রান্নার তেলের বিজ্ঞাপনে পিতজাকে পিজ্জা বলা ছেলেটার আজ বিজয় দিবস।
মফঃস্বলের স্যাঁতস্যাঁতে বাংলা মিডিয়াম ক্লাসরুমে পঞ্চম শ্রেণী থেকে এ বি সি ডি শেখা ছেলেটিরও আজ বিজয় দিবস।
সদ্য শেষ হওয়া বইমেলায় যে ছেলেটির ঝুলিতে ছিল শুধুই বাংলা লিটল ম্যাগাজিন আর শক্তি সুনীল জয়, আজ তারও বিজয় দিবস।
বান্ধবীকে ভ্যালেন্টাইন্স ডে তে নিজের লেখা দু লাইন বাংলা কবিতা উপহার দিয়ে 'ছিঃ', 'যা তা', 'ক্লাসলেস' আখ্যা পাওয়া ছেলেটি, তারও আজ বিজয় দিবস।
কালো পাড় সাদা ধনেকালি পরিহিতা লম্বা বেণী ঝুলিয়ে অতুল প্রসাদ গাওয়া মেয়েটির আজ হঠাৎ পিঙ্ক ফ্লয়েডের ভিড়ে ডাক পড়বে।
হ্যারি পটার আজ একদিনের জন্য হলেও বিরাম পাবে, বইয়ের তাক থেকে ধুলো মুছে আজ বেরোবে প্রফেসর শঙ্কু।
সাউথ সিটির তিরিশ তলার বারান্দায় আজ রোদের মায়াবী প্রবেশ স্থান পাবে ফেসবুকে, "বাংলা ভাষা উচ্চারিত হলে নিকনো উঠোনে ঝরে রোদ" ক্যাপশন দিয়ে।
অভ্র রিদমিকের ডাউনলোড আজ বেড়ে যাবে।
হুজুগে পড়ে সবাই আজ দুই তিন লাইন জ্ঞানের বাণী কপচাবে যত্রতত্র।
একদল আজও বাংলাটা ঠিক আসেনা বলে মিথ্যে আক্ষেপ করবে।
আর পৃথিবীর এক প্রান্তে আজও কিছু আব্দুস, রফিক, আবুল, জব্বরেরা গুলি খাবে, প্রতিদিনের মতোই, মাতৃভাষার সম্মান রক্ষার্থে। নীরবে। নিঃশব্দে।
Wednesday, February 21, 2018
Saturday, February 17, 2018
বুরা না মানো, আজ হোলি হ্যায়।
হোলি হ্যায়!
উফ, আবার শুরু হলো। সবে সকাল দশটা। এর মধ্যেই গোটা কমপ্লেক্স জুড়ে লোকে লোকারণ্য। সুতপার কাছে এই দিনটা একটা বিভীষিকা। চেষ্টা করেছিল ঘরের সব দরজা জানলা বন্ধ করে এসিটা চালিয়ে কম্বল মুড়ি দিয়ে শুয়ে থাকবে, যতক্ষণ না এই রঙ খেলার প্রহসন শেষ হয়। মা বাবা অনেকবার করে বলেছিল ওদের সাথে মাসীর বাড়ি ভুবনেশ্বরে যেতে, যাওয়ারও কথা ছিল সুতপার। কিন্তু শেষ মুহূর্তে কাজের দোহাই দিয়ে ছুটি ক্যান্সেল করে দিল বস।
হ্যাঁ, প্রহসনই তো বটে। সারা বছর নোংরা দৃষ্টি দিয়ে ওকে গিলে খায় যে কয় জোড়া চোখ, হোলির দিন "বুরা না মানো, আজ হোলি হ্যায়"এর দোহাইয়ে তারাই বিনা বাধায় হাতের সুখ, মনের সুখ এক করে ফেলে। রঙ এত প্রিয় সুতপার, কিন্তু গত দু বছর ধরে যে মানসিক যন্ত্রণা ওকে কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে, সেই জন্যই এইবারে ঘরের মধ্যে চুপ করে বসে আছে ও। খুব ইচ্ছে করছিল প্রতি বছরের মতোই এবারেও ও ধবধবে সাদা সালোয়ার কামিজ পরবে, দুই হাত ভরে আবির মাখবে আর মাখাবে সমস্ত প্রিয়জনদের। কিন্তু না, ওই যে আজ, হোলি, বুরা মানা বারণ।
কলিং বেলের শব্দে সম্বিৎ ফিরল সুতপার। এই অসময়ে কে এলো আবার? আইহোল দিয়ে উঁকি মেরে দেখতে পেলো সেই দুই জোড়া নোংরা চোখ। ধক করে উঠল বুকটা সুতপার।
"হ্যাঁ রে মা, দরজা খোল। রঙ খেলবি না? বুরা মানলি নাকি? আজ তো হোলি রে পাগলি!"
হঠাৎই সুতপার প্রবলভাবে হোলি খেলার ইচ্ছেটা জেগে উঠল। এক ছুটে রান্নাঘর থেকে সদ্য জার্মানি থেকে ওর দাদার পাঠানো বুচার'স নাইফটা নিয়ে ছিটকিনিটায় হাত রাখল ও।
উফ, আবার শুরু হলো। সবে সকাল দশটা। এর মধ্যেই গোটা কমপ্লেক্স জুড়ে লোকে লোকারণ্য। সুতপার কাছে এই দিনটা একটা বিভীষিকা। চেষ্টা করেছিল ঘরের সব দরজা জানলা বন্ধ করে এসিটা চালিয়ে কম্বল মুড়ি দিয়ে শুয়ে থাকবে, যতক্ষণ না এই রঙ খেলার প্রহসন শেষ হয়। মা বাবা অনেকবার করে বলেছিল ওদের সাথে মাসীর বাড়ি ভুবনেশ্বরে যেতে, যাওয়ারও কথা ছিল সুতপার। কিন্তু শেষ মুহূর্তে কাজের দোহাই দিয়ে ছুটি ক্যান্সেল করে দিল বস।
হ্যাঁ, প্রহসনই তো বটে। সারা বছর নোংরা দৃষ্টি দিয়ে ওকে গিলে খায় যে কয় জোড়া চোখ, হোলির দিন "বুরা না মানো, আজ হোলি হ্যায়"এর দোহাইয়ে তারাই বিনা বাধায় হাতের সুখ, মনের সুখ এক করে ফেলে। রঙ এত প্রিয় সুতপার, কিন্তু গত দু বছর ধরে যে মানসিক যন্ত্রণা ওকে কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে, সেই জন্যই এইবারে ঘরের মধ্যে চুপ করে বসে আছে ও। খুব ইচ্ছে করছিল প্রতি বছরের মতোই এবারেও ও ধবধবে সাদা সালোয়ার কামিজ পরবে, দুই হাত ভরে আবির মাখবে আর মাখাবে সমস্ত প্রিয়জনদের। কিন্তু না, ওই যে আজ, হোলি, বুরা মানা বারণ।
কলিং বেলের শব্দে সম্বিৎ ফিরল সুতপার। এই অসময়ে কে এলো আবার? আইহোল দিয়ে উঁকি মেরে দেখতে পেলো সেই দুই জোড়া নোংরা চোখ। ধক করে উঠল বুকটা সুতপার।
"হ্যাঁ রে মা, দরজা খোল। রঙ খেলবি না? বুরা মানলি নাকি? আজ তো হোলি রে পাগলি!"
হঠাৎই সুতপার প্রবলভাবে হোলি খেলার ইচ্ছেটা জেগে উঠল। এক ছুটে রান্নাঘর থেকে সদ্য জার্মানি থেকে ওর দাদার পাঠানো বুচার'স নাইফটা নিয়ে ছিটকিনিটায় হাত রাখল ও।
Tuesday, February 13, 2018
অন্য ভ্যালেন্টাইনস ডে
সকাল থেকেই পিয়ালের whatsapp ভরে যাচ্ছে শুধু ভ্যালেন্টাইন্স ডে মেসেজে। হয় বোন শিমুলের পাঠানো মিষ্টি মিষ্টি টেডি বিয়ার, হাতে তার ইয়া বড় লাল রঙের হার্ট শেপের বেলুন, তাতে লেখা "লাভ", নয়তো মাসীর মেয়ে মনাইয়ের পাঠানো অডিয়ো মেসেজে টকিং টমের গলায় ভ্যালেন্টাইন ডে উইশ। বান্ধবীদের গ্রুপেও জোর কদমে গত দশ দিন ধরে চলছে আজকের তোড়জোড়। কে কার বয়ফ্রেন্ডের সাথে বরের সাথে কোথায় সেলিব্রেট করবে, তার হাজার হাজার প্ল্যান। নববিবাহিতা পিয়ালের কাছে সকলেরই প্রায় এক প্রশ্ন, " কী রে, আজ কী প্ল্যান? সারাদিন কী করছিস? বর কী গিফট দিলো? কোথায় বেরোচ্ছিস আজ?" ইত্যাদি ইত্যাদি। এইসব প্রশ্নবাণে পিয়াল জর্জরিত। হবে নাই বা কেন?
