সোয়েটার পড়ে চাদর মুরি দিয়ে বসলাম। শুরু হল কেসরিয়া বালাম গান দিয়ে। স্থানীয় শিল্পীদের পরিবেশনায়। পরপর চলতে লাগল রাজস্থানি লোকসঙ্গীত, সাথে নাচ। সে নাচ কখনো ঘুমর নাচ, কখনো বাঞ্জারা নাচ। আগুন নিয়ে নাচ, কাঁচের ওপর দাঁড়িয়ে নাচ, মাথায় মটকা ব্যালেন্স করে নাচ। আহা। না দেখলে বোঝান যাবেনা বলে। অসম্ভব ভালো লেগেছিল। ঘন্টা দুই পারফরমেন্স দেখে এবার হোটেল ফেরার পালা।
আর মোটে যোধপুর ঘোরা বাকি। পরের দিন যোধপুর। তারপরের দিন সেখান থেকে যোধপুর এক্সপ্রেসে হাওড়া ফেরার টিকিট। এদিকে ট্রেন ট্র্যাক করে দেখা যাচ্ছে, কুয়াশার জন্য প্রত্যেক দিন ট্রেনটি প্রায় ১৫-১৬ ঘন্টা লেটে চলছে। যে ট্রেনটা হাওড়া থেকে আসবে আর আমরা তাতে উঠব, সেটা যোধপুর থেকে ছেড়েছে প্রায় ১৬ ঘন্টা লেটে। বাড়তি চিন্তা শুরু হল ফেরা নিয়ে। ট্রেন ক্যান্সেল করলেই শেষ। ডিনার টেবিলে বসে সিদ্ধান্ত নেওয়া হল যে ট্রেনে ফিরলে খুব দেরি হয়ে যাবে। ততদিনে সকলেই আমরা টায়ারড ভীষণ ভাবে। লম্বা ট্রিপ করে কাহিল চারজনেই। যোধপুর থেকে ফ্লাইট আছে কলকাতার, তবে ভায়া দিল্লি বা বম্বে। তাতে তখন টিকিটের দাম ষোল সতেরো হাজার টাকা একেক জনের। মারাত্মক। জয়পুর থেকে দেখলাম ছয় হাজারের একটু বেশী। খানিক ভেবেচিন্তে জয়পুরের টিকিট কেটে নেওয়া হল। আগে তো যোধপুর পৌঁছই, তারপর দেখা যাবে। যোধপুর আই আই টি তে আমার এক পরিচিত পড়ায়, ওকে জিজ্ঞেস করলাম জয়পুর যাবো কি ভাবে। বাস গাড়ি ট্রেন সবের হদিস পেলাম। নিশ্চিন্ত হলাম। মা বাবা আর কাকার প্রথম ফ্লাইট হবে, সেই নিয়ে অল্প উত্তেজনাও হল। জয়পুরে গিয়ে কোথায় থাকব, সেটাও অ্যাপ দিয়ে খুঁজে বুক করে ফেললাম চুটকিতেই। কত সুবিধে আজকাল!
আগামীকাল লম্বা জার্নি আবার। যোধপুর যাওয়া।
আমাদের হোটেলে বাস পৌঁছে দিল। সেখানে রিসেপশনে দেখলাম ক্যামেল সাফারি, সোনার কেল্লার ছবি। এত বাঙালি ট্যুরিস্ট আসে ওখানে বলে, দেওয়ালে বাংলাতে নোটিস লিখে রাখা। ওই হোটেলে তখন আমাদের দল ছাড়াও আরো দুটি দল আসায় ঘরের কমতি হয়েছিল। তাই আমাদের কিছুজনকে পাশের আরেকটা হোটেলে ঘর দিল। সাপে বর হল বটে কারণ এই নতুন হোটেলটি ভারী সুন্দর। সোনালী রঙের প্রাসাদের মতোই দেখতে। ঘরগুলি বড়। বিছানা পরিপাটি। বিছানার ওপর দেওয়ালে সোনার কেল্লার একটা প্যানোরামা ছবি বাঁধিয়ে রাখা। প্রথম হোটেলটির ছাদে রাত্রের খাওয়ার ব্যবস্থা ছিল। ছাদ থেকে কাছেই সোনার কেল্লা দেখা যায়। দিব্যি সেই দেখতে দেখতে মাংস ভাত দিয়ে ডিনার সারলাম।
সকাল সকাল ব্রেকফাস্ট করে বেরনো হল লোকাল সাইটসিয়িং করতে। সাথে গাইড ছিলেন। প্রথমেই গেলাম পাট্টা কি হাভেলিতে। ওই একই জায়গায় দুটো হাভেলি আছে। আমরা একটিই দেখা স্থির করলাম। পঞ্চাশ টাকা টিকিট কাটতে হল। হাভেলির বাইরে থেকে দেখলাম সোনালী পাথরে তৈরি একটি বিশাল বড় বাড়ি। অত্যন্ত সূক্ষ্ম কারুকার্য করা দেওয়ালে, পাথরের ওপর। বারান্দাগুলি দেখার মতো। তেমনি দেখার মতো হল জাফরি কাজগুলি। ব্যবসায়ী পরিবারের অঢেল টাকা, তাই এমন ব্য্যবহুল বাড়ি বানানো। বিলাসবহুলও বটে। হাভেলির ভিতরে বিশাল উঁচু উঁচু সিঁড়ি। এবং সরু। আমার আবার একটু ক্লস্ট্রোফোবিয়া আছে, তাই হাল্কা অস্বস্তি হচ্ছিল সিঁড়ি ভাঙতে। কিন্তু এই কষ্টটা সত্যিই করা উচিৎ। কারণ ভিতরটাও দেখার মতোই সুন্দর। সিলিঙে নানান রঙের পেইন্টিং থেকে শুরু করে কাঁচের কাজ, স্কাল্পচার, অসামান্য। একেক তলায় একেক খনির সম্ভার যেন। সবচেয়ে ওপরতলা আর ছাদ, দুই জায়গা থেকেই বিশাল সোনার কেল্লা দেখা যায়। আমাদের গাইড তো বেশ উৎসাহ পেয়ে আমায় দাঁড় করিয়ে পোজ দিইয়ে অনেক ছবি তুলে দিলেন সোনার কেল্লার ব্যাকড্রপে। হাভেলির বাইরে আবার অনেক ছোটখাটো দোকান। সস্তায় বেশ রংবেরঙের জামা ব্যাগ শোপিস ইত্যাদি ইত্যাদি বিক্রি হচ্ছিল। আমি কি কিনলাম কিছু? হ্যাঁ অবশ্যই! যোধপুর ছাড়া সব জায়গা থেকেই আমি কিছু না কিছু কিনেছি, এইটা পরে খেয়াল হল!
হাভেলি ঘোরা এবং তারপরে কেনাকাটির পর গাইড আমাদের ভিতরের গলির রাস্তা দিয়ে দিয়ে নিয়ে চললেন সোনার কেল্লার দিকে। একটা অদ্ভুত জিনিস খেয়াল করলাম। রাস্তা জুড়ে দেওয়ালগুলিতে বিয়ের বিজ্ঞপ্তি। অমুকের সাথে তমুকের বিয়ে। অমুক দিন। তমুক জায়গায়। বাড়িগুলোর দেওয়ালে লেখা। রঙিন। মা অবাক হয়ে জানতে চাইল এখানে কার্ডের প্রচলন নেই নাকি? গাইড বললেন যে হ্যাঁ, টা আছে। তবুও এই বিজ্ঞপ্তি দেওয়াটা চলে আসছে বছরের পর বছর। ভারী মজার কিন্তু!
সোনার কেল্লাতে ঢুকলাম একটা বাজার অঞ্চলের মধ্যে দিয়ে। সোনার কেল্লা নাকি অন্যতম "living fort", অর্থাৎ, এখনো জয়সালমের শহরের বহু বাসিন্দা কেল্লার মধ্যেই বসবাস করেন। অনেকটা জায়গা জুড়ে এই কেল্লা। কিছুটা এলাকা শুধুমাত্র টুরিস্টদের জন্য। কিছুটা ব্রাহ্মণদের থাকার জায়গা আর কিছুটা রাজপুতদের। গাইড বললেন, কেল্লার ভিতরে অনেকটা হাঁটাহাঁটি আর কিছু সিঁড়ি ভাঙ্গা রয়েছে। সেই শুনে দলের তিন চারজন এলেন না। তারা নীচেই বসে চারিদিক দেখতে লাগলেন। দোকানপাট, লোকজন। আমরা গাইডের পিছন পিছন চললাম। প্রথমেই আমাদের নিয়ে এলেন লক্ষ্মী নারায়ণ মন্দিরে। দেব দেবী নিয়ে কিছু বলার নেই, তবে মন্দিরের বাইরের কারুকার্য খুব সুন্দর। সেই জাফরি কাজের। এরপরের স্থান হল "মুকুল বাড়ি"। সোনার কেল্লা সিনেমায় যে বাড়িটা দেখে মুকুল নিজের বাড়ি বলে পরিচয় দেয়, সেই ভগ্নাবশেষটি এখন আরেকটা "স্পট"। অন্যান্য প্রদেশের টুরিস্টদের সেটি দেখানো হয় কিনা সেই বিষয়ে আমার খুব কৌতূহল। চারিদিকেই মুকুল আর মুকুল। একটি দোকান দেখলাম পাথর বাটির, সেটির নামেও মুকুল। শুনেছি ওখানে নাকি প্রত্যেক দোকানেই (অন্তত পুরনো গুলো) সত্যজিত রায়ের ছবিতে পুজো করে। নেহাত কোন দোকানে ঢুকিনি, তাই যাচাই করতে পারিনি। এমনি রাস্তার ধারে কেল্লার মধ্যে ঢেলে বিক্রি হচ্ছে সোনার পাথরবাটি। দর দাম করতে হবে অবশ্যই। কিনলাম কয়েকটা।
এরপর মূল মহলে যাওয়া কেল্লার। টিকিট কাটতে হল। ক্যামেরার আলাদা টিকিট। প্রাসাদে রাজাদের বংশতালিকা, তাদের ছবি তো দেখলামই, সাথে তাদের ব্যবহৃত পোশাক, অস্ত্র সবই চোখে পড়ল। এগুলি দেখে দেখে এখন চোখ পচে যাওয়ার জোগাড়। কিন্তু যা বার বার দেখছিলাম আর মুগ্ধ হচ্ছিলাম, তা হল স্থাপত্য। কী অসম্ভব সুন্দর করে পাথরের ওপর খোদাই করে কাজ করা। ততক্ষণে সূর্যের তেজ বেড়েছে। সূর্যের আলোয় হলুদ স্যান্ডস্টোনের কেল্লাকে দেখে সত্যি মনে হচ্ছিল যেন সোনা দিয়ে তৈরি। সোনালি আভা ঠিকরে পড়ছিল যেন। প্রাসাদের ছাদ থেকে দেখতে পেলাম অনতিদূরে জৈন মন্দিরের চুড়ো। পাশে লোকজনের বাড়ি। প্রাচীন কেল্লায় এখন টাটা স্কাইয়ের এন্টেনাও দেখলাম, পুরনো ও নতুনের কী অদ্ভুত সুন্দর মিলন। ছাদ থেকে পাট্টা হাভেলিটিও দেখলাম। জায়গায় জায়গায় এখন হোটেল, দোকান। ঘিঞ্জি হয়ে গিয়েছে কেল্লার ভিতর। যার ফলে নাকি এখন কেল্লার সামগ্রিক অবস্থা বিশেষ সুবিধের না, সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা দেখা গিয়েছে। ড্রেনেজ সিস্টেমের অবস্থা নিতান্তই শোচনীয়। মাঝে মাঝে থেমে থেমে আমরা ছবি তুলে বেরিয়ে এলাম কেল্লা থেকে। পারকিং লট অবধি পৌছতে পৌছতে কেল্লার বিশাল প্রাচীর আমাদের সাথে সাথেই ছিল। সোনার কেল্লা সোনার কেল্লা বলে এত উত্তেজনা, তাও দেখা শেষ!
ইতিমধ্যে ওই ভীষণ রোদে ঘুরে ঘুরে আমার সাইনাসের ব্যথাটা চাগাড় দিয়ে উঠল। তাই এরপরে কাছেই একটি মন্দিরে নিয়ে গিয়েছিল, সেখানে আর আমি নামিনি। বিকেলে উট চাপতে হবে যে। এনারজি বাঁচানো আর কী!
