এই প্রথম আমার কোন এয়ার বিএনবিতে থাকার অভিজ্ঞতা হল। কনসেপ্টটা এরকম যে কারুর বাড়ি, কখনো গোটাটা বা কখনো কোন একটা ঘর (কখনো তো শুনেছি শুধু একটা কাউচও) ভাড়া দেওয়া হয়। আইডিয়ালি বিএনবি অর্থাৎ বেড অ্যান্ড ব্রেকফাস্ট। হোটেলে থাকার চেয়ে তুলনামুলকভাবে সস্তা হয়। আমরা ছিলাম আলেকজান্দ্রিয়ার বাড়ি। একটা ডাবল বেডরুম আমাদের বুক করা ছিল। এ ছাড়া লিভিং রুম, ওয়াশরুম এবং কিচেনে যাওয়ার অনুমতি ছিল। সুজাতা একদম ভোরবেলা পৌঁছে গিয়েছিল। ও আলেকজান্দ্রিয়ার থেকে চাবি নিয়ে রেখেছিল। হোটেলের তুলনায় এয়ারবিএনবির আরো একটা সুবিধে হল, চেক ইন চেক আউটের সময় নিয়ে বেশ ফ্লেক্সিবল। তাই ঘর খালি ছিল বলে ওকে দুপুরের আগেই ঢুকতে দিয়েছিল। আমরা যখন স্টেশন থেকে এলাম, দেখলাম বাড়ি ফাঁকা। প্রসঙ্গত আগামী তিনদিন আলেকজান্দ্রিয়া বাড়ি আসেনি। গোটা বাড়ির স্বাধীনতা ছিল আমাদের। লাগেজ রেখে ফ্রেশ হয়ে ঠিক হল কিছু খেতে হবে। দুপুরবেলা। আর সাথে কিছু বাজার করতে হবে ব্রেকফাস্টের জন্য। আমরা অ্যাপ দেখে বেরোলাম। হাঁটা পথের মধ্যেই ছিল একটি চাইনিজ রেস্টুরেন্ট। ব্রিঘাম রোড চাইনিজ। ম্যাপ দেখছি। অথচ কিছুতেই দোকান খুঁজে পাচ্ছিনা। চর্কির মতো চক্কর কাটছি। একবার ভাবলাম তাহলে হয়তো ডিপারট্মেন্টাল স্টোরের মধ্যে রয়েছে। সেখানে খুঁজতে ঢুকলাম। দোকান পেলাম না বটে। কিন্তু স্টপ অ্যান্ড শপে হদিস পেয়ে গেলাম আমাদের ব্রেকফাস্টের জিনিসপত্র। প্রচুর ফল সবজি দুধ ডিম ব্রেড কেক রান্না করা প্যাকেজড খাবারের বিরাট সম্ভার। এ ছাড়াও সাধারণ ডিপারটমেন্টাল স্টোরের মতই সব কিছু রয়েছে। গুগল ম্যাপ ভুল বলবে, কিছুতেই বিশ্বাস হচ্ছিলনা। আবার বেরোলাম। অনেক কষ্টে খুঁজে পেলাম। মেনু কার্ড দেখে তেমন কিছু না বুঝে অর্ডার তো করলাম একটা লার্জ চিকেন ফ্রায়েড রাইস। বিল দেওয়ার সময় প্রথম জানলাম অ্যামেরিকার টিপিং কালচার। অন্তত ১০ থেকে ১৫ শতাংশ টিপ দেওয়াটা অলিখিত নিয়ম। দোকানটি সেলফ সার্ভিস। খাবার এলো একটা কাগজের বাক্সে, প্লেট নিয়ে আমরা খাওয়া শুরু করলাম। আমাদের কেরলের সিগনেচার মোটা চালের মতো চাল, আবার অনেক সয়া সস ঢালায় বেশ খয়েরি। ভর্তি চিকেনের টুকরো। কিন্তু বিশেষ স্বাদ নেই। কোনমতে আদ্ধেক খেয়ে বাকিটা প্যাঁক করে নিলাম। ডিনারে কিছু একটা ব্যবস্থা করা যাবে ভেবে।
এরপর আবার স্টপ অ্যান্ড শপ থেকে ডিম দুধ ফল আর আমার জন্য লেমোনেড নিলাম। সাথে লেমন টারট। খুব পছন্দের খাবার আমার। ডিম নিলাম কিন্তু টেট্রাপ্যাকে। কত কিছুই দেখবো! বেশ ডিম ভাঙ্গার চিন্তা নেই। ফ্যাটানোও সোজা। বাড়ি ফিরে সব ফ্রিজে চালান করে সটান বিছানায়। পর্দা টানা। ঘরে তাই আলো নেই। সেন্ট্রাল কুলিং। অ্যাডজাস্ট করার জন্য আবার আলেকজান্দ্রিয়াকে ফোন করতে হবে। ধুর, কম্বল লেপ আছে। গায়ে দিয়ে শুয়ে পড়ো। কিন্তু ঘুমবো বললে কি ঘুম হয়? এত বছর পরে দেখা। গল্পের স্টক যে উপচে পড়ছে। তার মধ্যেও প্রচণ্ড ক্লান্তির জেরে ঘন্টাখানেক ঘুমলাম। পাঁচটার পর উঠে ঠিক হল পরেরদিন যেখানে কনফারেন্স, সেইখানে একবার ঘুরে আসলে হয়। এমনিও পরেরদিনেই আমার পোস্টার প্রেজেন্টেশন, আজ টাঙ্গিয়ে আসতে পারব।
রেডি হয়ে বেরোলাম। সাড়ে পাঁচটা। ঝলমলে আলো। কে বলবে এই সময়। ঘড়ি না দেখলে খালি মনে হবে দুপুর দুটো হয়তো। আবার ম্যাপের শরণাপন্ন হলাম আমরা। দেখাচ্ছে হাঁটা পথে মিনিট কুড়ি পঁচিশ। পরে হাঁটতে গিয়ে বুঝেছিলাম যে ওইসব বুঝি মার্কিনী পায়ের মাপ অনুযায়ী। আমার এই এইটুকু (সত্যি বলছি। আমার জুতোর মাপ ২ থেকে ৩) পা ফেলে ফেলে পৌঁছলাম প্রায় চল্লিশ মিনিট পর। অবশ্য চারিদিকে রাস্তা দেখতে দেখতে। পথে পড়ল ম্যাসাচুসেটস ইন্সটিট্যুট অফ ডিজাইনের বিল্ডিং। বেশ মডার্ন আর্ট মার্কা দেখতে। নর্থ ইস্টার্ন ইউনিভারসিটি। ছড়িয়ে ছিটিয়ে। প্রচুর দোকান। বিশাল বিশাল বাড়ি। নীলচে রঙের না হলেও কাঁচের ওপর নীল আকাশের রিফ্লেকশন। আমাদের তুলনায় উল্টোদিক দিয়ে গাড়ি যায়।
প্রচুর গাড়ি। বাসও চলছে। বাসগুলোর নির্দিষ্ট স্টপেজ রয়েছে অবশ্যই। সুন্দর ছাউনি দিয়ে বানানো স্টপ। আবার রাস্তার মাঝখান দিয়ে টি-লাইন চলে গিয়েছে। মাঝে মাঝে ঘটাং ঘটাং করতে করতে ট্রেন যাচ্ছিল। ওই চারতে কম্পারটমেন্টের। আমরা যে রাস্তা ধরে যাচ্ছিলাম, হান্টিংটন অ্যাভেন্যু, সেটার ওপর দিয়ে টি-এর গ্রিন লাইন যায়। এছাড়াও ছিল অরেঞ্জ, রেড, ইত্যাদি। বাসে উঠে একজ্যাক্ট চেঞ্জ দিতে হয়। আর একবারের টিকিট কাটলে অনেক খরচ সাপেক্ষ হয়ে যায়। আমরা ভেবেছিলাম তাই যে চার্লি পাস কিনব। চার্লি পাস মানে ওই আমাদের মান্থলির ভাই। তবে মিনিমাম সাতদিনের জন্য কিনতে হত। দুজনের জন্য খরচ ৪২ ডলার। হিসেব করে দেখলাম, তিনদিনে মোটেই খরচ করতে পারব না। উসুল হবেনা। বরং অনেক খরচ। তার চেয়ে ভালো ওয়েদার, হাঁটা যাবে সহজেই। খুব অসুবিধে হলে উবার বা লিফট শেয়ার। অ্যামেরিকার রাস্তায় ট্রাফিক রুল খুব ভালো ভাবে ফলো হতে দেখেছি (অবশ্য ন্যু
ইয়র্কে পরে একটু অন্যথা দেখেছি বই কি!)। এবং পথচারীদের অগ্রাধিকার দেওয়া
হয়। মানে ধরুন সিগনাল সবুজ, তাও আপনি রাস্তা ক্রস করতে নেমে গিয়েছেন, গাড়ি
কিন্তু থেমে আপনাকে জায়গা করে দেবে। একটুও না রেগে। আরো একটা ব্যাপার
দেখলাম। কিছু কিছু রাস্তায় সুইচ টিপে দিলে সাময়িকের জন্য লাল সিগনাল হয়ে
যায় যাতে পথচারী রাস্তা পেরোতে পারেন। বেশ অবাক করা ব্যাপার কিন্তু!
হাঁটতে হাঁটতে এদিক সেদিক খচাখচ ক্যামেরাতে ছবি তুলতে তুলতে অবশেষে পৌঁছলাম ম্যারিয়টে। আমাদের কনফারেন্সের ভেন্যু। বাবা রে, কী বিশাল। ভাগ্যিস আমাদের প্রোটিন সোসাইটির বোর্ড টাঙ্গানো ছিল জায়গায় জায়গায়। দেখে টেখে রেজিস্ট্রেশন ডেস্কে পৌঁছলাম। নাম রেজিস্টার করে এরপর গেলাম পোস্টার একজিবিশন হলে। সুজাতাই লাগিয়ে দিল আমার পোস্টারটি। একটু ছবি টবি তোলা হল। ব্যস। আজকের মতো কাজ শেষ। আবার টুকটুক করে হেঁটে হেঁটে ফিরলাম ট্রিমন্ট স্ট্রিটে আমাদের বাসস্থানে। এবারে দেখলাম কখন কে জানে আমরা একটা লেফট টার্ন মিস করেছি, কিন্তু তাতে দিব্যি সোজা রাস্তায় পৌঁছে গিয়েছি। অর্থাৎ, গুগল ম্যাপ সব সময় ঠিক বলেনা!
