ভিড় বাস, জ্যাম, ঘাম, ঠেলাঠেলি কাটিয়ে মানিকতলা বাজারে নেমেছি অফিস
ফেরতা। শার্টের বুকপকেটে গিন্নীর যত্ন করে হাতে লেখা ফর্দ। পরশু আমাদের
ছেলেটার পাঁচ বছরের জন্মদিন। ঘটা করে পালন হবে। তাই লিস্টিও লম্বা। মাছ,
মাংস, হরেক রকম সব্জি। মাছওয়ালার কাছে দাঁড়িয়ে কানকো টিপে টিপে টাটকা কাতলা
বেছে, দর করে বেশ একটা যুদ্ধজয়ের ভাব মনে। কী করব। মধ্যবিত্ত সাধারণ
মানুষ। মাসের শেষ। ২১০টাকা কিলোটা ১৯০এ পেয়েই তাই মন বেজায় প্রসন্ন। হঠাৎ
পাশ থেকে কানে এলো এক রিনরিনে কণ্ঠস্বর:
"দাদা, ইলিশ কত করে?"
ছ্যাঁত করে উঠলো বুকটা।
চোখ তুলে তাকালাম।
একটা সাধারণ লাল কালো সবুজ জংলা ছাপ শাড়ি। তেল চুপচুপে চুল টেনে একটা
খোঁপায় বাঁধা। দুই ভুরুর মাঝখানে, একটু উঁচু করে বড় সিঁদুরের টিপ। চোখে সেই
হাই পাওয়ারের চশমা। মোটা কালো ফ্রেম। সরু কব্জি আলো করে আছে শাঁখা আর
দুগাছা চুরি। ডান হাতটা ধরে পাশে দাঁড়িয়ে বছর ছয়েকের একটা ফুটফুটে মেয়ে।
ঠিক যেমন সাজে কল্পনা করতাম ওকে। আজ থেকে বছর দশেক আগে। কলেজ ফেরত। এই
মানিকতলা বাস স্ট্যান্ডেই। ও ফিরত ভিকটোরিয়া কলেজ থেকে। আমি আসতাম
সুরেন্দ্রনাথ থেকে।
এখনও সেই একই রকম মায়ামাখা মুখ। সেই পাগলকরা দুই
চোখ। খানিক চেয়ে রইলাম ওর দিকে। কে জানে কতক্ষণ। এক মিনিট? দু মিনিট? নাকি
হাজার হাজার বছর?
"এই যে দাদা, আপনার মাছটা ধরুন। বলুন বৌদি, কতটা চাই?"
মাছওয়ালার কথায় সম্বিৎ ফিরল। দুজনেরই?
এখানে বাল্বের হলুদ আলোটা যেন বড্ড ম্লান।
হাত বাড়িয়ে প্যাকেটটি নিয়ে ঘুরলাম। দু পা এগোতেই সব্জির বাজার শুরু।
লিস্টে এখনো ফুলকপি, এঁচোর, বেগুন বাকি।
পাশের কোনো এক দোকানির রেডিওতে বেজে উঠলো, "অভি না যাও ছোড়কার, কে দিল অভি ভরা নহি..."।
হাসলাম মনে মনে। দিল আদৌ কবেই বা ভরেছিলো?
(না, এরা কিন্তু আর যেই হোক না কেন, কিছুতেই অগ্নি আর রুমুন না। ওদের এমন বিয়োগান্তক গল্প হতেই পারে না।)
Thursday, March 28, 2019
- কী ব্যাপার সকাল থেকে এই নিয়ে থার্ড এরকম লাভি ডাভি মেসেজ?
- ভালো লাগলো। তাই।
- সারাদিন এইসবই করছিস? কাজ নেই?
- আজ একটু হালকা আছি। ভালো লাগলো। তাই তোকে পাঠালাম।
- বুঝলাম।
- ভালো না লেখাগুলো?
- হুম। বেশ ভালো।
- আমাদের নিয়ে যদি কেউ এমন লিখতো...
- শুনলাম নাকি লেখে। ফেসবুকে। সাম্পান না কি একটা নাম পেজটার।
- ওই তো গুটিকয়েক লোকে পড়ে। ভাইরাল হয় না আমাদের গল্প।
- একদিক দিয়ে ভালো।
- কীসের ভালো?
- বেশি লোক জেনে গেলে কার না কার নজর লেগে যাবে শেষে।
- যত বাজে কথা।
- পাগলী!
- তাড়াতাড়ি ফিরিস আজ।
- চেষ্টা করছি।
- ভালো লাগলো। তাই।
- সারাদিন এইসবই করছিস? কাজ নেই?
- আজ একটু হালকা আছি। ভালো লাগলো। তাই তোকে পাঠালাম।
- বুঝলাম।
- ভালো না লেখাগুলো?
- হুম। বেশ ভালো।
- আমাদের নিয়ে যদি কেউ এমন লিখতো...
- শুনলাম নাকি লেখে। ফেসবুকে। সাম্পান না কি একটা নাম পেজটার।
- ওই তো গুটিকয়েক লোকে পড়ে। ভাইরাল হয় না আমাদের গল্প।
- একদিক দিয়ে ভালো।
- কীসের ভালো?
- বেশি লোক জেনে গেলে কার না কার নজর লেগে যাবে শেষে।
- যত বাজে কথা।
- পাগলী!
