Thursday, March 14, 2019

মেমোরিজ

সকাল হলেই ফেসবুক খুলে রুমুনের প্রথম কাজই হলো "মেমোরিজ" দেখা। বেশ লাগে ওর। ফেলে আসা বছরগুলিকে কী সুন্দর আরো একবার "রি-লিভ" করা যায়। আজও তেমনই দেখতে দেখতে দু'বছর আগের একটা স্ট্যাটাস চোখে পড়লো ওর। অগ্নিকে ডেকে দেখিয়ে বলল, "দেখ, দেখ। কীসব লিখতাম তখন ফেসবুকে। 'সাড়ে পাঁচ বছরে সাড়ে পাঁচখানা ক্রাশ/ভালোবাসা। এত সেরোটোনিন/ডোপামিন আসে কোত্থেকে আমার?'"
অগ্নি বেশ গম্ভীর মুখ করে বলে, "তা এই সাড়ে পাঁচখানা ক্রাশ/ভালোবাসার গল্পটা একজ্যাক্টলি কী? সাড়েটা কে?"
রুমুন মুচকি হেসে বলে, "তুই। আবার কে!"
"মানে? সাড়ে কেন?" অগ্নি অবাক হয়ে প্রশ্ন করে।
"তখনও তুই আমায় প্রোপোজ করিসনি। হাবেভাবে বুঝছি অল্পস্বল্প। ভালোবাসিস। এদিকে আমি বলতে পারছিনা, চাইলেও। তার আগের চারটের এক্সপিরিয়েন্স আমায় বিরত রাখছে নিজে থেকে তোকে প্রোপোজ করতে। তাই ওই আর কী..."
"ভগবান!" অগ্নি কপালে হাত দিয়ে বলে।
"থাক, আর ভগবানকে ডাকতে হবে না। ভাগ্যিস কোনো একদিন সুমতি হয়েছিল তোর.."
"না মানে সেটাই জিজ্ঞেস করতাম ওঁকে। কেন কেন কেন সেদিন 'সুমতি'টা দিয়েছিলেন আমায়। ফেঁসে গেলাম তো আগামী সাত জন্ম।" হাসতে হাসতে অগ্নি ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। খানিক দ্রুতপদেই।
প্রায়র এক্সপিরিয়েন্স বলছে, এরপর ওর কপালে বিশেষ দুর্ভোগ আছে।

Wednesday, March 13, 2019

ঘুঙুর

সারা সপ্তাহ শান্ত চুপচাপ এই অ্যাপার্টমেন্টটা উইকেন্ড এলেই প্রাণচঞ্চল হয়ে ওঠে। তখন এক দঙ্গল কচি কাঁচার ভিড়ে, তাদের হাসির কলরবে আর ঘুঙুরের শব্দে চারিদিক মুখরিত হয়ে ওঠে। ডালিয়ার নিস্তরঙ্গ জীবনেও প্রাণের ঝাপটা আসে শনি আর রবি - এই দুদিনে। দুপুর থেকেই শুরু হয় আলমারি খুলে পছন্দের শাড়ি বাছা। তারপর ঘন্টাখানেকের ওপর ধরে চলে ড্রেসিং টেবিলের সামনে বসে ওর মেকআপ। পছন্দসই সাজগোজের শেষে ঝুঁকে বসে পায়ে সযত্নে পরে নেয় পরম প্রিয় ঘুঙুর।
তারপর বড় হলঘরে এসে সিডি প্লেয়ারটা চালিয়ে দেয়। একের পর এক নাচের বোল বাজতে থাকে। সাথে সাথে বাচ্চাগুলোও তাল মিলিয়ে নাচতে থাকে। আর উইলচেয়ারে বসে দুই হাত দিয়ে ওদের ভুলগুলো শুধরে দেয় ডালিয়া।
এই রেওয়াজ চলে আসছে গত দু'বছর ধরে। সেরিব্রাল অ্যাটাকের পর থেকে শরীরের নীচের অংশের সাড় চলে যাওয়ার পরও নাচকে ছাড়তে পারেনি ডালিয়া। বা বলা চলে, নাচ ডালিয়াকে ছেড়ে যেতে পারেনি।

