Tuesday, March 6, 2018

মায়েরা সব বোঝে

Sunday, March 4, 2018

আমার রবিবার

আমার রবিবার

রবিবার মানেই মনে পড়ে যায় অনেক ছোটবেলায় মায়ের হাত ধরে রিক্সা চেপে গীতালি আন্টির নাচের স্কুলে যাওয়া। কী জঘন্যই না লাগত বাবা রে। ওই সক্কাল সক্কাল কত্থকের বোলের তালে তালে নাচা। একদম ভালো লাগত না।

এরপরে নাচের ব্যাপারে আমার চরম অনীহা টের পেয়ে মা বাবা ভাবলেন মেয়েকে তাহলে নাচ থেকে মুক্তি দেওয়াই যায়। আমি ভাবলাম বুঝি যাক বাঁচা গেলো। রবিবার, আনন্দে কাটবে। টিভিতে মহাভারত, স্কুল ডেজ দেখা যাবে। ও মা, সে কপালে নেই। বাঙালি মধ্যবিত্ত বাড়ি। তাঁরা ঠিক করলেন, আঁকার স্কুলে ভর্তি করবেন। ব্যস, শুরু হল বাড়ির কাছেই, বকুল আর্ট স্কুলে প্রত্যেক রবিবার আঁকার ক্লাস। সেও যেতে ভালো লাগত না। বারান্দায় দাঁড়িয়ে দেখতাম। রিক্সা করে যদি পিউ যেত, তাহলে আমি যেতাম। নইলে ডুব! কিছু মাসের মধ্যে অবশ্য সেখান থেকেও মুক্তি পেয়েছিলাম। তবে রবিবারে মানেই কিছু না কিছুর টিউশান লেগেই থাকতো।

সেই টিউশান ক্লাস শুরু হয়েছিল ক্লাস নাইন থেকে। চলল টুয়েলভ অবধি। লাইফ সায়েন্স ক্লাস। শুরু হতো সকাল নটায়, চলতো একটা দেড়টা অবধি। যদিও ক্লাস করতে খুবই ভালো লাগত, তবুও সকাল সকাল ব্রেকফাস্টে কয়েকটা লুচি দিয়ে ছোলার ডাল খেয়ে এসে সাড়ে বারোটার পর থেকে পেট চুঁইচুঁই করতে লাগত। তার ওপর মাথার মধ্যে ঘুরত, বাড়ি গিয়ে মাংসের ঝোল ভাত রয়েছে। সেই সব মাথায় নিয়ে কী আর ফটোসিন্থেসিস, রেস্পিরেশন, গ্রোথ, এসব মাথায় ঢোকে?

রবিবার মানেই ভালো খাবার। ব্রেকফাস্টে অন্যদিন যখন পাউরুটি মাখন আর সাথে অম্লেট নয়তো সন্দেশ, তখন রবিবার স্পেশাল। মায়ের সাথে হাতে হাতে লুচি বেলা আর ভাজা। মনে আছে, আমার একটা নিজস্ব ছোট্ট বাটি ছিল, ওটাতেই আমার জন্য ছোলার ডাল বা ঘুগনি যাই হতো না কেন, সেটাতে পরিবেশন করা হত। এখনো বাড়ি গেলে তাতেই হয়। দুপুরবেলা মাংসের ঝোল ভাত যেন ম্যান্ডেটরি। প্রেশার কুকারে মা বানাতেন, আলু আর কাঁচা পেঁপে দিয়ে পাতলা ঝোল। প্রেশারের ঢাকনা খুললেই একটা বিটকেল গন্ধ বেরোত, ঠাকুমা বলতেন "বাথ্রুমের গন্ধ"। বিকেল হলে বাবাকে রাজি করিয়ে পাড়ার রোলের দোকান (সে দোকান কখনো আবার খাবো, কখনো তাঞ্জোর, কখনো জায়ন জেস্ট) থেকে ঝাল ঝাল প্রচুর কাঁচা পিঁয়াজ দেওয়া আর অনেকটা টমেটো আর চিলি সস দেওয়া এগ রোল খাওয়া। সন্ধ্যেবেলা সেসব খেয়ে অবধারিতভাবেই রাত্রে কম খিদে। আর তাই অল্প করে একটু ভাত আর সাথে সকালের বানানো মাংসের এক টুকরো আর ঝোল। কখনো কখনো আবার রবিবার বিকেলগুলো যেতাম পিউদের বাড়ি। ওর সাথে খেলতাম। ওর ঠাকুমার ঘরে, খাটের পাশে বসে, বারান্দায় চলতো আমাদের লুকোচুরি খেলা, রান্নাবাটিও। ওদের তখন কেবিল টিভি। কখনো বসে টিভিও দেখতাম। জানিনা কেন, তবুও খালি মনে আছে, রাজু চাচা সিনেমাটা দেখেছিলাম খানিকটা। ওর বাবা চিকেন পকোড়া আনতেন আমাদের জন্য, সে স্বাদ এখনো মুখে লেগে আছে।

ইলেভেন টুয়েলভে উঠে টিউশানের বহর বাড়ল। সকালের লাইফ সায়েন্স টিউশান তো ছিলই। তার সাথে যোগ হল বিকেলবেলা করে পাথফাইন্ডারে গিয়ে জয়েন্ট এন্ট্রান্সের প্রিপারেশন নেওয়া। সেই সব দিন, ওরে বাবা। ভাবলেই ভয় লাগে। প্রত্যেক রবিবার গিয়ে পরীক্ষা দেওয়া। তার সাথে সাথে আগেরদিনের পরীক্ষার নম্বর পাওয়া। সেই ঝুলিতে বেশিরভাগ দিনই মাইনাসে নম্বর। সেই সব খাতা লুকিয়ে রাখা। গ্রেড শিট ব্যাগের কোণে ফেলে রাখা। রবিবার মানে যেন তখন লুকোচুপি।

ভাগ্যিস তারপর রবিবারগুলো আর টিউশন থাকত না। তখন সারা দুপুর লম্বা ভাতঘুম দিয়ে বিকেল চারটে বাজলে ডি ডি বাংলা চালিয়ে সাদা কালোতে উত্তম সুচিত্রা দেখার পালা। সুপারহিট মুকাব্লা দেখতাম। দেখতাম স্কুল ডেজ, কেন জানিনা শক্তিমান দেখার তেমনভাবে কখনোই ইচ্ছে হতনা। পরবর্তীকালে বাড়িতে যখন কেবিল এলো (আমার বি এস সি তে ভর্তির পর), তখন সারা দিন সাব টিভিতে তারক মেহতা কা উলটা চশমা দেখা। সে নেশা এখনো আছে। কলকাতায় থাকাকালীন এরপর রবিবারগুলো মোটামুটি একঘেয়েই কাটত। পরেরদিনের কোন হোমওয়ারক থাকে সেগুল শেষ করা, কলেজে মান্ডে টেস্ট থাকলে তার পড়া তৈরি করা।