- তাড়াতাড়ি ফিরিস আজ।
- চেষ্টা করছি।
Tuesday, March 26, 2019
প্রেমে পড়া বারণ
দাশনগরের এই পাড়াতে নন্দিনীর আসার সবে ছয় মাস হয়েছে। বাবা শিবপ্রসাদ সান্যাল সরকারি হাসপাতালের ডাক্তার। এতদিন মালদা, বহরমপুর ইত্যাদি জায়গায় বদলিসূত্রে থেকে এই এবারে দাশনগরের সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রের দায়িত্ব পেয়েছেন। নন্দিনীর উচ্চ মাধ্যমিক শেষ হলো এবছর। এতদিন বাবার বদলির জেরে যাতে ওকে জেরবার না হতে হয়, লেখাপড়ায় কোনো ক্ষতি না হয়, তাই শিলিগুড়িতে মামা বাড়িতে থেকে লেখাপড়া করেছে। মামাবাড়িতে ওর বয়সী তেমন কেউ নেই। একমাত্র মামাতো দিদি, টুলুদি, নন্দিনীর চেয়ে পনেরো বছরের বড়। বহু বছর হলো বিয়ে করে বম্বেতে থাকে। মামা মামীও অন্যের সন্তানকে মানুষ করছেন দায়িত্ব নিয়ে, তাই কড়া শাসনের মধ্যে রাখতেন ভাগ্নিকে। এইসবের জেরেই নন্দিনী হয়েছে এক্কেবারে মুখচোরা, লাজুক। সাত চড়েও রা কাটেনা।
জয়েন্টে রেজাল্ট ভালো না হলেও উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় ভালো ফল করে এবছর প্রেসিডেন্সিতে বটানি অনার্স নিয়ে ভর্তি হয়েছে। কিন্তু মনে প্রাণে ইচ্ছে, বাবার মতোই ডাক্তার হবে। তাই সারাদিন কলেজে ক্লাস করে, সিনিয়রদের দাদাগিরি, ক্লাসমেটদের এদিক সেদিক বেফাঁস মন্তব্য সব মুখ বুজে সহ্য করেও নিয়ম করে সপ্তাহে তিনদিন জয়েন্টের স্পেশাল কোচিং ক্লাসে ঠিক যাবেই যাবে। তার অবশ্য দুটো কারণ। মুখ্য কারণ ডাক্তারিতে চান্স পাওয়ার প্রবল ইচ্ছে হলেও, দ্বিতীয় কারণটিও ইদানিং নেহাত গৌণ নয়। অন্তত নন্দিনীর কাছে। এই দ্বিতীয় কারণটি হলো বিশ্বম্ভর রায় চৌধুরী। দাশনগরের বিখ্যাত মাস্টার। অমন ভারিক্কি নাম শুনে প্রথমদিন দুরুদুরু বুকে ক্লাস করতে গিয়ে তো নন্দিনী একেবারে থ। আরে, এ যে একেবারে ইয়ং স্যর। বছর তেইশ কি চব্বিশ বয়স। নিজে মেডিকেল কলেজ থেকে পাস করে এখন পোস্ট গ্র্যাজুয়েট পরীক্ষার জন্য পড়ছে। আর সাথে এই একটা ব্যাচ পড়ায়। ভারী আমুদে এই বিশ্বম্ভর স্যর। ছাত্রদের প্রিয় বিশুদা।
নন্দিনীর ওকে খুব ভালো লেগে গেলো। কী সুন্দর মিশুকে। ওদের সাথে ওদের মতন করে মিশে গিয়ে গল্পের ছলে কঠিন কঠিন টপিক পড়িয়ে দেয়। প্রশ্নোত্তর পর্বেও সাহায্য করে।
কলেজের মতোই এই টিউশন ক্লাসেও নন্দিনী প্রায় চুপচাপ থাকে বেশিরভাগ সময়। হয়তো ব্যাচের বেশিরভাগই ওর চেয়ে ছোট বলে। তাও তাদের মধ্যে ওই রমিতা আর পিউয়ের সাথে যা অল্পবিস্তর কথা হয়। তার কারণ অবশ্য ওরা একই রুটের অটোতে যাতায়াত করে। তার মধ্যেও বিশ্বম্ভর স্যর মাঝে মাঝে নন্দিনীর থেকে প্রশ্নের উত্তর ঠিক বের করে নেয়। কনফিডেন্স বাড়ানোর চেষ্টায়।
সেদিন কলেজে হাফ ডে হয়ে ক্লাস অফ হয়ে যায়। বাড়ি এসে নন্দিনী একটু এফ এম রেডিওটা চালিয়ে শুয়েছে। বাবা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে। মা দুদিন হলো শিলিগুড়ি গিয়েছে। মামীর শরীরটা ভালো না। তাই ওদের সংসার সামলাতে মাই ভরসা। কোনোদিনও সেরকমভাবে টিভি বা রেডিও দেখার বা শোনার অভ্যেস ছিল না নন্দিনীর। আজ কী মনে হলো, কে জানে। ইয়ারফোন লাগিয়ে চালালো একটা স্টেশন। ভারী সুন্দর ভরাট গলায় একটি মেয়ে গাইছিল।
"তোমায় যত গল্প বলার ছিল
সব পাপড়ি হয়ে গাছের পাশে ছড়িয়ে রয়েছিল,
দাওনি তুমি আমায় সেসব কুড়িয়ে নেওয়ার কোনো কারণ।"
আহা। ভারী মনকাড়া তো। একবার ফোনের নেট অন করে নন্দিনী ইউটিউবে গানটা খুঁজে শুনলো। একবার। দুবার। দশবার। অপূর্ব। কী সুর। কীসব শব্দ। কী গায়কী। দুপুরের ঘুমটা দিলো তো মাটি করে এই গানটা।