রাত্রে ফিরে ভীষণ টায়ার্ড দুজনেই। যে যার বাড়িতে ফোন করে, মোবাইল চার্জে বসিয়ে দিলাম। ডিনারে ওই দুপুরের লেফট ওভার ফ্রায়েড রাইস আর ডিম ভাজা খেয়ে পরেরদিন সকালের অ্যালার্ম সেট করে শুয়ে পড়লাম লেপের তলায়, অসম্ভব নরম বিছানায়। বস্টনে প্রথম দিন শেষ।
Wednesday, August 8, 2018
Tuesday, August 7, 2018
আম্রিকা দর্শন পর্ব ৬
আগেই বলেছিলাম যে স্যান ফ্র্যান্সিস্কো না যেতে পারায় আমার অনেক টাকা নষ্ট হয়েছিল। যার ফলে ইন্সটিটিউটের থেকে প্রাপ্য টাকা কমে গিয়েছিল। প্রতিনিয়ত আমায় তাই কস্ট কাটিং করতে হয়েছে। এরই এক নমুনা। আমি নেওয়ার্ক থেকে বস্টন ট্রেনে যাওয়া স্থির করেছিলাম। মধুরিমাদের বাড়ি থেকে ন্যু জার্সি পেন স্টেশনটি ওই মিনিট কুড়ি পঁচিশের মতো দূরে অবস্থিত। ওরা গাড়িতে আমায় স্টেশন পৌঁছে দিল। গোটা অ্যামেরিকা ট্রিপে একটা ব্যাপার লক্ষ্য করলাম। ওখানে সকলে জি পি এস কে ভীষণভাবে ভরসা করে। মানে ধরুন আপনার বাড়ি পূর্ণ সিনেমার সামনে। আপনি যাবেন রাসবিহারী মোড়। সোজা রাস্তা। বছরের পর বছর গাড়ি চালাচ্ছেন। তবুও আপনি রোজ গাড়িতে উঠে জি পি এস অন্ করে ডেসটিনেশন দেবেন এবং যন্ত্রের নির্দেশেই গাড়ি চালাবেন। ঠিক এইরকম ওখানে। আর যন্ত্র তো যন্ত্র রে বাবা। ভুলভ্রান্তিও হয়। হলও তাই। একই রাস্তা দিয়ে কম করে পাঁচবার চক্কর কাটলাম আমরা। পারকিং লটে পৌঁছনর জন্য। এবং শেষমেশ ঠিকঠাক পেলামও না। অরিন গাড়িতে রইল। মধুরিমা আমাকে স্টেশনে নিয়ে গেল। এবং ভালো করে দেখিয়ে দিল যে কোনরকম কিছু সমস্যায় পড়লে হেল্পডেস্ক ঠিক কোথায়। বোর্ডে আমরা দেখে নিলাম আমার ট্রেনের নম্বর মিলিয়ে, কোন প্ল্যাটফর্মে আসবে। আমার ট্রেনটি ছিল নর্থ ইস্ট রিজিওনাল ১৬০। ও প্ল্যাটফর্মে আমায় দাঁড় করিয়ে চলে গেল, নইলে গাড়ির সমস্যা হত।
স্টেশনটা বিশেষ ভিড় নেই। ট্রিপঅ্যাডভাইসর বেশ ভয় টয় পাইয়ে দিয়েছিল। নাকি এত ভিড় হয় যে ট্রেনে ওঠা কঠিন হয়ে পড়ে, সিট পাওয়া যায় না ইত্যাদি। আমি সেই ফাঁকা প্ল্যাটফরম দেখে তাই একবার ভাবলাম, ঠিক জায়গায় আছি তো? দুবার তিনবার টিকিটের সাথে মিলিয়ে নিলাম বোর্ড। আটটা পনেরোয় ট্রেন ছিল। আটটার পর থেকে এক এক করে পাঁচ ছয়জন এলেন। নিশ্চিন্ত হলাম। পাশের লাইন দিয়ে অন্যান্য ট্রেন যাচ্ছে আসছে। আমার ট্রেনটি যথাসময়ে এলো। অ্যামট্র্যাকের ট্রেনে সিট নম্বর নির্দিষ্ট থাকেনা। শুধু রিজার্ভেশন দেয়। তাই যে কোন জায়গা থেকেই ওঠা যায়। উঠে পড়লাম সামনেই যে কামরা পেলাম, তাতে। ভিতরটা আমাদের দেশী দামী চেয়ার কারের মতো। অনেকটা চেন্নাই ব্যাঙ্গালোর শতাব্দীর একজিকিউটিভ ক্লাসের মতো। বড় কাঁচের জানলা। সবুজ গদি দেওয়া সিট। মাথার ওপর লাগেজ রাখার জায়গা। আমি উঠে তো জানলার ধার পেলাম না খুঁজে। অগত্যা ধারের সিটে বসলাম। এক ভদ্রলোকের সাহায্যে (দেখে ভারতীয় মনে হল। স্ত্রী ও মেয়ের সাথে ট্র্যাভেল করছিলেন) ওপরে স্যুটকেসটা রাখলাম। ইতিমধ্যে ট্রেন ছেড়ে দিয়েছে। পরের স্টেশন ন্যু ইয়র্ক। সেইখানে অবশ্য জানলার ধার পেয়ে গেলাম। গুছিয়ে বসলাম। পাশের সিট ফাঁকা। উল্টোদিকে এক ভদ্রলোক ভদ্রমহিলা। ওঁরা ন্যু ইয়র্ক থেকে উঠলেন। সৌজন্যমূলক হাসি বিনিময় হল। আমি দেখলাম আমার অ্যাড্যাপটার কাজ করছে এখানে। দিব্যি ফোন চার্জে বসিয়ে কানে হেডফোন লাগিয়ে নিলাম। ট্রেনের ওয়াই ফাই বেশ ভালো থাকলেও ইয়ুটিউব চলছিল না। তাই নিজের স্টকের গানই ভরসা। বাড়িতে মাঝে মাঝে মেসেজ বা ওয়াটসঅ্যাপ কল করে কথাবার্তা চলছে। সাথে সাথে মধুরিমা আর সুজাতাকেও লাইভ আপডেট দিচ্ছি।
ন্যু ইয়র্ক ছাড়াল যখন ট্রেন, তখন ন্যু ইয়র্কের বিখ্যাত স্কাইলাইন চোখে পড়ল। এই প্রথম পশ্চিমের বিরাট বিরাট বাড়ি দেখলাম। আগেই একবার বলেছিলাম, আমার সাইজ নিয়ে সমস্যা আছে। পাশে আমাদের দেশী বিল্ডিং থাকলে হয়তো বেশি ভালো বুঝতাম এইগুলির মাহাত্ম্য। নইলে দেখে মনে হল, হ্যাঁ বড় বেশ। তবে ওই আর কী। এই ট্রেনের যাত্রাপথও আমার ইয়ুটিউবে দেখে নেওয়া। তবুও চাক্ষুস দেখা আর স্ক্রিনে দেখার মধ্যে বিস্তর ফারাক। ট্রেন ছুটছিল ভালোই স্পিডে। একের পর এক ছোট ছোট গ্রাম ও টাউনের ওপর দিয়ে। সবুজালির অভাব নেই। মাঝে মাঝে আবার পুকুরের মতো জলাশয়। লেক। ব্রিজের ওপর দিয়ে ট্রেন ছুটছে। কোথায় যেন তখন ভারতীয় রেলের লঙ ডিস্টেন্স জার্নিগুলোর সাথে বড্ড মিল পাচ্ছিলাম। একটা স্টেশন পার হলাম। নিউ ইংল্যান্ড। পাশেই সুবৃহৎ অ্যাটল্যান্টিক ওশেন। অপূর্ব। ট্রেনের উল্টোদিকের জানলায় ছিলাম বলে ছবি তুলতে পারিনি ঠিকই, কিন্তু অমন পিকচারেস্ক স্টেশন আর দুটো দেখিনি। পরপর প্রচুর স্টিমার যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে ইয়াচ। আর রয়েছে লাক্সারি ক্রুস। যে যার সামর্থ্য ও প্রয়োজন মতো ব্যবহার করবেন এই জলপথ। আর সমুদ্রের ধার দিয়ে যে রাস্তা, ভর্তি শুধুই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের লাল নীল সাদা স্ট্রাইপস ও স্টারসের পতাকা। সেটা সদ্য ৪ঠা জুলাই, অর্থাৎ ওদের স্বাধীনতা দিবসের জন্য না এমনিই থাকে সব সময়, জানা নেই। পড়ে পিসির কাছে শুনেছিলাম যে এমনিই ওখানে লোকজন একটু বেশি দেশভক্ত। তাই ফ্ল্যাগ হামেশাই ঝোলান বাড়িতে গাড়িতে অফিসে স্কুলে। ইতিমধ্যে বিভিন্ন স্টেশনে ট্রেনে লোকজন নিয়মিত উঠছেন নামছেন।
পরপর কী কী স্টেশন থাকবে, দেখে রেখেছিলাম। প্রভিডেন্স ও তারপরে রুট ১২৮। তারপরেই বস্টন ব্যাক বে স্টেশন। আমার গন্তব্য। টিকিট ইন্সপেক্টার মাঝে এসে টিকিট দেখে গিয়েছিলেন। প্রভিডেন্স আসার আগে এসে বলে গেলেন। সুজাতাকে জানিয়ে রাখলাম। ওর আসার কথা আময় রিসিভ করতে, স্টেশনে। যখন আমি রুট১২৮, ও ব্যাক বে পৌঁছে গিয়েছে। যাক, আমি নিশ্চিন্ত। অবশেষে দুপুর দেড়টার দিকে বস্টন ব্যাক বে স্টেশনে ট্রেন ঢুকল। এর পরেরটা শেষ স্টেশন, তাই ট্রেন প্রায় ফাঁকা। প্ল্যাটফরমটি দেখলাম বেশ অন্ধকার। আন্ডারগ্রাউন্ড বলেই মনে হল কারণ বেশ অন্ধকার। হলুদ আলো জ্বলছে। প্রায় আমাদের মেট্রো স্টেশনগুলির মতো। ট্রেনটা বেরিয়ে যেতে নিয়মমাফিক ফোন ও মেসেজ করে কিছু যাত্রীদের পিছন পিছন এগোলাম। প্ল্যাটফর্মের দেওয়ালে বস্টনের ম্যাপ আঁকা। আরো রয়েছে মেট্রো আর বাসের রুটের নক্সা। বস্টনের এই মেট্রো সিস্টেমকে টি বলে। বেশ ভালো করে গোটা শহরটাকে জুড়ে রেখেছে।
প্ল্যাটফরম থেকে তারপর এস্কালেটর চেপে ওপরে উঠতেই দেখি সুজাতা দাঁড়িয়ে রয়েছে। চার বছর পর আরেক প্রিয় বান্ধবীর সাথে অবশেষে দেখা। দুজনেরই মুহূর্তের মধ্যে সমস্ত ক্লান্তি উধাও। গলা জড়াজড়ি করলাম। এইবারে যেন মনে হল, যাক। পৌঁছেছি ঠিক। ওর সাথে দেখা হয়ে গিয়েছে। আমার বাবা মা, মধুরিমা সকলেই এইবারে একদম নিশ্চিন্ত। আর কোথাও একা ট্র্যাভেল করার নেই, তাই নাকি চিন্তাও নেই তাদের কারুর। সব দায়িত্ব এবার সুজাতার।
স্টেশন থেকে বেরিয়ে আমরা অ্যাপ ক্যাব ডাকলাম। ওখানে চলে লিফট আর উবার। লিফট আমি ইনস্টল করেই রেখেছিলাম। শেয়ার ক্যাব এসে পৌঁছনর আগে সেলফি তোলা হল। রাস্তাঘাটের ছবিও। কী ঝকঝকে নীল আকাশ। রোদ ঝলমল। বেশ সুন্দর।
গাড়ি এলো। বিরাট এস ইউ ভি। অ্যামেরিকায় বোধহয় ছোট গাড়ি কেউই ব্যবহার করেননা! উঠে পড়লাম লাগেজ নিয়ে। ডেসটিনেশন, আমাদের এয়ারবিএনবি। ট্রিমন্ট স্ট্রিটে। মিনিট পনেরোর মধ্যেই চোখে পড়ল একটা বড় চার্চ। সুজাতা রাস্তা চিনতে পেরেছে ততক্ষণে। বলল যে আমরা কাছাকাছি এসে গিয়েছি কারণ ও চার্চের ঘণ্টার শব্দ শুনতে পাচ্ছিল সকাল থেকে। রবিবার। আর একটু এগোতেই আমাদের গন্তব্য এসে গেল। নামলাম। ঠিক যেমন পড়ে এসেছিলাম, বাড়িটার নিচে একটা সাবওয়ের দোকান। পুরনো দিনের বাড়ি। কাঠের ভারি দরজা ঠেলে ঢুকলাম। ভিতরটা খুব অল্প আলো। একদম 'যত কাণ্ড কাঠমান্ডুতে'র বাড়ি গলিগুলোর কথা মনে পড়ে যাচ্ছিল। একটা স্যাঁতস্যাঁতে গন্ধ। সিঁড়ি ভেঙ্গে উঠলাম দোতলায়।
জয়ী
"জানিস, মুক্তাদি আর নেই। আজ সকালেই খবরটা পেলাম।" পল্লবীর পাঠানো এই ওয়াটসঅ্যাপ মেসেজে ওদের স্কুল গ্রুপের সকলের মধ্যেই একটা বেশ সারা পড়ে গেল। ওরা অর্থাৎ বছর তিরিশের জনা পঁচিশ, একদা সুধাময়ী বালিকা বিদ্যালয়ের ছাত্রী। প্রত্যেকেই এখন সুপ্রতিষ্ঠিত। কেউ করছে বড় চাকরি, কেউ বা চালাচ্ছে নিজের বুটিক। কেউ বা স্কুল কলেজের টিচার তো কেউ সরকারি আমলা। গ্রুপের মধ্যে সর্বক্ষণই চলতে থাকে আলাপ আলোচনা। বিষয় বিবিধ। ঝাঁ চকচকে শপিং মলে মার্কেটিং, বিদেশ ভ্রমণ, ছেলে মেয়েদের নামী দামী স্কুল ও ট্যুশন টিচার, নতুন খোলা রেস্টুরেন্ট, শাশুড়ির চিকিৎসা, নন্দাইয়ের এক্সট্রা ম্যারিটাল, অফিস পলিটিক্স, ইত্যাদি ইত্যাদি। ওদের এই গ্রুপের মধ্যে এক্কেবারে বেমানান প্রেয়সী। প্রেয়সী মফস্বলের একটি আধা সরকারি স্কুলের অঙ্কের দিদিমণি। স্কুলের কাছেই ঘর ভাড়া নিয়ে থাকে একা। স্বামী সংসারের ঝুটঝামেলায় জড়ায়নি। সকাল থেকে স্কুলের বাচ্চাগুলোর পিছনে দৌড়য় চক পেন্সিল হাতে। কঠিন অঙ্ককে ভালবাসতে শেখানোই যেন ওর জীবনের মূল উদ্দেশ্য। একদিন এ বি টি এর মিটিঙে দেখা কাকলির সাথে। কাকলি ওরই ক্লাসমেট ছিল সুধাময়ীতে। বর্তমানে কলকাতার এক স্কুলের হেড মিস্ট্রেস। আর কী, ফোন নম্বর চেয়ে ওকে যোগ করে দিয়েছিল গ্রুপে।
প্রেয়সী গ্রুপে নামেই আছে। সব খবর পড়ে। কিন্তু কোনদিনও কোন কথার উত্তর দেয়না। শুরুর দিকে বাকিরা ওকে সাধলে ওই হ্যাঁ না দিয়ে কাটিয়ে দিত। কোনদিনও কোন গেটটুগেদারেও যায়নি বাকিদের সাথে। গ্রুপে আসা সেই মিটের ছবিতে মন্তব্যও করেনি। মুক্তাদি ওর খুব প্রিয় দিদিমণিদের একজন ছিলেন। ওঁর চলে যাওয়ার খবরটা পেয়ে নিজেকে আর সামলে রাখতে পারল না। পল্লবীকে জিজ্ঞেস করলো, "আচ্ছা সুমি, মানে দিদির মেয়েটার কী খবর? ওর এবার কী হবে? কে দেখছে ওকে?"