দুপুরের খাওয়া দাওয়ার পাট মিটিয়ে চারটে নাগাদ বেরনো হল আবার বাসে করে, ক্যামেল সাফারির উদ্দেশ্যে। ইতিমধ্যে তো যাবতীয় সব রকম পড়াশোনা করে রেখেছি, কী ভাবে উটে উঠবো। খুব লাফাচ্ছি, আহা, উট, শিপ অফ দি ডেজারট, ইত্যাদি ইত্যাদি বলে। তারপরে যখন আসল সময় এলো, ভয়ে হাত পা ঠান্ডা হওয়ার জোগাড়। আমি বেঁটে মানুষ, পা দুটো ছোট। বাইকে একদিকে দুই পা রেখে বসি, সে হেন মানুষকে উটের পিঠে বসাতে গিয়ে একেবারে নাজেহাল অবস্থা। দলের আরেকটি মেয়ে ছিল, কোনমতে উটে চেপে তার কোমর জড়িয়ে বসেছি। উট সামনে ঝুঁকবে না আমি পিছনে ঝুঁকব, এই ভাবতে ভাবতে ঠিক করতে করতে দেখি হ্যাঁচকা দিয়ে উট চার পায়ে খাঁড়া। উটের পিঠে চেপে তারপরে শুরু হল আমাদের সাফারি। উট ব্যাটা সোজা রাস্তা দিয়ে যাবেনা, তাকে যত উঁচু নীচু জায়গা দিয়েই যেতে হবে। খালি মনে হচ্ছে, এই রে, এই বুঝি উল্টে পড়ব। উটের সাথে যে ছেলেটি যাচ্ছিল, সে যত আমায় বলে যে কিচ্ছু হবেনা, পড়ব না। রিলাক্স করি যেন। আমার তো ভয়ে অবস্থা খারাপ। পারলে ওখানেই নেমে যাই, এমন অবস্থা। এই হাল্কা দুলুনি, এই বুঝি গেলাম, এই রে, এই শেষ, সাইকেল থেকে পড়ে হাত ভাঙতে ভাঙতে বেঁচেছি, ফাঁড়াটা কাটেনি, এই এবার উট থেকে পড়ব, এইসব ভাবতে ভাবতে যতক্ষণে দেখি এডজাস্ট হবো হবো, ততক্ষণে গন্তব্যে পৌঁছে গেলাম। মিনিট পনেরো, মোটামুটি মরুভূমির ওপর দিয়ে গেলাম। তবে সেখানে গিয়ে উট চালক বলে কি এটা কী আর আসল রেগিস্তান, আরো ছয়শো টাকা দিলে আধ ঘন্টা ধরে মূল মরুভূমিতে ঘুরিয়ে আনবে। কোথায় রুদালি, কোথায় বর্ডার ইত্যাদি সিনেমার শুটিং হয়েছে, সব দেখাবে। ততক্ষণে আমার অবস্থা এমন যে ফ্রিতে নিয়ে গেলেও যাবো না। বাবা রে বাবা, সখ মিটে গিয়েছে। হেঁটে চলে বেরাব, তাও ভালো। কিন্তু উটের পিঠে আর না। দাঁড়িয়ে ঘুরে বেরিয়ে তারপরে সূর্যাস্ত দেখলাম মরুভুমিতে। বিরাট লাল সূর্য আস্তে আস্তে ঢলে পড়ল পশ্চিম আকাশে। দিগন্ত বিস্তৃত লালচে আভার আকাশ। ক্রমে অন্ধকার নামল। আমাদের এরপরের গন্তব্য ফোক ডান্স শো। ক্যাম্পে যেতে গিয়ে দেখলাম পূর্ণিমার এত্ত বড় চাঁদ উঠছে। সূর্যাস্ত সূর্যোদয় অনেক দেখছি, চন্দ্রোদয় এই প্রথম দেখলাম। অসম্ভব সুন্দর লাগল। খোলা আকাশের নীচে এরপর গ্যালারিতে বসলাম। খুব কনকনে ঠান্ডা ছিল। ভালো করে সোয়েটার পড়ে চাদর মুরি দিয়ে বসলাম। শুরু হল কেসরিয়া বালাম গান দিয়ে। স্থানীয় শিল্পীদের পরিবেশনায়। পরপর চলতে লাগল রাজস্থানি লোকসঙ্গীত, সাথে নাচ। সে নাচ কখনো ঘুমর নাচ, কখনো বাঞ্জারা নাচ। আগুন নিয়ে নাচ, কাঁচের ওপর দাঁড়িয়ে নাচ, মাথায় মটকা ব্যালেন্স করে নাচ। আহা। না দেখলে বোঝান যাবেনা বলে। অসম্ভব ভালো লেগেছিল। ঘন্টা দুই পারফরমেন্স দেখে এবার হোটেল ফেরার পালা।
আর মোটে যোধপুর ঘোরা বাকি। পরের দিন যোধপুর। তারপরের দিন সেখান থেকে যোধপুর এক্সপ্রেসে হাওড়া ফেরার টিকিট। এদিকে ট্রেন ট্র্যাক করে দেখা যাচ্ছে, কুয়াশার জন্য প্রত্যেক দিন ট্রেনটি প্রায় ১৫-১৬ ঘন্টা লেটে চলছে। যে ট্রেনটা হাওড়া থেকে আসবে আর আমরা তাতে উঠব, সেটা যোধপুর থেকে ছেড়েছে প্রায় ১৬ ঘন্টা লেটে। বাড়তি চিন্তা শুরু হল ফেরা নিয়ে। ট্রেন ক্যান্সেল করলেই শেষ। ডিনার টেবিলে বসে সিদ্ধান্ত নেওয়া হল যে ট্রেনে ফিরলে খুব দেরি হয়ে যাবে। ততদিনে সকলেই আমরা টায়ারড ভীষণ ভাবে। লম্বা ট্রিপ করে কাহিল চারজনেই। যোধপুর থেকে ফ্লাইট আছে কলকাতার, তবে ভায়া দিল্লি বা বম্বে। তাতে তখন টিকিটের দাম ষোল সতেরো হাজার টাকা একেক জনের। মারাত্মক। জয়পুর থেকে দেখলাম ছয় হাজারের একটু বেশী। খানিক ভেবেচিন্তে জয়পুরের টিকিট কেটে নেওয়া হল। আগে তো যোধপুর পৌঁছই, তারপর দেখা যাবে। যোধপুর আই আই টি তে আমার এক পরিচিত পড়ায়, ওকে জিজ্ঞেস করলাম জয়পুর যাবো কি ভাবে। বাস গাড়ি ট্রেন সবের হদিস পেলাম। নিশ্চিন্ত হলাম। মা বাবা আর কাকার প্রথম ফ্লাইট হবে, সেই নিয়ে অল্প উত্তেজনাও হল। জয়পুরে গিয়ে কোথায় থাকব, সেটাও অ্যাপ দিয়ে খুঁজে বুক করে ফেললাম চুটকিতেই। কত সুবিধে আজকাল!
আগামীকাল লম্বা জার্নি আবার। যোধপুর যাওয়া।
আমার চোখে রাজস্থান পর্ব ৮ (হলদিঘাটি ও মাউন্ট আবু)
উদয়পুর ঘুরবার পর আমাদের পরেরদিন সক্কাল সক্কাল বেরোনো হল। উদ্দেশ্য মাউন্ট আবু। পথে একবার যাওয়ার কথা হলদিঘাটি। ঘন্টাখানেকের পথ ছিল। হার কাঁপানো ঠাণ্ডায় বাস যখন হলদিঘাটিতে পৌঁছল, তখন যেন বাস থেকে নামতেই ইছহে করছেনা, এমন অবস্থা। চেতকের স্মৃতি ফলক ছিল আমাদের প্রথম স্টপ। সেই জায়গাটিতেই চেতক তার শেষ নিঃশ্বাস নেয়। অসীম সাহস, দক্ষতা ও প্রভুভক্তির চরম নিদর্শন রাণা প্রতাপের ঘোড়া চেতক। তাই তার স্মৃতি বিজড়িত স্থানটি দেখতেই হত। মোটা সোয়েটার, চাদর, টুপি পরেও যেন বাধ মানছিল নাওই কনকন ঠাণ্ডা বাতাস। হাতে হাতে ঘষতে ঘষতে তাও নামলাম। দেখলাম। অনুভব করলাম। মিনিট পাঁচেকের হাঁটাপথেই রয়েছে একটু সামনেই, মহারাণা প্রতাপ মিউজিয়াম। একটা নির্দিষ্ট প্রবেশমূল্যের বিনিময়ে এই মিউজিয়ামটি ঘুরে দেখা যায়। ঢুকেই প্রথমেই নজরে পড়ে কপার রঙের ধাতুর তৈরি বিরাট কিছু মূর্তি। যুদ্ধরত রাণা প্রতাপ ও মান সিংহ, কিছু আরও সহকারী সেনা। মিউজিয়ামের ভিতর ঢুকে সেই রাজপুত রাণাদের অস্ত্রশস্ত্রর প্রদর্শনী দেখলাম। ইতিমধ্যে বেশ কিছু মিউজিয়াম ঘুরে ঘুরে এখন আর ওগুলোর প্রতি আলাদা আকর্ষণ বোধ করছিলাম না। যেটা ভালো লাগল এরপর, সেটা হল পাঁচ মিনিটের একটি ভিডিয়ো, রাণা প্রতাপের জীবনী নিয়ে।
হলদিঘাটির যুদ্ধের ঘটনা প্রায় প্রত্যেকেই আমরা পড়েছি ইতিহাসের পাতায়। কিন্তু মূলত আমাদের ইতিহাস শিক্ষা সীমিত থেকেছে মোঘল সাম্রাজ্যের কাহিনী অবধি। রাজপুতদের কাহিনী খুব কম পড়েছি। এই ভিডিয়োটির মাধ্যমে রাজপুতদের বীর বিক্রমের কথা দেখতে পাই, জানতে পারি তাদের শৌর্যর কথা। হলদিঘাটির যুদ্ধের একটা ব্যাপার যেটা লক্ষ্য করলাম তা হল, রাণা প্রতাপের সেনাপতি ছিলেন এক মুসলমান ব্যক্তি। আর আকবরের সেনাপতি ছিলেন মান সিংহ। অর্থাৎ এটিকে কিন্তু সেই অর্থে হিন্দু মুসলমানের communal warfareও বলা চলে না। যেদিন প্রবল যুদ্ধ চলছিল, প্রায় রাণা প্রতাপের হার নিশ্চিত, এমন সময়ে তার এক সৈন্য, যাকে অবিকল প্রতাপের মতোই দেখতে, সে প্রতাপের বেশ ধারণ করে লড়াই করেন ও প্রাণ বলিদান দেন। সেই সুযোগে প্রতাপ চেতকের সাহায্যে যুদ্ধক্ষেত্র ছেড়ে পালাতে সক্ষম হন। এই সময়ে চেতকের বীর বিক্রমের কাহিনী তো আমরা সকলেই জানি। রাজস্থান বিভিন্ন স্থানেও এর চিত্র বা মূর্তি দেখেছি। ভিডিয়োটির পর লাইট এন্ড সাউন্ডের ব্যবস্থা ছিল। পুতুল ও আরো বিভিন্ন প্রপ্সের সাহায্যে, লাইট ফেলে সাথে সুন্দর ব্যাকগ্রাউন্ড ম্যুজিক দিয়ে মহারাণা প্রতাপ ও হলদিঘাটির লড়াইয়ের পুরো ইতিহাস বলে যাচ্ছিল। পান্নাদাইয়ের ইন্সটলেশনের সামনে এসে খানিক স্তব্ধ হলাম। যদিও পান্নার চরম বলিদানের কথা বইতে পড়া, তবুও চোখের সামনে ওই নিজের সন্তানকে নিশ্চিত মৃত্যুর সামনে রেখে রাণাকে সুরক্ষিত স্থানে সরানোর দৃশ্য দেখে যেন ব্যাপারটা ধাক্কা মারল। একজন মা যে কীভাবে এমন বলিদান দিতে পারেন, দেশমাতৃকার জন্য, সত্যিই ভাবনার বাইরে। মিউজিয়ামের বাইরে গুলকন্দ বিক্রি হচ্ছিল। আমরা কিনিনি। বরং আশেপাশে একটু ঘুরলাম। কিছু উট, গরু ইত্যাদির বড় মূর্তি আছে। ছবি তোলার জন্য ভালো। গরুর টানে আখের রস তৈরি হচ্ছিল, সেটাও দেখলাম। দশ টাকা করে গ্লাস প্রতি বিক্রিও হচ্ছিল। স্যুভেনির শপ আছে। বাইরে থেকেই দেখতে ভালো। ঢুকলে মোটামুটি গলা কাটা দাম যে হবেই, আন্দাজ করে নিয়েছিলাম। মূল কম্পাউন্ডের বাইরে কিছু উট সাজানো ছিল, কেউ যদি সাফারই করতে চান, সেই উদ্দেশ্যে। আমরা রাস্তায় চায়ের দোকান থেকে গরম গরম চা খেলাম, ঠাণ্ডায় আরাম হল। ব্রেকফাস্টে সেদিন ওই বান রুটি ইত্যাদি আর ভালো লাগছিল না বলে খাইনি। রাস্তার দোকান থেকেই পোহা খেলাম। মেসে এমনিতে পোহা দেখলে নাক কুঁচকোই, কিন্তু এদিন দিব্যি ভালো লাগল। আশেপাশে হলদিঘাটির হলুদ মাটিও দেখলাম।