সন্ধ্যে হলো। এবার বিশ্বম্ভরের টোলে যাওয়ার পালা। হ্যাঁ, ওর বাবা মজা করে এই নামেই বলে কোচিং ক্লাসটাকে। বাবা ডাক্তার জানার পর এক দুবার বিশ্বম্ভর স্যর এসে বাবার সাথে দেখা করে গিয়েছে। স্বাস্থ্যকেন্দ্রেও মাঝেসাঝে বসে। তাই নন্দিনীর বাবার সাথে ভালোই আলাপ পরিচয়। কিন্তু নন্দিনী এখনো তেমনভাবে জড়তা কাটিয়ে উঠতে পারেনি। মনে মনে অল্প ভালোলাগা জন্মালেও, সেটিকে পাত্তা না দেওয়ার চেষ্টাই করে চলেছে প্রাণপণ। মোটামুটি পারলেও মাঝে মাঝে সব যেন কেমন এলোমেলো হয়ে যায়।
ঠিক যেমন আজ হলো। বাড়ি থেকে বেরোনোর সময়েই আকাশটা কেমন ভার হয়েছিল। ক্লাসে পৌঁছতে পৌঁছতে আকাশ ভেঙে জোরে বৃষ্টি নামলো। চারিদিক অন্ধকার। হাওয়া বইছে বেশ জোরেই। আজকাল প্রায়ই চৈত্র মাসেই ঈশান কোণ কালো করে কালবৈশাখী এসে তান্ডব নৃত্য করে দিয়ে যাচ্ছে।
ছাতা থাকলেও খানিক ভিজেই নন্দিনী যখন ক্লাসে ঢুকল, দেখল ও ছাড়া আর জনা ছয়েক ছেলে মেয়ে বসে আছে। তাদের মধ্যে অবশ্য পিউ আর রমিতা নেই। বিশ্বম্ভর নিজের চেয়ার পেতে সামনে বসে। চুপচাপ ক্লাসের পিছনদিকে একটা কোণে গিয়ে বসতেই যাচ্ছিল নন্দিনী, এমন সময়ে বিশ্বম্ভর স্যরের গম্ভীর গলা শুনল, "এই তো কজন এসছিস তোরা আজ। যা বৃষ্টি নেমেছে, মনে হয় না আর কেউ আসবে বলে। আজকে আর ওই লাস্ট বেঞ্চে যাস না নন্দিনী। এই সামনেটায় চলে আয়।"
নন্দিনী নিরুপায়। কালো সুতির ওড়নাটা দিয়ে ভেজা মুখ মুছে পিঠের ব্যাগটা তুলে গুটিগুটি পায়ে এলো ফার্স্ট বেঞ্চে। বসতে যাবে, ঠিক সেই সময় গেল লোডশেডিং হয়ে। রাস্তার আলো, আসে পাশের সব বাড়ির আলোই চলে গিয়েছে। ঘুটঘুট্টি অন্ধকার। ছেলেদের দিক থেকে সমবেত প্রস্তাব এলো, 'বিশুদা, আজ প্লিজ ক্লাস করিয়ে এমন দুর্দান্ত ওয়েদারকে নষ্ট করো না। প্লিজ বিশুদা। ছুটি দাও।" বিশ্বম্ভর হেসে বললো, "সে ঠিক আছে। বুঝলাম। ছুটি না হয় দিলাম। কিন্তু একটা কথা বল, এই বৃষ্টির মধ্যে বাইরেই বা যাবি কী করে তোরা? ভিজে স্নান হয়ে যাবি। তারপর জ্বর হলে আরো তিনটে ক্লাস কামাই হবে। উহু। তার চেয়ে বরং সবাই মিলে এখানেই গল্প করি। গানটান গাই।"
হইহই করে ছেলেরা সায় দিলো এই কথায়। বিশ্বম্ভর।বললো, "দাঁড়া, আমি কটা মোমবাতি নিয়ে আসি। তোরা ইতিমধ্যে গান শুরু কর কেউ।" এই বলে বিশ্বম্ভর মোবাইলের আলো জ্বেলে ভিতরের ঘরে গেল। তারপর মিনিট দু তিনেকের মধ্যেই ফিরেও এলো। হাতে গোটা ছয়েক সরু সাদা মোমবাতি। আর একটা দেশলাই বাক্স। সুবীর বলে একটি ছেলে তখন গান ধরেছে। রীতিমতো হেড়ে গলায়। "কিছুতে কেন যে মন লাগে না..."
বিশ্বম্ভর একে একে মোমবাতিগুলো জ্বালাচ্ছে। আর নন্দিনীর হাতে ধরিয়ে দিচ্ছে। এদিক ওদিক রাখার জন্য। এক আধবার এই দেওয়া নেওয়ার সময়েই আলতো করে দুজনের আঙুল স্পর্শ করে গেলো একে অপরকে।
"সুবীর, এবার থাম। একটুও সুর নেই তোর গলায়।" হেসে বললো বিশ্বম্ভর।
"ঠিক বলেছ বিশুদা, ও গাইলে এই গা ছমছমে পরিবেশে ভূতেরা এসে পড়বে।" ফুট কাটলো রক্তিম বলে আরেক ছাত্র।
বিশ্বম্ভর এবার নন্দিনীর দিকে তাকিয়ে বলল, "তুই নিশ্চয়ই ভালো গান গাস। একটা গান ধর না।" নন্দিনী খানিক ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যায়। কোনোমতে তা কাটিয়ে উঠে বলে, "না। মানে আমি ঠিক গান জানি না।"
"বললেই হলো? তোর গলার আওয়াজ এত মিষ্টি। আবার আজ ক্লাসে ঢুকলি ইয়ারফোন কানে। গান জানিস না বললেই হলো? উহু। গান গাইতে হবেই। নইলে ছাড়ছি না।" বিশ্বম্ভর ঈষৎ গম্ভীর হয়েই বলে কথাগুলো।
নন্দিনী তো ঘেমে নেয়ে একশা। একেই এতজনের সামনে গান। তার ওপর বিশ্বম্ভর রয়েছে। কী মুশকিল। এদিকে মাথায় গানও আসছে না। ওই একটিই ছাড়া। আবার তাড়া খেয়ে এবার চোখ বুজে গান ধরতেই হলো। নন্দিনী নিজেও অবাক। কী গাইছে এটা?
