Saturday, August 11, 2018

আম্রিকা দর্শন পর্ব ৯



কুইনসি মার্কেট নাকি বস্টনের অন্যতম দেখার জায়গা। চেন্নাই থেকেই জেনে গিয়েছিলাম। শপিং করা যাবে। লিফট থেকে নামলাম যখন, সুজাতার মেসেজ এলো যে ও পৌঁছে গিয়েছে। এবং অবধারিতভাবে দুজনে দুই জায়গায়। ওর ফোনের চার্জ প্রায় শেষ। তাই আমিই গুগল ম্যাপ খুলে পৌঁছলাম ওর কাছে। দাঁড়িয়ে ছিল হার্ড রক ক্যাফের সামনে। প্রায় সাড়ে সাতটা বাজে। সন্ধ্যে হবো হবো। ঝিরিঝিরি বৃষ্টি শুরু হয়েছে। আমরা ঢুকলাম কুইনসি মার্কেটে। আসলে কিছুই না, একটা বড় মার্কেট কমপ্লেক্স গোছের। কোথায় গিয়ে যেনও আমাদের হগ মার্কেটকে মনে করিয়ে দিচ্ছিল। চারিদিকে দেয়ালে গাছে টুনি বাল্ব দিয়ে সাজানো। মনে হবে যেন ক্রিসমাস এসে গিয়েছে আগে আগে। তবে দোকান পাট দেখে হতাশ হলাম। খুব বেশি দাম। সাধ্যের বাইরে। বাইরে কিছু ঠ্যালাগাড়ি মতো দোকান ছিল। সেখান থেকে খুচখাচ যেটা না কিনলেই না, এমন স্যুভেনির কিনলাম। ওই ফ্রিজ ম্যাগনেট, চাবির রিং।

আমার তো ওই ফিশ ট্যাকো খেয়ে তখনও বেশ পেট ভর্তি। শুধু বড্ড জল টান হয়েছিল। তাই আইস কোল্ড ফ্যানটা কিনে ঢকঢক করে ৬০০এম এলের এক বোতল পুরোটা একসাথে খেলাম। আমার এক জেঠু বলে দিয়েছিল বস্টনে ক্ল্যাম চাউডার নাকি খুব বিখ্যাত। অবশ্যই যেন খাই। কুইনসি থেকে বেরিয়ে এলাম ফেনুইল হল চত্ত্বরে। তার উল্টোদিকেই বিল্ডিং একটা। সেখানে সারি সারি খাবারের দোকান। অনেক দোকানেই বস্টন চাউডার বিক্রি হচ্ছে। আমরা দেখে শুনে একটায় গেলাম। বেশ ভিড় ছিল। আমি শুধু টেস্ট করব, তাই সুজাতা একটাই নিলো। চাউডার মনে ওই থকথকে স্যুপ গোছের। আর ক্ল্যাম এক ধরণের সামুদ্রিক প্রাণী। চিংড়ি জাতীয়। গোটা বস্তুটা মন্দ লাগেনি। হয়তো খিদে থাকলে আরো ভালো লাগতো। ফেনুইল হল হলো বস্টন ফ্রিডম ট্রেলের অন্যতম পয়েন্ট। আমেরিকার সিভিল যুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত। মহৎ জায়গা। ফ্রিডম ট্রেল আড়াই কিলোমিটার মতো হাঁটা পথ। জায়গায় জায়গায় সেখানে সিভিল ওয়ারের চিহ্ন। আমরা কেউই ইতিহাস নিয়ে অত উৎসাহী নয়। আর হাতে সময়ও কম। তাই ফ্রিডম ট্রেল বাদ। তবুও কপাল জোরে এই চত্বরটা দেখা হলো। সামনেই একটা এট্রিয়াম মত। দুইজন ছেলে গিটার বাজিয়ে লাইভ শো করছিল। খেতে খেতে শুনতে মন্দ লাগছিলো না। অনেকেই ওদের রাখা বাক্সে সাধ্যমতো ডলার বিল রাখছিল। শিল্পের কদর করি কিন্তু পকেটের টান। তাই ইচ্ছে থাকলেও এক ডলারের চেয়ে বেশি রাখতে পারিনি। খাওয়ার পাট মিটিয়ে আবার গাড়ি ডেকে বাড়ি ফেরা।

পরেরদিন আমাদের বস্টন ছাড়ার কথা। এয়ার বিএনবির চেকাউট টাইম দুপুর বারোটা। এদিকে আমাদের সন্ধ্যেবেলা বাস সাড়ে সাতটায়। এতক্ষন কী করব? আলেকজান্দ্রিয়াকে ফোন করে আমরা বললাম আমাদের অবস্থা। ও বললো কোনো অসুবিধে নেই। লিভিং রুমে লাগেজ রেখে বেরিয়ে যেও। বিকেলে নিয়ে নিও। আমরাও খুব খুশি হয়ে গেলাম। সেই আনন্দে ঝটপট ব্রেকফাস্ট আমিই বানালাম সেদিন। একই মেনু। সাথে আপেল। ইতিমধ্যে আমি মার্কিনি কায়দার গ্যাস ওভেন ব্যবহার শিখে মজা পেয়ে গিয়েছি। বাড়িতে ফোন করে ভিডিও চ্যাট করতে করতে রান্না করা আর তারপরে ওয়াটসএপ কলের মাধ্যমেই রেডিও মির্চি কলকাতা শোনা। চেন্নাইতে থাকতে মিরের কণ্ঠে ঘুম কাটাতাম। ওখানে টাইম জোনের দৌলতে অগ্নির হৈচৈ ক্যাফে শুনতে শুনতে একই কাজ হয়ে যেত। সত্যি, প্রযুক্তি আমাদের কোথায় নিয়ে গিয়েছে, না?

সুজাতার ইচ্ছে ছিল বেশ কয়েকটা টক শুনবে। আমার মতলব ছিল ঝিমনোর। তবে লাঞ্চ সেশন অবধি টক শুনে ও হল ও হাল দুইই ছেড়ে দিলো। টার্কি স্যান্ডউইচ দিয়ে লাঞ্চ সেরে আমরা ম্যারিওটের লবিতে বসে ভাবতে লাগলাম, কোথায় যাওয়া যায়। বস্টনের ডাক ট্যুরস বিখ্যাত। বিশ্বযুদ্ধের সময়ের কিছু গাড়িকে রং চং করে সাজিয়ে গুছিয়ে ট্যুরিস্টদের ঘোরানো হয়। বস্টনের মূল কিছু দর্শনীয় স্থান দেখায়। আর তারপর সেই একই গাড়ি জলে নেমে যায় স্কাইলাইন দেখাতে। ওই জন্যই নাম ডাক ট্যুরস। হাঁসের মতো জলে ও স্থলে উভয়েই চলে বলে। আমাদের শখ হয়েছিল। কিন্তু অস্বাভাবিক দাম। দেড় ঘন্টা ঘোরাবে, তাতে মাথাপিছু পঁয়তাল্লিশ ডলার। এছাড়া আবার টিপস থাকবে। লবিতে বিভিন্ন ট্র্যাভেল এজেন্সির হপ অন হপ অফ ট্যুরের ব্রোশ্যার দেখলাম। কিছুই ট্যাঁক ফ্রেন্ডলি হচ্ছিল না। আসলে শহরটার দেখার জায়গা খুব বেশি নেই। তাই ওই অত দাম ঠিক জাস্টিফাই করতে মন চাইছিল না। কী করা যায় ভাবতে গিয়ে ঠিক করলাম বেশ একবার না হয় চার্লস নদীর ধারে যাই। তারপর ভাবা যাবে। যেমন ভাবা তেমন কাজ। ক্যাব বুক করে রওনা দিলাম আমরা লঙ ওয়ারফ ওয়াটারফ্রন্টে। পথে অন্য যাত্রীকে নামবে বলে আমরা চায়না টাউন দেখে ফেললাম। বস্টনের বুকে এক টুকরো চায়না। দোকান বাজার ব্যাংক অফিস। সর্বত্র চাইনিজ ভাষায় লেখা। প্রচুর চাইনিজ লোকজন। দেখার মতোই জায়গা। স্রেফ কপাল করে আমরা দেখে ফেললাম, প্ল্যানে না থাকলেও। পায়ে হেঁটে ঘুরলে এর চেয়ে বেশি কিছু হতো বলে মনে হয় না।

ওয়াটারফ্রন্ট পৌঁছে দেখি এলাহী কান্ডকারখানা। একটা বিরাট ইয়াচ দাঁড়িয়ে। ওয়েল ওয়াচিং করায়। এক পিঠ আটাত্তর ডলার। আঁতকে উঠলাম। সর্বনাশ। পঁয়তাল্লিশএর ধাক্কা এড়াতে এসে আটাত্তর। নাহ, এও গেল। তাহলে? সামনেই ছিল নিউ ইংল্যান্ড অ্যাকওয়ারিয়াম। বেশ পকেট ফ্রেন্ডলি। তিরিশ ডলারের মধ্যেই হয়ে যাচ্ছে। সময়ের অভাবে আমরা থ্রি ডি মুভি শো মিস করলাম। ঢোকার আগে আবার বাইরে দাঁড়ানো স্টল থেকে আরেক প্রস্ত স্যুভেনির শপিং করলাম দুজনেই। এক ভারতীয় গ্রুপের সাথে দেখা হলো। দুই প্রবীণ দম্পতি। ছেলে মেয়েরা এখানে থাকে। ঘুরতে এসেছেন এখানে। মূলত ওদের উৎসাহে অ্যাকওয়ারিয়ামের টিকিট কেটেছিলাম। খানিকক্ষণ বাইরেটা দেখলাম। কত লোক। সব নদীর ধারে ছোট ছোট ক্যাফেতে বসে খাচ্ছে আর প্রাকৃতিক দৃশ্য উপভোগ করছে। অনেকে ক্রুজের অপেক্ষায়। এক দল লোক ফিরলো ক্রুজ থেকে। মুখে হাসি। হয়তো দারুন কিছু দেখেছে।

অ্যাকওয়ারিয়ামের ভিতরে ঢুকে প্রথমেই গেলাম সি লায়ন দেখতে। ফার সিল ও সি লায়ন দুইই একই এনক্লোজারে রাখা। অতীব মিষ্টি প্রাণীগুলো। দিব্যি জলের মধ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে। কেউ কেউ পাথরে শুয়ে আলসেমি করছে। তারপর গেলাম মূল অ্যাকওয়ারিয়ামে। সেখানে শুরুতেই রয়েছে আফ্রিকান পেঙ্গুইনের দল। বেঁটে খাটো সাদা কালো এই প্রাণীগুলো গুটিগুটি পায়ে হেঁটে যাচ্ছে। জলে লাফাচ্ছে। খাচ্ছে। দেখতে ভারি মজা লাগলো। খানিক্ষণ দাঁড়িয়ে ওদের দেখলাম। ছবিও তুললাম। তারপর এগোলাম অন্য দিকে। গোটা জায়গাটা একটু আলো আঁধারী মতো। নীল হালকা একটা আলোর মৃদু আভা। অনেকটা কোনো থিমের পুজোর প্যান্ডেল যেন। একটা ওয়েলের বিরাট কঙ্কাল সাজিয়ে রাখা। এরপর ramp বরাবর পরপর বিভিন্ন ইকো সিস্টেমের মিনিয়চার। বহু বহু প্রজাতির মাছ ও অন্যান্য সামুদ্রিক স্পিসিজ। যেমন কোরাল স্টারফিশ জেলিফিশ ইল কচ্ছপ ইত্যাদি। একটা জায়গায় সাপ (আমি দেখেই পালিয়েছি)। প্রত্যেকটা এনক্লোজারে বাইরে সেই প্রাণী সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য দেওয়া। চারতলা সমান জলের ট্যাঙ্কে ডুবুরিরা নেমে মাছেদের ও অন্যান্য পশুদের খাবার দিচ্ছে, দেখলাম। অন্ধকারের জন্য ভালো ছবি না উঠলেও চাক্ষুস দেখার অভিজ্ঞতা বেশ বেশ ভালো। মনে হলো স্কাইলাইন বা ওয়েল ক্রুজ না করে খুব ভুল করিনি। এটা মোটামুটি পয়সা উসুল। সব দেখে টেখে বেরোতে বেরোতে প্রায় চারটে। গত দুদিন সূর্যের আলো দেখে সময় বুঝতে গিয়ে খুব ঠকান ঠকেছি। আজ তাই কব্জি ঘুরিয়ে সময় দেখা। সন্ধ্যের বাস। মিস করলে মুশকিল। বস্টনের ঘোরাঘুরিকে আপাতত বিদায় জানিয়ে এরপর ফিরলাম বাড়ি। ফ্রিজ থেকে আমাদের ফলমূল ও চীজকেক বের করলাম। প্যাক করে নিতে হবে। ফোনেও চার্জ চাই। আর ঘন্টাখানেক সোফায় লম্বা হয়ে শুয়ে রেস্ট।

