Saturday, September 1, 2018

saampaan live

একটা ছোট্ট অনুরোধ নিয়ে এলাম পাঠকদের কাছে। এই অনুরোধ আগেও করেছি লাইভ সেশনে। সম্প্রতি কিছু ফিডব্যাক কানে এলো। আর তাই আজ আবার বাধ্য হলাম। অন্যভাবে নেবেন না কিন্তু কেউ প্লিজ।
প্রতিটা লেখা যখন লেখা হয়, সেটি লেখক বা লেখিকার কাছে অত্যন্ত আপন হয়ে পড়ে। সন্তানসম প্রায়। আর সেই সন্তান স্নেহে অন্ধ হয়ে অনেক সময়েই আমরা বুঝিনা লেখাটি আদৌ জনসমক্ষে আসার জন্য তৈরি কি না, নাকি আরো পরিশীলিত ও পরিমার্জিত হওয়া প্রয়োজন। এইখানে আসে আপনার, মানে পাঠকের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। যখন লেখাটি পড়ছেন, দয়া করে সেটি সম্পর্কে আপনার মতামত কষ্ট করে হলেও জানান। আর সব সময় যে শুধু ভালো ভালো বলতে হবে, তা কিন্তু না। নির্দ্বিধায় খারাপ লাগাটা জানান। কীরকম হলে ব্যাপারটার মান উন্নত হতে পারতো, আপনার মতে, সেটি বলুন। আমরা কিন্তু উন্নতি করার জন্য উৎসুক। আর তাই সমালোচনা চাই। ভালো যেমন শুনতে পারি, তেমনই মন্দ লাগাটাও শোনা আমাদের কর্তব্য। আপনার সম্পূর্ণ অধিকার আছে সেটি জানানোর। আপনাদের মতামত না জানতে পারলে উন্নতি করতে পারবনা। তখন আপনারাই অসন্তুষ্ট হবেন। সাম্পান ছেড়ে অন্য নাওতে চলে যাবেন।
এবং এই একই বক্তব্য শুধুমাত্র লেখা সম্পর্কে নয়, পেজ সম্পর্কেও। পেজের কোন কন্টেন্ট যদি পছন্দ না হয়, নিশ্চয়ই জানাবেন। নতুন কীরকম কী চাইছেন, জানাবেন। সব অনুরোধ রাখতে পারব, এমন কথা দিচ্ছিনা। কারণ সাম্পান আমার নেশা হলেও পেশা অন্য। কাজেই বুঝতেই পারছেন... তবে হ্যাঁ, আপনারা যেহেতু আপনাদের মূল্যবান সময় ও উপার্জিত অর্থের বিনিময়ে ইন্টারনেট প্যাক কিনে সাম্পানে আসেন নিয়মিত, তাই আপনাদের বলার সম্পূর্ণ অধিকার আছে।
প্রসঙ্গত বলে রাখি, এই নৌকা চালিয়ে আমি একটি পয়সাও উপার্জন করিনা। নিতান্তই শখের জেরেই সাম্পানকে ভাসিয়ে রেখেছি। এবং আপানদের সকলকেও সেই শখ ও ভালোবাসা দিয়েই আমন্ত্রণ জানিয়েছি। যাত্রাপথে কজন যাত্রী হল, তাতে কিন্তু খুব একটা কিছু যায় আসেনা আমার, অর্থাৎ পেজের লাইক বা রিচ কমা বাড়া নিয়ে খুব বেশি বিচলিত নই আমি, কারণ আমি কোন পারানি নিইনা। নৌকো যেমন চলার, ঠিক চলবে। তবে হ্যাঁ, বেশি সহযাত্রী হলে অবশ্যই সবাই মিলে মিশে পথটা অতিক্রম করলে আনন্দটা বেশি। আপনার সম্পূর্ণ স্বাধীনতা আছে এই পথে আমাদের সঙ্গী হবেন কি না, তা ঠিক করার।
চলে যেতেই পারেন। শুধু এইটুকুই বলার যে যতক্ষণ আছেন, একটু খোলাখুলি সমালোচনা করুন। কোন পোস্ট পছন্দ না হলে সেখানে লিখুন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক হলে মেসেজ করে জানান। কথা দিচ্ছি, আপনার আইডেন্টিটি ডিসক্লোজ না করেই লেখক/লেখিকার কাছে সমালোচনার বার্তাটি পৌঁছে দেব। পেজ সম্পর্কেও কিছু বলার থাকলে মেসেজ করুন ইনবক্সে, অথবা ইমেলে জানান। ব্যক্তিগত দিক থেকে বলি, সমালোচনাকে সমালোচনা হিসেবে নেওয়ার মতো মানসিকতা রয়েছে আমার। তাই নির্দ্বিধায় আমায় জানাতে পারেন। আমি আপনাকে প্রকাশ্যে বা আড়ালে কোনভাবেই হেয় করবোনা।
কিন্তু জানান। না জানিয়ে চলে যাওয়া এবং তারপরে বাইরে গিয়ে সমালোচনা করাটা আমার মনে হয় ঠিক না। যেহেতু আমরা সকলে এক নৌকার সহযাত্রী, তাই কোথাও কিন্তু আত্মিক একটা টান থাকে। বলুন তো, is it a good thing to wash dirty linen in public? না তো?
পেজের ইমেল আইডি saampaan.emagazine@gmail.com

আকাশবাণী


শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় আমার অন্যতম প্রিয় লেখক। এই সেপ্টেম্বর মাসেই ওঁর মৃত্যুদিন (২২শে সেপ্টেম্বর)। ওঁর লেখা "আকাশবাণী" গল্পটি আমার খুব পছন্দের। ওঁর লেখাকে ট্রিবিউট জানানোর জন্যই কাছাকাছি ভাবনাচিন্তার, অবশ্যই আধুনিক জীবনের পরিপ্রেক্ষিতে, লিখেছিলাম এই লেখাটি বছরখানেক আগে। নামও একই রেখেছি।