"প্রেমে পড়া বারণ।
কারণে অকারণ।"
মোমের নরম আলো পড়ে তখন ওর নিষ্পাপ মুখখানি ভারী সুন্দর লাগছে। অমায়িক। নির্মল। নিরালা। নরম। বিশ্বম্ভরের চোখদুটিও কারণে অকারণে মাঝে মাঝেই ওর দিকে চলে যাচ্ছে। ঠোঁটের কোণে স্মিত হাসিতে ওকেও বেশ লাগছে কিন্তু।
বৃষ্টি থেমে আসে। ঘোর বসন্ত।
"শহর জুড়ে যেন প্রেমের মরসুম..."
জয়েন্টে রেজাল্ট ভালো না হলেও উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় ভালো ফল করে এবছর প্রেসিডেন্সিতে বটানি অনার্স নিয়ে ভর্তি হয়েছে। কিন্তু মনে প্রাণে ইচ্ছে, বাবার মতোই ডাক্তার হবে। তাই সারাদিন কলেজে ক্লাস করে, সিনিয়রদের দাদাগিরি, ক্লাসমেটদের এদিক সেদিক বেফাঁস মন্তব্য সব মুখ বুজে সহ্য করেও নিয়ম করে সপ্তাহে তিনদিন জয়েন্টের স্পেশাল কোচিং ক্লাসে ঠিক যাবেই যাবে। তার অবশ্য দুটো কারণ। মুখ্য কারণ ডাক্তারিতে চান্স পাওয়ার প্রবল ইচ্ছে হলেও, দ্বিতীয় কারণটিও ইদানিং নেহাত গৌণ নয়। অন্তত নন্দিনীর কাছে। এই দ্বিতীয় কারণটি হলো বিশ্বম্ভর রায় চৌধুরী। দাশনগরের বিখ্যাত মাস্টার। অমন ভারিক্কি নাম শুনে প্রথমদিন দুরুদুরু বুকে ক্লাস করতে গিয়ে তো নন্দিনী একেবারে থ। আরে, এ যে একেবারে ইয়ং স্যর। বছর তেইশ কি চব্বিশ বয়স। নিজে মেডিকেল কলেজ থেকে পাস করে এখন পোস্ট গ্র্যাজুয়েট পরীক্ষার জন্য পড়ছে। আর সাথে এই একটা ব্যাচ পড়ায়। ভারী আমুদে এই বিশ্বম্ভর স্যর। ছাত্রদের প্রিয় বিশুদা।
নন্দিনীর ওকে খুব ভালো লেগে গেলো। কী সুন্দর মিশুকে। ওদের সাথে ওদের মতন করে মিশে গিয়ে গল্পের ছলে কঠিন কঠিন টপিক পড়িয়ে দেয়। প্রশ্নোত্তর পর্বেও সাহায্য করে।
কলেজের মতোই এই টিউশন ক্লাসেও নন্দিনী প্রায় চুপচাপ থাকে বেশিরভাগ সময়। হয়তো ব্যাচের বেশিরভাগই ওর চেয়ে ছোট বলে। তাও তাদের মধ্যে ওই রমিতা আর পিউয়ের সাথে যা অল্পবিস্তর কথা হয়। তার কারণ অবশ্য ওরা একই রুটের অটোতে যাতায়াত করে। তার মধ্যেও বিশ্বম্ভর স্যর মাঝে মাঝে নন্দিনীর থেকে প্রশ্নের উত্তর ঠিক বের করে নেয়। কনফিডেন্স বাড়ানোর চেষ্টায়।
সেদিন কলেজে হাফ ডে হয়ে ক্লাস অফ হয়ে যায়। বাড়ি এসে নন্দিনী একটু এফ এম রেডিওটা চালিয়ে শুয়েছে। বাবা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে। মা দুদিন হলো শিলিগুড়ি গিয়েছে। মামীর শরীরটা ভালো না। তাই ওদের সংসার সামলাতে মাই ভরসা। কোনোদিনও সেরকমভাবে টিভি বা রেডিও দেখার বা শোনার অভ্যেস ছিল না নন্দিনীর। আজ কী মনে হলো, কে জানে। ইয়ারফোন লাগিয়ে চালালো একটা স্টেশন। ভারী সুন্দর ভরাট গলায় একটি মেয়ে গাইছিল।
"তোমায় যত গল্প বলার ছিল
সব পাপড়ি হয়ে গাছের পাশে ছড়িয়ে রয়েছিল,
দাওনি তুমি আমায় সেসব কুড়িয়ে নেওয়ার কোনো কারণ।"
আহা। ভারী মনকাড়া তো। একবার ফোনের নেট অন করে নন্দিনী ইউটিউবে গানটা খুঁজে শুনলো। একবার। দুবার। দশবার। অপূর্ব। কী সুর। কীসব শব্দ। কী গায়কী। দুপুরের ঘুমটা দিলো তো মাটি করে এই গানটা।
সন্ধ্যে হলো। এবার বিশ্বম্ভরের টোলে যাওয়ার পালা। হ্যাঁ, ওর বাবা মজা করে এই নামেই বলে কোচিং ক্লাসটাকে। বাবা ডাক্তার জানার পর এক দুবার বিশ্বম্ভর স্যর এসে বাবার সাথে দেখা করে গিয়েছে। স্বাস্থ্যকেন্দ্রেও মাঝেসাঝে বসে। তাই নন্দিনীর বাবার সাথে ভালোই আলাপ পরিচয়। কিন্তু নন্দিনী এখনো তেমনভাবে জড়তা কাটিয়ে উঠতে পারেনি। মনে মনে অল্প ভালোলাগা জন্মালেও, সেটিকে পাত্তা না দেওয়ার চেষ্টাই করে চলেছে প্রাণপণ। মোটামুটি পারলেও মাঝে মাঝে সব যেন কেমন এলোমেলো হয়ে যায়।