ছটা নাগাদ মালপত্র নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। গ্রে হাউন্ড বাস স্ট্যান্ডের উদ্দেশ্যে। পরের গন্তব্য নায়াগ্রা।


আম্রিকা দর্শন পর্ব ৮


আমি বেশ চিল্ড আউট পাবলিক। বিকেলে আমার পোস্টার প্রেজেন্টেশন। সেই নিয়ে কোন তাপ উত্তাপ নেই। দিব্যি সকালবেলা আড়মোড়া ভাঙতে ভাঙতে উঠলাম। ইতিমধ্যে দেখি সুজাতা উঠে পড়েছে। ধীরেসুস্থে ফোন পর্ব শেষ করে স্নান টান সেরে যখন বেরোলাম, দেখি সুজাতা ইতিমধ্যে আমার আর ওর জন্য ব্রেকফাস্ট রেডি করে ফেলেছে। বেগেল টোস্ট, সাথে চীজ স্প্রেড আর অনেকটা ডিম ভাজা। যেহেতু টেট্রাপ্যাকের ডিম আর বাসনেরও অভাব ছিল, ব্যাপারটা অমলেট বা পোচ না হয়ে তৈরি হল ওই অলমোস্ট স্ক্র্যাম্বল্ড এগস। খেয়ে দেয়ে গেলাম কপ্লি প্লেসের ম্যারিওটে। সারাদিন বেশ বোরড হলাম। আমার না লেকচার টেকচার শুনলে বড্ড ঘুম পায়। খুব কষ্ট করে জেগেছিলাম। দুপুরে কনফারেন্সেই লাঞ্চ দিয়েছিল। চিকেন স্যান্ডুইচ, আপেল, কুকি, চিপস আর ড্রিঙ্কস। অল্পবিস্তর খাওয়াদাওয়া করে আমি একটু লবিতে রইলাম। ফোনে প্রেজেন্টেশনটা দেখে টেখে একটু মেন্টাল প্রিপারেশন নেওয়া আর কি। সময় মতো পোস্টার সেশন শুরু হল। শেষও হল। কিছু অতি উৎসাহী মানুষজন এলেন। তাঁদের আমার কাজ সম্পর্কে বললাম। ব্যস, মিটে গেল কাজের কাজ। এইবার শুধুই ভ্রমণে মন দেওয়া যাবে।
বেরোতে বেরোতেই প্রায় সাতটা হয়ে গিয়েছিল। আমরা হাঁটতে হাঁটতে হেলতে দুলতে রওনা দিলাম আমাদের থাকার জায়গার উদ্দেশ্যে। পথে পড়ল বিখ্যাত চীজকেক ফ্যাক্টরি। এই দোকানের চেনটি গোটা অ্যামেরিকা জুড়ে আছে। এখন তো বোধহয় অন্যান্য কিছু দেশেও খুলেছে ব্রাঞ্চ। চীজকেক ফ্যাক্টরির বৈশিষ্ট্য কি কিছু আছে? তেমন না। শুধু এই যে থরে থরে সাজানো বিভিন্ন ফ্লেভারের অনন্য স্বাদের (এবং অবধারিতভাবে প্রচণ্ড পরিমাণে ক্যালরিযুক্ত) পরম সুস্বাদু চীজকেক। এ ছাড়াও আরো অন্যান্য খাবার আইটেমও পাওয়া যায় অবশ্যই। আমরা যারা খুব জনপ্রিয় টিভি সিরিজ দ্য বিগ ব্যাং থিওরি দেখে আনন্দ পাই, তাদের কাছে দ্য চীজকেক ফ্যাক্টরির আলাদা টান, কারণ এখানেই সিরিজের প্রিয় ক্যারেক্টাররা মাঝে মাঝেই এসে খেতেন, মঙ্গলবার করে। আমরা তো দুজনে ঢুকলাম দোকানে। দাম দেখে একটু ছ্যাঁকা খেলাম। তবে সুজাতার অবস্থা আমার চেয়ে বেটার, ও স্টাইপেন্ড পায় ডলারে। আমার মতো প্রতিবার এক ডলার মানে তখন উনসত্তর যাচ্ছে, এরকম ভাবতে হচ্ছেনা। ওই বলল, এটা ওর ট্রিট। আমার অ্যামেরিকা আসাকে সেলিব্রেট করতে। লেমন চীজকেক পছন্দ করে নিলাম। দাম খেয়াল নেই, তবে ওই টিপস দিয়ে টিয়ে প্রায় কুড়ি ডলারের কাছাকাছিই হবে। বেশ বড় পিস, দুজনে মিলে আরাম করে খাওয়া যায়। আর সাথে প্রচুর চেরি দেওয়া। ফেরার পথে রাস্তায় একটা বিশাল বিল্ডিং ছিল, কীসের কী, জানিনা। আন্ডার রেনোভেশন ছিল। তার সামনে বেশ বড় একটা ফোয়ারা ছিল। সেখানে বাচ্চারা ছোটাছুটি করে খুব মজা করছিল দেখলাম। আমরা ধারে বসলাম খানিক। একটু চিজকেক খেলাম। বাইরে তখন রোদ পড়ে আসছে। ঘড়ির কাঁটায় সাড়ে সাতটা বেজে গিয়েছে। ডেজারট গুছিয়ে রেখে হাঁটা লাগালাম। গতকালের ওই জঘন্য চাইনিজ ডিনারের পর ইচ্ছে ছিল আজ রাত্রে ভালো কিছু খেতে হবে। তাই গেলাম ক্যুডোবা নামের এক মেক্সিকান রেস্টুরেন্টে। মেনু দেখে আমার তো ওই ভগবান জানে এসব কী, খায় না মাথায় দেয় অবস্থা। সুজাতার জিম্মায় ছেড়ে দিলাম অর্ডার করার দায়িত্ব। আমরা নিলাম চিকেন বারিটো রাইস বোল। বানালো আমাদের সামনে। কিছুই না। ওই রাজমা চাউলকে বিদেশি নাম ও সাজ দেওয়া। রাজমা, ভাত এর সাথে কিছু টক ঝাল সস, প্রচুর শসা পিঁয়াজ ও টমেটো মিশিয়ে একটা চাট চাট ব্যাপার। ভিতরে মাংসের টুকরো ভালো মতোই। খেয়েদেয়ে ফিরলাম বাড়ি। পরেরদিন সুজাতার প্রেজেন্টেশন। ও খুব সিরিয়াস এইসব ব্যাপারে।আমি ভাবতে বসলাম আমার দিনপঞ্জি কী হতে পারে। বস্টনে ঘোরার মতো খুব বেশি কিছু নেই। তাও তার মধ্যে যা যা দেখার আছে, সেখান থেকে কিছু একা একা ঘুরে নেওয়া যায় কি না।
আমার আই আই টির জ্যুনিওর দেবজ্যোতি হার্ভার্ডে পি এইচ ডি করছে। ওকে বলে রেখেছিলাম আমায় হার্ভার্ড ঘোরাতে। বস্টন এসে ওই পাড়ায় না যাওয়াটা পাপ। ওকেই তাই জিজ্ঞেস করলাম মেসেজ করে। পরেরদিন ওর কী প্ল্যান প্রোগ্রাম। বলল লাঞ্চ টাইমে চলে এসো। ব্যস। আমারও প্ল্যান সেট। কোনমতে ঘুমোতে ঘুমোতে প্রথম সেশন কাটালাম কনফারেন্সে। সুজাতার ল্যাপটপটা বিগড়েছিল। ও মাঝপথেই ছুটল অ্যাপল স্টোরে। আমি লিফট শেয়ার ডেকে রওনা দিলাম কেম্ব্রিজের দিকে। বস্টন আর কেম্ব্রিজ (যেখানে হার্ভার্ড), আমাদের হাওড়া কলকাতার মতোই। গঙ্গার বদলে চার্লস নদী।
ইউ এসে যেটা এই দুদিনেই বুঝে গিয়েছিলাম, মানুষজনের সৌজন্যবোধটা খুব বেশি। ক্যাবেই যাও কী দোকানে, প্রথমেই হাই, হাউ আর ইউ যেন বলতেই হবে। সাথে অবশ্যই চওড়া হাসি। আমিও ক্যাবে উঠে চালককে হাই হ্যালো করলাম। ভদ্রমহিলা চালক। মাঝবয়সী। দারুণ লাগল ব্যাপারটা দেখে। ভারতে তো কোনদিনও এমন দেখিইনি। অথচ মার্কিনে বেশ কয়েকবার মহিলা চালিত শেয়ার ক্যাব দেখলাম।  ঝলমলে আকাশ। রোদ। ট্র্যাফিক তেমন বেশি না। আমি একটু ভদ্রমহিলার সাথে গল্প করার চেষ্টা করলাম। আহা কী সুন্দর ওয়েদার বলে টলে। তবে দেখলাম উনি হয়ত স্বচ্ছন্দ নন। আমিও চুপচাপ জানালর বাইরে মন দিলাম। চওড়া রাস্তা। গাড়ি চলছে অনেক। ক্রমে আমরা পড়লাম একদম নদীর ধারের রাস্তায়। বেশ লাগছিল। গাড়িতে চলছে এফ এম। সেখানে কিছু চেনা সাম্প্রতিক ইন্টারন্যাশনাল হিটস বাজছে (শেপ অফ ইয়ু, ডেস্পাচিতো)। পাশ দিয়ে নদী। সাড়ে বারোটা নাগাদ পৌঁছলাম হার্ভার্ড স্কোয়ারে। দেবজ্যোতির দেখা নেই। ফোন করলে দেখি রিসিভ করছেনা। ওয়াটসঅ্যাপেও সারা নেই। এই রে। গেলো কোথায় ছেলেটা। ভাবতে ভাবতে দেখি সে হাজির। আমায় ক্যাবে আসলে নাকি ভুল জায়গায় নামিয়েছিল। বেশ।
কেমন আছ/আছিস এইসবের পালা মিটিয়ে শুরু হল আমাদের হার্ভার্ড ভ্রমণ।