চেন্নাই আসার পর, এই একটিমাত্র দিন যেদিন ছুটি। যখন ইচ্ছে ঘুম থেকে ওঠো, হোস্টেল জীবন। কেউ কিছু বলার নেই। আর তাই শনিবার অনেক রাত অবধি জেগে জেগে হয় গল্পের বই পড়তাম, নয় সিনেমা দেখতাম। তারপর কোনমতে নটায় ঘুম থেকে উঠে নীচে নেমে ব্রেকফাস্ট সেরে আবার আরেক প্রস্থ ঘুম। এখন তো তাও করিনা। যখন ঘুম ভাঙ্গার, ভাঙ্গে। ঘরে খুচখাচ খাবার রাখি। মেসেও যাইনা আদ্ধেক রবিবার। এখন রবিবার সকালগুলো কাটে বন্ধুদের সাথে স্কাইপ, বাড়িতে দু তিনবার ফোন আর এমনিই ল্যাধ খেয়ে।খুব কম দিন কাজের চাপ থাকলে খানিকক্ষণ ল্যাবেও যেতে হয়। নইলে সারাদিন এত ঝিমোই, গল্পের বইয়ের হয়তো চল্লিশ পাতাও পড়া হয়না। খুব পছন্দের কোন সিনেমা রিলিজ করলে সকাল সকাল সিনেমা হলে চলে যাই, দেখে আসি। নইলে কখনো বা ল্যাপটপে কোন প্রিয় সিরিজ (যেমন ফ্রেন্ডস) দেখি। বই পড়ি বা ফেসবুকে লোকজনের লেখালিখি যখন পড়ি, ব্যাকগ্রাউন্ডে রবীন্দ্রসঙ্গীত চলতেই থাকে। আসলে তাতে একটা বেশ বাড়ি বাড়ি ভাব আসে। খুব ইচ্ছে হলে দুপুরে কোথাও খেতে যাই। বিকেল হলেই কেমন একটা মন কেমনিয়া ভাব এসে যায়। সেটা কাটাতে মাঝে মাঝে হাঁটাহাঁটি করি। আমাদের ক্যাম্পাসটা খুব সুন্দর তো, বেশ লাগে। খুব কম বার, কিন্তু কিছু রবিবার কাছে পিঠে ঘুরতেও গিয়েছি।

এই তো এমনভাবেই রবিবারগুলো কেটে যায়। বিভিন্ন বয়সে বিভিন্ন জায়গায় রবিবার কাটানোর সরঞ্জাম পালটায় বটে। তবে কিছু মূল জিনিস এক থেকে যায়। ঘুম। আরাম। খাওয়াদাওয়া। কখনো কখনো কোন পেন্ডিং কাজ থাকলে সেগুলো সেরে ফেলা। সোশ্যালাইজ করা। তারপর আর কী, আবার পরের রবিবারের জন্য পথ চেয়ে বসে থাকা।

Saturday, March 3, 2018

ভালোবাসাবাসি ২

"আমি না তোকে খুব ভালোবাসি। তুইও কী বাসিস?" এক্সেল শিটে টাকাপয়সার হিসেব করতে বসে দোয়েলের প্রশ্নে একটু অবাকই হয়েছিল নীল। এ আবার কেমন প্রশ্ন, নীল আর দোয়েল তো সেই কোন ছোট্টবেলার বন্ধু, গলায় গলায় ভাব, "পারটনারস ইন ক্রাইম" গোছের। দোয়েল বরাবরই একটু গেছো ধরণের, অনেকটা কুছ কুছ হোতা হ্যায়তে প্রথমার্ধে কাজলের চরিত্রের মত। তার কাছ থেকে এমন প্রশ্ন শুনে, তাও হঠাৎই কলেজ ফেস্টের মিটিং করতে গিয়ে, একদম ভাবতেই পারেনি। একটু থতমত খেয়ে নীল বলেছিল, "এ আবার কী প্রশ্ন? বেস্ট ফ্রেন্ড না তুই আমার? তোকে তো ভালবাসবোই।" দোয়েল কিচ্ছু বলেনি, হাল্কা হেসে কোনরকমে সেদিনের মত কাজ শেষ করে চলে গিয়েছিল। এরপর ফেস্টের নানান কাজের ব্যস্ততার অছিলায় আর পরে ফাইনাল পরীক্ষা, কোচিং ক্লাস সব মিলিয়ে নীল আর দোয়েলের একসাথে তেমন ভাবে আর কিছুই করা হয়ে ওঠেনি। ক্যাটে ভালো রেজাল্ট করে দুজনেই এম বি এ পড়তে চলে গেল এদিক সেদিক, একজন শিলং, আরেকজন রাঁচি। যোগাযোগটা রয়ে গিয়েছিল কেবলমাত্র ফেসবুকেই।
পড়া শেষ, তারপর শুরু হল চাকরিজীবন। কপাল জোরে দুজনেই পোস্টিং পেলো চেন্নাইতে। মাঝে ঝিমিয়ে যাওয়া বন্ধুত্বটাও পেলো নতুন অক্সিজেন। সপ্তাহান্তে দেখাসাক্ষাৎ, সিনেমা, রেস্টুরেন্ট। কখনো বা লঙ উইকেন্ডে পন্ডিচেরি বা ইয়ারকাড। দিব্যি চলছিল।  তবুও কোথায় যেনসব আগের মত হয়েও যেন ঠিক তা না। দোয়েল এখন অনেক হিসেবি। হাসলে চোখের কোণে ভাঁজ পড়েনা, হাসতে হাসতে পেটে ব্যথাই করেনা। খুনসুটি তো ভুলেই গিয়েছে! নীলও ঘাঁটায় না। বন্ধুত্বের মধ্যে একটা ব্যর্থ প্রেমের প্রচেষ্টা এসে গেলে যেন কেমন তাল কাটা, বেসুরো হয়ে যায় গোটা ব্যাপারটাই। আগের মত সেই প্রাণখোলা ভাবটাই যে কোথায় হারিয়ে গিয়েছে।
কর্পোরেট জীবনে নিঃশ্বাস ফেলার জো নেই, দুজনের যোগাযোগও একটু কমেছে। প্রায় মাস খানেকের ওপর কথাবার্তা হয়নি দুজনের। হঠাৎ দোয়েলের ফোনে একটা ছোট্ট মেসেজ ঢুকল, "কেমন আছিস রে? আমি তো গত সাত দিন ধরে গৃহবন্দী। জ্বর।" দোয়েল অনেকদিন পর একটু ফুরসৎ পেয়ে ওর রঙের সরঞ্জাম নিয়ে সবে বসেছিল, বহু সপ্তাহ আগে এঁকে রাখা একটা ছবিতে রঙ বাকি। নীলের মেসেজ পেয়ে সব ফেলে কোনক্রমে চুলে চিরুনি চালিয়ে, হ্যান্ডব্যাগ আর ফোন সাথে নিয়ে দৌড়ে নীচে নেমে অটো ধরল। "আন্না, পেরাঙ্গুডি।"
ট্রাফিক জ্যাম পেরিয়ে যখন রাত্তির দশটা নাগাদ দোয়েল পৌঁছল নীলের বাড়ি, ভয়ে চিন্তায় ও তখন ঠকঠক করে কাঁপছে।  দুবার বেল বাজানোর পর দরজার ওপারে দেখল নীলকে। অবিন্যস্ত চুল, মুখে কদিনের না কাটা দাড়ি। কপালে হাত দিয়ে জোর ছ্যাঁকা খেয়ে "আগে জানাতে পারিসনি হতভাগা?" বলে নীলের বুকের ওপর মুখ গুঁজে ডুকরে কেঁদে উঠল দোয়েল।
"আচ্ছা, হয়েছে। ঠিক আছি আমি। তুই থাম এবার।"
"জ্বরে গা একেবারে পুড়ে যাচ্ছে। ওষুধ খেয়েছিস?"
"হুম, সবে। সময় লাগবে। ডাক্তার বলেছেন, চিন্তার কারন নেই। ভাইরাল।"
পরম যত্ন সহকারে এরপর দোয়েল নীলের কপালে জলপট্টি দিয়ে ওর জ্বরটা নামাল। আরাম পেয়ে নীলের দু চোখ জুড়ে এলো রাজ্যের ঘুম। ঘুমন্ত নীলের মুখে এক অপার শান্তির হাসি, পরম পরিতৃপ্তি। দোয়েল নীলের খাটের পাশেই বসে রাতটা কাটাবে ঠিক করল। কোন এক সময়ে ওর দু চোখেও নেমে এসেছিল ঘুম। ভোরের আলো ফুটতে চোখ মেলে উঠতে গিয়ে দোয়েল খেয়াল করল, নীল শক্ত করে ওর হাতটা নিজের মুঠোর ভিতর রেখেছে। ছাড়াতে গেলে টের পেল, পারছেনা। নীলের দিকে তাকাতে দেখল, ওর দিকেই তাকিয়ে আছে। মুখে সেই আগের মত দুষ্টু হাসি।
"কী রে, ছাড় হাতটা। উঠতে দে।"
"দেবো, আগে একটা কথার উত্তর দে?"
"কী?"
"তুই কী এখনো আমায় ভালোবাসিস?"
দোয়েলের মুখে নেমে আসে বিশাদের ছাপ। কিচু বলেনা উত্তরে।
"বল না প্লীজ?"
"নীল, অনেকগুলো বছর পার হয়ে গিয়েছে। এখনো?"
"আমি তো সেটাই জানতে চাইছি দোয়েল, এখনো?"
"যদি বলি না?"
"তাহলে ইমিডিয়েটলি বই লেখা শুরু করবো। দ্য বিগেস্ট রিগ্রেট ইন মাই লাইফ নাম দিয়ে।"  
"আর যদি বলি হ্যাঁ?"
"বলেই দেখ না!"
"বেশ, এবারের মত বই লেখা থেকে নিস্তার।"
"আমি একটা মস্ত বড় ইডিয়ট। গাধার মত চোখের সামনে থাকা হীরে ফেলে আমি নুড়ি পাথর কুড়োচ্ছিলাম এতদিন। অনেক হয়েছে, আর ছেড়ে যাস না আমায়। প্লীজ? থাকবি তো? আর হ্যাঁ, ক্ষমা করিস এ কবছরের জন্য। আমি একটা মর্কট।"
"হ্যাঁ, সে আর বলতে!"
"কী? আমি মর্কট?"
"ও মা তুই নিজেই তো এক্ষুনি বললি!"
..................