আকাশবাণী

এইমাত্র টিয়া চলে গেল। গত এক মাস বাড়ি ভর্তি লোকে লোকারণ্য ছিল। চল্লিশ বছরের বিবাহিত জীবনের পর এই প্রথম এত বড় বাড়িতে একা থাকতে হবে কৌশিক বাবুকে। স্ত্রী মালিনী দীর্ঘ রোগভোগের পর মারা গিয়েছেন আজ ঠিক এক মাস হল। মায়ের মৃত্যুর খবর পেয়ে সুদূর স্কটল্যান্ড থেকে তড়িঘড়ি চলে এসেছিল মেয়ে টিয়া। সাথে এসেছিল জামাই ও যমজ নাতি-নাতনি। ছেলে বৌমা নাতি উড়ে এসেছিল আমেদাবাদ থেকে। সকলে থাকায় মালিনীর অবর্তমানটা যেন ততটা বুঝতে পারছিলেন না কৌশিক। শ্রাদ্ধশান্তি মিটে যাওয়ার পরে ছেলে-বউমা-নাতি-নাতনিরা চলে যাওয়ার পর বাড়ি খালি হলেও টিয়া ছিল বলে সেই একাকীত্ব গ্রাস করতে পারেনি।
আজ যেন সদর দরজাটা বন্ধ করতে বর্তমান পরিস্থিতিটা ভালো করে বুঝতে পারলেন। বিহ্বল হয়ে খানিকক্ষণ সোফায় চুপ করে মাথায় হাত দিয়ে বসলেন। গত ছয় মাস শয্যাশায়ী থাকলেও মালিনীর জ্ঞান ছিল একদম শেষ দিন পর্যন্ত। রোজ কৌশিকের জেগে থাকার সময়ের সিংহভাগ জুড়ে থাকত মালিনীর কাছে বসে দুনিয়ার গল্প করা। দিন শুরু হত খবরের কাগজ পড়ে শোনানো দিয়ে। তারপর বাজার থেকে কী কী আনতে হবে, সেই সমস্ত আলোচনা, বাজার করে ফিরে বাইরের জগতের খোঁজখবর – সব ভাগ করে নিতেন মালিনীর সাথে। নিজের হাতে খাইয়ে দেওয়া, জানলার ধারে খাটটাকে সরিয়ে বিকেলের চা খাওয়া, সন্ধ্যেবেলার বস্তাপচা বাংলা সিরিয়াল দেখা এবং রাত্রের খাবার খেয়ে একসাথে ঘুমানো – এই ছিল কৌশিক – মালিনীর নিত্যনৈমিত্তিক রুটিন।
এখন তিনি একা এত বড় বাড়িতে বসে একদম নিঃসঙ্গ বোধ করতে লাগলেন। স্ত্রীর সাথে কাটানো বহু সুখস্মৃতির কথা মনে পড়ে যেতে লাগল। পরিষ্কার দেখতে পারলেন গত শীতের ছুটিতে দুজনে রাজস্থান বেড়াতে গিয়ে কত আনন্দ করেছিলেন – উটের পিঠে চড়া থেকে সোনার কেল্লায় সেলফি তোলা – মালিনীর দৌলতে বয়সটা যেন কক্ষনো বাড়তে পারেনি ওনাদের দুজনের। তার আগেরবার পিকনিকে গিয়ে ডাম্বশ্যারাড খেলার ছলে কত মজাই না হয়েছিল। অত্যন্ত প্রাণবন্ত এক মানুষ ছিলেন মালিনী। Latest technology সম্বন্ধে সর্বদা ওয়াকিবহাল থাকতেন। ছেলেমেয়েদের সাথে Whatsapp, Facebook এ তো যোগাযোগ রাখতেনই, তেমনই একটি ব্লগও ছিল। কাল একবার সমস্ত account গুলিতে মালিনীর obituary লিখে account গুলো বন্ধ করে দিতে হবে।
ভাবনাচিন্তা করতে করতে কখন যে সন্ধ্যে নেমে গেছে, খেয়াল করেননি কৌশিক। ঘরের কোণে মালিনীর একটা সদ্যস্নাতা অপূর্ব সুন্দর ছবি বাঁধিয়ে রাখা ছিল। কৌশিকের তোলা, বছর পাঁচেক আগে, নৈনিতালে। যেদিন প্রথম ব্লাড টেস্টের রিপোর্ট দেখলেন মালিনী, এক অদ্ভুত প্রশান্ত মুখে হার্ড ডিস্ক থেকে নিজের এই ছবিটা বের করে কৌশিক কে ডেকে বলেন, ‘ শোনো আমার শ্রাদ্ধে প্লীজ এই ছবিটা ব্যবহার কোরো। কোন দশ বারো বছর আগের ছবি টাঙিয়ে খুকি প্রতিপন্ন করতে যেও না আমায়। এই কেরালা কটন শাড়ীটা টিয়া প্রথম চাকরি পেয়ে আমায় দিয়েছিল। আমার খুব প্রিয় এটা। আর এই ছবিটা তুমি তুলেছিলে বাবলুর দেওয়া ক্যামেরাতে। সবদিক দিয়েই এটা আমার জন্য স্পেশাল। আর হ্যাঁ, আমি চলে গেলে রোজ আমার ছবির সামনে একটা করে ল্যাভেন্ডার ফ্রেগ্রেন্সের টি ক্যান্ডল জ্বালাবে। অ্যামাজনের লিঙ্কটা তোমায় মেল করে দেব। কোন বাহানা যেন না শুনি।‘
ভাবলেও কিরকম অদ্ভুত লাগে, নিজের মৃত্যু শমন হাতে পেয়েও কৌশিককে কেমন অবলীলাক্রমে এইসব নির্দেশ দিয়ে যাচ্ছিলেন মালিনী। পেশায় ইলেক্ট্রনিক্স ইঞ্জিনিয়ার, মালিনী, নিজের বয়সী আর পাঁচজনের চেয়ে অনেক বেশী tech savvy ছিলেন। হাতে ধরে কৌশিককে স্মার্টফোন ব্যবহার করা শিখিয়েছিলেন। চোখে লাগে বইয়ের ছোট অক্ষর পড়তে, তাই Kindle ব্যবহারও ওনারই শেখানোয়। কৌশিক, স্ত্রীর কল্যাণে, ষাট বছর বয়েসে প্রথম video call করা শুরু করেছিলেন। খেলার ছলে স্বামী স্ত্রী একতলা দুইতলায় বসে Skype Whatsapp video call করতেন। মালিনীর কথামত ছবির সামনে মোমবাতি জ্বালিয়ে চেয়ার টেনে বসলেন। হাতে নিলেন নিজের মোবাইল ফোনটা। অনেকে কন্ডোলেন্স মেসেজ পাঠিয়েছেন, একে একে উত্তর দেবেন ঠিক করলেন।
হোম স্ক্রীনে দেখলেন ফোন আপডেটের কিছু নোটিফিকেশন, প্রত্যেকটাতেই ওকে দিলেন। স্কাইপের আইকনটা অভ্যেশবসত প্রেস করেই ফেললেন। একটু অবাকই হলেন। মালিনীর প্রোফাইল পিকচার তো এটা ছিলনা। টিয়ার মেয়ে রুমির সাথে গত শীতের সময়ে তোলা ছবিটার বদলে এই ঘরের টেবিলের কোণের দৃশ্য। মোমবাতির আলোয় মালিনীর চোখ চকচক করছে – তাহলে বোধকরি এটা টিয়ার কাজ। ও কদিন ওর মায়ের ফোনটা নিয়ে টুকটাক খুটখাট করছিল। ছবির দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে হঠাত স্ক্রিনে ভেসে উঠল, “ Malini Sengupta calling”। আঁতকে উঠলেন কৌশিক। দুই চোখ কচলে তাকিয়েই রইলেন, স্কাইপ কল রিসিভ করলেনই না। Unanswered call হয়ে গেল। ফোনের নোটিফিকেশনে দেখলেন, “You have one missed call from Malini Sengupta”। ভালো করে দেখলেন – তারিখ, সময় একদম ওই মুহূর্তের। বিহ্বলতা কাটিয়ে ওঠার আগেই দেখলেন আবার সেই এক , “ Malini Sengupta calling”। বার তিনেক এরকম হল। তিনি ফোনটা না ধরে অবাক হয়ে চেয়ে রইলেন। পঞ্চমবার অত্যন্ত ভয়ে ভয়ে রিসিভ বাটন প্রেস করেই ফেললেন।
স্ক্রিন্টা অবশ্য ব্ল্যাংকই ছিল। একদম ঘুটঘুট্টে অন্ধকার স্ক্রিন, কেবলমাত্র একটা ক্ষীণ স্বর শুনতে পেলেন, এ তো তার বহুপরিচিত স্বর।
কী হল? কলটা আনসার করছিলেনা কেন?
মালিনী?
হ্যাঁ আমি মালিনীই তো। জানি অবাক হচ্ছ।
তুমি কোথায় মালিনী? আমি তোমায় দেখতে পাচ্ছি না কেন?
Out beyond the ideas of wrongdoing and rightdoing, there is a field – মনে কর আমি রুমির সেই ফিল্ডে। তুমি তো আমায় আর দেখতে পাবেনা। আমি যে আর আমি নেই পুরোপুরি।
আমি কিছুই বুঝছিনা যে।
সে পরে বোঝাব। তুমি কেমন আছ বল কৌশিক।
এখনো তো তোমায় নিয়েই ভেবে চলেছি মালিনী। তুমি না থাকলে আমি কি করে বাঁচব বল?
তাও তো ছেলে মেয়ের সাথে একমাস রইলে। আমার কথাটা ভাব। কত দূরে আমি একা পড়ে আছি। অপেক্ষা করছি কবে তুমি বাড়িতে একা থাকবে আর আমিও আসব।
কেন মালিনী? ছেলে মেয়েদের সামনে এলে না কেন? তুমি কীভাবে এলে? কোথা থেকেই বা এলে?
সব বলছি। আগে একটু দেখি তোমায়। ইশ, চোখের কোলে কালি পড়ে গেছে। জল কম খাচ্ছ?
মালিনী তুমি কেমন আছ?
আমি বড় একা কৌশিক। তোমায় প্রতি মুহূর্তে বড্ড মিস করি। তাই তো তোমার কাছে ছুটে এলাম।
তুমি থেকে যেতে পারনা?
তা হয়না কৌশিক। ওখানেরও কিছু নিয়ম আছে।
তবে তুমি কিভাবে এলে?
দেখো, Rules are meant to be broken। Existing rules এর কিছু tweak আর আমার engineering বিদ্যা কাজে লাগিয়েই এলাম। তবে কোনটাই সম্ভব হতনা তোমায় ছাড়া।
আমায়?
তুমি যদি অন্ধকার ঘরে বসে মোমবাতির আলোয় আমার ছবির দিকে তাকিয়ে না থাকতে বা তাকালেও এক মনে আমার কথা না ভাবতে, তাহলে আমি আসতে পারতাম না। তাও সহজে পারিনি। বহুবার নেটওয়ার্ক এরর আসার পরে আমি আসতে পারলাম।
তুমি রোজ আসবে? সারাদিন আসবে?
রোজ আসতেই পারি। তোমায় এক মনে প্ল্যানচেটের মত আমার কথা ভাবতে হবে। তবেই আমি আসতে পারব। তবে সারাদিন, জানিনা। ওখানেও সিগ্নাল উইক থাকে। কানেক্ট করা মুশকিল। তার ওপর, ওখানের কড়া নিয়ম। যার সাথে যোগাযোগ করব, সে ছাড়া আর কারুর উপস্থিতিতে আমি আসতে পারবনা।
বেশ। মাথায় থাকবে। খবরের হেডলাইন পড়ে শোনাব তোমায় মালিনী? ওখানে বলতে যেখানে বোঝাচ্ছ, সেখানে খবর পাও?
পাই বইকি, কিন্তু তোমার কাছে শুনে শুনে এমন অভ্যেস হয়ে গেছে – মাথায় ঢোকেনা কিছু।
আচ্ছা দাঁড়াও, আমি আনি।

