Saturday, June 8, 2019

তুয়ার হিজিবিজি ৪

ইন্টার্নশিপ শুরু হওয়ার পর এই প্রথম একটা শনিবার তুয়ার ছুটি ছিলো। শ্রীময়ী ম্যাম সহ বাকি অনেকেই জামাইষষ্ঠীর ছুটি নিয়েছিল। তুয়া সারাদিন ওর এই এইটুকু ঘর, আলমারি এই সমস্ত গোছগাছ করলো। যদিও ঘর দোর পরিষ্কার করার জন্য জেঠিমাদের ঠিকে লোক মীনাদিকেই বলা আছে, তাও মাঝে মধ্যে একটু নিজের হাতে ঘর দোর না গোছালে তুয়ার চলে না। মোটে অষ্টাদশী হলে কী হবে? তুয়ার কিন্তু এই ইতিমধ্যেই বেশ একটা নিজের কাজ নিজে করা, স্বাধীনচেতা মনোভাব এসে গিয়েছে। আসানসোলের পাড়া পড়শিরা সেসব শুনে মাকে বলে, "বাহ বৌদি, মেয়ে যে ঘোরতর সংসারী হয়ে গেলো। বেশ ভালো। গ্র্যাজুএশনটা পাস করলেই বিয়ে দিয়ে দিতে পারবে, কোন চিন্তা নেই।" মা বা বাবা ভাগ্যিস এসবে তেমন মাথা ঘামায় না। ওদের ইচ্ছে, অবশ্যই তুয়ারও। মাস্টার্স পড়বে। তবে চাকরি। তারপর না হয় পরের কথা পরে ভাবা যাবে। তুয়া মাস কম্যুনিকেশন নিয়ে পড়ছে। ওর ইচ্ছে পরবর্তীকালে কোন মিডিয়া হাউজে যুক্ত হওয়ার, সাংবাদিক হিসেবে। আর সেই জন্যই এই সামারে ও বিখ্যাত এক বাংলা ম্যাগাজিনে ইন্টার্নশিপ করছে।
তুয়া যেই বাড়িটাতে থাকে, এর ঠিক সামনেই একটা বড় খেলার মাঠ। মাঠের চারিদিকে দোতলা বাড়ি। এখনও মাল্টি স্টোরিডের খপ্পরে পড়েনি এই পাড়াটা। বেশ একটা পাড়া-পাড়া ভাব এখনও আছে। তুয়ার খুব ভালো লাগে এই পরিবেশ। এক তলায় জেঠু জেঠিমা থাকেন। এই জেঠু জেঠিমা তুয়ার নিজের আত্মীয় না হলেও দূর সম্পর্কের পরিচিত। ওঁদের ছেলে ইংল্যান্ডে চাকরি করে। ওখানেই সেটল্ড। দোতলায় যে ঘরে তুয়া থাকে, তার পাশে দুটো ঘর সব সময় তালা দেওয়া থাকে, শুনেছে ওই দুটোই সেই ছেলের ঘর। মীনাদি সপ্তাহে দু তিনদিন তালা খুলে পরিষ্কার করে। জেঠু জেঠি দুজনেই বয়স্ক। একলা থাকবেন, এত বড় বাড়ি। তাই পেয়িং গেস্ট রেখেছেন। কাগজে কলমে তুয়ার লোকাল গার্জেন হলেও, সেরকমভাবে ওঁরা গার্জেনগিরি ফলাননা। মাঝে মধ্যে জেঠির হেঁশেলে ভালো মন্দ রান্না হলে ওপরে পৌঁছে যায়। এমনিতে তুয়া নিজের বাজার নিজেই করে। রান্নাটা করে দেয় লক্ষ্মী পিসি। তুয়া রোজ বেরনোর আগে একটা চিরকুটে লিখে দিয়ে যায় কী কী রান্না হবে। ওর ঘর লাগোয়া ছোট্ট কিচেনে। ফ্রিজে বাজারহাট থাকে। পিসি সারাদিনে যে কোন সময় হোক এসে রান্না করে রেখে যায়। এই ব্যবস্থা জেঠিমারই করা। তুয়াকে প্রথমেই বলেছিলেন, "শোনো, তোমাদের বয়সের খাওয়া দাওয়া রুচি সব আমাদের থেকে আলাদা। তাই ভালো হয়, নিজের খাওয়ার ব্যবস্থা আলাদা করেই করো। এই হলে সম্পর্ক খারাপ হবেনা। এমনিতেই ভাড়াটে বাড়িওয়ালার সম্পর্ক বিখ্যাত।"
এই সিস্টেমে তুয়ার দিব্যি চলে যাচ্ছে। এক বছর তো হয়ে গেলো। কেউ কারুর ব্যাপারে নাক গলায় না। বাড়ির কিছু সামান্য নিয়ম কানুন আছে। ওই যেমন, রাত দশটার মধ্যে ফেরা, বাইরে রাত কাটালে আগাম জানিয়ে রাখা। এইসব। কথাবার্তা খুব যে নিয়মিত হয়, তা না। মাঝে মধ্যে হাই হ্যালো। সৌজন্যমূলক হাসি বিনিময়। ব্যস। এই ভালো। বাসন একসাথে থাকলে ঠোকাঠুকির যে প্রবল সম্ভাবনা, ভাগ্যিস দুপক্ষই জানে। আর তাই, পাড়া প্রতিবেশীদের অবাক করে দিয়ে এক বছরের ওপর তুয়া টিকে আছে পেয়িং গেস্ট হিসেবে।

