Saturday, August 4, 2018

আম্রিকা দর্শন: পর্ব ৩



ক্যাবের থেকে লাগেজ নামিয়ে কোনক্রমে তো এয়ারপোর্টে ঢুকলাম। পাঁচ বছরের ডোমেস্টিকে ট্র্যাভেল করার ভিত্তিতে জানি মূলত তিনটি স্টেপ রয়েছে। ১। প্রথমেই চেক-ইন লাগেজ স্ক্যান করাও। ২। বোর্ডিং পাস নাও। ৩। নিজের সিকিউরিটি চেক করাও (সাথে কেবিন লাগেজ থাকলে, সেটিও)। ইন্টারন্যাশনালের ক্ষেত্রে জানি এক্সট্রা একটা পয়েন্টঃ ইমিগ্রেশন। আমার বান্ধবী মধুরিমা (যার কাছে কিনা যাচ্ছি ন্যু জার্সিতে), সে তো আমায় ছোট থেকেই চেনে। তাই আমার কাণ্ড কেরামতি যে কতদূর হতে পারে, সব জানে। ও আমায় কলকাতা মেট্রোতে চাপা শিখিয়েছিল। এই ক্ষেত্রেও পাখি পড়ার মত করে সব শিখিয়ে দিয়েছিল। কাউন্টারে গিয়ে ঠিক কী কী বলতে হবে, কোথায় কখন কী চাইতে পারে, ইত্যাদি ইত্যাদি। আমার যে বন্ধুরা ফেব্রুয়ারিতে স্যান ফ্র্যানসিস্কো গিয়েছিল, তাদের থেকে খুব বেশি উপদেশ পাইনি। তাও সব মিলিয়ে আমি তো ভিতরে ঢুকে পয়েন্ট ১ থেকে খোঁজা শুরু করছি। হন্যে হয়ে এদিক সেদিক করছি। কোথাও তো লাগেজ স্ক্যানের কিছুই দেখিনা। তারপর লজ্জা টজ্জা কাটিয়ে এক এয়ারপোর্ট কর্মচারীকে জিজ্ঞেস করলাম, "আন্না এয়ার ইন্ডিয়ার লাগেজ স্ক্যানিং কোথায় হবে?" উনি একটু অবাক হয়ে বললেন যে সেসব নেই। ডাইরেক্ট লাগেজ চেক-ইন করে দিতে হবে। ভাবলাম কে জানে, ইন্টারন্যাশনাল, ব্যাপার স্যাপার আলাদা। পরে জেনেছিলাম যে এই নিয়ম চেন্নাই এয়ারপোর্টে হালফিলেই হয়েছে কারণ ফেব্রুয়ারিতে ওদের কিন্তু স্ক্যান হয়েছিল।

খুঁজে টুজে কাউন্টারে গেলাম। কয়েকজনের পরেই লাইন। পাসপোর্ট ধরালাম। সাথে টিকিটের এক কপিও। এই প্রসঙ্গে বলে রাখি, কিছুদিন যাবত আমি আমার দুটো ফ্লাইটই (চেন্নাই থেকে বম্বে এবং বম্বে থেকে নেওয়ার্ক) ট্র্যাক করার ফলে দেখেছি যে প্রথমটি মাঝে মধ্যেই বেশ দেরি করছে। সম্ভবত বম্বের বৃষ্টির জন্য। আর তাই দ্বিতীয়টি ডিলেইড হচ্ছে। আমার ক্ষেত্রেও তাই হতে পারে, তেমন হলে দৌড়তে হতে পারে ভেবে ডোমেস্টিক ফ্লাইটে একদম প্রথম সারিতে (মানে ইকোনমির প্রথমে) সিট নিয়েছিলাম। আমি অল্প হলেও ক্লস্ট্রোফোবিক। উইন্ডো সিট নিইনি তাই। কাউন্টারের ভদ্রলোককে যখন টিকিটটা দিলাম, মিষ্টি করে হেসে বললাম, "ক্যান আই হ্যাভ অ্যান আইল সিট ফ্রম দ্য মিডল ব্লক প্লিজ ফর মাই ইন্টারন্যাশনাল ফ্লাইট?" উনি কিছু বললেন না। খানিক কম্প্যুটারে কী চালিয়ে টালিয়ে তারপর হাতে ধরালেন বোর্ডিং পাস। ওহ, আমি এর মধ্যে মধুরিমার শেখানো অনুযায়ী বলে দিয়েছি যে লাগেজ কিন্তু নেওয়ার্ক পৌঁছেই নেব। উনি আমায় লাগেজ ট্যাগটা দেখালেন। MAA EWR লেখা। আশ্বস্ত করলেন যে আমার কথা অনুযায়ী ঠিকঠাক জায়গাতেই যাবে। তারপর একবার পিঠের ব্যাগটার ওজন করলেন। ব্যস। ছাড়পত্র পেয়ে গেলাম। এবার গন্তব্য ইমিগ্রেশন। আবার একটু হাবাগোবার মত এদিক সেদিক দেখেশুনে পৌঁছলাম ঠিক জায়গায়। সেখানে এক প্রস্থ লাইন। দাঁড়ালাম। সময়মত কাউন্টারেও পৌঁছলাম। প্রথম প্রশ্ন, "ইঙ্গে পোনা?" ভাবলাম অ্যাঁ, পোনা মাছের কী বলছে? সিঙ্গি পোনা কীসব। ক্ষণিকের ভ্যাবাচ্যাকা কাটিয়ে ততক্ষণে যদিও বুঝে গিয়েছি তামিল ভাষায় জিগ্যেস করছেন কোথায় যাচ্ছি, কিন্তু ইতিমধ্যে আমার মুখে এক বিরাট প্রশ্নবোধক চিহ্ন (আজকাল আমি একদম মনের ভাব মুখে প্রকাশ না করে থাকতেই পারিনা, খুব মুস্কিলের ব্যাপার)। উনি আবার জিজ্ঞেস করলেন, এইবার ইংরেজিতে। কোথায় যাচ্ছি। বললাম। পাসপোর্ট দেখলেন। যেই ঠিকানায় কলকাতা লেখা দেখেছেন, অমনি "আ, বেঙ্গলিয়া? কতায় যাচ্ছে?" ওই যে বাঙ্গালি দেখলে ভাঙ্গা ভাঙ্গা বাংলা বলার এই আদেখলাপনা, সত্যি বলছি, বিরক্ত লেগে যায়। যাই হোক, ডিপারচারের আগে বাধ্যতামূলক ছবি তুললেন, তারপর স্ট্যাম্প মেরে দিলেন। অর্থাৎ, ব্যস। দেশ থেকে এই বের করে দিলেন আমায়।

ইমিগ্রেশন পর্ব মিটিয়ে তারপরে লাইন দিলাম সিকিউরিটি চেকিংএ। লম্বা লাইন খুব একটা না। মিনিট পনেরো পর সব মিটিয়ে টিটিয়ে একটু থিতু হয়ে বসলাম। বাড়িতে ফোন টোন সারলাম। ইতিমধ্যে দেখাচ্ছে ফ্লাইট আরও ডিলেইড। দশটার আগে ছাড়বেনা। আমি ওয়েটিং এরিয়াতে পৌঁছে একটা চারজিং পয়েন্টে ফোনটা লাগিয়ে (আমি আবার এই বিষয়ে অত্যাধিক বাতিকগ্রস্ত। ফোনে সবসময় চেষ্টা করি ১০০ শতাংশ চার্জ রাখতে। নইলে কেমন প্যাল্পিটেশন হয়। অথচ সাথে কিন্তু ফুললি চারজড পাওয়ার ব্যাঙ্ক রয়েছে, তাও) পরপর বন্ধুবান্ধবদের, কিছু নিকট আত্মীয়দের ফোন করলাম। এত কিছুর পরেও দেখি সবে আটটা পনেরো। অত্যন্ত বোর্ড হচ্ছিলাম। তবে ত্রাতা হয়ে তখন এক বন্ধু এলো ওয়াটসঅ্যাপে এবং তারপর ফোনে। তার সাথে প্রায় রাত্তির সাড়ে দশটা অবধি গল্প করলাম, নানান বিষয়ে। প্রচুর ইনপুট পেলাম লেখালিখি নিয়ে। এর মধ্যে জেনে গিয়েছি, ফ্লাইট এগারোটার আগে ছাড়বেনা। একটু চিন্তা হল। পৌছতে দুই ঘণ্টা। পরেরটা রাত দেড়টায় রাইট টাইম। ছোটাছুটি করতে হবে। খিদেও পেয়ে গিয়েছিল। সাথে আবার ঘুমও। আমি সাধারণত এগারোটার দিকে শুয়ে পড়ি। অথচ সেদিন একটা অদ্ভুত পরিস্থিতি। একদিকে হাই উঠছে সমানে, অন্যদিকে চরম উত্তেজনা। অবশেষে সাড়ে দশটার পর বোর্ডিং শুরু হল। সেখানেও সেই লাইন। আবার প্রতীক্ষা। যখন সবকিছু মিটিয়ে প্লেনটা চেন্নাইয়ের আকাশে উড়ল, রাত সোয়া এগারোটা বেজে গিয়েছে। আমার জেথুর মেসেজ ততক্ষণে ফোনে ঢুকেছে। "এয়ারহোস্টেসকে বলবি পরের ফ্লাইটের কথা।"