ঠিক যেমন আজ হলো। বাড়ি থেকে বেরোনোর সময়েই আকাশটা কেমন ভার হয়েছিল। ক্লাসে পৌঁছতে পৌঁছতে আকাশ ভেঙে জোরে বৃষ্টি নামলো। চারিদিক অন্ধকার। হাওয়া বইছে বেশ জোরেই। আজকাল প্রায়ই চৈত্র মাসেই ঈশান কোণ কালো করে কালবৈশাখী এসে তান্ডব নৃত্য করে দিয়ে যাচ্ছে।
ছাতা থাকলেও খানিক ভিজেই নন্দিনী যখন ক্লাসে ঢুকল, দেখল ও ছাড়া আর জনা ছয়েক ছেলে মেয়ে বসে আছে। তাদের মধ্যে অবশ্য পিউ আর রমিতা নেই। বিশ্বম্ভর নিজের চেয়ার পেতে সামনে বসে। চুপচাপ ক্লাসের পিছনদিকে একটা কোণে গিয়ে বসতেই যাচ্ছিল নন্দিনী, এমন সময়ে বিশ্বম্ভর স্যরের গম্ভীর গলা শুনল, "এই তো কজন এসছিস তোরা আজ। যা বৃষ্টি নেমেছে, মনে হয় না আর কেউ আসবে বলে। আজকে আর ওই লাস্ট বেঞ্চে যাস না নন্দিনী। এই সামনেটায় চলে আয়।"
নন্দিনী নিরুপায়। কালো সুতির ওড়নাটা দিয়ে ভেজা মুখ মুছে পিঠের ব্যাগটা তুলে গুটিগুটি পায়ে এলো ফার্স্ট বেঞ্চে। বসতে যাবে, ঠিক সেই সময় গেল লোডশেডিং হয়ে। রাস্তার আলো, আসে পাশের সব বাড়ির আলোই চলে গিয়েছে। ঘুটঘুট্টি অন্ধকার। ছেলেদের দিক থেকে সমবেত প্রস্তাব এলো, 'বিশুদা, আজ প্লিজ ক্লাস করিয়ে এমন দুর্দান্ত ওয়েদারকে নষ্ট করো না। প্লিজ বিশুদা। ছুটি দাও।" বিশ্বম্ভর হেসে বললো, "সে ঠিক আছে। বুঝলাম। ছুটি না হয় দিলাম। কিন্তু একটা কথা বল, এই বৃষ্টির মধ্যে বাইরেই বা যাবি কী করে তোরা? ভিজে স্নান হয়ে যাবি। তারপর জ্বর হলে আরো তিনটে ক্লাস কামাই হবে। উহু। তার চেয়ে বরং সবাই মিলে এখানেই গল্প করি। গানটান গাই।"
হইহই করে ছেলেরা সায় দিলো এই কথায়। বিশ্বম্ভর।বললো, "দাঁড়া, আমি কটা মোমবাতি নিয়ে আসি। তোরা ইতিমধ্যে গান শুরু কর কেউ।" এই বলে বিশ্বম্ভর মোবাইলের আলো জ্বেলে ভিতরের ঘরে গেল। তারপর মিনিট দু তিনেকের মধ্যেই ফিরেও এলো। হাতে গোটা ছয়েক সরু সাদা মোমবাতি। আর একটা দেশলাই বাক্স। সুবীর বলে একটি ছেলে তখন গান ধরেছে। রীতিমতো হেড়ে গলায়। "কিছুতে কেন যে মন লাগে না..."
বিশ্বম্ভর একে একে মোমবাতিগুলো জ্বালাচ্ছে। আর নন্দিনীর হাতে ধরিয়ে দিচ্ছে। এদিক ওদিক রাখার জন্য। এক আধবার এই দেওয়া নেওয়ার সময়েই আলতো করে দুজনের আঙুল স্পর্শ করে গেলো একে অপরকে।
"সুবীর, এবার থাম। একটুও সুর নেই তোর গলায়।" হেসে বললো বিশ্বম্ভর।
"ঠিক বলেছ বিশুদা, ও গাইলে এই গা ছমছমে পরিবেশে ভূতেরা এসে পড়বে।" ফুট কাটলো রক্তিম বলে আরেক ছাত্র।
বিশ্বম্ভর এবার নন্দিনীর দিকে তাকিয়ে বলল, "তুই নিশ্চয়ই ভালো গান গাস। একটা গান ধর না।" নন্দিনী খানিক ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যায়। কোনোমতে তা কাটিয়ে উঠে বলে, "না। মানে আমি ঠিক গান জানি না।"
"বললেই হলো? তোর গলার আওয়াজ এত মিষ্টি। আবার আজ ক্লাসে ঢুকলি ইয়ারফোন কানে। গান জানিস না বললেই হলো? উহু। গান গাইতে হবেই। নইলে ছাড়ছি না।" বিশ্বম্ভর ঈষৎ গম্ভীর হয়েই বলে কথাগুলো।
নন্দিনী তো ঘেমে নেয়ে একশা। একেই এতজনের সামনে গান। তার ওপর বিশ্বম্ভর রয়েছে। কী মুশকিল। এদিকে মাথায় গানও আসছে না। ওই একটিই ছাড়া। আবার তাড়া খেয়ে এবার চোখ বুজে গান ধরতেই হলো। নন্দিনী নিজেও অবাক। কী গাইছে এটা?