Tuesday, March 12, 2019

বসন্ত এসে গেছে


অফিস থেকে ফিরে রুমুন দেখল অগ্নি বেশ ফুরফুরে মেজাজে রয়েছে। মনে হয় বসের সাথে মিটিংটা ভালোয় ভালোয় মিটেছে। ঘরে ঢুকে দেখল ও গুনগুন করে গান গাইছে। একটু কাছে আসতে কানে এলো জনপ্রিয় গান, "বাতাসে বহিছে প্রেম, নয়নে লাগিল নেশা..."
একটু হেসেই রুমুন জিজ্ঞেস করলো, "কী ব্যাপার? গান ধরেছিস যে?"
অগ্নি গান না থামিয়েই হেসে মাথা নাড়ে।
রুমুন বলতে থাকে, "অবশ্য তোর আর দোষ কী? বসন্ত কাল। দক্ষিণের বারান্দা থেকে বেশ একটা ঠাণ্ডা বাতাস বইছে। আমারই গান পাচ্ছে!"
তখনই ফ্ল্যাটের কলিং বেলটা বাজল। অগ্নি "আমি দেখছি" বলে মোবাইলটা হাতে উঠে গেলো দরজা খুলতে।
মিনিট দুয়েক পর অগ্নির গলা শোনা গেলো, "এদিকে চলে আয়। এইবারে বুঝবই গানের তাৎপর্য।"
"কী হয়েছে?" জিজ্ঞেস করতে করতে রুমুন বেরিয়ে এসে দেখে ডাইনিং টেবিলে ফুড ডেলিভারি অ্যাপের প্যাকেট থেকে দুটো বড় বাক্স বের করছে অগ্নি।
"নে, দুটো বড় প্লেট নামা। এইবারে সত্যিই "বসন্ত এসে গেছে"।"
রুমুন একটু ভেবলে তাকিয়ে রইল।
"আরে, বুঝছিস না? ফিস কবিরাজি অ্যান্ড চিকেন কাটলেট। স্ট্রেট ফ্রম বসন্ত কেবিন।"
রুমুন এবার হেসে কুটিপাটি। বলল, "ও হরি! এতক্ষণে বুঝলাম!"

Monday, March 11, 2019

বালিশ

অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে ছোট্ট এক কামরার ফ্ল্যাটে অনিতা আর হর্ষবর্ধনের আরো ছোট্ট সংসার। দুজনেই গ্র্যাজুয়েট স্টুডেন্টস। ল্যাবের কাজ, তার প্রেশার, বিদেশ বিভূঁইয়ে একলাযাপন, পরিবার পরিজন থেকে দূরে থাকা। সব মিলিয়ে দুজনেই নাজেহাল। তাই সংসারের বয়স ছয়মাস না পেরোলেও হানিমুন পিরিয়ডটা কবে যে ফুরুত করে উড়ে গিয়েছে, টেরই পায়নি ওরা।
আজ ওদের সকাল থেকে ঝগড়া শুরু হয়েছে। ঘটনার সূত্রপাত কে পাউরুটি টোস্ট করে গ্যাস মুছে রাখেনির মতো নিতান্তই সামান্য হলেও সমস্ত জমে থাকা মান অভিমান উপচে উপচে পড়েছে সারাদিন। ডিপার্টমেন্ট গিয়ে পর্যন্ত একসাথে লাঞ্চ সারেনি। সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরেছে যে যার মতো নিজে নিজে। আলাদা সময়ে।
সারাদিন কেউই কারুর সাথে কথা না বললেও যে যার মতো নির্দিষ্ট কাজ করে চলেছিল। একজন কাচা জামা ভাঁজ করে তুলে রাখলো, তো আরেকজন ফ্রিজ থেকে খাবার বের করে গরম করলো। বিনা বাক্যব্যায়ে একজন টিভি চালিয়ে সোফায় বসে খেয়েও নিলো। অন্যজন হাতে বই নিয়ে। এই অবধি সব ঠিক চলছিল।
বাধ সাধলো শোয়ার সময়। বেডরুম একটাই। আজ তো কিছুতেই দুজনে এক ঘরে শোবে না। অন্যান্যবার হর্ষবর্ধন শিভালরি দেখিয়ে অনিতার জন্য বেডরুম ছেড়ে দিয়ে নিজে লিভিং রুমে বালিশ কম্বল নিয়ে শুয়ে পড়ে। আজ যে সকালবেলা রাগের মাথায় অনিতা কাঁচি চালিয়ে বালিশের সমস্ত তুলো বের করে দিয়েছে। অগত্যা?
খানিক ইতস্তত করলো দুজনেই। ঘড়ির কাঁটা দশটা পেরিয়ে এগারোটা পৌঁছে গেল। কিন্তু ওয়াকিবহাল দম্পতির কেউই আগ বাড়িয়ে আর শুতে যেতে পারছেনা।
সোয়া এগারোটার দিকে অনিতা একবার গলা খাকরি দিয়ে বলল, "বালিশ তো মোটে একটাই। ফর অল প্র্যাকটিক্যাল পারপাজেস, আপাতত যুদ্ধ বিরতি হোক। কী বলিস?"
হর্ষবর্ধন যেন ঠিক এই কথাটার জন্যই অপেক্ষা করছিল। ও অনিতার কথাটা লুফে নিয়ে বলল, "এমনিও চব্বিশ ঘন্টা ঝগড়া বহাল রাখা স্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকারক। কাজেই এবার মিটিয়ে নিলেই তো হয় একেবারে পাকাপাকিভাবে?"
অনিতা কিছু বলেনা। মুচকি হেসে বেডরুমে ঢোকে, সাধের বালিশের বৃহত্তর ভাগের দখল নিতে।