লাগেজ নিয়ে দৌড়তে হবে ভেবেই আমি ব্যাকপ্যাক আর পোস্টারটা পায়ের সামনে রেখেছিলাম। কিন্তু স্ট্যুয়ারড এসে বললেন যে নিয়ম নেই। আমাদের মাথার ওপরের র‍্যাক তখন ভরে গিয়েছে। আমি আবার হাইটের দিক থেকেও চ্যালেঞ্জড। উনি তাই আমার মালপত্র বিজনেস ক্লাসের কেবিনে তুলে দিলেন। যথাসময়ে ডিনার এলো। জিরা রাইস গোছের কিছু আর সাথে দুই রকম তরকারি থাকার কথা। আমার কপাল এমন, দুইদিকে দেখলাম একই তরকারি। যাক গে, পনির ছিল। তাই কিছু বলিনি। প্লাস তখন চোখে ঘুম। চকোলেটটা ব্যাগে পুরে কফি না খেয়ে কোনমতে একটু দুই চোখের পাতা এক করলাম। ঘন্টাখানেক পর চোখ মেলে দেখি প্রায় পৌনে একটা। এয়ার হোস্টেসকে ডেকে জানালাম পরের ফ্লাইটের কথা। তিনি ঘড়ি দেখে বললেন, "যদিও আমাদের শিডিউল অনুযায়ী সোয়া একটায় বম্বেতে ল্যান্ড করার কথা, কিন্তু আমি অ্যাশিউরেন্স সিচ্ছি। আমরা পারব না। চক্কর কাটতেই থাকে প্লেন। তাও আমি পাইলটকে বলছি এটার কথা। তবে আপনি চিন্তা করবেন না। কানেক্টিং ফ্লাইট, কিছু একটা ব্যবস্থা হবে।" ভাবুন তখন আমার অবস্থাটা। জানি কানেক্টিং ফ্লাইট ইত্যাদি, কিন্তু প্ল্যানের সব চৌপাট হয়ে যাবে যে। ল্যান্ডিঙের একটু আগে হোস্টেস ঘোষণা করলেন। নেওয়ার্ক যাওয়ার প্লেনটি আমাদের জন্য অপেক্ষামান। তাই আমাদের সবার আগে ডিপ্লেন করানো হবে। প্লেনটা মাটি ছুঁতেই কোনমতে এর তার সাহায্য নিয়ে কেবিন থেকে লাগেজ নামালাম (ঠ্যাকায় পড়লে মানুষ যে কত হাইট স্কেল করতে পারে, আমায় দেখেই বোঝা যায়!)। লাইন দিয়ে আমরা জনা বারো দাঁড়িয়ে। এদিকে এয়ার ইন্ডিয়ার বাসের কোন দেখা নেই। তখন প্রতি মুহূর্ত অমূল্য। পাঁচ সাত মিনিটের অপেক্ষার পর বাস এলো। বাইরে তখন গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি হচ্ছে। ভাবলাম যেহেতু ইমিগ্রেশন হয়ে গিয়েছে, বুঝি ডাইরেক্ট প্লেনে নিয়ে যাবে। ও মা। সে গুঁড়ে বালি। আমাদের নিয়ে গেল আবার টার্মিনালে। সেখানে জায়গায় জায়গায় এয়ার ইন্ডিয়ার স্টাফ রয়েছেন, আমাদের তাড়া দিচ্ছেন। রীতিমত দৌড়ে দৌড়ে পৌঁছলাম সিকিউরিটি চেকে। সেখানে এক প্রস্থ ঝঞ্ঝাট। জেটের কলোম্বোর ফ্লাইট রাত দুটোয়, ডিলেড। ওদের প্যাসেঞ্জারদের চেক আগে হবে না আমাদের। জেট প্রাইভেট কোম্পানি, স্টাফের গলার জোর বেশি। এয়ার ইন্ডিয়ার ভদ্রলোক শান্তশিষ্ট। শেষমেশ আমরা প্যাসেঞ্জাররা প্রায় গায়ের জোরে ঠ্যালাঠেলি করে নিজেদের চেকিং করালাম। তারপর আবার শুরু দৌড়। এ যেন বিরাট ম্যারাথন। উফ। বম্বের এয়ারপোর্ট এত সুন্দর, অথচ সেইসব দেখতেই পাচ্ছিনা। সময় নেই। মনে মনে প্ল্যান করছি, ফেরার পথে দেখব সব। যখন ভাবলাম এই বুঝি গেটে পৌঁছলাম, দেখি ধুর, আবার সিকিউরিটি। এখানে আবার আরো কড়াকড়ি। জুতো খুলিয়ে তাও স্ক্যান করতে হবে। নিজের চেক করে আবার ব্যাগ জুতো নিয়ে দৌড়তে শুরু করেছি (মনে মনে গুনে নিচ্ছি যে ও, ট্রে থেকে এই কটা জিনিস নামাতে হবে), আমার সাথে একজন ভদ্রমহিলা ছিলেন একই ফ্লাইটের, বললেন "আরে তুমি তো তোমার পোস্টার ফেলে যাচ্ছ"। আবার ফিরলাম। ভাবুন শুধু। যার জন্য এত কিছু, তাই ফেলে যাচ্ছিলাম (অবশ্য ব্যাক আপ প্ল্যান ছিলই)। সবকিছু নিয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে দৌড়তে দৌড়তে উঠলাম সেই ইন্টারন্যাশনাল ফ্লাইটে। বেচারা বাকি যাত্রীরা কখন থেকে বসে আছে। আদ্ধেক তো ঘুমিয়েই পড়েছে। খুঁজে খুঁজে গেলাম নিজের সিটে। তারপরে স্বস্তির নিঃশ্বাস। বাবাকে ফোন করে জানালাম। বেচারা ওঁরাও জেগে বসে আছেন আমার জন্য। ধীরেসুস্থে সেটল হয়ে মাথার ওপর কেবিনে ব্যাকপ্যাক ভরে আর পাশের ব্লকের কেবিনে ওই ভদ্রমহিলার সাহায্যে পোস্টারটি রাখলাম। মনে মনে নোট করে নিলাম, নামার সময় সব নিয়ে নামতে হবে। গলায় শুধু স্লিং ব্যাগটি। ওতে রয়েছে পাসপোর্ট আর পার্স। সিটবেল্ট বেঁধে শান্ত হয়ে বসলাম। বোর্ডিং কমপ্লিট হল। প্লেন ছাড়ল ঠিক রাত দুটো পনেরোয়। মধুরিমাকে মেসেজ করে দিলাম। ও যদিও ট্র্যাক করছিলই। ওকে যে এয়ারপোর্টে আসতে হবে আমায় রিসিভ করতে। সুজাতাকেও জানালাম। আসছি, ফাইনালি!

(ওরে বাবা, বড্ড হাঁপ ধরে গিয়েছে। কালকে বিরাম।)