অভিজ্ঞ ট্যুরিস্ট গাইডের মতো আমায় সমস্ত কিছু বোঝাল, দেখাল। গোটা কেম্ব্রিজ চত্বরের যে বেশিরভাগ বাড়িই হার্ভার্ড ইয়ুনিভারসিটির সেটা জানলাম। এবং সেই সমস বাড়িকে প্রায় চেনার একটা অব্যর্থ উপায় হল বাড়ির রঙ। একটা সিগনেচার লালচে দেওয়াল। পুরনো আর্কিটেকচার। মেন গেট দিয়ে ঢুকলাম হার্ভার্ডে। বিশাল সবুজ লন। আর আরেকটু এগোলেই ঐতিহাসিক হার্ভার্ডের স্ট্যাচ্যু। দেখলাম ট্যুরিস্টের ভিড় সেখানে। এই স্ট্যাচ্যুটা হার্ভার্ডে আসলে দেখেই দেখে লোকে। এটিকে বলা হয় স্ট্যাচ্যু অফ ঠরই লাইজ। অর্থাৎ, তিনটি মিথ্যের স্ট্যাচ্যু। প্রথমটি হল বলা হয় এটিই হার্ভার্ডের প্রতিষ্ঠাতা জন হার্ভার্ডের স্ট্যাচ্যু। আসলে কিন্তু আদপেই এটি জন হার্ভার্ডের মূর্তি না। দ্বিতীয়ত হার্ভার্ড মোটেই সেই অর্থে ইউনিভারসিটির প্রতিষ্ঠাতাও নন। উনি প্রথম অনুদান করেছিলেন ইউনিভারসিটির জন্য, তা ঠিক। তৃতীয়ত মূর্তিতে লেখা হার্ভার্ড প্রতিষ্ঠা হয় ১৬৩৮এ। আসলে তা না। হয় আরো দুই বছর আগে। বলা হয় এই মূর্তিতে মাথা ঘষে গেলে নাকি কপাল ফেরে। পরীক্ষার্থীরা পরীক্ষা দিতে যাওয়ার আগে তা করে যায় নিয়মিত। ট্যুরিস্টও তাই করে। আর তাই এই স্ট্যাচ্যুটি বেশ চকচকে। আমার অবশ্য মাথা ঠোকা বা পাশে পোজ দিয়ে ছবি তোলা কোনটাই হয়নি। অত ভিড় ঠিক ইচ্ছে হয়নি। দূর থেকেই ছবি তুলেছি।
এরপরে আমাদের গন্তব্য ছিল ওয়াইডনার লাইব্রেরি। এটি হার্ভার্ডের তথা পৃথিবীর সমস্ত ইউনিভারসিটির মধ্যে সবচেয়ে বড় লাইব্রেরি। যখন লাইব্রেরিটি বানানোর জন্য অনুদানা সে, তখন একটি শর্ত ছিল যে বাইরের ফ্যাসেডটি বদলানো যাবেনা। কিন্তু দিন যত এগিয়েছে, লাইব্রেরির কালেকশনে বই ততই বেড়েছে। কী উপায়? বুদ্ধি খাঁটিয়ে এবং স্থাপত্যবিদ্যার যথাযথ প্রয়োগ করে বর্তমানে বিল্ডিঙটির ছতলা ওপরে এবং মাটির নিচে আরো বারোতলা রয়েছে। একেই এতোগুলো তলা, তার ওপর এরিয়াও বিশাল। একেকটি ফ্লোর নর্থ ইস্ট ওয়েস্ট সাউথ উইঙে বিভক্ত। মোটামুটি সারা পৃথিবীতে যত ভাষায় যত বই প্রকাশ হয়, প্রত্যেকটার একেক কপি অন্তত এই লাইব্রেরিতে আছে। আমি দুটো ফ্লোর ঘুরেছিলাম। তাও সমস্ত উইং না। কিন্তু তাতেই ওই অত অত বই দেখে মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। হিউম্যানিটিজ থেকে সায়েন্স, টেকনোলজি থেকে ফিল্ম, যা চাই, সব আছে। আর অসামান্য ক্যাটালগিং সিস্টেম। দেবজ্যোতির কাছে শুনলাম যে এই লাইব্রেরি থেকে বিভূতিভূষণ তুলে পড়েছে যেমন, তেমনি প্রচুর ওল্ড ইংলিশ ক্লাসিক সিনেমাও দেখেছে। বিপুল সম্ভার। রিডিং রুমগুলোও অপূর্ব। সেই স্থাপত্য যে কোন মধ্যযুগীয় রাজপ্রাসাদকে হ্যাঁর মানাতে পারে কারুকার্যে। ও ওর প্রিয় স্পট দেখাল। জানলার ধারে সোফা আর টেবিল পাতা। বাইরে হার্ভার্ড লন দেখা যাচ্ছে। বেশ কফি কাপ হাতে আরামে পা ছড়িয়ে বসে সারা দিন কাটিয়ে দেওয়া যায়, এমন সুন্দর।
এরপরের গন্তব্য মেমোরিয়াল হল। এই মেমোরিয়াল হলেই রয়েছে স্যান্ডারস থিয়েটার। সিনেমা স্ক্রিনিং হয়। অক্সফোর্ডের এক থিয়েটার হলের অনুকরণে তৈরি এই হলটি নাকি তার অ্যাকস্টিক ও ডিজাইনে রজনয় বিখ্যাত।  ভিতরে ঢুকতে পারিনি। বাইরে থেকে দেখলাম।তার পাশেই রয়েছে অ্যানেনবারগ হল। এটি মূলত স্টুডেন্টদের ডাইনিং হল। এবং তারপরে রয়েছে মেমোরিয়াল ট্রান্সেপ্ট। যারা যারা হ্যারি পটারের সিনেমা দেখেছেন, হগওয়ারটসের প্রাসাদ যেমন রাজকীয় দেখিয়েছে, তার চেয়ে কোন অংশে কম না। রঙ্গিন কাঁচের জানলা, বিশাল উঁচু দেওয়াল। সেই দেওয়াল জুড়ে নাম লেখা সিভিল ওয়ারের সময় হার্ভার্ডের যে সমস্ত মানুষ মৃত্যুবরণ করেছিলেন ইউনিয়নের জন্য।
ইতিমধ্যে দুপুর দেড়টা বেজে গিয়েছে। খিদে খিদে পাচ্ছে। আমরা গেলাম লাঞ্চ সারতে। কেম্ব্রিজ কমন্স বলে একটি রেস্টুরেন্টে। টিপিকাল অ্যামেরিকান রেস্টুরেন্ট। ভিতরটা লাল (আর অল্প কালো) রং। সেদিন ফ্রান্স আর বেলজিয়াম (বোধহয়, খেয়াল নেই) ম্যাচ চলছিল। রেস্টুরেন্ট ভর্তি লোক। সবার হাতে বিয়ার, প্লেটে খাবার আর দুই চোখ টিভি স্ক্রিনে। আমরা গিয়ে বসলাম। ফিস ট্যাকো আর ব্রাউনি উইদ আইসক্রিম সহযোগে বেশ হেভি লাঞ্চ হল। পকেটেও হেভি (জনপ্রতি টিপস সহ ২৪ ডলার), পেটও ভালোই ভরেছিল। ওই দুপুরের চড়া রোদে ঘুরতে ঘুরতে বড্ড টায়ার্ড হয়ে গিয়েছিলাম। গেলাম দেবজ্যোতির হোস্টেলে। আই আই টির হোস্টেলে সীমিত পরিকাঠামোয় অভ্যস্ত। হার্ভার্ডের হোস্টেল দেখে থ। হোটেলের ঘর বলা চলে প্রায়। সুন্দর এসি লাগানো ঘর, সাথে আবার অ্যান্টি রুম। আরামকেদারা। বেশ কোজি অ্যান্ড কমফোর্টেবল। গল্প করলাম খানিক। ও স্নান করতে গেল যখন, আমি মনের সুখে ওর বইয়ের তাক ঘাঁটলাম।
আমাদের ইচ্ছে ছিল কমন রুমে বসে ম্যাচের দ্বিতীয়ার্ধ দেখবো। কিন্তু বকবক করতে করতে আর তা হয়ে ওঠেনি। চারটের দিকে বেরোলাম আরো বাকি জায়গাগুলো ঘুরতে। পরপর বিভিন্ন ডিপার্টমেন্টের বিল্ডিং দেখলাম। নিজে বায়োলজির স্টুডেন্ট বলে বায়োসায়েন্সের বিল্ডিং দেখে বেশ একটা অন্যরকম অনুভূতি হল। ডি এন এ ডবল হেলিক্সের আবিষ্কারের যুগান্তকারী কাজ যেখানে বসে হয়েছে, সেটিও  দেখলাম বটে। সমস্ত দিকপাল মানুষজনেরা যেই যেই ল্যাবে কাজ করেন, সেই ল্যাবগুলি চাক্ষুস দেখলাম। অমর্ত্য সেনের অফিস বিল্ডিঙটিও দেখলাম। কী অসম্ভব নিষ্ঠা ও মনোযোগ দিয়ে স্কলাররা কাজ করেন, তাঁদের ল্যাব, অফিস...সত্যি, পীঠস্থান বটে।  মেকানিক্স বিল্ডিঙের চিলেকোঠায় বসে যে হার্ভার্ডের একটা দারুণ রূপ দেখা যায়, সেই অভিজ্ঞতাও হল। সাধারণ ট্যুরিস্টের চেয়ে ঢের বেশিই চিনলাম যেন হার্ভার্ডকে। ল স্কুলের সামনে সেই স্থাপত্য দেখে খানিক মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইলাম। তারপর চললাম নদীর ধার দিয়ে হাঁটতে। চার্লস ওয়াটারফ্রন্ট যার পোশাকি নাম। নদীর অপরদিকে অলস্টন আর বস্টন শহর। নদীতে কেউ কায়াকিং করছে, কেউ বা এমনিই ধারে বসে। কেউ রোয়িং করছে তো কেউ রাস্তা দিয়ে সাইকেল চালিয়ে যাচ্ছে। মাঝে মাঝেই সুন্দর বেঞ্চ পাতা। আমরা একবার বসে একটু জিরোলাম। পিঠে ব্যাগ। একদম কনফারেন্স থেকে চলে এসেছি, সাথে আবার ভারি ক্যামেরা। একটু টায়ার্ড লাগছিল। নদীর ধারে রাস্তা পার হলে সারি দিয়ে স্টুডেন্টদের থাকার জায়গা। স্টুডেন্ট হাউজিংগুলিও একেকটা দেখার মতো স্থাপত্য।
হাঁটতে হাঁটতে আমরা পৌঁছলাম ম্যাগাজিন বিচে। ছোট্ট একটু জায়গা। নদীর জলে পৌঁছনো যায়। দেবজ্যোতি জলে নামল। আমি আবার জুতো মোজা খোলার চক্করে যেতে হবে বলে নামলাম না। পটাপট কিছু ছবি তুললাম। ইতিমধ্যে সুজাতা জানালো ও রেডি। বেরিয়ে পড়ছে। আমি বেশ টায়ার্ড, তাই আরো হেঁটে এম আই টি অবধি গেলাম না। দেবজ্যোতি বলেছিল যে এম আই টিতা ঠিক সুন্দর না। মানে হ্যাঁ, সেন্টার ফর এক্সিলেন্স বটে, কিন্তু হার্ভার্ড যেমন সুন্দর, দেখে ভালো লায়ে, তেমন কিছুই না। আর তাই আফসোস না করেই লিফট ডেকে ফেললাম। যেখানে ক্যাবে উঠলাম, সেখানে দেখি একটা ওপেন এয়ার জিম। দিব্যি ইনোভেটিভ লাগল ব্যাপারটা। খোলা আকাশের নিচে শারীরিক কসরত, কিন্তু সমস্ত সফিস্টিকেটেড ইক্যুইপমেন্টস দিয়ে। ভারতবর্ষে এদিন আসতে কত দেরি কে জানে।