"প্রেমে পড়া বারণ।
কারণে অকারণ।"
মোমের নরম আলো পড়ে তখন ওর নিষ্পাপ মুখখানি ভারী সুন্দর লাগছে। অমায়িক। নির্মল। নিরালা। নরম। বিশ্বম্ভরের চোখদুটিও কারণে অকারণে মাঝে মাঝেই ওর দিকে চলে যাচ্ছে। ঠোঁটের কোণে স্মিত হাসিতে ওকেও বেশ লাগছে কিন্তু।
বৃষ্টি থেমে আসে। ঘোর বসন্ত।
"শহর জুড়ে যেন প্রেমের মরসুম..."
hijibiji kotha
#হিজিবিজি_কথা
আমি যে ডেস্কে বসে কাজ করি রোজ, সেখানে একদম সামনেই জানলা না থাকলেও, আমাদের ঘরটার জানলাগুলো এমনিতে খুব বড় বলে ভালো মতোই দেখা যায় সব। জানলার বাইরে দিয়ে বড় বড় তাল, সুপুরি ও আরো অনেক গাছ দেখতে পাই। আমি আবার গাছপালা ভালোবাসি বলে আমার এতে খুব আনন্দ হয়। এইসবের পিছনে, খানিকটা দূরে দেখি একটা টেলিফোনের টাওয়ার দাঁড়িয়ে আছে। কীরকম নিঃসঙ্গ। একা। মনে হয়, কোথাও গিয়ে যেন আমরাও ওই টাওয়ারটার মতো। এত ভিড়ের মাঝে থেকেও হয়তো একা। টাওয়ারটার মতোই যোগাযোগ স্থাপন করি, করাই ঠিকই, তবুও হয়তো আমাদের দিনের শেষে সেই একাই রয়ে যেতে হয়। মহাপুরুষদের বাণীই তাই বলে গিয়েছে যুগ যুগ ধরে। একাই আসি, একাই ফিরি। মাঝে শুধু কিছুদিন সবাই মিলে আনন্দ করি।
আমি যে ডেস্কে বসে কাজ করি রোজ, সেখানে একদম সামনেই জানলা না থাকলেও, আমাদের ঘরটার জানলাগুলো এমনিতে খুব বড় বলে ভালো মতোই দেখা যায় সব। জানলার বাইরে দিয়ে বড় বড় তাল, সুপুরি ও আরো অনেক গাছ দেখতে পাই। আমি আবার গাছপালা ভালোবাসি বলে আমার এতে খুব আনন্দ হয়। এইসবের পিছনে, খানিকটা দূরে দেখি একটা টেলিফোনের টাওয়ার দাঁড়িয়ে আছে। কীরকম নিঃসঙ্গ। একা। মনে হয়, কোথাও গিয়ে যেন আমরাও ওই টাওয়ারটার মতো। এত ভিড়ের মাঝে থেকেও হয়তো একা। টাওয়ারটার মতোই যোগাযোগ স্থাপন করি, করাই ঠিকই, তবুও হয়তো আমাদের দিনের শেষে সেই একাই রয়ে যেতে হয়। মহাপুরুষদের বাণীই তাই বলে গিয়েছে যুগ যুগ ধরে। একাই আসি, একাই ফিরি। মাঝে শুধু কিছুদিন সবাই মিলে আনন্দ করি।
সন্ধ্যের সময়টা
ভারি সুন্দর লাগে আমার। কী সুন্দর সারি দিয়ে দলে দলে ঝাঁকে ঝাঁকে পাখিরা
বাসায় ফেরে। ওই যে তখন পাখীর কূজন, যে কোন অপেরা অর্কেস্ট্রাকে হার মানিয়ে
দেবে বলে আমার বিশ্বাস। একটু কান পেতে শুনবেন কখনও। এয়ারপোর্টটা খুব কাছে
হওয়ায় দিনের কিছু কিছু সময় আবার প্রায় পাঁচ দশ মিনিট অন্তর প্লেনগুলো খুব
নীচ দিয়ে উড়ে যায়। তখন খুব মনে হয়, এই যদি পাখিগুলোর মতো দিনের শেষে
প্রিয়জনদের কাছে, বা নিজের বাসায় ফিরতে পারতাম। যদি...