songlap

রবিবার সন্ধ্যায় রুমুন আর অগ্নির বাড়ি ঠিক কী হচ্ছে? ছোট্ট এক ঝলক।
(দুই হাতে দুটো চায়ের কাপ নিয়ে ব্যালকনিতে প্রবেশ অগ্নির।)
- নে, চা'টা ধর।
- ও। থ্যাংকস। বিস্কুটের কৌটোটা আনিসনি?
- আমার দুটো মোটে হাত বাবা, কী করে তাতে দুই কাপ চা আর বিস্কুটের কৌটো ম্যানেজ করবো?
- ইউ নো, দের ইজ সামথিং কল্ড আ ট্রে দ্যাট ইউ কুড ইউজ।
- মাথায় আসেনি। নেক্সট টাইম ফর শিয়র। দাঁড়া আনছি।
- না। তুই বোস। আমি আনছি।
- উঠছিসই যখন, একটু প্লিজ ছোট্ট করে নাগেটস ভেজে আনবি সাথে?
- চিকেন না ভেজ?
- অফ কোর্স চিকেন।
- ও ইয়া, রাইট। কোনোদিনও যদি নন ভেজের অপশন থাকা সত্ত্বেও তুই ভেজ চাস, বুঝবো ইট ইজ এ রেসকিউ সিগন্যাল ফ্রম ইউ। রাইট রাইট।
- হুম।
- আনছি।
- আর শোন, মুখরোচকের প্যাকেটটার কী অবস্থা?
- আধ প্যাকেট আছে।
- ওটাও প্লিজ নিয়ে আসিস।
- হুম।

(মিনিট দশেক পর। রান্নাঘর থেকে ভাজাভুজির ছ্যাক ছোক শব্দ এবং সুস্বাদু গন্ধ আসছে।)
- এই শোন না।
- আবার কী?
- কালকের লেফট ওভার গাজরের হালুয়া আছে না?
- না। নেই।
- এই, কী করে হয়? আমি নিজে রেখেছি ফ্রিজে।
- নেই তো আমি কী করব?
- তুই বললেই হলো?
- আরে এই তো এখন নাগেটসগুলো বের করলাম। থাকলে তো চোখে পড়ত।
- উহু। হতেই পারে না।
- তুই নিজে এসে দেখে যা।
- হ্যাঁ আসছি।
(অগ্নির রান্নাঘরে প্রবেশ। সামনে রাখা কাঁচের বাটিতে গাজরের হালুয়া।)
- এটা কী হলো? এইরকম রসিকতার কী মানে?
- রান্নাঘরে ঢুকেই দেখলাম সামনেই ট্রে। তাতে চা চলকেও পড়েছে। বুঝে গেলাম। গোটা ব্যাপারটাই প্ৰি প্ল্যান্ড। স্রেফ আমায় খাটানোর জন্য।
- সাবাশ তোপসে!
- যা বারান্দা থেকে চায়ের কাপ দুটো নিয়ে আয়। মাইক্রোতে আরেকবার গরম করে আন। আমি এগুলো নিয়ে বসছি।
- খাটিয়ে খাটিয়ে মারলি আমায়। উফ।
- ফুড ফর ওয়ার্ক! সিম্পল!!