Friday, August 3, 2018

আম্রিকা দর্শন : পর্ব ২

কম্প্যুটার খুলে প্রথম কাজ যেটি করলাম, তা হল কনসুলেটের ওয়েবসাইটে স্ট্যাটাস দেখা। প্রথম ধাক্কা খেলাম সেখানেই। যেই কেস নম্বর লেখা আমার ফর্মে, সেটি দেখাল নন একজিস্টিং। অ্যাপ্লিকেশন  নম্বর দিয়ে এবারে দেখলাম। তারপরে যেই লাইনগুলি দেখলাম, তা মোটামুটি আমার মাথায় পুরোপুরি গেঁথে গিয়েছে। কারণ আমি পরবর্তী সত্তর দিন ওই একই লাইন কটি দেখেছি। Your visa is under administrative processing. It is usually resolved within 60 days, however, it may vary from case to case.
তখনো গা করিনি বিশেষ। দিব্যি বেড়াতে চলে গিয়েছি রাজস্থান। ইতিমিধ্যে আমার ল্যাবেরই আরও যেই তিনজনের যাওয়ার কথা ছিল আমার সাথে, ওদের ইন্টারভ্যু হয়ে গিয়েছিল। দুজন দিনে দিনে পেয়ে গেল। দশ বছরের ছাড়পত্র। আরেকজনের আমার মতোই অবস্থা। ইন্টারভ্যু দেওয়ার দশদিনের মাথায় যখন আমি পুষ্কর লেকের ধারে ঘুরছি, আমার কাছে কনসুলেট থেকে ফোন এলো। এবং দুর্ভাগ্যবশত ফোনের একটা কথাও শুনতে পারলাম না। এদিকে তারপর বার বার ওদের ফোন করার চেষ্টা করেও কোন কিছু হলনা। ইনকামিং হয়না বোধহয়। তারপর ইমেল করলাম। জানতে পারলাম পরেরদিন যে আরও কিছু ডকুমেন্টস ওদের লাগবে। সঙ্গে সঙ্গে সেগুলি পাঠালাম। ব্যস। আর কোনরকম কোন আপডেট নেই। এরপরের পঞ্চাশদিন যে আমার কী বিচ্ছিরিভাবে কেটেছিল, সেটা বোধহয় আর লিখে বোঝাতে পারবনা। প্রতিনিয়ত কনসুলেটের ওয়েবসাইট ট্র্যাক করা, হেল্পডেস্কে মেল লেখা, ফোন করা, ফেসবুকে কনসুলেটে যোগাযোগের চেষ্টা - হেন জিনিস নেই যা করিনি। এমনকি আমার সুপারভাইজারের সাহায্যে স্যান ফ্র্যানসিস্কোতে ইন্ডিয়ান কনসুলেটের এক ভদ্রলোকের সাহায্যেও অ্যামেরিকান কনসুলেটে যোগাযোগের চেষ্টা করি। এমারজেন্সি হিসেবে যদি ধরে। কিন্তু না। আমার চল্লিশ হাজার টাকা জলাঞ্জলি দিয়ে হতভাগা ভিসাটি এলো ঠিক যেদিন আমার স্যান ফ্র্যানসিস্কো থেকে ফেরার কথা, সেইদিন সকালে। বাকিরা ইতিমধ্যে ঘুরে ফিরেও এসেছে। যে ভিসা পাওয়ার জন্য আমি তার আগে পর্যন্ত হন্যে হয়ে ঘুরেছি, পাগলের মত যে যেখানে যা সাজেশন দিয়েছে, পরায় সব উপায় খুঁজেছি, সেটা যেদিন জানতে পারলাম মেলে যে অ্যাপরুভ হয়েছে, একটা অদ্ভুত রকমের অনুভূতি হয়েছিল। এমনকি এতটাই নিরাসক্ত গোছের একটা ব্যাপার এসে গিয়েছিল যে পাসপোর্টটা পর্যন্ত নইতে যেতে ইচ্ছেই করছিল না। নেহাত বাবা মা খুব তাড়া দিচ্ছিলেন। তাই হাতে নিয়ে এলাম। সেই বহুকাঙ্খিত অ্যামেরিকান ভিসাসহ আমার ভারতীয় পাসপোর্ট।
ভিসার মেয়াদ আগামী ফেব্রুয়ারি অবধি। আরেকটি কনফারেন্সের কথা খুঁজে জানলাম। সেই কনফারেন্সটি বস্টোন শহরে হবে। ভিসাটির সদ্ব্যবহার করতে অ্যাপলাই করে দিলাম। এবং পেয়েও গেলাম। এইবারে গন্তব্য পূর্বদিক। কিন্তু না আঁচাতে বিশ্বাস নেই, এই অবস্থায় পৌঁছে গিয়েছি ততদিনে। তাই বড় মুখ করে তেমনভাবে কাউকে বলতেও পারছিনা। স্যান ফ্র্যানসিস্কোর সমস্ত প্ল্যানিং তো ততদিনে আডিয়ার নদীর জল থেকে বিচিত্র নেটওয়ার্কের মাধ্যমে প্যাসিফিক ওশেনে মিশে একাকার হয়ে গিয়েছে। তবুও সুযোগ পেলে ঘুরব না, এমন তো হতে পারেনা। আর তাই অল্প হলেও পরিকল্পনা শুরু করেছি। শুধু প্রতিবার একটাই চিন্তা। এবার যেন প্ল্যানগুলো অতলান্ত জলে না ডুবে যায়। আমার যা কপাল! এই কনফারেন্সে আমার অতি প্রিয় বান্ধবী সুজাতারও আসার কথা। ও থাকে সিয়াটেলে। ওখানেই পি এইচ ডি করছে। চার বছর পর দেখা হবে ওর সাথে। ভাবতেই পুলক জাগছে মনে। এদিকে ন্যু জার্সিতে আমার এক্কেবারে স্কুল লাইফের বেস্ট ফ্রেন্ডের বাড়ি। আবার পিসিরও বাড়ি। মানে যাকে বলে পুরো জমে ক্ষীর প্ল্যান। এখানে যাবো, সেখানে যাবো।
যত যাওয়ার দিন এগিয়ে আসে, ভিতরে ভিতরে উত্তেজনা বাড়তে থাকে। ৬ই জুলাই রাত্রের প্লেন। সরকারি টাকায় যাওয়া, তাই এয়ার ইন্ডিয়া বাধ্যতামূলক। আমার রুটটি ছিল চেন্নাই থেকে বম্বে, তারপর বম্বে থেকে সিধে নেওয়ার্ক। নেওয়ার্ক হল ন্যু জার্সিতে আর ন্যু ইয়র্ক আর ন্যু জার্সি আবার আমাদের হাওড়া কলকাতার মতোই ব্যাপার। আমি তো মোটামুটি এক তারিখ থেকেই ঠকঠক করে কাঁপছি। এই না কিছু ভুলভাল করি, এই না আমায় বিদেশ বিভূঁইয়ে অ্যারেস্ট করে ফেলে। না জানি কী কেলোর কীর্তি করব (নিজের ওপর বিশেষ ভরসা নেই যে), ইত্যাদি ইত্যাদি। অনেক লিস্টি বানিয়ে টানিয়ে শেষ মুহূর্ত অবধি দরকারি অদরকারি জিনিসপত্র কিনে টিনে অবশেষে ৬ তারিখ দুপুরবেলা যখন ল্যাব থেকে ফিরলাম, তখন হল গিয়ে আমার যাবতীয় প্যাকিং কমপ্লিট। সেদিনও সকাল সকাল বেরিয়ে থিক খুচখাচ জিনিসপত্র কিনেই চলেছি, বিশেষ করে ওষুধপত্র। আবার লাস্ট মোমেন্টে মনে পড়া ব্যাগের মেরামতিও করিয়েছি। শুধু ভাবছি, একবার প্লেনে উঠে পড়ি, ব্যস। চেইন কী শ্বাস নেব। কিন্তু বিধাতা যে একেকজনের একেক রকম পরিকল্পনা করে রাখেন, সে মনীষীরা যুগ যুগ ধরে বলে এলেও তেমন পাত্তা দিইনি। ইতিমধ্যে যেনে গিয়েছি যে আমার রাত্তির ৯টার ফ্লাইটটি এক ঘণ্টা ডিলেড হয়েছে।  কিন্তু যেহেতু অস্বাভাবিক দামের জন্য ওয়েব চেক-ইন করিনি (ইন্টারনেটের তথ্য অনুযায়ী ঠিক করাই ছিল। যদিও প্রথম ইন্টারন্যাশনাল ফ্লাইট, তবুও জানলার ধার চাইনে আমার। আমার অবশ্য করেই আইল সিট চাই। এদিকে ওয়েব চেক-ইন করতে গেলে একেকটি আইল সিট দেখাচ্ছে হাজারের ওপর বাড়তি টাকা। একেই ইন্সটিট্যুটের বেঁধে দেওয়া টাকা রয়েছে, যত কমে সবকিছু করা যায় সেটাই দেখতে হচ্ছে প্রতি মুহূর্ত), তাই আমার পূর্ব নির্ধারিত সময়েই বের হওয়ার প্ল্যানটি বহাল রইল।
অ্যাপ ক্যাবের ওপর আমার খুব বিশ্বাস। খুব ভরসা। আর তাই হোস্টেল থেকে এয়ারপোর্ট যাওয়ার জন্য মহামান্য ওলাতে ক্যাব প্রি-বুক করলাম। আমার অভ্যেস কোথাও যাওয়ার হলে আগেভাগে পৌঁছে যাওয়া। হাতে বেশ অনেকটাই সময় নিয়েই প্রি-বুক করলেও শেষ মুহূর্তে মিনি প্যানিক অ্যাটাক দিয়ে আধ ঘণ্টায় ছ-ছটা গাড়ি ক্যান্সেল করল বুকিং। আমার প্ল্যান সন্ধ্যে ছটার মধ্যে এয়ারপোর্ট পৌঁছতেই হবে। এদিকে পৌনে ছটাতে আমি ফ্যালফ্যাল করে হোস্টেলের সামনে লটবহর নিয়ে রয়েছি। লটবহর বলতে বান্ধবীর পইপই করে বলে দেওয়ার ফলে একটি ব্যাকপ্যাক যার ওজন পরে মেপে জানলাম সাড়ে পাঁচ কেজি (তার মধ্যে দুই কেজি মিনিমাম হবেই আমার ক্যামেরাটি), একটি ট্রলি স্যুটকেস (আট কেজির আশেপাশে ওজন) গলায় একটি স্লিং ব্যাগ যার মধ্যে সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র রয়েছে এবং সবচেয়ে জরুরি জিনিসটি, অর্থাৎ আমার পোস্টারটি। সব কিছুরই একটা যথাযথ সময় আছে, আর তাই ঠিক আধ ঘণ্টার হয়রানির পর এক সদয় ওলা ড্রাইভার আমার রিকুয়েস্ট মেনে এলেন। বন্ধুদের যাদের আসার কথা ছিল আমায় ড্রপ করতে, তারা শেষ মুহূর্তে কাজে আটকে গেল। অগত্যা আমি একাই দুগগা দুগগা বলে রওনা দিলাম।  ততক্ষণে টেনশন করে এমন অবস্থা হয়ে গিয়েছে আমার যে ক্যাম্পাসের মেন গেটে গিয়ে ড্রাইভারকে বলছি, একটু গাড়ি থামাবেন? দেখব পোস্টারটি নিয়েছি কি না। ড্রাইভার মহাশয় ততক্ষণে আমার কাউন্সেলরের রোল নিয়ে নিয়েছেন। ইতিমধ্যেই ক্যাব ক্যান্সেল করা কিভাবে রুখতে হয়, সেই নিয়ে মিনি ট্যুটোরিয়াল দিয়ে দিয়েছেন। এবারে আশ্বস্ত করলেন যে পোস্টারটি তিনি নিজে ভরেছেন। আমি যেন টেনশন না করি। গাড়িতে যেতে যেতে বাড়িতে এবং এক বন্ধুর সাথে কথা বলে টলে অবশেষে পৌঁছলাম চেন্নাইয়ের আন্না ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টে। ঘড়ির কাঁটা সন্ধ্যে ছটা তেতাল্লিশ (ওলার বিল মেলালাম)।