এরপর রওনা দিলাম আরাবল্লী পাহাড় ভেদ করে মাউন্ট আবুর দিকে। ঠাণ্ডা ভালোই লাগছিল। পৌঁছোতে দুপুর হয়ে গিয়েছিল। হোটেলটি ছিল একটু রাস্তার ভিতরে। দেখলাম পাশাপাশি অনেকগুলো হোটেল ওরকম। বাড়িগুলোর সব কমন দেওয়াল। ওই সরু রাস্তায় আমাদের বড় বাস আসতে পারবেনা। তাই আমাদের এবং আমাদের লাগেজের জন্য জিপগাড়ির ব্যবস্থা হল। জীপ চড়লেই বেশ একটা পাহাড় পাহাড় অনুভূতি হয়, ভালো লাগে। মিনিট পাঁচেকে পৌঁছলাম হোটেল। ছিমছাম। সুন্দর। দুপুরের খাওয়া সেরে আমরা গেলাম নাক্কি লেক দেখতে। হোটেল থেকে পায়ে হাঁটা পথ। এ যাবত অনেক লেক দেখেছি পাহাড়ি শহরে। এই লেকটিও তার মধ্যে কোন আলাদা কিছু নজরে এলনা। সাধারণ সাজানো গোছানো লেক। সন্ধ্যে হয়ে গিয়েছিল। আলো দিয়ে ধারটা ঝলমল করছে। বোটিং চলছে। যেটা টেনেছিল সেটা অবশ্য করেই সারি সারি দোকান। লেকে যাওয়ার রাস্তা জুড়ে শুধুই দোকান আর দোকান। হ্যান্ডিক্রাফট, ব্যাগ, জামা, জুতো সব। আর খালি খাবারের দোকান। আইসক্রিম, ডাল বাটি চুরমা, মোমো, পুরী সব্জি কী নেই? মনের সুখে কেনাকাটা হল। ভুট্টা সিদ্ধ খাওয়া হল। ওই সময়ে তিনদিন ব্যাপী "winter festival" চলছিল মাউন্ট আবুতে। নাচ গান, খেলা, ফটোগ্রাফি নানান বিষয়ে বিভিন্ন এক্টিভিটিজ ছিল। আমরা সন্ধ্যের বাকি সময়টা কাটালাম সামিয়ানার নীচে বসে রাজস্থানি লোক নৃত্য দেখতে দেখতে। ভারী রঙিন সে দৃশ্য। গানগুলিও বড্ড "catchy"।
পরের দিন গরম গরম আলুর পরোটা ছোলার তরকারি আর মিষ্টি খেয়ে ব্রেকফাস্ট খেয়ে আমরা আবার জিপগাড়িতে চেপেই বেরলাম লোকাল সাইটসিইং করতে। মাউন্ট আবুতে দর্শনীয় স্থান বলতে বিশ্ব বিখ্যাত দিলও্যারা মন্দির। জৈনদের মন্দির। অসামান্য স্থাপত্য কারুকার্য। কিন্তু সেটি এগারোটা না বারোটার আগে খোলেনা। তাই সময় কাটাতে আমাদের প্রথমে নিয়ে যাওয়া হল ব্রহ্মকুমারীদের হেড সেন্টারে। বিভিন্ন টিভি চ্যানেল ও ইয়ুট্যুবের কল্যাণে ব্রহ্মকুমারীদের সাথে আমাদের পরিচয় আছেই, তাদের হেড অফিস (অফিস বলা চলে কি?) দেখলাম। ধব ধবে সাদা বাড়ি। সামনে ভীষণ সুন্দর করে বাগান করা। বাড়িটির ভিতরে রয়েছে প্রেয়ার হল। ঝকঝকে তকতকে। ওখান থেকে তারপরে গেলাম একটি শিব মন্দিরে। কোন বৈশিষ্ট্য নেই। কিন্তু ভারতীয়দের একটু মন্দির দেখালে তারা খুশী হয়ে যায়, আর সেই জন্যই বুঝি এই মন্দিরগুলিও "স্পট" হয়ে গিয়েছে। এটি ছিল হাঁটা পথে। এরপরে আবার জিপে চড়ে যাওয়া হল আরো এক মন্দিরে। নাম আর মনে নেই। তবে বিষ্ণু আর মহাদেব দুজনেই উপাসিত, সেইটুকু মনে আছে। মন্দিরটি বড়। পাথরের কাজ করা।
পরের গন্তব্য গুরু শিখর। মাউন্ট আবুর সবচেয়ে উঁচু স্থান। অনেকটা সিঁড়ি ভেঙ্গে আবারও সেখানে মন্দির। এবং স্বাভাবিকভাবেই সেই মন্দিরে যাইনি। এমনিই হেঁটেচলে আশেপাশেটা দেখলাম। কাঁচা গাজর, মুলো, ভুট্টা বিক্রি হচ্ছিল। রোদ পড়ে বেশ একটা শীতের আমেজ পাচ্ছিলাম। ভিউ পয়েন্টে দাঁড়িয়ে নিজেরা ছবি তুললাম। অবশেষে বারোটা বাজতে গেলাম বহু প্রতীক্ষিত দিলোয়ারা মন্দিরে। মন্দিরে ঢুকতে গেলে সাংঘাতিক কড়া সিকিউরিটি। ফোন বা ক্যামেরা এলাউড না। তাই দুর্ভাগ্যবশত অমন অপূর্ব শিল্পকলার একটি ছবিও নেই। জুতো খুলে ব্যাগ ম্যানেজার কাকুর জিম্মায় রেখে লম্বা লাইন দিয়ে (ছেলেদের ও মেয়েদের লাইন আলাদা) ঢুকলাম। দেখলাম ড্রেস কোড রয়েছে। হাফ প্যান্ট লুঙ্গি ইত্যাদি চলবেনা। মন্দির কমপ্লেক্সের ভিতর তিন চারটে মন্দির দেখার মতো। বাইরে থেকে দেখে বোঝাই যায়না যে ভিতরটা অমন সুন্দর। আসলে এটি নাকি ইচ্ছাকৃত। যাতে কি না শত্রুরা নষ্ট না করে। মন্দিরের মধ্যে মার্বেলের ওপর exquisite স্থাপত্য। জৈন তীর্থঙ্করদের মূর্তি, মন্দির, বিভিন্ন নারী পুরুষের আকৃতি। দেখার মত। অনেকের মতে তাজ মহলের চেয়েও নাকি অপূর্ব। আমার যদিও তেমন মনে হয়নি, কিন্তু দেখতে ভীষণ ভালো লেগেছে, এইটুকু বলতে পারি। মন্দির ঘুরতে প্রায় ঘন্টাখানেক লাগল। মন্দির তৈরির ইতিহাস জানলাম। জানলাম একটি মন্দির কারিগরেরা নিজেদের ফ্রি টাইমে বিশ্রাম না নিয়ে ঝটতি পটতি মার্বেলের অংশ বিশেষ দিয়ে তৈরি করেন। তার ডিজাইন অবশ্যই তত সূক্ষ্ম না হলেও তাদের এফোরটটাকে সাধুবাদ জানাই।
হোটেলে ফিরে এসে খাওয়াদাওয়া সেরে অল্প ঘুম দেওয়া হল। বিকেলে পায়ে হেঁটে সানসেট পয়েন্ট যাওয়ার কথা। এমন ঠাণ্ডা জাঁকিয়ে পড়েছিল, আর লেপের তলা থেকে বেরোতে পারিনি! মনে হল, সানসেট তো অনেক দেখেছি। একটু আরাম করি। বছরের শেষ সূর্যাস্ত দেখে মন খারাপ না করে লেপের ওম নিই। ন্যু ইয়ার ইভ স্পেশাল সেদিন জম্পেশ ডিনার হল। মাছ, পাঁঠার মাংস, ডিমের ডেভিল, ফ্রায়েড রাইস, কাস্টারড ইত্যাদি ইত্যাদি। পরেরদিন সকাল সকাল বেরোতে হবে। পরবর্তী গন্তব্য জয়সালমের। লম্বা রাস্তা, প্রায় সাড়ে পাঁচশো কিলোমিটার। ব্রেক দিয়ে যেতে যেতে বারো ঘণ্টা লাগবেই। তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়লেও, রাত বারোটা বাজতেই ফেস্টিভাল (আমাদের হোটেল থেকে পায়ে হাঁটা দূরত্বে ছিল) প্রাঙ্গণ থেকে খুব বাজি ফাটার আওয়াজ আসছিল, ঘুম ভেঙ্গে নতুন বছরের শুভেচ্ছা বিনিময় করে আবার ঘুম দিলাম।
হলদিঘাটির যুদ্ধের ঘটনা প্রায় প্রত্যেকেই আমরা পড়েছি ইতিহাসের পাতায়। কিন্তু মূলত আমাদের ইতিহাস শিক্ষা সীমিত থেকেছে মোঘল সাম্রাজ্যের কাহিনী অবধি। রাজপুতদের কাহিনী খুব কম পড়েছি। এই ভিডিয়োটির মাধ্যমে রাজপুতদের বীর বিক্রমের কথা দেখতে পাই, জানতে পারি তাদের শৌর্যর কথা। হলদিঘাটির যুদ্ধের একটা ব্যাপার যেটা লক্ষ্য করলাম তা হল, রাণা প্রতাপের সেনাপতি ছিলেন এক মুসলমান ব্যক্তি। আর আকবরের সেনাপতি ছিলেন মান সিংহ। অর্থাৎ এটিকে কিন্তু সেই অর্থে হিন্দু মুসলমানের communal warfareও বলা চলে না। যেদিন প্রবল যুদ্ধ চলছিল, প্রায় রাণা প্রতাপের হার নিশ্চিত, এমন সময়ে তার এক সৈন্য, যাকে অবিকল প্রতাপের মতোই দেখতে, সে প্রতাপের বেশ ধারণ করে লড়াই করেন ও প্রাণ বলিদান দেন। সেই সুযোগে প্রতাপ চেতকের সাহায্যে যুদ্ধক্ষেত্র ছেড়ে পালাতে সক্ষম হন। এই সময়ে চেতকের বীর বিক্রমের কাহিনী তো আমরা সকলেই জানি। রাজস্থান বিভিন্ন স্থানেও এর চিত্র বা মূর্তি দেখেছি। ভিডিয়োটির পর লাইট এন্ড সাউন্ডের ব্যবস্থা ছিল। পুতুল ও আরো বিভিন্ন প্রপ্সের সাহায্যে, লাইট ফেলে সাথে সুন্দর ব্যাকগ্রাউন্ড ম্যুজিক দিয়ে মহারাণা প্রতাপ ও হলদিঘাটির লড়াইয়ের পুরো ইতিহাস বলে যাচ্ছিল। পান্নাদাইয়ের ইন্সটলেশনের সামনে এসে খানিক স্তব্ধ হলাম। যদিও পান্নার চরম বলিদানের কথা বইতে পড়া, তবুও চোখের সামনে ওই নিজের সন্তানকে নিশ্চিত মৃত্যুর সামনে রেখে রাণাকে সুরক্ষিত স্থানে সরানোর দৃশ্য দেখে যেন ব্যাপারটা ধাক্কা মারল। একজন মা যে কীভাবে এমন বলিদান দিতে পারেন, দেশমাতৃকার জন্য, সত্যিই ভাবনার বাইরে। মিউজিয়ামের বাইরে গুলকন্দ বিক্রি হচ্ছিল। আমরা কিনিনি। বরং আশেপাশে একটু ঘুরলাম। কিছু উট, গরু ইত্যাদির বড় মূর্তি আছে। ছবি তোলার জন্য ভালো। গরুর টানে আখের রস তৈরি হচ্ছিল, সেটাও দেখলাম। দশ টাকা করে গ্লাস প্রতি বিক্রিও হচ্ছিল। স্যুভেনির শপ আছে। বাইরে থেকেই দেখতে ভালো। ঢুকলে মোটামুটি গলা কাটা দাম যে হবেই, আন্দাজ করে নিয়েছিলাম। মূল কম্পাউন্ডের বাইরে কিছু উট সাজানো ছিল, কেউ যদি সাফারই করতে চান, সেই উদ্দেশ্যে। আমরা রাস্তায় চায়ের দোকান থেকে গরম গরম চা খেলাম, ঠাণ্ডায় আরাম হল। ব্রেকফাস্টে সেদিন ওই বান রুটি ইত্যাদি আর ভালো লাগছিল না বলে খাইনি। রাস্তার দোকান থেকেই পোহা খেলাম। মেসে এমনিতে পোহা দেখলে নাক কুঁচকোই, কিন্তু এদিন দিব্যি ভালো লাগল। আশেপাশে হলদিঘাটির হলুদ মাটিও দেখলাম।
এরপর রওনা দিলাম আরাবল্লী পাহাড় ভেদ করে মাউন্ট আবুর দিকে। ঠাণ্ডা ভালোই লাগছিল। পৌঁছোতে দুপুর হয়ে গিয়েছিল। হোটেলটি ছিল একটু রাস্তার ভিতরে। দেখলাম পাশাপাশি অনেকগুলো হোটেল ওরকম। বাড়িগুলোর সব কমন দেওয়াল। ওই সরু রাস্তায় আমাদের বড় বাস আসতে পারবেনা। তাই আমাদের এবং আমাদের লাগেজের জন্য জিপগাড়ির ব্যবস্থা হল। জীপ চড়লেই বেশ একটা পাহাড় পাহাড় অনুভূতি হয়, ভালো লাগে। মিনিট পাঁচেকে পৌঁছলাম হোটেল। ছিমছাম। সুন্দর। দুপুরের খাওয়া সেরে আমরা গেলাম নাক্কি লেক দেখতে। হোটেল থেকে পায়ে হাঁটা পথ। এ যাবত অনেক লেক দেখেছি পাহাড়ি শহরে। এই লেকটিও তার মধ্যে কোন আলাদা কিছু নজরে এলনা। সাধারণ সাজানো গোছানো লেক। সন্ধ্যে হয়ে গিয়েছিল। আলো দিয়ে ধারটা ঝলমল করছে। বোটিং চলছে। যেটা টেনেছিল সেটা অবশ্য করেই সারি সারি দোকান। লেকে যাওয়ার রাস্তা জুড়ে শুধুই দোকান আর দোকান। হ্যান্ডিক্রাফট, ব্যাগ, জামা, জুতো সব। আর খালি খাবারের দোকান। আইসক্রিম, ডাল বাটি চুরমা, মোমো, পুরী সব্জি কী নেই? মনের সুখে কেনাকাটা হল। ভুট্টা সিদ্ধ খাওয়া হল। ওই সময়ে তিনদিন ব্যাপী "winter festival" চলছিল মাউন্ট আবুতে। নাচ গান, খেলা, ফটোগ্রাফি নানান বিষয়ে বিভিন্ন এক্টিভিটিজ ছিল। আমরা সন্ধ্যের বাকি সময়টা কাটালাম সামিয়ানার নীচে বসে রাজস্থানি লোক নৃত্য দেখতে দেখতে। ভারী রঙিন সে দৃশ্য। গানগুলিও বড্ড "catchy"।