একেই পিয়াল নিজে একটু মুখচোরা। তার ওপর বিয়ে হয়েছে সবে তিন মাস। খবরের কাগজ দেখে বিয়ে। তেমন মেলামেশাও করেনি বিয়ের আগে। সুমন্ত কলেজে পড়ায়। ছাত্র পড়িয়ে পড়িয়ে যেন রসায়নের মাস্টারের জীবনে কোন রসবোধ নেই। বিয়ের এই তিন মাসে একটা দিনও রোমান্টিক কিছুই করেনি সে। নেহাত হানিমুনের টিকিট শ্বশুরমশাই কেটে রেখেছিলেন, তাই নেহাত দুজনে মিলে একটু মুসৌরি ঘুরে এসছিল। তা সেখানে গিয়েও দুজনের একসাথে কোন ছবিই নেই। আশেপাশে যেখানে সব ট্যুরিস্ট কাপলরা মিনিটে মিনিটে রোম্যান্টিক পোজ দিয়ে ছবি তুলছে বা তোলাচ্ছে, এরা দুজনে যেন নিপাট অপরিচিতের মতো দূরত্ব রেখে রেখে দাঁড়িয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। লজ্জার মাথা খেয়ে পিয়াল তখন কিছু বলতেও পারেনি, সখ হলেও হাত ধরে হাঁটতে পারেনি, বিকেলের নরম আলোয় বরের দিকে হাঁ করে তাকিয়ে মুগ্ধ হতে পারেনি। ওদের এলবাম দেখে ননদ ফুল্কি তো ফুট কেটেই ফেলল, " হ্যাঁ রে বৌদিভাই, তোরা বর বৌ না ভাই বোন রে?" বলেই সে কী হাসি। লজ্জায় মুখ লাল হয়ে পিয়াল তখন ঘর থেকে পালাতে পারলে বাঁচে!
যদিও সুমন্ত্র থেকে কোনরকমই আশা রাখেনি পিয়াল আজকের দিনটির জন্য, কিন্তু তাও কেন জানি মনের কোণের মধ্যে একটা ক্ষীণ আশা হয়তো থেকেও গিয়েছিল। তাই সকাল সকাল সুমন্ত্র জন্য যখন ওর প্রিয় চিকেন স্যান্ডউইচ বানাচ্ছিল, খুব মনে হচ্ছিল এই বুঝি সুমন্ত হেসে দুটো কথা বলবে। ও মা, বাবু তখন গভীর মনযোগ দিয়ে আনন্দবাজার পত্রিকায় রাষ্ট্রনীতি পড়তে ব্যস্ত। পাশের পাতায় অঞ্জলির এত বড় বিজ্ঞাপন চোখেও পড়েনা। দুপুরে খেতে বসে রেডিয়োতে শুধুই প্রেমের গান।
" চাহে তুম কুছ না কহো, ম্যায়নে শুন লিয়া। কে সাথই প্যার কা, মুঝে চুন লিয়া। ম্যাইনে শুন লিয়া।" কল্পনার আকাশে তখন পিয়াল উড়ছে। মোটা ফ্রেমের চশমা ছেড়ে সুমন্ত কুল সানগ্লাস, লাল টিশার্ট পরে পুরো হিরো, পিয়ালও যশ চোপড়ার সিনেমার হিরোয়িনদের মতো শিফন শাড়িতে অপ্সরা। এসব ভাবতে ভাবতে হাতের ভাত শুকিয়ে যায়। সম্বিৎ ফেরে কলিং বেলের আওয়াজে। নির্ঘাত সুমন্ত ওর জন্য ফুলের বুকে পাঠিয়েছে। কলেজে গিয়ে ছাত্র ছাত্রীদের দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে। লাফাতে লাফাতে গিয়ে দরজা খুলতে যাবে, চিতপটাং! এ এক জঘন্য ব্যামো পিয়ালের, শুকনো ডাঙ্গাতেও দুমদাম পড়ে যায়। কোনোমতে উঠে, নিজেকে সামলে, খোঁড়াতে খোঁড়াতে দরজাটা খুলে দেখে ক্যুরিয়ার। ব্যথার মধ্যেও এইটুকু যাও বা আশা ছিল, সব ভেঙ্গে গেল যখন চিঠিটা হাতে নিয়ে দেখল এল আই সির প্রিমিয়ামের রিসিপ্ট।
ব্যথায় যন্ত্রণায় সাড়া দুপুর কাতরাতে থাকলো পিয়াল। ভোলিনি লাগিয়েছিল বটে, কিন্তু হঠাৎ করেই খুব মায়ের জন্য, বাবার জন্য মন খারাপ লাগছিল। বড্ড একা বোধ হচ্ছিল। এই যদি এখন বাড়ির সবাই থাকত, কত যত্নআত্তি খাতির করতও পিয়ালের। এরকম একা একা মোটেই পড়ে থাকতে হতোনা। বাড়ির থেকে এত দূরে বিয়েটা করতেই চায়নি পিয়াল, কিন্তু মা বাবার জোরাজুরিতে শেষমেশ মত দিতে হয়েছিল। অসুস্থ শরীর, দুর্বল মন, বড্ড ভঙ্গুর। কাঁদতে কাঁদতে কখন দুপুর গড়িয়ে বিকেল, বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যে হয়ে গিয়েছে, খেয়াল নেই। দু চোখের পাতা এক হয়ে গিয়েছিল কখন, কে জানে। খুট করে দরজার শব্দে ধড়ফড় করে উঠল পিয়াল, উঠতে গিয়েই পায়ের ব্যথাটা জানান দিলো।
" তুমি ঠিক আছো? এই সন্ধ্যেবেলা অন্ধকার ঘরে শুয়ে। বেল বাজালাম, খুললে না। ভাগ্যিস ডুপ্লিকেট ছিল। "
সুমন্ত্র চোখে মুখে একরাশ প্রশ্ন, চিন্তা দেখে নিজেকে আর সামলাতে পারল না পিয়াল। ভ্যা করে কেঁদেকেটে উল্টে পড়ার কথা জানালো সুমন্তকে। সুমন্ত বেচারা, ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে একশা। কঠিন কঠিন থারমোডাইনামিক্স ইকুয়েশন সল্ভ করতে ওস্তাদ, জীবনের এইসব ইকুয়েশন ব্যালেন্স করতে গিয়ে রীতিমতো হিমসিম খেয়ে যায়। অপটু হাতে গ্যাসে গরম জল করে, হট ব্যাগে জল ভরে সেঁক দিতে থাকে। আরেক হাতে ফোন। ফ্যামিলি ডাক্তার মিত্রবাবুকে তড়িঘড়ি তলব। ডাক্তারবাবু এসে দেখেশুনে বললেন চিন্তার কারন নেই। সেঁক চলতে থাকুক। আর দরকার একটু রেস্ট। ওনাকে বিদায় করে ঘরে ঢুকে সুমন্ত বলে, " শোনো, তুমি চিন্তা করোনা। আমি কদিন ছুটি নিয়ে নিচ্ছি। তুমি একদম মাটিতে পা ফেলোনা। আমি সবদিক ম্যানেজ করে দেবো। "
রান্নাবান্নায় অপটু সুমন্ত অ্যাপ দিয়ে ডিনার অর্ডার করল দুজনের। অর্ডার করতে গিয়ে টের পেল, দুজনেরই যে বড় প্রিয় চাইনিজ। বেডরুমেই বসে খেলো। খেতে বসে কারেন্ট চলে যেতে আবার "ক্যান্ডেললাইট ডিনার" হল। তারপর পায়ে সেঁক দিয়ে ভোলিনি লাগিয়ে, পেন কিলার খাইয়ে ধীরেসুস্থে ওকে শুইয়ে গায়ে চাদর ঢেকে দিলো। পিয়াল যেন আজ এক অন্য সুমন্তকে চিনছে, অবাক হয়ে তাই তাকিয়েই রইলো। এতটা যত্নশীল। হোক না সে একটু আনরোমান্টিক, কিন্তু এই যত্ন করে আপনজনের মত খেয়াল রাখা, এই বা কম কী? হবো না হবো না করেও, ভ্যালেন্টাইন্স ডে কিন্তু পালন হয়েই গেল!