ওদের খুনসুটি, হাসি, পিলো ফাইটের তুলো সব মিলিয়ে তখন আকাশ বাতাস মুখরিত।  

Thursday, March 1, 2018

শুভ দোলযাত্রা

"গুড মর্নিং মাম্মাম।" সাত বছরের মিঠাইয়ের ডাকে ঘুম ভেঙ্গে গেলো তিতলির। হলো কী আজ?  যে মেয়েকে কিনা রোজ অন্তত আধ ঘণ্টা ধরে চেষ্টা করে ভুলিয়ে ভালিয়ে বিছানা ছাড়াতে হয়, সে আজ এত সকাল সকাল নিজেই উঠে পড়েছে।
"হ্যাঁ রে মিঠা, আজ এত সক্কাল সক্কাল উঠলি যে? আমি তো সোয়া পাঁচটার অ্যালার্ম দিয়েছিলাম। তুই তারও আগে উঠে পড়েছিস?" তিতলি একটু অবাক হয়েই মেয়েকে জিজ্ঞেস করল।
"মাম্মাম, তাড়াতাড়ি না উঠলে রেডি হবো কীভাবে? টাইম লাগবে তো। আমি ফুলের মালাটা ফ্রিজ থেকে বের করে নিয়েছি। আনটি কিন্তু বলে দিয়েছেন, দেরি করলে খুব বকবেন।"
ও, এই ব্যাপার। মেয়ের মধ্যে এই উৎসাহ দেখে এক ছুট্টে বছর তিরিশ আগে পৌঁছে গেল তিতলি। কোন এক দোলের ভোরে, ওও তো সাত সকালে উঠে মায়ের কাছে লাল পাড় হলুদ শাড়ি পরে, মাথায় রাঙা পলাশ লাগিয়ে নাচতে বেরিয়েছিল, "ওরে গৃহবাসী, খোল দ্বার খোল।" সুদূর ব্যাঙ্গালোরে বসে, মেয়েকে নাচের স্কুলের অনুষ্ঠানের জন্য তৈরি করতে গিয়ে আজ বারবার তিতলির মনে চলে যাচ্ছিল ওদের সেন্ট্রাল পার্কের বসন্তোৎসবে। কত গান, কত প্রভাতফেরী। কত আবির। কত আনন্দ।
আর সব শেষে সকলে মিলে "আজ খেলা ভাঙার খেলা"র তালে তালে নাচ। আজ হাফ ডে নিয়েছে তিতলি। মেয়ের মধ্যে দিয়েই দোলের আনন্দটুকু লুটেপুটে নিতে হবে যে।