আম্রিকা দর্শন : পর্ব ১

যখন আই আই টি ম্যাড্রাসে পি এইচ ডি করতে ঢুকি, কিছু মাসের মধ্যেই জানতে পেরে গিয়েছিলাম যে সরকারি খরচে একটি বিদেশ ভ্রমণের সুযোগ থাকে পাঁচ বছরে একবার। সেই আনন্দে হোস্টেলে এক বছর পূর্ণ হতেই সঙ্গে সঙ্গে পাসপোর্টের জন্য দরখাস্ত করে ফেললাম। হাতেও পেয়ে গেলাম দিন চারেকের মধ্যে। তারপর সেই পাসপোর্ট নিয়ে অন্য গল্প আছে। কখনো বলব। তা যাক গে, ডিসেম্বর ২০১৪তে পাসপোর্ট করে রাখলেও ২০১৭র সেপ্টেম্বরের আগে সেই বইটি আলমারি থেকে বের হওয়ার সুযোগই পায়নি। ফেব্রুয়ারি ২০১৮তে অ্যামেরিকার পশ্চিমে কূলে অবস্থিত স্যান ফ্র্যানসিস্কো শহরে যাওয়ার একটি সুযোগ এলো। মনে আছে, ষষ্ঠীর দিন সন্ধ্যেবেলা বসে ভিসার অ্যাপ্লিকেশন করলাম। এই সময়টা আর আবার জুন জুলাই অগস্ট হল অ্যামেরিকা যাওয়া আসার সবচেয়ে পপ্যুলার সিজন। আর তাই স্বাভাবিকভাবেই ভিসার ইন্টারভ্যু ডেট পেলাম সেই ডিসেম্বরের এগারোতে।
অ্যামেরিকার ভিসা পাওয়া অন্যতম কঠিন একটা ব্যাপার। এইচ ১ বি নিয়ে সাম্প্রতিক বহু আলোচনায় সেইসব নিয়ে তো চর্চা অনেকেই নিশ্চয়ই পড়েছেন। তা যাই হোক, আমার ছিল কনফারেন্স। আর তাই আমার জন্য সঠিক ভিসা ছিল বি-১/বি-২। সোজা ভাষায় ট্যুরিস্ট/বিজনেস ভিসা। আমার আবার সব বিষয়ে হোমওয়ার্ক করার একটি বিশেষ প্রবণতা রয়েছে। আর তাই ভিসা ইন্টারভ্যু দিতে যাওয়ার আগে যে নেট ঘাঁটব না, তা তো নয়। প্রচুর লেখাপত্তর দেখলাম। সম্ভাব্য প্রশ্নাবলী, তার যথাযথ উত্তর, কী কী কাগজপত্র সাথে লাগতে পারে, ইত্যাদি ইত্যাদি। (এই বিষয়ে কারুর কোন প্রশ্ন থাকলে অবশ্যই ইনবক্সে জিজ্ঞেস করতে পারেন। ) বিভিন্ন বিশেষজ্ঞরা বললেন যে আমার নাকি ভিসা পাওয়া একদম জলভাত সমান। কোনরকম চিন্তার জেন কারণই নেই। তাও একটু নার্ভাস হয়ে প্রথমদিন গেলাম বায়োমেট্রিক ডিটেলস জমা করার জন্য। এইটি মূল কনসুলেট না। আলাদা একটি অফিস। তবুও এখানেও সিকিউরিটি নিয়ে কড়াকড়ি রয়েছে। ফোন নিয়ে যাওয়া বারণ। আমি নিয়ে যাইনি তাই। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত পারশে পেনড্রাইভ ছিল, সেটা আবার নিচে লকারে পঞ্চাশ টাকা ভাড়া দিয়ে রেখে আসতে হয়। যাই হোক, বায়োমেট্রিক তো ভালোয় ভালোয় হল। অনেক টাকা অটো ভাড়া দিয়ে (কী করব, ফোন নেই সাথে, তাই অ্যাপ ক্যাবও নেই।)ফিরলাম হোস্টেলে। দুদিন পর ডি-ডে।
স্নান করে ঠাকুর নমস্কার করে সক্কাল সক্কাল বেরিয়ে গেলাম। এটি চেন্নাই কনসুলেটে। জেমিনি ফ্লাইওভারের কাছে। গোটা ফুটপাথ জুড়ে শুধুই লোক আর লোক। বাবা রে, আম্রিকা যাওয়ার এত ক্রেজ, দক্ষিণে বোধহয় একটু বেশিই। (পড়ে জেনেছি হায়দ্রাবাদের কাছে নাকি ভিসা বালাজি বলে কোন মন্দির আছে। সেখানে বালাজির কাছে পুজো দিলে তাড়াতাড়ি ভিসা এসে যায়। হায় রে আমার ভারতবর্ষ!) আর তাছাড়া ব্যাঙ্গালোর, যেখান থেকে প্রচুর লোক অনসাইটের সৌজন্যে অ্যামেরিকা যায়, সেই ব্যাঙ্গালোরেই ইউ এস কনসুলেট নেই। তাই তাদেরও ভরসা চেন্নাই। ভারতে বোধহয় শুধুমাত্র কলকাতা দিল্লি বম্বে ম্যাড্রাস আর হায়দ্রাবাদে ইউ এস কনসুলেট আছে। আর তাই ভিড় হওয়াটা খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার।
সাড়ে এগারোটার অ্যাপয়েন্টমেন্ট ছিল। এগারোটার একটু আগে লাইনে দাঁড় করাল। হাতে পাসপোর্ট রাখতে হবে। আর বাকি সমস্ত কাগজপত্র প্লাস্টিকের প্যাকেটে বা ট্রান্সপ্যেরেন্ট ফাইলে। বেশ বাধ্য নাগরিকের মতই সকলে রইলাম লাইনে। সঠিক সময়ে আমাদের লাইনকে ছাড়া হল। অন্য কোন দেশের কনসুলেটে আমি যাইনি, তাই জানিনা সেখানে নিরাপত্তা ব্যবস্থা কেমন। তবে অ্যামেরিকান কনসুলেটে বাড়াবাড়ি রকমের সিকিউরিটি। হাতের ঘড়ি পর্যন্ত খুলে চেকিং করে লম্বা লম্বা লাইন ও করিডর পেরিয়ে পৌঁছলাম একটি বিল্ডিঙে। সেইখানে মূলত মার্কিনী স্টাফ। ভারতীয় স্টাফ থাকলেও সংখ্যায় ও ক্ষমতায় কম। আবার লাইন। একেকটি কাউন্টার খালি হচ্ছে আর সেখানে লোক পাঠাচ্ছে। কিছু কাউন্টার আবার স্পেশালাইজড ভিসার জন্য নির্দিষ্ট। আমি এক সময়ে সুযোগ পেলাম। পাসপোর্ট দিলাম। আবার বায়োমেট্রিক ইনপুট হল। ভেরিফিকেশনও বটে। পাসপোর্ট ফেরত নিয়ে গেলাম আরেক লাইনে।  বলতে ভুলে গিয়েছি, এই বিল্ডিঙে সর্বত্র অ্যামেরিকার ট্যুরিস্ট স্পটের ছবি। স্যান ফ্র্যানসিস্কোতে গেলে কোথায় কোথায় যাবো, কী দেখব, সব ইতিমধ্যে মাথার মধ্যে দারুণভাবে রেডি। তাই ছবিগুলো চিনতে একটুও অসুবিধে হচ্ছিল না। আহা, গোল্ডেন গেট ব্রিজ, কুয়াশাচ্ছন্ন। রোমাঞ্চ জাগছিল মনে, আর মোটে দুই মাস। তারপরেই আমিও এর সামনে পোজ দেবো।
অপেক্ষা আর অপেক্ষা। আর তারপরে গেলাম কন্সুলার অফিসারের সামনে কাউন্টারে। খুব বেশি প্রশ্ন করেননি ভদ্রমহিলা। ওই সাধারণ কবে যাবো, কোথায় যাবো, কী করি ভারতে। তারপর আমার সিভি এবং যে কাজটি প্রেজেন্ট করতে যাচ্ছি তার অ্যাবস্ট্র্যাক্ট জমা নিলেন। সাথে পাসপোর্ট। এইবারে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। জানব যে আমার কপালে ভিসা আছে কি না।
একটু দুঃখী দুঃখী মুখ করে জানালেন যে এই মুহূর্তে ওঁর পক্ষে আমায় ভিসা দেওয়া সম্ভব হচ্ছেনা। কিছু অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ প্রসেসিং দরকার। আমায় ধরিয়ে দিলেন একটি নীল রঙের কাগজ। সেখানে লেখা 221G, কেস নম্বর লিখে জানালেন ওদের ওয়েবসাইটে নিয়মিত চোখ রাখতে, স্ট্যাটাস জানতে। ২২১জি শুনেছিলাম খুবই কমন, অন্তত আমরা যারা বায়োসায়েন্স বা কেমিক্যাল সায়েন্স নিয়ে রিসার্চ করি তাদের জন্য। তায় আবার আমার কাজ এইচ আই ভি নিয়ে। আমার যে অত সহজে ভিসা আসবেনা, বোঝাই উচিত ছিল। তবুও, মনে আশা ছিল একটু হয়ত হয়ে যাবে। যাই হোক, হাতে দুই মাসের মত সময় আছে। সামনে বাড়ি যাওয়া, বেশি চিন্তা না করে ফিরলাম ক্যাম্পাসে। 