সুমির বয়স ওই কুড়ির কাছাকাছি। ওরা যখন ক্লাস সিক্স, সুমি জন্মায়। কিছু বছরের মধ্যেই ডাউন সিন্ড্রোম ধরা পড়ে ওর। দায়িত্ব নিতে না চেয়ে মুক্তাদির স্বামী ওর শ্বশুরবাড়ির লোকজন সমস্ত সম্পর্ক ত্যাগ করে। বাড়ির অমতে বিয়েটা ছিল বলে বাপের বাড়ির দিক থেকেও কোনরকম সম্পর্ক বা সাহায্য ছিলনা। স্কুলের চাকরি ও কিছু ট্যুশানি সম্বল করেই দিদির দিন কাটত। প্রেয়সীদের ব্যাচের অনেকেই দিদির কাছে ট্যুশন পড়তে যেত। আর তখনই সুমির সাথে ওদের আলাপ। ওইটুকু মেয়ে, কী প্রাণশক্তিতে ভর্তি। মুক্তাদি মাঝে মাঝেই পড়াতে পড়াতে আক্ষেপ করতেন। ওঁর অবর্তমানে সুমিকে কে দেখবে, কী হবে ওর। প্রেয়সীরা তখন ছোট। কীই বা বলবে। কলেজে পড়াকালীন বার দুই তিনেক ও মুক্তাদির সাথে দেখা করেছে। তারপর এই চাকরিটা পেয়ে চলে আসায় যাতায়াত বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। প্রথম কয়েক বছর ফোনে যোগাযোগ থাকলেও শেষে আর কোনরকম খবরই নেওয়া হয়নি।
বড্ড অপরাধ বোধ কাজ করছে ওর আজ। বারবার দিদির মুখটা আর সুমির ওই নির্মল হাসিখানি মনে পড়ছে। ক্লাস নিতে নিতে মাঝে মাঝেই চোখ চলে যাচ্ছিল ফোনে। পল্লবী কোন মেসেজ করলো? না। কেউই কিছুই লেখেনি। রাত্রের দিকে কাকলি আর অদিতির মেসেজ এলো। সাধারণ হু হ্যাঁ। আক্ষেপ। কিছু পুরনো স্মৃতি। ব্যস। শম্পা একবার জিজ্ঞেস করলো ওরা কেউ যাবে কি না দিদির বাড়ি। কারুরই আর সময় বের হল না ব্যস্ত জীবনে। ওয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ কদিন একটু শান্ত থেকে ফিরল আবার চেনা ছন্দে। সামনে পুজো। কোন দোকানে কত ছাড়, কোথায় কী ডিজাইন। প্লেনের টিকিট। হোটেল বুকিং। রাঁধুনির বোনাস। বৃষ্টি জল কাদা। ফ্রেন্ডশিপ ডেতে গ্রুপ ভর্তি শুধুই জিফ আর ফরওয়ার্ড। বন্ধুত্ব নিয়ে কয়েক কলি। পুরনো স্কুলের দিনগুলোর গল্প।
কাকলি আর পল্লবী কাছাকাছি থাকে। ওরা এক রবিবার সন্ধ্যেয় প্ল্যান করে দেখা করলো সাউথ সিটি মলে। উদ্দেশ্য সিনেমা দেখে ডিনার সারবে। ফুড কোর্টে বসে খাবারের অপেক্ষার মধ্যে চলছে পি এন পি সি। "প্রেয়সীটা সেই একই রয়ে গেল দেখ। উড়নচণ্ডীর মতো থাকে। কোন শ্রী নেই চেহারায়।"
"থাকবেই বা কী করে। দেখছিস না কেমন ধ্যারধেরে গোবিন্দপুরে পড়ে আছে।"
"সত্যি। কোন অ্যাম্বিশন নেই। কোথায় ম্যুচুয়াল নিয়ে শহরে ফিরবি, তা না।"
"হ্যাঁ। আমি তো সেদিন মিটিঙে বললাম। ইউনিয়নকে ধর, ঠিক পেয়ে যাবি। ও মা, আমার কথাতে পাত্তাই দিলো না কোন।"
"ও বরাবরই ওরকম। নিজেকে সব সময় আমাদের থেকে আলাদা প্রমাণ করার ইচ্ছে। দেখলি না। মানস যখন ওকে বিয়ের প্রস্তাব দিল, শুধুমাত্র চাকরির দোহাই দিয়ে নাকচ করে দিল। আরে বাবা মানসের মত অমন ব্রাইট ছেলে। লন্ডন যাচ্ছে হায়ার স্টাডিজে। তুই কোথায় সঙ্গে যাবি, তা না। নিজের এই আধা সরকারি চাকরি আঁকড়ে পড়ে থাকলি। কী মোক্ষ লাভ হল? এত বছরের সম্পর্কের কোন মূল্য নেই?"
"যা বলেছিস। এই দাঁড়া দেখি, এবার কে মেসেজ করলো। ও মা, পল্লবী দেখ দেখ। শিগগির দেখ। প্রেয়সী মেসেজ পাঠিয়েছে। দেখি কী ছবি। ডাউনলোড করি।"
কাকলির ফোনের নেট স্লো হলেও পল্লবীর ইতিমধ্যে অটো ডাউনলোড হয়ে গিয়েছে। বড় স্ক্রিন খুলে কাকলিকে দেখাল ও ছবি। হাসি হাসি মুখে দাঁড়িয়ে প্রেয়সী। পাশে বছর কুড়ি পঁচিশের একটি মেয়ে। নীচে লেখা "এই দেখ। আজ মুক্তাদির বাড়ি গিয়েছিলাম। সুমিকে ওর প্রতিবেশীরা কোনমতে দেখছিল এই কদিন, কিন্তু লঙ টার্মে দায়িত্ব নিতে অক্ষম। আমি তাই ওকে নিয়ে এলাম আমার কাছে। এবার থেকে ওর সব দায়িত্ব আমার। তোরা সকলে মিলে কখনো পারলে আসিস। ও জানিস তো আমাদের সকলকে মনে রেখেছে। আমার কাছে তোদের সবার খবর নিচ্ছিল। আজ আমার খুব মনটা হাল্কা লাগছে রে। তাই তোদের মেসেজটা পাঠালাম।"
প্রেয়সীকে যেন আজ ওদের সকলের চেয়ে বেশি সুন্দর লাগছে। মুখে একটা পরম পরিতৃপ্তির হাসি। আর সুমি? ওর খুশি যেন ধরেনা। গ্রুপের চরিত্র অনুযায়ীই গ্রুপ ভরে গেল পরপর সকলের মেসেজে, সব্বাই প্রেয়সীকে সাধুবাদ জানাচ্ছে এমন একটা দুর্দান্ত পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য। কাকলিই বা বাদ যায় কী করে। পটাপট টাইপ করলো, "তুইই সেরা প্রেয়সী।" ইতিমধ্যে পল্লবীরও মেসেজ ঢুকেছে। "তুই আমাদের গর্ব।"
ব্যস। কাজ শেষ। আবার চিকেনের পিসে মনোনিবেশ করাই যায়। আলোচ্য টপিকের অভাব তো নেই।
Monday, August 6, 2018
আম্রিকা দর্শন পর্ব ৫
গাড়িতে উঠেই প্রথম কাজ। বাড়িতে জানানো। মধুরিমা ওর ফোনটা দিলও।
ওয়াটসঅ্যাপ কল করতে গিয়ে দেখি মায়ের প্যানিক করে পাঠানো এত্ত এত্ত মেসেজ।
মাকে ফোন করতে সে প্রায় কেঁদেই ফেলল। এতক্ষণ কেন কোন খবর দিইনি, ইত্যাদি।
আমি যে আস্ত এক পিসেই রয়েছই এবং সেফ হ্যান্ডসে রয়েছই, সেইসব নিয়ে আশ্বস্ত
করতে এমারজেন্সি অবস্থা কাটল। এইবারে মধুরিমার আনা মাফিনে আপাতত না বলে
চারিদিকে চোখ বোলাতে লাগলাম। প্রথম পার্থক্যই যেটা চোখে পড়ল, গাড়ি চলছে
ভারতের তুলনায় রাস্তার উল্টোদিক দিয়ে, আর তাই ড্রাইভারের সিটটিও উল্টোদিকে।
এক্কেবারে ফাঁকা রাস্তা। একটা দুটো গাড়ি মাঝে মাঝে পাশ দিয়ে হুহু করে
বেরিয়ে যাচ্ছে। শুনলাম শনিবারের সকাল, তাই এই। উইকডেজে নাকি জ্যাম পর্যন্ত
হয়ে যায়। অবশ্য ন্যু ইয়র্ক ন্যু জার্সির জ্যামের গল্প আমি আগে থেকেই শুনে
এসেছি বেশ কয়েকজনের কাছ থেকেই।
ন্যু জার্সি স্টেটকে বলে গার্ডেন স্টেট। এবং সত্যি সত্যিই সেই নামকে সার্থক করে চারিদিকে সবুজালি। রাস্তার দুধারে বিশাল বিশাল সবুজ গাছের সারি। কোথাও কোথাও কিছু নেবারহুডের নাম দিয়ে ডিরেকশন দেওয়া। হিলসবরো, ব্লুমফিল্ড, ইত্যাদি। মধুরিমাদের বাড়ি অ্যানানডেলে, পাম্পকিন ফার্ম কোর্টে (না, কোন কুমড়োর ক্ষেত টেত চোখে পড়েনি)। এয়ারপোর্ট থেকে প্রায় পঁয়তাল্লিশ মিনিটের জার্নি। যথাসময়ে পৌঁছে গেলাম। ওদের বাড়িটা একটা হাউজিং কমপ্লেক্সের মত জায়গায়। তবে কোন বাউন্ডারি ওয়াল নেই। পরপর প্ল্যান মাফিক দোতলা বাড়ি। খয়েরি রঙের। রাস্তাঘাট উঁচু নিচু, ঢাল। আবারও সেই শুনশান। মেজানাইন ফ্লোরে ড্রইং রুম। দোতলায় বেডরুম। মধুরিমা আর অরিন আমার লাগেজ টেনে ওপরে নিয়ে গেল। হাত মুখ ধুয়ে গরম কফি আর মাফিন খেলাম। ততক্ষণে বেশ শীতে ধরে গিয়েছে। বলছে সামার, এদিকে বাইরে ১৬ ১৭ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড। আমি বাপু চেন্নাইবাসী, আমাদের বোধহয় উইন্টারেও তাপমাত্রা কুড়ির নিচে নামেনা। কাজেই ঠকঠক করে যে কাঁপব, এতে আর নতুন কী আছে। একটু শরীর গরম করে ঠিক করলাম স্নান করে নিতে হবে। এবং সেখানে গিয়েই প্রথম ধাক্কা।
এ যে ওয়াটারলেস সিস্টেম। নেই কোন জেট স্প্রে। নেই কোন মগ বালতি। কি সর্বনেশে ব্যাপার। বাথটাবে ছাড়া স্নান করা যাবেনা। প্রচুর চাপ টাপ খেয়ে গেলেও কোনমোটে ম্যানেজ করলাম। প্লেনে ভালোই ঘুমিয়ে নিয়েছিলাম বলে তখনো ঘুম তুম পায়নি। মধুরিমা বারবার জিজ্ঞেস করলও সেই কথা। স্নান সেরে আমরা বসলাম আড্ডা মারতে। যদিও নিয়মিত মেসেজ মেলে কথা হয়, তবুও ফেস টু ফেসের আলাদা মাধুর্য। টপিকেরও অভাব নেই। সময়ও অফুরন্ত। মাঝে অরিন লাইব্রেরি গেল, আমাদের জিজ্ঞেস করলো যাবো কি না। ততক্ষণে আড্ডা জমে গিয়েছে। ওইসব ছেড়ে আবার কে বেরোয়। ও ফিরতে আমরা লাঞ্চ সারলাম। চিকেন বিরিয়ানি, মিট বল, রায়তা ও ফ্রুট জ্যুস। একটা ব্যাকগ্রাউন্ড ইনফরমেশন নিয়ে গিয়েছিলাম যেটা, সেটা হল যে ওখানে কলের জলই পানীয় জল হিসেবে ব্যবহৃত হয়। তবে মধুরিমাদের বাড়ির কাছাকাছি কোন পাওয়ার প্লান্ট থাকায় ওরা ওখানে সবাই প্যাকেজড জল খায়। তাই অ্যামেরিকান কালচারের এই দিকটির সাথে তখনো পরিচয় হলনা।
খাওয়ার পর অল্প অল্প ঘুম আসছিল, কিন্তু আমি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলাম যে না, ঠিক রাত হলে তবেই শোবো। নইলে সেই জেটল্যাগ হ্যানল্যাগ ত্যানল্যাগ হবে। আর ওইসব হলেই শেষ সব। ঘোরাঘুরি মাটি। তাই দাঁতে দাঁত চিপে জেগে রইলাম। মধুরিমার সাথে বাড়ির বাইরে আশেপাশেটা ঘুরে দেখব বলে বায়না করলাম। ওর একটা জ্যাকেট গায়ে চাপিয়ে আমরা এরপর রাস্তায় বেরোলাম। ওর বাড়িটা এমন সুন্দর জায়গায়, পিছনেই উঁচু হয়ে উঠে গিয়েছে সবুজ ঘন জঙ্গল। উঁচু নিচু রাস্তা। মনে হচ্ছিল বুঝি কোন হিল স্টেশনে গিয়েছি। আমাদের কোদাইকানাল বা মুন্নার (প্লিজ ক্ষমা করবেন, পাঁচ বছর সাউথে থেকে এই দুটোই প্রথমে মাথায় এলো। দার্জিলিং না লিখে।) রোদ চরচরে। বেশ একটা শীতের দুপুর। মাঠে শতরিঞ্চি পেতে মিঠেকড়া রোদে পিঠ এলিয়ে কমলালেবু নিয়ে বসে পিকনিক করার মত আয়োজন। খানিক হাঁটাহাঁটি করলাম। বিটলসের মতো পোজ দিয়ে একটা জেব্রা ক্রসিঙে ছবিও তুললাম। ক্যামেরা নিয়ে বেরিয়েছি। খচাখচ আরো কিছু ছবি তুললাম। মধুরিমা তাড়া দিচ্ছিল ঘরে ঢোকার, কারণ ওর দুই পাশের দুই বাড়ির পোষা কুকুরগুলোর তখন হাঁটতে বেরোনোর সময়। আর মধুরিমা এমনই মেয়ে যে ক্লাস সিক্সে পাশের বাড়িতে কুকুর ডাকছিল বলে লাফ মেরে প্রায় ক্লাসরুম থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল টিফিন টাইমে। আমি বললাম আহা একটু থাকি, মার্কিনী কুকুরদের দেখি। আদর করি। ও মা। তা নাকি হবে না। লোকজনের ওখানে বড়ই প্রাইভেসি নিয়ে সমস্যা। ভারতবর্ষে যেমন রাস্তায় ঘাটে আমরা যার তার বাচ্চা, কুকুর ইত্যাদি ইত্যাদিকে আদর টাদর করে দিই, ওখানে এইসব করতে গেলেই পুলিশ টুলিশ ডেকে দেবে। বাপ রে। দরকার নেই। ওই দুর থেকেই দেখে কুকুর ও তার মালিকদের দিকে ছোট্ট হাসি ছুঁড়ে দিলাম। হাঁটাচলা করে ঘরে এসে দেখি তখনও চারটে বাজেনি। অবশ্য বাইরের রোদ দেখে বোঝার উপায় নেই। এই সময়ে নর্থ ইস্ট অ্যামেরিকাতে রাত্তির সাড়ে আটটার আগে প্রায় সূর্যাস্ত হয়ই না। অথচ সকাল সকাল দিব্যি টাইমে সূর্যোদয় হয়ে যায়। এই প্রসঙ্গে বস্টোনে পৌঁছে আরো বলবো।