Friday, June 7, 2019

তুয়ার হিজিবিজি ৩

আজ গিনির জন্মদিন। গিনি, মানে তুয়ার বেস্ট ফ্রেন্ড। সেই ছোটবেলা থেকে ওরা বন্ধু। সেই সূত্রে ওদের মায়েরা বন্ধু, বাবারা বন্ধু। গিনি থাকে সিডনিতে। ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে গিয়েছে। তুয়া এসেছে কলকাতা। দুই বন্ধুর মধ্যে অবশ্য ভৌগোলিক দূরত্বটা বাড়াবাড়ি হলেও, ভাগ্যিস মনের দিক থেকে এখনও ওরা পড়শী। রাত বারোটা বাজতেই, প্রতি বছরের মতোই গিনিকে ফোন করলো তুয়া। এবং দুটো রিং হতেই মনে হলো, "এই রে, এখন তো ওদের সবে ভোর সাড়ে পাঁচটা। ঘুমাচ্ছে নির্ঘাত। রেখেই দিই। সকালে উঠে ফোন করবো।"  ফোনটা সবে কাটতে যাবে, ঘুম জড়ানো গলায় গিনি বলল, "বল তুয়াপাখী।" এক লহমায় তুয়ার মুখে হাসি ফুটে উঠলো।  "তুয়াপাখী"। নামটা এত মিষ্টি লাগে শুনতে। তুয়া একটু বেশিই রোগা। বাকি বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়স্বজনরা যখন এই নিয়ে ওকে বারবার কিছু না কিছু উপদেশ দিতে থাকে, একমাত্র গিনিই ওকে সান্ত্বনা দেয় আর বলে, "আরে, চাপ কী? সবাই হাতি গন্ডার হলে ইকো সিস্টেম ব্যালেন্স কে মেন্টেন করবে? তুই নাহয় পাখীই হলি। আমার তুয়াপাখী।" গিনিটা খুব সমঝদার। কখন কার সাথে কীভাবে কথা বলতে হবে, আদব কায়দা সবেতে এক্সপার্ট। তুয়া আবার ঠিক তার উল্টো। ঠিকমতো গুছিয়ে কথা বলতে পারে না, এমন না। তবে যথা সময়ে কথাগুলো আসে না মাথায়। ফলে প্রচুর আফসোস। প্র্যাক্টিকাল সমস্যার সমাধানের জন্যও তুয়া বরাবর গিনির দ্বারস্থ হয়। সব মিলিয়ে, গিনি এক্কেরে তুয়ার ফে ফি গা, অর্থাৎ, ফ্রেন্ড ফিলোজফার গাইড।
"এই সরি, আমার একদম মাথায় ছিল না টাইম জোনের ব্যাপারটা। তোর কাঁচা ঘুম ভাঙ্গালাম।" তুয়া একটু লজ্জিত কন্ঠেই বলে।
"ওরে ইডিয়ট, অন্তত আগে উইশটা তো করবি!" গিনি মৃদু ধমক দেয়।
"হ্যাপ্পপ্পপি বার্থডে গিনি। আনন্দে কাটুক বছরটা। খুব খুব এঞ্জয় কর। আজকের পার্টিটা ডিউ রইলো।"
"অবশ্যই। এখানে দু একটা বন্ধুবান্ধব যা জুটেছে, ওদের সাথে আজ সেলিব্রেশনের প্ল্যান আছে ঠিকই।"
"কে কে? মার্ক? আহেম" তুয়া গিনিকে মাঝ বাক্যে আটকে দিয়ে বলে।
"এক মা খাবি মার্কের চ্যালা কোথাকার। কথা শেষ করতে দে।" গিনি আবারও বকে দেয়।
এ ওদের নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপার।
দুজনেরই ভালো লাগে। একে অপরকে শাসন করতে। সহায় হতে। ওরা দুজনে যেন  মায়ের পেটের বোন, এমন মিলমিশ ওদের।
আরো খানিক টুকটাক গল্প করে তারপর ওরা ফোন ছাড়ে। তুয়াকেও এবার শুতে হবে। কাল অফিসে একটু হেক্টিক আছে। শ্রীময়ী ম্যামের সাথে কাল একটা ইন্টারভ্যু শুটে যেতে হবে। গিনিও হয়তো আর ঘন্টাখানেক ঘুমিয়ে কলেজ যাবে। ওদের এখন শীত যাবো যাবো করছে। দারুণ ওয়েদার। তুয়ার খুব ইচ্ছে হয়, একবার গিনির কাছ থেকে ঘুরে আসবে। মে মাসে ঠান্ডায় ঠকঠক করে কাঁপবে। ভারি মজা। গিনি থাকতে থাক্তেই যেতে হবে। টাকা জমানো শুরু করে দিয়েছে ও তাই।