Tuesday, February 27, 2018

টিয়ার মিশন

দূর দূর দূর। বেঁচে থেকে আর কী হবে? জীবনটার কোন মূল্যই রইলো না। একে তো ট্যুশানে ওইরকম ভাবে বেইজ্জত হতে হল স্যারের সামনে, কী না মেকানিক্সে দশের মধ্যে মাইনাস দুই এসছে টিয়ার। তার ওপর আবার মিলির সাথে ইনটু পিন্টু করতে দেখল ও শুভমকে। মরে যাই মরে যাই। ছিঃ। তাও আবার দেখাল কে না সন্ধ্যা, যাকে কিনা এমনিতেই দু চক্ষে দেখতে পারেনা টিয়া। প্রেস্টিজের এক্কেবারে গ্যামাক্সিন হয়ে গেলো। সন্ধ্যার নিশ্চয়ই এতক্ষণে দোয়েল, শিপ্রা সবাইকে ডেকে ডেকে বলা হয়ে গিয়েছে। কাল স্কুলে মুখ দেখানোর জো থাকবেনা। সরস্বতী পুজোয়, ভ্যালেন্টাইন্স ডে তে বড় মুখ করে যাদের টিয়া শুভমের সাথে ডেটে যাওয়ার গল্প বলেছিল (ওমা, গল্প কেন, সত্যি সত্যিই তো ওরা সিটি সেন্টার, এক্রোপোলিস গিয়েছিলও), তাদের কাছে ইতিমধ্যেই ও হাসির খোরাক হয়ে গিয়েছে। খেতে বসেও পাতে সেই বেগুন পোড়া (যাকে আবার মা পোশাকি নামে ডাকে, বেঙ্গন ভর্তা। দূর ব্যাঙ) আর আটার রুটি। কোথায় একটু ঝাল ঝাল ডিমের কষা বানাবে, তা না। বললেই বলবে,হুহ, আজ মঙ্গলবার। আজ নিরামিষ। এই এত মঙ্গল শনি শুক্র সোম করে কী হচ্ছে? কোন আখেরটা গুছিয়েছে মা? মিছিমিছি যত অত্যাচার সইতে হয় ওকে। এর একটা হেস্তনেস্ত করতেই হবে। আর এমন সহ্য করা যায়না। অনেক হল। ব্যস। বেঁচে থাকা যাবেনা।
কিন্তু টিয়া মরবে কী করে? মরতে চাইলেই মরা যায় নাকি? এ তো আর পিতামহ ভীষ্ম কেস না যে ইচ্ছামৃত্যু হবে। তবে? ব্লেডে হেবি ভয় টিয়ার। রক্তারক্তি কাণ্ড ওর দ্বারা হওয়ার না। গলায় ফাঁস টাঁস দিতেও পারবেনা, হাইটেও ভয়। বাড়ির ধারেকাছে রেল লাইন নেই যে মাথা পাতবে। বড় রাস্তায় মাঝ রাতে বড় বড় লড়ি যায়, তার সামনে ঝাঁপ মারাই যায়, কিন্তু বেরোবে কী করে? বাবা যে মেইন গেটের তালার চাবি নিজের কাছে নিয়ে ঘুমোয়। ভাল্লাগেনা, সবেতেই ফেল ফেল ফেল। এই জন্যই কেউ ওকে পাত্তা দেয়না।
ইউরেকা! ঘুমের ওষুধ খেলে তো শুনেছে মরা টরা যায়। ওই যে, হেমলক সোসাইটিতে কোয়েল মল্লিককে দেখাচ্ছিল না, মাঝ রাত্রে ওষুধের দোকান থেকে অতগুলো বড়ি কিনছে। তারপর ওই আনন্দ কর রুপী পরমব্রত এসে ওকে বাঁচালো (আহা, ওর জীবনের হিরোটাও ঠিকঠাক জুটল না গো। কী পোড়া কপাল। ইচ্ছে করে বেগুন পোড়ার চেয়ে একদিন ওর কপাল পোড়া খাওয়াবে সবাইকে। হুহ!)। বাড়িতে অনেক ঘুমের ওষুধ আছে। টিয়া জানে। ঠামের রোজ রাত্রে লাগে। বাবা তো এই গত পরশু গিয়ে চিত্ত ডাক্তারের কাছ থেকে মাসের ওষুধ নিয়ে এসছে। কপাল ভালো, ঠাম এবার বড় পিসির বাড়ি যাবে দু সপ্তাহর জন্য, তাই বাবা বোধহয় বেশিদিনেরই ওষুধ এনেছে, তাই তো আনার কথা ছিল যা শুনেছিল টিয়া। ব্যস, বুড়ি ওষুধ খেয়ে অঘোরে ঘুমবে। সেই ফাঁকে গিয়ে টেবিল থেকে বড়িগুলো আনলেই হবে। ততক্ষণে গুছিয়ে একটা সুইসাইড নোট লিখে ফেলতে হবে।
আচ্ছা, সুইসাইড নোটেরও কী ফরম্যাট আছে? মানে ফর্মাল না ইনফরমাল, কোন ফরম্যাটে লিখবে? রাইটিং প্যাড নিয়ে বসে এটাই প্রথমে মাথায় এলো। কে জানে, এসব তো আর স্কুলে শেখায়না। নিকুচি করেছে স্কুল। কোন ব্যাঙ্কে কে লোন নেবে, কার কারখানায় মিস্ত্রি লাগবে, সেই সব চিঠি শেখাবে। জীবনে কাজে লাগে এসব কারুর? ফালতু এসব না করিয়ে গুছিয়ে একটা সুইসাইড নোট লেখানো শেখাত, কাজে দিত। গোগোল মামাকে জিজ্ঞেস করলেই হয়, তিনি কি না ইংরেজির মাস্টার। কিন্তু মামা ঠিক মায়ের কানে তুলবেই কথাটা। তারপর মায়ের যে রণচণ্ডী মূর্তি হবে, সে আর বলতে? অগত্যা একটু অক্ষরের হেরফের। গোগোলের জায়গায় গুগুল, মামার জায়গায় ভায়া। গুগুল ভায়া কে জিজ্ঞেস করা। অনেক লেখাপড়া করে (এত তো টিয়া ট্রিগনোমেট্রির অঙ্কেও খাটেনা) লেখা শুরু করল ও।
প্রিয় মা
না না, প্রিয় আবার কী? শ্রীচরণেষু মা।
এই রে, ষ না শ? বানান ভুল করলে মা বলেছিল পিঠে চ্যালাকাঠ ভাঙবে। তার চেয়ে ডিয়ার মা লিখবে? হ্যাঁ, সেই ভালো।
ডিয়ার মা
তুমি যখন এই চিঠিটা পড়বে, ততক্ষণে আমি অনেক দূরে চলে গিয়েছি। জীবন মরণের সীমানা ছাড়িয়ে দূরে কোথায় যে আমি পৌঁছে গেছি, আমিও জানিনা। শুধু এইটুকুই বলার মা, বড্ড আক্ষেপ নিয়ে গেলাম আমি। আমায় কেউ ভালোবাসেনা। বন্ধুরাও তো আজকাল হ্যাটা করে আমায়। তুমিই বা কম যাও নাকি? কবে থেকে একটু বলছি চাউমিন দিতে টিফিনে, দিয়ে যাচ্ছ ওই ব্রেড জ্যাম নয় ব্রেড মারজারিন। বাটার দিলেও নয় বুঝতাম। যাক গে। পরে কখনো কোথাও কোন জন্মে নিশ্চয়ই আবার দেখা হবে। ভালো থেকো তোমরা।
যাই। ও সরি, আসি। আবার তো নইলে সেটা নিয়েও বকবে, "যাওন নাই, আসো গিয়া।' উফফ।
ইতি
তোমার টিয়া।
ভেবে ভেবে লিখতে লিখতে এগারোটা বেজে গেল। টিভিতে "রাঙিয়ে দিয়ে যাও"ও শেষ। এবার বন্ধ করে সবাই ঘুমোতে যাবে। টিয়া জলদি জলদি নিজের ঘরের আলো নিভিয়ে দিয়ে " মা শুতে গেলাম। গুড নাইট" বলে মশারির মধ্যে ঢুকে গেল। বড় ঘড়িতে শুনলও বারোটার বারোটা ঢং ঢং। সাড়া বাড়ি নিঃশব্দ, শান্ত। খালি পায়ে চুপি চুপি টিয়া গেল ঠাকুমার ঘরে। রাস্তার আলোয় টেবিলটা ভালো করেই দেখা যায়। পেলও ওষুধের কৌটোটা। হ্যাঁ, ক্যালি ফস। দেখে নিলো ঠিক করে নাম। আশে পাশে এত একই দেখতে শিশি। হ্যাঁ, এটাই খায় ঠাম। আর পায় কে ওকে! ঘরে এসে, কাঁদো কাঁদো চোখে নাক ফোঁসফোঁস করতে করতে এক গ্লাস জল দিয়ে পুরো বোতলটা শেষ করে দিয়ে শুয়ে পড়ল। ব্যস, আর খানিকক্ষণ। এরপরেই এক গভীর শান্তি ওকে ঢেকে ফেলবে। আর কোন ঝুটঝামেলা, কূটকাচালি, ঝগড়াঝাঁটি কিচ্ছু ওকে ভাবাবে না, ঘাঁটাবে না। শান্তির চিরনিদ্রায় মগ্ন হবে টিয়া। ঘুমে চোখ জুড়িয়ে আসছে। আহ, কী আরাম। আহা।
"এই টিয়া, উঠেছিস?
সকাল সাতটা বেজে গেলো, এখনো উঠিসনি কী রে? স্কুল টুল যেতে হবে না নাকি? উঠে আয় এদিকে। ঠামের ঘরে যা। কী ওষুধ খুঁজে পাচ্ছেনা বলছে। দেখ গে। আমি আর পারিনা। ধুর বাবা। কতদিক সামলাবো। মরণ দশা যত।"
যাচ্চলে। সেই ঘুম ভাঙল? মানে এই মরার অভিযানেও ফেল? চিত্ত ডাক্তার কী ভুলভাল ওষুধ দেয় যে ওতে মানুষ মরেওনা (আহা টিয়া কি আর জানে নাকি কে অতগুলো হোমিওপ্যাথি ওষুধ খেলে শুধু ঘুমটাই ভালো হবে, আর কিছু না?)? ধুর ধুর। কিসসু হলো না জীবনে। ধুস। তাড়াতাড়ি উঠে ডায়েরির নীচে চাপা দেওয়া চিঠিটা তুলে কুচি কুচি করে ছিঁড়ল টিয়া, ডাস্টবিনে ফেলা যাবেনা। বাই চান্স মা জননীর চোখে পড়লেই শেষ। পাতা নষ্ট করার জন্য আরেক প্রস্থ বকুনি। এর চেয়ে স্কুলে গিয়ে ফেলবে। এই ভেবে ব্যাগের ভিতরের চেনে পুড়ল কুচিগুলো।

আবার একটা দিন। আবার এক প্রস্থ মন খারাপ। বন্ধুদের টিটকিরি। ম্যাডামের বকা (অঙ্কগুলো শেষ হয়নি তো। ভেবেছিল আর ঘুম ভাঙবেনা, তাই করেওনি। সেই সময়ে বসে ফন্দী আঁটছিল, তাও আবার ফেল।), পি এন পি সি, দলাদলি।কবে যে এসব থেকে মুক্তি পাবে টিয়া। কবে বড় হবে।
যাক, আপাতত আগে ঠামের ওদিকে দেখুক ও। ওষুধের শিশিটা মনে করে ফেলল না রে টিয়া, এ বাবা। মা যেই আসবে, দেখবে। ন্যস।
সুপার ডুপার ফেল হল যে টিয়ার মিশন!!!