Thursday, August 2, 2018

মজার চিঠি

প্রিয় অগ্নি

তোমার লেখা যাদবপুরের মেয়ে সিরিজটা পড়ছি। মন্দ লিখছ না। কিন্তু বাবা, বলি হচ্ছেটা কী? যবে থেকে তুমি সিরিজটি লেখা শুরু করেছ, জীবন যে আমার বড্ড বেশি হ্যাপেনিং হয়ে গিয়েছে। উঠতে বসতে বন্ধুদের থেকে প্যাঁক খাচ্ছি। ভাইরাল ভিডিওর চেয়েও বেশি মুখরোচক হয়ে গিয়েছে সিরিজটি। সেদিন তো আবার একজন আমায় ট্যাগ করে পড়ালও। বোঝো কাণ্ড। মায়ের কাছে মাসির গল্প! এ তো গেল ইউনিভারসিটির কথা। হোমফ্রন্টে অবস্থা শোচনীয়।

আমার মা আবার তোমাদের স্টেশনের বিশাল ফ্যান। সারাদিন বাড়িতে রেডিও চলছে। বাবা তো মাঝে মাঝে মন্তব্য করে, "বাড়িটাকে কি পান বিড়ির দোকান বানিয়ে ফেললে নাকি? সর্বক্ষণ বকবক আর ভুলভাল যত মাইন্ডলেস মিনিংলেস গান।" অবশ্য তাতে আমি বা মা কেউই পাত্তা দিইনা। সে যাই হোক, আত্মীয়স্বজনদের তো মা বড় মুখ করে বলেছিল যে "এই আজ না আমার মেয়েকে রেডিওতে শুনিয়েছে", এবার সেই মামা কাকা পিসির ছেলেমেয়েগুলো যারা কিনা তোমার একনিষ্ঠ ভক্ত, তোমার কোন আপডেট মিস করেনা, এখন সব তোমার লেখা পড়ে দুমদাম আমায় ফোন করছে, ওয়াটসঅ্যাপে মেসেজের বন্যা বইয়ে দিচ্ছে। আওয়াজের পর আওয়াজ খাচ্ছি। আমার জেঠুমণি আবার একটু গোঁড়া গোছের মানুষ। প্রথম থেকেই চাননি আমি যাদবপুরে পড়ি। "যতসব উচ্ছৃঙ্খল বাচ্চাকাচ্চার দল", এই তাঁর ধারণা। আমায় তো প্রায় উঠে পড়ে ব্রেবোরনে পাঠিয়েই দিচ্ছিলেন। নেহাত লাস্ট মোমেন্টে বাবা আমার সাইড নিলো। তা এ হেন জেঠুর কানে যদি এইসব যায় না, আমি শিয়োর, তোমার নামে নির্ঘাত কেস ঠুকে দেবে। এককালের দুঁদে উকিল কিন্তু জেঠুমণি। (সে তোমার নামে কেস ঠুকুক, তাতে আমার কিছু না। সোমক নিশ্চয়ই অন্য ছেলে অ্যাডপ্ট করে নেবে। ও মা গো না চললে হয় নাকি? চুপিচুপি বলে রাখি, আমি কিন্তু সোমকের বিশা...আল ভক্ত। আর একটা হাল্কা, উহু ভালো মতই ক্রাশও আছে। ও মা গো দেখি মূলত ওকে দেখব বলেই।) কিন্তু জেঠুমণি যদি এইসব শুনে আমায় কলেজ ছাড়িয়ে গৃহবন্দী করে দেয় না, ভালো হবে না বলে দিলাম। আর আমার কাজিনগুলোও হয়েছে একেকটা বাঁদর। সমানে আমায় ব্ল্যাকমেল করে যাচ্ছে। আচ্ছা মুস্কিলে ফেললে তো আমায়? নেহাত আমার বেস্ট ফ্রেন্ডটি বিন্দাস। এখনো অবধি রিঅ্যাকট করেনি এইসবে।

ফেসবুকের অবস্থাও ওদিকে নাজেহাল। এত্ত ফ্রেন্ড রিকুয়েস্ট। আদার ফোল্ডারে তো আবার গুচ্ছের মেসেজ আসতে শুরু করে দিয়েছে। তোমার ফ্যানেরা যে সব একেকটি সিবিআই এফবিআই এজেন্ট, জানতাম না। ঠিক আমাকে খুঁজে বের করেছে। আর সমানে মেসেজ। সেই মেসেজের আবার কত ক্যাটেগরি। "দিদিভাই, অগ্নিদার সিঙ্গলত্ব ঘুচিয়ে দাও" থেকে শুরু করে "শোনো, ঝুলিয়ে রেখোনা বেচারাকে। তেমন হলে আমরা তো আছি। সামলে নেব।" বাবা রে!

তাই বলি কি, কিছুই তো হওয়ার নেই এই ফ্রন্টে। তুমি বরং অন্য রাস্তা দেখো। বুঝলে? আর হ্যাঁ, চাইলে অ্যাপ্লিকেশন জমা রাখতে পারো। সিট খালি হলে কনসিডার করা যাবে না হয়।