সকালে ঘুম ভাঙল সেই ৬ঃ২৩এই। হাত মুখ ধুয়ে লেবুর জল বানিয়ে একবার ওর পুঁচকি বারান্দায় এসে দাঁড়ালো তুয়া। নীচে দুই মা দাঁড়িয়ে, সাথে তাদের দুই ছানা। মায়েরা ওদের শান্ত হয়ে দাঁড়াতে বলছে, বাস এসে যাবে এক্ষুণি। ওরা কে শোনে কার কথা। দুটিতে দৌড়াদৌড়ি করে যাচ্ছে। কী মিষ্টিই যে লাগছে ওদের দেখতে, তুয়া ভাবে। ঠিক যেন বছর বারো আগের তুয়া আর গিনি। সেই ভোরের বাস স্ট্যান্ড, কালারম্যান, কুমির ডাঙ্গা খেলা। ওদের অবশ্য দল ছিলো আরো বড়। মোহনা, চাঁদনী, দোলন। তখন এত গলায় গলায় ভাব, এদিকে এখন দেখো, কারুর সাথেই আর যোগাযোগ নেই। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে তুয়া। নাহ, আবার আস্তে আস্তে সব্বাইকে খুঁজে নিতে হবে।

Thursday, June 6, 2019

তুয়ার হিজিবিজি ২

যতই রাত করে ঘুম আসুক না কেন, ঘড়ি ধরে ঠিক সাড়ে ছটায় তুয়া উঠে পড়বেই। ফোনে অ্যালার্ম দেওয়া আছে ঠিকই, কিন্তু বায়োলজিকাল ক্লকের ওসব লাগেনা। নইলে প্রতিদিন সকাল সকাল উঠে মোবাইলটা হাতে নিয়ে কখনো রোজ ঠিক ৬ঃ২৩ই বাজে? একটুও অন্যথা হবে না? তবে এ অভ্যেসের জন্য দায়ী ওর দীর্ঘ চোদ্দ বছরের মর্নিং স্কুল। শীত গ্রীষ্ম বর্ষা, সাড়ে পাঁচটায় ঘুম থেকে উঠে দৌড়াদৌড়ি করে ঘুম চোখে নীল সাদা লজঝরে স্কুলবাসে চেপে হন্তদন্ত হয়ে মর্নিং আসেম্বলিতে "মঙ্গল দীপ জ্বেলে" গাওয়া। এইভাবেই হয়ে যেত ওর রোজের গানের রেওয়াজ। আজকাল আর গান গায়না তুয়া। গান যে খুব ভালোবেসে গাইতো, এমন কথা বলা যায়না। বরং মাকে রীতিমতো বকাঝকা করেই সন্ধ্যেবেলা হারমোনিয়াম নিয়ে বসাতে হত। পাশের বাড়ি থেকে মৃন্ময়ী কাকীমার সন্ধ্যে দেওয়ার