Saturday, March 9, 2019

বায়স্কোপ

আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আরো একবার লাল কাঞ্জিভরমের আঁচলটা ঠিক করে নিলো নয়নিকা চ্যাটার্জি। শাড়ির সাথে মানানসই ভারী গয়না পরেছে। তবে মেকআপ অবশ্যই যৎসামান্য। ডাকসাইটে সুন্দরী নয়নিকার কোনো বাড়তি প্রসাধনের কোনোদিনও প্রয়োজন হয়নি। অভিনেত্রী থাকাকালীনও না। এখন এই মাঝবয়সে এসেও না। স্বামী সুপ্রতিম ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির নামকরা প্রযোজক। পৈতৃক পেশা। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রোডাকশন হাউজের সিনেমার প্রিমিয়ার পার্টিতে ওদের আজ নেমন্তন্ন। এক্কেবারে নতুন কোনো পরিচালকের প্রথম সিনেমা। তবুও ট্রেলার অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়েছে সোশ্যাল মিডিয়াতে। গানও সুপারহিট। আর তাই আজ প্রচুর লোকজন থাকবে, নামী দামী সবাই। অনেক মিডিয়া। নিজেদের স্টেটাসটা বজায় রাখতেই যাওয়া আজ।

দামী গাড়ী চেপে চ্যাটার্জি দম্পতি যখন পৌঁছলো মাল্টিপ্লেক্সে, তখন উপচে পড়ছে ভিড়। ফ্ল্যাশবাল্বের ঝলকানি। মাইক হাতে নিউজরিপোর্টার। ইন্ডাস্ট্রির হুজ হু সব্বাই হাজির। ছবির প্রযোজক মিস্টার আগরওয়াল নিজে দাঁড়িয়ে হাত জোড় করে সব অতিথিকে অভ্যর্থনা জানাচ্ছেন। ওদের দেখে এক গাল হেসে বললেন, "আরে দাদা, এত লেট করলেন। আসুন আসুন। বসুন। বৌদি, থ্যাংক ইউ ফর কামিং।" "প্রীতি, স্যর আর ম্যামকে ওদের সিটে পৌঁছে দাও।" নির্দেশমতো এক সুসজ্জিতা যুবতী ওদের দিকে এগিয়ে এলো। নিয়ে গেল প্রেক্ষাগৃহে। এক্কেবারে সামনের সারিতে ওদের বসার জায়গা দেখিয়ে দিয়ে প্রীতি এগিয়ে গেলো পরবর্তী অতিথিদের জন্য।
যথাসময়ে আগরওয়াল বাবু এলেন। দু চার মিনিট বক্তৃতা দিলেন। কেউ কেউ পরিচালক কই জিজ্ঞেস করায়, বললেন, "ও তো এক্কেবারে নতুন। খুব নার্ভাস। বলেছে আড়াল থেকে আপনাদের প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করে তারপরে সিনেমার শেষে এসে পরিচয় করবে। তাহলে চলুন, আর সময় নষ্ট না করে সিনেমাটা দেখি। আশা করছি, আপনাদের সকলের ভালো লাগবে।"
প্রেক্ষাগৃহের সমস্ত আলো নিভে গেল। কালো পর্দার ওপর ভেসে উঠলো একটা ঝকঝকে নীল আকাশ। সামনে আরো ঝকঝকে সাদা কাঞ্চনজঙ্ঘা। আবহে ভেসে উঠলো শান্তিদেব ঘোষের চিরপরিচিত কণ্ঠে "অমল ধবল পালে"। গাঢ় নীল গোটা গোটা অক্ষরে এবার লেখা উঠলো "রডোডেনড্রোন"। নয়নিকা চমকে উঠলো। তাহলে কি...