(ঠিক যেরকম চাইছ সেরকম না) ভালোবাসা নিয়ো
(তোমার) যাদবপুরের মেয়ে

Tuesday, July 31, 2018

জলছবি

দুপুর দুটোর কলকাতা। আধা খালি বাসটা ঢিকিস ঢিকিস করতে করতে এসে পৌঁছেছে অফিসপাড়ায়। সেখানে তখন ফুটপাথের দোকানিরা ভীষণ ব্যস্ত পসরা সাজিয়ে। "আমায় এক প্লেট চাউ দেবেন তো", "এদিকে দুটো ঘুগনি আর মামলেট", "দাদা খুচরো দিন না"। এরই মধ্যে রাস্তায় সিগনালে আটকে থাকা খালি বাসটার দরজা থেকে কন্ডাক্টরের "এ পার্ক স্ট্রীট রবীন্দ্র সদন এক্সাইড হাজরা টালিগঞ্জ ফাঁড়ি। খালি আছে। সীট খালি সীট খালি"র প্রবল আকুতিতে যাত্রী তোলার মরিয়া চেষ্টা। আকাশ জুড়ে ঘন কালো মেঘ। বাসের এফ এমে তখন বিজ্ঞাপনের একঘেয়ে ঘ্যানঘ্যান।
লেডিজ সিটে জানলার ধারে বসে মা ব্যস্ত ছেলের স্কুলের ডায়রি দেখতে। ম্যাডাম কী হোমওয়ার্ক দিলেন, পরীক্ষার সিলেবাস কী, প্রশ্নে নাজেহাল দশ বছরের ছেলেটি। ওর মন পড়ে আছে স্কুলের লাস্ট পিরিয়ডের খেলায়। অান্টি  তখন মগ্ন হয়ে পড়াচ্ছেন গুলমোহর রিডার থেকে ড্যাফোডিলস। I wandered lonely as a cloud... এদিকে ওরা বন্ধুরা ব্যস্ত বুক ক্রিকেটে। সিগনাল ততক্ষণে সবুজ হয়েছে। তবুও ড্রাইভার দাঁড়িয়ে। "নে একেবারে বাড়ির ভিতর থেকে লোক ডেকে আন। সত্যিই। কী কুক্ষণে যে এই বাসটাতে চেপেছিলাম।" গুটিকয়েক প্যাসেঞ্জারের রোজের এই মনোলগে আর কান দেননা পঁয়তাল্লিশের ড্রাইভার। তার চেয়ে ঢের বেশী শ্রুতিমধুর রেডিয়োতে তখন বেজে চলা আফগান জলেবি।
বাসটা গুঁটিগুঁটি পায়ে উঠল পার্ক স্ট্রীট ফ্লাইওভারে। সনসন করে হাওয়া দিচ্ছে। ড্রাইভারও বোধহয় মুড পেয়ে গিয়েছেন। বাস সেকেন্ড গিয়ার থেকে একেবারে ফোরথে। "পুচু আমার হাতটা ধরে বসো। এক্ষুনি ব্রেক মারলেই পড়ে যাবে"র উত্তরে একটি নরম হাত চেপে ধরল তার কুচুর বলিষ্ঠ হাত। কব্জির ঘড়িতে তখন সোয়া দুটো। ঝিরঝিরে হাল্কা বৃষ্টি শুরু হয়েছে ইতিমধ্যে। ডান হাত দিয়ে চোখের উপরে বারবার পড়া চুলের গোছা সরাচ্ছে মেয়েটি। সহযাত্রীর মুগ্ধ দৃষ্টি ওর ঠোঁটের ওপর ছোট্ট কালো তিলে।  
"মা, আমি জানলার ধারে বসব প্লিজ"এর উত্তরে সন্ত্রস্ত চিন্তিত মা কাঠের জানলা বন্ধ করছেন। সামনেই ইউনিট টেস্ট। এখন ভিজলেই কেলেঙ্কারি হবে ছেলের।
পিছনের সীটের প্রৌঢ় মগ্ন ফোনে। "ছাতা নিয়ে বেরোইনি কিন্তু আমি। এই এক্সাইড ছাড়ালাম। মাম্পাকে বলো ছাতা নিয়ে বাস স্ট্যান্ডে এসে দাঁড়াতে। আর শোনো, রাত্রে খিচুরি করে দিয়ো তো। যা দেখছি আকাশের অবস্থা, থামার তো লক্ষণ নেই। ডিম আছে তো? নইলে মন্টুর দোকান থেকে আনিয়ে নিয়ো। ব্যাস। খিচুরি আর ডিম ভাজা।ঘি আছে তো?"
বাসটা হঠাৎ স্পিড তুলেছে। পূর্ণর স্টপেজে থামলইনা। পিছনে বোধহয় একই রুটের আরেকটা বাস। "গোটা রাস্তা ধীরে চালিয়ে এখন এই র‍্যাশ ড্রাইভিং। রিডিকিউলাস।" কোনমতে এঁটেসেঁটে বসে ভাবল উনিশের মেয়েটি। ফিরছে কলেজ থেকে। একটু ঘুমিয়ে আবার ছুটবে ট্যুশানে। ইশ, এই ওয়েদার, কোথায় চাদর মুরি দিয়ে ফুল স্পিডে ফ্যান চালিয়ে ভূতের গল্প পড়বে, তা না। এক হাঁটু জল ঠেঙ্গিয়ে কোয়ান্টাম কেমিস্ট্রির কচকচানি শুনতে হবে।
রেডিয়োতে পরপর চলছে "আমার সারাটাদিন মেঘলা আকাশ", "কাগজের নৌকো", "সাওয়ান বরসে" । আর জে খবর দিচ্ছে মাঝে মাঝে, কোথায় জল দাঁড়িয়ে গিয়েছে, কোথায় জ্যাম। বারবার সাবধান করছে ভিজে রাস্তায় গাড়ী চালানো নিয়ে। বিকেল তিনটেতেই প্রায় ঘুটঘুট্টি অন্ধকার।
একটা বিশ্রী শব্দ করে ব্রেক কষল বাসটা। প্রৌঢ় ছিটকে পড়ে যেতে যেতে কোনমতে নিজেকে সামলালেন। "কে রে ভাই? কী করে চালাস বাসটা? তখন থেকে এই করছে ব্যাটা।" ড্রাইভারের চোদ্দ গুষ্টি এক করতে বাসের ওই গুটিকয়েক যাত্রী তখন মরিয়া।
মুহূর্তের মধ্যে রেরে করে ছুটে এলো কিছু পথচারী। আশেপাশের বাস থেকে প্যাসেঞ্জার। এই বাসের ড্রাইভার কন্ডাক্টর ছুটছে। তার পিছনে ছুটছে মত্ত জনতা। তারও পিছনে ট্রাফিক পুলিশ কানে ওয়াকি টকিতে কন্ট্রোল রুমে ফোন করতে করতে হন্তদন্ত হয়ে ছুটছে।
শুধু স্থির হয়ে পড়ে আছে বছর চব্বিশের এক কলেজ পড়ুয়া। গলায় ঝুলতে থাকা আই ডি কার্ডটা ছাড়া চেনা যাচ্ছেনা আর। ঝমঝম করে বৃষ্টি পড়ছে। কালো পিচের ওপর ধুয়ে যাচ্ছে টাটকা রক্তের স্রোত।
"বাবু, ওইদিকে তাকিয়ো না। চলো। দেখি আবার এখন এখান থেকে অটো পাওয়া যায় কি না। কালকের হোমওয়ার্কগুলো শেষ করতে হবে তো। আবার ক্লাস টেস্টও তো কাল।" পিছনের দরজা দিয়ে নেমে মা ছেলে তখন অন্য দিকে।
"শোনো, একটা বিচ্ছিরি অ্যাকসিডেন্ট হয়েছে এখানে। দেখি পরের বাসটা কখন পাই। ভিজেই তো গেলাম। আর মাম্পাকে পাঠাতে হবেনা", দায়িত্ববান পিতা ফোনে জানিয়ে দিলেন বাড়িতে।
পুচু আবার একদম রক্ত দেখতেই পারেনা। কুচুর এখন বিরাট দায়িত্ব তাই। ওকে কোনভাবে স্পট থেকে সরিয়ে নিয়ে যাওয়ার।

ট্রাফিক সার্জেন্ট পকেট থেকে মোবাইলটা বের করলেন। আই ডি কার্ডে দেওয়া নম্বরটায় ফোন করে জানাতে হবে তো। এইসব উটকো ঝামেলা যত। প্রফেশনাল হ্যাজারড। 