শাঁখের শব্দই হতো সেই সিগ্নাল। এইবার বাপু খেলা থামিয়ে ঘরে এসো, মা অপেক্ষা করছে। নইলে কপালে দুঃখ আছে। আজকাল তুয়ার জীবন থেকে কী করে কে জানে গান হারিয়ে গিয়েছে। দিন রাত কানে ইয়ারফোন গুঁজে কাজের ফাঁকে ফাঁকে গান চলতে থাকে বটে, তবে সেসব গানের সুরে বা কথায় তেমন মনোযোগ দেওয়া হয়না। এমন নয় যে তুয়া প্রাচীনপন্থী, হালফিলের গান মানেই বিশ্রী, এমন মনোভাব। একদমই না। আজকাল কত সুন্দর সুন্দর গানও হয়। শুনেওছে তুয়া। কিন্তু কিছুতেই যেন আর আগের মতো আনন্দ পায়না। গাইতেও ইচ্ছে করেনা। কতদিন স্টেজে অনুষ্ঠান করেওনি, দেখতেও যায়নি। অভ্যেস।
ইলেক্ট্রিক কেটলিতে খানিকটা গরম জল করে, তাতে লেবুর রস আর মধু মিশিয়ে খাওয়ার হ্যাবিটটা মা তৈরি করে দিয়েছে। এত সর্দি কাশিতে ভোগে, তাই একটু ন্যাচারাল সোর্স অফ ভিটামিন সি। খেতে খুব একটা ভালো লাগেনা। কিন্তু ওই যে, অভ্যেস। উপকার পায় বলেও তো মনে হয়না। একটু বৃষ্টিতে ভিজলেই হ্যাচ্চো হ্যাচ্চো শুরু হয়ে যায়। তবুও রোজ নিয়ম করে আলসেমি কাটিয়ে জলটা গরম ও করবেই। কোন কোন দিন ইচ্ছে হয় একটু বিদ্রোহ করে, খাবে না। জল গরম করবে না। করলেও ফেলে দেবে। তবে পর মুহূর্তেই মনে পড়ে, একটু পরেই মা ভিডিও কল করবে। হাতে কাঁচের গ্লাসে লেবুর জল না দেখলেই প্রশ্ন করবে। মিথ্যে কথা তুয়া বলতে পারেনা। তাই মা জেনেই যাবে। তারপর মা বকা দেবে। শুরু হবে এক প্রস্থ "আমি দূরে আছি বলে যা ইচ্ছে করে নে। শরীরের যত্ন নিতে হবে না আর। অসুখ করলে কে দেখবে?" ইত্যাদি ইত্যাদি। সক্কাল সক্কাল এসব আর ভালোই লাগেনা। তার চেয়ে চুপচাপ খেয়ে নাও। তিতো বড়ির মতো। শান্তির বড়ি।