পরের দিন গরম গরম আলুর পরোটা ছোলার তরকারি আর মিষ্টি খেয়ে ব্রেকফাস্ট খেয়ে আমরা আবার জিপগাড়িতে চেপেই বেরলাম লোকাল সাইটসিইং করতে। মাউন্ট আবুতে দর্শনীয় স্থান বলতে বিশ্ব বিখ্যাত দিলও্যারা মন্দির। জৈনদের মন্দির। অসামান্য স্থাপত্য কারুকার্য। কিন্তু সেটি এগারোটা না বারোটার আগে খোলেনা। তাই সময় কাটাতে আমাদের প্রথমে নিয়ে যাওয়া হল ব্রহ্মকুমারীদের হেড সেন্টারে। বিভিন্ন টিভি চ্যানেল ও ইয়ুট্যুবের কল্যাণে ব্রহ্মকুমারীদের সাথে আমাদের পরিচয় আছেই, তাদের হেড অফিস (অফিস বলা চলে কি?) দেখলাম। ধব ধবে সাদা বাড়ি। সামনে ভীষণ সুন্দর করে বাগান করা। বাড়িটির ভিতরে রয়েছে প্রেয়ার হল। ঝকঝকে তকতকে। ওখান থেকে তারপরে গেলাম একটি শিব মন্দিরে। কোন বৈশিষ্ট্য নেই। কিন্তু ভারতীয়দের একটু মন্দির দেখালে তারা খুশী হয়ে যায়, আর সেই জন্যই বুঝি এই মন্দিরগুলিও "স্পট" হয়ে গিয়েছে। এটি ছিল হাঁটা পথে। এরপরে আবার জিপে চড়ে যাওয়া হল আরো এক মন্দিরে। নাম আর মনে নেই। তবে বিষ্ণু আর মহাদেব দুজনেই উপাসিত, সেইটুকু মনে আছে। মন্দিরটি বড়। পাথরের কাজ করা।
পরের গন্তব্য গুরু শিখর। মাউন্ট আবুর সবচেয়ে উঁচু স্থান। অনেকটা সিঁড়ি ভেঙ্গে আবারও সেখানে মন্দির। এবং স্বাভাবিকভাবেই সেই মন্দিরে যাইনি। এমনিই হেঁটেচলে আশেপাশেটা দেখলাম। কাঁচা গাজর, মুলো, ভুট্টা বিক্রি হচ্ছিল। রোদ পড়ে বেশ একটা শীতের আমেজ পাচ্ছিলাম। ভিউ পয়েন্টে দাঁড়িয়ে নিজেরা ছবি তুললাম। অবশেষে বারোটা বাজতে গেলাম বহু প্রতীক্ষিত দিলোয়ারা মন্দিরে। মন্দিরে ঢুকতে গেলে সাংঘাতিক কড়া সিকিউরিটি। ফোন বা ক্যামেরা এলাউড না। তাই দুর্ভাগ্যবশত অমন অপূর্ব শিল্পকলার একটি ছবিও নেই। জুতো খুলে ব্যাগ ম্যানেজার কাকুর জিম্মায় রেখে লম্বা লাইন দিয়ে (ছেলেদের ও মেয়েদের লাইন আলাদা) ঢুকলাম। দেখলাম ড্রেস কোড রয়েছে। হাফ প্যান্ট লুঙ্গি ইত্যাদি চলবেনা। মন্দির কমপ্লেক্সের ভিতর তিন চারটে মন্দির দেখার মতো। বাইরে থেকে দেখে বোঝাই যায়না যে ভিতরটা অমন সুন্দর। আসলে এটি নাকি ইচ্ছাকৃত। যাতে কি না শত্রুরা নষ্ট না করে। মন্দিরের মধ্যে মার্বেলের ওপর exquisite স্থাপত্য। জৈন তীর্থঙ্করদের মূর্তি, মন্দির, বিভিন্ন নারী পুরুষের আকৃতি। দেখার মত। অনেকের মতে তাজ মহলের চেয়েও নাকি অপূর্ব। আমার যদিও তেমন মনে হয়নি, কিন্তু দেখতে ভীষণ ভালো লেগেছে, এইটুকু বলতে পারি। মন্দির ঘুরতে প্রায় ঘন্টাখানেক লাগল। মন্দির তৈরির ইতিহাস জানলাম। জানলাম একটি মন্দির কারিগরেরা নিজেদের ফ্রি টাইমে বিশ্রাম না নিয়ে ঝটতি পটতি মার্বেলের অংশ বিশেষ দিয়ে তৈরি করেন। তার ডিজাইন অবশ্যই তত সূক্ষ্ম না হলেও তাদের এফোরটটাকে সাধুবাদ জানাই।
হোটেলে ফিরে এসে খাওয়াদাওয়া সেরে অল্প ঘুম দেওয়া হল। বিকেলে পায়ে হেঁটে সানসেট পয়েন্ট যাওয়ার কথা। এমন ঠাণ্ডা জাঁকিয়ে পড়েছিল, আর লেপের তলা থেকে বেরোতে পারিনি! মনে হল, সানসেট তো অনেক দেখেছি। একটু আরাম করি। বছরের শেষ সূর্যাস্ত দেখে মন খারাপ না করে লেপের ওম নিই। ন্যু ইয়ার ইভ স্পেশাল সেদিন জম্পেশ ডিনার হল। মাছ, পাঁঠার মাংস, ডিমের ডেভিল, ফ্রায়েড রাইস, কাস্টারড ইত্যাদি ইত্যাদি। পরেরদিন সকাল সকাল বেরোতে হবে। পরবর্তী গন্তব্য জয়সালমের। লম্বা রাস্তা, প্রায় সাড়ে পাঁচশো কিলোমিটার। ব্রেক দিয়ে যেতে যেতে বারো ঘণ্টা লাগবেই। তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়লেও, রাত বারোটা বাজতেই ফেস্টিভাল (আমাদের হোটেল থেকে পায়ে হাঁটা দূরত্বে ছিল) প্রাঙ্গণ থেকে খুব বাজি ফাটার আওয়াজ আসছিল, ঘুম ভেঙ্গে নতুন বছরের শুভেচ্ছা বিনিময় করে আবার ঘুম দিলাম।
Tuesday, January 23, 2018
আমার চোখে রাজস্থান পর্ব ৭ (উদয়পুর)
উদয়পুর পৌঁছোতে পৌঁছোতে আমাদের প্রায় সন্ধ্যে পেরিয়ে গেল। রাজস্থান ট্রিপ যখনই কোন ট্রাভেল এজেন্সির সাথে হয়,যেহেতু একেকটা জায়গা একে ওপরের থেকে এতটাই দূরে, তাই কোন স্পটে দুই রাত্তির রাখা মানে আসলে তার মধ্যে একটা দিন ধরে সেখানে পৌঁছনোর জন্য। আরেকটা দিন হয় সেইখানের সাইটসিয়িং করার জন্য। এই কদিনে এই ব্যাপারটা উপলব্ধি করেই নিয়েছিলাম। আর তাই যত দেরিতেই কোন জায়গায় পৌঁছই না কেন, আর প্যানিক করতাম না। উদয়পুরে আমাদের যে হোটেলে রেখেছিল, সেটা একটা চৌরাস্তার মুখে, আমাদের অত বড় বাস ওখানে পার্ক করা যাবেনা। তাই মালপত্র ট্রাভেলের ছেলেদের জিম্মায় রেখে আমরা মিনিট পাঁচ সাত হেঁটে হোটেলে পৌঁছলাম। মোতি মহল। একদম মুক্তোর মতোই ধবধবে সাদা। এই প্রসঙ্গে বলি, উদয়পুরের বিভিন্ন নামের মধ্যে, "white city" প্রসিদ্ধ (ঠিক যেমন জয়পুর পিঙ্ক সিটি আর জয়সালমের golden city, ইত্যাদি)। হোটেলটি বেশ সুন্দর সাজানো, ঘর দোর স্ট্যান্ডার্ড। সেদিন রাত্রে আমাদের আর কিছু করার ছিল না। মাংস ভাত খেয়ে টিভি দেখে ঘুম। পরের দিন সকাল সকাল সাইট সিয়িং করতে বেরোনোর কথা।
ব্রেকফাস্ট সেরে আমরা বেরলাম শহর ঘুরতে। বাসে যেতে যেতে প্রথমেই আমাদের বেদান্তর হেড কোয়ার্টার দেখাল। আরো জানলাম, জিঙ্কের জন্য প্রসিদ্ধ উদয়পুর। এরপর আমরা পৌঁছলাম ফতেহ সাগর লেকে। City of lakes বলে বিখ্যাত উদয়পুরকে অনেকেই Venice of the east আখ্যাও দেন। মূলত পাঁচটি বড় লেকের মধ্যে অন্যতম ফতেহ সাগর। বিশাল জায়গা জুড়ে এই লেক। এখানে এমনি মোটর বোট ছাড়াও স্পীড বোটিং ও করা যায়। আমরা মোটর বোটে উঠে গোটা লেকের এক চক্কর কাটলাম। পাহাড় ঘেরা এই লেকটির আঁকার দূর থেকে দেখলে অনেকটা ভারতে ম্যাপের মত লাগে। এই লেকের মধ্যে কয়েকটি দ্বীপ আছে। সেই দ্বীপগুলিতে রয়েছে নেহরু পার্ক, সোলার অবজারভেটরি। প্রতিটিই আলাদা করে টুরিস্ট ডেসটিনেশন। আমরা একটাতেও নামিনি, কিন্তু লেক ঘুরে দেখার সময় দেখলাম আর ছবি তুললাম। মিনিট কুড়ি ধরে চলল জলবিহার।
এরপরে আমরা গেলাম লেকের প্রায় উল্টোদিকেই অবস্থিত রাণা প্রতাপ স্মারকে। পায়ে হেঁটে সিঁড়ি বেয়ে যাওয়া যায়। কিন্তু সময়সাপেক্ষ। আমাদের হাতে তেমন সময় ছিল না। তাই আমরা আমাদের বাসেই গেলাম। মোতি পাহাড়ের ওপর অবস্থিত এই স্মারকটি। মহারাণা প্রতাপ ও তার সাধের চেতকের একটি lifesize ব্রোঞ্জের মূর্তি রয়েছে। মূর্তির ফলকে হলদিঘাটির যুদ্ধ আর চেতকের শেষ নিঃশ্বাসের দৃশ্য দুইদিকে খোদাই করা। এই স্মারকস্থলটি থেকে উদয়পুর শহরের কিছুটা দেখা যায়। আশেপাশে সুন্দর ফুলের বাগান। পাশে ফতেহ সাগর লেক। রোদ ঝলমলে। শীতের সকাল। সব মিলিয়ে জমজমাট। সামনেই একটি ছোট্ট স্যুভেনির শপও রয়েছে। আমি চেতক চাবির রিং কিনলাম সেখান থেকে।
পরবর্তী গন্তব্য ভারতীয় লোককলা কেন্দ্র। এটি রাজস্থানি আর্ট এন্ড ক্রাফট সম্বন্ধে জানার জন্য একেবারে যোগ্য স্থান। বিভিন্ন রাজস্থানি শিল্পকলা, তাদের ইতিহাসের রঙিন সমাবেশ এই কেন্দ্রে। সত্যি কথা বলতে, তখন মনে দিয়ে পড়ে এলেও এখন হয়তো জিজ্ঞেস করলে কিছুই বলতে পারব না। কিন্তু ওই সময়ে যে এক অদ্ভুত ভালো লাগা কাজ করেছিলও মনে, সেটা অনস্বীকার্য। আগেও বলেছি, রঙ আমার খুব প্রিয়। আর তাই এই জায়গাটা আমার বেশিরকমের পছন্দ হয়েছিল। ছবিতে কয়েকটা উদাহরণ দেখালেও সামনা সামনি দেখার আলাদা "চার্ম"। ওই একই জায়গায় এরপর আমরা দেখতে পেলাম ট্র্যাডিশনাল রাজস্থানি পুতুল নাচ। রাজসভায় রাজা ও মন্ত্রীদের সামনে বসে রাজ নর্তক ও নর্তকীর নাচ, ফোক ম্যুজিকের তালে তালে। কতটা দক্ষতা লাগে এই ধরণের উপস্থাপনা করতে, না দেখলে বোঝা কঠিন। ভীষণভাবে উপভোগ্য।
লোক কলা কেন্দ্রের পর আম্রা গেলাম "সহেলীয়ও কি বাড়ি"। রাজপরিবারের মেয়েদের তাদের সহেলীদের সাথে খেলে বেরানোর জায়গা এটি। কিছুই না তেমন, শুধু একটু ফোয়ারা দিয়ে ঘেরা সাজানো গোছানো সুন্দর ফুলে ভর্তি বাগান। ছবি তোলার জন্য মনের মত জায়গা। মিনিট কুড়ির মধ্যে ঘুরে নেওয়াই যায়। বাইরে রাজস্থানি পোশাক পরে ছবি তোলানোরও ব্যবস্থা আছে।