চলল আমাদের গল্প। পি এন পি সি। এরপরে কবে কোথায় যাচ্ছি, কীভাবে কী করব তার প্ল্যানিং, পরের দিন কখন বেরবো সেইসবের ডিটেল্ড আলোচনা। মধুরিমা আর অরিন প্রচুর ঘুরে বেরায়। ওদের দেওয়ালে একটা ওয়ার্ল্ড ম্যাপ লাগানো। কোথায় কোথায় ঘুরেছে এর মধ্যে, পিন লাগানো তাতে। অবাক হয়ে দেখলাম। কত দেশ। কত শহর। ওদের তাই অনেক অভিজ্ঞতা। অতি বিচক্ষণ। ওদের সাথে বসে পুরো প্ল্যান ঝালিয়ে নিলাম। পরেরদিন আমার ট্রেন। একা প্রায় ছয় ঘণ্টার জার্নি। আবার ওদের এবং আমারও টেনশনের ব্যাপার। সেই জন্যই এই প্ল্যানিং খুব দরকার ছিল।
আমার ততক্ষণে ঘুমে চোখ বন্ধ হয়ে আসছে। মধুরিমা বারবার বলছিল, খেয়ে নে। ঘুমিয়ে পড়। কিন্তু আমি ওই অনড়। বাইরে আলো ঝলমল করছে। এতে কী খেয়ে শুয়ে পড়ব? তবে কুড়ি ঘণ্টা প্লেন জার্নি করে সারাদিন না ঘুমিয়ে অবস্থা প্রায় শোচনীয়। বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে ভেবে অল্প দই চিড়ে খেয়ে নিলাম (খিদে খুব একটা ছিল না)। আমার হজমের সমস্যা হয় ইদানীং, সেই শুনে মধুরিমা এইসবেরও ব্যবস্থা রেখেছিল! খাওয়া সেরে মাথায় এলো ফোন চার্জ করতে হবে। সাথে নিয়ে এসেছিলাম ট্র্যাভেল অ্যাড্যাপটার। ইউ এসে ১১০ ভোল্ট চলে, ভারতে ২২০। তাই ওখানে প্লাগ পয়েন্টে আমাদের চারজার লাগবেনা। অ্যাড্যাপটার সহ চার্জে বসাতে গিয়ে আরেক বিপত্তি। ওইটি এত ভারি, কিছুতেই দেওয়ালে লাগছেনা। খালি খুলে যায়। সাময়িক ব্যবস্থা হল অরিনের অফিসে, মাল্টি প্লাগ এক্সটেনশন বোর্ড দিয়ে। কিন্তু বাকি ট্রিপ? সুজাতাকে মেসেজ করলাম। ওর ওইদিন রাত্রের ফ্লাইট সিয়াটল থেকে। ওর কাছে যদি থাকে, যেন নিয়ে আসে। ও বললও ওর কাছে তো নেই, কিন্তু কিনে নেবে কারণ ওরও দেশে এসে লাগবে। বেশ। সমস্যার আশা করি সমাধান যতক্ষণে হল আর মধুরিমাও ডিনার সেরে ঘরে এলো, বাইরে অন্ধকার। নটা বেজে গিয়েছে। আর আমার ঘুমোতে যাওয়া নিয়ে অসুবিধে নেই। পরেরদিন সাড়ে পাঁচটার অ্যালার্ম লাগিয়ে শুলাম। দুই বন্ধু মিলে গল্প করতে করতে যে কখন ঘুমিয়ে পড়েছি, কে জানে।
ন্যু জার্সি স্টেটকে বলে গার্ডেন স্টেট। এবং সত্যি সত্যিই সেই নামকে সার্থক করে চারিদিকে সবুজালি। রাস্তার দুধারে বিশাল বিশাল সবুজ গাছের সারি। কোথাও কোথাও কিছু নেবারহুডের নাম দিয়ে ডিরেকশন দেওয়া। হিলসবরো, ব্লুমফিল্ড, ইত্যাদি। মধুরিমাদের বাড়ি অ্যানানডেলে, পাম্পকিন ফার্ম কোর্টে (না, কোন কুমড়োর ক্ষেত টেত চোখে পড়েনি)। এয়ারপোর্ট থেকে প্রায় পঁয়তাল্লিশ মিনিটের জার্নি। যথাসময়ে পৌঁছে গেলাম। ওদের বাড়িটা একটা হাউজিং কমপ্লেক্সের মত জায়গায়। তবে কোন বাউন্ডারি ওয়াল নেই। পরপর প্ল্যান মাফিক দোতলা বাড়ি। খয়েরি রঙের। রাস্তাঘাট উঁচু নিচু, ঢাল। আবারও সেই শুনশান। মেজানাইন ফ্লোরে ড্রইং রুম। দোতলায় বেডরুম। মধুরিমা আর অরিন আমার লাগেজ টেনে ওপরে নিয়ে গেল। হাত মুখ ধুয়ে গরম কফি আর মাফিন খেলাম। ততক্ষণে বেশ শীতে ধরে গিয়েছে। বলছে সামার, এদিকে বাইরে ১৬ ১৭ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড। আমি বাপু চেন্নাইবাসী, আমাদের বোধহয় উইন্টারেও তাপমাত্রা কুড়ির নিচে নামেনা। কাজেই ঠকঠক করে যে কাঁপব, এতে আর নতুন কী আছে। একটু শরীর গরম করে ঠিক করলাম স্নান করে নিতে হবে। এবং সেখানে গিয়েই প্রথম ধাক্কা।
এ যে ওয়াটারলেস সিস্টেম। নেই কোন জেট স্প্রে। নেই কোন মগ বালতি। কি সর্বনেশে ব্যাপার। বাথটাবে ছাড়া স্নান করা যাবেনা। প্রচুর চাপ টাপ খেয়ে গেলেও কোনমোটে ম্যানেজ করলাম। প্লেনে ভালোই ঘুমিয়ে নিয়েছিলাম বলে তখনো ঘুম তুম পায়নি। মধুরিমা বারবার জিজ্ঞেস করলও সেই কথা। স্নান সেরে আমরা বসলাম আড্ডা মারতে। যদিও নিয়মিত মেসেজ মেলে কথা হয়, তবুও ফেস টু ফেসের আলাদা মাধুর্য। টপিকেরও অভাব নেই। সময়ও অফুরন্ত। মাঝে অরিন লাইব্রেরি গেল, আমাদের জিজ্ঞেস করলো যাবো কি না। ততক্ষণে আড্ডা জমে গিয়েছে। ওইসব ছেড়ে আবার কে বেরোয়। ও ফিরতে আমরা লাঞ্চ সারলাম। চিকেন বিরিয়ানি, মিট বল, রায়তা ও ফ্রুট জ্যুস। একটা ব্যাকগ্রাউন্ড ইনফরমেশন নিয়ে গিয়েছিলাম যেটা, সেটা হল যে ওখানে কলের জলই পানীয় জল হিসেবে ব্যবহৃত হয়। তবে মধুরিমাদের বাড়ির কাছাকাছি কোন পাওয়ার প্লান্ট থাকায় ওরা ওখানে সবাই প্যাকেজড জল খায়। তাই অ্যামেরিকান কালচারের এই দিকটির সাথে তখনো পরিচয় হলনা।
খাওয়ার পর অল্প অল্প ঘুম আসছিল, কিন্তু আমি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলাম যে না, ঠিক রাত হলে তবেই শোবো। নইলে সেই জেটল্যাগ হ্যানল্যাগ ত্যানল্যাগ হবে। আর ওইসব হলেই শেষ সব। ঘোরাঘুরি মাটি। তাই দাঁতে দাঁত চিপে জেগে রইলাম। মধুরিমার সাথে বাড়ির বাইরে আশেপাশেটা ঘুরে দেখব বলে বায়না করলাম। ওর একটা জ্যাকেট গায়ে চাপিয়ে আমরা এরপর রাস্তায় বেরোলাম। ওর বাড়িটা এমন সুন্দর জায়গায়, পিছনেই উঁচু হয়ে উঠে গিয়েছে সবুজ ঘন জঙ্গল। উঁচু নিচু রাস্তা। মনে হচ্ছিল বুঝি কোন হিল স্টেশনে গিয়েছি। আমাদের কোদাইকানাল বা মুন্নার (প্লিজ ক্ষমা করবেন, পাঁচ বছর সাউথে থেকে এই দুটোই প্রথমে মাথায় এলো। দার্জিলিং না লিখে।) রোদ চরচরে। বেশ একটা শীতের দুপুর। মাঠে শতরিঞ্চি পেতে মিঠেকড়া রোদে পিঠ এলিয়ে কমলালেবু নিয়ে বসে পিকনিক করার মত আয়োজন। খানিক হাঁটাহাঁটি করলাম। বিটলসের মতো পোজ দিয়ে একটা জেব্রা ক্রসিঙে ছবিও তুললাম। ক্যামেরা নিয়ে বেরিয়েছি। খচাখচ আরো কিছু ছবি তুললাম। মধুরিমা তাড়া দিচ্ছিল ঘরে ঢোকার, কারণ ওর দুই পাশের দুই বাড়ির পোষা কুকুরগুলোর তখন হাঁটতে বেরোনোর সময়। আর মধুরিমা এমনই মেয়ে যে ক্লাস সিক্সে পাশের বাড়িতে কুকুর ডাকছিল বলে লাফ মেরে প্রায় ক্লাসরুম থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল টিফিন টাইমে। আমি বললাম আহা একটু থাকি, মার্কিনী কুকুরদের দেখি। আদর করি। ও মা। তা নাকি হবে না। লোকজনের ওখানে বড়ই প্রাইভেসি নিয়ে সমস্যা। ভারতবর্ষে যেমন রাস্তায় ঘাটে আমরা যার তার বাচ্চা, কুকুর ইত্যাদি ইত্যাদিকে আদর টাদর করে দিই, ওখানে এইসব করতে গেলেই পুলিশ টুলিশ ডেকে দেবে। বাপ রে। দরকার নেই। ওই দুর থেকেই দেখে কুকুর ও তার মালিকদের দিকে ছোট্ট হাসি ছুঁড়ে দিলাম। হাঁটাচলা করে ঘরে এসে দেখি তখনও চারটে বাজেনি। অবশ্য বাইরের রোদ দেখে বোঝার উপায় নেই। এই সময়ে নর্থ ইস্ট অ্যামেরিকাতে রাত্তির সাড়ে আটটার আগে প্রায় সূর্যাস্ত হয়ই না। অথচ সকাল সকাল দিব্যি টাইমে সূর্যোদয় হয়ে যায়। এই প্রসঙ্গে বস্টোনে পৌঁছে আরো বলবো।
চলল আমাদের গল্প। পি এন পি সি। এরপরে কবে কোথায় যাচ্ছি, কীভাবে কী করব তার প্ল্যানিং, পরের দিন কখন বেরবো সেইসবের ডিটেল্ড আলোচনা। মধুরিমা আর অরিন প্রচুর ঘুরে বেরায়। ওদের দেওয়ালে একটা ওয়ার্ল্ড ম্যাপ লাগানো। কোথায় কোথায় ঘুরেছে এর মধ্যে, পিন লাগানো তাতে। অবাক হয়ে দেখলাম। কত দেশ। কত শহর। ওদের তাই অনেক অভিজ্ঞতা। অতি বিচক্ষণ। ওদের সাথে বসে পুরো প্ল্যান ঝালিয়ে নিলাম। পরেরদিন আমার ট্রেন। একা প্রায় ছয় ঘণ্টার জার্নি। আবার ওদের এবং আমারও টেনশনের ব্যাপার। সেই জন্যই এই প্ল্যানিং খুব দরকার ছিল।
আমার ততক্ষণে ঘুমে চোখ বন্ধ হয়ে আসছে। মধুরিমা বারবার বলছিল, খেয়ে নে। ঘুমিয়ে পড়। কিন্তু আমি ওই অনড়। বাইরে আলো ঝলমল করছে। এতে কী খেয়ে শুয়ে পড়ব? তবে কুড়ি ঘণ্টা প্লেন জার্নি করে সারাদিন না ঘুমিয়ে অবস্থা প্রায় শোচনীয়। বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে ভেবে অল্প দই চিড়ে খেয়ে নিলাম (খিদে খুব একটা ছিল না)। আমার হজমের সমস্যা হয় ইদানীং, সেই শুনে মধুরিমা এইসবেরও ব্যবস্থা রেখেছিল! খাওয়া সেরে মাথায় এলো ফোন চার্জ করতে হবে। সাথে নিয়ে এসেছিলাম ট্র্যাভেল অ্যাড্যাপটার। ইউ এসে ১১০ ভোল্ট চলে, ভারতে ২২০। তাই ওখানে প্লাগ পয়েন্টে আমাদের চারজার লাগবেনা। অ্যাড্যাপটার সহ চার্জে বসাতে গিয়ে আরেক বিপত্তি। ওইটি এত ভারি, কিছুতেই দেওয়ালে লাগছেনা। খালি খুলে যায়। সাময়িক ব্যবস্থা হল অরিনের অফিসে, মাল্টি প্লাগ এক্সটেনশন বোর্ড দিয়ে। কিন্তু বাকি ট্রিপ? সুজাতাকে মেসেজ করলাম। ওর ওইদিন রাত্রের ফ্লাইট সিয়াটল থেকে। ওর কাছে যদি থাকে, যেন নিয়ে আসে। ও বললও ওর কাছে তো নেই, কিন্তু কিনে নেবে কারণ ওরও দেশে এসে লাগবে। বেশ। সমস্যার আশা করি সমাধান যতক্ষণে হল আর মধুরিমাও ডিনার সেরে ঘরে এলো, বাইরে অন্ধকার। নটা বেজে গিয়েছে। আর আমার ঘুমোতে যাওয়া নিয়ে অসুবিধে নেই। পরেরদিন সাড়ে পাঁচটার অ্যালার্ম লাগিয়ে শুলাম। দুই বন্ধু মিলে গল্প করতে করতে যে কখন ঘুমিয়ে পড়েছি, কে জানে।