Wednesday, June 5, 2019

তুয়ার হিজিবিজি ১

সারাদিন কোন কাজ ছিল না। জাস্ট কোন কাজ না। অথচ অফিসটার নিয়ম এমন দেখো, ইন্টার্নদের সেই সকাল ৯টায় ঢুকতে হবে। বেরোতে বেরোতে সাতটা। আরে বাবা, কাজ করতে মোটেই খারাপ লাগেনা তুয়ার। কিন্তু এই বিনা কারণে বসে থাকা। বড্ড বিরক্তিকর। বাকি ক্লাসমেটগুলো সব কী সুন্দর কলকাতায় বাড়ি। তাই পরীক্ষার পরে ইন্টার্নশিপও করছে, এদিকে বাড়ির আরামে আছে। তুয়ার বাড়ি আসানসোল। পরীক্ষা শেষ হলেও এই আড়াই মাস মেসেই পড়ে থাকতে হচ্ছে। আজ আবার ছুটির দিন অফিশিয়ালি, কিন্তু শ্রীলেখা ম্যাম নিজে আসবেন কাজে, তাই ওকেও আসতে হলো। ম্যাম অন্যান্যদিন তাড়াতাড়ি বাড়ি চলে যান, ছোট বাচ্চা আছে বাড়িতে, তাই। ছুটির দিনগুলোতেই যত কাজ মনে পড়ে। আর যেহেতু তুয়া ওঁর সুপারভিশনে কাজ করে, তাই ওকেও থাকতেই হয়। আজ কী অসম্ভব ভালো ওয়েদার, সারাদিন জানলার বাইরে হাঁ করে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখেছে আর আফসোস করেছে তুয়া। এমন দিনে কোথায় পার্কে ঘুরে বেড়াবে, রাজপথ ধরে হাঁটবে, হুঠহাঠ ফুচকার লাইনে দাঁড়িয়ে পড়বে, গঙ্গার ঘাটে গিয়ে বসে থাকবে। তা না। নিকুচি করেছে এই ইন্টার্নশিপ। ছেড়ে দেবে। ভালো লাগেনা একা একা এখানে পড়ে থাকতে। ইচ্ছে করছে এক ছুট্টে গিয়ে মায়ের কোলে ঝাঁপিয়ে শুতে। আর বলতে, "আজ খিচুরি ডিম ভাজা?" মা মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলবে, "বেশ তো। বাবাকে বলে দিই। একটু পাঁপড় নিয়ে ঢুকুক।"

আবোল তাবোল ভাবতে ভাবতে তুয়া লোহার গেটটা ঠেলে ঢোকে ওর এই পায়রার খুপরিতে। সিঁড়ির আলোগুলো জ্বালতে জ্বালতে উঠে যায় দোতলায়, ওর কুঠুরিতে। আটটা বেজে গেছে। একতলা থেকে জেঠিমাদের রান্নাঘর থেকে ছ্যাঁকছোক শব্দ আসছে। গন্ধে মনে হচ্ছে বেগুনি, তেলেভাজা। নির্ঘাত খিচুরিও হয়েছে, বা হবে। ফোনটা হাতে নিয়ে তুয়া অ্যাপ খুলল। আশেপাশে যদি কোন রেস্টুরেন্ট খিচুরি বিক্রি করে, তাহলে অর্ডার দেবেই। উঁহু। খানিক দেখে টেখে কিছুই তেমন পাওয়া গেলো না। তাহলে কি নুডলস অর্ডার দেবে? ঝাল ঝাল... মন্দ লাগবে না ওয়েদারে। এমন সময় কড়কড় শব্দে বাজ পড়লো জোরে। কাছেই। বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। বৃষ্টিটা নামলো বলে। থাক, এই ওয়েদারে আর কাউকে রিস্ক নিয়ে এসে ওর খাবার ডেলিভারি করতে হবেনা আর। স্টকে ম্যাগি আছে। সেই বানিয়ে খাবে নাহয়। ইচ্ছেগুলোকে সব সময় কি আর সায় দেওয়া যায়? নিজের মনেই হাসে তুয়া। মা ঠিকই বলে। একলাযাপন ওকে বড় করে দিয়েছে অনেকটা।