সকালের মত ঘুরে এবার হোটেল ফিরে লাঞ্চ সারা হল। দ্বিতীয়ার্ধে ঘোরার কথা ছিল সিটি প্যালেস। ততক্ষণে কেন জানিনা ওই প্যালেস আর ম্যুজিয়াম দেখতে দেখতে একটু হলেও একঘেয়ে লাগছিল। তার ওপর জনপ্রতি সারে তিনশো টাকা শুনে একটু হলেও বিরত হলাম। আমরা চারজনে সেই জায়গায় অটো ভাড়া করে চলে গেলাম লেক পিচোলা। উদয়পুর বলতেই লোকের মনে যেই নাম আসে, সেটি এই লেক পিচোলা। ভিড় জমজমাট লেকের ধার। পাশেই উদয়পুরের সিটি প্যালেস। লেকের মধ্যে দ্বীপগুলিতে রয়েছে লেক প্যালেস (বর্তমানে বিলাসবহুল হোটেল। সিনেমার শুটিং, প্রচুর টাকাওয়ালা লোকেদের বিয়েবাড়ি এইসব পারপাসেই ব্যবহার হয়) , জগমন্দির ( এর রূপ দেখেই নাকি সম্রাট শাহ জাহান তাজ মহল বানানোর অনুপ্রেরণা পান)। আমরা যেটা করলাম, লেকের কাছেই একটু উঁচুতে অবস্থিত রোপওয়ে রয়েছে, সেটার টিকিট কাটলাম। জনপ্রতি একশোর একটু বেশী খরচ। অপেক্ষা করতে হল খানিকক্ষণ। তারপর মিনিট পাঁচেকে পৌঁছে দিল উল্টোদিকের পাহাড়ে। একসাথে তিনটে গাড়ি চলে, লাল হলুদ ও সবুজ রঙের। ভারি সুন্দর লাগে দূর থেকে দেখতে। ভিতরটা কাছের বড় জানলা দিয়ে তৈরি। পাহাড় পেরোনোর সময় ধারে সিটি প্যালেস, লেক পিচোলা, যোগ মন্দির সব চোখে পড়ে। উলটোদিকে নেমে জানা গেল কর্নি মাতার মন্দির আছে। মা আর কাকা মন্দির থেকে ঘুরে এলো। আমি আর বাবা ওখানে এমনি ঘোরাঘুরি করলাম। ওপর থেকে উদয়পুর শহরটাকে খুব সুন্দর লাগছিল। একটু ঘিঞ্জি, কিন্তু ধবধবে সাদা বাড়ির দেওয়াল। লেকের ওপর সূর্যাস্তের নয়নাভিরাম দৃশ্যও চোখে পড়ল। ছবি তোলার জন্য আইডিয়াল সানসেট স্পট।
এবার ফেরার পালা। মনে আছে তো সেই যে পেন্ডিং শপিঙের কথা বার বার বলছিলাম? অটো ধরে আমরা এলাম বাপু বাজার। অনেক অনেক দোকান। একদম আমাদের বড় বাজার চত্বরের মতোই। কিছু খুচখাচ জামাকাপড় কেনা হল বটে। কিন্তু সেই রাজস্থানি ঝুমকোর আর দেখা পাই না। হাঁটতে হাঁটতে এদিক ওদিক করে চষে ফেললাম গোটা অঞ্চল, কিন্তু কোথায় কি? শেষে বাসন গ্যাস এসবের দোকানের পাড়ায় পৌঁছে এক ভদ্রলোককে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি দেখিয়ে দিলেন একটি রাস্তা। ততক্ষণে সন্ধ্যে নেমে গিয়েছে। রাস্তা প্রায় শুনশান। ওইসব দিকে সন্ধ্যে সারে সাতটার মধ্যেই সব দোকান বন্ধ হয়ে যায়। দেখানো রাস্তা দিয়ে গিয়েও কিছুই খুঁজে পাই না। ফিরে আসব আসব করছি, এমন সময় রাস্তার একজনকে জিজ্ঞেস করায় উনি একটি বাড়ি থেকে কাউকে ডেকে দিলেন। মা আর আমি একটু বাঁধো বাঁধো হয়ে ভিতরে ঢুকে গেলাম বটে। বাবা আর কাকা বাইরে দাঁড়িয়ে রইল পাহারা দিয়ে।
জানলাম এটি যার বাড়ি, তিনি গয়নার হোলসেলার। রীতিমতো আদর আপ্যায়ন করে "বেটি তুঝে যো পসন্দ আয়ে, নিকালকে লে লে" বলে ছাড়পত্র দিলেন। ঘরের টাক ভর্তি গয়নার বাক্স। নামিয়ে নামিয়ে ডিজাইন পছন্দ করে অনেক অনেক কিনলাম। প্রায় আশ মিটিয়ে যাকে বলে। কী সস্তা সব। এখন মনে হয় আরো কিনলে হতো। অনেক গল্প হল ওনার সাথে। পরের বার উদয়পুর এলে ওনার বাড়ি ডাল বাটি চুরমা খাওয়ার নিমন্ত্রণ করলেন ওনার ছেলের বৌ। সাথে করে ওনার কার্ড নিয়ে এসেছি। কারুর যদি উদয়পুর যাওয়ার প্ল্যান থাকে, বলবেন। ঠিকানা দিয়ে দেবো।
আবার আরেকটা জায়গা ঘোরা হয়ে গেল। কতটা ঘুরলাম কি, জানিনা। তবে এইটুকু বলতে পারি, জেনে গেলাম আরো কত কিছু দেখার আছে। হাতে সময় নিয়ে এসে আরো কত কিছু দেখতে হবে, অনুভব করতে হবে। বেরানো শেষের দিকে। মাউন্ট আবু, জয়সালমের আর যোধপুর বাকি। আগামীকাল সকাল সকাল হলদিঘাটি হয়ে যাওয়ার কথা মাউন্ট আবু। সেখান থেকে শুরু হবে মাড়ওয়ার। রুক্ষ্ম প্রকৃতি। বালিয়াড়ি।
ব্রেকফাস্ট সেরে আমরা বেরলাম শহর ঘুরতে। বাসে যেতে যেতে প্রথমেই আমাদের বেদান্তর হেড কোয়ার্টার দেখাল। আরো জানলাম, জিঙ্কের জন্য প্রসিদ্ধ উদয়পুর। এরপর আমরা পৌঁছলাম ফতেহ সাগর লেকে। City of lakes বলে বিখ্যাত উদয়পুরকে অনেকেই Venice of the east আখ্যাও দেন। মূলত পাঁচটি বড় লেকের মধ্যে অন্যতম ফতেহ সাগর। বিশাল জায়গা জুড়ে এই লেক। এখানে এমনি মোটর বোট ছাড়াও স্পীড বোটিং ও করা যায়। আমরা মোটর বোটে উঠে গোটা লেকের এক চক্কর কাটলাম। পাহাড় ঘেরা এই লেকটির আঁকার দূর থেকে দেখলে অনেকটা ভারতে ম্যাপের মত লাগে। এই লেকের মধ্যে কয়েকটি দ্বীপ আছে। সেই দ্বীপগুলিতে রয়েছে নেহরু পার্ক, সোলার অবজারভেটরি। প্রতিটিই আলাদা করে টুরিস্ট ডেসটিনেশন। আমরা একটাতেও নামিনি, কিন্তু লেক ঘুরে দেখার সময় দেখলাম আর ছবি তুললাম। মিনিট কুড়ি ধরে চলল জলবিহার।
এরপরে আমরা গেলাম লেকের প্রায় উল্টোদিকেই অবস্থিত রাণা প্রতাপ স্মারকে। পায়ে হেঁটে সিঁড়ি বেয়ে যাওয়া যায়। কিন্তু সময়সাপেক্ষ। আমাদের হাতে তেমন সময় ছিল না। তাই আমরা আমাদের বাসেই গেলাম। মোতি পাহাড়ের ওপর অবস্থিত এই স্মারকটি। মহারাণা প্রতাপ ও তার সাধের চেতকের একটি lifesize ব্রোঞ্জের মূর্তি রয়েছে। মূর্তির ফলকে হলদিঘাটির যুদ্ধ আর চেতকের শেষ নিঃশ্বাসের দৃশ্য দুইদিকে খোদাই করা। এই স্মারকস্থলটি থেকে উদয়পুর শহরের কিছুটা দেখা যায়। আশেপাশে সুন্দর ফুলের বাগান। পাশে ফতেহ সাগর লেক। রোদ ঝলমলে। শীতের সকাল। সব মিলিয়ে জমজমাট। সামনেই একটি ছোট্ট স্যুভেনির শপও রয়েছে। আমি চেতক চাবির রিং কিনলাম সেখান থেকে।
পরবর্তী গন্তব্য ভারতীয় লোককলা কেন্দ্র। এটি রাজস্থানি আর্ট এন্ড ক্রাফট সম্বন্ধে জানার জন্য একেবারে যোগ্য স্থান। বিভিন্ন রাজস্থানি শিল্পকলা, তাদের ইতিহাসের রঙিন সমাবেশ এই কেন্দ্রে। সত্যি কথা বলতে, তখন মনে দিয়ে পড়ে এলেও এখন হয়তো জিজ্ঞেস করলে কিছুই বলতে পারব না। কিন্তু ওই সময়ে যে এক অদ্ভুত ভালো লাগা কাজ করেছিলও মনে, সেটা অনস্বীকার্য। আগেও বলেছি, রঙ আমার খুব প্রিয়। আর তাই এই জায়গাটা আমার বেশিরকমের পছন্দ হয়েছিল। ছবিতে কয়েকটা উদাহরণ দেখালেও সামনা সামনি দেখার আলাদা "চার্ম"। ওই একই জায়গায় এরপর আমরা দেখতে পেলাম ট্র্যাডিশনাল রাজস্থানি পুতুল নাচ। রাজসভায় রাজা ও মন্ত্রীদের সামনে বসে রাজ নর্তক ও নর্তকীর নাচ, ফোক ম্যুজিকের তালে তালে। কতটা দক্ষতা লাগে এই ধরণের উপস্থাপনা করতে, না দেখলে বোঝা কঠিন। ভীষণভাবে উপভোগ্য।
লোক কলা কেন্দ্রের পর আম্রা গেলাম "সহেলীয়ও কি বাড়ি"। রাজপরিবারের মেয়েদের তাদের সহেলীদের সাথে খেলে বেরানোর জায়গা এটি। কিছুই না তেমন, শুধু একটু ফোয়ারা দিয়ে ঘেরা সাজানো গোছানো সুন্দর ফুলে ভর্তি বাগান। ছবি তোলার জন্য মনের মত জায়গা। মিনিট কুড়ির মধ্যে ঘুরে নেওয়াই যায়। বাইরে রাজস্থানি পোশাক পরে ছবি তোলানোরও ব্যবস্থা আছে।
সকালের মত ঘুরে এবার হোটেল ফিরে লাঞ্চ সারা হল। দ্বিতীয়ার্ধে ঘোরার কথা ছিল সিটি প্যালেস। ততক্ষণে কেন জানিনা ওই প্যালেস আর ম্যুজিয়াম দেখতে দেখতে একটু হলেও একঘেয়ে লাগছিল। তার ওপর জনপ্রতি সারে তিনশো টাকা শুনে একটু হলেও বিরত হলাম। আমরা চারজনে সেই জায়গায় অটো ভাড়া করে চলে গেলাম লেক পিচোলা। উদয়পুর বলতেই লোকের মনে যেই নাম আসে, সেটি এই লেক পিচোলা। ভিড় জমজমাট লেকের ধার। পাশেই উদয়পুরের সিটি প্যালেস। লেকের মধ্যে দ্বীপগুলিতে রয়েছে লেক প্যালেস (বর্তমানে বিলাসবহুল হোটেল। সিনেমার শুটিং, প্রচুর টাকাওয়ালা লোকেদের বিয়েবাড়ি এইসব পারপাসেই ব্যবহার হয়) , জগমন্দির ( এর রূপ দেখেই নাকি সম্রাট শাহ জাহান তাজ মহল বানানোর অনুপ্রেরণা পান)। আমরা যেটা করলাম, লেকের কাছেই একটু উঁচুতে অবস্থিত রোপওয়ে রয়েছে, সেটার টিকিট কাটলাম। জনপ্রতি একশোর একটু বেশী খরচ। অপেক্ষা করতে হল খানিকক্ষণ। তারপর মিনিট পাঁচেকে পৌঁছে দিল উল্টোদিকের পাহাড়ে। একসাথে তিনটে গাড়ি চলে, লাল হলুদ ও সবুজ রঙের। ভারি সুন্দর লাগে দূর থেকে দেখতে। ভিতরটা কাছের বড় জানলা দিয়ে তৈরি। পাহাড় পেরোনোর সময় ধারে সিটি প্যালেস, লেক পিচোলা, যোগ মন্দির সব চোখে পড়ে। উলটোদিকে নেমে জানা গেল কর্নি মাতার মন্দির আছে। মা আর কাকা মন্দির থেকে ঘুরে এলো। আমি আর বাবা ওখানে এমনি ঘোরাঘুরি করলাম। ওপর থেকে উদয়পুর শহরটাকে খুব সুন্দর লাগছিল। একটু ঘিঞ্জি, কিন্তু ধবধবে সাদা বাড়ির দেওয়াল। লেকের ওপর সূর্যাস্তের নয়নাভিরাম দৃশ্যও চোখে পড়ল। ছবি তোলার জন্য আইডিয়াল সানসেট স্পট।
এবার ফেরার পালা। মনে আছে তো সেই যে পেন্ডিং শপিঙের কথা বার বার বলছিলাম? অটো ধরে আমরা এলাম বাপু বাজার। অনেক অনেক দোকান। একদম আমাদের বড় বাজার চত্বরের মতোই। কিছু খুচখাচ জামাকাপড় কেনা হল বটে। কিন্তু সেই রাজস্থানি ঝুমকোর আর দেখা পাই না। হাঁটতে হাঁটতে এদিক ওদিক করে চষে ফেললাম গোটা অঞ্চল, কিন্তু কোথায় কি? শেষে বাসন গ্যাস এসবের দোকানের পাড়ায় পৌঁছে এক ভদ্রলোককে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি দেখিয়ে দিলেন একটি রাস্তা। ততক্ষণে সন্ধ্যে নেমে গিয়েছে। রাস্তা প্রায় শুনশান। ওইসব দিকে সন্ধ্যে সারে সাতটার মধ্যেই সব দোকান বন্ধ হয়ে যায়। দেখানো রাস্তা দিয়ে গিয়েও কিছুই খুঁজে পাই না। ফিরে আসব আসব করছি, এমন সময় রাস্তার একজনকে জিজ্ঞেস করায় উনি একটি বাড়ি থেকে কাউকে ডেকে দিলেন। মা আর আমি একটু বাঁধো বাঁধো হয়ে ভিতরে ঢুকে গেলাম বটে। বাবা আর কাকা বাইরে দাঁড়িয়ে রইল পাহারা দিয়ে।