Wednesday, August 8, 2018

আম্রিকা দর্শন পর্ব ৭

এই প্রথম আমার কোন  এয়ার বিএনবিতে থাকার অভিজ্ঞতা হল। কনসেপ্টটা এরকম যে কারুর বাড়ি, কখনো গোটাটা বা কখনো কোন একটা ঘর (কখনো তো শুনেছি শুধু একটা কাউচও) ভাড়া দেওয়া হয়। আইডিয়ালি বিএনবি অর্থাৎ বেড অ্যান্ড ব্রেকফাস্ট। হোটেলে থাকার চেয়ে তুলনামুলকভাবে সস্তা হয়। আমরা ছিলাম আলেকজান্দ্রিয়ার বাড়ি। একটা ডাবল বেডরুম আমাদের বুক করা ছিল। এ ছাড়া লিভিং রুম, ওয়াশরুম এবং কিচেনে যাওয়ার অনুমতি ছিল। সুজাতা একদম ভোরবেলা পৌঁছে গিয়েছিল। ও আলেকজান্দ্রিয়ার থেকে চাবি নিয়ে রেখেছিল। হোটেলের তুলনায় এয়ারবিএনবির আরো একটা সুবিধে হল, চেক ইন চেক আউটের সময় নিয়ে বেশ ফ্লেক্সিবল। তাই ঘর খালি ছিল বলে ওকে দুপুরের আগেই ঢুকতে দিয়েছিল। আমরা যখন স্টেশন থেকে এলাম, দেখলাম বাড়ি ফাঁকা। প্রসঙ্গত আগামী তিনদিন আলেকজান্দ্রিয়া বাড়ি আসেনি। গোটা বাড়ির স্বাধীনতা ছিল আমাদের। লাগেজ রেখে ফ্রেশ হয়ে ঠিক হল কিছু খেতে হবে। দুপুরবেলা। আর সাথে কিছু বাজার করতে হবে ব্রেকফাস্টের জন্য। আমরা অ্যাপ দেখে বেরোলাম। হাঁটা পথের মধ্যেই ছিল একটি চাইনিজ রেস্টুরেন্ট। ব্রিঘাম রোড চাইনিজ। ম্যাপ দেখছি। অথচ কিছুতেই দোকান খুঁজে পাচ্ছিনা। চর্কির মতো চক্কর কাটছি। একবার ভাবলাম তাহলে হয়তো ডিপারট্মেন্টাল স্টোরের মধ্যে রয়েছে। সেখানে খুঁজতে ঢুকলাম। দোকান পেলাম না বটে। কিন্তু স্টপ অ্যান্ড শপে হদিস পেয়ে গেলাম আমাদের ব্রেকফাস্টের জিনিসপত্র। প্রচুর ফল সবজি দুধ ডিম ব্রেড কেক রান্না করা প্যাকেজড খাবারের বিরাট সম্ভার। এ ছাড়াও সাধারণ ডিপারটমেন্টাল স্টোরের মতই সব কিছু রয়েছে। গুগল ম্যাপ ভুল বলবে, কিছুতেই বিশ্বাস হচ্ছিলনা। আবার বেরোলাম। অনেক কষ্টে খুঁজে পেলাম। মেনু কার্ড দেখে তেমন কিছু না বুঝে অর্ডার তো করলাম একটা লার্জ চিকেন ফ্রায়েড রাইস। বিল দেওয়ার সময় প্রথম জানলাম অ্যামেরিকার টিপিং কালচার। অন্তত ১০ থেকে ১৫ শতাংশ টিপ দেওয়াটা অলিখিত নিয়ম। দোকানটি সেলফ সার্ভিস। খাবার এলো একটা কাগজের বাক্সে, প্লেট নিয়ে আমরা খাওয়া শুরু করলাম। আমাদের কেরলের সিগনেচার মোটা চালের মতো চাল, আবার অনেক সয়া সস ঢালায় বেশ খয়েরি। ভর্তি চিকেনের টুকরো। কিন্তু বিশেষ স্বাদ নেই। কোনমতে আদ্ধেক খেয়ে বাকিটা প্যাঁক করে নিলাম। ডিনারে কিছু একটা ব্যবস্থা করা যাবে ভেবে।
এরপর আবার স্টপ অ্যান্ড শপ থেকে ডিম দুধ ফল আর আমার জন্য লেমোনেড নিলাম। সাথে লেমন টারট। খুব পছন্দের খাবার আমার। ডিম নিলাম কিন্তু টেট্রাপ্যাকে। কত কিছুই দেখবো! বেশ ডিম ভাঙ্গার চিন্তা নেই। ফ্যাটানোও সোজা। বাড়ি ফিরে সব ফ্রিজে চালান করে সটান বিছানায়। পর্দা টানা। ঘরে তাই আলো নেই। সেন্ট্রাল কুলিং। অ্যাডজাস্ট করার জন্য আবার আলেকজান্দ্রিয়াকে ফোন করতে হবে। ধুর, কম্বল লেপ আছে। গায়ে দিয়ে শুয়ে পড়ো। কিন্তু ঘুমবো বললে কি ঘুম হয়? এত বছর পরে দেখা। গল্পের স্টক যে উপচে পড়ছে।  তার মধ্যেও প্রচণ্ড ক্লান্তির জেরে ঘন্টাখানেক ঘুমলাম। পাঁচটার পর উঠে ঠিক হল পরেরদিন যেখানে কনফারেন্স, সেইখানে একবার ঘুরে আসলে হয়। এমনিও পরেরদিনেই আমার পোস্টার প্রেজেন্টেশন, আজ টাঙ্গিয়ে আসতে পারব।
রেডি হয়ে বেরোলাম। সাড়ে পাঁচটা। ঝলমলে আলো।  কে বলবে এই সময়। ঘড়ি না দেখলে খালি মনে হবে দুপুর দুটো হয়তো। আবার ম্যাপের শরণাপন্ন হলাম আমরা। দেখাচ্ছে হাঁটা পথে মিনিট কুড়ি পঁচিশ। পরে হাঁটতে গিয়ে বুঝেছিলাম যে ওইসব বুঝি মার্কিনী পায়ের মাপ অনুযায়ী। আমার এই এইটুকু (সত্যি বলছি। আমার জুতোর মাপ ২ থেকে ৩) পা ফেলে ফেলে পৌঁছলাম প্রায় চল্লিশ মিনিট পর। অবশ্য চারিদিকে রাস্তা দেখতে দেখতে। পথে পড়ল ম্যাসাচুসেটস ইন্সটিট্যুট অফ ডিজাইনের বিল্ডিং। বেশ মডার্ন আর্ট মার্কা দেখতে। নর্থ ইস্টার্ন ইউনিভারসিটি। ছড়িয়ে ছিটিয়ে। প্রচুর দোকান। বিশাল বিশাল বাড়ি। নীলচে রঙের না হলেও কাঁচের ওপর নীল আকাশের রিফ্লেকশন।  আমাদের তুলনায় উল্টোদিক দিয়ে গাড়ি যায়।
প্রচুর গাড়ি। বাসও চলছে। বাসগুলোর নির্দিষ্ট স্টপেজ রয়েছে অবশ্যই। সুন্দর ছাউনি দিয়ে বানানো স্টপ। আবার রাস্তার মাঝখান দিয়ে টি-লাইন চলে গিয়েছে। মাঝে মাঝে ঘটাং ঘটাং করতে করতে ট্রেন যাচ্ছিল। ওই চারতে কম্পারটমেন্টের। আমরা যে রাস্তা ধরে যাচ্ছিলাম, হান্টিংটন অ্যাভেন্যু, সেটার ওপর দিয়ে টি-এর গ্রিন লাইন যায়। এছাড়াও ছিল অরেঞ্জ, রেড, ইত্যাদি। বাসে উঠে একজ্যাক্ট চেঞ্জ দিতে হয়। আর একবারের টিকিট কাটলে অনেক খরচ সাপেক্ষ হয়ে যায়। আমরা ভেবেছিলাম তাই যে চার্লি পাস কিনব। চার্লি পাস মানে ওই আমাদের মান্থলির ভাই। তবে মিনিমাম সাতদিনের জন্য কিনতে হত। দুজনের জন্য খরচ ৪২ ডলার। হিসেব করে দেখলাম, তিনদিনে মোটেই খরচ করতে পারব না। উসুল হবেনা। বরং অনেক খরচ। তার চেয়ে ভালো ওয়েদার, হাঁটা যাবে সহজেই। খুব অসুবিধে হলে উবার বা লিফট শেয়ার। অ্যামেরিকার রাস্তায় ট্রাফিক রুল খুব ভালো ভাবে ফলো হতে দেখেছি (অবশ্য ন্যু ইয়র্কে পরে একটু অন্যথা দেখেছি বই কি!)। এবং পথচারীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। মানে ধরুন সিগনাল সবুজ, তাও আপনি রাস্তা ক্রস করতে নেমে গিয়েছেন, গাড়ি কিন্তু থেমে আপনাকে জায়গা করে দেবে। একটুও না রেগে। আরো একটা ব্যাপার দেখলাম। কিছু কিছু রাস্তায় সুইচ টিপে দিলে সাময়িকের জন্য লাল সিগনাল হয়ে যায় যাতে পথচারী রাস্তা পেরোতে পারেন। বেশ অবাক করা ব্যাপার কিন্তু!
হাঁটতে হাঁটতে এদিক সেদিক খচাখচ ক্যামেরাতে ছবি তুলতে তুলতে অবশেষে পৌঁছলাম ম্যারিয়টে। আমাদের কনফারেন্সের ভেন্যু। বাবা রে, কী বিশাল। ভাগ্যিস আমাদের প্রোটিন সোসাইটির বোর্ড টাঙ্গানো ছিল জায়গায় জায়গায়। দেখে টেখে রেজিস্ট্রেশন ডেস্কে পৌঁছলাম। নাম রেজিস্টার করে এরপর গেলাম পোস্টার একজিবিশন হলে। সুজাতাই লাগিয়ে দিল আমার পোস্টারটি। একটু ছবি টবি তোলা হল। ব্যস। আজকের মতো কাজ শেষ। আবার টুকটুক করে হেঁটে হেঁটে ফিরলাম ট্রিমন্ট স্ট্রিটে আমাদের বাসস্থানে। এবারে দেখলাম কখন কে জানে আমরা একটা লেফট টার্ন মিস করেছি, কিন্তু তাতে দিব্যি সোজা রাস্তায় পৌঁছে গিয়েছি। অর্থাৎ, গুগল ম্যাপ সব সময় ঠিক বলেনা!
রাত্রে ফিরে ভীষণ টায়ার্ড দুজনেই। যে যার বাড়িতে ফোন করে, মোবাইল চার্জে বসিয়ে দিলাম। ডিনারে ওই দুপুরের লেফট ওভার ফ্রায়েড রাইস আর ডিম ভাজা খেয়ে পরেরদিন সকালের অ্যালার্ম সেট করে শুয়ে পড়লাম লেপের তলায়, অসম্ভব নরম বিছানায়। বস্টনে প্রথম দিন শেষ।

Tuesday, August 7, 2018

আম্রিকা দর্শন পর্ব ৬


আগেই বলেছিলাম যে স্যান ফ্র্যান্সিস্কো না যেতে পারায় আমার অনেক টাকা নষ্ট হয়েছিল। যার ফলে ইন্সটিটিউটের থেকে প্রাপ্য টাকা কমে গিয়েছিল। প্রতিনিয়ত আমায় তাই কস্ট কাটিং করতে হয়েছে। এরই এক নমুনা। আমি নেওয়ার্ক থেকে বস্টন ট্রেনে যাওয়া স্থির করেছিলাম। মধুরিমাদের বাড়ি থেকে ন্যু জার্সি পেন স্টেশনটি ওই মিনিট কুড়ি পঁচিশের মতো দূরে অবস্থিত। ওরা গাড়িতে আমায় স্টেশন পৌঁছে দিল। গোটা অ্যামেরিকা ট্রিপে একটা ব্যাপার লক্ষ্য করলাম। ওখানে সকলে জি পি এস কে ভীষণভাবে ভরসা করে। মানে ধরুন আপনার বাড়ি পূর্ণ সিনেমার সামনে। আপনি যাবেন রাসবিহারী মোড়। সোজা রাস্তা। বছরের পর বছর গাড়ি চালাচ্ছেন। তবুও আপনি রোজ গাড়িতে উঠে জি পি এস অন্ করে ডেসটিনেশন দেবেন এবং যন্ত্রের নির্দেশেই গাড়ি চালাবেন। ঠিক এইরকম ওখানে। আর যন্ত্র তো যন্ত্র রে বাবা। ভুলভ্রান্তিও হয়। হলও তাই। একই রাস্তা দিয়ে কম করে পাঁচবার চক্কর কাটলাম আমরা। পারকিং লটে পৌঁছনর জন্য। এবং শেষমেশ ঠিকঠাক পেলামও না। অরিন গাড়িতে রইল। মধুরিমা আমাকে স্টেশনে নিয়ে গেল। এবং ভালো করে দেখিয়ে দিল যে কোনরকম কিছু সমস্যায় পড়লে হেল্পডেস্ক ঠিক কোথায়। বোর্ডে আমরা দেখে নিলাম আমার ট্রেনের নম্বর মিলিয়ে, কোন প্ল্যাটফর্মে আসবে। আমার ট্রেনটি ছিল নর্থ ইস্ট রিজিওনাল ১৬০। ও প্ল্যাটফর্মে আমায় দাঁড় করিয়ে চলে গেল, নইলে গাড়ির সমস্যা হত।