Saturday, February 24, 2018

তিতিরের গল্প



১।

"মা তোমার জন্য দাসী আনতে যাচ্ছি।" ঠিক এই কথাটাই বলে বুবুন বেরিয়েছিল বিয়ে করতে। কতটা মজার ছলে, কতটা পুরনো রীতি রেওয়াজ মেনে, তা ভাববার তখন সময় পাননি মানসী। শুধু হেসে বুবুনের মাথার টোপরটা ঠিক করতে গিয়ে বলেছিলেন, "ধুর, ওইসব বলতে নেই। তিতির তো আমার আদরের রাজকন্যে। তুই বল বরং, তোমার জন্য মেয়ে আনছি।" "এই দাদা, বৌদিভাই কে আবার কাকিমণি নিজের মেয়ে বলছে রে। খেয়েছে, তোরা ভাই বোন হবি নাকি?" মাঝখান থেকে ফুট কেটেছিল তুলতুল, বুবুনের জেঠতুতো বোন, যে নিজে ঘোরতর সংসারী। বুবুন কিছু উত্তর দেয়নি, হেসেছিল শুধু। ততক্ষণে যে বিয়ের লগ্ন এসে যাচ্ছে বলে তাড়া পড়ছিল জ্যাঠা কাকাদের দিক থেকে।


২।

বুবুন, তিতির আর স্বামী প্রমথেশকেকে নিয়ে মানসীর ভরা সংসার। সক্কাল থেকে সেখানে ব্যস্ততা শুরু। মানসীর স্কুল, প্রমথেশের চেম্বার, বুবুনের অফিস বেরোনোর তাড়া। আগে মানসীর ওপর সকালটা ভীষণ চাপ পড়ত, তিতির আসায় অনেকটাই যেন সুরাহা হয়েছে। বুবুনের বিয়ের আজ দেখতে দেখতে আট মাস হতে চলল। এই আট মাসে নিয়ম করে প্রতিদিন হাসি মুখে বাড়ির সব কাজ সামলে দিয়েছে তিতির। সকাল হতে না হতেই চা, তারপর টেবিলে জলখাবার পরিবেশন করা, তিনজনের মুখরোচক টিফিন প্যাক করে দেওয়া, ঠিকে লোকের ওপর তদারকি করা, এইসব কাজ নিয়ে আর মানসীকে মাথা ঘামাতেই হয়না। মানসী একটু ধীরেসুস্থে স্কুল যেতে পারে, শাড়ির প্লিটটা ঠিকঠাক ভাবে পড়ে, চুলের খোঁপাটা সাজানো হয়। ম্যাচিং ক্লিপ আর কানের দুলও ড্রেসিং টেবিল থেকে সহজেই বেরিয়ে পড়ে। সেদিন তো ওঁর বহু পুরনো কলিগ, হিস্ট্রির দিদিমণি, শিপ্রাদি মন্তব্যও করেই দিলেন, " বাবা মানসী, তুই তো আজকাল বেশ ঝাড়া হাত পা হয়ে গিয়েছিস মনে হচ্ছে। দিব্যি সেজেগুজে গুছিয়ে আসছিস। ব্যাপার কী? বৌমার সাথে কম্পিটিশন নাকি? কে কত সুন্দরী?"

" ধুর শিপ্রাদি, কী যে বলো না। মেয়ে আমার অনেক ফিটফাট। আমি সাত বুড়ির এক বুড়ি হতে গেলাম গিয়ে। ওর সাথে কীসের কম্পিটিশন। আসলে আজকাল সকালে আমার কাজ থাকেনা। তিতির পুরোটা সামলে দেয় যে। তাই সময় পাই একটু। তিরিশটা বছর ধরে তো সংসারের ঘানি টেনে গেলাম। এবার মেয়ে এসে গিয়েছে, নিশ্চিন্ত আমি। পুরো রেস্ট। নিজের মত করে উপভোগ করবো বাকি দিন কটা।"

"বেশ তো। কিন্তু হ্যাঁ, পুরো লাগাম ছাড়িস না কিন্তু। দিনের শেষে সংসারের আসল মালকিন কিন্তু তুইই। মাথায় রাখিস মানসী।" শিপ্রা তাঁর অভিজ্ঞ মতামত জানান মানসীকে। মানসী মুখে কিছু বলেন না, হাসেন।

বিকেলবেলা তিতির চায়ের কাপ হাতে মানসীর ঘরে ঢুকতে তিনি বলেন, " তিতির, আজ কী রাঁধতে দিচ্ছিস রে কমলাকে?"

" মা, আজ একটু পালং শাক করাবো ভাবছি। অনেকদিন খাওয়া হয়নি, খুব প্রিয় তো। আমাদের বাড়িতে ঠাকুমা একটা ঘণ্ট বানায়, ওটা দারুণ লাগে। আর বাজারে ভালো শাক দেখলাম। তাই। সাথে ওই পেঁয়াজ ফোড়ন দিয়ে মুসুর ডাল আর আমুদি মাছের ঝাল। ভাতটা আমি পরে করে নেবো, নইলে ঠাণ্ডা হয়ে যাবে। "

" পালং শাক? আমরা কেউ ভালোবাসি না। ঠিক আছে, শাক কেটে রেখেছিস যখন ঠিক আছে। আজকে করা। কিন্তু এরপর থেকে জেনে নিবি সকালে আমার কাছে। সবে তো ক'মাস এসছিস। এখনো সবার পছন্দ অপছন্দ জানিস না। আস্তে আস্তে সব শিখে যাবি, জেনে নিবি। তখন আর আমায় জিজ্ঞেস করতে লাগবে না। ঠিক আছে? আর হ্যাঁ মা শোন, বুবুন শাক খাবেনা। ওকে দুটো বেগুন ভেজে দিস। বা এক কাজ কর, তোদের ভাজতে হবেনা। চিনি মাখিয়ে রাখিস, আমি ভেজে দেবো। আমার হাতের রান্না বড় ভালোবাসে ছেলেটা।"