জানলাম এটি যার বাড়ি, তিনি গয়নার হোলসেলার। রীতিমতো আদর আপ্যায়ন করে "বেটি তুঝে যো পসন্দ আয়ে, নিকালকে লে লে" বলে ছাড়পত্র দিলেন। ঘরের টাক ভর্তি গয়নার বাক্স। নামিয়ে নামিয়ে ডিজাইন পছন্দ করে অনেক অনেক কিনলাম। প্রায় আশ মিটিয়ে যাকে বলে। কী সস্তা সব। এখন মনে হয় আরো কিনলে হতো। অনেক গল্প হল ওনার সাথে। পরের বার উদয়পুর এলে ওনার বাড়ি ডাল বাটি চুরমা খাওয়ার নিমন্ত্রণ করলেন ওনার ছেলের বৌ। সাথে করে ওনার কার্ড নিয়ে এসেছি। কারুর যদি উদয়পুর যাওয়ার প্ল্যান থাকে, বলবেন। ঠিকানা দিয়ে দেবো।
আবার আরেকটা জায়গা ঘোরা হয়ে গেল। কতটা ঘুরলাম কি, জানিনা। তবে এইটুকু বলতে পারি, জেনে গেলাম আরো কত কিছু দেখার আছে। হাতে সময় নিয়ে এসে আরো কত কিছু দেখতে হবে, অনুভব করতে হবে। বেরানো শেষের দিকে। মাউন্ট আবু, জয়সালমের আর যোধপুর বাকি। আগামীকাল সকাল সকাল হলদিঘাটি হয়ে যাওয়ার কথা মাউন্ট আবু। সেখান থেকে শুরু হবে মাড়ওয়ার। রুক্ষ্ম প্রকৃতি। বালিয়াড়ি।
Sunday, January 21, 2018
সরস্বতী পুজো
বছর আঠাশের শুভ্রা। বিয়ে হয়ে মান্ডি এসছে সবে ছয় মাস হল। কলকাতায় থাকতে এপারট্মেন্টের সবার একেবারে মধ্যমণি ছিল। সমস্ত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের দায়িত্বে থাকত ও। সুষ্ঠু ভাবে তা সম্পন্ন হতো বলে সকলের আদরের ছিল শুভ্রা। সরস্বতী পুজো থেকে শুরু করে দোল, নববর্ষের অনুষ্ঠান থেকে শুরু করে রবি-নজ্রুল সন্ধ্যা, রথযাত্রা থেকে বিজয়া সম্মিলনী, ক্রিসমাস থেকে ন্যু ইয়ার। কোনটাই বাদ পড়ত না। ওর বর অরুণাভ আই আই টি মান্ডিতে কম্প্যুটার সায়েন্স বিভাগে সদ্য জয়েন করেছে এসিস্টেন্ট প্রোফেসর হিসেবে। সেই সুবাদে শুভ্রাও কলকাতার চাকরি ছেড়ে তল্পিতল্পা গুটিয়ে পিছু পিছু এসেছে মান্ডি।
পাহাড়ের কোলে, নদীর ধারে ওদের ক্যাম্পাসটি ভীষণ সুন্দর, পিকচার পোস্টকার্ডের মতোই নয়নাভিরাম। প্রথম কয়েক মাস কোয়ার্টার গুছিয়ে, ঘুরে বেরিয়ে আনন্দ করে কাটালেও আজকাল শুভ্রার জীবনে অখন্ড অবসর। সব সময় কাজের মধ্যে থাকতে যে মেয়ে ভালোবাসে, তাকে এখন সারাদিন খালি বাড়িতে বসে সময় কাটাতে হয়। কত আর বই পড়ে গান শুনে সময় কাটবে। রান্নাবান্না করতে মোটেই ভালোবাসেনা। আশেপাশের কোয়ার্টারেও তেমন কারুর সাথে খুব একটা হৃদ্যতা জমাতে পারেনি এখনো অবধি। মোট কথা, নিতান্তই একাকীত্বে কাটছে শুভ্রার দিনগুলি।
এর মধ্যে হই হই করে এসে গেলো সরস্বতী পুজো। পুজোর মাস খানেক আগে থেকে ওদের কলকাতার এপারট্মেন্টের মেসেজ গ্রুপে চলতে লাগল হাজার একটা প্ল্যানিং। ও প্রথম প্রথম খুব উৎসাহ নিয়ে সেই সব আলোচনায় ভিড় করত বটে। কিন্তু তারপর হঠাৎ করেই একদিন কী মনে হতে সব ছেড়েছুড়ে দিল শুভ্রা। সেখানে না থাকতে পারায় বড্ড কষ্ট হচ্ছিল কি না। বউয়ের এই মন খারাপটা অরুণাভর হঠাৎএকদিন চোখে পড়ল। ভাগ্যিস! নইলে অমন স্কলার ছেলে, মোটামুটি আর বাকি সময়ে জগত সংসার সম্বন্ধে এক্কেবারে ভ্রুক্ষেপহীন। "কী হয়েছে, কেন এমন মন খারাপ, মুখ গোমড়া করে আছে কেন", এসব প্রশ্ন করতে লাগল। শুভ্রাও খুব একটা চাপা মেয়ে না। সে গড়্গড় করে বলল তার বর কে।
"ও এই ব্যাপার? দাঁড়াও, কিছু একটা করতে হবে। আমায় দুদিন সময় দাও।" এই বলে অরুণাভ সেদিন ক্লাস নিতে চলে গেলো। সন্ধ্যে নাগাদ ফিরল সঙ্গে ওর কিছু কলিগদের নিয়ে। মান্ডি ক্যাম্পাসে জনা সাতেক বাঙালি ফ্যাকাল্টি পরিবার। সেই সব বাঙালি ফ্যাকাল্টিদের সাথে শুভ্রার অল্প বিস্তর আলাপ ছিল। তাদেরকে নিজের কোয়ার্টারে দেখে একটু অবাক হল বটে। হঠাৎ কী দরকারে, কেন সবাই হাজির ভাবতে ভাবতে অরুণাভই ওর সব প্রশ্নের উত্তর দিয়ে দিল, " এই নাও। এবার সবাই মিলে প্ল্যান করে একটা সরস্বতী পুজো নামাও তো" এই বলে।
" আরে এটা তো দারুণ বলেছো অরুণাভ।" শুভ্রার মন আনন্দে নেচে উঠল। অন্তত কিছুদিনের জন্য হলেও, কোন একটা ব্যাপারে নিজেকে ব্যস্ত রাখতে পারবে, এই আনন্দে প্রায় সব দায়িত্বই ও নিতে রাজী হয়ে গেল।
কিন্তু পুজো যে হবে, কোথায় হবে? ঠাকুর কোথায় পাবে? কে করবে? এইসব নানান প্রশ্নের উত্তর পেতে শুভ্রা পরেরদিনই একটা ছোট মিটিং ডাকল নিজের বাড়িতে। ক্যাম্পাসের সব বাঙ্গালিরা এলো। চা সামোসা সহযোগে চলল আলোচনা। ঠিক হল, অম্লান দা, অর্থাৎ কেমিস্ট্রির অম্লান ব্যানারজীদা পুজো করবেন। কলেজে থাকাকালীন করার অভিজ্ঞতা আছে। এইবারে আর মূর্তি আনানোর বা বানানোর সময় নেই, তাই ছবি প্রিন্ট করে ফ্রেমে বাঁধিয়ে ঘটে পুজো হবে। শুভ্রাদের বাড়িতেই হবে। কী কী জিনিস লাগবে, কোথা থেকে তা জোগাড় করা যাবে, এইসবের ফর্দ করতে হবে। শুভ্রার বেশ মজা লাগছে। এতদিনে মনে হচ্ছে যেন আবার নিজের এপারট্মেন্টের দিনগুলিতে ফিরে গিয়েছে। মায়ের থেকে ওর পুরনো ফাইল ঘেঁটে পুজোর ফর্দর ছবি ওয়াটসআপে নিয়েছে। এক এক করে কোথায় পাওয়া যেতে আপ্রে, তার হদিস চলছে।
ওর খুব ইচ্ছে একটা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হোক সন্ধ্যেবেলা। লোকবল তেমন নেই। তাই চাইলেও নাটক বা গীতিনাট্য করা যাবেনা। কোন চিন্তা নেই। রমেনদার স্ত্রী, মালবিকা বৌদি খুব ভালো নাচ করেন। ঠিক হল, উনিই বাকি আর তিনজনকে ঘষে মেজে নাচ তুলিয়ে দেবেন। সাথে গান গাইবে শুভ্রা। শুভ্রাকে গানে সঙ্গত করবে তবলায় অরুণাভ। পি এইচ ডি করার সময়ে শেষ তবলা বাজিয়েছিল ও, আজ কিছু বছর পর আবার সেই সুযোগ আসছে দেখে ও সমান ভাবে উত্তেজিত। আজকাল শুভ্রার মধ্যে একটা বেশ খুশি খুশি ভাব দেখে অরুণাভ। দেখেও ভালো লাগে। সত্যি তো, চাকুরিরতা মেয়েকে এমন ঘরবন্দী করে রাখলে কাহাতক আর ওর ভালো লাগে? এই ইনিশিয়েটিভটাকে জিইয়ে রাখতে পারলে ভালো হয়।
দেখতে দেখতে বসন্ত পঞ্চমী এসে গেল। ভোর থেকে, আলো ফোটার আগে থেকেই অরুণাভ টের পেল শুভ্রা উঠে পড়েছে। স্নান সেরে ঠাকুর রাখার জায়গাটা ধুয়ে মুছে তৈরি করছে। ছটা বাজতে না বাজতে একে একে কলিং বেল বাজতে লাগল। হৈমন্তী দি, মালবিকা বৌদি, রিনি, মহুয়াদি, সব এসে পড়তে লাগল। এরপর একে একে দল বেঁধে শুরু হল পুজোর তোড়জোড়। কেউ আল্পনা দিচ্ছে, কেউ ফল কাটছে। তো অন্যদিকে আবার কেউ ঠাকুর সাজাচ্ছে। পুরুষেরাও মেতে উঠেছে পুজোর কাজে। প্ররবাসে হলেও উৎসাহ বা চেষ্টার কোনরকম ত্রুটি রাখেনি ওরা। রমেনদা আবার পটাপট লেন্সবন্দী করে চলেছেন এই মুহূর্তগুলি।
এই খানিক্ষনের মধ্যেই ঘর ভরে যাবে ধূপকাঠির সৌরভে, কর্পূরের গন্ধে তৈরি হবে একটা পুজো পুজো আবহাওয়া। আর সাথে থাকবে দৃপ্ত কণ্ঠস্বরে
"জয় জয় দেবী চরাচর সারে
কুচযুগশোভিত মুক্তাহারে।
বীণারঞ্জিত পুস্তক হস্তে
ভগবতী ভারতী দেবী নমহস্তুতে।" যা পৌঁছে দেবে এক লহমায় অনেকগুলো বছর আগের এমনই কোন বসন্ত পঞ্চমীর দিনে। ফিরে আসবে কত মিষ্টি মধুর স্মৃতি।
Friday, January 19, 2018
তুমি হঠাৎ হাওয়ায় ভেসে আসা ধন
তুমি হঠাৎ হাওয়ায় ভেসে আসা ধন
১।
টিফিন ব্রেকের সময় ভয়ে ভয়ে ক্লাসরুমে ঢুকেছে আজ শ্রেয়ান। এত বছর বয়েজ স্কুলে পড়ার পর এই প্রথম কোএডে। তার ওপর আবার কলেজের প্রথম দিন। মেধাবী ছেলে শ্রেয়ান উচ্চ মাধ্যমিকে চমকপ্রদ রেজাল্ট করে বর্ধমান জেলার এক প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে কলকাতার অন্যতম নামী কলেজে ফিজিক্স নিয়ে পড়তে এসেছে। হোস্টেলে থাকতে হবে। আজ সকালেই বাবা কলেজ গেটে পৌঁছে বাড়ি চলে গিয়েছেন। এত বড় কলকাতা শহরে ও সম্পূর্ণ একা। কাউকে চেনেনা। শুনেছে কলেজে, হোস্টেলে ভালো মতই র্যাগিং হয়। বুক ঢিপ ঢিপ করছে ওর।
শতাব্দীপ্রাচীন কলেজের বড় ক্লাসরুমটাতে বাইরের আলো তেমন নেই, দিনেরবেলাও টিউবলাইট জ্বলছে। ঢুকে দেখল ওদের ক্লাসের বাকি ছেলেমেয়েরা দুটো বেঞ্চ জুড়ে জটলা পাকিয়ে বসে আছে। ওর আর জায়গা হবেনা ওখানে বলে পিছনের বেঞ্চিতে গিয়ে বসল শ্রেয়ান। টিচার্স প্ল্যাটফর্মের ওখানে জনা দশেক সিনিয়র দাদা দিদিরা দাঁড়িয়ে আছে, কয়েকজন টেবিলে চেয়ারে বসে।
" এই শোন, কলেজের প্রথম দিন এসছিস, সিনিয়রদের সম্মান জানাতে হয়, জানিস না? এলি আর বসে পড়লি? গুড আফটারনুন উইশ কে করবে?"