সেইদিন আরো অনেকক্ষণ গল্পগাছা চলেছিল এই দম্পতির। বিজ্ঞান দিয়ে বিচার করতে গেলে এর কোনরকম ব্যাখ্যা নেই, তবু কাজ তো করে। একেই কি তবে বলে মনের টান? কে জানে। এরপর থেকে রোজ দিনে বেশ কয়েকবার কথা – দেখা হত কৌশিক মালিনীর। স্ত্রীর মৃত্যুর পর ছয় মাস হতে চলল। ছেলে – বৌমা আমেদাবাদ থেকে ডাকছে, মেয়ে জামাই বিলেতে ডাকছে। কিন্তু কৌশিকের কোথাও যেতে ইচ্ছে করেনা। গেলে যদি আর মালিনীর সাথে দেখা না হয়? নেশার মত হয়ে গেছে। ইতিমধ্যে একদিন কাজের মেয়ের হাত থেকে পড়ে কৌশিকের ফোনটা ভেঙ্গে চৌচির হয়ে গেল। স্ক্রিনটা কিছুতেই কিছু আর ডিসপ্লে করেনা। পুরো চার্জ করে, বারবার অফ-অন করেও কোন উপকার না পেয়ে তড়িঘড়ি Service centreএ নিয়ে গেলেন। Service centreএর প্রতিনিধির প্রায় দুই হাত ধরে কাকুতি-মিনতি করতে লাগলেন।
ভাই ফোন সেটটা আমার খুব দরকারি, প্লীজ এটা repair করে দাও। যত খরচা পড়বে, আমি দেব। কিন্তু ফোন যেন চালু হয়ে যায় দেখো।
মেসোমশাই দুই দিন observation রাখি, hardware এর গণ্ডগোল নাকি OS পালটাতে হবে, দেখে জানাব।
কৌশিক বেশ ভয়ে ভয়ে দোকান থেকে বেরোলেন, না জানি hardware কিছু গোলমাল হলে মালিনীর সাথে যোগাযোগটা রাখতে পারবেন কি না। গত ছয় মাসে যে প্রত্যেকদিন মালিনীর সাথে গল্প করতেন, এই ব্যাপারটা কেউ জানেইনা। ছেলে মেয়েদের বললে তারা বিশ্বাসই করতে চাইবেনা। কৌশিক নিজেই কি আর প্রথমে ব্যাপারটা ভাল বুঝেছিল নাকি? শরদিন্দু বাবুর গল্পের সাথে মিল খুঁজে পেলেও নিজের জীবনে এমনটা হবে, অভাবনীয় ছিল। তবুও দুই একদিন একটা ঘোরের মধ্যে থাকলেও আসতে আসতে গোটা ব্যাপারটা তার কাছে খুবই স্বাভাবিক হয়ে যায়, বলা চলে, সন্ধ্যে হলেই চায়ের কাপ হাতে, ফোনটা নিয়ে বসাটা রোজের নতুন অভ্যেসে পরিণত হয়ে গিয়েছিল। সারাদিনের সমস্ত গল্প মালিনীর সাথে শেয়ার করতে করতে যেন আর কিছুতেই কথা ফুরোতনা। শেষে মালিনীর দিক থেকেই প্রযুক্তিগত সমস্যা থাকায় কল কেটে দিতে হত। আবার অপেক্ষা পরের দিনের।
Service centre থেকে দ্বিতীয় দিন দুপুরে ফোনটা আসে। উদগ্রীব হয়ে কৌশিক তার নিজের ফোনের কথা জানতে চাইলেন। ছেলেটি জানালো ফোন ঠিক হয়ে গেছে,যেন বিকেলে এসে নিয়ে যান। কৌশিক পারলে তক্ষুনি ছুটে চলে যান। বিকেলবেলা ফোনটা নিয়ে এলেন। সন্ধ্যেবেলায় আগের মতই বসলেন মালিনীর ছবির সামনে। কিন্তু না, সন্ধ্যে গড়িয়ে রাত, রাত পেরিয়ে ভোর হয়ে গেল। Full signal, WiFi দিব্যি চলছে, অথচ মালিনীর ফোন নেই। সাতদিন হয়ে গেলেও আর “Malini Sengupta calling” ভেসে উঠলনা কৌশিকের স্ক্রিনে।
দুঃখে খাওয়া দাওয়া প্রায় বন্ধ করার জোগাড়। কাজের লোক ও পাড়া-প্রতিবেশীর থেকে খবর পেয়ে ছেলে ছুটে এসে দেখে বাবার গা পুড়ে যাচ্ছে জ্বরে। এদিকে হাতে ফোন ধরে, স্কাইপ আইকনের দিকে চেয়ে আছেন একদৃষ্টে। ডাক্তার এসে তেমন কিছু সুবিধে করতে পারলেন না। অনেক রাতে ছেলের ঘুম ভাঙল বাবার গলার আওয়াজে। ধীর পায়ে কৌশিকের দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে দেখতে পেল অত্যন্ত উত্তেজিত হয়ে উনি ফোনের দিকে তাকিয়ে বলছেন,
তুমি এসেছ? কোথায় ছিলে এতদিন?
বাবার বিছানার দিকে এগিয়ে গিয়ে স্ক্রীন এ চোখ পড়তেই চমকে উঠল সে। অন্ধকার স্ক্রিনের ওপর লেখা “Malini Sengupta in call”।