" ঠিক আছে মা।" এইটুকু বলে তিতির ধীর পায়ে বেরিয়ে যায় মানসীর ঘর থেকে।


৩।


মাস চারেক কেটে গিয়েছে আরো এরপরে। মানসীর সংসার যেমন চলছিল, তেমনই চলছে। একদিন দুপুরবেলা খেয়ে উঠে তিতির ফেসবুক খুলে বসেছে, তাও অনেকদিন পর। স্বাভাবিকভাবেই প্রচুর নোটিফিকেশন বন্ধুদের থেকে। "কী, বিয়ে করে আমাদের ভুলেই গেলি?" "সারাক্ষণ ওই বর বর করলেই হবে?" "খালি বরের সাথেই ঘুরবি? আমাদের সাথে দেখাসাক্ষাৎ কি আর হবে না রে?" ইত্যাদি ইত্যাদি। একে একে সকলের প্রশ্নের উত্তর দিলো তিতির। "না না, আসলে কাজের ফাঁকে সময় হয়না তেমন। সকাল থেকে একটার পর একটা লেগেই থাকে। দুপুরে একটু লেখালিখি। আর গান শোনা, একটু গুনগুন করা। বিকেল হতেই আবার সবাই বাড়ি আসলে একটু রান্নাঘরে টুকটাক কাজ। আর কী, এইভাবেই দিন কেটে যায়। সময় হয়না রে তেমন ভাবে আর।"

"তুই ওইই করে যা। হেঁসেল ঠ্যাল। সবে পঁচিশ। এর মধ্যেই কেউ বিয়ে করে? এম ফিল করে বাড়ি বসে আছিস। মেয়েদের চাকরির যুগ এটা তিতির। এত প্রস্পেক্টিভ একটা কেরিয়ার, জলাঞ্জলি দিলি শুধুমাত্র নিজের জেদে।" প্রাণের বান্ধবী শ্রেয়া লিখল। শ্রেয়া এখন পি এইচ ডি করছে, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে। কম্প্যারেটিভ লিটারেচারে। ওর প্রোফাইল ভর্তি শুধুই আনন্দের টুকরো টুকরো ছবি। লেকচার, সেমিনার, পেপার পাবলিশ, ঘুরে বেড়ানো। বেশ আছে কিন্তু।

নাহ, একটু আরামের জীবন তো তিতির নিজেই চেয়েছিল। আর তাই জন্যই তো কল্যাণীতে অমন ভালো অফার পেয়েও নিলো না। এখন অন্যদের জীবন দেখে আক্ষেপ করবে না ও।


৪।


দিন কেটে যায় আপন লয়ে। তিতিরের জীবনে তেমন কোন স্রোত আসেনা। সপ্তাহান্তে সিনেমা, মাঝে মাঝে একটু আধটু শপিং, মাঝে মাঝে বাপের বাড়ি। এই নিয়েই কেটে যায় দিন। প্রথম বিবাহবার্ষিকীতে ধুমধাম করে সেলিব্রেশন, ন্যু জিল্যান্ড বেড়াতে যাওয়ার সারপ্রাইজ এসব অবশ্য ওকে মাঝে ফেসবুকে কয়েক মাসের রসদ দিয়েছিল। এরপর আবার সেই থোড় বড়ি খাড়ার জীবন ফিরে আসে তিতিরের। মানসী এতদিনে স্কুলে হেডমিস্ট্রেস হয়েছেন, দায়িত্ব বেড়েছে। আরো পরে বাড়ি ফেরেন। কিন্তু সংসারের চাবি এখনো শিপ্রার পরামর্শে ওঁরই হাতে এখনো। এই করতে করতে বিয়ের দু বছর এসে যায় দেখতে দেখতে।

" তিতির মা, এবার কিন্তু তোরা ফ্যামিলি প্ল্যানিং নিয়ে ভাবনা চিন্তা শুরু করতে পারিস।"

"হ্যাঁ রে তিতির। তোর আর জামাইয়ের কী কোন ইচ্ছেই নেই আমাদের নাতি নাতনির মুখ দেখানোর?"

" কী রে, বিয়ের খাওয়া অনেকদিন আগে তো খেলাম, এবার অন্নপ্রাশনের ব্যবস্থাটা কর, না কি?"

"বৌদিভাই, তোমরা কি সেই ভাই বোনই রয়ে গেলে নাকি? তখন কাকিমণিকে বলেছিলাম। মেয়ে আনতে যাচ্ছি বলিয়ো না দাদাকে দিয়ে। এখন বোঝো! আরে বাবা, ভাইয়ের বিয়েতে একটা নিতবর তো চাই, নাকি?"

সাতজনের সতেরো কথা শুনতে হয় মুখ বুজে তিতিরকে। বুবুনকে বললে, পাত্তাও দেয়না। "শোনো, এখন কেরিয়ারের এমন একটা জায়গায় আমি দাঁড়িয়ে, আমার পক্ষে এইসব ক্রাইসিস হ্যান্ডল করা সম্ভব না। তাছাড়া আমরা এখনো তিরিশ পেরিয়ে যাইনি। অনেক সময় আছে হাতে। এত তাড়া কী?" এই হল ওর নিয়মমাফিক উত্তর। এরপর তিতির সেই রোজ এক কথা বলে, " আসলে সবাই বলছিল খুব। আমারও এখন মনে হয়। সারাদিন বাড়িতে বসে থাকি। অখণ্ড অবসর। বাচ্চা মানুষ করার জন্য প্রশস্ত সময় ও পরিস্থিতি এটা।"

"সারাদিন বাড়ি বসে আছোই বা কেন বলতো? চাকরি করো না। এখনো বেশ সরকারী চাকরিগুলোতে ট্রাই করলে পেয়ে যাবে। বয়স আছে। তোমার বিদ্যে বুদ্ধি আছে। বাড়ি বসে বসে বোর হচ্ছোই বা কেন?"

"না মানে চিরকাল দেখে এলাম মা কাকি মাসিদের। চাকরি করতে করতে জমিয়ে সংসার করতে পারলনা। সারাক্ষণ একটা গিল্ট ফিলিং চলত। এই বুঝি সংসারে নজর দিলনা। আমরা ঠিক মত বড় হচ্ছিনা। আমি চাইনি এই জীবন। তাই জন্যই তো বাড়িতে বসে গুছিয়ে সংসার করবো প্ল্যান করেছিলাম।"

"তাহলে সংসার করো। এত আবদার কেন তাহলে? স্বেচ্ছায় বাড়িতে থাকার ব্যবস্থা করেছো। এখন তাহলে বোর হচ্ছি বলো না। তাছাড়া একটা বোরডম কাটানোর জন্য কেউ বাচ্চা আনে নাকি? পাগল হয়েছ? সিঙ্গল ইনকামে বাচ্চা মানুষ করা মনের মত করে, এই মুহূর্তে হবেনা বস, তুমি অপেক্ষা করো বছর দুই আরো।"

এরপর আর তিতিরের কিছুই বলার থাকেনা। বসার ঘরে সোফায় বসে চুপ করে দু চোখ বন্ধ করে থাকে। নিজের সাথে তখন এই চেয়ার, টেবিল, রান্নাঘরের মাইক্রোওয়েভ আভেন, ফুড প্রসেসার আর ডিশ ওয়াশারের সাথে কোন পার্থক্যই বের করতে পারেনা। গাল বেয়ে বড় বড় ফোঁটা চোখের জলের জল পড়তে থাকে।

" তিতির, নটা বেজে গেলো যে। ভাতটা হয়েছে? ডাল তরকারি গরম করবি না?"