একেই পিয়াল নিজে একটু মুখচোরা। তার ওপর বিয়ে হয়েছে সবে তিন মাস। খবরের কাগজ দেখে বিয়ে। তেমন মেলামেশাও করেনি বিয়ের আগে। সুমন্ত কলেজে পড়ায়। ছাত্র পড়িয়ে পড়িয়ে যেন রসায়নের মাস্টারের জীবনে কোন রসবোধ নেই। বিয়ের এই তিন মাসে একটা দিনও রোমান্টিক কিছুই করেনি সে। নেহাত হানিমুনের টিকিট শ্বশুরমশাই কেটে রেখেছিলেন, তাই নেহাত দুজনে মিলে একটু মুসৌরি ঘুরে এসছিল। তা সেখানে গিয়েও দুজনের একসাথে কোন ছবিই নেই। আশেপাশে যেখানে সব ট্যুরিস্ট কাপলরা মিনিটে মিনিটে রোম্যান্টিক পোজ দিয়ে ছবি তুলছে বা তোলাচ্ছে, এরা দুজনে যেন নিপাট অপরিচিতের মতো দূরত্ব রেখে রেখে দাঁড়িয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। লজ্জার মাথা খেয়ে পিয়াল তখন কিছু বলতেও পারেনি, সখ হলেও হাত ধরে হাঁটতে পারেনি, বিকেলের নরম আলোয় বরের দিকে হাঁ করে তাকিয়ে মুগ্ধ হতে পারেনি। ওদের এলবাম দেখে ননদ ফুল্কি তো ফুট কেটেই ফেলল, " হ্যাঁ রে বৌদিভাই, তোরা বর বৌ না ভাই বোন রে?" বলেই সে কী হাসি। লজ্জায় মুখ লাল হয়ে পিয়াল তখন ঘর থেকে পালাতে পারলে বাঁচে!
যদিও সুমন্ত্র থেকে কোনরকমই আশা রাখেনি পিয়াল আজকের দিনটির জন্য, কিন্তু তাও কেন জানি মনের কোণের মধ্যে একটা ক্ষীণ আশা হয়তো থেকেও গিয়েছিল। তাই সকাল সকাল সুমন্ত্র জন্য যখন ওর প্রিয় চিকেন স্যান্ডউইচ বানাচ্ছিল, খুব মনে হচ্ছিল এই বুঝি সুমন্ত হেসে দুটো কথা বলবে। ও মা, বাবু তখন গভীর মনযোগ দিয়ে আনন্দবাজার পত্রিকায় রাষ্ট্রনীতি পড়তে ব্যস্ত। পাশের পাতায় অঞ্জলির এত বড় বিজ্ঞাপন চোখেও পড়েনা। দুপুরে খেতে বসে রেডিয়োতে শুধুই প্রেমের গান।
" চাহে তুম কুছ না কহো, ম্যায়নে শুন লিয়া। কে সাথই প্যার কা, মুঝে চুন লিয়া। ম্যাইনে শুন লিয়া।" কল্পনার আকাশে তখন পিয়াল উড়ছে। মোটা ফ্রেমের চশমা ছেড়ে সুমন্ত কুল সানগ্লাস, লাল টিশার্ট পরে পুরো হিরো, পিয়ালও যশ চোপড়ার সিনেমার হিরোয়িনদের মতো শিফন শাড়িতে অপ্সরা। এসব ভাবতে ভাবতে হাতের ভাত শুকিয়ে যায়। সম্বিৎ ফেরে কলিং বেলের আওয়াজে। নির্ঘাত সুমন্ত ওর জন্য ফুলের বুকে পাঠিয়েছে। কলেজে গিয়ে ছাত্র ছাত্রীদের দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে। লাফাতে লাফাতে গিয়ে দরজা খুলতে যাবে, চিতপটাং! এ এক জঘন্য ব্যামো পিয়ালের, শুকনো ডাঙ্গাতেও দুমদাম পড়ে যায়। কোনোমতে উঠে, নিজেকে সামলে, খোঁড়াতে খোঁড়াতে দরজাটা খুলে দেখে ক্যুরিয়ার। ব্যথার মধ্যেও এইটুকু যাও বা আশা ছিল, সব ভেঙ্গে গেল যখন চিঠিটা হাতে নিয়ে দেখল এল আই সির প্রিমিয়ামের রিসিপ্ট।
ব্যথায় যন্ত্রণায় সাড়া দুপুর কাতরাতে থাকলো পিয়াল। ভোলিনি লাগিয়েছিল বটে, কিন্তু হঠাৎ করেই খুব মায়ের জন্য, বাবার জন্য মন খারাপ লাগছিল। বড্ড একা বোধ হচ্ছিল। এই যদি এখন বাড়ির সবাই থাকত, কত যত্নআত্তি খাতির করতও পিয়ালের। এরকম একা একা মোটেই পড়ে থাকতে হতোনা। বাড়ির থেকে এত দূরে বিয়েটা করতেই চায়নি পিয়াল, কিন্তু মা বাবার জোরাজুরিতে শেষমেশ মত দিতে হয়েছিল। অসুস্থ শরীর, দুর্বল মন, বড্ড ভঙ্গুর। কাঁদতে কাঁদতে কখন দুপুর গড়িয়ে বিকেল, বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যে হয়ে গিয়েছে, খেয়াল নেই। দু চোখের পাতা এক হয়ে গিয়েছিল কখন, কে জানে। খুট করে দরজার শব্দে ধড়ফড় করে উঠল পিয়াল, উঠতে গিয়েই পায়ের ব্যথাটা জানান দিলো।
" তুমি ঠিক আছো? এই সন্ধ্যেবেলা অন্ধকার ঘরে শুয়ে। বেল বাজালাম, খুললে না। ভাগ্যিস ডুপ্লিকেট ছিল। "
সুমন্ত্র চোখে মুখে একরাশ প্রশ্ন, চিন্তা দেখে নিজেকে আর সামলাতে পারল না পিয়াল। ভ্যা করে কেঁদেকেটে উল্টে পড়ার কথা জানালো সুমন্তকে। সুমন্ত বেচারা, ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে একশা। কঠিন কঠিন থারমোডাইনামিক্স ইকুয়েশন সল্ভ করতে ওস্তাদ, জীবনের এইসব ইকুয়েশন ব্যালেন্স করতে গিয়ে রীতিমতো হিমসিম খেয়ে যায়। অপটু হাতে গ্যাসে গরম জল করে, হট ব্যাগে জল ভরে সেঁক দিতে থাকে। আরেক হাতে ফোন। ফ্যামিলি ডাক্তার মিত্রবাবুকে তড়িঘড়ি তলব। ডাক্তারবাবু এসে দেখেশুনে বললেন চিন্তার কারন নেই। সেঁক চলতে থাকুক। আর দরকার একটু রেস্ট। ওনাকে বিদায় করে ঘরে ঢুকে সুমন্ত বলে, " শোনো, তুমি চিন্তা করোনা। আমি কদিন ছুটি নিয়ে নিচ্ছি। তুমি একদম মাটিতে পা ফেলোনা। আমি সবদিক ম্যানেজ করে দেবো। "
রান্নাবান্নায় অপটু সুমন্ত অ্যাপ দিয়ে ডিনার অর্ডার করল দুজনের। অর্ডার করতে গিয়ে টের পেল, দুজনেরই যে বড় প্রিয় চাইনিজ। বেডরুমেই বসে খেলো। খেতে বসে কারেন্ট চলে যেতে আবার "ক্যান্ডেললাইট ডিনার" হল। তারপর পায়ে সেঁক দিয়ে ভোলিনি লাগিয়ে, পেন কিলার খাইয়ে ধীরেসুস্থে ওকে শুইয়ে গায়ে চাদর ঢেকে দিলো। পিয়াল যেন আজ এক অন্য সুমন্তকে চিনছে, অবাক হয়ে তাই তাকিয়েই রইলো। এতটা যত্নশীল। হোক না সে একটু আনরোমান্টিক, কিন্তু এই যত্ন করে আপনজনের মত খেয়াল রাখা, এই বা কম কী? হবো না হবো না করেও, ভ্যালেন্টাইন্স ডে কিন্তু পালন হয়েই গেল!
Sunday, February 11, 2018
কিছু প্রতিশ্রুতি।
১।
"শোন, বিয়ের পরে কিন্তু তুই চাকরিটা ছাড়বি না। আমি সব সময় তোকে সাপোর্ট করব। যাই হোক না কেনো।" অনির কথাগুলো খুব কানে বাজছে আজ দিয়ার। খানিক আগে ধুন্ধুমার কাণ্ড ঘটে গেল যে বাড়িতে। চাকরির পোস্টিং হয়েছে দিয়ার মজফফরপুরে। শ্বশুর শাশুড়ির ঘোর আপত্তি। একটু নিজের হয়ে কথা বলার জন্য তাকিয়েছিল দিয়া অনির দিকে। বুঝেছিল, দুই বছর অনেকটাই বেশী সময়, প্রমিসগুলো ভোলার জন্য।
২।
"মা, গড প্রমিস, আমি আর কক্ষনো মিথ্যে কথা বলবো না তোমায়। প্লীজ আমায় বকো না। প্লীজ?" মা কে মিথ্যে বলে মায়ের জন্মদিনের জন্যই সারপ্রাইজ প্ল্যান করতে বেরিয়ে তাতাইয়ের মনে পড়ে গেলো সেই পনেরো বছর আগের দিনটা। মায়ের মুখে হাসি দেখার জন্য বোধহয় কিছু কিছু প্রমিস ভাঙ্গাই যায়, তাই না?