Wednesday, August 29, 2018

বোরং

বেশ কিছু বছর আগের বেড়াতে যাওয়া একটা জায়গার গল্প বলি তবে। পাহাড় তো আমায় ভীষণভাবে টানে, মাঝে মাঝেই তাই আমরা তখন পাহারে চলে যেতাম ঘুরতে। হাতে সময় বেশি থাকলে উত্তরাখণ্ড বা হিমাচল, আর সময় নিয়ে টানাটানি থাকলে হাতের কাছে সিকিম বা উত্তরবঙ্গ।

তখন আমি বি এস সি পড়ছি। পুজোর মাসখানেক আগে একদিন হঠাৎ আমি ভোরের দিকে স্বপ্নে কাঞ্চনজঙ্ঘাকে দেখলাম। তখন দিনকাল অন্যরকম ছিল, তাই বাবাকে স্বপ্নের কথা বলতেই বললেন, "চল তাহলে। ঘুরেই আসি।" কোথায় যাওয়া যায়, কোথায় যাওয়া যায় এই করতে করতেই কাটল গোটা দুই তিনদিন। আমরা একটু অফবিট জায়গা যেতেই ভালোবাসি। ভাবনাচিন্তার ফাঁকে মনে পড়ল, আরে, গত বছর রিঞ্চেনপং আর উত্তরেতে যাদের হোটেলে ছিলাম, ওঁদের তো অন্য একটা হোটেলও আছে। বোরং নাম জায়গাটার। গত বছরের অভিজ্ঞতা যখন ভালোই, তখন নিশ্চয়ই যাওয়াই যায়।

ব্যস, আর কীসের দেরি। সরকারি কলেজ, মহালয়া থেকে ছুটি পড়ে এক্কেবারে জগদ্ধাত্রী পুজোর পর খুলত। ঠিক হল ভাইফোঁটার পর তাহলে দিন পাঁচেকের জন্য ঘুরে আসা যাবে। আর তখন রীতিমত অফ-সীজন। তাই ট্রেনের টিকিট এমন শেষ মুহূর্তে খুঁজলেও পাওয়া যাবেই। যেমনি ভাবা, তেমনি কাজ। পরেরদিন সক্কাল সক্কাল বাবা দার্জিলিং মেলের (নাকি উত্তরবঙ্গ, খেয়াল নেই) তিনটে টিকিট কেটে আনলেন। আমি আর মা গড়িয়াতে হোটেলের মালিকের বাড়ি গিয়ে টাকাপয়সা অ্যাডভানস দিয়ে বুকিং করে নিলাম। প্রস্তুতি চলতে লাগল আমাদের টুকটাক। পুজোর হই হুল্লোড় আর ভাইফোঁটার আচার অনুষ্ঠান, গেট টুগেদার সব কাটিয়ে উঠে তো পড়লাম ট্রেনে। যেহেতু বেশ কিছু বছর আগের ঘটনা, ডিটেলে মনে নেই জার্নির কথা। এইটুকু বলতে পারি, নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশনে ট্রেন ঢোকার আগে, প্রতিবারের মতোই আকাশ পরিষ্কার পাওয়ায় কাঞ্চনবাবুকে এক ঝলক দেখতে পেয়েছিলাম, জীবন ধন্য ধন্য একটা ব্যাপার। গাড়ি বুক করে আমরা প্রথমে গিয়েছিলাম রাবাংলা। রাবাংলা অনেকেরই ভীষণভাবে পরিচিত একটি টুরিস্ট স্পট। সেই গল্পে জাচ্ছিনা তাই। মোট কথা ওখানে ওই পায়ে হেঁটে ঘুরে বেরিয়ে, মোনাস্টেরিতে গিয়ে, পাহাড়ে চড়ে ভালোই আনন্দ করেছিলাম। ওইখানে দুই দিন কাটিয়ে পৌঁছলাম বোরং।