শ্রেয়ানের দিকে তাকিয়ে বলল সিনিয়র "দিদি", পরনে সাদার ওপর হলুদ ফুল ছাপ কুর্তি আর নীল জিন্স, গোড়ালি অবধি গিয়ে শেষ হয়েছে। মাথায় এক ঢাল কালো চুল, কয়েকটা আবার বার বার কপালের উপর পড়ছিল বলে মাঝে মাঝেই হাত চলে যাচ্ছিল চুল ঠিক করতে। কানে একজোড়া বড় ঝুমকো দুল। ঠোঁটের ওপর ছোট্ট তিল মুখশ্রীতে আলাদা মাধুর্য এনেছে, শ্রেয়ানের শিল্পী মনে ভাবনা এলো।
" গুড আফটারনুন দিদি।" উঠে দাঁড়িয়ে বলল ও।
" দিদি আবার কী? বলবি মধুরা। নাম কী তোর? "
" শ্রেয়ান। ঠিক আছে দিদি। এই সরি, মধুরা।"
" আতাক্যালানে। যা বোস।"
২।
মাস দুই হয়ে গিয়েছে কলেজের। এখনো শ্রেয়ানের ক্লাসে তেমন বেশী বন্ধু হয়নি। মুখচোরা ছেলে ও। রুমমেটের সাথে ছাড়া আর দু তিনজন ছেলের সাথে যা একটু কথাবার্তা হয় ওর। ক্লাস আর লেখাপড়া নিয়ে ব্যস্ত থাকে। সময় পেলে চলতে থাকে আঁকাঝোঁকা। আজ লাঞ্চের পরে ক্লাসটা ক্যান্সেল হয়ে যাওয়ায় লাইব্রেরির দিকে হাঁটা লাগিয়েছিল ও। কেমিস্ট্রি বিল্ডিঙের সামনে দিয়ে যাচ্ছে যখন, দেখল, উল্টোদিক থেকে আসছে মধুরা। আজ ওর পরনে লাল নীল জংলাছাপ গোড়ালি ঝুলের ড্রেস। ওকে দেখেই, " কী রে কেমন আছিস?" বলে হাল্কা হাসল মধুরা।
" ভালো আছি দি।"
"আবার দি? কোথায় যাচ্ছিস এখন? ক্লাস নেই?"
" না দি। আজ এম বি স্যার ক্লাস নেবেন না বলেছেন। তাই ভাবলাম একটু লাইব্রেরিতে বসি গিয়ে।"
" ওরে হাঁদারাম, এটা স্কুল না যে সারাক্ষণ পড়াশোনা নিয়ে থাকতে হবে। ক্লাস নেই তো মজা করে ঘুরে বেরা!"
" আসলে আমি তেমন কিছুই চিনিনা। কোথায় যাবো? "
" ওরে নিজেকে চিনে নিতে হয়। "
" হুম। ঠিক আছে দি।"
" শোন কাল আমাদের এনভাইরনমেন্টালের ক্লাসটা আমি বাঙ্ক করছি। বারোটায়। তোদের তো ওই সময় বাংলা থাকে। কাউকে বলিস প্রক্সি দিতে। আমার সাথে দেখা করবি মেন গেটে। তোকে নিয়ে যাবো এক জায়গায়। "
" কোথায় দি?"
" কাল দেখতে পাবি। "
ভ্যাবলা হয়ে মধুরার চলে যাওয়া হাঁ করে দেখতে লাগল শ্রেয়ান।
৩।
বারোটা বেজে পনেরো। মধুরার দেখা নেই। শ্রেয়ান কিন্তু কিছুটা কৌতূহলবশত আর কিছুটা ভয়ে ভয়ে (এখনো সিনিয়রদের প্রতি ভীতিটা কাটেনি ওর) অপেক্ষা করে আছে গেটে। চলে গেলে পাছে পরে দেখা হয়ে বকা খায়, এই ভেবে যেতেও পারছেনা। কাউকে প্রক্সি দিতে বলতেই পারেনি ও। মিছিমিছি একটা এটেন্ডেন্স নষ্ট হল। এইসব ভাবতে ভাবতে ফোনে খুঁটখুঁট করছিল শ্রেয়ান।
" সরি, একটু দেরি হয়ে গেল। অনেক্ষণ দাঁড়িয়ে আছিস কি?"
মুখ তুলে মধুরাকে দেখতে পেল।
" ওই আর কী। আগের ক্লাসটা তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে গেল। তখন থেকেই আছি।"
" আসলে আমার আগের ক্লাসটা এস এমের ছিল। বুড়িটা এক্সট্রা টাইম নিলো। তাই দেরি হল। এদিকে তোর নম্বরটাও জানিনা যে এস এম এস করে দেবো। ঝটপট তোর নম্বরটা দে তো।"
" ৯৪৩৩......"
" মিসড কল দিয়ে দিচ্ছি।"
বলতে বলতেই শ্রেয়ানের ফোনে রিং হল, অচেনা নম্বর থেকে। দুটো রিং হতেই কেটে দিল মধুরা।
" নে সেভ করে রাখ।"
" হ্যাঁ, করছি।" "মধুরা দি" লিখে সেভ করল নম্বরটা শ্রেয়ান।
" আজ ওয়েদার ভালো নেই। যে কোন সময় বৃষ্টি নামতে পারে। তাই যেখানে প্ল্যান করেছিলাম, যাওয়া যাবেনা। তার চেয়ে বরং চল কোথাও খেতে যাই।"
" কোথায় যাবে?"
" পার্ক স্ট্রিট চল।"
" কী হল? অমন ভ্যাবলাকান্তর মতো মুখ করে আছিস কেন রে? পার্ক স্ট্রিট গেছিস কখনো?"
" না, মানে শুনেছি দামী জায়গা খুব..."
" ধুর ধুর। আজকে আমার ট্রিট। তোদের ইন্ট্রো নেওয়ার দিন হেবি চেটেছিলাম তোকে। তারপরে ফ্রেশারসে আসিনি আমি। ট্রিটটা পেন্ডিং আছে। বন্ধুত্ত্ব অটুট করতে হবেনা?"
মধুরার মিষ্টি হাসি দেখে আর কথা বাড়ালো না শ্রেয়ান।
৪।
"শুভ মহালয়া দিদি।" শ্রেয়ানের এস এম এস ঢুকল মধুরার ফোনে। খেয়াল পড়ল, তাই তো। আজ থেকে টানা দেড় মাস কলেজ ছুটি। দেড় মাস শ্রেয়ানকে দেখতে পাবেনা। ও ফিরে যাচ্ছে জল্পাইগুড়ি নিজের বাড়ি পুজোয়, শ্রেয়ানও বর্ধমান। একটু যেন তেতো লাগল কফিটা। উফ, এই পিজির রান্নার মাসিটা না। এক্কেবারে যাচ্ছেতাই।
প্রায় প্রতিদিন কলেজের পরে শ্রেয়ান আর ও হাঁটতে হাঁটতে চলে যেত অনেকটা দূর। একেকদিন একেক দিকে। সারাদিনের লেখাপড়ার কথা, বাড়ির কথা, শ্রেয়ানের রবীন্দ্রনাথ চর্চা আর ওর গ্রিন ডের চর্চা। মাঝে কোথাও দাঁড়িয়ে ভাঁড়ের চা। অসমবয়সী হলেও কোথাও যেন একটা অদ্ভুত টান অনুভব করত শ্রেয়ানের জন্য মধুরা। সহজ সরল ছেলেটার সাথে কথা বললে আরাম লাগে, মন ভালো থাকে। আবার একটা রুটিন ব্রেক হবে। একদম ভালো লাগেনা মধুরার।
" হুম, ভালো করে পুজো এঞ্জয় করে ফের।" ছোট্ট জবাব দিয়ে বিছানা ছাড়ল মধুরা। বিস্বাদ কফিটা ছুড়ে ফেলল বেসিনে। ওকে তো আবার ব্যাগ গোছাতে হবে। রাত্রের ট্রেন।
৫।
হাওড়া স্টেশনে ট্রেনের অপেক্ষায় বসে আছে শ্রেয়ান। তিন মাস পর বাড়ি যাচ্ছে। মাঝে অবশ্য কয়েকবার বাবা এসে দেখা করে গিয়েছেন। তবে মা আর ঠাকুমার সাথে দেখা হয়নি এতদিন। ভিডিয়ো কলে দেখেছে বটে, কিন্তু স্পর্শ অনুভব করতে পারেনি। যেদিন প্রথম কলকাতা আসে, সেদিন থেকে দিন গুনতে থেকেছে শ্রেয়ান, কবে বাড়ি যাবে পুজোর ছুটিতে। ভেবেছিল বুঝি খুব আনন্দ হবে। কিন্তু আজ কেমন একটা মন খারাপ গ্রাস করে আসছে ওকে। একেই বাইরে মেঘলা, অন্ধকার হয়ে আছে। বৃষ্টি একদম ভালোবাসেনা শ্রেয়ান। তার ওপর কলেজ, হোস্টেল, মধুরাদিকে ছেড়ে দেড় মাস থাকার কষ্ট, কিচ্ছু ভালো লাগছেনা ওর। এই কয়েক মাসে যেন ভালোবেসে ফেলেছে ও কলকাতা শহরটাকে, আর তার সিংহভাগ কৃতিত্ব মধুরার। ওকে সাথে নিয়ে গোটা শহরটা ঘুরে বেরিয়েছে। ষ্টেশনে ট্রেন ঢুকতেই কামরায় উঠে জানলার ধারে সীট নিয়ে কানে হেডফোন গুঁজে বসল শ্রেয়ান।
"I walk the empty streets
On the boulevard of broken dreams" গ্রীন ডে চলতে লাগল একের পর এক।
৬।
দেড় মাস বাদে জগদ্ধাত্রী পুজোর পরে আজ কলেজ খুলেছে ওদের। দুটোয় ল্যাব আর ক্লাস শেষ করে দুজনের আজ গঙ্গার ঘাট যাওয়ার কথা। কথামতো কলেজ গেটে দেখা করল ওরা। ফেলে যাওয়া শরতের মিঠে রোদে আজ বড় মন জুড়ানো আরামদায়ক। কদিনের প্যাচপ্যাচে বৃষ্টির পর আকাশ আজ রৌদ্রজ্জ্বল। মধুরার পরনে একটা হাল্কা বেগুনি রঙের চিকন কাজ করা শাড়ি। লম্বা চুলটাকে অযত্নে হাতখোঁপায় আটকে রেখেছে, কানে ছোট্ট দুল। দুই চোখে কাজলের ঔজ্জ্বল্য। শ্রেয়ানকেও বড় ঝকঝকে লাগছে আজ লাল পাঞ্জাবিতে।
" চল, গঙ্গার ঘাটে যাই। নৌকোতে চড়ে ঘুরব।"
" চলো!"
গঙ্গার বুকে নৌকোবিহার চলল ওদের অনেকক্ষণ। আজ শ্রেয়ান ওর ক্যামেরাটা নিয়ে এসছিল। পুজোয় বাড়ি গিয়ে বাবার থেকে পাওয়া গিফট। সবে শেখা শুরু করেছে। গোটা সময়টা জুড়েই লেন্স তাক করে রেখেছিল মধুরার দিকেই।
" এই, কী তখন থেকে শুধু ছবিই তুলে যাচ্ছিস?"
" তোমায় আজ খুব সুন্দর লাগছে মধুরাদি।"
" বলছিস?"
" হুম।"
" আমি ওই ন্যাকা মেয়েদের মতো বলব না যে কই কিছুই তো সাজিনি। না, আজ সত্যিই আমি সেজেছি। ভালো লাগছে বললি সেটাও এঞ্জয় করলাম। থ্যাঙ্ক ইয়ু!"
" একটা কথা বলব?"
" কী বল?"
" অনেকদিন ধরে ভাবছিলাম বলব..."
"ভালোবাসিস আমায়?"
"কী হল, ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলি?"
" না মানে..."
" ও, ভালোবাসিস না?"
" না না। তা না। অবশ্যই বাসি।"
" তাহলে?"
" না মানে তুমিও?"
" কী মনে হয়?"
" কে জানে। জানলে তো এমন ভ্যাবাচ্যাকা খেতাম না।"
" পাগল কোথাকার!" হেসে শ্রেয়ানের মাথার চুলগুলো হাত দিয়ে ঘেঁটে দিল মধুরা।
"চল, ফেরা যাক। তোর তো পড়ার টাইম নষ্ট হচ্ছে।"
" হ্যাঁ, তা বটে। কাল ল্যাব নোটবুক জমা দিতে হবে। আজ স্পেক্ট্রোর এক্সপেরিমেন্টটা শেষ করেছি।"
" উফ। চল।"
" পৌঁছে একটা ফোন করো।"
" হুম।"
ঘন্টাখানেক পরে শ্রেয়ান ওর হোস্টেলের ঘরে বসে পড়ছে। বা বলা চলে, পড়ার চেষ্টা করছে। সারাদিনের ঘটনার আকস্মিকতার ঘোর এখনো কাটেনি। এমন সময়ে ফোনে বেজে উঠল, " তুমি সন্ধ্যার মেঘমালা। তুমি আমার সাধের সাধনা।" স্ক্রিনে তাকিয়ে দেখল সদ্য এডিট করা নাম।
"Madhura calling"।
১।
টিফিন ব্রেকের সময় ভয়ে ভয়ে ক্লাসরুমে ঢুকেছে আজ শ্রেয়ান। এত বছর বয়েজ স্কুলে পড়ার পর এই প্রথম কোএডে। তার ওপর আবার কলেজের প্রথম দিন। মেধাবী ছেলে শ্রেয়ান উচ্চ মাধ্যমিকে চমকপ্রদ রেজাল্ট করে বর্ধমান জেলার এক প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে কলকাতার অন্যতম নামী কলেজে ফিজিক্স নিয়ে পড়তে এসেছে। হোস্টেলে থাকতে হবে। আজ সকালেই বাবা কলেজ গেটে পৌঁছে বাড়ি চলে গিয়েছেন। এত বড় কলকাতা শহরে ও সম্পূর্ণ একা। কাউকে চেনেনা। শুনেছে কলেজে, হোস্টেলে ভালো মতই র্যাগিং হয়। বুক ঢিপ ঢিপ করছে ওর।
শতাব্দীপ্রাচীন কলেজের বড় ক্লাসরুমটাতে বাইরের আলো তেমন নেই, দিনেরবেলাও টিউবলাইট জ্বলছে। ঢুকে দেখল ওদের ক্লাসের বাকি ছেলেমেয়েরা দুটো বেঞ্চ জুড়ে জটলা পাকিয়ে বসে আছে। ওর আর জায়গা হবেনা ওখানে বলে পিছনের বেঞ্চিতে গিয়ে বসল শ্রেয়ান। টিচার্স প্ল্যাটফর্মের ওখানে জনা দশেক সিনিয়র দাদা দিদিরা দাঁড়িয়ে আছে, কয়েকজন টেবিলে চেয়ারে বসে।
" এই শোন, কলেজের প্রথম দিন এসছিস, সিনিয়রদের সম্মান জানাতে হয়, জানিস না? এলি আর বসে পড়লি? গুড আফটারনুন উইশ কে করবে?"