৩।
"শুনুন পনেরোর নীচে আমি কিছুতেই রাজী হতে পারছিনা। এত রিস্কি একটা প্রসেস। বুঝতেই তো পারছেন। তাহলে দেরি করে তো লাভ নেই, শুভস্য শীঘ্রম। আগামীকালই বিকেলের দিকে নিয়ে আসুন বৌমাকে। সাল্টে দেবো।" কন্যাভ্রূণহত্যার "সুপারি" নিতে গিয়ে একবারের জন্যও ডক্টর মৈত্রর মনে পড়ল না হিপোক্রেটিক ওথের লাইনগুলি। " I will use treatment to help the sick according to my ability and judgment, but never with a view to injury and wrong-doing."
৪।
" শাইনা, বেটি তুই ঘরে ফিরে আয়। শাহাবকেও আসতে বল। আমি আর তোর আব্বু তোকে মাফ করে দিয়েছি রে। বাড়ি আয়। ধুমধাম করে নিকাহ উদযাপন করব। খুদা কসম।"
স্কুলের ধারের মাঠে যখন পরপর আব্বু, ভাইজান আর শোয়েব হকির স্টিক দিয়ে মারতে মারতে শাহাবের কপাল ফাটিয়ে দিচ্ছিল, ধুলোয় লুটিয়ে থাকা, হাত পা বাঁধা আধমরা শাইনার বারবার মনে হচ্ছিল, কেন বিশ্বাস করল আম্মির কথা, কেন শুনল না শাহাবের সাবধানবাণী।
৫।
" স্যার, আমরা জিতবোই জিতবো আজ এই ম্যাচ, আপনি দেখবেন। আপনার এবং দেশের নাম উজ্জ্বল করবোই। আপনার হাতে বিশ্বকাপের ট্রফিটা তুলে দেবোই।" কথা রেখেছে পৃথ্বী শুভনম, মনজোত, ঈশানরা। রাহুল দ্রাবিড়ের হাতে অবশেষে উঠেছে ক্রিকেট বিশ্বকাপটি।
৬।
ফ্যামিলি গেট টুগেদারের গিয়ে সব ভাই বোনদের আড্ডা দারুন জমেছিল। বিয়ের সবে এক মাস হয়েছে তিতিরের। আনন্দবাজার দেখে বিয়ে। রোহনের সাথে এখনো তেমন বন্ধুত্ব হয়ে ওঠেনি, যতটা ওর লাভ ম্যারেজ করা বান্ধবীদের দেখে। ভালো লাগল যখন গল্পগাছার মধ্যে সবার সামনে রোহন তিতিরকেই ওর "বেস্ট ফ্রেন্ড" আখ্যা দিল। মনে পড়ে গেল বিয়ের সময়ে নেওয়া সাত প্রতিশ্রুতির একটা।
" om prajabhyaha santu jaradastayaha", অর্থাৎ "তুমিই আমার সবচেয়ে প্রিয় বন্ধু, আমার ভালো মন্দ তোমার চেয়ে বেশী কেউ চায়না। ঈশ্বর তোমার মঙ্গল করুন। "
"শোন, বিয়ের পরে কিন্তু তুই চাকরিটা ছাড়বি না। আমি সব সময় তোকে সাপোর্ট করব। যাই হোক না কেনো।" অনির কথাগুলো খুব কানে বাজছে আজ দিয়ার। খানিক আগে ধুন্ধুমার কাণ্ড ঘটে গেল যে বাড়িতে। চাকরির পোস্টিং হয়েছে দিয়ার মজফফরপুরে। শ্বশুর শাশুড়ির ঘোর আপত্তি। একটু নিজের হয়ে কথা বলার জন্য তাকিয়েছিল দিয়া অনির দিকে। বুঝেছিল, দুই বছর অনেকটাই বেশী সময়, প্রমিসগুলো ভোলার জন্য।
২।
"মা, গড প্রমিস, আমি আর কক্ষনো মিথ্যে কথা বলবো না তোমায়। প্লীজ আমায় বকো না। প্লীজ?" মা কে মিথ্যে বলে মায়ের জন্মদিনের জন্যই সারপ্রাইজ প্ল্যান করতে বেরিয়ে তাতাইয়ের মনে পড়ে গেলো সেই পনেরো বছর আগের দিনটা। মায়ের মুখে হাসি দেখার জন্য বোধহয় কিছু কিছু প্রমিস ভাঙ্গাই যায়, তাই না?
৩।
"শুনুন পনেরোর নীচে আমি কিছুতেই রাজী হতে পারছিনা। এত রিস্কি একটা প্রসেস। বুঝতেই তো পারছেন। তাহলে দেরি করে তো লাভ নেই, শুভস্য শীঘ্রম। আগামীকালই বিকেলের দিকে নিয়ে আসুন বৌমাকে। সাল্টে দেবো।" কন্যাভ্রূণহত্যার "সুপারি" নিতে গিয়ে একবারের জন্যও ডক্টর মৈত্রর মনে পড়ল না হিপোক্রেটিক ওথের লাইনগুলি। " I will use treatment to help the sick according to my ability and judgment, but never with a view to injury and wrong-doing."
৪।
" শাইনা, বেটি তুই ঘরে ফিরে আয়। শাহাবকেও আসতে বল। আমি আর তোর আব্বু তোকে মাফ করে দিয়েছি রে। বাড়ি আয়। ধুমধাম করে নিকাহ উদযাপন করব। খুদা কসম।"
স্কুলের ধারের মাঠে যখন পরপর আব্বু, ভাইজান আর শোয়েব হকির স্টিক দিয়ে মারতে মারতে শাহাবের কপাল ফাটিয়ে দিচ্ছিল, ধুলোয় লুটিয়ে থাকা, হাত পা বাঁধা আধমরা শাইনার বারবার মনে হচ্ছিল, কেন বিশ্বাস করল আম্মির কথা, কেন শুনল না শাহাবের সাবধানবাণী।
৫।
" স্যার, আমরা জিতবোই জিতবো আজ এই ম্যাচ, আপনি দেখবেন। আপনার এবং দেশের নাম উজ্জ্বল করবোই। আপনার হাতে বিশ্বকাপের ট্রফিটা তুলে দেবোই।" কথা রেখেছে পৃথ্বী শুভনম, মনজোত, ঈশানরা। রাহুল দ্রাবিড়ের হাতে অবশেষে উঠেছে ক্রিকেট বিশ্বকাপটি।
৬।
ফ্যামিলি গেট টুগেদারের গিয়ে সব ভাই বোনদের আড্ডা দারুন জমেছিল। বিয়ের সবে এক মাস হয়েছে তিতিরের। আনন্দবাজার দেখে বিয়ে। রোহনের সাথে এখনো তেমন বন্ধুত্ব হয়ে ওঠেনি, যতটা ওর লাভ ম্যারেজ করা বান্ধবীদের দেখে। ভালো লাগল যখন গল্পগাছার মধ্যে সবার সামনে রোহন তিতিরকেই ওর "বেস্ট ফ্রেন্ড" আখ্যা দিল। মনে পড়ে গেল বিয়ের সময়ে নেওয়া সাত প্রতিশ্রুতির একটা।