বোরং পৌঁছেছিলাম দুপুরের দিকে। বাইরে তখন হাল্কা মেঘলা, মাঝে মাঝে কয়েক ফোঁটা বৃষ্টি পড়ছে। রাস্তাঘাট খুব ভালো না। তা ছাড়া আমাদের হোটেলটি যেখানে, সেখানে খুব একটা আশেপাশে আর কিছু নেই। তাই আমার মা যথারীতি টেনশন শুরু করে দিলেন। না জানি কোথায় এসে পড়লাম, কী করে থাকব, ইত্যাদি। তাও রাস্তায় যে গুটিকয়েক লোকজন দেখা যাচ্ছিল, তাদের জিজ্ঞেস করে আমরা তো অবশেষে এলাম আমাদের হোটেলে। রাস্তাতেই গাড়ি থেকে নেমে পড়তে হল। হোটেলের বয় এসে আমাদের মালপত্র নিয়ে এগিয়ে চলল রিসেপশনের দিকে।
কী জায়গা, চারিদিক নিস্তব্ধ, মাঝে মাঝে কিছু অজানা পাখির ডাক নৈঃশব্দ্য ভেঙ্গে চলেছে।  একটা অদ্ভুত বুনো গন্ধ যেন হাল্কা ভেসে আসছে নাকে। এরকম জনমানবহীন স্থানে কী করে থাকব, মোটেই থাকতে রাজি নই, এইসব বলে তো আমি আমার স্বভাববিরুদ্ধ ঘ্যানঘ্যান শুরু করলাম। তখন বয়স অন্তত দশ বছর কম, সারাক্ষণ তাই জমজমাট ভিড় পছন্দ। কিন্তু যেহেতু টাকা দেওয়া হয়ে গিয়েছে, আর কিছু করার নেই। অগত্যা...

আমাদের থাকার জায়গা ছিল একটি কাঠের কটেজে। ইলেক্ট্রিসিটিরই তেমন অবস্থা ভালো না, কাজেই বাথরুমে যে গিজার থাকবে, এ আশা করা মোটেই ঠিক না। হোটেলের লোকজনকে বলতে ওরা একটু কাঠের আঁচে জল গরম করে এনে দিলো। আমরা হাত মুখ ধুয়ে ফ্রেশ হব। সেই জলে অদ্ভুত গন্ধ হলেও, বেশ আরাম লাগল। ক্লান্তি কাটলেই হল। খাবার জায়গাটি আরেকটি কটেজে। আমাদেরটা থেকে হেঁটে কয়েক মিনিটেরই পথ। রাত্রে হেঁটে যাওয়াটা কিন্তু ভয়ের হতে পারে, অন্ধকারে, "জঙ্গলের" মধ্যে দিয়ে। সেইসব ভাবতে ভাবতে পৌঁছলাম ডাইনিং হল। হোটেল পুরো ফাঁকা, তাই যেতেই বসার জায়গাও পেলাম। গরম গরম ভাত ডাল চিকেন কারি তৈরি। খেয়েদেয়ে একটু যেন স্বস্তি। এইবারে চারিদিকে দেখা যায়।

দেখলাম আমাদের কটেজটির মতোই আরো গোটা চারেক এমন কাঠের কটেজ। প্রত্যেকটির সামনে লাগোয়া এক টুকরো বারান্দা। বারান্দায় বেতের চেয়ার পাতা। আর কটেজের পিছনে লম্বালম্বি সরু এক ফালি বারান্দা। বারান্দায় বেঞ্চ পাতা। বুঝলাম মেঘ না থাকলে হিমালয় দেখা যাবে, তাই এই ভিউ নেওয়ার সুব্যবস্থা। কটেজগুলি প্রত্যেকটিই কোন না কোন গাছের নামে। যেমন, আমাদেরটা ছিল পাইন। পাশে ওক, ফার্ন ইত্যাদি। সামনে অনেকটাই বড় বাগান। সেখানে ফুটে রয়েছে বিভিন্ন রঙের গোলাপ,হলুদ ও কমলা গাঁদা, এছাড়াও আরো বিভিন্ন রঙ বেরঙের নাম না জানা বুনো ফুল। এইবারে বুঝলাম ওই অদ্ভুত বুনো গন্ধের রহস্য। একটা দোলনাও দেখলাম। ভিতরের শিশুটি জেগে উঠল, একটু হলেও। আমারও, মায়েরও।

মেঘ জমে আছে তখনও, হাল্কা শিরশিরানি ঠাণ্ডা। গায়ে চাদর বেশটি করে জড়িয়ে বারান্দায় বসলাম। তখনই ঘরের ভিতর যেতে ইচ্ছে করছিলোনা। এত পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন চারপাশটা, বিশুদ্ধ বাতাস। প্রাণ ভরে নিঃশ্বাস নিলাম খানিকক্ষণ। কিছুক্ষণের মধ্যেই বৃষ্টি এসে গেল। আমরাও ঘরের মধ্যে এলাম। জঙ্গলের মধ্যে ঘর, প্রচুর পোকা থাকার কথা। ঝটপট ইনসেক্ট রিপেলেন্ট লাগিয়ে ফেললাম গায়ে হাতে পায়ে। দেওয়ালে ইতিমধ্যেই কয়েকটা বড় মথ দেখতে পাচ্ছি। গরম গরম চা আর পকোড়া সহযোগে নিজেদের মধ্যে গল্প করেই বেশ সময় কেটে যাচ্ছিল। হোটেলের বয় এসে ঘরেই ডিনার দিয়ে গেল। ভাগ্যিস। নইলে এই বৃষ্টিতে অন্ধকারে বেরোতে হলে মুস্কিল হতো ঠিকই। মায়ের নির্দেশমতো ঝুটঝামেলায় যেতে হবেনা বলে মরশুম অনুযায়ী ডিনারে খিচুরি আর পাঁপড়ভাজা। মনে আছে, সেই আমলেই এক প্লেটের দাম প্রায় ষাট টাকা ছিল। চমকে গিয়েছিলাম। এতই দুর্গম? কে জানে। ওদের কথামতো প্লেট বারান্দায় নামিয়ে রাখতে দরজা খুলতে দেখি একটি বিশাল কালো কুকুর শুয়ে। অন্ধকারের মধ্যে হঠাৎ দেখে চমকে গিয়েছিলাম অবশ্যই। তবে সে সাময়িক। তারপর তো তাকে প্রচুর আদর যত্ন করা হল।