স্টেশনটা বিশেষ ভিড় নেই। ট্রিপঅ্যাডভাইসর বেশ ভয় টয় পাইয়ে দিয়েছিল। নাকি এত ভিড় হয় যে ট্রেনে ওঠা কঠিন হয়ে পড়ে, সিট পাওয়া যায় না ইত্যাদি। আমি সেই ফাঁকা প্ল্যাটফরম দেখে তাই একবার ভাবলাম, ঠিক জায়গায় আছি তো? দুবার তিনবার টিকিটের সাথে মিলিয়ে নিলাম বোর্ড। আটটা পনেরোয় ট্রেন ছিল। আটটার পর থেকে এক এক করে পাঁচ ছয়জন এলেন। নিশ্চিন্ত হলাম। পাশের লাইন দিয়ে অন্যান্য ট্রেন যাচ্ছে আসছে। আমার ট্রেনটি যথাসময়ে এলো। অ্যামট্র্যাকের ট্রেনে সিট নম্বর নির্দিষ্ট থাকেনা। শুধু রিজার্ভেশন দেয়। তাই যে কোন জায়গা থেকেই ওঠা যায়। উঠে পড়লাম সামনেই যে কামরা পেলাম, তাতে। ভিতরটা আমাদের দেশী দামী চেয়ার কারের মতো। অনেকটা চেন্নাই ব্যাঙ্গালোর শতাব্দীর একজিকিউটিভ ক্লাসের মতো। বড় কাঁচের জানলা। সবুজ গদি দেওয়া সিট। মাথার ওপর লাগেজ রাখার জায়গা। আমি উঠে তো জানলার ধার পেলাম না খুঁজে। অগত্যা ধারের সিটে বসলাম। এক ভদ্রলোকের সাহায্যে (দেখে ভারতীয় মনে হল। স্ত্রী ও মেয়ের সাথে ট্র্যাভেল করছিলেন) ওপরে স্যুটকেসটা রাখলাম। ইতিমধ্যে ট্রেন ছেড়ে দিয়েছে। পরের স্টেশন ন্যু ইয়র্ক। সেইখানে অবশ্য জানলার ধার পেয়ে গেলাম। গুছিয়ে বসলাম। পাশের সিট ফাঁকা। উল্টোদিকে এক ভদ্রলোক ভদ্রমহিলা। ওঁরা ন্যু ইয়র্ক থেকে উঠলেন। সৌজন্যমূলক হাসি বিনিময় হল। আমি দেখলাম আমার অ্যাড্যাপটার কাজ করছে এখানে। দিব্যি ফোন চার্জে বসিয়ে কানে হেডফোন লাগিয়ে নিলাম। ট্রেনের ওয়াই ফাই বেশ ভালো থাকলেও ইয়ুটিউব চলছিল না। তাই নিজের স্টকের গানই ভরসা। বাড়িতে মাঝে মাঝে মেসেজ বা ওয়াটসঅ্যাপ কল করে কথাবার্তা চলছে। সাথে সাথে মধুরিমা আর সুজাতাকেও লাইভ আপডেট দিচ্ছি।

ন্যু ইয়র্ক ছাড়াল যখন ট্রেন, তখন ন্যু ইয়র্কের বিখ্যাত স্কাইলাইন চোখে পড়ল। এই প্রথম পশ্চিমের বিরাট বিরাট বাড়ি দেখলাম। আগেই একবার বলেছিলাম, আমার সাইজ নিয়ে সমস্যা আছে। পাশে আমাদের দেশী বিল্ডিং থাকলে হয়তো বেশি ভালো বুঝতাম এইগুলির মাহাত্ম্য। নইলে দেখে মনে হল, হ্যাঁ বড় বেশ। তবে ওই আর কী। এই ট্রেনের যাত্রাপথও আমার ইয়ুটিউবে দেখে নেওয়া। তবুও চাক্ষুস দেখা আর স্ক্রিনে দেখার মধ্যে বিস্তর ফারাক। ট্রেন ছুটছিল ভালোই স্পিডে। একের পর এক ছোট ছোট গ্রাম ও টাউনের ওপর দিয়ে। সবুজালির অভাব নেই। মাঝে মাঝে আবার পুকুরের মতো জলাশয়। লেক। ব্রিজের ওপর দিয়ে ট্রেন ছুটছে। কোথায় যেন তখন ভারতীয় রেলের লঙ ডিস্টেন্স জার্নিগুলোর সাথে বড্ড মিল পাচ্ছিলাম। একটা স্টেশন পার হলাম। নিউ ইংল্যান্ড। পাশেই সুবৃহৎ অ্যাটল্যান্টিক ওশেন। অপূর্ব। ট্রেনের উল্টোদিকের জানলায় ছিলাম বলে ছবি তুলতে পারিনি ঠিকই, কিন্তু অমন পিকচারেস্ক স্টেশন আর দুটো দেখিনি। পরপর প্রচুর স্টিমার যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে ইয়াচ। আর রয়েছে লাক্সারি ক্রুস। যে যার সামর্থ্য ও প্রয়োজন মতো ব্যবহার করবেন এই জলপথ। আর সমুদ্রের ধার দিয়ে যে রাস্তা, ভর্তি শুধুই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের লাল নীল সাদা স্ট্রাইপস ও স্টারসের পতাকা। সেটা সদ্য ৪ঠা জুলাই, অর্থাৎ ওদের স্বাধীনতা দিবসের জন্য না এমনিই থাকে সব সময়, জানা নেই। পড়ে পিসির কাছে শুনেছিলাম যে এমনিই ওখানে লোকজন একটু বেশি দেশভক্ত। তাই ফ্ল্যাগ হামেশাই ঝোলান বাড়িতে গাড়িতে অফিসে স্কুলে। ইতিমধ্যে বিভিন্ন স্টেশনে ট্রেনে লোকজন নিয়মিত উঠছেন নামছেন।

পরপর কী কী স্টেশন থাকবে, দেখে রেখেছিলাম। প্রভিডেন্স ও তারপরে রুট ১২৮। তারপরেই বস্টন ব্যাক বে স্টেশন। আমার গন্তব্য। টিকিট ইন্সপেক্টার মাঝে এসে টিকিট দেখে গিয়েছিলেন। প্রভিডেন্স আসার আগে এসে বলে গেলেন। সুজাতাকে জানিয়ে রাখলাম। ওর আসার কথা আময় রিসিভ করতে, স্টেশনে। যখন আমি রুট১২৮, ও ব্যাক বে পৌঁছে গিয়েছে। যাক, আমি নিশ্চিন্ত। অবশেষে দুপুর দেড়টার দিকে বস্টন ব্যাক বে স্টেশনে ট্রেন ঢুকল। এর পরেরটা শেষ স্টেশন, তাই ট্রেন প্রায় ফাঁকা। প্ল্যাটফরমটি দেখলাম বেশ অন্ধকার। আন্ডারগ্রাউন্ড বলেই মনে হল কারণ বেশ অন্ধকার। হলুদ আলো জ্বলছে। প্রায় আমাদের মেট্রো স্টেশনগুলির মতো। ট্রেনটা বেরিয়ে যেতে নিয়মমাফিক ফোন ও মেসেজ করে কিছু যাত্রীদের পিছন পিছন এগোলাম। প্ল্যাটফর্মের দেওয়ালে বস্টনের ম্যাপ আঁকা। আরো রয়েছে মেট্রো আর বাসের রুটের নক্সা। বস্টনের এই মেট্রো সিস্টেমকে টি বলে। বেশ ভালো করে গোটা শহরটাকে জুড়ে রেখেছে।

প্ল্যাটফরম থেকে তারপর এস্কালেটর চেপে ওপরে উঠতেই দেখি সুজাতা দাঁড়িয়ে রয়েছে। চার বছর পর আরেক প্রিয় বান্ধবীর সাথে অবশেষে দেখা। দুজনেরই মুহূর্তের মধ্যে সমস্ত ক্লান্তি উধাও। গলা জড়াজড়ি করলাম। এইবারে যেন মনে হল, যাক। পৌঁছেছি ঠিক। ওর সাথে দেখা হয়ে গিয়েছে। আমার বাবা মা, মধুরিমা সকলেই এইবারে একদম নিশ্চিন্ত। আর কোথাও একা ট্র্যাভেল করার নেই, তাই নাকি চিন্তাও নেই তাদের কারুর। সব দায়িত্ব এবার সুজাতার।

স্টেশন থেকে বেরিয়ে আমরা অ্যাপ ক্যাব ডাকলাম। ওখানে চলে লিফট আর উবার। লিফট আমি ইনস্টল করেই রেখেছিলাম। শেয়ার ক্যাব এসে পৌঁছনর আগে সেলফি তোলা হল। রাস্তাঘাটের ছবিও। কী ঝকঝকে নীল আকাশ। রোদ ঝলমল। বেশ সুন্দর।

গাড়ি এলো। বিরাট এস ইউ ভি। অ্যামেরিকায় বোধহয় ছোট গাড়ি কেউই ব্যবহার করেননা! উঠে পড়লাম লাগেজ নিয়ে। ডেসটিনেশন, আমাদের এয়ারবিএনবি। ট্রিমন্ট স্ট্রিটে। মিনিট পনেরোর মধ্যেই চোখে পড়ল একটা বড় চার্চ। সুজাতা রাস্তা চিনতে পেরেছে ততক্ষণে। বলল যে আমরা কাছাকাছি এসে গিয়েছি কারণ ও চার্চের ঘণ্টার শব্দ শুনতে পাচ্ছিল সকাল থেকে। রবিবার। আর একটু এগোতেই আমাদের গন্তব্য এসে গেল। নামলাম। ঠিক যেমন পড়ে এসেছিলাম, বাড়িটার নিচে একটা সাবওয়ের দোকান। পুরনো দিনের বাড়ি। কাঠের ভারি দরজা ঠেলে ঢুকলাম। ভিতরটা খুব অল্প আলো। একদম 'যত কাণ্ড কাঠমান্ডুতে'র বাড়ি গলিগুলোর কথা মনে পড়ে যাচ্ছিল। একটা স্যাঁতস্যাঁতে গন্ধ। সিঁড়ি ভেঙ্গে উঠলাম দোতলায়।