প্রেসিডেন্সির কোয়াড্রঙ্গেলে শীতের দুপুরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে এদিক ওদিক বসে থাকা আর পাঁচটা সাধারণ যুগলের মতোই ওরা দুজনে বসে আছে। পিলারে হেলান দিয়ে। ছেলেটি মেয়েটির কাঁধে মাথা এলিয়ে। হাতে একটা খয়েরি মোটা বাঁধানো ডায়রি।
"বুঝলি নয়না, তোর আজ অবধি যত লেখা পড়েছি, তার মধ্যে শ্রেষ্ঠ এটা। প্রচন্ড সিনেম্যাটিক। এমনিতেই এত সুন্দর ডিটেলিং করেছিস, স্ক্রিপ্ট বানানো জলভাত। কোনোদিন যদি সিনেমা বানাতে চাস এটা দিয়ে, আমায় বলতে পারিস। আই এম সো কনভিন্সড উইথ দ্য স্টোরি।"
"বেশ। এই গল্পটা তোকেই দিলাম। তবে আমার একটা ইচ্ছে আছে। পারলে পূরণ করিস।"
"কী বল? তেরে লিয়ে সর আঁখো পর।"
"বাবাঃ, সিনেমা করার আগেই এত ড্রামাটিক!" নয়না হেসে বলে।
"ইয়ার্কি না। বলে ফেল তোর ইচ্ছেটা। কাঞ্চির রোলে তুই অভিনয় করবি? আর হিরো কাকে চাই? বুম্বাদা?"
"ধ্যাৎ। আমায় কে অভিনয়ে নেবে?"
"আমার এমন সুন্দরী বান্ধবীকে যে কেউ লুফে নেবে।"
"বাজে কথা থামা। বলছি যে যখন টাইটেল কার্ড আসবে স্ক্রিনে, প্লিজ অমল ধবল পালে গানটা দিস আবহে। শরতের সেটিংয়ে গল্প তো। তাই। আমার সবচেয়ে প্রিয় শরতের গান ওটা।"
"নিশ্চয়ই। আর যে সে গাইবে না। শান্তিদেব ঘোষের ভার্সানটাই বাজবে। আমি জানি, ওটা তোর প্রিয়।"

নয়নিকা অবাক হয়ে দেখতে থাকে সিনেমাটা। প্রতিটি সিন ওর চেনা। এমনকী কোনটার পর কী হতে চলেছে, সব বলে দিতে পারে। সংলাপ পর্যন্ত। থরথর করে কাঁপতে থাকে ও। ইন্টারভালের আগেই সুপ্রতিমকে "আমি একটু বাইরে যাচ্ছি" বলে বেরিয়ে যায়। বাইরে লবিতে তখন প্রায় কেউ নেই। শুনশান। কোল্ড ড্রিঙ্কের দোকান থেকে একটা স্প্রাইটের গ্লাস কিনে ঢকঢক করে খেলো পুরোটা। গলাটা শুকিয়ে গিয়েছিল। পার্চমেন্ট পেপারের মতো। ঠান্ডা পানীয়র ফলে এতক্ষণে একটু স্বস্তি। কালো গদির সোফায় বসলো নয়নিকা। হাতে ক্লাচ ব্যাগটা মুঠোর মধ্যে চেপে। ওই তীব্র এসির মধ্যেও কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমছে।
এও কি সম্ভব? ওর এত বছর আগের লেখা গল্প। হুবহু। টাইটেল সিনসহ। ও ছাড়া আর জানতো বাণী। প্রেসিডেন্সির সহপাঠী। কিন্তু...কিন্তু মধুজা যে বলেছিল, বাণী রিহ্যাবেই আত্মহত্যা করে?
কলেজ পাস করার পর বাণী এক দুটো সিনেমা কুড়িয়ে বাড়িয়ে প্রযোজক জোগাড় করে করেছিল। সব ফ্লপ। ইতিমধ্যে নয়না ওরফে স্ক্রিনের নয়নিকা একটার পর একটা হিট দিচ্ছে। ওকে সাইন করাতে বাড়ির বাইরে প্রোডিউসারের ভিড়। বাণীকে অনেকবার টাকা দিয়ে  ও সাহায্য করতে চেয়েছিল। বলেছিল ওর প্রযোজক হবে। কিন্তু বাণীর তখন মেল ইগো চরমে। নয়নার সাফল্যে ঈর্ষান্বিত হয়ে শেষ পর্যন্ত ওদের সম্পর্কটাও শেষ হয়ে যায়। বাণী চেষ্টা চালিয়ে যায় সিনেমা বানানোর। নিজের সর্বস্ব দিয়ে একটা মাঝারি মাপের সিনেমাও বানায়। গ্রামের দিকে চলেছিল। সেই দেখে একটি বড় প্রোডাকশন হাউজ ওর সাথে চুক্তি করে তিনটে সিনেমার। সেই সিনেমার না আছে কোনো গল্প, না কোনো রুচি। তবুও ধার দেনা শোধ করতে ওকে এগুলো করতেই হয়।
নয়না ততদিনে সুপ্রতিমকে বিয়ে করেছে। প্রেম করেই। খবর পেয়েছে বাণীও ওর ক্যামেরম্যানের মেয়েকে বিয়ে করে ভরপুর সংসারী। এক দুটো রুচিশীল সিনেমার চেষ্টাও করেছে। কিন্তু কপাল খারাপ। শহরের দর্শক তখন বাংলা সিনেমা দেখে না। গ্রামে সেসব জাত সিনেমা বোঝার লোক নেই। পরপর তিনটে ফ্লপ। বাজার মন্দা। প্রোডিউসারেরা আর রাজি নয় পরীক্ষা নিরীক্ষাতে। তাদের শুধুই চাই যাত্রাপালা গোছের সিনেমা। যা দেখে গ্রামের মানুষ খুশি হবে। দলে দলে এসে সিনেমা দেখবে।
বাণী ভুগতে লাগলো চরম হতাশায়। আস্তে আস্তে মদের নেশায় পড়লো। লিভারের বারোটা বাজলো। রিহ্যাবে ছিল। সেখানে একদিন ভোরবেলা ওর ঝুলন্ত দেহ আবিষ্কার হলো।