" om prajabhyaha santu jaradastayaha", অর্থাৎ "তুমিই আমার সবচেয়ে প্রিয় বন্ধু, আমার ভালো মন্দ তোমার চেয়ে বেশী কেউ চায়না। ঈশ্বর তোমার মঙ্গল করুন। "
x
Thursday, February 8, 2018
তুই মায়ের মতোই ভালো
ভোর ছটা বাজতে না বাজতেই তিতিরের চোখ খুলে যায় অভ্যেস মতোই। সবে ফেব্রুয়ারির শুরু, তাতেই যা গরম পড়ে গিয়েছে। তার ওপর তিনতলার ঘরটা বদ্ধ। রাত্রের ঘুমটা মনোমত হয়না। ক্লান্তি মেখেই এরপর নীচে নেমে হাত মুখ ধুয়ে বালতি করে জল ভরে শুরু হয় ওর দিনলিপি। মা মরা মেয়ে, মামাবাড়িতে মানুষ হচ্ছে। বাবাও কোন খোঁজখবর রাখেনা, অন্যত্র সংসার করছে জমিয়ে। দিন রাত্তির তাই মামির খোঁটা খেতে খেতে পেট ভরে তিতিরের।
এরপর চা করে সবার ঘরে ঘরে দিয়ে, জলখাবারের জোগাড় করে তবে ছুটি। অবশ্য ছুটি কি আর একে বলা চলে? কোনোমতে স্নান সেরে মুখে গতরাত্রের বেঁচে যাওয়া শুকনো রুটি বা ভাত খেয়ে ছুট ছুট। অটো চড়ার বিলাসিতার কোনদিনও সুযোগই পায়নি তিতির। কাঁধে কলেজের ব্যাগ নিয়ে কুড়ি মিনিট প্রায় দৌড়তে দৌড়তে ষ্টেশনে পৌঁছে ভিড় ঠেলে কোনরকমে প্ল্যাটফর্মে আসা। আটটা দশের লোকালটা মিস করলে মুস্কিল। ফার্স্ট ক্লাসটায় লেট হলেও হতে পারে। ভিড় ট্রেনে একটা কোণে চেপ্টে দাঁড়িয়ে, তারপর ট্রেন থেকে নেমে আবার জোরে হাঁটা লাগিয়ে তিতির অবশেষে কলেজ পৌঁছয়, ঘেমে নেয়ে স্নান। চুল উস্কখুস্ক। সালোয়ারের ওড়নাটা ঠিক করে যখন ক্লাসে ঢুকে লাস্ট বেঞ্চে বসে, ততক্ষণে সহপাঠিনীদের এক প্রস্থ রূপচর্চা আর পরনিন্দা পরচর্চা হয়ে গিয়েছে। তিতিরকে দেখে আবার চাপানউতোর শুরু হয়। তিতির আর এসবে গা করেনা। ও বুঝে গিয়েছে, জীবনযুদ্ধে জয়ী হতে গেলে এইসব তুচ্ছ ব্যাপারে মাথা ঘামালে ওর পক্ষেই কঠিন হবে লড়াইটা।
প্রথম ক্লাস শেষ হয়। পরেরটা অফ। বাকি সবাই ছোটে ক্যান্টিনে চা খেতে, আড্ডা মারতে। তিতির গুটি গুটি পায়ে আসে লাইব্রেরীর দিকে। ব্যাগটা জমা রেখে সবে ভিতরে যেতে যাবে, এমন সময় পিছন থেকে " এই তিতির, শোন" বলে ডাক পায়। তাকিয়ে দেখে মহিম। ওরই সহপাঠী। ওর মতোই মুখচোরা। তেমনভাবে কখনো কথাবার্তা হয়ে ওঠেনি এক ক্লাসে পড়লেও।
" কিছু বলবি?"
" এই নে। এইটা খা।" বলে নিজের টিফিন বাক্সটা এগিয়ে দেয় মহিম। তিতির খুলে দেখে তাতে রয়েছে মালপোয়া আর পাটিসাপটা।
" সেদিন সকলে যখন এই নিয়ে আলোচনা করছিল ক্লাসে, তোর মুখ চোখ দেখে খুব মায়া হল। তাই মা যখন বানালো কাল, আমি তোর জন্য আলাদা করে তুলে রেখেছিলাম। "
কেউ যে ওর কথা ভাবতে পারে, এও যেন ভাবতে ভুলে গিয়েছিল তিতির। শেষ কবে কোন ছোটবেলায় মায়ের কাছে এমন যত্ন পেয়েছিল, সেসব আর প্রায় মনেই পড়েনা। মহিমের কথায় আবেগে আপ্লুত হয়ে শুধু একটা কথাই বেরোল ওর মুখ দিয়ে, " তুই মায়ের মতোই ভালো রে। "
এরপর চা করে সবার ঘরে ঘরে দিয়ে, জলখাবারের জোগাড় করে তবে ছুটি। অবশ্য ছুটি কি আর একে বলা চলে? কোনোমতে স্নান সেরে মুখে গতরাত্রের বেঁচে যাওয়া শুকনো রুটি বা ভাত খেয়ে ছুট ছুট। অটো চড়ার বিলাসিতার কোনদিনও সুযোগই পায়নি তিতির। কাঁধে কলেজের ব্যাগ নিয়ে কুড়ি মিনিট প্রায় দৌড়তে দৌড়তে ষ্টেশনে পৌঁছে ভিড় ঠেলে কোনরকমে প্ল্যাটফর্মে আসা। আটটা দশের লোকালটা মিস করলে মুস্কিল। ফার্স্ট ক্লাসটায় লেট হলেও হতে পারে। ভিড় ট্রেনে একটা কোণে চেপ্টে দাঁড়িয়ে, তারপর ট্রেন থেকে নেমে আবার জোরে হাঁটা লাগিয়ে তিতির অবশেষে কলেজ পৌঁছয়, ঘেমে নেয়ে স্নান। চুল উস্কখুস্ক। সালোয়ারের ওড়নাটা ঠিক করে যখন ক্লাসে ঢুকে লাস্ট বেঞ্চে বসে, ততক্ষণে সহপাঠিনীদের এক প্রস্থ রূপচর্চা আর পরনিন্দা পরচর্চা হয়ে গিয়েছে। তিতিরকে দেখে আবার চাপানউতোর শুরু হয়। তিতির আর এসবে গা করেনা। ও বুঝে গিয়েছে, জীবনযুদ্ধে জয়ী হতে গেলে এইসব তুচ্ছ ব্যাপারে মাথা ঘামালে ওর পক্ষেই কঠিন হবে লড়াইটা।
প্রথম ক্লাস শেষ হয়। পরেরটা অফ। বাকি সবাই ছোটে ক্যান্টিনে চা খেতে, আড্ডা মারতে। তিতির গুটি গুটি পায়ে আসে লাইব্রেরীর দিকে। ব্যাগটা জমা রেখে সবে ভিতরে যেতে যাবে, এমন সময় পিছন থেকে " এই তিতির, শোন" বলে ডাক পায়। তাকিয়ে দেখে মহিম। ওরই সহপাঠী। ওর মতোই মুখচোরা। তেমনভাবে কখনো কথাবার্তা হয়ে ওঠেনি এক ক্লাসে পড়লেও।
" কিছু বলবি?"