Sunday, August 5, 2018
আম্রিকা দর্শন পর্ব ৪
প্লেনে উঠে আমার প্রথম কাজ বলতে যেটা ছিল, সেটা হল আগেই দেখা যে সামনের সিটের পিছনে অর্থাৎ আমার চোখের সামনে লাগানো টিভিটা কাজ করে কি না। দেখলাম টাচ কাজ করছেনা। সহযাত্রী যিনি ছিলেন, উনি সাহায্য করলেন রিমোট দিয়ে সেটার সুরাহা করতে। মোবাইলের চারজিং পয়েন্টও আমারটায় কাজ করছিল না। ওনারটাই ব্যবহার করার পারমিশন দিলেন এবং আমি খুশি খুশি গোটা ট্রিপে ওটাই ব্যবহার করলাম। মোটামুটি সবকিছু নিয়ে সেটল করে এরপর আশপাশটা তাকিয়ে দেখলাম। এই প্রসঙ্গে একটা কথা বলে রাখি, গোটা অ্যামেরিকা ভ্রমণেই যেটা পদে পদে বুঝেছি, আমার একটু ডাইমেনশন নিয়ে সমস্যা আছে। অর্থাৎ, ইন্টারন্যাশনাল প্লেন তো অবশ্যই ডোমেস্টিকের চেয়ে ঢের বড়। অথচ আমি বাইরে দাঁড়িয়ে সেটা বুঝিনি। হয়তো পাশাপাশি দুটোকে রাখলে বুঝতাম। তবে হ্যাঁ, প্লেনের ভিতরটা দেখে বুঝলাম, নাহ, এ সত্যিই বড়। ভিতরে ৩টে করে সীট, এমন তিনটে ব্লক। আমি ছিলাম মাঝখানে। আবার প্রতি পনেরোটা মতো সিটের পরে পরে আবার একটা করে প্যান্ট্রি গোছের জায়গা মাঝখানে আর দুইদিকে দুটো ওয়াশরুম। প্লেনের ভিতরটা গোটা যাত্রাপথেই অন্ধকার অন্ধকার ছিল। সবার জানলার ঝাপি নামানো। হাল্কা হলুদ নীল আলোয় বেশ একটা সুন্দর পরিস্থিতি। কম্বলটা প্যাকেট থেকে বের করে গায়ে জড়িয়ে ঘুমোতে যাব কি ভাবছি (প্লেনের ভিতরে বেশ ঠাণ্ডা ছিল) তখন খাবারের ট্রে নিয়ে এলো। ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা বড়া পাও (বম্বে থেকে খাবার উঠেছে, থাকবেই), ব্রেড আর কাটা ফল। সাথে চা কফি। সেসব ওই রাত তিনটেতে কে খায়। অল্প খুঁটে খুঁটে ফল খেয়ে ট্রে ফেরত দিয়ে কম্বল মুরি দিয়ে শুলাম। কানে হেডফোন (এয়ারলাইন্সেরটাই), কিছু পুরনো হিন্দি গান চালিয়ে, স্ক্রিন অফ করে। কব্জির ঘড়িতে তখনও ভারতীয় সময়ই চলছে। ঘুম আসেনা কিছুতেই। তন্দ্রা ভাব শুধু। তাও ওই মিনিট দশ পনেরোর ঘুম, তারপরে ঘুম ভেঙ্গে যাচ্ছে, এই করতে করতে ঠিক করলাম একবার গোটা প্লেনটা চক্কর কাটি। কাটলামও। দেখলাম অন্ধকারে অনেকেই ঘুমোচ্ছেন। আবার কেউ কেউ বিশেষত বয়স্করা রীতিমতো মর্নিং (নাকি ইভনিং) ওয়াক করছেন।
এই হাঁটাহাঁটির ফলে যেটা লাভের লাভ হল, আমি এসে টানা তিন ঘন্টা জমিয়ে ঘুম দিলাম। আমার সহযাত্রী যিনি ব্যাঙ্গালোর থেকে এসেছিলেন, বেশ ভালো মানুষ। একবারও আমার ঘুম ভাঙ্গিয়ে বের হননি। তাই একদম একটানা ঘুম ঘুমিয়ে যখন ব্রেকফাস্ট করব বলে উঠলাম, রীতিমতো ঝরঝরে লাগছিল। চোখে মুঝে জল দিয়ে সিটে ফিরলাম। ইতিমধ্যে ব্রেকফাস্ট এসে গিয়েছে। বেশ ভারী একটা অমলেট, ব্রেড, বাটার, চা কফি, ফ্রেঞ্চ ফ্রাই আর আবার কাটা ফল। এতক্ষণে খিদে খিদে পেয়েওছে। খেলাম ওপর ওপর।
তারপর, কী করা যায়, কী করা যায়? সিনেমা দেখব ঠিক করলাম। তেমনভাবে কিছুই পছন্দ হল না। অনেক ঘাঁটাঘাঁটি করে শেষমেশ ময়ূরাক্ষী দেখা শুরু করলাম। ঘন্টা দেড় দুই ওতেই কেটে গেল। এরপর? একটু আসতে আসতে কী করি আজ ভেবে না পাই ভাব আসছিল। তখন ঠিক করলাম যে না, বন্ধুটি যে হোমটাস্ক দিয়েছে (যাওয়ার দিন একটি গল্প পোস্ট করে গিয়েছিলাম মনে আছে? বাদল দিনের প্রথম কদম্ফুল... ওইটার একটা দ্বিতীয় পর্ব চাই। লেখার ইনপুট এয়ারপোর্টে বসেই পেয়েওছিলাম।) সেটি করা যেতে পারে। খুব বেশি আলো ছিল না। তাও তারই মধ্যে ব্যাগ থেকে রাইটিং প্যাড বের করে টুকুস টুকুস করে লিখতে লাগলাম। ইতিমধ্যে আবার ড্রিঙ্কস নিয়ে চলে এসেছে হোস্টেস। আমার ঠিক করাই ছিল, রেড ওয়াইন খাবো। নিলামও তাই। সাথে সল্টেড পিনাটস। বেশ একটা আয়েসের ব্যাপার। যাই হোক এইসব লেখালিখি ও পানীয় নিয়ে সময় কেটে গেল। ইতিমধ্যে বারোটা বাজতে যায়, দেখতে দেখতে এসে গেলো লাঞ্চ। সুন্দর হট মিল। জিরা রাইস, শ্রেডেড চিকেন, মিক্সড ভেজ, আবারও ব্রেড, চা কফি ইত্যাদি। মোটামুটি খেলাম। নড়াচড়া নেই। খিদেও তেমন নেই। খেতে খেতে আরেকটা সিনেমা দেখতে বসলাম। ততক্ষণে আবার এয়ারহোস্টেস এসে আমাদের সকলকে ধরালেন একটি করে কাস্টমস ফর্ম। এই ফরমটির বিষয়েও মধুরিমা সব শিখিয়ে দিয়েছিল। সিল্ড প্যাকেটে খাবার থাকলে ডিক্লেয়ার করার প্রয়োজন নেই, তেমনি দশ হাজার ডলারের নীচে ক্যাশ ক্যারি করলেও বলার দরকার নেই। বাকি সব দেখে শুনে ভরলাম। সহযাত্রীকে পেন ধার দিলাম। ঘড়ির কাটায় যখন বিকেল চারটে পেরিয়েছে, পাইলট বললেন যে এইবারে আমরা নামা শুরু করব। বাইরের তাপমাত্রা ও লোকাল সময় জানিয়ে দিলেন। ন্যু জার্সি ভারতীয় সময়ের থেকে সাড়ে নয় ঘন্টা পিছিয়ে। সেই মতো ঘড়ি অ্যাডজাস্ট করে ফেললাম। যখন প্লেন মাটি ছোঁব ছোঁব করছে, ফোনের ফ্লাইট মোড অফ করে দিয়েছি। পিকপিক করে এস এম এসের শব্দ পেলাম। যাক, বিরাট নিশ্চিন্তি। আমার ইন্টারন্যাশনাল রোমিং তাহলে কাজ করছে। জিও ফোনের রোমিং প্যাকটা সবচেয়ে কস্ট এফেক্টিভ লেগেছিল। যত জায়গায় ঘুরেছি, ভীষণ ভালো কাভারেজ পেয়েছি। এ টি & টি কোম্পানির টাওয়ার। ঝটপট ওয়াটসঅ্যাপে বাড়িতে জানালাম। মধুরিমাকেও।
প্লেন যথাসময়ে নামল। আমিও লটবহর নিয়ে নামলাম। একটা অদ্ভুত অনুভূতি হল। এই এতক্ষণে তাহলে মার্কিন মুলুকে এলাম। দেশের ভিতরে যাওয়ার পারমিশন পাওয়া এখনো বাকি। কিন্তু অন্তত পৌঁছে তো গিয়েছি। বাইরে সকালের হাল্কা রোদ। অল্প অল্প ঠান্ডা। গলায় স্কার্ফটা ভালো করে এঁটে নিলাম। ফ্লাইটের বাকি যাত্রীদের ফলো করে খানিকটা হেঁটে পৌঁছলাম একটা জায়গায়। মধুরিমার পরামর্শে যদিও ইয়ুটিউব থেকে এয়ারপোর্টটা আর ইমিগ্রেশনের বিষয়ে অনেক ভিডিও দেখে রেখেছিলাম আগেই, তবুও সবকিছুই নতুন নতুনই লাগছিল। একজন সিকিউরিটি স্টাফ, বেশ অমিশুকে দেখতে ভদ্রমহিলা আমাদের সকলকে দেখে "ইন্ডিয়ান পাসপোর্ট দিস সাইড, অ্যামেরিকান পাসপোর্ট দেয়ের" বলে লাইনে ঢুকিয়ে দিলেন। ভয়ে তখন বুক দুরুদুরু। ব্যাকপ্যাক থেকে যাবতীয় ডকুমেন্টসের ফাইলটা বের করলাম। ছবি তুলব কি, ফোন ব্যবহারও বারণ। তাই ইমিগ্রেশন হচ্ছে যে, সেটাও মা বাবাকে জানাতে পারিনি। পরে জেনেছিলাম আমার মা এর মধ্যে মেয়ের কী হল এই টেনশনে বেশ কয়েকবার মধুরিমাকে মেসেজ টেসেজ করে একাকার। লাইন ধীরে ধীরে এগোচ্ছে। বিরাট ঘর, পরপর অনেক কাউন্টার থাকলেও অনেকগুলিই বন্ধ। ওই গোটা দশেক কাউন্টারে স্টাফ আছে। আর তাই সময়ও লাগছে। এয়ারলাইন্সের ক্রুদের আলাদা কাউন্টার। ওরা যখন ইমিগ্রেশন পর্ব মিটিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছিল, খালি মনে হচ্ছিল ইশ, আমার আপন মানুষগুলো কোথায় চলে যাচ্ছে। এই বিদেশ বিভূঁইয়ে একদম একা।
আর ঠিক তখনই আমার পিছনেই এক প্রৌঢ় দম্পতিকে দেখলাম। বাবা মায়ের বয়সী হবেন। ভদ্রমহিলার হাতে শাঁখা পলা দেখে নিশ্চিত হলাম, যাক, ঘরের লোক। ওনারাও আমায় দেখে বোধ করি একটু আস্বস্ত হলেন। আমায় জিজ্ঞেস করলেন, "আচ্ছা, এখানে শুধু হিন্দি আর ইংরেজি চলবে কাউন্টারে, না?" আমি বললাম, "হিন্দিও চলবে না হয়তো।" ওনাদের মুখ সঙ্গে সঙ্গে শুকিয়ে গেল। ভদ্রলোক বললেন, "আচ্ছা, তুমি তাহলে একটু আমাদের সাথে সাথে থেকো। লাগেজ নেওয়া অবধি।" আমি বললাম, "বেশ। তবে লাগেজ নেওয়ার পরও আবার অফিসারের কাছে যেতে হবে।" অনুরোধ করলেন তখন অবধি থাকতে। কাউকে যতটুকু আমার ক্ষমতায় আছে, সাহায্য করা যায়, সচরাচর করি। এই ক্ষেত্রেও অন্যথা হয়নি। কাউন্টারের অফিসারের ওই অতি বিরক্ত, "কেন যে এরা আমাদের দেশে আসে" গোছের মুখ দেখে আবার প্যাল্পিটেশন বেড়ে গেল আমার। তার মধ্যেও যথাসাধ্য উত্তর দিলাম প্রশ্নের। সেই একই বুলি। কেন এসেছি, কোথায় যাব, কতদিন। কত টাকা সঙ্গে আছে। গুছিয়ে উত্তর দিলাম। বায়োমেট্রিক ভেরিফিকেশন হল। এক মাসের থাকার অনুমতির স্ট্যাম্প পড়ল পাসপোর্টে। কাউন্টার ছেড়ে এগিয়ে গেলাম। ওই দম্পতি এলেন। কিছু অসুবিধে হচ্ছিল ওঁদের। আমায় ডাকলেন হাত নেড়ে। আমার সামনে তখন এক অফিসার, পকেটে বন্দুক। ওরে বাবা, যদি গুলি টুলি করে দেয়, ভরসা নেই। ওঁকে জিজ্ঞেস করলাম, সাহায্য করতে যেতে পারি কি না। অনুমতি পেয়ে গেলাম। আবার ওই গোমড়া মুখো খিটখিটে লোকটার প্রশ্নের ট্রান্সলেশন আর এঁদের উত্তরের পালটা ট্রান্সলেশন পর্ব চলল। সেখানেও পারলে এঁদের ভয় টয় দেখিয়ে দেন আর কি। তারপর এইসব মিটিয়ে লাগেজ নেওয়ার জায়গায়। দু দুটো বেল্টে আমাদের লাগেজ আসবে। খেয়েছে রে। একেই এই ফ্লাইটটার প্রচুর বদনাম। অনেক সময়ই লাগেজ পরে আসে। ওই ওজন বেড়ে গেলে তেল কম নেওয়া হবে, তাই। আমার তখন ফিঙ্গার ক্রসড কেস। যদিও ব্যাকপ্যাকে এক দুদিনের জিনিস রাখা আছে প্রয়োজনীয়, তবুও। ওই হয়রানিতে কে যায়। একটা বেল্টে খানিক্ষণ দেখলাম। না। আমার বেগুনি স্ট্রলির কোন দেখা নেই। অনেক বেগুনি আসছে বটে, কিন্তু আমার কমলা রঙের ফিতে বাঁধাটি আর নেই। একটু বিমর্ষ হয়ে পাশেরটাতে গেলাম। সেখানেও নেই। যাহ্, দুর্ভোগের শেষ নেই ভাবছি। এমন সময়ে ওই ভদ্রমহিলা এসে বললেন, "তোমার ব্যাগ পেয়েছ?" বললাম, "না।"
"কেমন দেখতে??"