" হ্যাঁ, করছি মা।" ব্যস, কান্নারও বুঝি সময় হয়না। তোলা থাকে পরেরদিন একলা দুপুরের জন্য, জানলার গ্রিল আকড়ে।


৫।


আরো কিছু মাস কেটে যায়। সবে ফেব্রুয়ারির শেষের দিক। বাজার থেকে আজ তিতির অনেকটা কুল কিনে এনেছে। গতকাল টিভিতে কুলের আচার রান্না শেখাচ্ছিল। দেখতে দেখতে এক ছুট্টে বছর পনেরো আগের স্কুলের দিনগুলি মনে পড়ে যায় তিতিরের। স্কুল ছুটির পর গেটের বাইরে আচার কাকুর থেকে দুটাকা দিয়ে আমসি, কুলের আচার খাওয়ার নিষিদ্ধ আনন্দগুলি কোথায় হারিয়ে গিয়েছে, যেন তেপান্তরের মাঠ পেরিয়ে, অন্য এক জগতে। রেসিপি অনুযায়ী কড়াইয়ে সবে একটু ফোড়ন দিয়েছে, ওমনি কলিং বেলের আওয়াজ পেল। এই ভর দুপুরে আবার কে আসলও, ভাবতে ভাবতে গ্যাস বন্ধ করে তিতির এগিয়ে এলো। আইহোল দিয়ে দেখল, পাশের ফ্ল্যাটে পিজি থাকা মেয়ে, সুভদ্রা।

দরজা খুলতেই, "বৌদি, তোমার কাছে একটু ধনেপাতা হবে গো? রান্না করতে করতে দেখলাম শেষ।"

" হ্যাঁ, দিচ্ছি। তুই ভিতরে এসে বস।"

খানিকক্ষণের মধ্যেই ফ্রিজ থেকে এক আঁটি ধনেপাতা হাতে নিয়ে তিতির বসার ঘরে আসতে দেখল সুভদ্রা ওর খুলে রাখা ডায়েরিটা পড়ছে।

" এই নে। আর কিছু লাগবে? কী রাঁধছিস রে?"

" থ্যাঙ্ক ইয়ু বৌদি। ওই একটু আলুর দম করছিলাম। সরি, ডায়েরিটা তোমার পারমিশান না নিয়ে উলটে পালটে দেখলাম বলে। আচ্ছা, এগুলো তোমারই লেখা তো সব?"

" হ্যাঁ রে। ওই একটু খুচখাচ যখন যা মনে আসে, কয়েক লাইন লিখে রাখি হিজিবিজি।"

" হিজিবিজি কী বলছ গো? কী গভীর চিন্তাভাবনাগুলো। আই আম সো স্পেলবাউন্ড।"

" ধ্যাত পাগল মেয়ে। তোর মনে হয় আজকাল বই পড়া কম হচ্ছে। লাইব্রেরী যা বরং। তখন এইসব হেঁজিপেঁজি লেখা পড়ার ইচ্ছেও করবেনা।"

" না বৌদি। সত্যি বলছি। পাবলিশিং হাউজে ইন্টার্নশিপ করেছি। একটু আধটু ধারণা আমারও আছে। প্লীজ চর্চা চালিয়ে যাও।"

" তুই না। পারিসও। যা রান্না কর। আমিও রান্নাঘরে যাই। আচার বানাচ্ছিলাম"

" কীসের আচার গো?"

" কুল। তুই ভালবাসিস?"

" প্রচণ্ড।"

" ঠিক আছে। আমি পাঠাবো তোকে।"

সুভদ্রা যেতে দরজা বন্ধ করে তিতির আবার রান্নাঘরে ফিরল। দশ পনেরো মিনিটও হয়নি, আবার বেল বাজল। আইহোল দিয়ে দেখল, সেই সুভদ্রা। দরজা খুলে, "আয় বস। আমি গ্যাসটা কমিয়ে আসছি।"

" না না, সময় লাগবে। আমি আসছি তোমার সাথে রান্নাঘরে। চলো।"

" আচ্ছা, আয়। বল।"

" শোনো বৌদি আমি এক্ষুনি আমার এক্স বসের সাথে কথা বলছিলাম। খুবই কাকতালীয় ব্যাপারটা। আমায় কল করেছিলেন উনিই। তা ওরা এখন কিছু নবীন লেখকদের লেখা নিয়ে একটা সঙ্কলন বানাতে চায়। আমায় জিজ্ঞেস করছিল কেউ আছে কি না চেনা জানা। তোমার কথা বলেছি।"

" এই তুই কি পাগল হলি না কি?"

" পাগলের কিচ্ছু না বৌদি। শোনো মন দিয়ে কী করতে হবে।"

" উফ। ভর দুপুরে এসছে মেয়ে যত বাজে বকতে। যা কাজ কর। ওসব শুনে আমার কোন কাজ নেই।"

" প্লীজ!"

" না, কোন প্লীজ টিজ না।"

" ভাল্লাগেনা। তোমার আচার বানাতে আর কতক্ষণ? টেস্ট করবো। খুব ভালো গন্ধ বেরোচ্ছে।"

" আরো মিনিট কুড়ি।"

" আচ্ছা, আমি বসবার ঘরে বসছি গিয়ে। এখানে খুব গরম। কী করে যে সারাক্ষণ এই গরমে দাঁড়িয়ে কাজ করো।"

" অভ্যেস রে বাবু, সব অভ্যেস। আচ্ছা তুই বস গিয়ে। আমি রেডি করে আনছি আচার।"

সেদিন সুভদ্রাকে আচার খাইয়ে তারপর বিদায় করে দরজা দিল তিতির। টেবিল থেকে কবিতার খাতাটা তুলে নিজের আলমারিতে রাখল। এরকম ফেলে ছড়িয়ে রাখা ঠিক না। যত উটকো খামখেয়ালিপনা মেয়েটার। ভাবলেও হাসি পায় তিতিরের।



৬।


দিন দশেক পর এরকমই এক দুপুরে তিতিরের মোবাইলে একটা ফোন এলো, অচেনা নম্বর। ট্রুকলারে নাম উঠল সাহানা চক্রবর্তী। কার ফোন, নির্ঘাত রঙ নাম্বার। এই ভেবে প্রথমবার ফোনটা ধরল না ও। কিন্তু ওপর দিক থেকে যিনি কল করছেন, তিনি যে নাছোড়বান্দা। পরপর তিনবার ফোন বাজতে বাজতে কেটে যাওয়ার পর তিতির একটু কৌতূহলবশত নিজেই রিং ব্যাক করল।

" হ্যালো। আমি এই নাম্বার থেকে অনেকগুলো মিসড কল পেলাম। আসলে ব্যস্ত ছিলাম। আপনি কে বলছেন?"

" আমি সাহানা চক্রবর্তী। আঁকিবুঁকি ম্যাগাজিনের এডিটর। আপনি তিতির ঘোষ তো?"

" হ্যাঁ। কিন্তু আপনাকে তো ঠিক..."

" হ্যাঁ, না চেনারই কথা। আঁকিবুঁকি এমন কিছু বড় ব্যাপার না। সবে ফেসবুকের গণ্ডী পেরিয়ে প্রিন্টে এসছে এই কিছু মাস হল।"

" আচ্ছা। বলুন।"

" আপনার কিছু লেখা আমি সুভদ্রার থেকে পাই। সেগুলি খুব পছন্দ হয়েছে। সেখান থেকে তিনটে কবিতা বাছাই করেছি। আমাদের ম্যাগাজিনের পরবর্তী সংখ্যায় ছাপতে চাই। আপনার থেকে যেহেতু সুভদ্রা চুরি করে লেখাগুলো আমায় দিয়েছে, তাই ছাপবার আগে আপনার পারমিশান নেওয়াটা উচিত বলেই ফোন করলাম।"

তিতির চুপ। কী বলবে, ভেবে পায়না।

" হ্যালো? তিতির? শুনতে পাচ্ছেন?"