"কী? ভালো লাগছে না সিনেমাটা?" কাঁধে একটি হিমশীতল হাতের স্পর্শে চমকে তাকালো নয়নিকা। দেখলো এক বছর কুড়ি একুশের মেয়ে ওর সামনে দাঁড়িয়ে। সাধারণ সাজগোজ। ও উত্তর দিলো না। মেয়েটি বললো আবার, "বেরিয়ে এলেন যে?"
"ইচ্ছে হলো না।" নয়নিকা উত্তর দিলো।
"আপনি প্লিজ দেখবেন। আপনার মতামতের জন্য ভীষণভাবে আমি ব্যাকুল। প্লিজ।"
"কে তুমি?" নয়নিকা বিস্ময়ভরে জিজ্ঞেস করে।
মেয়েটি স্মিত হেসে বলে, "আমি এ সিনেমার ডাইরেক্টর। আমার নাম তিতলি।"
"তুমি এই গল্প কোথায় পেলে? এই স্ক্রিপ্ট?" নয়নিকা জানতে চায়।
"বাণীব্রত মুখোপাধ্যায় আমার বাবা। ধরুন, পৈতৃক সম্পত্তিতে আমি একটি মোটা খয়েরি ডায়রি পাই। সেখানে ছিল ওই গল্পের স্ক্রিপ্ট। অরিজিনাল লেখাটাও। আমার খুব পছন্দ হয়। তাই সিনেমাটা বানাই। মায়ের কাছে শুনেছি, বাবার খুব ইচ্ছে ছিল এটা বানানোর। পারলো না। আমি তাই ফিল্ম স্কুলে গেলাম। হাত পাকালাম  এক দুটো শর্ট বানিয়ে। এইটা আমার প্রথম ফুল লেন্থ ফিচার। তাই খুব নার্ভাস।"
নয়নিকা ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে তিতলির দিকে। কোনো শব্দ বেরোয় না মুখ দিয়ে।
তিতলি ওর হাত ধরে উঠিয়ে বলে, "আপনাকে এটা পুরোটা দেখতেই হবে। দয়া করে চলুন।"
নয়নিকা তিতলির হাত ধরে প্রেক্ষাগৃহে ঢোকে। নিজের সিটে বসে। সুপ্রতিমের " কোথায় ছিলে? ইন্টারভাল হয়ে আবার শুরু হলো। ভালো এগোচ্ছে। মিস করলে"র উত্তরে "একটু দরকার ছিল" বলে পর্দায় চোখ ফেরালো। সিনেমা চলতে থাকে। দু ঘন্টা পর যথারীতি শেষও হয়। শেষ সিনে লেখা ওঠে, "থ্যাংক ইউ বাবা (বাণীব্রত মুখোপাধ্যায়)। থ্যাংক ইউ নয়না আন্টি।"
গোটা প্রেক্ষাগৃহ হাততালিতে ফেটে পড়ে। সকলের চোখেই জল, মুখে তৃপ্তির হাসি। অনেকদিন পর এমন এক চমৎকার সিনেমা দেখে সবাই অভিভূত।
নয়নিকা চ্যাটার্জি আঁচলের কোণ দিয়ে একবার চোখ মোছে। এগিয়ে যায় তিতলির দিকে। জড়িয়ে ধরে ওকে। ওর মধ্যে দিয়ে খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করে নিজের মেয়েবেলার সেই প্রিয় বন্ধুটিকে।