জানি, "ফিরব বললে ফেরা যায় নাকি?" তবুও, সাধ জাগে। কোন একদিন আমার ডেস্কটা খালি পড়ে থাকবে। বা অন্য কেউ হয়তো এখানে বসে দেখবে। জানলা দিয়ে। নীল আকাশের বুক চিড়ে একটা সাদা লাল প্লেন উড়ে গেলো। দূরবীনে চোখ রাখলেও দেখতে পাবে কি জানি না, কিন্তু সেই প্লেনের কোন এক জানলার ধারে তখন মুক্তির হাসি হাসব আমি। হয়তো কোনদিন। শিগগিরই।
তখন রোজের জীবন আর প্রকৃতি কেমন মিলে মিশে এক হয়ে যাবে।
জানি, "ফিরব বললে ফেরা যায় নাকি?" তবুও, সাধ জাগে। কোন একদিন আমার ডেস্কটা খালি পড়ে থাকবে। বা অন্য কেউ হয়তো এখানে বসে দেখবে। জানলা দিয়ে। নীল আকাশের বুক চিড়ে একটা সাদা লাল প্লেন উড়ে গেলো। দূরবীনে চোখ রাখলেও দেখতে পাবে কি জানি না, কিন্তু সেই প্লেনের কোন এক জানলার ধারে তখন মুক্তির হাসি হাসব আমি। হয়তো কোনদিন। শিগগিরই।
তখন রোজের জীবন আর প্রকৃতি কেমন মিলে মিশে এক হয়ে যাবে।
ভিলেন
- উফ এই যা ওয়েদার। ভীষণ প্রেম পাচ্ছে।
- আমার পাচ্ছে না।
- তুই বড্ড আনরোমান্টিক।
- বিশ্বাস কর, সারা দুপুর আজ বসের জন্য ফালতু ফালতু রোদে টো টো করে ঘুরে কাজ করতে হয়েছে। তাও ইউজলেস কাজ। আমার মাথা ধরে আছে। ঘুম পাচ্ছে। এরপর আর যাই হোক প্রেম পাচ্ছে না।
- ধুর ধুর। সব সময় তোর এই বসটা ভিলেন হয়ে থাকে আমাদের লাভ স্টোরিতে।
- নামের ইনিশিয়ালসেই এ পি। অমরীশ পুরি।
- বেকার। টোটাল বেকার।
- এক কাজ কর। ইউটিউব চালিয়ে অরিজিৎ সিং শোন। প্রেম পালিয়ে যাবে। বিরহ মোড অন।
- বিরহ মধুর হলো আজি...
- ভরি দিয়া পূর্ণিমানিশা অধীর অদর্শনতৃষা।
- হয়েছে। এবার থাম। জানি সব গানের সব লাইন তোর মুখস্থ। গান শোন। আমি ঘুমাই।
- লাভ ইউ টু।
- হুম। সুইট ড্রিমস।
অপু-অপর্ণা
(স্থান: ধরুন, যাদবপুর সি আই টি মার্কেটের সামনে। একগাদা অটো যেখানে ভিড় করে দাঁড়িয়ে থাকে। রাণীকুঠি আর টালিগঞ্জ মেট্রো যাওয়ার জন্য।
কাল: সকাল দশটা। ব্যস্ত সোমবার।
পাত্র পাত্রী: নিজের মতো নাম ভেবে নিন। সাজেশন চাইলে বলবো অগ্নি আর রুমুন, নয়তো পাল্কি আর কৃশানু।) - আচ্ছা, আমি যদি অপু হই, তুই আমার অপর্ণা হবি?
(খানিক থতমত খেয়ে) - হতে পারি। তবে কথা দিতে হবে। কাজলকে দেখতে আসতে যেন পাঁচ বছর না লেগে যায়।
- ধুর পাগলী, কাজল তো আমার সামনেই জন্মাবে। ও যখন আসবে, আমি তোর পাশেই থাকবো। আমার দুই হাত দিয়ে শক্ত করে তোর দুই হাত চেপে ধরে রাখবো। যাতে তুই কোত্থাও না চলে যাস...
কাল: সকাল দশটা। ব্যস্ত সোমবার।
পাত্র পাত্রী: নিজের মতো নাম ভেবে নিন। সাজেশন চাইলে বলবো অগ্নি আর রুমুন, নয়তো পাল্কি আর কৃশানু।) - আচ্ছা, আমি যদি অপু হই, তুই আমার অপর্ণা হবি?
(খানিক থতমত খেয়ে) - হতে পারি। তবে কথা দিতে হবে। কাজলকে দেখতে আসতে যেন পাঁচ বছর না লেগে যায়।
- ধুর পাগলী, কাজল তো আমার সামনেই জন্মাবে। ও যখন আসবে, আমি তোর পাশেই থাকবো। আমার দুই হাত দিয়ে শক্ত করে তোর দুই হাত চেপে ধরে রাখবো। যাতে তুই কোত্থাও না চলে যাস...
(সলজ্জ হাসি। ঈষৎ রক্তিম গাল।) - বেশ। তবে তাই হোক।
Thursday, March 21, 2019
ফাগ
কাল রাত থেকেই পাল্কির খুব মন খারাপ। দেশে গতকাল ছিল দোল। সোশ্যাল মিডিয়া ভর্তি শুধুই আবীর আর রঙের ছবি। এই পোড়া দেশে না আছে এইসব উৎসব, না আছে একটা মন ভোলানো বসন্তের মৃদুমন্দ বাতাস। উল্টে ক'দিন ধরে এমন বিচ্ছিরি বৃষ্টি শুরু হয়েছে, কিচ্ছু ভাল্লাগছেনা। চারিদিকে শুধুই গ্রে। রঙের ছিটেফোঁটাও নেই কোথাও।
আর পাঁচটা সাধারণ বৃহস্পতিবার সকালের মতোই তাড়াহুড়ো করে ব্রেকফাস্ট খেতে খেতে বাড়িতে কথা বলছিল পাল্কি। মাথার মধ্যে হাজারো চিন্তা। ল্যাবে গিয়ে আজ কী কী এক্সপেরিমেন্ট করার আছে, তার একটা খসড়া করা, ফ্রিজে সব্জি মাছ মাংস কমে এসেছে, বিকেলে স্টোরে গিয়ে সেসব কেনার ফিরিস্তি। এমন সময়ে কলিং বেল বাজল ওর অ্যাপার্টমেন্টে। এই অসময়ে আবার কে, একটু অবাক হয়েই ফোন ছেড়ে পাল্কি এগলো দরজা খুলতে। আই-হোল দিয়ে দেখল ফেড এক্সের ডেলিভারি দিতে এসেছে। আরো অবাক। কিছু তো আসার কথা না। পাল্কি দরজা খুলে পার্সেলটা সই করে নিলো। এবং সেন্ডার ডিটেল দেখেই এক লহমায় মুখে একটা চওড়া হাসি খেলে গেলো ওর। কৃশানু।
দরজা বন্ধ করে ঘরে ঢুকে পার্সেলটা খুলে পাল্কি পেল একটা ট্রান্সপারেন্ট প্যাকে এক মুঠো সুগন্ধী গোলাপি আবীর। আর একটা ছোট্ট চিরকুট। হাল্কা গোলাপি রঙের কাগজে বেগুনি রঙের স্পার্কল কালিতে লেখা...