রাত্রে খুব ভালো ঘুম হল। সকালে উঠে  দেখি ঝকঝকে আকাশ। মেঘ কেটে গিয়েছে। কাঞ্চনজঙ্ঘা এইখান থেকে দেখা যায়না, কিন্তু আশে পাশের বাকি অনেকটা রেঞ্জ দিব্যি দেখা যায়। ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপ হাতে বারান্দায় বসে দেখতে খুব ভালো লাগছিল। ভোরের প্রথম আলো কালো সাদা পর্বতশ্রেণীর ওপর পড়ে সৃষ্টি করেছে এক অনন্য ক্যানভাস। মুগ্ধ দৃষ্টিতে বসে বসে তাকিয়ে থাকতে থাকতে যে কত সময় কেটে যায়। ব্রেকফাস্ট সেরে আমরা হোটেলের বাইরে বড় রাস্তায় খানিক হাঁটাহাঁটি করলাম। তেমনভাবে তো কোন কাজ নেই। আশেপাশেও সেরকমভাবে ঘুরে বেড়ানোর আলাদা কিছু নেই। যা আছে, তা ওই রাবাংলা, নামচি, যেগুলি আমরা ঘুরেছি বা পরে যাব। তাই শুধুমাত্র আরাম করা আর সাথে দেদার আলসেমি, এছাড়া কিচ্ছুটি করার নেই। খানিক ঘোরাঘুরির পর ফিরলাম হোটেলে। গুচ্ছ গুচ্ছ বুনোফুলের বাগানে পায়ে হেঁটে তো ঘুরলামই, সাথে দোলনায়ও বসলাম। প্রথম কিছু মুহূর্ত একটু ইতস্তত করলেও মাকে আরামে দোলনায় চেপে মজা পেতে দেখে আমিও দোল খেতে শুরু করলাম। বাবা বারান্দায় বসে সমানে ছবি তুলতে লাগলেন। আমি আর মা দোল খেতে খেতে কত গল্প করলাম, গান গাইলাম... তখনও স্মার্টফোনের দৌরাত্ম্য হয়নি, আর তাই  প্রতি মুহূর্তে সোশ্যাল মিডিয়াতে আপডেট দেওয়ার ব্যস্ততা নেই। নেই কোন অকারণ ব্যাঘাত। বোধহয় প্রাণভরে ছুটির মতো ছুটি কাটানো একেই বলে।

দুপুরের খাওয়াদাওয়া সেরে এবার পালা গল্পের বই পড়ার। বাগানের কোলে চেয়ার পেতে পছন্দের বই। পাশে মোবাইলে বাজছে মৃদুস্বরে প্রিয় গান। বইয়ের পাতা থেকে মাঝে মাঝে মুখ তুলে ওপরে তাকালেই ম্যাজিক। হিমালয়ের অপরূপ বিস্তার। মাঝে মাঝে কালো কুকুরটা পাশে এসে বসছে। ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছি। আবার কখনও ক্যামেরা নিয়ে পটাপট কিছু ছবি তোলা। মা বাবা কখনও শুনতে পাচ্ছি ফোনে কথা বলছে। কী করে যে দিন কেটে গেল, বুঝলামই না। যে জায়গায় প্রথমদিন এসে ভাবলাম কী করে কাটবে সময়, সেইখানেই যে এত উপভোগ করবো, অভাবনীয়।

এই দুদিনে যতটা পেলাম, এত শান্তি বোধহয় কখনও আগে কোথাও পাইনি। লোকজনের থেকে দূরে এসে প্রকৃতির কোলে নিজেকে সম্পূর্ণভাবে সঁপে দেওয়ায় যে কত মাধুর্য থাকতে পারে, বোরং না এলে জানতেই পারতাম না। তৃতীয়দিন আমরা বোরং ছেড়ে রওনা দিলাম নামচির উদ্দেশ্যে। দক্ষিণ সিকিমের অন্যতম বড় জায়গা। পথে একটা দুর্ধর্ষ ভিউপয়েন্ট থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘার সাথে সাক্ষাত হল। উঠতেই ইচ্ছে করছিলোনা, খালি ওখানেই বসে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়েই থাকি আর পরপর গান গেয়ে যাই, এমন মনে হচ্ছিল। ঝকঝকে নীল আকাশ, সবুজ গাছের সারি, ফাঁক দিয়ে বিশাল হিমালয় পর্বতশ্রেণী, মাঝে দীপ্যমান প্রাণের কাঞ্চনজঙ্ঘা। আহা।

" জীবন জুড়ে লাগুক পরশ      
  ভুবন ব্যেপে লাগুক হরষ
 তোমার রূপে মরুক ডুবে আমার দুটি আঁখিতারা..." (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)


পুনশ্চঃ বর্তমানে আমার এক বন্ধুর অ্যালবামের ছবি দেখে বুঝেছি বোরং এখন অনেকটাই বদলে গিয়েছে, আরো উন্নত হয়েছে সমস্তকিছু ওখানে। টুরিস্ট যাচ্ছেন বিপুল সংখ্যায়।


Tuesday, August 28, 2018

বিজ্ঞাপন

কবে থেকে টিভি দেখা শুরু করেছেন বলুন তো? আমি তো সেই কোন ছোটবেলা থেকে সুযোগ পেলেই হাঁ করে টিভির প্রোগ্রাম গিলতাম। তবে ওই ছোট্ট বয়সে টিভি মানে ছিল শুধুই ওই বিভিন্ন অ্যাড জিঙ্গলস। কী মিষ্টি তাদের সুর, ভিডিওগুলোও কী কিউট। ধারার বিজ্ঞাপনটা মনে পড়ে? সেই যে বাচ্চাটা বাড়ি থেকে পালিয়ে স্টেশনে বসেছিল, আর তারপর তার রামুকাকা যেই তাকে বাড়িতে মায়ের হাতে বানানো "জলেবি"র কথা বললেন, ব্যস, সেই চোখে মুখে কী হাসি, কী উৎসাহ! যতই সাফোলা তেলের বিজ্ঞাপনের বাচ্চাগুলো লুচির সাথে তাল মিলিয়ে কার্টউইল করুক না কেন, ভোজনরসিক আমিটি কিন্তু সেই বয়স থেকেই ঠিকঠাক জিনিস পছন্দ করতাম। এখনও ইনোসেন্সের সুর বললে ওই "ধারা ধারা, বিশুদ্ধ ধারা" সুরটাই বারবার মনে হয়।

আরেকটু বড় হলাম যখন, স্কুলে যাওয়া শুরু। মা আর মোনাই বারবার করে বলতো, খুউউব সাবধান। উকুন বাঁধিয়ে এসোনা যেন। সেই সাথে প্রিভেনশন ইজ বেটার দ্যান কিয়োরের মতোই প্রতি রবিবার তখন চলত নিয়ম করে মেডিকার দিয়ে মাথা ধোয়া। ওরে বাবা, তখন স্নানের জন্য কত আয়োজন। ফিল্মস্টারেরা বেশিরভাগই লাক্স সাবান এন্ডরস করে, কাজেই হয় লাক্স মাখো, আর নইলে সোনালি বেন্দ্রের মতো "সৌন্দর্য সাবুন নির্মা"। শীত পড়লে অবশ্য সাপ্তাহিক বর্তমানের লাস্ট পেজ জুড়ে আর ডিডি সেভেনে "এলো শীতের রুক্ষ দিন, প্রিয় ত্বকের যত্ন নিতে চেসমি গ্লিসারিন"। শীতকাল এলো আর "সুরভিত অ্যান্টিসেপ্টিক ক্রিম বোরোলিন" বলবো না, হয় নাকি? মাঙ্কি ক্যাপের পরেই সবচেয়ে জনপ্রিয় বাঙালির আইডেন্টিটি যে।