""বেগুনি। কমলা ফিতে।"
"অনেকে ব্যাগ নামিয়ে রাখছে পাশে। দেখো তোমারটা আছে কি না। আমাদের একটা ওইভাবেই পেয়েছি।"
এই তো। এটা তো খেয়াল করিনি। একটা জায়গায় দেখলাম বেল্টের পাশে অনেকে ব্যাগ নামিয়ে রেখেছে। আরে এঁদের বুদ্ধি কবে হবে কে জানে। নিজের ব্যাগ না, ভুল করে নামিয়েছেন যখন, আবার বেল্টে তুলে দিতে কী হয়? যতসব। যাই হোক, সেখানে একটু এগোতেই দেখি আমারজন চুপচাপ দাঁড়িয়ে। তাকে নিলাম। এঁদেরও ডেকে নিলাম। একসাথে এবার গন্তব্য কাস্টম অফিসারের কাছে। এই ভদ্রলোক বেশ হাসিখুশি। আমার এত কম লাগেজ দেখে নিতান্তই অবাক। ফর্মে কোন ডিক্লারেশন নেই। তাই ছাড়া পেয়ে গেলাম। ওঁদের কাউন্টারের ভদ্রলোক আমায় জিজ্ঞেস করলেন হিন্দি বলি কি না। বললাম যে হ্যাঁ, পারি। আমায় অনুরোধ করলেন দোভাষীর কাজ করতে ওঁদের জন্য। আমি দিব্যি বাংলায় বললাম। এই অফিসারটি নিপাট ভদ্র। আমায় খুব করে ধন্যবাদ জানালেন। ব্যস। এবার আমরা তিনজনে টুকটুক করে বেরোলাম। ওঁরা তখনও ভয়ে ভয়ে। "মনা, আর কিছু করতে হবে না?" "না না। ব্যস। এইবার আনন্দে ঘুরুন। মেয়ের সাথে দারুণ সময় কাটান।"
গেট দিয়ে বেরিয়েই ওঁরা ওঁদের মেয়ে জামাইকে দেখতে পেলেন। আমিও পেয়ে গেলাম মধুরিমা আর ওর বর অরিনকে। একটু সৌজন্য বিনিময়ের পর যে যার নিজের পথে।
মধুরিমাদের দেখলাম সেই পাঁচ বছর পর। এত আনন্দ হয়েছিল, বলে বোঝাতে পারব না। এতক্ষণে স্বস্তি, দুই পক্ষেরই। যাক, আই এম ইন সেফ হ্যান্ডস নাউ। এয়ারপোর্ট থেকে বেরিয়ে চললাম পারকিং লটে।
(বন্ধুর সাথে একটু গল্প করে নিই? আবার ফিরছি তারপরে)
Saturday, August 4, 2018
আম্রিকা দর্শন: পর্ব ৩
ক্যাবের থেকে লাগেজ নামিয়ে কোনক্রমে তো এয়ারপোর্টে ঢুকলাম। পাঁচ বছরের ডোমেস্টিকে ট্র্যাভেল করার ভিত্তিতে জানি মূলত তিনটি স্টেপ রয়েছে। ১। প্রথমেই চেক-ইন লাগেজ স্ক্যান করাও। ২। বোর্ডিং পাস নাও। ৩। নিজের সিকিউরিটি চেক করাও (সাথে কেবিন লাগেজ থাকলে, সেটিও)। ইন্টারন্যাশনালের ক্ষেত্রে জানি এক্সট্রা একটা পয়েন্টঃ ইমিগ্রেশন। আমার বান্ধবী মধুরিমা (যার কাছে কিনা যাচ্ছি ন্যু জার্সিতে), সে তো আমায় ছোট থেকেই চেনে। তাই আমার কাণ্ড কেরামতি যে কতদূর হতে পারে, সব জানে। ও আমায় কলকাতা মেট্রোতে চাপা শিখিয়েছিল। এই ক্ষেত্রেও পাখি পড়ার মত করে সব শিখিয়ে দিয়েছিল। কাউন্টারে গিয়ে ঠিক কী কী বলতে হবে, কোথায় কখন কী চাইতে পারে, ইত্যাদি ইত্যাদি। আমার যে বন্ধুরা ফেব্রুয়ারিতে স্যান ফ্র্যানসিস্কো গিয়েছিল, তাদের থেকে খুব বেশি উপদেশ পাইনি। তাও সব মিলিয়ে আমি তো ভিতরে ঢুকে পয়েন্ট ১ থেকে খোঁজা শুরু করছি। হন্যে হয়ে এদিক সেদিক করছি। কোথাও তো লাগেজ স্ক্যানের কিছুই দেখিনা। তারপর লজ্জা টজ্জা কাটিয়ে এক এয়ারপোর্ট কর্মচারীকে জিজ্ঞেস করলাম, "আন্না এয়ার ইন্ডিয়ার লাগেজ স্ক্যানিং কোথায় হবে?" উনি একটু অবাক হয়ে বললেন যে সেসব নেই। ডাইরেক্ট লাগেজ চেক-ইন করে দিতে হবে। ভাবলাম কে জানে, ইন্টারন্যাশনাল, ব্যাপার স্যাপার আলাদা। পরে জেনেছিলাম যে এই নিয়ম চেন্নাই এয়ারপোর্টে হালফিলেই হয়েছে কারণ ফেব্রুয়ারিতে ওদের কিন্তু স্ক্যান হয়েছিল।
খুঁজে টুজে কাউন্টারে গেলাম। কয়েকজনের পরেই লাইন। পাসপোর্ট ধরালাম। সাথে টিকিটের এক কপিও। এই প্রসঙ্গে বলে রাখি, কিছুদিন যাবত আমি আমার দুটো ফ্লাইটই (চেন্নাই থেকে বম্বে এবং বম্বে থেকে নেওয়ার্ক) ট্র্যাক করার ফলে দেখেছি যে প্রথমটি মাঝে মধ্যেই বেশ দেরি করছে। সম্ভবত বম্বের বৃষ্টির জন্য। আর তাই দ্বিতীয়টি ডিলেইড হচ্ছে। আমার ক্ষেত্রেও তাই হতে পারে, তেমন হলে দৌড়তে হতে পারে ভেবে ডোমেস্টিক ফ্লাইটে একদম প্রথম সারিতে (মানে ইকোনমির প্রথমে) সিট নিয়েছিলাম। আমি অল্প হলেও ক্লস্ট্রোফোবিক। উইন্ডো সিট নিইনি তাই। কাউন্টারের ভদ্রলোককে যখন টিকিটটা দিলাম, মিষ্টি করে হেসে বললাম, "ক্যান আই হ্যাভ অ্যান আইল সিট ফ্রম দ্য মিডল ব্লক প্লিজ ফর মাই ইন্টারন্যাশনাল ফ্লাইট?" উনি কিছু বললেন না। খানিক কম্প্যুটারে কী চালিয়ে টালিয়ে তারপর হাতে ধরালেন বোর্ডিং পাস। ওহ, আমি এর মধ্যে মধুরিমার শেখানো অনুযায়ী বলে দিয়েছি যে লাগেজ কিন্তু নেওয়ার্ক পৌঁছেই নেব। উনি আমায় লাগেজ ট্যাগটা দেখালেন। MAA EWR লেখা। আশ্বস্ত করলেন যে আমার কথা অনুযায়ী ঠিকঠাক জায়গাতেই যাবে। তারপর একবার পিঠের ব্যাগটার ওজন করলেন। ব্যস। ছাড়পত্র পেয়ে গেলাম। এবার গন্তব্য ইমিগ্রেশন। আবার একটু হাবাগোবার মত এদিক সেদিক দেখেশুনে পৌঁছলাম ঠিক জায়গায়। সেখানে এক প্রস্থ লাইন। দাঁড়ালাম। সময়মত কাউন্টারেও পৌঁছলাম। প্রথম প্রশ্ন, "ইঙ্গে পোনা?" ভাবলাম অ্যাঁ, পোনা মাছের কী বলছে? সিঙ্গি পোনা কীসব। ক্ষণিকের ভ্যাবাচ্যাকা কাটিয়ে ততক্ষণে যদিও বুঝে গিয়েছি তামিল ভাষায় জিগ্যেস করছেন কোথায় যাচ্ছি, কিন্তু ইতিমধ্যে আমার মুখে এক বিরাট প্রশ্নবোধক চিহ্ন (আজকাল আমি একদম মনের ভাব মুখে প্রকাশ না করে থাকতেই পারিনা, খুব মুস্কিলের ব্যাপার)। উনি আবার জিজ্ঞেস করলেন, এইবার ইংরেজিতে। কোথায় যাচ্ছি। বললাম। পাসপোর্ট দেখলেন। যেই ঠিকানায় কলকাতা লেখা দেখেছেন, অমনি "আ, বেঙ্গলিয়া? কতায় যাচ্ছে?" ওই যে বাঙ্গালি দেখলে ভাঙ্গা ভাঙ্গা বাংলা বলার এই আদেখলাপনা, সত্যি বলছি, বিরক্ত লেগে যায়। যাই হোক, ডিপারচারের আগে বাধ্যতামূলক ছবি তুললেন, তারপর স্ট্যাম্প মেরে দিলেন। অর্থাৎ, ব্যস। দেশ থেকে এই বের করে দিলেন আমায়।
ইমিগ্রেশন পর্ব মিটিয়ে তারপরে লাইন দিলাম সিকিউরিটি চেকিংএ। লম্বা লাইন খুব একটা না। মিনিট পনেরো পর সব মিটিয়ে টিটিয়ে একটু থিতু হয়ে বসলাম। বাড়িতে ফোন টোন সারলাম। ইতিমধ্যে দেখাচ্ছে ফ্লাইট আরও ডিলেইড। দশটার আগে ছাড়বেনা। আমি ওয়েটিং এরিয়াতে পৌঁছে একটা চারজিং পয়েন্টে ফোনটা লাগিয়ে (আমি আবার এই বিষয়ে অত্যাধিক বাতিকগ্রস্ত। ফোনে সবসময় চেষ্টা করি ১০০ শতাংশ চার্জ রাখতে। নইলে কেমন প্যাল্পিটেশন হয়। অথচ সাথে কিন্তু ফুললি চারজড পাওয়ার ব্যাঙ্ক রয়েছে, তাও) পরপর বন্ধুবান্ধবদের, কিছু নিকট আত্মীয়দের ফোন করলাম। এত কিছুর পরেও দেখি সবে আটটা পনেরো। অত্যন্ত বোর্ড হচ্ছিলাম। তবে ত্রাতা হয়ে তখন এক বন্ধু এলো ওয়াটসঅ্যাপে এবং তারপর ফোনে। তার সাথে প্রায় রাত্তির সাড়ে দশটা অবধি গল্প করলাম, নানান বিষয়ে। প্রচুর ইনপুট পেলাম লেখালিখি নিয়ে। এর মধ্যে জেনে গিয়েছি, ফ্লাইট এগারোটার আগে ছাড়বেনা। একটু চিন্তা হল। পৌছতে দুই ঘণ্টা। পরেরটা রাত দেড়টায় রাইট টাইম। ছোটাছুটি করতে হবে। খিদেও পেয়ে গিয়েছিল। সাথে আবার ঘুমও। আমি সাধারণত এগারোটার দিকে শুয়ে পড়ি। অথচ সেদিন একটা অদ্ভুত পরিস্থিতি। একদিকে হাই উঠছে সমানে, অন্যদিকে চরম উত্তেজনা। অবশেষে সাড়ে দশটার পর বোর্ডিং শুরু হল। সেখানেও সেই লাইন। আবার প্রতীক্ষা। যখন সবকিছু মিটিয়ে প্লেনটা চেন্নাইয়ের আকাশে উড়ল, রাত সোয়া এগারোটা বেজে গিয়েছে। আমার জেথুর মেসেজ ততক্ষণে ফোনে ঢুকেছে। "এয়ারহোস্টেসকে বলবি পরের ফ্লাইটের কথা।"
লাগেজ নিয়ে দৌড়তে হবে ভেবেই আমি ব্যাকপ্যাক আর পোস্টারটা পায়ের সামনে রেখেছিলাম। কিন্তু স্ট্যুয়ারড এসে বললেন যে নিয়ম নেই। আমাদের মাথার ওপরের র্যাক তখন ভরে গিয়েছে। আমি আবার হাইটের দিক থেকেও চ্যালেঞ্জড। উনি তাই আমার মালপত্র বিজনেস ক্লাসের কেবিনে তুলে দিলেন। যথাসময়ে ডিনার এলো। জিরা রাইস গোছের কিছু আর সাথে দুই রকম তরকারি থাকার কথা। আমার কপাল এমন, দুইদিকে দেখলাম একই তরকারি। যাক গে, পনির ছিল। তাই কিছু বলিনি। প্লাস তখন চোখে ঘুম। চকোলেটটা ব্যাগে পুরে কফি না খেয়ে কোনমতে একটু দুই চোখের পাতা এক করলাম। ঘন্টাখানেক পর চোখ মেলে দেখি প্রায় পৌনে একটা। এয়ার হোস্টেসকে ডেকে জানালাম পরের ফ্লাইটের কথা। তিনি ঘড়ি দেখে বললেন, "যদিও আমাদের শিডিউল অনুযায়ী সোয়া একটায় বম্বেতে ল্যান্ড করার কথা, কিন্তু আমি অ্যাশিউরেন্স সিচ্ছি। আমরা পারব না। চক্কর কাটতেই থাকে প্লেন। তাও আমি পাইলটকে বলছি এটার কথা। তবে আপনি চিন্তা করবেন না। কানেক্টিং ফ্লাইট, কিছু একটা ব্যবস্থা হবে।" ভাবুন তখন আমার অবস্থাটা। জানি কানেক্টিং ফ্লাইট ইত্যাদি, কিন্তু প্ল্যানের সব চৌপাট হয়ে যাবে যে। ল্যান্ডিঙের একটু আগে হোস্টেস ঘোষণা করলেন। নেওয়ার্ক যাওয়ার প্লেনটি আমাদের জন্য অপেক্ষামান। তাই আমাদের সবার আগে ডিপ্লেন করানো হবে। প্লেনটা মাটি ছুঁতেই কোনমতে এর তার সাহায্য নিয়ে কেবিন থেকে লাগেজ নামালাম (ঠ্যাকায় পড়লে মানুষ যে কত হাইট স্কেল করতে পারে, আমায় দেখেই বোঝা যায়!)