" আমার পাগলি,
মন খারাপ, না? জানি তো। বসে বসে শুধু পুরনো ছবিগুলোই দেখে চলেছিস। ঠিক তো, বল?
আমি তো যেতে পারলাম না, তাই প্রক্সি দিতে এই এক মুঠো আবীরই রইল। তোর ওই নরম গালে একটু ছুঁইয়ে নিস। ভাবিস আমিই না হয় এই ফাগের ছোঁওয়ায় রাঙালাম। আর হ্যাঁ, সাথে রইল তোর পছন্দের মিষ্টি। বলরাম থেকে রীতিমতো লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে কিনেছি গতকাল।
ইতি
তোর চৈত্র রাতের উদাসী...
পুনশ্চঃ সন্ধ্যেবেলা ল্যাব থেকে ফিরে লাল পার সাদা ঢাকাইটা পরবি, প্রত্যেক বছরের মতো। বেলের মালাটা পাবি না, জানি। ওটা মাফ। বাকি সাজগোজ যেন প্রত্যেক বছরের মতোই থাকে। ঝুমকোটা একটু বড় চাইই চাই। আর হ্যাঁ, কাজল পরবি, আই লাইনার না। তারপর আমায় ভিডিও কল করবি। আমি এখানে হারমোনিয়ামটা বাজাবো। আর তুই গান গাইবি। একটার পর একটা। বসন্তের গান। আমাদের বসন্তোৎসবটা যেন এবারে মিস না যায়। "
এই যে "দিনেকের দেখা, তিলেকের সুখ , ক্ষণেকের তরে শুধু হাসিমুখ" এইটুকুই তো সম্বল।
নতুন করে কুড়িয়ে পাওয়া এই প্রাণোচ্ছ্বাসভরে পাল্কি বেরোয় জীবনযুদ্ধে।
আর পাঁচটা সাধারণ বৃহস্পতিবার সকালের মতোই তাড়াহুড়ো করে ব্রেকফাস্ট খেতে খেতে বাড়িতে কথা বলছিল পাল্কি। মাথার মধ্যে হাজারো চিন্তা। ল্যাবে গিয়ে আজ কী কী এক্সপেরিমেন্ট করার আছে, তার একটা খসড়া করা, ফ্রিজে সব্জি মাছ মাংস কমে এসেছে, বিকেলে স্টোরে গিয়ে সেসব কেনার ফিরিস্তি। এমন সময়ে কলিং বেল বাজল ওর অ্যাপার্টমেন্টে। এই অসময়ে আবার কে, একটু অবাক হয়েই ফোন ছেড়ে পাল্কি এগলো দরজা খুলতে। আই-হোল দিয়ে দেখল ফেড এক্সের ডেলিভারি দিতে এসেছে। আরো অবাক। কিছু তো আসার কথা না। পাল্কি দরজা খুলে পার্সেলটা সই করে নিলো। এবং সেন্ডার ডিটেল দেখেই এক লহমায় মুখে একটা চওড়া হাসি খেলে গেলো ওর। কৃশানু।
দরজা বন্ধ করে ঘরে ঢুকে পার্সেলটা খুলে পাল্কি পেল একটা ট্রান্সপারেন্ট প্যাকে এক মুঠো সুগন্ধী গোলাপি আবীর। আর একটা ছোট্ট চিরকুট। হাল্কা গোলাপি রঙের কাগজে বেগুনি রঙের স্পার্কল কালিতে লেখা...
" আমার পাগলি,
মন খারাপ, না? জানি তো। বসে বসে শুধু পুরনো ছবিগুলোই দেখে চলেছিস। ঠিক তো, বল?
আমি তো যেতে পারলাম না, তাই প্রক্সি দিতে এই এক মুঠো আবীরই রইল। তোর ওই নরম গালে একটু ছুঁইয়ে নিস। ভাবিস আমিই না হয় এই ফাগের ছোঁওয়ায় রাঙালাম। আর হ্যাঁ, সাথে রইল তোর পছন্দের মিষ্টি। বলরাম থেকে রীতিমতো লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে কিনেছি গতকাল।
ইতি
তোর চৈত্র রাতের উদাসী...
পুনশ্চঃ সন্ধ্যেবেলা ল্যাব থেকে ফিরে লাল পার সাদা ঢাকাইটা পরবি, প্রত্যেক বছরের মতো। বেলের মালাটা পাবি না, জানি। ওটা মাফ। বাকি সাজগোজ যেন প্রত্যেক বছরের মতোই থাকে। ঝুমকোটা একটু বড় চাইই চাই। আর হ্যাঁ, কাজল পরবি, আই লাইনার না। তারপর আমায় ভিডিও কল করবি। আমি এখানে হারমোনিয়ামটা বাজাবো। আর তুই গান গাইবি। একটার পর একটা। বসন্তের গান। আমাদের বসন্তোৎসবটা যেন এবারে মিস না যায়। "
এই যে "দিনেকের দেখা, তিলেকের সুখ , ক্ষণেকের তরে শুধু হাসিমুখ" এইটুকুই তো সম্বল।
নতুন করে কুড়িয়ে পাওয়া এই প্রাণোচ্ছ্বাসভরে পাল্কি বেরোয় জীবনযুদ্ধে।
Subscribe to:
Posts (Atom)