জয়ী


"জানিস, মুক্তাদি আর নেই। আজ সকালেই খবরটা পেলাম।" পল্লবীর পাঠানো এই ওয়াটসঅ্যাপ মেসেজে ওদের স্কুল গ্রুপের সকলের মধ্যেই একটা বেশ সারা পড়ে গেল। ওরা অর্থাৎ বছর তিরিশের জনা পঁচিশ, একদা সুধাময়ী বালিকা বিদ্যালয়ের ছাত্রী। প্রত্যেকেই এখন সুপ্রতিষ্ঠিত। কেউ করছে বড় চাকরি, কেউ বা চালাচ্ছে নিজের বুটিক। কেউ বা স্কুল কলেজের টিচার তো কেউ সরকারি আমলা। গ্রুপের মধ্যে সর্বক্ষণই চলতে থাকে আলাপ আলোচনা। বিষয় বিবিধ। ঝাঁ চকচকে শপিং মলে মার্কেটিং, বিদেশ ভ্রমণ, ছেলে মেয়েদের নামী দামী স্কুল ও ট্যুশন টিচার, নতুন খোলা রেস্টুরেন্ট, শাশুড়ির চিকিৎসা, নন্দাইয়ের এক্সট্রা ম্যারিটাল, অফিস পলিটিক্স, ইত্যাদি ইত্যাদি। ওদের এই গ্রুপের মধ্যে এক্কেবারে বেমানান প্রেয়সী। প্রেয়সী মফস্বলের একটি আধা সরকারি স্কুলের অঙ্কের দিদিমণি। স্কুলের কাছেই ঘর ভাড়া নিয়ে থাকে একা। স্বামী সংসারের ঝুটঝামেলায় জড়ায়নি।  সকাল থেকে স্কুলের বাচ্চাগুলোর পিছনে দৌড়য় চক পেন্সিল হাতে। কঠিন অঙ্ককে ভালবাসতে শেখানোই যেন ওর জীবনের মূল উদ্দেশ্য। একদিন এ বি টি এর মিটিঙে দেখা কাকলির সাথে। কাকলি ওরই ক্লাসমেট ছিল সুধাময়ীতে। বর্তমানে কলকাতার এক স্কুলের হেড মিস্ট্রেস। আর কী, ফোন নম্বর চেয়ে ওকে যোগ করে দিয়েছিল গ্রুপে।
প্রেয়সী গ্রুপে নামেই আছে। সব খবর পড়ে। কিন্তু কোনদিনও কোন কথার উত্তর দেয়না। শুরুর দিকে বাকিরা ওকে সাধলে ওই হ্যাঁ না দিয়ে কাটিয়ে দিত। কোনদিনও কোন গেটটুগেদারেও যায়নি বাকিদের সাথে। গ্রুপে আসা সেই মিটের ছবিতে মন্তব্যও করেনি। মুক্তাদি ওর খুব প্রিয় দিদিমণিদের একজন ছিলেন। ওঁর চলে যাওয়ার খবরটা পেয়ে নিজেকে আর সামলে রাখতে পারল না। পল্লবীকে জিজ্ঞেস করলো, "আচ্ছা সুমি, মানে দিদির মেয়েটার কী খবর? ওর এবার কী হবে? কে দেখছে ওকে?"
সুমির বয়স ওই কুড়ির কাছাকাছি। ওরা যখন ক্লাস সিক্স, সুমি জন্মায়। কিছু বছরের মধ্যেই ডাউন সিন্ড্রোম ধরা পড়ে ওর। দায়িত্ব নিতে না চেয়ে মুক্তাদির স্বামী ওর শ্বশুরবাড়ির লোকজন সমস্ত সম্পর্ক ত্যাগ করে। বাড়ির অমতে বিয়েটা ছিল বলে বাপের বাড়ির দিক থেকেও কোনরকম সম্পর্ক বা সাহায্য ছিলনা। স্কুলের চাকরি ও কিছু ট্যুশানি সম্বল করেই দিদির দিন কাটত। প্রেয়সীদের ব্যাচের অনেকেই দিদির কাছে ট্যুশন পড়তে যেত। আর তখনই সুমির সাথে ওদের আলাপ। ওইটুকু মেয়ে, কী প্রাণশক্তিতে ভর্তি। মুক্তাদি মাঝে মাঝেই পড়াতে পড়াতে আক্ষেপ করতেন। ওঁর অবর্তমানে সুমিকে কে দেখবে, কী হবে ওর। প্রেয়সীরা তখন ছোট। কীই বা বলবে। কলেজে পড়াকালীন বার দুই তিনেক ও মুক্তাদির সাথে দেখা করেছে। তারপর এই চাকরিটা পেয়ে চলে আসায় যাতায়াত বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। প্রথম কয়েক বছর ফোনে যোগাযোগ থাকলেও শেষে আর কোনরকম খবরই নেওয়া হয়নি।
বড্ড অপরাধ বোধ কাজ করছে ওর আজ। বারবার দিদির মুখটা আর সুমির ওই নির্মল হাসিখানি মনে পড়ছে। ক্লাস নিতে নিতে মাঝে মাঝেই চোখ চলে যাচ্ছিল ফোনে। পল্লবী কোন মেসেজ করলো? না। কেউই কিছুই লেখেনি। রাত্রের দিকে কাকলি আর অদিতির মেসেজ এলো। সাধারণ হু হ্যাঁ। আক্ষেপ। কিছু পুরনো স্মৃতি। ব্যস। শম্পা একবার জিজ্ঞেস করলো ওরা কেউ যাবে কি না দিদির বাড়ি। কারুরই আর সময় বের হল না ব্যস্ত জীবনে। ওয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ কদিন একটু শান্ত থেকে ফিরল আবার চেনা ছন্দে। সামনে পুজো। কোন দোকানে কত ছাড়, কোথায় কী ডিজাইন। প্লেনের টিকিট। হোটেল বুকিং। রাঁধুনির বোনাস। বৃষ্টি জল কাদা। ফ্রেন্ডশিপ ডেতে গ্রুপ ভর্তি শুধুই জিফ আর ফরওয়ার্ড। বন্ধুত্ব নিয়ে কয়েক কলি। পুরনো স্কুলের দিনগুলোর গল্প।
কাকলি আর পল্লবী কাছাকাছি থাকে। ওরা এক রবিবার সন্ধ্যেয় প্ল্যান করে দেখা করলো সাউথ সিটি মলে। উদ্দেশ্য সিনেমা দেখে ডিনার সারবে। ফুড কোর্টে বসে খাবারের অপেক্ষার মধ্যে চলছে পি এন পি সি। "প্রেয়সীটা সেই একই রয়ে গেল দেখ। উড়নচণ্ডীর মতো থাকে। কোন শ্রী নেই চেহারায়।"
"থাকবেই বা কী করে। দেখছিস না কেমন ধ্যারধেরে গোবিন্দপুরে পড়ে আছে।"
"সত্যি। কোন অ্যাম্বিশন নেই। কোথায় ম্যুচুয়াল নিয়ে শহরে ফিরবি, তা না।"
"হ্যাঁ। আমি তো সেদিন মিটিঙে বললাম। ইউনিয়নকে ধর, ঠিক পেয়ে যাবি। ও মা, আমার কথাতে পাত্তাই দিলো না কোন।"
"ও বরাবরই ওরকম। নিজেকে সব সময় আমাদের থেকে আলাদা প্রমাণ করার ইচ্ছে। দেখলি না। মানস যখন ওকে বিয়ের প্রস্তাব দিল, শুধুমাত্র চাকরির দোহাই দিয়ে নাকচ করে দিল। আরে বাবা মানসের মত অমন ব্রাইট ছেলে।  লন্ডন যাচ্ছে হায়ার স্টাডিজে। তুই কোথায় সঙ্গে যাবি, তা না। নিজের এই আধা সরকারি চাকরি আঁকড়ে পড়ে থাকলি। কী মোক্ষ লাভ হল? এত বছরের সম্পর্কের কোন মূল্য নেই?"
"যা বলেছিস। এই দাঁড়া দেখি, এবার কে মেসেজ করলো। ও মা, পল্লবী দেখ দেখ। শিগগির দেখ। প্রেয়সী মেসেজ পাঠিয়েছে। দেখি কী ছবি। ডাউনলোড করি।"
কাকলির ফোনের নেট স্লো হলেও পল্লবীর ইতিমধ্যে অটো ডাউনলোড হয়ে গিয়েছে। বড় স্ক্রিন খুলে কাকলিকে দেখাল ও ছবি। হাসি হাসি মুখে দাঁড়িয়ে প্রেয়সী। পাশে বছর কুড়ি পঁচিশের একটি মেয়ে। নীচে লেখা "এই দেখ। আজ মুক্তাদির বাড়ি গিয়েছিলাম। সুমিকে ওর প্রতিবেশীরা কোনমতে দেখছিল এই কদিন, কিন্তু  লঙ টার্মে দায়িত্ব নিতে অক্ষম। আমি তাই ওকে নিয়ে এলাম আমার কাছে। এবার থেকে ওর সব দায়িত্ব আমার। তোরা সকলে মিলে কখনো পারলে আসিস। ও জানিস তো আমাদের সকলকে মনে রেখেছে। আমার কাছে তোদের সবার খবর নিচ্ছিল। আজ আমার খুব মনটা হাল্কা লাগছে রে। তাই তোদের মেসেজটা পাঠালাম।"

প্রেয়সীকে যেন আজ ওদের সকলের চেয়ে বেশি সুন্দর লাগছে। মুখে একটা পরম পরিতৃপ্তির হাসি। আর সুমি? ওর খুশি যেন ধরেনা। গ্রুপের চরিত্র অনুযায়ীই গ্রুপ ভরে গেল পরপর সকলের মেসেজে, সব্বাই প্রেয়সীকে সাধুবাদ জানাচ্ছে এমন একটা দুর্দান্ত পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য। কাকলিই বা বাদ যায় কী করে। পটাপট টাইপ করলো, "তুইই সেরা প্রেয়সী।" ইতিমধ্যে পল্লবীরও মেসেজ ঢুকেছে। "তুই আমাদের গর্ব।"
ব্যস। কাজ শেষ। আবার চিকেনের পিসে মনোনিবেশ করাই যায়। আলোচ্য টপিকের অভাব তো নেই।