" এই নে। এইটা খা।" বলে নিজের টিফিন বাক্সটা এগিয়ে দেয় মহিম। তিতির খুলে দেখে তাতে রয়েছে মালপোয়া আর পাটিসাপটা।
" সেদিন সকলে যখন এই নিয়ে আলোচনা করছিল ক্লাসে, তোর মুখ চোখ দেখে খুব মায়া হল। তাই মা যখন বানালো কাল, আমি তোর জন্য আলাদা করে তুলে রেখেছিলাম। "
কেউ যে ওর কথা ভাবতে পারে, এও যেন ভাবতে ভুলে গিয়েছিল তিতির। শেষ কবে কোন ছোটবেলায় মায়ের কাছে এমন যত্ন পেয়েছিল, সেসব আর প্রায় মনেই পড়েনা। মহিমের কথায় আবেগে আপ্লুত হয়ে শুধু একটা কথাই বেরোল ওর মুখ দিয়ে, " তুই মায়ের মতোই ভালো রে। "
Wednesday, February 7, 2018
কেন মেঘ আসে হৃদয় আকাশে।
ভোরের দিকে অনেক কষ্ট করে একটু দু চোখের পাতা এক হয়েছিল। ঘুম ভাঙল পাশের বাড়ি থেকে অনিন্দ্যদার তানপুরা সহযোগে রেওয়াজের সুরে।
"ক্ষণিক আলোকে আঁখির পলকে তোমায় যবে পাই দেখিতে।
ওহে হারাই হারাই, সদা ভয় হয়, হারাইয়া ফেলি চকিতে।"
ক্লান্ত লাগছে। খুব। খবরটা শোনা ইস্তক সারারাত শুধুই এপাশ আর ওপাশ করে কাটালাম। হাজার চেষ্টা করেও ঘুমোতে পারছিলাম না। চোখ বন্ধ করলেই সিনেমার মতো পরপর ভেসে আসছিল একটার পর একটা মুহূর্ত।
কেমিস্ট্রি ক্লাসের বাইরে আমি দাঁড়িয়ে। তুই এলি রিমার জন্য নোটস দিতে। অ্যারোমাটিক কম্পাউন্ডের সাথে সাথে তখন আমার কিশোরী মনে যে প্রেমের সৌরভ ভেসে আসছে, তুই তো বুঝিসইনি। তোর পরনে ছিল লাল চেক শার্ট। সেই থেকে লাল আমার প্রিয় রঙ।
উচ্চ মাধ্যমিক শেষ হওয়ার পর পুরো গ্রুপ মিলে আমরা গেলাম নিক্কো পার্ক। সারাটাক্ষণ আমি চেষ্টা করে গেলাম তোর সাথে রাইড শেয়ার করবো। একটুর জন্য মুন রেকারে তোর পাশে বসতে পারছিলামও। ঠিক শেষ মুহূর্তে এসে পল্লবী আমায় সরিয়ে তোর পাশটায় বসে পড়ল। মন খারাপ করে সন্ধ্যেবেলা যখন ট্যাক্সি করে বাড়ি ফিরলাম, জানলার বাইরে আমার অভিমানী লাল ওড়নাটা হাওয়ায় বেপরোয়া উড়ছে।
কলেজের ফার্স্ট ইয়ার। তুই গেলি প্রেসিডেন্সি, আমি ব্রেবোরন। ফেস্টে এলো ভূমি। তোর তখনকার অন্যতম প্রিয় ব্যান্ড। সাহস করে তোকে অরকুটে মেসেজ করে জানালাম। বললি আসবি। আমি সেদিন অষ্টাদশীর ন্যায় উচ্ছ্বাসে সারা সকাল বেছে বেছে সেজেগুজে এলাম। সবাই বলেওছিল। লাল সিল্কের শাড়িটাতে আমায় নাকি দারুণ মিষ্টি লাগছিল। যথাসময়ে তুই এলি। সাথে ছিল শ্রেয়া। আমার লাল শাড়ির সাথে কন্ট্রাস্ট করে মুখটা হয়ে গেলো বেজায় কালো।
মাস্টার্স পড়তে তুই চলে গেলি বম্বে। আমি গেলাম রুড়কি। পুজোর ছুটিতে আমাদের পুরো গ্রুপটা দেখা করবে প্ল্যান হল। ম্যাডক্সে। তখন সদ্য আমি ঠাকুমাকে হারিয়েছি। মন ভালো নেই। তাও তুই আসবি বলে আমি যেতে রাজি হলাম। যাবো বলে তিনদিন আগে মায়ের সাথে দক্ষিনাপণ গিয়ে একটা লাল চুড়িদার সেট কিনেছিলাম। ঠিক মোক্ষম মুহূর্তে তুই দেবাকে মেসেজে জানালি, আসছিস না। মৃণালিনীর সাথে নর্থ ঘুরতে গিয়েছিস। আমারও সেদিন কোনোমতে কফিটা শেষ করেই খুব মাথা ধরে গেলো, ফিরে এলাম বাড়ি। সাইনাসের দোহাই দিয়ে আলো নিভিয়ে ঘরবন্দী হয়ে কাটালাম অষ্টমীর সন্ধ্যেটা।
তুই চাকরি নিয়ে গেলি হায়দ্রাবাদ। আমি দিল্লী। অফিসের কাজে এসেছি ভোপাল। হোটেলের লবিতে হঠাৎ তোর মুখোমুখি। তুই একা। সেদিন একসাথে বসে অনেক আড্ডা চলল। কাপের পর কাপ কফি। রাত্রে যে যার ঘরে ফিরলাম যখন, আমার মুখচোখে এক হাল্কা লালচে আভা। বোধহয় একেই ব্লাশ করা বলে।
ফেসবুকে রইলো যোগাযোগ। সেখানেই একদিন দেখলাম তোর মেসেজ। বিয়ে করছিস। পাত্রী তোরই কলিগ। পাঞ্জাবী মেয়ে। খুব ধুমধাম করেও হল তোদের বিয়ে। দিল্লীতেই। সেদিন আমি ইচ্ছে করেই সিমলা চলে গিয়েছিলাম। ফিরে এসে দেখলাম তোদের বিয়ের এলবাম। লালে লাল। কী খুশী লাগছিল তোকে দেখতে। খুব কেঁদেছিলাম সেদিন জানিস। খুব।
বলে না, সময়ের সাথে সাথে সবকিছু সহ্য হয়ে যায়, ক্ষতস্থানে প্রলেপ পড়ে যায়। আমিও ভেবেছিলাম বুঝি দেড় বছরে সব ভুলে গিয়েছি। এক তরফা ভালোবাসা। তার আর কীই বা জোর। কিন্তু না। কাল রাত্রে যখন মধুজার মেসেজ পেলাম, শুনলাম তুই খুব কষ্টে আছিস, যন্ত্রণায় কাতর হয়ে আছিস, নিজেকে আর সামলাতে পারলাম না। ভীষণ ইচ্ছে করছে রে, আমার কোলে তোর মাথাটা রেখে একটু হাত বুলিয়ে দিই। চুলে বিলি কেটে দিই। আরাম পাবি না বল? আসছি রে আমি। এখুনি আসছি। প্লীজ এবার হারিয়ে যাসনা। চলে যাসনা। আসছি।
"ক্ষণিক আলোকে আঁখির পলকে তোমায় যবে পাই দেখিতে।
ওহে হারাই হারাই, সদা ভয় হয়, হারাইয়া ফেলি চকিতে।"
ক্লান্ত লাগছে। খুব। খবরটা শোনা ইস্তক সারারাত শুধুই এপাশ আর ওপাশ করে কাটালাম। হাজার চেষ্টা করেও ঘুমোতে পারছিলাম না। চোখ বন্ধ করলেই সিনেমার মতো পরপর ভেসে আসছিল একটার পর একটা মুহূর্ত।
কেমিস্ট্রি ক্লাসের বাইরে আমি দাঁড়িয়ে। তুই এলি রিমার জন্য নোটস দিতে। অ্যারোমাটিক কম্পাউন্ডের সাথে সাথে তখন আমার কিশোরী মনে যে প্রেমের সৌরভ ভেসে আসছে, তুই তো বুঝিসইনি। তোর পরনে ছিল লাল চেক শার্ট। সেই থেকে লাল আমার প্রিয় রঙ।
উচ্চ মাধ্যমিক শেষ হওয়ার পর পুরো গ্রুপ মিলে আমরা গেলাম নিক্কো পার্ক। সারাটাক্ষণ আমি চেষ্টা করে গেলাম তোর সাথে রাইড শেয়ার করবো। একটুর জন্য মুন রেকারে তোর পাশে বসতে পারছিলামও। ঠিক শেষ মুহূর্তে এসে পল্লবী আমায় সরিয়ে তোর পাশটায় বসে পড়ল। মন খারাপ করে সন্ধ্যেবেলা যখন ট্যাক্সি করে বাড়ি ফিরলাম, জানলার বাইরে আমার অভিমানী লাল ওড়নাটা হাওয়ায় বেপরোয়া উড়ছে।
কলেজের ফার্স্ট ইয়ার। তুই গেলি প্রেসিডেন্সি, আমি ব্রেবোরন। ফেস্টে এলো ভূমি। তোর তখনকার অন্যতম প্রিয় ব্যান্ড। সাহস করে তোকে অরকুটে মেসেজ করে জানালাম। বললি আসবি। আমি সেদিন অষ্টাদশীর ন্যায় উচ্ছ্বাসে সারা সকাল বেছে বেছে সেজেগুজে এলাম। সবাই বলেওছিল। লাল সিল্কের শাড়িটাতে আমায় নাকি দারুণ মিষ্টি লাগছিল। যথাসময়ে তুই এলি। সাথে ছিল শ্রেয়া। আমার লাল শাড়ির সাথে কন্ট্রাস্ট করে মুখটা হয়ে গেলো বেজায় কালো।