। লাইন দিয়ে আমরা জনা বারো দাঁড়িয়ে। এদিকে এয়ার ইন্ডিয়ার বাসের কোন দেখা নেই। তখন প্রতি মুহূর্ত অমূল্য। পাঁচ সাত মিনিটের অপেক্ষার পর বাস এলো। বাইরে তখন গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি হচ্ছে। ভাবলাম যেহেতু ইমিগ্রেশন হয়ে গিয়েছে, বুঝি ডাইরেক্ট প্লেনে নিয়ে যাবে। ও মা। সে গুঁড়ে বালি। আমাদের নিয়ে গেল আবার টার্মিনালে। সেখানে জায়গায় জায়গায় এয়ার ইন্ডিয়ার স্টাফ রয়েছেন, আমাদের তাড়া দিচ্ছেন। রীতিমত দৌড়ে দৌড়ে পৌঁছলাম সিকিউরিটি চেকে। সেখানে এক প্রস্থ ঝঞ্ঝাট। জেটের কলোম্বোর ফ্লাইট রাত দুটোয়, ডিলেড। ওদের প্যাসেঞ্জারদের চেক আগে হবে না আমাদের। জেট প্রাইভেট কোম্পানি, স্টাফের গলার জোর বেশি। এয়ার ইন্ডিয়ার ভদ্রলোক শান্তশিষ্ট। শেষমেশ আমরা প্যাসেঞ্জাররা প্রায় গায়ের জোরে ঠ্যালাঠেলি করে নিজেদের চেকিং করালাম। তারপর আবার শুরু দৌড়। এ যেন বিরাট ম্যারাথন। উফ। বম্বের এয়ারপোর্ট এত সুন্দর, অথচ সেইসব দেখতেই পাচ্ছিনা। সময় নেই। মনে মনে প্ল্যান করছি, ফেরার পথে দেখব সব। যখন ভাবলাম এই বুঝি গেটে পৌঁছলাম, দেখি ধুর, আবার সিকিউরিটি। এখানে আবার আরো কড়াকড়ি। জুতো খুলিয়ে তাও স্ক্যান করতে হবে। নিজের চেক করে আবার ব্যাগ জুতো নিয়ে দৌড়তে শুরু করেছি (মনে মনে গুনে নিচ্ছি যে ও, ট্রে থেকে এই কটা জিনিস নামাতে হবে), আমার সাথে একজন ভদ্রমহিলা ছিলেন একই ফ্লাইটের, বললেন "আরে তুমি তো তোমার পোস্টার ফেলে যাচ্ছ"। আবার ফিরলাম। ভাবুন শুধু। যার জন্য এত কিছু, তাই ফেলে যাচ্ছিলাম (অবশ্য ব্যাক আপ প্ল্যান ছিলই)। সবকিছু নিয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে দৌড়তে দৌড়তে উঠলাম সেই ইন্টারন্যাশনাল ফ্লাইটে। বেচারা বাকি যাত্রীরা কখন থেকে বসে আছে। আদ্ধেক তো ঘুমিয়েই পড়েছে। খুঁজে খুঁজে গেলাম নিজের সিটে। তারপরে স্বস্তির নিঃশ্বাস। বাবাকে ফোন করে জানালাম। বেচারা ওঁরাও জেগে বসে আছেন আমার জন্য। ধীরেসুস্থে সেটল হয়ে মাথার ওপর কেবিনে ব্যাকপ্যাক ভরে আর পাশের ব্লকের কেবিনে ওই ভদ্রমহিলার সাহায্যে পোস্টারটি রাখলাম। মনে মনে নোট করে নিলাম, নামার সময় সব নিয়ে নামতে হবে। গলায় শুধু স্লিং ব্যাগটি। ওতে রয়েছে পাসপোর্ট আর পার্স। সিটবেল্ট বেঁধে শান্ত হয়ে বসলাম। বোর্ডিং কমপ্লিট হল। প্লেন ছাড়ল ঠিক রাত দুটো পনেরোয়। মধুরিমাকে মেসেজ করে দিলাম। ও যদিও ট্র্যাক করছিলই। ওকে যে এয়ারপোর্টে আসতে হবে আমায় রিসিভ করতে। সুজাতাকেও জানালাম। আসছি, ফাইনালি!
(ওরে বাবা, বড্ড হাঁপ ধরে গিয়েছে। কালকে বিরাম।)
Friday, August 3, 2018
আম্রিকা দর্শন : পর্ব ২
কম্প্যুটার খুলে প্রথম কাজ যেটি করলাম, তা হল কনসুলেটের ওয়েবসাইটে স্ট্যাটাস দেখা। প্রথম ধাক্কা খেলাম সেখানেই। যেই কেস নম্বর লেখা আমার ফর্মে, সেটি দেখাল নন একজিস্টিং। অ্যাপ্লিকেশন নম্বর দিয়ে এবারে দেখলাম। তারপরে যেই লাইনগুলি দেখলাম, তা মোটামুটি আমার মাথায় পুরোপুরি গেঁথে গিয়েছে। কারণ আমি পরবর্তী সত্তর দিন ওই একই লাইন কটি দেখেছি। Your visa is under administrative processing. It is usually resolved within 60 days, however, it may vary from case to case.
তখনো গা করিনি বিশেষ। দিব্যি বেড়াতে চলে গিয়েছি রাজস্থান। ইতিমিধ্যে আমার ল্যাবেরই আরও যেই তিনজনের যাওয়ার কথা ছিল আমার সাথে, ওদের ইন্টারভ্যু হয়ে গিয়েছিল। দুজন দিনে দিনে পেয়ে গেল। দশ বছরের ছাড়পত্র। আরেকজনের আমার মতোই অবস্থা। ইন্টারভ্যু দেওয়ার দশদিনের মাথায় যখন আমি পুষ্কর লেকের ধারে ঘুরছি, আমার কাছে কনসুলেট থেকে ফোন এলো। এবং দুর্ভাগ্যবশত ফোনের একটা কথাও শুনতে পারলাম না। এদিকে তারপর বার বার ওদের ফোন করার চেষ্টা করেও কোন কিছু হলনা। ইনকামিং হয়না বোধহয়। তারপর ইমেল করলাম। জানতে পারলাম পরেরদিন যে আরও কিছু ডকুমেন্টস ওদের লাগবে। সঙ্গে সঙ্গে সেগুলি পাঠালাম। ব্যস। আর কোনরকম কোন আপডেট নেই। এরপরের পঞ্চাশদিন যে আমার কী বিচ্ছিরিভাবে কেটেছিল, সেটা বোধহয় আর লিখে বোঝাতে পারবনা। প্রতিনিয়ত কনসুলেটের ওয়েবসাইট ট্র্যাক করা, হেল্পডেস্কে মেল লেখা, ফোন করা, ফেসবুকে কনসুলেটে যোগাযোগের চেষ্টা - হেন জিনিস নেই যা করিনি। এমনকি আমার সুপারভাইজারের সাহায্যে স্যান ফ্র্যানসিস্কোতে ইন্ডিয়ান কনসুলেটের এক ভদ্রলোকের সাহায্যেও অ্যামেরিকান কনসুলেটে যোগাযোগের চেষ্টা করি। এমারজেন্সি হিসেবে যদি ধরে। কিন্তু না। আমার চল্লিশ হাজার টাকা জলাঞ্জলি দিয়ে হতভাগা ভিসাটি এলো ঠিক যেদিন আমার স্যান ফ্র্যানসিস্কো থেকে ফেরার কথা, সেইদিন সকালে। বাকিরা ইতিমধ্যে ঘুরে ফিরেও এসেছে। যে ভিসা পাওয়ার জন্য আমি তার আগে পর্যন্ত হন্যে হয়ে ঘুরেছি, পাগলের মত যে যেখানে যা সাজেশন দিয়েছে, পরায় সব উপায় খুঁজেছি, সেটা যেদিন জানতে পারলাম মেলে যে অ্যাপরুভ হয়েছে, একটা অদ্ভুত রকমের অনুভূতি হয়েছিল। এমনকি এতটাই নিরাসক্ত গোছের একটা ব্যাপার এসে গিয়েছিল যে পাসপোর্টটা পর্যন্ত নইতে যেতে ইচ্ছেই করছিল না। নেহাত বাবা মা খুব তাড়া দিচ্ছিলেন। তাই হাতে নিয়ে এলাম। সেই বহুকাঙ্খিত অ্যামেরিকান ভিসাসহ আমার ভারতীয় পাসপোর্ট।
ভিসার মেয়াদ আগামী ফেব্রুয়ারি অবধি। আরেকটি কনফারেন্সের কথা খুঁজে জানলাম। সেই কনফারেন্সটি বস্টোন শহরে হবে। ভিসাটির সদ্ব্যবহার করতে অ্যাপলাই করে দিলাম। এবং পেয়েও গেলাম। এইবারে গন্তব্য পূর্বদিক। কিন্তু না আঁচাতে বিশ্বাস নেই, এই অবস্থায় পৌঁছে গিয়েছি ততদিনে। তাই বড় মুখ করে তেমনভাবে কাউকে বলতেও পারছিনা। স্যান ফ্র্যানসিস্কোর সমস্ত প্ল্যানিং তো ততদিনে আডিয়ার নদীর জল থেকে বিচিত্র নেটওয়ার্কের মাধ্যমে প্যাসিফিক ওশেনে মিশে একাকার হয়ে গিয়েছে। তবুও সুযোগ পেলে ঘুরব না, এমন তো হতে পারেনা। আর তাই অল্প হলেও পরিকল্পনা শুরু করেছি। শুধু প্রতিবার একটাই চিন্তা। এবার যেন প্ল্যানগুলো অতলান্ত জলে না ডুবে যায়। আমার যা কপাল! এই কনফারেন্সে আমার অতি প্রিয় বান্ধবী সুজাতারও আসার কথা। ও থাকে সিয়াটেলে। ওখানেই পি এইচ ডি করছে। চার বছর পর দেখা হবে ওর সাথে। ভাবতেই পুলক জাগছে মনে। এদিকে ন্যু জার্সিতে আমার এক্কেবারে স্কুল লাইফের বেস্ট ফ্রেন্ডের বাড়ি। আবার পিসিরও বাড়ি। মানে যাকে বলে পুরো জমে ক্ষীর প্ল্যান। এখানে যাবো, সেখানে যাবো।
যত যাওয়ার দিন এগিয়ে আসে, ভিতরে ভিতরে উত্তেজনা বাড়তে থাকে। ৬ই জুলাই রাত্রের প্লেন। সরকারি টাকায় যাওয়া, তাই এয়ার ইন্ডিয়া বাধ্যতামূলক। আমার রুটটি ছিল চেন্নাই থেকে বম্বে, তারপর বম্বে থেকে সিধে নেওয়ার্ক। নেওয়ার্ক হল ন্যু জার্সিতে আর ন্যু ইয়র্ক আর ন্যু জার্সি আবার আমাদের হাওড়া কলকাতার মতোই ব্যাপার। আমি তো মোটামুটি এক তারিখ থেকেই ঠকঠক করে কাঁপছি। এই না কিছু ভুলভাল করি, এই না আমায় বিদেশ বিভূঁইয়ে অ্যারেস্ট করে ফেলে। না জানি কী কেলোর কীর্তি করব (নিজের ওপর বিশেষ ভরসা নেই যে), ইত্যাদি ইত্যাদি। অনেক লিস্টি বানিয়ে টানিয়ে শেষ মুহূর্ত অবধি দরকারি অদরকারি জিনিসপত্র কিনে টিনে অবশেষে ৬ তারিখ দুপুরবেলা যখন ল্যাব থেকে ফিরলাম, তখন হল গিয়ে আমার যাবতীয় প্যাকিং কমপ্লিট। সেদিনও সকাল সকাল বেরিয়ে থিক খুচখাচ জিনিসপত্র কিনেই চলেছি, বিশেষ করে ওষুধপত্র। আবার লাস্ট মোমেন্টে মনে পড়া ব্যাগের মেরামতিও করিয়েছি। শুধু ভাবছি, একবার প্লেনে উঠে পড়ি, ব্যস। চেইন কী শ্বাস নেব। কিন্তু বিধাতা যে একেকজনের একেক রকম পরিকল্পনা করে রাখেন, সে মনীষীরা যুগ যুগ ধরে বলে এলেও তেমন পাত্তা দিইনি। ইতিমধ্যে যেনে গিয়েছি যে আমার রাত্তির ৯টার ফ্লাইটটি এক ঘণ্টা ডিলেড হয়েছে। কিন্তু যেহেতু অস্বাভাবিক দামের জন্য ওয়েব চেক-ইন করিনি (ইন্টারনেটের তথ্য অনুযায়ী ঠিক করাই ছিল। যদিও প্রথম ইন্টারন্যাশনাল ফ্লাইট, তবুও জানলার ধার চাইনে আমার। আমার অবশ্য করেই আইল সিট চাই। এদিকে ওয়েব চেক-ইন করতে গেলে একেকটি আইল সিট দেখাচ্ছে হাজারের ওপর বাড়তি টাকা। একেই ইন্সটিট্যুটের বেঁধে দেওয়া টাকা রয়েছে, যত কমে সবকিছু করা যায় সেটাই দেখতে হচ্ছে প্রতি মুহূর্ত), তাই আমার পূর্ব নির্ধারিত সময়েই বের হওয়ার প্ল্যানটি বহাল রইল।