Monday, July 30, 2018

একটি রবিবাসরীয় সকাল



গতকাল এক বিচিত্র অভিজ্ঞতা হল। প্রায় সপ্তাহখানেকের প্রস্তুতিপর্বের পর ঠিক হয়েছিল সকাল সকাল প্রতিষ্ঠিত বাঙালি মিষ্টির দোকানে (পড়ুন কে সি দাস) যাব। কচুরি খেয়ে রবিবারের জলখাবারটা সারবো। সেই অনুযায়ী প্ল্যানিংও চলছিল। শনিবার গুগলকে জিজ্ঞেস করে দোকানের টাইমিং জেনে নিলাম। তারপর রবিবার সকালের বড় প্রিয় ঘুমকে বিসর্জন দিয়ে এবং দায়িত্ব নিয়ে বাকি তিনজনের ঘুম ভাঙিয়ে আমরা রওনা দিলাম ক্যাম্পাস থেকে। সে কী উত্তেজনা। ফেসবুকে একখানা ছবি পোস্টিয়ে দিলাম। আবার স্টেটাসও দিলুম। বেলা বোস গানের প্যারোডি হিসেবে।
"অ্যাপ ক্যাব মোরা পেয়ে গেছি ওগো শুনছ
আর মাত্র কয়েকটা মিনিট ব্যাস।
স্টারটিংএই ওরা কচুরি দেবে
তারপর দেবে মিষ্টি
চুপ করে তখন খাবো আমরা সব।"
পৌনে নটার দিকে দোকানের সামনে পৌঁছে মাথায় হাত। শাটার টাটার নামানো। দোকান খোলেইনি। ততক্ষণে ফেসবুকের ছবির প্রাইভেসি "ওনলি মি" করে দিয়েছি। প্যারোডি ডিলিট। এর মধ্যে যে বেশ বুক ফুলিয়ে জাহির করা হয়ে গিয়েছে। তৃণাদিকেও কনফিডেন্টলি বলে ফেলেছি যে কে সি দাস আটটায় খুলে যায়, ইত্যাদি। গাড়ি থেকে না নেমে সঙ্গে সঙ্গে ডেসটিনেশন চেঞ্জড। চলো পানসি বেসন্ত নগর। চন্দনের ইতিমধ্যে খিদেয় পেটে ছুঁচো ডন বৈঠক মারছে। পায়েলের মন চা চা করছে। অয়নের মুখ চুন, কারণ ওই ছিল কচুরি অভিযানের মূল হোতা। আমি ভাবছি গেল রে, এত শো অফ, কী হবে এবার। প্রেস্টিজ ইস্যু।
যাই হোক, বেসন্ত নগর বিচে নেমে আমাদের প্রথম প্ল্যান হল কিছু একটা খেতে হবে। চন্দনের কথা মতো গেলাম মুরুগন ইডলি শপে। এই দোকানটি একটি বিখ্যাত ব্র্যান্ড তামিল নাডুর। চেন্নাইতে একাধিক ব্রাঞ্চ। এমনকি আমি সদ্য মাদুরাই গিয়েও দেখেছিলাম এদের ব্রাঞ্চ। বেসন্ত নগরে আমি আগে বার দুয়েক খেয়েছি। সুস্বাদু অথেনটিক দক্ষিনী খাবার। ঠিক হল কফি খাবো আর সাথে হাল্কা ব্রেকফাস্ট। কারণ কচুরি আমাদের খেতেই হবে। প্রায় পাখি পড়ার মতো আমি বাকি তিনজনকে বলেই চলেছি। ওরে, বুঝে শুনে মেপে ঝুঁকে খাস কিন্তু।
তা মুরুগনে তো হেঁটে হেঁটে পৌঁছনো গেল। একটু এদিক ওদিক দেখে শুনে টেবিলও পেলাম। ওখানের সিস্টেম বেশ মজার দেখলাম। একেকটা আইটেম নিয়ে এসে ঘুরে ঘুরে যাচ্ছে। জিজ্ঞেস করছে নেব কি না। মানে আলাদা করে একটা এই দুটো ওই ওরকম কোন ব্যাপার নেই। আমরা তো নিলাম প্রথমেই চারজনে চারটে পোড়ি ঘি ইডলি। সে যে কী অপূর্ব স্বাদ, বলে বোঝাতে পারব না। খেতেই হবে। মনে করুন তুলতুলে নরম ইডলি, তাতে ঘি মাখানো। আর তার ওপর পোড়ি ছড়ানো। পোড়িটা আসলে ওই নানান মসলাকে রোস্ট করে গ্রাইন্ড করে দেওয়া হয়। ইডলি, দোসা, উত্থাপমের সাথে দারুণ মানায়। এরপর একে একে "ট্রাই" করলাম পোঙ্গল, সুইট পোঙ্গল, বড়া, প্লেন ইডলি এবং পোড়ি অনিয়ন উত্থাপম। ফিলটার কফিটা বেশ বেশ ভালো ছিল। বিল টিল তো মেটানো হলো। খসলও ভালোই। এদিকে ঘড়ির কাঁটা বলছে সোয়া নটা। কে সি দাস যদি খোলে তো দশটায়। অর্থাৎ আরো পঁয়তাল্লিশ মিনিটের ধাক্কা। কী করা যায় ভাবতে ভাবতে মনে হল যে তাহলে রোদের মধ্যেই না হয় সমুদ্রের ধারে যাই। এত কাছে এলাম আর বঙ্গোপসাগরের দর্শন নেব না, তা কি হয়?
ওই গরমে আমরা সমুদ্রের ধারে গেলাম। চোখ খুলে তাকাতে পারছিনা এত রোদ। গা পুড়ে যাচ্ছে। ভাগ্যিস সানস্ক্রিন মেখে বেরিয়েছিলাম। এদিকে রোদ চশমা নিইনি। ভাবিনি তো কচুরি খেতে গিয়ে চোখ টোখ ঝলসে যাবে এমন! অয়ন চন্দন আর পায়েল জলে নামলো। আমি দূর থেকেই। ততক্ষণে বারবার কে সি দাসে ফোন করছি। কেউই ধরে না। পৌনে দশটা নাগাদ তাদের কী মনে হল কে জানে ফোন রিসিভ করল। বেশ সভয়ে জিজ্ঞেস করলাম, "when will the shop open?", "it is open now" উত্তর পেলাম। উল্লাস দেখে কে! আহা, কচুরি খেতে চলেছি! ফাইনালি!
ঝটপট আবার এক খানা অটো নিয়ে পৌঁছলাম। ঢোকার আগে এক প্রস্থ ছবি ছাবা তুলে ফেলেছি। ইতিমধ্যে আরো বন্ধুদের মেসেজ করা হয়ে গেছে কোথায় এসেছি। কনফিডেন্স ফেরত পেয়ে পুরনো পোস্ট আবার ওপেন টু অল করে ফেলেছি। রীতিমতো টগবগিয়ে ফুটছে আত্মবিশ্বাস। দোকানে ঢুকে দেখি তখনও তেমন বেশী মিষ্টি নেই। কিন্তু গাড়ি থেকে তখন মিষ্টির ট্রে নামানো হবো হবো করছে। একটু আশ্বস্ত হলাম। জিজ্ঞেস করা হল, "কচুরি হবে?" জানলাম হবে, কিন্তু আধ ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হবে। যে আমরা কচুরি খাব বলে সকাল আটটা থেকে দশটা বাজিয়ে দিলাম, নিশ্চয়ই আর আধা ঘণ্টা অপেক্ষা করাই যায়। ডিটারমিনেশন তুঙ্গে তখন। বললাম, বেশ। করবো অপেক্ষা। বানাও আটটা। শুরু তো হোক আট দিয়ে। তেষ্টা মেটাতে তখন জল, ফ্যান্টা চলছে। এদিক ওদিক দেখছি। প্ল্যান হচ্ছে আর কী মিষ্টি খাওয়া যায়, কেনা যায়। প্লাস এত সুন্দর ব্যাকগ্রাউন্ড দেখে চলছে অগুন্তি সেলফির বন্যা। অয়নের চাকচিক্যও ফেরত এসে গিয়েছে। পায়েল লাফাচ্ছে রসগোল্লা খাবে বলে। চন্দন ফোনে লাইভ কমেন্টারি দিচ্ছে। আর আমি খুঁজছি ভাজা মিষ্টি।
এমন সময় কে জানে কেন, অয়নের মনে কুডাক দিলো। ওর কী মনে হল, বলল, "আচ্ছা কচুরি মানে খাস্তা কচুরি দেবে না তো?" সবাই মুহূর্তের জন্য ব্যোমকে গেলাম বটে, তারপর সেলফ কন্সোলেশনের মতো বললাম, " না না। কচুরি মানে কচুরি। বাঙালি দোকান। কচুরি বুঝবে না?"
ওই যে কথিত আছে, নেগেটিভ ভাবলে জীবনে সব নেগেটিভ হয়। নেগেটিভ ভাইবস ছড়ায়। তার একদম যথাযথ উদাহরণ সহ দোকানের রান্নাঘর থেকে বেরোল এক সার্ভার। হাতে খাস্তা কচুরি। সিনেমা হলে চারটে পাঁচটা কাঁচের গ্লাস ভাঙার শব্দ হত ব্যাকগ্রাউন্ডে। আর বাংলা সিরিয়াল হলে তো কথাই নেই। এক সপ্তাহর খোরাক পেয়ে যেত। বারবার ক্যামেরা আমাদের চারজনের মুখে ফোকাস করতো। আমাদের একদা হাসি মুখ মুহূর্তে কেমন ফ্যাকাসে হয়ে যায়। বার বার একই শট বিভিন্ন অ্যাঙ্গেল থেকে দেখাতো। গ্যারান্টি দিচ্ছি, দারুণ শট হত। শেষ সম্বলের মতো অয়ন আবার জিজ্ঞেস করল, "আচ্ছা, পুরি পাওয়া যাবে? কচুরি আই মিন। এটা তো খাস্তা কচুরি।" অ্যাটম বোম পড়ল। না। পাওয়া যাবে না। ভগ্ন হৃদয় আমরা চারজনে খুঁটে খুঁটে ওই খেলাম। আরেক প্রস্থ কোল্ড ড্রিঙ্ক ও রসগোল্লা কালো জামের সাহায্যে কচুরি নামালাম। হ্যাঁ মানছি, সুস্বাদু ছিল বটেই। অ্যাসিডিটি হয়নি। কিন্তু তবুও, চাইলাম এক, পেলাম আরেক। আমাদের ভিতরকার দার্শনিক সত্ত্বা তখন লাফিয়ে লাফিয়ে বেরোচ্ছে। "কপালে না থাকলে ঘি, ঠকঠকিয়ে হবে কী?" গোছের প্রবাদ বাক্য বেরোচ্ছে কত দিন পর। ভাগ্যিস মুরুগনে কিছুটা ব্রেকফাস্ট খেয়েছিলাম, এই নিয়ে সান্ত্বনা দিচ্ছি একে অপরকে। চন্দন একটু আপার হ্যান্ড নিচ্ছে। কারণ ওর আইডিয়া ছিল মুরুগন। অয়ন তো ততক্ষণে আবার নিভে গিয়েছে। পায়েলের মন খারাপ। আমি ভাবছি গেলো রে, জনসমাজে মুখ দেখাবো কী করে, ইত্যাদি ইত্যাদি।
যাই হোক হাজার টাকা খরচা করে অতি স্মরণীয় রবিবার সকাল কাটালাম বটে আমরা। প্রচুর মেমোরিজ হলো। শুধু মিশন কচুরির বদলে ট্রিপটার নাম মডিফাইড হল মেন্টালি। "মিশন ব্রেকফাস্ট"। মিশনই তো বটে!!