শ্রেয়ানের দিকে তাকিয়ে বলল সিনিয়র "দিদি", পরনে সাদার ওপর হলুদ ফুল ছাপ কুর্তি আর নীল জিন্স, গোড়ালি অবধি গিয়ে শেষ হয়েছে। মাথায় এক ঢাল কালো চুল, কয়েকটা আবার বার বার কপালের উপর পড়ছিল বলে মাঝে মাঝেই হাত চলে যাচ্ছিল চুল ঠিক করতে। কানে একজোড়া বড় ঝুমকো দুল। ঠোঁটের ওপর ছোট্ট তিল মুখশ্রীতে আলাদা মাধুর্য এনেছে, শ্রেয়ানের শিল্পী মনে ভাবনা এলো।
" গুড আফটারনুন দিদি।" উঠে দাঁড়িয়ে বলল ও।
" দিদি আবার কী? বলবি মধুরা। নাম কী তোর? "
" শ্রেয়ান। ঠিক আছে দিদি। এই সরি, মধুরা।"
" আতাক্যালানে। যা বোস।"
২।
মাস দুই হয়ে গিয়েছে কলেজের। এখনো শ্রেয়ানের ক্লাসে তেমন বেশী বন্ধু হয়নি। মুখচোরা ছেলে ও। রুমমেটের সাথে ছাড়া আর দু তিনজন ছেলের সাথে যা একটু কথাবার্তা হয় ওর। ক্লাস আর লেখাপড়া নিয়ে ব্যস্ত থাকে। সময় পেলে চলতে থাকে আঁকাঝোঁকা। আজ লাঞ্চের পরে ক্লাসটা ক্যান্সেল হয়ে যাওয়ায় লাইব্রেরির দিকে হাঁটা লাগিয়েছিল ও। কেমিস্ট্রি বিল্ডিঙের সামনে দিয়ে যাচ্ছে যখন, দেখল, উল্টোদিক থেকে আসছে মধুরা। আজ ওর পরনে লাল নীল জংলাছাপ গোড়ালি ঝুলের ড্রেস। ওকে দেখেই, " কী রে কেমন আছিস?" বলে হাল্কা হাসল মধুরা।
" ভালো আছি দি।"
"আবার দি? কোথায় যাচ্ছিস এখন? ক্লাস নেই?"
" না দি। আজ এম বি স্যার ক্লাস নেবেন না বলেছেন। তাই ভাবলাম একটু লাইব্রেরিতে বসি গিয়ে।"
" ওরে হাঁদারাম, এটা স্কুল না যে সারাক্ষণ পড়াশোনা নিয়ে থাকতে হবে। ক্লাস নেই তো মজা করে ঘুরে বেরা!"
" আসলে আমি তেমন কিছুই চিনিনা। কোথায় যাবো? "
" ওরে নিজেকে চিনে নিতে হয়। "
" হুম। ঠিক আছে দি।"
" শোন কাল আমাদের এনভাইরনমেন্টালের ক্লাসটা আমি বাঙ্ক করছি। বারোটায়। তোদের তো ওই সময় বাংলা থাকে। কাউকে বলিস প্রক্সি দিতে। আমার সাথে দেখা করবি মেন গেটে। তোকে নিয়ে যাবো এক জায়গায়। "
" কোথায় দি?"
" কাল দেখতে পাবি। "
ভ্যাবলা হয়ে মধুরার চলে যাওয়া হাঁ করে দেখতে লাগল শ্রেয়ান।
৩।
বারোটা বেজে পনেরো। মধুরার দেখা নেই। শ্রেয়ান কিন্তু কিছুটা কৌতূহলবশত আর কিছুটা ভয়ে ভয়ে (এখনো সিনিয়রদের প্রতি ভীতিটা কাটেনি ওর) অপেক্ষা করে আছে গেটে। চলে গেলে পাছে পরে দেখা হয়ে বকা খায়, এই ভেবে যেতেও পারছেনা। কাউকে প্রক্সি দিতে বলতেই পারেনি ও। মিছিমিছি একটা এটেন্ডেন্স নষ্ট হল। এইসব ভাবতে ভাবতে ফোনে খুঁটখুঁট করছিল শ্রেয়ান।
" সরি, একটু দেরি হয়ে গেল। অনেক্ষণ দাঁড়িয়ে আছিস কি?"
মুখ তুলে মধুরাকে দেখতে পেল।
" ওই আর কী। আগের ক্লাসটা তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে গেল। তখন থেকেই আছি।"
" আসলে আমার আগের ক্লাসটা এস এমের ছিল। বুড়িটা এক্সট্রা টাইম নিলো। তাই দেরি হল। এদিকে তোর নম্বরটাও জানিনা যে এস এম এস করে দেবো। ঝটপট তোর নম্বরটা দে তো।"
" ৯৪৩৩......"
" মিসড কল দিয়ে দিচ্ছি।"
বলতে বলতেই শ্রেয়ানের ফোনে রিং হল, অচেনা নম্বর থেকে। দুটো রিং হতেই কেটে দিল মধুরা।
" নে সেভ করে রাখ।"
" হ্যাঁ, করছি।" "মধুরা দি" লিখে সেভ করল নম্বরটা শ্রেয়ান।
" আজ ওয়েদার ভালো নেই। যে কোন সময় বৃষ্টি নামতে পারে। তাই যেখানে প্ল্যান করেছিলাম, যাওয়া যাবেনা। তার চেয়ে বরং চল কোথাও খেতে যাই।"
" কোথায় যাবে?"
" পার্ক স্ট্রিট চল।"
" কী হল? অমন ভ্যাবলাকান্তর মতো মুখ করে আছিস কেন রে? পার্ক স্ট্রিট গেছিস কখনো?"
" না, মানে শুনেছি দামী জায়গা খুব..."
" ধুর ধুর। আজকে আমার ট্রিট। তোদের ইন্ট্রো নেওয়ার দিন হেবি চেটেছিলাম তোকে। তারপরে ফ্রেশারসে আসিনি আমি। ট্রিটটা পেন্ডিং আছে। বন্ধুত্ত্ব অটুট করতে হবেনা?"
মধুরার মিষ্টি হাসি দেখে আর কথা বাড়ালো না শ্রেয়ান।
৪।
"শুভ মহালয়া দিদি।" শ্রেয়ানের এস এম এস ঢুকল মধুরার ফোনে। খেয়াল পড়ল, তাই তো। আজ থেকে টানা দেড় মাস কলেজ ছুটি। দেড় মাস শ্রেয়ানকে দেখতে পাবেনা। ও ফিরে যাচ্ছে জল্পাইগুড়ি নিজের বাড়ি পুজোয়, শ্রেয়ানও বর্ধমান। একটু যেন তেতো লাগল কফিটা। উফ, এই পিজির রান্নার মাসিটা না। এক্কেবারে যাচ্ছেতাই।
প্রায় প্রতিদিন কলেজের পরে শ্রেয়ান আর ও হাঁটতে হাঁটতে চলে যেত অনেকটা দূর। একেকদিন একেক দিকে। সারাদিনের লেখাপড়ার কথা, বাড়ির কথা, শ্রেয়ানের রবীন্দ্রনাথ চর্চা আর ওর গ্রিন ডের চর্চা। মাঝে কোথাও দাঁড়িয়ে ভাঁড়ের চা। অসমবয়সী হলেও কোথাও যেন একটা অদ্ভুত টান অনুভব করত শ্রেয়ানের জন্য মধুরা। সহজ সরল ছেলেটার সাথে কথা বললে আরাম লাগে, মন ভালো থাকে। আবার একটা রুটিন ব্রেক হবে। একদম ভালো লাগেনা মধুরার।
" হুম, ভালো করে পুজো এঞ্জয় করে ফের।" ছোট্ট জবাব দিয়ে বিছানা ছাড়ল মধুরা। বিস্বাদ কফিটা ছুড়ে ফেলল বেসিনে। ওকে তো আবার ব্যাগ গোছাতে হবে। রাত্রের ট্রেন।
৫।
হাওড়া স্টেশনে ট্রেনের অপেক্ষায় বসে আছে শ্রেয়ান। তিন মাস পর বাড়ি যাচ্ছে। মাঝে অবশ্য কয়েকবার বাবা এসে দেখা করে গিয়েছেন। তবে মা আর ঠাকুমার সাথে দেখা হয়নি এতদিন। ভিডিয়ো কলে দেখেছে বটে, কিন্তু স্পর্শ অনুভব করতে পারেনি। যেদিন প্রথম কলকাতা আসে, সেদিন থেকে দিন গুনতে থেকেছে শ্রেয়ান, কবে বাড়ি যাবে পুজোর ছুটিতে। ভেবেছিল বুঝি খুব আনন্দ হবে। কিন্তু আজ কেমন একটা মন খারাপ গ্রাস করে আসছে ওকে। একেই বাইরে মেঘলা, অন্ধকার হয়ে আছে। বৃষ্টি একদম ভালোবাসেনা শ্রেয়ান। তার ওপর কলেজ, হোস্টেল, মধুরাদিকে ছেড়ে দেড় মাস থাকার কষ্ট, কিচ্ছু ভালো লাগছেনা ওর। এই কয়েক মাসে যেন ভালোবেসে ফেলেছে ও কলকাতা শহরটাকে, আর তার সিংহভাগ কৃতিত্ব মধুরার। ওকে সাথে নিয়ে গোটা শহরটা ঘুরে বেরিয়েছে। ষ্টেশনে ট্রেন ঢুকতেই কামরায় উঠে জানলার ধারে সীট নিয়ে কানে হেডফোন গুঁজে বসল শ্রেয়ান।
"I walk the empty streets
On the boulevard of broken dreams" গ্রীন ডে চলতে লাগল একের পর এক।
৬।
দেড় মাস বাদে জগদ্ধাত্রী পুজোর পরে আজ কলেজ খুলেছে ওদের। দুটোয় ল্যাব আর ক্লাস শেষ করে দুজনের আজ গঙ্গার ঘাট যাওয়ার কথা। কথামতো কলেজ গেটে দেখা করল ওরা। ফেলে যাওয়া শরতের মিঠে রোদে আজ বড় মন জুড়ানো আরামদায়ক। কদিনের প্যাচপ্যাচে বৃষ্টির পর আকাশ আজ রৌদ্রজ্জ্বল। মধুরার পরনে একটা হাল্কা বেগুনি রঙের চিকন কাজ করা শাড়ি। লম্বা চুলটাকে অযত্নে হাতখোঁপায় আটকে রেখেছে, কানে ছোট্ট দুল। দুই চোখে কাজলের ঔজ্জ্বল্য। শ্রেয়ানকেও বড় ঝকঝকে লাগছে আজ লাল পাঞ্জাবিতে।
" চল, গঙ্গার ঘাটে যাই। নৌকোতে চড়ে ঘুরব।"
" চলো!"
গঙ্গার বুকে নৌকোবিহার চলল ওদের অনেকক্ষণ। আজ শ্রেয়ান ওর ক্যামেরাটা নিয়ে এসছিল। পুজোয় বাড়ি গিয়ে বাবার থেকে পাওয়া গিফট। সবে শেখা শুরু করেছে। গোটা সময়টা জুড়েই লেন্স তাক করে রেখেছিল মধুরার দিকেই।
" এই, কী তখন থেকে শুধু ছবিই তুলে যাচ্ছিস?"
" তোমায় আজ খুব সুন্দর লাগছে মধুরাদি।"
" বলছিস?"
" হুম।"
" আমি ওই ন্যাকা মেয়েদের মতো বলব না যে কই কিছুই তো সাজিনি। না, আজ সত্যিই আমি সেজেছি। ভালো লাগছে বললি সেটাও এঞ্জয় করলাম। থ্যাঙ্ক ইয়ু!"
" একটা কথা বলব?"
" কী বল?"
" অনেকদিন ধরে ভাবছিলাম বলব..."
"ভালোবাসিস আমায়?"
"কী হল, ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলি?"
" না মানে..."
" ও, ভালোবাসিস না?"
" না না। তা না। অবশ্যই বাসি।"
" তাহলে?"
" না মানে তুমিও?"
" কী মনে হয়?"
" কে জানে। জানলে তো এমন ভ্যাবাচ্যাকা খেতাম না।"
" পাগল কোথাকার!" হেসে শ্রেয়ানের মাথার চুলগুলো হাত দিয়ে ঘেঁটে দিল মধুরা।
"চল, ফেরা যাক। তোর তো পড়ার টাইম নষ্ট হচ্ছে।"
" হ্যাঁ, তা বটে। কাল ল্যাব নোটবুক জমা দিতে হবে। আজ স্পেক্ট্রোর এক্সপেরিমেন্টটা শেষ করেছি।"
" উফ। চল।"
" পৌঁছে একটা ফোন করো।"
" হুম।"
ঘন্টাখানেক পরে শ্রেয়ান ওর হোস্টেলের ঘরে বসে পড়ছে। বা বলা চলে, পড়ার চেষ্টা করছে। সারাদিনের ঘটনার আকস্মিকতার ঘোর এখনো কাটেনি। এমন সময়ে ফোনে বেজে উঠল, " তুমি সন্ধ্যার মেঘমালা। তুমি আমার সাধের সাধনা।" স্ক্রিনে তাকিয়ে দেখল সদ্য এডিট করা নাম।
"Madhura calling"।
Subscribe to:
Posts (Atom)