Monday, August 6, 2018

আম্রিকা দর্শন পর্ব ৫

গাড়িতে উঠেই প্রথম কাজ। বাড়িতে জানানো। মধুরিমা ওর ফোনটা দিলও। ওয়াটসঅ্যাপ কল করতে গিয়ে দেখি মায়ের প্যানিক করে পাঠানো এত্ত এত্ত মেসেজ। মাকে ফোন করতে সে প্রায় কেঁদেই ফেলল। এতক্ষণ কেন কোন খবর দিইনি, ইত্যাদি। আমি যে আস্ত এক পিসেই রয়েছই এবং সেফ হ্যান্ডসে রয়েছই, সেইসব নিয়ে আশ্বস্ত করতে এমারজেন্সি অবস্থা কাটল। এইবারে মধুরিমার আনা মাফিনে আপাতত না বলে চারিদিকে চোখ বোলাতে লাগলাম। প্রথম পার্থক্যই যেটা চোখে পড়ল, গাড়ি চলছে ভারতের তুলনায় রাস্তার উল্টোদিক দিয়ে, আর তাই ড্রাইভারের সিটটিও উল্টোদিকে। এক্কেবারে ফাঁকা রাস্তা। একটা দুটো গাড়ি মাঝে মাঝে পাশ দিয়ে হুহু করে বেরিয়ে যাচ্ছে। শুনলাম শনিবারের সকাল, তাই এই। উইকডেজে নাকি জ্যাম পর্যন্ত হয়ে যায়। অবশ্য ন্যু ইয়র্ক ন্যু জার্সির জ্যামের গল্প আমি আগে থেকেই শুনে এসেছি বেশ কয়েকজনের কাছ থেকেই।
ন্যু জার্সি স্টেটকে বলে গার্ডেন স্টেট। এবং সত্যি সত্যিই সেই নামকে সার্থক করে চারিদিকে সবুজালি। রাস্তার দুধারে বিশাল বিশাল সবুজ গাছের সারি। কোথাও কোথাও কিছু নেবারহুডের নাম দিয়ে ডিরেকশন দেওয়া। হিলসবরো, ব্লুমফিল্ড, ইত্যাদি। মধুরিমাদের বাড়ি অ্যানানডেলে, পাম্পকিন ফার্ম কোর্টে (না, কোন কুমড়োর ক্ষেত টেত চোখে পড়েনি)। এয়ারপোর্ট থেকে প্রায় পঁয়তাল্লিশ মিনিটের জার্নি। যথাসময়ে পৌঁছে গেলাম। ওদের বাড়িটা একটা হাউজিং কমপ্লেক্সের মত জায়গায়। তবে কোন বাউন্ডারি ওয়াল নেই। পরপর প্ল্যান মাফিক দোতলা বাড়ি। খয়েরি রঙের। রাস্তাঘাট উঁচু নিচু, ঢাল। আবারও সেই শুনশান। মেজানাইন ফ্লোরে ড্রইং রুম। দোতলায় বেডরুম। মধুরিমা আর অরিন আমার লাগেজ টেনে ওপরে নিয়ে গেল। হাত মুখ ধুয়ে গরম কফি আর মাফিন খেলাম। ততক্ষণে বেশ শীতে ধরে গিয়েছে। বলছে সামার, এদিকে বাইরে ১৬ ১৭ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড। আমি বাপু চেন্নাইবাসী, আমাদের বোধহয় উইন্টারেও তাপমাত্রা কুড়ির নিচে নামেনা। কাজেই ঠকঠক করে যে কাঁপব, এতে আর নতুন কী আছে। একটু শরীর গরম করে ঠিক করলাম স্নান করে নিতে হবে। এবং সেখানে গিয়েই প্রথম ধাক্কা।
এ যে ওয়াটারলেস সিস্টেম। নেই কোন জেট স্প্রে। নেই কোন মগ বালতি। কি সর্বনেশে ব্যাপার। বাথটাবে ছাড়া স্নান করা যাবেনা। প্রচুর চাপ টাপ খেয়ে গেলেও কোনমোটে ম্যানেজ করলাম। প্লেনে ভালোই ঘুমিয়ে নিয়েছিলাম বলে তখনো ঘুম তুম পায়নি। মধুরিমা বারবার জিজ্ঞেস করলও সেই কথা। স্নান সেরে আমরা বসলাম আড্ডা মারতে। যদিও নিয়মিত মেসেজ মেলে কথা হয়, তবুও ফেস টু ফেসের আলাদা মাধুর্য। টপিকেরও অভাব নেই। সময়ও অফুরন্ত। মাঝে অরিন লাইব্রেরি গেল, আমাদের জিজ্ঞেস করলো যাবো কি না। ততক্ষণে আড্ডা জমে গিয়েছে। ওইসব ছেড়ে আবার কে বেরোয়। ও ফিরতে আমরা লাঞ্চ সারলাম। চিকেন বিরিয়ানি, মিট বল, রায়তা ও ফ্রুট জ্যুস। একটা ব্যাকগ্রাউন্ড ইনফরমেশন নিয়ে গিয়েছিলাম যেটা, সেটা হল যে ওখানে কলের জলই পানীয় জল হিসেবে ব্যবহৃত হয়। তবে মধুরিমাদের বাড়ির কাছাকাছি কোন পাওয়ার প্লান্ট থাকায় ওরা ওখানে সবাই প্যাকেজড জল খায়। তাই অ্যামেরিকান কালচারের এই দিকটির সাথে তখনো পরিচয় হলনা।
খাওয়ার পর অল্প অল্প ঘুম আসছিল, কিন্তু আমি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলাম যে না, ঠিক রাত হলে তবেই শোবো। নইলে সেই জেটল্যাগ হ্যানল্যাগ ত্যানল্যাগ হবে। আর ওইসব হলেই শেষ সব। ঘোরাঘুরি মাটি। তাই দাঁতে দাঁত চিপে জেগে রইলাম। মধুরিমার সাথে বাড়ির বাইরে আশেপাশেটা ঘুরে দেখব বলে বায়না করলাম। ওর একটা জ্যাকেট গায়ে চাপিয়ে আমরা এরপর রাস্তায় বেরোলাম। ওর বাড়িটা এমন সুন্দর জায়গায়, পিছনেই উঁচু হয়ে উঠে গিয়েছে সবুজ ঘন জঙ্গল। উঁচু নিচু রাস্তা। মনে হচ্ছিল বুঝি কোন হিল স্টেশনে গিয়েছি। আমাদের কোদাইকানাল বা মুন্নার (প্লিজ ক্ষমা করবেন, পাঁচ বছর সাউথে থেকে এই দুটোই প্রথমে মাথায় এলো। দার্জিলিং না লিখে।)   রোদ চরচরে। বেশ একটা শীতের দুপুর। মাঠে শতরিঞ্চি পেতে মিঠেকড়া রোদে পিঠ এলিয়ে কমলালেবু নিয়ে বসে পিকনিক করার মত আয়োজন। খানিক হাঁটাহাঁটি করলাম। বিটলসের মতো পোজ দিয়ে একটা জেব্রা ক্রসিঙে ছবিও তুললাম। ক্যামেরা নিয়ে বেরিয়েছি। খচাখচ আরো কিছু ছবি তুললাম। মধুরিমা তাড়া দিচ্ছিল ঘরে ঢোকার, কারণ ওর দুই পাশের দুই বাড়ির পোষা কুকুরগুলোর তখন হাঁটতে বেরোনোর সময়। আর মধুরিমা এমনই মেয়ে যে ক্লাস সিক্সে পাশের বাড়িতে কুকুর ডাকছিল বলে লাফ মেরে প্রায় ক্লাসরুম থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল টিফিন টাইমে। আমি বললাম আহা একটু থাকি, মার্কিনী কুকুরদের দেখি। আদর করি। ও মা। তা নাকি হবে না। লোকজনের ওখানে বড়ই প্রাইভেসি নিয়ে সমস্যা। ভারতবর্ষে যেমন রাস্তায় ঘাটে আমরা যার তার বাচ্চা, কুকুর ইত্যাদি ইত্যাদিকে আদর টাদর করে দিই, ওখানে এইসব করতে গেলেই পুলিশ টুলিশ ডেকে দেবে। বাপ রে। দরকার নেই। ওই দুর থেকেই দেখে কুকুর ও তার মালিকদের দিকে ছোট্ট হাসি ছুঁড়ে দিলাম।  হাঁটাচলা করে ঘরে এসে দেখি তখনও চারটে বাজেনি। অবশ্য বাইরের রোদ দেখে বোঝার উপায় নেই। এই সময়ে নর্থ ইস্ট অ্যামেরিকাতে রাত্তির সাড়ে আটটার আগে প্রায় সূর্যাস্ত হয়ই না। অথচ সকাল সকাল দিব্যি টাইমে সূর্যোদয় হয়ে যায়। এই প্রসঙ্গে বস্টোনে পৌঁছে আরো বলবো।
চলল আমাদের গল্প। পি এন পি সি। এরপরে কবে কোথায় যাচ্ছি, কীভাবে কী করব তার প্ল্যানিং, পরের দিন কখন বেরবো সেইসবের ডিটেল্ড আলোচনা। মধুরিমা আর অরিন প্রচুর ঘুরে বেরায়। ওদের দেওয়ালে একটা ওয়ার্ল্ড ম্যাপ লাগানো। কোথায় কোথায় ঘুরেছে এর মধ্যে, পিন লাগানো তাতে। অবাক হয়ে দেখলাম। কত দেশ। কত শহর। ওদের তাই অনেক অভিজ্ঞতা। অতি বিচক্ষণ। ওদের সাথে বসে পুরো প্ল্যান ঝালিয়ে নিলাম। পরেরদিন আমার ট্রেন। একা প্রায় ছয় ঘণ্টার জার্নি। আবার ওদের এবং আমারও টেনশনের ব্যাপার। সেই জন্যই এই  প্ল্যানিং খুব দরকার ছিল।
আমার ততক্ষণে ঘুমে চোখ বন্ধ হয়ে আসছে। মধুরিমা বারবার বলছিল, খেয়ে নে। ঘুমিয়ে পড়। কিন্তু আমি ওই অনড়। বাইরে আলো ঝলমল করছে। এতে কী খেয়ে শুয়ে পড়ব? তবে কুড়ি ঘণ্টা প্লেন জার্নি করে সারাদিন না ঘুমিয়ে অবস্থা প্রায় শোচনীয়। বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে ভেবে অল্প দই চিড়ে খেয়ে নিলাম (খিদে খুব একটা ছিল না)। আমার হজমের সমস্যা হয় ইদানীং, সেই শুনে মধুরিমা এইসবেরও ব্যবস্থা রেখেছিল! খাওয়া সেরে মাথায় এলো ফোন চার্জ করতে হবে। সাথে নিয়ে এসেছিলাম ট্র্যাভেল অ্যাড্যাপটার। ইউ এসে ১১০ ভোল্ট চলে, ভারতে ২২০। তাই ওখানে প্লাগ পয়েন্টে আমাদের চারজার লাগবেনা। অ্যাড্যাপটার সহ চার্জে বসাতে গিয়ে আরেক বিপত্তি। ওইটি এত ভারি, কিছুতেই দেওয়ালে লাগছেনা। খালি খুলে যায়। সাময়িক ব্যবস্থা হল অরিনের অফিসে, মাল্টি প্লাগ এক্সটেনশন বোর্ড দিয়ে। কিন্তু বাকি ট্রিপ? সুজাতাকে মেসেজ করলাম। ওর ওইদিন রাত্রের ফ্লাইট সিয়াটল থেকে। ওর কাছে যদি থাকে, যেন নিয়ে আসে। ও বললও ওর কাছে তো নেই, কিন্তু কিনে নেবে কারণ ওরও দেশে এসে লাগবে। বেশ। সমস্যার আশা করি সমাধান যতক্ষণে হল আর মধুরিমাও ডিনার সেরে ঘরে এলো, বাইরে অন্ধকার। নটা বেজে গিয়েছে। আর আমার ঘুমোতে যাওয়া নিয়ে অসুবিধে নেই। পরেরদিন সাড়ে পাঁচটার অ্যালার্ম লাগিয়ে শুলাম। দুই বন্ধু মিলে গল্প করতে করতে যে কখন ঘুমিয়ে পড়েছি, কে জানে। 

Sunday, August 5, 2018

আম্রিকা দর্শন পর্ব ৪

প্লেনে উঠে আমার প্রথম কাজ বলতে যেটা ছিল, সেটা হল আগেই দেখা যে সামনের সিটের পিছনে অর্থাৎ আমার চোখের সামনে লাগানো টিভিটা কাজ করে কি না। দেখলাম টাচ কাজ করছেনা। সহযাত্রী যিনি ছিলেন, উনি সাহায্য করলেন রিমোট দিয়ে সেটার সুরাহা করতে। মোবাইলের চারজিং পয়েন্টও আমারটায় কাজ করছিল না। ওনারটাই ব্যবহার করার পারমিশন দিলেন এবং আমি খুশি খুশি গোটা ট্রিপে ওটাই ব্যবহার করলাম। মোটামুটি সবকিছু নিয়ে সেটল করে এরপর আশপাশটা তাকিয়ে দেখলাম। এই প্রসঙ্গে একটা কথা বলে রাখি, গোটা অ্যামেরিকা ভ্রমণেই যেটা পদে পদে বুঝেছি, আমার একটু ডাইমেনশন নিয়ে সমস্যা আছে। অর্থাৎ, ইন্টারন্যাশনাল প্লেন তো অবশ্যই ডোমেস্টিকের চেয়ে ঢের বড়। অথচ আমি বাইরে দাঁড়িয়ে সেটা বুঝিনি। হয়তো পাশাপাশি দুটোকে রাখলে বুঝতাম। তবে হ্যাঁ, প্লেনের ভিতরটা দেখে বুঝলাম, নাহ, এ সত্যিই বড়। ভিতরে ৩টে করে সীট, এমন তিনটে ব্লক। আমি ছিলাম মাঝখানে। আবার প্রতি পনেরোটা মতো সিটের পরে পরে আবার একটা করে প্যান্ট্রি গোছের জায়গা মাঝখানে আর দুইদিকে দুটো ওয়াশরুম। প্লেনের ভিতরটা গোটা যাত্রাপথেই অন্ধকার অন্ধকার ছিল। সবার জানলার ঝাপি নামানো। হাল্কা হলুদ নীল আলোয় বেশ একটা সুন্দর পরিস্থিতি। কম্বলটা প্যাকেট থেকে বের করে গায়ে জড়িয়ে ঘুমোতে যাব কি ভাবছি (প্লেনের ভিতরে বেশ ঠাণ্ডা ছিল) তখন খাবারের ট্রে নিয়ে এলো। ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা বড়া পাও (বম্বে থেকে খাবার উঠেছে, থাকবেই), ব্রেড আর কাটা ফল। সাথে চা কফি। সেসব ওই রাত তিনটেতে কে খায়। অল্প খুঁটে খুঁটে ফল খেয়ে ট্রে ফেরত দিয়ে কম্বল মুরি দিয়ে শুলাম। কানে হেডফোন (এয়ারলাইন্সেরটাই), কিছু পুরনো হিন্দি গান চালিয়ে, স্ক্রিন অফ করে। কব্জির ঘড়িতে তখনও ভারতীয় সময়ই চলছে। ঘুম আসেনা কিছুতেই। তন্দ্রা ভাব শুধু। তাও ওই মিনিট দশ পনেরোর ঘুম, তারপরে ঘুম ভেঙ্গে যাচ্ছে, এই করতে করতে ঠিক করলাম একবার গোটা প্লেনটা চক্কর কাটি। কাটলামও। দেখলাম অন্ধকারে অনেকেই ঘুমোচ্ছেন। আবার কেউ কেউ বিশেষত বয়স্করা রীতিমতো মর্নিং (নাকি ইভনিং) ওয়াক করছেন।

এই হাঁটাহাঁটির ফলে যেটা লাভের লাভ হল, আমি এসে টানা তিন ঘন্টা জমিয়ে ঘুম দিলাম। আমার সহযাত্রী যিনি ব্যাঙ্গালোর থেকে এসেছিলেন, বেশ ভালো মানুষ। একবারও আমার ঘুম ভাঙ্গিয়ে বের হননি। তাই একদম একটানা ঘুম ঘুমিয়ে যখন ব্রেকফাস্ট করব বলে উঠলাম, রীতিমতো ঝরঝরে লাগছিল। চোখে মুঝে জল দিয়ে সিটে ফিরলাম। ইতিমধ্যে ব্রেকফাস্ট এসে গিয়েছে। বেশ ভারী একটা অমলেট, ব্রেড, বাটার, চা কফি, ফ্রেঞ্চ ফ্রাই আর আবার কাটা ফল। এতক্ষণে খিদে খিদে পেয়েওছে। খেলাম ওপর ওপর।