অ্যাপ ক্যাবের ওপর আমার খুব বিশ্বাস। খুব ভরসা। আর তাই হোস্টেল থেকে এয়ারপোর্ট যাওয়ার জন্য মহামান্য ওলাতে ক্যাব প্রি-বুক করলাম। আমার অভ্যেস কোথাও যাওয়ার হলে আগেভাগে পৌঁছে যাওয়া। হাতে বেশ অনেকটাই সময় নিয়েই প্রি-বুক করলেও শেষ মুহূর্তে মিনি প্যানিক অ্যাটাক দিয়ে আধ ঘণ্টায় ছ-ছটা গাড়ি ক্যান্সেল করল বুকিং। আমার প্ল্যান সন্ধ্যে ছটার মধ্যে এয়ারপোর্ট পৌঁছতেই হবে। এদিকে পৌনে ছটাতে আমি ফ্যালফ্যাল করে হোস্টেলের সামনে লটবহর নিয়ে রয়েছি। লটবহর বলতে বান্ধবীর পইপই করে বলে দেওয়ার ফলে একটি ব্যাকপ্যাক যার ওজন পরে মেপে জানলাম সাড়ে পাঁচ কেজি (তার মধ্যে দুই কেজি মিনিমাম হবেই আমার ক্যামেরাটি), একটি ট্রলি স্যুটকেস (আট কেজির আশেপাশে ওজন) গলায় একটি স্লিং ব্যাগ যার মধ্যে সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র রয়েছে এবং সবচেয়ে জরুরি জিনিসটি, অর্থাৎ আমার পোস্টারটি। সব কিছুরই একটা যথাযথ সময় আছে, আর তাই ঠিক আধ ঘণ্টার হয়রানির পর এক সদয় ওলা ড্রাইভার আমার রিকুয়েস্ট মেনে এলেন। বন্ধুদের যাদের আসার কথা ছিল আমায় ড্রপ করতে, তারা শেষ মুহূর্তে কাজে আটকে গেল। অগত্যা আমি একাই দুগগা দুগগা বলে রওনা দিলাম। ততক্ষণে টেনশন করে এমন অবস্থা হয়ে গিয়েছে আমার যে ক্যাম্পাসের মেন গেটে গিয়ে ড্রাইভারকে বলছি, একটু গাড়ি থামাবেন? দেখব পোস্টারটি নিয়েছি কি না। ড্রাইভার মহাশয় ততক্ষণে আমার কাউন্সেলরের রোল নিয়ে নিয়েছেন। ইতিমধ্যেই ক্যাব ক্যান্সেল করা কিভাবে রুখতে হয়, সেই নিয়ে মিনি ট্যুটোরিয়াল দিয়ে দিয়েছেন। এবারে আশ্বস্ত করলেন যে পোস্টারটি তিনি নিজে ভরেছেন। আমি যেন টেনশন না করি। গাড়িতে যেতে যেতে বাড়িতে এবং এক বন্ধুর সাথে কথা বলে টলে অবশেষে পৌঁছলাম চেন্নাইয়ের আন্না ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টে। ঘড়ির কাঁটা সন্ধ্যে ছটা তেতাল্লিশ (ওলার বিল মেলালাম)।
তখনো গা করিনি বিশেষ। দিব্যি বেড়াতে চলে গিয়েছি রাজস্থান। ইতিমিধ্যে আমার ল্যাবেরই আরও যেই তিনজনের যাওয়ার কথা ছিল আমার সাথে, ওদের ইন্টারভ্যু হয়ে গিয়েছিল। দুজন দিনে দিনে পেয়ে গেল। দশ বছরের ছাড়পত্র। আরেকজনের আমার মতোই অবস্থা। ইন্টারভ্যু দেওয়ার দশদিনের মাথায় যখন আমি পুষ্কর লেকের ধারে ঘুরছি, আমার কাছে কনসুলেট থেকে ফোন এলো। এবং দুর্ভাগ্যবশত ফোনের একটা কথাও শুনতে পারলাম না। এদিকে তারপর বার বার ওদের ফোন করার চেষ্টা করেও কোন কিছু হলনা। ইনকামিং হয়না বোধহয়। তারপর ইমেল করলাম। জানতে পারলাম পরেরদিন যে আরও কিছু ডকুমেন্টস ওদের লাগবে। সঙ্গে সঙ্গে সেগুলি পাঠালাম। ব্যস। আর কোনরকম কোন আপডেট নেই। এরপরের পঞ্চাশদিন যে আমার কী বিচ্ছিরিভাবে কেটেছিল, সেটা বোধহয় আর লিখে বোঝাতে পারবনা। প্রতিনিয়ত কনসুলেটের ওয়েবসাইট ট্র্যাক করা, হেল্পডেস্কে মেল লেখা, ফোন করা, ফেসবুকে কনসুলেটে যোগাযোগের চেষ্টা - হেন জিনিস নেই যা করিনি। এমনকি আমার সুপারভাইজারের সাহায্যে স্যান ফ্র্যানসিস্কোতে ইন্ডিয়ান কনসুলেটের এক ভদ্রলোকের সাহায্যেও অ্যামেরিকান কনসুলেটে যোগাযোগের চেষ্টা করি। এমারজেন্সি হিসেবে যদি ধরে। কিন্তু না। আমার চল্লিশ হাজার টাকা জলাঞ্জলি দিয়ে হতভাগা ভিসাটি এলো ঠিক যেদিন আমার স্যান ফ্র্যানসিস্কো থেকে ফেরার কথা, সেইদিন সকালে। বাকিরা ইতিমধ্যে ঘুরে ফিরেও এসেছে। যে ভিসা পাওয়ার জন্য আমি তার আগে পর্যন্ত হন্যে হয়ে ঘুরেছি, পাগলের মত যে যেখানে যা সাজেশন দিয়েছে, পরায় সব উপায় খুঁজেছি, সেটা যেদিন জানতে পারলাম মেলে যে অ্যাপরুভ হয়েছে, একটা অদ্ভুত রকমের অনুভূতি হয়েছিল। এমনকি এতটাই নিরাসক্ত গোছের একটা ব্যাপার এসে গিয়েছিল যে পাসপোর্টটা পর্যন্ত নইতে যেতে ইচ্ছেই করছিল না। নেহাত বাবা মা খুব তাড়া দিচ্ছিলেন। তাই হাতে নিয়ে এলাম। সেই বহুকাঙ্খিত অ্যামেরিকান ভিসাসহ আমার ভারতীয় পাসপোর্ট।
ভিসার মেয়াদ আগামী ফেব্রুয়ারি অবধি। আরেকটি কনফারেন্সের কথা খুঁজে জানলাম। সেই কনফারেন্সটি বস্টোন শহরে হবে। ভিসাটির সদ্ব্যবহার করতে অ্যাপলাই করে দিলাম। এবং পেয়েও গেলাম। এইবারে গন্তব্য পূর্বদিক। কিন্তু না আঁচাতে বিশ্বাস নেই, এই অবস্থায় পৌঁছে গিয়েছি ততদিনে। তাই বড় মুখ করে তেমনভাবে কাউকে বলতেও পারছিনা। স্যান ফ্র্যানসিস্কোর সমস্ত প্ল্যানিং তো ততদিনে আডিয়ার নদীর জল থেকে বিচিত্র নেটওয়ার্কের মাধ্যমে প্যাসিফিক ওশেনে মিশে একাকার হয়ে গিয়েছে। তবুও সুযোগ পেলে ঘুরব না, এমন তো হতে পারেনা। আর তাই অল্প হলেও পরিকল্পনা শুরু করেছি। শুধু প্রতিবার একটাই চিন্তা। এবার যেন প্ল্যানগুলো অতলান্ত জলে না ডুবে যায়। আমার যা কপাল! এই কনফারেন্সে আমার অতি প্রিয় বান্ধবী সুজাতারও আসার কথা। ও থাকে সিয়াটেলে। ওখানেই পি এইচ ডি করছে। চার বছর পর দেখা হবে ওর সাথে। ভাবতেই পুলক জাগছে মনে। এদিকে ন্যু জার্সিতে আমার এক্কেবারে স্কুল লাইফের বেস্ট ফ্রেন্ডের বাড়ি। আবার পিসিরও বাড়ি। মানে যাকে বলে পুরো জমে ক্ষীর প্ল্যান। এখানে যাবো, সেখানে যাবো।
যত যাওয়ার দিন এগিয়ে আসে, ভিতরে ভিতরে উত্তেজনা বাড়তে থাকে। ৬ই জুলাই রাত্রের প্লেন। সরকারি টাকায় যাওয়া, তাই এয়ার ইন্ডিয়া বাধ্যতামূলক। আমার রুটটি ছিল চেন্নাই থেকে বম্বে, তারপর বম্বে থেকে সিধে নেওয়ার্ক। নেওয়ার্ক হল ন্যু জার্সিতে আর ন্যু ইয়র্ক আর ন্যু জার্সি আবার আমাদের হাওড়া কলকাতার মতোই ব্যাপার। আমি তো মোটামুটি এক তারিখ থেকেই ঠকঠক করে কাঁপছি। এই না কিছু ভুলভাল করি, এই না আমায় বিদেশ বিভূঁইয়ে অ্যারেস্ট করে ফেলে। না জানি কী কেলোর কীর্তি করব (নিজের ওপর বিশেষ ভরসা নেই যে), ইত্যাদি ইত্যাদি। অনেক লিস্টি বানিয়ে টানিয়ে শেষ মুহূর্ত অবধি দরকারি অদরকারি জিনিসপত্র কিনে টিনে অবশেষে ৬ তারিখ দুপুরবেলা যখন ল্যাব থেকে ফিরলাম, তখন হল গিয়ে আমার যাবতীয় প্যাকিং কমপ্লিট। সেদিনও সকাল সকাল বেরিয়ে থিক খুচখাচ জিনিসপত্র কিনেই চলেছি, বিশেষ করে ওষুধপত্র। আবার লাস্ট মোমেন্টে মনে পড়া ব্যাগের মেরামতিও করিয়েছি। শুধু ভাবছি, একবার প্লেনে উঠে পড়ি, ব্যস। চেইন কী শ্বাস নেব। কিন্তু বিধাতা যে একেকজনের একেক রকম পরিকল্পনা করে রাখেন, সে মনীষীরা যুগ যুগ ধরে বলে এলেও তেমন পাত্তা দিইনি। ইতিমধ্যে যেনে গিয়েছি যে আমার রাত্তির ৯টার ফ্লাইটটি এক ঘণ্টা ডিলেড হয়েছে। কিন্তু যেহেতু অস্বাভাবিক দামের জন্য ওয়েব চেক-ইন করিনি (ইন্টারনেটের তথ্য অনুযায়ী ঠিক করাই ছিল। যদিও প্রথম ইন্টারন্যাশনাল ফ্লাইট, তবুও জানলার ধার চাইনে আমার। আমার অবশ্য করেই আইল সিট চাই। এদিকে ওয়েব চেক-ইন করতে গেলে একেকটি আইল সিট দেখাচ্ছে হাজারের ওপর বাড়তি টাকা। একেই ইন্সটিট্যুটের বেঁধে দেওয়া টাকা রয়েছে, যত কমে সবকিছু করা যায় সেটাই দেখতে হচ্ছে প্রতি মুহূর্ত), তাই আমার পূর্ব নির্ধারিত সময়েই বের হওয়ার প্ল্যানটি বহাল রইল।
অ্যাপ ক্যাবের ওপর আমার খুব বিশ্বাস। খুব ভরসা। আর তাই হোস্টেল থেকে এয়ারপোর্ট যাওয়ার জন্য মহামান্য ওলাতে ক্যাব প্রি-বুক করলাম। আমার অভ্যেস কোথাও যাওয়ার হলে আগেভাগে পৌঁছে যাওয়া। হাতে বেশ অনেকটাই সময় নিয়েই প্রি-বুক করলেও শেষ মুহূর্তে মিনি প্যানিক অ্যাটাক দিয়ে আধ ঘণ্টায় ছ-ছটা গাড়ি ক্যান্সেল করল বুকিং। আমার প্ল্যান সন্ধ্যে ছটার মধ্যে এয়ারপোর্ট পৌঁছতেই হবে। এদিকে পৌনে ছটাতে আমি ফ্যালফ্যাল করে হোস্টেলের সামনে লটবহর নিয়ে রয়েছি। লটবহর বলতে বান্ধবীর পইপই করে বলে দেওয়ার ফলে একটি ব্যাকপ্যাক যার ওজন পরে মেপে জানলাম সাড়ে পাঁচ কেজি (তার মধ্যে দুই কেজি মিনিমাম হবেই আমার ক্যামেরাটি), একটি ট্রলি স্যুটকেস (আট কেজির আশেপাশে ওজন) গলায় একটি স্লিং ব্যাগ যার মধ্যে সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র রয়েছে এবং সবচেয়ে জরুরি জিনিসটি, অর্থাৎ আমার পোস্টারটি। সব কিছুরই একটা যথাযথ সময় আছে, আর তাই ঠিক আধ ঘণ্টার হয়রানির পর এক সদয় ওলা ড্রাইভার আমার রিকুয়েস্ট মেনে এলেন। বন্ধুদের যাদের আসার কথা ছিল আমায় ড্রপ করতে, তারা শেষ মুহূর্তে কাজে আটকে গেল। অগত্যা আমি একাই দুগগা দুগগা বলে রওনা দিলাম। ততক্ষণে টেনশন করে এমন অবস্থা হয়ে গিয়েছে আমার যে ক্যাম্পাসের মেন গেটে গিয়ে ড্রাইভারকে বলছি, একটু গাড়ি থামাবেন? দেখব পোস্টারটি নিয়েছি কি না। ড্রাইভার মহাশয় ততক্ষণে আমার কাউন্সেলরের রোল নিয়ে নিয়েছেন। ইতিমধ্যেই ক্যাব ক্যান্সেল করা কিভাবে রুখতে হয়, সেই নিয়ে মিনি ট্যুটোরিয়াল দিয়ে দিয়েছেন। এবারে আশ্বস্ত করলেন যে পোস্টারটি তিনি নিজে ভরেছেন। আমি যেন টেনশন না করি। গাড়িতে যেতে যেতে বাড়িতে এবং এক বন্ধুর সাথে কথা বলে টলে অবশেষে পৌঁছলাম চেন্নাইয়ের আন্না ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টে। ঘড়ির কাঁটা সন্ধ্যে ছটা তেতাল্লিশ (ওলার বিল মেলালাম)।
Subscribe to:
Posts (Atom)