মাস্টার্স পড়তে তুই চলে গেলি বম্বে। আমি গেলাম রুড়কি। পুজোর ছুটিতে আমাদের পুরো গ্রুপটা দেখা করবে প্ল্যান হল। ম্যাডক্সে। তখন সদ্য আমি ঠাকুমাকে হারিয়েছি। মন ভালো নেই। তাও তুই আসবি বলে আমি যেতে রাজি হলাম। যাবো বলে তিনদিন আগে মায়ের সাথে দক্ষিনাপণ গিয়ে একটা লাল চুড়িদার সেট কিনেছিলাম। ঠিক মোক্ষম মুহূর্তে তুই দেবাকে মেসেজে জানালি, আসছিস না। মৃণালিনীর সাথে নর্থ ঘুরতে গিয়েছিস। আমারও সেদিন কোনোমতে কফিটা শেষ করেই খুব মাথা ধরে গেলো, ফিরে এলাম বাড়ি। সাইনাসের দোহাই দিয়ে আলো নিভিয়ে ঘরবন্দী হয়ে কাটালাম অষ্টমীর সন্ধ্যেটা।
তুই চাকরি নিয়ে গেলি হায়দ্রাবাদ। আমি দিল্লী। অফিসের কাজে এসেছি ভোপাল। হোটেলের লবিতে হঠাৎ তোর মুখোমুখি। তুই একা। সেদিন একসাথে বসে অনেক আড্ডা চলল। কাপের পর কাপ কফি। রাত্রে যে যার ঘরে ফিরলাম যখন, আমার মুখচোখে এক হাল্কা লালচে আভা। বোধহয় একেই ব্লাশ করা বলে।
ফেসবুকে রইলো যোগাযোগ। সেখানেই একদিন দেখলাম তোর মেসেজ। বিয়ে করছিস। পাত্রী তোরই কলিগ। পাঞ্জাবী মেয়ে। খুব ধুমধাম করেও হল তোদের বিয়ে। দিল্লীতেই। সেদিন আমি ইচ্ছে করেই সিমলা চলে গিয়েছিলাম। ফিরে এসে দেখলাম তোদের বিয়ের এলবাম। লালে লাল। কী খুশী লাগছিল তোকে দেখতে। খুব কেঁদেছিলাম সেদিন জানিস। খুব।
বলে না, সময়ের সাথে সাথে সবকিছু সহ্য হয়ে যায়, ক্ষতস্থানে প্রলেপ পড়ে যায়। আমিও ভেবেছিলাম বুঝি দেড় বছরে সব ভুলে গিয়েছি। এক তরফা ভালোবাসা। তার আর কীই বা জোর। কিন্তু না। কাল রাত্রে যখন মধুজার মেসেজ পেলাম, শুনলাম তুই খুব কষ্টে আছিস, যন্ত্রণায় কাতর হয়ে আছিস, নিজেকে আর সামলাতে পারলাম না। ভীষণ ইচ্ছে করছে রে, আমার কোলে তোর মাথাটা রেখে একটু হাত বুলিয়ে দিই। চুলে বিলি কেটে দিই। আরাম পাবি না বল? আসছি রে আমি। এখুনি আসছি। প্লীজ এবার হারিয়ে যাসনা। চলে যাসনা। আসছি।
Thursday, February 1, 2018
নিজের কথা
আমি কে? ভীষণ কঠিন প্রশ্ন। এ যে ক্লাস সেভেন এইটের টাইম এন্ড ডিস্টেন্স, টাইম এন্ড হাইটের চেয়েও কঠিন। না মানে আমি অঙ্কে কাঁচা, তা কোনভাবেই বলা যায় না। মাধ্যমিকে ৯৮ (অবশ্য জীবনের এই পর্যায়ে এসে বুঝে গিয়েছি যে পরীক্ষায় প্রাপ্ত নম্বর কেবলমাত্র নম্বরই। আর কিচ্ছুটি না।) আর উচ্চ মাধ্যমিকে ১৯৩ পেয়েছিলাম (হ্যাঁ আমি সেই প্রাগৈতিহাসিক যুগের যখন উচ্চ মাধ্যমিক হতো একেকটা পেপার ২০০ তে। অবশ্য আমরাই ছিলাম লাস্ট ব্যাচ।)। তবুও প্রতিবার অঙ্ক পরীক্ষা দিতে যাওয়ার আগে মায়ের কাছে একটাই কথা বলতাম, "যদি একটাও অঙ্ক ঠিক না করি? যদি সব ভুল করি? কী হবে মা? (আমার এমন বলার ভ্যালিড কারণ আছে কিন্তু। আমি হলাম গিয়ে সিলি মিস্টেক করতে ওস্তাদ। মায়ের পইপই করে বলা দেওয়া সত্ত্বেও, তিন চারবার রিভাইজ করেও ভুল খুঁজে পেতাম না। ভাবতাম বুঝি ফুল মার্কস পাচ্ছি। ড্যাং ড্যাং করতে করতে সব পরীক্ষার পর বেরিয়ে বলতাম, ভালো হয়েছে। আর তারপর রেজাল্ট বেরোলে দেখা যেত এদিকে ভুল, ওদিকে ভুল। বকা খেতাম। ফার্স্ট টার্মে এই রকম হত। বকার রেশটা থাকত সেকেন্ড টার্ম অবধি। তখন এমন পড়া পড়তাম যে এক্কেবারে ক্লাস টপার। ফাইনাল টার্মে গিয়ে আবার যে কে সেই!! হি হি!!! আমি মানুষটা এরকমই। কন্সিস্টেন্সির খুব অভাব।) " কনফিডেন্সের অভাব আমার চিরকাল। এখনো গান গাইতে গেলে স্টেজে সেই চোতা নিয়ে উঠি। যদিও একবারও তাকাই না তার দিকে (তাকাবো কী? আমি তো তখন ভয়ের চোটে চোখ টোখ বন্ধ করে নিজের মনে গেয়ে চলেছি!), তাও সে সাথে না থাকলে হয়না। ভরসা পাইনা। কাজের প্রেজেন্টেশন, অত্যন্ত ইনফরমাল পরিবেশে দিতে গেলেও হাত পা ঠান্ডা হয়ে যায়। আমাদের রিসার্চ গ্রুপে সপ্তাহে একদিন করে একেকজন স্টুডেন্টকে কাজের আপডেট দিতে হয়। আমার টার্ন আসে হয়তো তিন মাসে একবার। যেদিন আমার প্রেজেন্টেশন দেওয়ার কথা, সেইদিন কম করে পঞ্চাশ হাজার বার বাকিদের জ্বালিয়ে মারি এই বলে, "প্লীজ, আমি প্রেজেন্ট করবো না। অন্য কেউ প্রক্সি দাও/দে।" বলা বাহুল্য, শেষমেশ আমাকেই দিতে হয়। ইদানীং মন্দ হচ্ছেনা (টাচ উড, টাচ উড! সময় ভালো যাচ্ছেনা এখন আমার এক্কেবারে। অনেক জায়গায় অনেক কিছু আটকে আছে। আর এইটুকু কাজের দিকে আর নজর লাগাতে চাইনা!)।
ও এতক্ষনে নিশ্চয়ই বুঝে গিয়েছেন যে আমি বড্ড টপিক থেকে সরে যাই? ওই যে অঙ্কের কথা বলছিলাম। ইচ্ছে ছিল তারপরে অন্য একটা কথা বলার। মানে লেখা শুরুর আগে সেরকমই ফ্লো প্ল্যান করেছিলাম। লিখতে গিয়ে ঘেঁটে গেল। যাই হোক। হ্যাঁ, অঙ্কে আমি কাঁচা না। বলেছি। কনফিডেন্স নেই। তাও বলেছি। যেটা বলিনি, সেটা হল যে এই জিনিসগুলোর সাথে রীতিমতো ঘরকন্না করতে হবে, সাথে থাকবে মেকানিক্স, সেই ভয়েই আমি জয়েন্টে কিছু একটা র্যাঙ্ক পেয়েও ( কলকাতার কোন বেসরকারী কলেজে অবশ্য করেই চান্স পেয়ে যেতাম ইলেক্ট্রিকাল/কেমিক্যাল/আই টি কোথাও একটা) ইঞ্জিনিয়ারিং পড়িনি। আমি না সূচ খুব ভয় পাই। এমনকি টিভি, সিনেমা কোথাও ইঞ্জেকশন দেখানো হচ্ছে হলেও চোখ বন্ধ করে দিই। ছোটবেলায় ম্যান্ডেটরি কিছু টীকা নিতে হয় বলে ওগুলোই শুধু নেওয়া, মরে যাবো, তাও নতুন করে ভ্যাক্সিনেশন করাবো না, এমন মানুষও ইঞ্জিনিয়ারিঙের কাউন্সেলিংএ যাবো বলে ব্লাড গ্রুপ পরীক্ষা করিয়েছিলাম! অথচ গেলাম না। এমনই আমি। কোন স্থিরতা নেই। বায়োটেকনোলজি নিয়ে পড়াশোনা করব বলে কষ্ট করে কেমিস্ট্রি নিয়ে বি এস সি তে ভর্তি হলাম। লেডি ব্রেবোরন কলেজে। সে তো নামেই কলেজ। আসলে আমার কারমেল স্কুলের চেয়েও বেশী ডিসিপ্লিন আর নিয়মের জাঁতাকল। বন্ধুরা সব আল্ট্রা কুল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ, প্রেসিডেন্সিতে পড়ছে, আমি কিনা যাদবপুরে চান্স পেলাম না, ভীষণভাবে ডিপ্রেসনে চলে গিয়েছিলাম। ফলস্বরূপ, ফার্স্ট ইয়ারে ২০০তে মোটে ৯৫ পেলাম। কোনমতে অনার্স বাঁচালাম। যে আমি আজ অবধি ৮৫'র নীচে শতাংশে নম্বর পাইনি, কলকাতা ইয়ুনিভারসিটি এসে এক্কেবারে নিজের "অউকাত" বুঝে গেলাম। ওই সময়ে একটা ভারী গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পেয়েছিলাম আমার বাবা আর এক স্যারের থেকে। " কষ্ট হলে কাঁদো, যত ইচ্ছে কাঁদো। কিন্তু একদিন। তারপরে উঠে পড়ে লেগে পড়ো। দেখিয়ে দাও যে তুমিও পারো। কান্নাকাটি করে আর সময় নষ্ট করোনা। " এই কথাগুলি আমি আজও অক্ষরে অক্ষরে মানি। কেমিস্ট্রি পড়তে একদম ভালো লাগত না। তাও যুদ্ধে নেমেছি, তাই শেষ দেখে ছাড়বো। এই একটা মনোভাব এক কালে খুব বেশিরকমের প্রবল ছিল। এখন বুঝেছি, মানসিক শান্তি অনেক দামী। সব লড়াই তাই worth না। অপোনেন্ট বাছি খুব ভেবেচিন্তে।