তখন ক্রিকেট খেলা দেখা শুরু করেছি।খেলা মোটামুটি বুঝলেও বেশি আগ্রহ থাকত ওই সাদা বা স্কাই ব্লু রঙের জার্সি পরা ভারতীয় ক্রিকেটারদের দিকে মুগ্ধদৃশটিতে তাকিয়ে থাকায়। অজয় জাদেজা, রাহুল দ্রাবিড় এরা সব হার্টথ্রব। পেপসির বিজ্ঞাপনগুলোর জন্য মুখিয়ে থাকতাম। কিংফিশারের "উ লা লা লা উলে লো" অ্যাডে জাদেজাকে কী কিউট লাগত! দ্রাবিড় বিজ্ঞাপন দিতো বলে মনে আছে ৯৩এর বিশ্বকাপের বছর ঢেলে ব্রিটানিয়া চীজ কিনতাম, যদি মিট অ্যান্ড গ্রীটের সুযোগ পাই। কপাল খারাপ। পেতাম শুধুই, "বেটার লাক নেক্সট টাইম।"
এরকম সময়ে ক্যাডবেরির একটা বিজ্ঞাপন খুব পছন্দের ছিল। সাদা জার্সি পরা ক্রিকেটার, ৯৯ এ বল তুলে মারলেন। আউট হতে হতে ছয়। গ্যালারিতে বসা মেয়েটাকে ভীষণ হিংসে করতাম। কী সুন্দর ডেয়ারি মিল্কটা শেয়ার করতে পারতো ওই হ্যান্ডসাম ক্রিকেটারটির সাথে?
বয়স বাড়ল। আস্তে আস্তে বুঝতে পারলাম, রেমন্ডের সেই কমপ্লিট ম্যান থাকে শুধুই পর্দার ওপারে। বা "নয়ে ভারত কি, বুলন্দ তসভীর, হমারা বাজাজ"ও টিভির পর্দাতেই শুধু কূল। রিল ও রিয়েলের মধ্যে পার্থক্যগুলি বড্ড প্রকট। 

Monday, August 27, 2018

সংলাপ ৬

গুড মর্নিং
তুই কবে দেশ ছাড়লি?
দেশ ছাড়লাম মানে?
না মানে আমার ঘড়িতে দেখছি সকাল সাড়ে সাতটা। রবিবার। যে ছেলে উইকডেজেও আটটার আগে ওঠেনা, আজ রবিবার... তাই ভাবলাম তুই বোধহয় অন্য টাইমজোনে চলে গিয়েছিস।
না মানে আমি হোল নাইট জেগেছিলাম। এই এইবারে ঘুমোতে যাব। এখন কিন্তু কুম্ভকর্ণের মতো ঘুমাবো। যাতে তুই ফোন করে ডিস্টার্ব না করিস, তাই আগেভাগে কল করে নিলাম।
একশোবার বলি, এরকম ইন্ডিসিপ্লিন্ড লাইফ লিড করিসনা। কে শোনে কার কথা।
ব্যস। জ্ঞানদানন্দিনী মোড অন।
ভ্যাবলাকান্ত নিজের খেয়াল তো নিজে নিতে পারিসনা। সারাক্ষণ তাই টিকটিক করে যেতে হয়। কাকিমাকেও, আমাকেও।
মা তোর চেয়ে কম করে আজকাল।
শী হ্যাজ ক্লিয়ারলি গিভেন আপ অন ইয়ু।
আজ্ঞে না। দ্যাট লেডি ইস ভেরি স্মার্ট। দেখেছে তুই এসব করতে ভালবাসিস, তাই পুরো দায় তোর ঘাড়ে চাপিয়ে নিজে এখন বিন্দাস চিল করছে।
ওয়াটেভার।
তা আজ বেরোচ্ছিস কখন?
কোথায়?
এই যে বললি তুলির সাথে লাঞ্চে যাবি?
না না। ওই প্ল্যান ক্যান্সেল্ড। ওর নাকি কীসব লাস্ট মোমেন্টে অসুবিধে হয়েছে। বাড়িতে গেস্ট আসছে না কীসব।
যাহ। সানডে ওয়েস্ট?
ওয়েস্ট কেন হতে যাবে? অনেক বই রয়েছে, পেন্ডিং। ওগুলো নিয়েই থাকব।
গুড।
রান্নাও করতে পারি।
কী রাঁধবি?
বল কী খাবি?
আমি কী খাবো, তাতে আর কী যায় আসে? ভিডিও কলে শুক্তোও যা, মাটনও তা, যখন সামনে রাজমা চাউল থাকে।
ঢং করিসনা তো।
ঢং কী দেখলি রে এতে তুই?
আমায় কি গাধা ভাবিস নাকি?
হঠাৎ এই ক্ল্যারিফিকেশন?
পরিষ্কার পিছনে বাংলায় কথা শুনতে পাচ্ছি। গাড়ির হর্নের আওয়াজও। তাও যদি না বুঝি তুই কলকাতায় এসেছিস, তাহলে কী বলব নিজেকে?
যাচ্চলে। তাহলে আমার পুজোর ছুটি নিয়ে বাড়ি ফেরার সারপ্রাইজটা মাটি?
অ্যাজ অলওয়েজ! এনিওয়ে, কতদূর পৌঁছলি বল? লুচি আর আলুর চচ্চড়ি খাবি তো?
কোই শক ভেব্লি?
বাঁদর কোথাকার। দাঁড়া, একটা লুচি কম দেবোই দেবো।
সে ঠিক আছে। অন্য কিছুতে পুষিয়ে নেবো।