Tuesday, June 4, 2019

শহরের পাঁচালি ১০

বারান্দার এই দোলনাটাতে বসে থাকতে থাকতে বেশ অনেকটা সময় কেটে যায় জাহ্নবীর। মধ্য বয়স। ছেলে মেয়েরা যখন যে যার মতো কেরিয়ার গড়তে সব্বাই দেশে বিদেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। এখন অখন্ড অবসর ওর। রায় বাহাদুর পরিবারের পুত্রবধূ, টাকার কোন অভাব নেই। আর তাই অভাব নেই কাজের লোকের, সেবা করার লোকের। তবে এমন পরিবারের সাথে মানানসই দাপট কোনদিনও ছিল না জাহ্নবীর। এই বয়সে এসে তো আরোই কথা ওঠে না। সারাদিন নিজের মতো করে সময় কাটে। গাছের খুব শখ জাহ্নবীর, বরাবর। নিজে হাতে বারান্দা আর ছাদে মরসুমি ফুলের বাগান করেছে। তাদের যত্নআত্তি করতে করতে আর তারপর ঠাকুরঘরে খানিকটা সময় গোপালের সেবা করতে করতে সারা সকাল চলে যায়। সব সময়ের কাজের লোক পলাশী হাতে হাতে সাহায্য করে দেয়। তারপর দুপুর থেকে এই বারান্দায়, গাছের মাঝে, ছোট্ট দোলনায়। কফি টেবিলে পাশে রাখা থাকে নানান ম্যাগাজিন, বই। যখন যেটা ইচ্ছে। আর থাকে পানের ডিবে।
আকাশ দেখতে খুউব ভালোবাসে জাহ্নবী। একেক মরসুমে, দিনের একেক সময়ে, আকাশের রঙের যে এই পরিবর্তন... মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে দেখে ও। যেমন এই আজকের আকাশ। বিকেল আর কটা হবে... ওই চারটে? কী মায়াবী হলুদ আলো। এমন সোনালী আকাশ সচারচর চোখে পড়ে না। মেঘ করে আছে বটে, তবুও এই যে অদ্ভুত সুন্দর রঙ। একেই বুঝি বলে কনে দেখা আলো?
জাহ্নবীর মনে পড়ে যায়। প্রায় বছর পঁচিশ আগের কথা। এমনই এক মায়াবী বিকেলে এক জোড়া মুগ্ধ চোখ অপলক দৃষ্টিতে চেয়ে ছিল ওর দিকে। অনেক্ষণ। প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল একটা মধুর অনন্তের। আর সদ্য স্কুল পেরনো সেই রাই কিশোরী জাহ্নবীর সলজ্জ আরক্ত দুই গালের সাথে তাল মিলিয়ে পশ্চিমের আকাশে ঢলে পড়ছিল দীপ্যমান সূর্য।

Monday, June 3, 2019

শহরের পাঁচালি ৯

ভবানীপুরের সরু গলির অনেকটা ভিতরে টালির চালের ঘরে একটা পুরনো আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে শেষবারের মত নিজের সাজ দেখে নিলো নীলাম্বরী। বা বলা চলে, মেপে নিলো নিজেকে। ঠিক যেমনভাবে প্রতিদিন মাপে ওকে হাজার হাজার "মানুষ"। অবশ্য এতে নীলাম্বরীর আক্ষেপ নেই এতটুকুও। হাজার হোক, এইভাবেই তো সংসারটা চালাতে পারছে ও।
আর পাঁচটা এমন মেয়ের সাথে নীলাম্বরীর জীবনের গল্পেও তেমন পার্থক্য নেই। সেই গরীব বাবা, অসুস্থ মা, ফ্যাক্টরি লক-আউট হওয়া ভাই। ভগবান যখনই ওকে কিছু দিয়েছেন, বেশ ঢেলে দিয়েছেন। তাই অভাব অনটনের কোন কমতি নেই।
তবে কথায় আছে না? চিনির ব্যবস্থাও চিন্তামণিই করে দেন। তা আমাদের নীলাম্বরীর এই অভাবের থেকে ক্ষণিকের মুক্তির পথও ঈশ্বর ঠিক খুঁজে দিয়েছেন। ছোট থেকেই অসম্ভব রূপের ছটা ওর। আকর্ষক চেহারা, ঝকঝকে মুখশ্রী। সাথে ভাগ্যিস টেন পাশ করে পাড়ার লোকের পাল্লায় পড়ে বেসিক স্পোকেন ইংরেজিটা শিখে ফেলেছিলো। এখন তাই নীলাম্বরী "কমপ্লিট প্যাকেজ"। বলতে নেই, আর্থিক অভাব অনেকটাই এখন আয়ত্তে এসে গিয়েছে।
চাইনিজ কোম্পানির বড় স্মার্টফোনটা বেজে ওঠে নীলাম্বরীর। অপর প্রান্তে অ্যাপ ক্যাবের ড্রাইভার। তাকে লোকেশন বুঝিয়ে কালো চকচকে হ্যান্ডব্যাগটা নিয়ে বেরিয়ে পড়ে নীলাম্বরী। থুড়ি, বিখ্যাত এস্করট নীলা।
আজ রাতের ঠিকানা গ্র্যান্ড হোটেল। আজ আবারও কর্পোরেট ক্লায়েন্ট।
ঝলমলে নগরীর ঐতিহ্য প্রাসাদে কুহকিনীর আরো এক মোহিনী রাত্রিযাপন।