" হ্যাঁ হ্যাঁ। বলুন। আসলে আমি খুব অবাক হয়ে গিয়েছি। তাই।"

" হুম, বুঝতে পারছই। সুভদ্রা আমায় সব বলেছে। আপনি খুবই হেজিটেট করছিলেন লেখা দেওয়া নিয়ে। আর তাই ওকে বাধ্য হয়ে আপনার ডায়েরি থেকে লেখাগুলোর ছবি তুলে আমায় পাঠাতে হল। ভাগ্যিস করেছিলও ও, নইলে অনেক রত্ন মিস হয়ে যেত আমাদের।"

" আমি সত্যি বুঝছিনা কীভাবে রিএক্ট করবো। সত্যি আমার কাছে এটা একটা বিরাট পাওনা, কখনো সিরিয়াসলি কিছু ভেবে তো লিখিনা। যখন যেমন মনে হয়, লিখি। রান্না করতে করতে, গাছগুলোতে জল দিতে দিতে কিছু মনে এলে ডায়েরির পাতায় লিখে রাখি। সেগুলো যে আপনাদের এত পছন্দ হয়ে যাবে, এটা আমার একটা পরম প্রাপ্তি। আপনি নিশ্চয়ই আমার লেখা ছাপবেন। আমি কৃতজ্ঞ। ধন্য।"




৭।


আজ তিতিরের চতুর্থ বিবাহবার্ষিকী। সন্ধ্যেবেলা থাকবে বাড়ি ভর্তি লোক। আবার একই সাথে ওর সাধভক্ষণ অনুষ্ঠানও। কিন্তু সেসব তো দুপুর আর বিকেলের ব্যাপার। তার আগে এখন ওকে ছুটতে হচ্ছে ওর "বুক রিলিজ" অনুষ্ঠানে। এটা তিতিরের প্রথম কবিতার বই। ইতিমধ্যে ফেসবুকীয় সাহিত্য জগতে বড় নাম করেছে ও। তবুও, "ইশশ্রী" নিয়ে ওর খুব টেনশন, নারভাসনেস। মানসী আর সুভদ্রা সমানে ওকে সাহস জুগিয়ে যাচ্ছে। সব সময়ের মতোই। মানসী আজ তিতিরের গর্বিত মা। তিতির পারবেই। ইশশ্রী ওকে সেই প্রতিষ্ঠা এনে দেবেই যা ওর প্রাপ্য।







Thursday, February 22, 2018

দুহিতা

"জি এম!"
প্রতিদিন তিতিরের ঘুম ভাঙ্গে বাবার থেকে আসা এই মেসেজে। সকাল সাড়ে ছটার এলারম বাজার সাথে সাথেই ঘুম চোখে ফোন হাতে নিয়ে বাবার সুপ্রভাতের উত্তর লিখে তবেই দিন শুরু হয় ওর। বাবা কাছে থাকলে বাবার ডাকে ঘুম ভাঙ্গে। বড় আদুরে ও বাবার।  দীর্ঘ আট বছর তিতির কলকাতার বাইরে থেকেছে। প্রথমে লেখাপড়ার সূত্রে পুণায়, তারপর চাকরি সূত্রে বম্বে, মাদ্রাজ হয়ে অবশেষে এখন ব্যাঙ্গালোরে থিতু। বছরে দু তিনবার বাড়ি আসে তিতির, আর বাবা মা ওর কাছে যান দুবার। প্রতিবারই বিচ্ছেদের সময়ে চলে প্রবল কান্নাকাটি। "ধুর পাগল, এত বছর হয়ে গেলো, তাও এয়ারপোর্টে দাঁড়িয়ে কাঁদার শেষ নেই তোর। তুই কাঁদলে আমার খুব খারাপ লাগে। মন কেমন করে। কতবার বলেছি, কলকাতায় চাকরি দেখ। সেইবেলা শুনবি না।" বাবার কাছে মৃদু বকুনি খেয়েও অভ্যেস পালটায় না।
এইবারের আসাটা একটু আলাদা। আজ যে শেষবারের মত আইবুড়ো তিতির বাবার কাছ থেকে সুপ্রভাত শুনল।

আজ ওর বিয়ে। বাড়ি ভর্তি আত্মীয়স্বজন। ভোরবেলা মা মাসিরা বিয়ের নিয়ম কানুন মানা শুরু করবে বলে ওকে উঠিয়ে দিয়েছে। একটু যে বাবার কাছে শুয়ে, কাছে ঘেঁষে আদর খাবে, তার উপায় নেই। সুপ্রতীকের সাথে তিতিরের বিয়ে ঠিক হয়েছে প্রায় এক বছর আগে। এই এক বছরে ভালমতোই আলাপ পরিচয় হয়েছে দুজনের, তাও কেন জানিনা তিতিরের খুব মন খারাপ। হয়তো বাবা মা কে ছেড়ে চলে যেতে হবে বলে, কে জানে।
বৃদ্ধির পুজোয় বসে বাবারও বেশ মন খারাপ। চোখের সামনে নিজের ছোট্ট মেয়েটাকে আজ কনের সাজে বুকের কাছে কিছু একটা ধাক্কা দিয়ে যাচ্ছে। যে মেয়েটা রান্নাবাটি খেলত এই তো সেদিন, আজ নাকি সে নিজের একটা সংসার স্থাপন করতে চলেছে। চোখ বন্ধ করলে পরিষ্কার দেখতে পান বাবা, আজকের মতোই মাথায় টোপর লাগিয়ে লাল শাড়ী পরে কনের সাজে পুতুলের মত ছোট্ট তিতির, মামার কোলে বসে প্রথম ভাত খাচ্ছে। কী খেতে না ভালোবাসে তিতির, সেই ওইটুকু বয়স থেকেই। পায়েসের চামচটা কিছুতেই ছাড়তে চাইছিল না। আজ দেখো, বেচারি উপোস করে বসে আছে।

আরেকটু বড় হল তিতির। নামী ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে ভর্তি হল। নীল ফ্রক পরে প্রথম স্কুল যাচ্ছে, টলমল করতে করতে। কলকল করে সে কত কথা মেয়েটার বাড়ি এসে। স্কুলে পেরেন্টস কল। কেন? লাস্ট পিরিয়ডে বসে নাকি তিতিরের খুব কান্নাকাটি, রোজ। সে কিছুতেই ক্রেশে যাবেনা, বাড়িই আস্তে হবে। এদিকে দেখো, কীরকম আট বছর বাড়ির বাইরে রইলো। মা বাবাকে ছাড়া যে মেয়ে ঘুমোতে পারত না, দিব্যি মানিয়ে নিয়েছে। আজ আবার রাঙ্গা চেলীতে লাল টুক্টুক কনে বৌ সেজে চুপচাপ বসে আছে।

বাবা জানেন যে এই নতুন জীবনেও তিতির ভালো থাকবে। তবু, বাবার মন। মেয়েকে সম্প্রদান করতে বসে চোখের কোণে জল ভরে আসছিল। তিতিরও থম মেরে বসে রইল। পরেরদিন সন্ধ্যেবেলা যখন তিতির আর সুপ্রতীক সবার আশীর্বাদ নিচ্ছে যাওয়ার আগে, তিতিরের চোখের জলও যেন বাধ মানছে না। সাথে বাবারও। কেন যে এমন নিয়মগুলো হয়। তিতির যাওয়ার আগে বাবার কানে বলে গেল, " কাঁদছ কেন বাবা? আমি তো বিয়ে করতে চাইনি। তুমিই তাড়া দিলে।"
" তুই এগুলো এখন বুঝবি না রে। নিজে মা হ, তখন সব বুঝবি।"
 "ভালো থেকো বাবা। সময় মেনে ওষুধগুলো খেয়ো। মা কে দেখো। জল না ঘাঁটে যেন। এমনিতেই খালি যা সর্দিকাশিতে ভোগে।" আরো কিছু বোধহয় বলতে যাচ্ছিল ও, কান্নায় আর শেষ করতে পারল না। সুপ্রতীকের হাত ধরে "কনকাঞ্জলি"র মাধ্যমে মায়ের ঋণ শোধ করে তখন ওর যাওয়ার পালা, "নিজের বাড়ি"তে।