প্রাত্যহিকী

গত সাতদিন এক নাগাড়ে বৃষ্টির পর আজ সকাল থেকে ঝকঝকে নীল শরতের আকাশ।  পারুল খুব খুশি, জামাকাপড়গুলো ছাদে মেলতে পারবে। সোমনাথ সরকার অবশ্য এইসব দেখেন না, কী বৃষ্টি, কী রোদ, তেমনভাবে কিছুই যায় আসেনা। রিটায়ার করেছেন দশ বছর হতে চলল। গত দশ বছর ধরে প্রতিদিন সকাল ছটায় বিছানা ছেড়ে  বেডরুম লাগোয়া এই ছোট্ট ব্যাল্কনিতে ইজিচেয়ার পেতে বসেন, সাথে থাকে কোন না কোন বই, নিজের বিরাট সংগ্রহ থেকে। পাশে টেবিলে রয়েছে একটি আদ্যিকালের পুরনো কালো রেডিওসেট। ১০৭ ও ১০০.২ মেগাহার্টজ, এর মধ্যেই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে চলে সংবাদ আর গান। পারুল সময়ে সময়ে এসে চায়ের জোগান দিয়ে যায়। এগারোটার দিকে সোমনাথ স্নানের জন্য ওঠেন। তারপর চটজলদি দুপুরের খাবার খেয়ে আবার ব্যাল্কনিতে ফেরত।। বই পড়তে পড়তে মাঝেসাঝে ঝিমিয়েও নেন। সন্ধ্যের মুখে সামনের পার্কে বাচ্চাগুলো হই হুল্লোড় হুটোপাটি করে, ভারি আমোদ পান ওদের দেখতে, নাতির কথা মনে হয় তখন। স্ত্রী সরলাদেবী গত হয়েছেন দুই বছর হল। পারুল ঘরের কাজ আর টিভি সিরিয়াল নিয়ে থাকে। সোমনাথ একলা মানুষ। সারাদিন তাই এইভাবেই নিজের মতোই সময় কাটিয়ে দেন।

ছেলে সম্বুদ্ধ চাকরিসূত্রে দশ বছর ধরে লন্ডনে থাকে, স্ত্রী ও সন্তান নিয়ে। পারুলের থেকে নিয়মিত সোমনাথের খোঁজ খবর নেয়। ইদানীং সোমনাথের বয়সের কারণে মাঝে মাঝেই খুচখাচ অসুস্থতা তাদের চিন্তার কারণ হয়ে উঠেছে। তাই তড়িঘড়ি সম্বুদ্ধ এসে এবার ওর সাথে সোমনাথকে বিলেত নিয়ে গেল। অন্তত কিছু মাস যাতে নিশ্চিন্ত থাকতে পারে। একমাত্র ছেলে, দায়িত্ব বলেও তো একটা ব্যাপার আছে। পারুল খুব কাঁদছিল সোমনাথ চলে যাচ্ছেন বলে। ওর সাথে নিয়মিত ভিডিও কলে যোগাযোগ রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়ে সোমনাথ সাথে কিছু খুব শখের বইপত্তর নিয়ে রওনা দিলেন অধীর আগ্রহে। নাতিবাবুর সাথে দেখা হবে অবশেষে। এইবার থেকে ওর সাথেই খেলে গল্প শুনিয়ে দিব্যি সময় কেটে যাবে।

তিন মাস হল সোমনাথ লন্ডনে এসেছেন। ছেলে বৌমা খুব যত্ন করে। আলাদা ঘর, তার লাগোয়া ছোট্ট ব্যাল্কনি। ব্যাল্কনিতে পাতা আরামকেদারা। পাশে কফি টেবিল। টেবিলের ওপর রাখা হালফিলের রেডিও সেট, বিলেতের স্টেশন থেকে সেখানে বাংলায় গান চলে সারাদিন। সোমনাথ এখনও সেই সকাল ছটায় ওঠেন। সারাদিন বই পড়ে কাটান। তবে এ বই কাগজের না, এ ট্যাবে। বৌমা অফিস যাওয়ার আগে খাবার গুছিয়ে রেখে যায়, সারাদিন ছেলে বৌমা অফিস আর নাতি প্লে স্কুল আর ক্রেশেই কাটিয়ে দেয়। বিকেল হলে সামনের পার্কের বাচ্চাগুলো খেলে। মাঝে মাঝে বেলার দিকে পারুলকে ভিডিও কল করে খোঁজখবর নেন। দিব্যি সোমনাথের সময় এখানেও কেটে যায়।


শুধু মাঝে মাঝে মনে হয়, সত্যি, কীই বা কলকাতা, কীই বা লন্ডন। একাকীত্বর বুঝি দেশ কাল সীমানা হয়না।

Friday, August 24, 2018

সংলাপ ৫

হ্যালো?
বল।
এক্ষুনি সুইগির লোকটা ডেলিভারি দিয়ে গেল।
জানি। এস এম এস পেয়েছি।
থ্যাঙ্ক ইউ।
হুম।
তুই এখনও আপসেট, না?
ছাড় না ওইসব।
সরি রে, আই নো, আই প্রব্যাব্লি শুডন্ট হ্যাভ রিয়াক্টেড দ্যাট ওয়ে।
আমি খুব দুঃখ পেয়েছিলাম রুমুন তোর ব্যবহারে।
আমি জানি, আমি খুব বাজে ব্যবহার করেছি তোর সাথে সেদিন। আসলে এই লঙ ডিস্টেন্সটা আমায় কীরকম ইন্সিক্যোর বানিয়ে দিচ্ছে।
কীসের ইন্সিক্যোরিটি রুমুন? লঙ ডিস্টেন্স তো কী হয়েছে? তুইও এক আছিস, আমিও মানুষটা এক রইলাম। তাহলে কীসের সমস্যা?
আমি জানিনা। সারাক্ষণ মনে হয় দূরে আছি বলি তুই হয়তো সরে যাচ্ছিস আমার থেকে।
তুই আমায় ভরসা করিসনা, না?
ধ্যাৎ , অগ্নি। ওরকম বলিসনা।
তাহলে ভরসা করিসনা কেন?
জানি না। সবাই যে বলে লঙ ডিস্টেন্স ডাজন'ট ওয়ার্ক...
কুছ তো লগ কহেঙ্গে, লোগো কা কাম হ্যায় কেহনা...
ট্রু...
শোন, দিস ইজ আ চ্যালেঞ্জ টু আস। দেখাই যাক না, কেমনভাবে আমরা এটা কাটাতে পারি। কবে ফিরব বা তুই এখানে আসবি, জানিনা ঠিকই।
ঠিক বলেছিস। কোন কাজের কাজ তো হলোই না এই দুদিনে। উল্টে দুজনেই বিচ্ছিরি মুডে কাটালাম। মিছিমিছি মুহূর্তগুলো নষ্ট করলাম।
এই তো। এইবারে মাথায় ঢুকল?
ইয়েস!
আমি জানি তো, আমার ভেব্লি বুড়িটা এমনিতে স্মারট অ্যান্ড ইনটেলিজেন্ট, শুধু মাঝে মাঝে মাথায় পোকা নড়ে।
হুম...
নে, এবার খেয়ে নে। সুপটা ঠাণ্ডা হয়ে গেলে আর ভালোই লাগবেনা। তখন কমপ্লেন করলেও আরেকবার অর্ডার করতে পারব না। মাসের শেষ। পকেট ফাঁকা।
খাচ্ছি। তুই বাই দি ওয়ে, খেয়াল রাখ। তোর পিজ্জাটা রওনা দিয়েছে। ট্র্যাক করছিলাম। এই এলো বলে। তোরটা আসুক, একসাথে ভিডিও কল করতে করতে খাবো।
আমাদের সানডে লাঞ্চ ডেট?
নয়তো কী?