Saturday, June 1, 2019

শহরের পাঁচালি ৮

উপায়নের ফোনটা পেয়ে একটু অবাকই হয়েছিল ইজ্যা। যাদবপুর থেকে একসাথে ইকোনমিক্স নিয়ে গ্র্যাজুয়েশন আর তারপর মাস্টার্স করে একইসাথে দুজনে লন্ডন চলে যায় চাকরি নিয়ে। তারপর ক্রমে ভালো বন্ধু থেকে আরেকটু বেশি, এবং অবশেষে বর্তমানে প্রেমিক প্রেমিকা। তাও প্রায় বছর চারেক হয়ে গিয়েছে। গরমের ছুটি নিয়ে উপায়ন ইজ্যা দুজনেই এখন কলকাতায়। লন্ডনে একসাথে থাকাকালীন ঠিক করে নিয়েছিল, কলকাতায় এক মাস যত সম্ভব কম দেখা করবে একে অপরের সাথে। এই এক মাস শুধুই পরিবার পরিজন ও বন্ধুদের জন্যই থাক। দুজনেই এটাকে বেশ সুবিধের মনে করেছে। আসলে গত কিছু মাসে একে অপরের মধ্যে যেন বড্ড খিটমিট লেগেই থাকতো। হয়তো একটু বেশিই একসাথে থাকার ফলে। দুজনের কাছেই তাই এইটা যেন সেই "much needed break"।


এ হেন অবস্থায় উপায়নের ফোন সত্যিই বেশ আকস্মিক। উপায়ন ইজ্যার সাথে দেখা করতে চায়। কী বৃত্তান্ত, কেন, এইসব জিজ্ঞেস করায় উত্তর পায়নি ইজ্যা। উপায়নের গলার স্বরও কেমন জানি সিরিয়াস। কী জানি, কী হলো আবার। সারাদিন ভারী উৎকণ্ঠায় কাটে ইজ্যার। বিকেলে সময়মতো ক্যাব নিয়ে ইজ্যা পৌঁছে যায় বিশ্ব বাংলা গেটে। তখনও বোধহয় উপায়ন এসে পৌঁছয়নি। বরাবরের লেট লতিফ। ইজ্যা অবাক হয়ে দেখতে থাকে সামনের বিরাট স্থাপত্য। কী বিশাল, অথচ কী সুন্দর। অবাক হয়ে মন্ত্রমুগ্ধের মতোই দেখে ইজ্যা। ব্যাগ থেকে মোবাইলটা বের করে কয়েকটা ছবিও তুলে ফেলে। ফিরে গিয়ে বন্ধুদের দেখাবে। কে বলে কলকাতা এখনো সেই ঝিমিয়ে থাকা পুরোনো শহর? দিল্লি বম্বের সাথে দিব্যি টেক্কা দিয়ে যেতে পারে আধুনিকতায়।