Friday, March 8, 2019

নারী দিবস উপলক্ষে সংলাপ

রুমুন-অগ্নির নারী দিবস উপলক্ষে ফিল্মি সংলাপ:

- কীরে সারাদিনে একবারও উইমেন্স ডের উইশ করলি না?
- ধুর ধুর। নারী দিবস টিবস সব ফালতু। একটা দিন কেন লাগবে তোদেরকে সেলিব্রেট করতে?
- সে ভ্যালিড পয়েন্ট বটে। কিন্তু তবুও, নারী দিবসের ইতিহাসের কথা মাথায় রেখে একটা দিন তো আলাদা করে সম্মান করাই উচিত।
- উহু। সম্মানটা রোজ করা উচিত। ভালোটা রোজ বাসা উচিত।
- দ্যাটস ট্রু। এই জন্যই তোকে এত ভালোবাসি। কী সুন্দর সেনসিটিভ তুই এইসব বিষয়ে।
- হুম। তবে তুই কী করে জানলি যে এটা আমি জাস্ট বলার জন্য বললাম নাকি মিন করলাম?
- সে আমি জানি।
- তাই?
- হুম।
- তবুও, আজকের বিশেষ দিনে সবাই যখন তোকে উইশ করেছে...
- অফিসে বস পর্যন্ত মেল করেছে আমাদের সব ফিমেল এমপ্লয়িজদের। আলাদা করে। পার্সোনালাইজড।
- সে হয়তো দেখ এইচ আর থেকে ইন্সট্রাকশন এসেছিল।
- হতে পারে।
- তা যা বলছিলাম, তোকে সবাই যখন উইশ করলো, আমারও কিছু বিশেষ করে উচিত আজকের দিনে।
- করলে তো খুশি হবোই।
- তাহলে দাঁড়া দু মিনিট।

- এই, এই অগ্নি, কী হলো? মাথা নীচু করে দাঁড়ালি কেন?
- রুমুন, এই নাকি তুই নিজেকে এস আর কের এত বড় ফ্যান বলিস?
- এখানে আবার এস আর কে কোত্থেকে এলো?
- কুছ কুছ হোতা হ্যায়ের বিখ্যাত প্রোপোজ সিনটা মনে কর।
- উম, মনে পড়ছে না।
- পঞ্চাশবার দেখেছিস। আর আমায়ও তিরিশ বার দেখিয়েছিস। আমার ডায়লগ মুখস্থ, এদিকে তুই বলছিস মনে নেই। বোঝো কান্ড। আর যদি কখনো দেখি তোর সাথে সিনেমাটা...
- আজকেই দেখবো। টু ব্রাশ আপ অন ইট। এবার বল দেখি, কী ডায়লগ।
- শোন তাহলে।
- বল
- এক মর্দ কা সর সিরফ তিন ঔরতকে সামনে ঝুঁকতা হ্যায়। এক অপনে মা, এক দুর্গা মা, ঔর। ঔর...

(না এরপরের সিনে বিশেষ গেলাম না। চোখ টোখ মারামারি, বুকে জড়াজড়ি ইত্যাদি অনেক কিছুই আছে। আপনার বরং সিনটা দেখে নিন। লিঙ্ক দিলাম।
https://youtu.be/Ta5gpHf3PFc)