তারপর, কী করা যায়, কী করা যায়? সিনেমা দেখব ঠিক করলাম। তেমনভাবে কিছুই পছন্দ হল না। অনেক ঘাঁটাঘাঁটি করে শেষমেশ ময়ূরাক্ষী দেখা শুরু করলাম। ঘন্টা দেড় দুই ওতেই কেটে গেল। এরপর? একটু আসতে আসতে কী করি আজ ভেবে না পাই ভাব আসছিল। তখন ঠিক করলাম যে না, বন্ধুটি যে হোমটাস্ক দিয়েছে (যাওয়ার দিন একটি গল্প পোস্ট করে গিয়েছিলাম মনে আছে? বাদল দিনের প্রথম কদম্ফুল... ওইটার একটা দ্বিতীয় পর্ব চাই। লেখার ইনপুট এয়ারপোর্টে বসেই পেয়েওছিলাম।) সেটি করা যেতে পারে। খুব বেশি আলো ছিল না। তাও তারই মধ্যে ব্যাগ থেকে রাইটিং প্যাড বের করে টুকুস টুকুস করে লিখতে লাগলাম। ইতিমধ্যে আবার ড্রিঙ্কস নিয়ে চলে এসেছে হোস্টেস। আমার ঠিক করাই ছিল, রেড ওয়াইন খাবো। নিলামও তাই। সাথে সল্টেড পিনাটস। বেশ একটা আয়েসের ব্যাপার। যাই হোক এইসব লেখালিখি ও পানীয় নিয়ে সময় কেটে গেল। ইতিমধ্যে বারোটা বাজতে যায়, দেখতে দেখতে এসে গেলো লাঞ্চ। সুন্দর হট মিল। জিরা রাইস, শ্রেডেড চিকেন, মিক্সড ভেজ, আবারও ব্রেড, চা কফি ইত্যাদি। মোটামুটি খেলাম। নড়াচড়া নেই। খিদেও তেমন নেই। খেতে খেতে আরেকটা সিনেমা দেখতে বসলাম। ততক্ষণে আবার এয়ারহোস্টেস এসে আমাদের সকলকে ধরালেন একটি করে কাস্টমস ফর্ম। এই ফরমটির বিষয়েও মধুরিমা সব শিখিয়ে দিয়েছিল। সিল্ড প্যাকেটে খাবার থাকলে ডিক্লেয়ার করার প্রয়োজন নেই, তেমনি দশ হাজার ডলারের নীচে ক্যাশ ক্যারি করলেও বলার দরকার নেই। বাকি সব দেখে শুনে ভরলাম। সহযাত্রীকে পেন ধার দিলাম। ঘড়ির কাটায় যখন বিকেল চারটে পেরিয়েছে, পাইলট বললেন যে এইবারে আমরা নামা শুরু করব। বাইরের তাপমাত্রা ও লোকাল সময় জানিয়ে দিলেন। ন্যু জার্সি ভারতীয় সময়ের থেকে সাড়ে নয় ঘন্টা পিছিয়ে। সেই মতো ঘড়ি অ্যাডজাস্ট করে ফেললাম। যখন প্লেন মাটি ছোঁব ছোঁব করছে, ফোনের ফ্লাইট মোড অফ করে দিয়েছি। পিকপিক করে এস এম এসের শব্দ পেলাম। যাক, বিরাট নিশ্চিন্তি। আমার ইন্টারন্যাশনাল রোমিং তাহলে কাজ করছে। জিও ফোনের রোমিং প্যাকটা সবচেয়ে কস্ট এফেক্টিভ লেগেছিল। যত জায়গায় ঘুরেছি, ভীষণ ভালো কাভারেজ পেয়েছি। এ টি & টি কোম্পানির টাওয়ার। ঝটপট ওয়াটসঅ্যাপে বাড়িতে জানালাম। মধুরিমাকেও।

প্লেন যথাসময়ে নামল। আমিও লটবহর নিয়ে নামলাম। একটা অদ্ভুত অনুভূতি হল। এই এতক্ষণে তাহলে মার্কিন মুলুকে এলাম। দেশের ভিতরে যাওয়ার পারমিশন পাওয়া এখনো বাকি। কিন্তু অন্তত পৌঁছে তো গিয়েছি। বাইরে সকালের হাল্কা রোদ। অল্প অল্প ঠান্ডা। গলায় স্কার্ফটা ভালো করে এঁটে নিলাম। ফ্লাইটের বাকি যাত্রীদের ফলো করে খানিকটা হেঁটে পৌঁছলাম একটা জায়গায়। মধুরিমার পরামর্শে যদিও ইয়ুটিউব থেকে এয়ারপোর্টটা আর ইমিগ্রেশনের বিষয়ে অনেক ভিডিও দেখে রেখেছিলাম আগেই, তবুও সবকিছুই নতুন নতুনই লাগছিল। একজন সিকিউরিটি স্টাফ, বেশ অমিশুকে দেখতে ভদ্রমহিলা আমাদের সকলকে দেখে "ইন্ডিয়ান পাসপোর্ট দিস সাইড, অ্যামেরিকান পাসপোর্ট দেয়ের" বলে লাইনে ঢুকিয়ে দিলেন। ভয়ে তখন বুক দুরুদুরু। ব্যাকপ্যাক থেকে যাবতীয় ডকুমেন্টসের ফাইলটা বের করলাম। ছবি তুলব কি, ফোন ব্যবহারও বারণ। তাই ইমিগ্রেশন হচ্ছে যে, সেটাও মা বাবাকে জানাতে পারিনি। পরে জেনেছিলাম আমার মা এর মধ্যে মেয়ের কী হল এই টেনশনে বেশ কয়েকবার মধুরিমাকে মেসেজ টেসেজ করে একাকার। লাইন ধীরে ধীরে এগোচ্ছে। বিরাট ঘর, পরপর অনেক কাউন্টার থাকলেও অনেকগুলিই বন্ধ। ওই গোটা দশেক কাউন্টারে স্টাফ আছে। আর তাই সময়ও লাগছে। এয়ারলাইন্সের ক্রুদের আলাদা কাউন্টার। ওরা যখন ইমিগ্রেশন পর্ব মিটিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছিল, খালি মনে হচ্ছিল ইশ, আমার আপন মানুষগুলো কোথায় চলে যাচ্ছে। এই বিদেশ বিভূঁইয়ে একদম একা।

আর ঠিক তখনই আমার পিছনেই এক প্রৌঢ় দম্পতিকে দেখলাম। বাবা মায়ের বয়সী হবেন। ভদ্রমহিলার হাতে শাঁখা পলা দেখে নিশ্চিত হলাম, যাক, ঘরের লোক। ওনারাও আমায় দেখে বোধ করি একটু আস্বস্ত হলেন। আমায় জিজ্ঞেস করলেন, "আচ্ছা, এখানে শুধু হিন্দি আর ইংরেজি চলবে কাউন্টারে, না?" আমি বললাম, "হিন্দিও চলবে না হয়তো।" ওনাদের মুখ সঙ্গে সঙ্গে শুকিয়ে গেল। ভদ্রলোক বললেন, "আচ্ছা, তুমি তাহলে একটু আমাদের সাথে সাথে থেকো। লাগেজ নেওয়া অবধি।" আমি বললাম, "বেশ। তবে লাগেজ নেওয়ার পরও আবার অফিসারের কাছে যেতে হবে।" অনুরোধ করলেন তখন অবধি থাকতে। কাউকে যতটুকু আমার ক্ষমতায় আছে, সাহায্য করা যায়, সচরাচর করি। এই ক্ষেত্রেও অন্যথা হয়নি। কাউন্টারের অফিসারের ওই অতি বিরক্ত, "কেন যে এরা আমাদের দেশে আসে" গোছের মুখ দেখে আবার প্যাল্পিটেশন বেড়ে গেল আমার। তার মধ্যেও যথাসাধ্য উত্তর দিলাম প্রশ্নের। সেই একই বুলি। কেন এসেছি, কোথায় যাব, কতদিন। কত টাকা সঙ্গে আছে। গুছিয়ে উত্তর দিলাম। বায়োমেট্রিক ভেরিফিকেশন হল। এক মাসের থাকার অনুমতির স্ট্যাম্প পড়ল পাসপোর্টে। কাউন্টার ছেড়ে এগিয়ে গেলাম। ওই দম্পতি এলেন। কিছু অসুবিধে হচ্ছিল ওঁদের। আমায় ডাকলেন হাত নেড়ে। আমার সামনে তখন এক অফিসার, পকেটে বন্দুক। ওরে বাবা, যদি গুলি টুলি করে দেয়, ভরসা নেই। ওঁকে জিজ্ঞেস করলাম, সাহায্য করতে যেতে পারি কি না। অনুমতি পেয়ে গেলাম। আবার ওই গোমড়া মুখো খিটখিটে লোকটার প্রশ্নের ট্রান্সলেশন আর এঁদের উত্তরের পালটা ট্রান্সলেশন পর্ব চলল। সেখানেও পারলে এঁদের ভয় টয় দেখিয়ে দেন আর কি। তারপর এইসব মিটিয়ে লাগেজ নেওয়ার জায়গায়। দু দুটো বেল্টে আমাদের লাগেজ আসবে। খেয়েছে রে। একেই এই ফ্লাইটটার প্রচুর বদনাম। অনেক সময়ই লাগেজ পরে আসে। ওই ওজন বেড়ে গেলে তেল কম নেওয়া হবে, তাই। আমার তখন ফিঙ্গার ক্রসড কেস। যদিও ব্যাকপ্যাকে এক দুদিনের জিনিস রাখা আছে প্রয়োজনীয়, তবুও। ওই হয়রানিতে কে যায়। একটা বেল্টে খানিক্ষণ দেখলাম। না। আমার বেগুনি স্ট্রলির কোন দেখা নেই। অনেক বেগুনি আসছে বটে, কিন্তু আমার কমলা রঙের ফিতে বাঁধাটি আর নেই। একটু বিমর্ষ হয়ে পাশেরটাতে গেলাম। সেখানেও নেই। যাহ্‌, দুর্ভোগের শেষ নেই ভাবছি। এমন সময়ে ওই ভদ্রমহিলা এসে বললেন, "তোমার ব্যাগ পেয়েছ?" বললাম, "না।"

"কেমন দেখতে??"

""বেগুনি। কমলা ফিতে।"

"অনেকে ব্যাগ নামিয়ে রাখছে পাশে। দেখো তোমারটা আছে কি না। আমাদের একটা ওইভাবেই পেয়েছি।"

এই তো। এটা তো খেয়াল করিনি। একটা জায়গায় দেখলাম বেল্টের পাশে অনেকে ব্যাগ নামিয়ে রেখেছে। আরে এঁদের বুদ্ধি কবে হবে কে জানে। নিজের ব্যাগ না, ভুল করে নামিয়েছেন যখন, আবার বেল্টে তুলে দিতে কী হয়? যতসব। যাই হোক, সেখানে একটু এগোতেই দেখি আমারজন চুপচাপ দাঁড়িয়ে। তাকে নিলাম। এঁদেরও ডেকে নিলাম। একসাথে এবার গন্তব্য কাস্টম অফিসারের কাছে। এই ভদ্রলোক বেশ হাসিখুশি। আমার এত কম লাগেজ দেখে নিতান্তই অবাক। ফর্মে কোন ডিক্লারেশন নেই। তাই ছাড়া পেয়ে গেলাম। ওঁদের কাউন্টারের ভদ্রলোক আমায় জিজ্ঞেস করলেন হিন্দি বলি কি না। বললাম যে হ্যাঁ, পারি। আমায় অনুরোধ করলেন দোভাষীর কাজ করতে ওঁদের জন্য। আমি দিব্যি বাংলায় বললাম। এই অফিসারটি নিপাট ভদ্র। আমায় খুব করে ধন্যবাদ জানালেন। ব্যস। এবার আমরা তিনজনে টুকটুক করে বেরোলাম। ওঁরা তখনও ভয়ে ভয়ে। "মনা, আর কিছু করতে হবে না?" "না না। ব্যস। এইবার আনন্দে ঘুরুন। মেয়ের সাথে দারুণ সময় কাটান।"

গেট দিয়ে বেরিয়েই ওঁরা ওঁদের মেয়ে জামাইকে দেখতে পেলেন। আমিও পেয়ে গেলাম মধুরিমা আর ওর বর অরিনকে। একটু সৌজন্য বিনিময়ের পর যে যার নিজের পথে।

মধুরিমাদের দেখলাম সেই পাঁচ বছর পর। এত আনন্দ হয়েছিল, বলে বোঝাতে পারব না। এতক্ষণে স্বস্তি, দুই পক্ষেরই। যাক, আই এম ইন সেফ হ্যান্ডস নাউ। এয়ারপোর্ট থেকে বেরিয়ে চললাম পারকিং লটে।

(বন্ধুর সাথে একটু গল্প করে নিই? আবার ফিরছি তারপরে)