কিন্তু তা বলে আপোশ করিনা। কোন কিছু বা কাউকে অপছন্দ হলে, কারুর আচরণ আপত্তিকর লাগলে, সটান জানাই। হয় মিষ্টি করে ঠুকে দিই (খুব একটা লাভ হয়না। সেন্স অফ হ্যুমার আজকাল খুব কম লোকজনের। তাই সারকাজম বোঝে কম।), নইলে চাঁছাছোলা ভাষায় বলি। ঝগ্রুটি অপবাদ নেই বটে, কিন্তু দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে বুমের্যাংএর মতো ফিরে আসি। আর নেহাত যদি দেখি যে বলেও লাভ নেই, উল্টে সময় নষ্ট, তাহলে আর কী? এনারজি বাঁচাতে সেই পদার্থ (ম্যাক্সিমাম সময়ে অবশ্য অপদার্থ) থেকে নিজেকে সরিয়ে নিই। সময় কাটানোর জিনিসের তো অভাব নেই। মাথার ওপর মস্ত দায়িত্ব রয়েছে। সাড়ে চার বছর যেটার জন্য অনেক স্যাক্রিফাইস করলাম (স্যাক্রিফাইস না তো কী? এমন ঘরকুনো মেয়ে, আবাব মায়ের আদুরে, বাবা মা কে ছাড়া থাকতে পারেনা...কিরকম বাড়ি ঘর ছেড়ে পড়ে আছি এই এত্ত দূরে! চাইলেই মায়ের হাতের রান্না খেতে পারিনা। একটু শরীর খারাপ হলে কান্নাকাটি করতে পারি না। আদর আবদার সব মেপে মেপে...স্কাইপে তো তাদের স্পর্শ পাইনা! মাঝরাত্রে প্রবল টেনশনে ঘুম ভেঙ্গে গেলে মাকে জড়িয়ে শুতে পারিনা। নিজে হাতে বিনুনি করতে পারিনা বলে চুলগুলো এমন উড়ণচন্ডীর মতো হয়ে থাকে। আরো অনেক কিছু। বলে শেষ করতে পারবো না। পরের ইভেন্ট এসে যাবে!) , সেই পি এইচ ডি ডিগ্রিটা পেতে হবে তো, না কি? লেখালিখি গান একটু আধটু যা করি, তার জন্যও সময় লাগে। বই পড়ার রয়েছে। আলমারি আর কিন্ডল মিলিয়ে কম করে ১২-১৪টা না পড়া বই রয়েছে। এমাজনের কার্টে আরো গোটা দশেক রাখা আছে উইশলিস্টে (এই প্রসঙ্গে বলি, অনলাইন শপিং করতে ভীষণ ভালোবাসি। এমাজন আমার সবচেয়ে প্রিয় ওয়েবসাইট)। সেই সব নিয়ে থাকবো বাবা।
ভুলভাল বলতে বলতে দেখলেন তো, অনেক কথাই কেমন জানালাম নিজেকে নিয়ে? গুছিয়ে বলিনি ঠিকই। কিন্তু বলেছি তো। আসলে আমি declutteringএ বিশ্বাস করলেও খুব একটা পারদর্শী না। হ্যাঁ, আমার ল্যাপ্টপ, ডেস্কটপের হোমস্ক্রিন এমন ফাঁকা, যে যে কেউ এসে গোল দিয়ে যাবে। কিন্তু যেই না আমার আলমারিটি খুলবেন, জিনিসপত্র (মূলত জামাকাপড়) হুড়মুড়িয়ে গায়ে পড়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। ফর্মাল ভাবে কথা বলতে গেলে হঠাৎ করে, পারিনা। কম করে তিন চারবার মাথার মধ্যে কাল্পনিক একটা কথোপকথন চলতেই থাকে। তবে আমি এটেম্পট নিই। আসলে কোনকিছুই দুমদাম করতে হলে বিরক্তি বোধ করি। বেশ সব কিছু প্ল্যান করে (মানে যতটা নিজের হাতে থাকে, আর কি), ভালো করে আগুপিছু ভেবেচিন্তে করতে হলে আমি খুশি হই। যে জিনিসটা নিজে বিশ্বাস করিনা, সেটা কিছুতেই অন্য একজনকে বিশ্বাস করাতেই পারিনা। লোকজন ঠকানো definitely is not my forte।
ভালবাসতে ভালোবাসি। এই বুড়ি বয়সে এসেও হুটহাট লোকজনের ওপর ক্রাশ হয়ে যায় (কিছু কিছু ক্ষণস্থায়ী। কিছু আবার বিরক্তিকরভাবে লং টার্ম।), একতরফা ভালবাসতে ওস্তাদ। খুব সহজে বিশ্বাস করি মানুষকে। ঠকি। অবশ্য করেই। তাও শিক্ষা হয়না। ভালোবেসেই যাই। বিশ্বাস করেই যাই। তাদের জন্য করেও যাই। এই পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশী ভালো কাকে বাসি জিজ্ঞেস করলে অবশ্যই উত্তর হবে বাবা এবং মা (নাকি মা এবং বাবা?)। নিজে কোন কিছু উপভোগ করলে, তাদের সাথে সেই এক্সপিরিয়েন্স শেয়ার না করলে, তাদেরকে সেটা না দিলে শান্তি পাইনা। উদাহরণ দিই। আমি আজকাল ছুটি কম পাওয়া হয় আর ফ্লাইটের দাম মোটামুটি সস্তা বলে, মূলত ফ্লাইটেই যাতায়াত করি। কিন্তু আমার বাবা মাকে কখনো রাজী করাতেই পারিনি প্লেনে চড়তে। আমার খুব মন কেমন করত সব সময়। প্লেনের গল্প বলতাম যখন ওদের, ওরা সব বুঝলেও ১০০ পারসেন্ট তো বুঝতো না। ফার্স্ট হ্যান্ড এক্সপিরিয়েন্সের আলাদা মূল্য। আর তাই এইবারে রাজস্থান বেড়াতে গিয়ে যেই না সুযোগ পেলাম ওদের প্লেনে চড়ানোর, আমি নিজে যাকে বলে এক্কেরে "অন ক্লাউড নাইন"। বাবা মায়ের হাত ধরে হাঁটতে শিখেছি, আজ না হয় তারা আমার হাত ধরে প্লেনে চাপা শিখুক। বেড়াতে ভালোবাসি আমরা তিনজনেই। ইচ্ছে আছে ভবিষ্যতে আমরা আরো অনেক অনেক জায়গায় ঘুরবো। বড় হয়েছি, নিজে দায়িত্ব নিয়ে তাদের ঘোরাবো।
আমি খুব মিলেমিশে থাকতে ভালোবাসি (ওই জন্যই মনে হয় হোম সাথ সাথ হ্যায় সিনেমাটি আমার খুব প্রিয়। এতবার দেখেছি, হাতে গুনে শেষ হবেনা। মন খারাপ লাগলেই কম্প্যুটারে চালিয়ে দেখি। দিন নেই রাত নেই, যখন হোক। শাহ্রুখের কোন সিনেমাও এত বেশী দেখিনি। যদিও কভি খুশি কভি গম ক্লোজ কম্পিটিটর।)। বেশ সব কাছের মানুষগুলো আমায় ঘিরে থাকবে। শুধু মানুষ কেন, অ-মানুষগুলোও। কুকুর, বিড়াল, পাখি। সব। চাই সব প্রিয়জনদের নিয়ে একটা সুস্থ পরিবেশে থাকতে। যেখানে থাকবেনা সিরিয়ালের মতো কুটকাচালি। থাকবেনা রিয়েলিটি শোয়ের অযৌক্তিক ড্রামা। কল্পনা করতে দোষ কী? ট্যাক্স লাগেনা তো? (নাকি লাগে? আজকের বাজেটে কি কিছু এই নিয়ে কথা হলো?)
Subscribe to:
Posts (Atom)