"অনেকক্ষণ এসে গিয়েছিস?" উপায়নের গোয়ার স্বরে সম্বিৎ ফেরে ইজ্যার।


"হুম। মিনিট কুড়ি হবে।" ইজ্যা হেসে বলে।


"সরি, আসলে ক্যাবটা পেতে দেরি হলো।" দুইহাতে দুই কান ধরে হাসিমুখে বলে উপায়ন।


যাক, আশা করি তাহলে সিরিয়াস কিছু না। ইজ্যা মনে মনে ভাবে।


"চল, ওপরে যাই। দারুণ ভিউ ওখান থেকে। খাবারও মন্দ না ক্যাফেতে।" উপায়ন বলে।


"চল।" ইজ্যা উপায়নের পিছু পিছু হাঁটা লাগায়। উপায়ন টিকিটের ব্যবস্থা করেই রেখেছিল। ওরা লিফটে করে ওপরে উঠলো। জানলার ধারে টেবিল বুক করা ছিল। বাইরে তাকিয়ে ইজ্যার মন খুশিতে ভরে গেল।


কী দুর্দান্ত দৃশ্য। এই এত উঁচু থেকে আধুনিকা শহর। বিরাট বিরাট হাইরাইজ। চওড়া রাস্তা। সাইসাই করে ছুটে চলেছে গাড়ি। ভলভো বাস। যে কোনো বিদেশি শহরের সাথে পার্থক্য নেই।


ওয়েটার ওদের জন্য লাইম মিন্ট সোডা এনে দিলো। চুমুক দিতে দিতে উপায়ন বললো, "ইজ্যা, মনে আছে বি এ পড়ার সময় আমরা কতদিন বিকেলে হাঁটতে হাঁটতে চার নম্বর থেকে ঢাকুরিয়া চলে যেতাম।"


ইজ্যা হেসে বলে, "মনে থাকবে না? সেই ফুট ব্রিজের ওপর দাঁড়িয়ে থাকতাম কতক্ষণ... গাড়ির ঢল নামা দেখতাম।"


"তোর ফেভারিট ছিল। আমার মনে আছে। কী অদ্ভুত এক মুগ্ধতা লেগে থাকতো তোর চোখে মুখে। যেন শহরতলীর মেয়ে, প্রথম শহরে আসার মাদকতা উপভোগ করছিস। অথচ তুই এই খাস দক্ষিণ কলকাতায় মানুষ। আমি নাহয় উত্তরের এঁদো গলিতে বড় হয়েছি। অথচ তোর মধ্যে থাকতো কী অসম্ভব ভালো লাগা।"


"আসলে এমন আলোর ধারা, গাড়ির স্রোত। ডায়নামিক জীবন। ভীষণ ভালো লাগে।"


"ওই জন্যই তো আজ এখানে মিট করছি। আজ একটু স্পেশাল। তাই এই জায়গাটাই বাছলাম।"


ইজ্যা খানিক অবাক হয়ে একটা ভুরু তুলে প্রশ্ন করে, "স্পেশাল?"


উপায়ন ওর দিকে তাকিয়ে থাকে খানিক। কোন কথা বলে না। দুই চোখে একরাশ মুগ্ধতা। তারপর চেয়ার ছেড়ে উঠে এসে একদম হাঁটু গেড়ে বসে ইজ্যার সামনে। ইজ্যা একটু লজ্জা টজ্জা পেয়ে বলে, "এই, কী করছিস?"


উপায়ন ওঠে না। শার্টের পকেট থেকে একটা ছোট্ট লাল ভেলভেটের বাক্স বের করে সেটার ঢাকনা খুলে ইজ্যার সামনে ধরে বলে, "উইল ইউ ম্যারি মি?"


বিকেলের অস্তগামী সূর্যের রক্তিম ছটা যেন আরক্ত করে ইজ্যাকে। সলজ্জ, সপ্রতিভ ইজ্যা। আংটির হীরের মতোই জ্বলজ্বল করে ওর চোখ। খুশিতে। আহ্লাদে।


নীচের রাস্তা দিয়ে গারির ঢল বয়ে যায়। জীবন বয়ে চলে। চির শাশ্বত বেগে।