Friday, July 27, 2018

ত্বমাসি মম জীবনম

"কী রে তখন থেকে অমন হাঁ করে তাকিয়ে আছিস কেন? কী বলবি বল। নয়তো ফোট। এরকম তাকিয়ে থাকলে না অস্বস্তি হয়।" Quora অ্যাপ থেকে মুখ না তুলেই অগ্নি বললো রুমুনকে। "আমি তাকিয়ে আছি বুঝলি কী করে?" ঝাঁঝিয়ে উঠলো রুমুন।
"বুঝতেই পাচ্ছি মেজাজ তোর তিরিক্ষি হয়েছে। কিন্তু তা বলে বুদ্ধিশুদ্ধি যে মা গঙ্গার ভোগে চলে যাবে, এমনটা বুঝিনি রে। ডাইরেক্ট না দেখলেও আড়চোখে দেখা যায় রে হাঁদা।" জিভ দিয়ে একটা চুক চুক শব্দ করে অগ্নি বললো। প্রসঙ্গত এখনো মুখ না তুলেই।
"অগ্নি!! তখন থেকে আমি দাঁড়িয়ে আছি দেখছিস আর তাও ফোন থেকে চোখ সরাচ্ছিসনা। ভালো লাগছেনা কিন্তু আমার।" এবারে বেশ রাগতস্বরেই কথাগুলো বললো রুমুন।
"তোর যা বলার বল না। আমি তো শুনছি।"
"আমি যখন কথা বলবো, আই নিড ফুল অ্যাটেনশন। বুঝেছিস?"
"আরে আমি ফুল অ্যাটেনশনই দিচ্ছি রে। জাস্ট দ্যাট এখানে এলন মাস্ক লাইভ উত্তর দিচ্ছেন লোকজনের। আমি তাই সেগুলি দেখছি। কিন্তু চাপ নিসনা। আমি শুনছিলাম।"
"না। আই ওয়ান্ট আই কন্ট্যাক্ট। আমি অপেক্ষা করছি। তুই শেষ কর যা করছিস। তারপর বলব কথা। আমার এরকম রোবটের সাথে কথা বলতে ভালো লাগেনা।"
"উফ, জ্বালালি। তুই জানিস আমি কীসে গলব। ঠিক সেই ওষুধটাই ব্যবহার করবি। বল।" ফোনটা হাত থেকে নামিয়ে পাশে রাখতে রাখতে কিঞ্চিৎ বিরক্ত মুখ করে অগ্নি বললো।
"শোন, আমার আবার ব্রেকাপ হয়েছে আজ। আমার খুব মন খারাপ।"
"এ আর নতুন কথা কী? তা এবারে জানি কে? রণজয়? না সোহেল?"
"সোমক। উফ। সোহেল ছিল লাস্ট ডিসেম্বরে। আর রণজয় আগের পুজোয়। তুই না!!"
"বাবা রে বাবা। তোর যদি একটার পর একটা রিলেশন হয়, আমি অত ট্র্যাক রাখি কী করে বল তো? সারাক্ষণ কি লেজার মেন্টেন করবো নাকি? লেখাপড়া নেই আমার?"
"ঢং করিসনা তো। নিজে তো আজ অবধি ওই অপর্ণাকে প্রোপোজ করে উঠতে পারলিনা। আবার আমায় খোঁটা দিচ্ছে। হুহ।"
"শোন, অপর্ণা আমার মিউজ। শি ইজ ইন এ রিলেশন উইদ অপূর্ব। আমি এমন রব নে বনা দি জোড়িকে ভেঙে পাপ করি নাকি।"
"নাকি রব নে বনা দি জোড়ি। হু।"
"ওসব তুই বুঝবি না। ট্যাঁস ট্যাঁস খামেল স্কুলে পড়লে বাংলা সিনেমা উপন্যাস আর জানবি কী করে।"
"ও আমার সবজান্তা। শোন আমিও কম পড়িনি বাংলা সাহিত্য। চর্যাপদ টু মঙ্গলকাব্য, রবীন্দ্রনাথ থেকে জীবনানন্দ, সব জানি। "
"জীবনানন্দ জানিস বুঝি?"
"অবশ্যই। নাটোরের বনলতা সেন। বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি।"
"হুম। বুঝলাম। তা বল তো দেখি, ভালোবাসা সবই খায়। শুকনো পাতা। হেমন্তের এঁটো খড়। বাগানের কোণে পড়ে থাকা রুগ্ন শিকড়। সবই খায়। শুধু খায় না আমাকে। এবং প্রতিদিন রোজ হাঁ করে আমারই সম্মুখে বসে থাকে। কার লেখা?"
"জানিনা।"
"শক্তি চট্টোপাধ্যায়।"
"বুঝলাম। তা আমি এসেছি ব্রেকআপের কষ্ট নিয়ে। উনি আমার সুনীল শক্তি জ্ঞান দিচ্ছেন।"
"শোন, আমার মতো জীবনে একটাও প্রেম না করা মানুষ আর কী বলবে তোকে? আমার দৌড় ওই সাহিত্য অবধি। সেখান থেকে টুকটাক যা খুশি বলতে পারি অল্পবিস্তর। প্র্যাকটিক্যাল নলেজ কোথায় পাব?"
"তা বলে আমার মন খারাপের দায়িত্ব নিবি না?"
"তুই সোমকের সাথে যখন ডেটে গিয়ে হুল্লোড় করলি, এন্তার মজা করলি, আর আমি বাড়ি বসে তখন জ্বরে কাঁপছি, তখন তুই কি এসে আমার দায়িত্ব নিয়েছিলি? নিসনি তো? তাহলে তুই কার না করে সাথে গিয়ে ব্রেকাপ করবি। তার দায় আমি নেব কেন?"
"তুই এরকম বলতে পারলি তো অগ্নি?" গলা কেঁপে গেল রুমুনের। এই না কেঁদে ফেলে। দিনটাই খারাপ। একে ব্রেকাপ। তারপর প্রিয়বন্ধুর এমন নিস্পৃহ হাবভাব।
"হ্যাঁ পারলাম।"
"সেই। বলবি তো। আমায় তো আর ভালোবাসিসনা। অপর্ণা থাকলে আমার জায়গায় কী করতিস, আমি সব জানি।"
"বাহ। এই তো। আমার সবজান্তা ম্যাডাম।"
"তুই চুপ কর। আমার বয়ফ্রেন্ডগুলো একটার পর একটা আমার সাথে ব্রেকাপ করে দেয়। আমার বেস্ট ফ্রেন্ড তুইও আমার কথা ভাবিসনা। আমায় কেউ ভালোবাসেনা। হুহ। "
"নাটক করা থামলে বলিস। আমি ততক্ষণ এলন মাস্ক কী বলছে পড়ি।"
"হ্যাঁ তাই তো করবি। কোথায় আমায় সান্ত্বনা দিবি, তা না। উনি এলন মাস্ক ফলো করছেন। ফেলে দেব টান মেরে ফোনটা এই বলে দিলাম। তাকা আমার দিকে।"
"উফ আবার কী?"
"বল, আমি খুব আনলাভেবল, না?"
"এই দেখ, কাঁদছিস কেন? এই যে মেয়েদের কথা নেই বার্তা নেই, কান্নাকাটি শুরু হয়ে যায়। কী মুস্কিল!"
"বল না তুই। আমার কেন কেউ ভালোবাসে না? এই নিয়ে চার চারটে ব্রেকাপ হয়ে গেল গত তিন বছরে। দোষটা নিশ্চয়ই আমার। কই আর তো কারুর এরকম হয়না।"
"আরে ধুর। ওই সবকটা ছেলে ভুলভাল। তাই টেকেনি। তুই ভালো মেয়ে। তোকে কেন কেউ ভালোবাসবে না? ভালো যোগ্য ছেলেরা নিশ্চয়ই তোকে মাথায় করে রাখবে।"
"নমুনা দেখে তো উল্টে যাচ্ছি।"
"আরে হ্যাপেন্স। ওগুলো সব রং ডিসিশনস। তুই কদিন চুপচাপ শান্ত হয়ে থাক তো। এত ঝপাং ঝপাং করে রিলেশনে যাস না। সব ঠিক হয়ে যাবে। আর হ্যাঁ, একটা কথা। নিজেকে নিয়ে ভুলভাল ভাববি না। তুই এতটাই ভালো মেয়ে যে যে কেউ বর্তে যাবে তোকে পেলে। যারা তোকে পেয়েও হারায় নিজেদের দোষে, তারা সব একেকটি ড্যাশ।"
"শিয়র যে কেউ পেলে বর্তে যাবে?"
"অবশ্যই।"
"তুইও?"
"এখানে আমি কোত্থেকে এলাম আবার?"
"যা জিজ্ঞেস করছি, উত্তর দে।"
"হুম। মানে ইয়ে।"
"কী ইয়ে? হবি কি হবি না বল?"
"মানে হবো। কিন্তু ... "
"গাধা তো এতদিন মুখ ফুটে বলতে কী হয়েছিল? ছাগল একটা।"
"কী বলব?
"বলবি যে ভালোবাসিস।"
"সিঙ্গল ছিলি কতদিন?"
"কম করে হলেও ছয় মাস মিলিয়ে মিশিয়ে।"
"তা ছাড়া আমি চাইনি ওইসব করে বন্ধুত্বটা নষ্ট করতে।"
"ইডিয়ট। এই নাকি আমার বেস্ট ফ্রেন্ড? এইটুকুও বুঝলিনা বুদ্ধু যে এতে আমাদের বন্ধুত্ব স্ট্রং হতো।"
"আর বাই চান্স ঘেঁটে গেলে?"
"প্রেম যেত। বন্ধুত্ব কখনোই না।"
"ওরম মনে হয়।"
"বড় এসেছে আমার সবজান্তা সর্বজ্ঞানী।"
"তা হলে?"
"প্রোপোজ কর বিফোর আই সে ইয়েস টু এনিবডি এলস। লম্বা লাইন আছে।"
"আমি প্রিভিলেজড? বাবা। এই দেখ এই বললাম হুটহাট প্রেমে পড়িস না। তাও আবার প্রোপোজ করাচ্ছিস। পারিসও বটে তুই।"
"১ থেকে ১০ গুনবো। বলার হলে বল। নইলে যা পালা। ১ ২ ৩ ৪..."
"হয়েছে হয়েছে। চন্দ্রবিন্দুকে কোট করি দেবী। তোমাকে করবো আদর আত্মি যত্নম। চক্ষে এস অন্ধ হোক, কক্ষে এস নিন্দে হোক। বক্ষে এস গীতগোবিন্দ ভুলিয়া।"
"ত্বমাসি মম জীবনম?"

গীতগোবিন্দ ভুলে ততক্ষণে দুই নব্য কপোত কপোতী গভীর আলিঙ্গনে আবদ্ধ। আরে বকবকানিও থামাতে হবে, নাকি?